ক্ষেতলালের দিনমজুর কালামের দিন কাটছে ভিক্ষাবৃত্তি করে

 ক্ষেতলালের দিনমজুর কালামের দিন কাটছে ভিক্ষাবৃত্তি করে

ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি : একটি সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে আট বছর ধরে দুর্বিষহ জীবন কাটছে দিনমজুর আবুল কালামের। রিক্সা-ভ্যানে শুয়ে থেকে হাত দিয়ে প্যাডেল করে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে এখন চলছে তার জীবন। অথচ ওই সড়ক দুর্ঘটনার আগেও আবুল কালাম ছিলেন সামর্থ্যবান যুবক। অন্যের জমি পত্তন নিয়ে চাষাবাদের পাশাপাশি বাড়িতে গরু পালন করে স্ত্রীকে নিয়ে গড়ে ছিলেন সুখের সংসার। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বগুড়ার নন্দীগ্রাম থেকে ভটভটিযোগে বাড়ি ফেরার পথে বিপরীতমুখী  ট্রাকের সাথে সংঘর্ষ হয়। এতে মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে যায় কালামের। নানা চিকিৎসার পরও আর দাঁড়াতে পারেনি কালাম। সেই থেকে পঙ্গু জীবনের নতুন যাত্রা শুরু হয় তার। কালামের পরিবার ও গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কাপাসঠিকরি (ধাওয়াপাড়া) গ্রামে অন্যের জমিতে গড়ে তোলা বাড়িতে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাস করেন দিনমজুর আবুল কালাম। শারীরিক সামর্থ্যবান যুবক কালাম পরিশ্রম করেই গড়েছেন সচ্ছল সংসার।

২০০৭ সালে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামের শাহজালাল এর মেয়ে     জহুরা বেগমকে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই সংসারে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন। ২০০৮ সালে তাদের ঘরে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান সিয়াম। কিন্তু জন্মের কয়েক মাস পরই সিয়াম আক্রান্ত হয় থ্যালাসেমিয়া রোগে। তখন সন্তানকে সুস্থ করতে কালাম ছুটে বেড়ান বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে। এতে তার অনেক খরচও হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়ার পর থেকে ছেলের পরিবর্তে নিজের চিকিৎসার জন্য পড়ে থাকতে হয় হাসপাতালে। তখন চরম অর্থ সংকটে পড়ে কালাম। নানা চেষ্টার পরও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় তাকে। থমকে যায় তার জীবনের সকল পরিকল্পনা। বিপন্ন জীবনে সন্তান ও সংসারের ভার বহনের ক্ষমতা হারিয়ে কালামের জীবন কাটছে এখন হাত দিয়ে প্যাডেল করা তিন চাকার রিক্সা-ভ্যানে। কোমর থেকে দুই পা অবশ হয়ে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গেছে তার। দিন-রাত শুয়ে থাকার কারণে পায়ের হাড়ে প্রচন্ড ব্যথা হয়। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে কখনও কখনও অঝোরে কাঁদে কালাম।

 হাত দিয়ে প্যাডেল করার কারণে হাতের তালু শক্ত কাঠের মত হয়ে গেছে। তারপরও থেমে নেই ছেলেকে বাঁচানোর আকুতি। এদিকে প্রতিমাসে সাতশত টাকা সরকারি পঙ্গু ভাতায় এখন কালামের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তার পাশাপাশি মানুষের কাছ থেকে যেটুকু সহযোগিতা মেলে তাই দিয়ে তিনজনের সংসারে দ্রব্য মূল্যের এ বাজারে কোন রকমে পরিবার নিয়ে দিন কাটছে পঙ্গু কালামের। কালাম বলেন, ‘আট বছর পঙ্গুত্ব বরণ করে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছি। স্বামী-স্ত্রী মিলে সুখের সংসার ছিল আমাদের। কিন্তু কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল, ভটভটিতে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা আমার পুরো জীবন ওলট পালট করে দিল। দুই পা অবশ হয়ে গেছে। পায়ের ব্যথার অসহ্য যন্ত্রণা, ভ্যান টানতে টানতে হাতও পাথর হয়ে গেছে।

কষ্ট হলেও হাত দিয়ে প্যাডেল করে রিক্সা-ভ্যানে দিনের পর দিন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরি। কালামের স্ত্রী জহুরা বেগম বলেন, ‘একেতো স্বামী পঙ্গু, তার ওপর একমাত্র সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগ। দীর্ঘ আট বছর ধরে স্বামী সন্তানের এই অবস্থার মধ্য দিয়ে সংসার চলছে তাদের। নিজের সম্বল বলতে কিছুই নেই। বসত ভিটাও অন্যের জায়গায়। এই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তির কোন পথ খুঁজে পাচ্ছেন না গৃহবধূ জহুরা বেগম। স্থানীয় কাপাসটিকরী গ্রামের আ. কাদের জানান, ‘আট বছর আগেও কালাম ছিলেন শারীরিক সামর্থ্যবান যুবক। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে কালাম নিঃস্ব হয়ে গেছে। চলাফেরার জন্য যান্ত্রিক কোন বাহনের ব্যবস্থা করা গেলে উপকৃত হবে কালাম। স্থানীয় আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুজ্জামান তালুকদার নাদিমে অসহায় কালামের বিষয়ে জানান, পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। কালামের পাশাপাশি তার একমাত্র ছেলে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। পরিবারটিকে পরিষদের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতাও দেওয়া হয়েছে।