দুপুর ২:৫১, মঙ্গলবার, ২৩শে মে, ২০১৭ ইং
/ মতামত

  মোঃ আব্দুল ওহাব  : সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে বর্তমানের দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধ্বগতি। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বলতে আমরা শুধু বুঝি যে, আমরা প্রতিনিয়ত যে খাদ্যপণ্যগুলো ক্রয় করি সেগুলোকে। আসলে আমাদের খাবারের দ্রব্য গুলো ছাড়াও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকমের উপকরণের প্রয়োজন হয়। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এই মৌলিক চাহিদাগুলোও এর সাথে সংশ্লিষ্ট। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য।

 

সাম্প্রতিক সময়ে চাল, ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীনভাবে মূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের, যারা সমাজে সীমিত আয়ের মানুষ হিসাবে পরিচিত। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে জীবনযাপন করা এখন প্রায় রীতিমতো অসম্ভব। দ্রব্য মূল্যের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিতে জনজীবন একটি অভিশাপরূপে দেখা দিয়েছে । ন্যায়সঙ্গত বা নির্ধারিত মূল্য বলতে মনে হয় না কিছু আছে।


 আমরা ছোট বেলায় নানা-নানী, দাদা-দাদীর নিকট থেকে অনেক কথা শুনেছি, কিন্তুু সেই কথাগুলো আমাদের কাছে এখন রূপকথার মতোই মনে হয়, এক টাকায় আট মণ চাল, এক পয়সায় এক সের লবণ ইত্যাদি। দ্রব্যমূল্যের বর্তমানের যেসব দেশে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে হয় না সে সব দেশেও বর্তমানে একই অবস্থা, আবার যেসব দেশে মুদ্রাস্ফীত ঘটতে দেওয়া হয় না, এমন দেশেও প্রতি মাসে মূদ্রাস্ফীত বেড়েই চলছে। মুদ্রাস্ফীত সম্পর্কে আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদগণ ভালো বলতে পারবেন, তারপরেও আমরা যেটা জানি যে, একই পরিমাপের দ্রব্য যদি পূর্বের তুলনায় বেশি টাকা দিয়ে ক্রয় করতে হয় তাহলে আমরা সাধারণত সেটাকে মুদ্রাস্ফীতি বলে থাকি।


 এখন থেকে এক যুগ আগে ৮ টাকা কেজি চাল, ৪০ টাকা কেজি গরুর মাংস কিনে খেয়েছি। সেই তুলনায় বর্তমানে চাল কিনতে হয় ঠিক ৭ বা ৮ গুণ বেশি টাকা দিয়ে, আর গরুর মাংস কিনতে হয় প্রায় ১০ গুণ টাকা বেশি দিয়ে। যারা সরকারী বা বেসরকারী চাকুরীজীবী তাদের বেতন সেই তুলনায় যে খুব বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে তা নয়। আমার সাথে অনেকেই হয়তো একমত হবেন যে আগে ১০ হাজার টাকা দিয়ে যেভাবে জীবনযাপন করা যেত, বর্তমানে ২৫ বা ৩০ হাজার টাকা দিয়েও একই রকম জীবনযাপন করা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়েছে বিধায় বেতন বৃদ্ধির সাথে জীবনযাপনের কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। এটা সরকারী চাকুরীজীবিদের জীবন।


 এছাড়া দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ১৪ লক্ষ্যে বা তার কিছু বেশি সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছে আর অবশিষ্ট বড় একটি অংশ রয়েছে, যারা চাকুরীজীবি নয়। তাদেরও বাজার থেকে একই মূল্যের টাকা দিয়ে খাদ্যদ্রব্য কিনতে হয়। কারণ পণ্যের দাম শুধু সমাজের উচুঁ শ্রেণীর মানুষদের জন্যই বাড়ে না। গরুর মাংস কিন্তুু সবাইকে ৪৫০ টাকা কেজিতেই কিনতে হয়, পার্থক্য শুধু কেউ তা কিনতে পারে আর কেউ কিনতে পারে না। তাহলে যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায় বা যারা চাকুরীজীবি নয় তারা কিভাবে জীবনযাপন করবে। দ্রব্যমুল্যের এই উর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনযাপন পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কোন একটি দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলে তার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট সকল দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে।


 গ্যাসের দাম যদি বৃদ্ধি পায় তাহলে মানুষের যাতায়াত ভাড়া অনেক বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেশি হওয়ায় মুল্য স্বাভাবিক ভাবেই বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। যারা সমাজের নিপীড়িত মানুষ বা দারিদ্র্যর কষাঘাতে জর্জরিত এই মানুষগুলো তাদের নির্ধারিত আয়ে যখন পরিবার চালাতে পারেনা, তখন বাধ্য হয়ে দ্রব্যমূল্যর বৃদ্ধির কারণে কখনো কখনো বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করে, কিন্তুু তাদের ন্যায্য দাবির কোন মূল্যায়ণ করা হয় না। বিশেষ করে দেশের পোষাক কারখানাসহ বিভিন্ন কল-কারখানায় যারা কাজ করে তাদের জীবনযাপন আরও অনেক কষ্টকর। তাদের যে বেতন তা দিয়ে নিজের ও পরিবারের খরচ চালানো, দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধ্বগতিতে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। এছাড়া আমাদের দেশে বড় একটি অংশ আছে যারা নদী ভাঙ্গন, হাওর ও চরাঞ্চল এলাকায় বসবাস করে।


 এই মানুষগুলো সারা বছরে অনেক পরিশ্রম করে তারপরেও পরিবার নিয়ে ভালো খাবার বা ভালোমানের কোন পোশাক পরিধান করতে পারেনা উর্ধ্বগতি দ্রব্যমূল্যের কারণে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে আমার বেশ ধারণা আছে। কোন এক ঈদের আগে চরাঞ্চলের এক পরিবারের সাথে কথা বলেছিলাম যে আপনাদের ঈদের বাজার এবং ছেলে-মেয়েদের নতুন পোষাক ক্রয় করেছেন কিনা ? জবাবে বলেছিলেন, যা রোজগার করি তা দিয়ে ঠিকভাবে দু-বেলা ভাত খাওয়ায় কষ্টকর, ছেলে-মেয়েদের নতুন কাপড় কেনা আমাদের কাছে অনেকটা দুসাধ্য।

 

ঈদের দিনে যে ভালো খাবার রান্না করব সেটাও আমাদের কপালে জোটে না, অন্যের বাসায় কাজ করি সেখানেই ঈদের দিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দাওয়াত খেয়ে আসি, এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় কিছু। এই কথাগুলো যে কোন ব্যক্তিই শোনার পড়ে হয়তো কষ্ট পাবেন। এটা শুধু একটি পরিবারে কথা নয় । তাই তাদের সামান্য আয় দিয়ে এই দ্রব্যমূল্যর লাগামহীন উর্ধ্বগতির মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।


দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির পিছনে প্রধান করণ, চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্যহীনতা। দেশে যে হারে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়েই চলছে সেই পরিমাণ দ্রব্য সাথে সাথে যোগান দেওয়া সম্ভব নয়। আবার যে পরিমাণ দ্রব্য বা পণ্য দেশে উৎপাদন হয় এই পণ্যগুলো অনেক অসৎ ব্যবসায়ী রয়েছে যারা অধিক লাভ করার আশায় আগে থেকেই গুদামে মজুদ করে কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে। এতে করে দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় শুধু বাংলাদেশ নয় বিভিন্ন দেশে দ্রুততার সাথে দেশের ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার অতিরিক্ত নোট বাজারে ছাড়ে, আর এতে করে সম্পদ উৎপাদনের তুলনায়, টাকার পরিমান অনেক বেড়ে যায়। যার কারণে পণ্যের দাম বা দ্রব্যমূল্যের দামও কোন সময় ঠিক থাকে না।


এর প্রভাবে সমাজে নানা রকমের সমস্যা দেখা দেয়। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির জন্য সমাজের সীমিত আয়ের মানুষেরা যখন অল্প আয়ে তাদের নিত্যপণ্য সামগ্রী কিনতে পারে না বা তাদের আয় দিয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পরে, তখন তারা নানাভাবে পরিবারের ব্যয় মিটানোর জন্য অসৎ ভাবে অর্থ উপার্জন করার চেষ্টা করে। আর এ জন্যই সমাজে দূর্নীতি, ঘুষসহ নানা অপকর্ম দিন দিন বেড়েই চলছে। একই সাথে আমাদের দেশে দুর্নীতিপরায়ণ লোকের সংখ্যাও খুব কম নয়। অনেক সময় সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপের কারণে তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে।


তবে সমাজে এখনও অনেক ভালো মানুষ আছে, যারা নিজের আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা না করে সমাজে যারা খেটে খাওয়া মানুষ তাদের চিন্তা করে, তাদেরকে যতটুকু পারে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তবে আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলন আছে যে, ‘‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’’ আর এ কথাটি আমরা কখনই অস্বীকার করতে পারি না।  শুধু বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে এই ধোঁয়া তুলে দ্রব্যর দামও বৃদ্ধি করতে হবে তা নয়,  এই চিন্তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ বেতন বৃদ্ধি পায় শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। দেশের সবাই কিন্তুু সরকারী চাকুরীজীবি নয়।


 সমাজে যারা দিন আনে দিন খায়, সমাজে যাদের ন্যায্য কথার কোন মূল্য দেওয়া হয় না, যারা শুধু চিন্তা করে যে, পরিবার নিয়ে তারা যে আয় করে তা দিয়ে যেন দু-বেলা দু-মুঠো ভাত খেতে পারে। সমাজের কাছে তাদের তেমন কোন চাওয়া থাকে না। তারা সমাজের সহজ-সরল মানুষ হিসাবে পরিচিত, তাদের কথাও সকলের চিন্তা করা উচিত। সে সকল মানুষসহ দেশের সকল মানুষগুলোর কথা বিবেচনা করে, তাদের যে আয় রোজগার তা দিয়ে যেন স্বচ্ছলভাবে জীবনযাপন করতে পারে, এ জন্য এখনই দ্রব্যমূলোর লাগামহীন উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।


 এজন্য সরকারকেই যথাযতভাবে কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের প্রতি সবাইকে শ্র্রদ্ধাশীল হতে হবে। যদি কেউ আইন অমান্য করে তাহলে তার যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকার নানা ভাবে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে, নদী-ভাঙ্গন, হাওর ও চরাঞ্চল এলাকাতে যারা বসবাস করে সেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোতে ভতুর্কি দিয়ে দ্রব্যমূল্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে পারে। এদেশ কৃষি প্রধান দেশ, কৃষকেরা কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলান, তবে তাদের প্রায় অধিকাংশের জীবনযাপন অত্যন্ত নাজুক, তাদেরকে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে সহযোগিতা করে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষি সংক্রান্ত যে সকল পণ্যদ্রব্য রয়েছে সেগুলো বিনামূল্যে কৃষকের মাঝে বা দারিদ্য মানুষের মাঝে বিতরণ, বিশেষ করে ব্যাংক থেকে স্বল্প মুনাফায় লোনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকারিভাবে অবশ্য নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।


 এর পাশাপাশি যতটুকু কৃষকদের জন্য বরাদ্দ হয় সেটাও আবার স্থানীয় পর্যায়ে পৌছাতেই প্রায় শেষ হয়ে যায়, বিষয়টি সরকারকে সঠিকভাবে নজরদারি করতে হবে। সবাইকে চিন্তা করতে হবে দেশের কৃষি পণ্যের আমদানি-রপ্তানি উন্নতী না হওয়া পর্যন্ত দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি স্বাভাবিক আশা করা যায় না। এছাড়া কালো বাজারি বন্ধ করতে হবে জরুরিভাবে, যে মজুদদারীরা পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে, তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্রশাসন অবশ্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে, তারপরেও আইনের ফাঁক-ফোকোর দিয়ে তারা থাকছে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।


 তাই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যে সব পণ্য প্রতিনিয়ত প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য, সেগুলোর উপর সরকারের শুল্ক কমানো উচিত। অনেক সময় পণ্য পরিবহনে নানা রকম চাঁদাবাজি হয় এগুলো কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রতি আমাদের আরও মনোযোগী হতে হবে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে দ্রব্যমূল্যের সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, এ জন্য প্রশাসনকে  সঠিকভাবে প্রতিনিয়ত বাজার মনিটরিং করতে হবে।

 বাজারের প্রতিটি পণ্যের মূল্যের তালিকা প্রতিটি দোকানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। কোন পণ্যের দাম যদি বৃদ্ধি করতে হয়, তাহলে সেই পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রশাসন ও স্থানীয় প্রতিনিধির দ্বারা গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে মূল্য পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া কৃষি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। তাহলেই হয়তো দ্রব্যমুল্যের উর্ধ্বগতি কিছুটা হলেও আমাদের নিয়ন্ত্রনের মধ্যে আসতে পারে এবং স্বল্প আয়ের মানুষগুলোসহ সবাই তাদের নির্দিষ্ট আয় দ্বারা পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে খেয়ে পড়ে জীবন যাপন করতে পারবে।
লেখক ঃ স্টাফ, আর্মি মেডিকেল কলেজ বগুড়া
০১৭২৯-৮২৮৬৮৫

বগুড়ায় আবাসন শিল্প

ডাঃ গাজী  সফিকুল আলম চৌধুরী :ভূমিকা ঃ- পৃথিবীর সব দেশেই নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা এবং চিকিৎসার পাশাপাশি আবাসন অন্যতম অধিকার। প্রায় প্রত্যেক মানুষেরই আকাংখা থাকে একটি সুন্দর বাড়ি অর্জন করা। বাংলাদেশে বর্তমান নগরজীবনে সবারই স্বপ্ন একটি সুন্দর ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্টের। দেশে দ্রুত মানুষ বাড়ছে কিন্তু জমির পরিমাণ আগের মতই আছে। সুতরাং সীমিত জায়গায় অধিক সংখ্যক মানুষের বাসস্থান করতে ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্ট তৈরির বিকল্প নেই।

জেলা শহর বগুড়ায় ফ্ল্যাট এবং এপার্টমেন্টের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবে ক্রেতার পরিমাণ কম থাকায় বেশি প্রকল্প নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। গাজী রিয়েল এস্টেট এবং বগুড়া রিয়েল এষ্টেট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যগণের উদ্যোগে সীমিত আকারে নতুন চৎড়লবপঃ নেওয়া হচ্ছে।আবাসন একটা গুরুত্বপূর্ণ খাত

মানুষ সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে আমাদের নিকট একটি ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্ট কিনেন। এক্ষেত্রে প্রতারণা খুবই খারাপ এবং দুঃখজনক হবে। তাই আমি ক্রেতাদের বলব তিনি যেন দেখে শুনে নেন। নির্মাণ কাজ ঠরংরঃ করবেন, রিয়েল এষ্টেট কোম্পানির নধপশমৎড়ঁহফ চেক করবেন এবং উবপরংরড়হ নিতে সময় নিবেন। আবাসন শিল্পের সংকট নিরসনেও গণমাধ্যমের কিছু দায়বদ্ধতা আছে। সমাজের  প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো আবাসন শিল্পেও কিছু কিছু দুর্বৃত্তের অনুপ্রবেশ আছে। এদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম কর্মীদের সোচ্চার হতে হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে আবাসন শিল্প যাতে বিকশিত হয় সেই পথে চলতে হবে। পরিবেশ বান্ধব আবাসন শিল্পের বিকাশ সকল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাম্য।


সঙ্কটে আবাসন খাত ঃ ২০১০ সাল থেকে আবাসন খাত কঠিন সময় পার করছে। এর প্রধান কারণগুলি হল- এই সালে শেয়ার বাজারের ধ্বস নামায় তা আবাসন খাতেও অনেক প্রভাব ফেলেছে। তারপর ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হয়ে আবাসন খাত আরও বিপর্যয়ে পড়েছে। এই সালে চলমান হরতালে আবাসন শিল্পতে অনেক কাজ বন্ধ রাখতে হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার এই দেশে ভবিষ্যতে কি হবে আমরা জানি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে  নি¤œ লিখিত কারণে আমাদের আবাসন খাত বিপদের সম্মুখে রয়েছে বলে আমার মনে হয়। নকশা অনুমোদনে বিড়ম্বনা। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার। ক্রেতা পর্যায়ে ঋণ সুবিধার অভাব।
অতিরিক্ত নিবন্ধন ফি।


ভূমির স্বল্পতা।নির্মাণ সামগ্রীর মূলের উর্দ্ধগতি। অদূরদর্শী নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা। গৃহ নির্মাণে আইন প্রক্রিয়ার জটিলতা। এরপরও —- সময় সময়ে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ সংযোগের অতিরিক্ত আলাদা খরচ এবং ডিমান্ড নোট। নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে ফ্ল্যাট নির্মাণের মূল্য অনেক বেড়ে গিয়েছে কিন্তু দুঃখের বিষয় ফ্ল্যাট এখন ন্যূনতম ২০ থেকে ৩০ % কম দামে বিক্রয় করতে হচ্ছে। এইসব কারণে আক্রান্ত হয়ে আবাসন খাত এখন দ্রুত বিপর্যয়ের সম্মুখিন।কেন বহুতল ভবন প্রয়োজন ?


সীমিত ভূমিসহ জমির উচ্চমূল্যের জন্য বগুড়া এবং অন্যান্য শহরগুলো বহুতল ভবন নির্মাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যত্রতত্র নির্মাণের জন্য জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা ডেভেলপারেরা ভূমি মালিককে শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ভবনের অংশ দিয়ে কাজ করতে হয়। ফ্ল্যাট বা এপার্টমেন্টের সকল ব্যয়সমুহ উক্ত নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় টিকে থাকতে গেলে নূন্যতম আট বা নয় তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করতে হয়। এটা স্পষ্টভাবেই বলা যায় ভবিষ্যতে শুধু বগুড়াতেই না সমগ্র  বাংলাদেশেই বহুতল ভবন নির্মাণ হবে। ঢাকা শহরের নতুন নির্মাণাধীন ভবনের একশত ভাগই নয়তলা বিশিষ্ট। বহুতল ভবনের সুবিধাসমুহ নি¤েœ দেওয়া হল –


শহরের ভিতরের জমির সঠিক ব্যবহার ও ঘনত্ব কমায় বহুতল ভবন। সঠিকভাবে নকশা করে নির্মাণ করলে বাণিজ্যিক ও আবাসিক উভয়ের কার্যকরী ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। শহরে উচ্চভবনে বসবাসের উপর এটা একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বহুতল ভবনের নির্মাতা ও এর ব্যবহারকারীর দ্বারা সাধারণত: বেশি রেভিনিউ পেয়ে থাকে স্থানীয় সরকার  (পৌরসভা)।


বহুতল ভবনের দ্বারা উচ্চ-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ফ্ল্যাটের চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে।
প্রধান প্রতিবন্ধকতা ঃ-প্রথম যেটা উল্লেখ করব তা হচ্ছে –  বগুড়ায় পৌরসভার নকশা পাশে দীর্ঘসূত্রিতা, বিশেষ করে ৬ তলার উপরের বিল্ডিং এর নকশা পাশ করতে দুই/তিন বছর লেগে যায়। প্রথমত বলা হয় এটা রাজনৈতিক  সিদ্ধান্ত। সে সিদ্ধান্ত বগুড়াবাসীর উন্নয়নের বাধা হয়ে দাঁড়ায় তা কেন নেয়া হয়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে আমাদেরকে সহযোগিতা তো করা হয়ই না, বরং কটুবাক্য শুনতে হয়। যেমন – কোন কিছু না বুঝেই “রানা প্লাজা”এর উদাহরণ দেয়া হয়।

 রানা প্লাজায় অনেক অনিয়ম করা হয়েছে। সাধারণ নঁরষফরহম কে ঋধপঃড়ৎু নঁরষফরহম হিসাবে ব্যবহার হয়েছে। যেখানে ২০০/৩০০ মানুষের থাকার কথা সেখানে দিন-রাত ৪০০০/৫০০০ মানুষ কাজ করেছে।  উপর তলায় ২৪ ঘন্টা এবহবৎধঃড়ৎ ও অন্যান্য ঐবধাু গধপযরহবৎরবং  চালানো  হয়েছে। এইরূপ আরো নানা ধরনের অনিয়ম ছিল, যার একটাও আমাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পৌরসভায় ঋরৎব ঝবৎারপব, পরিবেশ, পুলিশ সুপার, এধং এবং ঊষবপঃৎরপরঃু এর ছাড়পত্র জমা দেওয়ার পরেও আমাদেরকে ২-৩ বৎসর অহেতুক অপেক্ষা করতে হচ্ছে।


আবাসন শিল্পের অবদান ঃ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম চালিকাশক্তি নির্মাণশিল্প, নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাবে বর্তমান এই খাতে বিনিয়োগ প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা, এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত। দেশে জিডিপির প্রায় ১৪ শতাংশ অবদান আছে নির্মাণ শিল্পের। প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও আবাসন শিল্পের অবদান রয়েছে। আবাসন খাত বহু বাধা বিপত্তিকে মোকাবেলা করে দেশের বেকার সমস্যার সমাধানসহ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে বহু মানুষের ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, বিবিএ, এমবিএ এবং আইনজীবী বহু শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেশ কয়েক খাত মানুষ কাজ করছে। আবাসন শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কয়েক শত লিংকেজ প্রতিষ্ঠান।


বগুড়া ও দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই যে, আমরা যেন ক্রমান্বয়ে আমাদের জন্মভূমি বগুড়া এবং বাংলাদেশকে উন্নত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যেতে পারি উচ্চমানের ভবন এবং হাউজিং এলাকা নিশ্চিত করে বগুড়াবাসীর জন্য সন্তুষ্ট অর্জন করা আমাদের লক্ষ্য।
লেখক ঃ চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
গাজী রিয়েল এস্টেট লিঃ
০১৭২৬-০৪২৩০৪

এত অস্ত্র দিয়ে কি করবে সৌদি আরব

রাশিদ রিয়াজ :সৌদি আরব মুসলমানদের হৃদয়ে এক ধরনের ধর্মীয় আবেগ ও অনুভূতি এবং শ্রদ্ধা মিশ্রিত একটি দেশের নাম। ইসলামের ্অন্যতম ফরজ হজ আদায়ের জন্যে প্রতিবছর লাখ লাখ মুসলমান দেশটিতে যান। ইসলাম অর্থ শান্তি এবং এ শান্তির নিদর্শন সামাজিকভাবে আমাদের জীবনে বহমান থাকার আকাঙ্খায় সৌদি আরবের অনেক উদাহরণ আমরা প্রাত্যহিক জীবনে টেনে থাকি অথবা অনুসরণ করতেও অভ্যস্ত।

 

দেশটিতে ইসলামী আইন থাকার কারণে অপরাধ প্রবণতা কম বলেই আমাদের অনেকের ধারণা। সেই সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৩৮ হাজার কোটি টাকার চুক্তি করেছে যার মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা অস্ত্র ক্রয়ের জন্যে। হোয়াইট হাউজ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো দেশের সঙ্গে এত বড় অস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি এই প্রথম। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে সৌদি আরব এত অস্ত্র কিনে কি করবে?

 
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরবে এ প্রশ্নের আংশিক উত্তর দিয়েছেন। বলেছেন, এই চুক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে সৌদিরা তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, ইরানের হুমকি মোকাবেলা করতে পারে। ইরানকে টিলারসন ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথাও বলেছেন। টিলারসন এও বলেছেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সহযোগিতা সৌদি আরব এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে নিরাপত্তা দেবে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে আগামীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।

 

এমনিতে সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান থেকে শুরু করে আফ্রিকার অনেক মুসলিম দেশে জঙ্গি তৎপরতা ও অস্ত্রের ব্যবহার, সংঘর্ষ দেশগুলোকে কোথায় নিয়ে গেছে এবং এসব দেশে এমন পরিস্থিতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি কতটা ইন্ধন যোগাচ্ছে তা এই ইন্টারনেটের যুগে কারো অজানা নয়। এমন অবস্থায় মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্যে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন আমাদের জানা নেই। বরং ওসামা বিন লাদেনের মত আলকায়েদা নেতার উত্থান তার দেশ থেকেই হয়েছে।


 তালেবানের ধারাবাহিক সংস্করণ আইএস জঙ্গিদের পেছনে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে এমন অভিযোগ যেখানে রয়েছে সেখানে এত অস্ত্র না কিনে সৌদি আরব বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, এমআইটি, সোরবোর্ন, এলএসই, মোনাস’এর মত যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে তেল বিক্রির টাকা খরচ করত তাহলে বিশ্বমুসলিমের কিছুটা হলেও কাজে লাগত।

 

জ্ঞানই শক্তি এধরনের কোনো উপলব্ধি থেকে এবং সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা বিলাসিতা থেকে কিছুটা বিরত থেকে মুসলমানদের জন্যে যদি সত্যি কিছু করতে চাইত তাহলে এত অস্ত্রের প্রয়োজন হত না। লক্ষ্যনীয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলোর নেতারা যখনই সৌদি আরব যান তখনি দেশটি এসব নেতাদের কাছ থেকে শত শত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনার ঘোষণা দেন।


সৌদি আরব যে অর্থে অস্ত্র কিনছে তা দেশটির জনগণের কষ্টার্জিত শ্রমের পয়সা না হলেও মাটির নিচে অঢেল ছড়িয়ে থাকা তেলের পয়সায় কেনা হচ্ছে। সৌদি আরব কোনো শিল্প উন্নত দেশ নয়। দ্বিতীয়ত শত শত যেসব প্রতিষ্ঠান দেশটিতে রয়েছে তার সিংহভাগ মালিকানা মার্কিনিদের হাতে এবং বাণিজ্য উদ্বৃত্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই। এমন অস্ত্র যদি সিরিয়া ও ইয়েমেনে নিরীহ মানুষকে হত্যার জন্যে ব্যবহার হয় তাহলে আমরাও গোমরাহী হয়ে পড়ব তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

ট্রাম্প মুসলমানদের শত্রু না মিত্র সে বিতর্কে না যেয়েও বলা যায়, প্রথম দেশ হিসেবে সৌদি আরব সফরের পর তিনি ইসরায়েল সহ অন্য কোন কোন দেশে যাচ্ছেন এবং সেখানে কি বলবেন তার দিকে যদি খেয়াল রাখি তাহলে মুসলমানদের কিছুটা হুঁশ ফিরলেও ফিরতে পারে। ট্রাম্প ২০১৬ সালের মার্চ মাসে বলেছিলেন, ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। ১৯৭৯ সালে ইরানে যখন বিপ্লব হয় সেই সময়ে সৌদি আরব এ ধরনের এজেন্ডা তৈরির পর যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাদের সমর্থনও করেছিল।


সৌদি আরবের রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র সহ পরাশক্তি দেশগুলোর লেজুরবৃত্তি দরকার তেমনি ওসব দেশের সৌদির মত দেশগুলোকে শোষণ করে, দেশগুলোর জনগণকে জ্ঞান অর্জনের মত আসল যুদ্ধ থেকে সরিয়ে রাখতেই এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি প্রয়োজন। মুসলমানদের জ্ঞান অর্জন ফরজ, সেই পথে সৌদি আরব বিশ্বমুসলিমকে নেতৃত্ব না দিয়ে আক্রান্ত হবার আগেই কেন অস্ত্র ক্রয়ের মত কাজকে ফরজ হিসেবে বেছে নিয়েছে সে জবাব বাদশাহদের আল্লাহর কাছেও দিতে হবে।

ধর্ষকদের সাথে ওদেরও যেন শাস্তি হয়?

মীর আব্দুল আলীম :দেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর খুনের ঘটনা বেড়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের অপরাধ বাড়ার মূল কারণ। ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির বিষয় স্পষ্ট দিক হলো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত ব্যর্থতা। হাল সময়ের বনানীতে ঘটে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীও ঘটনাই তার জ¦লন্ত প্রমাণ।

 

এ ঘটনাটিও ধামাচাপা পড়ার উপক্রম হয়েছিল। বীরের বেশেই ঘুরছিল ধর্ষকরা। ধর্ষকরা ধনীর দুলাল হওয়ায় সব কিছু যেন পানির মতো হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু মিডিয়া এবং দেশবাসী সরব হওয়ায় তা হয়নি। অপরাধীরা ধরা পড়েছে।

 

 এমন হবে কেন? এমন প্রশ্রয়ে দেশে ধর্ষণ বাড়বে এটাইতো স্বাভাবিক। শুরুতেই রাজধানীর বনানীর চার তারকা ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় পুলিশের নিষ্পৃহতার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার মামলা গ্রহণে পুলিশের গড়িমসির বিষয়টি মিডিয়ায় এসেছে।

 

গত ২৮ মার্চ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়–য়া দুই ছাত্রীকে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে তাদের দু’জনকে আলাদা আলাদা কক্ষে আটকে রেখে রাতভর ধর্ষণ করা হয়। শুধু ধর্ষণ নয়, ধর্ষণের ঘটনা ভিডিও চিত্রে ধারণ করা হয়। ভিকটিমরা তাদের ভয়ভীতি দেখালে তারা পরিবারের সাথে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে বনানী থানায় মামলা করতে যায়।

 মামলা গ্রহণে পুলিশ প্রথমে টালবাহানা করে এমনকি ওই ভিকটিমদের অপরাধী প্রমাণের চেষ্টা করে। তাদের চরিত্র খারাপ বলে প্রমাণের চেষ্টা করে। মেডিকেল টেস্টের নামে থানায় আটকে রাখা হয়। অপরাধীরা ধনাঢ্য এবং প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় অনেকের মনেই যথেষ্ট সন্দেহ দানা বাঁধে যে, অতীতের কোন কোন অপরাধ ঘটনার মতোই এই ধর্ষণ ঘটনাও ধামাচাপা পড়ে যাবে।

 

কিন্তু ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ার চাপে একটা পর্যায়ে মামলা হয়। পুলিশ আসামীদের আটক করতে গড়িমসি করে। মিডিয়া সোচ্চার হয়, মিডিয়া জানায় আসামীরা সিলেটে আছে। একটা পর্যায়ে শেষ পর্যন্ত সিলেটে দুই ধর্ষককে আটক করে পুলিশ।

যে কোন অপরাধের মামলায় আসামি গ্রেফতার হবে এবং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে এটাই আইনের বিধান। কিন্তু ঘটনা ঘটার পর মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করে, মানুষ রাস্তায় নেমে দাবি জানিয়ে তারপর পুলিশ তৎপর হবে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।


প্রশ্ন হলো, যারা বনানী ধর্ষণ মামলা নিয়ে নয়-ছয় করলো; যারা এতো দিন আপন জুয়েলার্সের সকল অপকর্ম ঢেকে রেখেছিল; যারা বনানীর চার তারকা হোটেল ‘দ্য রেইনট্রি’ অবৈধ ভাবে কারবার চলতে সহায়তা করলো এরা কেন আইনের আওতায় আসবে না?

 

বনানীর ঘটনায় সকল ধর্ষক, ধর্ষকদের বাঁচাতে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের, যারা ‘দ্য রেইনট্রি’ অনৈতিক কাজ এ যাবৎ ঢেকে রাখলো তাদের এবং আপন জুয়েলার্সেও চোরাচালান, ভ্যাট ট্যাক্স ফাঁকিতে যারা দীর্ঘদিন সহযোগিতা করেছেন তাদের সকলকেই আইনের আওতান আনা হউক। ধর্ষকরা যেমন অপরাধ করেছে এরাও নানা কারণে অপরাধী। এদেরও যেন শাস্তি হয়।


দেশে কি সোনার খনি আছে? সোনা আবার আমদানি করার অনুমতিও নেই। অথচ দেশজুড়ে দিব্যি গড়ে উঠেছে ২০ হাজারেরও বেশি সোনার দোকান। এসব দোকানে নিয়মিতভাবে গয়না তৈরি হচ্ছে, ভাঙাও হচ্ছে; কাজ করে যাচ্ছেন কারিগরসহ দেড় লাখেরও বেশি শ্রমিক। রাজধানী থেকে মফস্বল শহর সবখানে জুয়েলারি দোকানের ভীষণ কদর। কিন্তু, এসব দোকানে যে সোনা ব্যবহার হয়, প্রশ্ন ওঠে তার উৎস কি? বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য মতে, পুরনো সোনা ‘রিফাইন’ বা পরিশোধন করে দেশে গয়না তৈরি হয়।


 কিন্তু, বাস্তবতা বলে, মূলত চোরাচালানের সোনা দিয়েই চলছে দেশের জুয়েলারি ব্যবসা। দেশে সোনা আমদানির বৈধতা না থাকায় চোরাচালানকে আঁকড়ে ধরে আছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। আপন জুয়েলার্স তার অন্যতম। এসব জানতো প্রশাসন কিন্তু নগদি নারায়ণ পেয়ে চুপ থাকতো সবাই। এমনটা হবে কেন? এতো দেশের সর্বনাশ। এসব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হউক। সোনার বাজারটা মূলত অস্বচ্ছ। এটাকে স্বচ্ছ করতে হলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।


বনানীর ধর্ষণ নিয়েই আজকের এ লেখা। পাঠক মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই,  দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৮ বছরের কম বয়সী এক দশমিক সাত শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতিকালের এমন জরিপই বলে  দেয়, দেশে ১৮ উর্দ্ধ নারী ধর্ষণ আর নির্যাতনের পরিমাণ কত। সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। নিত্যই ব্যাভিচার ও ধর্ষণকামিতার ঘটনা ঘটছে। রোধ হচ্ছে না।


কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। আমাদের নারী, শিশুরা যৌন নির্যাতন এমনকি ধর্ষণের পর খুন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ। দেশব্যাপী শুরু হয়েছে ব্যাভিচারের চূড়ান্তÑপ্রকাশ্য ধর্ষণকামিতা। রাত-বিরাতে নয় শুধু, দিনদুপুরে প্রকাশ্য ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে।

 

শুধু ধর্ষণই নয়, রীতিমতো গণধর্ষণ হচ্ছে। অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের সমাজকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করছে তা হালআমলের ধর্ষণের চিত্র দেখলেই বেশ টের পাওয়া যায়। বাসের ভেতরে ধর্ষিত হচ্ছে মেয়েরা, শিক্ষাঙ্গনে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, এমপির কথিত এপিএসর দ্বারাও  এদেশে ধর্ষিত হচ্ছে যুবতী।

 

 এই হলো বাস্তবতা। তবে এটি নতুন কোন বিষয় তা নয়; বলা যায় আমাদের সমাজ বাস্তবতার এক করুণ চিত্র। কিছু মানুষরূপী নরপশু সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে হায়েনার নখ মেলে বসেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বললেই চলে। আর শাস্তি না হওয়ার পরিণতিতে বাংলাদেশে ধর্ষণ, নির্যাতন, অতঃপর হত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রশ্রয় পেলে এ ধরনের অপরাধতো ফেঁপে উঠবেই।  


যৌন হয়রানি শুধু নারী, শিশুর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণ বাড়ছে এশিয়ার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশে ধর্ষণের অপরাধ বেশি হয়ে থাকে। খুন, ধর্ষণ আজকাল এই আধুনিক পৃথিবীর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হলেও আমাদের দেশে এর মাত্রা যেন সব বিচিত্রতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞকদের মতে, ধর্ষণের এই ব্যাপকতার পিছনের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, ইসলামী মূলবোধ মেনে না চলা এবং অপরাধীর শাস্তি না পাওয়া। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও তাদের তৎপরতাও দায়ী।

 

 নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের ৯ (২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে।’


 একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, ‘যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং উক্ত ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে’। ভারতে এক্ষেত্রে শুধু যাবজ্জীবনের কথা বলা আছে।

 মহিলা আইনজীবী সমিতির এক জরিপে জানা যায়, নানা কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামী খালাস পেয়ে থাকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে ‘প্রশাসনে দলীয় লোক থাকার কারণে এসব ঘটনার অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়ার আরেক কারণ। এছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে ‘জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি পাবে।’ শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে ধর্ষণ মহামারী রূপ নিয়েছে।


ইজ্জত হারিয়েও মুখ খোলেন না। তারা জানেন আইন আদালত করলে তাদের ভাগ্যে উল্টো বিপত্তি ঘটবে। অন্যায় করে অপরাধিরা এভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই দেশে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমরা ঈমানী শক্তি হারিয়েছি। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, যৗন কামনা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রেরণা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাই সমাজ থেকে সুখ, শান্তি বা আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে।

 

নিঃশর্ত ভালবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠন মূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে । অনিয়ন্ত্রিত যৌন কামনার প্রভাবে আমাদের মধ্যে ধর্ষণ, জেনা, পরকীয়া প্রেম ইত্যাদির প্রবণতা বাড়ছে।


 পার্শ্ববর্তী ভারতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে হৈ চৈ পড়ে যায়। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের জনগণ একেবারেই নীরব। সচেতন কম। প্রতিবাদ হয়না হলেও খুবই সামান্য। মনে হয় ভারতেই হরে দরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে নয়! যৌন-ব্যাভিচার সর্বযুগে, সর্বধর্মমতে নিন্দনীয় নিকৃষ্ট পাপাচার।

 

ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার চূড়ান্ত শাস্তিবিধান মৃত্যুদন্ড। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা হলে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণে নিশ্চিত হলে হত্যাকারীর শাস্তিও মৃত্যুদন্ড। কিন্তু আমাদের দেশে এ যাবৎ যতগুলো ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে, তার যথাযথ বিচার সম্পন্ন হয়েছে এরূপ নজির কমই আছে। হয় চুড়ান্ত রিপোর্টে ঘাপলা নয়তো সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রভাবিত করে অপরাধি পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকই।


উপরন্তু এর বিচার চাইতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীরা নির্বিচারে পাল্টা হত্যার হুমকি কখনো কখনো হত্যার শিকার ও হয়রানির শিকার হন। এ অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। এদেশে ধর্ষণের পাকাপোক্ত আইন আছে ঠিকই কিন্তু আইনকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আইনের যারা প্রয়োগ করবেন তারা ঐ আইনের পথে হাঁটেন না।

 

 কখনো অর্থের লোভ কখনো বা হুমকি ধমকিতে  শুরুতেই গলদ দেখা দেয়। মামলার চার্জশিট গঠনের সময় ফাঁক ফোকর থেকে যায়। তাই শেষে রায়ে ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার লোকজন সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন। ধর্ষণ যেহেতু মস্ত অপরাধ এসব মামলাগুলোর ক্ষেত্রে চার্জশিট গঠনের সময় কোন ম্যাজিট্রেট অথবা পুলিশের কোন পদস্থ কর্মকর্তার নজরদারিতে করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চুড়ান্ত রিপোর্টের সময় ভিক্টিমের সাক্ষাত গ্রহণ করা যেতে পারে। তাতে করে গোপনে চার্জশীট দাখিলের ফলে যে জটিলতা তৈরি হয় তা কমে আসবে।


ধর্মে নারীকে পর্দা করতে বললেও পুরুষদেরও চোখ অবনত রাখতে বলা হয়েছে। তবে শুধু নারীর দোষ কেন? নারীর রুপ যৌবন পুরুষকে মোহিত করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই বলে তার উপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে কেন? ধর্ষণ কমাতে হলে আগে পুরুষের মাঝে মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করতে হবে। ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে।

 

 অবাধ মেশামেশার সুযোগ, লোভ-লালসা-নেশা, উচ্চাভিলাষ, পর্নো সংস্কৃতির নামে অশ্ল¬ীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লিল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি কামোত্তেজনা মানুষকে প্রবলভাবে ব্যাভিচারে প্ররোচিত করে তা বর্জন করতে হবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সময় মত বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌন শিক্ষার গ্রহন করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে।


ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যার যার পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, শালীনতা, অশ্ল¬ীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ।

 

আর এটা করতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা, আইনের শাসন প্রয়োগ বা ফতোয়া দিলেই চলবে না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থানে থেকে স্কুল-কলেজ মাদরাাসা-মক্তব-মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সমাজের অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 

সর্বোপরি কঠোর শাস্তির বিধান ও প্রয়োগ নিশ্চত করতে হবে। নারীকে মর্যাদার আসনে বসাতে হবে। পর নারীকে কখনো মা, কখনো বোন, কখনোবা মেয়ে ভাবতে হবে। তাদের উপর লোলুপ দৃষ্টি নয়; মায়ামমতার দৃষ্টি দিতে হবে। তবেই ধর্ষণ কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
newsstore13@gmail.com  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

মানবতার মৃত্যু ঘন্টা বাড়ছেই

আব্দুল হাই রঞ্জু : শিশু অপহরণ, অতপর মুক্তিপণ দাবি কিম্বা বিদেশে পাঁচার করার ঘটনা দেশে হরহামেশাই ঘটছে। অনেক সময়ই হতভাগ্য এসব শিশুদের জীবিত উদ্ধার করাও সম্ভব হয় না। কদাচিৎ ভাগ্যগুণে কেউ কেউ জীবিত উদ্ধার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুই যেন হয় তাদের শেষ ঠিকানা। টানা ২৪ দিন অপহৃত  অবস্থায় জীবিত থেকে সুস্থ শরীরে ৫ বছরের সুমাইয়াকে পুলিশ উদ্ধার করে তার বাবা মায়ের কোলে তুলিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করেছে অনন্য এক দৃষ্টান্ত। আমাদের দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে কতই না অভিযোগ!

 

সেই পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ ধরে তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে টানা ২৪ দিন ধরে লুকিয়ে রাখা শিশু সুমাইয়াকে জীবিত উদ্ধার করায় আর একবার প্রমাণিত হল, সত্যিই আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুুলিশ জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু। হয়তো মাঝে মধ্যে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কিম্বা সদস্যের অপকর্মের দায় গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে বিতর্কিত করে তোলে।


দিনটি ছিল ২৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবারের ভরা দুপুর। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। শ্বাস রুদ্ধকর এক আবেগঘন পরিবেশ। পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ইব্রাহিম অপহৃত ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশু সুমাইয়াকে মায়ের কোলে তুলে দিয়ে অপহরণের বিবরণ সাংবাদিকদের নিকট তুলে ধরেন। মায়ের কোলে উঠে সুমাইয়া বলতে থাকে, মা-আমি তোমাদের জন্য অনেক কেঁদেছি, আমাকে চুমু দাও মা’ বলতে থাকলে সেখানে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার জন্ম হয়। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠেন মা-বাবা।

 

মা-বাবার এই আনন্দ অশ্রু আর আবেগঘন এক পরিবেশে উপস্থিত সকলেই আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠেন। সুমাইয়া ওর বাবাকে লক্ষ্য করে বলতে থাকে, বাবা, তোমরা আমাকে খুঁজোনি? বাকরুদ্ধ বাবার কিইবা জবাব থাকতে পারে? এমন কি কোন সন্তান আছে, যে হারিয়ে গেলে কোন বাবা-মা খোঁজ না করে থাকতে পারে? যে পাষন্ডরা নিষ্পাপ শিশুটিকে অপহরণ করেছিল, ওদের ঘরে কি কোন সন্তান নেই? ওদের সন্তান হাঁরিয়ে গেলে ওরা কি তার খোঁজ করতেন না? সহজ জবাব, সব বাবা-মাই সন্তানের খোঁঁজ নিবে, এটাই স্বাভাবিক।


তাহলে কি করে মানুষ বাবা-মায়ের বুকের ধন সন্তানকে অপহরণ করে? বাস্তবে ভোগবাদি যান্ত্রিক এ সমাজে মানুষ বাবা-মায়ের বুকের ধন সন্তানকে অপহরণ করে অর্থ আদায় করার নির্মম কৌশলকে অবলম্বন করেই অর্থের চাহিদা মেটানোর চেষ্ট করে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। সেই শিশুরা নির্বিঘেœ সমাজে চলাফেরা করতে না পারলে ওরা বেড়ে উঠবে কি করে? অথচ বেড়ে ওঠার সুযোগ ওদের জন্মগত অধিকার। সেই জন্মগত অধিকারটুকু ভোগের সুযোগ আমাদের সমাজে একেবারেই নেই, যা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। আমরাও শিশু হয়ে জন্ম নিয়ে এ দেশেই বেড়ে উঠেছি। আমাদের সময়তো এ ধরনের নিরাপত্তাহীনতা একেবারেই ছিল না। বলতে গেলে আমরা বলগাহীন ঘোড়ার ন্যায় স্বাধীন সত্তা নিয়েই বেড়ে উঠেছি।


 কিন্তু সমাজ দেশ অনেক এগিয়েছে, তবুও আজ শিশুদের নিরাপত্তাটুকু কেন তাদের জীবনে অনিশ্চিত? কেন ঘুম থেকে ওঠে প্রতিটি বাবা-মাকে, বিশেষ করে স্কুলে নেয়া কিম্বা ছুটির পর সন্তানকে বুকে নিয়ে ফিরতে হয় বাড়িতে। এ দৃশ্য এখন মফস্বল শহর থেকে নগর মহানগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপরও মায়ের কোল থেকে শিশুদের অনেক সময়ই কেড়ে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। এ নির্মমতার কি কোন শেষ নেই? এ প্রশ্ন আজ গোটা জাতির। জবাব মেলা খুবই ভার। তবুও শিশুটির নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মায়ের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে অবিরাম। এরপরও শিশু অপহরণ, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যার ঘটনা সমানেই বেড়েই চলছে। অর্থাৎ মানবতার মৃত্যু ঘন্টা কমার বদলে শুধুই বাড়ছে!


আগেই বলেছি, এর মূলেই রয়েছে ভোগবাদি সমাজব্যবস্থার ভোগ বিলাসের অসম প্রতিযোগিতা। যে সমাজব্যবস্থায় দুর্নীতি, লুটপাট, অবৈধ উপার্জন মানুষকে নিষ্ঠুর করে তুলছে। যে সমাজ ব্যবস্থায় মাদকের মত জীবনঘাতি অবৈধ ব্যবসার দাপটে তরুণ ও যুব সমাজ প্রতিনিয়তই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাদক, অশ্লিলতা এখন এতই বেশি বিস্তৃত, যেখানে বাবা-মায়ের পক্ষে আদরের সন্তানটিকে সুস্থ পরিবেশে মানুষ করতে অনেকেই অপারগ হচ্ছেন। কত মায়ের সন্তান মাদকের ছোবলে অনিশ্চিত অন্ধকার জগতে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিচ্ছে।

 

একবার কোন সন্তান বিপজ্জনক এ পথে পা বাড়ালে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা যে কতবড় কঠিন কাজ, যা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতিত অন্য কেউ কল্পনা করতেও পারবেন না। অথচ বাবা-মায়ের বুকের ধন প্রতিটি সন্তানের অনাবিল ভবিষ্যত সুখ সমৃদ্ধির স্বপ্ন নিয়েই বাবা-মায়ের স্বপ্নের শেষ থাকে না। তবুও কতজনই না বিপথগামী হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নকে ধুলিস্যাত করছে। মাদক মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশের পথে বড় অন্তরায়। একজন মাদকাসক্ত সন্তান অনেক সময়ই মাদকের পয়সার জন্য ভাড়াটে খুনি হতে দ্বিধা করে না। ফলে সমাজে খুন খারাপি অপহরণের মতো ঘটনা সমানেই বাড়ছে।


খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়। হয়তো মাস খানেকের বেশি হবে। ঢাকার অদূরে গাজীপুর শ্রীপুরের ছিটপাড়া গ্রামের জনৈক প্রভাবশালীর ছেলের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় ৭ বছরের শিশু আয়েশা আক্তার। এ ঘটনার ন্যায় বিচারের জন্য শিশুটির বাবা হযরত আলী ইউপি মেম্বারসহ স্থানীয় সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত শ্রীপুর থানায় অভিযোগ করলে সেখান থেকেও মানসিক ভারসাম্যহীন আখ্যা দিয়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয় পুলিশ।

 

অগত্যা কোথাও মেয়ের ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিচার না পেয়ে গত ২৯ এপ্রিল বুকের ধন শিশু আয়েশাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বাবা-মেয়ে। ঘটনটি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রকৃত ঘটনাটি কেন এবং কি কারণে ঘটেছে, যা খতিয়ে দেখতে পুলিশ প্রশাসনও নড়ে চড়ে বসেছে। শেষ পর্যন্ত অপরাধিদের বিরুদ্ধে কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া নেয়া হবে, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা চাই, এ ধরনের কর্তব্যে অবহেলার দায় কোন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর বর্তালে তার বিরুদ্ধে যেন উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।


 তা না হলে এ দায় পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, যা কারো কাছেই কাম্য নয়। আগেই বলেছি উপযুক্ত বিচারের অভাব এবং মাদকের আগ্রাসনে সমাজের অবক্ষয় চিত্র যেভাবে দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। অতিসম্প্রতি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু নাঈম আশরাফ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে জন্ম দিনের পার্টিতে বনানীর রেইনট্রি নামে বিলাসবহুল হোটেলে আমন্ত্রন দিয়ে এনে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয় ধর্ষণের চিত্র ভিডিও করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়। পরে ভুক্তভোগী ছাত্রী দু’জন বনানী থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। যথারীতি থানা মামলাটি গ্রহণ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আপন জুয়েলার্সের বাসায় তল্লাশি করে। ইতিমধ্যেই দু’জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

 

এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে বিচার কার্য্য সম্পন্ন করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেন এ ধরনের অপকর্ম আর ভবিষ্যতে না ঘটে, তানা হলে ধর্ষণের মাত্রা কমার বদলে বাড়তেই থাকবে। শুধু ধর্ষণই নয়, অতি সম্প্রতি নারায়নগঞ্জের আড়াই হাজার উপজেলার হাজিরটেক গ্রামে ধর্ষিত হন ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা। এ ধরনের ঘটনা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তবে, মাদকাসক্তদের দ্বারা এমন কোন হীনকাজ নেই, যা ঘটানো সম্ভব। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকেও সাবধানে পা ফেলতে হবে। তা না হলে অনাকাংঙ্খিত ঘটনা ঘটতেই পারে।


প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ইয়াবা খ্যাত মাদক আটকের ঘটনা ঘটেই চলছে। মাদকের মধ্যে ইয়াবার আগ্রাসনই এখন অনেক বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ হতে দেদার ইয়াবা পাঁচার হয়ে দেশে ঢুকছে। যা দেশের নিভৃত পল্লী পর্যন্ত দিনে দিনে বিস্তৃত হচ্ছে। মাদকের এই আগ্রাসনকে ঠেকানো সম্ভব না হলে দেশের যুব সম্প্রদায়কে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত। সম্ভাবনাময় সকল শিশুর মেধার বিকাশ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে না উঠলে জাতি একদিন মেধাশূন্য হয়ে পড়বে।

অথচ মেধাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর বিকাশ না হলে সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণ করা কশ্মিনকালেও সম্ভব হবে না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থা বা বিএমবিএস এর মিডিয়া অবাধ অ্যান্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা ফাতেমা ইয়াসমিন দিনে দিনে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার যে চিত্র তুলে ধরেন, সত্যিই তা গভীর উদ্বেগের। তিনি বলেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৭ নারী ও শিশু। হত্যাকান্ডের শিকার হয় ১০০ শিশু। তাদের মধ্যে ১০ জনকে হত্যা করে বাবা-মা। বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয় ৮১ শিশু। আর ধর্ষিত হয় ৫৮ জন নারী।


 গণধর্ষণের শিকার হয় ২৪ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৪ জন নারীকে। পারিবারিক কলহে আপনজনদের হাতে খুন হন ২৪ নারী। যৌতুকের বলি হন ২৬ জন। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন ১৫ জন। এছাড়া আত্মহত্যা করেন ১০৮ জন নারী। (সূত্র: দৈনিক আমাদের সময় ৯/৫/১৭ ইং)। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালের তুলনায় চলতি বছরে নারী শিশু নির্যাতন, অপহরন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা অনেক বেড়েছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে খোদ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা শারমীন রেনু গত ১৪ মার্চ রাজধানীর ব্রাক সেন্টারে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, আগের চেয়ে নারী নির্যাতনের ধরন যেমন পাল্টেছে, তেমনি সংখ্যাও বেড়েছে।


 সামাজিক এ সমস্যা সমাধানে নারী-পুরুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে, তা না হলে এ সমস্যা রোধ করা কঠিন হবে। এ প্রসঙ্গে উইমেন সার্পোট অ্যান্ড ইনভেষ্টিগেশন ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের প্রধান ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, এখনও আমাদের সমাজে প্রতিদিন নারীরা নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। আর আইনের ফাঁক ফোঁকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে অপরাধিরা। আমরাও মনে করি, শুধু আইন দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের আইন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তানা হলে সোমাইয়াদের মতো নিষ্পাপ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড়ই কঠিন হবে।  
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

ক্রেডিট কার্ডের উচ্চ সুদহার ঋণগ্রহীতাদের নাভিশ্বাস

মুহাম্মদ মাছুদুর রহমান: ব্যাংক ও    আর্থিক  প্রতি-ষ্ঠানের কাজই হলো আমানত-কারীদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা। মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে তা মূলত ঋণদান।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঋণ প্রদান করে থাকে। যেমন- কৃষির উন্নয়নে কৃষকদের কৃষি ঋণ, ব্যবসা পরিচালনার জন্য ক্যাশ ক্রেডিট (সিসি) ঋণ, কুটির শিল্প ঋণ, বৃহৎ শিল্প ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঋণ, বাড়ী করার জন্য ঋণ, ভোক্তা ঋণ, চাকুরীজীবীদের বেতনের বিপরীতে ঋণ, প্রভৃতি ঋণ, বলাবাহুল্য, ব্যবসার এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করেনা।

গ্রাহক যে ঋণই ভোগ করুক সাধারণত প্রয়োজন না হলে কোন গ্রাহকই পারত পক্ষে ঋণমুখী হন না। বর্তমানে আধুনিক জীবন ধারণের জন্য তথ্য প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকিং সেবায় এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়, মানুষ এখন নগদ  টাকায় কেনা কাটার পরিবর্তে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। বিশ্বব্যাপী ব্যক্তি পর্যায়ে কেনাকাটা ও নগদ অর্থের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে তুমূল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণ সুবিধা তথা ক্রেডিট কার্ড।


অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও চাহিদা বাড়ছে ক্রেডিট কার্ড সেবাটির। বর্তমানে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় ক্রেডিট কার্ডের সুদহার সর্বোচ্চ ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ১৪ শতাংশ। সাম্প্রতিককালে একটি জাতীয় দৈনিক এ উদ্বেগজনক খবরটি ছাপিয়েছে। ব্যাংকগুলো ব্যক্তি পর্যায়ে বেতনের বিপরীতে যে ঋণ দিচ্ছে সে ঋণের সুদহার বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ থেকে সর্বনিম্ন এক অংকের ঘরে উঠানামা করছে।

ক্রেডিট কার্ডের এ ঋণ জামানতবিহীন বলে এ ঋণের সুদহার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান। ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষি ঋণ জামানতবিহীন যার সুদহার ১০ শতাংশ। ব্যাংকগুলো বেতনের বিপরীতে যে ঋণ প্রদান করে তাও জামানতবিহীন যদিও বলা হয় চাকুরিই এ ঋণের গ্যারান্টি বা জামানত। আমাদের জানামতে জামানত বলতে বুঝায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি।


 চাকুরি কি এ ধরনের জামানতের মধ্যে পড়ে না যে ব্যাংক শুধুমাত্র চাকুরীকে গ্যারান্টি রেখে বেতনের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঋণ দিতে পারছে। আবার একই ব্যাংক একই বক্তিকে একই জামানত ক্রেডিট কার্ড ঋণ সুবিধা দিচ্ছে কিন্তু তার সুদ হার গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিষয়টি গভীরভাবে ভাববার বিষয়। এ নিবন্ধের লেখক একটি প্রথম সারির বেসরকারী ব্যাংক থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের (পারসোনাল লোন) ঋণ নেন বেতনের বিপরীতে যার সুদ হার ১৩ শতাংশ।

 

একই ব্যাংকের একই জামানতের ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ৩০ শতাংশ। অনেক ক্রেডিট কার্ড গ্রহীতার সাথে কথা বলে নিবন্ধকারের মতই মতামতই পাওয়া গেছে। শুধু যে ব্যাংকগুলো ৩০% হারে সুদই নিচ্ছে তা কিন্তু নয়। একটি ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক বাৎসরিক ৮০০ থেকে ১৩০০ টাকা ফি দিতে হয়। এছাড়া বিলম্ব ফি, চেক বই ফি,চেক প্রসেসিং ফি, চেক ডিজ অনার ফি, ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম, এস.এম.এস প্রদান ফি ছাড়াও গ্রাহকের অজান্তে নানা মাশুল ধার্য্য করে গ্রাহকদের সর্বস্বান্ত করছে। উল্লেখিত ফি সংযুক্ত করলে একটি ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদহার হয় ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ যা খুবই হতাশাজনক।


পরিসংখ্যান মতে ক্রেডিট কার্ডের আমেরিকার সুদহার ১৪ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ১২ শতাংশ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ১৫ শতাংশ। যার কোনটিই বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ডের সুদহারের নিচে নয়। ক্রেডিট কার্ড এখন আর কোন বিলাসবহুল পণ্য নহে। এটা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নাগরিক জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বর্তমানে দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়েছে এবং যুগের চাহিদা অনুযায়ী তা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে।

উল্লেখ্য যে, ব্যাংকাররা অনেক যাচাই-বাছাই করে ক্রেডিট কার্ড ঋণ প্রদান করে। সিংহভাগ ক্রেডিট কার্ডের ভোক্তা হলো সরকারী-বেসরকারী চাকুরীজীবী শ্রেণি। যারা সমাজে সম্মানিত বলে পরিচিত। ফলে ক্রেডিট কার্ডের ঋণ খেলাফীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম। আমরা মনে করি দেশে ক্রেডিট কার্ডের সুদহার মাত্রাতিরিক্ত। যদিও ক্রেডিট কার্ডের কিছু সুবিধা ঋণগ্রহীতা ভোগ করে। তা হলো নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের সুদ দিতে হয়না।

 

এ সুবিধার জন্য ঋণের সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত হওয়া কোনভাবেই কাম্য নহে। তাদের এ সুবিধার বিনিময়ে হয়ত কিছুটা সুদহার বৃদ্ধি যুক্তিযুক্ত হতে পারে। কিন্তু কোন ভাবেই লাগামহীন সুদহার হওয়া উচিৎ নয়। যেখানে বর্তমানে পারসোনাল ঋণের সুদহার ৯-১৩% যেখানে ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ৩০-৩৪% হওয়া কি যৌক্তিক? রাষ্ট্রীয়ত্ত্ব দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক লি ঃ ১৪% সুদহারে ক্রেডিট কার্ড দিতে পারে তাহলে অন্যান্য ব্যাংক কেন ১৪% বা তারা কাছাকাছি সুদহারে ঋণ দিতে পারবে না ? সাধারণ জনগণের আমানতের টাকায় পরিচালিত ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ডের অযৌক্তিক ও মাত্রাতিরিক্ত সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নেমে আনার জন্য। এ বিষয়ে আমানতকারীদের স্বার্থ দেখার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জোরালো ভূমিকা পালন করা উচিত।
লেখক ঃ এম ফিল গবেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
০১৭১৬-৩২৭৭৫৫

বিশ্বের যে ১১ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে ভালো

রহমান আসিফ:বিশ্ব অর্থনীতির ওপর গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরাম। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশকে নিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ১২টি বিষয়কে স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয় যার মধ্যে রয়েছে- বৃহৎ অর্থনীতির পরিবেশ, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং দক্ষ শ্রমিকের প্রাচুর্যতা। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ওয়ার্ল্ড কম্পিটিটিভনেস রিপোর্টে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘বিজনেস ইনসাইডার’। বিশ্বের সবচেয়ে ভালো শিক্ষাব্যবস্থার ১১ দেশকে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ঠাঁই হয়নি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যের।


 ওয়ার্ল্ড কম্পিটিটিভনেস রিপোর্টে ভালো শিক্ষাব্যবস্থার র‌্যাংকিংয়ে উল্লেখিত সেরা দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো প্রতিবেদনে। ফিনল্যান্ড : ৬ দশমিক ৭ বরাবরই ভালো শিক্ষাব্যবস্থার তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে আসছে ফিনল্যান্ড। দেশটিতে সকল শিক্ষার্থীদের একই ক্লাসে একই ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়। এর ফলে ভালো এবং মন্দ বলে কোনো পার্থক্য শিক্ষার্থীদের মাঝে থাকে না।

 

দেশটির শিক্ষার্থীদের খুব কম বাড়ির কাজ দেওয়া হয় এবং ১৬ বছর বয়সে তাদের শুধুমাত্র একটি বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সুইজারল্যান্ড: ৬ দশমিক ২ সুইজারল্যান্ডের মাত্র পাঁচ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সুইজারল্যান্ডে অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হয়। এরমধ্যে রয়েছে জার্মানীয় ভাষা, ফ্রেঞ্চ ভাষা এবং ইতালিয়ান ভাষা। মাধ্যমিক থেকে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে আলাদা করা হয়।


 বেলজিয়াম: ৬ দশমিক ২ বেলজিয়ামে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার রয়েছে চারটি পদ্ধতি। এগুলো হচ্ছে জেনারেল সেকেন্ডারি স্কুল, টেকনিক্যাল সেকেন্ডারি স্কুল, ভোকেশনাল সেকেন্ডারি এডুকেশন স্কুল এবং আর্ট সেকেন্ডারি এডুকেশন ইনস্টিটিউশন। বেলজিয়াম এবং লুক্সেমবার্গের সঙ্গে শিক্ষার্থী অদল-বদল করে যুক্তরাষ্ট্রের ফুলব্রাইট কমিশন। সংস্থাটির মতে, সর্বক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পায় শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সরকারের বাজেটের সবচেয়ে বড়ভাগ পায় শিক্ষা। খুব কম কিংবা বিনামূল্যে চার থেকে ১৮ বছর বয়সী সকল শিক্ষার্থীর জন্য সর্বোচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করার মতো ইনস্টিটিউশন রয়েছে।

 

সিঙ্গাপুর: ৬ দশমিক ১ প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিআইএসএ) বড় স্কোর পেয়েছে সিঙ্গাপুর। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের পারফরমেন্স পরিমাপ করা হয় এ ব্যবস্থায়। যদিও সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে এমন কথা প্রচলিত আছে যে, দেশটিতে শিক্ষার্থীদের প্রচুর চাপের মধ্যে রাখা হয় খুব অল্প বয়সেই। নেদারল্যান্ড: ৫ দশমিক ৯ ২০১৩ সালে ইউনিসেফের জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী শিশুদের তালিকায় প্রথম স্থান দখল করে নিয়েছে নেদারল্যান্ড। দেশটির শিক্ষার্থীদের খুব বেশি বাড়ির কাজ দেওয়া হয় না মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত এবং শিক্ষার্থীদের খুব কম চাপ দেওয়া হয়।


কাতার: ৫ দশমিক ৮ ২০১২ সালে বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তেল সমৃদ্ধ দেশ কাতার শিক্ষাব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করছে দেশটি। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফ্রি’তেই শিক্ষা দেওয়া হয় দেশটির নাগরিকদের। তবে বিদেশিদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হতে হয়। আয়ারল্যান্ড: ৫ দশমিক ৮ দেশটির বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি টাকায় বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়, তবে দেশটিতে সরকারি মাধ্যমিক ও ভোকেশনাল স্কুলও আছে। যদিও সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটি শিক্ষাখাতে ১৫ শতাংশ ব্যয় কমিয়েছে। বলা হচ্ছে সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে ভবিষ্যতে ভুগবে দেশটির শিক্ষাখাত।

 

এস্তোনিয়া: ৫ দশমিক ৭। ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এস্তোনিয়া তার শিক্ষাখাতে জিডিপির চার শতাংশ ব্যয় করে। ১৯৯২ সালে প্রণীত শিক্ষানীতি অনুযায়ী, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যক্তিত্ব, পরিবার এবং জাতীয় উন্নতির প্রকৃত পথ সৃষ্টি করা। নিউজিল্যান্ড: ৫ দশমিক ৬ নিউজিল্যান্ডে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের বয়স হচ্ছে পাঁচ থেকে ১৯ বছর এবং ছয় থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক। নিউজিল্যান্ডে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা পদ্ধতি তিন ধরনের। দেশটির সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাগ্রহণ করে শতকরা ৮৫ জন শিক্ষার্থী, স্বায়ত্বশাসিত বিদ্যালয়গুলোতে ১২ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিন শতাংশ শিক্ষার্থী।

বারবাডোজ: ৫ দশমিক ৯ বারবাডোজ সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করে আসছে যার ফলশ্রুতিতে দেশটিতে শিক্ষার হার দাঁড়িয়েছে ৯৮ শতাংশে। দেশটির প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের বয়স চার থেকে ১১ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ১১ থেকে ১৮ বছর। দেশটির বেশিরভাগ স্কুলই সরকারের মালিকানাধীন। জাপান: ৫ দশমিক ৬ অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভলপমেন্ট (ওইসিডি) ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত শিক্ষাক্ষেত্রে উপরের দিকের স্থান জাপানের দখলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বে শিক্ষার্থীদের ছয় বছর প্রাথমিক শিক্ষা, তিন বছর জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং তিন বছর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। দেশটিতে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়া বাধ্যতামূলক না হলেও শতকরা ৯৮ শতাংশই শিক্ষা গ্রহণ করে।

একটি বাসা, এতটুকু আশা!

আতাউর রহমান মিটন : নিয়মিত পত্রিকা পড়তে আমার ভয় লাগে। কারণ ইতিবাচক সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক জ্ঞান-গর্ভ আলোচনা থাকলেও খারাপ সংবাদগুলোই পত্রিকার পাতায় অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। দুঃসংবাদগুলো আমাদের জানতে হবে অবশ্যই, তবে তারও চেয়ে বেশি বোধহয় ভাল সংবাদগুলো জানা দরকার। দরকার জনগণের বিশ্লেষণী ক্ষমতা শাণিত করা, মানুষের বিবেক নাড়া দেয়ার মত করে বিষয়বস্তু উপস্থাপন।


ঢাকায় একটি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনাটি এখন সকলেই জানেন এবং এই ঘটনাকে উপজীব্য করে শোনা কথা ও নিজস্ব ধারণা মিলিয়ে নানা রম্য কাহিনী প্রতিদিন ছড়াচ্ছে। অনেকেই এখন ভাবতে শুরু করেছেন এই ঘটনার পেছনে আরও কোন বড় ঘটনা লুক্কায়িত আছে। সোনা চোরাচালান ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ বা হাত বদলের সাথে এই ঘটনার সম্পর্ক আছে কি না সেটাও এখন চায়ের টেবিলে আলোচিত বিষয়।


 কুমিল্লার তনু হত্যাকান্ড নিয়েও গণমাধ্যম সরব হয়েছিল। কিন্তু দেশে সংঘটিত নারী নির্যাতন বা অন্যান্য অমানবিক ঘটনাগুলোর কতটুকুই বা গণমাধ্যমে আসে? বনানীর ঘটনার আগেই গাজীপুরে নিজের শিশু কন্যার উপর সংঘটিত যৌন নির্যাতনের বিচার না পেয়ে এক হতাশাগ্রস্ত বাবা ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। বনানীর ঘটনায় গাজীপুরের সেই কাহিনী এখন চাপা পড়েছে। গরীব মানুষ বলে কি গাজীপুরের ঘটনা কম গুরুত্বপূর্ণ!


‘আমাদের আমবাগানে আজকাল ভাল আম হয় না কিন্তু বিলেতের আপেল বাগানে প্রচুর আপেল হচ্ছে। তাই বলে কি আমরা বলব যে আম গাছ কেটে আপেল লাগালেই আমরা সমৃদ্ধি অর্জন করব? অথবা ‘ঘানিতে সরিষা চেপে আমরা তেল পাই। কিন্তু তাই বলে সেখানে ফুল ফেলে দিয়ে চাপলে কি আমরা মধু পাব?’ প্রশ্ন দুটো আমার নয়, রবীন্দ্রনাথের। তিনি আমাদের আকাঙ্খা ও পদক্ষেপ এর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা ফুটিয়ে তোলার জন্য এই প্রশ্নটি করেছেন।


 আমাদের বর্তমান সমাজের মধ্যেও কি আমরা এমন অসামঞ্জস্যতা দেখছি না? আমরা যা চাই আর আমরা প্রতিদিন যার পেছনে ছুটে বেড়াই তার মধ্যে মিল কোথায়? ফুল চেপে যদি মধু না পাওয়া যায় তাহলে সমাজকে ভেতর থেকে জাগিয়ে না তুলে সমাজ পরিবর্তন কিভাবে করা সম্ভব? চারিদিকে যা ঘটছে তা আসলে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। অপশক্তিরা নিজেদের ‘ধরাছোঁয়ার উর্দ্ধে’ ভাবতে পারছে বলেই তারা আজ বেপরোয়া।


 সমাজের বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার করা ছাড়া এই অব্যবস্থা রোধ করা সম্ভব হবে না। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে, বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য মতে বাংলাদেশ থেকে ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ২০১৪ সালে ৯১১ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকেও বিদেশে অর্থপাচারের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।


 এমতাবস্থায়, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দাবি জানিয়ে বলেছেন, “এই অর্থপাচার রোধে কোনো শর্ত ছাড়া আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ১৯বি-এর যুগোপযোগী সংশোধন করা জরুরি।”


পাঠক, ‘অপ্রদর্শিত আয় বা অর্থ’ কথাটার মানে কি? আমি যতটুকু জানি সরকার ঘোষিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে প্রতিবছর জমা দেয়া আয়কর হিসাব বিবরণী (ট্যাক্স রিটার্ণ) তে অনুল্লিখিত অর্থকে ‘অপ্রদর্শিত আয়’ বলা হয়। ‘ঘুষ খাওয়া’ বা ‘কালোবাজারী করা’ বা কারও কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করা অপ্রদর্শিত আয়ের অন্যতম উৎস। তবে এর বাইরেও অনেকের কাছে টাকা থাকতে পারে যা সাধারণভাবে ‘অপ্রদর্শিত আয়’ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।


আমাদের অনেক সম্মানিত পেশাজীবী আছেন যাঁরা মেধা খাটিয়ে বা কঠোর পরিশ্রম করে আয় করেন কিন্তু নিজেদের আয় গোপন রেখে কর ফাঁকি দেন। এমন আয় ‘অপ্রদর্শিত আয়’ হলেও এটাকে আমাদের সমাজ অনৈতিক হিসেবে গণ্য করে না। কিন্তু ‘ঘুষ’ বা অন্য কোন অনৈতিক পন্থায় অর্জিত আয়  নিঃসন্দেহে ঘৃণিত এবং এই অর্থ জায়েজ করার জন্য সরকার কোন উদারতা দেখাতে পারেন না।


প্রতিবছর বাজেট এলেই ‘কালো টাকা’ সাদা করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। টাকার রং তো একই তাহলে এখানে কালো বা সাদা কথাটার অর্থ কি? আসলে এক্ষেত্রেও ঐ অপ্রদর্শিত আয় এর কথাটাই চলে আসে। অর্থাৎ ‘অপ্রদর্শিত আয়’ আর ‘কালো টাকা’ প্রায় সমার্থক।  কালো টাকা কাদের কাছে থাকে? এই টাকা আসে কোথা থেকে? ভারতে সম্প্রতি মোদী সরকার যখন ৫০০ ও ১০০০ রুপি নোট বাতিল করে, তখন সেখানে বিরাট হৈ চৈ সৃষ্টি হয়। এমন কি বিভিন্ন স্থানে এসব নোটের বস্তা পড়ে থাকতে দেখা গেছে বলেও শোনা যায়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুর্নীতি কমানোর অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপটি নিয়েছিলেন। এটা তার জন্য এক দুঃসাহসিক ঘোষণা ছিল। এমনকি এর ফলে তিনি ‘হত্যাকান্ডের শিকার’ হওয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। যদিও বাস্তবে এই ব্যবস্থায় ভারতে ‘দুর্নীতি’ কতখানি কমেছে তা নিয়ে বিস্তর সংশয় আছে। কারণ দুর্নীতিবাজরা সবসময় কৌশল খোঁজে এবং তারা ঠিকই একটা পথ বের করে নেয়। বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে।


বাংলাদেশের সরকার অতীতে ‘কালো টাকা’র প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। ফলে দুর্নীতি এখানে প্রশ্রয় পেয়েছে বলে আমি মনে করি। রিহ্যাব চেয়ারম্যান এবার ‘কালো টাকা’ না বলে ‘অপ্রদর্শিত আয়’ হিসেবে ঐ একই ধরনের অর্থকেই বৈধতা দানের প্রস্তাব করেছেন।

ধরা যাক, সরকার রিহ্যাব প্রধানের দাবি মেনে নিলেন অর্থাৎ ফ্ল্যাট বা জমি কেনায় ব্যবহৃত অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলেন না। তাহলে পরিণতি কি দাঁড়াবে? সব ঘুষঘোর, দুর্নীতিবাজেরা আরও বেপরোয়া হয়ে অবৈধ পথে আয় করতে চেষ্টা করতে থাকবেন আর সেই আয় দিয়ে বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ইত্যাদি কিনবেন।

 এতে করে রিহ্যাব ব্যবসায়ীদের ব্যবসার অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে দেখেছেন? মানুষ এখনই মরিয়া ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট বা প্লট কেনার জন্য, এই অনুরোধ রক্ষা করা হলে তখন তাঁরা আরও বেপরোয়া হয়ে যাবে। সমাজকে এগিয়ে নিতে চাইলে এটা কোনভাবেই করা যাবে না। এটা করা উচিত নয়। বরং রিহ্যাব প্রস্তাবিত গৃহঋণের সুদের হার কমানো, স্বল্পবিত্তদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ-এ ছোট ছোট ফ্ল্যাট কেনার বন্দোবস্ত দেয়ার দাবিগুলো বিবেচনা করা উচিত।


আমার মনে হয়, আবাসন শিল্পের উন্নয়ন এবং সকলের জন্য মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করার জন্য এবং সর্বোপরি শহরের উপর বর্দ্ধিত মানুষের চাপ কমানোর জন্য সরকারের উচিত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গৃহঋণ সুবিধা সম্প্রসারিত ও সহজলভ্য করা।

শহরের কর্মস্থলের সাথে আরামদায়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে এবং সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে গ্রামেই বা উপজেলা শহরে নিজের বাড়িটাকে সুন্দর করে তৈরী করতে পারলে কেন মানুষ শহরের কংক্রিটের বস্তিতে গিয়ে বাস করবে? গৃহঋণ এর উপর সুদের হার কমানো একটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই হার কোন অবস্থাতেই ৬% এর বেশি হওয়া উচিত নয়। অথবা এই ঋণ পরিশোধ এর মেয়াদ ২৫-৩০ বছর হওয়া উচিত। নগরায়ন একটি অনিবার্য বাস্তবতা।

 আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত অথচ প্রাকৃতিক ছন্দময়তা ও মায়ায় ঘেরা একটি ছোট্ট বাড়ি কার না পছন্দ বলুন! যদি ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষদের সন্তুষ্টি নিয়ে জরীপ করা হয় তাহলে দেখা যাবে খুব কম মানুষই এই শহরে বাস করতে পেরে সন্তুষ্ট।

কিন্তু তবু তারা এই শহর ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবতে পারেন না। কেন পারেন না? সরকারকে সেই কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে ‘সমন্বিত নগরায়ন’ পরিকল্পনা করতে হবে। সারাদেশের মানুষকে বঞ্চিত করে ঢাকাকে তিলোত্তমা বানানোর কোন প্রস্তাবই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান এবং সরকারকে সকলের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে।


আসন্ন বাজেটে সরকারকে গৃহঋণ সহজলভ্য করার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করছি। যাতে করে অধিক মানুষ এই ঋণ গ্রহণের সুযোগ পায় এর ফলে আবাসন শিল্প চাঙ্গা হয়। সন্দেহ নেই যে, নানা কারণে বাংলাদেশের আবাসন শিল্প প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শেয়ারবাজারের ধ্বস, বিদেশে অর্থ পাচার ইত্যাদি নানাবিধ কারণে একটা স্থবির অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে।

 তবে কিছু কিছু উদ্যোক্তার সীমাহীন লোভ বা অতি মুনাফা করার প্রবণতা এ ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা। মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে কিস্তি দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে অবশ্যই আরও অনেকেই ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে উৎসাহী হবে। প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স এর উপর বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হলে এই খাত আরও অগ্রসর হতে পারে।


 বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ভাল হচ্ছে। সরকার দাবি করছে এবার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭.২৪ শতাংশ। যদিও বিশ্বব্যাংক বলছে এই হার হবে ৬.৮ শতাংশ। হার যাই হোক না কেন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক এটা সত্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

এক. রপ্তানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংক এর মতে, এই তিনটি খাতেই আমাদের অগ্রগতি খুব বেশি নয়। বরং রেমিট্যান্স কমেছে, আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না, এমতাবন্থায়, আমাদের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চাইলে বা বৃদ্ধি করতে হলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।


আগামী  জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৯ সালের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হবে। অনেকে মনে করেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সরকার নির্বাচনের সময় কিছুটা এগিয়ে এনে আগামী বছরের শেষদিকে বা অক্টোবর-নভেম্বরেও নির্বাচন সম্পন্ন করে ফেলতে পারে। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল অতীতের মত সহজ বিজয় পাবে না। বিএনপি এবার নির্বাচন করবে এটা নিশ্চিত। সাধারণতঃ ক্ষমতাসীন দলের প্রতি মানুষের আস্থা হ্রাস পায়।


 সেটা আওয়ামী লীগ এর ক্ষেত্রেও আছে। এমতাবস্থায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় বাজেটকে মানুষকে আস্থায় নেয়ার বাজেট হিসেবে উত্থাপন করতে চাচ্ছে। দলটির এই রাজনৈতিক কৌশল নেয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাদেরকে ঠিক করতে হবে, তারা কি ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কাজ করবেন নাকি ভোক্তা বা সাধারণ জনগণের পক্ষে থাকবেন?


বিএনপি অনেক দেরিতে হলেও একটি সুনির্দিষ্ট ‘ভিশন ২০৩০’ জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই প্রবণতাটা খুবই ইতিবাচক। জনগণ এই ঘোষিত ভিশন কিভাবে নেবে সেটা জনগণের বিষয় কিন্তু রাজনীতির এই গুণগত পরিবর্তনের ধারাকে সকলেই স্বাগত জানিয়েছে। পেশী শক্তি দেখিয়ে বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভোটে জেতা সম্ভব নয়।

 মনে রাখতে হবে, ভোটারও এখন পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে সচেতন। এই ভোটারের মন জয় করতে হলে কর্মিদের কথা-বার্তা ও কার্যক্রমে সৃজনশীলতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোটে জেতার পুরোনো বাসনা থেকে দূরে থাকাই ভাল। জনতার জয় হোক।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯
 

আধুনিক দেশ গড়তে প্রয়োজন শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব

মাশরাফী হিরো : বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। হাজারো বেদনার্ত মানুষের সাথে কেঁদেছিল বাংলার আকাশ। শেখ হাসিনার অশ্রু সম্ভবত সহ্য করতে পারে নি প্রকৃতি। তাইতো গলাগলি করে কেঁদেছিল বাংলাদেশের হাজারো মানুষ, বঙ্গবন্ধু কন্যা ও বাংলার আকাশ। পিতা-মাতা স্বজন হারানোর বেদনা তাকে যেমন উদ্বেলিত করেছিল তেমনি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ধৈর্য ধরতে বাধ্য করেছিল। যে দেশে তিনি সেদিন পা রেখেছিলেন তা ছিল তাঁর জন্য অগ্নিকূপ। যেখানে নির্ঘাত পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন শেখ হাসিনা।


 পিতা বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এবং গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। দায়বদ্ধতা তৈরি করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সম্মেলনে তার অনুপস্থিতিতে সভাপতি করে। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি যখন নিরাপত্তা বন্দী তখন তাকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক করা হয়েছিল। এই দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অনেকেই ছিলেন।


 মাওলানা ভাষানী, শামসুল হক, আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, তাজউদ্দীন আহম্মেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর, আব্দুল মালেক উকিল, জোহরা তাজউদ্দীন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। অধিকাংশই এখন প্রয়াত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সময়ই আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দলীয় সংহতি ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁরা। নেতৃত্বের দৃঢ়তা তাদেরকে বারবার নেতৃত্বে নিয়ে এসেছে। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে নেতৃত্ব দেওয়া যে কত কঠিন তা সবারই জানা।


 মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ চেয়ে থাকে উন্নত বিশ্বের দিকে। ব্যবসা যেদিকে নেতৃত্ব সেদিকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ব্যবসার নামে ভারতবর্ষ দখল করেছিল। তাদের পতন হলেও ব্যবসার পতন হয়নি। বরঞ্চ তা বহুগুণে ফিরে এসেছে এই বাংলাদেশে। ইউনিকল সহ বহু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তাঁবু গেঁড়েছে বাংলাদেশে। যার কারণে বাংলাদেশের ক্ষমতায় ওঠানামা। যার কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড।


 জাতিসংঘ সবার প্রতিনিধি হলেও তাদের চোখ এড়িয়ে যায় এসব থেকে। ন্যাটোর হামলা তাদের চোখে পড়ে না। ইরাক হামলায় তারা দোষ খুঁজে পায় না। ফিলিস্তিনি নির্যাতনে তারা ব্যাথিত হয় না। এসব সংস্থাকে তোয়াক্কা করে না আগ্রাসী কিছু রাষ্ট্র। যারা গণতন্ত্রের কথা বলে অন্য দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে স্বাধীনতা হরণ করে।


 অন্যের সম্পদ করায়ত্ত করাই এদের কাজ। আর এসব ক্ষেত্রে বেছে নেয় কিছু লোভী মানুষকে। যারা ক্ষমতায় থাকতে ভালবাসে তা যেভাবেই হোক না কেন। তেমনি কিছু ঘটেছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও আইয়ুব, ইয়াহিয়াদের সহোদররা বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করেছিল দীর্ঘকাল। আর তাদের প্রধান অনুসঙ্গ ছিল স্বাধীনতা বিরোধীরা। মুক্তিযোদ্ধারা ছিলো নির্বাসিত। নামেই বাংলাদেশ আসলে পাকিস্তান। এমনি অবস্থা থেকে দেশকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন শেখ হাসিনা। আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে কেউ নিস্তার পাচ্ছে না।


 দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন চালনায় শেখ হাসিনা অতীতের যে কোন রাষ্ট্র প্রধানের চেয়ে এগিয়ে। যা তার শত্রুরাও স্বীকার করে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার অবস্থান জিরো টলারেন্স। যা লৌহ মানবের ভূমিকা বলে অনেকে মনে করেন। বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ সারা বিশ্বের ক্ষুদ্র দেশগুলিকে ধ্বংস করেছে। ধ্বংস করেছে তাদের অর্থনীতি। যার বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের কোন নেতা মুখ খুলতে সাহস পান নি।


 কিন্তু, প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে সংসদে বক্তৃতা করেছেন তিনি। কথা বলেছেন ড. ইউনুসের ব্যাপারে। যিনি হতে চেয়ে ছিলেন বাংলার হামিদ কারজাই। ওয়ান ইলেভেন সমস্ত নেতা-নেত্রীদের গ্রেফতার করলেও যুদ্ধাপরাধীদের ছোঁয়ার সাহসও পায়নি। যা করে দেখিয়েছেন শেখ হাসিনা। অপরাধীর কোন ছাড় নেই, তারা যত শক্তিশালীই হোক, শেখ হাসিনা তা প্রমাণ করেছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এবং পরে অনেকে মনে করেছিল শেখ হাসিনার সরকার স্থায়ীত্ব পাবে না। কিন্তু তা আর হয় নি। বিএনপি নেতা-নেত্রীরা এটাকে নির্বাচন বলেন।


 আমি মনে করি এটি একটি প্রকাশ্য যুদ্ধ, যাতে জামায়াত-বিএনপি হেরেছে। আওয়ামী লীগ জিতেছে। অনেকে বলেন ভোটার উপস্থিতি কম। যেভাবে বাংলাদেশকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাতে যে মানুষ ঘর থেকে বের হয়েছে এটাইতো বড় কথা। অগ্নিযুদ্ধে ভোটার পাবেন কোথায়? এই বুঝি আবার ওয়ান ইলেভেনের মত কিছু একটা এলো। তা আর হয়নি। সমস্ত প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে। এখন শেখ হাসিনা কিছুটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপ্রতিরোধ্য। বিএনপি চেয়ে আছে শেখ হাসিনার দিকে।


এমন অবস্থা আগে ছিল না। আওয়ামী লীগ চেয়ে থাকতো অন্যান্য সরকারগুলির দিকে। কারণ তারা সমর্থন পেত ঐসব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের। এই প্রথম তার ব্যত্যয় ঘটেছে। ১৯৭১ আর ২০১৪ একে অপরের পরিপুরক। একটির নেতা পিতা বঙ্গবন্ধু আরেকটির নেতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে বহু বছর। ৭৫, ৭৮, ৮১, ৮২, ৮৬, ৮৮, ৯০, ৯১, ৯৬, ২০০১ ও ২০০৭ সাল। ৯৬ সাল ব্যাতিত সবগুলিই ছিল আওয়ামী লীগের জন্য দুর্ভোগের। আজ সে দুর্ভোগ শেষ হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আজ আওয়ামী লীগ, নৌকার জয়গান আজ সর্বত্র।


 প্রাচীন এই দলটিকে সেকেলে বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হতো। কোট-টাই পরা নেতারা পাঞ্জাবী-পায়জামা ও মুজিব কোটের সমালোচনা করতেন। আর এখন মুজিব কোটের আদলে কোট পরা ফ্যাশন। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আজ ঘরে ঘরে। প্রাচীন হলেও আধুনিক হয়ে ওঠায় প্রাণবন্ত আওয়ামী লীগ। আগে জন্ম হলেই সেকেলে হয় না। তার প্রমাণ আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে তৃতীয় বিশ্বের নেতায় পরিণত হয়েছেন পিতা বঙ্গবন্ধুর মত।

 

বৈশ্বিক উষ্ণতা, যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান, জঙ্গিবাদের জিরো টলারেন্স আজ সমস্ত বিশ্বের জন্য উদাহরণ। আমরা এখন ভঙ্গুর দেশ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে। শেখ হাসিনার অর্থনীতি আজ যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার বিষয়। আফ্রিকা মহাদেশের ক্ষুদ্র দেশগুলির জন্য অনুস্মরণীয়। তবে শেখ হাসিনার নীতি নৈতিকতা বাংলাদেশের জন্য শুভ হলেও তার জন্য ক্ষতিকর। কারণ উন্নত বিশ্ব চাইবে না তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এত শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকুক। যেমন চায়নি বঙ্গবন্ধুর সময়ে। কারণ নেতৃত্ব শক্তিশালী হলে ব্যবসার ক্ষতি। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছাড় দেওয়া।


যা তারা দীর্ঘসময় দিতে চাইবে না। তাই দরকার সুশিক্ষিত একটি জাতি। কর্মিবান্ধব ও সৎ নেতৃত্ব। প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা। বঙ্গবন্ধু হারিয়ে গেছেন তাতে তাঁর কোন ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশ ও বাঙালির। শেখ হাসিনা হারিয়ে গেলেও ক্ষতি তাঁর নয়, ক্ষতি বাংলাদেশের। আমাদের প্রয়োজনেই বাঁচতে হবে শেখ হাসিনাকে। সুখি-সমৃদ্ধশালী, আধুনিক বাংলাদেশে প্রয়োজন তাঁর মত দৃঢ় নেতৃত্ব। যা আজ পরীক্ষিত। বাঙালি-বাংলাদেশ হারাতে চায় না পথ। তাই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে সবার চাওয়া হোক তাঁর দীর্ঘায়ু।
লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

বাল্য বিবাহ রোধ করতেই হবে

হাদিউল হৃদয়:‘থাকলে শিশু বিদ্যালয়ে,/ হবেনা বাল্য বিয়ে;/ থাকলে শিশু লেখাপড়ায়,/ সফল হবে জীবন গড়ায়’Ñ এই স্লোগানে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা গভর্ন্যান্স প্রজেক্টের সহযোগিতায় বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানিকে লালকার্ড দেখিয়ে সচেতনতামূলক করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ইস্যুটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি উপজেলা।


এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাল্য বিবাহে শীর্ষ দেশ সমূহের একটি বাংলাদেশ। অবশ্য জেলার কোন কোন উপজেলা ইতোমধ্যে সরকারি তরফে বাল্য বিবাহ মুক্ত ঘোষণা করা হলেও মূলত: বাল্য বিবাহ থেমে নেই কোথাও। সরকারিভাবে বাল্য বিয়ের উপদ্রব হ্রাসের কিছু পদক্ষেপ থাকলেও বেসরকারিভাবে এটা বন্ধের প্রয়াস অল্পই। কারণ, এনজিওরা স্বেচ্ছাসেবায় যা করছে প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে তাও বেগবান হচ্ছে না।

 

সরকারি প্রচেষ্টার মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও লাল কার্ড ক্যাম্পেইন কেবল মাঝে মাঝে দৃশ্যমান। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে প্লান বাংলাদেশ এর সহায়তায় চ্যালেঞ্জ ফান্ড প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে বাল্য বিবাহ নিরোধে একটা ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়ার কথা সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে। সেটা কখন কীভাবে কতটুকু সফল হবে তা দেখার প্রতীক্ষায় থাকতে হবে।

 

তবে আমরা মনে করিÑ বাল্য বিবাহ নির্মূলে কতিপয় বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে তার ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে তৎপরবর্তী পুনশ্চ পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গৃহীত হতে পারে। এর মধ্যে প্রথমেই প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে নারী সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি সত্যকার রূপে সচল সক্রিয় ও তৎপড় করা। পাশাপাশি ইউপি ও ওয়ার্ড ভিত্তিক এবং সম্ভব হলে গ্রাম ভিত্তিক বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ কমিটিসহ উপজেলা প্রর্যায়ে সুশীল সমাজকে অন্তর্ভূক্ত করে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে ওয়াচ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। থাকতে পারে এগুলো পরিচালনার একটি গাইডলাইনও। এছাড়া স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রী সমন্বয়ে সচেতনামূলক সভার মাধ্যমে বাল্য বিবাহ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।


এ ব্যাপারে জেলা পরিষদ ও পৌরসভাও জোরালো ভূমিকা পালনে এগিয়ে এলে ভালো হবে। শুধু তাই নয়; রাস্তা-ঘাট আর দালান কোটা নির্মাণের পাশাপাশি এদিকটার জন্য কিছু সরকারি বিনিয়োগ করা জরুরি। অন্তত ইউনিয়ন পর্যায়ে কিছু সচেতনা বিল বোর্ড স্থাপন করা অত্যন্ত যৌক্তিক। এছাড়া মনে রাখতে হবে- ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণ ব্যতীত কোন সামাজিক আন্দোলন সফল হতে পারে না। এ জন্য সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ- অভিযান আবশ্যক।  বাল্য বিবাহ সংক্রান্ত আইনের প্রসঙ্গ এমনিতে  প্রায়শঃ বলা হয়; কিন্তু আইনটি সাধারণ মানুষের মাঝে পরিচিত বা অবহিত করার কোন দৃষ্টান্ত নেই যা দ্রুত দরকার। একই সাথে আইনের প্রয়োগেও  জিরো টলারেন্স থাকতে হবে।


এছাড়া আইইসি-বিসিসি উপকরণ বিতরণ করলে সমাজে এর প্রভাব পড়বে স্পষ্টই। এটা করতে জেলা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যকরি উদ্যোগ নিতে পারে। তাই বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ বিষয়টিকে একটা সামাজিক বিপ্লব ধরনের আন্দোলনে পরিণত করে তা বাস্তবায়িত করার সুদুরপ্রসারী দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও সেই মোতাবেক ধারাবাহিক অব্যাহত কার্যক্রম সরকারি-বেসরকারি যৌথ পার্টনারশীপে গ্রহণ করা জরুরি প্রয়োজন। যেহেতু এটা সমাজদেহে অভিশাপ বা ক্যান্সার ব্যাধির মত সংক্রমিত হচ্ছে – তাই এ সমস্যা থেকে অব্যাহতির খন্ডিত ও বিচ্ছিন্ন চিন্তা না করে স্থায়ী উপায় অনুসন্ধান করতে হবে।
লেখক ঃ কবি-সাংবাদিক
hadiulridoy@gmail.com

দেশের চিকিৎসা সেবায় ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে হবে

মো: মুরশীদ আলম: ভারতের স্বাস্থ্য আয়ের শীর্ষে বিদেশি উৎস বাংলাদেশ। বিদেশি রোগিদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে ভারত যা আয় করে বেশি ভাগই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগিদের কাছ থেকে পাওয়া। প্রতিবেশি দেশটি ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে বিদেশিদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে ৮৮ কোটি ৯৩ লাখ ডলার আয় করেছে। যার উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশি রোগি ব্যয় করেছেন বলে সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।


 ভারতের কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিবস বিভাগের মহাপরিচালকের বরাত দিয়ে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয় গত অর্থ বছরে দেশটি বাংলাদেশি রোগিদের কাছ থেকে ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করেছে। ওই সময়ে ভারতের হাসপাতালগুলোতে চার লাখ ৬০ হাজার বিদেশী রোগি চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশি। গত ২৮ এপ্রিল/১৭ তারিখের দৈনিক করতোয়ায় খবরের জানা গেছে।


এই সংবাদটি পাঠ করে বিস্মিত হতে হয় যে, বাংলাদেশের মত একটি দেশ থেকে ৩৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলার চলে গেছে বিদেশে। তা হলে কি আমাদের দেশের চিকিৎসক আর চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা নেই? নেই বিশ্বাস।


 তা হলে কি ধরে নিব দেশে অভিজ্ঞ আর মানসম্পন্ন চিকিৎসক নেই। নেই কি কোন সুবিধাসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা? চিকিৎসক যে নেই এমন কথা বলা যাবে না। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কিছু অনিয়ম, ত্রুটি আর নীতি বিবর্জিত কিছু কারণে তাঁরা কাজ করতে পারেন না।

 

তাঁদের অভিজ্ঞতা আর কর্মকুশলতাকে কাজে লাগাতে পারেন না। বা পারছেন না। এর কারণ রোগ নির্ণয়ের জন্য যেসব মেশিনপত্র দরকার তার ঘাটতি রয়েছে। আবার সেগুলো রয়েছে যেগুলো নিম্নমানের বা অচল হয়ে আছে বলে ভাল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। রয়েছে দক্ষ মেশিন চালকের বা টেকনিশিয়ানের অভাব। এক কথায় অভাব সুবিন্যস্ত সেবার।


এছাড়া আমাদের দেশের কিছু মানুষের বিদেশমুখী মনোভাব। সামান্য কিছু হলেই তারা ছুটে যায় বিদেশে। এর কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাটাকে অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও মান সম্মত করে তুলতে পারা যায়নি। অর্থাভাব ও কিছু দুর্নীতিপরায়ন ও স্বার্থলোভী কর্মকর্তাদের জন্যই তা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমরা চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেমন কোন ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পারিনি।

 

১৯৮৯ সাল। মালয়েশিয়ার অবস্থা মোটেই উন্নত না। সামাজিক; রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক চিকিৎসা কোন ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ বা উন্নত নয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। পেশায় চিকিৎসক মাহাথির বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। তাঁর স্ত্রীও একজন ডাক্তার।

]ধরা পড়ল মাহাথিরের হৃদযন্ত্রের সমস্যা ব্লক আছে। বাইপাস সার্জারি করতে হবে। সেই সময় মালয়েশিয়ার রাজনীতিবিদ, আমলা ব্যবসায়ীরা চিকিৎসার জন্য আমেরিকা বা লন্ডনে যেতেন। কেউ কেউ সিংগাপুরে যেতেন। মাহাথিরের চিকিৎসার উদ্যোগ চলতে থাকল। তাকে নিয়ে যাওয়া হবে লন্ডনে।


 বিষয়টি জানলেন মাহাথির। কেন লন্ডনে? কেন মালয়েশিয়ায় নয়। বলা হলো মালয়েশিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা যেহেতু অতটা উন্নত বা পরীক্ষিত নয়। সুতরাং এ ধরনের অপারেশনের জন্য ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থায় অপারেশন করতে হবে। তাতে ঝুঁকি কম থাকবে।

 

মাহাথির মুক্তি দিলেন আমার অপারেশন তো মালয়েশিয়ার ডাক্তারই সবচেয়ে গুরুত্ব এবং যতœ নিয়ে করবেন। তা ছাড়া আমাদের ঐতিহ্য সৃষ্টি করা দরকার। আমরা বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা করলে সাধারণ মালয়েশিয়ানরাতো বিদেশ যাবে, দেশে ভরসা করবে না।


সুতরাং আমার অপারেশন মালয়েশিয়াতেই হবে। ডা: মন্ত্রী রাজিনন। পুরো প্রশাসন রাজিনন। মহাথীর অনড়। অবশেষে রাজি হলেন। অপারেশন মালয়েশিয়াতেই হবে।এরপর সিংগাপুরের অভিজ্ঞ সার্জনের অধীনে অপারেশন করানোর প্রস্তাব দিলেন তাতেও মাহাথির রাজি হলেন না। মাহাথিরের অপারেশন মালয়েশিয়াতেই হলো। সফলভাবে হলো। মাহাথির নিজের আত্ম জৈবনিক বইয়ে বিষয়টি বিস্তারিত লিখেছেন।

 

মালয়েশিয়া এখন চিকিৎসা সেবায় পৃথিবীর তৃতীয়। সেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়া ও ইউরোপ এমনকী অস্ট্রেলিয়া থেকে চিকিৎসার জন্য আসে। মাহাথীর হার্টের রোগি হয়েও তিনি নিজ জীবনের কথা ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের কথা আর দেশের জনগণের কথা। আমাদের দেশে ও যে এমন ২/১ জন মানুষ নেই এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না।


 তবে তা সংখ্যায় খুব নগণ্য। বলছি ঐ সমস্ত মানুষের কথা যারা সামান্য কিছু সর্দিজ্বর হলেই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা অবহেলা আর অবজ্ঞা করে বিদেশ যান। তাঁরা হয়তো আমাদের দেশের চিকিৎসক আর চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা বা ভরসা করতে পারেন না। অবশ্য এ কথা সত্য যে, আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি দুর্নীতিবাজ চক্র কাজ করে। কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে। যার ফলে মানসম্পন্ন চিকিৎসা দেওয়ার ইচ্ছা আর মানসিকতা থাকলেও তাঁরা তা দিতে পারেন না। কেননা অভিজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেতো আর হবে না।

 

এর জন্য চাই প্রয়োজনিয় সংশ্লিষ্ট মেশিনপত্র। এসব মেশিনপত্র কেনার জন্য সরকার যে টাকা পয়সা বরাদ্দ করেনা তা কিন্তু বলা যাবে না। তা বলা হলে সরকারের উদ্যোগ আর প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করা হবে। কিন্তু ঐ যে বলেছিলাম একটি দুষ্টু চক্র ওই সবমেশিন পত্র বা যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে তারা নিম্ন মানের মেশিন পত্র কিনে। নিম্নমানের মেশিন পত্র কমদামে কিনে বেশি দাম দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত করে।


 আবার যে মেশিন আদৌ দরকার নেই এবং তা চালানোর কোন দক্ষ অপারেটর বা টেকনিশিয়ান এদেশে নেই সে সব মেশিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিনে ঐসব মেশিন চিকিৎসার কাজে লাগে না। ঐ চক্রের উদ্দেশ্য টাকা কামানো। রোগিদের রোগ চিকিৎসা তাদের লক্ষ্য নয়।

 

উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গত ২৭ এপ্রিল/১৭ তারিখের দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে যে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার তালিকায় আছে এমপি ওয়াই ইন্ট্রা অপারেটেড ইমেজিং সিস্টেম নামের ১৪টি সার্জিক্যাল মেশিন।

 

 এই মুহূর্তে এসব মেশিন ব্যবহারের কোন সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা নেই বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। কেননা এ মেশিন চালানোর ওপর কোন প্রশিক্ষণ কারো নেই। কতিপয় একশ্রেণীর মুনাফাখোরী ব্যবসায়ী এবং অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রতি বছর স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে এধরনের ক্রয় তালিকা পাঠানো হয় এবং ক্রয় করা হয়। কোন হাসপাতালে কি যন্ত্রপাতি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল পরিচালনা কর্তৃপক্ষ নয়।

 

এমপি ওয়াই এই সার্জিক্যাল মেশিনের ১৪টি ইউনিট ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বা ক্রয়ের কথা বলা আছে। এ মেশিনের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ১৪টি মেশিনের দাম হচ্ছে ৯১ কোটি টাকা। চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ি এ মেশিনের সর্বোচ্চ মূল্য আড়াই কোটি টাকা। মেশিন প্রতি অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ কোটি টাকার বেশি।

 

অর্থাৎ ১৪টি মেশিন ক্রয়ে সরকারকে গচ্চা দিতে হচ্ছে ৫৬ কোটি টাকা। তাহলে দাঁড়াচ্ছে কী, সরকার টাকা ঠিকই দিচ্ছে কিন্তু এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ অর্থলোভী এই সব টাকা আত্মসাত করার ফন্দি জিকির করছে। আর এর জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে না। দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগিদের। যেসব মেশিনের আপাতত দরকার নেই, সেইসব মেশিন কেনার জন্য সংশ্লিষ্ট মহল তৎপর। কেবল তাদের আপন স্বার্থের জন্য।

 

তা না করে যদি যে যে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় মেশিনপত্র যেমন এক্সরে মেশিন ডায়ালাইসিস মেশিন ইত্যাদি একেবারেই নেই অথবা থাকলেও বিকল হয়ে আছে, এসব কেনা হলে রোগিরা চিকিৎসা পেত। প্রয়োজনীয় মেশিন পেলে চিকিৎসকগণের পক্ষে রোগ নির্ণয়ে সুবিধা হত। চিকিৎসা দিতে পারতেন। তাদের প্রতি মানুষের আস্থা ও ভরসার দুয়োরটা উন্মোচিত হত। বিশ্বাস পেতেন চিকিৎসকদের ওপর। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র সত্যই অত্যন্ত দুঃখজনক। এর অর্থ এই নয় যে ডাক্তারদের অবস্থাও করুণ।

 

সংখ্যায় বেশি না হলেও বাংলাদেশে অত্যন্ত যোগ্য, দক্ষ অভিজ্ঞ ও চিকিৎসা শাস্ত্রের মান সম্পন্ন চিকিৎসক রয়েছেন। তাঁরা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সামর্থের তুলনায় বেশি মানুষের চিকিৎসা দিচ্ছেন প্রতিদিন। কিন্তু সব কিছুর মতো চিকিৎসা ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাপনা বলে একটা বিষয় থাকার কথা। যার অস্তিত্ব বাংলাদেশের অন্যান্য সেকটরের মত চিকিৎসা সেকটরেও নেই।

 

 মানুষ থাকলে রোগ থাকবে। থাকবে চিকিৎসা। আর সেই চিকিৎসার জন্য থাকতে হবে সুব্যবস্থা। যেটুকু সম্পদই থাক না কেন তা যদি সুষ্ঠুভাবে সুব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয় বা পরিচালনা করা যায় তাহলে তার সফলতা শতভাগ অর্জিত না হলে একটা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব। এই অর্জনের মধ্যে দিয়ে মানুষের আস্থা বাড়বে। ভরসা আসবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা চিকিৎসার জন্য বাহির মুখী হবে না।


 দেশে চিকিৎসা নিয়ে দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে সক্ষম হবে। কিন্তু তা করা হচ্ছে না বা যাচ্ছে না কেবলমাত্র এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ও অর্থলোভী মানুষ নামের কীটের কারণে অর্থের মোহ যাদের বিবেকের রাস্তাটা বন্ধ করে দিয়েছে। যা দিয়ে ন্যায় অন্যায় আর মানুষের দুঃখ দুর্দশার বিষয়টা তাদের বিবেচনায় আসেনা মনেও হয় না।

 

অনুভবও করে না। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার কোথাও কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত আছে চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকা এবং চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনার সংগে ডাক্তারদের প্রায় কোন সম্পর্ক নেই। সামান্য কয়েক জন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ডাক্তারের কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দায় নিতে হয় সব ডাক্তারদের।


চিকিৎসার ক্ষেত্রে সুব্যবস্থাপনা ফিরে আনতে বা নিশ্চিত করতে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কঠিন কঠোর হতে হবে। কোন রকম অন্যায় সহ্য করা হবে না। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও এগিয়ে আসতে হবে। দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিতে হবে।

 

স্বজন প্রীতি দলীয় পরিচয়ে পরিচিতদেরও রেহায় দেয়া যাবে না। কেননা এটা চিকিৎসা ব্যবস্থা। মানুষের জীবন নিয়ে কথা। তাই যে কোন রকম অন্যায়কে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে তাদের লোভ লালসার সীমানা প্রশস্ত করার সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।


 এর ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটা সুব্যবস্থা ফিরে আসলে মানুষের আস্থা বাড়বে। মানুষ ভরসা পাবে চিকিৎসা ব্যবস্থা আর চিকিৎসকের ওপর। সেই সাথে আমাদের দেশের মানুষেরও বিদেশে চিকিৎসা করানোর মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

অবশ্য পরিহার এর প্রবণতা তখনই ধীরে ধীরে জন্মাবে যখন চিকিৎসার মান বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে চিকিৎসকদেরকে হতে হবে ন্যায় নিষ্ঠাবান আর রোগিঅন্ত প্রাণ। তাঁরা তাদের ব্যবহার দিয়ে, কথা দিয়ে আর সেবা দিয়ে রোগিদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে হবে চিকিৎসা সেবায়।
লেখক: উন্নয়ন কর্মী
০১৭১৮-৫৩৩৭৬৬

হাওরের দুর্গত মানুষের কান্না

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ: হাওর অঞ্চলের মানুষের কান্না গণমাধ্যমের বদৌলতে এখন সবার কানে পৌছে গেছে। এই কান্না শুধু এখন আর হাওরবাসী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা গোটা বাংলাদেশের কান্না।  প্রতিদিন হাওর অঞ্চলের মানুষদের দুর্ভোগের খবর সংবাদ মাধ্যমগুলো ফলাও করে প্রকাশ করছে।

 

কিন্তু তাতেও কী কাজের কাজটি হচ্ছে? হচ্ছে না। সরকার যেটুকু সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছে সেটিও পর্যাপ্ত নয়। তার উপর আবার অনিয়ম ও দুর্নীতি তো আছেই।  সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে হলেও সরকারি সহায়তার পাশাপাশি দুর্ভোগে আক্রান্ত এসব হাওরবাসীদের পাশে বিত্তবানসহ সবার এগিয়ে আসার কথা ছিল ।


 কিন্তু আমরা তা করতে পারছিনা। এটা আমাদের ব্যর্থতা। কারণ আমরা এখনো সেভাবে মানবিক হতে পারিনি। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সহমর্মিতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে প্রকট আকারে। গোটা সমাজব্যবস্থা এখন চরম ও নির্মম পুঁজিবাদী ও স্বার্থবাদী হয়ে উঠেছে।  যার কারণে অন্যের কষ্ট আমাদেরকে আর পীড়া দেয় না। সোজা কথায় বলতে গেলে  সমাজের প্রতিটি মানুষ এখন হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর ও নির্মম।

 

হাওর অঞ্চলের এসব অসহায় মানুষগুলোর চোখ-মুখের দিকে তাকানোই যাচ্ছে না। সবকিছু হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে কিভাবে তারা বেঁচে আছেন?  একথা ভাবতেই ভেতর থেকে ডুঁকরে কান্না বের হয়ে আসে। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন জানতে পারি সরকারি কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশ করে এসব দুর্যোগ ও দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছেন।

 

হাওরবাসীর এই দুর্ভোগ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ঘটলেও এটাকে মানব সৃষ্ট একটি দুর্ঘটনা বললেও ভুল হবে না। কারণ দুর্নীতিবাজদের অনিয়মের কারণে আজ এই দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে হাওর অঞ্চলের এই ব্যাপক ক্ষতির পরিমাণ যে গোটা বাংলাদেশেই অর্থনীতির উপর কম বেশি প্রভাব ফেলবে এটা আমরা মোটামুটি সবাই অনুমান করতে পারছি।


 হাওর নিয়ে কাজ করে দেশি-বিদেশি এরকম ৩৫ টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম’ এর জরিপ মতে এই অঞ্চলের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে কত দাঁড়ায় সেটিও এখন বলা যাবে না। তবে ক্ষতির পরিমাণ যে দিন দিন বাড়বে এটা নিশ্চিত। সুনামগঞ্জের কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে হাওর অঞ্চলগুলোতে এবারে সব মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল।

 

তার মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির বোরো ধান একেবারে পুরোপুরি তলিয়ে গিয়েছে। অসময়ে এরকম অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে গোটা হাওর অঞ্চলের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়ে গেছেন। কারণ বোরো ধানের আবাদই ছিল এই অঞ্চলের মানুষদের একমাত্র ফসল। তবে অনেকে বলছেন যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ তাদের ভোগান্তি অন্যদের চেয়ে বেশি।


এই অঞ্চলের কৃষকদের যে শুধু ফসলের ক্ষতি হয়েছে তা কিন্তু না! বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে অনেকের স্বপ্ন ও আশা। মাথা গোজানোর ঠাঁইটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন অনেকে। এসব অসহায় ও নিঃস্ব মানুষগুলো আহাজারির ধ্বনিতে ভারি হয়ে উঠেছে গোটা হাওর এলাকা। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় গোটা হাওর অঞ্চলের মাত্র ৩ লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। আর বাকিদের জন্য ১৫ এবং ১০ টাকা দরে খোলা বাজারে  চাল  বিক্রির মাধ্যমে সেবা দেয়ার কথা বলছেন। যদিও এটি একেবারেই অযৌক্তিক একটা বিষয়।


 যেখানে হাওরবাসীদের মধ্যে ৮ থেকে ১০ লাখ পরিবার তীব্র খাদ্য সংকট ও খাদ্য ঝুঁকির মধ্যে আছেন সেখানে মাত্র ৩ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয়া কতটা যৌক্তিক ও বিবেক সম্মত?  তবে একথাও সত্য যে হাওর অঞ্চলের মানুষের দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও কিছু পেটুক নেতা ও আমলাদের কারণে দুর্গতদের মাঝে সঠিক মানের সেবা পৌছানো সম্ভব হচ্ছে না।

 

প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত এসব সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেয়ার কথা বলা হলেও তারা অনেকে মোবাইল ফোনে খোঁজ-খবর নিয়ে গোঁজামিল দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছেন। দুর্গত এলাকায় অনেক কর্মকর্তা পা দিয়ে মাড়ানোর চেষ্টাও করেননি।


 অনেক কর্মকর্তা জানেই না যে কোন কোন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে! কোন কোন এলাকায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং সেই এলাকার মানুষদের এখন কী অবস্থা? কোন এলাকায় পরিমাণ সরকারি সহায়তা লাগবে? এসব কিছুই তারা জানেন না। শুধুমাত্র ফোনে একটু খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করেছেন মাত্র। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের সং্িবধানের ২নং অধ্যায়ে ২৭নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’।

 

এখন বিষয় হল সাধারণ মানুষের এরকম একটি চরম দুর্ভোগের সময় যে  সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ কাজে অবহেলা করলেন, তারা কি আমাদের সংবিধান মানেন না? যদি তারা সংবিধান মানেন তাহলে তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত থেকেও কাজে অবহেলা করলেন কেন? আর যদি না মানেন তাহলে তাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে কিনা?


 হাওরবাসী সাধারণ মানুষের এই চরম দুর্ভোগের সময় সরকারের উচিত ছিল গোটা হাওর অঞ্চলকে একটি খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে নিয়ে আসা। সেই সাথে গোটা হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গতদেরকে  অর্থনীতির মূল ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কিন্তু সরকার তা করছে না। সরকারি মহল থেকে অনেকেই বলাবলি করছেন দুর্ভোগ নাকি এখনো চরম অবস্থায় পৌছায়নি। হাওর অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষদেরই নাকি বাড়তি অন্য আয় আছে! যার কারণে সংকট তীব্র না।

 

এজন্য হয়তবা সরকার মাত্র ৩ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে আর অন্যদের খোলা বাজারে ১৫ টাকা কেজি দরে চালের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়াও যেখানে সরকারিভাবে ২০০ জনকে সহায়তা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে সেখানে হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সরকার থেকে বলা হচ্ছে সমস্যা তেমন প্রকট না। নিজের শেষ সম্বল গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে মানুষ পেটের খাবার জোগাড় করছে। হাতে কাজ নেই! কিন্তু পেটে তো কিছু দিতে হবে!


আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এখন আগেকার চাইতে অনেক ভাল। গোটা এক দশক থেকে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন স্থিতিশীল। ভবিষৎ আমাদের অনেক সম্ভবনাময়। দেশের অভ্যন্তরে ছোট-খাট দুর্যোগ বা  দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করার সামর্থ এখন আমাদের আছে। আর এটি অর্জন করতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে। দিন মজুর শ্রমিকদের খাটা-খাটুনি দিয়ে আমরা আজ অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছি। তবে একটি দেশে যদি সুশাসন না থাকে তবে সেই দেশের প্রবৃদ্ধি পাহাড় সমান হলেও সেটি ভেঙ্গে পড়তে সময় লাগে না।


 তাই দেশের সার্বিক উন্নয় ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে এক দেশকে সুশাসনের আওতায় নিয়ে আসা খুবই জরুরি। কারণ সুশাসন ও উন্নয়ন যদি সুষম গতিতে চলে তবেই সেই দেশের উন্নয়ন হবে ‘টেকসই উন্নয়ন’। সুশাসন ছাড়া কোন দেশকেই টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির মধ্যে রাখা যায় না। এজন্য সুশাসন ও উন্নয়ন একটি দেশের জন্য খুবই জরুরি।

 

আমরা জানি দিন যতই গড়াচ্ছে আমরা ততই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে এটি স্পষ্ট। কারণ উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটি দেশে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন ঘটবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটিই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই উন্নয়নের পাশাপাশি আমরা সুশাসন কতটা পাচ্ছি সেটিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


হাওর অঞ্চলের মানুষ আজ আক্রান্ত। এটি কিন্তু শুধু হাওর অঞ্চলের মানুষদের কান্না না। এটা গোটা বাংলাদেশের কান্না। এই দুর্ভোগ গোটা বাংলাদেশের। কারণ এবার হাওরবাসীর বোরো ধানের যে ক্ষতি হল এটি কিন্তু আমাদের অর্থনীতির উপর বড় ধরনের একটি খারাপ প্রভাব ফেলবে।

 

কারণ সব সম্পদই বাংলাদেশের সম্পদ। যেখানেই সেই সম্পদ বা সম্পত্তির বিনষ্ট হোক না কেন সেটি গোটা বাংলাদেশেরই ক্ষতি। আর এর প্রভাব গোটা বাংলাদেশেই পড়বে এটাই স্বাভাবিক। হাওর অঞ্চলে এবার ৯০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সহায়-সম্বল হারিয়ে ৮ থেকে ১০ পরিবার এখন নিঃস্ব। তাদের আহাজারিতে কেঁপে উঠছে গোটা হাওর অঞ্চল।


 গোটা অঞ্চল বন্যার পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। হাঁস-মুরগি, গরু- ছাগল এবং বছরের একমাত্র বোরো ধান হারিয়ে তারা এখন ভাষাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। অনেকেই অভিযোগ করে বলছেন এটি একটি মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারদের অনিয়ম ও গাফিলতির মাশুল দিতে হচ্ছে এসব অসহায় কৃষকদেরকে। বছরের পর বছর দুর্নীতি করে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু দুর্ভোগ পোহাতে সাধারণ মানুষদের। সরকারি হিসাব মতে দেশের মোট ধান উৎপাদনের ১৮ শতাংশই আসে এখানকার ছোট-বড় হাওরগুলো থেকে।


 এছাড়াও উন্মুক্ত মাছের ২৮ শতাংশ আসে এই হাওর অঞ্চলগুলো থেকেই। দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে হাওর অঞ্চলের অবদান ধরা হয় প্রায় ৬ শতাংশ। এছাড়াও ২০১৩ সালের হাওর অঞ্চলের জীবন-জীবিকাবিষয়ক  অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রতিবেদন মতে হাওর অঞ্চলের দারিদ্র্যের হারও বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হারের চেয়ে বেশি। তাই সরকারের উচিত হবে গোটা হাওর অঞ্চলকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষণা করা।

 

ই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীদেরকে খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে তাদেরকে অর্থনীতির মূল ধারায় ফিরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কারণ কৃষিকে বাঁচাতে হলে প্রথমে কৃষকদেরকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে কৃষকেরা ক্রমান্বয়ে কৃষি কাজের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। যারফলে একদিন  গ্রামীণ কৃষি নির্ভর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।      
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক ও সংগঠক
rased.4bangladesh@gmail.com
০১৭৫০-৫৩৪০২৮

মা’র তুলনা মা নিজেই

তাহমিনা আকতার পাতা :“মা কথাটি ছোট অতি
কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে
নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই।”
[কাজী কাদের নেওয়াজ]
সত্যিই তাই। মা শব্দ বা কথাটি ছোট হলেও এর অর্থ অনেক তাৎপর্য ও মহিমান্বিত। এক অক্ষরের শব্দটির সাথে মিশে আছে, স্নেহ-মায়ার নিবিড় বন্ধন। মায়ের মতো আপনজন এ ভূবনে কেউ নেই। মা আমাদের সবচেয়ে প্রিয়জন। মা নারীর জাত। মায়ের তুলনা মা নিজেই। আর কারো সাথেই মায়ের কোন তুলনা হয় না। তিনি অতুলনীয়, অপরিসীম ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধন। দেশ, কাল, জাতি, বর্ণ-গোষ্ঠী ভেদে মায়ের বিকল্প কিছু নেই।

 জগতের মূল্যায়নে মায়ের তুলনা কারো সাথে হয় না। মাতৃকোষে ক্রোমোজম পদ্ধতি ও জীনের সমন্বয়ে প্রতিটি মানব শিশু গর্ভাবস্থায় মায়ের পেটে ভ্রুণ অবস্থা থেকে শুরু করে পৃথিবীর আলোতে জন্ম হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পরম শান্তি ও নিরাপদে মায়ের নাড়ীর বন্ধনে সম্পৃক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। মা একজন নারী এবং যথার্থই একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। সন্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে মা-ই বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন। গর্ভধারণ, দুধপান, রাত জেগে সন্তানের তত্ত্বাবধান সহ নানাবিধ কষ্ট একমাত্র মা-ই সহ্য করেন। তাছাড়া সন্তানের প্রতি মা সবচেয়ে বেশি যতœবান এবং বেশি আদর সোহাগ করে থাকেন।
ইসলাম ধর্মে হাদিসে আছে “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত।


সংস্কৃতিতে আছে, ‘জননী ও জন্মভূমি স্বর্গ থেকেও শ্রেষ্ঠ’। সুতরাং মা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ, মা একজন পরিপূর্ণ নারী। মা এবং নারী একই সূত্রে গাঁথা মানুষ। অতএব, নারীর প্রতি আমাদের সম্মান ও দায়িত্ব, কর্তব্যের কোনো শেষ নেই। মা স্নেহময়ী, মা ত্যাগী ও ধৈর্য্যর বীর প্রতীক। মায়ের স্নেহ ছাড়া কোনো শিশু পৃথিবীতে যথার্থ বেড়ে উঠতে পারে না। সন্তানের কল্যাণের জন্য মা হাসিমুখে সব কষ্ট সহ্য করতে পারেন।

 

মায়ের প্রতিও সন্তানের কর্তব্য তাই অনস্বীকার্য। সবাই মিলে এক সঙ্গে পারিবারিকভাবে ভালো থাকা, একটি সুখি পরিবার মায়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে। সেখানে ভালোবাসার মানুষগুলোও মায়ের সাথে অন্যান্য সদস্যসহ সহাবস্থান নিয়ে আসে জীবনে পরিতৃপ্তি।


 এই সুখ, আনন্দের পিছনে মায়ের ত্যাগ, শ্রম, ভালোবাসা চাবিকাঠি হয়ে কাজ করে। জগতে মা’ই পারেন একটি সুখি পারফেক্ট ফ্যামিলি গড়ে তুলতে। তবে বাবার অবদানও অস্বীকার করার কিছু নেই। পরিবারের সদস্যদের সুখী ও শান্তিতে রাখার জন্য বাবা সারাদিন পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনেন।

 

অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা দু’জনেরই সুন্দর পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক আয় রোজগারের স্বাবলম্বিতার জন্য পরিবার সুখী ও সমৃদ্ধিশালী হয়ে ওঠে। সুতরাং পরিবারে বাবার সাথে সাথে মায়ের অবস্থানের গুরুত্বও কোন অংশে কম নয় এবং এ ব্যাপারটা ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই। বাবার তুলনা যেমন বাবা। বাবার স্নেহ, স্বপ্ন, সৎ ইচ্ছা সন্তানের জন্য আশির্বাদ বয়ে আনে। তেমনি মা, মা-ই, তার অন্য কোন রূপ নেই।


পারিবারিক কোলাজে প্রতিটি সম্পর্কের রং, রূপ যথাযথভাবে মিশে ভালোবাসার বিশেষ ছোঁয়ায় মায়ের নিঃস্বার্থ স্পর্শের পাশাপাশি বাবার সান্নিধ্যও আমাদেরকে করে বিমোহিত। মানুষের জীবনে প্রতিটা মুহূর্ত প্রাণভরে বাঁচা, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বেঁচে থাকার নিয়মানুবর্তিতাগুলো আমরা প্রথম মায়ের কাছ থেকেই বুঝতে শিখি।

যে মা আমাদের জন্মদাত্রী, সেই মায়ের জাত, সমগ্র নারী জাতকে সমগ্র পৃথিবী ও পৃথিবীর যতো সমাজ ও রাষ্ট্র আছে, আছে যতো পুরুষ কিংবা শাসক গোষ্ঠী সবাইকে একবাক্যে “নারীর প্রতি ব্যালেন্সড মাইন্ডসেট” থাকতে হবে চরমভাবে। মায়ের প্রতি সম্পর্কের আন্তরিক সমীকরণই হচ্ছে নারীর প্রতি সম্মানের মূলমন্ত্র। এর কোনো বিকল্প নেই। কোনো জিনিসই একদিনে তৈরি বা সৃষ্টি হয়না।


 সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীর প্রতি যে অনুশাসন, অত্যাচার, অবহেলা চলে আসছে এটা পরিবর্তন হতে আরো সময় লাগবে। নারীর সম্মানের অস্তিত্ব’র সীমারেখা নির্ণয় করতে আরো বেশি ধৈর্য্যরে প্রয়োজন আছে বৈকি? বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালন করা হয়। মা দিবসের মূল উদ্দেশ্য, মাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া।

জানা যায়, ১৯১১ সাল থেকে এ দিনটি পালনের রেওয়াজ শুরু হয়ে আসছে। ওই বছর সর্বপ্রথম আমেরিকা জুড়ে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার দিবসটি পালিত হয়। বলা যায়, মা দিবস হলো মায়ের প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশের একটি দিন। অন্যদিকে মা দিবস হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কার্ড আদান- প্রদানকারী দিবস।


 বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ দিবসে নানা আয়োজন, আলোচনা, সেমিনার ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলোতে মায়েদের জন্য বিশেষ ডিজাইনের শাড়ি ও উপহার সামগ্রী বিক্রি করার প্রচলন কিছু বছর ধরে দেখা যাচ্ছে।

 

কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এ দিবসে রতœগর্ভা মাকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করে থাকে। মাকে সম্মান করে উপরোক্ত কাজগুলো অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের প্রত্যেকেরই মায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো উচিত। তারপরও বলবো মায়ের কোন তুলনা নেই এবং শুধু একটি দিবস নয় প্রতি দিবসেই মায়ের সম্মান সমান থাকা উচিত।


মা ও নারী যেহেতু একই সত্ত্বা। সময় গুণ বিচারে মায়ের তুলনার কোনো পরিমাপ নেই। মা নিজেই তার পরিমাপক। মাকে নির্ণয় করার কোনো নির্দিষ্ট দিবসেরও প্রয়োজন নেই। প্রতিটি দিবসই আমার কাছে “মা দিবস”। সে হিসেবে প্রতিটি দিনই অবিস্মরণীয়।

 

জীবনের শুরুতে মানুষের মধ্যে গুড ভ্যালুজ তৈরি হলে নারীর প্রতি পজিটিভ মানসিকতা গড়ে উঠতে বাধ্য। এর জন্য প্রসেস প্রয়োজন অল টাইম। একজন মা কিভাবে পরিবারের সবার মধ্যে ওয়ার্ক আর হোম ব্যালেন্স করে কিভাবে পরিবেশটা সুন্দর রাখেন, তা থেকেও কি সমাজ এবং আমরা কিছু শিখতে পারি না?


আমাদের চোখ বুজে থাকা এবং অজ্ঞতাই এর জন্য দায়ী। যদি নারী এবং জগৎ সম্পর্কে আমরা স্বচ্ছ দৃষ্টি রাখি কিংবা দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টাতে সক্ষম হই তাহলে মায়ের সম্মান এবং সমগ্র নারী জাতির সুসম্মান সমগ্র পৃথিবীতে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য। মায়ের ছোঁয়া ছাড়া জগৎ সংসার যেন এক ‘অনুভবহীন ছোঁয়া’। মা হচ্ছেন অনুচ্চারিত শব্দকোষের শিশুর মুখের প্রথম বুলির পরম উপলব্ধির একটি নাম।

 

এর সাথে মিশে আছে অনেক গভীরতা, আন্তরিকতা ও বন্ধন। এমন চিত্তাকর্ষক জীবনের ওৎপ্রোতভাবে জড়ানো ব্যাক গ্রাউন্ডগুলো “মা” আর “নারী” এর সাথে জড়িত। সুতরাং মা নারী, নারী মা। এই কোয়ালিটি নারীর প্রতি আমাদের মানতেই হবে। আজকের লাইফ স্টাইলের সাথে সাথে সময়ের ব্যবধানটা এতটাও বদলায়নি যে, আমরা নারীর প্রতি সম্মান জানাতে কুন্ঠা বা লজ্জা বোধ করবো।


 এটা পুরোটাই অসুস্থ মানসিকতার ব্যাপার। নারী ও মানুষ, তারও আছে জীবনের ক্লান্তিভাব, আরো আছে সাধ, স্বপ্ন, ইচ্ছা সুতরাং নারীর প্রতি প্রায়রিটি লিস্টে মর্যাদা দেয়া উচিত। জন্মের পর থেকে কন্যা শিশু পিতার ঘরে বড় হতে হতে প্রাপ্ত বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আসে স্বামীর ঘরে। স্বামী-স্ত্রীর জীবন-সংসারে একজন নারী মাতৃত্বের স্বাদ পায়। জীবনের বাঁকে নানা পরতে পরতে মা অন্দর মহলে নানা ডেসার্ট কিংবা রেসিপিতে সাজিয়ে তোলে  জীবনের বন্ধন কিংবা ঘর সংসার।

তার পরিবেশনে মুগ্ধতা পায় অনেকেই কিন্তু মা বা নারী ভুলে যায় নিজের জীবনের রেসিপি, ভুলে যায় নিজের খেয়াল। সে সদা ব্যস্ত পরোপকারে। ‘মা’ মানেই স্পেশাল এক আদর্শ মেরুকরণ, মা মানেই ‘হোম ড্রিমস’। একজন আদর্শ মা, একজন আদর্শ নারী সুস্থ, সুন্দর সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে এ সত্যতার পজিটিভ আউটলুক সবার মধ্যে থাকতে হবে এবং মেনে নিতে হবে, নিতে বাধ্য। ধর্মে আছে “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত”।


প্রত্যেক মানুষের জন্ম আগে। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আনুষঙ্গিক অন্য সব কিছু পরবর্তীতে জীবনের সাথে যোগ হয়। মানুষের জন্ম যেহেতু ভ্রƒণ অবস্থা থেকে শুরু করে মায়ের গর্ভে। সুতরাং কোনো মানুষ কি বলতে পারবে, মায়ের গর্ভ ছাড়া তার জন্ম সম্ভব হয়েছে? মায়ের নাড়ির সাথে আছে সন্তানের টান ও বন্ধন।

 

এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যমন্ডিত। প্রত্যেক মানুষের উচিত মাকে সম্মান করা এবং জীবনের চলার পথে পরবর্তীতে যে ধাপগুলো আছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সহকারে বিশ্বাস বিবেচনা করে সঠিক জীবন ধারণ করা। কন্যা, জায়া, জননী একই অঙ্গে নারীর জীবনে ভিন্ন ভিন্ন প্যাটার্ন যুগে যুগে, শতাব্দীর পর শতাব্দী নারীকে করেছে অনন্যা, লাস্যময়ী, অসাধারণ।


 নারীর জীবনের এমন কন্ট্রাস্ট রঙের ভূমিকা অন্য কোনো মানুষের মধ্যে আছে কি? একথা এখন নতুন করে ভাবতে হবে জগত সংসারকে। এ চাওয়া এ প্রশ্ন আজ পুরাতন সময় পার করে নতুনভাবে সমাজের কাছে উপস্থাপন করছি। পালা পার্বণের অগ্নিশিখায় ‘মা’ এবং ‘নারী’ কে দেখতে চাই সমাজ-সংসারে নতুন সেলিব্রেটি রূপে।

 

মা একজন চমৎকার আশির্বাদ স্বরূপ নারী হয়ে সামাজিক, পারিবারিক পৃথিবীর মেলবন্ধন হয়ে বেঁচে থাকুক মানুষের জন্মলগ্ন থেকে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া অবধি। মায়ের মধ্যে যে বন্ধনের মায়া মমতার বীজ লুকায়িত আছে সে পজিটিভ সম্ভাবনা কাজে লাগুক পৃথিবীর তরে। এ চাওয়া আজ নতুন করে আমার, আমাদের সবার যুগ যুগান্তরের।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক -আইনজীবী
জজ কোর্ট, ঢাকা।
০১৭১১-৮২৫৫৫৪

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় খাদ্য শস্য আমদানির গুরুত্ব

আব্দুল হাই রঞ্জু  : দুর্যোগ একটি আতংকের নাম। যে কোন দেশে যে কোন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটতেই পারে, এটা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। তবে দুর্যোগ ঘটলে তা মোকাবিলা করার সামর্থ্য যেমন সরকারের থাকা উচিৎ, তেমনি জনগণকেও তা মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। অতি সম্প্রতি স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে গেল হাওর অঞ্চল খ্যাত জেলাগুলোয়।

 বাঁধ রক্ষায় দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং অতিবর্ষণের পাশাপাশি উজানের  পানির ঢলে প্রায় ৩ লক্ষ হেক্টর জমির আধা পাকা ধান তলিয়ে সর্বনাশ হয় কৃষকের। একমাত্র সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদই হাওরবাসীর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

 

সে অবলম্বনটুকু যখন কোন দুর্যোগের মুখে পড়ে, তখন আর মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। ফলে হাওর অঞ্চলে চলছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি। অবশ্য সরকারি তরফে এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে এবং বিভিন্ন এনজিও পর্যায়েও সাহায্যের হাত অনেকেই বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের মহাবিপর্যয় না ঘটলে হাওরবাসীর সাহায্যের কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু উপায় কি, বাঁচতে হলে অন্যের কৃপার উপর অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হয়।


 তবে আমরা মনে করি, টেকসই পরিকল্পনার আওতায় হাওর অঞ্চলকে উজানের পানির ঢল ঠেকে রাখার মতো বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। যেন আগাম বন্যার পানি হাওরে ঢুকে ফসলহানির মতো দুর্যোগ আর সৃষ্টি করতে না পারে। ইতিমধ্যেই সরকার দায়িত্ব অবহেলার দায়ে বেশ ক’জনকে সাময়িক ভাবে চাকুরি হতে বরখাস্ত করছে। এমনকি পানি সম্পদ মন্ত্রী এ ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগে প্রস্তুত আছেন বলে বিবৃতিও দিয়েছেন।

 

অবশ্য আমাদের দেশে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করার ঘটনা সহসাই ঘটেনা। যদি হাওর বিপর্যয়ের কারণে পানি সম্পদ মন্ত্রী পদত্যাগ করেন, তাহলে এটা একটা দৃষ্টান্ত হবে। বাস্তবে কি ঘটে, তা দেখার জন্য হয়ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু মনে হয়, দগদগে ঘা কিছুটা শুকিয়ে গেলে মান্যবর মন্ত্রীর এ উপলব্ধি থাকবে কিনা, যা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশও রয়েছে।


দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার খুব কাছাকাছি পৌঁছায় সরকার উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষায় বিদেশ থেকে চাল আমদানির উপর শুল্ক আরোপ করেছিল। যেন বিদেশী চালের আগ্রাসনে দেশীয় উৎপাদক শ্রেণী ধানের উপযুক্ত মুল্য থেকে বঞ্চিত না হয়। ফলে দু’বছর যাবৎ কৃষকের উৎপাদিত ধানের মুল্য সরকার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

 

অবশ্য দেশে যেকোন পণ্য আমদানি কিম্বা রফতানির বিষয়টি জনস্বার্থের কথা বিবেচনার নিয়ে সরকার করে থাকে। কারণ সরকারকে যেমন উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, তেমনি ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় অনেক সময় আমদানির উপর ধার্য্যকৃত ট্যারিফও প্রত্যাহার করতে হয়। ইতিমধ্যে সরকার বাস্তব অবস্থার নিরিখে চাল আমদানির উপর ধার্য্যকৃত সমুদয় ট্যারিফ প্রত্যাহারের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে।


 আমরাও মনে করি, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে চাল আমদানির উপর শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়ায় হবে সঠিক ও সময়োচিত। সরকার এ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আশা করা যায়, এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজি বন্ধ করা অধিকাংশেই সহজ হবে। এ বছর শুধু যে হাওরেই বিপর্যয় হয়েছে, তা নয়। গোটা দেশে আগাম অতিবৃষ্টির কারণে চিকন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির কারণে নেক ব্লাষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।


এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে, সরকারকে কৃষি পর্যায়ে সার, বীজ, তেল এবং বিদ্যুতে ভর্তুকীর পরিমাণ বৃদ্ধি করে আগামী ফসলকে নির্বিঘœ করতে হবে। তা না হলে কৃষকের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে জানা গেছে, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বিভিন্ন এনজিওর দেওয়া ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য চাপ অব্যাহত রয়েছে। বাস্তবে আমাদের দেশের চাষীদের ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ, এমনকি মহাজনি ঋণ পর্যন্ত গ্রহণ করে চাষাবাদ করতে হয়। কোন কারণে ফসলের ক্ষতি হলে ঋণ পরিশোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়ে।

 

এ বছর চাষীদের উপর যে পর্যায়ে বিপর্যয়ের কাল মেঘ আঘাত হেনেছে, তা মোকাবিলায় ঋণ মওকুফের পাশাপাশি পুনরায় ফসলি ঋণ দিতে হবে। পৃথিবীর নানা দেশে যখন সহজ কিস্তিতে শস্য বীমার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে শস্যবীমার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে শস্যে বিপর্যয় হলে বীমা না থাকায় চাষীরা ক্ষতিপূরণ পান না। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা অভিঘাত এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে, সেহেতু শস্য বীমার মত কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ রেখে ঋণ দেয়া জরুরি। তাহলে অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের অর্থের ঝুঁকি অনেকাংশেই  কমে আসবে।

 

আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে সাধারণ ভোক্তার সংখ্যাই বেশি। মুলত যারা মোটা চালের উপর নির্ভরশীল। এ কারণে মোটা চালের বাজার দর তুলনামুলক বেশি। সে ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। পক্ষান্তরে দেশে এখন মোটা ধানের চেয়ে চিকন ধানের চাষাবাদও বেশি হচ্ছে। ফলে মোটা চালের সংকটের কারণে দামও কিছুটা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে দু’টি কারণ বিদ্যমান।

 

সরকার প্রতিবছর যে চাল সংগ্রহ করে তার সিংহভাগই মোটা চাল। আবার ভোক্তা পর্যায়ে মোটা চালের ভোক্তাও বেশি থাকার কারণে মোটা চালের বাজার দর তুলনামুলক বেশি থাকে। পরিস্থিতি যখন সাধারণ ভোক্তাদের প্রতিকূলে চলে যায়, তখন সরকারের খাদ্য বিভাগ স্বল্প মুল্যে ভর্তুকি  দিয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রি করে থাকে। মুলত সে চাল সাধারণ ভোক্তারা কিনে খায়। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেও সরকার গোটা দেশে দশ টাকা কেজির খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির বাইরে খোলা বাজারে চাল বিক্রি করতে পারেনি।

 

 এর মুলেই ছিল, সরকারি গুদামে চালের মজুদ সংকট। সে সংকট এখনও যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সরকার চলতি বোরো মৌসুমে আপদকালীন খাদ্য মজুদ গড়তে অভ্যন্তরীণভাবে ৮ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ও কৃষকদের নিকট থেকে ৭ লক্ষ মেট্রিক টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

 

যদি অভ্যন্তরীন লক্ষ্যমাত্রার ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হয়, তাহলে খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আর যদি ধান চালের অস্থির বাজারের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়,  তাহলে সরকারকে জিটুজি পদ্ধতিতে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে হলেও কাংখিত চালের মজুদ গড়ে তুলতে হবে।


পাশাপাশি সরকার খোলা বাজারে আটা বিক্রির যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে, সাধারণ ভোক্তার স্বার্থে আটা বিক্রির কার্যক্রমও চালু করা প্রয়োজন। কারণ বাজারে আটা কিংবা ময়দার দাম অনেক বেশি চড়া। যা অনেকের পক্ষে কিনে খাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সরকারের  খোলাবাজারে আটা বিক্রির কর্মসূচিকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হলে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষা করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের স্বার্থে আটা খোলাবাজারে পুনরায় বিক্রির ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।


সামনে রমজান মাস। রমজান মাস আসলেই, ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের বাজার দর মূল্য বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে চাল, আটা, ছোলা, ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওর অঞ্চলসহ গোটা দেশেই এক ধরনের পণ্য সংকটের আতংক বিরাজ করছে।

 

সরকারের উচিৎ এই ধান কাটা মাড়াইয়ের সময়েও যে সব অঞ্চলের ধান পানিতে তলিয়ে  এবং পোকার আক্রমণে নষ্ট হয়েছে, সে সব অঞ্চলকে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে খোলাবাজারে চাল, ডাল, আটা, চিনি, তেল, ছোলার মত নিত্যপণ্য বিপণন করা উচিত। তাহলে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে রমজান মাসের ব্যয় নির্বাহ করা সহজ হবে।

 

 হয়তো সরকারকে এ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে।  আর জনস্বার্থে ভর্তুকি দেওয়াই সরকারের দায়িত্ব। অনেকের স্মরণে আছে, গত ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিশেষ করে চালের তীব্র সংকট হয়েছিল। সে সময় সরকার অর্থ নিয়ে গোটা বিশ্বে দৌঁড় ঝাঁপ করেও আশ্বাস ব্যতিত কাংখিত চাল আমদানি করতে পারেনি। ফলে সাধারণ ভোক্তার কষ্টের শেষ ছিল না। এ বছর যে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না, তা আমরা বিশ্বাস করতে পারছিনা।


 তবে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ থাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ দিনের খাদ্যের প্রয়োজন প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন।

আর ৬০ দিনের প্রয়োজন প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। সে তুলনায় আমাদের দেশের খাদ্য মজুদ যেখানে মাত্র ৫ লাখ টনেরও নিচে, সেখানে সরকারি ভাবে খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি করা যে জরুরি, যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোক্তার স্বার্থ এবং টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের উচিৎ সরকারি বেসরকারিভাবে শুল্ক মুক্ত সুুবিধায় আমদানি করে কাংখিত পরিমাণ খাদ্যশস্যের মজুদ গড়ে তোলা জরুরি। তাহলে খাদ্য সংকটের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি হতে হবে না।
 
 লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮ 

লাই-লাতুল বরাতের ফজিলত ও দর্শন

  মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : লাই-লাতুল বরাতের ফজিলত দর্শন, গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ মুহাম্মদ মাদানী রচিত হাদিসে কুদসী গ্রন্থের অনুবাদক মোমতাজ উদ্দিন আহম্মদ ১২নং অধ্যায়ের ভূমিকার মধ্যে উল্লেখ করেছেন “শাবান মাসের ফযিলাতের দুটি বিশেষ কারণ রহিয়াছে, প্রথমত: ইহা নিজেই ফজিলতের মাস। ইহার মধ্যভাগে যে তিনটি রোজা রাখার বিধান রহিয়াছে উহা নফল হলেও উহার নেকী অপরিসীম। দ্বিতীয় শাবান মাস পবিত্র রমজানের অগ্রদূত।


 লাইলাতুল বরাতে রয়েছে অন্তর্নিহিত ফজিলত ও কল্যাণ। এ প্রসঙ্গে আল্লামা মুহাম্মদ মাদানী সংকলিত হাদিসে কুদসি গ্রন্থের ১৩৭নং হাদিসে ইবনে মাজা হযরত আলী (রা) এর সূত্র ধরে বলেছেন “যখন শাবান মাসের অর্ধেক (অর্থাৎ পনের তারিখ) রাত্রি আসে তখন তোমরা সেই রাত্রিতে কিয়াম কর (ইবাদত কর) এবং দিনে রোজা রাখ। কারণ আল্লাহ ইহাতে সূর্যাস্তের পর পরই দুনিয়ার নিকটতম আকাশে নামিয়ে আসেন এবং বলেন “কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী কি নাই যে, আমি তাহাকে ক্ষমা করিতে পারি?

কোন রিযিক অনুসন্ধানকারী নাই, যে, আমি তাহাকে রিযিক দিতে পারি? কোন পীড়িত ব্যক্তি নাই যাহাকে আমি সুস্থতা দান করিতে পারি? কোন বাসনাকারি নাই যে, আমি তাহাকে প্রার্থীত বস্তু দিতে পারি? এরূপ নাই কি? এরূপ নাইকি বলা হইতে থাকে যে পর্যন্ত না ফজরের উদয় হয়।

 

(হাদিসে কুদসী পৃ: ১৩২) আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী বলেন নবী (স:) বলেছেন, যে মুসলমান এ মাসে তিনটি রোজা রাখবে এবং ইফতারের সময় তিনবার দরুদ পড়বে তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে, তার রিযিকে বরকত হবে। কিয়ামতের দিবসে উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।


হাদিসে আরও বর্ণিত আছে, রাসুল (স:) রমজানুল মোবারক ছাড়া অন্য মাসে এতো অধিক রোজা রাখতেন না যতখানি শাবান মাসে রাখতেন।) বোখারী মুসলিম)। তবে এ কথা সত্য যে, আজকের এই গুনাহ মাফের রজনীতে সকলের গুনাহ মাফ হবে না। এমন কিছু ব্যক্তি এই সমাজে রয়েছে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় অত্যাচার, মদ, জুয়া সহ বিভিন্ন প্রকার গুনাহর কাজ করে এবং গুনাহ মাফের আশঅই মহা ধুমধামে পালন করে এ সমস্ত রজনী, তাদের দোয়া কখনই কবুল হয় না। বরং তারা হবে বঞ্চিত।

 

 এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে “হযরত আয়শা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক রাত্রে আমি নবীজীকে তার স্থানে না পেয়ে তাকে খুঁজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে নবী (স:) কে জান্নাতুল বাকী নামক স্থানে গিয়ে দেখি, তিনি আকাশ পানে মাথা উত্তোলন করে দুআ করছেন।

 

রসুল তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়শা আমার নিকট হযরত জিব্রাইল (আ:) এসেছিলেন, তিনি আমাকে বললেন আজ অর্ধ শাবানের (শবে বরাত) রজনী। এ রাতে মহান আল্লাহ এত অধিক পরিমাণ লোকদের কে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন যে কালব গোত্রের বকরীগুলোর যত পশম রয়েছে তার সমপরিমাণ।

 

 কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন কিছু দুর্ভাগ্য ব্যক্তি বা লোক রয়েছে যারা এই পবিত্র রজনীতেও ক্ষমা লাভে বঞ্চিত হবে। আর তারা হলোÑ (১) আল্লাহর সাথে শরিক স্থাপনকারী, (২) হিংসা-বিদ্বেষী পোষণকারী,  (৩) অন্যায় ভাবে ট্যাক্স (চাঁদা) আদায়কারী, (৪) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান (৫) অহংকারী,   (৬) যাদুকর ও গণক (মিশকাত ১:১১৫) অন্যত্র মদ, জুয়া, ব্যাভিচারী ও খুনীদের কথাও বলা হয়েছে। এদেরকে কোন অবস্থায় ক্ষমা করা হবে না।


 তাছাড়া অন্যান্য অপরাধীদেরকে ক্ষমার কথা বলা হয়েছে। তবে এ কথা সত্য যে মানুষ যত বড়ই অপরাধ করুন না কেন সে যদি পাপের জন্য অনুশোচনা করে এবং অতিতের সকল ভুলের জন্য একাগ্রচিত্তে খালেস নিয়তে এই রজনীতে তওবা করে তবে অবশ্যই আলাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। কারণ আল্লাহ বলেন, তোমরা আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।

 

 অন্যত্র তিনি বলেছেন আল্লাহ অসীম ক্ষমাশীল ও দয়াবান। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, আজকের রজনীতে ইবাদত করতে হবে একাগ্রচিত্তে এবং খালেস নিয়তে। আর ওই সমস্ত পাপের কাজ থেকে সরে আসতে হবে চিরদিনের জন্য। এই গুনাহ মাফের রজনীতে একজন মুমিন হয়ে উঠবে খাঁটি সোনার মত প্রকৃত মুত্তাকি। তাই তো বলা হয় এ রাতের বিপুল বরকত লাভের অদম্য চেতনায় দীপ্ত হয়ে উঠে মোমিনের দেহ মন। সে তার স্থুল অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক পরশ ব্যাকুলতা অনুভব করে এই রজনী পাবার এবং আলিঙ্গন করার জন্য এ রাতের দৃপ্ত আহরণে জেগে থাকে একাগ্রচিত্তে।


সে তৃষ্ণার্ত চাতকের মত লক্ষ্য রাখে এ রাতটি আগমনের প্রতি। দুনিয়ার সব ভোগবাদী অর্থনীতি ও বিলাসিতা পরিহার করে শুধু ব্যস্ত থাকবে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনে আর এইটাই একজন মোমিনের কামনা হওয়া উচিৎ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ এই দিনটি বহুমুখী বেদআতে ভরপুর। বিজ্ঞানের এই স্বর্ণ উজ্জ্বল যুগে এসেও মুসলিম সমাজে এমন কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয় যা ইসলামী শরিয়তের সম্পূর্ণ বিরোধী।


যেমন এই রজনীতিতে এক শ্রেণীর লোক আনন্দ, ফুর্তি, হাসি, তামাশা, গল্প গুজব আর আতশ বাজীর মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়। বাড়ী বাড়ী বিভিন্ন প্রকার ফিরনী, সেমাই এবং হালুয়া রুটি তৈরীর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। নাজাতের আশায় কবরে কবরে জ্বালিয়ে দেয়া হয় ধুপবাতী যা আদৌ ইসলামী শরিয়ত সম্মত কিনা তা ভেবে দেখার জন্য জ্ঞানী পাঠক সমাজের নিকট প্রশ্ন রাখছি।

 তবে এদিনে ফকির মিসকিনকে খাওয়ানো ভাল মন্দ খাবার পরিবেশন করা দোষেই কিছু নেই। অথচ আজকের রাতে জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফের আশা নিয়ে একাগ্রচিত্তে কেঁদে কেঁদে বুক ভিজানোর কথা। প্রার্থনা করার কথা যাবতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য। তাই আসুন আমরা আর বিদআত নয়, হাসি তামাশা নয়, বরং শবে বরাত পালিত হবে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে আসুন দিনে রোজা এবং রাতে কেঁদে কেঁদে দুচোঁখ উজাড় করে একাগ্রচিত্তে ফরিয়া করি মহান মাবুদের দরবারে।
লেখক ঃ কলামিষ্ট, প্র্রবন্ধকার, সংগঠক, ইসলামি গবেষক ও কলেজ প্রভাষক
mostakimbogra@gmail.com
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার

মোঃ সালাউদ্দিন: পৃথিবীতে অনেক আগে থেকেই বিচার ব্যবস্থা প্রচলিত। আমার ধারণা বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল, জালিমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করার জন্য। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) তার দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল এর মাঝে বিরোধ মিটাতে একটি বিচার এর আয়োজন করেছিলেন।

 

এছাড়াও হযরত সুলাইমান (আঃ) এর বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন গল্প আমরা শুনতে পাই, বিভিন্ন রাজ দরবার বা কাজীর অধিনেও বিভিন্ন বিচারের কাহিনী আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। অধুনা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সুলতান সুলেমানের বিচারিক কার্যক্রমের কাহিনী আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম জালিমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করার জন্যই মূলত বিচার ব্যবস্থার প্রবর্তন।


 কিন্তু হয়ত কোন কারণে সেই বিচার ব্যবস্থায় অন্যায় ঢুকে পড়েছিল। অর্থাৎ বিচারে হয়ত জালিম রক্ষা পেয়েছিল আর মজলুম দন্ডিত হয়েছিল। সেই থেকেই হয়ত বিচার শব্দটির পূর্বে ন্যায় শব্দটি যোগ করা হয়েছে। কিংবা বলা যায়, একটি ন্যায়বিচার এবং অপরটি অন্যায় বিচার। একজন বিচারক যখন বিচার করেন তার বিচারটি নির্ভর করে উপস্থিত তথ্য উপাত্য, সাক্ষী ও ব্যক্তিবর্গের কথার উপর।


 ফলে যদি জালিম শক্তিশালী হয়, তবে সেখানে ন্যায় বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পরে। কারণ বিচারক যতই সৎ থাকুক না কেন, তাকে সেই উপস্থাপিত তথ্যের উপর নির্ভর করেই রায় দিতে হবে। পক্ষান্তরে, বিচারক যদি অসৎ হন, তবে তিনি উপস্থাপিত তথ্যের মধ্যে ফাঁক খুঁজে ন্যায় বিচার বিঘিœত করতে পারেন। বর্তমানে দেখা যায় যে, অন্যায়কারীও যদি বিচারে হেরে যায়, সে বলে ন্যায়বিচার সে পায়নি, অদ্ভুত!


আবার এই বিচার ব্যবস্থা যদি ন্যায় এর উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে, তবে একটি ভাল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি বিপরীত হয় তবে সেই সমাজের ধ্বংস অনিবার্য্য। কারণ অন্যায়ের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।

 

বিচার যেন ন্যায় এর উপর ভিত্তি করে হয়, এজন্য বিচার ব্যবস্থা গ্রাম আদালত থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। এতো গেল বিচার ব্যবস্থার কথা। বিচার ব্যবস্থার বাইরেও আরো একটি ন্যায় বিচারের জায়গা রয়েছে, যেখানে একজন মানুষ নিজেকে মূল্যায়ণ করতে পারে।


মানুষ স্বভাবতই ন্যায়, অন্যায়ের মিশ্রণে তৈরী। সে নিজেই বুঝতে পারে সে যা করছে তা ন্যায় নাকি অন্যায়। এই বুঝতে পারার বিষয়টিও নির্ভর করে তার আর্থ সামাজিক বা যে পরিবেশে সে বড় হয়েছে তার উপর। যেমনঃ একজন ভুমি দস্যুর সন্তান যখন ভূমি সদ্যুতা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার কাছে এটি অন্যায় মনে হয় না। মনে হবে এটি তার কাজ। ঠিক যেমন ঘুষ দিয়ে চাকুরী নিলে মনে হবে ঘুষ খাওয়াটাও একটি কাজ। অবশ্য সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে এখন মনে হয় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ঘুষ নেয়া বা দেয়া একটি সংস্কৃতি।


 কারণ, কেউ সরকারী চাকুরী পেলেই আমরা জিজ্ঞাসা করি, কিরে কত দিলি? সে যদি বলে কিছুই লাগেনি আমরা বিস্মিত হই, এও কি সম্ভব? ঠিক তেমনি ডাকাত ডাকাতি করতে যেয়ে মানুষ হত্য করে। গাড়ি চাপায় মানুষ মারা যায়, ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বা প্রদর্শন করার জন্য মানুষ হত্যা করে, ধর্মের ঝান্ডা ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করে, কেউ কেউ মানবাধিকার রক্ষার নামে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী নিতে টাকা গুণতে হয় যাদের তাদের কাছে এগুলো অন্যায় নয়, বরং ন্যায় (তা না হলে কেউ টাকা দিত না)।

 

আবার একজন দুর্বল মানুষ পেয়ে দুথাপ্পড় মেরে দেয়া, বাজার করতে যেয়ে কিছু টাকা মেরে দেয়া, কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দেয়া, অধনস্ত্যদের নাজেহাল করা, স্বামী বা স্ত্রী কিংবা মা-বাবা, সন্তানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, গরীব অসহায় মানুষ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে সাহায্য তুলে মেরে দেয়া, এ রকম হাজারো ফিরিস্তি দেয়া সম্ভব।


তাহলে ন্যায় বিচার কি শুধুই আদালতের বিষয়! না, এটি আপনার আমার সকলের বিষয়। নিজের মনুষ্যত্ব না থাকলে ন্যায় বিচার করা যায় না, সেটা হোক ব্যক্তি জীবনে, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে। সবার আগে নৈতিকতা জাগ্রত করতে হবে।

যদি ব্যক্তির মধ্যে নৈতিকতার জন্ম হয় তবেই, সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার দূর করা সম্ভব। অন্যকে দোষারোপের মাঝে কোন কৃতিত্ব নেই, নিজের দোষগুলো ধরে সংশোধন করে আগে নিজের প্রতি ন্যায় বিচার করতে হবে, তারপর পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র। আসুন আমরা সবাই মিলে নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করি।
লেখক ঃ সংগঠক  
asharprodip@yahoo.com
www.asharprodipblog.wordpress.com
০১৭৭৯-৩৫৯৯৮৪

ঐক্যে জয়, বিভেদে ক্ষয়

আতাউর রহমান মিটন :‘পলিটিক্স’ এর বাংলা আমরা রাজনীতি বলেই জানি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘বাংলায় পলিটিক্সের পরিবর্তে রাজনীতি শব্দ প্রচলিত হইয়া গেছে। কিন্তু রাজনীতি শব্দটি পুরাতন, পলিটিক্স আমাদের পক্ষে নূতন। আমাদের দেশে যখন রাজনীতি ছিল তখন ঠিক আধুনিক পলিটিক্স ছিল না।

 

যখন পূর্বকার রাজার সহিত এখনকার রাজার অনেক তফাৎ হইয়া গেছে তখন রাজনীতি হইতে রাজ্য শব্দটাই বাদ দেওয়া দরকার। অতএব রাজনীতি না বলিয়া রাষ্ট্রনীতি বলিলে কথাটা আরও পরিষ্কার হয় বটে। কারণ, রাষ্ট্রে রাজা থাকিতেও পারে, না থাকিতেও পারে। যেমন আমেরিকার সম্মিলিত রাষ্ট্রে রাজা নাই, সেখানে রাজনীতি নাই, রাষ্ট্রনীতি আছে। এই হিসাবে রাষ্ট্রনীতি শব্দ রাজনীতি শব্দের অপেক্ষা অধিকতর ব্যাপক।’


আমার মত সাধারণ মানুষের পক্ষে অবশ্য ‘রাষ্ট্রনীতি’ এবং ‘রাজনীতি’র মধ্যেকার এই তফাৎ বোঝা কঠিন। রাজনীতিতে আমরা প্রায়শঃই ‘পলিটিক্স’ শব্দটিকে ব্যঙ্গ করে ‘পলিট্রিক্স’ হিসেবে বলতে শুনি। বড় বড় নেতারা যখন বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ অথবা যখন দেখা যায় দিনের আলোয় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আর রাতের অন্ধকারে তাদের সাথে বিভিন্ন দেনা-পাওনা নিয়ে দেন দরবার করা হচ্ছে – তখন এ ধরনের অসংলগ্ন বা অসদাচরণগুলোকেই ‘পলিট্রিক্স’ হিসেবে গণ্য করা হয়।


রাজনীতি ধীরে ধীরে একটা দখলদারিত্বের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। মুখে আমরা যতই বলিনা কেন যে, ‘রাজনীতি মানুষের মুক্তির জন্য’ বাস্তবে রাজনীতি পরিণত হয়েছে ‘নিজের আখের গোছানোর উপায়’ হিসেবে। একটা সময় ছিল রাজনীতি করতেন শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, সাহিত্যিক প্রমুখ শিক্ষিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ। আর এখন কারা করছে? পাড়ার যে দুষ্টু ছেলেটা লেখাপড়া না করে গুন্ডামি করে বেড়াত সেই এখন বিরাট নেতা! লেখাপড়া বা জ্ঞান চর্চ্চার প্রয়োজন এই নেতার কাছে সামান্যই। নেতার যা দরকার তা হচ্ছে ‘টাকা’ ও ‘টাকার বিনিময়ে ক্ষমতা’।


 জন সম্পৃক্ততা, দেশপ্রেম, সৎকর্ম বা চিন্তাশীলতা আমাদের রাজনীতি থেকে উবে চলে যাচ্ছে ইতিহাসের পাতায়!
গত শুক্রবার ছিল কার্ল মার্কসের ২০০তম জন্মবার্ষিকী। মার্কসের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী, কমিউনিষ্ট ইশতেহারের ১৭০তম বার্ষিকী, মার্কসের ‘পুঁজি’ গ্রন্থের ১৫০ বছর পূর্তি এবং রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাঙলার পাঠশালা’ আয়োজিত এক আলোচনা সভা শুনতে গিয়েছিলাম। বিকাল ৩টায় শুরু হওয়া আলোচনা বিরতিহীনভাবে চলেছে রাত সোয়া দশটা পর্যন্ত। আমি সেই গুরু গম্ভীর আলোচনা পুরোপুরি না বুঝলেও অন্ততঃ এত রাত পর্যন্ত সেমিনার হতে দেখে বিস্মিত বোধ করেছি! আয়োজকরা অসাধ্য সাধন করেছে বটে!  বাঙলার পাঠশালার অদম্য কর্ণধার আহমেদ জাভেদ রনি ও তাঁর টিম এই অসামান্য কৃতিত্বের দাবীদার।

 

কার্ল মার্কস এর দর্শনকে সংক্ষেপে ‘মার্কসবাদ’ আর এই দর্শনে বিশ্বাসীদের ‘মার্কসবাদী’ বলা হয়ে থাকে। বিশেষ করে সমাজতন্ত্র বিশ্বাসীরা নিজেদের মার্কসবাদী পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করেন। যদিও মার্কসবাদের দাবীদারদের মধ্যে কতজন প্রকৃতই মার্কসের জীবন ও দর্শন ধারণ করেন তা নিয়ে বিরাট সংশয় রয়েছে। এই সকল অতি ভক্ত অনুসারীদের ব্যঙ্গ করতে গিয়ে মার্কস নিজেই এক সময় ঠাট্টা ছলে বলেছিলেন, “যতদূর জানি, আমি একজন মার্কসবাদী নই”। [মার্কস-এঙ্গেলস্ (১৯৭৫), পৃঃ ৩৯৩]


মার্কসবাদ নিয়ে আলোচনা করার দুঃসাহস আমার নেই। যতটুকু জানি ও বুঝি মার্কস ‘পুঁজিবাদের ধ্বংস অনিবার্য’ বলেছেন।  তিনি স্পষ্টতঃই এই ব্যবস্থার বিরোধি ছিলেন। তিনি শ্রেণীহীন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যহীন, স্বশাসিত, সকলের চাহিদা ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিপূরণে সক্ষম একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা সংক্ষেপে এই সমাজকে বলি ‘সাম্যবাদ’। সেদিন অধ্যাপক এম এম আকাশ তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, “বিমূর্ত স্বপ্ন হিসেবে সাম্যবাদের বর্ণনাটি খুবই চমৎকার কিন্তু তা বাস্তবে অর্জনের সম্ভাব্য মাত্রা, পথরেখা, ম্যাপ ইত্যাদি নিয়ে মার্কসের কোন বিস্তৃত ব্যাখ্যা নেই।


 নিজে বাস্তববাদী ছিলেন বলে তিনি সে চেষ্টা করেনও নি। পুঁজিবাদের ধ্বংস অনিবার্য একথা তারা বলে গেছেন কিন্তু দেশে দেশে বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট রূপটি কি হবে, বিশেষ করে পুঁজিবাদের পরিপূর্ণ বিকাশ এবং পরিণতিতে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর মডেলটিই কি সর্বত্র শিরোধার্য হবে না কি মাঝ পথেও কোথাও, কোথাও বিপ্লব আসতে পারে এ নিয়েও মার্কসের কোন একক (ইউনিক) বক্তব্য নেই। এও আমরা জানি যে, দ্বান্দি¦ক পদ্ধতি যেহেতু সর্বদাই বিপরীতের সম্ভাবনাকে ধারণ করে অগ্রসর হয় সেজন্য এটি চরিত্রগতভাবেই ‘উন্মুক্ত’ পদ্ধতি।

 

এখানেই সর্বদা অনিবার্যতা এবং সম্ভাবনা পরস্পর জড়াজড়ি করে অগ্রসর হয়। তাই মার্কসের ভবিষ্যৎ বাণীগুলিকে চূড়ান্ত না ভেবে আমাদেরকে ‘কনটেক্সচুয়ালী’ বা বাস্তব শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত আপেক্ষিক ও ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আর এখানেই নিহিত আছে নতুন নতুন পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের সৃজনশীল ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের অপার সম্ভাবনা।”

 
হালের বাংলাদেশে বহু মার্কসবাদী মনে করেন, মার্কসের দর্শন মৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সেদিন বললেন, “মতান্ধ মার্কসবাদীদের বিশ্বাস যতই দৃঢ় হোক, মার্কসবাদ মতাদর্শ হিসেবে এখন অকার্যকর।” তিনি একাধারে মনে করেন, ‘সমাজতন্ত্রের নামে দেশে দেশে যা চলছে তাতে সমাজতন্ত্রের প্রতি খুব কম লোকেরই এখন আগ্রহ ও আস্থা আছে।’ অপরদিকে তিনি একথাও বলেছেন, ‘কায়েমি স্বার্থবাদীরা গণতন্ত্রের নামে হুজুগ সৃষ্টি করে, কেবল ভোটাভুটি দিয়ে, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে, হীন স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে।


’ তাঁর মতে, ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার অভ্যন্তরে সকল কেন্দ্রে এখন কর্তৃত্বশীল আছে কায়েমী-স্বার্থবাদীরা। দুনিয়াব্যাপী জনসাধারণ ঘুমন্ত। কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে সারা দুনিয়ায় শ্রমিক-কৃষকেরা এখন অর্ধাহার-অনাহার থেকে মুক্ত, আর মধ্যবিত্তরাও আর্থিক দিক দিয়ে আগের তুলনায় ভাল আছে। উচ্চ, মধ্য, নি¤œ সকল শ্রেণীর মানুষই মানবিক গুণাবলী হারিয়ে চলেছে। উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধনী-গরীবের বৈষম্য বাড়ছে, সামাজিক অবিচার বাড়ছে, জুলুম-জবরদস্তি বাড়ছে, সামাজিক সংহতি কমছে, শিথিলতা বাড়ছে। গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখিত হচ্ছে নানা তত্ত্ব অবলম্বন করে যেগুলো উদ্ভাবিত ও প্রচারিত হচ্ছে সা¤্রাজ্যবাদী মহল থেকে।


 সেগুলোতে প্রাণশক্তির নিদারুণ অভাব। সৃষ্টিশীলতা দুর্লভ। দুনিয়াব্যাপী কায়েমী স্বার্থবাদীদের অভিপ্রায় অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার রূপ ও প্রকৃতিকে এমন করে ফেলা হয়েছে যে, এর ভেতর থেকে চলমান রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য এমন শিক্ষিত লোক তৈরী হচ্ছে যারা কায়েমী স্বার্থ সংরক্ষণে সম্পূর্ণ উপযোগী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের মধ্যে জিজ্ঞাসা নেই, জ্ঞানস্পৃহা নেই, প্রগতির প্রবণতা নেই।


সমাজে একদিকে বৈষম্য বাড়ছে। অন্যদিকে মার্কসবাদকে বলা হচ্ছে ‘অকার্যকর’। তাহলে মুক্তির উপায় কী? সেই প্রশ্নটা মাথায় রেখে মেহনতি মানুষকে অগ্রসর হতে হবে। মার্কসবাদের অন্যতম সূত্র হচ্ছে, ‘সামাজিক বাস্তবতাই সামাজিক চেতনাকে নির্ধারণ করে।’ এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সাধারণ মানুষ সর্বদাই চিন্তাশীল সক্রিয় মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং নিরন্তর।

 

ব্যক্তির সামাজিক চেতনার সঙ্গে তার উত্তরাধিকারের সম্পর্ক বিদ্যমান হলেও নিছক বল প্রয়োগ করে আধিপত্য বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। আধিপত্যকামী শক্তিগুলো রাষ্ট্র যন্ত্রকে ব্যবহার করে নানা কায়দায় সাধারণ মানুষদের উপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখে। সে কারণে সমাজ কাঠামোর সামগ্রিক পরিবর্তন করে একটি নতুন সমাজ গঠন করা অনিবার্য হয়ে ওঠে।


 প্রত্যাশিত সেই নতুন সমাজের জন্য বিপ্লবী চেতনা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। এটা ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে বা ‘ক্যু’ করে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে অর্জিত হবে না। এর জন্য বিভিন্ন সামাজিক শক্তি ও শ্রেণীগুলোর মধ্যে নেটওয়ার্ক বা আস্থাভাজন সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে। গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে চাইলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বতঃস্ফুর্ত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করতে হবে।

কাঙ্খিত নতুন সমাজ সম্পর্কে সকলের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে যাতে করে তারা এটাকে নতুন ধরনের আধিপত্যবাদী সমাজ হিসেবে গণ্য না করে। জনগণকে তার বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারাই নতুন সমাজের ন্যায্যতা ও অভিগম্যতা অনুধাবনের সুযোগ দিতে হবে। নতুন এই সমাজকে ‘সমাজতন্ত্র’ নামেই আখ্যায়িত করার কোন আবশ্যকতা আছে বলে আমার মনে হয় না। শোষণমুক্ত সমাজ গঠনই মূল কথা।

 

বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি কোন আদর্শিক সূত্রে পরিচালিত নয়। এখানে লুটেরা পুঁজিবাদ সক্রিয়। শ্রমজীবী জনগণের জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনও কোন দার্শনিক অবস্থান তৈরী হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি বিকাশমান কিন্তু এর ভিত্তি নড়বড়ে। আমাদের পুঁজিপতিরা কাজ করছে নয়াউপনিবেশবাদীদের স্বার্থে। দেশের রাজনীতি এরা দখল করে রেখেছে।

 

প্রগতিশীল চর্চ্চার গতি রোধ করতেই এখানে ধর্মীয় নানা ইস্যুকে উস্কে দিয়ে সামাজিক সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারতে এখন চলছে হিন্দুত্ববাদের জোয়ার। সেখানে তারা ২২% অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ‘ভোট প্রয়োজন নেই (ভোট নেহি মাংতা)’ – এমন কথা বলতেও দ্বিধা বোধ করছে না। উপমহাদেশীয় এই প্রবণতায় বাংলাদেশেও অন্য ধর্মাবলম্বীদের হেয় করার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক ধর্মপ্রিয়তা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাথে এর কোন মিল নেই। এদেশের বহু স্থানেই মসজিদ এবং মন্দির পাশাপাশি স্থাপিত আছে এবং শত শত বছর ধরে উভয়েই শান্তিতে-শ্রদ্ধায় নিজেদের কর্মসূচী পরিচালনা করছে। কিন্তু এখন সেখানে উগ্রতার উসকানি চলছে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এটা কায়েমী স্বার্থবাদী মহল করাচ্ছে।


অবস্থার দাসত্ব ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত হতে সহযোগিতা করতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদক শ্রেণীর মধ্যে শোষণহীন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার কোন বিকল্প নেই। ‘উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব’ বা উৎপাদক শ্রেণীর শ্রমের ফসলে মালিকের ভোগ-বিলাস বৃদ্ধির কারসাজি সম্পর্কে সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে হবে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠামুক্ত উন্নত জীবনের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার বৃদ্ধি ও জনগণের নৈতিক চেতনাকে মানবিকীকরণ ও মনুষ্যত্ব বিকাশের অনুকূলে প্রবাহিত করতে হবে।

 

শাসক শ্রেণী নিজে থেকে সেটা করবে এমন প্রত্যাশা করি না আর সে কারণেই মুক্তিকামী মেহনতি মানুষের ঐক্য সুদৃঢ় করতে হবে এবং কার্যকর রণকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক অবস্থানগুলো থেকে শোষকদের বিতাড়িত করা এবং সমাজের ভেতরে পরিবর্তনের সপক্ষে বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত রাখতে পারলেই শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয় অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১৫২৬৯৭৯

 

চিরভাস্বর এক বিজ্ঞানী সাধক

মো. শহীদ উল্লা খন্দকার : রাজনৈতিক বলয়ে থেকেও বিজ্ঞানী হিসাবে নিজের গবেষণা নিয়ে আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলেন যিনি, তিনি আমাদের প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ধাপ পরমাণু নিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো কাজটি তিনি করে গেছেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য এমন একজন বিজ্ঞানী অপরিহার্য ছিল। বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের এই স্বপ্নদ্রষ্টা আজ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।


আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই পরমাণু বিজ্ঞানী নানাভাবেই বাঙালি জাতির পরম আপনজনে পরিণত হয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত দেশে পরিণত করার এক স্বপ্ন ছিল তার। যা তিনি তার জীবন ও  কর্মে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের। এই মহান বিজ্ঞান সাধকের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৯ সালের ৯ই মে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।


আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই পরমাণু বিজ্ঞানী তার জীবদ্দশায় আন্তরিকতা, প্রতিভা ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে চারপাশের মানুষকে যেমন মুগ্ধ করেছেন, তেমনই ভালোবাসা ও দেশপ্রেম দিয়ে নিঃস্বার্থভাবে জাতির জন্য কাজ করে গেছেন। জাতির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার জন্য ড. ওয়াজেদ মিয়া সকলের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবেন এবং তার অবদানের জন্য মানুষ  তাকে চিরকাল স্মরণ করবে।


স্বপ্নবান এই বিজ্ঞানী বলেছিলেন, “একটা উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে সম্পদ অপ্রতুল সেখানে একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই জাতির জন্য সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারে।” কথায় নয়, তার কাজেও আমরা সেই প্রতিফলন দেখেছি, তার জীবনের সবগুলো কর্মময় বছরই তিনি নিবেদন করেছেন বিজ্ঞান এবং তার পেছনের মানুষগুলোকে মহিমান্বিত করার কাজে।


পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এই বিজ্ঞানী সম্পর্কে যতই জেনেছি- অবাক হয়েছি ততই। বারবার আমার মানসপটে তাঁর অবয়বটি দেখতে পেয়েছি এ রকম- তিনি যেন ক্লান্তিহীন, বিজ্ঞানকে সামাজিক উন্নয়নে আরও অর্থবহ করে তোলার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার নতুন নতুন সুযোগের সন্ধানে মত্ত। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে ছিল তার কাজের শেষদিন। ৩৬ বছরের কর্মস্থলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সে দিনটিতেও তার কর্মোদ্যম একটুও স্তিমিত হয়ে যায়নি। একটা মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি অবিচলভাবে প্রতিশ্রুত থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি।


১৯৪২ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্ম নেয়া এই বিজ্ঞানসাধক ছাত্রজীবনেও তুখোড় মেধাবী ছিলেন। মেধার কারণে তিনি একের পর এক সাফল্যের সঙ্গে সকল শিক্ষা বৈতরণী পার হন। যা সমসময়ে সহপাঠিদের কাছে তার আলাদা পরিচয় তৈরি করে দেয়। তার জীবনের দিকে দৃষ্টি নিপতিত করলে দেখা যায়, মেধাবী ছাত্র বা পরমাণুবিজ্ঞানী এর বাইরেও অনেকগুলো গুণবাচক শব্দ ধারণ করেছিলেন তিনি।

 যা আমাদের এক মুগ্ধতার আবেশে তাকে নিয়ে ভাবতে উজ্জীবিত করে। তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিভৃতচারী, নীতিবান, নিরহংকার, নির্ভীক, স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক, আদর্শবান, সৎ, সহজ-সরল, বিনয়ী, চরিত্রবান, যুক্তিবাদী, অজাতশত্রু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন আদর্শ মানুষ। এত গুণে গুণান্বিত মানুষ ক’জন আছেন এই ভূবনে।


ওয়াজেদ মিয়াকে প্রিয়জনরা ডাকতেন ‘সুধা মিয়া’ নামে। বাবা ছিলেন আব্দুল কাদের মিয়া, মা ময়জন্নেসা বিবি। রংপুরের পিছিয়ে পড়া জন্মগ্রাম ফতেহপুরেই বেড়ে ওঠেন তিনি। মেধাবী হিসাবে ছোটবেলাতেই শিক্ষকদের দৃষ্টি কাড়েন তিনি। ১৯৫৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।


 সে বছরই ভর্তি হন ঢাকা বিশববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। ছিলেন ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র। সে সময়ই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা; ফজলুল হক মুসলিম হলের ভিপিও নির্বাচিত হন তিনি ১৯৬১-৬২ শিক্ষা বছরে। তখনই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৬১ সালে স্নাতক, ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তিনি তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগ দেন। এরপর ’৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডারহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউক্লিয়ার এন্ড হাই এনার্জি পার্টিকেল ফিজিকস এ পিএইচডি করেন।


এই সাধক বিজ্ঞানের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে ছিলেন তা তার কর্মজীবনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা ছাড়াও ইতালির ট্রিয়েসটের  আন্তর্জাতিক পদার্থ  বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে একাধিকবার গবেষণা করেছেন। তিনি গবেষণা করেছেন ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশনেও।


 তার গবেষণা ও জ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লিস্থ ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা ট্র্যাজেডির পর গোটা পরিবারের হাল ধরেন ওয়াজেদ মিয়া। ’৮১ সাল পর্যন্ত নির্বাসিত জীবনে ভারতীয় পরমাণু শক্তি কমিশনের বৃত্তির টাকায় সংসার চালিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ চাকরি করেছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন চাকরি থেকে।


বিজ্ঞান সাধনায় নিবেদিত থাকলেও সামাজিক কর্মকান্ড থেকে একেবারেই সরে যাননি তিনি। তিনি ঢাকার রংপুর জেলা সমিতির আজীবন সদস্য এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দুইবছর মেয়াদকালের জন্য ওই সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এবং ঢাকাস্থ বৃহত্তর রংপুর কল্যাণ সমিতি, উত্তরবঙ্গ জনকল্যাণ সমিতি, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম, জাতীয় সমন্বিত উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদ এবং রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার মির্জাপুর বছিরউদ্দিন মহাবিদ্যালয়ের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ঢাকার বিক্রমপুর জগদীশ চন্দ্র বসু সোসাইটি তাকে ১৯৯৪ সালে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক এবং ম্যাবস ইন্টারন্যাশনাল, ঢাকা ১৯৯৭ সালে পদক প্রদান করে।


মেধাবী সন্তানরা দেশের সম্পদ। একটি দেশ এগিয়ে যাওয়ার মূলশক্তিই হচ্ছেন এই মেধাবীরা। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া এদেশের এমনই একজন মেধাবী বিজ্ঞানী। তিনি আমাদের গর্বের পরমাণুুবিজ্ঞানী। বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তার বিজ্ঞান সাধনার উৎকর্ষতার জন্য তিনি যুগের পর যুগ বাংলাদেশের ইতিহাসে নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন। যার অপরিসীম জ্ঞান ও আন্তরিকতায় আলোকিত হয়েছে আমাদের দেশ। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।


আজ বাস্তবায়নের পথে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। বলা যায়, এটা তার স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের এই পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূরণ হবে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। সফল হবে বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার আমরণ প্রচেষ্টা এবং সুফল ভোগ করবে সারা দেশের মানুষ।’ যথার্থই বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।


ড. ওয়াজেদ মিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে যারা চিনতেন, কাছ থেকে দেখেছেন তারা একবাক্যেই তার সততা ও মোহমুক্ততা নিয়ে প্রশংসায় মেতে ওঠেন। সহকর্মীদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন সৎ ও ন্যায়-নিষ্ঠাবান হওয়ার জন্য। তিনি নিজে ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও কোন সুযোগ-সুবিধা নেননি। কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। সর্বদা নিজস্ব বলয়ে থেকে নিজের যোগ্যতায় নিজ কর্মক্ষেত্রের পরিধিতে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে কর্মজীবন শেষ করেছেন।


ড. ওয়াজেদ মিয়া সাতটি পাঠ্যবই লিখেছিলেন, এরমধ্যে ছয়টিই ইতোমধ্যে প্রকাশিত। মৃত্যুর আগে সপ্তম বইটির সম্পাদনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। দেশের বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ড. ওয়াজেদ মিয়া মনে করতেন, সমাজে বিজ্ঞানীদের যথাযথ অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানীদের আগে নিজেদের কাজ করে যেতে হবে তারপরই কেবল জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা যেতে পারে। তিনি পান্ডিত্য ও প্রতিভার দ্বারা নিজস্ব একটি পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এজন্যই অন্য পরিচয়গুলো তার জন্য অলংকার। যেসব কথা তিনি প্রচার করতে চাননি, তার প্রয়োজনও বোধ করেননি। মৃত্যুর আগে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে দেশবাসি যতটা জানতেন, মৃত্যুর পর জেনেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি।
লেখক : সচিব,
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

 

রবীন্দ্রতীর্থ পতিসরে উচ্চশিক্ষার প্রসার

এম মতিউর রহমান মামুন: রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মদিবসে আজ প্রথম বারের মতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি আলহাজ্ব এড. আব্দুল হামিদ আসছেন রবিতীর্থ পতিসরে। বাংলাদেশে  রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত পতিসর- শিলাইদহ- শাহজাদপুর এই তিনটি স্থানের মধ্যে পতিসর ছিল কবির নিজস্ব। অথচ পতিসরই আছে উপেক্ষিত। মহামান্য রাষ্ট্রপতির আগমনের বার্তা পেয়ে এ অঞ্চলের গণমানুষ রবীন্দ্র গবেষক, সাংস্কৃতিমনা মানুষের নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন হয়তো এবার তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে।

 

তাদের চাওয়া পতিসরে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি প্রতিষ্ঠিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন জাতীয়করণ, পতিসরে হাসপাতাল স্থাপন, পতিসরে বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিত কৃষি কলেজ জাতীয়করণ ইত্যাদি। ১৮৯১ সালের ১৩ই জানুয়ারি পতিসরে পা রেখেই শিক্ষা বঞ্চিত, হত দরিদ্র মানুষের কথা ভেবে তাদের শিক্ষিত করার লক্ষে পতিসরে বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯০৫ সালে, পতিসর এম, ই স্কুল স্থাপন করে এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলেন। মাটির দেয়ালের টিন-টালির ছাউনিতে স্কুলটির যাত্রা।


 বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং হাতে কলমে শিক্ষাদান করেছিলেন। ১৯০৫ সালে ভারতে স্কুল কলেজের সংখ্যা হাতেগোনা। গ্রামাঞ্চলের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবাই হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদের কথা, পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু বই পত্র এনে শ্যালক নগেন্দ্রনাথের নামে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন পতিসরে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫) স্থাপন অর্থাৎ সমাজ সংস্করণ। ব্যাংক স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল কৃষি নির্ভরশীল অর্থনীতিতে কৃষককে স্বনির্ভর করে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে আধুনিক সমাজ গঠন করা।


 অর্থাৎ অর্থ-বিত্তের সঙ্গে শিক্ষার যোগ সূত্র বোধ করেই রবীন্দ্রনাথ পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। আজ থেকে শত বছর পূর্বে পল্লীগঠন, গ্রামোন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণ দান কর্মসুচির গোড়াপত্তন করেছেন কৃষি গুরু ও সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপন করে গরীব চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে দাসত্ব গোলামির জিঞ্জির থেকে কৃষককে মুক্ত করার যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তাতো তৎকালীন ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়। ‘১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করার পর কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, তাঁদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্প শক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিলনা।


 অবশ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর। ঠিক কত টাকা জমা হয়েছিল তা নিয়ে ও নানা জনের লেখায় ভিন্ন ভিন্ন অংকের হিসাব দেখা যায়’ (রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২য় পৃঃ৪৬২)। আধুনিক চাষাবাদ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, খামার ব্যবস্থাপনা, হস্ত ও কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, রেশম শিল্পের বিকাশ ঘটানো ও দারিদ্র বিমোচনের জন্য যে ঋণ কর্মসূচি বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের কালীগ্রামের গ্রামোন্নয়ন ও মহাজনকে এলাকা ছাড়ানো, তাই ঘটেছিল মহাজনরা এলাকা ছাড়লো কৃষক ও কৃষির উন্নতি হল। আর কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ব্যাংকে মূলধন বৃদ্ধি এ সব কর্মকান্ড ছিল রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী সমাজ ভাবনার পূর্বাপর লক্ষ্য। ১৯১৩ সালে নোবেল


প্রাপ্তির পর গরীব অসহায় হতদরিদ্র চাষিদের কথা বিবেচনা করে ১৯১৪ সালে ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংকে  আমানত জমা করা তো সেই স্বাক্ষরই বহন করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোন বিশেষ অঞ্চলের ফসলহানি ঘটলে খাজনা মওকুফ করে দেওয়া ছিলো রবীন্দ্রনাথের কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও ঋণদান কর্মসূচির প্রধান শর্ত।

 

ফসলহানিতে দুর্দশাগ্রস্ত প্রজার কাছ থেকে খাজনা আদায়ের বদলে ঘর থেকে টাকা দিয়ে প্রজাকে সাহায্য করা কি তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ নয়? শিলাইদহ-শাজাদপুর-পতিসর-পূর্ব বঙ্গের এই তিন এলাকার জমিদারি কর্মসূত্রে রবীন্দ্রনাথের যাতায়াত ও অবস্থানের কথা আমাদের জানা আছে কিন্তু জানা হয়নি কবির কর্মভূমি কিভাবে তাঁর মানুষ ভূমির গড়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। সেটা গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার ছিল।


রবীন্দ্রনাথের পরিব্যাপ্ত শিল্প মানস ও জীবন বেদ বুঝবার জন্য তাঁর জীবনের এই পর্বের গভির অনুধ্যান দরকার। এক্ষেত্রে শিলাইদহ শাজাদপুরের উপর গবেষক, বিশ্লেষক, রবীন্দ্র গবেষকদের গভির দৃষ্টিপাত ঘটলে ও পতিসর ছিল বরাবরই উপেক্ষিত। অথচ এই পতিসরই রবীন্দ্রনাথের পল্লী চিন্তা, শিক্ষা ভাবনা ও স্বদেশ ভাবনার আশ্চর্য সংহতি অর্জন করেছিল কিন্তু রবীন্দ্র গবেষণার অকরুণ পরিণতির ফলে আমরা পতিসরকে জানতে পারিনি।

 

দেশের সত্যিকারের রূপটি কবে যে পতিসরে এসে খুঁজে পেয়েছিলেন তাও আমাদের জানা হয়নি। এখনো আমাদের জানা হয়নি পতিসরে ঘটেছিল কবিসত্তা ও কর্মিসত্তার এক ভিন্নতর উদ্ভাসন, জমিদার রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেন শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ। অতএব সেদিক থেকে বিবেচনা করে পতিসরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করা যেতে পারে।  
লেখক : রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক
০১৭১৪-৯৪৩৫৬৭

আমাতে তোমার প্রকাশ পূর্ণ হোক

মাহফুজ সাদি :‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/ তাপস নিঃশ্বাস বায়ে/ মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক/ এসো এসো…’। বৈশাখকে এভাবেই স্বাগত জানিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৫৬ বছর আগে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের পঁচিশে বৈশাখ জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা এ কবি। জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে জন্ম নেন তিনি। এ মানুষটি জীবনজুড়ে তার সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা ভাষা, গান ও সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন বৈশ্বিক উচ্চতায়। তিনি তার লেখনী, কর্ম, জীবনদর্শন  

 

দিয়ে শুধু বাংলাকেই নয়, আলোকিত করেছিলেন সমগ্র বিশ্বকে। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনে তার অবাধ বিচরণ মহাকালের অবাক বিস্ময়। শিক্ষা, ধর্ম, রাজনীতি, দর্শন, মানবতা প্রভৃতি বিষয়ে তার চিন্তা গভীরে বিস্তৃত। বাঙালির জীবনে, বিশেষত বাঙালির চিন্তার নির্মাণ ইতিহাসে তিনি প্রবাদ পুরুষ। এত বছর পরও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং সমকালীন। ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে বাংলাকে ব্যাপক পরিচিত করেন। তিনি চির নতুনের কবি, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কবি।


রাজসিক কবিকে নন্দিত অকুণ্ঠিত অভিনন্দন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মানুষের। বন্ধুত্ব হয়েছে ডব্লিউবি ইয়েটসের সঙ্গে। আইনস্টাইনের সঙ্গে হয়েছিল বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর পাশাপাশি যোগাযোগ ছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবী রাসবিহারী বোসের সঙ্গেও। ‘মহাত্মা’ উপাধিটি গান্ধীকে তিনিই দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে তার গান ও কবিতা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।

 

রবীন্দ্রনাথ ছুঁয়ে যাননি বাঙালির এমন কোনো অনুষঙ্গ নেই। বাঙালিকে উদ্দেশ্য করে কবিগুরু বলেছেন, তুমি নিছক বাঙালি নও, তুমি বিশ্বচরাচরের অংশ। প্রাণীজগৎ, নিসর্গ, প্রকৃতিকে সকলের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রেমের মধ্যে বাঁচতে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধু। সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ। চরণপদ্মে মম চিত নিষ্পন্দি করো হে। নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে।


’  আজ থেকে শত বছরেরও বেশি আগে বাঙালি পাঠকদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের জিজ্ঞাসা ছিল- ‘আজি হতে শতর্বষ পরে / কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি / শত কৌতুহল ভরে / অথবা, আজি হতে শতবর্ষ পরে / এখন করিছো গান সে কোন্ নুতন কবি / তোমাদের ঘরে!’ কবির এ শঙ্কার জবাবে বলা যায়, শত বছর পরে এখন অনেক নতুন কবি এসেছেন, নব নব সৃষ্টিতে প্রতিনিয়ত স্ফীত হচ্ছে আমাদের সাহিত্য এবং সংগীতের ভূবন। তারপরেও আমাদের রবীন্দ্রনাথ মাত্র একজন।

 

কবির বসন্ত গান শতবছর পরেও ধ্বনিত হয় নবীন কবি আর পাঠকের বসন্ত দিনে। এখনো নবীনদের সৃষ্টির প্রেরণাও তিনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থে লেখেন, ‘মানুষের আলো জ্বালায় তার আত্মা, তখন ছোটো হয়ে যায় তার সঞ্চয়ের অহংকার? জ্ঞানে-প্রেমে-ভাবে বিশ্বের মধ্যে ব্যাপ্তি দ্বারাই সার্থক হয় সেই আত্মা? সেই যোগের বাধাতেই তার অপকর্ষ, জ্ঞানের যোগে বিকার ঘটায় মোহ, ভাবের যোগে অহংকার, কর্ম যোগে স্বার্থপরতা?’


 তিনি লেখেন, ‘ভৌতিক বিশ্বে সত্য আপন সর্বব্যাপক ঐক্য প্রমাণ করে, সেই ঐক্য-উপলব্ধিতে আনন্দিত হয় বৈজ্ঞানিক?’ এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাহলে তাঁর জীবনে এবং রচনার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার একটি বিশেষ সূত্র পাই? নাকি এক্ষেত্রে তাঁর চিন্তার ক্রমবিকাশ ঘটেছে? কবিগুরুর কবিতার ভাষাতেই আবারো বলা যায়, মহাবিশ্বজীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে/ নির্ভয়ে ছুটিতে হবে, সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা। / …. কে সে? জানি না কে? চিনি নাই তারে।/ শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি অন্ধকারে/ চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে,/ ঝড়ঝঞ্ঝা-বজ্রপাতে, জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে/ অন্তর প্রদীপ-খানি।/ কে সে, চিনি নাই তারে…।


 কবিগুরুর গান-কবিতা এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তির ক্ষেত্রে প্রভূত সাহস যোগায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শুধু নয়, চিরকালই কবির রচনাসমূহ প্রাণের সঞ্চার করে। আমাদের প্রতিটি সংগ্রামেই কবির চিরায়ত রচনাসমগ্র আজীবন স্মরণের শীর্ষতায় আবিষ্ট হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রেরণা যুগিয়েছিল তার অনেক গান।

 

তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’ এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ‘প্রার্থনা’ নামে একটি ছোট্ট লেখায় ‘আমাতে তোমার প্রকাশ পূর্ণ হোক’ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? অথচ বাংলায় এতো সুন্দর প্রার্থনা আর চোখে পড়েনি? মনে হয়, তাঁর এই ইচ্ছা পূর্ণ করেছিলেন ঈশ্বর? রবীন্দ্রনাথ বাংলার কবি, বাঙালির কবি হয়ে মৃত্যুহীন অনন্ত জীবনের সাক্ষর বয়ে যাবেন যুগ থেকে যুগান্তরে। পরিশেষে, ১৩৩৮ সালের ১১ই পৌষ কবিগুরুকে উদ্দেশ্য করে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পঠিত এক মানপত্র দিয়ে শেষ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই।


বাণীর দেউল আজি গগন স্পর্শ করিয়াছে। আত্মার নিগূঢ় রস ও শোভা, কল্যাণ ও ঐশ্বর্য তোমার সাহিত্যে পূর্ণ বিকশিত হইয়া বিশ্বকে মুগ্ধ করিয়াছে। তোমার সৃষ্টির সেই বিচিত্র ও অপরূপ আলোকে স্বকীয়-চিত্তের গভীর ও সত্য পরিচয়ে কৃত-কৃতার্থ হইয়াছি। হাত পাতিয়া জগতের কাছে আমরা নিয়াছি অনেক, কিন্তু তোমার হাত দিয়া দিয়াছিও অনেক। তোমার মধ্যে সুন্দরের পরম প্রকাশকে আজি নতশিরে বারংবার নমস্কার করি।
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কবি
০১৯২০-০৭৫১৯৯

নগর জীবন পানিবন্দি কেন

মীর আব্দুল আলীম : বৃষ্টি পানিতে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ডুবে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই  নগরজীবন অচল হয়ে পড়ে। জলজটের সাথে নগরীতে আছে যানজটও। এভাবে কি নগর জীবন চলে? কি বৈশাখ, কি আষাঢ়  জলাবদ্ধতায় ডুবে ঢাকা; আর চট্টগ্রাম নগরীও থাকে পানির তলায়। ভরসা কোথায়? আদৌ কি এই দুই নগরের জলাবদ্ধতা দুর হবে? ঢাকার দুই এবং চট্টগ্রামের এক সিটের নাগরিকদের সেবায় তিনজন বেশ জনপ্রিয় নগর পিতা পেয়েছে। নগর পিতারা জলাবদ্ধতা নিরসনে কি করছেন? পরিকল্পিত নগরায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না; ড্যাব বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না; নগরের খালগুলো দখলমুক্ত হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না।


 ক’য়েক মাস ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এসব ড্রেনগুলো পরিকল্পনা মাফিক হলে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা কিছুটা কমতে পারে। এদিকে রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত খাল আছে; অস্তিত্ব নেই। খালগুলো কোথায় আছে তাই জানে না নগরবাসী। দখল হয়ে গেছে অনেক খাল। এসব খাল নয়া নগর পিতাদের দখলমুক্ত করতে হবে। প্রশ্ন হলো রাজধানী ঢাকায় ড্যাব বাস্তবতায় হলে ভূমিদস্যুদের কি হবে? ১ টাকার পুকুর আর জমি কিনে ১শ’ টাকায় বেচার স্বপ্ন যে তাহলে তাদের ভেস্তে যাবে।

 

নগরের খাল গুলোতো রাঘববোয়ালদের দখলে আছে। এগুলো দখলমুক্ত করে এ সাধ্য কার? তাই যে যাই বলি, নিরাশার কথা এই যে, নগর জীবনের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ সহসাই লাঘব হবে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে, সক্রিয় হতে হবে, শক্তিশালী হতে হবে, সৎসাহস নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই নগরজীবনের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ লাঘব হবে।


ক’দিকে টানা বৃষ্টির ফলে পানি সরতে না পেরে জল-কাদায় একাকার হয়ে গেছে রাজধানী ঢাকা। আছে ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনাও। টানা বৃষ্টির ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতার। আর এতে করে বাসা-বাড়ি থেকে বের হয়েই ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। বিশেষ করে যারা সকালে  অফিসের জন্য বের হন, তারা পড়ছেন মহাবিপাকে। সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর অনেক রাস্তাই পানিতে তলিয়ে যায়। টানা বৃষ্টি, তার ওপর জলাবদ্ধতায় বিভিন্ন রাস্তায় সৃষ্টি হয়েছে অসহনীয় যানজটের।

 

রাজধানীর মৌচাক-মালিবাগ এলাকাসহ কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, বেইলি রোড, মগবাজার, রাজারবাগ এলাকা ছাড়াও অনেক রাস্তায় হাঁটু পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এছাড়া ফুটপাতেও পানি জমে গিয়েও মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বিঘিœত হচ্ছে। সকালে কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। এর মধ্যে নগরীর অনেক জায়গায় চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি আর ফ্লাইওভারের কাজ। বৃষ্টির পানিতে ওসব জায়গা কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলে আরো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। বৃষ্টির কাদা পানি আর বেহাল রাস্তাঘাট বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় নগরবাসীর দুর্ভোগের মাত্রা।


বর্ষাকাল চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরীর জনগোষ্ঠীর জন্যে এক মহা দুর্ভোগের কাল হিসেবেই আবির্ভূত হয়। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) নগরবাসীকে জলাবদ্ধতাজনিত দুঃসহ কষ্ট থেকে রেহাই দিতে এখনও কোনো আন্তরিক উদ্যোগ নেয়নি। উপরন্তু এসব সেবাদানকারী সংস্থার কিছু তৎপরতা জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ভোগ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গত মেয়র নির্বাচনে জনগণ বর্তমান মেয়র মঞ্জুকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিল। কিন্তু গত চার বছরে কিঞ্চিত সুফলও আসেনি।


 চউক চেয়ারম্যান চট্টগ্রামে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার কথা উচ্চকণ্ঠে বললেও নগরীর রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশার অবসান ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কি কি কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন তা স্পষ্ট নয়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মূলত চসিক ও চউকের ব্যর্থতার কারণেই বর্ষার প্রথম ভারী বর্ষণেই তলিয়ে গেছে বন্দরনগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান প্রধান সড়কসহ অলি-গলি কোমর ও হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, একটানা ভারিবর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।


 বৃষ্টিতে পানি জমে ডুবে গেছে নগরের প্রায় রাস্তাঘাট। প্রায় সব রাস্তায় হাঁটুপানি। কিছু কিছু এলাকা কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাসা বাড়ির নিচতলা ও দোকানে পানি ঢুকে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। এই পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন দায় এড়াতে পারে না। সিডিএ’র অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সিটি কর্পোরেশনের খালগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার না করা এবং নালা-নর্দমার ময়লা অপসারণে ব্যর্থতাই এই দুর্দশার প্রধান কারণ। নগরে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হওয়ার জন্য মূল খাল রয়েছে ১৬টি। কিন্তু নগরের প্রাথমিক ১৬টি খালের সব কটির অধিকাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেদখল হয়ে গেছে। এ ছাড়া এসব খাল সময়মতো সংস্কার ও খনন করা হয়নি।


 কিছু কিছু খালের মাটি তোলা হলেও তা রাখা হয়েছিল পাড়ে। পরে বৃষ্টির পানিতে ওই মাটি আবার খালে পড়ে। নগরীতে ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে এমনিতেই বহু নালা-নর্দমা খাল ভরাট হয়ে গেছে, তার উপর সংস্কার নেই পুরনো খাল ও নালার। পানি ধারণক্ষম বহু পুকুর ভরাট করে দালানকোঠা ও দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সরতে পারছে না। সহজে পানি সরে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় ভারী বৃষ্টিতে হঠাৎ এমন জনদুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে চার বছরে ব্যয় করেছে ১৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪১ কিলোমিটার নালা-নর্দমা থেকে মাটি উত্তোলন ও অপসারণ করা হয়। এ সময় নগরে নালা-নর্দমা নির্মাণ করা হয় ১২১ কিলোমিটার।


এতে ব্যয় হয় ২১ কোটি টাকা। এ ছাড়া নগরের বিভিন্ন খালে ২৯ কোটি টাকায় ৩২ কিলোমিটার প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া সাড়ে আট কোটি টাকায় বহদ্দারহাটের শুল্কবহর থেকে ডোম খাল পর্যন্ত সংযোগ খাল তৈরি করা হয়। ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের বহদ্দারহাট ও মহেশখাল নামে দুটি প্রকল্পের কাজ চলছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করা হলেও এর সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী।


জল নিষ্কাশনের পথগুলো উন্মুক্ত রাখলে এ জন-দুর্ভোগের সৃষ্টি হতো না। এ বিষয়ে ডিসিসি ও চসিকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আমরা মনে করি, এ দুই মহানগরে পানি নিষ্কাশনের নাজুক অবস্থার কারণেই এমনটি হয়েছে। পুকুর-জলাশয় নদী-নালা ভরাট ও বেদখল হয়ে যাওয়ার সাথে যোগ হয়েছে মহানগরের পয়ঃনিষ্কাশনের খাল দখলের প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রামের প্রধান খাল চাক্তাই খালের বিভিন্ন অংশ ভূমিগ্রাসীদের দখলে চলে যাওয়া এবং ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়া। তাছাড়া, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে তেমন বাধা না থাকায় পরিবেশ ধ্বংসকারী পলিব্যাগে সয়লাব হয়ে গেছে পুরো মহানগর।


পলিথিনগুলো নালা-নর্দমা ভরাট করে পানি নিষ্কাশনে বাধার সৃষ্টি করে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নালা-নর্দমা পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করেনি। এখনো তারা এ ব্যাপারে নির্লিপ্ত রয়েছে। তাদের চরম গাফিলতির কারণেই নগরের বিভিন্ন এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেও ডুবে যায়। এ সময় দুর্গত মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়। ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নগরে মারাত্মক জলাবদ্ধতার কারণে চরম গণদুর্ভোগের পরও কর্তাব্যক্তিদের চৈতন্যোদয় হয়নি কেন?


যতটুক দেখা যায়, ঢাকার চেয়ে চট্টগ্র্রামের দুর্ভাগ্য এখনও কিছু কম। চট্টগ্রামে এখনও কিছু খাল রয়েছে যেগুলো পুনঃখনন করলে হয়তো সেগুলো পুরনো চেহারায় ফিরে আসতে পারে। আর উন্নয়নবিদ-পরিকল্পনাবিদরা যদি দয়া করে ড্রেনেজের বিষয়টা ভাবেন তাহলে পরিস্থিতি রক্ষা পেলেও পেতে পারে। পত্র পত্রিকার প্রতিবেদন মোতাবেক জানা যাচ্ছে, এ শহরের উন্নয়নে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ৩৫টি প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও, প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিয়েই কোনো প্রকল্প নেই।

 

যদিও এর আগে প্রকল্পকেন্দ্রিকও অনেক অনিয়মের অভিযোগ লক্ষ্য করা গেছে যেখানে সময়ক্ষেপণ, অনিয়ম ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন হুমকির মুখে পড়েছে। আর এ ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতার মতো একটি ভয়াবহ সমস্যা নিয়ে কোনো প্রকল্পই না থাকা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, যে কোনো মূল্যেই হোক এ পরিস্থিতি নিরসন করতে হলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ২০১০ সালে জলাবদ্ধতা নিরসনে অঙ্গীকার করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন এম মনজুর আলম।


গত ৪ বছরে এ খাতে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা খরচ হলেও জলাবদ্ধতা নিরসন হয়নি। এ ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গড়িমসি রয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, তার যৌক্তিকতা অস¡ীকারের উপায় নেই। উন্নয়নের সঙ্গে জলাবদ্ধতার সম্পর্ক নির্ণয় খুব কঠিন নয়। কারণ এ উন্নয়ন হচ্ছে অপরিকলিত উন্নয়ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী উন্নয়ন। রাজধানী ঢাকা বহু আগেই এর শিকার। ঢাকার সব খাল ও ঝিল আমরা অনেক আগেই ভরে ফেলেছি। প্রভাবশালীরা যে যা পারে দখল করেছে। প্রাকৃতিক বা মুঘল আমলের খনন করা খাল ভরাটের পাশাপাশি পরিকল্পিত জলনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নেই।


 এখন এক পশলা বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট সয়লাব। ঢাকার পরম সম্পদ চারটি নদীও দখলে-দূষণে শেষ হওয়ার পথে। রাজধানী ঢাকাকে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িয়ে ফেলতে আমরা ‘ড্যাপ’ মানব না, পানি সরে যাওয়ার কোনো স¡াভাবিক পথ রাখব না, পানিকে ধারণ করার কোনো প্রাকৃতিক জলাশয়েরই অস্তিত্ব থাকবে না। ঢাকার পর এবার চট্টগ্রাম সংহার আমাদের। চট্টগ্রাম শহরে ১৬টি খাল বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কাজ করত। অধিকাংশই কুক্ষিগত হয়েছে ক্ষমতাবানদের। তাদের দাপটে অসহায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রায় তিরিশ বছর ধরে চাক্তাই খাল নিয়ে কত আহাজারি। খননের প্রকল্পও তো হল। শুধু কাজের কাজ হল না।

পৃথিবীর বহু দেশে নগরায়নের পরও নদী রক্ষা ও নিষ্কাশন সুব্যবস্থার নজির আছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না? এজন্য আমাদের সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা প্রভৃতি সংস্থারও দায়ভার আছে। তবে এসব সংস্থার কাজের মধ্যে সমন¡য়ের ব্যবস্থা নেই। ‘নগর সরকার’ বিষয়টি নিয়ে বহু বছর ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছে।


কিন্তু নগর সরকারে দেখা মিলছে কৈ? নগর সরকার গঠন করে সকল নগরের জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের একাধিপত্যের লালসার কাছে জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বপ্ন কি বাস্তবায়ন হবে? অবশ্যই হবে। এজন্য সকল অপশক্তির লাগাম টেনে ধরে ড্যাব বাস্তবায়ন করতে হবে, পরিকল্পিত নগরায়ন করতে হবে, নদী, খালগুলো দখলমুক্ত কতে হবে। তাহলেই নগরের জলাবদ্ধতা দুর করা সম্ভব হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
newsstore13@gmail.com  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

রেমিট্যান্সে মন্দা কোন অবস্থানে বাংলাদেশ

আব্দুল হাই রঞ্জু ::প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব যে অপরিসীম, নতুন করে যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মুলত বিদেশি আয়ের প্রথম স্থানটি পোশাক খাতের, আর পরের স্থানটি ধরে রেখেছে প্রবাসী রেমিট্যান্স। যার বদৌলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অনেক আগেই কল্পনার সীমাকে অতিক্রম করেছে।

 

ফলে পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বর্ণদ্বার পদ্মা সেতুর মতো সুবিশাল প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের দু:সাহসিকতা সরকার দেখিয়েছে। যে পদ্মা সেতুকে ঘিরে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ বাতিল, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির নানা খতিয়ান নিয়ে দেশজুড়েই যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত খোদ কানাডার আদালতে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির কোনো প্রমাণ মেলেনি। অবশ্য আমাদের দেশে দুর্নীতির মাত্রাটি কম বেশি প্রতিটি খাতেই এখনও প্রবল।


ফলে দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠলে যে কেউ তা সহসাই মেনে নেয়। স্বাধীনতা উত্তর ৪৫ বছরে এ দেশের অর্থনীতিতে যেমন বৈষ্যমের হার বেড়েছে পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতিও বেড়েছে, তেমনি চোখে পড়ার মত অনেক উন্নয়নও ঘটেছে, যা অস্বীকার করারও কোন জো নেই, যা সত্য। মানুষের আয় রোজগারও অনেক বেড়েছে। আবার ভূমিহীন, বা¯ুÍহীন মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে সমানতালে। এটাই স্বাভাবিক।


 কারণ বাতির নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনি চোখ ধাঁধানো জৌলুসের পাশাপাশি বিত্তশালী মানুষের সংখ্যাও বাড়ে। অর্থাৎ পুঁজিবাদি সমাজব্যবস্থায় শোষণের মাত্রাও বাড়ে, এটাই সত্য। যে কারণে নগর মহানগরে বস্তিবাসীর সংখ্যাও বেড়েছে। রাজধানী ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ীর শহরে রিকসা চালকের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক বেশি। এগুলোই একটি পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থার অর্থনৈতিক দৈন্যতার জ্বলন্ত প্রমাণ। যে শহরে গড়ে উঠেছে সুবিশাল অট্টালিকার পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সে হারে ক্রেতার সংখ্যা তেমন বাড়েনি। অর্থাৎ দিনে দিনে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

 

 মানুষ এখন প্রয়োজনের তাগিদে নিত্যপণ্য একান্তই যা না কিনলে নয়, তাই খরিদ করে। ফলে যে কোন দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটলে স্যার স্যার এখানে আসুন, এ ধরনের ডাক এখন অনেকটাই চিরচেনার মত অর্থাৎ সারি সারি শপিং মল, বিলাসবহুল দোকানপাট গড়ে উঠলেও সে অনুপাতে ক্রেতার সক্ষমতা বাড়েনি। এসবগুলোই একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য বিকাশের ফসল। যখন একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন গোটা দেশের অর্থনীতি গুটিকতক মানুষের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। সংগত কারণে একজন চিকিৎসক এখন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ কিম্বা ক্লিনিক তৈরি করে মানবতার স্লোগান তুলছে।


 দেখা যায়, ঐ চিকিৎসকের পুঁজির আধিপত্য এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে তিনি এখন ঐ ব্যবসার পাশাপাশি জনগণের নিত্যপণ্য যেমন-তেল, ডাল, আটা, সুজি, চিনি, চাল, সহ নানা পণ্যের কারখানা দিয়ে পণ্য বাজারজাত করছে। পাঠক, শুধুমাত্র বোঝার স্বার্থেই একজন চিকিৎসকের উদাহরণ টানলাম অর্থাৎ শুধু চিকিৎসকই নন, একজন বুনিয়াদি শিল্পপতি হিসেবে যিনি নিজেকে দাবি করেন, তিনিও দেশের গ্রোসারী ব্যবসার সুযোগটি পর্যন্ত গ্রহণ করছেন।

ফলে এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদেরকে তাদের ব্যবসার ডিলারশীপ নিয়ে পণ্য বিপণন করতে হচ্ছে। এ ভাবেই দেশের চিনি শিল্প, চাল কল শিল্প, পাট ও বস্ত্র শিল্প একে একে ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের নিত্যদিনের চাহিদার তালিকায় চিনি অন্যতম। স্বাধীনতা অর্জনের আগেও এ দেশে সরকারিভাবে চিনিকল শিল্প গড়ে উঠেছিল। কৃষিনির্ভর দেশে চাষীরা আখ চাষ করতো।

 

আজ কিন্তু সে সব শুধুই স্মৃতি। এখন আঁখ চাষী নেই বললেই চলে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ভংগুর জরাজীর্ণভাবে পড়ে থাকতে থাকতে মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে। সে স্থান দখলে নিয়েছে, দেশের হাতেগোনা ৭/৮টি বেসরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। সরকার যাদের মাধ্যমে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশে পরিশোধন করে বিপণন করছে। যারা মুনাফার নামে সুবিশাল ভোক্তার গলা কাটছে। মনে হয়, দেশটি গুটিকতক মানুষের স্বর্গ সুখের রাজ্যে পরিণত হয়েছে!


 অথচ দেশে সরকার আছে, যারা জনস্বার্থের কথা বলছে, কিন্তু জনস্বার্থ বিরোধী নানা কাজে তারা সর্বনিয়তই সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশীয়ভাবে দু’চারটি সরকারি চিনিকল চালু করলেও উৎপাদিত চিনির বাড়তি মুল্যের প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে শতশত কোটি টাকার চিনি অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে।

 

বেতন ভাতা না পেয়ে কর্মচারিরা মানবেতর জীবনযাপন করেছে। এরপরও সরকার অপরিশোধিত চিনি আমদানি বন্ধ করছে না। কারণ শ্রেণীস্বার্থ রক্ষাই ক্ষমতাসীন এই সব সরকারের প্রকৃত চেহারা। এ কারণেই একটি পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় যারাই ক্ষমতাসীন হবে, তারাই তাদের শ্রেণী স্বার্থে দেশ পরিচালনা করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রবাসী আয়ের ওপর লিখতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে অনেক কথাই লেখা হলো।


আমাদের দেশে জনসংখ্যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভৌগলিক অবস্থানের তুলনায় অনেক বেশি। সে তুলনায় সরকারি কিম্বা বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও ভাল না। ফলে শিক্ষিত আধা-শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। মোদ্দা কথা আমাদের দেশে বেকারত্ব একটি বড় মাপের অভিশাপ। অথচ এ দেশের কর্মক্ষম ছেলে, মেয়েরা কাজ করে বাঁচতে চায়। কিন্তু তাদের সে আকাংখা কোন ভাবেই পুরণ হচ্ছে না। উল্টো বিত্তশালীরা উপার্জিত অর্থ দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে দেদার পাঁচার করছে। একমাত্র ভরসা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রবাসী রেমিট্যান্স। সেখানেও চরম সংকট।


 রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাত্রাতিরিক্ত টাকা আদায়, বিদেশে লোক পাঠাবার নামে টাকা আত্মসাত কিম্বা অবৈধ পথে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে ছোট ডিঙ্গায় অথৈ সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধির ঘটনা ঘটছে, আবার ভাগ্যচক্রে কেউ স্বপ্নের দেশে পৌঁছিতে পারলেও মাসের পর মাস এমনকি বছর ধরেও অনেককে আত্মগোপন করে কাজ খুঁজতে হয়। অনেক সময় বিদেশের মাটিতে আটক হয়ে জেল জরিমানা পর্যন্ত গুনতে হয়।

 

এসবই যেন এ দেশের কর্মক্ষম মানুষের নিয়তি! যদিও সরকার জিটুজি পদ্ধতিতে বিদেশে লোক পাঠানোর উদ্যোগ নানাভাবে গ্রহণ করেছে। সেক্ষেত্রেও পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হয়নি। ফলে নানা আতংকে এখন বিদেশ গমনে অনেকের আগ্রহ আগের তুলনায় কমে গেছে। এরপরও বিদেশে এখনও লাখ লাখ কর্মি কাজ করে তাদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠায়। যে অর্থের বদৌলতে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে, সে কথা আগেই বলেছি। এখন পত্রিকান্তরে দেখা যাচ্ছে, হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে আসায় রেমিট্যান্সের পরিমাণও দিনে দিনে কমে আসছে।


যদিও রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমার এ প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং এ সংকট উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ^ ব্যাংকের বসন্তকালীন এক বৈঠকে হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নেমে গেছে। যা ২০১৫ সালে ছিল ৪৪ হাজার কোটি ডলার।  সংস্থাটি মনে করে, ভূ-মধ্যসাগরীয় দেশগুলো ও রুশ ফেডারেশনে তেলের দরপতন ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ইউরোপে দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে মরু অঞ্চলের দেশগুলোরও প্রবাসী আয়ও অনেক কমেছে।


 বিশেষ করে শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহিতা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় কমেছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে উদ্ব্যেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যতদ্রুত সম্ভব হুন্ডির কারণে কেন এবং কিভাবে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমছে, তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি প্রতিনিধি দল মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সরেজমিনে তদন্তে যাচ্ছে।

 

আমরাও মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োচিত। কারণ দেশের মায়া মমতা, আর আপনজনদের ছেড়ে যারা প্রবাসে কষ্টের অর্থ হুন্ডিতে পাঠানোর কারণে দেশের ক্ষতি হচ্ছে, তা যেমন খতিয়ে দেখা জরুরি, তেমনি বিনা হয়রানিতে স্বল্প খরচে প্রবাসীরা যেন তাদের উপার্জিত অর্থ বৈধ পথে দেশে পাঠাতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিতে হবে।


 এ প্রসঙ্গে বিশ^ ব্যাংকের গ্লোবাল ইন্ডিকেটরস গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রিতা রামালহো বলেন, উন্নয়নশীল বিশে^ লাখ লাখ পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হচ্ছে প্রবাসী আয়। কোন কারণে সেই প্রবাসী আয় কমে গেলে, এসব পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এমনকি উপযুক্ত খাবার অভাবে পুুষ্টি সমস্যাও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চলতি ২০১৭ সালে গোটা বিশে^ প্রবাসী আয় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।


উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, আমাদের দেশের কর্মক্ষম সবল হাতের সংখ্যা পাহাড় সমান। যাদের শ্রম, মেধা, আন্তরিকতায় আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সরকারকে এখন বিদেশে লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে, তেমনি প্রবাসীদের কষ্টের অর্থ যেন বৈধ পথে দেশে আনা যায়, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

 

স্মরণে রাখতে হবে, রফতানির আয়ের বড় খাত পোশাক শিল্পের পরের স্থানটি প্রবাসী আয়েই ধরে রেখেছে। সেই আয়কে নিস্কন্টকভাবে দেশে আনার ক্ষেত্রে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে হয়ত ভবিষ্যতে হুন্ডি এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আগ্রাসন বন্ধ করা সম্ভব হবে। আর তা নিশ্চিত করতে পারলে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারা কমার বদলে বৃদ্ধি পাবে, এটাই নির্মোহ সত্য।  
  লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

হিজরির অষ্টম মাস শা’বান

অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ: ইসলামি ক্যালেন্ডারের অষ্টম মাস শা’বান। শা’বান অর্থ প্রকাশ হওয়া, বিদির্ণ হওয়া, ফেটে পড়া, ছড়াইয়া পড়া ইত্যাদি। শায়েখ শাখাবী বলেন আরবরা এ মাসে লুট-তরাজের জন্য বাড়ি হতে বের হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়ে পড়তো বলে উক্ত নামে অভিহিত করা হয়েছে। রজব মাসের সম্মানার্থে লুট-তরাজ, মারামারি, যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রেখে শা’বানা মাসে ওইগুলো আবার শুরু করতো। আমাদের সমাজে শা’বান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতকে শবে বরাত হিসাবে উদয়াপন করা।

 

পরের দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। ঐ রাতে মসজিদে শবে বরাতের ফজিলত বয়ান করা হয়। মিলাদ ও দোয়া করে তাবারক খেয়ে অনুষ্ঠান পালন করা হয়। অনেকেই ওই রাতে বিভিন্ন কবরস্থান জিয়ারত করেন। শহর বন্দরের দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। ২/৪ জন সারারাত মসজিদে অবস্থান করে সালাত ও জিকির এবং দোয়ার মাধ্যমে ইবাদতে মগ্ন থেকে ফজর পড়ে বাড়িতে চলে যান। কেউ কেউ ১৩, ১৪, ১৫ই শা’বান সিয়াম পালন করেন। আবার অনেকেই শবে বরাতের আগের দিন ও পরের দিন সিয়াম পালন করেন।


 সাধারণ লোক মনে করেন যে আজ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন বা রাত। আজ আর অন্য কোন কাজকর্ম না করে শুধু ইবাদত বন্দেগী করে কাটাই। এর বদলে অন্তত আগামী এক বছর ভাল থাকব ভাল খাব ভালভাবে চলতে পারবো। সারা বছর ভাল থাকার জন্য মাত্র এক রাত শবে-বরাত কখনই ছাড়া যাবে না। যেকোন মূল্যে শবে-বরাত পালন করতেই হবে। আসুন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এ মাসে কীভাবে শবে-বরাত পালন করতেন? ছাহাবাগণ শবে বরাতে কী করতেন? এগুলো জেনে নেই এবং সেই মোতাবেক আমল করি তাহলে শুধু এক বছর নয়, সারা জীবন ইহকাল-পরকাল ভাল থাকার আশা করা যায়। (১) হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, ছাহাবাগণ শা’বান মাসে ২টি কাজ করতেন।

 

এক নম্বর কুরআনের প্রতিবেশী মনোযোগ দিতেন। অর্থাৎ বেশী বেশী কুরআন অধ্যায়ন করতেন। দুই নম্বর সম্পদের যাকাত হিসাব করে গরিব মিসকিনদের দিতেন, যেন তারা শা’বান মাসে রমজানের সিয়াম পালনের শক্তি অর্জন করতে পারে। (২) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এ মাসে অধিক সিয়াম পালন করতেন এবং সাহাবাদের সিয়াম পালনে উৎসাহ দিতেন। শুধু ২/৩ দিন নয় শা’বান মাসের অধিকাংশ দিন তিনি সিয়াম পালন করতেন।

 

এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন এ মাসে রাব্বুল আলামিনের কাছে মানুষের আমল উঠান হয়। আর আমি ভালবাসি যে, আমার আমল সিয়াম অবস্থায় ওঠান হোক। (নাসাঈ, হাদীসটি হাসান পর্যায়ের)। উপরোক্ত হাদীসগুলির ভিত্তিতে আমরা জানলাম যে, এ মাসে আমাদের কাজ হলো বেশি বেশি সিয়াম পালন এবং বেশি বেশি কুরআন অধ্যায়ন। যা ছিল আল্লাহর নবীর কাজ এবং সাহাবাদের কাজ। আমাদের সমাজে এ মাসে এই দুটি কাজ করার লোক সংখ্যা নিতান্তই কম।

 

 কারণ সুন্নাতের আমলের গুরুত্ব আমাদের সমাজে কম। বরং সমাজে কী চালু আছে সেটা পালন করা নিয়ে সবাই ব্যস্ত। সুন্নাত বাদ দিয়ে শুধু শবে-বরাত পালনে কতটুকু মঙ্গল মহান আল্লাহই ভাল জানেন। হাদীসে এ মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতকে “লাইলাতু নিস্ফি শা’বান” বা “মধ্য শা’বানের রাত” বলা হয়েছে। “লাইলাতুল বারাআত” পরিভাষাটি সাহাবা-তাবিয়ীদের যুগে প্রচলিত ছিল না। পরবতিতে “মধ্য শা’বানের রাত” এর আরবি “লাইলাতু নিস্ফি শা’বান” নামটি (যা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পবিত্র জবানে উচ্চারিত) পরিবর্তন করে সহজভাবে “শবে-বরাত” রাখা হয়েছে। সবাই শবে-বরাত চিনে কিন্তু “লাইলাতু নিস্ফি শা’বান ভুলে গেছেন। আমাদের দেশের রিকসাওয়ালা যেমন টিটি কলেজ বললে ভাল চিনে, কিন্তু শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় বললে কেউ চিনেনা।

 

 মুসলমানদের অবস্থা প্রায় এরকম হতে যাচ্ছে। শা’বান মাসের ১৪ই দিবাগত রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেক ক্ষমা করেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ হাদীসের আলোকে এবং হাসান হাদীসের আলোকে আমাদেরকে আমল করতে হবে। সহীহ বা হাসান হাদীসের আমলসহ দুর্বল হাদীসেরও আমল করা যায়। শবে-বরাতের দিক-নির্দেশনা মূলক ২টি হাদীস পাঠকের জন্য উপস্থাপন করলাম। আশা করি এত দিনের চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন ঘটবে। সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। ১নং হাদীসঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন “আল্লাহ তায়ালা মধ্য শা’বানের রাতে (অর্থাৎ শবে-বরাতের রাতে) তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, মুশরিক এবং বিদ্বেষ পোষণ কারী ব্যতিত সকলকে ক্ষমা করেন”।


(ইবনুমাজাহ) ৮জন সাহাবীর সূত্রে বিভিন্ন সনদে বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে এ হাদীসটি বর্ণিত। হাদীস বিজ্ঞানীদের মতে শবে বরাতের ফযিলত বিষয়ে যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে সবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদীস এটি। এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, শবে-বরাতের ফযীলত অনেক বেশি। তবে শর্ত হলো শিরক ও বিদ্বেষমুক্ত হতে হবে। এ দুটি পাপ থেকে মুক্ত হতে পারলে শবে-বরাতের রাতের অছিলায় সকল গুনাহ মাফ পাওয়া যাবে। আর যদি শিরক ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত না হয়ে সারাজীবন শবে-বরাত পালন করা হয় তাতেও কোন লাভ হবে না।


 কারণ শর্ত পুরণ হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা শবে-বরাত উপলক্ষে অনেক কিছু করি, কিন্তু সহীহ হাদীস থেকে বর্ণিত এ দুটি শর্ত পালন করার বা পুরনের চেষ্টা করার খুব কম মানুষই আছি। এদুটি পাপের বৈশিষ্ট হলো মহান আল্লাহর সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হওয়া। ২নং হাদীসঃ বুখারী, মুসলিম সহ অন্যান্য ইমাম কর্তৃক সংকলিত সহীহ হাদীসে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন “প্রতিরাতে রাতের প্রথম তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলে আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে বলেন, আমিই রাজা ধিরাজ, আমিই রাজা ধিরাজ। আমাকে ডাকার কেউ আছ কি? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। আমার কাছে চাওয়ার কেউ আছ কি? আমি তাকে প্রদান করবো। আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কেউ আছ কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো।


 প্রভাতের উন্মেষ হওয়া পর্যন্ত এ্রভাবে তিনি বলেন।” তাহলে আমরা জানলাম, মুমিনের জন্য জীবনের প্রতি রাতই শবেবরাত। কাজেই মুমিনের কর্তব্য হলো শবে-বরাতের আবেগ নিয়ে প্রতিরাত এক তৃতীয়াংশের পর ২/৪ রাকাত এ আমল করা যায়। আমাদের সমাজে উক্ত ২টি হাদীসের বেশী হয় না। কারণ হাদীস ২টি কষ্টকর মনে হয়। অপর দিকে আলী (রাঃ) সূত্রে ১টি হাদীস আমাদের সমাজে ব্যাপক পরিচিত। হাদীসটি ইবনু মাজাহ কিতাবে বর্ণিত। অর্থ হলো শবে বরাতে রাতে দ ায়মান থাক এবং দিনে রোজা রাখ। কেননা ঐ রাতে আল্লাহ পৃথীবির আকাশে নেমে এসে বলেন, কে আছ ক্ষমা চাও? ক্ষমা করে দিব।


 কে আছ রিযিক চাও? রিযিক দিব। কে আছ বিপদগ্রস্থ? বিপদ দুর করে দিব। এভাবে সুবহে সাদেক পর্যন্ত বলেন। হাদীসটি শবেবরাত পালনের ফযিলত বর্ণনা করে। সকলের কাছে সহজ মনে হয়। বছরে একরাত নামাজ পড়া ১ দিন রোজা রাখা তেমন কঠিন নয়। ইমাম তিরমিজি হাদীসটিকে হাসান ও গরীব বলেছেন। এই হাদীস বর্ণনাকারী ইবনু আবী সাবরাহ। একমাত্র বর্ণনাকারী। ইমাম বুখারী, ইমাম আহমাদ সহ অনেক মুহাদ্দিস তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু জনগণের কাছে এই হাদীস বেশী গ্রহণ যোগ্য। কারণ সারা বছর কিছু না করেও শুধু শবে বরাতের এক রাতের এবাদতেই সব পাওয়া যাচ্ছে।


সবকাজ বাদ দিয়ে এশার নামাজের সময় মসজিদে গেলাম, ইমাম সাহেবের বয়ান শুনলাম মিলাদ পড়লাম, দুয়া দরুদ পড়ে মোনাজাত করলাম । সবমিলে ২/৩ ঘন্টা সময় ব্যয় হলো। এত সহজ পন্থা আর কোথাও নেই। কিন্তু নবীর সুন্নাত হলো এ মাসের প্রথম থেকেই বেশি বেশি রোজা রাখা। আর সাহাবাদের আরও ২টি বেশি কাজ হলো কুরআনের প্রতি বেশী মনোযোগী হওয়া এবং যাকাত সম্ভব হলে দিয়ে দেয়া। রাসুল (সাঃ) ও সাহাবাদের কাজ আর আমাদের কাজ তুলনা করুন। লক্ষ্য করুন আমরা কার অনুসরণ করছি। আল্লাহ আমাদেক সুমতি দিন। আমীন।
লেখক ঃ খতিব, উপশহর
জামে মসজিদ, বগুড়া
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

সমাজ পরিবর্তনে পাঠাগার আন্দোলন

আবদুর রাজ্জাক রাজু: গ্রন্থাগার বা পাঠাগার হলো জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা-সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম বড় মাধ্যম। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রচলিত শিক্ষার মূল কেন্দ্রভূমি হলেও গ্রন্থাগারবিহীন শিক্ষাকেন্দ্র আসলে পরিপূর্ণ আদর্শিক শিক্ষা স্থল নয়। মুক্ত জ্ঞান অনুশীলন ও বুদ্ধিবৃত্তির স্বত:স্ফুর্ত চর্চার উত্তম স্থান হচ্ছে গ্রন্থাগার। প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার উৎকর্ষ ও প্রসারে পাঠাগারের কোন বিকল্প হতে পারে না।

 

 যদিও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন জ্ঞান-বিদ্যা চর্চার নানামূখী ডিজিটাল পদ্ধতি আবিষ্কার ও ইলেকট্রনিক পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে; তথাপি তা গ্রন্থাগারের বিকল্পরূপে অদ্যাবধি স্বীকৃতি পায়নি। ইতোমধ্যেই ই-পাবলিকেশন বা বই-পুস্তকের ইলেট্রনিক ভার্সন চালু হয়েছে বটে- তবে তা জনপ্রিয় হতে দীর্ঘ সময় নেবে এবং সমাজের সর্বস্তরে চালু হওয়াটাও আরো সুদীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। এ ব্যবস্থা শিক্ষাঙ্গনেও এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি তেমনটা।

 

বর্তমান প্রজন্মের শিশু ও তরুণেরা ঝুঁকে যাচ্ছে ইন্টারনেট ভিত্তিক শিক্ষা-বিনোদনের দিকে। ফলে তারা পাঠ্যবহির্ভূত বই-পুস্তক পড়ার আর্কষণ ক্রমশঃ হারিয়ে ফেলছে। এতে ইতিবাচক প্রতিচ্ছবির পাশাপাশি নেতিবাচক প্রতিফলনও সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। শিক্ষার্থীরা শুধু গাইড-নোট বড় জোর সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে।

 

 সিলেবাস সর্বস্ব পড়ালেখাই যেন আবশ্যিক শিক্ষণীয় বলে ধরে নিয়েছে। এরও মূলে আছে গোল্ডেন প্লাস বা তদুর্ধ গ্রেড লাভের মাধ্যমে বৈষয়িক মওকা হাসিলের দুর্দম নেশা। তাই আগেকার দিনে হাইস্কুল জীবনেই আমরা যে পাঠ্য বইয়ের বাইরে নানা রকম গল্প-উপন্যাস এবং কবিতার বই স্কুল লাইব্রেরী থেকে ইস্যু করে নিয়ে পড়তাম, এখন তেমনটি দেখা যায় না। প্রসঙ্গক্রমে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রেফারেন্স স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেন “সিলেবাসের পাঠ্য বই আসলে অপাঠ্য; এর বাইরের যে উন্মুক্ত ও জ্ঞানসমৃদ্ধ বই-পুস্তক সেগুলোই প্রকৃতপক্ষে পাঠ্য বই।


” অথচ এ যুগের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার উক্ত মর্মার্থ থেকে অনেক দুরে সরে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্পন্ন লাইব্রেরী দেখা যায় না, যদিও বা অস্তিত্ব থেকে থাকে তার ব্যবহার ও সম্প্রসারণ চোখে পড়ে না। ফিরে যাই আবারো আমাদের যুগের কথায়। তখন আমরা মাধ্যমিকে সাহিত্য জগতের প্রখ্যাত লেখকদের বিখ্যাত বইগুলো বেছে বেছে প্রতিযোগিতামূলকভাবে পড়তাম। আর তা নিয়ে পরবর্তীতে গর্ব ও তৃপ্তির উচ্ছ্বাস থাকতো সহপাঠী বন্ধুদের সাথে প্রাসঙ্গিক সংলাপে বা আড্ডায়।

 

আমরা সবাই জানি- বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও সৈয়দ মুজতবা আলীসহ দিকপাল সাহিত্যিকদের বই পড়া ও গ্রন্থাগার সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ-নিবন্ধ ইত্যাদি লেখা রয়েছে যাতে গ্রন্থাগারের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য তুলে ধরা হয়েছে। জনৈক মনীষী “লাইব্রেরী মনের হাসপাতাল” বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা দেহ বা শরীরের রোগ হলে হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে থাকি। অনুরূপ মনের অসুস্থতা, বন্ধ্যাত্ব ও কুপমন্ডুকতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আমরা লাইব্রেরীতে গিয়ে বই পড়তে পারি।

 

 এতে করে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণার সংকীর্ণতা হ্রাস পেয়ে ক্রমশ: সভ্যতা ও শুদ্ধাচারের দিকে অগ্রসর হতে সহায়ক হতে পারে। দূর করতে পারে গোঁড়ামী ও কুসংস্কারের মত কুরুচির মানসিকতা। এক কথায় মনের দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যাধি বা রোগ আরোগ্যের জন্য পাঠাগার চিকিৎসালয়ের কাজ করে থাকে। ঘুচাতে পারে মনের বা অন্তরের অন্ধত্ব। অন্য একটি প্রবাদ হলো “বই ছাড়া একটি ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো।” তাহলে বাস্তবে আমাদের গৃহগুলির কী দুর্দশা বা দুরাবস্থা তা অনুধাবন করা কঠিন নয়।   


এ ক্ষেত্রে কেবলি পাঠাগার এমনকি পারিবারিক পাঠাগার সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। “সুশিক্ষিত মানুষ মাত্রই স্বশিক্ষিত”- লেখকের এ কথার গূঢ় অর্থ গতানুগতিক শিক্ষার গন্ডি ছাড়া বৃহৎ পরিসরে মানুষ যা পড়ে বা শিখে সেটাকে ইংগিত করা হয়েছে।

 

আর এটা সম্ভব শুধু গ্রন্থাগার চর্চার ভেতর দিয়ে- স্বশিক্ষা সেভাবেই অর্জিত হতে পারে। অথচ পাঠাগার আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া গেলে তা আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতিকে তথা দেশের সার্বিক অগ্রযাত্রাকে আরো সমৃদ্ধ ও বেগবান করতো। বিধায়, সে কথা সর্বতোভাবেই যথার্থ সত্য যে, পাঠাগার স্থাপনকে একটা সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে বিশেষ করে ইদানিংকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে।

 
সাম্প্রতিক কালে দেশে একুশে বই মেলার  প্রচলন ঘটেছে যা নানা কারণে আশাব্যঞ্জক বটে। কিন্তু এটা রাজধানী ঢাকাতে বেশি কেন্দ্রীভূত, অন্য দু’চারটি শহরে-গঞ্জে হলেও তা হাতে গোনা। অবশ্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এবং গ্রামাঞ্চলে এর আয়োজন এখনো তেমনটা দেখা যায় না। যদি আমরা গ্রামগুলোতে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারি- সাথে সাথে বই মেলার পার্বন করাও সহজ হবে।


আধুনিক যুগে পাঠাগার শুধু বই পড়ায় সীমিত না রেখে এটাকে সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখার চর্চা ও বিকাশে যুক্ত করা হয়েছে। এতে আরো যোগ হয়েছে রুচিশীল ও নান্দনিক বিনোদনের নানা পর্ব। এমনকি এর বহুমাত্রিকতা কোথাওবা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবসেবামূলক কাজের সাথেও।


বিশেষত: আমরা যদি মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অনৈতিকতা, অশান্তি,  ও অস্থিতিশীলতা রুখে দিতে চাই, তবে তরুণ প্রজন্মকে পাঠাগারমূখী করতে হবে। তাদেরকে আমাদের দেশীয় নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য সাহিত্য-কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে মেল বন্ধন ঘটাবার সুযোগ করে দেয়া অতীব প্রয়োজন।

 

তরুণ, নবীন, প্রবীণ নির্বিশেষে সবারই মাথা ও কল্পনা যেন লাইব্রেরী অভিমুখী হয় সেই পরিবেশ তৈরী করাটা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অধুনা জরুরি কর্তব্য বলে মনে করি। এ প্রসঙ্গে এবারে আরেকজন মহান ব্যক্তির প্রবাদ স্মরণ করবো তা হলো হেনরি ওয়ার্ড এঁর প্রবাদ – “সম্পদ কোন সভ্যতা আনতে পারে না- কিন্তু সভ্যতা সম্পদ আনতে পারে”। বর্তমানের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা মর্মান্তিকভাবে প্রমাণিত সত্য।


 এ দেশে অর্থ-স্বার্থ বিত্ত-বিভব গড়ে তোলার কি যে অদম্য নেশায় পেয়ে বসেছে প্রায় সবাইকে তা সহজেই  লক্ষ্যণীয়। পক্ষান্তরে এই স্বার্থ-সম্পদের মোহে আর লোভে দুর্নীতির মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা সবারই জানা। মোট কথা, সম্পদ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ইদানিং ক্রমশ: অসভ্যতার শীর্ষে ঠেলে দিচ্ছে সমাজ ব্যবস্থাকে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হল -নির্মল ও নিষ্কলুষ জ্ঞান আহরণ। সহজ কথায় সুস্থ ও সুশীল সদগুণবিশিষ্ট জীবন চর্চার উদ্দেশ্যে হৃদয়-অন্তর আলোকিত ও আলোড়িত করার উপযোগী বই পড়াশুনা ও নীতি আদর্শের অনুশীলন করা।  


এদেশে আজো প্রায় অর্ধেক মানুষ প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার সংস্পর্শের বাইরে; তাদের পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জন আর হয়তো সম্ভব নয়। অতএব গ্রামে-গ্রামে পাড়ায়-মহল্লায় পাঠাগার স্থাপন করে আমরা এই  ব্যাপক নিরক্ষর কিংবা স্বাক্ষর জ্ঞানের মানুষকে সচেতন করতে উদার ও মুক্ত পাঠ্যাভ্যাসের প্রতি আগ্রহী করে শিক্ষার ছায়াতলে আনতে পারি।

 

ইসলামে জ্ঞানার্জনকে ফরজ বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনুল করীমেরও প্রথম বাণী হলো “পড় তোমার প্রভুর নামে”..। সেই জ্ঞান শিক্ষার অবারিত ¯্রােতস্বিনী বা হিমশৈল হলো পাঠাগার। আসুন, আমরা সবাই পাঠাগার আন্দোলনকে “হ্যাঁ” বলি এবং সুস্থ-সুন্দর ও সভ্য সমাজ গঠনে মূল্যবান ভূমিকা রাখি।

 
সরকার দেশের নানামুখী উন্নয়নে ও গণকল্যাণে বেশুমার অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছে – এটা প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে দেশের সর্বত্র পাঠাগার প্রতিষ্ঠায় সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মনস্ক নাগরিক জীবন তৈরীতে পাঠাগার বিশাল অবদান রাখতে পারে।

 

সমাজের শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন-অগ্রগতিতে পাঠাগার রাখতে পারে বিরাট কার্যকর ভূমিকা। এভাবে সমগ্র জাতির আরো এগিয়ে যাবার গতি ত্বরান্বিত হবে। আর স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের এটাই উপায়।


বই পুস্তক অধ্যায়ন শুধু জ্ঞানার্জনই নয়। এটা ইবাদততুল্য নেক আমলও বটে। প্রবাদে আরো বলা আছে “একটি বই একটি উত্তম বন্ধু”। বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না।

 

বই প্রিয়জনকে দেয়ার জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে বিবেচিত। বই পড়া মানুষকে পরিবর্তন করতে পারে, বদলে দিতে পারে তার মনন ও দর্শন। তাকে মহৎ, মানবিক, নীতিনিষ্ঠ, আদর্শিক, দেশপ্রেমী ও উচ্চ-মাপের মানুষে উপনীত করতে বই পড়ার প্রভাব অনস্বীকার্য। বেপথ ও বিভ্রান্ত হওয়া থেকে বিশেষ করে আজকের নতুন প্রজন্মকে দূরে রাখতে বই হতে পারে বড় রক্ষা কবচ।

 

 আমাদের সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় এতো বেশি ব্যাপক হতো না যদি লোকেরা বই পড়ার অভ্যাস পরিত্যাগ না করতো। অধিকাংশই আটপৌড়ে শিক্ষা সমাপ্তÍ করে যে কোন পেশা-কর্মে প্রবেশের পর আর বই এর নিকট ফিরেনি, বইয়ের সংশ্রব, সংযোগ ও সান্নিধ্য চলমান রাখেনি, তাই মনে-মানসে নানা দু:শীল, পচনশীল ও পতনমূখী অশুভ চিন্তা- ভাবনা ঠাঁই করে নিয়েছে। অবশেষে এটা বলা যায়, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও বই পড়া আন্দোলন আমাদের সমাজ পরিবর্তনে নি:সন্দেহে অনেকটা সহায়ক হতে পারে।  
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
paribartan.razu@gmail.com
০১৭১৬-১৮৭৩৯২

ভেতর থেকে জেগে না উঠলে পরিবর্তন কঠিন

আতাউর রহমান মিটন:পাহাড়ের ঢল ও অকাল বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীকে সরকারের পক্ষ থেকে সব রকমের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেছেন, ‘হাওরে বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে’। গত রোববার ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীদের ত্রাণ সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যে সুনামগঞ্জের শাল্লায় ছুটে গিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

 

হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের দুর্দশা লাঘবে এনজিওরা যেন ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ না দেয় সেই নির্দেশনাও তিনি দিয়েছেন। কিছুটা দেরীতে হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর জন্য যে সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন এবং তাদের দুঃখ লাঘবে আশ্বাস দিয়েছেন সেজন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তবে শুভ উদ্যোগ দ্রুততম সময়ে নেয়া হলে তা আরও ফলপ্রসু হয়। আশাকরি সংশ্লিষ্টরা সেটা মনে রাখবেন।


হাওরের সংকটকে কেবল বাঁধ ভেঙে যাওয়া বা নতুন করে বাঁধ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না। বরং সেখানে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া বা ভরাট করে ফেলা, নদীগুলোকে ড্রেজিং করে নাব্যতা বৃদ্ধি করা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, বাড়িঘর উন্নত করাসহ বিবিধ বিষয়ে একটা সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 

হাওর আমাদের ভূ-প্রকৃতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। আমরা কৃত্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে এই ভূ-প্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনলে দীর্ঘমেয়াদে তা আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত করবে সেই বিবেচনাটাও রাখতে হবে। অতি উৎসাহী উন্নয়ন প্রয়াসীরা কথায় কথায় জলাধার ভরাট করে সেখানে অন্য কিছু করার উপর অধিক গুরুত্ব দেন যা আমাদের জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি এবং জীব-বৈচিত্র্যকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা খন্ডিত চিন্তার ভিত্তিতে হওয়াটা কাম্য নয়। সরকারকে সমন্বিত বা হলিষ্টিকভাবে চিন্তা করতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে, পপুলার ভোট নিজের বাক্সে ভরার কৌশল হিসেবে ‘যা খুশী’ গোছের প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প এমন হওয়া উচিত নয়, যে উন্নয়নের ভারে নিজেকেই চাপা পড়ে থাকতে হয়।

 

মানুষের জন্য উন্নয়ন প্রয়োজন কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস হলে মানুষ টিকে থাকতে পারবে না। হাওরের পানি বিষাক্ত হলে যেমন মাছের মড়ক লাগে, শত শত  টন মাছ মরে ভেসে যায়, ঠিক তেমনি পরিবেশ ধ্বংস করে উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হলে তা মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনে। পারমাণবিক বোমা বা গ্যাসীয় বোমার চাইতে তা কোন অংশে কম নয়।


 আমরা হয়তো এখন এই ক্ষতি বা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারছি না কারণ এটা খুব ধীরে ধীরে ঘটছে কিন্তু বিজ্ঞানীরা শংকিত যে এই ধ্বংসের ধারাকে রুখে দেয়া না হলে আগামীর বিশ্ব বাসযোগ্য থাকবে না। সে কারণেই গোটা পৃথিবীতে জলবায়ূ পরিবর্তন একটা বড় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী মানুষ জলবায়ূ পরিবর্তন রোধ বা পরিবেশ সুরক্ষায় সংবেদনশীল হয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে।


আমাদের দেশেও গ্রামে গ্রামে একদল বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ এখনও স্বেচ্ছায় গাছ লাগাচ্ছেন, কোথাও আবার স্বেচ্ছাসেবী তরুণেরা পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তুলছেন, কোথাও কোথাও নদী রক্ষায় সোচ্চার আন্দোলন হচ্ছে আবার কোথাও কোথাও ক্ষতিকর ‘ইউক্যালিপটাস’ গাছ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। এই ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে এবং ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দিতে হবে। জনপ্রতিনিধিদেরকে পরিবেশ সুরক্ষায় মুখ খুলতে হবে এবং নিজের সমর্থক ও ভোটারদেরকে পরিবেশবিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।


 একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান চাইলেই তাঁর ইউনিয়নের অধিভূক্ত রাস্তাগুলোতে ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো বন্ধ ঘোষণা করতে পারেন। স্থানীয় বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা ইচ্ছা করলেই নার্সারীগুলোতে ক্ষতিকর এই গাছের উৎপাদন বন্ধ করতে পারেন। একজন কৃষি কর্মকর্তা চাইলেই কৃষকদেরকে ফসলের ক্ষেতের পাশে এই গাছ লাগালে জমিতে যে রস কমে যায় এই সাধারণ কথাটা বোঝাতে পারেন।


পরিবেশ সুরক্ষার সাথে আমাদের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্ক রয়েছে সুশাসনেরও। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি বা অবহেলা সুশাসন সম্পর্কিত বিষয়। আর অকাল বৃষ্টিপাত একটি জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত প্রভাব। আবার জলবায়ূ পরিবর্তনের সাথেও সুশাসন সম্পর্কিত।

 

সরকার বা কোন গোষ্ঠী যখন বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা না করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প গ্রহণ করে তখন সেটাও সুশাসনের অন্তর্ভূক্ত বিষয়ে পরিণত হয়। সুশাসন নিশ্চিত করাটা নিশ্চয়ই একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং সরকারকেই এর জন্য দায় ও দায়িত্ব নিতে হবে। হাওরে বাঁধ নির্মাণে যদি অনিয়ম হয়ে থাকে তবে সেটা কে করেছে তা বিবেচনার চাইতে জনগণ সেটাকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের অবহেলা হিসেবেই গণ্য করবে। ব্যক্তি বা বিভাগ এখানে মুখ্য নয়। সুতরাং সরকারের কাছে আমরা সর্বক্ষেত্রে সুশাসনের নিশ্চয়তা চাই।


সরকারের কাছে দাবি জানানোর পাশাপাশি একথাটাও আমি সবিনয়ে বলতে চাই যে, নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। একটা সমাজ নিজের ভেতর থেকে জেগে না উঠলে, নিজেরা না বদলালে কিছুতেই বাইরের প্রচেষ্টায় বদলাবে না। বিষবৃক্ষে বিষই ফসল। শিকড়ে যদি বিষ থাকে, বৃক্ষ যতই নয়নাভিরাম হোক, ফলটা বিষাক্তই হয়। এটা বলতে কষ্ট লাগলেও দ্বিধা নেই যে বর্তমানের রাজনীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আদর্শ চর্চ্চার বদলে লুটপাট, দখল এবং অপচয়ের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছে।

 

মন্ত্রটা কী যে সরকারি দলে থাকলেই ধন-সম্পদের শনৈঃ শনৈঃ বিস্তৃতি ঘটে! সরকার কি দলের কর্মিদের উচ্চহারে বেতন দেন? সরকারের টাকা তো আসলে জনগণের কষ্ট করে দেয়া ট্যাক্সের টাকা। এই টাকাগুলো লুটপাট বা অপচয় করার অধিকার সংশ্লিষ্টরা পায় কী করে? আর আমরা জনগণই বা সবকিছু মেনে নিচ্ছি কেন? এর দায়টা কি আমাদেরও নয়?

 আমাদের সমাজ যদি নিজে থেকে ‘সৎ’ আর ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ মানুষ এর মধ্যে পার্থক্য করতে না শেখে, যদি সৎ মানুষের তুলনায় দুর্নীতিগ্রস্তরাই সমাজে মূল্যবান বিবেচিত হয় তাহলে নতুন প্রজন্ম সততার পথে, নিষ্ঠার পথে, দেশ প্রেমের পথে চলতে চাইবে কেন? একজন ভাল মানুষের মর্যাদা তো অনেক বড় বিষয়, যে দেশের সমাজ ভাল মানুষের মর্যাদা দিতে শিখবে না সেখানে সুমিষ্ট ফলের প্রত্যাশা করি কী করে! সুতরাং আমরা সরকারের কাছে সত্যিকারের মানুষ গড়ার প্রচেষ্টায় বরাদ্দ চাই।


আসছে জুন মাসেই মহান জাতীয় সংসদে আগামী অর্থ বছরের বাজেট পেশ করা হবে। এবারের বাজেটের আকার হবে প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা যা অর্থমন্ত্রীর নিজের ভাষায় ‘উচ্চাভিলাষী’। বাজেটের এই আকার বৃদ্ধি আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নির্দেশ করে। আমাদের জনগণের হাতে যে অনেক টাকা রয়েছে সরকার এর দ্বারা সেটাই বোঝাতে যাচ্ছেন।

 

তবে অনেক টাকা থাকলেই কোন দেশ যেমন উন্নত হয় না ঠিক তেমনি অনেক টাকার মালিক বনে গেলেই কোন পরিবার আদর্শ হয়ে ওঠে না। টাকা থাকলেই যদি উন্নত দেশ বলা যেত তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশকেই আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় উন্নত বলে গণ্য করতাম। বাজেট মূলতঃ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দলিল যা রাষ্ট্রের সাংবাৎসরিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এই দলিল দেখে জনগণ বুঝতে পারে সরকার কোন খাতে কতটাকা বরাদ্দ দিচ্ছে।


 ধরুন আমরা কৃষি খাতে অধিক বরাদ্দ চাইছি যাতে করে প্রান্তিক কৃষক এবং কৃষি সংশ্লিষ্ট সকলের অবস্থার উন্নয়নে যথাযথ প্রকল্প গ্রহণ করা যায়। এটা খাদ্য নিরাপত্তার সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু কৃষি বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেই কি প্রান্তিক কৃষক সে সুবিধা পায়? অথবা সামর্থ্যবান কৃষকের কাছে সরকারের বরাদ্দের অর্থ গেলে কি তা খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হয়? যদি না হয় তাহলে কৃষিতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবীর সাথে সাথে যে দাবীটি জোর দিয়ে তোলা উচিত তা হলো বাজেট ব্যবহারের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। দেশের সত্যিকারের কৃষক কারা এবং কতজন তা নিয়েও সংশয় আছে।


 সুবিধাভোগী রাজনৈতিক নেতা-কর্মিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের পেশা হিসেবে কাগজে-কলমে দেখান ‘কৃষি’ কিন্তু বাস্তবে তাদের পেশা অন্য কিছু। এই ছদ্মবেশি কৃষকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিঁপড়ার ন্যায় কৃষিখাতের সরকারি বরাদ্দের গুড় খেয়ে শেষ করে ফেলে।

 

সত্যিকারের গায়ের ঘাম ঝরানো, রোদে পিঠ পোড়ানো কৃষকের ঘরে কিছুই পৌঁছায় না। আর খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষির বিষয় নয়, এর সাথে অন্যান্য মন্ত্রণালয় যেমন প্রাণীসম্পদ, মৎস্য, খাদ্য, বাণিজ্য ইত্যাদি জড়িত তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সকলের সমন্বয়ে বাজেট বরাদ্দ এবং ব্যবহারের কৌশল নির্ধারণ করা উচিত। বিচ্ছিন্নভাবে, পরস্পর ছাড়া ছাড়া হয়ে আমরা খাদ্য নিরাপত্তায় কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারব না।


আগামীর বাংলাদেশকে যদি একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হয় তাহলে উন্নত মানুষ এবং উন্নততর ব্যবস্থাপনায় আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের বাজেট একদিকে যেমন বড় হচ্ছে তেমনি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালা ও পরিকল্পনার আলোকে সেখানে পরিবর্তন প্রতিফলিত হচ্ছে। গত কয়েক দশকে আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে।

 

জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমলেও শ্রমশক্তি জরিপ (২০১০) এর হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমমক্তির ৪৭.৫ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষি নির্ভর শিল্প এবং কৃষি পর্যটন খাতের দিকে নজর দিতে হবে।


কৃষিতে বর্তমান সরকারের অনেক সাফল্য রয়েছে। কিন্তু সরকারের নীতি ও কৌশলগুলোকে কেবল সার, বীজ ও সেচসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকি দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কৃষিখাতকে জনপ্রিয় করতে হবে। ছেলেমেয়েরা যেন কৃষি পেশায় থাকতে আগ্রহী হয়, তারা যেন কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করে এবং বাংলাদেশের কৃষিকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে আগ্রহী হয়, তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা সৃষ্টি করতে হবে। সরকার সম্প্রতি জৈব কৃষি নীতি অনুমোদন করেছে। বাংলাদেশ জৈব কৃষির জন্য উপযুক্ত স্থান।

 

 আমাদের এখানে অনেক মানুষ এবং তারা প্রকৃতিগতভাবেই মোটামুটি জৈব পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। এর সাথে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ যুক্ত করে জৈব কৃষির বিকাশের মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন দেশের মানুষের জন্য বিষমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারি, ঠিক তেমনি বিশ্বের বাজারে জৈব ফসল রপ্তানি করে আমরা অনেক বাড়তি টাকা আয় করতে পারি। জাপানে একটা অর্গানিক বা জৈব কলা ১০০-১৫০ টাকায় খুব সহজেই বিক্রি করা সম্ভব। আমাদের টমেটো, আলু, চাল ইত্যাদি জৈব উপায়ে চাষ করা হলে বর্তমানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব।  


সুতরাং মোদ্দা কথা হলো সম্ভাবনা আছে। আমরা যেন এই সম্ভাবনাকে ‘সম্ভব না’ ভেবে না বসি। আমাদের জনগণ সরকারের কাছে দয়া-দাক্ষিণ্য চায় না। তারা সরকারের কাছে সহায়ক নীতি ও সুশাসন চায়। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিন, আমাদের পরিশ্রমী মানুষেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই সোনার ফসল ফলিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে বসাবে।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১৫২৬৯৭৯

 

মে দিবসের উপাখ্যান

নার্গিস জামান   : ক্লান্ত শ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ,/মাটি ভিজে গেছে ঘামে।/জীবনের সব রাত্রিকে ওরা/ কিনেছে অল্প দামে।’আমার লেখা নয়, বড্ড বিষাদময় চারটি লাইন লিখে গিয়েছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবির এই চারটি লাইনে হাহাকার আর বেদনা লুকিয়ে আছে শ্রম শোষণকারীদের বিরুদ্ধে। আমরা জানি, হাজার বছর ধরে পুঁজিবাদ অর্থনীতিতে ‘শ্রম শোষণ আর শ্রমিক শাসন’ এই নীতি চলে আসছে।

 

বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত কোথায় নেই শোষণ! যুগে যুগে রাজা বাদশাহ, জমিদার সহ সকল পুঁজিবাদরাই শোষণ তো করেছেই উপরন্তু নড়ানামা হলে শাসন ও করেছে নির্মমভাবে। তবে আশার কথা যে, যুগে যুগে বঞ্চনা সইতে সইতে অবশেষে শ্রমিকরাও সোচ্চার হয়েছে। আর তারই প্রতিফলন এই মে দিবস। পহেলা মে’ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। তাই মে দিবস বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর সকল শ্রমিকের সংহতিকে তুলে ধরার লক্ষ্যেই মে দিবস পালিত হয়ে থাকে। শ্রমিকদের ঐতিহাসিক আত্মত্যাগকে মনে করে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা ।  

 

বহুদিন থেকে শোষিত বঞ্চিত শ্রমিকরা এককভাবে মনে মনে বিদ্রোহ করে আসছিল শোষক ও মালিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। কিন্তু এককভাবে কিছু বলা বা করা সম্ভব ছিল না। কথায় বলে জিততে চাইলে একসাথে সবাইকে নয়, এক এক করে ধর, আর ব্যবস্থা নাও। পুঁজিবাদরা এটা মাথায় রেখেছিল। যে কোন শ্রমিক একটু মাথাচাড়া দিলেই, তার ব্যবস্থা নেয়া হতো। ফলে মনে বিদ্রোহ জাগলেও সেটা প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না শ্রমিকদের একার পক্ষে। কিন্তু এই বিদ্রোহ বিপ্লবে রূপ নেবার অপেক্ষোয় ছিল যেন।

 

তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন রকম শ্রমিক সংগঠন, শ্রমিক সংঘ তৈরি হতে লাগলো এবং শ্রমিকরা নিজেদের প্রতি মালিক পক্ষের প্রহসন বুঝতে পেরেছিলো খুব ভালোভাবেই। এরই ফলশ্রুতিতে একদিন তারা শ্রমঘন্টা আন্দোলন শুরু করেছিলো ১৮৬০-এর দশকে। আমরা জানি, পুুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রম শোষণ সকল সময়েই বিদ্যমান। সে সময় শিল্পবিপ্লবের ফলে শ্রমিকের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যায়। শ্রমিকদের কারখানায় অনিরাপদ পরিবেশে ১২/১৬ ঘন্টা কাজ করতে হতো। লাগাতার এত সময় কাজ করার ফলে নানারকম দুর্ঘটনায় পড়ত তারা।

 

 পঙ্গু, ক্ষত আর মৃত্যু ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। শ্রমিকরা আর সহ্য করতে না পেরে শ্রমঘন্টা আন্দোলন শুরু করেছিলো। ৬০ এর দশকে শুরু হয়ে ১৮৮৬ সালে এটি চরম আকার ধারণ করে। ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস এন্ড লেবার ইউনিয়ন শিকাগো, জাতীয়ভাবে সম্মেলন করে সর্বপ্রথম ১৮৮৪ সালের ১লা মে। এতে তাদের কর্মঘন্টা কমিয়ে আট ঘন্টা করার জন্য দাবি জানানো হয় এবং এই দাবি পূরণের সময় বেঁধে দেন তারা ১৮৮৬ সালের ১লা মে’র মধ্যে। দীর্ঘ দু বছর সময় দেয়া হয় মালিক পক্ষকে।

 

তথাপি মালিক পক্ষ তাদের দাবি মেনে না নিলে ১৮৮৬ সালের ১লা মে এই দাবির স্বপক্ষে একত্রিত হয়ে শ্রমিকরা আবারো দাবি জানায় সোচ্চার কন্ঠে। এদিকে আমেরিকাতে তিন লাখের বেশি কর্মচারী কর্ম বিরতি দেয় একই দিনে, একই দাবিতে। চলতে থাকে বেগবান আন্দোলন। এ সময় এক কারখানায় কর্ম বিরতি দিয়ে সমাবেশ করতে থাকা শ্রমিকদের উপর মালিকপক্ষ গুলি চালালে নিহত হয় ছয় শ্রমিক। আন্দোলন বিস্ফোরণের রূপ ধারণ করে। অতঃপর  ৪ মে শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সামনে লক্ষাধিক শ্রমিক একত্রিত হয় শান্তিপূর্ণভাবে দাবির স্বপক্ষে।

 

 শ্রমিকদের সমাবেশকে বানচাল করতে কে বা কারা বোমা বর্ষণ করে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। এই কারণে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। নিহত হয় ৮/১০ শ্রমিক। অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ৮ ঘন্টার দাবী মেনে নেয় ঠিকই। কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয় নেতৃত্বদানকারী অনেক শ্রমিককে। পরবর্তীতে ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর প্রহসনমূলক বিচারের রায়ে নেতা আলবার্ট পারসন্স, অগাস্ট স্পাইস, জর্জ এঙ্গেল, এডলফ ফিশার সহ ছয় জনকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

 

একজন কারাবন্দী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। ফাঁসির মঞ্চে যাবার আগে অগাস্ট স্পাইস বলেন, “আজ আমাদের এই নিস্তব্ধতা, একদিন তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে। তারা হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নেন, তবুও কর্মঘন্টাকে কমিয়ে ৮ ঘন্টা করে লাখ লাখ শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর পরে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে ফরাসি বিপ্লবের এক বছর পূর্তিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে শিকাগো ট্রাজেডির দিনটিকে ১৮৯০ সাল থেকে উদযাপনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়।


পরের বছর দ্বিতীয় কংগ্রেসে তা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। ১৯০৪ সালে নেদারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মে মাসের পহেলা দিনে শোভাযাত্রার আয়োজন করতে সকল শ্রমিক সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এ আহ্বানের সাড়া হিসেবে বিশ্বের প্রায় সব শ্রমিক সংগঠন ১লা মে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেন। মহান মে দিবসে শ্রমিকরা আত্মত্যাগী সেই বীরদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে উদযাপিত হতে থাকে ১লা মে, বিশ্ব শ্রমিক দিবস।

 

এই দিনে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কন্ঠ গর্জে উঠে কাল মার্কসের কালজয়ী সংলাপে, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও।’ তথাপিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনও রয়ে গেছে শ্রমিক শোষণ, নির্যাতন। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থানে দলছুট বা দলহারা কর্মচারিরা বঞ্চিত ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু শ্রমিক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অক্সিজেন হিসেবে বেশ বড় অংশের অর্থ যোগান দিচ্ছে বিদেশে কর্মরত এবং দেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই নারী ও শিশু।


নারী ও শিশু শ্রমিকের অবস্থানঃ যৌন নিপীড়ন নারীদের জন্য গোঁদের উপর বিষফোঁড়া। নারী যদি গৃহকর্মির কিংবা গার্মেন্টসে এমনকি বিদেশেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, তাকে এই অপ্রকাশযোগ্য যৌন হয়রানি নীরবে সয়ে যেতে হয়। আবার এই গৃহশ্রমিকের ৮০ ভাগই মেয়ে শিশু, যাদের বয়স ৫-১৭ বৎসর। নারী গৃহশ্রমিক আবার শ্রমিকই নয়, তার শ্রমের কোন স্বীকৃতি নেই। তবে গৃহকর্মিদের সুরক্ষার জন্য সরকার গৃহকর্মি সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা ২০১০ এর খসড়া তৈরি করেছেন।

 

এই নীতিমালাকে স্বাগতম। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে কিছুটা সুবিধা পাবে এরা। তথাপিও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখনো নারী ও শিশু শ্রমিকদের মজুরি সমান নয়। এটা খুবই দুঃখজনক। এছাড়াও বিভিন্ন অটোমোবাইল, গ্যারেজ, মটরগাড়িতে নামমাত্র মূল্যে শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা হয়ে থাকে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু শ্রম অবশ্যই শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথে অন্যতম অন্তরায়।

 

 এতে করে লঙ্ঘিত হচ্ছে শিশু অধিকার। তবে বাংলাদেশ শিশু শ্রম বন্ধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার ২০০১ সালে শিশু শ্রম নির্মূল প্রতিরোধ (আইএলও) কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে। ইসলামে শ্রম নীতিঃ ইসলাম মতে, একজন শ্রমিক-কর্মচারির বেতন কমপক্ষে এ পরিমাণ হতে হবে, যা দ্বারা তার পরিবারের নিত্য নৈমিত্তিক মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হয়। একজন শ্রমিক কঠোর পরিশ্রমের পরেও যদি তার পাওনা বেতন বা মজুরি দ্বারা মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে এটা হবে তার প্রতি চরম অবিচার।

 

 মৌলিক প্রয়োজন বলতে ইসলাম বুঝায়, ‘হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সঃ) বলেছেন, এ বস্তুগুলোর মধ্যে প্রতিটিতে আদম সন্তানের সমান অধিকার রয়েছে। বাসস্থানের জন্য ঘর, লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য বস্ত্র এবং স্বাভাবিক খাদ্য ও পানীয়। (তিরমিযী) ইসলামী ফিকাহবিদগণ ছয়টি প্রয়োজন কে মানুষের মৌলিক চাহিদা বলে ঘোষণা করেছেন ঃ ১/খাদ্য, ২/বাসস্থান, ৩/বস্ত্র, ৪/চিকিৎসা, ৫/শিক্ষা, ৬/বিবাহ। শ্রমিকের মজুরি পরিশোধের তাগিদ দিয়ে নবী করিম (সঃ) যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। ‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার মজুরি আদায় করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ) পুঁজিবাদ সমাজে বিত্তবান ধনিক শ্রেণীই হচ্ছে মালিকগোষ্ঠী, আর অসহায় শ্রমিক সমাজ তাদের আশা আকাঙ্খা পূরণের হাতিয়ার।

 

বিত্তবান লোকেরা দরিদ্র লোকদের ‘শ্রম সম্পদকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শোষণ করে নিজেদের সৌভাগ্য রচনা করছে এবং শোষণের নতুন নতুন পদ্ধতি ও কৌশল আবিষ্কার করছে। একটি মেশিনকে চালানোর জন্য কতটা সময়ে ঠিক কতটুকু তেল প্রয়োজন, তা যেমন নির্ধারণ করা যায়, তদ্রুপ শ্রমজীবি মানুষটির যৌবনের শক্তিটুকু বা শ্রমটুকু নিতে, তার পেটের যতটুকু ক্ষুধা নিবারণ করা দরকার ঠিক ততটুকুই যেন মেপে দেয়া হচ্ছে, তার বেশি নয়। একজন শ্রমিক মৃত্যু পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেও ধনী হবার সুযোগ লাভ করতে পারেনা একারণেই।


এমনকি বৃদ্ধ বয়সে তাদের ভাতের সংস্থানের জন্যও কোনরূপ ভাতা’র ব্যবস্থা থাকেনা কর্মরত সেইসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে। অথচ যৌবনের সমস্তটুকু শ্রম ঢেলে দেয় সংশ্লিষ্ট মালিকদের কারখানায়। ১৮০০ শতাব্দী থেকে ২১০০ শতাব্দী চলছে, অথচ আজও কান পাতলে, চার বছর আগে রানা প্লাজায় চাপা পড়া সেই সব শ্রমিকের আর্তনাদ শুনতে পাবেন! কি করে বলবেন? রানা প্লাজায় চাপা পড়া ৪২% জীবিত, অথচ আহত, পঙ্গু হয়ে পড়ে থাকা সেইসব বেকারদের মুখের ওপরে যে, আমরা তোমাদের অধিকার নিশ্চিত করেছি! বলতে পারবেন?  
লেখক ঃ সহকারি শিক্ষক-প্রাবন্ধিক
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭

খাদ্য নিরাপত্তায় টেকসই খাদ্য মজুদের গুরুত্ব

আব্দুল হাই রঞ্জু  :এক সময়ের মঙ্গাখ্যাত কুড়িগ্রাম সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে ঘুরে দাাঁড়িয়েছে। যদিও এ জেলার চাষযোগ্য ফসলি জমির মালিকানা এখন প্রকৃত কৃষকের হাতে নেই। স্বাধীনতা অর্জনের পর অভাব-অনটন আর ক্ষুধার জ্বালায় চাষীরা তাদের চাষযোগ্য জমি পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। বলতে গেলে গুটিকতক মানুষের হাতে চাষের জমি কুক্ষিগত হয়েছে।

 

 এখন এ জেলার জমিহারা প্রকৃত চাষীরা বর্গা চাষী হিসেবে চাষের জমিতে আবাদ করে। মুলত ব্যয়বহুল সেচভিত্তিক বোরো চাষের জমি থেকে যে ফসল আসে, তা জমির মালিকদের ভাগ দিয়ে বাকীটা দিয়ে সারা বছরের খাদ্যের সংস্থান ও গৃহস্থালী খরচাদি পরিচালনা করে।

 

এরপরও এখন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে যে পরিমাণ চাষের জমির মালিকানা রয়েছে, তাদেরও খাদ্যের যোগান, ভরণ পোষণের জন্য বোরো চাষাবাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। চাষাবাদের সময় এলে চাষীরা স্বপ্ন দেখে, আশায় বুক বেধে নিরন্তর ফসলের মাঠে কাজ করে, সে স্বপ্ন যদি কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিম্বা পোকার আক্রমণে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন আর কৃষকের কষ্টের শেষ থাকে না।

 

নয়টি উপজেলার সমন্বয়ে কুড়িগ্রাম জেলা। যার মধ্যে রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা দু’টি উজান থেকে বেয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এমন এক সময় ছিল, যখন কুড়িগ্রাম শহর থেকে চাল আটা না গেলে ঐ অঞ্চলের মানুষের আহারের সংস্থান হত না। সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে সে সব এখন শুধুই স্মৃতি। উল্লেখিত দুই উপজেলায় বর্তমানে ধান, গম, রবি শস্যের যে চাষাবাদ হয়, তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর পার্শ্ববর্তী জেলা কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল জেলায় গড়ে ওঠা স্বয়ংক্রিয় চালকলগুলোর চাহিদার সিংহভাগ ধান পূরণ হয়ে থাকে।

 

 এ বছরও চাষীরা আশায় বুক বেঁধে ধানের চারা রোপণ করে গোটা জেলার চাষীরা পরিচর্যা করেছে। ধানের শীষ আসার আগ পর্যন্ত ক্ষেতের যে চেহারা ছিল, তা দেখে মনে হয়েছে, এ বছর বোরোর পাম্পার ফলন হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ধানের শীষ ঠিকই বের হয়েছে, কিন্তু সে শীষে কোন ধান নেই।

 

শুধুই চিটা, যা ঠেকাতে চাষীরা শেষ পর্যন্ত ওষুধ স্প্রে করেও কোন সুফল পায়নি। স্থানীয় কৃষি বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ জমিতে নেক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে ধানের শীষ বের হলেও ধান শূন্য মাঠ জুড়ে এখন শুধু কৃষকের আহাজারি। শুধু দু’একটি জমিতে এ রোগের আক্রমণ নয়, যে সব জমিতে চিকন ২৮ নম্বর ধানের চাষ হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ জমির ধানের শীষে কোন ধান নেই। এ এক চরম বিপর্যয়।


 এ বিপর্যয়কে চাষীরা কিভাবে মোকাবেলা করবে, যা নিয়ে চরম উৎকন্ঠা আর হতাশায় দিন কাটছে ভুক্তভোগী চাষীদের। মূলত মেরুদন্ড ভাঙ্গা এ দেশের চাষীরা ব্যাংক ঋণ, মহাজনি ঋণ কিম্বা এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করেই চাষাবাদ করে। যারা ফসল কাটার পর সে ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করে থাকে। এ বছর গোটা দেশের চাষীরা এসব ঋণ কিভাবে পরিশোধ করবে, তা নিয়ে উৎকন্ঠায় তাদের দিন কাটছে। শুধু ঋণের অর্থ পরিশোধের সমস্যাই যে প্রবল, তা নয়। কি খেয়ে বাঁচবে, এটাই এখন বড় প্রশ্ন। আবার গবাদি পশুকে কি খাওয়াবে, এ নিয়েও চিন্তার শেষ নেই।


 যদিও সরকার বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের ঋণের সুদ মওকুফ করার পাশাপাশি খাদ্য ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। পত্রিকা সুত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চলের মানুষ ও গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। আবার সরকারি সাহায্য খুবই অপ্রতুল।

 

মাথা প্রতি মাত্র আড়াই কেজি চাল ও ১১ টাকা করে ক্ষতিগ্রস্তরা সাহায্য পেয়েছেন। সাহায্যের এ পরিমাণই বলে দেয়, ক্ষতিগ্রস্তরা কি ধরনের সংকটে আছে। শুধু ঋণের সুদ মওকুফ নয় বরং ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের সঠিক তালিকা নিরূপণ করে কৃষিঋণ মওকুফের পর নুতন করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য চাষীদের পুনরায় ঋনের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কারণ কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের চাষীরা মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না।

 

মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ বেঁচে থাকতে হলে খাদ্যের কোন বিকল্প নেই। আর বোরো মৌসুমের চাষাবাদই এ দেশের মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন। সেই বোরো মৌসুমের ধান কাটার মুহূর্তে উজানের পানির ঢল, অতি বৃষ্টির পানি এবং অনাকাংখিত পোকার আক্রমনে যে ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তাকে মহাবিপর্যয় বলাই শ্রেয় হবে।

 আর এই মহাবিপর্যয়ের কারণে দেশের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নও জোরালোভাবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান দেশে সরকারি বেসরকারি উভয় পর্যায়েই ধান ও চালের মজুদ একেবারেই কমে এসেছে। আশা ছিল, ধানের বাম্পার ফলন হবে, চাষীরা তা ঘরে তুলতে পারলে একদিকে যেমন কৃষক পর্যায়ে ধানের মজুদ বাড়বে, অন্য দিকে সরকারের ঘোষিত অভ্যন্তরীণভাবে ৮ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ও ৭ মেট্রিক টন ধান সংগৃহীত হলে সরকারের আপদকালীন খাদ্য মজুদও গড়ে উঠবে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি পোকার আক্রমনে ফলন বিপর্যয়ের কারণে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ভাবে সরকারের খাদ্য শস্য সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হয়ত কঠিন হবে।

 

 শেষ পর্যন্ত সত্যিই যদি অভ্যন্তরীন ভাবে খাদ্য শস্য সংগ্রহের স্বাভাবিক গতি না থাকে, তাহলে আপদকালিন খাদ্য মজুদ গড়তে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজার হতে জি টু জি পদ্ধতি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করতে হতে পারে। সরকারকে যেমন উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, তেমনি ভোক্তার স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হয়। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে টালবাহানার বক্তৃতা বিবৃতি হয়ত দেওয়া সম্ভব, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সরকারের আপদকালীন মজুদ কাংখিত পর্যায়ে না থাকলে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করাও কঠিন হয়।

 

এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি  সংস্থার মতে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারিভাবে কমপক্ষে ৬০ দিনের জন্য খাদ্য মজুদ থাকা প্রয়োজন। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর এক দিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় ৪৬ হাজার মেট্টিক টন। সে হিসাবে আমাদের দেশের এক মাসের খাদ্যের প্রয়োজন হয় প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন। অর্থাৎ ৬০ দিনের খাদ্যের প্রয়োজন প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার টন।

 অথচ বর্তমানে আমাদের দেশে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ৬ লক্ষ মেট্রিক টনের অধিক হবে না। বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্য শস্য সরকারি গুদামে মজুদ আছে, তা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। এমতবস্থায় অভ্যন্তরীণভাবে খাদ্য শস্য লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সংগৃহিত না হলে খাদ্য নিরাপত্তা যে সংকটের মুখে পড়বে, তা আর বলার প্রয়োজন পড়ে না। আগেই বলেছি, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি স্পর্শকাতর। বর্তমানে মোটা চালের বাজার ক্ষেত্র বিশেষে ৩৮ টাকা হাতে ৪০ টাকা। আর সরকারের সংগৃহীত ঘোষিত দর প্রতি কেজি ৩৪ টাকা। এখানে স্পষ্ট, সাধারণ ভোক্তাদের এখন সরকারি দরের চেয়ে বাড়তি দরে চাল কিনে খেতে হচ্ছে।


যখন চালের বাজার উর্ধ্বগতি থাকে, তখন সরকার খোলা বাজারে স্বল্প মুল্যে চাল বিক্রি করে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে থাকে। কিন্তু এবার যখন সাধারণ ভোক্তাদের বাড়তি দামে চাল কিনে খেতে হয়েছে, তখন শুধুমাত্র খাদ্য মজুুদের অপ্রতুলতার দরুন খোলাবাজারে চাল বিক্রি করা খাদ্য বিভাগের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এর ওপর আবার চাল আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ থাকায় উন্নতমানের চিকন চাল ব্যতিত সাধারণ মানুষের খাদ্য উপযোগী চাল সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবেও আমদানি হয়নি। ফলে এক ধরনের খাদ্য সংকট বিরাজমান ছিল।

 ফলে গুটিকতক চাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান চড়া দামে চাল বিপণন করে মোটা অংকের টাকাও লাভ করেছে। আর করাটাই স্বাভাবিক। কারণ সরকারের খাদ্য গুদামে কাংখিত পরিমাণ খাদ্য শস্য মজুদ না থাকলে গুটিকতক ব্যবসায়ির হাতে ভোক্তারা জিম্মি থাকবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ কারণে ভোক্তার স্বার্থে সরকারিভাবে বেশি পরিমাণ খাদ্য শস্য মজুদ রাখা জরুরি।


শংকার বিষয় হচ্ছে, হাওর অঞ্চলে মহাবিপর্যয়ের পর এবার গোটা দেশে টানা ভারি বর্ষণের কারণে নিচু জমির আধা পাঁকা ধানও তলিয়ে গেছে। এক ধরনের অকাল বন্যার কবলে গোটা দেশের চাষীদের কপাল পুড়ছে। অবস্থা দৃষ্টে দেখা যায়, এ ধরনের অসময়ে ভারি বৃষ্টিপাত স্মরণকালের মধ্যে দেখা যায়নি। প্রাকৃতিক এ বিপর্যয় যে দেশের গোটা কৃষি অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে, যা অনেকটাই নিশ্চিত। প্রাকৃতিক এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাংখিত পরিমাণ খাদ্যশস্য সরকারি গুদামে মজুদের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন খাদ্য শস্য মজুদ সংকটের কারণে সুযোগ সন্ধানী অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি হতে না হয়।
  লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

 

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড – শিক্ষার মেরুদন্ড শিক্ষক

অলোক আচার্য্য : শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড । আর শিক্ষক শিক্ষার মেরুদন্ড । শিক্ষকদের আচার আচরণ, নীতি নৈতিকতার উপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রভাবিত হয়। আগেও তাই হয়েছে এখনও তাই হচ্ছে। ভবিষ্যতেও তাই হবে। কিন্তু নৈতিকতা বিরোধী কাজকর্মের জন্য শিক্ষক সমাজের উপর দুর্নাম আসছে।

 

আসলে যারা এ ধরনের নৈতিকতা বিরোধী কাজকর্ম করছেন তাদের শিক্ষকের অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। কারণ শিক্ষক হতে গেলে যে গুণাবলী অর্জন, যে মূল্যবোধ থাকা প্রয়োজন তা তাদের নেই। তাই পেশাগতভাবে সে শিক্ষকতা করলেও আসলে শিক্ষক হওয়ার কোন যোগ্যতাই তাদের নেই। তাই গুটিকতক লোভী ও নীতিহীন শিক্ষকের জন্য পুরো শিক্ষক সমাজ দায় নিতে পারে না।

 

 আজ শিক্ষার মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে তার দায় শিক্ষকরা এড়াতে পারে না। কারণ প্রশ্ন ফাঁস নামক একটি অসৎ কাজের পেছনে গুটিকতক শিক্ষক নামের কুলাঙ্গার জড়িয়ে রয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে ছাত্রছাত্রীদের ভাল রেজাল্ট হয়তো হচ্ছে কিন্তু মেধার বারোটা বেজে যাচ্ছে যা সে বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। এভাবে শুধু সে পিছিয়ে পড়ছে তা না দেশটাকেও পিছিয়ে দিচ্ছ্ েকারণ দেশে হাজার হাজার মেধাহীন জনশক্তির চেয়ে অল্পসংখ্যক মেধাবী থাকা উত্তম। তাই শিক্ষার মেরুদ  ভেঙে যারা দেশটার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করছে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।


শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দেশে সামগ্রিকভাবে একটা সমালোচনা চলছে। অনেক দিন আগে থেকেই মেধাবীদের মূল্যায়ন ও শিক্ষা পদ্ধতিতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। পাসের হার বৃদ্ধির সাথে সাথে কতটা মেধাবী শিক্ষার্থী বের করতে পারছি তা নিয়েই মূলত প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ভাল ফলাফল করা ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন মেধা পরীক্ষায় হতাশ করার মত ফলাফল করছে। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত বেকার বৃদ্ধি দেশের জন্য কোন সুখকর খবর না। কিন্তু সেটাই ঘটে চলেছে।


 কয়েক বছর আগে থেকেই অনেকেই দেশের মেধাবীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে আসছেন। মেধা মূল্যায়নের সাথে সাথে কয়েকটা বিষয় নিয়ে মূলত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির প্রয়োগে দক্ষতার অভাব, পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন, আনাচে কানাচে ব্যঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন এবং অধিকাংশ পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁস এসব এখন শিক্ষার সাথে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে।

 

কোন মতেই যেন এর থেকে বের হতে পারছি না। কথায় আছে সর্ষের ভেতরই যদি ভূত থাকে তাহলে ওঝা ঝাড়বে কোথায়। প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িয়ে আছে নীতিহীন শিক্ষক যাদের কাছে প্রশ্ন না, বিবেক না, মেধা না মূল লক্ষ্য হলো পকেট ভারী করা। জড়িয়ে আছে বড় বড় সাইনবোর্ডের আড়ালে শিক্ষা ও মেধা নিয়ে ব্যবসা করা কোচিং সেন্টার আর আছে যে কোন মূল্যে সন্তানের ভাল রেজাল্ট নিশ্চিত করা কিছু অভিভাবক ও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী নিজেই।


এইচএসসি পরিক্ষা চলছে। এখন পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। কিন্তু অভিভাবক মহল চিন্তিত এই ভেবে যে পরীক্ষাটা নির্বিঘেœ শেষ হবে তো। নাকি কোন এক পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাঁস হবে। অন্তত গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া পিএসসি বা জেএসসি পরীক্ষায় এটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ছাত্র-ছাত্রীরা সত্যি সত্যি পরীক্ষার প্রস্তুতি বাদ রেখে কোথায় প্রশ্ন পাওয়া যাচ্ছে তা খুঁজতে সময় নষ্ট করছে। শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয় অনেক অভিভাবকও সন্তানের ভাল ফলাফলের আশায় সেসব ফাঁস হওয়া প্রশ্নের খোঁজে ছুটেছেন। কর্তৃপক্ষ অবশ্য প্রশ্ন ফাঁস রোধ করার জন্য কম চেষ্টা করেনি। আগামী বছর থেকে স্থানীয়ভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন ছাপানোর বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।


নিজের পকেট ভারী করে দেশের মেধা বিসর্জন দিতে কার্পণ্য করছে না এসব অকাল কুষ্মান্ডরা। মেধা দিয়ে তো আর তাদের বাড়ি গাড়ি হবে না। রেজাল্টের পাশে গোল্ডেন জিপিএ থাকবে না। তাই টাকা দিয়েই কিনতে হবে। আর প্রশ্ন ফাঁসকারীরাও এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। টাকা তো তাদের চাই-ই। তাই তো প্রশ্ন বিক্রি করে টাকা কামাচ্ছে। বাজারে যারা ব্যবসা করে তাদেরও একটা নীতি আছে বলে মনে হয়। কিন্তু যারা আগেই প্রশ্ন বিক্রি করে তাদের নীতির বালাই আছে বলে মনে হয় না। দেশের মূল সম্পদ কোনটি প্রশ্ন করলে আমার এককথার উত্তর মেধাবীরা।


 একমাত্র মেধাবীরাই পারে দেশের বাকী সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতির মেধাকে ধ্বংস করে কোনদিন উন্নয়ন আশা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষভাগে এসে যখন পাকিস্তানীরা যখন দেখলো যে তাদের পরাজয় নিশ্চিত তখন বেছে বেছে তারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যাতে স্বাধীন হলেও যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারি।

 

যাদের হত্যা করা হয়েছে তারা যদি আজ বেঁচে থাকতো তাহলে আমরা আরো এগিয়ে যেতাম নিশ্চিত। আমার কাছে প্রশ্ন ফাঁস করে জাতির মেধাবী সন্তানদের মেধা বিকশিত হওয়ার আগেই মেরে ফেলাটাও সেরকম জঘন্য কোন অপরাধ বলে মনে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এটা তার থেকেও বড়। কারণ যাদের মেধা বিকাশের সুযোগ না দিয়ে চৌর্য বৃত্তি করে পরীক্ষার ফলাফল কেনা হলো তার মেধা আর কোনদিন বিকশিত না হবারই কথা। সে সারাজীবন এই অবস্থা থেকে বের হতে পারবে কি না সন্দেহ।
]

এই বাঙালিরাই বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বুকে মেধা, দক্ষতা আর গৌরবের সাক্ষর  রেখেছেন। সাহিত্য , সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, খেলাধূলা সর্বপরি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাঙালি এবং বাংলার কথা জ্বলজ্বল করছে। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া সহ কত নাম মেধার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে। এই নাম কিন্তু আপনা আপনি বা হালের রেওয়াজ প্রশ্ন ফাঁস করে সম্ভব হয়নি। প্রকৃত মেধা আর যোগ্যতার বলেই এসব করতে পেরেছি।

 

আমরা যখন পড়াশোনা করতাম তখন প্রশ্নপত্র ফাঁস তো দুরের কথা স্যারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাগিয়ে আনতেও ভয় পেতাম। ভয় পেতাম এই ভেবে যে পাছে অন্য ছাত্র বলে প্রশ্ন না আঁকিয়ে আনলে পরিক্ষায় মোটেই ভাল করতে পারতাম না। আর এখন অনেকেই ফোন দিয়ে জিগ্যেস করে ভাই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে না কি! এটা যেমন ছাত্রছাত্রীরা করে তেমনি এক শ্রেণির অভিভাবকরাও এবারে করেছে। সবাই চায় নিজের সন্তান যেন ভাল ফলাফল করে। কিন্তু নিজের বুদ্ধিবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে ভাল ফলাফল ভবিষ্যতের জন্য কতটা ভাল এটা বুঝতে পারা জরুরি।


অবশ্য যারা এই অশুভ প্রক্রিয়া চালায় তারা শুধু জেএসসি বা এসএসসি নয় বরং চাকরির পরীক্ষাগুলোতেও যে একই চেষ্টা অব্যাহত রাখে সে কথা বলাই বাহুল্য। একটি জাতির মেধাকে ধ্বংস করে দেবার এর চেয়ে আর ভালো উপায় আর কি হতে পারে? জানিনা এর পেছনে কারা জড়িত আর কেনই বা আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা এমন পঙ্গু করে দিতে উঠে পড়ে লেগেছি।

 

 আমার কষ্ট লাগে এইসব ছেলেমেয়েদের জন্য। এতদিন চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। আমরা ধরেই নেই কোথাও না কোথাও প্রশ্ন ফাঁস হবেই। তবে সেখান থেকে স্কুল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হবে এ আমি স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারিনা। আমাদের জাতিকে এভাবে মেধাশূন্য করার পেছনে যারা কাজ করে যাচ্ছে তাদের খুব  দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ছাত্রছাত্রী থাকবে , শিক্ষক থাকবে , শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে তবে লেখাপড়া করার বা করানোর খুব বেশি দরকার হবে না। রাত জেগে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ারওা দরকার হবে না। আর সেটা হলে আমরাই বড় বিপদে পড়ব।


প্রশ্ন ফাঁস কেন হয়? যদি এই প্রশ্ন থেকে সমাধানের চেষ্টা করি তাহলে পাবলিক পরীক্ষা ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে যে দুটি পরীক্ষা হয় সেদিকে তাকানো দরকার। এবং এই বিষয়টি অনেক আগে থেকেই ঘটে আসছে। আসল কথা হলো প্রশ্ন শিক্ষকদের প্রণয়ন করার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই তা পাবলিশার থেকে কিনে আনে। এর কারণ মূলত দুটি। এক. প্রাইভেট শিক্ষকরা যাতে তার প্রাইভেটের ছাত্র-ছাত্রীকে কমন না ফেলতে পারে দুই. শিক্ষকরা পরিশ্রম করতে চান না। প্রশ্ন তৈরি করা অনেকের কাছেই একটা বোঝা। তাইতো গাইডগুলো বহাল তবিয়তে বাজারে চলে। কারণ খোদ শিক্ষকরাই তো সেগুলো থেকে প্রশ্ন করে। আবার সরাসরি কমনও পড়ে। ভাবা যায়, সৃজনশীল প্রশ্নও কমন পড়ে।


প্রাইভেট ব্যবসা অনেক পুরাতন এবং এটি বহাল তবিয়তেই চলছে। এখন যারা যে শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে পরীক্ষার আগে সেইসব শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন অনেকেই আগে থেকেই বলে দেন। আজ যে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে তার একমাত্র উদ্দেশ্যই হচ্ছে টাকা। আজকের শিক্ষার্থীদের পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এবেলা ওবেলা তাদের প্রাইভেট কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কোচিং সেন্টারগুলো এবেলা-ওবেলা পরীক্ষা নিয়ে এ প্লাস পাওয়ানোর শর্তে ছাত্রছাত্রীদের কোচিং সেন্টারে টেনে আনে।

 

এখানে দায় শুধুমাত্র কোচিং সেন্টারকে দিলেই হবে না। খানিকটা অভিভাবকের ওপরও পড়ে। যারা দিনরাত লেখাপড়া, বেশি বেশি পরীক্ষা আর পরীক্ষায় অন্তত গোল্ডেন এ প্লাসকে সামাজিক মর্যাদা বলে মনে করেন। তাতে তার সন্তানের যাই হোক না কেন। মাঝে মাঝে পরীক্ষায় অকৃতকার্র্য ছাত্র-ছাত্রীদের আত্মহননের খবর আসে। তাদের আসলে বোঝানো হয় যে ফেল করা মানে সব কিছু শেষ হওয়া।

 

আসলে কি তাই? পাস ফেল স্বাভাবিক বিষয়। যে পরিশ্রম করবে সে ভাল ফল করবে আর যে তা করবে না তার ফল খারাপ হবে। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস করে ভাল ফলাফল করার কোন বীরত্ব নেই। প্রশ্ন ফাঁস হওয়াতে মেধাবী জাতি নিয়ে আমরা শংকিত। মেধাবী জাতি গঠনে তাই শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন আবশ্যক।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
01737-044946
sopnil.roy@gmail.com

গ্রাম উন্নয়নে অগ্রাধিকার চাই

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ : হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আতাউর রহমান মিটন ভাই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় যাওয়ার আমন্ত্রণ করেছিলেন। তাই খুব আগ্রহ নিয়েই পঞ্চগড়ের উদ্দেশ্যে সেদিন বের হলাম। আর বের হয়েই পড়ে গেলাম মহাবিপদে! গাড়ীর প্যাঁ পোঁ শব্দে রাস্তার এপার থেকে ওপারে যাওয়া যাচ্ছে না, অথচ একটা গাড়ির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না।

 

বাইরের উন্নত কোন দেশে গিয়ে যদি এসব গল্প বলি তাহলে তারা ভাববে নিশ্চয় তাদের সাথে রসিকতা করছি! কিন্তু ঘটনাটি যে সত্য সেটি হয়তবা বিশ্বাস করানো সম্ভব হবে না। কারণ একটি সভ্য ও উন্নত কোন দেশে রাস্তায় এ রকম অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, এ রকম অনিয়ন্ত্রিত অরাজকতা ও নৈরাজ্য আছে বলে আমার মনে হয় না।  

যা হোক খুব কষ্ট করে হলেও শেষ পর্যন্ত গন্তব্যস্থলে এসে পৌছালাম। পঞ্চগড়ের বোদা এসে হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড অফিসের নাম বললেই মোটামুটি সবাই চিনে। বলরামহাট বানিয়াপাড়ার এই এলাকায় দীর্ঘদিন থেকেই হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এটি একটি জাপানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য দূর করে একটি স্বাবলম্বী, আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০১ সাল থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তারা মনে করেন ক্ষুধামুক্ত ও সমৃদ্ধশালী একটি দেশ গড়ে তুলতে পারলে সেটিই হবে ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সূবর্ণ জয়ন্তীর সবচেয়ে বড় উপহার। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই তারা কাজ করছেন।


আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের গোটা ফার্ম ঘুরে দেখলাম। প্রথমেই আবু তালেব ভাইয়ের সাথে কথা হল। তিনি এই ফার্মে ২০০৫ সাল থেকে কাজ করছেন। অর্গানিক চাষাবাদেও তার ঝুলিতে রয়েছে দীর্ঘ ২৯ বছরের অভিজ্ঞতা। তিনি দেখতে খুব সাধারণ হলেও এখানে অসাধারণ কিছু কাজ করছেন। যা আমাদেরকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি এখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দেশি প্রজাতির মৌ চাষ করে, মধু সংগ্রহ করেন। এই কাজটি তিনি এখানে দীর্ঘ দিন থেকেই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করে যাচ্ছেন।


 এই কাজটি করতে গিয়ে মৌমাছির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ও একটি নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তিনি মৌমাছি দেখেই তাদের ভাষা বুঝতে পারেন। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের মধ্যে মৌমাছিগুলো তাদের বংশ বিস্তারের জন্য বিভাজিত হয়। এই বিভাজন প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে এখানে তিনি মৌমাছির রাণী তৈরি করেন। একটি মৌ রাণী ধরে তাকে বাক্সে রেখে কয়েকদিন পর আবার সেটিকে ছেড়ে দেয়া হয়। এভাবে শুরু হয় মৌ চাষ বা মধু সংগ্রহের প্রক্রিয়া। বাইরে থেকে আবার অনেকেই আসেন এই রাণীগুলো কেনার জন্য।


 আবু তালেব ভাই প্রতিবছর মৌমাছির রাণী বিক্রি করেই অনেক টাকা আয় করেন। ইতোমধ্যেই মৌমাছি চাষাবাদ প্রক্রিয়াটি এখানে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এখন অনেকেই মৌমাছি চাষাবাদের জন্য আবু তালেব ভাইয়ের কাছে এসে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সেই সাথে আবু তালেব ভাইকে সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড। আবু তালেব ভাই নিজেও একসময় প্রচন্ড আর্থিক অনটনে সময় পার করেছেন। এমনকি তিনবেলা পেটভরে খাবারও জোটেনি। সংসার চালিয়েছেন খুব টানাহেছড়া করে। কিন্তু এখন তিনি স্বাবলম্বী। সৃষ্টিকর্তার পরেই তিনি এখন মৌমাছির আরাধনা করেন। কারণ এই মৌমাছি তাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে, নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।


 মৌমাছি চাষ ছাড়াও এখানে অর্গানিক চাষাবাদের ক্ষেত্রেও একটি বিপ্লব তৈরি হয়েছে। এই এলাকার কৃষকেরাও এখন ক্রমান্বয়ে অর্গানিক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। সেই সাথে তাদের দক্ষতাও বাড়ছে, তারা অনেক কিছু দেখছেন ও শিখছেন, যা তাদেরকে অর্গানিক চাষাবাদে দিন দিন আরো বেশি অনুপ্রাণিত করে তুলছে। এখানে ফার্মে কেঁচো কমপোষ্ট সার, বোকাশি সার, (বোকাশি একটি জাপানি ভাষা) চিটাগুড়, ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট, পানি ও টক দই দিয়ে ইমু তৈরি করেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার গাছ-গাছড়ার নির্যাস থেকে বালাইনাশক ও গোচোনা দিয়ে কীটনাশক ও ইউরিয়া তৈরি করে তা ব্যবহার উপযোগি করে তোলা হয়।


 এছাড়াও এখানে স্বল্পমূল্যে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিক্রয় করা হয়, অত্যাধুনিক অর্গানিক কৃষি প্রশিক্ষণের  ব্যবস্থা রয়েছে, পানি বিশুদ্ধকরণ, জৈব সার তৈরি করার কৌশল, ভেষজ কীটনাশক তৈরির কৌশল, কৃষি প্রদর্শনী প্লট ও বায়োফার্টিলাইজারের ব্যবহারের কৌশল সম্পর্কে সাধারণ কৃষকদের শেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কাজের পাশাপাশি হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড বলরামহাট বানিয়াপাড়া ফার্মের ভেতরে ছোট বাচ্চাদের জন্য একটি স্কুল তৈরি করেছেন। এখানে প্রায় ২১০ জনের মত শিক্ষার্থী পড়াশুনা করেন এবং দুপুরে তাদের খাবার দেয়া হয়।


ফার্মের ভেতরে গ্রামের সাধারণ মানুষদের জন্য ‘কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিটি হাসপাতাল’ নামে একটি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র রয়েছে। এখানে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য স্বাস্থ্য পরিক্ষাসহ বিশেষজ্ঞ নার্স ও ধাত্রীদের তত্ত্বাবধানে নরমাল ডেলিভারির ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে আল্ট্রাসনোগ্রাম, ব্লাড গ্রুপিং, ডায়াবেটিস, টাইফয়েড, কিডনী, প্রসাব ও পায়খানা পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। উল্লেখ্য, বোদা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ এর জন্মস্থান এবং ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এই এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।


কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই মহান মানুষটি ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত যৌথ গেরিলা বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কমরেড মণি সিংহ এবং কমরেড ফরহাদ সে সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে রাশিয়ার সহায়তায় বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরীতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জীবদ্দশায় যিনি অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিপ্লবের পথে ছুটে চলতেন, আকণ্ঠ বিপ্লব পিয়াসী সেই মানুষটিকে ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর মৃত্যু এসে জাপটে ধরে।


 তাঁর অকাল মৃত্যু বাংলাদেশে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তি সংগ্রামকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বঞ্চিত মানুষের পরীক্ষিত এই মানুষটির স্মৃতি রক্ষার্থে বোদায় নিভৃত এক গ্রামে বেশ খানিকটা নীরবেই পরিচালিত হচ্ছে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিটি হাসপাতাল। আমার মনে হয় এই হাসপাতালের কথা সারাদেশের মানুষকে জানানো প্রয়োজন।

 

এছাড়াও বোদায় হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড পরিচালিত সেন্টার ফর অর্গানিক ফার্মে এসে আমার বিস্ময় লেগেছে ‘প্রত্যাশা ২০২১’ ভাস্কর্যটি দেখে। আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা যে, ‘২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হোক দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে’ এই শ্লোগান নিয়ে আতাউর রহমান মিটন এর প্রচেষ্টায় ২০০৫ সালে গড়ে তোলা হয় নাগরিক সংগঠন ‘প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম’। একই বছরে দেশের স্বনামধন্য ভাস্কর রাসা এর তত্ত্বাবধানে তার ছোট ভাই ভাস্বর রাজীব সেগুন কাঠের ৬ ফুট লম্বা গুড়ি দিয়ে ‘প্রত্যাশা ২০২১’ নামে একটি ভাস্কর্য তৈরি করেন।


 বর্তমানে এটি বোদায় রক্ষিত আছে। মিটন ভাই বললেন ২০২১ সাল পর্যন্ত এটা বোদায় থাকবে। ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে এখানে সূবর্ণজয়ন্তীর উৎসব শেষ করে এই ভাস্কর্য সরকারের হাতে বা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করা হবে। আমি মুগ্ধ, বিস্মিত। নিভৃত এক পল্লী, অবহেলিত এক ছোট্ট গ্রামে কি অদ্ভুত সুন্দর এক জাতীয় প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। দুঃখ এতটুকুই যে, কেউই এই ভাস্কর্য সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। আমার তো মনে হয়, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের উৎসাহ বোধ করা উচিত। যে আগুন বোদার চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামে এখনও জ্বলছে তার আলো পুরো দেশে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন।


 গণমাধ্যমই কেবল সেটা করতে পারে। অমিত সুন্দর এই ভাস্কর্যটি আমি এক নজর দেখে আসার জন্য ঐ এলাকায় সকলকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। উক্ত ফার্মে থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত আছে। সুতরাং কেউ যদি অবসরে বা ছুটিতে ঐ ফার্মে বেড়াতে যান এবং কিছু সময় কাটান আমি বাজী ধরে বলতে পারি তারা মুগ্ধ হবেন, অর্জন করবেন এক নতুন চেতনা। হতাশাগ্রস্ত মনে জেগে উঠবে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করার প্রণোদনা।

 

বেসরকারি সংগঠন হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড অসহায়, গরিব ও দুস্থ মহিলাদেরকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে সমবায় সমিতি করে তাদেরকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার পথ সৃষ্টি করছে। তাদের এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে অবহেলিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশার আলো সঞ্চার করেছে। আমরা যদি সঠিক চিন্তা ও সঠিক পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যেতে পারি তাহলে সাহায্যের জন্য কারো কাছেই ভিক্ষা চাইতে হবে না।


  হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড মনে করে, আমাদের দেশের সীমিত সম্পদকে সর্বোচ্চ বা পর্যাপ্ত ব্যবহার করেই দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আর এজন্য আমাদেরকে প্রথমে গ্রাম উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কথায় আছে ‘শুরু যদি করব তবে কাকে দিয়ে শুরু করব? শুরু যদি করব তবে আমাকে দিয়েই শুরু করব। শুরু যদি করব তবে কখন থেকে শুরু করব? শুরু যদি করব তবে এখন থেকেই শুরু করব।’ অবশ্য সেই শুরু করার কাজটি হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড খুব সুন্দরভাবেই করেছেন। এই প্রক্রিয়াটিকে এখন সম্প্রসারিত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।  


এখন শুধু আমাদেরকে এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখতে হবে। শিল্পায়ন বা নগরায়নের পাশাপাশি আমাদেরকে সমান তালে গ্রামগুলোর উন্নয়নেও নজর দিতে হবে। আর এ জন্য ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক কাজ করতে হবে। কারণ গ্রামগুলোর উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে আমরা কিছুতেই উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারব না।

গ্রামের সঙ্গে আমাদের শিকড়ের সম্পর্ক। তাই সবার আগে আমাদের সেই শিকড়কে ঠিক রাখতে হবে। যদি আমাদের উন্নয়নগুলো শুধু শহরকেন্দ্রিক হয় তাহলে আমরা ক্রমান্বয়ে সেই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব। গ্রাম ছেড়ে সবাই শুধু শহরমুখী হয়ে পড়বে। তাই গ্রামগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে শহরের সাথে তাল মিলিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
লেখক ঃ  সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
rased.4bangladesh@gmail.com
০১৭৫০-৫৩৪০২৮



Go Top