অধিকার বঞ্চিত শিশুদের অধিকার চাই

অধিকার বঞ্চিত শিশুদের অধিকার চাই

ওসমান গনি : আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুরা আগামী দিনের জাতির কর্ণধার। তাদেরকে অবহেলা না করে আদর যতœ দিয়ে মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ এ শিশুদের মধ্যে রয়েছে সুপ্ত প্রতিভা। তারা সঠিক মূল্যায়ন পেলে নিঃসন্দেহভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে ভবিষ্যতের কত কবি, শিল্পী, বৈজ্ঞানিক,  সাহিত্যিক, চিকিৎসক ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিভা। আমাদের দেশে প্রতিবছর ব্যাপক আয়োজন করে পথশিশু দিবস’ ২রা অক্টোবর পালন করা হয়। শিশু বিষয়ক আরও যে সব দিবস রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল ১৭ই মার্চ জাতীয় শিশু দিবস, কন্যা শিশু দিবস ৩০ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব শিশু দিবস ২০ শে নভেম্বর অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, সাংসদ বা শিক্ষাবিদ এসে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে যান। তাতে সমবেদনা ঝরে, এমনকি করণীয় কর্মসূচীর কথাবার্তাও উচ্চারিত হয়। ওই ‘শিশু দিবস’ উপলক্ষে প্রকাশিত, প্রচারিত বিজ্ঞাপনে দেখা যায় গোলগাল, অতিপুষ্ট শিশুদের হাসিহাসি মুখ। বলা বাহুল্য এসব ছবি বিত্তবান, উচ্চমধ্যবিত্ত, পরিবারভুক্ত শিশুর, অতিপুষ্ট যাদের কারো কারো অন্য সমস্যা। অন্যদিকে অধিবাসী শিশু, শ্রমজীবি পরিবারের শিশু (শহর বা গ্রামের), এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুও রোগে বা অপুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্টিই এদের প্রধান ব্যাধি। এদের তো বিজ্ঞাপনে দেখানো চলে না। অনেক ছিন্নমূল শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনাদরে অবহেলায় মানুষ হচ্ছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এ দেশের দরিদ্র ও অসহায় শিশুরা।

 রাজধানী ঢাকায় কয়েক দশক ধরে দেখছি এদের, এবং এদের একাংশ অসহায় পথশিশু। একসময় এদের ‘পথকলি’-র শোভন নামে আখ্যায়িত করে স্বাভাবিক জীবনস্রোত ফিরিয়ে নেবার পরিকল্পনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তা বেশি দূর এগোয় নি। ওদের ভাগ্য রাজপথেই নির্ধারিত থাকে। জীবনের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত পথশিশুদের সাহায্য দুএকটি এন.জি.ও এগিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত অবস্থার হেরফের হয়নি। তাই স্বনামখ্যাত কার্টুনশিল্পী রফিকুন নবীর তুলিতে, কলমে এরা ‘টোকাই’ নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। শিক্ষিত মহলের আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। এরা এক অর্থে পরিবার বর্জিত, সমাজের উপেক্ষিত সদস্য। আমাদের সকলের প্রাণের স্পন্দন বাংলাদেশ। যে দেশের মানব সম্পদ এবং মেধা সম্পদ দিয়ে অন্যান্য দেশ আজ সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুসজ্জিত। অপরদিকে আমরা আজীবন গরীব দুঃখীই থেকে গেলাম। অথচ আমরা সারা জীবন শুধু অন্যদের প্রতিষ্ঠার গান শুনি, অনেক বেশী মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে নিজেদের উন্নতির কথাই ভুলে যাই। পরিপূর্ণ ভাবে ভুলে যায় কি করা উচিৎ ছিলো আর কি করছি! যার চূড়ান্ত কু-ফল আমাদেরকে চাক্ষুষ দেখতে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান সমস্যার মধ্যে শিশু শ্রম শনির দশা পরিগ্রহ করছে। শিশু পূর্ণার্ঙ্গ মানুষ থেকে কিছুটা আলাদা। এটা বোঝাতে গেলে হয় বোকা সাজতে হবে নইলে অন্যকে বোঝাতে ব্যর্থ হতে হবে। শিশু শ্রম নিয়ে অনেক আইন আছে সুপ্রিম কোর্টের বড় বড় বইয়ের পাতায়। কিন্তু কার্যকরের বেলায় আইন থাকে শূন্যের কোটায় যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিক শিশুরা করে মানবেতর জীবন যাপন আর থাকে বস্তিতে।

যে সব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন, মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা মারাত্মক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, মাদকাসক্ত কিংবা পিতা-মাতা সংসার চালাতে পারছে না সেই সব ঘরের শিশুরা বাইরে চলে এসে রাস্তায় বসবাস শুরু করে তাদেরকে পথ শিশু বলে। আমাদের দেশের বেশীর ভাগ লোকই দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। এরা সঠিক ভাবে শিশুদেরকে গড়ে তুলতে পারে না। তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। তারা ছেলে-মেয়েদেরকে ঠিকমত খাবার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার/সুযোগ-সুবিধা প্রদানে ব্যর্থ হয়। এসব শিশুরাই তখন জীবন সংগ্রামে নেমে বিভিন্ন কাজ-কর্মে জড়িয়ে পড়ে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে- কুলি, হকার, রিক্সা শ্রমিক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুনন কর্মী, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদেরকে নিয়োজিত করা হয়। সে বয়স থেকেই শিশুকে ধরতে হচ্ছে সংসারের হাল। মোটর, রিকশা, সাইকেল নির্মাণ বিদ্যুৎ  ইটভাটা, চা ষ্টল, হোটেল, রেষ্টুরেন্টে, রাজমিস্ত্রীর সাহায্যকারী, ওয়েলডিং কারখানায় গার্মেন্টস, জুটমিল, কৃষিসহ বিভিন্ন কাজে শিশুরা জীবন জীবিকার পথ খোঁজে। অনেকেই ট্যাক্সি, ম্যাক্সি, টেম্পু, মাইক্রোবাসের হেলপার, কেউবা চালাচ্ছে রিক্সা,কেউ কাঠমিস্ত্রির সহকারী। অভাবের তাড়নায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে শিশুরা।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
ganipress@yahoo.com
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯