সন্ধ্যা ৭:১৩, বুধবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য

মোহাম্মদ আল-আমিন ইসলাম, পৌষ মাস শুরু হয়েছে। জনিদের গাঁয়ে পৌষমেলা বসে। সেই পৌষমেলায় জনির মামাতো ভাই শাহেদ, জিশান জনিদের বাড়িতে আসে। মেলারদিন বিকালে জনি ওর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মেলায় যায়। মেলায় গিয়ে নাগরদোলা, লাঠিখেলা, পুতুলখেলা দেখে, জিলাপি-মন্ডা মিঠাই, মিষ্টি খেয়ে, তিনজনে পাঁচটি বাঘের মুখোশসহ অনেক কিছু কিনে নিয়ে জনিদের বাড়িতে আসে। মেলা শেষের দু-দিন পর জনি ওর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে নানা বাড়ি যাওয়ার জন্য দুপুরে রওয়ানা দেয়। যেতে যেতে ঠিক বিকেলে ওরা ওদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

 জনি বিকেলে, মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মামার ঘরে খাওয়া দাওয়া করে এবং মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে খেলাধুলা করে মাগরিবের আযানের দিকে ঘরে ফিরে আসে। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর মামাতো ভাই সাহেদ, জিশানের সঙ্গে ঘুমাতে গিয়ে খেজুর রস চুরির বুদ্ধি করে ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত পেরিয়ে যখন সকাল হয়, তখন জনি, জিশান, শাহেদ ঘুম থেকে উঠে রস চুরির জন্য মেলায় কেনা বাঘের মুখোশ পড়ে খেজুর বাগানের দিকে রওয়ানা হয়। তখন চারদিক ছিল নিঝুম-নিরব ও কুয়াশায় ঘেরা। তবে ওরা বাঘের বাড়তি মুখোশ দুটি নিতে ভোলে নি।


হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যে খেজুর বাগানে পৌঁছে যায় ওরা। বাগানে পৌঁছে গিয়ে গাছে বাঁধা রসের কলস পারার জন্য শাহেদ ও জিশান গাছে ওঠে । আর ওদেরকে সাহায্য করার জন্য জনি গাছের নিচে রয়ে যায়। তবে গাছে উঠতে না উঠতেই ছোট্্র এক পুঁচকে এসে ওদেরকে দেখে গিয়ে, গাছের মালিককে বলে দেয়। গাছের মালিক শাহেদ, জিশান, জনির সমবয়সী তার ছেলে রহিমকে একটি লাঠি হাতে দিয়ে বলে, খেজুর গাছের নিচে মুখোস পড়া যে ছেলে থাকবে তাকে লাঠি দিয়ে মাথায় মারবি। রহিম বাবার কথা শুনে চলে গেলে, বাবা রহিমের সমবয়সী ভাই রতনকেও একই কথা বলে পাঠিয়ে দেয়। রহিম খেজুর বাগানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওকে জিশান, জনি, শাহেদ ধরে বাড়তি মুখোশের একটি মুখোশ পড়িয়ে দেয়।

 তারপর ওরা সুযোগ বুঝে দৌড়াতে থাকে এবং বাড়তি মুখোশটি মাটিতে ফেলে দিয়ে যায়। সেই মুখোশটি রহিমের ভাই রতন নিজের মুখে পড়ে। রহিম জিশান, জনি, শাহেদের পিছনে দৌড়ায়। আর রহিমের ভাই রতন রহিমের পিছনে দৌড়ায়, রহিমকে রসচোর ভেবে জিশান, জনি, শাহেদ দৌড়াতে দৌড়াতে রহিমের অদৃষ্টি হয়ে যায়। রহিম তাই বাড়িতে ফিরে আসার জন্য বাড়ির মুখে ঘোরে। ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে রহিম রতন দ্ভুাই সামানা সামনি হয় এবং দুজন-দুজনকে রসচোর ভেবে দুজনার মাথায় দুজনে লাঠি দিয়ে মারে লাথি।

 দুজনে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। রহিম-রতনের বাবার রস বিক্রি করে শীতকালে সংসার চলে। তাই রাতে খেজুর গাছে রসে কলস ভরার জন্য বেঁধে রাখে এবং সকালে তা বিক্রির জন্য গ্রামে বের হয়। ছোট পুঁচকের কথাতে ছেলেদের রসচোরদের সাজা দিতে পাঠিয়ে নিজেও বেরিয়ে পড়েন রসের কলস নিয়ে গ্রামে বের হওয়ার জন্য। কিন্তু খেজুর বাগানে এসে দেখেন রসের কলস একদম ফাঁকা। তাই তিনিও মুখোশ পড়া রসচুরি করা ছেলেদের সাজা দেওয়ার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। কিছুদূর যেতে না যেতেই তিনি দেখতে পেলেন নিজের ছেলের মত দুটো ছেলের মুখে মুখোশ ।

 ওদের মাথা ফেঁটে গেছে, ওরা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। হাত দিয়ে মুখোশ দুটো খুলে দেখেন ছেলে দুটি তার নিজের ছেলে রহিম-রতন। রহিম-রতনকে হাসপাতালে নিলেন ওদের বাবা। রহিম-রতন সুস্থ হয়ে মুখোশ পড়া ছেলেদের সম্পর্কে বাবাকে জানাল। বাবা রহিম-রতনের মুখে মুখোশ পড়া ছেলেদের সম্পর্কে জেনে, ভাবে ছেলেরা রসচোরের মজা দিতে গিয়ে, নিজেরাই নিজেদের রসচোর ভেবে মজা দিল। বাবা মুখোশ দুটোকে হাতে নিয়ে আরও বলতে থাকে, হায়বে মুখোশ তোর জন্যই আমার ছেলেদের এই দশা।

কাঠ বিড়ালী ও বিড়াল

,কুদ্দুস ইশায়ী ,কাঠ বিড়ালী ও বিড়ালের শত্রুতা অনেক দিনের। কাঠবিড়ালী তার একটা নিজেস¦ এরিয়ার মধ্যে চলাফেরা করে। গাছে গাছে পেয়ারা, আম, বাতাবী নেবু খায়। মাটিতে নেমে এসে চলাফেরা করে। কোন মানুষ তাকে ধরার চেষ্টা করলে দৌড়ে গিয়ে গাছে চরে। কাঠবিড়ালী ধরা খুব কষ্টকর। তবু যে ধরা পরে না তা নয়, ধরা পরে। শিকারীরা পারে না এমন কাজ পৃথিবীতে নাই। কাঠবিড়ালী যে পোষ মানে না তাও না, পোষ মানে। শিকারীদের একটা ধারনা বনে পশু যত শক্তিশালী হোক তাকে পোষ মানানো যাবে।

 বনের পশুদের যদি শারিরীক কোন নির্যাতন না করে বন্দি রেখে তাদের খাবার দাবার ভরণ পোষন ঠিক মত করা যায় একদিন পোষ মানতে দ্বিধা করবে না। তখন যদি খাঁচা খোলাও থাকে সে তার মনিবকে ফাঁকি দিবে না। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এই ধারনা সম্পুর্ণ ভুল। মানুষকে কখনও পোষ মানানো যায় না। উপকার করলে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। সুনাম করলে দুর্নাম করার চেষ্টা করে। কাছে টানলে আঘাত করার চেষ্টা করে। কাঠবিড়ালী এক মনিবের খাঁচায় অনেক দিন ধরে বন্ধি আছে। মনিব কাঠবিড়ালীকে খুব ভালবাসে। গাছের পাকা পেঁপে, পাঁকা কলা, পেয়ারা, বাতাবী নেবু সব এনে দেয়। সেগুলো কাঠবিড়ালী মজা করে খায়। এই মনিবের বাড়ি আরো আছে পোষা বিড়াল, পোষা কুকুর।

 পাখিদের মধ্যে আছে ময়না, টিয়া, কবুতর ও কোয়েল পাখি। আলাদা একটা ঘর আছে। সেই ঘরে এই শিকার করা বন্য পশুপাখি লালন পালন করে। বিড়ালের একটাই রাগ কুকুর তাকে দেখতে দৌড়িয়ে যায় কামড়াতে। বাড়ির মনিব তার কোন খোঁজ রাখে না। কাঠ বিড়ালীকে বাজার থেকে ভাল ভাল খাবার এনে দেয়। তাহলে কি তার এই বাড়িতে থাকা আদৌ ঠিক হচ্ছে। হচ্ছে না। মনিব এক চোখে লবন দেখে অন্য চোখে মিষ্টি দেখে। বিড়াল রেগে বাড়ি থেকে চলে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় সে আর এ বাড়িতে কোনদিন আসবে না। যদি মনিব তার চরিত্র ঠিক করে এক নীতিতে সবাইকে দেখে সেদিন আসবে। বিড়াল মনের রাগে এক বিধবার বাড়িতে আসে। বিধবার দুই কুলে কোন আপনজন নাই। বিড়ালকে দেখে তার মায়া জাগে।

 কাছে ডেকে, গায়ে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো তুই আমার কাছে থাক। বেটাপুত্র যা ছিল সবাই ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। তুই আমাকে ফাঁকি দিসনা। আমি যা খাব তোকেও তা খাওয়াব। আমি যেখানে থাকবো তুই আমার পাশে থাকবি। বিড়াল ঘার নাড়িয়ে স¦াগত জানাল। বেশ সুখেই  কাটছিল দিনকাল। এদিকে মুনিবের ঘুম হারাম। কোথায় গেল তার পোষা বিড়াল? মুনিবের মেয়ে অর্পনা যে বিড়ালকে কাছে করে মাছ ভাত খাওয়ায় সে তার বাবাকে বিড়াল নিয়ে আসার জন্য খুঁজে বের করার জন্য বেশ কয়েকদিন হলো তাগাদা দিয়ে আসছে। মনিব তার পোষা বিড়ালকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে।

পেয়ে যায় বিধবার বাড়িতে। কিন্তু বিধবা সে তার পোষা বিড়ালকে ফেরত দিবে না। মনিব অনেক বুঝিয়ে তবে পোষা বিড়ালকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। কাঠবিড়ালী এতদিন কবজি ডুবিয়ে খেয়েছে। বিড়ালকে মনিবের সাথে দেখে রেগে গড়গড় করতে থাকল। বিড়াল এবার হাটঘাট বেঁেধই মাঠে নেমেছে। হয় কাঠবিড়ালী এ বাড়িতে থাকবে না হয় আমি থাকব। কাঠবিড়ালীও সিদ্ধান্ত নিয়েছে একবার যদি খাঁচা থেকে ছাড়া পাই এ গ্রাম থেকে একেবারে জঙ্গলে চলে যাব। কাঠবিড়ালী আর বিড়ালের এই ঝগড়া কেউ জানে না। দুজন দুজনাকে দেখলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে।

মনিব যে তাদের আশ্রয়দাতা সেও জানে না তাদের ঝগড়ার কারণ। দিন গড়াতে লাগল। একদিন মনিব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরে। সেইদিন কোন পশুপাখিকে খাবার দিতে পারেনি। খাবার যা ছিল বিড়াল খেয়ে ফেলেছে। মনিব যেখানে শুয়ে ছিল বিড়াল মনিবের পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পরে। মনিব বুঝতে পারে বিড়াল তাকে খুব ভালবাসে। অসুস্থ অবস্থায় মনিব বিড়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। বিড়াল মনে মনে ভাবে আমি এত কাছে থাকার পরেও আমাকে চেন নাই। কি দরকার ছিল, আমার শত্রু কাঠবিড়ালীকে ঘরে রাখতে। এবার তারাও নইলে আর তুমি সুস্থ হতে পারবে না।

মনিবের একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিল, তাকে দিয়ে পশুপাখিগুলোকে যত্ম নিত। যত্মের কোন রকম অভাব ছিল না। কারণ মনিব অসুস্থ হলেও কর্মচারীকে সব সময় পশুপাখিকে খেয়াল রাখার কথা স¥রণ করিয়ে দিত। কাঠবিড়ালী ও বিড়াল কেন এত আক্রোশ তার একটা বাস্তব কথা বলি। বিড়াল সবে মাত্র ছানা প্রসব করেছে। কাঠবিড়ালী তার দুইটি বাচ্চাকে পায়ে পিষিয়ে মেরে ফেলে। বিড়াল সেটা  নিজে চোখে দেখেছে। প্রতিবাদ করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কাঠবিড়ালীর দল ছিল একতা। কিছু করতে পারে নি। বিড়াল বুকে কষ্ট নিয়ে দিন গুনতে থাকে। কোন দিন যদি এমন সময় আসে সেই দিন তার প্রতিশোধ নিবে। মায়ের চোখের সামনে যদি কোন নেমক হারাম বাচ্চাকে মেরে ফেলে মা কেমন হতে পারে। সেই দিন থেকে কাঠবিড়ালী ও বিড়ালের ঝগড়া। কাঠ বিড়ালীও বলে আমি যতদিন বন্দি খাঁচায় আছি তুই আমাকে কিছুই করতে পারবি না। আর বিড়াল বলে খাঁচাতো আমি যে কোন মুহুর্তে ভাঙতে পারি। এটা আমার কাছে এমন কিছুই না। শুধু মনিবের খাই, পরি, পাহারা দেয়, তাই মনিবের ভয়ে কিছুই বলি না। আমার জন্য মনিব কষ্ট পাবে এই ভেবে কাঠবিড়ালীকে কিছু বলি না। নইলে কাঠবিড়ালীকে আস্ত খেয়ে ফেলতাম। প্রতিশোধ নিতাম বাচ্চাদের।

বিলটুর স্বপ্ন

আজ বিলটুর স্কুলে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা। ওর মনে তাই বেশ খুশি খুশি ভাব। ওদের স্কুলে এ বছর অনেকগুলো বিষয়ে প্রতিযোগিতা হবে। প্রত্যেক বিষয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারীদের এ বছর স্কুলের পক্ষ থেকে দামি দামি পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। তাই শুনে বিলটুও এবছর তিনটি বিষয়ে নাম দিয়েছে। দীর্ঘ লাফ, ২০০ মিটার দৌড় এবং মোরগের লড়াই-য়ে। যদি তার ভাগ্যে একটা পুরস্কার কোন রকমে জুটে যায় তাহলে তো আর কথাই নেই। সবার কাছে ওর তখন কত দাম বেড়ে যাবে। সবাই তখন বলবে কত ভালই না খেলে বিলটু। আহ! আমরা যদি ওর মত  অত ভাল খেলতে পারতাম, ইত্যাদি।

এসব কথা ভেবে ভেবে ওর মন আনন্দে ভরে উঠে। তারপর সকাল ৮টা না বাজতেই গোসল করে, পেটভরে খেয়ে রওনা হয়ে গেল স্কুলের দিকে। এক এক করে সবাই স্কুলে হাজির হল। সকাল ১০টায় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সুচনা হল। স্কুলের ভাইস চেয়ারম্যান মিস্টার আর,কে দত্ত প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করলেন। প্রথমে স্থির হল বালকদের দীর্ঘ লাফ দিয়েই প্রতিযোগিতা শুরু হবে। তাই প্রথমেই এসে গেল বিলটুর পালা। ও দুই মিনিটেই প্রস্তুত হয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল এবার সে রাসেদ ও রতন কে টেক্কা দিয়ে লাফের একটা পুরস্কার নেবেই। তারপর ক্রিড়ার শিক্ষক বাঁশি বাজিয়ে এক এক জনকে ডাকতে লাগল লাফ দেওয়ার জন্য।

বিলটু ভাবতে লাগল আর যদি কোন কারণে লাফের পুরস্কারটা ফসকে যায় তাহলে আরও দুটো প্রতিযোগিতা তো বাকি রয়েছে। তখন ও দেখিয়ে দেবে তাকে সবাই যা ভাবে আসলে সে তা নয়। বলতে বলতে বিলটুর পালা এসে গেল। বাঁশি বাজার সাথে সাথেই সে খুব জোরে দৌড়ে এসে গায়ের জোরে একটা লাফ দিল। কিন্তু পড়ল সবার থেকে দুই-তিন হাত পিছনে। ওর লাফ দেখে সবাই বলল, “ আহারে লাফ একটা মেরেছে বিলটু।” কেউ বলল, “ ওরে বিলটু ফাস্ট হয়েছে।” অবশেষে আরও কয়েক বার লাফ দিলে, লাফের কোন পরিবর্তন হলো না দেখে ক্রিড়ার শিক্ষক ওকে বাদই দিলেন। লাফের পুরস্কারটা সত্যি সত্যিই ওর ফসকে গেল। দীর্ঘ লাফে প্রথম হল রতন আর দ্বিতীয় রাসেদ।

 বিলটুর খুব রাগ হল। ও মনে মনে বলল, “দৌড়ের সময় দেখিয়ে দেব ঐ রতন বেটাকে। দৌড়ের সময় ওকে যদি আমি ল্যাং মেরে  ফেলে না দিই তাহলে আমার নাম বিলটুই নয়। তারপর এল দৌড়ের পালা। স্যার সংকেত দেওয়ার সাথে সাথেই দৌড় শুরু হয়ে গেল। কিছু দুর এসে বিলটু রতনকে ল্যাং মেরে ফেলতে গিয়ে নিজেই পা ফসকে পড়ে গেল। তারপর উঠে আবার যখন দৌড় শুরু করল তখন রতন প্রায় দড়ি ছোঁয় ছোঁয়। বিলটু বৃথা ওর পিছু ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলনা। সবার শেষেই তাকে দড়ি ছুঁতে হল। ওর মন থেকে পুরস্কার পাবার চিন্তাটা ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসতে লাগল। ভাবল পুরস্কার বুঝি ওর ভাগ্যে নেই। তা না হলে দুটি প্রতিযোগিতাতেই তার স্থান হল সবার নিচে। তাই পুরস্কারের আশা ও এক রকম ছেড়েই দিল। কিন্তু শেষ চেষ্টা করতে দোষ কি এখনও তো তার একটা প্রতিযোগিতা বাকি আছে। কিছু বলাতো যায়না হয়তো এবার সে একটা পুরস্কার পেয়েও যেতে পারে। তাছাড়া লাফ ও দৌড়ে সে পুরস্কার পেলনা বলে মোরগের লড়াইতে পাবে না এমন তো কোন কথা নেই। নতুন উদ্যম নিয়ে তাই সে আবারও মাঠে নামলো।

 প্রাণ পনে লড়াই করতে লাগল অন্যদের সাথে। কিন্তু কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই গোপিনাথের কনুইয়ের কয়েকটা জাব্দা ঘা খেয়ে চিত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। ওকে দেখে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। রাগে তখন বিলটুর দম বন্ধ হয়ে আসছে। কাউকে কিছু না বলে মুখ কালো করে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল ও। খানিক দুরে এসে ওর পা আর যেন উঠতে চাইলনা। আসলে তিনটি খেলাতেই তো সে ওর সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। সাধ্যমত কষ্ট করেছে। তাই সে এখন পরিশ্রান্ত। তাই রাস্তার পাশের একটা বাবলা গাছ তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল সে। তার পর সোজা বাড়ি গিয়ে বারান্দার ভাঙ্গা খাটের উপর ধপাস করে শুয়ে পড়ল। আর শোয়া মাত্রই ক্লান্তিতে ওর ঘুম এসে গেল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।

 স্বপ্নে দেখতে লাগল দৌড়ে ও প্রথম হয়েছে। তাই প্রধান শিক্ষক ওকে বলছে, “ বিলটু তোমার পুরস্কারটা নিয়ে তবেই বাড়ি যেও।” তাই পুরস্কার নেওয়ার আশায় স্কুলের একটা বারান্দায় সে বসে আছে। বসে বসে সে খেলা দেখছে। সমস্ত খেলা শেষ হতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু পরেই পুরস্কার বিতরণী শুরু হল। প্রধান শিক্ষক দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকারী হিসাবে বিলটুকে পুরস্কার নেওয়ার জন্য ডাকলেন। ও এগিয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে তাকে একটা সেলুট জানালো। তারপর বাড়ি ফেরার জন্য বাইরে এসে দেখল রাত অনেক হয়েছে। একা একা বাড়ি ফিরতে তার একটু ভয় ভয় করছিল। কিন্তু কাউকে না পেয়ে শেষে একাই রওনা হল। কিছু দুর এসে সে যেন পথ হারিয়ে ফেলল। এ-সে কোথায় এসেছে ? এ তো তার বাড়ি ফেরার রাস্তা নয়। ওর বড় ভয় করতে লাগল। ঠিক ঐ সময় সে তার সামনে দেখতে পেল কতক গুলো কবর। ঠিক মাঝখানের কবরটার উপরে দাড়িয়ে একটা কালো রঙের মানুষ। নিশ্চয় ভূত টুত কিছু একটা হবে। তাকে দেখা মাত্র বিলটুর বুক ছ্যাঁৎ করে  কেপে উঠল।


প্রথমে ও দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু কি আশ্চার্য, ওর পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে আছে। ও কোন মতে দৌড়াতে পারলনা। তারপর ও চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে চাইল। কিন্তু তাও পারলনা। ওর মুখে কথা ফুটলনা। ওর সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে  আসতে লাগল। ওই ভুতটা ওকে হাত ছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। কিন্তু বিলটু সেখান থেকে এক পাও নড়ছেনা দেখে ভুত নিজেই এগিয়ে এল। তার পর বলল, “ বা! বেশ সুন্দর পুরস্কার পেয়েছিস তো। তোর পুরস্কারটা আমার কাছে দেতো।” বিলটু পুরস্কারটা দেবেনা বলে আগলে রাখতে চাইল। তখন ভূতটি বলল, “ দে বলছি, নইলে তোর ঘাড় মটকাবো।” এই বলে ভূতটি বিলটুর হাত থেকে পুরস্কারটা কেড়ে নিল। বিলটু তখন ভূতের হাত থেকে পুরস্কারটা নেবার চেষ্টা করল।

অমনি ভূতটি বিলটুর হাত ধরে তাকে একেবারে আকাশে ছুড়ে দিল। বিলটু হারালো তার পুরস্কারটা। আকাশে গিয়ে বিলটু দেখতে পেল অনেক গুলো গ্রহ পাশাপাশি দাড়িয়ে। ও তখন এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে লাগল। এক গ্রহে গিয়ে দেখতে পেল কতকগুলো মানুষ। মানুষ গুলো তার বোন সীমার ছোট পুতুলটির চেয়েও অনেক ছোট। মানুষ গুলো বিলটুকে দেখে আক্রমণ করল। বিলটু সব কটাকে এক একটা ঘুষি মেরে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। তারপর এল একটা বড় আকারের মানুষ। সে এসে বিলটুকে গলাধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সেই গ্রহ থেকে। তারপর এক সময় সে ধপাস করে এসে পড়ল পৃথিবীতে। যেই পড়া অমনি গেল তার ঘুম ভেঙ্গে। দেখল সে পড়ে আছে তাদের সেই ভাঙ্গা খাটের নিচে। আসলে সে কোন গ্রহ থেকে পড়েনি। খাট থেকে নিচের মাটিতে পড়ে গেছে, এই যা।

পুন্ড্রনগরে একদিন

দিনটি ঠিক বৃহস্পতিবার ছিল। আমাদের স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার সংস্কৃতি আসর অনুষ্ঠিত হয়। গত বৃহস্পতিবার আসরে হঠাৎ বনভোজনে যাওয়ার আনন্দ উল্লাসের কথা
আলোচনা করলেন স্কুলের শারিরীক শিক্ষার আব্দুল হান্নান স্যার। বনভোজনের আনন্দ উল্লাসের কথা শুনে সবাই একমত যে, আমরা সকল শিক্ষার্থীরা একদিন বনভোজনে যাব। হঠাৎ রুমান বলে উঠল, আগামী শুক্রবার আমরা সবাই বনভোজনে যাবো। এর পক্ষে কতজন, হাত তোলো দেখি? সঙ্গে সঙ্গে
আসরে উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীরা হাত তুললো এবং বলল, হ্যাঁ আগামি শুক্রবারই বনভোজনে যাওয়ার তারিখ ঠিক করা হোক। রুমান তার প্রস্তাবের সফলতা পেয়ে দারুণ উল্লাসিত।

 শিক্ষার্থীদের আশানুরূপ সম্মতি দেখে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান মন্ডল সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন , তো তোমরা কোথায় যেতে চাচ্ছ, এ বলে স্যার তার কক্ষে গেলেন। স্থান নির্বাচন নিয়ে তুমুল দ্বিমত বিরাজ করলো আসরে। ইতিমধ্যে আতাউর স্যার কক্ষ থেকে এসে, দ্বিমত
সংশোধনের জন্য সবার উদ্দেশ্যে বললেন, শোনো আমরা আগামী শুক্রবার সকাল ৮ টায় প্রাচীন বাংলার রাজধানী খ্যাত এবং বর্তমান সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী তথা সার্কের সদস্যকৃত দেশসমূহের সাংস্কৃতিক রাজধানী মহাস্থানগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিব।


 আর হ্যাঁ বনভোজন ফি বাবদ জন প্রতি ১৫০ টাকা আগামী পাঁচদিনের মধ্যে জমা দেওয়ার আদেশ করা হলো এবং সেই সঙ্গে তোমরা সবাই সকাল ৭টার মাঝে স্কুল ক্যাম্পাসে এসে পৌছবে। আর হ্যাঁ আমরা যেহেতু বনভোজনে যাচ্ছি এতে তো অবশ্য অবশ্যই একটা ব্যানার লাগবে গাড়ির সামনে ঝুলানোর জন্য? এতে আমরা একটা স্লোগান দিতে চাই। তোমাদের মাঝে কি কেউ পারবে ছন্দময় দুলাইনের স্লোগান তৈরি করে দিতে? ইতিমধ্যে আমিনুল আরিফকে উদ্দেশ্য করে বলল, কবি ভাই প্লিজ একটা স্লোগান তৈরি করো… না… প্লিজ …। অবশেষে আমি আমিনুলের অনুনয়নে লিখলাম ছন্দময় দুচরণের স্লোগান :
“বন্ধুত্বের সাজোন গোজন
মহাস্থানগড়ে বনভোজন।”


স্লোগান টি পড়ে দারুণ খুশি আতাউর স্যার। এরপর স্যার আসরটি সমাপ্ত ঘোষণা করলেন।
বনভোজনে যাওয়ার জন্য নানা অপেক্ষার প্রহর হিসাব করতে করতে অবশেষে হাজির হলো কাঙ্খিত শুক্রবার। সাতটার পূর্বেই প্রায় সকল শিক্ষার্থী স্কুল ক্যাম্পাসে এসে হাজির হয়েছে। যারা এখনো আসেনি তাদের বন্ধু বান্ধবীরা ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলছে। আমাদের বনভোজনের গাড়িটা নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল ক্যাম্পাস ত্যাগ করলো। গাড়ির ভিতরে সবাই একসঙ্গে অনেক মজা হলো।


আমরা যখন মহাস্থানগড়ে পৌছেছি তখন ঘড়ির কাটা ঠিক ১০ টার কাছাকাছি। রাস্তা পাশে আমাদের গাড়িটা যখন থামল তখন চোখে পড়লো সারি সারি তিন চাকা ভ্যানগাড়ি ভর্তি আগাম আলু। জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে, উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ সবজি বাজার তথা মহাস্থান বাজারে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কারেন্ট নিউজে পড়েছি অবশ্য, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় বগুড়ায়। আমি সাব্বির, আমিনুর আর শারিরীক শিক্ষার আব্দুল হান্নান স্যার বাজারে গেলাম বনভোজনের রান্নাবান্নার জন্য তরিতরকারি কিনতে । বাজারে হরেক রকম নাম জানা অজানা সবজি দেখে মগ্ধ হলাম। শুধু আমরাই না হান্নান স্যারও কোনোদিন এসব সবজি দেখেননি।
অনেক পরিশ্রম হলো বাজার করতে। মস্ত বড় বাজার।

 এদিকে আতাউর স্যার রান্না বান্নার জন্য সকল আসবাবপত্র গাড়ি থেকে নামিয়ে এনেছে । বাজার থেকে নিয়ে আসা সকল সব্জি সল্প সময়ের মধ্যে কাটাকাটি শেষ করলো আমাদের সহপাঠী মিথন, উম্মে হানি, মিলা, ফাতেমা, মার্জিয়া আর নিঝুম। ওরা ছয়জনে যেমন পটু সব্জি কাটাকাটিতে ঠিক তেমনি পটু রান্না বান্নার কাজে। ওরা কাজের জন্য কোনো বাবুর্চি সঙ্গে নিতে দেয়নি। এদিকে রান্নার কাজ চলছে আর আমরা বাকীরা সবাই ঘুরতে বের হলাম। প্রথমে আমরা গেলাম দূর্গা প্রাচীরের পশ্চিম দিকে কালীদহ সাগরে এরপর সোজাসুজি প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরের সামনে। জন প্রতি বিশ টাকা বিনিময়ে প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করলাম। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে জাদুঘরে প্রবেশ করলাম। জাদুঘরের দরজা পার হওয়ার পরপরই চোখে পড়লো বাহারি ফুলের সুভাষিত বাতাসে খেলা করা হাজারো ভ্রমর মৌমাছি। জাদুঘরের ভিতরে অনেক পুরনো ঐতিহ্য দেখতে পেলাম। জাদুঘর দেখা শেষ করেই বেরিয়ে আসলাম রাস্তার পাশে।


রাস্তার পূর্ব পাশেই গোবিন্দ ভিটা। জন প্রতি পাঁচ টাকা প্রবেশ পত্রের মূল্য। আমরা সবাই একসঙ্গে আবার প্রবেশ করলাম গোবিন্দ ভিটায়। হঠাৎ ইতিমধ্যে জুমা নামাজের আযান দিলো। আমরা বন্ধুরা সবাই তাড়াতাড়ি করে গোবিন্দ ভিটা দেখা শেষ করলাম। এরপর নামাজ পড়ার জন্য রওনা দিলাম মাজার মসজিদের উদ্দেশ্যে। উত্তরবঙ্গের মধ্যে সর্ব বৃহত্তম জুমার জামায়াত এখানে অনুষ্ঠিত হয় বলে বড়দের মুখে অনেক শুনেছি। জন প্রতি পাঁচ টাকা ভাড়ায় জাদুঘর থেকে মাযার গেটে এসে পৌছিলাম। তাড়াহুড়া করে ওযু করে জামায়াতে দাড়াতে দাড়াতেই সূরা ফাতিহা শেষ। নামাজ শেষে আমরা সবাই হযরত শাহ সুলতানের মাযার জিয়ারত করে পিকনিক পয়েন্টে ফিরে আসলাম। এরপর খাওয়া -দাওয়া হলো। তবে হ্যাঁ খাওয়ার পূর্বে ছিলো একটা অসাধারণ সুস্বাদু খাবার ঐতিয্যের ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের কটকটি। এটি শুধু এই মহাস্থানগড়েই পাওয়া যায়। খাওয়ার পর ছিলো কুইজ প্রতিযোগিতা। কুইজ প্রতিযোগিতায় কেউ বিজয়ী হতে পারেনি। অথচ প্রশ্নগুলো ছিলো খুব সহজতর।

একাত্তরের গপ্প

 সাকি সোহাগ ,রহিমন বিবির কান্না কিছুতেই থামছে না। সে গলা ছেড়ে দিয়ে কাঁদছে।
আমাদের গ্রামটি শহরের খুব নিকটে। শহরে এখন তুমুল যুদ্ধ। তারপরেও গত কয়দিন ভালোই ছিল আমাদের এই গ্রামটি। আজ দুপুরে রহমত মিয়া মুক্তি বাহিনী থেকে এসে গ্রামের সবাই কে বলে দিয়েছে                                            
-খুব শীঘ্রি আমাদের গ্রামে মিলাটারিরা ঢুকে পরবে ।


তাই সবাই যার যার জীবনের ভয়ে এদিক সেদিক যেতে লাগলো। রহিমন বিবি তার যুবক দুই ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে এসেছে বাবার কাছে। বাবা ও আমি সহ জব্বার আলী আর মুনসি মিয়া বেরুচ্ছি বাংকার খুঁড়তে এমন সময় রহিমন বিবি এসে বাবাকে বলছে – বড় মিয়া গো আমরার দুই পুত কেও লোন বাংকার খুরোনের লাই। আমরার তো কেউ নাই আমরা যামু কই!


আমরা সবাই মিলে আমাদের পুকুর পাড়ের সাথে লাগানো জমিনটার পূর্ব পাশে খুঁড়তে শুরু করলাম। মনসির মা’য় কাঁথা নিলো, রহিমন বিবির ঘরে চিড়া ছিল এক বোয়াম, সেটাও সাথে নিলো। আমার মা তো নাই, থাকলে হয়তো অনেক খাবার সাথে নিতো আমার জন্য। আমার মায়ের জীবনটা অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে শয়তান মিলাটারিরা।


আমাদের প্রায় দুই দিন লাগলো বাংকার খুঁড়তে। জব্বার আলীদের বাঁশ ঝার থেকে কয়েকটা বঁাঁশ কাটা হলো। সেগুলো কবরের খারাল এর মত করে কেটে নেওয়া হলো। ওগুলো পরে আমরা বাংকারের উপরে ব্যবহার করি, তার উপরে আবার বাঁশের চাটাই বিছায়। সব উপরে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখি। এক পাশে একটু ফাঁক রাখা হলো যাতায়াত করার জন্য। খুব ছোট একটা ফাঁক একজনের বেশি যাওয়া আসা করা যায় না। আমরা যে যার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে রাতেই বাংকারে থাকার ব্যবস্থা করলাম। আমাদের ঘরে মোম ছিল কয়েকটা, সেগুলো সহ বাবা আরো কিছু মোম কিনে দিলো। রাতে খুদ রান্না হলো সাথে আলু ভর্তা। আমার এখনো মনে পরে সেই রাতের কথা, কেবল ঐরাতেই পেট ভরে খেয়েছিলাম আগামী ছ’মাসের মধ্যে।


রহিমন বিবি কাঁথা বিছায়তাছে বাংকারের ভিতর। এক পাশে মোম জ্বলছে অবিরত। মোমের জ্বলা দেখে মনে হচ্ছে -আমাদের থেকেও ঐ মোমটা বড় অসহায়।
বাংকারের এক কোনে আমরা সবাই বসে আছি, শোয়ার জন্য। আমরা সবাই শুই নাই। বাবা আর জব্বার আলী উপরে উঠলো বিড়ি খাওয়ার জন্য।
বাবা বিড়ি টানতে টানতেই অন্যমনষ্ক ভাবে বলছে –
‘দেখ মিয়া জব্বার আলী, আমরা তো এ দেশেরই মানুষ, এই দেশ জাতি সমাজ সবই তো আমাদের, দেশের জন্য কিছু করা উচিত।’
জব্বার আলী বিড়িটা মুখ থেকে সরিয়ে আকাশ দিকে ধুয়া ছাড়ছে আর বলছে –
‘হ মিয়া ঠিকই কইছেন।’


বাংকারের মধ্যে থাকতে হঠাৎ কবরের কথা মনে পরাই সারা শরির শিহরে উঠলো। এখানে এত মানুষ, কিন্তু কবরের মধ্য শুধু একা থাকতে হবে। এখানে আলো আছে, সেখানে আলোও থাকবে না, চারিদিকে শুধু অন্ধকার।


আর গভিরে যেতে ইচ্ছে করলো না ভয় করছে, খুব ভয়। হঠাৎ গুলির শব্দে সবাই আঁতকে উঠলে। ফটফট করে উপরে কয়েকটা গুলি করার শব্দ হলো।
বাবা আর জব্বার আলী যুদ্ধে যাবে। বাবা যাওয়ার সময় আমার দিকে একবার করুন চোখে তাকালো। সেই চাহনি যে শেষ চাহনি হবে তা আমি কখনই জানতাম না।
বাবা ও জব্বার আলী যাওয়ার কয়েক দিন পর শোনা গেল রহিমন বিবির স্বামী মারা পরছে। রহিমন বিবির কান্না সামলাতে মনসির মা’য় সিওরে বসে আছে। ছেলে দু’জন শব্দ ছাড়া কাঁদছে। সব যুবক ছেলেরাই শব্দ করে কাঁদতে পারে না। মুনসি মায়ের আঁচল ধরে আছে। চোখ দু’টি টলমল করছে এই বুঝি কাঁদবে।


রহিমন বিবির ছেলেরা বাবার এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছে না। তারা দু’জনেও যুদ্ধে যাবে মায়ের কাছে আব্দার করলো। মায়ের মন তাই কী যেতে দেবে ! কিন্তু রহিমন বিবি শক্ত মনে বলছে – ‘যা তোরা, তোরার বাবার প্রতিশোধ নিবি।’


পরদিন সকালে ওরা দুই ভাই যুদ্ধে বেরুলো। দুই ভাইকে বিদায় দিয়ে রহিমন বিবি অসুস্থ হয়ে পরলো প্রায়।
সেদিন আর খাওয়ার কিছু নেই। একটু চিরা ছিলো আমি আর মুনসি মিয়া খেয়ে শুয়ে পরলাম। কিন্তু ঘুম ধরছে না খিদার যন্ত্রনায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। খুদায় দাঁড়াতে পারছি না। মুনসি মিয়া এখনো ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ বাংকারের উপর থেকে জব্বার আলীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বোধহলো খাবার নিয়ে
আসছে। কিন্তু না রহিমন বিবির বড় ছেলের রক্তাক্ত তাজা লাশ নিয়ে আসছে, ছোট ছেলের লাশ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ইপ্সিতা আর ডাকটিকেট পল্লব শাহরিয়ার

স্কুল থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই ভুরু কুঁচকে গেল ইপ্সিতার। তার লেখা প্রথম চিঠিটা পড়ে আছে পড়ার টেবিলে, তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে লেখা, যে কিনা তাকে ছেড়ে অনেক দুরে আছে।

‘বাবা’ তোমাকে যে বললাম চিঠিটা পোস্ট করে দিতে, তুমি দিলে না, এখন ওর জন্মদিনটা চলে যাবে আমার চিঠি আর পৌছাবে না। ঘরে ঢুকে বাবা বলে আরে শুধু খসখসিয়ে চিঠি লিখে খামে পুরলেই হবে? চিঠির পায়ে চাকা কই?
চাকা? আমি তো ঠিকানা লিখেই দিয়েছি।

ওরে আমার বোকা মেয়ে, চাকা মানে স্ট্যাম্প, বাংলায় যাকে বলে ডাকটিকেট। যেটা ছাড়া চিঠির একচুলও নড়ার উপায় নেই।
এটা তো জানা ছিল না, ইপ্সিতার চোখ দু’টো চিকচিক করে ওঠে, তার মানে কি বাবার হাত ধরে আবার একটা না-জানা অন্ধকার গুহার সন্ধান পাবে সে? বাবা বলো না স্ট্যাম্প কি?

গলা খাঁকরিয়ে শুরু করে বাবা। ‘স্ট্যাম্প বা ডাকটিকেট হচ্ছে একটা খুব ছোট্ট কাগজের টুকরো যেটা চিঠিপত্র পাঠানোর কাজে লাগানো হয়। এই স্ট্যাম্প তৈরি করার জন্য বিশেষ ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত আয়তকার এই কাগজের টুকরোটার গায়ে তার দাম মানে ১ টাকা ২ টাকা লেখা থাকে। স্ট্যাম্প পাওয়া যায় ডাকঘরে। যে ঠিকানায় চিঠি যাবে তার দূরত্ব মেপে ঠিক দামের ডাকটিকেট খামের ওপর সেঁটে দিতে হয়। আবার খামের ওজন বেশি হলে বেশি দামের ডাকটিকেট লাগাতে হয়।’

ইপ্সিতার মাথায় তিরবেগে প্রশ্ন ছুটে আসে। ‘আচ্ছা বাবা, এটা প্রথমবার কে আবিষ্কার করে?’
‘শুনলে অবাক হবি। আজ থেকে দেড়শো বছরেরও আগে ১৮৪০ সালের পয়লা মে ব্রিটেনে তৈরি হয় বিশে^ও প্রথম ডাকটিকেট পেরি ব্ল্যাক। স্যার রোনাল্ড হিল প্রথম ডাকটিকেট বানানোর প্রস্তাব দেন। আর সেই স্ট্যাম্পে ছবি ছিল রানি ভিক্টোরিয়ার।’

‘আচ্ছা বাবা, পৃথিবীর সব দেশেই তো ডাকটিকেট আছে তাই না?’ ইপ্সিতার চোখে শুধুই টুকরো টুকরো কাগজ আর তাকে ঘিরে জিজ্ঞাসা চিহ্ন।
হ্যাঁ, তা আছে। তবে সব দেশের কথা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তার চেয়ে কিছু অদ্ভুত ডাকটিকেটর কথা বলি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাকটিকেট তৈরি হয়েছিলো চিনে ১৯১৩ সালে। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরও ডাকটিকেট হল ব্লু নোজ স্ট্যাম্প। ১৯২৯ সালে এটি কানাডায় তৈরি হয়। বছর দশেক আগে ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ক্রিস্টালখচিত স্ট্যাম্প বানায়। ২০০৫ সালে ফ্রান্স প্রথমবার সুগন্ধী ডাকটিকেট প্রকাশ করে, মিষ্টি আনারসের গন্ধে ভরপুর ছিল সেই স্ট্যাম্প।

২০০৩ সালে রাশিয়া ডেভিস কাপকে মনে রেখে ক্লে-টেনিস কোর্টেও ডাকটিকেট তৈরি করেছিলো, আর তাতে নাকি সত্যিকারের ক্লে ব্যবহার করা হয়েছিলো। এরকম আরো অনেক উদ্ভট ডাকটিকেট সারা বিশ^ জুড়ে ছড়িয়ে ছটিয়ে আছে। যেমন টিনের পাতে ডাকটিকেট, সুতোর কাজের ডাকটিকেট, কর্কের ডাকটিকেট। তবে এদের সব্বার মধ্যে সবচেয়ে মহার্ঘ ডাকটিকেট হল ট্রেসকিলিং ইয়েলো স্ট্যাম্প। মজার ব্যাপার কী জানিস, ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত এই সুইডিশ স্ট্যাম্পটা আসলে ছাপার ভুলে তৈরি হয়েছিল। মানে স্ট্যাম্পটা ছাপার সময় সবুজ বদলে হলুদ রঙে ছাপা হয়েছিল। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই ডাকটিকেট এর দাম ছিল ৩০ লক্ষ ডলারেরও বেশি। তারপর ২০১০ সালে আবার এটাকে বিক্রি করা হয় তবে তার দাম প্রকাশ করা হয়নি।

ইপ্সিতা ভাবতে থাকে। ভাবে এই কাগজের টুকরোর কথা, ভাবে সাদা পাতায় লেখা অক্ষর-শব্দ-বাক্যগুলো এই কাগজের টুকরোটা ছাড়া কীরকম অসহায়, যেন ডানা কাটা পাখি। আজ বাবা না বললে সে জানতেই পারত না। তার মাথার মধ্যে কেমন একটা তেরেকেটে তাকতাক নেচে চলে বিস্ময়। ঘুরপাক খায় অবাক হওয়াগুলো। একটা ছোট্ট কাগজ, অথচ তাকে নিয়ে সারা দুনিয়া কীসব কান্ড কারখানাই না হয়েছে, হয়ে চলছে।
‘আর একটা শেষ কথা বলি’.. বাবার কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় সে। বাবা বলে চলে জানিস, অনেক মানুষ আছেন, যাদের শখ ডাকটিকেট সংগ্রহ করা, এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করা। একে বলে ফিল্যাটেলি’। বাবা উঠে পড়ে।
ইপ্সিতা খাম বন্ধ চিঠিটা নিয়ে ওলটাতে থাকে, হঠাৎ মাথায় আসে আসল কথাটাই তো জানা হল না। ‘আমার চিঠিটার জন্য কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে বললে না তো?’
বাবা অন্য ঘর থেকে হেসে বলে ‘পাঁচ টাকার….’

অনামিকার শীত ভাবনা মোনোয়ার হোসেন

অনামিকার মনটা ভালো নেই। গাড়ি চলছে। জানালার পাশে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে সে।
মাহিনুর , শাহীন , বাবলীর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে তার। কত অসহায় তারা।

 ভালো খেতে পারে না,  পরতে পারে না। স্কুলে যাওয়া তো দূরের কথা ! এই প্রচন্ড শীতেও তাদের গায়ে শীতের কোনো মোটা কাপড় নেই। পাতলা ছেঁড়া কাপড় পড়ে ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে দৌড়ে প্লাস্টিকের বটল কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
আজ শুক্রবার। ভাইয়ার অফিস বন্ধ। বিকেলে ভাইয়ার সাথে বাইরে ঘুরতে বের হলো অনামিকা।


ছুটির দিনে ভাইয়া তাকে নিয়ে প্রায় বাইরে ঘুরতে বের হয়। আইসক্রিম খাওয়ায়। ফুচকা খাওয়ায়।
এখন শীতকাল। শীতকালে অনামিকার ফুচকা খুব পছন্দ। ভাইয়া তাকে সংসদ ভবন এলাকায় মন্টু মামার ফুচকার দোকানে নিয়ে গেল। মন্টু মামার ফুচকা খুব পছন্দ তার।  ফুচকা দোকানের সামনে গাড়ি থামাতেই তিনজন ছোট ছোট বাচ্চা দৌড়ে এলো গাড়ির কাছে। তাদের কাঁধে একটা করে বস্তা ঝুলানো ,গায়ে ছেঁড়া, ময়লা জামা। পায়ে জুতা নেই। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে।

বটল আছে আফা?
অনামিকা তাকালো তাদের দিকে। তাকিয়ে হাসলো সুন্দর করে। তোমাদের নাম কী?
আমার নাম মাহিনুর।
আমার নাম শাহীন।
আমার নাম বাবলী।

বাহ ! খুব সুন্দর নাম তো তোমাদের। তোমরা এই ঠান্ডারদিনে শীতের মোটা কাপড় না পরে খালি পায়ে হাটঁছ কেন? ঠান্ডায় কাঁপছ তো!
আফা, গরীব মাইনষের আবার ঠান্ডা ! ঠোঁট উল্টিয়ে বলল মাহিনুর । বাবলী বলল,  পেটের ভাত জোটেনা, জুতা আর শীতের কাপড় কিনবো কেমনে?
কেন? তোমাদের বাবা-মা নেই?
নাহ। তিনজনেই বলল।
কোথায় গেছে তোমাদের বাবা-মা?
জানিনা।
অনামিকার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাইয়া ! চলো।
কেন খুকি? ফুচকা খাবি না?  
নাহ্।
কেন?
আজ আমার ভালো লাগছে না।
কেন? কী হয়েছে?
কিছু না ভাইয়া। তুমি বাসায় চলো। বলে অনামিকা গাড়িতে উঠে বসল ।
আন্দালিবও গাড়িতে উঠল।

গাড়ি চলছে। অনামিকা গাড়িতে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। ভাবছে বাবলীদের কথা। একই ছাদে বাস করে কত পার্থক্য, কত ফারাক আমাদের মাঝে? একটু শীত করলে আমরা কেমন কুঁকড়ে উঠি আর ওরা দিব্বি প্রতিটি মুহূর্ত শীতের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। ভাবতে ভাবতে অনামিকার চোখে পানি চলে আসে। মনে পড়ে ছোটবেলার পড়া একটা কবিতার কথা – সবার সুখে হাসবো আমি কাঁদবো সবার দু:খে,  নিজের খাবার বিলিয়ে দিবো অনাহারীর মুখে।
অনামিকাকে উদাস থাকতে দেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আন্দালিব। কী হয়েছে খুকী?
ভাইয়া ! তোমাকে একটা কথা বলব?  
বল খুকী।  
রাগ করবে না তো?  
আরে পাগলি ! হেসে বলল আন্দালিব। আমি কখনো তোর কথায় রাগ করেছি ? বল।
তুমি আমাকে দশ হাজার টাকা দিতে পারবে?
অবাক হলো আন্দালিব। অনামিকা কখনো তার কাছে এতো টাকা চায়নি। অবাক হয়ে তাকাল অনামিকার দিকে। তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, এত টাকা দিয়ে কী করবে তুই?
দরকার আছে আমার। দিবে?
ঠিক আছে।
আনন্দে চিকচিক করে উঠল অনামিকার চোখ।  জানতাম ভাইয়া?
কী?
তুমি আমাকে না বলবে না।
হেসে উঠল আন্দালিবও। তাই?
হুম, মাথা মোটা। অনামিকাও হাসে। ভাইয়া ! আর একটা কথা।  
আবার কী কথা?
আগামীকাল আমাকে আর একটু সময় দিতে পারবে?
কেন?
দরকার আছে। বলো না,  পারবে?
হুম।
খুশিতে গদগদ করে উঠে ভাইয়ার গলা জড়িয়ে ধরলো অনামিকা। উমমা….! জড়িয়ে ধরে ভাইয়ার দুইগালে টপাটপ  দু’টো চুমু খেলো। আমার লক্ষী ভাইয়া !  
পরেরদিন অনেকগুলো মোটা শীতকাপড় আর কোম্বল কিনে ভাইয়ার সাথে সংসদ ভবন এলাকায় এলো অনামিকা।  
গাড়ি থামতেই আজও গাড়ির কাছে দৌড়ে এলো মাহিনুর , শাহীন আর বাবলী।
গতকালের চেয়ে আজ ঠান্ডার প্রকোপ বেড়েছে।

অনামিকা দেখলো আজও পাতলা কাপড় পরে ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে ওরা। ওদেরকে কাছে ডাকলো। সবার হাতে একটা করে মোটা কম্বল আর শীতবস্ত্র দিলো।
কম্বল আর শীতবস্ত্র পেয়ে খুশিতে কেঁদে ফেললো তারা। আফা , আপনে মানুষ না,  ফেরেসতা। আল্লাহ আফনারে অনেক বড় করবো,  অনেক বড়।
আনন্দে কেঁদে ফেললো অনামিকাও। ভাইয়া ! দেখছো , কত অল্পতে খুশি ওরা। অথচ ওদের এই ছোট চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারছি না আমরা।  
হতভম্ব আন্দলিব জড়িয়ে ধরলো অনামিকাকে। আজ তুই সত্যিই আমার চোখ খুলে দিলে খুকী। আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা কাকে বলে?  সত্যি আজ আমি তোর ভাই হিসেবে গর্বিত। সত্যি আমরা কী পারিনা তোর মতো করে ভাবতে? আমাদের সব বোধ , বিবেক , মানবতা কী শেষ হয়ে গেছে?

সামিয়ার পাখি জোবায়ের রাজু


সামিয়া সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে কাল রাতের ঝড় বৃষ্টিতে তাদের সারা বাড়ি অনেকটা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। উঠোনে ঝরা পাতা আর গাছের মরা ডাল পড়ে কি বিশ্রি অবস্থা। সামিয়ার বাবা মা দুজনেই বেশ মনোযোগ দিয়ে সেগুলি পরিষ্কার করছে। বিছানা ছেড়ে উঠে সামিয়ার মনে হল তার বাবা মাকে কাজের সহায়তা করা দরকার।
সদ্য ঘুম থেকে উঠা সামিয়া খালি পায়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালো। ওমা! কাল রাতে ঝড়ে তাদের ঘরের চারপাশের বড় বড় গাছগুলির ডালপালা ভেঙ্গে একাকার। কখন এতো ঝড় হল! সামিয়া বুঝতেই পারেনি।

সামিয়াকে উঠে আসতে দেখে তার মা বলল ‘টেবিলে নাস্তা রেডি করা আছে, খেয়ে পড়তে বসো।’ সামিয়া কিছু বলছে না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আবর্জনার মত শুকনো পাতাগুলি দেখছে।

পুকুর ঘাটে এসে সামিয়া চমকে গেল। হায় হায়! ঘাটের পাশের বিশাল জামগাছটি উপড়ে পড়ে আছে। সামিয়া রোজ দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে এসে এই জাম গাছটিতে চড়ে তারপর পুকুরে ঝাঁপ দেয়। আজ গাছটি ভেঙ্গে গেছে দেখে সামিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

মন খারাপ করে সামিয়া পুকুর পাড়ে গিয়ে দেখে ঝোঁপের পাশে একটি শালিক ছানা কিচ কিচ করছে। আহারে, নিশ্চয় শালিক ছানাটির বাসাটা ঝড়ে ভেঙ্গে এখানে পড়ে আছে।
যতœ করে সামিয়া শালিক ছানাটি তুলে ঘরে নিয়ে এলো। সামিয়ার দাদুর খাটের তলায় যে লোহার পুরণো খাঁচাটি আছে, সামিয়া শালিক ছানাটি সে খাঁচায় ভরে রাখলো। তার বেশ ভালো লাগছে। শালিক ছানাটি ডাকাডাকি বন্ধ করে শান্ত হয়ে খাঁচার এক কোণে বসে রইল।
এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। খাঁচার শালিক ছানাটি সামিয়ার সেবা যতœ পেয়ে বড় হতে লাগল।
 
কোন কোন শালিকটা যখন তখন জোরে ডাকাডাকি করে সারা বাড়ি গরম করে তোলে। তখন সামিয়ার বাবা বলে Ñ‘তুমি পাখিটি ছেড়ে দাও। বনের পাখি বনে থাকবে, এটাই নিয়ম।’
বাবার এমন কথা শুনতে সামিয়ার ভালো লাগে না। সে পাখিটাকে অনেক ভালোবাসে, তাই খাঁচা থেকে তাকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবতেই পারে না।
একদিন সকাল বেলা পাখিটি জোরে জোরে ডাকতে লাগল। সামিয়া আর তার বাবা দৌড়ে এলো খাঁচার কাছে। পাকা কলা দেয়া হল পাখিটাকে। অন্যদিন হলে পাখিটা ঠুকরে ঠুকরে কলা খেতো। আজ খাচ্ছে না। বরং ডাকাডাকি আরো বাড়ছে। সামিয়ার বাবা বললÑ‘তুমি পাখিটা ছেড়ে দাও মা। দেখছো না ও বের হতে কেমন করছে।’ বাবার কথা শোনে সামিয়া চুপ হয়ে গেল। পাখিটার এমন করুণ টিৎকার সামিয়ার মন খারাপ করে দিল।

সেদিন দুপুরেই সামিয়া সিদ্ধান্ত নিল সে পাখিটা খাঁচা থেকে ছেড়ে দিবে। যে ভাবা, সে কাজ। প্রথমে সামিয়া খাঁচাটি নিয়ে এলো বারান্দায়। তারপর খাঁচার মুখ খুলতেই পাখিটি ফুরুৎ করে উড়ে চলে গেল সামিয়াদের পেয়ারা গাছের ডালে। সেখানে কিছুক্ষণ পায়চারি করে পাখিটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

পেছন থেকে সামিয়ার বাবা এসে বললÑ‘পাখিটি ছেড়ে দিয়ে খুব ভালো কাজ করেছো।’ সামিয়া বাবার দিকে তাকিয়ে বললÑ‘তুমি ঠিকই বলেছো আব্বু, বনের পাখি বনেই থাকবে। তাদেরকে খাঁচায় বন্দি করে কষ্ট দেয়ার দরকার নেই।’ মুখ হাসি হাসি করে সামিয়ার বাবা সমিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

হ্যারি পটারের পর ঢাকায় আসছে জাদুর নতুন গল্প

জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা সিরিজ ‘হ্যারি পটার’। এর লেখিকা জে কে রাওলিং। তার উপন্যাস থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল সাড়া জাগানো ‘হ্যারি পটার’ সিরিজ। ‘হ্যারি পটার’র কাহিনী শেষে আর ফিরবেন না এমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন তিনি। 

তবে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের নতুন ছবির জন্য আবারো চিত্রনাট্য লিখেছেন। তার লেখা ‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস অ্যান্ড হোয়্যার টু ফাইন্ড’ বই অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স। বইয়ের নামেই রাখা হয়েছে ছবির নাম।

১৮ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাচ্ছে ছবিটি। একই দিন বাংলাদেশেও মুক্তি পাবে। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য ছবিটি নিয়ে এসেছে স্টার সিনেপ্লেক্স। 

‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস অ্যান্ড হোয়্যার টু ফাইন্ড’ পরিচালনা করেছেন ডেভিড ইয়েটস, যিনি এর আগে ‘হ্যারি পটার’ সিরিজের শেষ চারটি ছবি পরিচালনা করেছেন। প্রযোজনায়ও আগের মতোই সঙ্গী হিসেবে আছেন ডেভিড হেম্যান, হ্যারি পটারের সবগুলো সিনেমার অর্থায়নে ছিলেন যিনি। 

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ ছবির মাধ্যমে চিত্রনাট্যকার হিসেবে অভিষেক ঘটছে রাওলিংয়ের। এ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ‘হ্যারি পটার’  সিরিজের সিকুয়্যেল কিংবা প্রিক্যুয়েল এটি নয়। ‘হ্যারি পটার’র গল্পের শুরু যেখানে, তারও ৭০ বছর আগে নিউইয়র্কের প্রেক্ষাপটে এর কাহিনি গড়ে উঠেছে।

ছবির প্রধান চরিত্র জাদুকর নিউট স্ক্যামান্ডারের চরিত্রে অভিনয় করছেন অস্কারজয়ী অভিনেতা এডি রেডমেইন। আর বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকছেন আরেক জাদুকরের চরিত্রে রূপদানকারী কলিন ফ্যারেল, যিনি অভিনয় করছেন একজন উচ্চপদস্থ চৌকস অরোরের চরিত্রে। আরও অভিনয় করেছেন ক্যাথেরিন ওয়াটারস্টন, অ্যালিসন সুডল ও ড্যান ফগলার। এছাড়া ছবিটিতে দেখা যাবে আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা জনি ডেপকেও। স্বল্প উপস্থিতি থাকলেও এর মাধ্যমে জাদুর দুনিয়ায় যুক্ত হয়েছেন এই হলিউড তারকা। শুধু তাই নয়, ‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস অ্যান্ড হোয়্যার টু ফাইন্ড দেম’ ছবির দ্বিতীয় কিস্তিতেও অভিনয় করবেন তিনি। তবে ৫৩ বছর বয়সী এই অস্কার মনোনীত অভিনেতার চরিত্রটি কেমন তা গোপন রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, জে কে রাওলিং জানিয়েছেন, ফ্যান্টাস্টিক বিস্টস ফ্র্যাঞ্চাইজির অধীনে পাঁচটি সিনেমার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সবগুলোরই চিত্রনাট্য লিখবেন তিনি। ইতোমধ্যে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। 

একইদিনে স্টার সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পাচ্ছে অ্যাকশন থ্রিলার ছবি ‘শাট ইন’। ফ্যারেন ব্ল্যাকবার্ন পরিচালিত এ ছবির মূল চরিত্রে আছেন আলোচিত অভিনেত্রী নাওমি ওয়াটস। 

‘শাট ইন’ ছবিতে দেখা যাবে, ভয়ংকর এক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন স্বামী। আর সন্তানটি হয়ে পড়লো প্যারালাইজড। শিশু মনস্তথ্যবিদ মেরি পোর্টম্যানের জীবনটাই বদলে গেল। তার মনে হতে লাগলো বাড়ির মধ্যে অজানা অচেনা এমন কিছু রয়েছে যা ক্রমে সর্বনাশ ঘটিয়ে ছাড়বে। ঘটতে থাকে লোমহর্ষক নানা ঘটনা। নাওমি ওয়াটসের পাশাপাশি এ ছবিতে আরও রয়েছেন অলিভার প্লাট, শার্লি হিটন, জ্যাকব ট্রেম্বলে প্রমুখ।
 

সেন্সর বোর্ডের প্রশংসা কুড়ালেন শাহরুখ খান

বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান ও আলিয়া ভাট প্রথমবারের মতো জুটিবদ্ধ হয়েছেন। রোমান্টিক ঘরানার ‘ডিয়া জিন্দেগী’ ছবিটি নিয়ে ভক্তদের উৎসাহ উদ্দীপনার কমতি নেই। 

সম্প্রতি ছবিটি জমা দেয়া হয়েছিলো সেন্সর ছাড়পত্রের উদ্দেশ্যে। কোন কাঁটছাঁট ছাড়াই ছবিটিকে ছাড়পত্র দিয়েছে ভারতীয় চলচ্চিত্র সেন্সরবোর্ড (সিবিএফসি)। 

‘আনকাট’ ছাড়পত্রের পাশাপাশি সেন্সরবোর্ডের জুরিগণ বলিউড কিং শাহরুখ খানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা বলেন এমন ছবির উদ্যোগ নেয়াতে শাহরুখকে অসংখ্যা ধন্যবাদ। এমন ছবি দর্শকদের প্রাণবন্ত করে তুলবে। শুধুমাত্র তাই নয় সিবিএফসির সেন্সরবোর্ডের এক জুরি জানান, ‘এ ছবি থেকে কোনো দৃশ্য যদি কাটা হতো তবে তা হতো অপরাধের মতোই।’

শাহরুখ-আলিয়া অভিনীত ‘ডিয়ার জিন্দেগী’ ছবিটির এখন পর্যন্ত দুটি গান ও চারটি টিজার প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যে প্রচারণার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন আলিয়া ভাট ও প্রযোজনা সংস্থা।এক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে আছে শাহরুখ কারন তিনি এখন ব্যস্ত আছেন তার অন্য দুটি ছবির কাজ নিয়ে। আসছে ২৫ নভেম্বর রূপালি পর্দায় দেখা যাবে ‘ডিয়ার জিন্দেগী’। 

ভারতীয় দুই বোনের গানে ভাসলো আর্মি স্টেডিয়াম

রাত সাড়ে ১০ টার দিকে মঞ্চে উঠলেন জনপ্রিয় ফোক গানের ভারতীয় শিল্পী জ্যোতি এবং সুলতানা; যারা নুরান সিস্টার্স নামেই সুপরিচিত। এরপর যৌথভাবে শুরু করলেন মন মাতানো পরিবেশনা। একে একে গাইলেন বিখ্যাত গান `দামা দাম মাস্ত কালান্দার`, `আল্লাহু আল্লাহু` ছাড়াও আরো কিছু বিখ্যাত গান। 

তাদের দু`বোনের গানের সঙ্গে আনন্দে ভেসে গেল আর্মি স্টেডিয়ামের কয়েক হাজার সংগীত পিপাসু মানুষ। চমৎকার এই পরিবেশনা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। দর্শক-শ্রোতারা এই দুই বোনের পারফর্মের পুরো সময়টা করতালিতে মেতে ছিলেন। বিখ্যাত ওস্তাদ গুলশান মীরের কন্যা জ্যোতি এবং সুলতানা ওরফে নুরান সিস্টার্স। শৈশবে তারা পিতার কাছ থেকে সুফী সংগীতের প্রশিক্ষণ নেন। তারা নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে শেকড় সন্ধানী গানগুলো গেয়ে গোটা উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন।

indian-singer

নুরান সিস্টার্সের আগে মঞ্চ মাতান উপমহাদেশের বরেণ্য বংশীবাদক ও লোকগানের শিল্পী বারী সিদ্দিকী। বারী সিদ্দিকী মঞ্চে আসেন বাঁশি হাতে। দীর্ঘক্ষণ তিনি বাঁশির সুরে মোহিত করে রাখেন দর্শকদের। তারপরই গেয়ে ওঠেন তার জনপ্রিয় গান পুবালী বাতাসে গানটি। এরপর তিনি রজনী, মালিক ছাড়া গতি নাই দয়াল বাবা ও আরো বেশ কিছু গান।

এদিকে, তিনদিন ব্যাপী আয়োজিত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট, আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব-২০১৬ এর শেষ দিন আজ। লাখো দর্শকের প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেনছে ৭ দেশের শতাধিক শিল্পী।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পের তারকারা

কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, নাট্যকার ও গীতিকার। পরিচালক হিসেবেও তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। আজ রোববার (১৩ নভেম্বর) নন্দিত এই মানুষটির জন্মদিন। অথচ আজ তিনি নেই আমাদের মাঝে। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার নির্দেশনায় কাজ করে আজ অনেক শিল্পী পেয়েছেন দারুণ জনপ্রিয়তা। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিল্পীই অভাববোধ করেছেন হুমায়ূন আহমেদের নির্দেশনার। তারা কাজ করেছেন তার গল্পে। কয়েকজন তারকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই প্রতিবেদন-

চঞ্চল চৌধুরী 
আমি স্যারের নির্মাণে ‘কালা কৈতর’ নামে একটি ধারাবাহিক নাটকে কয়েক পর্বে কাজ করেছি। স্যার মারা যাওয়ার পর তার পত্নী শাওনের নির্দেশনায় ‘নিমফুল’ নাটকে কাজ করেছি। স্যার যখন আমেরিকাতে অসুস্থ ছিলেন, তখন শাওনকে নাকি জানিয়েছিলেন ‘নিমফুল’ নাটকটি নির্মাণ করবেন; সেখানে অভিনয় করবো আমি। স্যার সেটা আর পারেননি। পরে শাওন নির্মাণ শুরু করলে আমাকে জানান, হুমায়ূন আহমেদের ইচ্ছে ছিল আমি যেন এই নাটকে কাজ করি। নাটকটির শুটিং করার সময় বারবার তার কথা মনে হয়েছিল।  

শবনম ফারিয়া 
আমি হুমায়ূন আহমেদ স্যারের গল্পে তিনটি নাটকে কাজ করেছি। প্রথমটা ছিল ‘যাও মেঘ যাও’, দ্বিতীয়টা ছিল ‘প্রিয় পদরেখা’ এবং তৃতীয় কাজটি ছিল ‘ভালোবাসার গল্প’। সবগুলো নাটকই নির্মাণ করেছেন মেহের আফরোজ শাওন আপু। তবে স্যারের গল্পে কাজ করাটা আমার কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। আমি ছোটবেলা থেকে একাডেমিক বইয়ের বাইরে বলতে গেলে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের লেখা দিয়েই বই পড়া শিখেছি। প্রথম পড়েছিলাম স্যারের লেখা ‘ভূত ভূতাং ভৌত’ বইটি। এবং আমার বইপড়ার অভ্যাসটা শুরুই হয় স্যারের লেখা বইগুলো পড়ার মাধ্যমে। স্যারকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু উনি ছিলেন আমার কাছে আমার পরিবারের একজন সদস্যের মতো। স্যারের মৃত্যুর খবরটা শুনে আমি প্রায় তিন দিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম! আমার মনে হয়েছিল আমার পরিবারের একজন সদস্য আমায় ছেড়ে চলে গেল। যদি তিনি বেঁচে থাকতেন অবশ্যই তার নির্দেশনায় কাজের সুযোগ পেতাম।

তৌসিফ মাহবুব 
স্যারের লেখা প্রচুর বই পড়েছি, তার নির্মিত অনেক নাটক দেখেছি ছোটবেলা থেকে। আর তার গল্পে গত ঈদে ‘আজ জরির বিয়ে’ নাটকটি রিমেকে নির্মিত হয়। এটি শাওন আপু নির্মাণ করেন। অনেক আগে একবার নাটকটি নির্মাণ করেছিলেন হুমায়ূন স্যার নিজেই। সেসময় অভিনয় করেছিলেন মাহফুজ আহমেদ ভাইয়া এবং শাওন আপু। আমি যখন পুনরায় আবার এই নাটকে কাজ করি তখন আমার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ কাজ করছিল। কারণ আগে মাহফুজ ভাইয়া যেখানে চরিত্রটি রূপ দিয়েছেন এবার সেখানে আমি দিচ্ছি। এটা ছিল আমার জন্য অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। পরে শাওন আপুকে এই চ্যালেঞ্জের ব্যাপারটা বললাম; তিনি আমাকে বলেছিলেন, মাহফুজ আহমেদের সেই অভিনয়কে ফলো করার দরকার নেই। আমি যেন আমার সেরাটা দিয়ে কাজ করি। পরে সেভাবেই কাজ করেছি। অনেক প্রশংসা পেয়েছিলাম নাটকটিতে কাজ করে। আর শুটিং করার সময় হুমায়ূন স্যারকে ভীষণ মিস করছিলাম। 

জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি  
হুমায়ূন আহমেদ স্যারের গল্পে ‘জুতার বাক্স’ নাটকটি প্রচার হয়েছে কদিন আগে। তারআগে ‘চার দুগুণে আট’ এবং ‘চৌধুরী খালেকুজ্জামানের গুণের সীমা নেই’ নামের আরো দুটি রিমেক নাটকে কাজ করেছি। এগুলো পরিচালনা করেছেন শাওন আপু। খুব ভালো লেগেছে স্যারের নাটকে কাজ করতে পেরে। কারণ চিত্রনাট্যগুলো অসাধারণ। তবে ইউনিটে কাজ করতে গিয়ে অনেকবার মনে হয়েছিল ইশ! যদি স্যারের নির্দেশনায় কাজ করতে পারতাম! তারপরও হুমায়ূন আহমেদ স্যারের মতো একজন বিখ্যাত মানুষের গল্পে কাজ করলাম এটাই বা কম কিসে!

তারিক আনামের নায়িকা নওশাবা

অভিনেত্রী নওশাবা ছোটবেলা থেকেই জনপ্রিয় অভিনেতা তারিক আনাম খানের অভিনয়ের ভক্ত ছিলেন। নওশাবার বাবা বলতেন- অভিনয় করলে আসাদুজ্জামান নূর, তারিক আনাম খান, আবুল কালাম আজাদের মতো করতে হয়! সম্প্রতি সেই তারিক আনামের নায়িকা হিসেবেই অভিনয় করলেন নওশাবা। 

বিষয়টি নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বাসিত এই অভিনেত্রী। বললেন, ‘চমৎকার একজন মানুষ তারিক আনাম খান। এরআগে আমরা একই সেটে কাজ করলেও তার বিপরীতে কাজ করা হয়নি। আমার খুব ইচ্ছে ছিল তারসঙ্গে কাজ করার। ওনার অভিনয়, কথাবার্তা, স্ক্রিপ্ট পড়া সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করে। অনেকদিন অপেক্ষা করার পর ওনার মতো দাপুটে অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।’

যোগ করে নওশাবা বলেন, ‘ইদানিং আমি কেন জানি একটু সিনিয়রদের সঙ্গে বেশি কাজ করছি! যেমন- গাজী রাকায়েত, আমজাদ হোসেন এবার তারিক আনাম ভাই। বিষয়টি ভাবতেই আমার কাছে ভীষণ ভালো লাগছে। তাদের সঙ্গে কাজ করে অনেক কিছু শিখতে পারছি, আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভারি হচ্ছে।’        

তারিক আনামের নায়িকা হিসেবে নওশাবাকে দেখা যাবে ‘পিঙ্ক পার্ল’ নামের একটি টেলিফিল্মে। হাবীব জাকারিয়া উল্লাসের চিত্রনাট্যে টেলিফিল্মটি পরিচালনা করেছেন অসীম গোমেজ। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় এর চিত্রায়ন শেষ হয়েছে। 

প্রেম যে কোনো বয়স মানে না, সবকিছুর উর্দ্ধে, ভালোবাসা কখনো মরে যায় না- এমন গল্পই উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে ‘পিঙ্ক পার্ল’ টেলিফিল্মটি। এখানে তারিক আনাম-নওশাবা ছাড়াও আরো অভিনয় করেছেন রুনা খান। 

জানা গেছে, খুব শিগগির ‘পিঙ্ক পার্ল’ টেলিফিল্মটি একটি বেসরকারি চ্যানেলে প্রচারিত হবে।  
 

বিশ্ব ভ্রমণে আয়নাবাজি

সারা দেশ মাতিয়ে এবার বিশ্ব সফরে যাচ্ছে চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত আলোচিত চলচ্চিত্র ‘আয়নাবাজি’। অতি শীঘ্রই আয়নাবাজি দেশের সিমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ছবিটির পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী। 

তিনি জানান, মুক্তির অনেক আগে থেকেই দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের আলোচনায় মুখরিত ছিল ‘আয়নাবাজি’। ফ্রান্সের কান চলচিত্র উৎসবে প্রথম প্রর্দশিত হয় আয়নাবাজি এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়টলে সাউথ এশিয়ান চলচিত্র উৎসবে বেস্ট নেরেটিভ ফিল্ম উপাধি পায়। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন নামি-দামি চলচ্চিত্র উৎসবে অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে এই চলচিত্রটি। 

বাংলাদেশে মুক্তির পরপরই চারদিকে ব্যাপক সাড়া ফেলে ‘আয়নাবাজি’। সপ্তম সপ্তাহে এসে এখনো স্টার সিনেপ্লেক্স, ব্লকবাস্টার ও শ্যামলীতে হাউজফুল শো চলছে। 

সেই সাফল্যে অনুপ্রাণীত হয়ে আয়নাবাজি বিশ্বভ্রমণে যাচ্ছে। এর শুভ সূচনা হচ্ছে শিল্পের দেশ ফ্রান্সের প্যারিস শহর থেকেই। প্যারিসের বিখ্যাত পাবলিসিস সিনেমা হলে আগামী ১৭ নভেম্বরে ছবিটির প্রযোজক জিয়াউদ্দিন আদিল, পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী ও কাহিনিকার গাউসুল আলম শাওনের উপস্থিতিতে ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রটির প্রথম শো প্রদর্শিত হবে। শুরুতেই পুরো সপ্তাহব্যাপী ‘আয়নাবাজি’র ১৪টি শো প্রদর্শিত হবে। 

আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, সান ফ্রান্সিসকো, অস্টিন, শিকাগো এবং ডালাস শহরে মুক্তি পেতে যাচ্ছে ছবিটি। কানাডাতে ১৯ নভেম্বর টরেন্টো ও ক্যালগেরি শহরের সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পাবে ‘আয়নাবাজি’। ২৬ নভেম্বর থেকে অস্ট্রোলিয়ার সিডনী, কানবেরা, মেলবোর্ন, ব্রিস্টবেইন, এডিলেড, ও পার্থের সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পাবে। 

ছবিটির ওয়ার্ল্ড ট্যুর প্রসঙ্গে আয়নাবাজির প্রযোজক জিয়াউদ্দিন আদিল বলেন, ‘মুক্তির ৭ সপ্তাহ পরেও দেশে ব্যবসাসফল যাচ্ছে আয়নাবাজি। এবার আমরা বিদেশে প্রবাসী দর্শকদের জন্য আয়নাবাজিকে বিশ্ব জুড়ে নিয়ে যেতে চাই। সিনেমা প্রদর্শনের প্রচলিত ধারায় বাংলাদেশি কোনো ছবি ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার বক্স অফিসে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও সম্মানের।’

আয়নাবাজি ছবিটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। তার সঙ্গে এখানে আরো রয়েছেন নাবিলা, পার্থ বড়ুয়া, লুৎফর রহমান জর্জ, হিরা চৌধুরী, শওকত ওসমান, গাওসুল আলম শাওন প্রমুখ। 

চলচ্চিত্রটির মুল ভাবনা গাওসুল আলম শাওনের; চিত্রনাট্যও তিনি রচনা করেছেন অনম বিশ্বাসের সঙ্গে যৌথভাবে। নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন এশা ইউসুফ। 

শুরু হচ্ছে শাকিব-শুভশ্রীর নবাব

যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হবে ‘নবাব’ ছবিটি। ছবিতে অভিনয় করবেন ঢাকাই সুপারস্টার শাকিব খান এবং কলকাতার সেনসেশন অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলী। এই খবর পুরনো।

নতুন খবর হলো- আগামী ১৮ নভেম্বর (শুক্রবার) থেকে ‘নবাব’ ছবির শুটিং শুরু হচ্ছে। এমনটাই জানিয়েছে ছবিটির প্রযোজনা সূত্র। 

ছবিটি পরিচালনা করবেন ‘শিকারী’ ছবির নির্মাতা জয়দেব মুখার্জি। তার বরাতে জাজ মাল্টিমিডিয়া জানায়, আগামী ১৮ তারিখ থেকে কক্সবাজারে ছবির শুটিং শুরু হবে। সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। শুটিংয়ে অংশ নিতে শিগগিরই ঢাকায় আসবেন শুভশ্রী। তার কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে ‘নবাব’ ছবির টিম। 

জাজ থেকে আরো জানা গেছে, কক্সবাজারে ৭ দিনের শুটিং শেষে ‘নবাব’র ইউনিট কলকাতা যাবে। সেখান থেকে উড়াল দেবে থাইল্যান্ড। সেখানে কয়েকটি গান ছাড়াও ছবির অধিকাংশ নির্মাণ কাজ করা হবে।

‘নবাব’ ছবিতে শাকিব-শুভশ্রী ছাড়া আরো অভিনয় করবেন দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পীরা। থাকবেন অমিত হাসান, খরাজ মুখার্জি, রজতাভ দত্ত, মেঘলা, সব্যসাচী চক্রবর্তী প্রমুখ। 

এর আগে ঘোষণা হয়েছিল এই ছবিটি আগামী ভালোবাসা দিবসে মুক্তি দেয়া হবে। তাই প্রথমে নাম রাখা হয়েছিল ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। কিন্তু ছবিটি মুক্তির দেয়া সম্ভব হবে না আশা করে পরে নাম চূড়ান্ত করা হয় ‘নবাব’।