আদি পর্বে বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন

আদি পর্বে বগুড়ায় ভাষা আন্দোলন

আব্দুর রহিম বগ্রা :আজিজ মেহের, একটা সময় ছিল যখন প্রগতিশীল চিন্তক মানুষের কাছে এ নামের মানুষটির কদর ছিল। বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন তিনি। ১৯৪৮ সালে এপ্রিল মাসে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বগুড়া শহরে ছাত্ররা যে মিছিল বের করে, সেই মিছিলে তার অংশগ্রহণ ছিল। তাঁর এক লেখায় তিনি সেই ঐতিহাসিক মিছিলের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, ‘সেটা ১৯৪৮ এর এপ্রিলে বগুড়ায় উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার বিরুদ্ধে  আন্দোলন করার মিটিং মিছিল হয়েছিল, তাতে প্রকাশ্য নেতৃত্বে ছিলেন গাজীউল ভাই, মতিন ভাই (মতিন সওদাগর), আবু, বুটু ভাই, মুখলেছ ভাই, শহীদ ভাইসহ আরো অনেকে। নেপথ্যে ছিলেন চিত্তদা, কমরেড আব্দুল কাদের চৌধুরী প্রমুখ এবং ওরাই সেই প্রতিকূল সময়ে আন্দোলন সূচনা করেছিলেন। একটা মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল।

এডওয়ার্ড পার্কের গেট থেকে বের হয়ে বগুড়া শহর পরিক্রমা করবে, ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে স্লোগান দেওয়া হবে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। মেজ ভাই মন্টুর সঙ্গে আমিও ছিলাম, আরো জনা পঞ্চাশ-ষাট জনের সঙ্গে। যাদের নাম উল্লেখ করলাম ওরা ছিলেন মিছিলের সামনে। মিছিল শুরু হল। সাতমাথার মোড়ে পৌঁছলে কোথা থেকে অতর্কিতে দশ বিশ জন যুবক- যারা মুসলিম লীগ সরকারের সমর্থক, কট্টর জিন্নাহ সাহেব ভক্ত- লাঠি, হকিস্টিক নিয়ে আল্লাহু আকবর, নারায়ে তকবির, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মিছিলের অগ্রভাগে। ফলে ক’জনের মাথা ফাটলো ও হাত ভাঙ্গল। আজিজ মেহের ওই মিছিলে তার মেজ ভাই ‘মন্টু’ নামে যার কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি চিত্র পরিচালক ‘ইবনে মিজান’। এ নামের মানুষটি সেদিন মন্টু নামে বগুড়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত ছিলেন। আজিজ মেহের তার এই ভাইয়ের রাজনৈতিক মতাদর্শের কথাও বলেছেন, এই ভাবে, ‘আমার মেজভাই মুন্টু (ইবনে মিজান, চিত্র পরিচালক) তখন ওদের পার্টির ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী। চিত্তদার সঙ্গে তার সরাসরি কিছুটা যোগাযোগ ছিল’।


৪৮-এ ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে বগুড়ায় ছাত্র মিছিলে হামলার ঘটনায় রক্তপাতের কথা বলেছেন, বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মোঃ নুরুল হোসেন মোল্লা। ‘ভাষা আন্দোলনে বগুড়ার অবদান’ শিরোনামে লেখায় তিনি বিশেষ করে আব্দুস শহীদ খলিফার কথা উল্লেখ করেছেন। তার বর্ণনা পাঠ করে আমরা জানতে পারি ৫২-এর আগেই বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের বীজ বপন হয়েছিল। আর সেটা ছিল রক্তসিক্ত বীজ। আব্দুস শহীদ খলিফা তার মাথার রক্ত ঢেলে সিক্ত করেছিলেন সেই বীজ। আজিজ মেহেরের মত নুরুল হোসেন মোল্লাও বলেছেন, ৪৮’এর মিছিলে মুসলিম লীগের পান্ডাদের হামলার কথা। তার বর্ণনা থেকে উদ্ধৃতি, ‘বগুড়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওহাব সাহেবের বড় ছেলে আব্দুস শহীদ সাহেবের স্থান অপরিসীম। ১৯৪৮ সালে যখন বগুড়া প্রগতিশীল ছাত্রদের দ্বারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উত্তরবঙ্গে ইউনিভার্সিটির দাবি নিয়ে স্থানীয় স্কুল কলেজের ছাত্ররা বিরাট মিছিল সহকারে রাস্তা প্রদক্ষিণ করেছিল। তখন তদানিন্তন ক্ষমতাশীল (মুসলিম লীগ) দলের গুন্ডারা পূর্ব প্রস্তুতি মত লোহার ডান্ডা নিয়ে মিছিলের পুর্বভাগে পতাকা হস্তে অবস্থিত জনাব শহীদ সাহেবের মাথায় প্রচন্ড আঘাত করে ও তার মাথা ফেটে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে যান। স্বাধীনতার পর বগুড়ায় সেই প্রথম রক্তপাত’। (তিনি ১৯৪৭ সালের আগস্টের ১৪ তারিখে ভারত বিভক্তির পর অর্জিত পূর্ববঙ্গের ভূ-খন্ডের স্বাধীনতার কথা বলেছেন )।

বর্ণিত আব্দুস শহীদ খলিফার পিতা ছিলেন আব্দুল ওহাব খলিফা ওরফে ধবল খলিফা। তিনি একাধারে জমিদার ও বড় বস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবে তার খ্যাতি ছিল। রাজনীতিতেও তার সংশ্লিষ্টতা ও সহযোগিতার কথা আমরা জানতে পারি। বগুড়ায় মুসলিম লীগের প্রতাপ প্রতিপত্তি উপেক্ষা করে জমিদার ওহাব খলিফা থানা সড়কে (কবি নজরুল ইসলাম সড়ক) তার তিনতলা ভবনের নীচতলায় ভাষা আন্দোলনে বগুড়ার সংগঠকদের শলাপরামর্শ, আলোচনা সভার জন্য ছেড়ে দেন। ভাষা সৈনিক নুরুল হোসেন মোল্লা তার সেই ঐতিহাসিক লেখা থেকে আমরা জানতে পারি ১৯৫২ এর ১৭ ফেব্র“য়ারি ওহাব খলিফার বাসভবনের নীচতলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র যুব, ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃ-স্থানিয়দের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ‘সর্ব দলীয় বাংলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। ১৭ সদস্য বিশিষ্ট সেই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে মজির উদ্দিন আহম্মেদ এবং গোলাম মহিউদ্দিন। এছাড়াও আন্দোলন গতিশীল রাখতে ও লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে কয়েকটি উপকমিটি গঠন করা হয়। ভাষা সৈনিক নূরুল হোসেন মোল্লা তখন পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, তাকে কলেজ সহ জেলার সমস্ত স্কুলে সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন কলেজ বলতে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ (বর্তমান পুরাতন ভবন, ফুলবাড়ী)। কলেজে স্বতন্ত্রভাবে অন্যরাও কাজ করতেন। তাদের মধ্যে মখছুদুল আলমের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি।


বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনে নুরুল হোসেন মোল্লা তার সাংগঠনিক কর্মকান্ডের কথা বলেছেন যেভাবে, ‘আজ আমি মুক্তকন্ঠে স্বীকার করছি যে, সেই দিন যদি তৎকালীন বগুড়া জেলা যুবলীগের সেক্রেটারী হারুন-অর-রশীদ সাহেব ও গোলাম মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সাহেব সাহায্য না করতেন তবে জেলা ভিত্তিক সমস্ত স্কুলগুলিতে ভাষা আন্দোলনের সংগঠন গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। কারণ তখন বক্তা ও কর্মীর খুব অভাব ছিল। কলেজের দায়িত্বে ছিলেন মখছুদুুল আলম, আমি নিজে ও মোশারফ হোসেন প্রভৃতি। প্রচারে মূলত: দায়িত্ব ছিল মহিউদ্দিন ও হারুন সাহেবের উপর। এই সমস্ত কর্মীদের নিয়ে বসা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রভৃতির দায়িত্ব ছিল তৎকালীন ও অধুনা কালের বগুড়ার অক্লান্ত রাজনৈতিক কর্মী মোখলেছার রহমান সাহেবের উপর’।  (সংক্ষিপ্ত)
তথ্য সূত্র : ‘উজান গাঙের মাঝি’
কমরেড চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য স্মারকগ্রন্থ-২০০৫ ইং
উন্মেষ স্মরণিকা, সম্পাদক দূর্গাদাস মুখার্জ্জী-১৯৭৮