সন্ধ্যা ৭:১৩, বুধবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ মতামত

সৈয়দ আহমেদ অটল : আজকের শিরোনামের কথা পুরনো বটে। তবে শোনাচ্ছে একেবারে নতুনের মত। মনে হয়, কথাটি কখনো পুরনো হবে না। অন্তত: আমার তাই মনে হয়। তারপরও কথাটি সদ্য ফেসবুক থেকে নেয়া। বলা হয়েছে- ‘অনেক মানুষই ভয়ে চমকে উঠতেন, যদি আয়নার সামনে দাঁড়ালে মুখ দেখা না গিয়ে চরিত্র দেখা যেত’। আমিই তো চমকে উঠতাম। কী ভয়ঙ্কর কথা না! এ যেন সবচেয়ে কাছের কিন্তু বড় শত্রু। ঘরের মধ্যে বিভীষণ! যে ঘরে সার্বক্ষণিক নিজে না থাকলেও আয়নাটা থেকেই যায়। ঘরের আর সব আসবাবপত্রের মধ্যে আয়না প্রয়োজন সব থেকে বেশি।

এমন কোনো বাসা-বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে ঘরে আয়না নেই। বিবাহিত বা অবিবাহিত যে কোনো বয়সের মানুষের প্রথম প্রয়োজন আয়না। আয়না ছাড়া আমাদের চলেই না। তা হলে দাঁড়াচ্ছেটা কী? আমরা নিজেরাই নিজের অজান্তে ঘরের মধ্যে শত্রু এনে রেখেছি। যে কোনো মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় শত্রু আর কিছুই হতে পার না। আয়নাই আমাদের বড় শত্রু।


আসলে আয়না আমাদের শত্রু নয়, বন্ধু। বন্ধু এই কারণে যে, আয়নায় নিজের চরিত্র দেখা যায় না, শুধু নিজের চেহারাটাই দেখা যায়। সে জন্যই আর সব আসবাবপত্রের চেয়ে আয়না আমাদের বেশি প্রিয়। আয়নার সামনে দাঁড়ালে শুধুই নিজের ফুটফুটে চেহারা (নিজের কাছে নিজে সব সময়ই বিশ্ব সুন্দর বা বিশ্ব সুন্দরী) ভেসে ওঠে। আর মনের আনন্দে আমরা আয়নার সামনে সব থেকে বেশি সময় দিয়ে থাকি। অভিযোগ আছে, বাস বা ট্রেনের সময় শেষ হয়ে এলেও নারীদের আয়নার সামনে থেকে সরানো যায় না। ‘এই হয়ে গেছে’, ‘আর একটু…’ বলে অনেক সময় ‘বহিয়া’ যায়। আমরা ঘরের মধ্যে আর সব কাজে যে সময় দেই, তারমধ্যে বেশি সময় দেই আয়নাতেই। আমার কেনো জানি মনে হয়, আয়নারও একটা প্রাণ আছে। কেননা আয়না হলো সেই জিনিস যার সাথে আছে মনের একটা গভীর সম্পর্ক। তা না হলে ‘মনেরও ছায়া পড়েছে, মনেরও আয়নাতে…’ এমন গান তৈরি হতো না। সে অনেক কথা হয়তো।

 
কিন্তু সত্যি সত্যি যদি আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চরিত্রটাই ফুটে উঠতো তা হলে কী হতো? সাম্প্রতিক সময়ে সমাজের নানা কর্মকান্ড দেখে মনে হয়েছে, যদি তাই হতো- তবে আয়নাই হতো আমাদের গোপন কর্মকান্ডের নীরব সাক্ষী। সে কথা ভেবে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াতে চাই না। ভয় পাই। কেননা, মনে হয়- আয়নার সামনে দাঁড়ালেই বুঝি আমার চরিত্রটাই সামনে এসে দাঁড়াবে! আমি তখন আয়নাটা ভেঙে চুরমার করে দেব? কিন্তু সেটা হবে না। কেননা আয়নার চরিত্রই হলো- যে সামনে দাঁড়াবে, তার চেহারাই দেখা যাবে। সেই আশাতেই আমি বারবার আয়নার সামনে দাঁড়াব। কখনো চুল ঠিক করব। কখনো পাউডার-স্নো লাগাব। এ ভাবেই আমি আমার আসল রূপ গোপন করব। লুকিয়ে রাখব। এখন তো সমাজে সেটাই হচ্ছে।

উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। চাঁদপুরের হাইমচরে এক জনপ্রতিনিধির স্কুলের ছাত্রদের পিঠের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ঘটনা। কী জঘন্য এই ‘জনপ্রতিনিধি’। মাহমুদপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। ছবিটি ফেসবুকে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। অনুষ্ঠানে স্কাউটসের সদস্যরা ‘প্রতীকী সেতু’ তৈরি করে। সেই ‘মানব সেতুর’ উপর দিয়ে হেঁটে যান অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। এই প্রধান অতিথিকে কি আপনি মানুষ বলবেন? এ নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। এরই মধ্যে সেই প্রধান অতিথি তার কর্মের জন্য মাফও চেয়েছেন। এরা হলো সেই মানুষ, যারা অপরাধ করে আবার সহজেই মাফও চায়। কারো কারো ভাষায় এটা ওদের ‘গুণ’। এই গুণ না থাকলে নাকি বড় হওয়া যায় না! ওরা এভাবেই বড় হতে থাকুক, আমরা চলুন পরের দৃশ্যে যাই। গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের আগুন দেবার ভিডিও ফুটেজ দেখে যারপর নাই বিস্মিত হলাম।

 নিজেকে প্রশ্ন করি, আমরা কোথায় আছি? এই আমার মুক্তিযুদ্ধের দেশ? কি ভয়াবহ ঘটনা। মানুষ মানুষের ঘরে আগুন দেয়। তা-ও আবার কারা! সাঁওতাল পল্লীর বিষয়টি যেহেতু আদালতে আছে তাই এখানেই ক্ষান্ত হয়ে অন্য গল্প (সত্যি হলেও হতে পারে) শোনাই। গল্পটা এমন- গ্রামের এক কৃষকের গরু চুরি হয়েছে। পরে তা ধরা পড়ে আরেক গ্রামের লোকদের হাতে। গ্রামবাসী গরুসহ চোরকে পুলিশে দেয়। পুলিশ চোরের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নেয়, তেমনি যার গরু চুরি হয়েছিল সেও কম হেনস্তা হয় না। শেষে গরুর মালিক বলতে বাধ্য হয়- ‘পুলিশ বাবার চেয়ে চোর বাবাই ভালো ছিল’। চলুন পরের গল্পে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ শুনে বিস্ময় প্রকাশ করে গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, ‘এটা উদ্বেগজনক’। তিনি বলেন, ‘গ্রাহকদের কাছ থেকে যে সব অভিযোগ আমরা শুনলাম, তাতে আমার কাছে আশ্চর্য লাগছে, এগুলো কিভাবে হতে পারে? প্রতিটি অভিযোগ ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সাথে জড়িত। এগুলো কোনো সাধারণ বিষয় নয় যে কেউ ছেঁড়া টাকা বদলাতে গিয়ে পারেনি। এটা অ?্যালার্মিং’।

অনুষ্ঠানে একজন গ্রাহক বলেন, ‘তার ভাই বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়েছিল সে টাকা অন্য কেউ তার ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে যায়’। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকেই ২০১৫-১৬ অর্থবছরে গ্রাহকরা বেশি হয়রানির শিকার হন। সোনালী ব্যাংক নিয়ে গ্রাহকরা ৫৬৩টি অভিযোগ করেছেন। ব্র্যাক ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ৩৭৩টি। অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ২৯১টি। ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৬৮টি, জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৩১টি, ডাচ- বাংলা ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২০৪টি, কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৮৪টি, পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৩২টি, রূপালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৩১টি এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১২৬টি অভিযোগ পড়ে ওই অর্থবছরে। এখানে একটি কথা বলি- আজকাল সহজে কেউ সুপরামর্শ গ্রহণ করতে চায় না। যত তাড়াতাড়ি কুপরামর্শ মাথায় প্রবেশ করে। এতএব কু আমাদের পরিচালিত করছে তাতে সন্দেই নেই। এবার চলুন দুদকের চেয়ারম্যানের কাছে।

চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেছেন, ‘দুদকের অভিযানে বেড়ে গেছে ঘুষের রেট’। পুরনো কথা নতুনের মতই শোনাচ্ছে। রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাকে অনেকেই বলেছে যে, আপনি ড্রাইভ দিচ্ছেন ভালো, কিন্তু এতে রেট বেড়ে গেছে। যারা দুর্নীতি করছে, তাদের এখন বক্তব্য হচ্ছে, ভাই এখন চারদিকে দুদক, ঝামেলা, ১০ টাকার জায়গায় আপনি এক হাজার টাকা দিবেন। এটা আমার কানে এসেছে। এটা সত্য না মিথ্যা তা যাচাই করার দায়িত্ব আমার না, তবে কানে যেহেতু এসেছে তা উদ্বেগের বিষয়।’ দুর্নীতি আমাদের পুরনো রোগ। এ রোগ সারাতে আরও সময় লাগবে। তবে আশার কথা কানাডার আদালত পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি পায়নি। এ খবরটি আমার খুবই ভালো লেগেছে। দুর্নীতি ঠেকাতে সামাজিক আন্দোলন জোরদার হতে হবে।


মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যর্থ ২০ কোম্পানির সব ওষুধ এবং ১৪টি কোম্পানির এন্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। দেশে ওষুধ নিয়েও জালিয়াতি হচ্ছে-এ অভিযোগ পুরনো। অভিযোগ তো আছেই ঢাকার মিটফোর্ডে নকল ওষুধ পাওয়া যায়। সব কিছুতেই আমরা নকলের মধ্যেই আছি। উদ্দেশ্যটা হলো পথ যেটাই হোক, ধনী হতে হবে। পরিবারের সবার জন্য একটা করে গাড়ি থাকতে হবে। তা না হলে ঢাকা শহরে এতো জ্যাম হবে কেন। আরেকটি চুরির গল্প বলে আজ শেষ করব। একজন সংবাদকর্মী লিখেছেন, ‘ট্রেনের প্রথম শ্রেণির যাত্রীর দ্বারাই চুরি হচ্ছে বালিশ, কম্বল, বিছানার চাদর। এ ঘটনা ঘটেছে চিত্রা ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে। সম্প্রতি এই সব ট্রেনে এসি বার্থের যাত্রীদের জন্য দেওয়া হয়েছে নতুন বিছানার চাদর, বালিশ, বালিশের কভার এবং কম্বল। তবে আরামদায়ক যাত্রীসেবা পেয়ে যাত্রীরা অনেক সময় কম্বল বালিশ নিয়ে যান! এসি বার্থের এতো দামি টিকিট কিনতে পারছেন যারা, তারা সামান্য বালিশ কম্বল চুরি করে বিবেক হাঁটুর নিচে নামিয়ে ফেলছেন।’ মানুষের পুরো শরীরের মধ্যে এমন কোনো অঙ্গ নেই যার নাম ‘বিবেক’।

 ‘বিবেক’ শব্দ মানুষেরই তৈরি। তারপরও আমরা বিবেকের কথা বলি। বলি এ জন্য যে, যখন কিছু করার থাকে না-তখন বিবেক কথা বলে। বিবেক থাকলে সমাজটা ছেঁড়া কাথার মত হতো না। আয়নার সামনে চেহারাটা ‘চোর’ ‘চোর’ লাগতো না। আসলে তো আমরা ব্যাপক মানুষ চোর না। কিছু লোক নিজ স্বার্থে চোর হচ্ছে। আপন ভাগ্য গড়তে, চোরাইপথে সম্পদের মালিক হচ্ছে। মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। এদের সংখ্যা নেহায়েত কম না। এরা উপরে সাদা, ভিতরে কেবলই কালো। এদের কথা শুনলে, আচরণ দেখলে খারাপ মানুষও লজ্জা পায়! এই শ্রেণির মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়ালে তাতে কিছুই দেখা যাবে না। যেন লজ্জিতই হবে আয়না! আয়না তখন কেবলই হয়ে উঠবে অন্ধকারময়। আজকের সমাজে এরাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

 এ সব গল্প শুনতে থাকলে শেষ হবে না। রাত শেষ করে ভোর হয়ে যাবে। আবার এ কথাও তো আছে, রাত যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে সূর্য উঠবে ততই আগে। আশার কথা, রাত শেষে একদিন সূর্য উঠবেই। সংশোধন : গত লেখায় অসাবধানত:বশত একটি কবিতা (‘পৌষ-পার্বণে পিঠা খেতে বসে…।’) পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের বলে উল্লেখ করেছি। আসলে কবিতাটি কবি সুফিয়া কামালের, নাম ‘পল্লীর স্মৃতি’। যারা এ ভুল ধরিয়ে দিতে ফোন করেছেন তাদের ধন্যবাদ।   
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
atalkaratoa01552@gmail.com
০১৫৫২৩২২৯৪২

ভাষার আত্মত্যাগের শিক্ষা

মামুন রশীদ :ভাষার প্রশ্নে বিতর্কের সূচনা ১৯৪৭ সালের আগেই শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের পর তা আরো জোরালো হয়। এবং আন্দোলনে চূড়ান্ত পরিণতি এলো ১৯৫২ সালে, যখন ভাষার প্রশ্নে প্রাণ বিলিয়ে দিলেন অকুতোভয় বাঙালি। ভাষার প্রশ্নে যে বিতর্কের শুরু হয়েছিল, সত্যিকার অর্থেই সেই বিতর্কের কি অবসান হয়েছে? সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর জন্য যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ভাষাসংগ্রামীরা জেল,জুলুম নির্যাতন সয়েছেন তাদের সেই আন্দোলন কি পূর্ণতা পেয়েছে? রাষ্ট্রভাষার বিতর্কের অবসান হয় পাকিস্তান আমলেই। তখন বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর বিপুল রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ ভাষার যে সার্বজনীনতার জন্য আমাদের লড়াই করতে হয়েছিল, তা কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?


সাধারণ মানুষ যেন বুঝতে পারে, তাদের জন্য যেন সহজ হয় সকল দাপ্তরিক কাজকর্মÑতাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠেছিল। আজ বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। আমাদের দাপ্তরিক ভাষা। কিন্তু অধিকাংশ সময় যে বাংলা ব্যবহƒত হয়, তা সাধারণের ভাষা না। এখনো দাপ্তরিক চিঠিপত্রে সাধারণ বাংলা, যাকে আমরা প্রমিত বাংলা বলে চিহ্নিত করি, তার ব্যবহার নেই। এখনো মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে দাপ্তরিক ভাষার তফাৎ  অনেক। এখনো ঘুরিয়ে পেচিয়ে সামান্য কথাকে বর্ণনা করা হয়। এখনোও গৎ বাঁধা দাপ্তরিক ভাষাই নানাক্ষেত্রে ব্যবহƒত। ঠিক একইভাবে আমাদের এ অঞ্চলের, এ ভূখে র মধ্যে বসবাসকারী অন্য ভাষার প্রতি আমাদের বিমাতা সুলভ আচরণও কিন্তু প্রকট। কয়েক বছর আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আমাদের সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী পাত্র সম্প্রদায়ের কথা। প্রতিবেদনটিতে পাত্রদের সম্পর্কে বলা হয়, ‘পাত্রদের যদি নিঃস্ব জাতি বলা হয়, তাদের ভাষাকে বলতে হবে নিঃস্বতর ভাষা।’ পাত্র সম্প্রদায়ের ভাষার নাম লালং। এ ভাষা তাদের নিজস্ব। তাদের আলাদা সংস্কৃতি ও ভাষা থাকলেও নেই বর্ণমালা। ফলে ভাষাটির লিখিত রূপও নেই। পাত্ররা নিজেদের লালং জাতি এবং ভাষাকে লালং ভাষা বলে। প্রতিবেদনটিতে একটি জরিপের ফল উল্লেখ করে আরো বলা হয়েছিল, সিলেট জেলার জৈন্তা, গোয়াইনঘাট ও সিলেট সদর মিলিয়ে বর্তমানে রয়েছে ৬০৭টি পাত্র পরিবার। এসব পরিবারের জনসংখ্যা তিন হাজার ৬৩৩ জন।

 পাত্রদের প্রায় সবাই লালং ভাষায় কথা বললেও তাদের ভাষায় বাংলা শব্দ এখন এমনভাবে মিলেমিশে গেছে যে, বর্তমানে লালং ভাষায় প্রায় ৫০ শতাংশের মতো বাংলা শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এমনকি পাত্রদের এক থেকে দুই শতাংশ মানুষ নিজেদের মধ্যে এখন লালং ভাষায় কথাই বলে না। ভাষা বদলের এই চিত্র সবচেয়ে বেশি ঘটছে পাত্র শিশুদের বেলায়। তাদের কাছ থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে মাতৃভাষা। তারা লালংয়ের পরিবর্তে বাংলা শিখছে, পাত্র বয়োবৃদ্ধদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে লালং ভাষারও বিদায় ঘণ্টা বাজছে। হয়তো খুব দ্রুতই এ ভাষা হয়ে উঠবে ইতিহাসের অংশ হবে। তার মানে আমরা, যারা মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করেছি, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছি, প্রাণ দিয়েছে বন্দুকের সামনে। তাদের হাতেই, তাদের ভাষার আগ্রাসনেই হারিয়ে যাচ্ছে সেই দেশেরই অন্য একটি ভাষা! বাংলা ভাষাভাষীদের কাছেই একই দেশের অন্য ভাষাগুলো হেরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এটা শুধু লালংয়ের ক্ষেত্রেই নয়, আমাদের অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষারও একই পরিণতি।


বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় মানুষ বুকের রক্ত দিয়েছে। আজ সেই ভাষা কেন অন্য ভাষার সঙ্গে বিরূপ আচরণ করছে? আসলে ভাষা দিয়ে, অর্থাৎ জোর করে চাপিয়ে দেয়া ভাষার মাধ্যমে যে কোন জাতির, একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা, মত প্রকাশের যে সুযোগ ও সীমা, তাকে খি ত ও বদ্ধ করে দেয়া সম্ভব। আর এক্ষেত্রে সেটাই করছে বাংলা ভাষা। ফলে আমরাই অন্য একটি ভাষার হারিয়ে যাওয়া দেখছি, মেনে নিচ্ছি।


অথচ আমরাই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। সেকি শুধুই ছিল ভাষার জন্য আবেগ? তা তো নয়। বরং এর পেছনে যেমন আবেগ ছিল, তারচেয়েও বেশি ছিল যুক্তি এবং আমাদের অধিকার সচেতনতা। আমরা শাসিতের ভাষা বুঝতে চেয়েছিলাম, যাতে করে পূর্বে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া জুলুম নির্যাতন যেন প্রতিহত করতে পারি। যেন আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারি। যেন আমরা নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা একইসঙ্গে খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম আমাদের স্বাতন্ত্র্যও। আমরা খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম আমাদের আত্মানুসন্ধান। সেইসঙ্গে আমরা আমাদের সত্তাসন্ধানের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলাম। আজ লালং ভাষার শব্দ সম্ভারে ঢুকে পড়েছে প্রায় অর্ধেক বাংলা শব্দ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, এই ভাষাটি হারিয়ে ফেলছে তার নিজস্বতা।

ভাষার এই আগ্রাসন, সে কিন্তু আমাদের দিকেও আঙুল তুলে আছে। আজ কিন্তু আমরা হিন্দি ভাষা নিয়েও চিন্তিত। টিভি সিরিয়াল এবং হিন্দি চলচ্চিত্র দেখে আমাদের শিশুরাও হিন্দি শিখছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে আমরা খুশি না। অথচ আমাদের তো খুশি হবার কথা ছিল। খুশি হবার কথা ছিল এই ভেবে যেÑ আমাদের শিশুরা ছোট থেকেই বাংলার সঙ্গে আরো একটি ভাষা শিখছে, তারা ছোট থেকেই হয়ে উঠছে বহুভাষাবিদ। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে আশাবাদী না হয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি। কেন? এই কেনর উত্তরের মধ্যেই রয়েছে সমাধান। মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা- এই স্লোগান আমরা ধারণ করেছিলাম। কারণ, মাতৃভাষার মাধ্যমে পড়ালেখা যতোটা বোধগম্য হতে পারে, মানুষ যতোটা বিকশিত হতে পারে, সমৃদ্ধ হতে পারেÑ অন্য ভাষায় শিক্ষাগ্রহণের মধ্যে ততোটা কখনোই সম্ভব হয় না।


নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে একটা দেশের, একটি জাতির সংস্কৃতি বেঁচে থাকে। কারণ একটি জাতির নিজের অস্তিত্ব, তার শেকড় তার ভাষা। এটা আমাদের বাংলাভাষার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি আমাদের এ অঞ্চলে বসবাসরত অন্যভাষাভাষীদের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। এ অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের ভাষার সঙ্গে তাদের সংস্কৃতি, তাদের চেতনা, তাদের জীবন-যাপন, সব মিলে মিশে আছে। বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা, আমাদের মায়ের ভাষা। আমাদের প্রতিবাদের ভাষা, আমাদের স্বাধীনতার ভাষা। এই ভাষার আত্মত্যাগের ইতিহাসের শিক্ষা থেকেই আমরা অন্য ভাষাভাষীদের শ্রদ্ধা করবো, তাদের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেবো। আর এটা করবো নিজেদের স্বার্থেই। একুশের ফেব্রুয়ারি আত্মত্যাগ কি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় না?
লেখক: সাংবাদিক, কবি।
mamun_rashid3000@yahoo.com

একুশের আলোকিত পথ সারা বিশ্বে

মোহাম্মাাদ নজাবত অালী: আজ আমি শোকে বিহ্বল নই, আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই , আজ আমি রক্তে গৌরবে অভিষিক্ত।…….. যারা আমার অসংখ্য ভাইবোন হত্যা করেছে, যারা  আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যময় ভাষায়  অভ্যস্ত মাতৃ সম্বোধনকে কেড়ে নিতে গিয়ে আমার এইসব ভাইবোনদের হত্যা করেছে , আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।………ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি,- মাহবুব-উল-আলম-চৌধূরী (২১ শের উপর রচিত প্রথম কবিতা।)
আজ একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমাদের জাতীয় জীবনে এক অমর অধ্যায়। আমাদের চেতনার এক অগ্নি  মশাল। একুশে ফ্রেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব। এর সঙ্গে বাঙালির গৌরব ও বেদনার ইতিহাস জড়িত। বাংলা মায়ের  গর্বিত  সন্তান  মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ঢাকার রাজপথে রঞ্জিত করে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্টীয় ভাষা হিসেবে  প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বের ইতিহাসে আমাদের তরুণ ছাত্র সমাজ এক মহাশক্তি। আমাদের ভাষা আন্দোলন তাদের সু-মহান ত্যাগের কথা বাঙালি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।


আজ একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।  বায়ান্ন  সালে ভাষার জন্য যে রক্ত ঝরেছিল সে রক্ত  আজ পুস্পিত  সৌরভে  সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব নেতৃবর্গ ভাষা  শহীদদের ১৮৮ দেশ ২১শে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা  দিবস হিসাবে  স্বীকৃতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাষা শহীদদের গৌরব গাঁথা ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন  ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ১৮৮৬ সালে পহেলা মে আমেরিকার শিকাগো শহরে যে মার্কেট ৮ ঘন্টা শ্রমের দাবিতে শ্রমিকদের আত্মদানের ঘটনা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে। ৫২‘ থেকে একাত্তর মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় জাতিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। বহু রক্তপাত ঘটেছে কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ২১শে ফেব্র“য়ারি ঘটনা বাঙালি জাতির একটি বিশিষ্ট অর্জনকে বিশ্ব স্বীকৃতি লাভের কোনো যুদ্ধ বা আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়নি। এ যেন বিনাযুদ্ধে বিশ্ব জয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালির আরেক বিজয়।

 

 মহান একুশ সীমানা পেরিয়ে ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত প্রথম কবিতা, আমি কাঁদতে আসেনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি-সে ফাঁসির চেয়েও বড় সম্মান আমরা পেয়েছি। আজ ২১শের আবেগ বিশ্বময় একুশের আলোকিত পথ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পবিত্র রক্তকে সম্মান দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সম্মেলনে ভাষা আন্দোলন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করে। তাই বাঙালির ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। বিশ্বের ১৯৩ দেশে আজ পালিত হচ্ছে বাঙালির ভাষা আন্দোলন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। আজ সারা বিশ্ব শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে সালাম, বরকত, রফিক প্রমুখ ভাষা শহীদদের নাম। এ ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি প্রথম পশ্চিম পাকিস্তানের ভিত কেঁপে দিয়েছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালি নিজেকে বুঝতে পারে এবং আত্মবিশ্বাসে জেগে ওঠে। বাঙালির মনে লুকিয়ে থাকা প্রচন্ড শক্তি সাহস বেরিয়ে আসে। বাঙালি প্রমাণ করেছে ন্যায়সঙ্গত দাবী আদায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই।


বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, সে মাতৃভাষার জাগরণ ঘটাতে হবে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বত্র। অর্থাৎ বাংলা ভাষার মাধ্যমে সুস্থ সংস্কৃতির  বিকাশ ঘটিয়ে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। ভাষার বিকাশ ঘটে তার চর্চার মধ্য দিয়ে। আমাদের মাতৃভাষার প্রতি অনীহা বা উদ্দ্যমহীনতা যে কারণেই হোক ব্যাপকহারে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে না। একুশের দাবী ছিল অফিস আদালতের ভাষা হবে বাংলা। কিস্তু উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার খুব কম। ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার সুুচনা হয়েছিল সে ধারা আজ অপসংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্যতম দিক হলো ভাষা সংরক্ষণ। এমন কতগুলো ভাষা আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে চর্চা গবেষণার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ভাষাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


ইতিহাসের আলোকেই, আজকের দিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে গৌরবান্বিত করেছেন। স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে যিনি স্বাধীনতার পর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। ধন্যবাদ জানায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যার চেষ্টা তৎপরতায় একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভে সহজতর হয়। সর্বোপরি আজকের এই মহান দিনে ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ও ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়।
লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

ভাঙ্গতে হবে শোষণ বঞ্চনার শৃঙ্খলকে

আব্দুল হাই রঞ্জু : মায়ের ভাষায় কথা বলা মানুষের জন্মগত অধিকার। যে অধিকারকে কেউ কেড়ে নিতে চাইলে প্রতিবাদ হবে, এটাই স্বাভাবিক। বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলা। সেই মাতৃভাষা বাংলার বদলে উর্দূকে রাষ্ট্র ভাষা করার ষড়যন্ত্র করেছিল উর্দূভাষী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। সে ষড়যন্ত্রের দূর্গ চুরমার করে মায়ের মুখের ভাষা বাংলার স্বীকৃতি আদায়ে হয়ত পৃথিবীর আর কোন জাতিকে জীবন দিতে হয়নি। কিন্তুু বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষায় রূপ দিতে অকাতরে জীবন দিতে হয়েছে রফিক, বরকত, সালাম, জব্বার সহ অনেক বিপ্লবীকে। গোটা ভারতবর্ষকে দু’শ বছর ধরে সা¤্রাজ্যবাদি বৃটিশ বেনিয়ারা শাসন শোষণ করলেও মাতৃভাষা বাংলার ওপর কোন কালো ছায়া না পড়লে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হেনেছিল। কিন্তুু সা¤্রাজ্যবাদি বৃটিশের দুঃশাসন ও শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই টানা দু’শ বছর ধরে জনগণকে আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। সে ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে পড়ার সুযোগ আমাদের হয়েছে। মাস্টার দা সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতার মতো বিপ্লবীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দু’শ বছরের গ্লানি মোচনে যে অবদান রেখে গেছেন, তা শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বাঙালি জাতি স্মরনে রাখবে।


মানুষের স্বপ্ন ছিল, বৃটিশ বেনিয়াদের তাড়াতে পারলে শোষণ, বঞ্চনা আর দুঃশাসনের অবসান হবে। কিন্তুু দুর্ভাগ্য, দ্বিজাতীতত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তানের জন্ম হলেও ভৌগলিক দিক থেকে পূর্ব বাংলা থেকে যায় পূর্বপাকিস্তানে, আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে যায় ভারতের সঙ্গে। আর হাজার মাইল দুরে অবস্থিত উর্দূভাষী লাহোরকে ঘিরে পশ্চিম পাকিস্তান নাম নিয়ে জন্ম হয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। শত বঞ্চনার পর ভারত বর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের সীমারেখা নির্ধারনের ক্ষেত্রেও বাঙালি জাতির স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং শিক্ষা দীক্ষায় অগ্রসরমান ব্যবসা বাণিজ্যে সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ববঙ্গ থেকে আলাদা করায় বলতে গেলে তখন পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগলিক সীমা রেখা আর একটি জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত ছাড়া তেমন কিছুই অর্জিত হয়নি। বাংলা ভাষী বাঙালির জাতীয় সংগীত উর্দূ ভাষায় রচিত হয়, পাকছার জমিন……..। যে উর্দূ ভাষায় রচিত জাতিয় সংগীতকে রাষ্ট্রীয় ভাষায় স্বীকৃতি দিতে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যখন ঘোষণা করেন, উর্দূই হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে ছাত্ররা না না বলে প্রতিবাদে ফেঁটে পড়েন। সদ্য স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিরা স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে না করতেই নতুন ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় ছাত্র সমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হয়।

 বাংলা ভাষার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে গোটা দেশের ছাত্র সমাজ। চলতে থাকে প্রতিবাদ বিক্ষোভ সমাবেশ। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ছাত্র সমাজের আন্দোলন সংগ্রামের কর্মসূচি বন্ধে ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল সমাবেশ বন্ধ করে দেয়। কিন্তুু বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজকে ১৪৪ ধারা জারি করেও আন্দোলন থেকে নিবৃত করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভেঙ্গেঁ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলে গুলি চালায় পাকিস্তানি পুলিশ। মুহূর্তেই ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই। শাসকের বুলেট বাঙালির মাতৃভাষাকে কেড়ে নিতে পারেনি। সে উত্তাল আন্দোলন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। সেই বিজয়ের পিচ্ছিল পথ ধরেই বাঙালি জাতির স্বপ্ন ছিল, শোষণ বঞ্চনামুক্ত বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র কাঠামো প্রবর্তনের। একুশ হয়ে ওঠে বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করার প্রতিকে। সেই একুশের চেতনায় শুধু মাতৃভাষা বাংলার প্রবর্তনই নয়, যা সামরিক শাসক আয়ুবের দূর্গ চুর্ণ করতে এ দেশের ছাত্র সমাজকে দূর্বার আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। যার নেতৃত্বের সুতিকাগার ছিল ঐতিহ্যে লালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


কারণ অনুন্নত পশ্চাৎপদ কৃষি নির্ভর পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না কোন শিল্প কলকারখানা। শুধু শোষণে শোষণে মেরুদন্ড ভাঙ্গা ক্ষুদ্র কৃষক আর জমিদার জোতদারদের শোষণে নিষ্পেষিত প্রজা নামক হাড্ডিসার মানুষগুলো ছিল অনেকটাই অসংগঠিত। ছিল না কোন শ্রমিক সংগঠন। ফলে ছাত্র সমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। অবশ্য এর কোন বিকল্পও ছিল না। ছাত্র আন্দোলনের পথ ধরেই এ দেশের সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে। পরিণতিতে সামরিক বিরোধী আন্দোলন, ১১ দফায় ছাত্র আন্দোলন, ৬ দফার আন্দোলন, ৬৯- এর গণঅভ্যূত্থান, সর্বোপরী ৭১- এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ দেশের ছাত্র জনতার  অগ্রণী ভূমিকা পশ্চিম পাকিস্তানের মসনদ চুরমার করে দেয়। ৭১- এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে বাঙালি জাতিকে বুলেটের মুখে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তুু সে চেষ্টাও বাঙালি জাতি নস্যাৎ করে দেয়। “যার যা কিছু আছে, তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে” বঙ্গবন্ধুর সে ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা নির্বিচারে হত্যা করে নিরপরাধ মানুষকে। শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়, মা বোনদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন।

মাত্র ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালির আত্মদান এবং দুই লক্ষ মা বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়। মনে হয় পৃথিবীর আর কোন দেশকে এত অল্প সময়ে এত প্রাণ ও সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়নি। লক্ষ্য ছিল দেশ স্বাধীন হবে। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হবে। থাকবে না শোষণ বঞ্চনা আর অর্থনৈতিক বৈষম্য। কিন্তুু বাঙালি জাতির দূর্ভাগ্য, স্বাধীনতা অর্জনের পর গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতার মূলমন্ত্র বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো নব্য দেশীয় শোষক ও শাসক গোষ্ঠীর হাতে একে একে পরাভুত হয়েছে স্বাধীনতার অমিত স্বপ্ন। স্বাধীন দেশে লুটপাট, দূর্নীতি এমনভাবে শিঁকড় গেড়ে বসেছে, স্বাধীনতা অর্জনের পর ৪৫টি বছর অতিবাহিত হলেও লুটপাট আর দূর্নীতির রোষানলে পড়ে এ দেশের কৃষক হারিয়েছে চাষের জমি, প্রান্তিক চাষি, বর্গাচাষী জমি হারিয়ে হয়েছে ভূমিহীন। এমনকি গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে সমান তালে। যারা এখন নগর মহানগরে বস্তিতে বস্তিতে ঠাঁই নিয়ে কোন রকমে মানবেতর জীবন যাপন করছে। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র সমাজতন্ত্র থেকে খোদ স্বাধীনতার পথিকৃত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ চলে এসেছে অনেক দূরে। এমনকি পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রয়াত্ব শিল্প বিকাশের বদলে পানির দামে সরকারি সম্পদ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে বিত্তশালী লুটেরাদের হাতে।

 ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্পে লোকসান গুণতে গুণতে এক সময়ের রফতানি আয়ের বড় খাত পাট শিল্প, বস্ত্র শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। সে জায়গা দখলে নিয়েছে সেনথেটিক ও প্লাস্টিক পণ্য। পাটের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজিকে বিএনপি সরকার ধ্বংস করে  ঐতিহ্যবাহী আদমজির প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত পাট চাষী সহ কোটি কোটি মানুষের রুটি রুজি বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও স্বাধীনতা লাভের চার দশকের পর বর্তমান সরকার ‘মোড়কে পাটজাত পণ্যের বাধ্যতামূলক ব্যবহার’ আইন করে পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে নানা ভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তুু এ ক্ষেত্রেও রয়ে গেছে শুভংকরের ফাঁকি। কারণ দেশীয় ভাবে পলিথিন, সিনথেটিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ না করে, উল্টো সেসব পণ্য ব্যবহারকারীদেরকেই নিশ্চিত করতে বলা হচ্ছে। বিষয়টি স্ববিরোধী। কারণ দেশে পলিথিন সিনথেটিকের উৎপাদন আগে বন্ধ করতে হবে। তানা করে যদি সরকার একদিকে পলিথিন পিপি ব্যাগ উৎপাদন অব্যাহত রাখে, অন্যদিকে তা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাহলে পলিথিন পিপি ব্যাগের আগ্রাসন বন্ধ হবে কি করে?


এ দেশের ক্ষমতাসীনরা বরাবরই স্ববিরোধী পথে অগ্রসর হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই কোন ভালো কাজের উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত শতভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়না । এ ঘটনা শুধু পাট শিল্পের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এ ধরনের ঘটনা হরহামেশা কম বেশি সব ক্ষেত্রেই ঘটছে। ফলে জনস্বার্থ রক্ষা করা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবি মানুষের ঐক্যবন্ধ প্রয়াসের কোন বিকল্প নেই। আর সেভাবেই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না জন্যই সরকার আসে সরকার যায় কিন্তুু দেশের মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। এ ভাবেই স্বাধীনতা উত্তর ৪৫ বছরে কোটিপতি ২২ পরিবারের বদলে দেশে এখন লক্ষ কোটি পরিবারের জন্ম হয়েছে।

এরাই দেশের নব্য শোষক গোষ্ঠী। এই শোষক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাই ঘুরে ঘুরে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসার আগে জনকল্যাণে নানা প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তুু যা হওয়ার তাই হয়, জনগণের ভাগ্যের বদল হয় না। ফলে এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি বা কর্মসংস্থান হয়ে যায় ‘সোনার হরিণ’। মেধা যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের চাকরি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় না। জনশ্রুতি আছে, বিশাল অংকের টাকা গুণতে না পারলে মেধা থাকলেও ভাগ্যে চাকরিও জোটে না। এ কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। অনেক ক্ষেত্রেই বেকারত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে অনেকেই হতাশার চোরাবালিতে বিপথগামী হচ্ছে। এ পথ বড়ই বন্ধুর। এ পথে মুক্তির কোন সুযোগ নেই।

 বরং বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে হলে পুঁজিবাদি এই ঘুঁনে ধরা সমাজ ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করতে হবে। আর এ সংকট থেকে উত্তোরণের একমাত্র পথই হচ্ছে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বদলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির রাষ্ট্র কাঠামোর প্রবর্তন। সে চেতনা নিয়েই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মাতৃভাষার আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলনে এ দেশের সূর্য সন্তানরা অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।


উপসংহারে এটুকুই বলতে চাই, মহান একুশের চেতনায় আবার বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে দেশীয় শোষক ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে। ভাংতে হবে পুঁজিবাদি অসম সমাজব্যবস্থার শোষন বঞ্চনার শৃঙ্খলকে। তানা হলে মহান একুশের চেতনার বাস্তবায়ন কস্মিনকালেও সম্ভব হবে না।
 লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২৬৯৮৮২৮

একুশ শতকে একুশের চেতনা

   
শিক্ষাবিদ আবুল ফজল লিখেছেন, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। আর আমি বলব একুশ মানে মাথা উঁচু করে, বুক চেতিয়ে চলা। মাতৃভাষার স্থলে অন্য ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার দুরন্ত ছেলেরা মাথা উঁচু করে, বুক চেতিয়ে সানন্দে প্রাণ বিলিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার যে অধিকার আদায় করেছিল, তা বিশ্বময় আজও চিরভাস্বর। এই আন্দোলনে ছিল নিখাদ দেশপ্রেম। মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি অবিমিশ্র প্রেম না থাকলে এভাবে প্রাণ বিলিয়ে দেয়া যায়না। এই মাথা উঁচু এবং বুক চেতিয়ে চলার চেতনা ছিল একাত্তর পর্যন্ত। তারপর থেকে এই চেতনা মাথা নত করে চলতে শুরু করেছে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অবাধে বাংলা প্রচলনের দাবিই ছিল সেই বিপ্লবের মূলমন্ত্র। মূলত মানুষ যে গৃহে, যে ভাষায়, যে সংস্কৃতিতে জন্ম লাভ করে, সে সেই ভাষায় কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। আর এটাই হলো মানুষের মুখের ভাষা বা মাতৃভাষা। আর যে যাই পারুক, কেউ কারো মুখের ভাষা কেড়ে নিতে পারেনা। যা পারে তা হলো চর্চিত জীবনের ভাষার বদল ঘটাতে।

এতে যাপিত জীবনে প্রভাব পড়লেও প্রাণের ভাষার কোন পরিবর্তন হয় না। সাতচল্লিশ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ভাষাভাষী মানুষেরা এমনিতেই ছিল বঞ্চিত, লাঞ্ছিত। এরপর জোর করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়া হলো। যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকান্ড থেকে সমূলে বাংলাভাষাকে বিতারিত করা। অর্থাৎ শিক্ষার মাধ্যম হবে উর্দুভাষা, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মাধ্যম হবে উর্দুভাষা এবং সবকিছুতেই থাকবে উর্দুভাষার প্রাধান্য। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঘোষণার আগে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ একবারো ভেবে দেখেনি, পাকিস্তানি প্রজাতন্ত্রের ৫৭ শতাংশ মানুষের মনেরভাব প্রকাশের অন্য একটি ভাষা আছে, আর তা হলো বাংলা। মানুষের প্রাণের এবং জীবন ধারণের ভাষা যখন এক না হয়, তখন সেখানে দ্বন্দ্ব অবধারিত। এই অবধারিত দ্বন্দ্ব সংঘাতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনে দারুণ ব্যাঘাত ঘটে। আর এই ঘটিত ব্যাঘাত থেকে মুক্তি পেতেই সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের।

 যেহেতু শত চেষ্টা করেও বাঙালির মাতৃভাষার কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়, তাই স্বভাবতই বাঙালির দাবি ছিল প্রাণের ভাষাতেই যাতে তারা তাদের জীবন যাপন করতে পারে। সঙ্গত কারণেই বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। অনেক রক্ত ঝরে, প্রাণের বিনিময়ে এই দাবি আদায় হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তা আজও সর্বাংশে পূরণ হয়নি। ভাষা সভ্যতার মতই পরিবর্তনশীল। বাংলাভাষার আদিগ্রন্থ চর্যাপদে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল কিংবা বিবর্তনের ধারায় প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগে যে ভাষা ব্যবহার হয়েছে এবং আধুনিক যুগ শেষে বর্তমানকালে যে ভাষা ব্যবহার হচ্ছে, প্রত্যেকটি যুগেই ভাষার আলাদা আলাদা রূপ দেখা যায়। ভাষার এই পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

 এতবছর পরে বাংলাভাষাকে আজও অনেক কিছু গ্রহণ ও বর্জন করতে হচ্ছে। কিন্তু ভাষার সমৃদ্ধি এক বিষয় আর বিকৃতি অন্য বিষয়। বর্তমান প্রজন্মের হাতে ভাষা বিকৃতি হচ্ছে। এই বিকৃতি যারা করছে, হয় তারা বুঝে করছে কিংবা বাংলাভাষা সম্মন্ধে তারা কিছু না বুঝেই এই বিকৃতি ঘটাচ্ছে। অনেকে এই বিকৃতিকে ভাষার বিবর্তন বলে মেনেও নিচ্ছে। কিন্তু হিন্দি ইংলিশ মিলেমিশে ভাষার যে ব্যবহার বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাওয়া যায়, তা কতখানি বিবর্তনের ফল বা কতখানি বিকৃতির নেশা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

 কালপরিক্রমায় অনেক বিদেশি শব্দ আমাদের ভাষার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং এই বিদেশি শব্দের প্রবেশ আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মেনেও নিয়েছি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, উচ্চ শিক্ষায় বাংলাভাষার বিরাটরকম অনুপস্থিতি এবং আমাদের মাতৃভাষা প্রেম দৈন্যতার কারণে, অনেকে মাতৃভাষা বাংলাকে ব্যবহার করতে গিয়ে নিজেদের অশিক্ষিত ভাবে বা মনে করে এটা মূর্খের ভাষা। আধুনিক হতে গিয়ে এইসব ব্যবহারকারি নিজেদের মনেরভাব প্রকাশ করতে গিয়ে বা অন্যকে অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা বিপন্ন করছে। শুধু নিজেদের স্বকীয়তা বিপন্নই করছে না, ভাষা বিকৃতির চূড়ান্ত সীমায় চলে গেছে এই প্রজন্মের কথ্য ও লেখ্য ভাষা। বাংলাভাষার একমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অনেক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব রয়েছে এই ভাষা রক্ষার।

 কিন্তু এখন আধুনিক প্রযুক্তি ও আকাশ সংস্কৃতির গ্রাসে, আমরা আমাদের ভাষাকে ধীরে ধীরে বিকৃতির চূড়াঁয় নিয়ে গেছি। বাংলাভাষার প্রতিনিধিত্বকারিই আজ বাংলাভাষার জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। শুধু এখনকার তরুণ-তরুণীরাই নয় তাদের অভিভাবকরা পর্যন্ত নিজেদের অত্যাধুনিক ও যুগোপযোগি করতে বাংলাভাষাকে বাড়াবাড়ি রকমভাবে বিকৃতি করছে। নিজ মাতৃভাষায় কথা বলাটা যে একটা শিল্প এবং এর মধ্যে এক ধরনের সুর আছে এটা ভুলে গিয়ে তথাকথিত সময়োপযোগিতায় তাল মিলাতে গিয়ে এরা বাংলাভাষার বারোটা বাজাচ্ছে। সম্পূর্ণরূপে একটি সুন্দর বাংলা বাক্য তৈরি করে কথা বলতে গিয়ে, এখনকার প্রজন্মের অনেকের করুণ রূপ ধরা পড়ে। আর এই দুর্বলতা ঢাকতে একটি বাক্যের মধ্যে অনেকেই অন্য বিভিন্ন ভাষার শব্দ জুড়ে দিয়ে গজাখিচুড়ি মার্কা বাক্য গঠন করে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করছে।


বাংলাভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বাংলাভাষা ব্যবহারকারি প্রতিটি মানুষের মনের একান্ত মমত্ববোধ অপরিহার্য। মনের মধ্যে মায়ের জন্য যেমন ভালোবাসা থাকে, ঠিক তেমনি মায়ের ভাষার জন্যও ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। নিজের ভাষায় ভাব প্রকাশের মধ্যে হীনতা বলে কিছু নেই। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে আমরা প্রকৃত অর্থে নিজেদের স্ববিরোধি ও আত্মপ্রবঞ্চকে পরিণত করছি। একমাত্র দেশপ্রেম ও মাতৃভাষা প্রেমেই এই প্রবঞ্চনা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। তাই আসুন স্ববিরোধিতা ছেড়ে সবাই মিলে মাতৃভাষা বাংলার সঠিক ও সুষ্ঠু চর্চা করি।
লেখক ঃ সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
ংযধড়হি০৭৭@মসধরষ.পড়স
০১৭১৬-২২৪৮১০

যে চেতনা বি¯তৃত দেশ থেকে বিশ্বে, মুহূর্ত থেকে মহাকালে

একুশে ফেব্রয়ারি ১৯৫২। এখন থেকে প্রায় ৬৫ বছর আগের কথা। মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে একটি জাতি প্রতিবাদ মুখর হয়েছিল। আর এই প্রতিবাদ প্রতিহত করার  অপচেষ্টায় তৎকালিন পাকিস্তান সরকারের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটেছিল এই বিশেষ দিনে। স্থানটি ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণ। শহীদ হয়েছিল বরকত, ছালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ। প্রতিবাদ থামাতে নিষ্ঠুর নির্যাতন এবং প্রতিবাদি মানুষের আত্মত্যাগের বহু ঘটনা দেশে বহুবার ঘটেছে এবং ঘটছে। কিন্তু সব ঘটনায় ইতিহাসের বিশিষ্টতা লাভ করে না।


কেউ যদি বুলেট ছুঁড়ে একটি দেয়াল কে ফুটো করে কিংবা বুক বিদীর্ণ করে রক্ত ঝরায় সেখানে যে শব্দের সৃষ্টি হবে তা হবে ধ্বংসের। যে মৃত্যু ও শোক সৃষ্টি হয় তা সাধারণতঃ সীমিত থাকে সংঘটিত ঘটনার স্থান ও সময়ের মধ্যে। কিন্তু কেউ যদি মহাসমুদ্রে একটি ঢিল ছুঁড়ে এবং কাঁপিয়ে তুলে বি¯তৃত জলরাশির কোন একটি অংশকে তখন তার সৃষ্টি হয় তরঙ্গের। এই তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে বিন্দু থেকে বৃত্তে এবং ঢেউয়ের সেই বৃত্ত কাঁপিয়ে তুৃলে চারিদিক।

বস্তুতঃ আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা এমন তথ্য দাঁড় করেছেন যে, একটি প্রজাপতি তার ডানার কম্পন বায়ু মন্ডলে যে কম্পন সৃষ্টি করে তা প্রচন্ড ঝড়ের জন্ম দিতে পারে এক প্রলয়ঙ্করি ঘটনা রূপে। প্রজাপ্রতির ডানার কম্পন যে ঝড় সৃষ্টি করতে পারে তার ব্যাখ্যা আরো গভীর ও জটিল। ফলে আমরা বিস্মিত হই, কেমন করে এতো ছোট ঘটনা এত পরিব্যাপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।


ইতিহাসের ঘটনা ঘটে সামাজিক পরিমন্ডলে এবং এজন্য প্রয়োজন এক অবিচ্ছিন্ন চেতনা ও উপলদ্ধির। যার মূল্যবোধ ও রুচির ধারক ব্যাপক অর্থে বহন করে সংস্কৃতির বাহক অর্থাৎ ভাষা। ভাষাকে এখানে গভীর ও ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করতে চাই। যে ইঙ্গিত ও আচরণের মধ্যে দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টি করে সেটাই ভাষা। মানুষের এই ভাষা অনেক বেশি সুক্ষ, জটিল, গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ থাকে অনেক বি¯তৃত। তাছাড়া সমাজবদ্ধ মানুষ পারস্পারিক যোগাযোগ সৃষ্টি করতে গিয়ে নির্মাণ করেছে নিজস্ব ভাষা। আর এই ভাষাকে অবলম্বন করেই মানুষ যুক্ত হয়েছে পরস্পরের সাথে এক বিমূর্ত চেতনার জগতে। যেখানে এক মানুষের অভিজ্ঞতা চিন্তা ও ভাবনার মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করেছে অন্য মানুষের চিন্তা ও চেতনার সাথে।


ভাষা আসলে অসংখ্য ছবির বাঁধানো বই সংগ্রহ নয়। নয় বাগান থেকে তুলে আনা ফুলের সাজানো মালা কিংবা ফুলদানিতে রাখা ফুলের স্তবক। ভাষা অবস্থান করে চঞ্চল, সজীব জীবন্ত ও সক্রিয় ঘটনা প্রবাহের মধ্যে। ভাষা সর্বদা ঝড় বৃষ্টি রোদে প্রজ্জ্বলিত। প্রতিদিনের কাছে, প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতায়, প্রতিটি মানুষের কর্মতৎপরতায় ও জীবন সংগ্রামের স্বপ্ন ও সাধনা নির্মাণ করতে হয় আমাদের ভাষায়।


একটি গোলাপ কতটা গন্ধ ছড়ায় যখন তা কবিতার পংক্তিতে ব্যবহৃত হয়, কত ফুলদানিতে, কত চুলের খোঁপায় অথবা কোর্টের পকেটে শোভা পেয়েছে এবং কত হৃদয়ে তা আনন্দ উল্লাস ঘটিয়েছে। মা শব্দটি কি অর্থ বহন করে অভিধানে তা খুঁজতে হবে না। অসংখ্য বাঙালি মায়ের দিকে চোখ মেলে দেখলেই এর ভালবাসা অর্থ বোঝা যাবে। শুধু ভালবাসায় নয়, সন্তানের জন্য মায়ের যে আত্মত্যাগ, যে শ্রম তা জগত বিহিত।  আমাদের স্বাধীনতা শব্দটিও তেমনি এর অর্থ শোষণ করে নিয়েছে সমগ্র বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস রচনা করে, অজস্র মুক্তিযোদ্ধার আত্মাহুতি ও আত্মত্যাগের মূল্যে।


বস্তুত: আমাদের দেখতে হবে স্বাধীনতার জন্য আমরা কতটা ত্যাগ স্বীকার করছি। কতটা শ্রম, কতটা সততা ও সৃজনশীলতাই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলছি। মনে রাখতে হবে, সমগ্র চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা স্বাধীন শব্দকে গতিশীল ও সজীব রাখাই আমাদের কর্তব্য। মাতৃভাষা একটি জাতির চেতনা ও ঐতিহ্য। সমগ্র সমাজবদ্ধ মানব জাতির যে জটিল  ব্যবস্থার অবয়বে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিফলন ঘটায় তাই একমাত্র ভাষার মধ্য দিয়ে। ভাষা প্রত্যেক মানব জাতির এক বিশাল সম্পদ। যে জাতি এ সম্পদকে মূল্যবান ভাবতে পারেনি, সে জাতি এখনো পৃথিবীর অনেক অনাবিষ্কৃত ও অজ্ঞাত ক্ষেত্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি। এক কথায় ব্যর্থ হয়েছে।


একটি ফুলের মালাকে রক্ষা করতে হলে যেমন প্রতিটি ফুলকে রক্ষা করতে হয়। তেমনি বিশ্ব সভ্যতার বিকাশ লাভ করতে পারে যদি প্রতিটি জাতি তার ভাষার ব্যবহার সঠিকভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পারে। মাতৃভাষা আমাদের ভালবাসা। একুশে ফেব্র“য়ারিতে ঢাকায় সচেতনতা ও আত্মত্যাগের যে প্রদর্শন ঘটেছিল তা সব দেশের সব জাতির মাতৃভাষার জন্য তাদের একনিষ্ঠ ভালবাসা ও চেতনা বহন করে।

মাতৃভাষার জন্য বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিকভাবে যে স্বীকৃতি লাভ করেছে, তা স্থান ও কালের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্ব ইতিহাসের ঘটনা রূপে পরিগণিত হয়েছে। মানব সভ্যতার যে বিশ্বজনিন রূপ আমরা কল্পনা করতে পারি তা অবিচ্ছিন্ন এক সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্যদিয়ে। সেখানে বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের ভিতর দিয়ে সৃষ্ট চেতনার তরঙ্গ প্রবাহিত মহাকাল ও বিপুল বিশ্ব বিস্তারে।
লেখক ঃ শিক্ষক, বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।
০১৭১৬-৬৯৬৪১৮

ভারতের পানি আগ্রাসনের কবলে অভিন্ন ৫৪ নদী

তিস্তা নদীটির বাংলা নাম তিস্তা এসেছে ‘ত্রি-স্রোতা’ বা ‘তিন প্রবাহ’ থেকে। সিকিম হিমালয়ের ৭,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে এই নদীটি সৃষ্টি হয়েছে। ১৫০০ সালের পর থেকে বাংলার অনেক নদীর নদীখাতই ভৌগোলিক কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। তিস্তা নদী তাদের মধ্যে একটি।
তিস্তা নদী আগে জলপাইগুড়ির দক্ষিণে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হত: পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে পুনর্ভবা ও মধ্যে আত্রাই। সম্ভবত এই তিনটি ধারার অনুষঙ্গেই ত্রিস্রোতা নামটি এসেছিল, যেটি কালক্রমে বিকৃত হয়ে দাঁড়ায় তিস্তা।

 তিনটি ধারার মধ্যে পুনর্ভবা মহানন্দায় মিশত। আত্রাই চলন বিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে করতোয়ায় মিশত। তারপর আত্রাই-করতোয়ার যুগ্মধারাটি জাফরগঞ্জের কাছে মিশত পদ্মায়। ১৭৮৭ সালের এক বিধ্বংসী দুর্যোগের পর তিস্তা তার পুরনো খাত পরিবর্তন করে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মেশে। তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিমি, তার মধ্যে ১১৫ কিমি বাংলাদেশ ভূখে  প্রবাহিত। আর ২০০ কিমি ভারতের।


পানি উন্নয়ন বোর্ড ও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প সূত্র মতে, সেচ প্রকল্প এলাকায় সেচ দেয়া এবং নদীর প্রবাহমাত্রা ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে স্বাভাবিক প্রবাহমাত্রা থাকা প্রয়োজন ২০ হাজার কিউসেক পানি। শুধু সেচ প্রকল্প চালাতেই প্রবাহমাত্রা থাকা প্রয়োজন ১৪ হাজার কিউসেক এবং নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন চার হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু ডিসেম্বর মাসের পর থেকে তিস্তায় পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। শুধু তাই নয়, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে ব্যারেজ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ফসল ও বাসাবাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভারত তখন সব গেট খুলে দেয়। এতে ব্যারেজের ৪৪টি গেট ২৪ ঘন্টা খুলে দিয়ে পানি সরানো সম্ভব হয় না। এই অতিরিক্ত পানি অপসারণের জন্য প্রকল্পের উত্তরে ৬১০ মিটার একটি খাল নির্মাণ করা হয়।

 ১৯৯৮ সালে বন্যায় এই খাল ধ্বংস হয়ে অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের প্রবেশপথে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ। আগের ড্যামগুলো ছিল পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাই সেখানে পানি প্রত্যাহার হত না। পানির গতি বাধা পেত। কিন্তু এই গজলডোবা  ব্যারেজের মাধ্যমে পুরোপুরি পানি প্রত্যাহার করে নেয় তিস্তা থেকে। ব্যারেজের দুই পাশ দিয়ে দুইটি খাল আছে। যার মাধ্যমে তিস্তা থেকে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ব্যারেজের সামনে চর পড়ে গেছে। এভাবে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশ খুব কম পরিমাণ পানি পাচ্ছে। ২০ জানুয়ারি ২০১৭ তিস্তার পানি প্রবাহ ছিল ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৪০০ কিউসেক। ঐতিহাসিক গড় অনুযায়ী পানির এ প্রবাহ থাকার কথা কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক।


তিস্তা নদী আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি আন্তর্জাতিক নদী। কেননা এটি শুধু সিকিম রাজ্যে উৎসারিত হয়ে ভারতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাংলাদেশের উপর দিয়েও প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত হয়েছে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক নদীতে কোনো দেশের একচ্ছত্র আইনগত আধিপত্য নেই। এ নদীগুলোর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উজান ও ভাটির দেশগুলোর একই রকম অধিকার। ১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নিয়মাবলী অনুযায়ী, ইচ্ছা করলেই উজানের দেশ, এ ধরনের নদীর উপর ভাটির দেশের জন্য ক্ষতিকর এ রকম কোনো কিছু নির্মাণ করতে পারে না।

বস্তুত আন্তর্জাতিক নদীর পানির ব্যবহার সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালে সম্পাদিত হেলসিংকি নিয়মাবলীতে বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর জন্যে দ্বি-পাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক এই দুই স্তরেই আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার এবং তার সমবণ্টন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের আইনি পথ বাতলে দেওয়া হয়েছে। হেলসিংকি নিয়মাবলীর অনুচ্ছেদ ৩০-৩৫ পর্যন্ত ধাপে ধাপে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া আছে। যেমন, অনুচ্ছেদ ৩০ এ বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয়েছে। সেটা সম্ভব না হলে যৌথ প্রতিষ্ঠান তৈরির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।


এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন বর্তমানে সক্রিয় আছে। এর মাধ্যমে সমাধান সম্ভব না হলে অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের পথও খোলা রাখা হয়েছে। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় সমাধান না হলে অনুচ্ছেদ ৩৩ একটি অনুসন্ধান কমিশন গঠনের কথা বলেছে। অনুচ্ছেদ ৩৪ এ আন্তর্জাতিক বিচারালয়সহ অন্যান্য অনেক উপায়ে আন্তর্জাতিক সালিশির সুযোগও তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হেলসিংকি নিয়মাবলীর ৩৫ নং অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক সালিশির জন্য আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়ও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।


জাতিসঙ্ঘ আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন টঘ ঈড়হাবহঃরড়হ ড়হ ঘড়হ-ঘধারমধঃরড়হ টংবং ড়ভ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ডধঃবৎ ঈড়ঁৎংবং (টঘ ডধঃবৎ ঈড়ঁৎংবং ঈড়হাবহঃরড়হ) গৃহীত হয় ২১ মে ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের সভায়। কনভেনশনের পক্ষে ১০৩টি দেশ ভোট দেয়। তিনটি দেশ এর বিরোধিতা করে। তবে পাকিস্তান ও ভারত ভোটদানে বিরত থাকে। চীন, তুরস্ক ও বুরুন্ডি এ কনভেনশনের বিরোধিতা করে। শাসকগোষ্ঠির ক্ষমতা ও নতজানু নীতির  কারণে বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করতে সম্মতি জানায়নি। অথচ বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। কনভেনশনটি গৃহীত হওয়ার পর সদস্যরাষ্ট্রগুলো কর্তৃক এটি অনুসমর্থন, গ্রহণ, অনুমোদন বা সংযোজনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।  ৩৫টি দেশ স্বাক্ষর করায় তা আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়। এই আইন ১৭ আগস্ট ২০১৪ কার্যকর হয়।


কনভেশনের ধারা ১১তে বলা হয়েছে, “ডধঃবৎ ঈড়ঁৎংব ংঃধঃবং ঝযধষষ বীপযধহমব রহভড়ৎসধঃরড়হ ধহফ ঈড়হংঁষঃ বধপয ঝযব ধহফ রভ হবপবংংধৎু, হবমড়ঃরধঃব ড়হ ঃযব ঢ়ড়ংংরনষব বভভবপঃং ড়ভ ঢ়ষধহহবফ সবধংঁৎবং ড়হ ঃযব ঈড়হফরঃরড়হ ড়ভ ধহ রহঃবহঃরড়হধষ ধিঃবৎ পড়ঁৎংব.” আমাদের যৌথ নদী কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর কিছু করছে বলে মনে হয় না।


কনভেনশনের ১২ ধারায় বলা হয়েছে যে- ‘কোনো একটি পানিবাহিত রাষ্ট্র কোনো পরিকল্পনা কার্যকর করতে গেলে বা কাউকে কিছু কার্যকর করতে দিলে তাতে যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পানিপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি হয়, তবে সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যাদি তাদেরকে অবহিত করতে হবে। এ ধরনের তথ্য প্রদানের সাথে কারিগরি ডাটা, তথ্যাবলিসহ পানি পরিবেশের ওপর তার প্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে অবহিত করবে, যাতে করে তথ্যপ্রাপ্ত দেশটি সময় মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।’


১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারে স্থির হয় যে, তিস্তা নদীর পানির শতকরা ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। বাকী ২৫ শতাংশ পানি নদীটির সংরক্ষিত রাখা হবে। কিন্তু কী ভাবে এই পানি ভাগাভাগি হবে সে বিষয়ে কোন দিকনির্দেশনা ছিল না। বহুকাল পরে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি যৌথবৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দু’দেশের সমান অংশে ভাগ করে অবশিষ্ট ২০ শতাংশ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়।

ভারত এই প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করে জানায় যে, বাংলাদেশ ভারতের সমান পানি পেতে পারে না। নীলফামারীর তিস্তা নদীর উজানে ভারত জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমায় গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে । ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিস্তা নদীর মূল পানিপ্রবাহের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের তিস্তায় আসতে দেয়া হয়েছে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের শুষ্ক মৌসুমে ভারত কর্তৃক তিস্তার পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পানি-ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন যে, ‘তিস্তার মূল প্রবাহ ভারত প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

 তিস্তায় ডালিয়া ব্যারাজে উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহ প্রায় শূন্য। এখন যে ৬০০-৭০০ কিউসেক পানি যা আসছে তা, ধারণা করা হয়, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ভাটির উপনদী থেকে’। তিস্তার পানির ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মামলার উদাহরণ  মানছে না। ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরে গেছে। পানি বন্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুয়েমিতা, অনৈতিক ঢিলেমি ও হটকারীতায় তিস্তা তীরবর্তি ও আশেপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তলদেশে অজস্র পাথর, নুডড়, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার বুকে শুষ্ক মৌসুমে উত্তপ্ত বালুর স্তুপ। অন্যদিকে বর্ষাকালে মুল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচন্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙ্গনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে পথের ভিখেরি হয়। নদীর প্রবাহ পথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙ্গনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশি। কোন জায়গায় ৫০০ মিটার।


ভারত আন্তর্জাতিক নীতি লংঘন করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ন্যূনতম স্বার্থ বিবেচনা না করে তিস্তাসহ ৫৪ টি অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার করছে। এটা ভারতের সাম্রাজ্যবাদী ও পানি আগ্রাসন নীতির প্রতিফলন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার আর সরকারের নতজানু নীতির প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষের সোচ্চার হওয়া এখন সময়ের দাবি।
লেখক ঃ আহ্বায়ক, বাসদ, জেলা শাখা, বগুড়া।
ংঢ়ন.নড়মৎধ.ংঢ়@মসধরষ.পড়স
০১৭১৫-১৩৮০৬৪

প্রযুক্তি ব্যবহার করেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রোধ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের তাবদ হুঙ্কার, আশ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণী সবটাই যেন অকার্যকর মনে হচ্ছে। সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবারও এসএসসি পরীক্ষায় গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গণিত পরীক্ষার বহু আগে ফেসবুকে দেয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলে দেওয়া প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।

 বরাবরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। সরকার জঙ্গি দমন করতে পারছে, সরকার বিশ্ব ব্যাংককে উপেক্ষা করেই পদ্মা সেতুর মতো কঠিন কাজগুলো করতে সক্ষমতা দেখালেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? প্রশ্ন হলো সংশ্লিষ্টরা কি না দেখার ভান করছেন। সবাই জানে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার্থী, অভিভাবকরাও বলছেন, যে প্রশ্ন তারা অনলাইনে পেয়েছে তার সাথে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নে পুরোপুরি মিল আছে। সবাই দেখছেন, জানছেন কিন্তু তাঁরা (!) কেন দেখছেন না। এটা কি তাহলে কানার হাট বাজার নাকি? প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সংশ্লিষ্টরা এর দায় কেন নিচ্ছেন না? এমনটা চলতে থাকলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে, শিক্ষার মান বলে কিছু থাকবে না। প্রকৃত শিক্ষিত জাতি থেকে বঞ্চিত হবে দেশ।  আর তা দেশের জন্য ভয়ানক একটা সংবাদ।


প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। আমাদের কালেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তখন কেউ হঠাৎ প্রশ্নপত্র পেলেও অল্প সময়ে এক জায়গা হতে আরেক জায়গায় পাঠানো দুঃসাধ্য ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সহজ হয়েছে। কথায় আছে, কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।

 প্রশ্নপত্র বিতরণে ভিন্নতা আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কৌশলি হতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে পরীক্ষার দিন সকাল বেলা প্রশ্নপত্র ছাপানো এবং বিতরণ করা যায়। গণিত প্রশ্ন ফাঁসের পর প্রশ্ন ফাঁস রোধে পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র স্থানীয়ভাবে ছাপা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বিবৃতি দিয়েছেন। বছর তিনেক আগে আমি প্রশ্ন ফাঁস রোধে আমার লেখা কলামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েকটি সুপারিশ করেছিলাম। তখন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও এ জাতীয় সুপারিশ পেশ করেন।

 তা বাস্তবায়নে মন্ত্রনালয় উদ্যোগিও হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও সে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা যায়। আলোচিত সৎ এবং সাহসি ম্যাজিষ্ট্রেট রোকন-উ-দ্দৌলার মতো সরকারি আমলাদের এখানে কাজে লাগাতে হবে। যথানিয়মে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্নপত্রের নমুনা কপি সংগ্রহ করা হবে। পরীক্ষার রাতে ওইসব সৎ আমলাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল সংগৃহীত প্রশ্নপত্র থেকে বেছে বেছে নতুন প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি করবেন। তথ্য প্রযুক্তিতে ভরপুর থাকবে ঐ কক্ষ। সেখান থেকে পরীক্ষার আধা ঘন্টা আগে কেন্দ্রগুলোতে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে হবে।

 কেন্দ্রে আধা ঘন্টা আগে শিক্ষার্থীদেরও প্রবেশ করাতে হবে। এ সময়ে প্রিন্টারে প্রশ্ন প্রিন্ট করে পরীক্ষার হলে সরবরাহ করতে হবে। তাতে সুফল মিলতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য একটি সেন্ট্রাল সার্ভার থাকবে। পরীক্ষার আধা ঘন্ট আগে কেন্দ্রীয় সার্ভার হতে পরীক্ষা কেন্দ্রে থাকা ট্যাব বা কম্পিউটারে প্রশ্ন পৌঁছে দিতে হবে। অথবা ই-মেইলেও এ কাজটি করা যায়। এক ক্লিকেই কয়েকশ’ ই-মেইল পাঠানো সম্ভব।

 দেশের সবচাইতে বড় পাবলিক পরীক্ষা হল পিএসসি, যার কেন্দ্রের সংখ্যা কমবেশি ৬০০। এই পরীক্ষার জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো ১২-১৫ কোটি টাকার মধ্যেই গড়া সম্ভব এবং শুধু পিএসসি কেন, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ যে কোনো কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা খুব সহজেই নেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান প্রশ্নপত্র ছাপা এবং পাঠানোর খরচও অনেক বেশি পড়ে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেন্দ্রে প্রশ্ন পাঠালে বর্তমানের তুলনায় খরচ কয়েকগুণ কম হবে তাতে সন্দেহ নাই। বর্তমানে উন্নত পৃথিবীতে পরীক্ষার গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু আছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এদেশেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব। আসল প্রশ্ন হল, সংশ্লিষ্টরা সমাধান চাইছেন কিনা!


দেশে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা বিভিন্ন সময় হয়েছে। এখনো হচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্য দেশবাসীর কাছে বেশ স্পষ্ট হলেও পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাদের সে সফলতাকেই ম্লাান করে দিচ্ছে। প্রায় পরীক্ষায়ই এ ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহল চিন্তিত। আর এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য বজায় থাকবে কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখিও হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কর্ণকুহরে পানি ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না।

 তা যদি হতো তাহলে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটত না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনার ধামাচাপা দেয়ার ঘটনা ঘটে। একবারও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে না কেউ। ‘শর্ট সাজেশনস থেকে আসতে পারে’ এমন মন্তব্য করে শিক্ষা বিভাগ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এবার মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যথারীতি ফল প্রকাশ করে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় মেধাবীরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পাওয়াসহ মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে। পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে, মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে কয়েকজনকে আটকও করেছে পুলিশ।

 এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। বরাবরের মতো আগের রাতে নয় এবার কয়েকদিন আগেই শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের সেট হাতে পেয়ে যায়। ১০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ফটোকপির দোকানে এ প্রশ্ন বিক্রি হয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে। যেসব প্রশ্ন বাজারে পাওয়া গেছে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দেখা গেছে সব প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল ছিল। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও সমানের পরীক্ষায়ও তাই হয়। খুদে বার্তা ছাড়াও প্রশ্ন ছাপানো (কম্পিউটারে কম্পোজ করা) ও হাতের লেখা কপি পরীক্ষার আগেই বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফাঁস হওয়া ওইসব প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের শতভাগ মিল পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো কি হচ্ছে এসব? শিক্ষা ক্ষেত্রে এভাবেই কি প্রতিনিয়ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটবে? এসব রোধ করা হচ্ছে না কেন? সরকার কি রোধ করতে পারছে না? আমরা এ কথা সহজভাবে মেনে নিতে রাজি নই। সরকার চাইলে সবই পারে।


প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শান্তি ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ডসহ অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। কতবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো ক’জনকে এ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নাম্বার ধারায় এই শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই শাস্তির এ বিধান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হয় কিন্তু শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে বার বার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে। চলতি এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হলেও অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই চলে যাবে বলে ধারণা করতে পারি। সরকারি এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়।

 ওই সময় থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৮২ বার বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০১৪ সালের জেএসসি, পিএসসি, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২০১৫ সালে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের গণিত পরীক্ষায় পশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পরিসংখ্যান বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা আরো বাড়বে। এর মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, বাতিল ও তদন্ত কমিটি হয়েছে মাত্র ৩০টি পরীক্ষায়। তদন্ত কমিটি হোতাদের চিহ্নিত করে প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করলেও কোনোটিরই বাস্তবায়ন হয়নি। কারো শাস্তিও হয়নি। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।


প্রশ্ন ফাঁসের ফলে একটি নীতিহীন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সবার মধ্যেই একটি ব্যাধি সংক্রামক আকারে বাড়তে থাকে। এটা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেই আমরা মনে করি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
হবংিংঃড়ৎব১৩@মসধরষ.পড়স  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে, মাঘ, বাঘ দুটোই বিলুপ্তির পথে…..

“শীত রাত্রির ঢেউ” নামে একটি রাশান বই পড়েছিলাম, সেই ছোটবেলা। বরফ পড়া শীতে কর্মহীন গরীব এক রাশান পরিবারের কাহিনী। রুটি বা গমের অভাব, সামান্য সরকারী রেশনে আধপেটা খাওয়া, বস্ত্রহীন শীতে গমের নাড়ার আগুনে শরীর সেঁকা আর সেই আগুনে আলু পোড়া খেয়ে দূর্বিসহ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার গল্প! আমরা চাইনা এরকম দূর্বিসহ বরফ পড়া শীত আর বৈরী আবহাওয়া। যাতে কর্মহীন হয়ে কৃষক-শ্রমিককে আলু পোড়া খেতে না হয়।
তবে ষড়ঋতুর দেশে ছয়টি ঋতুকে আমরা যথাযথ কামনা করি, যাতে করে আমাদের তথা বিশ্ব পরিবেশের ভারসাম্য, ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী ঠিক থাকে তাতে করে স্ব স্ব ভূখন্ডের লোকেরা নিজস্ব প্রচলিত ধারা অনুযায়ী মৌসুমি আবাদগুলো সফলভাবে করতে পারে অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশে। যদিও পৃথিবীর একেক জায়গায় একেক রকম ঋতু।


কথা শুরু করতে চেয়েছি আসলে এবারের শীত নিয়ে। আমরা লক্ষ্য করছি, এবার শীত ঋতুতে তেমন কোন শীত নেই। এর ফলে উত্তর মেরুর বরফস্তর গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির স্তর বৃদ্ধি পাবার আশংকা সহ নানারূপ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা। এর পিছনে কিছু কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা এষড়নধষ ডধৎসরহম হলো জলবায়ু পরিবর্তনে একটি বিশেষ ঘটনা। এটি মানুষের কার্যক্রমের প্রভাবে ঘটছে মূলত এবং কিছুটা প্রকৃতিগতভাবেও।

উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ সমূহ বা গ্রিনহাউজ গ্যাসসমূহ : কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড এবং সালফারের অন্যান্য অক্সাইড সমূহ। নাইট্রিক অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরোকার্বন ইত্যাদি। এসব গ্যাস আমাদের কলকারখানার কার্যক্রম গাড়ি, রেফ্রিজারেটর হতে নির্গত। উল্লেখিত গ্যাসগুলির কারণে ওজনস্তর ক্ষয়ে যাওয়ার ফলে, সৌর বিকিরণ পৃথিবীতে আসে এবং ট্রপোমন্ডল উত্তপ্ত হয়। এবারের শীতের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে মাঘ বাঘ দুটোই বিলুপ্তির পথে!


আমাদের ঋতু ছয়টি, এ ছয়টি ঋতুতে আমরা ছয়রকম আবহাওয়া দেখতে পাই। প্রত্যেকটি ঋতু একেক রকম আবাদে আমাদের সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ ঋতুগুলো যদি নিজস্বতা হারায়, তাহলে চাষাবাদ সহ বিভিন্ন রকম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। জলবায়ুর পরিবর্তন ইতিমধ্যেই আমরা অবলোকন করছি। বরফ পড়া অতিশীত বা অতিবৃষ্টি, অতিখরার মত চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া কিছুতেই যেমন আমাদের কাম্য নয়, তদ্রুপ শীতহীন, বৃষ্টিহীন ঋতুর পরিবর্তন ও আমাদের কাম্য নয়। গত ক’বছর ধরে এরকম পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। এবার যেমন মাঘ মাসেও শীত নেই, শৈত্য প্রবাহও নেই। যদিও আমরা শীত কামনা করিনা, মানুষের কষ্টের কথা ভেবে। তথাপিও ষড়ঋতুর দেশে নিয়ম মাফিক শীতটুকু প্রয়োজন, আবহাওয়ার ভারসাম্যে ও চাষাবাদের কারণে।


ঋতুভেদে আমাদের কৃষি মৌসুম প্রধানত দুটি। এপ্রিল থেকে নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত মৌসুম। আর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুম। মুলত শীতকালটাই আমাদের রবি মৌসুম। শীতের মৌসুমে শীত নাই, কিংবা অতিশীত, আবার বর্ষা মৌসুমে অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি আমাদের কৃষি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ঋতু তার নিজেস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে না রাখলে আমাদের বিপর্যয়। এর জন্য দায়ী আবহাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তন। জলবায়ুর পরিবর্তন ও বৈরী আবহাওয়া আমাদের শস্য উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ। এই জলবায়ু পরিবর্তনের নানাবিধ কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। তার কারণগুলো হলোঃ


* আমাদের সংকটাপন্ন ভৌগলিক অবস্থান * দূর্বল অবকাঠামো * ঋতু বৈচিত্র্য * দরিদ্রতা * জনসংখ্যার ঘনত্ব * সমান্তরাল ও নীচুভূমি * চরম আবহাওয়া
পৃথিবীসহ বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। এমনকি গড় বৃষ্টিপাতও বেড়েছে। ফলে দূর্যোগ একের পর এক আসছেই। বন্যা, আইলা, সিডর, নার্গিস সহ নানারকম ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে হচ্ছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তন বাংলাদেশের তিন অঞ্চলের উপর বেশি প্রভাব ফেলেছে, উপকূল, হাওড়, চরাঞ্চল। মূলতঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই তিন অঞ্চলসহ সারাদেশে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষ আর্থ সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি দূর্যোগপূর্ণ দেশ। যদিও বাংলাদেশে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কম, প্রায় ০.১৭ তবুও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি।


কর্মসংস্থানের অভাবে উত্তরাঞ্চল এমনিতেই মঙ্গাপ্রবণ এলাকা। আবার খরা, বন্যা, অতিশীত, কম শীত হলে কৃষি সমস্যা ও অনাবৃষ্টিতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে। বন্যপ্রাণী নিধন ও গাছ কেটে অরণ্য ধ্বংস ও এর অন্যতম একটি কারণ। এ কারণেই রূপক হিসেবে আমি বাঘের কথা বলছি। আমার বিষয় ছিল মাঘ ও বাঘ দুটোই বিলুপ্তির পথে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, এড় রিষফ ভড়ৎ ষরভব. বাংলায় “বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ।” আবার ২৯শে জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। ২০১৫ সালের প্রতিপাদ্য ছিল, “বাঘ বাঁচলে বাঁচবে বন, রক্ষা হবে সুন্দরবন।” বিশ্বজুড়ে বিলুপ্ত প্রায় এই প্রাণী রক্ষায় বাঘ আছে, এমন দেশগুলোয় পালিত হয় দিবসটি। ওটঈঘ এর রেড ডেটা অনুযায়ী বাঘ বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই আমাদের সুন্দরবনের বাঘের বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ভাবা প্রয়োজন। অরণ্য শুধু বাঘের জন্যই নয়, বরং মানুষের জন্যও। নিজেদের নির্মল শ্বাস নেবার জন্যই, যেটুকু বন আছে তার অরণ্য ধ্বংস না করে রক্ষা করা প্রয়োজন।


সুন্দরবনের তিনদিকেই বসতি। শুধু দক্ষিণ দিকে সমুদ্র। বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন, আমাদের সুন্দর বন। আমাদের সুন্দর দৃষ্টিই এই বন আর বন্য প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক। আগেই বলেছি, “বাঘ” আমি রূপক অর্থে ব্যবহার করেছি। মূলত জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়েই আমার আশংকা। বাঘের চেয়েও বন আমাদের বেশি প্রয়োজন। সুন্দরবন আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ মানুষের রুজি রোজগারের ক্ষেত্রেও এতভাবে সেবা দেয় যা বর্ণনাতীত। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মাছ রপ্তানি হয় এই সুন্দরবন থেকে। এটা স্বীকার্য যে, আমরা ইচ্ছে করলেই আরেকটি সুন্দরবন বানাতে পারবোনা। সঙ্গত কারণেই এসে যায়, “রামপাল কয়লা তাপ বিদ্যুৎ নির্মাণ কেন্দ্রের কথা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এ কারণেই সবার প্রশ্ন “ রামপালে কয়লাÑ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র আশীর্বাদ না সর্বনাশ?”  
এ ব্যাপারটি নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি ও আলোচনা ইতিমধ্যেই হয়েছে। বিষয়টি কম বেশি সবারই জানা আছে। তবুও সংক্ষেপে এটুকু বলা যায় যে, গত ১০ সালে ভারত সফরের সময় যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেখানে দুই দেশ মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনের একটি প্রস্তাব ছিল। এই প্রস্তাবই মূলত আজকের রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি ভারতের “ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের (ঘঞচঈ) সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বোর্ডের (চউই) চুক্তি। এটি বাস্তবায়নের নিমিত্তে ১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ জারি ও অবকাঠামোর নকশার রূপরেখা চুড়ান্ত করা হয়। আমরা এও জানি, ভারতের ঘঞচঈ কোম্পানি তাদের দেশে ছত্তিসগড়ে একই রকম বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিলে সেই দেশের পরিবেশ মন্ত্রলায়ের গ্রিন প্যানেলের (ঊওঅ) রিপোর্ট, প্রকল্পটিকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে প্রতিবেদন দেয়, অতঃপর ভারত সরকার সেই প্রকল্প বাতিল করে। অথচ একই প্রকল্পকে বাংলাদেশ ইনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ঊওঅ) পরিবেশ বান্ধব বলে রিপোর্ট দিয়েছে। এরকম আজব রিপোর্টে আমাদের দেশের অভিজ্ঞ সুশীলরা ও আমজনতা সবাই অবাক, এবং এর প্রতিবাদেও তারা নানারকম কর্মসূচি পালন করে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন।


ভারতে ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিঃমিঃ ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ বা হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীব বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবেনা।


অথচ এওঝ সফটওয়্যার দিয়ে মেপে দেখা গিয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের এই দূরত্ব সর্বনি¤œ ৯ কিঃ মিঃ হতে সর্বোচ্চ ১৩ কিঃ মিঃ। যা বন্যপ্রাণী, অরণ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল এবং জনগণ মনে করছেন। আমরা জানি, আরেকটি সুন্দরবন তৈরি করা সম্ভব নয়। সুতরাং যেটি আছে আশীর্বাদ স্বরূপ সেটির সাথে সখ্যতা রেখে তার যতœ নেয়াই শ্রেয়। প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিৎ। অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেছেন, “রামপালে এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র না হলে ১০টা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যায়।

সুন্দরবন ধ্বংস হলে আরেকটা সুন্দরবন তৈরি করা সম্ভব নয়”। স্বনামধন্য মানবাধিকার কর্মি সুলতানা কামাল, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাইদ, শফিক উজ্জামান সহ বহু বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এই প্রকল্প পরিদর্শন করেন এবং সবাই এটিকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে মানুষের আগ্রাসনে। নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই আগ্রাসনে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে এবং সুন্দরবন ও পরিবেশের জন্য হুমকির কারণ বলে চিহ্নিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আমি শুরু করেছিলাম মাঘ আর বাঘ বিলুপ্তির কথা নিয়ে। আসলেই এটা স্বীকার্য যে, আমরা সাবধানে না চললে প্রকৃতির সম্পদ যথেচ্ছা এলোমেলো ব্যবহার বা নষ্ট করলে প্রকৃতি ভারসাম্য হারাবে। এবং তার ফলাফল খুব ভালো হবেনা মানুষের জন্য, তারই প্রমাণ আজকের ঋতু সংকট! ষড়ঋতু আজ নিজস্বতা হারানোর অভিমানে তার রং বদলাচ্ছে দিনে দিনে। শুরু করেছিলাম রাশান কৃষকের গল্প দিয়ে। আমরা চরমভাবাপন্ন জলবায়ুর চক্রে পড়ে, ওই ভাগ্যাহত রাশান চাষীদের মত, বরফ পড়া কঠিন শীতে আলুপোড়া খেতে চাইনা।
আমরা চাই,
শীতে শীত থাকুক আর বরষায়/স্বাভাবিক বৃষ্টি,
চাই কোমল ষড়ঋতু, চাইনা দুর্যোগ/আর অনাসৃষ্টি।
লেখক ঃ শিক্ষক, কবি ও কলামিস্ট
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭

বাংলাদেশের পরমাণু শক্তির এক স্বপ্নদ্রষ্টা ড. ওয়াজেদ মিয়া

মেধাবী সন্তানরা দেশের সম্পদ। একটি দেশ এগিয়ে যাওয়ার মূলশক্তিই হচ্ছেন এই মেধাবীরা। এদেশের এমনই একজন মেধাবী বিজ্ঞানীর নাম ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তিনি আমাদের গর্বের পরমাণুুবিজ্ঞানী। বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তার বিজ্ঞান সাধনার উৎকর্ষতার জন্য তিনি যুগের পর যুগ বাংলাদেশের ইতিহাসে নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন।


ক্ষণজন্মা এই মহান মানুষটির জন্মদিন আজ। ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জের নিভৃত গ্রাম ফতেপুরে তাঁর জন্ম। ডাক নাম সুধা মিয়া। যাঁর অপরিসীম জ্ঞান ও আন্তরিকতায় আলোকিত হয়েছে আমাদের দেশ। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর বিজ্ঞানচর্চার পরিধি কতটা সুউচ্চ ছিল তা আমাদের অনেকেরই অজানা। ১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাঁকে এসোসিয়েটশিপ প্রদান করে।

 এই সুবাদে তিনি ১৯৬৯-’৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ৬ মাস ধরে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টোরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের ‘আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে’ আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন।

 ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল প্রশ্নাতীত। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে তিনি পরপর দুবার বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি পরপর তিনবার ওই বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি বাংলাদেশ পদার্থ বিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৯৭ এবং ১৯৮৯ সালে দুবছর মেয়াদের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। আর এসব পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন শুধুমাত্র তার যোগ্যতার নিরিখেই।


১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর দুবার বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পরপর দুবার দুবছর মেয়াদকালের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১-১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘেরও সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার তিনি ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতি’র সভাপতি নির্বাচিত হন।


আজ বাস্তবায়নের পথে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। বলা যায়, এটা অনেক বড় এক স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের এই পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূরণ হবে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। সফল হবে বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার আমরণ প্রচেষ্টা এবং সুফল ভোগ করবে সারা দেশের মানুষ।’ যথার্থই বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ড. ওয়াজেদ মিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে যাঁরা চিনতেন, কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা একবাক্যেই বলেছেন, তাঁর মতো সৎ, নির্লোভ মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। যেখানে একজনের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে দুর্নীতি আর দুঃশাসনের উন্মত্ততায় মেতে ওঠে তাঁর চারপাশের লোকেরা, সেই প্রেক্ষাপটে তাঁকে মূল্যায়ন করার মতো কোন মাপকাঠি আমাদের জানা নেই।


ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আদর্শের জন্য প্রতিনিয়ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সহকর্মীদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন সৎ ও ন্যায়-নিষ্ঠাবান হওয়ার জন্য। তিনি নিজে ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও কোন সুযোগ-সুবিধা নেননি। কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। সর্বদা নিজস্ব বলয়ে থেকে নিজের যোগ্যতায় নিজ কর্মক্ষেত্রের পরিধিতে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে কর্মজীবন শেষ করেছেন। তিনি শুধু একজন মেধাবী ছাত্র বা পরমাণুবিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিভৃতচারী, নীতিবান, নিরহংকার, নির্ভীক, স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক, আদর্শবান, সৎ, সহজ-সরল, বিনয়ী, চরিত্রবান, যুক্তিবাদী, অজাতশত্রু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন আদর্শ মানুষ। এত গুণে গুণান্বিত মানুষ ক’জন আছেন এই ভূবনে।


রংপুরের পিছিয়ে পড়া এক গ্রাম থেকে উঠে এসেছিলেন তিনি। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কেবল শিক্ষার মাধ্যমে। পীরগঞ্জের ফতেপুরের সাদাসিধে ছেলেটিই বড় হয়ে দেশের অন্যতম একজন আনবিক বিজ্ঞানী হিসেবে নাম কুড়ালো। আরো অবাক করা ব্যাপার সে বড় হয়ে হলো জাতির জনকের জামাতা। সবই হলো তার লেখাপড়ার গুণে, মেধার গুণে। সহজ, সরল, মেধাবী, সদা সত্যভাষী এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় অনন্য এই মানুষটিকে কন্যা শেখ হাসিনার স্বামী হিসাবে পছন্দ করেন বঙ্গবন্ধু। ওয়াজেদ মিয়া-শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আইটির উন্নয়নে এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই স্বপরিচয়ে খ্যাত।


ড. ওয়াজেদ মিয়া সাতটি পাঠ্যবই লিখেছিলেন, এরমধ্যে ছয়টিই ইতোমধ্যে প্রকাশিত। মৃত্যুর আগে সপ্তম বইটির সম্পাদনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে ক্ষমতার ভিতর থেকেও কখনও ক্ষমতার অপব্যবহারের সামান্যতম সুযোগ নেননি। যা তাঁর জন্য খুব সহজ ছিলো। তিনি আপন অবস্থানে থেকেই কাজ করে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা, দেশের বিজ্ঞানীদের পেশাগত কাজের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা। দেশের বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ড. ওয়াজেদ মিয়া মনে করতেন, সমাজে বিজ্ঞানীদের যথাযথ অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানীদের আগে নিজেদের কাজ করে যেতে হবে তারপরই কেবল জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যেতে পারে।


ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া পান্ডিত্য ও প্রতিভার দ্বারা নিজস্ব একটি পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এজন্যই অন্য পরিচয়গুলো তাঁর জন্য অলংকার। যেসব কথা তিনি প্রচার করতে চাননি, তার প্রয়োজনও বোধ করেননি। মৃত্যুর আগে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে দেশবাসি যতটা জানতেন, মৃত্যুর পর জেনেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি।
লেখক : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব

সময়ই তা বলে দেবে

ভাষার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে আমার কোন মন্তব্য নাই। কারণ ব্যাকরণিক অজ্ঞতা। তাছাড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যে জ্ঞানের প্রয়োজন তার এক ফোঁটাও আমার মাঝে নাই। তাই বলে একুশে ফেব্রুয়ারিতে লিখবো না, তা হয় না। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের আবেগ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম এবং আত্মসম্মান বোধটাই বেশি ভূমিকা রেখেছিল। কলমের কালি ভাষা আন্দোলনকে স্বার্থক করতে পারেনি। স্বার্থক করেছিল সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বারের রক্ত। কোন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নিয়ে তারা রক্ত দেননি।

দিয়েছিলেন বাংলার মানুষের কথা ভেবে। বাঙালি যে আলাদা জাত তা তারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ধর্মের দোহাইকে আমরা সেদিন উপেক্ষা করেছি। যা করতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। তারা এখনও ধর্মের নামে ইন্ডিয়ার সাথে যুক্ত রয়েছে। অথচ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকের জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। যারা বাংলা ভাষার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অনেক জানেন এবং বোঝেন। কিন্তু সাতন্ত্র্যবোধ তাদের মধ্যে সম্ভবত কাজ করে না। অথবা তাদের বাংলা প্রেম নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে বিদ্যামান। পৃথিবীতে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন যাদের প্রকাশ ভঙ্গি নাই। যার কারণে তারা অধরা রয়ে গেছে। মানুষের কল্পনা চুরি করেছেন কবিরা। আর প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করেছেন বিজ্ঞানীরা।

একে অপরের পরিপূরক। কবিদের নয় বাংলার সমস্ত মানুষের আশা আকাক্সক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন ভাষা সৈনিকরা। কবি হয়তো তা তার লেখনীতে ধারণ করেছিলেন। সাহিত্যের বিষয়গুলি সবসময় সমসাময়িক বিষয়কে কেন্দ্র করে এগুতে থাকে। বাংলা সাহিত্যকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ। প্রাচীন যুগের লেখনীর সাথে মধ্য যুগের পার্থক্য এবং মধ্য যুগ থেকে আধুনিক যুগে সাহিত্যের বিস্তর ফারাক করেছে। অত দূরে যাওয়ার দরকার নাই। রবীন্দ্রযুগ এবং বর্তমান সময় চিন্তা করলেই পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়। আগের মত আর কবিতা চলে না। চললেও কবিতায় ছন্দ নেই। ছন্দ নেই বললে ভুল হবে। শাব্দিক ছন্দ নেই। যা রবীন্দ্রযুগে কল্পনা করা যেত না। সাহিত্যের প্রকাশই ছিল কাব্য।

গদ্যের প্রচলন খুবই কম ছিল। আর এখন সাহিত্যের প্রকাশ প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, যা গদ্য রীতিতে প্রকাশিত। এখনতো বইয়ের চেয়ে টেলিভিশন নির্ভর হয়ে পড়েছি আমরা। পাঠ্যবই ব্যতীত সব কিছু খোঁজে ইন্টারনেট অথবা টিভিতে। সংবাদপত্রও এখন মোবাইলের মধ্যে উঠে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো রয়েছেই। বিদ্রোহ করে লাভ নাই। সময়ের চাহিদা তোমাকে আমাকে পূরণ করতেই হবে। নতুবা পিছন থেকে ধাক্কা। পড়ে যেতে হবে খন্দকে। সময় বড় কঠিন বস্তু। যার সাথে সঙ্গতি রেখে চলতে হয় সবাইকে। সময় কারো সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলে না।

 বরঞ্চ সবাইকে সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই চলতে হয়। সময় বাংলাকে তুলে দিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। পরাধীন করে রেখেছিল ১৯০ বছর। আবার পাকিস্তানের কাছে পরাজিত করে রেখেছিল ২৩ বছর। আজ আমরা স্বাধীন। ২২৩ বছর পূর্বে আমরা ছিলাম স্বাধীন। আর ২১৩ বছর পর আমরা হলাম স্বাধীন। হয়তো মাঝখানে দেয়াল পড়ে গেছে। জানিনা সময় আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? প্রকৃতির পরিবর্তনও এক্ষেত্রে হয়তো ভূমিকা রাখবে। বাংলা ভাষাভাষী হয়ে কেউ জন্ম নেয় না। পারিপার্শ্বিকতা তাকে বাংলা শেখায়। তেমনি কেউ পরাধীন হয়নি। সময় তাকে পরাধীন করেছে। আবার সময় তাকে স্বাধীন করেছে। সময়ই ৫২,৭১ এর জন্ম দিয়েছে। সময়ই ১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৪৭ সালের জন্ম দিয়েছিল। জানিনা একবিংশ শতাব্দিতে এমন কোন সাল আছে কিনা যা আমাদের আবার ১৭৫৭ তে নিয়ে যাবে। সময়ই তা বলে দেবে।
লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

একুশের চেতনা ও রূপকল্প ২০২১

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর প্রাঙ্গণে নাগরিক সংগঠন ‘প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম’ তাদের ৯ম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে ‘একুশের চেতনা ও রূপকল্প ২০২১’ শিরোনামে একটি মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেছিল। সেই আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও  মহান সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ব্যারিষ্টার আমীর-উল ইসলাম,  বিশেষ অতিথি হয়েছিলেন দেশের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান, রূপালী ব্যাংক ডঃ আহমেদ আল কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ স্বপন ঘোষ। এই অনুষ্ঠানের একজন অন্যতম সংগঠক হিসেবে আমিও একজন বক্তা ছিলাম।

 সেই আলোচনার কিছু কথা আমি দৈনিক করতোয়ার পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। বলে নেয়া ভাল প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম কোন রাজনৈতিক সংগঠন নয়, ২০০৫ সাল থেকে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু এবং আগামী ২০২১ সাল তথা মুক্তিযুদ্ধের সূবর্ণজয়ন্তীকে ঘিরে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে গণজাগরণ সৃষ্টি করাই সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।


এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার সংগ্রাম ছিল না। মূলতঃ বাঙালির  স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আকাঙ্খা মূর্ত হয়ে উঠেছিল ভাষার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানোর মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, বাংলা আমাদের ভাষা, আমরা বাঙালি এবং আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

 ভাষার জন্য লড়াইটা রাজনৈতিক হলেও এর ভিত্তি সংস্কৃতি চেতনায়। সেই চেতনাটা আমাদের বাঙালিত্বের। আমাদের নিজেদের ভবিষ্যত নিজেরাই গড়ে তুলব, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরাই নেব, আমরা বিশ্বের বুকে সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াব এই আকাঙ্খার বহিঃপ্রকাশ হলো আমাদের ভাষা সংগ্রাম। বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বুকের রক্তে আলপনা এঁকে আমাদের অগ্রজেরা সেদিন জানিয়ে দিয়েছিল, ‘আমরা হার মানব না’।


মহান একুশের পথ ধরেই একাত্তরে এসে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ‘ভাষা সংগ্রাম’ এবং ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ আমাদের একই চেতনার মূর্ত প্রকাশ। সংগ্রাম করে বাংলাকে সেদিন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও আমরা জানতাম যে, ষড়যন্ত্র চলছে। বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত আছে। সুতরাং সেই ষড়যন্ত্র রুখে দেবার কর্তব্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালে আমরা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করিনি। পাকিস্তানের লৌহমানব আইয়ূব খান-এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা আর ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান এর পথ বেয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

 ভোটে জিতেও ক্ষমতায় বসতে না দেয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনচেতা বীর বাঙালির আবার গর্জে ওঠা। সে সময়ের অবিসংবাদিত মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন নির্দেশ দিলেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো’, তখন এ জাতির মুক্তি পাগল সদস্যরা আত্মাহুতি দিতে, আত্মত্যাগ স্বীকারে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষেনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে লড়াই করেই এদেশের মানুষ স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিকে পরিণত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বুকের রক্তে রচিত হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। সেই সংবিধান ঘোষণা করলো প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এতদিনের শোষণের জিঞ্জির ভেঙে আমরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই রচনা করার অধিকার লাভ করলাম।

 আমরা মুক্তির স্বপ্ন দেখলাম। আমাদের সেই স্বপ্নের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের উৎকর্ষ সাধন। সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হলো, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকেÑকৃষক ও শ্রমিকের-এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।

” সংবিধানের ১৫ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে বলা হলো (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; (খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার নিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ছেচল্লিশ বছর পরেও আমাদের দেশ এখনও সম্পূর্ণ দারিদ্র্যমুক্ত হয়নি। দেশের মানুষের আয় বেড়েছে সত্য কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে চলার চ্যালেঞ্জটা এখনও বেশ কঠিন। দেশে উন্নয়ন বৈষম্য প্রকট।

 মুষ্টিমেয় এলাকা এবং ব্যক্তির হাতে উন্নয়নের অধিকাংশ সুফল কুক্ষিগত হয়ে আছে। সাধারণের অভিগম্যতা সেখানে দূরূহ। সরকারি হিসেবেই দেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে রয়েছে, প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় চার কোটির বেশি। দেশের বরিশাল বিভাগ এবং রংপুর বিভাগে এখনও বেশিরভাগ দরিদ্র মানুষের বাস। ঢাকার বস্তিগুলোতে বসবাসকারীদের বড় অংশই এই দুই অঞ্চল থেকে আসা। কর্মবান্ধব শিক্ষার অভাব ও কর্মসংস্থানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সুষম উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। একুশের চেতনাকে কেবল ‘সর্বস্তরে বাংলা’ চালু করার সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে দেখার সুযোগ নেই। একুশ মানে ‘কথা বলার স্বাধীনতা’।

 রাষ্ট্রের কোন নাগরিক যদি স্বাচ্ছন্দ্যে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারে তাহলে একুশের চেতনা ভূলুন্ঠিত হয় বলে আমি মনে করি। সর্বস্তরে মাতৃভাষায় যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। জাপান, চীন, জার্মান, রাশিয়াসহ পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই সকল ক্ষেত্রে মাতৃভাষা ব্যবহার করে। আমাদের করতে বাধা কোথায়? রাষ্ট্র এখানে গুরুত্ব কম দিচ্ছে, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে না বলেই আমরা মাতৃভাষার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছি। প্রতিদিন একটু একটু করে আমরা ‘পশ্চিমা’ হয়ে যাচ্ছি। বৃটিশ শাসনামলে আমরা যতখানি ইংরেজদের অনুকরণ করেছি এখন করছি ঢের বেশি। আমাদের মনোজগতে এখন ‘পশ্চিমের বাস’। বিশেষ করে আমাদের দ্রুত বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে পশ্চিমাকরণের প্রভাব খুব বেশি।

 আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে পঙ্গু করে ফেলে রাষ্ট্র তথাকথিত ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বিকাশকে সহায়তা করছে। বক্তৃতার সময় সকলেই বলছেন, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ সর্বোৎকৃষ্ট কিন্তু বাস্তবে নিজেরাই টাকা ঢালছেন অন্য খাতে। নিতান্ত নিরুপায় না হলে এখন কেউ আর তার সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে আগ্রহী নন। এর প্রভাব কত সুদূর প্রসারী এবং ভয়ানক তা ভেবে দেখেছেন!

  একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমরা বিনিয়োগ চাই। কোথায় হবে সে বিনিয়োগ? জাপান বিনিয়োগ করেছিল শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায়। চীনকেও আমরা দেখছি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে। ভারতেও শিক্ষা এগিয়েছে আমাদের তুলনায় বহুগুণ। আর শ্রীলঙ্কায় শিক্ষার মান আমাদের তুলনায় ঈর্ষণীয়। ফলে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে বেশি।

 বিদেশের কর্মবাজারে ভারত ও চীন একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। আর জাপান নিঃসন্দেহে এখনও উৎকর্ষতার অনন্য উদাহরণ। এখানে একটা কথা বলা দরকার জাপানে শিক্ষার বিকাশে, মানুষ গড়ে তুলতে তাদের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এনএইচকে বিশাল ভূমিকা রেখে চলেছে। জাপানের শিশুরা আমাদের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি টেলিভিশন দেখে। আর টেলিভিশন থেকে তারা নৈতিকতা, জীবনের জন্য অপরিহার্য নানা বিষয়ের শিক্ষা, এমনকি গণিত ও বিজ্ঞানের নানা জটিল বিষয়ে শিক্ষালাভ করে। এই টিভি অনুষ্ঠানগুলো তাদের মধ্যে চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করে, প্রণোদনা জোগায় এবং তারা নাগরিক গুণাবলী নিয়ে বেড়ে ওঠে। আমি দুঃখিত আমাদের দেশে টেলিভিশন হচ্ছে আমাদের ‘ঘরের শত্রু’।

 এটা সম্ভব কিনা জানি না তবে সম্ভবতঃ এখন আমাদের টেলিভিশন না দেখার আহ্বান জানানোর সময় উপস্থিত। আমাদের শ্রদ্ধেয় মানস সংগঠক অধ্যাপক ডঃ জাফর ইকবাল এর বাসায় নাকি টেলিভিশন নেই। আমিও চেষ্টা করছি টেলিভিশন না দেখার। আমি লক্ষ্য করেছি, আমাদের পরিবারের নারী সদস্যরা টেলিভিশনের কিছু সিরিয়াল শুধু দেখে না, তারা সেগুলো গেলে! আর আমাদের শিশুরা খাবারের সিদ্ধান্ত নেয় টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন দেখে। আমাদের টেলিভিশন থেকে তারা মানবিকতা শেখে না। তারা শেখে না কিভাবে অপরকে সম্মান জানিয়ে, কাউকে ধাক্কা না দিয়ে পথ চলতে হয়। তারা শেখে না যে, ভুল করলে ‘দুঃখিত’ বলতে হয় এবং বিনয়ের সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়।


লক্ষ্য করলে দেখবেন আমাদের সমাজে সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হচ্ছে না, এখন সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুন হচ্ছে, আবার মায়ের হাতে খুন হচ্ছে শিশু, স্বামী হত্যা করছে স্ত্রীকে, স্ত্রীও স্বামীকে খুন করতে দ্বিধা করছে না। নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে মানুষ। একটা ‘মাথা গরম’ অস্থির সমাজের দিকে আমরা ঝুঁকে পড়ছি। এই সমাজে আলোচনা নেই, সমঝোতা নেই, কর্তব্য জ্ঞান নেই, পারস্পরিক শ্রদ্ধা যেন বহুদূরের কোন বিষয়। অথচ এই বাংলাদেশটা এমন নয়। এখানে বাড়ির কাজের লোক বা গৃহভৃত্যকেও নাম ধরে ডাকার কোন রেওয়াজ ছিল না।

ভাই, মামা, চাচা ইত্যাদি কোন একটা সম্বন্ধ জুড়ে দিয়ে কাউকে সম্বোধন করতে হতো। আমরা সেখান থেকে সরে যাচ্ছি। পশ্চিমে যেমন ছাত্ররা শিক্ষকের নাম ধরে ডাকে, ক্লাসের ভেতরে স্যারের সামনেই অশোভন ভঙ্গিতে বসে, আমরাও সেরকম শিক্ষায় শিক্ষিত (?) হয়ে উঠছি। এটা আমার সংস্কৃতি নয়। আমার একুশের চেতনার সাথে এই সংস্কৃতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

 ‘একুশের চেতনা’ ও ‘রূপকল্প ২০২১’ পরস্পরের পরিপূরক। রূপকল্প ২০২১ এর মূল লক্ষ্য একটি দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। অর্থনৈতিক দারিদ্র্য দূর করার সাথে সাথে মনের দারিদ্র্য দূর করার জন্য আমরা একুশের চেতনার আশ্রয় নিতে পারি। এর জন্য সরকার ঘোষিত ‘রূপকল্প ২০২১’ কে জনগণের প্রাণের দলিলে পরিণত করতে হবে।

একুশের চেতনার আলোকে ‘রূপকল্প ২০২১’ অর্জনে ইউনিয়নভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কর্মসূচি নিতে হবে। কারণ বর্তমানে যারা ইউনিয়ন পরিষদ এর চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের সম্মিলিত কার্যক্রমের ফলই হলো ২০২১ সালের বাংলাদেশ। আমরা মনে করি, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়াটা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে মহান ভাষা আন্দোলনের চেতনা, তথা ধর্ম নিরপেক্ষতা, বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তার বিকাশ, নারী-পুরুষের বৈষম্য অবসান, সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সম অধিকার, সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা রাষ্ট্রের আশাতীত ভূমিকা চাই।

বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ যা কিনা আমাদের একুশের চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও পৃষ্ঠপোষকতা চাই। আমাদের জীবনযাপনে বাঙালিত্বের চেতনার ধস নামছে বলে আমার আশঙ্কা। এটা অব্যাহত থাকলে আমরা একুশের চেতনাকে কেবল শহীদ দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলব। আমাদের জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খা ও কর্তব্যপরায়ণতার আলোকে পরিচালিত করতে পারব না। ফলে আমাদের ‘রূপকল্প ২০২১’ থাকলেও বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে না।
লেখক ঃ সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১৫২৬৯৭৯

বঙ্গবন্ধু, সাংবাদিকতা এবং প্রেস কাউন্সিল

 ,শামীমা চৌধুরী ভূমিকা:১৯৮৯-২০১৭ দীর্ঘ ছত্রিশবছর ধরে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল দেশের সংবাদপত্র শিল্পকে গতিশীল,জনবান্ধব,স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্য দিকে এই প্রতিষ্ঠান বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রবাহকে নিশ্চিত করছে একদিকে। সেই সাথে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছে।


১৮৪৭ খ্রীস্টাদ্বে জমিদার কালীচরণ রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রিটিশ সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশের রংপুর থেকে ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ পত্রিকার প্রকাশের মধ্য দিয়ে এ দেশে সংবাদপত্র প্রকাশের যাত্রা শুরু। এর তিন পর এই জেলা থেকেই প্রকাশিত ‘দিন প্রকাশ’ এবং কুষ্টিয়া থেকে কাঙাল হরিনাথ সম্পাদিত ‘গ্রামবাংলা প্রকাশিকা’ সাংবাদপত্র শিল্পকে পাঠকের দ্বোর গোড়ায় নিয়ে আসে। যা আজও স্বমহিমা, স্বমর্যাদা, স¦র্কীয়তা, স্বাধীনতা আর জবাব দিহিতা  নিয়ে টিকে আছে।
সংবাদপত্র পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রবর্তিত আচরণবিধি,হাউজের নিজস্ব নীতিমালা এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান প্রবর্তিত নীতিমালা ভিত্তিতে পরিচালিত হয় সংবাদপত্র।

প্রথমদিন থেকে সংবাদপত্রের ওপর মানুষের তথ্য প্রাপ্তির যে নির্ভরতা তা আজও পরিবর্তন হয়নি। এখন গণমাধ্যম অনেক বিস্তৃত। সংবাদপত্র ছাড়াও বিভিন্ন বার্তা সংস্থা,বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, সরকারি বেসরকারি রেডিও,অনলাইন পত্রিকা, অনলাইন বার্তা সংস্থা,অনলাইন রেডিও, অনলাইন টেলিভিশন, কমিউনিটি রেডিও-সব মিলিয়ে গণমাধ্যমের জগৎ অনেক প্রসারিত। গণমাধ্যমের যতগুলো শাখা আছে এর মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ক্ষমতায়ন ও সুশাসন বিষয়ে মানুষের প্রত্যাশা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলেছে সংবাদপত্র।


গত শতাব্দীর ’৯০ দশক থেকে গণতন্ত্রের যে ঢেউ বিশ্বব্যাপী আছড়ে পরে তাতে অনিবার্যভাবে সংবাদপত্রের ভূমিকা হয়ে উঠে আরও বহুমুখী। তাই বলা হয় সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। প্রতিমূহুর্তে ঘটে যাওয়া তথ্য বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ক্ষমতা রয়েছে সংবাদপত্রের। এই মাধ্যমটি সরকারকে জনগনের চাহিদা প্রত্যাশা,সাফল্য ও ব্যবস্থা  সম্পর্কে তথ্য দেয়, অন্যদিকে জাতীয় উন্নয়ন নিয়ে সরকারের নীতি, কার্যক্রম ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জনগনকে অবহিত করে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে প্রতিদিনের সংবাদপত্র দিনের প্রথম ভাগেই পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত এলাকায়-পাঠকের হাতে। রাতে বিভিন্ন চ্যানেলের সুবাদে অনেক তথ্য জানা থাকলেও সংবাদপত্রের পাতায় তা দেখতে চায় পাঠক বিস্তারিত ভাবে। কারণ  ঐতিহ্যগতভাবে এখনও সংবাদপত্রকেই তাঁর তথ্য প্রাপ্তির উৎস মনে করে। তাছাড়া এখানে আছে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ। এখন দেশের শুধুমাত্র বড় বড় শহর গুলোতে নয় জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক গেটআপে মেক আপে সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে।
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু:


১৯৭২ সালে স্বাধীনতা লাভের পর,পরই সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশাসন, আইন, বিচার ব্যবস্থা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সহ এই পেশার সাথে সংশ্লিষ্টদের জীবনের মানোন্নয়নে প্রতি বিশেষভাবে নজর দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। ১৯৭১ সালের অনেক আগেই স্বাধীন বাংলাকে সহ¯্রাব্দের উন্নয়নের শিখড়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। তাই স্বাধীনতা লাভের পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সংবাদপত্র শিল্প এবং সাংবাদিকতা পেশাকে নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিতামূলক করার লক্ষ্যে তাঁরই নির্দেশে ও উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট প্রণীত হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২৫ আগষ্ট স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক চক্রের হাতে তিনি স্বপরিবারে নিহত হন। তিনি তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের আজকের যে সাফল্য তা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নেরই বাস্তব রুপরেখা।


বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন একজন মানুষ- যাঁর শারীরিক ও মানসিক গঠনে বাংলার সুবজ শ্যামল প্রকৃতি, খেটে খাওয়া মানুষ, দরিদ্র নিঃস্ব মানুষের প্রভাব ছিল প্রবল। প্রত্যন্ত জনপদে টুঙ্গিপাড়ার জন্ম নেয়া খোকা এদের প্রভাবেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলার ও বিশ্বের অন্যতম অবিসংবদিক নেতা। তাঁর স্মৃতি শক্তি ছিলো প্রখর। তিনি তাঁর জন্মভূমির টুঙ্গিপাড়ায় মানুষদের, নেতাকর্মীদের চিনতেন। তাঁদের নাম- ভালোমন্দ সব বিষয়ই তাঁর স্মরণে থাকতো। রাজনীতির বাইরে কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, খেলোয়ার শিল্পী, আমলা, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মত। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সাথে। টুঙ্গিপাড়ার খোকা একটি জাতির মুক্তিদাতা, ও স্বাধীনতা স্থপতি হয়ে উঠেছিলেন তাঁর পেছনে ছিল সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অবদান। যা তিনি সব সময় উপলব্ধি করতেন। আর তিনি নিজেও কিছুদিন এ পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। তাই সংবাদপত্র  ও সাংবাদিকদের উন্নয়নে তিনি আমুত্যু কাজ করে গেছেন। এই পেশার দায়িত্ব কী, কী ভাবে এই পেশার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়-এই বিষয়গুলো তিনি  বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে- বক্তব্যে তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই  ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভায় বঙ্গবন্ধু প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। এ দিন তিনি তাঁর ভাষণে সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন-


‘মাননীয় সভাপতি, সুধীবৃন্দ ও সাংবাদিক ভাইয়েরা, আপনারা জানেন, আমি আপনাদের অনেক সহকর্মী শুধু সাংবাদিক ছিলেন না, তাঁরা আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। আমি অনেকদিন তাঁদের সঙ্গে জেলখানায় কাটিয়েছি। এবারের সংগ্রামে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা আজ আমাদের মধ্যে নাই। তেমনি নাই ৩০ লক্ষ লোক, যাঁরা আত্মাহুতি দিয়েছেন স্বাধীনতার জন্য। তাঁদের কথা চিরদিন আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে এবং যে আদর্শের জন্য তাঁরা জীবন দিয়েছেন, সে আদর্শে যদি বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, তাহলে তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে।’


সাংবাদিক ভাইদের কাছে আমার কয়েকটা স্পষ্ট আরজ আছে। আপনারা জানেন, বিপ্লবের মাধ্যমে এই স্বাধীনতা এসেছে এবং সে বিপ্লব ছিল রক্তক্ষয়ী। এমন বিপ্লবের পরে কোন দেশ কোন যুগে এতটা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে নাই, যা আমরা করছি। আমরা ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। এজন্য আপনাদের কোন কাজ কখনো কোনরকম হস্তক্ষেপ করি নাই।


সাংবাদিকতার  আদর্শ সম্পর্কে তিনি সেদিন বলেছিলেন
‘আপনারা খবরের কাগজের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি এবং এইসব আদর্শের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, এটাও আপনারা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন। আমরা এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতেই দেশের শাসনতন্ত্র তৈরি করতে চাই। কিন্তু গণতন্ত্রেও একটা মূলনীতি আছে। গণতন্ত্রের অর্থ পরের ধন চুরি, খুন-জখম, লুটতরাজ বা  পরের অধিকার হরণ করা হয়। তার জনকল্যাণমূলক একটা নীতিমালা আছে। সাংবাদিকতারও এমনই একটা মূলনীতি আছে।’


সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন
আপনারা দাবি করেছিলেন, আপনাদের পূর্ণ স্বাধীনতায় যেন কোনদিন হস্তক্ষেপ না করি। কিন্তু আপনাদেরও দায়িত্ব আছে। আপনাদের সাংবাদিক ইউনিয়নের যে আদর্শ আছে, সেগুলো মানলে কি মিথ্যা কথা লেখা যায়? রাতারাতি একটা কাগজ বের করে, বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে কেউ যদি বাংলার বুকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে, তাহলে আপনারা নিশ্চয়ই সেটা সহ্য করবেন না। কারণ, তা আমাদের স্বাধীনতা নষ্ট করবে। ‘ওভারসিজ পাকিস্তান’ নামে কোন সংস্থা যদি এখন থেকে খবরের কাগজ প্রকাশ করে, তাহলে আমাকে কী করতে হবে? আপনারা সামান্য কিছু লোকের স্বার্থ, যে ৩০ লক্ষ লোক রক্ত দিয়েছে, তাঁদের স্বার্থ দেখবেন? বিপ্লবের পরে এ দেশের সংবাদপত্র যে স্বাধীনতা পেয়েছে, তা এদেশে আর কখনো ছিল না। এই জন্যই রাতারাতি খবরের কাগজ বের করেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ ছাপানো হয়, ‘এক লক্ষ বামপন্থী হত্যা’, ‘বিমানবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ’ ইত্যাদি। কিন্তু এসব কি লেখা উচিত? এসব কার স্বার্থে ছাপানো হয়?


সংবাদপত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা তিনি বলেছিলেন
‘আপনারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন। আমিও বলি। কিন্তু কোন কোন খবরের কাগজে এমন কথাও লেখা হয়, যা  চরম সাম্প্রদায়িক। অথচ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে চব্বিশটি বছর প্রগতিশীল সাংবাদিকগণ সংগ্রাম করেছেন। আমরা সংগ্রাম করেছি, বাংলার মানুষ সংগ্রাম করেছে। আমাদের ছেলেরা, কর্মীরা জান দিয়েছে, জেল খেটেছে। সে নীতির বিরুদ্ধে যদি কোন সাংবাদিক লেখেন, তাহলে আপনারা কী করবেন? এটাও আপনাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। (সূত্র: নিরীক্ষা, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট,জুলাই আগষ্ট, ২০১৩, পৃষ্ঠা নং- ৭-৯, ১৮-১৯)
মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ইত্তেফাক এবং সংবাদ পত্রিকার পূণর্বাসনে তিনি এগিয়ে দিয়েছিলেন সহয়োগিতার হাত। যে সাংবাদিকরা বেকার ছিলেন তিনি তাঁদের সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।


বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিক জীবন:
বঙ্গবন্ধু নিজেও কিছুদিন সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধি। তবে তিনি নিজেই যে সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক ছিলেন, সে কথা কখনও কোন ভাষণে তিনি উল্ল্খে করেননি। এ তথ্যটি জানা যায় ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ থেকে। সেখানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর সাংবাদিক-জীবনের নানা কথা। কলকাতা থেকে চল্লিশের দশকে দৈনিক আজাদ-এর পর মুসলমানদের উদ্যোগে দৈনিক ইত্তেহাদ নামে আরও একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ইত্তেহাদ কেন প্রকাশিত হয়েছিল এবং এর প্রকাশনার পেছনে কারা ছিলেন সে প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,
… হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের সভাপতি হতে চাইলেন। কারণ, মওলানা আকরম খাঁ সাহেব পদত্যাগ করেছিলেন। শহীদ সাহেব রাজি হন নাই। মওলানা সাহেবকে অনুরোধ করে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করিয়েছিলেন। হাশিম সাহেব রাগ করে লীগ সেক্রেটারী পদ থেকে ছুটি নিয়ে বর্ধমানে চলে গিয়েছিলেন। যখন তিনি কলকাতা আসতেন মিল্লাত প্রেসেই থাকতেন। হাশিম সাহেব এই সময় ছাত্র ও যুবকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমাদের অনেকেরই মোহ তাঁর উপর থেকে ছুটে গিয়েছিল।


সে অনেক কথা। তিনি কলকাতা আসলেই শহীদ সাহেবের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতেন। এর প্রধান কারণ ছিল মিল্লাত কাগজকে দৈনিক করতে সাহায্য না করে তিনি ইত্তেহাদ কাগজ বের করেছিলেননবাবজাদা হাসান আলী সাহেবের ব্যবস্থাপনা এবং আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের সম্পাদনায়। মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের দৈনিক আজাদও ক্ষেপে গিয়েছিল শহীদ সাহেবের উপর। কারণ, পূর্বে একমাত্র আজাদ ছিল মুসলমানদের দৈনিক। এখন আর একটা কাগজ বের হওয়াতে মওলানা সাহেব যতটা নন,তাঁর দলবল  বেশি রাগ করেছিল। [শেখ  মুজিবর রহমান: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, ২০১১, পৃষ্ঠা ৭২]।


বঙ্গবন্ধুর এই লেখা থেকে পরিষ্কার  বোঝা যায়, দৈনিক ইত্তেহাদ বের হওয়ার পেছনে তৎকালীন বাংলার মুসলিম লীগের মধ্যেকার দ্বন্ধ কাজ করছিল। শহীদ সোহরাওয়ার্দী একদিকে যেমন মওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত দৈনিক আজাদের প্রভাব থেকে বেড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন, তেমনি আবুল হাশিমদের মিল্লাত পত্রিকার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে চেয়েছিলেন। ফলে তাঁর অনুসারী আবুল মনসুর আহমদকে সম্পাদক করে নতুন কাগজ প্রকাশিক হল দৈনিক ইত্তেহাদ।[শেখ  মুজিবর রহমান: অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, ২০১১, পৃষ্ঠা ৭২]।
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,
মানিক ভাই তখন কলকাতায় ইত্তেহাদ কাগজের সেক্রেটারি ছিলেন। আমাদের টাকা পয়সার খুবই প্রয়োজন। কে দিবে? বাড়ি থেকে নিজেদের লেখাপড়ার খরচটা কোনোমতে আনতে পারি, কিন্তু রাজনীতি করার টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? আমার একটু সচ্ছল অবস্থা ছিল, কারণ আমি ইত্তেহাদ কাগজের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলাম। মাসে প্রায় তিনশত টাকা পেতাম। আমার কাজ ছিল এজেন্সি গুলোর কাছ থেকে টাকা পয়সা আদায় করা, আর ইত্তেহাদ কাগজ যাতে চলে এবং নতুন এজেন্ট বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ করা যায় সেটা দেখা। বেশি দিন ছিলাম না। তবু অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কারণ কাগজে নাম আছে, টাকা বাড়ি থেকেও কিছু পাওয়া যাবে। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৮]


বঙ্গবন্ধুর এই লেখা থেকেই বোঝা যায় দৈনিক ইত্তেহাদ-এর তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ (পূর্ব বাংলার) প্রতিনিধি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর বেতন ছিল মাসিক তিনশত টাকা। এত টাকা বেতন  তখন কোন সচিবও পেতেন না।


১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পড়লে কলকাতা থেকে বঙ্গবন্ধু এবং অন্যান্যরা ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় আসার পর বঙ্গবন্ধু  রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পরেছিলেন। তবে তার প্রভাব যে তখনো দৈনিক ইত্তেহাদ-এ ছিল তার কিছু  তথ্য পাওয়া যায় আত্মজীবনীতে। যেমন, ‘আমি ঢাকায় এলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, আইন পড়ব। বই পুস্তক কিছু কিনলাম। ঢাকায় এসে শুনলাত গণতান্ত্রিক যুবলীগের এক সভা হয়ে গেছে। কার্যকরী কমিটির নতুন সভ্য কো-অপ্ট করা হয়েছে। পূর্বে ছিলাম সতেরজন এখন হয়েছে চৌত্রিশজন। কারণ, আমাদের সংখ্যালঘু করার ষড়যন্ত্র। আমাদের অনেকে নোটিশও পায় নাই। অন্য কোন কাগজ না ছাপলেও কলকাতায় ইত্তেহাদ কাগজ আমাদের সংবাদ ছাপাত ইত্তেহাদেও নোটিশ ছাপানো হয় নাই। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৭]
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের  প্রতিষ্ঠা ও কর্ম প্রয়াস:
সাংবাদপত্র শিল্পের ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল,জনবান্ধব করা, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার প্রসার ঘটানো, দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থাকা এবং হলুদ সাংবদিকতা রোধের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৪ সালের এ্যাক্টের আলোকে(প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ১১ (বি) ধারা,  ২০০২ সালে যা সংশোধিত।) একটি আধা বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা হয় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের।


১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ প্রেস  কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়। গত ছত্রিশ বছর ধরে বাংলাদেশ প্রেস  কাউন্সিল সংবাদপত্র শিল্পের গাইড হিসেবে কাজ করে চলেছে। দেশে সংবাদপত্র শিল্পের অবস্থাকে গতিশীল ও উন্নয়নের হাতিয়ার করতে বাংলাদেশ প্রেস  কাউন্সিল যে আচরণবিধি প্রণয়ন করে এর উল্লেকযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে,
১. দেশের কোন সংবাদপত্র ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী কোন তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকবে। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সমুন্নত রাখবে।
২. সংবাদপত্রে যা প্রকাশিত হবে তা সবই হবে জনস্বার্থে। জনগণকে আকর্ষণ করে অথবা তাদের উপর প্রভাব ফেলে এমন বিষয়কে সংবাদপত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩. সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য হতে হবে নির্ভুল ও সত্য।


৪. গুজব ও অসমর্থিত প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বে সেগুলোকে চিহ্নিত করা এবং যদি এসব প্রকাশ করা অনুচিত বিবেচিত হয় তবে সেগুলো প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. সংবাদপত্র ও সাংবাদিক বিতর্কিত বিষয়ে নিজস্ব মতামত জোরালোভাবে ব্যক্ত করার অধিকার রাখেন।
৬. কুৎসা মূলক বা জনস্বার্থ পরিপন্থি না হলে বাহ্যত ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থবিরোধী হলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষরিত যে কোন বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রে প্রকাশের অধিকার সম্পাদকের আছে। কিন্তু এই ধরনের  বিজ্ঞাপনের প্রতিবাদ করা হলে সম্পাদককে তা বিনা খরচে মুদ্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. ব্যক্তি অথবা সম্প্রদায়বিশেষ সম্পর্কে তাদের বর্ণ, গোত্র, জাতীয়তা, ধর্ম অথবা দেশগত বিষয় নিয়ে অবজ্ঞা বা মর্যাদা হানিকর বিষয় প্রকাশ না করা। জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িকতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে।


৮. অন্যান্য গণমাধ্যমের তুলনায় সংবাদপত্রের প্রভাবের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি; এ কারণে যে সাংবাদিক সংবাদপত্রের জন্য লিখবেন তিনি সুত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংবাদের সত্যতা সম্পর্কে বিশেষভাবে সাবধান থাকা এবং ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সুত্র সমূহ সংরক্ষণ করতে হবে।
৯. কোন অপরাধের ঘটনা বিচারাধীন থাকাকালীন সব পর্যায়ে তার খবর ছাপানো এবং মামলা বিষয়ক প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের জন্য আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করা সংবাদপত্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে বিচারাধীন মামলার রায় প্রভাবিত হতে পারে, এমন কোন মন্তব্য বা মতামত প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত ঘোষণার আগ পর্যন্ত সাংবাদিককে বিরত থাকতে হবে।


১০. সম্পাদকীয়ের কোন ভুল তথ্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যদি প্রতিবাদ করে, তবে সম্পাদকের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে একই পাতায় ভুল সংশোধন করে দু:খ প্রকাশ করতে হবে।
১১. বিদ্বেষপূর্ণ কোন খবর প্রকাশ করা যাবে না।
১২. সম্পাদক কর্তৃক সংবাদপত্রের সকল প্রকাশনার পরিপূর্ণ দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে।
১৩., সম্পাদক কর্তৃক সংবাদপত্রের সকল প্রকাশনার পরিপূর্ণ দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে।
১৪. কোন দুর্নীতি বা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বা অন্য কোন অভিযোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রতিবেদকের উচিত ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সাধ্যমতো নিশ্চিত হওয়া এবং প্রতিবেদককে অবশ্যই খবরের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার মতো যথেষ্ট তথ্য যোগাড় করতে হবে।( সূত্র: বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল)


উল্লেখ্য, প্রত্যেকটি সংবাদপত্রেরই নিজস্ব নীতিমালা ও আদর্শ রয়েছে। প্রেস কাউন্সিল প্রবর্তিত আচরণবিধি এর বিরোধী কিছু নয়। আর এ কারণেই দেশের সংবাদপত্র শিল্প গণমাধ্যমের শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এই নীতিমালাগুলো সুনির্দিষ্ট করলে যা দাঁড়ায় তা হল-শালীনতাবোধ/বস্তুনিষ্ঠতা/সার্বিক ভারসাম্য রক্ষা,/ আক্রমণাত্মক মনোভাব বর্জন/ প্রলোভন ও তথ্যকে হত্যা না করা/ প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও প্রকাশ/ হলুদ সাংবাদিকতা বর্জন/ অশুভ চাপ থেকে মুক্ত থাকা/ নিজস্ব মতামত বর্জন/ভ্রান্তি স্বীকার ও সংশোধনী প্রকাশ/ সংবাদ মাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালা মেনে চলা/ব্যাপক জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা/ দূর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের কর্তব্যবোধ/পক্ষপাতহীন সেবার মনোভাব/দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থাকা/পাঠকের জন্য শিক্ষনীয়  বিষয়াদির উপস্থাপন/দুস্থ-মানসিক  ভারসাম্যহীনদের প্রতি সহানুভুতি/সকল জাতি,ধর্ম ও সপ্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ/সমাজ উন্নয়নে দায়িত্বপালন/বহুমুখী জ্ঞান, ধারণা ও বিষয় উপস্থাপন/পরিস্থিতিগত পরিমিতিবোধ/জনগণের জানার অধিকার/শিশুদের কথা ভাবা/একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে করণীয়ঃ-আইন – আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা/দোষীব্যক্তির  আত্মীয়-স্বজনদের কথা ভাবা/ছোটোখাটো অপরাধে গ্রেফতারকৃতদের পূর্ণপরিচয় প্রকাশ না করা/মানহানি বা নিন্দামূলক কাজ থেতৈ বিরত থাকা/রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য সম্পর্কে সতর্কতা/প্রতিবাদের সূযোগ দেয়া/তথ্য প্রকাশে চাপ না দেয়া/সংবাদসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা/সংবাদসূত্রের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা/উদ্ধৃতি ব্যবহারে সতর্কতা/বিভ্রান্তিকর উক্তি সম্পর্কে সতর্কতা/সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে ধারণা


১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের  উদ্যোগে ঢাকায় একটি সম্মেলনের  আয়োজন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেস কাউন্সিলের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকরা সেই সম্মেলনে তাঁদের মতামত রেখেছিলেন। তাঁদের সেই মতামত বাস্তবে রূপ দিতে অনেকটা পথ পেরিয়ে  যায় প্রেস কউন্সিলের। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে কর্ম প্রয়াস শুধু দায়েরকৃত মামলা, মামলা নিষ্পত্তি এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরের কিছু প্রশিক্ষণ কর্মশালার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যাকে বলা যায় রুটিন মাফিক কাজ। কাউন্সিল সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলেছে এখন। ২০১৪ সালে বর্তমান চেয়ারম্যান  বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজউদ্দিন নেতৃত্বে এর কর্মপ্রয়াস পৌঁছে যায় তৃণমূলে। বিশেষ করে  সাংবাদিকদের আচরণবিধি ও নীতিমালা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে তাঁর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। তাঁকে যথাযথ ভাবে সহায়তা করছেন সচিব শ্যামল চন্দ্র কর্মকার ও অন্যন্য সহকর্মীরা।


বাংলাদেশ প্রেস  কাউন্সিলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দায়েরকৃত ৫১৭টি  মামলার মধ্যে ৫১২টি মামলার রায় প্রদান করেছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে দৈনিক কালের কন্ঠ বনাম দৈনিক প্রথম আলোর মামলার রায়টি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সাংবাদিকতার নীতিমালা, আচরণবিধি এবং হলুদ সাংবাদিকতার ওপর দেশব্যাপী সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে  এবং মতবিনিময় অনুষ্ঠানের  আয়োজন করে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রশংশিত হয়েছে। এই প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।


অযোগ্য, অদক্ষ ব্যক্তিরা যাতে সাংবাদিকতা পেশায় আসতে না পারে এ জন্য রেজিষ্ট্রিকৃত সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের সনদ প্রদানের  সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে  একদিকে সাংবাদিকদের সম্পর্কে একটি পরিসংখ্যন পাওয়া যাবে। অন্যদিকে প্রতিহত করা যাবে ভূঁয়া সাংবাদিকদের। পাশাপাশি রেজিষ্ট্রিবিহীন সংবাদপত্রের মালিকরা সহজেই ধরা পরবে। রেজিষ্ট্রিকৃত সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের নাম তালিকাভূক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। এটি দফতরে সংরক্ষণ ও ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হবে।


 বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল  তাদের কর্মপ্রয়াসকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তুলে ধরার লক্ষ্যেও কাজ করে যাচ্ছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল ভারত ও নেপালের সাথে সমঝোতা স্মারক (এম ও ইউ) স্বাক্ষর করেছে। প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের ন্যাশনাল ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। নেপাল প্রেস কাউন্সিলের আমন্ত্রণে কাঠমুন্ডুতে সার্কভূক্ত দেশের প্রেস  কাউন্সিলকে নিয়ে একটি জোট গঠনের প্রস্তুতিসভায়  যোগ দেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা।


চলমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার  নেতৃত্বে সহ¯্রাব্দের উন্নয়নের  লক্ষ্যে এখন এগিয়ে যাচ্ছে  বাংলাদেশ। সংবাদপত্র,বিভিন্ন বার্তা সংস্থা,বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল,সরকারী বেসরকারী রেডিও,অনলাইন পত্রিকা, অনলাইন বার্তা সংস্থা,অনলাইন রেডিও,অনলাইন টেলিভিশন,কমিউনিটি রেডিও-সবগুলো গণমাধ্যমেই  সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতা। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ¯œাত যে সুখী সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন আজ তাঁর সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে  তা বাস্তবতণ পেয়েছে। এই বাস্তবতারই অংশ বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের বর্তমান প্রয়াস। (১৪ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল দিবস ২০১৭)
লেখক: গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষক, লেখক, সাংস্কৃতি কর্মী।

রাষ্ট্র ঘুমায় আমাদেরই জাগতে হবে

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় দৈনিকের একটি শিরোনাম-‘২৪ ঘন্টায় সড়ক কেড়ে নিল ২৫ প্রাণ’। অর্থাৎ ঘন্টায় একজনেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।  সর্বশেষ ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরের নগরকান্দায়। গ্যাস সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষের পর আগুন ধরে যায় দুটি গাড়িতেই। এতে পুড়ে মারা গেছেন ১৩ জন।

 এ দুর্ঘটনায় দগ্ধ ও আহত হয়েছেন ৩৩ জন। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবেলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনার মূল অনুষঙ্গ বেপরোয়া গতি।

চালকেরা বেপরোয়া গতিতে এবং একের পর এক পাল্লা দিয়ে যান চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) মতে, মহাসড়কে গড়ে প্রতি মিনিট পরপর একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেকিংএর চেষ্টা করে। একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে  পাশকাটাতে গেলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি প্রতিরোধে মহাসড়কে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। সড়কে শৃঙ্খলা নেই বলেই দুর্ঘটনা। আর সরকারের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগও খুব একটা চোখে পড়ে না। সড়ক নিরাপত্তা শুধু মুখে মুখেই। বাস্তবে কর্মসূচি নেই বললেই চলে। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মহাসড়কে বিশেষ ক্যামেরা বসাতে হবে। কম খরচেই এটা করে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।


সরকারি এক  হিসাবে, গত ৩ বছরে গড়ে ২ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায়  মারা গেছে। বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ঐসময়ে হতাহত হয়েছে বলে জানান চিত্র নায়ক ইলিয়াছ কাঞ্চন।তবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির  এক হিসাবে, ২০১৬ সালেই ৪ হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬ হাজার ৫৫ জন। আহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ।

এর আগের বছর প্রাণহানি হয় ৮ হাজারের বেশি মানুষের। আর এটাই বাস্তব চিত্র। দেশে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে যে, দুর্ঘটনা রোধে হালে বিশেষ বাহিনী গঠনের দাবি উঠছে। দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি বিশেষ বাহিনী গঠন করা যায়, দুর্ঘটনা রোধে এ-জাতীয় বাহিনী নয় কেন? এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে সন্ত্রাসীদের হাতে শতকরা ৩০ জন লোক মারা গেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৭০ জন। ৩০ জনের জীবনসহ অন্যান্য জানমাল রক্ষায় সরকারের একটি বাহিনী থাকলে শতকরা ৭০ জনের জীবনসহ অসংখ্য আহত ও ডলারে কেনা পরিবহন রক্ষায় সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাহিনী গঠন করছে না কেন? দেশের মানুষের জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দুর্ঘটনা রোধে চরমভাবে ব্যর্থ সরকারকে দেশের মানুষের স্বার্থে যতসম্ভব দ্রুত ভাবতে হবে।

 আমরা জেনেছি, কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়ই দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। এ হিসাবে মাসে ৯০০ জন এবং বছরে ১০ হাজার ৮০০ জন মারা যাচ্ছে। তবে বিআরটিএ’র পরিসংখ্যানমতে এ সংখ্যা দিনে ১৬ এবং বছরে ৫ হাজার ৭৬০ জন। আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ ক্ষেত্রে সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশসহ চলমান প্রশাসন এ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে তাদের ঢেলে সাজাতে হবে, অন্যথায় নতুন করে দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণের মধ্যে ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল ২. মোবাইল ফোন ব্যবহার ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন ৪. ট্রাফিক আইন না মানা ৫. নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলা ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা। এ ৬টি বিষয়ে সরকার সজাগ দৃষ্টি দিলে দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু অনেকাংশে কমে যাবে।


বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১২ হাজার মানুষের। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম। দুর্ঘটনাকবলিত কোনো যানবাহনের চালককে আটক করা হলেও বেশির ভাগ সময়ই তাদের শাস্তি হয় না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা, জরুরি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনাহীনতাও দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে দায়ী। শুধু চালকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে শতভাগ নৈতিক ও কঠোর থাকতে পারলেই দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

 এটা ঠিক যে, দেশের বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার সঙ্গে সংগতি রেখে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব যান চালানোর জন্য চাই দক্ষ ও বিবেচক চালক। এই বিপুলসংখ্যক যোগ্য চালক তৈরির জন্য দেশে কি কোনো সুষ্ঠু কার্যক্রম রয়েছে? এমনকি লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের চলার পথে আরো সতর্ক থাকা এবং ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলার ব্যাপারে কোনো কর্মশালা কিংবা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও কি নিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আসলে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। একটি সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উদ্যোগী হতে হবে। না হলে যে কেউ যে কোনো দিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ইহধাম ত্যাগ কিংবা পঙ্গুত্ববরণ করবে, তা নিঃসংশয়ে বলা যায়।


ক’দিন আগে গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে বৈধ যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখেরও বেশি। অথচ বৈধ চালকের সংখ্যা মাত্র ৮ লাখ। বাকি যানবাহন যাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, তাদের লাইসেন্স বৈধ নয়। অনেকের একাধিক লাইসেন্সও আছে। স্বাভাবিকভাবেই এ অবৈধ লাইসেন্সধারী গাড়িচালকরা গাড়ি চালাতে গিয়ে আইনের ধার ধারেন না। সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত নন, এমন চালকের সংখ্যাও নেহায়েতই কম নয়।


এক গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুর্ঘটনা ঘটে সর্বোচ্চ তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে। নিহতের ৮০ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ৪৫ বছর। নিহতদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পথচারী। যাদের ২১ শতাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে। দুর্ঘটনায় আহত ১৫ শতাংশ লোক মারা যায় ঘটনার ১৫ মিনিটের মধ্যে। দেশে ১৬ লাখ রেজিস্টার্ড গাড়ি রয়েছে আর লাইসেন্স পাওয়া ড্রাইভার রয়েছে মাত্র ১০ লাখ। ৪ লাখ ড্রাইভারের ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং ড্রাইভিং ট্রেনিং দেয়া ও তাদের জন্য লাইসেন্সের দরকার আছে।

 তা না হলে প্রতিনিয়তই এভাবে অকাতরে ঝরবে আমাদের প্রাণ। প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই থানা পুলিশ
অনৈতিকভাবে মীমাংসা করে দিচ্ছে এসব হত্যাকন্ডের ঘটনাগুলো। কতটাই না অসভ্য আমরা। মানুষ মরবে আর ১০-২০ হাজার টাকার বিনিময়ে সব মীমাংসা হবে; হবে সব স্বাভাবিক। একি ভাবা যায়? সরকারি হিসাব মতে, ১৯৯৯ সালে ৪ হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে ৪ হাজার ৯১ জন, ২০০২ সালে ৪ হাজার ৯১৮ জন, ২০০৩ সালে ৪ হাজার ৭ ৪৯ জন, ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ২৯৭ জন, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৯৭৫ জন, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৮৬২, চলতি ২০১৬ সলের আগষ্ট পর্যন্ত আনুমানিক ২ হাজারেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিবছরই এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে আর তা রোধ করা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা; এ যেন অলঙ্ঘনীয় ব্যাপার; মৃত্যুদূত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফেরা যাবে কি? এমন সংশয় বরাবরই থেকে যায়। এ প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব পাওয়া কঠিন বাংলাদেশে। প্রশ্ন হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ ঝরে যাবে?


কথায় বলে ‘ঘুমন্ত লোকের ঘুম ভাঙানো সম্ভব, কিন্তু জেগে জেগে ঘুমালে তা কঠিন’। শত চেষ্টায়ও তাকে জাগানো যায় না। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যেন সেই দশা। কয়েক মাস আগে খোদ জাতীয় সংসদে অনভিজ্ঞ ও অল্পবয়সী হেলপার বাস-মিনিবাস চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানালেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি বলেন, গাড়ির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে দক্ষ চালক বাড়ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক, শিশু, নববধূ-বরসহ পুরো বরযাত্রী, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা এমনকি সাবেক মন্ত্রীও এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত হওয়ার খবর আমরা পত্রিকার পাতায় প্রত্যক্ষ করেছি, যার একটিও সহজভাবে মেনে নেয়া যায় না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিকতা, সচেতনতা, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
হবংিংঃড়ৎব১৩@মসধরষ.পড়স  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

বই পড়া-কেনা ও বইমেলা

যে বই পড়ে না তার মধ্যে মর্যাদাবোধ জন্ম নেয় না। বই কিনে কেউ কোনদিন দেউলে হয় না। বইয়ের ব্যবসা লাভজনক না জেনেও যাঁরা ব্যবসা করেন তাঁরা সত্যিই মহৎ। ক্রমশ মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করছে। আমাদের দেশেও শিক্ষিতের হার বাড়ছে। তবে সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক মান আশাব্যঞ্জক না। যারা বিজ্ঞতা দিয়ে, অভিজ্ঞতা দিয়ে, মেধা বা যোগ্যতা দিয়ে সমাজের কল্যাণ করবেন এমন মানুষ আমাদের খুবই কম।


জ্ঞানার্জনের জন্য বই পড়তে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বই পড়ার অভ্যাস কমেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। আমরা ছোট বেলায় দেখতাম অনেক সাধারণ মানুষ বই কেনার সামর্থ নেই তারপরও তিনি এর-ওর কাছ থেকে বই ধার নিয়ে পড়ছেন। সাধারণ বই যেমন-গোয়েন্দা কাহিনী, পুঁথি, হাল্কা হাসির বই ইত্যাদি পড়তেন অনেকেই। এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই বই পড়ার অভ্যাস কমেছে। বেড়েছে টেলিভিশন দেখা এবং মোবাইল ফোনের ব্যবহার। একটি বাড়ির প্রায় প্রতিটি কক্ষে দামী টেলিভিশন আছে এবং বাড়ির প্রতিটি সদস্যের হাতে দামী মোবাইল ফোনও আছে। কিন্তু বাড়িতে বইয়ের সেল্ফ বা আলমিরা নেই। যদিও বিজ্ঞ জনেরা বলেন, বইয়ের চেয়ে উৎকৃষ্ট আসবাব আর নেই। বইবিহীন কক্ষকে আত্মাবিহীন দেহের সঙ্গে তুলনা করা চলে। হ্যাঁ, এটা ঠিক, বই সবাই কিনতে ও পড়তে পারেও না। কারণ, বই একটা মননশীল চিন্তাশীল বিষয়। যে বই পড়ে সে অন্যরকম, জীবনযাপন সম্পর্কে তার একটা ধারণা থাকে। এটা খুব বেশি মানুষের মধ্যে নেই। সব মানুষই বই পড়বে তা সম্ভব না। এর সুযোগও নেই। তবে, যে বই পড়ে তার শত্রু কম।

পৃথিবীর যা কিছু শ্রেষ্ঠ জিনিস, শ্রেষ্ঠ চিন্তা, শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন সবই বইয়ের মধ্যে। বই না পড়ার অর্থ হলো শ্রেষ্ঠ স্বপ্নগুলো থেকে দূরে থাকা। বই একটি জাতিকে মুক্তি দিতে পারে। যেমন এই যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ক্ষুদ্র চেতনাসম্পন্ন মানুষ আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। এ থেকে উচ্চতর মনের মানুষ দরকার। আলোকিত মানুষ দরকার। এর জন্য দরকার বই আর বই। গত প্রায় তিন যুগ ধরে রাজধানী ঢাকায় মাসব্যাপী ‘একুশে গ্রন্থ মেলা’ হচ্ছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, পাবনা, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট পরিসরে বইমেলা হয়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে লেখক ও প্রকাশকগণ বই প্রকাশ করেন। যদিও সারা বছরই বই প্রকাশিত হয়। তবে প্রকাশনা ব্যবসায় এখন মুনাফাকেই প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রকাশক লেখকের চেয়ে বেশি বা সমপর্যায়ের জ্ঞানী মানুষ। প্রকাশককে হতে হয় চৌকস। তাঁকে জ্ঞান-বিজ্ঞান সবক্ষেত্রেই কমবেশি অবহিত হতে হয়। প্রকাশকের ভূমিকাই এখানে মুখ্য। চাইলেই যে কেউ বই বের করতে পারে না। কিন্তু এখন কী দেখা যাচ্ছে ? যে কেউ বই লিখতে পারেন, বই ছাপতে পারেন, কোন বাধা কিংবা নিয়ম কানুন নেই।

 বই লিখতে বা ছাপতে জ্ঞানী হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ হয়ত দু-চারটি লাইন লিখতে শিখেছেন, নিজের চেনা-জানা পরিমন্ডলে এই ‘অনন্য কীর্তি’ দেখিয়ে বাহবাও পাচ্ছেন। বাহবার পরিমাণ আরও বাড়াতে এক সময় তাঁর মনে জেগে ওঠে স্বপ্নচারা। মুদ্রণশিল্প অনেক অগ্রসর হয়েছে। যে কেউ নিজের লেখা বই নিজেই ছেপে ফেলতে পারেন, যদি খরচ করার টাকা তার পকেটে থাকে। এর বাইরে যারা নিজেরা করবেন না, প্রকাশককে দিয়ে করাবেনÑতাদেরও চিন্তার কারণ নেই। চাইলেই হয়ে যাবে। প্রকাশক শুধু বই প্রকাশ করার জন্যই দরকার নয়,-বইয়ের প্রচারের ব্যাপার আছে, বাজারজাত বড় বিষয়। কারও মনে যখন প্রচার, বাজারজাতের চিন্তা উদয় হবে, তখন অবশ্যম্ভাবী তাকে প্রকাশকের দ্বারস্থ হতেই হবে। প্রকাশকের কাছে এখন ব্যবসাটা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে-যা যা খুশি লিখছেন, আর প্রকাশক নগদপ্রাপ্তির বিনিময়ে তা প্রকাশ করছেন। তৃতীয় পক্ষ পাঠক সেখানে গৌণ হয়ে যাচ্ছেন।

 পাবলিককে যা ‘খাওয়ানো’ হবে তা-ই খাবে! এক-আধটু লিখতে-পড়তে জানলে আর পকেটে টাকা থাকলেই হলোÑলেখক হওয়া ঠেকায় কে? লেখক হওয়া কঠিন কোন বিষয় নয়। যা কিছু মুদ্রিত তাই মানসম্পন্ন! ভাল-মন্দ মিশিয়েই সবকিছু। যাঁরা লেখেন তাদের প্রায় সবারই দৃঢ় ইচ্ছা থাকে, ভাল কিছু সৃষ্টি করার। সৃষ্টির পথে সফল হোন গুটিকয়েক মানুষ। অন্যরা কোন রকমে থাকার মতো থাকেন। প্রযুক্তি সহজ এবং নাগালে থাকায় বই প্রকাশ করা এখন খুবই সহজ হয়েছে। কোন কোন লেখক ডজন ডজন বই লিখেছেন। এখনও শুদ্ধ করে ভাবতে পারেন না,  লেখকের যে নিজস্ব চিন্তা, দর্শন থাকতে হয় তাও জানেন না, বানান, বাক্য শুদ্ধ নয়, কী বলতে চান তাও পরিষ্কার নয়, তার পরেও বই লিখছেন। এ প্রসঙ্গে এক দিনের ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। একুশে গ্রন্থ মেলায় প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদ বসতেন আগামী প্রকাশনীর স্টলে। তিনি বসে ভক্ত অনুরাগীদের অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন।
]
 একজন নতুন লেখক, বই লিখেছেন। তিনি হুমায়ুন আজাদকে বইটি দিয়ে পড়ার অনুরোধ করে বিদায় নিলেন। হুমায়ুন আজাদ বইটি হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে  দেখলেন। তারপর পাশে বসে থাকা নবীন লেখক আমার বন্ধু রুদ্রাক্ষ রহমানের হাতে বইটি দিয়ে বললেন, পড় ভুল বের কর। বইটি মনোযোগ সহকারে দেখে রুদ্রাক্ষ রহমান বললেন, স্যার- ভুল বের করতে পারলাম না। এবার হুমায়ুন আজাদ তাঁর ¯েœহভাজন অনুজ লেখকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, তোমরা সবাই এমন মুর্খ কেন? তারপর বইয়ের প্রথম বাক্যটি পড়লেন, ‘তারা পরস্পর হাঁটছে’। হুমায়ুন আজাদ বললেন, ‘পরস্পর হাঁটা যায় না। পাশাপাশি বা আগে পিছে হাঁটা যায়। একজনের হাঁটা আরেকজন হেঁটে দিতে পারেন না।’ হুমায়ুন আজাদ বইটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন, যে উপন্যাসের প্রথম বাক্যেই ভুল সে বই পড়া  যায় না। প্রমথ চৌধুরীর একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে গেল,-বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটাই হচ্ছে পাঠকের ভুল, বই লেখা জিনিসটে একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয় কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিৎ না।’ লেখালেখি একটি শ্রমসাধ্য কাজ।

খুব কম সংখ্যক মানুষই পারেন, এই কঠিন কাজে নিজেকে যথাযথভাবে ডুবিয়ে রাখতে। নাম কামানো বা হুজুগের বশবর্তী হয়ে, শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টি করতে। অবশ্য প্রতিভাও একটা বিষয়। কারও প্রতিভা নেই কিন্তু চেষ্টার পর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সহজেই কাউকে ভাল বা খারাপ লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। ভাল খারাপ নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট কোন মানদন্ড- নেই। একজনের কাছে যা ভাল অন্যজনের কাছে তা মন্দ। আবার আরেকজনের কাছে যা খারাপ অন্যজনের কাছে তাই উপাদেয়! সুতরাং লেখকের মধ্যে শ্রেণী বিভাজনের বা বিতর্কের অবকাশ নেই। তবু এ সবের ভেতর থেকেই কেউ কেউ উত্রে যান। কোন কোন লেখক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন পাঠকের, বোদ্ধাজনের।


পাঠকেরও এখন ব্যস্ত হওয়ার, বিনোদন উপকরণের কমতি নেই। তারপরও কিছু পাঠক আছেন যাঁরা গড্ডালিকা প্রবাহ ভেসে যাননি। এখনও বইয়ের পাতায় খুঁজে নেন যাপিত জীবনের কাঙ্খিত-অনাকাঙ্খিত ছবি। বই থেকেই লাভ করতে চান নতুন জীবনবোধ। বই কেনা এখনও বেশিরভাগ মানুষের কাছে বিলাসিতার মধ্যে পড়ে। আগে তার মৌলিক চাহিদা পুরণ, তারপর বই। উদরের জন্য খাদ্যরস আহরণের পরই আসে মনের পুষ্টিরসের প্রশ্ন। যাদের বই কেনার সামর্থ আছেÑবলাবাহুল্য, তাদের অনেকই বইয়ের ভুবন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন!


মানুষের ক্ষেত্রে যেমন বইয়ের ক্ষেত্রেও তেমনই। অল্পসংখ্যকই মহান ভূমিকা পালন করে বাকি সব হারিয়ে যায় আগমনের মধ্যে। অর্থাৎ পৃথিবীতে কত মানুষের জন্ম হয়। এর মধ্যে কয়েকজন স্মরণীয় হোন। অন্যরা হারিয়ে যান। তেমনই কত বই-ই প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে কিছু বই হয় কালজয়ী। ইতালিতে একটি প্রবাদ প্রচলিত ‘খারাপ বইয়ের চেয়ে নিকৃষ্টতম তস্কর আর নেই।’ কিছু বই আছে যেগুলোর প্রচ্ছদ ও পেছনের মলাটই হলো সেরা অংশ।


জীবন নিতান্তই একঘেয়ে, দুঃখ কষ্টে ভরা, কিন্তু মানুষ বই পড়তে বসলেই সে সব ভুলে যায়। ব্যায়ামের দ্বারা মনেরও তেমন উন্নতি হয়ে থাকে। বই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ আত্মীয়, যার সঙ্গে কোনদিন ঝগড়া হয় না, মনোমালিন্য হয় না। মনে রাখতে হবে ভাল বই পড়তে হবে। একটি ভাল বই হলো বর্তমান ও চিরদিনের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বন্ধু। এককালে পৃথিবী বইয়ের ওপর কাজ করত। এখন বই-ই পৃথিবীর ওপর কাজ করে।


বই পাঠকের জন্য টমাস হুডের বাণী-‘আমি তাকে করুণা করি কারণ সে প্রতিদিন প্রচুর মাখন খায় কিন্তু বই পড়ে না।’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বই পড়াকে যথার্থ হিসেবে যে সঙ্গী  করে নিতে পারে, তার জীবনের দুঃখ কষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়।’ আর লেখকের জন্য উক্তি করেছেন বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ‘বই কেনাটা নিষ্পাপ বৃত্তি এবং এতে দুষ্কর্মের থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।’ আর বই প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের উদ্দেশ্যে বলি- ‘ভাল বই প্রকাশ ও বিক্রি করে আপনিও ইতিহাসে স্থান  করে নিতে পারেন।’ সর্বশেষে কালজয়ী লেখক, লিও টলস্টয়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়Ñ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই বই আর বই।’
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
০১৭১০-৮৬৪৭৩৩

খাদ্য মজুদ ও ভোক্তার স্বার্থ

মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক হল খাদ্য। ফলে খাদ্য একটি অতি স্পর্শকাতর পণ্য। বিশেষ করে আমাদের ভৌগলিক অবস্থানের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। দিন যতই যাচ্ছে জনসংখ্যা ততই বাড়ছে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে চাহিদাও আনুপাতিক হারে বাড়ছে। আবার বসতবাড়ি, অফিস আদালত, হাট বাজার, রাস্তাঘাট, নগরায়নে প্রতিবছর কম-বেশি চাষের জমি কমে যাচ্ছে। অথচ আমাদের ভৌগলিক সীমারেখা কার্য্যত স্থির থাকায় ঘন বসতি দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। এজন্য অপরিকল্পিত বসতবাড়ি নির্মাণের পথ বন্ধ করে আমাদের গ্রামগুলোকেও একটি পরিকল্পিত বসতবাড়ির আওতায় নিয়ে আসা জরুরি।

 এ জন্য সরকারকে এখন থেকেই পাইলট প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে কাঁচা কিম্বা আধাপাকা বাড়ীর বদলে পাঁকা অথচ ভূমিকম্প সহনীয় বহুতল ভবন পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ শুরু করতে হবে। তা না হলে যে হারে মানুষ বাড়ছে, সেহারে অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বসতবাড়ি নির্মিত হলে চাষ উপযোগী জমির পরিমাণ কমতে কমতে তলানিতে এসে যাবে। যার নেতিবাচক প্রভাবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়বে। কথায় আছে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান’। অর্থাৎ সময় থাকতেই পরিকল্পিতভাবে কমিউন ভিত্তিক বসতি গড়ে তুলতে হবে।

 তা না হলে দুর ভবিষ্যতে এ দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা দেশীয় ভাবে যোগান দেওয়া কঠিন হবে।
বর্তমান সময়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারিভাবে আপদকালীন খাদ্য মজুদ রাখা প্রয়োজন, তা অনেক সময়ই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, যে কোন দেশের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারিভাবে কমপক্ষে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ থাকা প্রয়োজন। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর এক দিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় ৪৬ হাজার টন।

 সে হিসাবে, আমাদের দেশে ৩০ দিনের খাদ্যের প্রয়োজন হয় প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন। আর ৬০ দিনের জন্য খাদ্যের মজুদ থাকার প্রয়োজন ২৭ লাখ ৬০ হাজার টন। অথচ খাদ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারি খাদ্য গুদামে চালের মজুদ ছিল মাত্র ৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৭৯ টন। যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকির বিশ্ব তালিকার প্রথম সারিতে থাকা বাংলাদশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কমপক্ষে ১০ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য মজুদ থাকা বাঞ্ছনীয়। সেখানে বর্তমানে সরকারিভাবে মজুদ থাকা খাদ্য শস্যের পরিমাণ যে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যা বলার প্রয়োজন পড়ে না। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন খাদ্য মন্ত্রণালয়ও।

 খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মনে করেন, পূর্ব প্রস্তুতি ব্যতিত সরকার খাদ্য বান্ধব কর্মসূচীর আওতায় ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজি মুল্যে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন চাল গত বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর পর্যন্ত বিক্রি করায় খাদ্য মজুদের পরিমান অর্থেকে নেমে এসেছে। সামনে মার্চ ও এপ্রিল দুই মাসে সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজিতে চাল বিক্রির পরিকল্পনা  সরকারের রয়েছে। সেখানে চালের প্রয়োজন হবে প্রায় ৩ লক্ষ মেট্রিক টনের। বর্তমানে যে পরিমাণ চাল সরকারের খাদ্য গুদামে মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে ৩ লক্ষ টন চাল বিতরণ করা হলে, চাল মজুদের পরিমাণ প্রায় আড়াই লাখ টনে নেমে আসবে। এ কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয় চলতি আমন মৌসুমে আরো দেড় লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে সরকারের খাদ্য বিভাগ যে মানের চাল সংগ্রহ করে তার বাজার দরও উর্ধ্বমুখী।

 এমতাবস্থায় সরকার অভ্যন্তরীণভাবে আরো দেড় লাখ টন চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়ে কতটুকু সফল হবে, যা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমতাবস্থায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উচিৎ হবে, অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে জিটুজি পদ্ধতিতে এই পরিমাণ চাল আমদানি করে খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। যদিও সরকার ইতিমধ্যে কিছু চাল বিদেশে রফতানি করেছে, সেখানে চাল আমদানি করলে সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্নের আশংকায় আমদানির পথে সরকার সহসাই যেতে চাইবে না, এটা ভাবাও স্বাভাবিক। হয়ত সরকারের খাদ্য বিভাগ ভাবতেই পারে, বোরো চাষের মৌসুম শুরু হয়েছে। মাত্র ৩/৪ মাস পর সরকার দেশীয় ভাবে উৎপাদিত ধান হতে অন্তত ১৩/১৪ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে। সেখানে এই মূহূর্তে চাল আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না। এ ভাবনাও অযৌক্তিক কিছু নেই। তবে কোন কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অনেকাংশেই কঠিন হবে। এই বিবেচনায় সরকার অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি দরের সাথে কিছু ইনসেনটিভ দিয়েও যদি দেড় লাখ টন চাল সংগ্রহ করে, তাহলে সেটাই হবে সঠিক ও সময়োচিত।

কারণ এখন পর্যন্ত ধানের আকারে কৃষক পর্যায়ে ও চাল কল মালিকদের অনুকুলে যে পরিমাণ ধান মজুদ আছে, তা দিয়ে দেড় লাখ টন বাড়তি চাল কেনা কোন অবস্থাতেই কঠিন হবে না। যদিও দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে চাহিদার যৎসামান্যই সরকার মজুদ রাখে। তবুও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় সরকারি খাদ্য গুদামে খাদ্য শস্য মজুদের বিষয়টি বড় মাপের ভুমিকা রাখে। কোন কারণে খাদ্য শস্যের বাজার উর্ধ্বমুখী হলে নি¤œ আয়ের মানুষদের জন্য সরকার কমমূল্যে চাল ও আটা ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে। অথচ এ বছরে শুধুমাত্র সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ স্মরণকালের মধ্যে কমে আসায় ওএমএসের চাল ও আটা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে নি¤œ আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে।

 এ কষ্ট লাঘবে সরকারকে আগামী বোরো মৌসুমের ধান কাটা মাড়াইয়ের আগ পর্যন্ত খোলা বাজারে চাল ও আটা বিক্রি করা একান্তই জরুরি। কিন্তুু ইচ্ছা থাকলেও সরকার খাদ্য মজুদ সংকটের কারণে সে পথে পা বাড়াতে পরছে না। এটাও অপরিকল্পিত খাদ্য মজুদ ও বিপণনের দুর্বলতার কারণে ঘটেছে। সরকার যেহেতু এখনও গম আমদানি অব্যাহত রেখেছে, সেখানে চাল দিতে না পারলেও অন্তত ওএমএসে আটা বিক্রির কার্যক্রম শুরু করতে পারে। তাহলেও নি¤œ আয়ের মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে। এ জন্য আমরা মনে করি, খাদ্য শস্য উৎপাদন, মজুদ ও বিপণনের ক্ষেত্রে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা না থাকলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা দুরূহ হয়ে ওঠে।


অতি সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ‘গমের আবাদ কমে গেছে’ এই শিরোমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ব্লাষ্ট রোগের প্রাদুর্ভাবের আশংকায় দেশে দক্ষিণ-পশ্চিমের ৭ জেলা অর্থাৎ যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল ও ভোলা জেলায় খোদ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) গম চাষে চাষীদের নিরুৎসাহিত করায় গমের চাষ আশংকাজনক হারে কমে এসেছে।

 নিয়ম আনুযায়ী একবার কোথাও ব্লাষ্ট রোগের প্রাদুর্ভাব হলে অন্তত টানা দুই বছর সে জমিতে ওই ফসল চাষ করা যাবে না। কারণ ব্লাষ্ট রোগের জীবানুকে ধ্বংস করতে হলে অন্তত দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। দেখা গেছে, গত বছর উল্লেখিত ৭ জেলায় ব্লাষ্ট রোগে গমের ক্ষেত আক্রান্ত হওয়ায় শত শত একর জমির উৎপাদিত গমের ক্ষেত আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এবার যে সকল গম চাষী ডিএই-এর নির্দেশনা অগ্রাহ্য দরে গমের চাষ করেছে, ইতিমধ্যেই সে সব জমির গম ব্লাষ্ট রোগে আকান্ত হয়েছে। ফলে এ বছরও গমের ক্ষেতকে আগুনে পুড়ে ধ্বংস করতে হবে।

 এমনিতেই আমাদের দেশের গম চাষীদের দূর্ভোগের শেষ নেই। সরকার উৎপাদিত গম চাষীদের নিকট থেকে উপযুক্ত মুল্যে নামমাত্র পরিমাণ গম ক্রয় করায় অধিকাংশ গম চাষীর পক্ষে সরকারি খাদ্য গুদামে সরকার নির্ধারিত করে গম বিক্রি করা সম্ভব হয় না। ফলে গম চাষীরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে গম বিক্রি করায় লোকসান গুনে থাকে। তার ওপর যদি ‘মরার উপর খাঁড়ায় ঘা ব্লাষ্ট রোগে’ আক্রান্ত হয়, তাহলেও চাষীদের যে কপাল পুড়ে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে চাষীদের নেয়া এনজিও, মহাজন কিম্বা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করাও সম্ভব হয় না। চাষীরা হয়ে যায় দেনাদার।

 এ ঘটনা দেশের চাষীদের অনেকটাই যেন নিয়তি! আতি সম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘সোয়া ১৮ লাখ চাষীর বিরুদ্ধে মামলা’ শিরোনামে খবর সুত্রে জানা গেছে, মাত্র সাড়ে ৭ কোটি টাকার ঋণের জ্বালে বিশাল সংখ্যক চাষীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। যে দেশে হাতে গোনা গুটিকতক ব্যবসায়ীর কাছে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ি। যে সব ঋণকে ব্যাংকগুলো অবলোপন দেখিয়া পুন:তফশীলিকরণ করছে কিম্বা রুগ্ন শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করে পুন:অর্থায়ন করা হচ্ছে। যে দেশে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ হাজার হাজার কোটি টাকা নানাভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আত্মসাত করেছে, যে দেশের অর্থমন্ত্রী সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার আত্মসাতকে অতি সামান্য অর্থ বলে মন্তব্য করতে পারেন, সে দেশে মাত্র সাড়ে ৭ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ সোয়া ১৮ লাখ চাষীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়, যা ভাবতেও অবাক লাগে।

 এটাই বাস্তবতা, কারণ শ্রেণীস্বার্থ রক্ষায় ক্ষমতাসীনরা এভাবেই গুটিকতক বহুজাতিক কোম্পানির হাতে দেশের সিংহভাগ অর্থ তুলে দিবেন, আর নাম মাত্র টাকার জন্য অসহায় চাষীদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন, এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এটাই পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থার নিয়ম। এ নিয়মকে ভাঙতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষুদ্র ও মাঝারী চাষীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে জোরদার করতে হবে। তা না হলে সরকার যাবে সরকার আসবে কিন্তু এ দেশের চাষীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে না। আর তা আশা করা হবে, ‘সোনার তৈরি পাথর বাটির’ মতোই কাল্পনিক ও অবাস্তব।


পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, কৃষি নির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচানো সম্ভব না হলে সমৃদ্ধ অর্থনীতির স্বপ্ন ফিঁকে হয়ে যাবে। এ জন টেকসই খাদ্য উৎপাদন, মজুদ ও বিপণনকে কৃষক এবং ভোক্তাবান্ধব হিসেবে নিশ্চিত করতে হবে। এক সময় সরকারিভাবে মজুদ উপযোগী খাদ্য গুদাম স্বল্পতার কারণে সরকার ইচ্ছা থাকলেও বেশি পরিমাণ মজুদ করতে পারেনি। কিন্তু মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে প্রায় ৭/৮ লক্ষ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে প্রায় ১৭/১৮ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য মজুদের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

 কিন্তুু খাদ্যের অভাবে প্রায় প্রতিটি খাদ্য গুদাম এখন ফাঁকা পড়ে আছে। বাস্তবে আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনদের টেকসই পরিকল্পনার অভাবে কখনও অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ, কখনও খাদ্য মজুদ কমে আসার মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এ জন্যই টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করে খাদ্য উৎপাদন, মজুদ ও বিপণনের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখতে হবে। তা না হলে উৎপাদকের স্বার্থ, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা বড়ই কঠিন হবে।
 লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

হিজরির পঞ্চম মাস জুমাদাল উলা

ইসলামি ক্যালেন্ডারের পঞ্চম মাস জুমাদাল উলা বা জমাদিউল আউয়াল। ‘জুমাদা’ শব্দের অর্থ বরফ জমার কাল বা সময়। জুমাদাল উলা বা জুমাদাল আউয়াল এর অর্থ হলো বরফ জমার প্রথম মাস। আরবরা সর্বপ্রথম যখন বৎসরের নাম সমূহের নামকরণ করে তখন ঘটনাক্রমে ঐ সময় শীতকাল এর প্রথম অংশ ছিল তাই তারা এ মাসকে শীত কালের প্রথম মাস হিসাবে ‘বরফ জমার প্রথম মাস’ নাম করণ করে জুমাদাল উলা বা জমাদিউল আউয়াল নামে অভিহিত করেছিল। পরবর্তিতে উক্ত নামের সাথে প্রাকৃতিক অবস্থার মিল না থাকলেও প্রথম নামকরণের অনুকরণে উক্ত নামেই অভিহিত হয়ে আসছে।

 এছাড়াও কুয়াশায় অন্ধকার রাতকে আরব কবিরা তাদের কবিতায় ‘জুমাদা রাত’ অন্ধকার রাত বলে অভিহিত করতো। এ মাসের কোনরূপ বৈশিষ্ট ফযিলত বা বিশেষ সালাত, সিয়াম, দু’আ, যিকর কিংবা বিশেষ কোন আমলের বিবরণ হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি বলে হাদীস বিজ্ঞানীগণ মন্তব্য করেছেন। এ বিষয়ে যা কিছু বিভিন্ন লেখকের লেখা বই পুস্তকে পাওয়া যায় সবগুলো মনগড়া বা ধারণা প্রসুত বলা যায়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া কোন তথ্য মুহাদ্দিস আলেমগণ কর্তৃক বর্ণিত হয়নি। তবে কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী অন্যান্য সময়ের মত এ মাসেও ফরজ, ওয়াজিব পালনের পাশাপাশি যত বেশী সম্ভব নফল সিয়াম ও নফল সালাত সহ বেশী বেশী জিকর ও দু’আ দরুদ পাঠ করা উত্তম।

 আমাদের মনে রাখতে হবে যে ফরজ এবাদত সমুহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ এবাদত হলো সালাত। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত সময়মত আদায় করতে হবে। কুরআন হাদীসে সালাতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোন এবাদত বর্ণিত হয়নি। কুরআনে ৮০টির অধিক স্থানে সালাতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অসংখ্য হাদীসে সালাতের গুরুত্ব বুঝান হয়েছে। সালাতের কোন বিকল্প নেই। অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সিয়াম কাযা করে পরে সিয়াম পালনের বিধান রয়েছে। অক্ষম ব্যক্তির জন্য সিয়ামের ফিদ্ইয়া কাফফারা দেয়া যায়। হজ্জ বদলা করান যায়।

 কিন্তু সালাতকে অন্যভাবে সহজ করা হয়েছে। দাঁড়িয়ে অসম্ভব হলে বসে, শুয়ে, পোশাক না থাকলে উলংগ হয়ে অর্থাৎ যেভাবে সম্ভব মুমিন তার প্রভুর দরবারে হাজিরা দেবেন। কোন সুরা না জানা থাকলে শুধুমাত্র আল্লাহু আকবর বলে তাসবীহ তাহলীল এর মাধ্যমে সালাত আদায় করতে হবে এবং শিখতে হবে। হুশ থাকা অবস্থায় সালাতের কোন বিকল্প নেই। আমাদের সমাজে সালাতকে পারলৌকিক জগতের উপকারমূলক কাজ বলে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু ইহজগতে মানব সভ্যতার জন্য সালাতের গুরুত্ব যে কত বেশী মনে হয় আমরা তা ভুলে গেছি। মানব জীবনে সালাতের সবচেয়ে বড় উপকার পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে: নিশ্চয় সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ হতে। (সুরা আল আনকাবুত আয়াত নং ৪৫)।


এই আয়াতে সালাতের কারণে মানব সমাজে ২টি কাজ কমে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (এক) অশ্লিলতা (দুই) মন্দ বা অসৎ। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাম্মাদ ইবনু সুলায়মান (রহ:) বলেন “সালাত অশ্লীল ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে।” এর অর্থ হলো ইহা কেবল সালাতের সময়ের জন্য প্রযোজ্য অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যতক্ষণ সালাতে লিপ্ত থাকে ততক্ষণ সে অশ্লীলতা ও মন্দ হতে বিরত থাকে।

 তার এই মত স্বাভাবিকভাবেই সত্য। কারণ মুছল্লি যখন সালাতের নিয়ত করলো তখন একমাত্র সালাতের নির্ধারিত কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজ করা সম্ভব নয়, তাই সালাতে যতক্ষণ রত থাকলো শুধু ভাল কাজ করলো কোন মন্দ কাজ করলো না। এভাবেই প্রমাণ হলো যে সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ হতে বিরত থাকে। কিন্তু পবিত্র হাদীস থেকে জানা যায় যে, সালাত পালনের সময়টুকু শুধু মন্দ কাজ হতে বিরত রাখাকে বলা হয় নি বরং সালাত আদায়কারী সালাতের অবস্থায় যেমন অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকবেন তেমনি সালাতের কারণে মহান আল্লাহ তাকে অশ্লীল ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবেন। এটাই হলো এই আয়াতের সঠিক ও পূর্ণ ব্যাখ্যা।

 সালাত নিয়মিত সঠিকভাবে আদায় করলে ইহজগতে সালাতের সবচেয়ে বড় উপকার হলো যে সালাত তাকে অশ্লীলতা বর্জন ও অশোভনীয় কাজ বর্জন করার মত মন মানসিকতা সৃষ্টি করবে। যেমন হাফিয আবু বকর রাযযার (রা.) বলেন, ইউসুফ ইবন মুসা (রা.) হযরত যাবির (রা.) হতে বর্ণনা করেন একদা এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বললো হে আল্লাহর রাসুল! অমুক ব্যক্তি সালাত পড়ে কিন্তু সে চুরি করে। তখন নবী (সা.) বললেন “সাইয়ানহাহুমা তাক্কুলু” তুমি যা বলছো অচিরেই তা হতে থাকে বিরত রাখবে। অর্থাৎ শীঘ্রই তার সালাত তাকে চুরি হতে বিরত রাখবে। অনুরূপভাবে আবু হোরাইরা (রা.) হতেও বর্ণিত আছে। এই হাদীস প্রমাণ করে সালাত চারিত্রিক দোষের বিলুপ্ত ঘটায়।

 সালাত যদি মুছল্লির চারিত্রিক দোষ বিলুপ্ত করতে ব্যর্থ হয় তাহলে বুঝা যাবে যে তার সালাত সঠিকভাবে আদায় হয়নি। অথবা সালাত বা ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত পুরণ হয় নি। সালাত মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম (কিন্তু অনেক সালাত আল্লাহ হতে  দুরে নিয়ে যায়। হযরত ইমরান ও ইবনু আব্বাস (রা.) হতে মারফুসূত্রে বর্ণিত আছে “যার সালাত অশ্লীলতা ও অশোভনীয় কাজ হতে তাকে বিরত রাখলো না, সে আল্লাহ হতে ক্রমশ: দুরেই সরে থাকে।

” ইমাম ইবনু বাবু হাতিম (রহ.) বলেন, মহাম্মদ ইবনু হারূন মাখযুমী আল ফাল্লাস (রহ:) ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) এই আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন- যার সালাত তাকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখলো না তার সালাত হয়নি।” তিনি আরও বলেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- যার সালাত তাকে অশ্লীল ও অশোভনীয় কাজ হতে বিরত রাখলোনা সে ক্রমশ: আল্লাহ হতে দুরে সরতে থাকে।

তাবরানী মুআবীয়া (রা.) এর সূত্রে হযরত ইবনু আব্বাস (রা.) হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনু জারীর (রহ:) বলেন, কাসিম (রহ:) ইবনু মাসউদ (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে সালাতের আনুগত্য স্বীকার করে না তার সালাত হয়নি’। আর সালাতের আনুগত্য স্বীকার বলতে অশ্লীল ও অসৎ বন্ধ করা। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু সামউদ (রা) কে বলা হলো যে, অমুক ব্যক্তি বড় দীর্ঘ সালাত পড়ে। তখন তিনি বললেন সালাত যত দীর্ঘই হোক না কেন যে সালাতের অনুকরণ করে না ওই সালাত তার জন্য উপকারী হবে না। সালাতের অনুকরণ বলতে সালাতের মধ্যে কোন মন্দ কাজ মুছল্লি করে না তেমনি সালাতের বাইরেও কোন মন্দ কাজ মুছল্লি করবে না।

 সালাতরত অবস্থায় যেভাবে আল্লাহ ও রাসুলের বিধান মেনে চলে সালাতের বাইরে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে। শুধু সালাতের সময় আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করলাম আর সালাতের বাইরে সারা দিন রাত তথা গোটা জীবন আল্লাহ ও রাসুলকে বাদ দিয়ে ইচ্ছামত জীবন যাপন করলাম এ শিক্ষা ইসলামের শিক্ষা নয়। এ জন্য আল্লাহ কিয়ামতে বলবেন ইসলামের কারণে আমি আমার বান্দাকে জান্নাত বা জাহান্নাম দিব। হাদীসে কুদসী, ইমাম মোহাম্মদ মাদানী (রহঃ)। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে মন্দ কাজকে ‘মুনকার’ দ্বারা আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মুনকার প্রত্যাখ্যান করা, মুনকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক। মুনকার দেখে সে মুমিনের অন্তরে অবজ্ঞার ভাব সৃষ্টি হয় না সে দুর্বল মমিনের চেয়েও নিকৃষ্ট। আজ মুসলিম সমাজের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সালাত পড়ছি কিন্তু সালাতের ইহলোকিক ফায়েদা থেকে প্রায় বঞ্চিত। পরকালিন ফায়দা কতটুকু হবে মহান আল্লাহই ভাল জানেন। ফরজ ওয়াজিব ও সুন্নাত সালাতের পর নফল সালাতের উৎসাহ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। হাদীসে একটি সেজদায় একটি মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। (মসলিম শরীফ)।

 
সালাতের পরেই মুমিনের জন্য অন্যতম ইবাদত কুরআন তিলাওয়াত করা। আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ যিকর কুরআন তিলাওয়াত। সারা বছরই কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কুরআন পড়তে পারে এমন লোকের সংখ্যা জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে নিতান্তই অনেক কম। মাত্র ৩-৪ মাস ভালভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পড়লে কুরআন তিলওয়াত শেখা যায়। আমরা পেপার পত্রিকা পড়তে জানি, কিন্তু মহান আল্লাহ যে কিতাবটি পাঠালেন তা পড়লাম না, জানলাম না, জানার চেষ্টাও করলাম না যে দেখি আমায় আল্লাহ কি বলেছেন।

 অথচ এ কিতাব পাঠ করা শুনে বা বুঝে হাজার হাজার অমুসলিম মুসলমান হচ্ছে। অনেক নওমুসলিম ৩-৪ বছরের মধ্যে কুরআন তিলওয়াত ও অর্থ বুঝার যোগ্যতা অর্জন করছেন। আর আমরা জন্ম থেকে মুসলমান হয়েও অনেকেই কুরআন পড়তে পারি না। মহান আল্লাহ আমাদেক সালাতের অনুকরণ করার, কুরআন পড়ার বুঝার এবং কুরআন মোতাবেক জীবন গড়ার তাওফিক দিন। আমীন।
লেখক ঃ খতিব উপশহর জামে মসজিদ, বগুড়া
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

বৃহস্পতিবার দুপুরে সমকালের জেলা প্রতিনিধি শ্রদ্ধেয় আমিনুল ইসলাম রানা ভাই প্রথম আমাকে শিমুলের গুলিবিদ্ধের খবরটা দিয়েছিলেন। তারপর বগুড়া সমকালের ব্যুরো প্রধান মোহন আখন্দ ভাইয়ের সাথে চিকিৎসা নিয়ে কথা হয়েছে। সবাই চেষ্টা করেছি শিমুলকে কিভাবে বাঁচানো যায়, তা নিয়ে। শুক্রবার যখন আমি মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে যাই তখন আমার মেয়ে অরিন আমার মোবাইল ফোন নিয়ে এসে বলল, আব্বু তোমাকে আংকেল কথা বলতে বললেন। মোবাইলের রিসিভ কলে দেখি শ্রদ্ধেয় রানা ভাই ফোন দিয়েছেন। ফোন দিলাম, রানা ভাই বললেন, বুলবুল শিমুল ডেথ!

 তারপর দুই দিন কিভাবে শাহজাদপুরে কেটেছে তা জানিনা। আমি যখন সহকর্মি, বন্ধু শাহজাদপুরের সমকাল প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলকে নিয়ে লেখাটি লিখছি, তখন আর দশজন সহকর্মির মতো আমারও হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। সহকর্মির অকাল মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব করেছি। ভাষা নেই, আবেগ নেই, ঠিক পাথরের মূর্তির মতো চেয়ে চেয়ে দেখেছি সহকর্মি শিমুলের ক্ষত-বিক্ষত লাশ, আর পাশেই পরিবারের শিশু সন্তান শিমুলের ছেলে সাদিক ও মেয়ে তামান্না, মা, ভাই বোন স্বজনদের আহাজারী, ও স্ত্রীর বৈধব্য, আর গগণ বিদারী কান্না সবকিছুই এলোমেলো করে দিয়েছে।

সেই সাথে একটি অকাল মৃত্যু ঘটনায় শাহজাদপুরবাসীর শিমুলের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অবাক করেছে। শুক্র ও শনিবার জীবনের কষ্টের এই দুদিনে শিমুলের লাশের বোঝা কাঁধে নিয়ে মাদলা কাকমারী কবর স্থানে যাওয়ার যন্ত্রণা যে কতো কষ্টের তা লিখে জানানো সম্ভব নয়। মনে পড়ে ২০০৫ সালে যখন আমি সমকালে তাড়াশ উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে শুরু করি, তখন শাহজাদপুরের মাদলা গ্রামের আব্দুল হাকিম শিমুল আমার সাথে শাহজাদপুর প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন।

 তার পরে কতো শত স্মৃতি, বেদনা, ভাল সময় কাটানো নিয়ে মধুর স্মৃতিগুলো এখন প্রিয় বন্ধু শিমুলকে হারিয়ে স্মৃতির বিস্মৃত রাশিতে পরিণত হয়েছে। ফেলে আসা সেদিন গুলোর কথা এখন আরো কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা ভুলার মত নয়। ভুলতে পারা যায় না। এক সাথে একযুগের পথচলায় শিমুল শ্রেষ্ঠতম বন্ধু হয়ে উঠেছিল আমার জীবনে ও আমার পরিবারে। দুজন দীর্ঘ সময়ে পেশা ও পরিবারের সুখ দুঃখ নিয়ে পথ চলেছি। এখন আমি চলছি পথে, সেই পথে নেই প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল।  মৃত্যু অমোঘ বলে মেনে নিতে হয়।

 কিন্তু পরিকল্পিত ন্যক্কারজনক হত্যাকান্ড তা মেনে নেওয়া যায় না। হত্যাকান্ড শুধু আমাকে নয়, দেশের মানুষকে শোকাহতই করেনি, করে তুলেছে ক্ষুব্ধ, বলতে শেখায় কাঁদতে আসিনি। ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের হত্যাকান্ড তেমনি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে দেশবাসীকে, সাংবাদিক সমাজকে, দেশের সকল সাংবাদিকসহ সমকালের শিমুলের সহকর্মী বন্ধুরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে শুধু কান্নাই করেনি, তাকে গুলি বর্ষণকারী, হত্যাকারী শাহজাদপুর পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর ফাঁসির দাবিও জানিয়েছেন।

 সেই সাথে হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে দেশে সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ। গত বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আ’লীগের দু-পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট সংঘর্ষের খবর সংগ্রহের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরের দিন শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান, নির্ভীক, নির্লোভ সাহসী সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল। মুলতঃ সংঘর্ষ চলাকালে পৌর মেয়রের গুলি বর্ষণের ছবি তোলার সময় সাংবাদিক শিমুলের মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালান, জেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু। যে হত্যাকান্ডে নিন্দা ও প্রতিবাদে দেশবাসী একাত্ম হয়েছেন। হয়তো মেনে নেওয়া যায়, ফলের পেঁকে উঠা।


 বৈশাখে নদী শুকিয়ে যাওয়া। ফালগুনে গাছের পাতা ঝরে যাওয়া। কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না, অকালে ঝরে যাওয়া সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সাহসী যোদ্ধা, নির্ভীক, নির্লোভ মানুষ আব্দুল হাকিম শিমুলের অকাল মৃত্যু। এমনিতেই সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। আমার মেয়ে, আমার সহকর্মি শিমুলের মৃত্যুতে সেও শোকাচ্ছন্ন। আমার মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছিল, পুলিশ বুলেট প্র“ফ জ্যাকেট পরিধান করে, মাথায় হেলম্যাট পরে। কোমরে পিস্তল থাকে, ঢাল থাকে আরো কত কিছু। অথচ তোমরা যারা সাংবাদিকতা কর তারা কেন বুলেট প্র“ফ পোশাক পরিধান করো না।

 সত্যিই তো সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ সাংবাদিক দুজনেই কাজ করেন। সেখানে পুলিশের প্রাণ রক্ষার সরঞ্জাম থাকে, অথচ সাংবাদিকের কিছুই থাকে না। আমরা যারা, মফস্বলে সাংবাদিকতার মতো ঝুকিপূর্ণ পেশায় আছি, তারা নানা সীমাবদ্ধতায় কাজ করেন। শিমূল তেমনই একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক যিনি কর্তব্য কাজকে অবহেলা না করে, সংবাদ সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।

সেখানে শিমুল যে ক্যামেরাটি ব্যবহার করেছেন সেটি ছিল সাধারণ ক্যামেরা। এ কারণে তাকে ঘাতকের কাছাকাছি যেতে হয়েছিল ছবি তুলতে। আর ছবিও তুলেছেন, সেই সাথে শিমুলের হত্যাকারী শাহজাদপুর পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর টার্গেটে পরিণত হোন শিমুল। মিরুর গুলি করার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার সাথে সাথে তার উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণের ঘটনায় তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শিমুল চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সে আর কোনদিনই ফিরবেন না। শিমুলে যক্ষের ধন মেয়ে তামান্না ও ছেলে সাদিক কাকে বাবা বলবেন ?

 তামান্না এখন ঘুমাবে কার কাছে? তামান্নাতো সারা রাত বাবাকে জড়িয়ে ঘুমাতে অভ্যস্ত। যতো রাতেই বাবা শিমুল বাসায় ফিরুক তামান্না, সাদিক জেগে থাকতো বাবার জন্য। এখন তামান্না ও সাদিক সারা দিন, সারা রাত জেগে থাকলেও অভিমানী শিমুল আর ফিরবে না। তাহলে ওরা দু ভাই বোন আর ঘুমাবে না! কতো দিন এভাবে বাবার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকবে।

   মনে পড়ে সদ্য প্রয়াত সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল প্রায়ই আমার কাছে হেঁসে হেঁসে বলতেন, আপনিতো অধ্যাপনা করেন, সচ্ছল আপনার পরিবার। কিন্তু আমার কি আছে? এ পৃথিবীতে আমার যে সম্পদ রয়েছে তা ৫ সেকেন্ডেই আমি বলে দিতে পারি। আমি জানার জন্য প্রশ্ন করলে ৪ সেকেন্ডেই বলে দিতো আমার সম্পদ  বলতে, আমার ছেলে সাদিক-মেয়ে তামান্না ও স্ত্রী নুরুন্নাহার বলে আবারও হাঁসতেন। সত্যি বলতে ওর বাসায় যখন আমি যাই, তখন ওর জীবন যাপন দেখে অবাক হয়েছি।

একজন সৎ সাংবাদিক কতো কষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন যাপন করেন। শিমুলের জীবনটাই ছিল যুদ্ধের। শিশুকালে বাবাকে হারিয়ে নানীর কাছে পৌর শহরে মাদলা গ্রামে বড় হতে থাকেন নানীর স্নেহ আদরে। প্রথম পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউসগাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। পরে শাহজাদপুর পাইলট উচচ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। পরে শাহজাদপুর সরকারি কলেজ হতে এইচ.এস.সি ও ডিগ্রী পাশ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে বাবার কোন সম্পদই তিনি পাননি।

 বর্তমানে তার সম্পদ বলতে নানী ও খালাদের দেয়া সাড়ে তিন শতাংশ বসত ভিটা। তার উপর টিনশেডের দুটি রুমের একটি বাড়ী। আসবাবপত্র নেই বললেই চলে। মুলত সাংবাদিকতার সম্মানি, স্ত্রী নুরুন্নাহারের সাথে দু-একটি দুধেল গাভী পালন আর এক বিঘা বর্গা জমি চাষ করে তার সংসার চলত। তবুও ওই বাড়ীর আঙ্গিনায় শত অপ্রাপ্তিতেও সূখের এক চিলতে চাঁদ হাসি মাখা মুখ নিয়ে দিন মান জেঁগে থাকতো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এতো স্বল্প সম্পদেও সূখের হাসি হাঁসতে শিমুল-নুরুন্নাহার দম্পতি আমার নিকট একটি দৃষ্টান্ত উদাহরণ।

 বাস্তবে শিমুলের অকাল মৃত্যুর পরবর্তীতে তার বাড়ীতে গিয়ে তার সহকর্মিরাও শিমুলের সম্পদ ছেলে সাদিক ও মেয়ে তামান্নাকে দেখে তারাও কেঁদেছেন অঝোরে। আসলে শিমুল যে সম্পদের কথা বলে গেছেন সেই দুই ছেলে মেয়ে ও স্ত্রী শিমুলকে হারিয়ে কিভাবে সংসার চালাবেন। কেমন করেই বা দু-ছেলেমেয়ের লেখাপড়া চালাবেন তা বলতে পারেন না।

 একজন সৎ নির্ভীক সাহসী সাংবাদিক হিসেবে আব্দুল হাকিম শিমুল যে শত-সহস্র শুভাকাঙ্খি রেখে গেছেন তারা কি বলতে পারবেন একজন সৎ সাংবাদিকের একমাত্র উপার্জনক্ষম পিতা হারা ছেলে-মেয়ে কি করবে আগামী দিনগুলোতে। এ প্রশ্নের উত্তর তার সহকর্মীরা দিতে পারেননি অবুঝ এতিম সাদিক ও তামান্নাকে। সেই সাথে আব্দুল হাকিম শিমুলকে একা ছাড়তে পারেননি তার নানী রোকেয় বেগম। নাতীর মৃত্যু শোকে একই দিনে মৃত্যুকে সংগি করে মূলত তিনিও নাতী শিমুলের সাথে পাড়ি জমিয়েছেন অজানার দেশে। সেই সাথে তার মৃত্যুতেও জেঁকে বসেছে ওই পরিবারে শোক।

জানা গেছে শিশুকালে মারা জান শিমুলের বাবা গোলাম হোসেন। এরপর নানী রোকেয়া বেগম সন্তানের মত করে স্নেহ, যতœ আদরে শিমুলকে মানুষ করেন। শিমুলের যা কিছু চাওয়া পাওয়া তার পুরোটাই পূরণ করতেন তার নানী। সেই সাথে তার মামা লতিফ মন্ডল, মজিদ মন্ডল ও নজরুল মন্ডল তাদের ছেলে-মেয়ের মতই ভাগ্নে শিমুলকে দেখাশোনা করতেন।

 কিন্তু সেই সদা হাস্য উজ্জ¦ল আব্দুল হাকিম শিমুল ঘাতকের বুলেটের আঘাতে অকালে ঝরে যান মাত্র ৪২ বছর বয়সে। শিমুলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর নানী রোকেয়া বেগম (৯০) কান্নাকাটি শুরু করেন। এক পর্যায়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় নাতীর লাশ দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নানী রোকেয়া বেগম নাতী শিমুলের সব সময় খোঁজ-খবর নিতেন। রাতে বাড়ী ফিরেছেন কি না, খাবার খেয়েছেন কি না এরকম হাজারো প্রশ্নে শিমুলের স্ত্রী নুরুন্নাহারসহ পরিবারের সবাইকে তটস্থ রাখতেন। সেই নানী, নাতী শিমুলের সাথী হলেন একই দিনে মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে তিনি মৃত্যুকে বরণ করেন।

 আর এজন্যই মাদলা গ্রামবাসী মাদলা কাকিলাবাড়ী কবর স্থানে পাশাপাশি দুটি কবরে শায়িত করলেন নানী রোকেয়া ও নাতী শিমুলকে। শিমুলের নানীর মৃত্যুর দায় ও সেই কুখ্যাত ঘাতক হালিমুল হক মিরুর একথা সবাই বলেছেন। শিমুলের অকাল মৃত্যুতে সরকারের যে সকল মন্ত্রী বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের কৃতি সন্তান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম যেভাবে শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন শিমুলের সহকর্মি হিসেবে তাঁর কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। সেই সাথে এই হত্যাকান্ডের বিচারের যে আশ্বাস সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দাবিতে দেশের সাংবাদিক ও সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সোচ্চার। বিগত দিনে সাগর-রুনীসহ অনেক সাংবাদিকের হত্যার বিচারের বাণী যেমন নিভৃতে কেঁদেছে, তেমনটি চাই না। আমরা চাই দ্রুততম সময়ে শিমুলসহ সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার। সেই সাথে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের পার্শ্বে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।  আমরা সমস্বরে বলতে চাই কাঁদতে আসিনি। ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।
লেখক ঃ প্রভাষক ও প্রয়াত সাংবাদিক
আব্দুল হাকিম শিমুলের সহকর্মী
০১৭১২-২৩৭৯৩৩

ট্রাম্প বিশ্বকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছেন

মায়ের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে এসেছে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি এলেই রফিক, সালাম, জব্বার, শফিক তোমাদের কথা মনে পড়ে যায়। বছরের অন্য মাসগুলোতে তোমাদের ভুলে না থাকলেও এই মাসেই তোমরা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠো। যেন ফিরে আসো আমাদের মাঝে সংগ্রামের চেতনায়। আমরা অনুভব করি, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। তোমরাই শিখিয়েছ, ‘একুশ মানে মুক্তি, দিন বদলের অঙ্গীকার’।

 
তোমরা সংগ্রাম করেছিলে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৯৫২-তে তোমাদের বুকের রক্তে আলপনা আঁকা হয়েছিল রাজপথে। সেই আলপনা আমাদের হৃদয়ে আজও গেঁথে আছে। আমরা আজও গর্জে ওঠার প্রেরণা পাই তোমাদের মত শত শহীদ, বীর সংগ্রামীদের কাছ থেকে। তোমাদের রক্তমাখা শার্ট এখনও আমাদের চেতনায় এগিয়ে চলার নিশানা। আমরা বলীয়ান, শত সংকট মাঝে দৃঢ় চিত্ত তোমাদের আত্মদানের নিদর্শন থেকে। মহান ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সকল শহীদ, সংগ্রামী বীর এবং সংগঠকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

 আমরা তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য এবং সর্বোপরি যে কোন সংকটে গর্জে ওঠার সাহস যোগানোর জন্য। তোমাদের নিবেদিত প্রচেষ্টার জন্যই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা, বিশ্বের বুকে আমরা দারিদ্র্য বিমোচনে সফলতার সাথে এগিয়ে চলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মুক্তির সংগ্রাম সম্ভবতঃ কখনও শেষ হবার নয়। দেশে দেশে একেক সময় একেকভাবে মুক্তির সংগ্রাম জাগ্রত হয়, রাজপথে মুষ্ঠিবদ্ধ হয় নারী-পুরুষের হাত, শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় কংক্রীটের সুউচ্চ দালান। যেমন শুরু হয়েছে আমেরিকায়।

 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর বিরু্েদ্ধ আমেরিকাসহ বিশ্বের দেশে দেশে আজ সমালোচনা-নিন্দার ঝড়। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ আজ উদ্বিগ্ন এক উন্মাদপ্রায়, মুসলিমবিদ্বেষী, যুদ্ধবাজ এক স্বৈরাচারের উন্মত্ততায়। গণমাধ্যমে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে, শীর্ষে তাঁর সমালোচনা। এই মানুষটি আজ শুধু সীমান্তের দেয়াল তুলছেন না, তিনি দেয়াল তুলছেন মানবতার ভেতরে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই সত্যকে ঢেকে দেয়ার জন্য তিনি সাত দেশের মুসলমানদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নিজের নির্বাহী আদেশটি আদালতের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লে সেটা মেনে না নিয়ে বরং নির্লজ্জভাবে সাফাই গাইছেন নিজের গোয়ার্তুমি আর প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্তের। ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি আজ নিজের দেশেই বিতর্কিত।

 আমেরিকার মানুষ এখন সম্ভবতঃ নিজেদের ভোটের মাশুল গুণতে শুরু করেছেন।  
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ধনকুবের। তিনি একাধিকবার নিজের ব্যবসায় আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন। টাকার গরমে তিনি এখনও ঘামছেন। নিজের অতীত ভুলে গিয়ে, নিজের ঘরে অভিবাসী (স্লোভেনীয়) বউ রেখে তিনি এখন স্বদেশী সাজার ভান করছেন। তিনি গণমাধ্যমের সামনে এমন সব ভাষায় কথা বলছেন যা ফ্যাসিবাদের কর্কশ ঝংকারের ফিরে আসার মত মনে হয়। দুর্ভাগ্য যে, তিনি এখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশের কর্ণধার। চিফ এক্সিকিউটিভ। তিনি চাইলে এক মূহূর্তেই নিউক্লিয়ার বোমার বোতাম টিপে গোটা বিশ্বকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে পারেন। এই রকম ক্ষমতাধর একটি পদে কিভাবে ট্রাম্প এর মত একজন বর্ণ, ধর্ম ও জাতি বিদ্বেষী ব্যক্তি নির্বাচিত হলেন তা ভেবে বিস্মিত বোধ করছি। আমাদের জীবন নিয়ে আফশোস নেই, কিন্তু প্রিয় সন্তানদের ভবিষ্যত নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন বোধ করছি।

 দূর অতীতে সামন্ত যুগে রাজ্যের মালিকানা থাকত রাজা বা স¤্রাটের হাতে। তিনি যা বলতেন সেটাই আইন। তিনি যা ভাবতেন, প্রজাদের জন্য তাই হতো প্রার্থনা। অনেক রক্ত, অনেক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে মানুষ সেই সামন্ত যুগের অবসান ঘটালেও বর্তমানের মার্কিন প্রেসিডন্ট যেন সামন্তপ্রভুর নয়া সংস্করণ। তিনি যেন অতীতের ভয়ঙ্কর স্বৈরাচারীদের সম্মিলিত প্রেতাত্মা। তিনি দেয়াল তুলছেন এবং দেয়াল তুলতেই থাকবেন একের পর এক। তিনি শুধু মুসলামানদের জীবনকে দুর্বিসহ করছেন তাই নয়, তিনি সাধারণ আমেরিকানদের জীবনকে ব্যয়বহুল ও অনিরাপদ করে তুলছেন। তাঁর কারণে আমেরিকায় সাধারণের ব্যবহার্য্য চাইনিজ বা মেক্সিকান পণ্যগুলোর মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। সে দেশে অল্পদিনের মধ্যেই বহু অভিবাসী বেকার হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এর ফলে আমেরিকান সমাজে অস্থিরতা ও সহিংসতা বেড়ে যাবে। এমনকি আমেরিকার বাইরে বহু দেশেই ‘আমেরিকান’ নাগরিকদের নিরাপদ চলাফেরা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

 আমেরিকার পাসপোর্ট থাকলেও এখন কেউ ইরানে প্রবেশ করতে পারবেন না, নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন না বিশ্বের অনেক দেশে। সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি এই ঘৃণা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রীতিকর হলেও ট্রাম্প সাহেব বিতর্কিত সব পদক্ষেপ নিয়ে সে পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই উন্মাদপ্রায় ক্ষমতাধর একনায়ককে এখন রুখবে কে? তিনি একজন রাষ্ট্রপতি হলেও তাঁর কূটনৈতিক শিষ্টাচার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্রতি অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল এর সাথে কথাবার্তার এক পর্যায়ে ধপাস করে টেলিফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখে সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়াও তিনি ফোন করে ধমকেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিকে পিয়ে নিয়েত্তো-কে। কথায় কথায় ধমক দিয়ে কথা বলা এই মান্যবরের স্বভাব।

 তিনি যে ক্ষমতাধর ‘ট্রাম্প কার্ড’ সেটা বুঝিয়ে দেয়ায় যেন তার এখনকার লক্ষ্য। ভোটে জিতে তিনি যেন সমগ্র বিশ্বের অধিশ্বর হয়েছেন এমন ভাব দেখাচ্ছেন। এটা সত্যিই বিরক্তিকর। এটা ঠিক যে, বাইরে সব ‘ফিটফাট’ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে আমেরিকার অর্থনীতি ‘সদর ঘাট’ হয়ে পড়েছে। হাঁফিয়ে উঠেছে সে দেশের অর্থনীতি। জিডিপি স্থবির। এমতাবস্থায়, নতুন করে শরণার্থী গ্রহণে অস্বীকৃতি বা ইতোমধ্যে গৃহীত শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর মত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো হবে শিষ্টাচারের মাধ্যমে, কূটনৈতিক, মানবিক বিষয়গুলো বিবেচনায় করেই। আমেরিকার রাষ্ট্রপতির কাছে আমরা কখনই এমন আচরণ প্রত্যাশা করি না যা একজন মুর্খ ও গোয়ার স্বৈরাচারের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণ করেই যা শুরু করেছেন তা দেখে বিশ্ব আজ শঙ্কিত। পৃথিবীর বুকে যেন আঁধার নেমে আসছে। বিভাজনী দানব মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।

নাগরিকত্বের বিভাজনের সাথে সাথে তিনি ধর্মের বিভাজনকে বাড়িয়ে তুলতে উসকানি দিচ্ছেন। তিনি সযতেœ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বিভাজনের প্রাচীর। বড় অদ্ভুত এই আঁধার! ইউরোপের শাসকেরা একদিন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বলে যে তত্ত্ব চালু করেছিলেন, আজ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তাই পরম মমতায় আঁকড়ে ধরেছেন। ট্রাম্প সাহেবের ছড়িয়ে দেয়া আতঙ্কে আজ গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত, আতঙ্কিত বোধ করছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ট্রাম্প এর নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকলেও কখন কি হয় সেই উদ্বেগে অস্থির হয়ে আছেন বাংলাদেশী নাগরিক এবং বাংলাদেশী বংশদ্ভুতেরা।

এমন কি যাঁরা স্বল্প সময়ের ভিসা নিয়ে সেদেশে বেড়াতে যেতে চান তাঁরা রয়েছেন নানা উৎকণ্ঠায়। কখন কি হয় বলা তো যায় না, এমন কি আমেরিকার এয়ারপোর্টে পৌঁছার পরও ভোগান্তির মুখে পড়তে হতে পারে। এই উদ্বেগ থেকে বিশ্ব সম্প্রদায়কে নিপরাদ রাখতে হলে মার্কিন প্রশাসনকেই উদ্যোগী হতে হবে। অথবা এগিয়ে আসতে হবে মার্কিন নাগরিকদেরই যাঁরা ভোট দিয়ে তাঁদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছেন।

 অন্ধকারে হবে সেটাই হবে আমাদের আলোকবর্তিকা। মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা কি সংকটের সবটুকু নাকি শুরু মাত্র? প্রশ্নটা এখন অনেকের মনে। এরপরে ট্রাম্প কি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে ‘মহান’ বানানোর জিকির তুলেছেন। অথচ তিনি ভুলে গেছেন যে রেড ইন্ডিয়ানদের বাদ দিলে ‘আমেরিকান’ বলে কেউ নেই। আজ যাঁরা মহান আমেরিকা’র জিকির করছেন তাঁদের পিতামহ বা পূর্ব পুরুষেরা যে অভিবাসী হিসেবেই আমেরিকায় প্রথম পা দিয়েছিলেন সে কথাটা মনে রাখা উচিত। এটা শুনতে ঠাট্টার মত মনে হয় যখন হাতে ‘রোলেক্স’ ঘড়ি নিয়ে জাপানী ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে ‘স্বদেশী’ হবার আহ্বান জানান। এটা বিশ্বায়ন ধারণার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং অবাস্তব। কারণ বর্তমানের আমেরিকা সকলের শ্রম ও মেধায় গড়ে ওঠা অভিবাসীদের দেশ।

 এই দেশটা গড়ে তুলেছেন তাঁরাই যাঁরা একদিন এদেশে এসেছিলেন অভিবাসী বা দাস হয়ে। আগামীর আমেরিকাকে সম্ভবতঃ তার স্বার্থেই এই দরজা খুলে রাখতে হবে। অন্যথায় বিরাট এক আইনী জটিলতায় জড়িয়ে যাবে মার্কিন প্রশাসন। এমনকি আবার রক্তক্ষয়ী হানাহানিও দেখা দিতে পারে! সন্দেহ নেই যে, ট্রাম্প সাহেব ক্ষমতায় এসেই দুনিয়াব্যাপী একটা হৈ চৈ বাঁধিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বের নজর কাড়ার জন্যই তিনি এটা করেছেন এটা মানা যায় না। নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে তিনি বরং নিজের এবং তাঁকে যারা রাষ্ট্রপতি হতে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে চাচ্ছেন।

ইতিহাস বলছে রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় এলেই বিশ্বে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। কারণ অস্ত্র ব্যবসা এবং তেলের মজুদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই এই ধনকুবেরদের অন্যতম লক্ষ্য। ইতোমধ্যেই চীন ডংফেং-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে এক ধরনের হুঁশিয়ারী দিয়েছে। প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে সক্ষম ডংফেং-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র। তবে কি আমরা এবার পূবের দিকে কোন অশনি সংকেতের আভাস টের পাচ্ছি? পত্রিকায় প্রকাশ রুশ সীমান্তের কাছে চীন এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। আর রাশিয়ার দাবি, সে ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার দিকে তাক করা রয়েছে।

 অন্য একটি সূত্রের মতে, এগুলো তাক করা আছে জাপান, ভারত এবং আমেরিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের দিকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকা-চীন সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার বদলে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব জুড়ে দিয়েছেন। ফলে চীন এখন পাল্টা হুঁশিয়ারি দিতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। আর তাছাড়া ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা তো রয়েছেই।
 
আমেরিকার প্রশাসন কোন পথে হাঁটছে সেটা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। কারণ এই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে আমেরিকার মিত্র প্রায় অন্যান্য দেশও একই ধরনের পদক্ষেপ নিবে। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি নানা ধরনের আইনী জটিলতায় সংকুচিত হয়ে যাবে মানুষের চলাচল। একের পর এক বিভাজনের দেয়ালে আটকে পড়ে মানুষ আরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার সকলেরই আছে। সকল রাষ্ট্রনায়কেরই উচিত তাঁর নিজের দেশের জনগণের সুরক্ষা করা।

 কিন্তু বাইরে আগুন জ্বালিয়ে রেখে ঘরের ভেতরে অগ্নি নিরোধক ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করে সুরক্ষা হবে কিভাবে? শুধু মুসলমানদের টার্গেট করে ট্রাম্পের পথে যদি কেউ হাঁটেন তিনি যতই দেশপ্রেমিক হোন না কেন তাতে নাগরিকদের কোন মঙ্গল হবে না। জঙ্গি সমস্যা দুনিয়ার একমাত্র সমস্যা নয়। এরও চেয়ে বড় ক্ষুধা ও দারিদ্রের সমস্যা। সম্পদ বৈষম্য ও সুযোগের বৈষম্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার একচ্ছত্র ব্যবহার ইত্যাদি সমস্যাগুলি সমাধানে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা বিশ্ব নেতাদের কাছে সেই অঙ্গীকার প্রত্যাশা করি। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করা নয়।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১৫২৬৯৭৯

আমি ড্রাইভার : আমার গাড়ির যাত্রী হবেন?

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মরছে। কেউ কিছু বলছে না। আগে পত্রিকায় ফলাও করে এ সংবাদ ছাপা হতো। এখন কোনটা ছাপে; কোনটা আবার ডাস্টবিনে স্থান পায়। ভাবটা এমন যেন কারো কোন দায় নেই। এমন বিষয়েই সেদিন আমার মেডিক্যাল পড়–য়া ছেলেটা  পত্রিকা পড়ার ফাঁকে নাস্তার টেবিলে বলছিলো-‘বাবা লক্ষ করেছ দুর্ঘটনা এখন কোন বিষয় নয়।

এ ব্যাপারে সবাই যেন স্বাভাবিক। অথচ হাসপাতালগুলোতে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনার রোগি ভরপুর দেখছি।’ উত্তরে আমি একটি কথা বলেছিলাম- ‘একটি কাজ করতে পার? ডাক্তারির পেশার পাশাপাশি অবসর সময়ে ড্রাইভিং কর। শিক্ষিত মানুষ ড্রাইভিংয়ে এলে আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। এও বলেছি ড্রাইভিং বা ড্রাইভারি এদেশে মর্যাদার কোন কাজ নয়। তাই শিক্ষত মানুষ এ পেশায় আসতে চান না। ইংলেন্ড, আমেরিকা, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইলেন্ড এমনকি ভারতের মত দেশেও এ পেশায় শিক্ষিত লোকজন রয়েছে অনেক।

 সেখানে এ পেশাটিতে মর্যাদা আছে বলেই সবাই সাচ্ছন্দে এ কাজ করছে। আমাদের দেশে একজন বেকার শিক্ষিত মানুষ না খেয়ে পথে পথে ঘুরে। চাকুরি না পেয়ে ৫/১০ হাজারর টাকার একটি অফিস সহকারির চাকুরিতে তুষ্ট থাকে, পক্ষাণান্তরে অনায়াসে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা  সহজেই আয় করা যায় যে ড্রাইভিং পেশায় সেখানে কেউ আসতে চায় না। সবাই ড্রাইভার বলে নাক শিটকায়। ড্রাইভারের কাছে কেউ মেয়েকে বিয়ে দিতে চায় না।

 এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এ পেশাকে মর্যাদাশীল করতে হবে, তাহলে আমাদের দেশেও শিক্ষিত মানুষ ড্রাইভিং পেশায় যুক্ত হবেন। আমি  সেদিন আমার ছেলেকে পাটাইম ড্রাইভার হতে অনুরোধ করলে, সেও উল্টো বললো- ‘তুমিওতো অবসরে ড্রাইভার হতে পার? তুমি এ কাজ করলে মানুষ আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবে। এ পেশার মর্যাদা অবশ্যই বাড়বে।’ ওরা কথাটা ঠিকই। আমরা যারা সমাজের কিছুটা নেতৃত্ব  স্থানে আছি তারা সবাই মিলে ড্রাইভিং পেশাকে মর্যাদাশীল করতে ভুমিকা রাখতে পারি।  আমরা শিক্ষিত বেকার মানুষকে এ পেশায় সম্পৃক্ত করে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে পারি।


সম্প্রতি কালে রাজধানী ঢাকায় ‘উবার টেক্্ির সার্ভিস’ আমাকে বেশ আশাম্বিত করেছে। আমি নিজেই এ সার্ভিস নিচ্ছি। এতে আমি খুবই উদ্দীপ্ত বোধ করছি। এ সার্ভিসে এখন শিক্ষিত মানুষ যুক্ত হচ্ছেন। উবারের লক্ষ্য হচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষিত বেকার গেষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করা, শহরগুলোতে চলাচল সুগম করা এবং যানজট ও বাযুদূষণ কমানো। যদিও উবার সার্ভিসের ব্যাপারে সরকারের যথেষ্ট আপত্তি ছিলো। সরকার ভালোটা বুঝতে পেরে উবারের কার্যক্রমে আর বাঁধ সাধছে না।  আসলে ‘উবার’ নামের যে ‘অন-ডিমান্ড’ ট্যাক্সি সেবা সারা পৃথিবীর বড় শহরগুলোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

 বাংলাদেশেও তা সারা ফেলবে। এ ট্যাক্সি সার্ভিসের মাধ্যমে শিক্ষিত মানুষ ড্রাইভিং পেশায় যুক্ত হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলে শিক্ষিত মানুষ ড্রাইভিং পেশায় এলে কি লাভ। যারা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার কওে তার একটু বেশিই বোধ-বিবেক শক্তি সম্পন্ন হয়। আইন মানার প্রবনতা তাদেও মধ্যে অনেক বেশি থাকে। ড্রাইভিং যথেষ্ট জ্ঞানের সাথে করতে হয়। একটু এদিক সেদিক হলেই জানমালের ক্ষতি হয়।

 শিক্ষিত লোকের জ্ঞান বেশি এটাতে আর বলার অপেক্ষ রাখে না।
এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক নয়, তা হচ্ছে মানবসৃষ্ট কারণে। এই হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা পরোক্ষভাবে হত্যারই শিকার। কিন্তু হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার কাঙ্খিত উদ্যোগ নেই। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। এরশাদ সরকারের আমলে সড়ক দুর্ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলে সরকার গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে।

এতে চালকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটলে চালককে নরহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করার বিধান রাখা হয়। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে পড়ে তা রহিত করতে বাধ্য হয় সরকার। দায়ী চালকদের শাস্তি না হওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক কর্তৃক গাড়ি চালানো, আনফিট গাড়ি রাস্তায় চালানো, সড়ক যোগাযোগে অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত চালকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর উদাহরণ খুব অনুজ্জ্বল। সব ক্ষেত্রেই দায়ী চালকরা পার পেয়ে গেছে।

 সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেছে ৩৪ হাজার ৯১৮ জন। প্রতি বছর মারা যায় ৩ হাজার ৪৯১ জন। থানায় মামলা হয়েছে এমন দুর্ঘটনার হিসাব নিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে দায়িত্বশীলদের তরফে। বেসরকারি হিসাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ২০ হাজার ৩৪ জন। প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছে প্রায় ৫৫ জন। সরকারি তথ্য ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান থাকার কারণ হলো, দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ৬৭ ধরনের প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়।

এ ঝামেলার কারণে অনেক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি যথাযথভাবে রেকর্ডভুক্ত হয় না। পুলিশের দেয়া তথ্যানুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ১৪০ জন। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে ১ হাজার ১৮৬ এবং সামান্য আহত হয়েছে ১৫৭ জন। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৭৪৮টি। মারা গেছে ৫২ হাজার ৬৮৪ জন। আহত ও পঙ্গু হয়েছে আরো কয়েক হাজার মানুষ। ২০০৯ সালে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এশিয়া, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার ১৫টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার নেপালে বেশি, দ্বিতীয় বাংলাদেশে। সবচেয়ে কম হার যুক্তরাজ্যে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের দুর্ঘটনায় নেপালে মারা যায় ৬৩ জন এবং বাংলাদেশে ৬০ জন। যুক্তরাজ্যে এ হার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ।


সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতির সাম্প্রতিক এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় ফি বছর ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদহানি হয়। এই হার দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৯৫ শতাংশের সমান। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় শতকরা ৫০ ভাগ বেশি। অন্য এক গবেষণা জরিপ থেকে জানা যায়, ৪৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী যাত্রীবাহী বাস, ৩৭ শতাংশ দায়ী ট্রাক। দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি বিশেষ বাহিনী গঠন করা যায়, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এ জাতীয় বাহিনী গঠন করা হচ্ছে না কেন? জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম মূল কারণ। সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ২. গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন, ৪. ট্রাফিক আইন না মানা, ৫. সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা, ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা এবং ৭. অরক্ষিত রেললাইন। কথা হলো, যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক।

 মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয় তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টায় এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির নিরসন করতেই হবে। এভাবে চলতে পারে না। এভাবে মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে পারে না। পঙ্গুত্বের মতো দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়ে মানুষ জীবন কাটাতে পারে না। কারণগুলো যেহেতু চিহ্নিত সেহেতু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দুরূহ হবে কেন?


পাঠক একটি প্রশ্ন কিন্তু সামনে আসে। দেশে সমন্ত্রাস দমনে র‌্যাব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, শিল্প রক্ষায় শিল্প পুলিশ, নৌপথ সুরক্ষায় নৌপুলিশ তাকলে সরকে মানুষ রক্ষায় এ জাতিয় বাহিনী এখনও কেন গঠন করা হয়নি? যেভাবে সড়কে মানুষ মরছে তাতে দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি বিশেষ র‌্যাব বাহিনী গঠন করা যায়, দুর্ঘটনা রোধে এ জাতীয় বাহিনী নয় কেন? এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে সন্ত্রাসীদের হাতে শতকরা ৩০ জন লোক মারা গেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৭০ জন। ৩০ জনের জীবনসহ অপরাপর জানমাল রক্ষায় সরকারের একটি বাহিনী থাকলে শতকরা ৭০ জনের জানমাল রক্ষায় সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাহিনী গঠন করছে না কেন? দেশের মানুষের জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দুর্ঘটনা রোধে চরমভাবে ব্যর্থ সরকারকে দেশের মানুষের স্বার্থে যথাসম্ভব দ্রুত ভাবতে হবে।


আমরা জানি দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, ঘটবেও। কেন তা রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকাল মৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শিক্ষিত মানুষদের ড্রাইভিং পেশায় সম্পৃক্ত করতে হবে, এটি নিয়েও সরকার ভাবুক এটা আমরা চাই। এ ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিক, সচেতন, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
হবংিংঃড়ৎব১৩@মসধরষ.পড়স  
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮

একদা এই দেশে অনেক নদী ছিল

নদী এই দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ। নদীমাতৃক ও কৃষি প্রধান দেশ হওয়ার কারণেই আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। ছাপান্ন হাজার বর্গ মাইলের এই বঙ্গিয় ব-দ্বীপে এক সময় নদীই ছিল প্রাণ। নদীগুলোই ছিল এই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি এবং এককালের যাতায়াতের মূল মাধ্যম। আমাদের কৃষি প্রধান দেশের সেচ নির্ভর ফসল উৎপাদনের প্রাণও ছিল এই নদীগুলো।

তবে এখন সবই অতীত। নদী নিয়ে গর্ব করার দিন প্রায় শেষ। দেশে এক সময় পনেরশোর মত নদী ছিল। ¯্রােতস্বিনী এইসব নদী ছিল এই দেশ ও মানুষের জন্য আশির্বাদ। নদীতে নির্ভরশীল এদেশের বিশাল জনগোষ্ঠি। আজ গর্বের নদীগুলো এত বেশি খর্ব হয়েছে যে, নদী নিয়ে আজ আর কোন গল্প, কবিতা, গান হয় না। দখল, দূষণে আমরা নদীগুলোকে হত্যা করছি। হত্যা করছি নদীর উপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকা। নষ্ট করছি পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। মিঠা পানির আধার এই নদীগুলো আজ জীর্ণশীর্ণ, মৃতপ্রায়। মরা নদীর সাথে মরছে নদীর উপর নির্ভরশীল মানুষগুলো।

এছাড়াও বিলুপ্তির পথে আমাদের খাদ্য তালিকায় থাকা আমিষের সবচেয়ে বড় উৎস দেশিয় নানা জাতের সুস্বাদু মাছসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণি। জাতীয় মাছ ইলিশও তার স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণ হারাচ্ছে অতিমাত্রায় নদী দূষণের কারণে। এছাড়াও বিচিত্র রকমের জলজ উদ্ভিদও আজ বিপন্ন প্রায়। মানুষের যাপিত জীবন ও দস্যুতার কারণেই নদীগুলোর আজ করুণ চেহারা। আর নদীগুলোকে সময়মত বাঁচাতে না পারলে দাদী-নানীর মুখে শোনা গল্পের মত নদীগুলোও একসময় রূপকথায় পরিণত হবে।  
এক সময়ের পনেরশো নদীর মধ্যে এখন বাংলাদেশে সর্বসাকুল্যে ২৩০টির মত নদী আছে।

 পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কর্ণফুলি, ব্র?হ্মপুত্র, করতোয়াসহ অসংখ্য নদী, উপনদী, শাখা নদী এবং অন্যান্য নদী মিলেই এদেশের বিশাল ও বিস্তৃত নদী নেটওয়ার্ক গঠিত। এইসব নদীগুলো ছিল প্রশস্ত, গভীর, বর্ষাকালে প্রমত্তা। দু’একটি বাদে এখনকার নদীর যে চিত্র, তা শুধু তিন মাস বা ছয় মাসের পানি প্রবাহ ধরে রাখতে সক্ষম। নদী তার প্রকৃত নদীর চেহারা নিয়ে বারো মাস তার রূপ ধরে রাখতে পারছে না।

 হতশ্রী, করুণ, রুগ্ন, বিপর্যস্ত নদীগুলোর দিকে তাকালে দৃষ্টির পীড়া হয়।
বর্তমান নদীগুলোর মধ্যে ১৭টি নদী শুকিয়ে একেবারে মৃতপ্রায়। এছাড়াও ৮টি নদী বিপর্যস্ত ও মৃতাবস্থায়। এসব নদীর মধ্যে সর্বসাকুল্যে একশোটির মত নদীতে কোনমতে নৌ চলাচলের মত অবস্থা এখনও টিকে আছে। দেশ স্বাধীনের পর এদেশে নদী পথ ছিল প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটারের মত। পানি প্রবাহ কমতে কমতে এখন তা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারে। এই নদী পথের সংখ্যা খুব দ্রুতই কমছে।

 এই ২৩০টি নদীর মধ্যে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। এরমধ্যে আবার ৫৪টি নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতে। আমরা ভাটির দেশ হওয়ার কারণে এই ৫৪টি নদীর পানি প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে ভারতের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের পানির ক্ষেত্রে নদী প্রবাহের অবদান ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ, বৃষ্টির পানি ২৩ শতাংশ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের এই বড় বড় নদীগুলোই কৃষি সেচের পানি যোগানের বৃহৎ উৎস ছিল। টিকে থাকা অল্প সংখ্যক নদীগুলো বর্ষাকালে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত করে। যা শুকনো মৌসুমে কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার ঘন মিটারে। কম বেশি মিলে সারা বছরের এই সামগ্রিক পানি প্রবাহ আমাদের নদী নির্ভর মানুষ, কৃষি এবং আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবাহ ও জীবনমানকে সচল রেখেছে।


পরিতাপের বিষয় আমাদের সবগুলো নদীই আজ ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত। দখলবাজ এবং দূষণকারিদের কবল থেকে কোনভাবেই আর এই নদীগুলোকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। তার উপর আছে প্রতিবছর বর্ষার সময় উজান থেকে নেমে আসা পলি মাটির স্তর। এই পলির স্তর নদীর তলদেশে পড়ে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত করছে। যার কারণে বর্ষাকালের সময় ও শেষে নদীগুলো আর আগের মত পানি ধরে রাখতে পারছে না। যার দরুণ বন্যার ব্যাপকতার চেয়ে নদী ভাঙন তীব্র হচ্ছে। নদী বিপর্যয়ের আরো কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, উজানে পানি প্রবাহ হ্রাস, নদী ভাঙন, নদী দখল করে বেষ্টনী স্থাপন, বৈশ্বিক পরিবেশগত বিপর্যয়। আমাদের দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়েতো বটেই এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে নদীর স্বাভাবিক গতিপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে।

 এছাড়াও আছে মাত্রাতিরিক্তহারে নদী দূষণ। শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, নৌযান নিঃসৃত ময়লা, বর্জ্য ও তেল, দীর্ঘস্থায়ী জৈবদূষক পদার্থ, শহুরে বর্জ্য, প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ও পলিথিন, দখলদারদের বর্জ্য, হাসপাতালের বিষাক্ত বর্জ্য, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণির মলমূত্র, মৃতদেহ, গাছগাছালির লতা-পাতা, কচুরিপানা, নদী ভাঙনের মাটি, ভাঙ্গা নৌযান, মাছ ধরা ও নির্মাণ সামগ্রি, শিল্প কারখানার নিঃসৃত গরম পানি ইত্যাদি ক্ষতিকর উপকরণে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ঘটছে নদীর পরিবেশ বিপর্যয়। বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ি, ঢাকার আশেপাশের তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা ও বালু নদীতে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার শিল্প কারখানা থেকে কমপক্ষে ১ কোটি ৫০ লাখ ঘন মিটার শিল্প বর্জ্য আসে।

 আর অন্যান্য উৎস থেকে আসে আরো অন্তত ৫০ লাখ ঘন মিটার বর্জ্য। দীর্ঘদিন ধরে এই দূষণ ঘটেই চলছে। ২০০৮ সালের এক সরকারি গবেষণা মতে, বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে জমা আছে ৯ থেকে ১২ ফুট পলিথিনের স্তর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)’র এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ি, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নদীর পানি সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। আর নদী অববাহিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত গঙ্গা অববাহিকার পানি। এই প্রতিবেদনে পানি নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে আরো দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের মাটির ওপরের এবং নিচের দুই ধরনের পানির অবস্থাই খারাপ। নদীর পানিদূষণে শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোর ৮০ শতাংশ পয়োবর্জ্য কোন প্রকার পরিশোধন ছাড়াই নদীর পানিতে ফেলা হয়। এরফলে দেশের নদীগুলোতে রাসায়নিক পদার্থের দূষণ ব্যাপকহারে বাড়ছে। এতে করে নদীগুলো দিন দিন আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।


এছাড়াও দেশে নদী দখলের চিত্র আরো ভয়াবহ। নদী তীরবর্তী সুবিধাভোগী প্রত্যেকটি মানুষ আজ নদী দখলের সাথে যুক্ত। এই নদী দখল মহোৎসবে এগিয়ে দেশের সব সময়ের ক্ষমতাসীনরা। দেশের যেসব নদী শহর ও বন্দরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তার কোন অংশই আর সুরক্ষিত নেই। বিভিন্ন ধরনের স্থাপনার মাধ্যমে দখল প্রতিযোগিতা চলছে দেশের প্রতিটি নদীতে। নদী ভরাট করে ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, মাছ চাষের নামে নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, কালভার্ট, স্লুইসগেট, ক্রসবাঁধ দেয়া। নদীর তীরে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে তোলার প্রবণতা। অনুমোদন ছাড়া নদীর তীর ঘেঁষে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা, পরবর্তিতে তা নদীর পানি প্রবাহের গতিপথ রোধ করে স্থাপনা বিস্তার ঘটানো ইত্যাদি। দেশের নদীগুলোর উপর মানুষের ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুর আচরণ এবং অত্যাচারের ফলে নদীগুলো মানুষের জন্য বিষে পরিণত হচ্ছে।


নদীর উপর আমাদের এইসব অভ্যন্তরীণ নিষ্ঠুরতা, নিদারুণতা ছাড়াও আমরা আন্তর্জাতিকভাবেও নদী নির্যাতনের শিকার। বহু দিনের তিস্তার পানি অধিকার আমরা এখনও আদায় করতে পারিনি। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও আমাদের শঙ্কার শেষ নেই। গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি হলেও সর্বাংশে তার বাস্তবায়ন এখনও দৃশ্যমান নয়। এছাড়াও আমাদের উজানের দেশ ভারত সম্প্রতি তার আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু করেছে। ভারতের এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশের নদীগুলো পানিশুণ্য হয়ে পড়বে।

যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ি একতরফাভাবে ভারত এটা করতে পারেনা, করলেও বাংলাদেশের অনুমতি প্রয়োজন। ভারতের এই পরিকল্পনায় ৩৭টি নদীকে ৩০টি সংযোগ খালের মাধ্যমে যুক্ত করা হবে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ব্র??হ্মপুত্র ও গঙ্গাকে সংযুক্ত করে উত্তরের পানি দক্ষিণে এবং পুবের পানি পশ্চিমে নিয়ে যাওয়া। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মরুতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। পানি শূন্য হবে আমাদের নদীগুলো। যার ফল হবে ভয়াবহ। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ও উদ্বেগের কারণ আছে। এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি করবে তা ভারতীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে বোঝাতে হবে। আর এই বোঝানোর কাজটি খুব দ্রুতই সম্পন্ন করতে হবে।

কারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। মরা ও মরু দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ।            
আমরা সভ্য যুগের মানুষরা প্রাকৃতিক জীবন ছেড়ে যতই নগর জীবনে প্রবেশ করছি, ততই অবহেলা, অবজ্ঞায় কিংবা অবচেতনভাবে অথবা সচেতনতার অভাবে এই নদীগুলোকে ধ্বংস করছি। এছাড়াও আছে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে নদীর পরিবেশ নষ্ট করা। দেশের মধ্যে প্রবাহমান সবগুলো নদীই আজ মৃতপ্রায়। অসংখ্য নদীর ¯্রােতে গড়ে ওঠা এই বাংলায় আজ বেশিরভাগ নদীই ফসলের জমি বা খেলার মাঠ। যে সামান্য কয়েকটি নদী আজও টিকে আছে তাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে দখলবাজ ও দূষণকারিদের বিরুদ্ধে।

 কিন্তু শুধু টিকে থাকার জন্য নদীর এই একতরফা লড়াই বড় বেশি অসামঞ্জস্য। এখনই জাতীয় স্বার্থে ভবিষৎ প্রজন্ম ও বাংলাদেশের কথা মাথায় রেখে নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, দূষণরোধ, দখলমুক্ত ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে নদীর স্বাভাবিক চেহারা ফিরে নিয়ে আসতে হবে। নদী বাঁচলে আমরা বাঁচবো, বাঁচবে কৃষি, কৃষক আর আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। তাই আর কালক্ষেপণ না করে সরকারসহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রক্ষা করতে হবে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই সম্ভাবনাময় নদীগুলোকে। আর তা না হলে রূপকথার গল্পের মত বলতে হবে, একদা এই দেশে অনেক নদী ছিল।    
লেখক ঃ সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
ংযধড়হি০৭৭@মসধরষ.পড়স
০১৭১৬-২২৪৮১০

‘আরাকান’ রাজ্য বাংলাদেশেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ

অনেক ঐতিহাসিকের মতে খৃষ্টপূর্ব ২০০০ সালে আরাকানের জনমানবহীন বনজংগল পাহাড় টিলা আবৃত এলাকায় আর্য বাঙালি রোহিঙ্গারা বসতি স্থাপন করে। খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সালে রোহিঙ্গা বাঙালিরা উত্তরের নদী ও সাগর বেষ্টিত সমতল ভূমিতেও বসতি স্থাপন করে। আবার কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতো খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সালে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের অধিবাসী বাঙালিরা প্রাচীন বঙ্গের অন্তর্গত সর্ব দক্ষিণের আরাকান রাজ্যে বসতি স্থাপন করে।

 পরবর্তীতে তারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত হয়। রোহিঙ্গাদের নচাট বাংলি (যারা নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলে) নামেও অভিহিত করা হয়। প্রাচীন বঙ্গ বঙ্গভূমি নামেও পরিচিত ছিল। আর এই বঙ্গভূমির অধিবাসী আদিবাসী শুধু বাঙালিরাই ছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসন আমলের শুরুতে ইংরেজ বাহিনীর অভিযানের কারণে আসাম ও উত্তরের পাহাড়ি এলাকা থেকে বিভিন্ন উপজাতিরা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করে উপজাতি নামে পরিচিত হয়। প্রাচীন বৃটিশ সাম্রাজ্যের মানচিত্র অনুযায়ী উত্তরে চীন, রাশিয়া, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বে চীন সীমানা কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, পশ্চিম পারস্য (ইরান) সীমানা পর্যন্ত বৃটিশ সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন বৃটিশ মানচিত্রে ভারতবর্ষের পূর্ব দিকে বিহার, উড়িষ্যা, অসম, বঙ্গ ও বার্মাকে দেখানো হয়েছিল।

 অবশ্য বৃটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণে থাইল্যান্ড (ব্রহ্মদেশ) ও মালয়েশিয়া (মালয়) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীরা বেঙলি বা বাঙালি নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন বঙ্গ বা বাংলার সীমারেখা ছিল পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সকল জেলা উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলাগুলি সহ আসামের কাছাড়, করিমগঞ্জ, বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, সিলেট পূর্বে ত্রিপুরা, পার্বত্য ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দক্ষিণ পূর্বে আরাকান যার আদিবাসী অধিবাসীরা রোহিঙ্গা বাঙালি। বঙ্গ বা বাংলার সর্ব দক্ষিণে বঙ্গপোসাগর।  


১৯৪৭ সালে ১৫ই আগস্ট ভারতবর্ষ ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ধর্মীয় দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। কিন্তু ভাষাগত জাতিগত তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়নি। যার ফলে পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারত বা ইন্ডিয়া এই তিনটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অপরদিকে বার্মা বা মায়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে। আর প্রাচীন বঙ্গ বা বাংলা তিন চার টুকরোয় বিভক্ত হয়ে যায়। বাংলার পশ্চিম অংশ ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, মধ্যপূর্ব অংশ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) উত্তর পূর্বের কিছু অংশ ভারতের আসামের মধ্যে পড়ে আবার দক্ষিণ পূর্বের কিছু অংশ অর্থাৎ ‘আরাকান’ বার্মা বা মায়ানমারের মধ্যে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে বাঙালি জাতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যবইয়ের ‘আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধটি স্থান পায়।

 এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি মহাকবি আলাওল আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এছাড়া আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বার্মা অর্থাৎ মায়ানমারের সামরিক শাসকবর্গ দেশ, রাজ্য, প্রদেশ, জেলা ও এলাকার ১০০০ এর অধিক নাম পরিবর্তন করে এবং বার্মার নাম ‘মায়ানমার’ আরাকানের নাম ‘রাখাইন’ রাখা হয়। গত ১১ নভেম্বর ২০১৬ সালে রাখাইন অর্থাৎ আরাকান প্রদেশে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাঙালির বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক কালো দিন। এই দিন আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে শহীদ হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেনাবাহিনী সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির সুরক্ষা করা।

 প্রয়োজনে সেনা অভিযানের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বাঙালি জাতির স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের রাজনীতিতে নাক গলানো নয়। আবার রক্ষী বাহিনী সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল দেশের এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা করা। তেমনি পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। ১৯৭৬ সালে প্রথম দিকে রোহিঙ্গা বাঙালিদের উপর নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়।

 রোহিঙ্গাদের উপর সবচাইতে বর্বর নির্যাতন শুরু হয় ১৯৮২-৮৩ সালে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাঙালিকে হত্যার পর তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে বাস্তুচ্যুত করে সাড়ে তিন থেকে চার লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয় উদ্বাস্তু শরণার্থী করে। নোয়াখালী চট্টগ্রামবাসী বাঙালিদের ৪,০০০ (চার হাজার) বছরের আদি বাসস্থান আরাকানকে বাঙালি শূন্য করার ষড়যন্ত্র নিয়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে মায়ানমারের সামরিক জান্তা। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। দেশে-বিদেশে বাঙালি হত্যা-নির্যাতনের সংবাদে বঙ্গবন্ধুর অন্তর ব্যথিত ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতো। জাগো বাঙালি জাগো। অন্যায় অত্যাচার হত্যা নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধের সময় এসেছে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-গবেষক
০১৮৬২-৪৮১৯৯৭

উচ্চ সুদহার বিনিয়োগে বাধা

দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেকটাই নেতিবাচক। কারণ বিনিয়োগ বাড়লে ব্যাংকগুলোয় অলস টাকার পাহাড় জমা থাকার কথা নয়। যেহেতু ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার পরিমাণ পাহাড় সমান, সেহেতু খুব সহজেই ভাবা যায় বিনিয়োগ বাড়েনি। অথচ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো খুবই জরুরি। মূলত বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিল্প স্থাপনা উপযোগী জমির অভাব বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে যে বড় অন্তরায়, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তুু গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ খাতে পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জিত না হলেও শিল্প স্থাপনের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এখন অনেকাংশেই সম্ভব হয়েছে। এক সময় বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকলেও এখন আর সে কড়াকড়ি পরিস্থিতি নেই। যে কেউ চাইলেই শিল্প-বাণিজ্য, সেচে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে পারছেন। তাহলে কি কারণে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে না? সরকারও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন! মাঝে মধ্যেই অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটায় বিস্ময় প্রকাশ করে কথা বলেন। আমরাও মনে করি, যেখানে টাকার কোন অভাব নেই, ব্যাংকে মজুদ হাজার হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকগুলোও বিনিয়োগে আগ্রহী, কিন্তুু উদ্যোক্তার অভাবে তারাও বিনিয়োগ করতে পারছে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জন্মে, তাহলে কি কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না?


আর বিনিয়োগ না বাড়লে ব্যবসা বাণিজ্যের যেমন প্রসার বাড়ে না, তেমনি অলস অর্থ পড়ে থাকার পরও ব্যাংকগুলো লাভের মুখ দেখে কিভাবে? যেখানে ব্যাংকের টাকা বিনিয়োগ না হলে লোকসান গুনার কথা, সেখানে ডিসেম্বর মাস শেষে দেখা গেছে, ৭/৮টি ব্যাংক ব্যতিত সকল ব্যাংকই কম বেশি মুনাফা করেছে। যা বিশ্বাস করা কঠিন হলেও বাস্তবে সত্য। এর অন্তর্নিহিত কারণ উদঘাটনে বিশেষ কোন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। সহজভাবেই অনুমেয়, ব্যাংকগুলোর বাড়তি সুদহার, নানা খাতে সেবার নামে কমিশন আদায়ের কারণে মাঝারী ও ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে কর্তিত অর্থের বিনিময়ে ব্যাংকগুলো কিছুটা হলেও মুনাফা করেছে। কিন্তুু ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারে এ ধারাকে কোন ভাবেই ইতিবাচক বলা সঠিক হবে না। কারণ বাড়তি সুদহার এবং নানা খাতে কমিশন দেওয়ার অর্থই হবে ব্যবসায়ীদেরকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করা।

 মাঝারী ও ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুদের বিনিময়ে ব্যবসা পরিচালনা করার কারণে লাভের একটি বড় অংশ ব্যাংককে পরিশোধ করতে হয়। ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় মন্দাভাব দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। এ কারণেই এক পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের অনুকুলে ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থ ঝুঁকিতে পড়ার আশংকা অনেকাংশেই বেড়ে যায়। অর্থাৎ ব্যাংকের পুঁজি ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ হবে, ব্যবসায়ীরা সফলভাবে ব্যবসা করে লভ্যাংশের অর্থ থেকে ব্যাংকের মুনাফা বা সুদ পরিশোধ করবে, এটাই নিয়ম। কিন্তুু ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিয়ে সে বিনিয়োগ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারলে উভয় পক্ষকেই সংকটে পড়তে হয়।

এ জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ বান্ধব সুদহার নির্ধারণ, সরকারের পরিসেবাগুলোর ব্যবসা বাণিজ্য উপযোগী ফি নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক। কিন্তুু আমাদের দেশে একদিকে যেমন ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসার সফলতার কারণে সুদহার বাড়িয়েছে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস-পানি, জমির খাজনা, ট্যাক্স, ভ্যাটসহ নানা খাতে বাড়তি অর্থ আদায় করছে। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি যে চাপ পড়ছে, যা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসা বাণিজ্যে এক ধরনের মন্দাভাব বিরাজ করছে। আর বিনিয়োগ না বাড়ার পিছনে শুধু অবকাঠামোগত সমস্যাই নয়; বরং এর পিছনে পুঁজিবাদি সমাজব্যবস্থার অন্তর্নিহিত যথেষ্ট কারণও বিদ্যমান।
একটি পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় গুটিকতক মানুষের হাতেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিত্য দিনের প্রয়োজনীয় সকল পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয়। যার কারণে পণ্যের মূল্য কনেকটাই ওঠানামা করে তাদের খেয়াল খুশির ওপর।

 অর্থাৎ পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে গুটিকতক মানুষই হয়ে যায় বহুজাতিক কোম্পানির মালিক। যারা দেশের গোটা অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বহুজাতিক কোম্পানির গর্ভেই ক্ষুদ্র ও মাঝারী পুঁজির মালিকরা প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে কপর্দক পুুঁজি শূন্য হয়ে পড়ে। যেমন: চিনি, ভোজ্য তেল, নিত্য পণ্যের মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশের রাষ্ট্রায়াত্ত্ব শিল্প চিনিতে সরকার লোকসানের কারণে নামমাত্র পরিমাণ চিনি উৎপাদন করে। যা অপরিশোধিত চিনি আমদানিকারকদের চিনি কম মূল্যে বিপণনের কারণে সরকারিভাবে উৎপাদিত চিনি অবিক্রিত অবস্থায় মিলে পড়ে থাকে।

 আবার সরকারকে এই সব চিনিকলে নিয়োজিত জনবলকে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন ভাতা দিতে হয়। অথচ অপরিশোধিত চিনি আমদানি না করে দেশীয় ভাবে উৎপাদিত চিনি বিপণন হলে এ খাতটিতে লোকসান গুনতে হতো না। অর্থাৎ গুটিকতক বহুজাতিক কোম্পানিকে চিনির ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্পের লোকসান সামাল দিতে জনগণের ওপর নানাভাবে কর, ট্যাক্স, ভ্যাটসহ সেবা খাতগুলোর মূল্যও বাড়ানো হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যাদের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব চিনিকল ধ্বংস হয়েছে, তারাই আবার অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে পরিশোধন করে বাজারজাত করছে।

 এসব পণ্য যে মুল্যে বিদেশ থেকে আমদানি করে পরিশোধনের পর বোতলজাত করা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মুল্যে দ্বারা বিপণনের সুযোগ পায়। শুধু চিনি ও ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রেই নয়, লবণ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সকল নিত্যপণ্যই এখন বহুজাতিক কোম্পানির দখলে চলে গেছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার এটাই নিয়ম। আর এই নিয়মের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী দিনে দিনে ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। ফলে নগর, মহানগর, মফস্বল শহর পর্যন্ত এখন বিভিন্ন বাহারি পণ্যের সারি সারি দোকানের জৌলুস চোখে পড়লেও যার ধারে কাছে যাওয়ার সামর্থ্য এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নেই। পাঠক মাত্রই জানেন, জৌলুসে ভরা সারিসারি দোকানে কর্মরতরা সারাক্ষণেই খদ্দেরদের ডাকাডাকি করেও সাড়া পান না।

 
শুধু বহুজাতিক কোম্পানীই নয়, এর বাইরে ঘুষ, দুর্নীতির মতো ক্রিয়াকান্ডে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস তো কোনভাবেই কমছে না। আবার পুঁজিবাদি সমাজব্যবস্থায় যারাই অর্থেবিত্তে সমৃদ্ধ, তারাই এখন ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরাই এখন ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে আইন সভায় বসে তারা শ্রেণী স্বার্থেই  আইন পাস করে। যে আইনের বদৌলতে তারাই হয়ে দাঁড়ায় বড় সুবিধাভোগী। যদিও জনস্বার্থের কথা তারা বরাবরই উচ্চারণ করে। কিন্তুু সেগুলো থেকে যায় জনগণের অনেক বাইরে। তা না হলে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো কোম্পানিগুলোর হাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি হতো না।

 অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিক ‘শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপীর কাছেই ২৬০৭ কোটি টাকা’ শিরোনামে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, শুধু সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছে আটকে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬০৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই আটকে আছে ২০ খেলাপির হাতে। এতো শুধু একটি ব্যাংকের ঋণ খেলাপির খতিয়ান। আর সকল ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপীদের হিসাব করলে যা লক্ষ লক্ষ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। আবার একদিন পর একই জাতীয় দৈনিকে লীড নিউজ করা হয়েছে, ‘কৃষকের বিরুদ্ধে সোয়া ১৮ লাখ মামলা’। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলো ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা আদায়ে কৃষকের বিরুদ্ধে ১৮ লাখ ২৯ হাজার ২২টি মামলা করেছে। যার মধ্যে বেশির ভাগই হয়েছে সার্টিফিকেট মামলা।

 অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় তারা এখন বোরো রোপণের ভরা মৌসুমে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মনে হয়, এ দেশের কৃষকের এটাই যেন নিয়তি“! যখন বিশাল অংকের টাকা পরিশোধে অপারগ বড় বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয় না, বরং সে সব ঋণ অবলোপন করে মূল টাকা কিম্বা সুদ মওকুফ করা হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এসব শিল্পকে রুগ্ন শিল্প হিসাবে চিহ্নিত করে পুন: অর্থায়ন করা হচ্ছে, তখন মাত্র ৭ কোটি টাকা আদায়ের নামে ১৮ লাখেরও বেশি কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এটাই বাস্তবতা এ কারণে, শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার তাগিদে ক্ষমতাসীনরা বড় বড় ঋণ খেলাপিদের ছাড় দেবে, আর অসহায় সাধারণ কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার মত কি-ই বা আছে? অথচ কৃষি অর্থনীতির বাংলাদেশে কৃষিতে শতভাগ সফলতার কারিগর এ দেশের কৃষক। যারা জলবায়ুজনিত নানা অভিঘাত মোকাবেলা করে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে শস্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেই চলছে

 আবার বেশিরভাগ সময়ই সরকারের কৃষকবান্ধব বিরোধী পদক্ষেপের কারণে ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে কৃষককূল, তখন তাদেরকে সহায়তা দেওয়ার বদলে মামলার জালে বন্দি করা যে কত বড় অনৈতিক, যা বিবেকবান মানুষ মাত্রই হাঁড়ে হাঁড়ে উপলব্ধি করতে পারেন। যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের অভাবে অলসভাবে ব্যাংকে গচ্ছিত থাকে, তখন মাত্র ৭ কোটি টাকা আদায় করাই যেন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়ার পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এতো সামান্য অর্থ! এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কি আছে? এখন সেই অর্থমন্ত্রীর উচিৎ, যত দ্রুত সম্ভব এসব মামলা প্রত্যাহার করে ঋণগুলোকে পুন:তফশীলিকরণ করে দীর্ঘমেয়াদে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা। স্মরণে রাখতে হবে, কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। আর এর অন্যতম কারিগর হলো কৃষক।

সেই কৃষকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে কৃষি অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে, যার কোন বিকল্প নেই। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, ব্যাংকে এখন অলস টাকার বিশাল পাহাড়। এ পাহাড়কে আর বাড়তে না দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থানের দ্বারকে প্রসারিত করতে হবে। কারণ বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মস্থান বাড়বে না। যা সুস্থ ও মজবুত অর্থনীতির জন্য কোন ভাবেই অনুকুল হবে না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চলমান স্থবিরতা দুর করতে হলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঁঙ্গা করে ব্যাপকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ বাড়াতে তাগিদ দিতে হবে। তাহলেই শুধু অলস টাকার পাহাড় যেমন কমে আসবে, তেমনি কর্মসংস্থানের বন্ধ দুয়ারও প্রসারিত হবে।   
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

মনোবিকাশে বিনিয়োগ করুন

স্মৃতির পাতায় পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় শৈশবটাই যেন সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল। আহ্, আবার যদি ছোট্ট বালক হয়ে যেতে পারতাম! কাজের চাপ নেই, আয় করার দুশ্চিন্তা নেই, অনেক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলা নেই – আছে শুধুই দুরন্তপনা আর কল্পনার আকাশে নিরন্তর ভেসে বেড়ানো। বড় হওয়া মানে যেন একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া! ‘দায়িত্ব’ নামের বিরাট এক দৈত্যকে বহন করে চলা!

 অসহ্য এক মানসিক চাপে প্রতিনিয়ত স্যান্ডউইচ হয়ে থাকা! সত্যিই কি তাই?
গবেষকগণ বলেন, শৈশবের জীবনেও অনেক মানসিক চাপ থাকে। ছোটরা বলে না বা বলতে পারে না কিন্তু বাস্তবে ওরা ওদের সহ্য ক্ষমতার চেয়ে বেশি ‘মানসিক চাপ’ বহন করে। পড়ালেখার বোঝা থেকে শুরু করে শাসনের বাড়াবাড়ি, কল্পনা ও বাস্তবতার দুরত্ব, চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যেকার অসঙ্গতি বোঝার অক্ষমতা, ইত্যাদি ছোটদের মানসিক চাপকে বাড়িয়ে তোলে।

 এমনকি সঙ্গী বা খেলার সাথীদের সাথে সৃষ্ট মনোমালিন্য, ঝগড়া-বিবাদও ছোটদের জন্য বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এ ধরনের ছোট-বড় মানসিক চাপগুলো ছেলেমেয়েদের সুষ্ঠু বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে পরবর্তি জীবনে বা বড় হয়ে যখন ওরা সত্যিকারের সংসার জীবনে প্রবেশ করে তখন তাদের মধ্যে নানা ধরনের অস্থিরতা, অসামঞ্জস্যতা বা ভঙ্গুরতা দেখা দেয়। বড়দের ভেতরে আমরা যে অসঙ্গতিগুলো দেখি তা আসলে শৈশবের বয়ে আনা জঞ্জাল, অমিমাংসিত ইস্যু।
মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা দিনের পর দিন মনে চাপা থাকলে এক সময় তা শরীরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হরমোন এর ভারসাম্যহীনতা, বন্ধ্যাত্ব, এমনকি ক্যান্সার এর মত অসুখেরও নেপথ্য কারণ হতে পারে মানসিক দুশ্চিন্তা।

 শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক বিকলাঙ্গতা, বদ মেজাজ, রুক্ষতা, অস্বাভাবিক আচরণ, মাদকাসক্তি এমনকি খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি ভয়াবহ অপরাধ করার প্রবণতাও মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে ঘটে থাকে। গ্রামের তুলনায় শহরে, নদীমাতৃক এলাকার তুলনায় শিল্পাঞ্চলে, শান্ত সমতল এর তুলনায় দুর্গম অঞ্চলগুলোতে মানুষের মধ্যে সাধারণতঃ মানসিক অস্থিরতা বেশি দেখা দেয়। এমনকি শহরের ভাল ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এখন অস্থির শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।


একটি সত্য ঘটনা থেকে উদাহরণ দিচ্ছি। রুদ্র (ছদ্মনাম) নামের ১৭ বছরের একটি ছেলে দেখতে দেখতে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। সে স্কুলে যেতে চায় না, পড়ালেখায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। রাতে ঠিকমত ঘুমায় না, আবার সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। নিজের কাজ নিজে করতে পারে না। প্রতিবার টয়লেটে সময় কাটায় কমপক্ষে আধ-ঘন্টা। সবারই ধারণা ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাহ্যিক লক্ষণগুলো অবশ্য তাই বলে কিন্তু প্রকৃত কারণটা কেউ জানেনা বা বুঝতে পারে না। জানা মতে, ছেলেটি ৬ মাস বয়স থেকে প্রতিদিন খাওয়ার সময় মার খেয়েছে। মায়ের ধারণা সে ইচ্ছে করে খায় না। কিন্তু বাবার ধারণা ছেলের পেট ভরা থাকায় বা খাওয়ার রুচি না থাকায় এই অনীহা। এই নিয়ে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও দ্বন্দ্ব বিরাজমান। ঐ পরিবারের বাবা’র ধারণা রুদ্র আসলে অতি শাসনে, বলা যায় ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবনের প্রতি বীতশ্রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। জীবনের জন্য তার কোন ভালবাসা নাই। ওর মধ্যে প্রণোদনার অভাব ঘটেছে। সে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খারাপ অভিভাবকত্বের ফলে!


আমি এর আগে একাধিকবার লিখেছি যে, ‘কোন খারাপ ছাত্র নেই, আছে খারাপ শিক্ষক’। ঠিক তেমনি আমি বিশ্বাস করি, ‘কোন খারাপ সন্তান নেই, আছে খারাপ অভিভাবক’। বলা বাহুল্য ‘খারাপ অভিভাবক’ মানে কিন্তু ‘খারাপ মানুষ’ বোঝাচ্ছি না। একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে সর্বোত্তম মানের হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র অভিভাবকত্ব ঠিকমত জানা বা না বোঝার কারণে ‘খারাপ অভিভাবক’ হতে পারেন। আমাদের দেশে অভিভাবকত্ব শেখার কোন প্রতিষ্ঠান আছে বলে আমার জানা নাই। যে ব্যক্তি নিজেই ভুল অভিভাবকত্বে বড় হয়েছে, সে যখন অভিভাবকে পরিণত হবে তখন সে কিভাবে সন্তানদের শেখাবে? অর্থাৎ আপনি যা কখনই শেখেন নি তা অন্যকে শেখাবেন কিভাবে?


অসচেতনতার পাশাপাশি অতি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকেও অভিভাবকেরা সন্তানদের সাথে এমন সব আচরণ করেন যা নির্যাতনের সামিল। আর আপনি যদি আপনার সন্তানকে দিনের পর দিন নিজের অজান্তেই নির্যাতন করেন তাহলে ওই সন্তানের মনে তার কি ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে ভেবে দেখেছেন? আজকাল শহরাঞ্চলে মায়েদের মধ্যে দেখা যায় সন্তানের পড়ালেখা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা, হোম ওয়ার্ক, স্যারের কাছে পড়তে যাওয়া, এরপর গান বা নাচের ক্লাস ইত্যাদি নানা বিষয়ে সন্তানকে চাপের মধ্যে রাখেন। ছেলেমেয়েরা যে মানুষ, মেশিন নয় এটা ঐ উদ্বিগ্ন মায়েরা ভুলে যান। অনেক মাকেই দেখি তাঁরা সন্তানকে প্রতিবেলায় তুলে খাওয়ান, ড্রেস ঠিকমত পরিয়ে দেন, প্রাকটিক্যাল খাতা তৈরি করে দেন, ইত্যাদি। সব কাজ যদি মা নিজেই সিদ্ধান্ত নেন বা নিজেই করেন তাহলে সন্তান শিখবে কিভাবে? লক্ষ্য করলে দেখবেন উৎকণ্ঠা বোধকারী এসব মায়েদের সন্তানেরাও সর্বদা উদ্বিগ্ন বোধ করেন।

 এটা এক ধরনের সংক্রমণের মতো। তাছাড়া অনেকেই নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে যেয়ে সন্তানের উপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করেন। যেমন ছোটবেলায় আপনার হয়তো ডাক্তার হবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু যে কোন কারণেই হোক আপনি তা হতে পারেন নি। এখন আপনি চাইছেন আপনার সন্তানকে ডাক্তার বানাতে। এর জন্য আপনি সকল ধরনের চাপ সন্তানের উপর প্রয়োগ করছেন। নিজের সন্তান এবং প্রিয়জনদের উপর এর প্রভাব সিংহভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। সাধারণতঃ নিজের মত করে যারা সবকিছু করতে চান, যাদের কাছে অন্যের পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব কম, যারা পরমতসহিষ্ণু নন, তাদের মধ্যে এই প্রবণতাগুলো বেশি দেখা যায়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা থেকেও অভিভাবকেরা এমন অনেক আচরণ করে থাকেন যা নির্যাতনের সামিল। কখনও কখনও এটা যে নির্যাতন তা ঐ অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন না। যেমন রুদ্র’র মা সেটা বুঝতে পারেন না।

কিন্তু অভিভাবক না বুঝলেও সন্তানের মনে তা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। যে ক্ষত ব্যাহত করে শিশু মনের স্বাভাবিক বিকাশ। কিছু আচরণ যেমন, সবকিছুতেই ভয়, একেবারে চুপচাপ হয়ে যাওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, নিজেকে অপরাধী ভাবা, অসহায় বোধ করা, হতাশ হয়ে পড়া, বিষণèতা কিংবা অস্বাভাবিক জেদ, মুখে মুখে তর্ক করা, ঔদ্ধত্বপূর্ণ দুর্বিনীত আচরণ, আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা, অবাধ্য হয়ে ওঠা, নেশাগ্রস্ততা ইত্যাদির নেপথ্য কারণ শিশু মনের উপর অতিরিক্ত চাপ বা সঠিক পরিচর্যার অভাব। সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক বাবা-মা তার সন্তানের ভাল চান। তিনি রাগ করেন বা শাসন করেন সন্তানের ভাল’র জন্যই। কিন্তু অসময়ে বা ভুল শাসনের ফল ভাল হয় না। যেমন আপনি যদি সন্তানকে অন্যের সাথে তুলনা করেন কিংবা অন্যের সামনে তাকে ছোট করেন বা অন্যের সামনে তাকে কটু কথা বলেন তাহলে নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি তার ব্যক্তিত্বের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটালেন। আপনি তার আত্মমর্যাদায় আঘাত করে তাকে নেতিবাচক পথে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করলেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাবকেরা এই ভুলটি করে থাকেন।


বাবা-মার অস্বাভাবিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অস্বাভাবিক প্রত্যাশা বা মাত্রাতিরিক্ত উচ্চাকাক্সক্ষা সন্তানদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা বৃদ্ধি করে। প্রতিবছর মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক বা এ ধরনের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করার সংবাদ শোনা যায়। ভারতে এই সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেশি। গবেষকগণ বলছেন, এটা শুধু শিক্ষার্থীর নিজস্ব সমস্যা নয়, বরং ঐ শিক্ষার্থীর উপর তার পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্যদের যে চাপ বিদ্যমান সেটা বহন করতে অসমর্থ হয়ে একজন আত্মহননের পথ বেছে নেয়। পড়াশোনার চাপ, অভিভাবকের রক্তচক্ষু থেকে পালাতে চায় এমন ছেলেমেয়েদের সংখ্যা সমাজে ক্রমশঃ বাড়ছে। এটা শুভ লক্ষণ নয়! সময় এসেছে কথা বলার। অভিভাবকেরা সংবেদনশীল না হলে আমরা আমাদের সন্তানদের অন্ধকারের আকর্ষণ থেকে বাঁচাতে পারব না।


বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সন্তানদের মনে অভিভাবকদের আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতার প্রভাব বিদ্যমান। যেমন আমাদের উপরে প্রভাব রয়েছে আমাদের রাষ্ট্রনায়ক, দেশ পরিচালকদের। আমরা তাঁদের দৈনন্দিন কার্যক্রম লক্ষ্য করি। যখন আমাদের সামনে আদর্শহীনতা প্রকট হয়ে দেখা দেয়, যখন অনুসরণ করার মত ব্যক্তিত্বের অভাব তীব্র হয় তখন সমাজের সদস্যরা নৈরাশ্যবাদী হয়ে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে। সমাজটা দ্রুত বদলাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সম্পর্ক। স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের গ্রাস করে ফেলছে। আগের দিনে যৌথ পরিবারে ছেলেমেয়েরা একসাথে বড় হতো, পরস্পরের আবেগ শেয়ার করতে পারত। একজনের মানসিক উৎকণ্ঠা অন্যজনের সাথে ভাগাভাগি হয়ে শেষ হয়ে যেত। সেটা এখন আর হচ্ছে না। আমরা ছেলেমেয়েদের মানুষ নয়, মেশিন ভাবছি। একেকটা রোবট তৈরি করছি আমরা! এভাবে আধুনিকতার ¯্রােতে আবেগ হারিয়ে ফেললে জীবনের সার্থকতা কোথায়!  


সরকার বলছেন, তাঁরা সোনার বাংলা গড়ে তুলবেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য সোনার মানুষ চাই’। প্রচন্ড মানসিক উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ এর মধ্যে বেড়ে ওঠা আজকেরা সন্তানেরা কি সোনার মানুষ হতে পারছে? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কি সেই আয়োজন রয়েছে? পরস্পর বিদ্বেষী, হিংসা ও পরনিন্দায় ভরপুর, স্বার্থবাদী রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে ছেলেমেয়েদের শেখার কি আছে? পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দর্শন শিশুদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা তৈরি করছে। দেশকে, সমাজকে ওরা দিতে শিখছে না। ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষুদ্র গন্ডির বাইরে জগৎ সম্পর্কে উদাসীনতা, নির্লিপ্ততা, নিস্পৃহতা শিশুদের মনকে ছোট ছোট দ্বীপে পরিণত করছে। ওরা কুয়োর ব্যাঙে পরিণত হচ্ছে। এভাবে সমাজ এগুবে না।


সুন্দর সমাজ গড়তে হলে আমাদের সন্তানদের দিকে নজর দিতে হবে। ওদের বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হবে প্রথম। রাষ্ট্র এখানে উদাসীন থাকতে পারে না। কেবল বইয়ের পোকায় পরিণত হওয়ার চেয়ে জীবনের দরিয়ায় নাও চালানোর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আগে ভাল ছাত্র হওয়ার জন্য ইংরেজী, অংক এবং বিজ্ঞান ভালভাবে জানতে হতো। এখন এসবের সাথে তথ্য প্রযুক্তি ভালভাবে জানতে হয়। কিন্তু ভাল মানুষ হওয়ার জন্য এর পাশাপাশি মানবিক গুণাবলীর বিকাশ চাই। মনের মধ্যে আলো জ্বালানোর প্রস্তুতি নেওয়া চাই। শিশু মনে উৎকর্ষতা, সৃজনশীলতা, সততা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সর্বোপরি নিজেকে মানুষ হিসেবে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে, অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল, মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিকশিত হবার প্রণোদনা সৃষ্টি করতে হবে। পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য সেটাই হবে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ, সর্বোত্তম পন্থা।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

ভেজাল-মানহীন ওষুধ বন্ধ করতে হবে

আমি বেশ কয়েকটি লেখায় উল্লেখ করেছি আমাদের পারিপার্শ্বিকতা সমাজ যেভাবে এগোনোর দরকার স্বাধীনতার ৪৫বছরেও তা এগোয়ানি। আমাদের চারিপার্শ্বে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে হিংসা, বিদ্বেষ হানাহানি সহ সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। সামাজিক উৎকর্ষ মানবিকতার পরাজয় ঘটেছে এক শ্রেণির অতি লোভী মানুষের কারণে।


মানব সেবার জন্য যে কয়েকটি দিক রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। যারা এ কাজে নিয়োজিত তাদেরকে সাধারণত বলা হয় ডাক্তার। আর ডাক্তাররা এমনি ফু দিয়ে চিকিৎসা করতে পারে না। প্রয়োজন হয় রোগ অনুযায়ী ওষুধের। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে এ্যালোপাথি চিকিৎসা। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও ওষুধের গুণগত মান ঠিক না থাকলে রোগ ভালো হওয়া তো দূরের কথা এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

 তাই ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এলোপাথি চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা শাস্ত্রে ওষুধের গুণগত মান বজায় না থাকলেও বা কম থাকলে কোনো সমস্যা নেই। রোগির কোনো ক্ষতি হবে না। এলোপাথি চিকিৎসায় যেহেতু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে তাই সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও ওষুধের গুণগত মান উপাদান খুবই জরুরি।

 
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে চিকিৎসা এক মানবিক সেবা ও পেশার নাম। মানব সেবার নামে এ সেবায় অর্থ, মুনাফা বা অন্য কিছু অর্জনের চেয়ে মানব সেবায় মূখ্য হওয়া উচিত। মানবসেবার মধ্যে নাকি সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়া যায়। জ্ঞানী গুণীর মুখ থেকে আমরা বহুবার এরকম সত্য নীতিবাক্য আগেই শুনেছি। তাই টাকা পয়সা সব কিছুর উর্দ্ধে থেকে কায়মনো বাক্যে হিষ্ট চিত্তে মানব সেবায় প্রাধান্য পাওয়া উচিত।

 যুগ যুগ ধরে চিকিৎসার এ মানব বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে আসছে চিকিৎসক বা ভিষকবৃন্দ। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কালের বিবর্তনে চিকিৎসায় মানুষের সেবার ক্ষেত্রে সে সত্যবোধ নীতিবাক্য হারিয়ে গিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে অর্থ বাণিজ্য। যার কারণে বর্তমানে হাজার বছরের চিকিৎসায় মানবসেবার দিকটা আজ উপেক্ষিত। আমাদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে চিকিৎসা একটি।

 তাই আমাদের সংবিধানেও মানবসেবায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাকে অন্তর্ভূক্ত করে নাগরিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ৪৫বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে যেমন উন্নতি হয়েছে তেমনি দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। চিকিৎসাকে প্রকৃত অর্থেই মানবসেবায় পরিণত করতে বেসরকারিভাবে আরও হাসপাতাল ক্লিনিক স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। মানুষ বেকায়দায় বা সমস্যায় না পড়লে পুলিশ বা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় না।

সাধারণ নাগরিক স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করে চিকিৎসা সেবাকে প্রকৃত অর্থেই মানবিক সেবা ও পেশা হিসেবে বেছে নিবে এসব সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। দেশে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিক মানব সেবার হাত বাড়িয়ে দিলেও বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ভূমিকা যথার্থ নয়, প্রশ্নবিদ্ধ। মানবসেবার নামে যে চিকিৎসা শাস্ত্রের তৈরি হয়েছে, ডাক্তার তৈরি হয়েছে কিন্তু অধিকাংশ ডাক্তারের আচার আচরণ সন্তোষজনক নয়। সেবার মানও প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থ অর্জনের জন্য ব্যঙের ছাতার মতো গজে উঠা বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ সামগ্রীর যথেষ্ট অভাব। এসমস্ত হাসপাতাল ক্লিনিকের মালিকরা যা ইচ্ছে তাই করেন। সরকারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না।


অথচ স্বাস্থ্য চিকিৎসাকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সংবিধানে। দেশের সরকার অনুমোদিত ও অননুমোদিত অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। অধিক ব্যয় সাপেক্ষ এ সমস্ত চিকিৎসা কেন্দ্রে সবার পক্ষে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব নয়। সমাজে যারা অর্থ বিত্তশালী তাদের চিকিৎসা অধিক ব্যয় সাপেক্ষ হলেও নিম্ন মধ্য হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যের চিকিৎসা নেয়া অনেকটা কঠিন।

 উপরোন্ত ভুল চিকিৎসা প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এ সমস্ত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে দেশের প্রায় ৬৮ভাগ মানুষ চিকিৎসা নেয়। কিন্তু সমাজের এ সিংহভাগ মানুষরা প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সরকারের তদারকি না থাকায় মালিকরা কোনো কিছুই তোয়াক্কা করেন না।

 অথচ এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক অনুমোদন পেয়েছে। দেশের হাসপাতাল ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টারগুলো গড়ে উঠেছে মূলত জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে। বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা হাসপাতাল ক্লিনিক, পরিচালনা করতে গেলে যে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ওষুধের প্রয়োজন পড়ে তা বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। এ সমস্ত চিকিৎসা সামগ্রী বা ওষুধের জন্য বেসরকারি উদ্যেক্তারা সরকারি ভর্তুকিও পেয়ে থাকেন। কিন্তু তারা অধিকাংশ সময়ই রোগিরা সঠিক চিকিৎসা ও সেবা পান না। যেটুকুই পান তা অর্থের বৌদলতে।

 পর্যাপ্ত ওষুধ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, উপযুক্ত প্যাথলজি নেই। আবার চিকিৎসা ফিও অনেক যা গরিব মানুষের পক্ষে অনেকটা কঠিন। অভিযোগ রয়েছে ডাক্তারদের সার্টিফিকেট ও দক্ষতা নিয়েও। কোনো রোগি এলেই তাকে প্যাথলজি, রক্ত বা অন্য কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় তাদের মনোনীত কোনো ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরিতে। কারণ সেখান থেকেও ডাক্তাররা আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাই জনগণের স্বাস্থ্যসেবার নামে যা চলছে তাতে সাধারণ মানুষরা প্রতারণার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ওষুধের গুরুত্ব অপরীসিম। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কয়েকটি বড় কোম্পানি ছাড়া বর্তমান ওষুধের গুণগত মান এতটা নিম্নমুখী যে তাতে রোগির রোগ ভালো তো হয় না বরং রোগ আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যেভাবে ওষুধ শিল্পের প্রসার ঘটেছে তা অভাবনীয় এবং ইতিবাচক। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ওষুধ শিল্পের প্রসার ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬ এর খসড়া মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি এটাও আমাদের মনে রাখা উচিত ওষুধ হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ পৃথিবীর ১২২টি দেশে রপ্তানী হচ্ছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়।

 তাই ওষুধের যেন গুণগত মান বজায় থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা অবশ্যই উচিত। ভেজাল ও মানহীন ওষুধ মানব জীবনে ক্ষতিকর যেমন ক্ষতিকর ভেজাল খাদ্য। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায় ইতিমধ্যে ঢাকায় বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে প্রচুর পরিমাণ অনিবন্ধিত নকল ভেজাল ওষুধ জব্দ করা হয়। এক শ্রেণির অসাধু অতি মুনাফালোভী চক্র রয়েছে যাদের কাজই হচ্ছে মানুষকে ঠকানো এবং এরাই নকল ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। সম্প্রতি পত্রিকায় এসেছে ‘জোনাডেক্স’ নামক ইনজেকশনটি ক্যান্সার রোগিদের দেয়া হয়।

এই ওষুধটি সাধারণত উৎপাদন করে ভারত, আমেরিকা এবং আলজেরিয়া। ওষুধটি বাংলাদেশে অনুমোদিত নয়। অথচ এক শ্রেণির অসাধু চক্রের সহায়তায় ওষুধটি চলছে। এমনকি এ ইনজেকশনটি বাংলাদেশে নকলও হচ্ছে। তবে ভেজাল নকলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিক ওষুধ। সম্প্রতি সরকার ১০টি ওষুধ কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেন।

 পাশাপাশি ২৩টি কোম্পানির এন্টিবায়োটিক সহ বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদন, বিপননে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবুও কিছু কিছু কোম্পানি সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে মানহীন ওষুধ উৎপাদন বিপণন অব্যাহত রেখেছে বলে জানা যায়। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি আমলে নিতে হবে এবং আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কারণ সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা, মানহীন নকল ভেজাল ওষুধের ব্যবহার মানুষের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ যেন মানুষের জীবন নিয়ে খেলা।

 ওষুধের গুণগত মান নির্ণয়ের দায়িত্ব ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। এ প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র দু’টি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরী রয়েছে। এগুলোতে বছরে সাধারণত ৪ থেকে ৫ হাজার ওষুধের নমুনা বা গুণগত মান পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন ওষুধ কারখানাগুলোতে ২৭ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদিত হয়। যদি তাই হয়ে থাকে ২২ হাজার ওষুধ কোনো রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই বাজারে চলে যাচ্ছে, বিক্রিও হচ্ছে অবাধে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ওষুধের মধ্যে যে হারে বিভিন্ন উপাদান থাকার কথা সেগুলো না থাকলেই ওই ওষুধ মানহীন। আর মানহীন ওষুধই হচ্ছে বিষ। তাহলে মান নির্ণয়ের পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরী না থাকায় এসব ওষুধ সেবনের নামে মানুষ বিষ পান করছে ! নকল ভেজাল মানহীন ওষুধ রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগকে আরও বাড়িয়ে দিবে।

 তাছাড়া প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন ওষুধও বাজারে আসছে। কি পরিমাণ ওষুধ বাজারে আসছে তার সঠিক কোনো তথ্য যেমন নেই তেমনি ওষুধের মান নির্ণয় ও যথাযথ হচ্ছে না। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ শিল্পকে আরও গতিশীল ও নিয়ন্ত্রণ করা মান নির্ণয়ে ল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের ওষুধ একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। জাতীয় ওষুধ নীতিমালায় কিছু দিক সন্নিবেশিত করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কার্যকর, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন ওষুধ। তাই নকল, ভেজাল, নিম্নমান, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ফার্মেসীতে মজুদ, প্রদর্শন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে নীতিমালায় এসেছে। তা সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। শুধু নীতিমালা বা আইন করলেই চলবে না তার যথার্থ প্রয়োগ ঘটাতে হবে।


তাই নকল ভেজাল, নিম্নমানের ওষুধ আর নয়। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আর নয়। স্বাস্থ্যসেবার নামে নৈরাজ্য নয়। কিন্তু এগুলোর দায়তো সরকারের ওপরই বর্তায়। তাই এসব ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজর দিতে হবে। আইন অমান্যকারী কোনো ব্যক্তি বা ফার্মেসীর মালিককে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। তাহলেই চিকৎসা সেবায় নৈরাজ্য বন্ধ হবে এবং জনগণ প্রকৃত অর্থেই স্বাস্থ্য সেবা পাবে।
লেখক: শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

 

শ্রেণী কক্ষে শিক্ষা-উপকরণের প্রয়োজনীয়তা

এখন থেকে ২০ বা ২৫ বছর আগে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া শুরু করেছিলেন তাদের বেশির ভাগের উপর লেখাপড়ার চাপ খুব একটা ছিল না, বিশেষ করে যে সকল ছাত্র-ছাত্রীরা গ্রামের বিদ্যালয় বা কলেজে পড়াশুনা করতেন । আমার উপরেও তেমন একটা চাপ ছিল না। সকাল ১০টা সময় বিদ্যালয়ে যেতাম আবার বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে আসার পর তেমন পড়াশুনা করতাম না বা না করলেও, এখনকার মতো শিক্ষার্থীদের উপর চাপের যে স্টিম রোলার চালানো হয় এটা আমার ভাগ্যে ছিল না, বলতে হবে এটা আমার সৌভাগ্য। সেই সময় গৃহশিক্ষক-এর প্রচলন খুব কম ছিল। একটা গ্রামে দুই একজন পড়াতেন, সেটা আবার সব পরিবারের পক্ষে পড়ানোর ব্যয় বহন করা সম্ভব ছিল না।

 বর্তমানে যা দেখা যায় এক জন ছাত্র-ছাত্রীর গৃহশিক্ষক এবং কোচিং মিলিয়ে দিনে ৪, ৫ বা ৬টি জায়গাতেও পড়তে যেতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের বাসায় যে একটি নির্দিষ্ট সময় তার পড়া প্রয়োজন সে সময়টুকুও পায় না। এক সময় দেখা যায় তারা শুধু প্রাইভেট বা কোচিং নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সম্মানিত অভিভাবকগণও ছেলে বা মেয়েদের মেধা কতটুকু বা তার পড়াগুলো আয়ত্ত্ব করার দক্ষতা কেমন; এ বিষয়গুলো বিবেচনা না করে, পরীক্ষার ফলাফল যদি খারাপ করে তাহলে তার উপরে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে এমনকি অনেকেই শারীরিকভাবেও আঘাত করে থাকে।

 এতে করে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয় । তাদের একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝতে হবে যে সবার মেধা সমান নয়, যদি তাই হতো তাহলে হাজিরা খাতায় ৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী থাকলে ৫০টি ০১ রোল লেখা থাকতো। তবে একজন শিক্ষার্থীকে ভালো ফলাফল করার জন্য সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে এবং শিক্ষার্থীরও অধ্যবসায়ের মনোভাব থাকতে হবে। যাই হোক আজ যে বিষয় নিয়ে লেখা সে বিষয়ে ফিরে আসি। আমার বয়সে যারা আছে বা ঐ সময় যারা পড়াশুনা করেছেন তাদের শিক্ষা উপকরণ সম্পর্কে খুব বেশি একটা ধারণা ছিল না। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ শ্রেণি কক্ষে আসতেন পূর্বের পড়া অনুযায়ী পাঠদান করতেন এবং পরের দিনের পড়া দিতেন।

 আমি আমার শিক্ষা জীবন (এমএসসি পাশ) শেষ করার পরে যখন বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন) কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম সেই সময় বুঝতে পারলাম যে, শ্রেণি কক্ষে একজন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা উপকরণ কতটা প্রয়োজন । শিক্ষার্থীদের যে বিষয় পাঠদান করা হবে সেই বিষয়টিকে সুন্দরভাবে বুঝানোর জন্য তাদের মনে বিষয়টি স্থায়ীভাবে গেথেঁ দেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম ১৯০১ সালে স্যার জন এডাম (ইংল্যান্ডের অধিবাসী) সর্বপ্রথম শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়ন করেন। শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের ফলে শিক্ষা কার্যক্রমকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এর মাধ্যমে শিখনের বিষয় বস্তুু তাদের কাছে অনেক সহজ মনে হয় এবং বিষয়টি সহজেই আয়ত্ব করতে পারে। একটি প্রবাদ আছে যে, “দশ হাজার শব্দ ব্যবহার করে যা বোঝানো যায় না, একটি মাত্র ভাল ছবির সাহায্যে তা অনায়াসে বোঝানো যায়’ এ কথা থেকে বোঝা যায় শিক্ষা উপকরণের গুরুত্ব কত বেশি।

 তবে শিক্ষা উপকরণের বিভিন্ন নীতিমালা রয়েছে, কারণ যেনতেন ভাবে এর ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা পাবে না। শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের জন্য শ্রেণি কক্ষে এটা কিভাবে ব্যবহার করা যায়, এ জন্য পূর্ব পরিকল্পনা থাকা খুব বেশি জরুরি। কথায় আছে, যে কোন কাজের অর্ধেক কাজ শেষ হয়ে যায়, যদি পরিকল্পনা সঠিক হয়। শিক্ষকবৃন্দ যেদিন যে পাঠ শিখাবে সেই দিন উক্ত পাঠের সাথে মিল রেখে শিক্ষা উপকরণ বাছাই করবে। শিক্ষা উপকরণ-এর ভাষা যেন সহজেই সবার বোধগম্য হয় এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে যে ব্যক্তিগত বৈষম্য আছে এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সবার জন্য সমান উপযোগী মনে হয় এমন উপকরণ বাছাই করে ব্যবহার করতে হবে। উপকরণ ব্যবহার করার পরে তা শিক্ষার্থীর দৃষ্টির বাইরে রাখতে হবে, কারণ দৃষ্টির বাইরে না রাখলে শিক্ষকবৃন্দরা যে কথা বলবে তার প্রতি মনোযোগ কমে যাবে। উপকরণের আকার শ্রেণির উপর ভিত্তি করে নির্বাচন করে নিতে হবে। কারণ শিক্ষার্থী ও শ্রেণির সাথে উপকরণের সামঞ্জস্য না থাকলে শ্রেণি কক্ষে উপকরণ ব্যবহার এর ফলাফল আশানুরূপ পাওয়া যাবে না।


 অনেক সময় দেখা যায় উপকরণ ব্যবহার করার সময় প্রদর্শন কাঠি ব্যবহার করে না, উপকরণ ব্যবহারের সময় প্রদর্শন কাঠি ব্যবহার করা সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি। শুধু ভাল উপকরণ হলেই হবে না সঠিকভাবে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের কলা-কৌশল জানা ও এর যথাযথ প্রয়োগ করার দক্ষতা একজন ভাল শিক্ষকের গুণাবলী। শ্রেণিতে প্রবেশ করেই সালাম বিনিময়ের পর শিক্ষক যদি কোন সুন্দর চার্ট, মডেল বা কোন পাঠ সংশ্লিষ্ট শিক্ষা উপকরণ প্রদর্শন করে পাঠ দান শুরু করে, তাহলে শিক্ষার্থীরা খুশী মনে পাঠ গ্রহণে মনোযোগী হবে।


এভাবে শ্রেণিতে শিক্ষা উপকরণ পাঠের পরিবেশ সৃষ্টি করে পাঠদান করতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় থেকে শিক্ষা উপযোগী সঠিক তথ্য নিয়ে তা সুস্পষ্টভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা শিক্ষকের একটি অন্যতম দায়িত্ব । একজন শিক্ষক যদি র্দীঘ সময় ধরে একটি জায়গার বর্ণনা দিতে থাকেন, ধরা যাক একজন শিক্ষক মহাস্থানগড় সম্পর্কে পাঠদান করছেন । এতে করে শিক্ষার্থীদের পাঠে অমনোযোগিতা আসতে পারে। পাঠের এই একঘেঁয়েমী দূর করার জন্য মহাস্থানগড়ের যদি একটি ছবি বা মডেল উপস্থাপন করতে পারেন তাহলে, মহাস্থানগড়ের পাঠ শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে । মহাস্থানগড়ের ইতিহাস, গঠন, আকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারনা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

 শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন তাদের মনে স্থায়ীভাবে দাগ কাটে এবং তাদের জ্ঞানের ভান্ডারে জমা হয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা উপকরণ ছাড়া সফলতা পাওয়া অনেক কঠিন। শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করার ফলে শিক্ষার্থীদের মনে যে ধারণা সৃষ্টি হয় এর ফলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তি জাগ্রত হয় এবং পরবর্তীতে সে পাঠ্যবিষয় মুখস্থ না করে যুক্তি ও বুদ্ধির সাহায্যে যে কোন বিষয় আয়ত্ব করতে সক্ষম হয়। উপকরণ ব্যবহার করে অল্প সময়ে অল্প কথায় শিক্ষার্থীদের মনে সাড়া জাগানো যায় এবং শিক্ষকবৃন্দের সময় কম লাগে। কঠিন ও জটিল বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে পাঠের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা অনেক সহজ হয়। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কক্ষে হইচই করে, শিক্ষক তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এটা শিক্ষকের একটি দুর্বল দিক। উপকরণ ব্যবহার করার ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের ফলে দেখে শিখতে পারে ৮৩% এবং শুনে বা শুধু আলোচনার মাধ্যমে শিখতে পারে মাত্র ১১%। ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে (ডযধঃ ও যবধৎ ভড়ৎমবঃ, যিধঃ ৎিরঃব ও ৎবসবসনবৎ, ডযধঃ ও ফড় ও ষবধৎহ, ডযধঃ ও ংবব ও হবাবৎ ভড়ৎমবঃ) এতে বুঝা যায় শেখার জন্য শুনা খুবই একটি দুর্বল ব্যবস্থা, অন্যদিকে দেখে শিখা একটি কার্যকরী ব্যবস্থা । তাই শ্রেণি কক্ষে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের গুরুত্ব অনেক বেশি।

 শ্রেণিতে পাঠদানের সময় নানা রকমের উপকরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। অনেক সময় পাঠদানের বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যের কারণে উপকরণও বৈচিত্র্যেময় হওয়া উচিত। আবার দেখা যায় যে দামি উপকরণের প্রয়োজন হলেও তা সব সময় ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এজন্য যে সকল উপকরণ সহজেই পাওয়া যায় বা হাতে তৈরি করা যায়, এ ধরনের উপকরণ বেশি বেশি ব্যবহারের প্রতি শিক্ষকদের মনোযোগী হওয়া উচিত। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশ। শিক্ষাখাতে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। বিদ্যালয় বা কলেজগুলোও আর্থিকভাবে বেশি সচ্ছল নয়। তবে বর্তমানে আশার বিষয় যে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ শ্রেণি কক্ষে ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া দামি ও জটিল ধরনের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যাও খুব বেশি নয়।

 বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে কম্পিউটার, ওভারহেড প্রজেক্টার, অডিও কনসোল, ক্যাসেট প্লেয়ারসহ নানা ধরনের উপকরণ থাকা সত্বেও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবে তা যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষকের আন্তরিকতায় শিক্ষার্থীদের দিয়ে আশে পাশের পরিবেশ থেকে সহজে পাওয়া যায় এমন সামগ্রী দিয়ে উপকরণ তৈরির ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ সব সময় শ্রেণী কক্ষে দামি উপকরণ ব্যবহার করতে হবে এমন কোন কথা নেই। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন ধরনের উপাদান দিয়ে হাতে তৈরি শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান করার চেষ্টা করতে হবে। এতে করে শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল হবে এবং আর্থিকভাবে উভয়ের সাশ্রয় হবে।

 অল্প খরচে সহজে তৈরি করা যায় এমন শিক্ষা উপকরণ তৈরীর জন্য একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা, পরিকল্পনা ও চেষ্টার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষক উদ্ভাবনীমূলক ক্ষমতার  অধিকারী হলে কাঠের টুকরা, কাগজ, হার্ড বোর্ড, পেরেক, সুতা ইত্যাদির সাহায্যে নানা রকমের সাধারণ উপকরণ তৈরী করে তা শ্রেণী কক্ষে
ব্যবহার করতে পারেন। উপকরণগুলো ব্যবহারের পরে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এমন জায়গাতে রাখতে হবে যেন বৃষ্টির পানি বা কোন ময়লা পরে নষ্ট না হয়। বেশির ভাগ বিদ্যালয় বা কলেজে শিক্ষা উপকরণ সংরক্ষণের জন্য আলাদা কোন কক্ষ নেই।

 শ্রেণি কক্ষের ভিতরেই উপকরণ রাখার ব্যবস্থা করলে সবচেয়ে ভালো হয়, এতে করে সহজেই শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপকরণগুলো ব্যবহার করতে পারবে। শ্রেণি কক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আলমারী, শোকেস, ড্রয়িং টেবিল, র‌্যাক, বুলেটিন বোর্ড ইত্যাদি রাখা দরকার। নিজেদের বিভিন্ন অঙ্কিত ছবি, চার্ট, বিশ্বের মানচিত্র ও নিজ জেলার মানচিত্র শ্রেণি কক্ষের দেওয়ালে টানিয়ে রাখতে হবে। উপকরণগুলো কোন বাক্সে বা ড্রয়ারে লক করে রাখা উচিত নয়, এগুলো এমনভাবে রাখতে হবে যেন ব্যবহারের সময় সহজেই ব্যবহার করা যায়। উপকরণের হিসাব-নিকাশ যথাযথভাবে রাখার জন্য বিষয় ভিত্তিক ষ্টক রেজিষ্টার চালু করা উচিত। উপকরণ ব্যবহার শেষে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখতে হবে। তাই বলা যায় শিক্ষা উপকরণের যথাযথ ব্যবহারের ফলে পড়াশুনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করানো সম্ভব ।
লেখক ঃ স্টাফ, আর্মি মেডিকেল কলেজ বগুড়া
সাবেক শিক্ষক, বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাই স্কুল
০১৭২৯-৮২৮৬৮৫

এটা কোনো অভিনন্দন পত্র নয়; বাংলা কবিতার জয়পত্র

 

 

‘বুকের ঊনপঞ্চাশ পৃষ্ঠা খোলো:/এটা একটা বিষাদের নদী; অভিমানের পাহাড়ে তার বাড়ি।’/-বালিকা আশ্রম, আবু হাসান শাহরিয়ার।
বালিকা আশ্রমের স্রষ্টা আবু হাসান শাহরিয়ার। বাংলা ভাষার এক অত্যুজ্জ্বল কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি কবিতা পুরস্কার পেলেন। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারকে ঘিরে দেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের মনে প্রত্যেক বছরই থাকে নানা কৌতূহল। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০১৬ ঘোষণা করা হয়েছে ২৩.০১.২০১৬ তারিখ।

এ বছর ৭ জন বিশিষ্ট কবি,  লেখক ও গবেষক এ পুরস্কার  পেয়েছেন। গত  সোমবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলন করে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম  ঘোষণা করেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। এবার কবিতায় আবু হাসান শাহরিয়ার, কথাসাহিত্যে শাহাদুজ্জামান, প্রবন্ধ ও গবেষণায় মোরশেদ শফিউল হাসান, অনুবাদে ড. নিয়াজ জামান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে ডা. এমএ হাসান, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথায় নূরজাহান বোস এবং শিশুসাহিত্যে রাশেদ রউফ এ পুরস্কার  পেয়েছেন।

বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ১  ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বরেণ্য এই  লেখকদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করবেন। এটা নিঃসন্দেহে একটা খুশির খবর। বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধির জন্য  প্রতিষ্ঠিত সংগঠন বাংলা একাডেমি। বাংলা ভাষা সাহিত্যে যাঁরা অবদান  রেখেছেন তাঁদেরকে সম্মানিত করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ঠিক এবছরও সম্মানিত করা হয়েছে কবিতায় আবু হাসান শাহরিয়ারকে। আবু হাসান শাহরিয়ারের  পুরস্কার পাওয়া এবয় কবির পূর্বের অবস্থান নিয়ে বাংলা একাডেমির পুরস্কার ঘোষণার সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এরিয়া শাহবাগ সহ দেশের মফস্বল এলাকাগুলোর সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের মুখে মুখে বোল উঠেছে , আবু হাসান শাহরিয়ার পুরস্কার নিবেন তো ! সমস্ত দেশ সরব হয়ে উঠেছে আবু হাসান শাহরিয়ারের পুরস্কারে ।


 তাঁর কবিতার বিচারের প্রশ্নে খুব বেশি মানুষ কথা বলেনি। তবে যে গৌণ বিষয়টি অনেককে বার বার সামনে আনতে দেখেছি, সেটা ব্যক্তি আবু হাসান শাহরিয়ারকে নিয়ে। ‘ইটস নট ফ্যাক্টস।’ কবি  আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতা এবং তাঁর পঠন পাঠন এবং সাহিত্যে ভাবনার কাছে ওইসব গৌণ আলোচনা অহেতুক বলে মনে হয়। ব্যক্তি আবু হাসান শাহরিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে মূখ্য বিষয় নয় বলে মনে করি। তাঁর কবিতা নিয়ে কথা তুলুন। আবার  কেউ কেউ বাংলা একাডেমি সম্বন্ধে আবু হাসান শাহরিয়ারের  পূর্বের অবস্থানটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। হুম । কবি সত্যের পথিক।  কবিকে সব সময় প্রতিবাদি হতে হয়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের নজিরও এই দেশের সাহিত্যিকদের আছে।

 সেক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির কোনো কাজে হুম। জীবনানন্দের পর  যে কয়েকজন কবির কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি,  সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় অবশ্যই আবু হাসান শাহরিয়ার একজন। ভাবতে পারেন আমার পাঠের অবস্থা হয়তো স্বল্প ! তাতে কোনো আপত্তি নেই। আপনার কবিতা ভালো না লাগলে আমি কেন পাঠ করব। কবিতা ভালো লাগলে মাটির খুঁড়ে পাঠক কবিতাকে উদ্ধার করে। কবিতাই পড়ে। কবিতাই টিকে থাকে।


আবু হাসান শাহরিয়ারের পুরস্কারে যারা নাক সিটকাচ্ছেন তাদেরকে কিছু বলার নেই, আবার যারা আবু হাসান শাহরিয়ারকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন তাদেরকেও কিছু বলার  নেই। আপনার ভালো না লাগলে, কেন স্বীকার করবেন! ব্যক্তি আবু হাসান শাহরিয়ার যিনি আমার ভাই ,পলিসমৃদ্ধ যমুনার অববাহিকার সন্তান তাকেও অভিনন্দন জানানোরও কিছু নাই। তাকে সবাই চেনেন। তার সাথে আপনারাই আড্ডা দিয়েছেন। আমরা কখনো ভাই পরিচয় দিয়ে সামনে দাঁড়াইনি। এমনকি তাঁর কবিতা ভালো লেগেছে এটাও কখনো তাকে বলতে যাইনি। অনেক বড় বড় কবিকেই  তো দেখা হয়নি। তো হয়েছেটা কী!


তবে মুখে কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতায় এই পুরস্কার বাংলা কবিতার পুরস্কার। এই পুরস্কারের মাধ্যমে শাহরিয়ারকে চেনানো বা নতুন করে পরিচয় করে দেওয়ার কিছুৃ নেই। আবু হাসান শাহরিয়ারের পরিচয় তিনি কবি। আপাদমস্তক কবি। কবিতা লিখেছেন। কবির দোষ থাকতে পারে! কবিতায় মুগ্ধতা ছড়ায়। ‘ তোমার বুকের মাপে চাঁদ উঠে সাহেব বাজারের আকাশে’ এসব লাইনগুলো  তো পাঠকের মুখে মুখে।


‘ চাঁদ গিয়েছিল বালিকাবিহারে/মন গিয়েছিল মনে একখানা রাত ভোর হয়ে গেল/ টেলিফোনে-  টেলিফোনে’- বালিকা আশ্রম।/‘চ ালের টোলে আমি রাত্রি  জ্বেলে  ডোম্বীকে ডাকি/চর্যার ডিঙ্গিতে চেপে সান্ধ্যভাষা কড্ডায় এসেছে/রেশমনগর  ট্রেন বালিকাশুমারে থামে সদানন্দপুরে আমার/ পৈতৃকপ্রেম আজও বাঁচে আয়ুর্বেদিকে।’-‘বালিকা আশ্রম’ – আবু হাসান শাহরিয়ার।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক
০১৭৫০৯৩৬৯১৯

নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর শিশু শিক্ষার্থীরাও পুলকিত

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বছরের প্রথম দিন নতুন পাঠ্য বই বিতরণের উৎসবের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে। তেমনি নিশ্চিতও করেছেন শিশু শিক্ষার্থীদের  অভিভাবকদের। রাষ্ট্রের এ দায়িত্ববোধ যেমন তাদের কর্তব্য কাজকে সুসংগতও করেছে। আবার প্রতি বছর নতুন বিনামুল্যে বিতরণের জন্য পাঠ্য বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করছেন।

 যাতে করে শিশুদের শিক্ষার অধিকার কোনভাবেই ক্ষুন্ন না হয়। বিশেষ করে এ বছর একই  সাথে পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠীর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের জন্য প্রাথমিক স্তরে তাদের মাতৃভাষায় রচিত নতুন বই বিতরণ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একদিকে তাদের যেমন মাতৃভাষায় রচিত নতুন বই প্রদান করে ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক শিক্ষার্থীদের অধিকারকে সংরক্ষণ করেছে, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে মাতৃভাষায় তাদের শিক্ষা লাভের অধিকার বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার গুরুত্ব দিয়েছে।

 যা প্রশংসার দাবি রাখে। এদেশের নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠী পরিশ্রমী সহজ-সরল নারী-পুরুষেরা এক সময় বন জঙ্গল কেটে আবাদি জমি তৈরিতে তৎকালীন সময়ে জমিদারদের সহযোগিতা করতেন। আবার অনেকের মতে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে রেলপথ তৈরিতে কর্মঠ হওয়ার কারণে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এদেশে এসেছিলেন তারা। তবে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় মাহাতো, উঁরাও, রবিদাস, কনক দাস, মুড়ারী, লহড়াকর্মকার, পাহান, সাঁওতাল সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। এরা কঠোর কর্মঠ ও সহজ সরল তাছাড়া দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে বেশির ভাগই। বর্তমান সময়ে শিক্ষার আগ্রহ নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেড়েছে।

 নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে দল বেধে ছেলে-মেয়েরা পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যায়। এ শিক্ষার দৃশ্যপট চোখে পড়ার মত।  মূলত দেশের উত্তরের জেলা পাবনা, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ,পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, রংপুর, ঠাকুরগাঁও এ সমতলের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরা বংশ পরম্পরায় বসবাস করছেন।  তাদের শিশুদের মাতৃভাষা সাদরী, দেব নাগরী প্রধান। এ সকল ভাষার শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় কথা বলায় আমাদের প্রচলিত বাংলা ভাষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিতে গিয়ে ভাষার সমস্যার কারণে অংকুরেই ঝরে পড়ে যেত।

 একাধিক নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত বন্ধু-বান্ধব জানান, নৃ-তাত্ত্বিক শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের সুযোগ থাকা চাই নৃ-তাত্ত্বিক শিশুদের  নাগালের মধ্যে। এতদিন স্থায়ীভাবে মাতৃভাষা শিক্ষা লাভের প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় এনজিও নির্ভর মাতৃভাষায় বিদ্যালয়গুলো থেমে থেমে চলছিল। যাতে করে নৃ-তাত্ত্বিক শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল। আর এই গুরুত্ব বুঝে বর্তমান সরকার পার্বত্য ও সমতলের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিকের শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের মাতৃভাষা  গারো, উরাঁও /সাদরী, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ৫টি ভাষায় রচিত  বিনামুল্যের বই প্রদান করেছেন। এতে করে দেশের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের ভাষার অধিকারকে এবং সকলের জন্য শিক্ষা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করেছে।

 নৃ-তাত্ত্¡িক জনগোষ্ঠীর হাজারও শিশু শিক্ষার্থী তাদের মাতৃভাষার নতুন বই পেয়ে তারা আনন্দিত, পুলকিত। ইতিমধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় রচিত নতুন বই হাতে পেয়েছে। সমতলের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরাও সাদরী ভাষায় মুদ্রিত বই হাতে পেয়ে তারা আনন্দিতও বটে। তবে নতুন বই দিয়ে তাদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ায় নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত অনেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। কিন্তু নতুন ৫টি ভাষার বই পাওয়ার পর কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ওই ৫টি ভাষার পড়াশোনা করানোর মত শিক্ষক চাই।

হয়তো আমরা আশা করতে পারি বর্তমান সরকার নৃ-তাত্ত্¡িক জনগোষ্ঠীর শিশুদের বই দিয়ে যেমন তাদের শিক্ষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তেমনি আগামী দিনের তাদের পড়ানোর মত মাতৃভাষা জানা শিক্ষকও দেবেন। মুলত বর্তমান সরকার সকল শিশুর শিক্ষার সুযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন । তারই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মত পার্বত্য ও সমতলের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের তাদের মাতৃভাষা গারো, উরাঁও /সাদরী, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা নতুন বই প্রদান করে প্রশংসাও পাচ্ছেন।

 আমরা চাই দেশের সকল শিশুর মাতৃভাষা শিক্ষা লাভের সুযোগ পাক। আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষার অবারিত দ্বার খুলে যাক এ প্রত্যাশা আর নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সুসংগত হোক।    
লেখক ঃ প্রভাষক ও কলামিষ্ট
জবড়িহথড়ৎরহ@ুধযড়ড়.পড়স
০১৭১২-২৩৭৯৩৩

মিড-ডে মিল ও একটি ভাবনা

                                                                       
সৈয়দপুর উপজেলা শিল্প শ্রমিক ও কৃষি শ্রমিক প্রধান এলাকা। এছাড়া এখানে রয়েছে উর্দু ভাষা-ভাষীদের বেশ কয়েকটি ক্যাম্প। শহর এলাকায় এসব পরিবারের অধিকাংশ সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। আবার গ্রাম এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কৃষি শ্রমিক, ভ্যান চালক, দিন-মজুর ইত্যাদি নি¤œ আয়ের পরিবারের সন্তানেরা লেখাপড়া করছে।


একজন উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে প্রায়ই বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করি। বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে দেখতে পাই  ছাত্রছাত্রীদের রোগা রোগা চেহারা। শিক্ষকগণ যখন ক্লাস নেন তখন খুব ভালভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বললেও অনেক  শিশুরাই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনা। যদিও তারা খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লাসটি শুনেছে বলে মনে হয়। কেন তারা এ সহজ বিষয়টি সহজ করে বার বার বুঝানোর পরেও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, তার কারণ খোঁজার নিরন্তর চেষ্টা করি। সৈয়দপুর উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কতিপয় চৌকস প্রধান শিক্ষকদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের উপর একটি  জরিপ পরিচালনা করি।  জরিপের ফলাফল অনুযায়ী সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে আসে প্রায় ৯০% শিক্ষার্থী।

সকালের নাস্তা হিসেবে চা-মুড়ি, চা-বিস্কিট খায় প্রায় ৭০% শিক্ষার্থী, দুপুরে দোকান থেকে কিনে ভেজাল আচার, চিপস, রং ও ঘনচিনি মিশ্রিত আইসক্রীম, হাইড্রোজ মুড়ি ও ভেজাল তেল দিয়ে তৈরি মুড়ি মাখা, অনুমোদনবিহীন চানাচুর, নিম্নমানের বিস্কুট ইত্যাদি খায় প্রায় ৮০% শিক্ষার্থী। টিফিনের সময় ২৫% শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে খেয়ে আসে। আর ২৪% বাড়ি থেকে টিফিন আনে অথবা না খেয়ে থাকে, ২০ % শিক্ষার্থী স্কুল ত্যাগ করে । এ জরিপের ফলাফল থেকে জানা যায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না হওয়ার একটি অন্যতম কারণ পুষ্টিহীনতা।

 মুলত পুষ্টিহীনতার কারণেই তাদের মেধার বিকাশ ঘটছে না। নি¤œআয়ের পরিবারের সন্তানদের সংখ্যাধিক্যের কারণে শিক্ষার্থীদের দুপুরের টিফিন পিরিয়ডে খাবার নিয়ে আসার সংখ্যা ছিল একেবারেই নগণ্য। সাধারণত বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের তিন ধরনের চিত্র দেখা যায়। একদল শিক্ষার্থী টিফিন পিরিয়ডে  বাড়িতে গিয়ে খাবার খেয়ে তারা নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যালয়ে ফিরে আসে। আর এক দল শিক্ষার্থী রয়েছে যারা সে সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করে নিকটস্থ দোকান থেকে অল্প টাকায় অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনে খায়। পরিণামে তারা পেটের পীড়া সহ স্বাস্থ্যজনিত নানা রোগে ভোগে।

 আর একদল শিক্ষার্থীদের চিত্র আরো ভয়াবহ। তারা টিফিন পিরিয়ডে বাড়িতে খেতে যায় আর ফিরে আসে না। ফলশ্রুতিতে টিফিন পিরিয়ডের পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়, পাঠে অমনোযোগিতা, স্কুলে অবস্থান না করার প্রবণতা, পুষ্টিহীনতা, ঝরে পড়ার হার ইত্যাদি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অর্থনৈতিক মানদন্ড অনুযায়ী সচ্ছল হওয়ায় ‘‘দারিদ্র পীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং প্রকল্পের’’ আওতার বাইরে  রাখা হয় সৈয়দপুর উপজেলাকে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়। তাদের চিন্তায় আসে কিভাবে অভিভাবকগণ স্বত:স্ফুর্তভাবে তাদের সন্তানদের টিফিন সহকারে বিদ্যালয়ে পাঠাবেন।


‘‘বিদ্যালয়ে একটি শিশুও অভুক্ত থাকবে না’’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উক্তিকে প্রতিপাদ্য হিসেবে সামনে রেখে সৈয়দপুর উপজেলার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হল কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন। উপজেলা পরিষদ, প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সম্মিলিত প্রয়াসে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়। এভাবে একের পর এক বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের নিয়ে শুরু হয় উদ্বুদ্ধকরণ মা সমাবেশ। এ উদ্দেশ্যকে আরো বেগবান করার জন্য স্কুল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয় টিফিন বক্স।


আজ সৈয়দপুর উপজেলার সকল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিফিনের পরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসার সময় টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে আসে। আর যারা সকালে নিজেরা খাবার নিয়ে আসতে পারে না সে সকল শিক্ষার্থীদের জন্য মায়েরা টিফিন পিরিয়ডে টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে আসছে। এসকল শিক্ষার্থীরা টিফিন পিরিয়ডে নিজস্ব শ্রেণীকক্ষে বসে একে অপরের খাবার ভাগাভাগি করে উৎসব মূখর পরিবেশে মিড ডে মিল গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো: নজরুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা, ও ড. মো: আবু হেনা মোস্তফা কামাল, এনডিসি (অতিরিক্ত সচিব), অতিরিক্ত মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা, সৈয়দপুরে এসে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রমের  সফলতা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের আগমন এ কার্যক্রমকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে আরো উজ্জীবিত করছে। দীর্ঘ দু’মাসের সম্মিলিত প্রচেষ্টার পর শিক্ষার্থীদের টিফিন আনার প্রবণতার হার শত ভাগের দোরগোড়ায় পৌছেছে।

ফলশ্রুতিতে সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ বৃদ্ধি, শতভাগ উপস্থিতি, ঝরেপড়া রোধ ও পুষ্টিহীনতা দূর করা সহ গুণগত মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।                                                  
   লেখক ঃ উপজেলা শিক্ষা অফিসার, সৈয়দপুর, নীলফামারী।
    ০১৭১২-৮৬২২১৬।