রাত ২:৫৭, রবিবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ সম্পাদকীয়

আগামী ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুতের স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় বর্তমান সরকার যেভাবে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে তাতে আগামী ৩ বছরের মধ্যে দেশে কোন বিদ্যুৎ সমস্যা থাকবে না। শিল্প কারখানার পাশাপাশি বসতবাড়িতে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা যাবে। সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করছে।

 অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে নেই। উন্নত দেশের তালিকায় নাম লেখাতে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। সে লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি নিজেরা কিভাবে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করতে পারি সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। সরকার দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশের লক্ষ্যে এসইজেড এবং ইপিজেড এলাকার কাছাকাছি স্থানে বিসিক শিল্পনগরী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যত্রতত্র শিল্প-কারখানা স্থাপন না করে, বিশেষায়িত শিল্প এলাকায় কল-কারখানা স্থাপনের জন্য ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান।

 দেশের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন দেশের মধ্যে এমন কিছু সম্পদ রয়েছে সেগুলো প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির অভাবে সঠিক কাজে লাগাতে পারা যাচ্ছে না। ফলে সেগুলোকে পরিত্যক্ত অবস্থায় না রেখে অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও জিডিপি বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।

 যার দুইটা প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বেকারত্ব দূর করা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যত্রতত্র শিল্প কারখানা রোধ করা। বর্তমান বাংলাদেশে অবকাঠামো, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে প্রতি বছর প্রায় ৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে যা জিডিপি’র ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে ৩২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

 

কর্মজীবী নারীর নিরাপদ আবাসন

দেশের অর্থনীতিতে কর্মজীবী নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি চোখে পড়ার মত। সেই সঙ্গে আবার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে কর্মক্ষেত্রে থেকে নারীর একাংশ ঝরে পড়তেও দেখা যাচ্ছে। প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্যতম নারীর আবাসন সংকট। নারীর নিরাপদ আবাসন সংকটের সমস্যা শুধু রাজধানীতেই নয়।

 বরং দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও গ্রামেও কর্মজীবী নারীর জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হোস্টেলের সংখ্যা মাত্র ৭টি। এসব হোস্টেলে মোট আসনের বিপরীতে শুধু রাজধানীতেই কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কয়েক হাজার গুণ বেশি। সরকারি হোস্টেলে আসন ফাঁকা না পেয়ে বাড়তি ভাড়াসহ নানা ভোগান্তি সঙ্গী করে ব্যক্তি মালিকানাধীন হোস্টেলে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক নারী।

 আর নারীর আবাসন সংকটকে পুঁজি করেই গড়ে উঠেছে একের পর এক ব্যক্তি মালিকানাধীন ছাত্রী হোস্টেল। নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা না পেয়ে কর্মবিমুখও হচ্ছেন এদের কেউ কেউ। আবাসন সংকট নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। এই সংকট মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আরও হোস্টেল নির্মাণের গুরুত্ব অপরিসীম। কর্মজীবী মহিলাদের নিরাপদ আবাসন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নিজ অর্থায়নে সারা দেশে ৭টি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল পরিচালনা করে আসছে। রাজধানী ঢাকা নীলক্ষেত, মিরপুর ও খিলগাঁওয়ে মোট ৭টি এবং খুলনা, যশোর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ১টি করে হোস্টেলের মাধ্যমে কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ আবাসন সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

 সামাজিক কুসংস্কার, লিঙ্গ বৈষম্য আর নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও গত দুই দশকে যথেষ্ট এগিয়েছে এ দেশের নারীরা। আর এ অগ্রযাত্রায় সব থেকে বড় বাধা নারীর আবাসন সংকট। কয়েকজন কর্মজীবী নারী অভিযোগ করে বলেন, অফিসের কাজে ফিরতে দেরি হয়ে গেলে হোস্টেল ঢোকার বিষয়ে অন্যান্য মেয়েদের মতো তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মটা কড়াকড়ি এবং ভিতরে ঢুকতে দেয়া হয় না। অভিযোগ আছে মহিলা হোস্টেলে অস্বাস্থ্যকর খাবারের।

 

গ্যাসের দাম বাড়ল

বিভিন্ন পক্ষের বিরোধিতার মধ্যেই গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার, যা কার্যকর হবে
আগামী মার্চ ও জুন মাসে দুই ধাপে। অন্যদিকে গ্রাহকদের আগামী ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য মাসে ৭৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকা। আর দ্বিতীয় ধাপে ১ জুন থেকে এক চুলার জন্য মাসিক বিল ৯০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৯৫০ টাকা হবে। গৃহস্থালিতে মিটারে যারা গ্যাসের বিল দেন, তাদের মার্চ থেকে প্রতি ঘন মিটার গ্যাস ব্যবহারের জন্য ৯ টাকা ১০ পয়সা এবং জুন থেকে ১১ টাকা ২০ পয়সা করে দিতে হবে।

যানবাহনে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক (সিএনজি) গ্যাসের দাম ১ মার্চ থেকে হবে প্রতি ঘন মিটারে ৩৮ টাকা, ১ জুন থেকে হবে ৪০ টাকা। দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিত করে গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর দাবি জানিয়েছে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তাদের মতে, কিছুদিন আগেও গ্যাসের দাম এক দফা বাড়ানো হয়েছে। এখন ফের বাড়ানো অযৌক্তিক। গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে বরং সিস্টেম লস ও দুর্নীতি কমানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত তিতাসের। দাম বাড়ানোর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

 এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গ্যাস উত্তোলন যেমন বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনি সঞ্চালন লাইন গ্যাস সরবরাহের উপযোগী করে তোলাও জরুরি। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় গ্যাস উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। সারা দেশে রয়েছে গ্যাসের ঘাটতি। প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ অপ্রতুল। একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, অন্যদিকে কমছে প্রাকৃতিক জ্বালানি। কেবল গৃহস্থালি কাজে নয়, গ্যাস-সংকটে স্থবিরতা নেমে এসেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতেও। এ ঘাটতি কবে, কিভাবে পূরণ হবে, তা কেউ জানে না। তবে নতুন নতুন গ্যাস ফিল্ড দরকার আমাদের। গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে।

 

নদী দখল কি চলতেই থাকবে

দেশের নদ-নদীগুলোর জায়গা নানাভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নদী দখলের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীরাই জড়িত থাকে। নদী দখল করে তারা বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে। নদী দখলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফল স্বরূপ দখল করা নদীর জায়গা উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। আর ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে অন্যরাও নদী দখলে উৎসাহী হয়। নদী দখল করার ফলে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। এ ব্যাপারে পরিবেশবাদীরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করলেও কোন ফল পাওয়া যায় না। অবাধে নদী দখল চলছেই।

 নদী দখল করতে করতে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, নদীর আর অস্তিত্বই থাকে না। দেশের নদ-নদী দখল করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। এতদিন নদী দখলকারী বলতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মির নাম শোনা গিয়েছিল। একে একে দেশের সব নদীই দখল হয়ে যাচ্ছে। আমরা জানতে চাই নদী দখল কি কখনো বন্ধ হবে না নদী দখল চলতেই থাকবে। আমরা চাই দেশের নদীর অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত করা হোক। যারা অবৈধভাবে নদীকেই দখল করে রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্যোগী হয়ে নদী দখলমুক্ত করতে হবে।

নদী এ দেশের প্রাণ। নদ-নদীর কারণেই এ দেশ সুজলা, সুফলা এবং শস্য শ্যামলা। নদী যোগায় মাছ এবং সেচের পানি। নদী পথ যাতায়াত ও ব্যবসায় বাণিজ্যের জন্য উত্তম। নদী যা ভেঙ্গে নিয়ে যায় তার দ্বিগুণ দিয়ে যায়। তাই তো নদী পারের মানুষ নদীর ভাঙন দেখে পালায় না। এপার ভেঙ্গে নিলে তারা আবার ওপার গিয়ে ঘর বাঁধে। সুখে-দুঃখে, আলো -আধারে একে অপরের সঙ্গে যেমন একীভূত। এই ভাঙ্গা গড়ার মধ্যেই নদী আমাদের দান করেছে অমূল্য সম্পদ। নদী দখল করা আমাদের বন্ধ করতে হবে।  
 

অভিন্ন নদীর করুণ দশা

ভারত উজান থেকে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত ৫৪টি নদী ক্রমেই স্রোতহীন হয়ে মরা নদীতে পরিণত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নদীগুলোর উৎস মুখে ভারত বাঁধ নির্মাণ করায় সেগুলো ক্রমেই করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। যে কোনো নদীর উৎস মুখে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। ভারত জলপাইগুড়িতে গজলডোবা ব্যারাজ থেকে তিস্তার পানি এক তরফা নিয়ে নিচ্ছে। ফলে দিন যতই যাচ্ছে ততই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত তিস্তা নদী ম্রিয়মান হচ্ছে।

 বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। আর শুস্ক মৌসুমে লাখ লাখ কৃষকের বোরো আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে আমাদের তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে প্রকাশ পানির অভাবে বাধ্য হয়ে কমানো হচ্ছে সেচের পরিধি। কমতে কমতে এমন পর্যায়ে এসেছে যে এখন এই প্রকল্পটি অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর উৎস দেশের ভূ-সীমানার বাইরে। প্রতিবেশি দেশ ভারতে এ নদীগুলোর প্রবাহ থাকায় অভিন্ন নদীগুলোর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে ব্যত্যয় ঘটানো, নদীর ওপর বাঁধ তৈরি কিংবা নদীর প্রবাহকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করা ইত্যাদি এক তরফাভাবে হতে পারে না। এটি আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

 ভারতের সঙ্গে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। ভারত গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করায় বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে গেছে। এখন তারা বরাক নদীতে একতরফাভাবে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশের মনোভাব সব সময় ইতিবাচক। অথচ ভারতের মনোভাব সম্পূর্ণ উল্টো। দেশটির এ আচরণ মোটেই সৎ প্রতিবেশিসুলভ নয়। আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের পক্ষে। তবে এটা হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে ভারত সৎ প্রতিবেশিসুলভ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে- দেশের মানুষ এমনটিই আশা করে।

 

অর্থনীতির মূল শক্তিই কৃষি

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল শক্তিই কৃষি। জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে এই কৃষি থেকে। ফলে চাষাবাদ পদ্ধতিতে আরও আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনশীল করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকার বিভিন্ন সময় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। চলতি অর্থ বছরের (২০১৬-১৭) দুই কিস্তিতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা কৃষি প্রণোদনা দেয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ৪২ কোটি টাকার প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

 বাকি ৩৩ কোটি টাকা প্রণোদনা কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে। এই অর্থ নগদে দেয়ার কোন পরিকল্পনা সরকারের নেই। কারণ এতে দুর্নীতির আশংকা থাকে। বরং প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে কৃষকদের চাষাবাদে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই এই প্রণোদনার কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়। দ্রুততম গতিতে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রতিবন্ধক। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশকে নিজেদের স্বার্থেই পরিবেশ বান্ধব কৃষি উৎপাদনশীলতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জনগোষ্ঠীর চাহিদা মিটিয়ে দেশটি আজ কৃষি উৎপাদনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে।

 চাষাবাদ পদ্ধতিতে সরকার প্রদত্ত প্রণোদনা অতিরিক্ত উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এমন মহতী উদ্যোগ ভূমির উৎপাদনশীলতাকেও অনেকটা এগিয়ে দেবে। সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দেশটিকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বান্ধব এই মহৎ সম্ভাবনা যেন কোনভাবেই বিঘিœত না হয়। যথার্থ এবং সঠিক পথে সরকারের এত বড় আয়োজন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারলে ফসল উৎপাদনে দেশ আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। সরকারের এই মহতী কর্মযোগকে সাধুবাদ যা দেশে পুরো অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে।

মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে হবে

মাদক ব্যবসায়ী, মাদক বহনকারী ও মাদকসেবী সবাইকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। ইয়াবার মতো মাদক ধ্বংস করছে মানুষ, মানুষের জীবনী শক্তি, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করছে। মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশ, সমাজ ও তারুণ্যকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে।

 গত শনিবার রাজধানীতে গোলটেবিল বৈঠকে এ মতামত তুলে ধরেন বক্তারা। মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাত বাড়ালেই মাদক মেলে-এমন বাস্তবতায় শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন সবারই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সঙ্গত কারণেই বাড়ছে। মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন সমাজ দেহে যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, তা চরম উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে মাদকের সর্বোচ্চ থাবা সব সম্ভাবনার মূলে কুঠারাঘাত করছে। অসংখ্য জীবন বিপথগামী হয়ে পড়েছে এবং মাদক বিরোধী সব অভিযানের ফল নির্মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 মাদকের যে আবার ভয়াবহতার রূপ নিয়েছে, তা একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত দিয়ে দেশে মাদকের অনুপ্রবেশের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হয়ে আসছে বটে, কিন্তু এর প্রতিকার চিত্র প্রশ্নবোধক। নগর-মহানগর-শহর-গ্রাম সর্বত্রই মাদকের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালেই মিলছে নানারকম সর্বনাশা জীবনসংহারী মাদক। উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত-সবশ্রেণির মানুষ বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীরা এই বিষে আক্রান্ত।

 এ কারণে একেকটি জীবন বা পরিবারই শুধু ধ্বংস হচ্ছে না, সমাজ কিম্বা রাষ্ট্রজীবনেও এর কুপ্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। মাদকের আগ্রাসন ও বিস্তারের কারণগুলো যেহেতু চিহ্নিত, তাই এর প্রতিকার দুরূহ কোন বিষয় না হলেও সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের ক্রমব্যর্থতার অভিশাপ ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে। একটি জাতি ও রাষ্ট্রকে সর্বনাশের উন্মত্ততা থেকে রক্ষার সব রকম প্রয়াস নিতে হবে নির্মোহ ও কঠোর হাতে।

বাংলাদেশে শ্রম বাজারে নারী

বাংলাদেশের শ্রম বাজারে বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক শ্রম বাজারে এখনো নারীর অংশগ্রহণ যথাযথ প্রতিনিধিত্বশীল নই। তারা কম মজুরি পায়, অনুন্নত পরিবেশে কাজ করে এবং তাদের কর্মপালনে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। সরকার অবশ্য শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কর্মপালনে উন্নত করা ও ন্যূনতম মজুরি প্রদানের মাধ্যমে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে সচেষ্ট।

 সরকারের এ প্রচেষ্টার মধ্যে শোভন কাজে নিশ্চয়তার জন্য নারীদের ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম অধিকার বা সমান সুযোগ তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ অন্যতম। আমাদের দেশে গার্মেন্টস শিল্পে উত্থানের পর থেকেই মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের পরিবেশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিগত ১২ বছরে বার্ষিক ১৬.৭% হারে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা মোট শ্রমশক্তির বৃদ্ধির ৪ গুণ বেশি এবং পুরুষ শ্রম শক্তি বৃদ্ধির ৬ গুণ বেশি। ১৯৮২-৮৪ এবং ১৯৯৬ সময়কালের মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে নারী শ্রম শক্তির পরিমাণ ৪৪% থেকে বেড়ে ৭৬% শতাংশ উন্নীত হয়েছে।

 প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে নারী শ্রম শক্তির বার্ষিক হার ২.৯% হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে নারী শ্রম শক্তির বার্ষিক বৃদ্ধির হার গড়পড়তা ৩২.৯%। ১৯৯১-২০০০ সালের মধ্যে ১৫০০০ দক্ষ নারী শ্রমিক উৎপাদনশীল কাজে এবং গৃহ কর্মি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে গমন করেছে। বর্তমানে সরকার নারী কর্মিদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশল, স্থপতি ও নার্সসহ ৪৩ পেশায় ৫১টি দেশে নারী কর্মিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে জাগরণের সুচনা হলে এই খাতে শ্রম বাজার ও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে।

কর্মিদের দেখা গেছে তৈরি পোশাক মিলে কর্মরত মোট শ্রমিকের শতকরা ৮০ ভাগ নারী শ্রমিক, গ্রামীণ কর্মহীন অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত যুবক নারীরাই এই শিল্পে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত হয়েছে বেশি। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটা সামাজিক পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি, বাংলাদেশে ৫৬ মিলিয়ন শ্রম শক্তির মধ্যে ৬২% পুরুষ আর ৩৮% নারী যার ৮৮.১% আবার গ্রামীণ কৃষি ও অকৃষি কাজে নিয়োজিত।

দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। অতি সম্প্রতি এ বিষয়ে চীন ও বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতি বাংলাদেশের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জনকে বিস্ময়কর ও চমৎকার বলে অভিহিত করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। তারমধ্যে এ দেশের অর্জিত অভিজ্ঞতা বিশ্বে অন্য দেশের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরে আসেন দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়ে অবহিত হতে। তিনি বলেন জয়ের নেতৃত্বে আছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই এই অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে। দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্য দেশও সুফল পাবে বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

নারী স্বাস্থ্য কর্মিদের দল গড়ে তুলে বাংলাদেশ ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার কথা স্মরণ করেন বিশ্বব্যাংক প্রধান। বাংলাদেশের উন্নয়ন ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রতিশ্রুতি দেশ ও জনগণের প্রতি বিশ্বব্যাংকের কমিটমেন্টও বটে।

 দেশে বিদ্যমান অপুষ্টি দূর করতে বাড়তি ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। শিশু অপুষ্টি দূর করতে বাংলাদেশের আগামী দুই বছর বাড়তি ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বিশ্বব্যাংক, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গেই আছে।

৩৪ কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন বন্ধ

মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ ২০টি কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এসব কোম্পানি গোপনে ওষুধ তৈরি বা বিক্রি করছে কিনা এবং কোম্পানিগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রতি তিন মাস পরপর আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এসব কোম্পানি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় হাইকোর্ট এ রায় ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে দ্রুতগতিতে। কিন্তু ওষুধনীতি আধুনিকায়ন না হওয়ায় তা সময়ের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ সহজে বাজারে ঠাঁই করে নিয়েছে। কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না যথেচ্ছভাবে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা। পাশাপাশি ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সহজে বাজারে ঠাঁই করে নিচ্ছে।

 দেশে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের অনেক কারখানা আছে, যা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অজানা নয়। দুর্জনরা বলেন, ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাত না করে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করা যায় না। আমরা  কোনটাকে সত্য বলে ধরে নেব। শর্ষের মধ্যেই ভূত রয়ে গেছে। তাই যদি হয় তাহলে এ ওষুধ প্রশাসন কী নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন রোধ করতে পারে।

যদি পারতই তাহলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন হলো কেন। আমরা সরকারকে বলতে চাই, জীবনরক্ষা করে যে ওষুধ তা নিয়ে কোন ধরনের হেলাফেলা কাম্য নয়। সুতরাং অভিযুক্ত কোম্পানির পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসব অপরাধে জড়িত কিনা তা সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ। মনে রাখা কর্তব্য, মানুষের কল্যাণেই আইন, যার নিশ্চয়তা দেবে রাষ্ট্র। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কঠোর হবে।

অমর একুশে

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন আমাদের দেশের মানুষ। বিশ্বের ইতিহাসে সে কথা লেখা আছে সোনার অক্ষরে। একুশ মানে মাথা নত না করা’ – এক কথায় এটাই হচ্ছে একুশের চেতনা। এই একুশের পথ ধরেই এসেছে আমাদের মহান স্বাধীনতা। আত্মমর্যাদায় সমুন্নত এক মহান জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অন্তহীন প্রেরণা একুশ। শহীদের আত্মত্যাগে উজ্জ্বল একটি দিন। এই দিনটি বাঙালি জাতিকে বিশ্ব সভায় পরিচয় করিয়ে দেয় একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে।

 সেদিনের ভাষার লড়াই আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা যেমন রক্ষা করেছিল, তেমনি রচনা করেছিল আমাদের স্বাধীনতার পথ। আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয়, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন, তার ভিত রচিত হবে তরুণদের হাতেই। তারাই জাতির কান্ডারি। বারবার যখন হিংস্র স্বাপদের নখ খামচে ধরতে চেয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র, রক্তাক্ত করতে চেয়েছে প্রিয় দেশ, তখন তরুণরাই জেগে উঠেছে। তাদের এ উদ্দীপনাই জাগিয়ে রেখেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যা আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য জরুরি।

 আজ অমর একুশে। নতুন করে শপথ নেয়ারও দিন আজ। মানুষের আত্মিক মুক্তি, সৃজনশীলতার বিকাশ আর মৌলিক অধিকার রক্ষার শপথে আজ নতুন করে বাংলা উচ্চারণ সঠিক শব্দ চয়ন ইত্যাদি বিষয়েও আমাদের সচেতন হতে হবে। একুশ থেকেই আমরা পাই গণতন্ত্র ও সাম্যের চেতনা। আমাদের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী কেড়ে নিতে চেয়েছিল আমাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা। কিন্তু মায়ের ভাষার মর্যাদা একটু ক্ষুন্ন হতে দেননি রফিক, শফিক, শফিউর, বরকত, সালাম, জব্বারসহ অগণিত ভাষা শহীদ। আমরা বাঙালি, আমাদের বাঙালিত্বকে সমুন্নত রাখতে হবে – নতুন করে শপথ নেয়ারও দিন আজ।

বগুড়ায় ভাষা-আন্দোলনে নারী

মো: ইসরাফিল হোসাইন : বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সাফল্য লাভের মূল কারণ- এ দেশের আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততা তার সাথে নারী সমাজের অগ্রণী ভূমিকা । ভাষা-আন্দেলনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশ গ্রহণ সংখ্যার দিক থেকে অতি নগণ্য হলেও তাদের এ ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগই নেই।
পূর্ব বাংলার গণমানুষের এই যে স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন  তাতে নারীরা বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করে তৎকালীন রক্ষণ সমাজ ব্যবস্থা একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

 

বিভাগোত্তরকালে লেখনি প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সালের, ১৯৫২ সালের এবং ১৯৫২ সালের পরবর্তী সময়ের সকল আন্দোলন নারীরা ব্যপকহারে অংশগ্রহণ করেন। শুধুমাত্র ঢাকা শহরে নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এমন কি প্রত্যন্ত অঞ্চলের আন্দোলনেও নারীদের অংশগ্রহণ বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। ঢাকায় লিলি খান, আনোয়ারা খাতুন, লায়লা সামাদ, শামসুন নাহার, রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া ইব্রাহিম, হালিমা খাতুন , সিলেটের হাজেরা মাহমুদ, যশোহরে হামিদা সেলিম প্রমূখ নারী ভাষা-আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে অন্যান্য নারী সমাজকে আন্দোলনে অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণা দাত্রী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন।

 
বগুড়া জেলার ভাষা-আন্দোলন উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলার মধ্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। ১৯৪৮ সালের এই আন্দোলন প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ ও শিক্ষকদের অংশ্রগ্রহণে একটি গতিশীল রূপ লাভ করে। সমাজ ব্যবস্থা রক্ষানশীলতার দৈন্যতা থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত না হওয়ার ফলে নারী সমাজে শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণের প্রবণতা খুবই কম ছিল । তৎকালীন সময়ে আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দু’জন নারীর নাম পাওয়া যায় যারা  ভাষা-আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম রহিমা খাতুন ও অপরজন হলেন সালেহা খাতুন।

 
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় একটি সাধারণ ধর্মঘট আহবান করা হয় এবং ধর্মঘট করার জন্য বিভিন্ন জেলায় ‘বাংলা ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন হয় এবং বগুড়ায় কবি আতাউর রহমানকে আহবায়ক করে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও অজিজুল হক কলেজের বেশ কয়েকজন অধ্যাপকও সংযুক্ত ছিলেন । ড. মুহম্মদ ড. শহীদুল্লাহ তখন আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ। তিনিও একবার ভাষার মিছিলে ভাষা সংগ্রামী গাজীউল হকের অনুরোধে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এতে করে ছাত্র সমাজের মনোবল আরো দৃঢ় হয়।

 নারীদের মধ্যে বিশেষ করে বগুড়ার দু’জন মুসলিম ছাত্রী এই আন্দোলনে জড়িত হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন-  রহিমা খাতুন ও সালেহা খাতুন। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই মুসলিম পরিবার থেকে এ দু’জন ছাত্রীর দু:সাহসিক কর্ম তৎপরতা সেদিন বগুড়া বাসীকে বিস্মিত না করে পারে নি। রহিমা খাতুন যখন সংগ্রাম কমিটির বিভিন্ন সভায় উপস্থিত হলেন তখন তাঁর সম্পর্কে সংশয়হীন হওয়ার জন্য আন্দোলনের নেতাকর্মীরা তাঁর অভিভাবক মুসলিম লীগের একনিষ্ঠ কর্মী ডাক্তার মুজাফ্ফর আহমদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং তাঁর বোন সম্পর্কে কথা বললে তিনি সৎসাহসের সঙ্গে জানালেনÑ ‘আমার বোন সংগ্রাম কমিটির সদস্য হয়েছে এতে আমি গর্ববোধ করেছি।’ উল্লেখ্য, ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ‘মুসলিম লীগ’ ভাষা-আন্দোলনের বিরোধী পক্ষ হিসেবেই অবতীর্ণ হয়েছিল। সে দিক থেকে ডাক্তার মুজাফ্ফর আহমেদ ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তবে বগুড়া জেলা মুসলিম লীগের একটি বৃহৎ অংশই ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।


১৯৪৭ সালের ১৭ এপ্রিল সমগ্র পূর্ববঙ্গে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে এই ধর্মঘট বানচাল করার জন্য সরকার সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মিছিলে হামলা চালানোর জন্য গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়। গুন্ডা বাহিনীর আক্রমণ ও মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে সেদিন পিকেটিং রত ছাত্র-কর্মী সালেহা খাতুন দুঃসাহসের  পরিচয় দিয়েছেন, তা অনেককে বিস্ময় ও হতবাগ করে দেয়। সেই মিছিলে গুন্ডা বাহিনীর অতর্কিত হামলায় ছাত্র নেতা আবদুস শহীদ গুরুতরভাবে আহত হন এবং পিকেটিং রত ছাত্র-কর্মী সালেহা খাতুন লাঞ্চিত হন।


১৯৫৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ‘শহীদ দিবস’ পালন করতে না দেয়ার ব্যাপারে সরকার আরো বেশি মারমুখী হয়ে ওঠে। অত্যাচার নির্যাতন ও ধরপাকড় শুরু করে। বগুড়ায় তখন বলতে গেলে পুলিশী সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছিল। রাজপথে মিছিলের শ্লোগান ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশী নির্যাতনের অবসান চাই’। বগুড়ার ছোট মেয়ে শামিমা  কালো পতাকা হাতে সেদিন ভাষার মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে সর্বস্তরের সংগ্রামী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। উত্তর বঙ্গের অন্যতম প্রখ্যাত আইনজীবী ও সরকারি উকিল সৈয়দ নওয়াব আলী সাহেব মিছিলের অগ্রভাবে থেকে সবার দৃষ্টি কাড়েন।

 বিশেষত সরকারি উকিল হওয়ার কারণে তাঁকে সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়েছিল। মিছিল শেষে সেদিনের জনসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। জানা যায় যে, কালো পতাকা হাতে মিছিলের নেতৃত্ব তাঁরই কনিষ্ঠ কন্যা ছিলেন। ভাষা-আন্দোলন কেবল শহর বন্দরেই সীমাবদ্ধ ছিল না । এ আন্দোলন তীব্ররূপ মফস্বল-গ্রামের সর্বস্তরের মানুষকে  উদ্বেলিত করেছিল । মফস্বল গ্রামাঞ্চলের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ মুখর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। স্কুল- কলেজের ছাত্র-ছাত্রী তাতে নানাভাবে অংশ গ্রহণ করে রাষ্ট্রভাষার দাবির পক্ষে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।


বগুড়ার ভাষা-আন্দোলনে পাহাড়সম প্রতিকুলতায় নারীদের অংশগ্রণ জাতীয় সংকটময় মুহূর্তে অন্যান্য সকল আন্দোলন-সংগ্রামের মাইল ফলক হয়ে আছে। ভাষা- আন্দোলনোত্তর বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও সর্বত্র বাংলা ভাষার বাবহারের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বগুড়ার নারী সমাজের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা আজ বিশ্বের বুকে নতুন করে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন ইতিহাস, নতুন গতিময়তা
শিক্ষক-প্রাবন্ধিক
বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজ, বগুড়া
০১৭১৮৮৮১২৯৭

সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধ করুন

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী তথা বিএসএফ’র বাংলাদেশি হত্যা কোনোভাবেই থামছে না। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক নেতাই এই হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রতিশ্রুতিই কাজে আসছে না। সেগুলো কেবল কথার কথা। প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে রয়েছে ভারত সীমান্ত। ফলে সীমান্তের শান্তি ও স্বস্তির ওপর সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া অনেকটাই নির্ভর করে।

 কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সীমান্ত সমস্যা যেন কিছুতেই দূর হচ্ছে না। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ নানা অজুহাতে বাংলাদেশের নিরীহ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে ধরনের নির্মম আচরণ করে চলেছে তা মেনে নেয়া কঠিন। তাদের এই আচরণ থেকে নারী-পুরুষ কিংবা শিশু কেউ রেহাই পাচ্ছে না। গত সোমবার রাতে চাপাইনবাবগঞ্জের শিবপুর সীমান্তে এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আরও কয়েকজন আহত হন। শুক্রবার ভোরে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে নিহত হন আরেকজন বাংলাদেশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দু’টি সীমান্ত হত্যাকান্ড এর ভয়াবহ পরম্পরাই তুলে ধরে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশিদের মানুষ হিসেবেই ভাবতে পারে না। তাই মানবাধিকারের প্রশ্নটি তাদের কাছে নিতান্তই গৌণ।

 এ শুধু কোনো বাংলাদেশিকে হত্যা নয়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকেও অগ্রাহ্য করার শামিল। সীমান্ত আইনে ইচ্ছে করলেই বিএসএফ যে কাউকে গ্রেফতার, নির্যাতন কিংবা হত্যা করার অধিকার রাখে না। কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে বিএসএফ বাংলাদেশের সীমান্তগুলোতে যে ধরনের আচরণ করে, বা তাদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের পরিচয়কেই স্পষ্ট করে। অবিলম্বে বিএসএফ’র এ ধরনের অসহিষ্ণু আচরণ বন্ধ হওয়াটা জরুরি। কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি হোক তা আমরা চাই না। তবে সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারত যে উদার তা সে দেশের সরকারকেই দায়িত্বের সঙ্গে প্রমাণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধে জোরদার কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রক্ষণাবেক্ষণ

সমাপ্ত ৮০০’র বেশি প্রকল্পের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) প্রতি বছর প্রয়োজন পড়ে দেড় হাজার কোটি টাকা। এ সবের বাইরেও পাউবোর জরুরি প্রয়োজনে বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্প রয়েছে। অথচ এ চাহিদার বিপরীতে চলতি অর্থ বছরে (২০১৬-১৭) সংস্থাটিকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩/২ কোটি টাকা। সর্বশেষ তিন বছর ধরেই প্রায় একই পরিমাণ বরাদ্দ পাচ্ছে সংস্থাটি।

 মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রকল্পগুলো। অন্যদিকে পাউবোর বকেয়াও বাড়ছে প্রতি বছর। জানা যায়, চলতি অর্থ বছরে আপদকালীন ব্যয় সহ বিভিন্ন খাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল পাউবো। এর বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে ৩৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা যা চাহিদার মাত্র ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ।

 এ বিল পরিশোধের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, সেচ, হাওড় এবং সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ সহ নদী ভাঙন রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদে চলতি বছর মন্ত্রণালয়ের কাছে বাজেটের অতিরিক্ত ৪৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুরোধ জানায় বাপাউবো। অর্থ যা বরাদ্দ দেয়া হয় তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে এসব প্রকল্পের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে এলাকা ভিত্তিক কাজেরও চাহিদা থাকে। অনেক সময় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এসব কাজে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দ থেকে ব্যয় করতে হয়। অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দের কারণ বর্তমানে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বাবদও বকেয়া বাড়ছে।  নদী ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যয়ের জন্য আপদকালীন হিসেবে এ বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতি বছরই এ ধরনের নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

প্রশ্ন পত্র ফাঁস

পরীক্ষা নেয়া হয় মেধা যাচাইয়ের জন্য। কিন্তু প্রায় প্রতিটি পরীক্ষা এখন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। রূপ নিয়েছে সামাজিক ব্যাধির। পরীক্ষার আগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে প্রশ্নপত্র। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কৃতিত্ব দেখাচ্ছে যারা, তাদের পকেটে জমা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রশ্নপত্র ফাঁস কারো জন্য পৌষ মাস হলেও সত্যিকারের মেধাবীদের জন্য সর্বনাশ হয়ে দেখা দিচ্ছে। অভিযোগের তীর এখন শিক্ষকদের দিকেও।

প্রশ্নপত্রের যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং এসএসসি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনে গাফলতির দায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত মঙ্গলবার ২০ শিক্ষক-কর্মচারির এমপিও ভুক্তি স্থগিত করেছে। পুলিশের সন্দেহ, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সরবরাহ ও ছাপার কাজে যুক্ত কেউ না কেউ এ ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। শিক্ষকদের প্রতি সন্দেহ আসছে এ কারণে যে দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্রায় সাড়ে চার হাজার মাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে প্রধানত তারাই থাকেন। তাদের হাতেই জেলার ট্রেজারি থেকে পরীক্ষার নির্ধারিত সময়ে দুই-তিন ঘন্টা আগে প্রশ্নের প্যাকেট তুলে দেয়া হয়। পথিমধ্যে প্যাকেট খুলে দ্রুত মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তুলে নেয়া সম্ভব। এ গুলি আবার মোবাইলের ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ইতিপূর্বে।

 পরীক্ষা ব্যবস্থার মাহাত্ম্যকেই গিলে ফেলছে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ফলের দিক থেকে এগিয়ে রাখতে তারা পরীক্ষা শুরুর দুই ঘন্টা আগে আগেই প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলে ফেলেন এমন তথ্য পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী নুুরুল ইসলাম নাহিদ গভীর পরিতাপ ও দুঃখের সঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের সবচেয়ে আস্থার জায়গা শিক্ষকরা। তাদের মধ্যেও দুর্নীতিবাজ ঢুকে গেছে। তাদের হাত ধরেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। এতে সত্যিকারের মেধাবীরা নানাভাবে বঞ্চিত হয় প্রাপ্য সুযোগ থেকে। কারণ এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

পরীক্ষার্থীদের একাংশ ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র কিনে সঠিক জবাব রপ্ত করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষায় গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় প্রশ্নপত্র। ইতিমধ্যে ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। সৎ-মেধাবীদের শিক্ষক নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হবে না।

বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ

দেশে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বাড়ছে। জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং নানা পেশা ও শ্রেণীর মানুষ বৈধভাবে পাওয়া এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে প্রতিপক্ষ ঘায়েল ও আধিপত্য বিস্তারে, এমনকি অবৈধ ভাতাও দেওয়া হচ্ছে এসব বৈধ অস্ত্র। প্রকাশ্যে এসব অস্ত্র উচিয়ে একদিকে যেমন ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তেমনি ব্যবহার হচ্ছে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, এমনকি সরকারি উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে পর্যন্ত।

 এসব অস্ত্র দিয়ে ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সম্প্রতি নির্বাচনেই এসব অস্ত্রের অবৈধ প্রদর্শন দেখা গেছে আশংকাজনকভাবে। শুধু যে অস্ত্র প্রদর্শন বা ফাঁকা গুলি তাই নয়, এসব অস্ত্র থেকে করা গুলিতে দিন দিন বাড়ছে নিহতের সংখ্যাও। মারা যাচ্ছেন নিজের রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

 এমনকি নিস্তার পাচ্ছেন না নির্বাহী পথচারি, গৃহবধূ, সাধারণ মানুষও। সবশেষে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ক্ষমতাসীন দলের পৌর মেয়র তার শর্টগান থেকে গুলি ছুড়লে মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা যান সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল। স্থানীয়দের পাশাপাশি বিক্ষুব্ধ সাংবাদিকদের মনে নিন্দার ঝড় বইছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের বিষয়টি।

দেশের মধ্যে ভালো করে অনুসন্ধান না করে যাকে তাকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে। সারা দেশে বৈধ অস্ত্রের ব্যবহারকারীদের সন্ধান করে অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবস্থা এখনই দরকার নিয়ন্ত্রণ।

উজানে বাঁধের প্রভাবে নদ-নদী বিলুপ্ত

এ দেশে অতীতে হাজারের বেশি নদী ছিল। এখন তা শুধুই ইতিহাস। গবেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের ছয় শতাধিক নদ-নদী পানির অভাবে শুকিয়ে মরে গেছে। এমনকি অনেক নদীর অস্তিত্বও বিলীন হয়ে গেছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রভাবে প্রতিবেশী দেশ ভারত অসংখ্য বাঁধ দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী গত ৪৫ বছরে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার কিলোমিটার নদী পথ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

 এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে দেশে কোন নদী পথের অস্তিত্ব থাকবে না বলে আশংকা তাদের। বাংলাদেশের অর্ধেক নদী শুকিয়ে মরে গেছে- গত ৪৫ বছরে ছিল ১৩০০’র মতো। পানির অভাবে শুকিয়ে এখন তার সংখ্যা নেমে এসেছে ৭০০ তে। ঢাকার আশে পাশের এলাকার মাত্রাতিরিক্ত দুষণ রোধে জরুরী ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া দরকার।

 এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এগুলি বাস্তবায়ন করা জরুরি। স্বল্প মেয়াদি সুপারিশের মধ্যে আছে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, কৃত্রিম লেক বা সমুদ্র সৈকতে ইঞ্জিন চালিত নৌকার পোড়া মবিল, তেল, গৃহবর্জ্য, ময়লা আবর্জনা, প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন সহ অপচনশীল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে আইনগতমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া অবৈধ দখল থেকে নদীকে রক্ষা করতে দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সুপারিশও করা হয়েছে।

 দীর্ঘ মেয়াদি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে শিল্প বর্জ্যে দুষণ থেকে নদী রক্ষায় শিল্প কারখানায় ২৪ ঘন্টা ইটিপি চালু রাখা। বিভিন্ন হাওড়-বাওড়, বিল ও পতিত নদী-নালাগুলোর উৎস মুখের বাঁধাগুলো সরিয়ে নিম্ন ভূমিতে পানি প্রবাহ সচল রাখার ব্যবস্থা করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন কাগজে কলমে দেশে বর্তমানে ৩১০টি নদীর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে এদের মধ্যে প্রায় ১শত নদীতে বছরের বেশির ভাগ সময়েই পানি থাকে না। এদের মধ্যে অনেক নদী ইতিমধ্যে বিলীন হয়েছে।

বছরে ক্যান্সারে মারা যায় দেড় লাখ

দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা এখনও অপ্রতুল। চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেলেও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও মেডিক্যাল উপকরণ ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে ক্যান্সারের চিকিৎসা। দেশে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আর বছরে মারা যায় প্রায় দেড় লাখ রোগী।

 সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশে বছরে ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে আসা গেলেও আড়ালে থেকে যায় আরও প্রায় আড়াই লাখ রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে জনসংখ্যা অনুপাতে বর্তমানে দেশে সব ধরনের সুবিধাসংবলিত ১৬০টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এখন কেন্দ্রের সংখ্যা আছে মাত্র ১৫টি।

 আবার এর সবই কার্যকর নয়। বেশির ভাগই চলছে জোড়াতালি দিয়ে। এ ছাড়া সারা দেশে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ৮৫ জন। ব্যয়বহুল অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও মেডিক্যাল উপকরণের কারণে ব্যাহত হয় ক্যান্সারের চিকিৎসা। চিকিৎসা করতে না পেরে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অনেক রোগী। এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে বিশ্বে সব জায়গায় যাদের অর্থ আছে তারা সরকারের সাথে সাহায্য করে।

 দেশের জনসংখ্যা বাড়ার হারের সঙ্গে ক্যান্সার রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে সবাইকে সচেতন হওয়া দরকার। যাতে করে ক্যান্সারে আক্রান্ত না হতে পারে। দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা ও চিকিৎসকের ওপর আস্থাহীনতার কারণে প্রতি বছর দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। ধারণা করা যাচ্ছে দেশে বর্তমানে মোট ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। প্রতি বছর কমপক্ষে ১০ হাজার রোগী দেশের বাইরে যায় চিকিৎসা করাতে।

বাংলাদেশ দ্বিমুখী চাপ মোকাবেলা করছে

অভ্যন্তরীণ এবং বহির্দেশীয় উভয় চাপই বাংলাদেশের পরিবেশ মোকাবেলা করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ যে সফল হতে পেরেছে তা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশের পরিবেশ সচেতনতা তাকে এই ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা দিয়েছে একথা বলা যায়। সার্বিকভাবে না হলেও মাথাপিছু আয়ের যেসব দেশের কাছাকাছি বাংলাদেশ তাদের তুলনায় গড় আয়ু এবং মানুষের সন্তুষ্টির ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। গড় আয়ুর দিক দিয়ে ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮১তম।

 আর নাগরিকদের ভালো থাকার অনুভূতি বা সন্তুষ্টির বিবেচনায় বাংলাদেশ রয়েছে ৯৫তম অবস্থানে। যেহেতু বাংলাদেশের তুলনামূলক অবস্থানে ওপরে রেখেছে তাহলো পরিবেশে ওপর প্রভাব। এই সূচকটির বাংলাদেশকে বিশ্বে অষ্টম সুখী ও সবুজ দেশ হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে। মানুষের সন্তুষ্টিভিত্তিক যে সূচক একটি একান্তই মনোগত এর বাস্তবভিত্তি বেশ দুর্বল। যেমন ধনি হলেই সন্তুষ্টি বেশি হবে না। আবার দরিদ্রতার জন্যও সন্তুষ্টিতে ঘাটতি কম নাও হতে পারে। সুখের সুচক হিসাবে গড় আয়ুর ব্যবহারে কিছুটা যৌক্তিকতা রয়েছে।

 গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া অর্থ হলো নাগরিকদের খাদ্য পুষ্টি বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হওয়া। এ দুটির মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এই মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে হবে। এটা উন্নতির লক্ষণ। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু তিরিশ বছর আগে ৫০ বছর ছিল। বর্তমানে এই গড় আয়ু ৭০ বছরে পৌছেছে, পরিবেশের ওপর প্রভাব সুখের অন্যতম সূচক হিসেবে ব্যবহার বেশ প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে পরিবেশ বিঘিœত হচ্ছে ধনী দেশগুলোর পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যকলাপের জন্য। এ সত্বেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মেটানোর জন্য এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপখাইয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের উদ্যোগেই পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

 

বেড়েছে চার ধরনের অপরাধ মামলা

অস্ত্র, বিস্ফোরক মাদক দ্রব্য ও চোরাচালানের মামলা এক বছরে ১০ হাজারের বেশি হয়েছে বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত (সিআইডি) বিভাগের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য ও চোরাচালানি উদ্ধার মামলা ২০১৫ সালে ছিল ৫৬ হাজার ৬৫২টি, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৬৬৬টি।

 এখানে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ক্ষতিকর বিষয়গুলোর ব্যবহার আছে। পুলিশের আরো তৎপরতা বাড়াতে হবে। যেহেতু সেটা কমে যায়নি। জঙ্গিবাদ দমনে তৎপরতার কারণে এটা হয়েছে। জঙ্গির সঙ্গে সম্পৃক্ত ইস্যুগুলোর কারণে এমনটি হয়েছে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বারবার বলেছে, মাদকের বড় ইনভেস্টমেন্ট আছে। রাঘব বোয়াল ও চোরাকারবার আছে। ক্রাইম নেটওয়ার্কও ক্রিয়াশীল। এজন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। পুলিশ সদর দপ্তরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সিআইডি ২০১৬ সালে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, নারী, শিশু নির্যাতন, জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা ও অন্যান্য মামলা সহ মোট তিন হাজার ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। আর ২০১৬ সালে সারা দেশে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ২০১৫ সালের তুলনায় কমেছে।

 ২০১৫ সালে ডাকাতির মামলা ছিল ৪৯১টি, ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ৪০৮টি, দস্যুতার মামলা ২০১৫ সালে ছিল ৯৩৮টি, ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ৭১২টি। চুরির মামলা ২০১৫ সালে ছিল ছয় হাজার ৮১৯টি, ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ছয় হাজার ১১০টি। খুনের মামলা ২০১৫ সালে ছিল তিন হাজার ৯৯৬টি, ২০১৬ সালে কমে হয়েছে তিন হাজার ৫৫২টি। দাঙ্গা সহ খুনের মামলা ২০১৫ সালে ছিল ৩৭টি, ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ১৯টি। নারী নির্যাতন মামলা ২০১৬ সালে ছিল ১৭ হাজার ২৭টি, ২০১৬ সাল কমে হয়েছে এক হাজার ৭১২টি। অপহরণ ও পাচার মামলা ২০১৫ সালে ছিল ৮০২টি, ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ৬৩৯টি।

সম্ভাবনাময় অর্থনীতি

১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশ চার দশক অতিক্রম করেছে। যা ঘটনা বহুল বৈরি সময়ের মধ্য দিয়েই এগিয়ে আসতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অতিক্রম করতে হয়েছে নানা রকম প্রতিকূলতা। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। দেশে খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন ধরনের যে সব ঘটনা ঘটছে তা দেশের জন্য সার্বিক দিক থেকেই ক্ষতিকর।

 তদুপরি এই দেশ এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে যা বিশ্বের কাছে অবশ্যই অভিনন্দন পাওয়ার দাবি রাখে। বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা প্রাইসওয়াটার কুপারসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ক্রয় ক্ষমতা সাম্যের ভিত্তিতে মোট দেশজ উৎপাদনে আগামী এক যুগের মধ্যে বিশ্বের ২৮তম বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে উঠে আসবে বাংলাদেশ।

 পেছনে ফেলে দেবে নেদারল্যান্ডস, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে। যে কোনো দেশেরই মূল লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন। আর দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে সে দেশের জনসাধারণের জীবন যাপনের আর্থিক নিরাপত্তার ওপর। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলে দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব পর হয়ে ওঠে। আর তা না হলে, দারিদ্র্য খাতে, নানা রকম সমস্যায় দেশের সব ক্ষেত্রই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। যা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। গত এক দশকের তথ্য এ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমে যাওয়ার যে তথ্য উঠে এসেছে, সে মোতাবেক বলা যায়- এ ধারাকে আরো এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশ একটি দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। উন্নয়নের এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। যুব ও তরুণ সমাজ সহ কর্মক্ষম বিপুল জনগোষ্ঠীর সুবিধাভোগ করতে হলে বাড়াতে হবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। এসব হবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যই অত্যন্ত জরুরি।

সমাজে অপরাধ সংস্কৃতি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে

 

স্বাধীন বাংলাদেশে সময় যত এগিয়েছে, সুশাসনের অভাবে নীতিনিষ্ঠ শাসনের অভাবে অপরাধের যথার্থ বিচার ও শাস্তি না হওয়ার কারণে সর্বোপরি আদর্শবাদী পারিবারিক, সামাজিক শাসনের অভাবে তরুণ প্রজন্ম নানা প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ক্ষমতাদর্পী পথে পা বাড়িয়েছে। ক্রমে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ ও অনৈতিকতার চক্রে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে বখাটেপনা ও যৌন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়েছে সংঘবদ্ধ তারুণ্য। বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিইনি। তবে সংবাদপত্র ও কিছু সংখ্যক লেখক পত্রিকা কলামে আমাদের জন্য সতর্কতা, সাবধানতার আওয়াজ তুলেছেন।

 অবশ্য তা ফাঁকা আওয়াজের চরিত্র নিয়ে হাওয়ায় ভেসে গেছে, সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। লেখায় প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবিত হওয়ায় ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে উদাসীনতার পরিচয় রেখেছে। তাৎক্ষণিক প্রতিকার ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে উল্লিখিত উদাসীনতা। প্রকৃতপক্ষে ব্যবস্থাই যদি নেওয়া হবে তাহলে দিনের পর দিন নারী ধর্ষণ, নারী হত্যা, বিভৎস পন্থায় শিশু নির্যাতন ও শিশু হত্যার মতো ঘটনা চলতে থাকবে কেন। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য মনে হয় স্কুল ছাত্র থেকে তরুণ ছাত্র নেতাদের বড় সড় অংশ ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতা, সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার।

বাদ যাচ্ছে না কিশোর বয়সের শিক্ষার্থী। বাংলাদেশি সমাজ জীবনাচরণ উর্ধ্বগামী হওয়ার বদলে অধোগামী হওয়ার পথ ধরেছে মূলত অপরাধ সংস্কৃতির হাত ধরে। সে সংস্কৃতি ক্রমশ বিস্তার ঘটেছে মহানগর ঢাকার এলাকার কেন্দ্র করে যেমন পুরান ঢাকা, তেমনি মধ্য বা কেন্দ্রীয় এলাকা গাজীপুর বা উত্তরায় টার্স শিল্পে। ক্ষমতাবান রাজনৈতিক সংস্কৃতি যত দিন নির্দোষ, নিরাপরাধ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না হবে, তত দিন সমাজে নিরীহ নিরাপরাধ সাধারণ সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

নতুন ইসি, জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে

অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে নতুন নির্বাচন কমিশনকে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এই কমিশনারের মেয়াদে। বিশ্লেষকদের মতে, বিদায়ী কাজী রকিব উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সৃষ্ট নানা বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমুর্তি গড়ে তুলতে হবে এই কমিশনকে। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

 আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই নতুন নির্বাচন কমিশনের কাঁধে পড়ছে বড়-ছোট ২৪টি নির্বাচন। ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় আইন-কানুন পর্যালোচনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ-খবরও নিচ্ছেন নতুন নির্বাচন কমিশনাররা। আমরা বলতে পারি, সার্চ কমিটি গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি যে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে। এখন কমিশনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেওয়া।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের পরই নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছিল কাজী রকিব উদ্দীনের কমিশন। এরপর উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তারা। নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে সন্দেহ-অবিশ্বাসের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে প্রথম দিন থেকেই কাজ করতে হবে নতুন ইসিকে। কাজের মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন প্রমাণ করবে, তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান বাস্তবতার বিচারে অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এই কাজ নতুন কমিশনকে করতে হবে।

 

নিরাপদ খাদ্যের প্রত্যাশা

চারদিকে কেবল ভেজাল বিষাক্ত আর মানহীন পণ্যের ছড়াছড়ি। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে মানবদেহে বাসা বাঁধছে যত অনিরাময়যোগ্য রোগ। সার্বিক পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে এ রোগ থেকে নিরাময়ের আর যেন কোন রাস্তাই খোলা নেই। কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই অকালে মারা যাচ্ছে। এ জটিল রোগ কিংবা অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী কিন্তু মানুষই।

এ দেশের এক শ্রেণির মানুষের অতি মুনাফা ও লোভের কারণেই দিন দিন আমাদেরও মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে। এদের মধ্যে কোন মানবিক বোধ নেই। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অধিক মুনাফার লোভে নিষ্ঠুরতাই কাজ করে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে খাদ্য দ্রব্য এমনকি শিশু খাদ্য-সবকিছুই তারা নকল করে বা ভেজাল মিশিয়ে বাজারে সরবরাহ ও বিক্রি করছে। তাতে মানুষ শুধু প্রতারিতই হচ্ছে না, নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্তও হচ্ছে।

 কথায় বলে, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। অসৎ ব্যবসায়ীদের কোনভাবেই ছাড় দেয়া উচিত নয়, কারণ তাদের কারণে দেশের সৎ ব্যবসায়ীদেরও বদনাম হচ্ছে। তবে এখানে মূল সমস্যা মানসিকতা, নীতি-নৈতিকতা ও সততার। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা এবং জনগণ সচেতন ও সোচ্চার না হওয়ায় খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না আমরা মনে করি, কেবল জরিমানা বা জেল নয়, এর সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদন্ড। অপরাধীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এর পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেই এ ব্যাপারে হতে হবে আপসহীন।

 

বিনা বিচারে আটকদের পুনর্বাসন

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিভিন্ন কারাগারে বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের জামিনের পর পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তার বিষয়টি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। কারাগারে ১৮ বছরে আটক। এ ধরনের ব্যক্তিদের জামিন দেয়ার পর তারা কোথায় যাবে, কী করবে। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের আদালতগুলো মামলার ভারে ন্যুব্জ হয়ে আছে। নানা ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে জনগণও প্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থার ব্যাপারে আগ্রহ হারাচ্ছে।

 বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে এনজিওদের কার্যক্রমকে সমর্থন আরো উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের সামাজিক বিরোধের ৮০ শতাংশই স্থানীয় পর্যায়ে নিষ্পত্তি ঘটে। আদালতে মামলা জট বাকি ২০ শতাংশ বিরোধ নিয়েই। স্থানীয় পর্যায়ের নিষ্পত্তি না হলেও মামলা জট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমেয়। কোর্টগুলোর ফৌজদারি মামলার ৪২ শতাংশ নিষ্পত্তি হতে যেখানে সময় লাগে এক বছর বা তারও কম সেখানে অবশিষ্ট ৫৮ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে এক-চার বছরেরও বেশি। ২০১৬ সাল পর্যন্ত সব ধরনের আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৮, ২০২০ সালে যা গিয়ে দাঁড়াবে ৫০ লাখে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক আইন সেবা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। গ্রাম আদালত প্রক্রিয়াকরণ উদ্যোগ গ্রহণ করা, ন্যায় বিচারে জনগণের অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ অর্থাৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

রিজার্ভ চুরির সিংহ ভাগ ফেরত আসেনি

রিজার্ভের অর্থ চুরি যায় গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি কিন্তু এক বছরেও চিহ্নিত হয়নি অপরাধীরা। অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি আটমাস আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও এখন পর্যন্ত তা প্রকাশ করা হয়নি। ১১ মাসেও  এ ঘটনার তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। ফিলিপাইনের সিনেট এ ঘটনায় তদন্ত আগেই শেষ করেছে। প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যে ব্যাংকটির মাধ্যমে এ অর্থ চুরি যায়, বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে সেই রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনেও জরিমানাও গুনতে হয়েছে ব্যাংকটিকে।

 রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে এক বছর ধরে নানা তৎপরতা চালিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক সহ অর্থ মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। নিউইয়র্ক ফেডারেল সুইফট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেও বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গত নভেম্বরে আইন মন্ত্রীর নেতৃত্বে ফিলিপাইন সফর করে উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির পাশাপাশি তারা বৈঠক করে আরসিবিসির সঙ্গে। এসব সত্ত্বেও ফেরত আসেনি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে ব্যাংকের হিসাব থেকে চুরি যায় রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। বাকি অর্থ ফেরত আনতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুলিশ এক সঙ্গে কাজ করছে। চুরিকৃত পুরো অর্থই শনাক্ত করা হয়েছে।

কারণ যাদের মাধ্যমে অর্থ হস্তান্তর হয়েছে তাদের চিহ্নিত করা গেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পুরো অর্থ দেশে আসতে সময় লাগবে। ৫ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভের অর্থ চুরি গেলেও তা প্রকাশ হয় প্রায় এক মাস পর। সরকার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলাটি আন্তঃদেশীয় হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে। রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত ২৩ বিদেশি নাগরিককে শনাক্ত করা হয়েছে। এক বছরের মধ্যেই একটা সুসংবাদ দিতে পারা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা যে কোন ব্যাংকের সমস্ত কাজ সততার সঙ্গে সম্পন্ন করা উচিত। আমরা চাই না ব্যাংকে এ ধরনের চুরি হোক।

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার

 

চিকিৎসা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণমানুষের এ অধিকার পূরণে প্রথম থেকেই তুলনামূলকভাবে যতœবান ভূমিকা রেখেছে। দেশের চিকিৎসা খাতে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেয়া হয় জাতীয় বাজেটে। যারা সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে চিকিৎসা শাস্ত্র সম্পর্কে পড়াশোনা করছে তাদের পড়াশোনার ৯৫ শতাংশই অর্থের জোগান দেয়া হয় দেশবাসীর পকেট থেকে।

দেশের সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পেছনেও ব্যয় করা হয় বিপুল অর্থ। তারপরও দেশের কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তা একটা প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। দেশে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক এমনকি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনে সরকারিভাবে অনুমতি দেয়া হয়েছে উদারভাবে। এত কিছুর পরও চিকিৎসা ব্যবস্থা চলছে চরম নৈরাজ্য।

সরকার চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনিয়মই যেন নিয়মে হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বেসরকারি চিকিৎসা খাত সেবার বদলে বাণিজ্যিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দেশের চিকিৎসকদের বেশির ভাগই ওষুধ কোম্পানির হুকুম বরদারের ভূমিকা পালন করছেন। রোগীদের কাছ থেকে বড় অংশের ফি নিয়েই তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না। ওষুধ কোম্পানীর ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার নামে তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করছেন বড় অংকের টাকা। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের অলিখিত চুক্তি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 চিকিৎসা কমিশনের লোভে যে সব বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার নেই সেসব বিষয়ে পরীক্ষার জন্যও রোগীদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করছে। সোজা কথায় চিকিৎসার নামে বাংলাদেশে এমন এক অবস্থা চলছে যে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য জাতীয় বাজেটে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে তা আদতে খুব একটা কাজে লাগছে না। চিকিৎসা ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ।  

 

দেশের উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব

বলা হয় শিক্ষাই সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদ । আমরা যতই বলিনা কেন বাংলাদেশে শিক্ষা ততটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে না। ১৯৭৪ সালে প্রথম যে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বের হয়েছিল সেখানে শিক্ষাকে মানব মূলধন বা সামাজিক পুঁজি হিসেবে স্বীকার করে এতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। সেখানে বাজেটে এক চতুর্থাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

 আর আজকের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা দেখব, চলতি অর্থ বছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে যখন অর্থ ছিল না, দেশের অর্থনীতি মন্দায় পতিত হয়েছিল, খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল, এখন অর্থাভাব সত্ত্বেও শিক্ষার গুরুত্ব বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল প্রাথমিক শিক্ষা হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। এরপর থেকে কারিগরি শিক্ষা।

 শিক্ষা হবে প্রয়োজন ও চাহিদা ভিত্তিক অর্থাৎ দেশে কোন কারিগরি শিক্ষার চাহিদা বেশি, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনবল দরকার আর কী কী চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা হবে দেশ ও আন্তর্জাতিক চাহিদা সামনে রেখে। আর উচ্চ শিক্ষায় যাবে তারাই যারা মেধাবী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই শিক্ষাকে গতানুগতিক ও গুরুত্বহীন করে রেখেছে।

 শিক্ষাখাতে বাজেট কমতে কমতে গত বছর ১ দশমিক ৮ শতাংশ চলে এসেছিল। ইউনেস্কোর নিয়ম অনুসারে প্রতিটি দেশকে শিক্ষাখাতে অন্তত জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া উচিত। আমরা কোন দিনও সেটি পাইনি। প্রত্যাশা থাকবে আগামী বছর শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দে চলতি বছরের ২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে অন্তত ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ হবে। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলে দেশ এগোবেই। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়াকে উদাহরণ হিসাবে ধরা যেতে পারে। মানব সম্পদ হচ্ছে সবচেয়ে বড় পুঁজি।  শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তিকে বলা হয় মানব মূলধন। কারিগরি শিক্ষা দিয়ে জনগণকে দক্ষ করে তুলবেন তা হবে সবচেয়ে বড় পুঁজি।

দেশে নারী নির্যাতন উদ্বেগজনক

মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টার তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছরে পারিবারিক কলহ, ধর্ষণ, যৌতুকের দায়সহ বিভিন্ন ঘটনায় সারা দেশে এক হাজার ৪১৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে বলে সংগঠনটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

 প্রতিবেদনে বলা হয় সারা দেশে পারিবারিক কলহের নির্যাতনের ৪০৯টি ঘটনায় ২৮৯ নারী নিহত হন, আত্মহত্যা করেন ৫৪ জন এবং আহত হন ৬৬ জন। ধর্ষণের শিকার হন ৭৩৯ জন নারী এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৯ জনকে। এ ছাড়া এসিড নিক্ষেপের ৩৫টি ঘটনায় নিহত হন একজন এবং আহত হন ৩৯ জন নারী। ২০১৬ সালে সারা দেশে অপহরণ হয় ৩৯৭ জন, অপহরণের পর জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৮৯ জনকে এবং অপহরণের পর লাশ উদ্ধার করা হয় ৭৩ জনের। এ ছাড়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ৩৪ জনকে অন্তর্বল (গুম) করা হয় এবং গুম করার পর ৯ জনকে বিচার বহির্ভূত হত্যা করা হয়। এ বছরে ১৬৭টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ২১৭ জন নিহত হয়।

 এ ছাড়াও ২০১৬ সালে কারা হেফাজতে মারা যায় ২৭ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে পারিবারিক কলহের নির্যাতনে ৪০৯টি ঘটনায় ২৮৯ নারী নিহত হয়। আত্মহত্যা করেন ৫৪ জন এবং আহত হন ৬৬ জন। ধর্ষণের শিকার হন ৭৩৬ জন নারী এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৯ জনকে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনে ২২৭টি ঘটনায় মারা গেছেন ১৫০ জন। আত্মহত্যা করেন পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন ৭২ জন নারী। এ ছাড়া এসিড নিক্ষেপের ৩৫টি ঘটনায় নিহত হন একজন এবং আহত হন ৩৯ জন নারী। ২০১৬ সালে সারা দেশে অপহরণ হয় ৩৯৭ জন। অপহরণের পর জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৮৯ জনকে। অপহরণের পর লাশ উদ্ধার করা হয় ৭৩ জনের। 



Go Top