দুপুর ১:০৬, বুধবার, ২৯শে মার্চ, ২০১৭ ইং
/ মতামত

আতাউর রহমান মিটন : যথাযথ মর্যাদা, সম্মান ও উৎসাহ-উদ্দিপনার মধ্যো দিয়ে আমরা আমাদের ৪৬তম স্বাধীনতা দিবস পালন করলাম। বরাবরের মত দেশের সকল জেলা ও উপজেলা সদরে কুচ-কাওয়াজ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে আমরা দিবসটি উদযাপন করেছি।

 

সংবাদপত্রগুলি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। টিভি চ্যানেলগুলো আয়োজন করেছে নানাবিধ অনুষ্ঠান। কিন্তু এবারই প্রথম অন্যান্য অনুষ্ঠানের চাইতে আমাদের মনযোগ কেড়েছিল সিলেটের ‘আতিয়া মহল’। মণি মানিক্য নয়, প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ‘আতিয়া মহল’ ঠাসা রয়েছে বিস্ফোরকে। বারুদে ঠাসা এই বিস্ময় আমাদের কাম্য নয়। আশাকরি জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারব।


মানুষের শক্তি তার একাকীত্বে নয়। একলা মানুষ টুকরা মাত্র। সমষ্টিবদ্ধতার মাঝেই সমাজের প্রগতি নিহিত। যে সমাজ নিজেই নিজেকে খন্ডিত করে একটি খন্ডকে বাহিরে রাখে সে কেবল নিজেকেই খাটো করে না বরং সমাজের মধ্যে চিরস্থায়ী বিরোধ সৃষ্টি করে। এই বিরোধ যত বাড়বে সমাজ ততই জট পাকিয়ে বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েই সমাজকে রক্ষা করেছি। এটাই আমাদের বল। আমাদের আজকের সমাজে যে অন্ধকার বাসা বেঁধেছে তা যেন আমরা প্রশ্রয় না দিয়ে মোকাবেলা করি। সামাজিক আত্মহত্যা আমাদের কাম্য নয়।


রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ডাক্তাররা বলেন, শরীর যখন সবল ও সক্রিয় থাকে, তখন রোগের আক্রমণ ঠেকাইতে পারে। আক্কেল দাঁত যখন ঠেলিয়া উঠিতে থাকে তখন বেদনায় অস্থির করে। কিন্তু যখন সে উঠিয়া পড়ে তখন শরীর তাহাকে সুস্থভাবে রক্ষা করে। যদি দাঁত উঠিবার কষ্টের কথা স্মরণ করিয়া দাঁতগুলাকে বিসর্জন দেওয়াই শরীর সাব্যস্ত করে তবে বুঝিব, তাহার অবস্থা ভালো নহে — বুঝিব, তাহার শক্তিহীনতা ঘটিয়াছে।’

 

আমরা নতুন নতুন যে সকল সমস্যা ও বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছি তা নিরুপায়ভাবে বর্জন করাটা সজীবতার লক্ষণ নয়। আমাদের সমাজ যে উদ্ভুদ সমস্যা মোকাবেলা করতে সক্ষম এবং সক্রিয় সেটা আমাদের বারেবারেই প্রমাণ করতে হবে। পুলিশ পাহারায় আর যাই হোক, সন্তান মানুষ করা সম্ভব হবে না। এর জন্য চেতনার জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। সমাজের শক্তিকে দুর্বল করে পুলিশের ভরসায় বসবাসের চেয়ে বনবাসই শ্রেয়।

 


এবারের স্বাধীনতা দিবসে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে ডঃ মোহাম্মদ হান্নান এর লেখা ‘যে বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম’ তা সকলের পাঠ করা উচিত বলে আমি মনে করি। উক্ত প্রবন্ধে লেখক বিশ্বব্যাংকের দুই অর্থনীতিবিদ এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, “বাংলাদেশ হলো উন্নয়নের প্রশ্নে পৃথিবীর কঠিনতম সমস্যা। বাংলাদেশের উন্নয়ন যদি সম্ভব হয়, তাহলে দুনিয়ার সকল দেশেই উন্নয়ন ঘটবে।

 

যদি বাংলাদেশের শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন হয়ও, তাহলেও দু’শত বছর সময় লাগবে।” ১৯৭৬ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ইধহমষধফবংয: ঞযব ঞবংঃ ঈধংব ড়ভ উবাবষড়ঢ়সবহঃ’ নামের রিপোর্টটিতে এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উক্ত অর্থনীতিবিদদ্বয়ের কথা সত্য প্রমাণিক হয়নি।


স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশ নিয়ে অনেক দেশেরই অনেক সন্দেহ ছিল। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপর্যুপরি আক্রান্ত হওয়া, জনসংখ্যা আধিক্যের এই দেশে ক্ষুধার অবসান সম্ভব এটা কল্পনা করাটা সত্যিই কঠিন ছিল। অথচ বাংলাদেশের মানুষ সেটা অর্জন করে দেখিয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেই এখন বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের মডেল’ বলা হচ্ছে। এই অর্জন কোন সাধারণ বিষয় নয়। এটা অর্জন করতে হয়েছে হৃদয়ের উষ্ণতায়। দাতা দেশগুলির ঞবংঃ ঈধংব, ইধংশবঃ ঈধংব শেষ করে এখন আমরা ঝযড়পিধংব এর পথ ধরেছি। এগিয়ে চলার এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।

 


বাংলাদেশ আমাদের হৃদয়ে। আমরা স্বপ্ন দেখছি এগিয়ে চলার। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বদনাম আমরা ঘুচিয়েছি। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকাসক্তি ইত্যাদি নেতিবাচক প্রবণতাগুলিও আমাদের মুছে ফেলতে হবে। এটা ঠিক যে আমাদের তরুণ সমাজ নষ্ট রাজনীতির কোলে বেড়ে উঠেছে। আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে যে, অন্ধকারের অপশক্তি তাদের টার্গেট করে ভুল পথে পরিচালিত করছে।

 

আমাদের সুশীল সমাজ অন্ধকারের এই অপশক্তি সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের উদাসীনতার সুযোগে সমাজে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে ‘মগজ ধোলাই’ এর ব্যাপারটা সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। সরকার যদি একজন দু’জন বিপথগামীদের প্রতি মনযোগ দেয়ার চাইতে  ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেকড়সমেত উপড়ে ফেলার উদ্যোগ নেয় তাহলে সেই প্রচেষ্টা অনেক বেশি ফলপ্রসু হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে ফুলের বাজারের তুলনায় অস্ত্রের বাজার অনেক অনেক গুণে বড়।

 

সুতরাং এটা সহজেই বলে দেয়া যায় যে, অস্ত্র ব্যবসায়ীরা আমাদের তরুণদের হাতে ফুল নয়, অস্ত্র তুলে দেয়ার দিকেই বেশি সচেষ্ট। সমাজে যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঘৃণা, বিবাদ কমে গেলে অন্ত্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। কায়েমী স্বার্থবাদী ঐ মহলটি তা হতে দিতে চাইবে কেন?

 


আমাদের তরুণ সমাজ সকলেরই টার্গেট। একেকজন একেকভাবে তরুণদের ব্যবহার করতে চাইছে। কেউ চাইছে তাদের অন্ধকারে টেনে নিয়ে যেতে, ধর্মের জিকির তুলে, জিহাদের উদ্দিপনায় তাদের দলে ভেড়াচ্ছে। আবার অন্যদিকে একটি গোষ্ঠী তাদেরকে রাজনীতি অসচেতন করে, রাজনীতির প্রতি বিমুখ করে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থে নিমগ্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীতে পরিণত করছে। আমার কাছে এই ‘আত্মনিমগ্নতা’ই হলো সামাজিক আত্মহত্যা।  
বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার একটি দেশ। আমাদের তরুণ সমাজ সেই সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রসর যোদ্ধা। ওরাই বীর। ওদের ভেতরে যে সক্ষমতা, যে শক্তি বিরাজমান সেই শক্তির উন্মেষ ঘটিয়ে আমরা বাংলাদেশকে আরও অনেক উঁচুতে তুলতে পারব।

 

আমরা আমাদের আশাগুলোকে ব্যক্ত করতে সমর্থ হলে, যথাযথ সহায়ক পরিবেশ পেলে আমরা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারব। দেশকে, দেশের সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করাটা ধর্ম নয়। মানুষের সেবা করাটাকে ধর্মের মতই মান্য করতে শেখাতে হবে। আমাদের তরুণদেরকে গোলাপ হাতে নিয়ে সম্প্রীতির মিছিলে টেনে আনতে হবে। অস্ত্র বা পুলিশ দিয়ে তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব নয়।

 


প্রসঙ্গক্রমে আমি এখানে একটি সৃজনশীল যুব উদ্যোগের কথা তুলে ধরছি। ‘যুব ছায়া সংসদ; নামের এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসের ৫ম অধিবেশনটি বসেছিল গত ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে। সাবেক ছাত্র-যুবনেতা প্রকৌশলী মুহম্মদ হিলালউদ্দিন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে বাংলাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রতিনিধি হিসেবে ৩০০ জন যুবক অংশ নিয়েছে। তারা কথা বলেছে নিজেদের ভবিষ্যত এবং জাতির ভবিষ্যত নিয়ে। ওরা কথা বলেছে, দাবী জানিয়েছে এই আশায় যে নীতি নির্ধারকগণ যুবকদের কথা শুনবেন এবং ব্যবস্থা নিবেন। কিন্তু অনেক সময় আমাদের নীতি নির্ধারকগণ যুবকদের কথা শোনেন না।

 


সেদিন যুব ছায়া সংসদে সরকার দলের পক্ষে সদস্য সামসুন্নাহার সুমী কর্তৃক আনীত প্রস্তাবের উপর সাধারণ বিধি-১৪৭ ধারায় আলোচনা হয়েছে। সকলের বক্তব্য থেকে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক। খাদ্য অধিকার জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।  কর্মের অধিকার মানুষের খাদ্য অধিকার এর সাথে ওতোপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের মহান সংবিধানের ধারা ১৫ (ক), ১৫(খ), ২০, ২৯ (ক) অনুযায়ী জনগণের খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার এবং কর্মের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। যুব ছায়া সংসদ প্রস্তাব করেছে,


(ক) আত্মকর্মসংস্থানে সহায়ক ‘কর্মমুখী কারিগরী শিক্ষা’ বিস্তারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে,  
(খ) জনগণের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে,
(গ) বিদেশে কর্মসংস্থানে সহায়ক জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ ও কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে,
(ঘ) কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও খাদ্য অধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ নীতি অনুসরণ করতে হবে,
(ঙ) কর্ম অধিকার নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধানসহ অবিলম্বে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করতে হবে।
যুব ছায়া সংসদে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ নূরুল ইসলাম ওমর এমপি, কাজী রোজী এমপি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এর চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণ সাক্ষরতা অভিযান এর পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এবং রূপালী ব্যাংক এর সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ ডঃ আহমেদ আল কবির।

 


আমরা যে অস্থির সময় অতিক্রম করছি সেখানে আমাদের অহিংসার পথে চলতে হবে। অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। অস্ত্র বা ভয়ের মুখে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু স্বার্থ হাসিল করা যায় কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন এর জন্য আমাদেরকে গঠনমূলক পথে চলতে শিখতে হবে। আমাদের তরুণদেরকে রাজনীতি সচেতন করে তুলতে হবে। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বপ্ন দিয়ে আমাদের ভবিষ্যত গড়ে তোলার প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।


কেবল পূর্বপুরুষের কীর্তিকে উপজীব্য করে চলার চেষ্টা বেশিদিন ফলপ্রসু হবে না। নিজের কর্মের প্রতি, নিজের শক্তির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা রেখে আমাদের এগিয়ে চলা শিখতে হবে। সংশয়, ভীরুতা নিয়ে কূয়োর মধ্যে বসে থাকার নাম স্বাধীনতা নয়। আমাদের চোখ মেলে তাকাতে হবে। সজাগভাবে, সজ্ঞানভাবে নিজের দেশের আদর্শকে উপলদ্ধি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারলেই আমাদের স্বাধীনতা সার্থক হবে।


ডাক্তার ভয় পায় তখন যখন রোগির মস্তিস্ক বিকল হয়। কারণ রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনা মস্তিস্কই করে থাকে। সুতরাং মস্তিস্ক বিকল হয়ে গেলে সে ওষুধের প্রয়োগ সাধন করতে পারে না, তখনই বিপত্তিটা ঘটে। আমাদের সমাজে আজ যে অসুখ দানা বেঁধেছে সেই অসুখ নিজে খুব বেশি উদ্বেগের কারণ না হলেও আমাদের উদ্বেগ বাড়ছে কারণ ঘাতক ব্যাধি আমাদের মস্তিস্কে বিস্তৃত হচ্ছে।

এই ধারা অব্যাহত থাকলে কোন ওষুধেই কাজ হবে না। আমাদের সমাজে বিদেশী শক্তির প্রভাব রয়েছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। সমাজ যদি বিদেশী প্রভাবের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে তাহলে স্বাধীনতা রক্ষা হবে কিভাবে? রবীন্দ্রনাথ এর ভাষায় বলতে চাই, ‘আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা।’
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক

miton2021@gmail.com

০১৭১১৫২৬৯৭৯

সড়কে মৃত্যু মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে

মীর আব্দুল আলীম: সড়কে মৃত্যু মিছিল থামছে না। আমরা সচেষ্ট নই বলেই  সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছেতো ঘটছেই। এ বিষয়ে সরকার পূর্ণ সক্রিয় তাও দেখি না। প্রশাসনেরতো গাঁছাড়া ভাব। সংশ্লিষ্টরা কি করছেন এ প্রশ্ন থেকেই যায়া?  যেদিন লিখছি (২৭ মার্চ), সেদিন দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৫ দিনে ৩১৩ জন মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। এর প্রকৃত সংখ্যা নাকি আরও বেশি। এক অল্প সময়ে এত মানুষের মৃত্যু ভাবা কি যায়? এ মৃত্যু কেবল ঐ পরিবারগুলোরই ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় ক্ষতি ধরে নিয়ে সরকারকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেষ্ট হতে হবে।

 আজকের (২৭ মার্চ) পত্রিকাতেই দেখলাম সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন হচ্ছে, এবং খসড়া অনুমোদন হয়েছে। আইনতো আগেও ছিলো। কতটা প্রয়োগ করেছে সরকার? বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টরা নেড়ে চড়ে বসেন, হা-হুতাশ করেন, আইনের কথা ভাবেন। কিন্তু কিছুই হয় না বলেইতো দেখছি দীর্ঘদিন। যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে তাতে সরকারকে আর গাঁছাড়া ভাব দেখালে চলবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারক, চালক, পরিবহনকর্মী, যাত্রী এবং পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।


চুয়াডাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশে হৈ চৈ পড়ে গেছে। ক’দিন এনিয়ে হৈ চৈ আরও হবে। মন্ত্রণালয়েও আইন পাসের কাগজপত্র ঠিকঠাকের কাজ চলছে। বুকে হাত রেখে বলতে পারি কিছুই হবে না। পুর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই এমন কথা বলছি।এভাবে চলে না। চলতে দেয়া যায় না। সরকার সরকারের  সড়ক ও সেতু মন্ত্রী কিছু একটা করুক আমরা চাই। সড়কমন্ত্রী সব কিছুতেই বেশ দক্ষতা দেখিয়ে দেশবাসীর দৃষ্টিতে এসেছেন। সড়ক দুর্ঘটনা তাঁর মন্ত্রণালয়েরই বিষয়। এখানে তিনি ব্যর্থ, আমি বলবই বলব। আমরা মনে করি তিনি সচেষ্ট হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে।

 পৃথীবির সব দেশেই কমবেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু এভাবে? মৃত্যু পরোয়ানা হাতে নিয়ে তবেই আমাদের ঘড় থেকে বেরুতে হয়। ঘরে ফিরে আসার নিশ্চয়তা কারো নেই। এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু কি মেনে নেয়া যায়? কোন সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্টে এমনটি কাম্য হতে পারে না।

আমাদেও দুর্ভাগ্য প্রতিদিন একের পর এক অনভিপ্রেত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে চালকরা আর তা রোধে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। আইন আছে, আইন প্রয়োগ হচ্ছে কি? পাশের দেশ ভারতসহ সারা বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিচার হয়। বাংলাদেশে হয় না। মিশুক-মনিরের ছাড়া আর কোনটাই অন্তত আমার মনে পড়ে না।

 এদেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়িদের বিচার করলেই সড়ক অচল করে দেয়া হয়। ক’দিন আগেও হয়েছে। আবার তাতে নাকি কোন মন্ত্রীর সায়ও ছিলো। এইতো বাংলাদেশ! আমরা এখানে কি আশা করতে পারি। ৪৫ দিনে ৪১৩ জন মানুষ অহেতুক জীবন দেবে আর তাঁদের জীবনের মুল্য শুন্য হবে তা কি করে হয়। আমি মনে করি এমন অবস্থায় সরকারের চুপচাপ বসে থাকা অন্যায়। সরকারের মন্ত্রী আমলা সবাইকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়কে নেমে পড়া উচিত।


কখনো কখনো সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপারে সজাগ হয় প্রশাসন, তাতে ভালো লাগে। সেদিন বেশ কয়েকটি দৈনিকে একটি খবর বেশ ফলাও করে ছাপা হয়েছে। এর একটির শিরোণাম এমন-‘গাড়ির চালক ও মালিককে খুঁছে পুলিশ’। তাঁরা যাতে পালাতে না পারেন, এ জন্য দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বোধ করি ঐ গাড়ির মালিক ও চালক ছাড় পাবে না। এমন সংবাদ পড়ে, খুব ভালো লাগলো। যেভাবে দেশে গাড়ির চাকায় মানুষ মরছে তাতে এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।

 
সড়ক দুর্ঘটনা, এ যেন আমাদের ললাটের লিখন। দুর্ঘটনাকে ভাগ্য হিসাবেই মেনে নিচ্ছি আমরা। এখন কোন পরিবারে সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে খুব একটা মামলা-মোকদ্দমায় যায় না। বিচার হয় না; গিয়ে কি লাভ? সপ্তাহখানিক আগে আমার অতি ¯েœহের এক ছোট ভাই জিটিভির নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি আশিকুর রহমান হান্নানের  জেএসসি পরীক্ষার্থী এক ভাতিজি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

 

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের বরপায় ঘটে এ দুর্ঘটনা। ফকির ফ্যাশনের একটি গাড়ি রাস্তা ছেড়ে ফুটপথে এসে তাকে চাপা দেয়। রাস্তায় আইল্যান্ড এড়িয়ে চলতে থাকা দ্রুতগামী গাড়িটি ঐ শিক্ষার্থীর উপর উঠে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। সাংবাদিক আশিক অত্যন্ত সচেতন একজন ব্যক্তি। লেখালেখির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকান্ড করেন। মাদকের বিরুদ্ধে লড়ছেন দীর্ঘ দিন ধরে। আমি যতদুর জানি এ ঘটনায়ও মামলা হয়নি। এমন অপরাধ করে চালকও বহাল তবিয়তেই আছেন।


পাঠক আপনাদের জানা প্রয়োজন আছে,বিশ্বের অত্যধিক সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। নেপাল, মালয়েশিয়ার মতো এতো পাহাড় পর্বত নেই তবু দুর্ঘটনা ঘটছেতো ঘটছেই। বর্তমানে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার এই মাত্রা ভয়াবহ, যা ক্রমে বাড়ছে। প্রতিদিনের এসব দুর্ঘটনায় আহত-নিহত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ, যারা আমাদেরই পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজন।

 সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবহন শ্রমিকরাও আহত-নিহত হচ্ছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মালিক শ্রেণীও; যা প্রত্যাশিত নয়। বিশ্বব্যাংক, দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বুয়েট এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করছে ১৮-২০ হাজার মানুষ এবং আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার; যা দেশের আর্থসামাজিক সংকটকে তীব্রতর করে তুলছে। বছরে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি একমাত্র বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া অন্য সব দুর্ঘটনা মিলিয়েও ঘটে না। বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অথচ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না সরকার, সরব হচ্ছে না নাগরিক সমাজও।


দেশের সড়কের ধরন ও ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী, বিশেষ করে নকশা ও কাঠামোগত ত্রুটির কারণে সড়কের অনেক স্থান দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিণত হয়েছে, যা সঠিকভাবে সংস্কার বা মেরামত করা হয় না। রাজধানীর ফুটওভার ব্রিজগুলোর অধিকাংশই সঠিক জায়গায় নির্মিত হয়নি এবং এগুলো ব্যবহার উপযোগিও রাখা হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ফুটওভার ব্রিজের তেমন সুফল পাওয়া যায় না। মহানগরীর যেসব স্থানে ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী সড়ক রয়েছে, সেসব স্থানে অদ্যাবধি বহুমুখী ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়নি।

 যেমন শাহবাগ, মৎস্য ভবন, পুরানা পল্টন, মালিবাগ মোড় ইত্যাদি। এসব স্থানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, মৃত্যু হচ্ছে বহু মানুষের। যারা এ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন, তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবার তহবিল সংকটের কথাও বলা হয় সবসময়। দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে বিআরটিএ নামক একটি প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিষ্ঠানটি জনবলস্বল্পতা ও দুর্নীতিসহ নানা সংকটে নিমজ্জিত। ফলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না কোনোভাবেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ২১ লাখ মোটরযান চলাচল করে।

 অথচ বৈধ ড্রাইভার আছে মাত্র ১৪ লাখ। বাকি ৭ লাখ মোটরযান চলছে অবৈধ ও অনভিজ্ঞ ড্রাইভার দ্বারা। কী অদ্ভুত ও ভয়াবহ ব্যাপার! এছাড়া সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ মোটরযানই ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব মোটরযানের বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধিতার কারণে।


সবসময় বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে না; বরং অনেকগুলো কারণের এটি একটি মাত্র। এক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি করতে হবে জনসাধারণসহ পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, সড়ক বিভাগের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বিচার ও শাস্তি প্রদানে দেশে বিদ্যমান আইনের সংস্কার করতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে।


কালক্ষেপণ না করে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কর্মকৌশলের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।


সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিম্নলিখিত প্রস্তাব বাস্তবায়ন জরুরি: ১. পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র প্রদান, ইউনিফর্ম প্রবর্তন, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্টকরণ, কাউন্সিলিং ও টার্মিনালে বিশ্রামাগার তৈরি। ২. বিআরটিএকে দুর্নীতিমুক্ত ও শক্তিশালীকরণ । ৩. ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন। ৪. সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের সংস্কার সাধন এবং পৃথক আদালত প্রবর্তন। ৫. পরিবহনের চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ। ৬. যাত্রী বীমা চালু। ৭. জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে বিভাজন গার্ডার নির্মাণ।

 ৮. মহাসড়কে ওয়েট লিফটিং স্টেশন নির্মাণ করে ওভারলোডিং ও স্পিড ক্যামেরা স্থাপন করে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ। ৯. মহাসড়কে নির্দিষ্ট দূরত্ব অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণ। ১০. হাইওয়ে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি। ১১. মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সংস্কার, এসব স্থানে সাইনবোর্ড স্থাপন ও তোরণ নির্মাণ নিষিদ্ধকরণ এবং যথাস্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ।

 

১২. পাঠ্যপুস্তকে সড়ক দুর্ঘটনা-বিষয়ক গল্প বা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্তকরণ, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশ মুখে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন। ১৩. সব কর্মক্ষেত্রের দৃশ্যমান স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা-বিষয়ক সাইনবোর্ড/পোস্টার প্রদর্শন। ১৪. দক্ষ চালকদের জন্য জাতীয়ভিত্তিক পুরস্কার প্রবর্তন, যাতে তারা সামাজিকভাবে মর্যাদাবোধ করেন। এতে অন্য চালকরাও এ ধরনের পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য দুর্ঘটনামুক্ত পরিবহন চালনায় উৎসাহিত হবেন।


উল্লিখিত, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হলে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলে আমরা মনে করি। তাতে বহু মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা হবে। তাই নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে এবং সরকারকে সমন্বিত ও টেকসই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাই। বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
 newsstore13@gmail.com 
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮

ক্ষুদ্র এনজিওদের আগামী দিনগুলি

আবদুর রাজ্জাক রাজু :স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ও আজকের উন্নয়নের মহাসড়কে উপনীত হওয়ার কাহিনী কমবেশী সকলের জানা। দারিদ্র বিমোচনে সরকারের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে সত্তুরের দশকে এদেশে এনজিওদের উন্মেষ ও আশি-নব্বইএ তাদের রমরমা তথা জমজমাট পদচারণা শুধু দেশীয় ইতিহাসেই নয় বরং বিশ্ব নন্দিত এবং দুনিয়া আলোড়িত করা এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

তাই জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতিতে এনজিওদের অবদান অনস্বীকার্য, চিরস্মরণীয় বটে। সে সূত্রে এ দেশের এনজিওরা যেমনি বিদেশী উন্নয়ন সংস্থা থেকে ধারণা ও প্রেরণা পেয়েছে – অনুরূপ বহু বিদেশী এজেন্সীও বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা ও ভূয়সী প্রশংসা করেছে।


 সেটা ছিল এনজিওদের গৌরবময় ও গর্বের স্বর্ণোজ্জল সময়। সেই এনজিও খাতের চরম প্রসার, সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষের উত্তরবঙ্গে আরোহণ অবস্থায় নব্বই দশকের প্রথম দিকে তাদের একমাত্র ও একচ্ছত্র আধিপত্যের দেশজোড়া সমন্বয় জোট বা নেটওয়ার্কটি সংকীর্ণ রাজনীতির ঘূর্নাবর্তে ও নিজেদের নেতৃত্বের অন্তদর্¦ন্দ্বে পড়ে যায় শনি গ্রহের কবলে। ক্রমান্বয়ে ধসে পড়তে থাকে তাদের আকাশচুম্বী সুনাম-সুখ্যাতি প্রভাব-প্রতিপত্তি যেমনটি প্রাসাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। এনজিওদের এই মেরুকরণের মধ্য দিয়ে বিশেষতঃ দূর্বল, বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র আর গ্রামীণ এনজিওগুলি।

 তাদের সেই পতনমূখী ক্ষয়িষ্ণু ধারা আজ একটা মর্মান্তিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পক্ষান্তরে এনজিওদের সেই অন্তর্বিরোধ কুজ্ঝটিকায় যারা নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছিল; ব্যতিক্রমী বাদে বড় আকারের জাতীয় এনজিওদের একটি প্রভাবশালী অংশ সেই সুরঙ্গ পথে কোটারী ফায়দা লুটে নেয় নানাভাবে।

 

তেমন মওকালাভের একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত হলো- দু’হাজার সালের পর থেকে দাতাদের অনুদানের সিংহভাগ ক্রমশঃ চলে যায় সেইসব জাতীয় বৃহৎ এনজিওদের পকেটে যদিও তারা সংখ্যায় বেশি নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে দাতাদের সুবিধাবাদী কূট চরিত্রের সুবাদে আর বৈশ্বিক নানা প্রেক্ষাপটে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছোট সংস্থাগুলোর আর্থিক তহবিল যোগান কমতে কমতে তা আজ প্রায় তলানীতে নেমে এসেছে।


এ প্রসঙ্গে মাত্র ক’বছর আগেও এনজিও ব্যুরো বলেছিল, বেসরকারি উন্নয়ন খাতের জন্য ফান্ড-ফ্লো কমে নাই-বরঞ্চ তা কিছুটা ডাইভার্ট হয়ে মোটা অংকটা বড় এনজিওদের ভাগে চলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে জাতীয় পর্যায়ের এনজিওগুলোকে স্থানীয় ছোট এনজিও’র সাথে পার্টনারশীপে কাজ করার পক্ষে মত ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এখন তারা স্বীকার করছে – সার্বিকভাবেই এনজিওদের জন্য দাতার বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ বাস্তবেই হ্রাস পেয়েছে।

 মোটা দাগে এর কারণ অনুসন্ধানে নজর দিলে দেখা যাবে-এর পেছনে জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দৃশ্যপট কাজ করছে। প্রথমতঃ বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা যেমন ঃ বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদের নেতিবাচক প্রভাব, দুনিয়া কাঁপানো জঙ্গিবাদ, দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাঙন ও ব্রেক্সিট,  বিশাল অভিবাসী ও শরনার্থী স্রোতের ধাক্কা ও সর্ব সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রে অনভিজ্ঞ ও উদ্ভট গরম মস্তিষ্কের নেতৃত্বের আবির্ভাব হেতু অস্বস্তি ও শংকা-আশংকা। এছাড়া আমাদের দেশে দাতা বিমূখতার মূখ্য নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে পদ্মা সেতুকে ঘিরে।

 অবশ্য এখন প্রমাণ মিলেছে বিশ্ব ব্যাংকই মূল খল নায়কের চরিত্রে দুষ্ট অভিনয় করেছে যার মাশুল গুণতে হচ্ছে ও হবে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে। এরপর আমাদের দেশেও সন্ত্রাসবাদের মাথা চাড়া দেওয়া, এর অন্তর্ঘাতী বিস্তার এবং অবশেষে হলি আর্টিজানের লোমহর্ষক ডিটেকটিভ স্টাইলের জঙ্গি হামলা ঘটনা স্পষ্টতইঃ দাতাদের ভুল বার্তা দিয়ে এদেশ বিমূখ হতে সহায়ক হয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় দাতারা গুটিয়ে নিয়েছে তাদের দানের হাত যার সর্বনাশা করুণ ছবি প্রতিফলিত হয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র-মাঝারি এনজিও’র প্রায়শঃ কার্যক্রম গুটানো বা দরজা বন্ধের মাধ্যমে। ফলশ্রুতিতে কর্মহীন বেকার হয়ে পড়েছে এর সাথে সংশ্লিষ্ট বহু উন্নয়ন কর্মি, অগণিত মানুষ।


অপরদিকে কয়েক বছর আগে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণার পর বর্তমানে যখন সরকার কর্তৃক আবার মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাব্য সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে তখন বোধ করি দাতারা ধরে নিতে শুরু করেছে যে, এ দেশে গরীবানা হাল উধাও হওয়ার পথে। যেমনটি ড. ইউনুস  দারিদ্রকে যাদুঘরে পাঠাতে চেয়েছেন। যদি তাই হয় বাংলাদেশই অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য গরীব অনুন্নত দেশকে দান করবে বা সহযোগিতার হাত বাড়ানোর সক্ষমতায় উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। সেটা আমাদের জন্য বিরাট কৃতিত্ব বটে।

 তেমন অবস্থায় এ দেশের এনজিওদেরকে দাতার অনুকম্পার দানের টাকা প্রদান তাদের দৃষ্টিতে আর তেমন যুক্তিগ্রাহ্য হবে না বলে মনে হয়। তাছাড়া অনেক আগে থেকেই সরকারিভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর কর্তৃক বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট অনেক কর্মসূচি সরকার নিজে এবং কিছু ক্ষেত্রে এনজিওদের সাথে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এতে এনজিওরা সামান্য সুযোগ-সুবিধার বিপরীতে বড় রকম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।

 আরো লক্ষ্যণীয়- সরকার প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে ও এডিপিতেও বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে শুধু বহির্দেশীয় ঋণ গ্রহণ নীতি অনুসরণ করছে। তাই দাতাদের শীর্ষ মোড়ল বিশ্ব ব্যাংক যখন হাত গুটিয়ে নিল; তখন বোঝা যায় তার অন্যান্য পার্শ্বচরিত্র চেলা দাতারাও তাদের দানের বাহু সম্প্রসারিত করা থেকে বিরত থেকেছে। পরিণামে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এনজিওদের পক্ষে সেবা ও কল্যাণমুখী কাজ করার যে সামাজিক ও গণকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতি ছিল তা আর কাংখিত মাত্রায় পালন করা সম্ভব হবে না। একই সাথে এই সেক্টরে জড়িত বিপুল দারিদ্রক্লিষ্ট জনতাও এনজিও কাজের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।


পক্ষান্তরে এখন সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ বা সামাজিক ব্যবসা করার মাধ্যমে এনজিওদের টেকসই হতে উপদেশ খয়রাত করা হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে মহাজনী মার্কা সুদ নির্ভর মাইক্রো ফিন্যান্স ও মুনাফাধর্মী ব্যবসা শুরু করার সামর্থ মাইক্রোক্রেডিট এনজিওগুলো ব্যতিত বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র এনজিওদের ক’টির আছে যার ভিত্তি হচ্ছে প্রয়োজনীয় পূঁজি বা মূলধন।


 বরঞ্চ সরকারের এনজিও বান্ধব নীতির অভাবে সেই আশা দূরাশা মাত্র। অন্যদিকে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন- আগামি দিনগুলিতে সরকারি ও কর্পোরেট অঙ্গনের বিভিন্ন উৎসের নিকট যেতে হবে এনজিও সহযোগিতার জন্য যা সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এছাড়া দেশীয় কিংবা স্থানীয় দাতা ও তহবিল সৃষ্টির উদ্ভাবনীমূলক পন্থাও তাদের অনুসরণের চিন্তা করতে হবে।

 তবে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হল- দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে সহায়তা খুঁজতে গিয়ে এনজিওরা তাদের এযাবতের ক্লিন ভাবমূর্তি কতটুকু স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পারছে বা পারবে। আর সেই গিভিং-টেকিং এর দেনদরবার করার সক্ষমতা ক্ষুদে এনজিওদের আছে কি-না। তাহলে এক্ষেত্রেও “বড় ভাইরাই” পার পেয়ে যাবে কেবলি সেই মধু আহরণে।

 সরকার যদিও বলছে দেশে দারিদ্র্যের হার অনেক কমেছে অবশ্য বাস্তবে তা নিম্নগামী। অথচ একেবারে সমাজের গভীরে শেকড়ে দৃষ্টি দিলে প্রতীয়মান হবে-এখনও হতদরিদ্র মানুষ আর দারিদ্রপীড়িত পরিবার সংখ্যা আসলে সত্যিকার অর্থে প্রকৃত ‘স্বনির্ভর’ এর মাত্রায় কমে নাই এবং উন্নত জীবনমানে পৌঁছে নাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা প্রকার সেবা সহযোগিতা পশ্চাৎপদ মানুষের জন্য এখনও অপরিহার্য যা সরকারি সেবাখাতসমূহ এককভাবে সম্পূর্ণটা মেটাতে অপারগ বলে মনে হয়।

 

আর জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি এবং মাথা প্রতি বার্ষিক গড় আয় বৃদ্ধির যে হিসাব পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরে সার্বিক উন্নয়ন চিত্র বর্ণনা করা হয় তার মধ্যে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। কারণ, এখনও সমাজে প্রকট দারিদ্র চিত্র যেমন নিরক্ষরতা, মানবিক দুর্দশা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, অন্যায্যতা, অধিকারহীনতা, অবিচার ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুরাবস্থা ইত্যাদি মানুষের জন্য  একান্তভাবে এনজিও সেবার দাবি রাখে এবং তার আবশ্যকতা আগামীতেও থাকবে- হয়তো পরিবর্তিত রূপে।

 
স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি দল বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার যার অকৃত্রিম অনুসঙ্গী, সহযোগী ও সমর্থক হল এ দেশের এনজিওরা। কেননা, তাদের সব কর্মকান্ডই অসম্প্রদায়িক, ধর্ম ও দল নিরপেক্ষ, মানবতাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ, দেশ ও জাতির সেবায় উৎসর্গকৃত এবং স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। অথচ পর পর দু’দফা ক্ষমতায় থাকলেও বর্তমান সরকার এনজিওদের উন্নয়নে ও কল্যাণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখার নজির স্থাপন করতে পারেনি অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও। উল্টো এনজিওদের আপত্তি উপেক্ষা করে  গত বছর বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক আইন সংশোধন করা হয়েছে।

 এটা গোটা এনজিও সেক্টরকে হতাশ ও নিস্পৃহ করেছে বলাবাহুল্য। অবশেষে বলবো, সামনের দিনগুলিতে এদেশের ক্ষুদ্র এনজিওদের জন্য অশনি সংকেত এই ভেবে যে, তাদের জন্য বৈদেশিক দান-অনুদান ও সাহায্যের পরিমাণ অনুমান করি শূন্যের কোটায় গিয়ে ঠেকবে। তখন হয়তো তাদেরকে ভিন্নভাবে উন্নত দেশের এনজিওদের মতো আলাদা প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যে কাজ করতে হতে পারে। ততদিনে দেশের তৃণমূলের কত ক্ষুদ্র এনজিও’র ঘরে যে লালবাতি জ্বলবে তা কে জানে যেমনটি এখনও অনেকেই গুটিয়ে বা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই।
লেখক ঃ উন্নয়ন কর্মি।
০১৭১৬-১৮৭৩৯২

বৈষম্যহীন অর্থনীতিই ছিল স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য

আব্দুল হাই রঞ্জু :সা¤্রাজ্যবাদি বৃটিশ বেনিয়াদের শোষণ, প্রজা তথা কৃষক নির্যাতনের করুণ কাহিনী আমরা পাঠ্য বইয়ে পড়েছি। সেই শোষণ আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির আন্দোলন- সংগ্রাম করতে হয়েছে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পিচ্ছিল পথ বেয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন মাস্টার দা সুর্যসেন, ক্ষুদিরাম, অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার মতো অসংখ্য বিপ্লবী। টানা দু’শ বছরের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের ফসল দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত নামক রাষ্ট্রের জন্ম।

 

স্বপ্ন ছিল, বৃটিশ বেনিয়াদের দুঃশাসন বন্ধ হলে শোষণ নির্যাতন বন্ধ হবে। কিন্তুু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব-পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর শোষণ নির্যাতনের নির্মমতার অভিজ্ঞতা নিয়েই বাঙালি জাতিকে আবার নতুন করে আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরেই হাঁটতে হয়েছে। সে ইতিহাস কম-বেশি সবারই জানা আছে। তবে, নুতন প্রজন্মের বাঙালিদের মধ্যে অনেকেরই হয়ত সে অভিজ্ঞতা নেই। মুলত সে কারণেই স্বাধীনতার মাস মার্চে এ লেখার অবতারণা।


১৯৪৭ সাল। সদ্য স্বাধীন পূব পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। হাজার মাইল দুরে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অবস্থান। মুলত পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলেই পাকিস্তানের জন্ম।

 শুধু অবস্থানগত দুরত্বই নয়, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষাগত পার্থক্যও ছিল বেশ দুস্তর। আমরা বাংলাভাষী বাঙালি, আর ওরা উর্দূ ভাষী পাঞ্জাবী। শুরুতেই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী তাদের শাসন ও শোষণের আকাংখা নিয়েই আঘাত হানে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার ওপর। যে ষড়যন্ত্র এ দেশের অগ্র সৈনিক ছাত্র আন্দোলনের মুখে নস্যাৎ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠিত হয় মায়ের ভাষা বাংলার।

মূলত বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামের গর্ভেই জন্ম নেয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন। যা পরিপূর্ণতা লাভ করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মাসের মহান স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ইতিহাস জুড়েই ছিল ছাত্র আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা। ৫২ সালের মাতৃভাষা আন্দোলন এক পর্যায়ে ৬৯’এর গণআন্দোলন, সর্বোপরী সত্তরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাঙালি জাতির আকাংখার প্রতিক আওয়ামী লীগের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। সে অর্জনকেও পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী পদদলিত করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

 বিজয়ী দলকে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে অপারেশন সার্চলাইট নামে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির উপর অতর্কিত হামলা চালায়। ২৬ মার্চ  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

 

সে মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনগোষ্ঠী অংশগ্রহণ করে জীবনবাজী রেখে মাতৃভূমি স্বাধীন করতে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাত্র ৯ মাসে এই মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালিকে অকাতরে জীবন দিতে হয়। সম্ভ্রম হারাতে হয় ২ লক্ষ মা-বোনকে।

 

প্রতিবেশি দেশ ভারত প্রায় ১ কোটি বাঙালিকে আশ্রয় খাদ্য অস্ত্র দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করায় মাত্র নয় মাসে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমরা অর্জন করি দীর্ঘ আকাংখার একটি জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং ভৌগলিক স্বাধীনতা। কিন্তু শোষণ মুক্তির শ্রেণী বৈষম্য সমাজ ব্যবস্থার আকাংখা, স্বাধীনতা উত্তর ৪৫টি বছর পেরিয়ে গেলেও তা যেমন অর্জিত হয়নি, তেমনি নব্য শোষক গোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার আগ্রাসন অতীতের যে কোন আগ্রাসনের চেয়ে বেড়েছে কয়েকগুণ।


মানুষের স্বপ্ন ছিল দেশ স্বাধীন হবে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের মৌলিক অধিকারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। থাকবে না কোন শ্রেণী বৈষম্য; আর শোষণের কোন রাহুগ্রাস। কিন্তু বাঙালি জাতির সেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পদে পদে পদদলিত হয়েছে দেশের গুটিকতক শোষক আর শাসকের হাতে। স্বাধীনতা উত্তর এ দেশের কৃষক জমি হারিয়ে হয়েছে ভূমিহীন বর্গাচাষী। শুধু পেটের দায়ে চাষের জমি পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে দেশের কৃষক সমাজ। শোষণে শোষণে এ দেশের কৃষক চাষের জমি বসতভিটা হারিয়ে হয়েছে বস্তিবাসী। যারা নগর মহানগরে সুরম্য অট্টালিকার তলে খোলা আকাশের নিচে ছন্নছাড়া হয়ে মানবেতর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বলতে গেলে দেশে এখন মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার নেই বললেই চলে।

কিন্তু কথা ছিল, ‘লাঙ্গঁল যার জমি তার’ -এই নিয়মেই চাষীরা জমি চাষাবাদ করবে চাষের জমিতে। সে স্থান এখন দখল করেছে, যান্ত্রিক লাঙ্গঁল। যে লাঙ্গঁলের ফলায় চিরচির করে ধ্বংস হয়েছে কৃষকের বেঁচে থাকার অবলম্বন জমির মালিকানা। সে জমি দখল করেছে জমিদার জোরদারের বদলে নব্য ভূ-স্বামীরা। যাদের জমিতে এ দেশের ভাগ্যহতরা কাজ করে পায় না উপযুক্ত মূল্য।

 

আবার নব্য ভূ-স্বামী পুঁজিপতি গুটিকতক মানুষের শিল্প কারখানায় কাজ করে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অভাবে যারা এখনও মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। যাদের ভাগ্যে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের মত মৌলিক অধিকারগুলো আজও সুদূর পরাহত। অথচ বাঙালি জাতি পাকিস্তানী ২২ পরিবারের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন করলেও স্বাধীনতা উত্তর গত ৪৫ বছরে এ দেশে ২২ পরিবারের বদলে জন্ম নিয়েছে লক্ষ কোটিপতি পরিবারের।

 
পাশাপাশি ঘুষ, দূর্নীতি, লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। বিশেষ করে ঘুষের স্বীকৃতি সমাজে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেখে মনে হয়, ঘুষ বৈধ এবং বৈধতার (?) পথে কেউ হাঁটতে না চাইলে তার কাজও ঠিক মতো হয় না। ফলে ঘুষ একটি অলিখিত আইনে পরিণত হয়েছে।

 

আবার এর মধ্যেও সৎ কর্মকর্তারাও মাঝে মধ্যে যে দেখা মেলে না, তা নয়। কিন্তু যাঁদের সংখ্যা অতি নগণ্য। তবুও সুযোগ থাকার পরও যারা এ ধরনের অনৈতিক কাজ থেকে বিরত আছে, তারাই এ দেশের সম্পদ। মূলত যাদের ওপর ভরসা করেই দেশের প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। মনে হয়, এ ধরনের সৎ মানুষ না থাকলে হয়ত দেশটি রসাতলে তলিয়ে যেত। আর দূর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা এ দেশের সম্মানি (?) ব্যক্তি। কারণ এ দেশের মানুষের মান মর্যাদা নির্ণয় হয় টাকার অংকে।

 

তারা কত বেশি বিত্তশালী, তারাই যেন সম্মানি ব্যক্তি। অর্থাৎ এদেশে অর্থই যেন সম্মানের মাপকাঠি! যাদের অর্থ নেই তারা সৎ এবং নীতি নৈতিকতায় মহামানবের মত হলেও সমাজে তারা একেবারেই অপাংক্তেয়। কারণ পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থার এটাই নিয়ম। লুটপাট করবে, কর ফাঁকি দেবে। অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ দেশে বিনিযোগ না করে বিদেশে পাচার করবে, এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশে বিনিয়োগ উপযোগী কলকারখানাও স্থাপিত হচ্ছে না। আর বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে না, এটাই বাস্তবতা। এ কারণে দেশের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থাৎ শিক্ষা শেষে এ দেশে কর্মসংস্থানের কোন গ্যারান্টি নেই। সংগতকারণে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী হতাশার চোরাবালিতে বিপথগামী হচ্ছে।

 যদিও এ বিপথগামীতা সংকট সমাধানের সঠিক কোন পথ নয়। এ অবস্থা থেকে কর্মক্ষম যুবশক্তিকে যথাযথভাবে কাজ দিতে না পারলে কর্মক্ষম হাতগুলোর অলসতার কারণে দেশের কাংখিত সমৃদ্ধি অর্জন করাও কঠিন হবে। অথচ স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল, দেশ স্বাধীন হবে, শোষণ বঞ্চনার বিদায় হবে।

 

ঘুষ, দুর্নীতি লুটপাট বন্ধ হবে। স্বাধীন দেশে কর্মসংস্থান উপযোগি রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, সেখানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেকারত্ব বিদায় নেবে। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে; কিন্তু দুর্ভাগ্য-স্বাধীনতা উত্তর গত ৪৫ বছরে দুর্নীতি লুটপাটের কারণে রাষ্ট্রায়াত্ব শিল্প লোকসান গুনতে গুনতে ধ্বংস হয়ে গেছে। পানির দামে রাষ্ট্রয়াত্ব পাট, বস্ত্র শিল্পের মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি পর্যায়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

বলতে গেলে এখন রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের বদলে বেসরকারি শিল্পের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সে সব শিল্পের অবস্থাও এ দেশে খুব একটা ভাল নেই। যারা ব্যাংক থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে বিনিয়োগ করলেও যথাসময়ে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয় ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। আবার শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার তাগিদে সেসব ঋণকে পুন:তফসিলিকরণ, সুদ মওকুফ কিম্বা রুগ্ন শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করে পুন: অর্থায়নের মতো কর্মকান্ড নির্বিঘেœই পরিচালিত হচ্ছে। এই  হচ্ছে বাস্তবতা।


অথচ বিদেশি লুটেরাদের তাড়াতে যুগের পর যুগ ধরে বাঙালি জাতিকে আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত না হলেও অর্জিত হয়েছে ভৌগলিক স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে দাঁড় করাতে হলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের কোন বিকল্প নেই।

এ জন্য ঘুনে ধরা পঁচা এই পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তনের আকাংখাকে যতদিন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না, ততদিন দেশীয় নব্য শোষক ও শাসক গোষ্ঠীর শোষণের রোষাণলে পড়ে এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অভাব অনটন, বেকারত্ব, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অভাব মোকাবেলা করেই বেঁচে থাকতে হবে, অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য।


অথচ জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে পশ্চিমা শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হলেও সে অবস্থান থেকে আমরা এখন অনেক দুর সরে এসেছে। এখন তারাই ক্ষমতায়, যারা রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার বদলে শ্রেণী স্বার্থ রক্ষায় বিরাষ্ট্রীকরণের পথেই হাঁটছে। যারা ক্ষমতায় থেকে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা সব সময়ই উচ্চারণ করছেন, কিন্তু বাস্তবে তা অতীতে কোনদিন সম্ভব হয়নি, আবার ভবিষ্যতে কখনও সম্ভবও হবে না।

 

কারণ শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে শোষিত শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। আর পুঁজিবাদি সমাজ কাঠামোর আওতায় কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের মুক্তির আকাংখা করা হবে, ‘সোনার তৈরি পাথর বাটির মতোই’ অবাস্তব এবং কল্পনাপ্রসূত।   
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

 

স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা

মোহাম্মদ নজাবত আলী: প্রত্যেক জাতির আশা আকাংখার মূর্ত প্রতীক তার স্বাধীনতা কারণ স্বাধীনতাহীনতায় কেউ বাঁচতে চায়না। কিন্তু যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতি পরাধীন ছিল। পরাধীন শাসনে বাঙালি জাতি হয়েছে নিষ্পেষিত। বিভিন্ন শ্রেণির শাসক গোষ্ঠি এ বঙ্গীয় নামক জনপদ শাসন শোষণ করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন কারও কাছে মাথা নত করে থাকা বাঙালির স্বভাব নয়। তাই পরাধীন শৃঙ্খল ভাঙতে আমাদের অতীত বীর সন্তানরা লড়াই করেছে। সংগ্রাম করেছে প্রিয় স্বাধীনতার জন্য।


আজ ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। বাঙালির অতীত গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। সেই তিতুমীর, সিরাজ-উদ-দৌল্লা থেকে শেখ মুজিব পর্যন্ত বাঙালি জাতির গর্ব, অহংকার। বাঙালি বীরের জাতি। কবি সুকান্ত লিখেছেন, “সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে ছারখার তবুও মাথা নোয়াবার নয়” সত্যিই বাঙালি জাতি একাত্তরে মাথা নোয়ায়নি। কারণ শাসন শোষণে থাকা বাঙালি জাতির স্বভাব বিরুদ্ধ।

 তাই একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা বাঙালি জাতি জেগে উঠেছিল বিজাতীয় শাসক, শোষকের বিরুদ্ধে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে জাতি মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। একাত্তরে বাঙালি যে সৌর্য্য বীর্যের ইতিহাস রচনা করেছেন তা চির জাগরুক থাকবে ইতিহাসের পাতায় অনাদিকাল।

২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ এই দিনেই ঘোষিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা। তাই এই দিনটির জন্য জাতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে যুগ যুগ ধরে। একাত্তর সালের ২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

 বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন বাঙালি জাতির গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। মূলত তাঁর নেতৃত্বেই বাঙালি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তিনি বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতায় অভিধায় অভিসিক্ত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তান কারাগারে বন্দি থাকলেও পরবর্তী ৯ মাস তাঁরই আদর্শিক নেতৃত্বে বীর বাঙালি যুদ্ধ করেন। ১৬ ডিসেম্বর ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা পায়।


এ বছর আমরা স্বাধীনতার ৪৬তম দিবস পালন করছি। স্বাধীনতা মানে আত্মমর্যাদা। আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকা। সকল প্রকার অনাচার, বৈষম্য, শোষণ, নির্যাতনের বিপরীতে আইনের শাসন, ন্যায় বিচার, সুষম বন্টন, অর্থনৈতিক মুক্তি, মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই গুলোই আমাদের আত্মমর্যাদা ও একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। একটি স্বাধীন জাতি আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ পরাধিন জাতির কখনো আত্মমর্যাদা থাকে না এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতেও পারে না।

 এক সময় দিল্লীর সম্রাট পঞ্চম জজ ভারতের কংগ্রেস নেতা গোখলেকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা স্বাধীনতা চাও কেন ? গোখলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, আমরা স্বাধীন হয়ে আত্মমর্যাদা ফিরে পাব। সম্রাট পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তোমাদের আত্মমর্যাদা কি করে হবে ? কারণ তোমরা তোমাদের নারীদের যে অধস্তন অবস্থায় রেখেছ তাতে তোমরা স্বাধীন হলেও আত্মমর্যাদা ফিরে পাবে না।

 গোখলে তখন সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্বাধীনতার সঙ্গে আত্মমর্যাদার সম্পর্ক যে অতি ঘনিষ্ঠ তা বলার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষেই স্বাধীনতা না থাকলে কোনো জাতির আত্মমর্যাদা থাকে না। তবে সম্রাট পঞ্চম জজ নারীদের ব্যাপারে যে ইঙ্গিত করেছিলেন সেক্ষেত্রে নারীদের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, নারী শিক্ষার প্রসার ও ক্ষমতায়ন হলেও তারা এখনও বিভিন্ন ভাবে শারীরিক, মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

বিশেষ করে যৌতুক, ধর্ষণ এখনও বন্ধ হয়নি। ফলে নারীর মর্যাদা ও সম্মানজনক অবস্থা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে এক্ষেত্রে সরকার যথেষ্ট সচেতন। নারী ধর্ষণ, নির্যাতন এগুলোর ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অতি সম্প্রতি খাদিজার ওপর নির্যাতনকারী বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছে।  


শুধু গোখলের দৃষ্টিতেই নয়, পাকিস্তানি আমলেও আমাদের স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হলে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি অর্জন করবো। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কতগুলো লক্ষ্য উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ যেখানে ধর্মীয় কোনো বিভাজন বা বিদ্বেষ থাকবে না। বাংলাদেশের পরিচয় হবে বহির্বিশ্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ যা হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য।

 আমাদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত। শোষণমুক্ত সমাজ ন্যায় বিচার, মানবিক মূল্যবোধ ও সমতাভিত্তিক একটি সমাজ। সর্বোপরী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। উল্লেখযোগ্য এ আদর্শগুলোকে সামনে রেখে একাত্তরে এ দেশের মুক্তি পাগল জনতা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে জয়ী হয়। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি না আসলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

 এ কারণেই বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ শেষ করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। মূলত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন  এবং তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে এবং বিশ্বে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 ইতিমধ্যে স্বাধীনতার ৪৫বছর পূর্ণ হলো। এই ৪৫বছরে আমাদের অর্জন একেবারে কম নয়। কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি নারী শিক্ষার প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে উজ্জল দৃষ্টান্ত। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের অংশীদার। কিন্তু নারীদের পথচলা এখনও সুগম হয়নি। ঘরে বাইরে কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়।

 নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, বেড়েই চলেছে। অতিসম্প্রতি তনু, রিশা, খাদিজা আক্তার নার্গিস আমাদের অবক্ষয় সমাজের নৃশংস বর্বরতার প্রতীক। নারী নির্যাতন রোধে দ্রুত আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। যে নারী আজ ক্রীড়াঙ্গন, এভারেষ্ট জয় করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল করছে তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজ যে কোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা ও চলার পথকে সুগম করতে পারলে দেশের উন্নয়ন দ্রুত তরান্বিত হবে।


বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক ও অভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার মধ্যে আমরা ইতিমধ্যেই অনেক কিছু অর্জন করেছি। স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে। কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, গড় আয়ু অনেক বেড়েছে। শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন আর মঙ্গা পীড়িত দেশ বা তলাবিহীন ঝুঁড়ি নয়। বাংলাদেশ এখন বিশ্ববাসীর কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ব বাজারে সমাদৃত। প্রবাসী অর্থ অর্জনে পোশাক শিল্প বাংলাদেশের ভাগ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। মধ্যপ্রচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নারীরা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত।

 অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃতি অর্জনের পথে বাংলাদেশ। সমুদ্র বিজয়, ছিটমহল সমস্যার সমাধান, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন কল্পে বড় বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, দারিদ্র বিমোচন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য দৃশ্যমান। মূলত: আইনের শাসন, ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের পথে। আগামী ২০২১সালে স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন অবশ্যই সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাব দিহিতামূলক প্রশাসন ব্যবস্থা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা।


উন্নতি সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে। কিন্তু তবুও কিছু সমস্যা রয়েছে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি আমাদের প্রধান শত্র“। সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তচক্র লুটেরা আমাদের অর্থনীতির গতিকে মন্থর করছে। দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমতা ভিত্তিক সমাজ। প্রান্তিক চাষী, হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কেননা বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলেও এখনো দারিদ্র মানুষের সংখ্যা রয়েছে। এই সংখ্যাকে শূন্যের কোঠায় নামাতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে।

 বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। একাত্তরে লাখো শহীদের স্বপ্ন একটি উন্নত ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন পূরণে সরকারের পাশাপাশি আমাদের অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। কারণ দুর্নীতিই উন্নতির প্রধান বাধা। দুর্নীতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেছিলেন, এদেশের কৃষক, শ্রমিকতো দুর্নীতি করে না। দুর্নীতি করে শিক্ষিত মানুষেরা……। তিনিই প্রকৃতপক্ষেই চেয়েছিলেন দেশের উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন যথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। তাই রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাব দিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনীতিকে অবশ্যই জনকল্যাণমুখী হতে হবে। তাহলে এদেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পারিবর্তন ঘটবে। স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারবে ১৬ কোটি মানুষ। তাই আত্ম বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে আমাদের আরও এগোতে হবে।   

 
আজ ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। তাই আসুন স্বাধীনতার মাসে আমরা শপথ নিই একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার। যেখানে সব ধর্মের মানুষের বসবাসের উপযোগী হবে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। কারণ এ দেশ আমাদের সবার, জাতি, ধর্ম, বর্ণ দলমত নির্বিশেষে আমরা সবাই দেশের উন্নয়নের সহযোদ্ধা। দেশকে ভালোবাসি এবং শোষণ দুর্নীতিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলি। আমরা গভীরভাবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে, স্মরণ করি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লাখো শহীদদের যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা।
লেখক ঃ শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

কবে স্বীকৃতি পাবে একাত্তরের গণহত্যা

আ, ব, ম  রবিউল  ইসলাম  (রবীন) :বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্ত্বার প্রকাশ কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এবং ত্রিশ লাখ তাজা প্রাণের বিনিময়ে আমরা লাভ করেছি মুক্তির স্বাদ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাই বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। মহান মুক্তিযুদ্ধেই বাঙালি জাতি সব্বোর্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে, অর্জনও করেছে তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকারের অনুষঙ্গ,পরিচয়ের উৎস। একাত্তরের আগে আমাদের ভূমি ছিল, মাতৃভূমি ছিল না। দেশ ছিল, স্বদেশ ছিল না।


‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে যে অন্যায়, অবিবেচক, অপ্রত্যাশিত, অমূলক যুদ্ধ চাপিয়ে  পাকিস্তান বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল বাঙালিদের উপর, ইতিহাসে তা বিরল। একটি, একশত, একহাজার বা একলক্ষ নয়, ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল ওরা। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকেও বিবেচনা করা হয়নি। নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে নিরস্ত্র, নিরপরাধ মানুষকে। আড়াই লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে। এত বড় গণহত্যা পৃথিবীর কোথাও হয়েছে বলে জানা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে যে নিষ্ঠুরতা হয়েছে, তা পৃথিবীর একক কোন রাষ্ট্র, বা জাতির ওপর হয়েছে বলে জানা যায় না।


দুঃখজনক হলেও সত্য ১৯৭১ সালে যে ভয়াবহ গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল, আন্তর্জাতিকভাবে তা স্বীকৃতি পায়নি আজও ; বরং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ‘গোন্ডগোল’, ‘গৃহযুদ্ধ’, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেকার যুদ্ধ হিসাবে প্রচার করা হয়েছে কোন কোন মহল থেকে। তবে সংজ্ঞাগত ও তাত্ত্বিকভাবেই বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যাকে স্বীকৃতি না দেওয়ার কোনো কারণ নেই বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইডে গণহত্যার পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্ল্খে আছে।

ৃ কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া- এই পাঁচটি উপাদানের কোনো একটি থাকলেই কোনো ঘটনা গণহত্যা হিসাবে চিহ্নিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শেষটি ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আর সব ধরনের অপরাধই সংগঠিত হয়েছে। তাই একে গণহত্যা না বলার কোনো কারণ নেই।  


তবে এসব বৈশিষ্ট্য থাকার পর বাংলাদেশের গণহত্যা স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণ হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনীহাকে দায়ী করা যেতে পারে। আবার নিজের দেশের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে জোরালো থাকতে হবে। বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয় কানাডা, আর্জেন্টিনা ছাড়াও বিশ্বের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি ও ডিপল ইউনিভার্সিটি, অষ্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ম্যাকোরি, ইউনিভার্সিটি অব হংকং ও পোলান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লজে বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়টি পড়ানো ও গবেষণা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ঠ্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড ষ্ঠাডিজ প্রোগ্রামে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইন্দোনেশিয়াসহ মোট ১৪টি গণহত্যার বিষয়ে উল্ল্খে আছে। এর মধ্যে ‘আদার’ বা অন্য গণহত্যার বিষয়ে উল্ল্খে আছে। বলা হয়েছে, এ গণহত্যার বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে।


অষ্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ম্যাকোরির স্কুল অব লতে বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন একাধিক গবেষক। হংকংয়ের ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের আইন বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক সুজনা লিন্টন ‘কমপ্লিটিং দ্য সার্কেল : অ্যাকাউন্টেবিলিটি ফর দ্য ক্রাইমস অব দ্য ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন’ শিরোনামে একটি গবেষণা করছেন। পোলান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লজের শিক্ষক টমাস লাওস্কি সম্প্রতি ২০১২ সালে ‘ট্রানজিশনাল জ্যাস্টিস অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট অন সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টরনাল ষ্ট্যাবিলিলিটি ইন সাউথ ইষ্ঠ এশিয়া: ‘দ্য কেস অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন।


বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে চর্চার বিশ্বজনীন তাৎপর্য আছে।  বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়ে পাকিস্তান রাষ্ঠ্র ও তাদের দোষরদের অপ্রচারের বিরুদ্ধে এই গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতি দরকার। কারণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম গণহত্যার মতো একটি ভয়াবহ ঘটনার মধ্যে দিয়ে। তাই এই জন্মের ইতিহাস প্রজান্মন্তরে সক্রিয় রাখা দরকার। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড ষ্টাডিজের বাইরে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণহত্যার বিষয়টি পড়ানো হয়না। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সেন্টার ফর স্ট্যাডি অন জেনোসাইড অ্যান্ড জাষ্টিস রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা বিষয়ে সভা,সেমিনারের আয়োজন করছে একধিকবার। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে গণহত্যা বিষয়ে  বিশেষঞ্জগণ এসেছেন তাঁদের আমন্ত্রণে।


ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো জনগোষ্ঠীর আন্তরিক তৎপরতা থাকলে গণহত্যার স্বীকৃতি আদায় যে সম্ভব, তার প্রমাণ আর্মেনিয়া। ১৯১৫ সালে অটোমান সা¤্রাজ্যের শেষ দিকে তুরস্কে ১৫ লাখ আর্মেনীয় গণহত্যার শিকার হয়। গত শতাব্দির এটিই প্রথম গণহত্যা বলে এটি স্বীকৃত। এই গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আর্মেনীয়রা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে। বছর বিশেক আগে থেকে ওই হত্যাকান্ড গণহত্যার স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। এ পর্যন্ত ফ্রান্স, রাশিয়াসহ ২০টি দেশ ওই হত্যাকান্ডকে গণহত্যা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।


২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট নামে যে সামরিক অভিযানে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয় রাজধানী ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে, তাঁর তিনটি লক্ষ্যবস্তুর একটি ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস। এখানে পুলিশ ব্যারাকগুলিতে আগুন ধরিয়ে নির্বিচারে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়। শুধু রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেই দেড়শত পুলিশ সদস্যকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে শুধু পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছেন ১১ শত জনেরও বেশি। এরপর পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর গণহত্যা চলতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের নানা অঞ্চলে।

 
বাংলাদেশের গণহত্যা বিষয়ে বৈশ্বিক স্বীকৃতির জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।  স্কুল, কলেজের সিলেবাসে গণহত্যা বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর্মেনিয়দের মতো সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।  ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে বীরত্ব ও আত্মদানের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। মুক্তিযুদ্ধে শত্রুর পরাজয় বাঙালি জাতিকে বিশ্বের বুকে স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম করেছে। তাই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের থামেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অন্তরে গ্রহণ করতে হবে, অন্দরে ছড়িয়ে দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে বার বার। নইলে মুক্তযুদ্ধ পূর্ণতা লাভ করবে না।
লেখক ঃ শিক্ষক – প্রাবন্ধিক
০১৭৭৪-৯৬২৮৪৯

ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি মাদায়েন ও আয়কাবাসী

মোহাম্মদ শাহ আলম শাহিন : হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের পরিচয় ঃ আল কোরআনে বর্ণনা ধারা হতে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত শোয়াইব (আঃ) দুই সম্প্রদায়ের জন্য নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। প্রথমত মাদায়েন সম্প্রদায়। এদের প্রসংগ এসেছে সুরা আল আরাফের ৮৫ নম্বর আয়াতে, সুরা হুদের ৮৪ নং আয়াতে এবং সুরা আনকাবুতের ৩৬নং আয়াতে। অন্যদিকে আসহাবুল আয়কার বর্ণনা এসেছে সুরা হিজরের ৭৮নং আয়াতে, সুরা শু’য়ারার ১৭৬ নম্বর আয়াতে, সুরা সাদের ১৩ নং আয়াতে এবং কাফের ১৪ নম্বর আয়াতে।


মাদায়েন সম্প্রদায় প্রকৃতপক্ষে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সন্তান ‘মাদায়েন’ এর বংশধর। হযরত শোয়াইব (আঃ) এই বংশেই জন্মগ্রহণ করেন। তাই আল কোরআনে যখন ‘মাদায়েন’ প্রসংগে উপস্থাপন করা হয়েছে তখন শোয়াইব (আঃ)-কে তাদের ‘ভাই’ বলিয়া পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

যেমন সুরা আরাফের ৮৫ নম্বর আয়াত, সুরা হুদের ৮৪ নম্বর আয়াত ও সুরা আনকাবুতের ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন “মাদায়েনবাসীর নিকট তাদের ভাই শোয়াইবকে পাঠিয়ে ছিলাম।” অন্যদিকে “আসহাবুল আয়কা” হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর অন্য ছেলে ‘ইয়াকসান’ এর পুত্র ‘দিদান’-এর বংশধর। এই বংশে হযরত শোয়াইব (আঃ) জন্মগ্রহণ না করলেও তিনি তাদের জন্য নবী ছিলেন।

তাই আল কোরআনে যখন ‘আসহাবুল আয়কা’-এর উল্লেখ এসেছে, তখন হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর ক্ষেত্রে ‘ভাই’ বলে পরিচয় পেশ করা হয় নাই। যেমন সুরা শুয়ারার ১৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন “আয়কাবাসীরা রসুলগণকে অস্বীকার করিয়াছিল, যখন শোয়াইব তাহাদিগকে বলিয়াছিল, তোমারা কি সাবধান হইবেনা?


হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক অবস্থান ঃ
মাদায়েন সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে আল কোরআনে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ পাক সুরা হিজরের ৭৮ ও ৭৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন ঃ “আর আইকাবাসীরা ছিল জালেম। কাজেই দেখে নাও আমিও তাদের উপর প্রতিশোধ নিয়েছি। আর এ উভয় সম্প্রদায়ের বিরাণ এলাকা প্রকাশ্য পথের ধারে অবস্থিত।

” মাদায়েনের মূল এলাকা হিজাযের উত্তর পশ্চিমে এবং ফিলিস্তিনের দক্ষিণে লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। অনেকে বলেছেন, হিজাযের শেষ সীমানার পরে সিরিয়ার উপকন্ঠে ‘মাআন’ নামক স্থানে তারা বসবাস করত।

 প্রাচীনকালে যে বাণিজ্যিক  সড়কটি লোহিত সাগরের উপকুল ঘেষিয়া ইয়েমেন হতে মক্কা ও ইয়ানবু হয়ে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল এবং যে বাণিজ্যিক সড়কটি ইরাক হতে মিশরের দিকে গিয়েছে এর ঠিক সন্ধিস্থলে এই জাতির জনপদসমূহ অবস্থিত ছিল।

এ কারণে আরবের ছোট-বড় সবাই মাদায়েন জাতি সম্পর্কে জানত এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পরও সমগ্র আরবে এদের খ্যাতি অপরিবর্তিত ছিল। কেননা আরববাসীদের বাণিজ্য কাফেলা মিশর ও ইরাক যাবার পথে দিন-রাত এদের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দিয়ে চলাচল করত।

 ইতিহাসে মাদায়েন জাতিকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওরাই ইতিহাসের সর্বপ্রথম জাতি যারা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় লাভ করেছে। তবে এদের মধ্যেই সর্বপ্রথম ব্যাপক দূর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনুপ্রবেশ করেছিল। ‘আসহাবু মাদায়েন’ জাতি ছিল শহরের অধিবাসী। ঐ একই সম্প্রদায়ের একটি অংশ গ্রামাঞ্চলে বা বনাঞ্চলে বসবাস করত। আর সেজন্যই এদেরকে ‘আসাহাবে আইকা’ বলা হয়।


পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি না করার দাওয়াত ঃ
সৃষ্টির সেরা হিসাবে মানুষ দুনিয়াতে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। তারা কয়েক ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে ঃ (ক) নবী-রাসুলদের শিক্ষাকে পরিহার করে পাপাচারের পথ অবলম্বন করেছিল; (খ) নিজেরা হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর অনুসরণ করে নাই এবং যারা তাঁর অনুসরণ করেছিল তাদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেছিল; (গ) পৃথিবীতে সর্বপ্রথম তারা ক্রেতাকে ঠকিয়ে অধিক সম্পদশালী হওয়ার জন্য মাপ ও ওজনে কম দেওয়ার রীতি গ্রহণ করেছিল; (ঘ) প্রকাশ্য যাতায়াতের রাস্তায় ওৎপেতে থেকে তারা মানুষের অর্থ-সম্পদ লুটপাট করত, (তথা মানুষজনকে বেকায়দায় ফেলে কৌশলে তারা অর্থ-সম্পদ ডাকাতি করত এবং রাতারাতি তারা ধনী হয়ে যাইত।) (ঙ) শিরক ও ফেৎনায় নিজেরা লিপ্ত হয়েছিল এবং লোকদেরকে পাপকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করেছিল।


মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের সুরা আরাফের ৮৫ নম্বর আয়াতে বলেছেনঃ “শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবার পর তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিও না। ইহাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা মুমিন হইয়া থাক।“হে আমার সম্প্রদায়! ন্যায়সংগতভাবে মাপবে ও ওজন করবে। লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাবে না। যদি তোমরা ঈমানদার হও, তবে আল্লাহ অনুমোদিত যা বাকি থাকবে তোমাদের জন্য তাই উত্তম। আমি তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক নই। (সুরা হুদ : ৮৫-৮৬)


ইবনে আব্বাস (আঃ) ও হাসান বসরী (রহঃ) ৮৬নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: “মহান আল্লাহ যা কিছু রিযিক তোমাদের দান করেন তা ঐসব সম্পদের তুলনায় অনেক ভাল যা তোমরা মানুষের থেকে ও বিভিন্ন ফন্দি ফিকিরে জোরপূর্বক আদায় কর।হযরত শোআইব (আঃ) তার জাতিকে (নেতাদেরকে) ধমকের সাথে বললেন: “হে আমার সম্প্রদায়! আমার বিরোধিতা  যেন কিছুতেই তোমাদেরকে এমন অপরাধ না করায় যাতে তোমাদের উপর তার অনুরূপ বিপদ আসবে, যেরূপ বিপদ আপতিত হয়েছিল কওমে নুহ, কওমে হুদ কিংবা কওমে সালিহ্র উপর আর কওমে লূত তো তোমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়।” (সুরা হুদ : ৮৯)


“আর কওমে লূত তো তোমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নয়” কথাটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা হল; (১) সময়ের দিক থেকে, অর্থাৎ কুফর ও জুলুমের কারণে কওমে লূতের উপর যে শাস্তি এসেছিল সে ঘটনা বেশি দিনের নয়। তাদের সব বর্ণনাই তোমাদের কাছে পৌঁছেছে। (২) স্থান ও অবস্থানের দিক দিয়ে। অর্থাৎ কওমে লূতের বিধ্বস্ত এলাকা তোমাদের বাসস্থান থেকে দূরে নয়। (৩) নীতি কর্মের দিক থেকে।


অর্থাৎ কওমে লূত যেমন ডাকাতি-রাহাজানী করত, মানুষের ধন-সম্পদের জোরপূর্বক (সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনী দ্বারা) দখল করে নিত এবং বিভিন্ন কৌশলে অর্থ রোজগারের জন্য (অফিস-আদালতে) গোপন ফাঁদ আঁটত, তোমারাও তাই করছ।ইবনে ইসহাক (রহঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছে, রাসুল (সাঃ) যখনই হযরত শোআইব (আঃ)-এর উল্লেখ করতেন তখনই তিনি বলতেন :

তিনি ছিলেন খতীবুল আম্বিয়া (নবীগণের খতিব) মাদায়েনবাসীরা ছিল কাফির, ডাকাত, হাইজাকার, রাহাজানী প্রিয়, ছিনতাইকারী তথা পথচারীদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ সম্পদ ছিনিয়ে নিত এবং আয়কার উপাসনা করত। তাদের লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা ছিল অত্যন্ত জঘন্য। ওজনে ও মাপে তারা খুবই কম দিত। পক্ষান্তরে কারও থেকে নেওয়ার সময় বেশি বেশি নিত। কিছু লোক শোআইব (আঃ) এর উপর ঈমান আনল, কিন্তু অধিকাংশই কুফরীর উপর অটল থাকল। ফলে আল্লাহ তাদের উপর কঠিন আজাব নাযিল করেন।


“তোমরা মুমিন হলে এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং ভয় দেখাবার উদ্দেশ্যে প্রতিটি রাস্তায় বসে থেকো না।” (সুরা : আল-আরাফ-৮৫-৮৬) অর্থাৎ পথের উপর বসে পথিকদেরকে ভয় দেখিয়ে তাদের সম্পদ ও শুল্ক আদায় করো না। সুদ্দী (রহঃ) বলেন, তারা পথিকদের থেকে তাদের পণ্যদ্রব্যের এক-দশমাংশ টোল আদায় করত। ইসহাক ইবনে বিশর (রহঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন, শোআইব (আঃ) এর জাতি ছিল সীমালংঘনকারী, বিদ্রোহী। তারা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে রাস্তার উপর বসে থাকত। মানুষের নিকট থেকে তারা তাদের এক দশমাংশ আদায় করত। চাঁদাবাজির এ প্রথা সর্বপ্রথম তারাই চালু করেছিল।


“আল্লাহ অনুমোদিত যা বাকী থাকবে” সুরা হুদের ৮৬ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হাসান বসরী (রহঃ) বলেছেন: “মহান আল্লাহ যা কিছু রিযিক তোমাদেরকে দান করেন তা ঐসব সম্পদের তুলনায় অনেক ভাল যা তোমরা মানুষের কাছ থেকে (বিভিন্ন ফন্দি ফিকিরে) জোরপূর্বক আদায় কর।”
ইবনে জারীর (রহঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: বেশি মুনাফার উদ্দেশ্যে ওজনে কম দিয়ে মানুষের অর্থ-সম্পদ নেয়ার চাইতে মাপ ও ওজন সঠিকভাবে পুরাপুরি দেওয়ার পর যা কিছু মুনাফা অবশিষ্ট থাকে, তাই তোমাদের জন্যে বহুগুণে উত্তম।


মাদায়েন সম্প্রদায়ের ধ্বংস ঃ
শিরিক, কুফরি, হকের বিরোধিতা, পাপাচার, দূরাচার, সুদ-ঘুষ, হত্যা, গুম, রাহাজানি, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, অন্যায়-অবিচার, চারিত্রিক অবক্ষয় এবং সীমালংঘনের দায়ে যখন মাদায়েন সম্প্রদায়ের পাপ ষোলকলায় পূর্ণ হলে তখন তাদের উপর বহুমুখী শাস্তি নেমে এলো।মহান আল্লাহ তাআলা সুরায়ে হুদের (৯৪-৯৬) নম্বর আয়াতে বলেছেন: “যখন আমার নির্দেশ এল, তখন আমি শোয়াইব ও তার সঙ্গী ঈমানদারগণকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করছিলাম, তারপর যারা সীমালংঘন করেছিল, মহানাদ তাদেরকে আঘাত হানলো। ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল। যেন তারা সেখানে কখনও বসবাসই করেনি। জেনে রেখো, ধ্বংসই ছিল মাদায়েনবাসীদের পরিণাম যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল ছামুদ সম্প্রদায়।

এভাবে একটি সমৃদ্ধশালী জাতি নিজেদের অপকর্ম, অত্যাচার, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা,ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, মাপ ও ওজনে কারচুপি, সুদ, ঘুষ, অপকৌশলে অর্থ আদায়, খাদ্যে ভেজাল, ভ’মি দস্যুতা, প্রভাব-প্রতিপত্তির অহংকার, সীমালংঘন এবং পরিশেষে আল্লাহর প্রেরিত নবী শোয়াইবকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার অপরাধে হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের উপর যেই দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি ও কঠিন আজাব নিপতিত করে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত ধ্বংস করে পৃথিবীর মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত পেশ করলেন।

প্রিয় পাঠক হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর মাদায়েন জাতি ছিল ইতিহাস প্রসিদ্ধ একটি সমৃদ্ধশালী জাতি। এই জাতি এমন কি অপরাধ করল যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে ধ্বংস  করে সেই ধ্বংসের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর সকল মানুষের সামনে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনের মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আমরা যেন ঐ সকল ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির মত আচরণ না করে সুন্দর এই পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি না করি। আসুন কোরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে আমরা হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর জাতির আলোচনা শুনি এবং আমাদের এই বাসযোগ্য পৃথিবীকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলি।
গ্রন্থপঞ্জী-আল-কোরআন, তাফসীরে ইবনে কাসির, আল-বিদায়া, সিরাত বিশ্বকোষ, তাফহীমুল কোরআন
লেখক ঃ প্রভাষক- ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
মহাস্থান মাহী সওয়ার ডিগ্রি কলেজ, বগুড়া
০১৮৫৭-৪৫২১৬২

পশুর যখন লেজ বড়..

: শিরোনাম দেখে ভাববেন না ডিসকভারি চ্যানেলের মত পশুদের লেজ নিয়ে গবেষণায় বসেছি। তবে পশুদের লেজ না হলেও মানুষের লেজ নিয়ে তো গবেষণা করাই যায়। তা হলে কপালে চোখ তুলে প্রশ্ন করবেন কী, মানুষের আবার লেজ কোথায়? আমি তো বলি, কোনো কোনো মানুষের লেজও আছে। সেই লেজ দেখা যায় না বটে, অনুভব করতে হয়।

 তারপরও ‘মানুষের লেজ’ নিয়ে লিখতে গিয়ে পশুর লেজের কথায়ও যেতে হচ্ছে। মনে হয়, পশুর লেজ অনেকটা তাদের অহংকারের প্রতিক। লেজের তেমন কাজ নেই, তবে অবসর সময়ে যে কায়দায় বসে জবর কাটতে কাটতে লেজ দিয়ে মশা-মাছি তাড়ায়- তাতে অহংকারের ভাব থাকে ছোট-বড় সব পশুদের মধ্যেই।

পশুদের মত কতিপয় মানুষের মধ্যেও অহংকারের বীজ পাওয়া যায়। যেমন ‘পশুত্বের’ বীজ থাকে পশু ও মানুষের মধ্যে। মানুষ তার শিক্ষা-সংস্কৃতি দিয়ে সেই পশুত্বকে দমন করে। তখন মানুষ হয়ে যায় মানব, কখনো কখনো মহামানব।

 তবে যাদের মধ্যে শিক্ষা বা সংস্কৃতি কাজ করে না, তারা পশুতে পরিণত হয়। যে ‘পশুরা’ পশুদের মত অহংকার ছড়ায় সমাজে। যা থেকে সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়ায়। মানুষের সেই গুণটি হলো- সে যা নয়, তাই প্রকাশ করে। অনেকটা ময়ুরের পেখম তোলার মত। নেচে-গেয়ে মন হরণ করতে চায়।

আর তা থেকে বেনিফিশিয়ারী হয়। এ ক্ষেত্রে অহংকার হলো মানুষের লেজ। এই অহংকারের তখনই জন্ম হয়, যখন সে বিত্ত-বৈভবে ফুলে ফেপে ওঠে। এক কথায় বিত্ত- বৈভবের গর্ভে জন্ম নেয় অহংকার। মানুষ তার অতীত ভুলে গিয়ে ধন-সম্পদকে উপরে ওঠার সিঁড়ি বানায়।

সে ভুলে যায়- কোথায় চলেছেন তিনি। একদিন যারা তার চার পাশে ছায়া দিত, সেই তাদের হেয় জ্ঞান করেন। আর নতুন সম্পদকে ঘিরে একদল মৌমাছি গান করতে করতে চার পাশে ভিড় জমায়। মধুর সন্ধানে। যে কথাটি সব সময়ই বলতে চাই তা হলো- মানুষকে শোষণ ছাড়া ধন-সম্পদ হয়না।

কোনো না কোনো ভাবে সে মানুষকে শোষন করেই। সেটা ‘ধর্মীয় লেবাস’ থেকে শুরু করে ‘আমজনতা’ যে কোনো সাজ নিয়ে। ঘুরিয়ে বলা যায়, ‘যেমন খুশি তেমন সাজ নেয়’ শোষণের নিমিত্তে। তবে যারা ব্যতিক্রম তাদের কথা আলাদা। আর অহংকার মানুষকে ডুবিয়ে দেয়।

সামান্য বাতাসে যেমন লাউগাছের লতা সহজেই ভেঙ্গে যায়। তেমনটি মানুষের অহংকার। এই অহংকার কী চিরস্থায়ী? ওই যে বললাম লতা-পাতার মত। বাতাসের পাশাপাশি প্রবল জলস্রোতে যা ভেসে যায়। কিন্তু যতদিন প্রবল বাতাসের সৃষ্টি না হবে ততোদিন ভোগান্তি হবে মানুষের, সেই সব অমানুষের কাছ থেকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল বলেই আমাদের অনেকের ভাগ্যে পরিবর্তন এসেছে। তবে এই পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরা দেশের এবং জনগণের কথা যথাযথ ভাবে মনে রাখছি তো?

 
কয়েকদিন আগে ইন্টার্নী চিকিৎসকরা ধর্মঘটে গিয়েছিলেন। একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল হাসপাতালগুলোতে। ভাবছিলাম, জীবন-মরণ বিষয় নিয়ে এভাবে ধর্মঘটে যাওয়া উচিৎ কিনা। অনেক সময় রোগির স্বজনরা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করে বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করেন। অনেক সময় তা আবেগের বশবর্তী হয়ে করা হয়। হয়তো তা করা মোটেও ঠিক নয়। কিšুÍ

তাই বলে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা হুমকির মধ্যে নিয়ে যাওয়া ঠিক মনে হয়না। এ ব্যাপারে একটি খবরের দিকে চোখ ফেরানো যাক। সম্প্রতি একজন চিকিৎসককে ধানমন্ডির একটি হাসপাতাল থেকে উত্তরায় বদলি করায় চিকিৎসকরা গত ১৪ মার্চ ধর্মঘট ডাকেন। খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগি সেখানে যান। ধর্মঘটের কারণে তারা চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

 এমনকি জরুরি বিভাগেও কোনো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই প্রিন্সিপালের নেতৃত্বে এই ধর্মঘট চলছে। এতে রোগিদের চরম ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে, যা আইন ও নৈতিকতা বিরোধী।’ এ নিয়ে ধর্মঘট স্থগিত চেয়ে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের ধর্মঘট ছয় ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

 সেই সঙ্গে ‘রোগীদের জিম্মি করে ধর্মঘট ডাকা’ কেন বে-আইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে আদালত। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাই কোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। একই দিনে আরেকটি খবর এসেছে প্রিন্ট মিডিয়ায়।

খবরে বলা হয়, ‘প্রয়োজন না হলেও ভুল তথ্য দিয়ে হৃদযন্ত্রে রিং বসাতে (এনজিওপাস্টি) রোগিকে বাধ্য করার চেষ্টার অভিযোগে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসকসহ দুজনকে তলব করেছে আদালত। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে কাওলা দক্ষিণখানের বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান কামরুলের করা মামলায় মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনসারী এ আদেশ দেন। বিচারক আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে তাদেরকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

  খবরে প্রকাশ, লুবানা হাসপাতালে করা এনজিওগ্রামে হৃদযন্ত্রে ব্লকের পরিমাণ ‘প্রতারণামূলকভাবে’ বেশি দেখিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আসামিরা রিং বসানোর উদ্যোগ নেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার বিবরণে আরজিতে বলা হয়, ৩৮ বছর বয়সী বাদী কামরুল ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টার দিকে বুকে ব্যথা ও চাপ অনুভব করলে উত্তরার আধুনিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।

 সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাৎক্ষণিকভাবে তার ইসিজি করে ডা. রাকিবুলের তত্ত্বাবধানে ভর্তি করে নেন। পরদিন আবার ইসিজির সঙ্গে হেমাটোলজি ও বায়োকেমিক্যাল ও ইকো কালার ডপলার পরীক্ষা করেন। ওই দিনই বিকাল ৪টায় রিপোর্ট পাওয়ার পর রাকিবুল রোগির লোকজনকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ‘হৃদযন্ত্রে সমস্যা থাকায় এনজিওগ্রাম করতে হবে’ বলেন। ‘কম খরচে উন্নত চিকিৎসার’ কথা বলে রোগিকে লুবানা জেনারেল হাসপাতালে যেতে বলেন ওই চিকিৎসক। কামরুল ওই দিনই সেখানে ভর্তি হলে রাকিবুল নিজেই তার এনজিওগ্রাম করেন।

 পরে তিনি রোগির স্বজনদের বলেন, রোগির হৃদযন্ত্রে ব্লকের পরিমাণ ৯০ শতাংশ, জরুরি ভিত্তিতে রিং না বসালে বিপদ হবে, এমনকি রোগির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ওই দুই আসামি রিংয়ের দাম এবং আনুসঙ্গিক চিকিৎসা সেবাসহ রোগির স্বজনদের কাছে ৩ লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু রোগির স্বজনরা তাতে রিং বসাতে সম্মত না হলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

পরে রোগি শেরে বাংলানগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানে এনজিওগ্রাম রিপোর্ট দেখে সেখানকার চিকিৎসক অধ্যাপক এম আক্তার আলী বলেন, ব্লকের পরিমাণ এতো সামান্য যে আদৌ রিং বসানোর দরকার নেই। বাদির আইনজীবী মঞ্জুরুল বলেন, ‘আসামিরা বাদি ও তার আত্মীয়স্বজনকে মারাত্মক রকমের হেনস্থা করেন; তারা ভয়ভীতি দেখান এবং গালিগালাজও করেন।’

আরো এমন অনেক অভিযোগ নিয়ে আলোচনায় না গিয়ে প্রশ্ন রাখতে চাই- আমরা চলেছি কোথায়? সমাজের এমন সব চিত্র আমাদের ব্যাকুলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জানতে ইচ্ছে করে- আমাদের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে যদি আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয় তবে আর থাকে কী ?  আমরা মানুষ হবো কবে ?


আমরা এক সময় শুধুই ডাল-ভাত, পরে ভাত-মাছের মানুষ হলেও দিন বদলে এখন ইলিশ আর গরুর মাংস ভোজী হয়ে গেছি। কিšুÍ সেখানে কত দিন থাকতে পারবো তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তখন পুকুরের মাছ আর জমির ধানেই আমাদের পেট ভরতো। এখন সেখানে এসেছে মাছের রাজা ইলিশ। তবে বাজারে ইলিশের যে দাম তাতে অদূর ভবিষ্যতে ইলিশের গন্ধ শুকে হয়তো দিনপাত করতে হবে। আর গরুর মাংস? সে তো ‘সোনার হরিণ’। আজ থেকে কয়েক বছর আগে সুইডেনের নাগরিক আমার জ্যেষ্ঠ শালিকার সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল।

 বাজার নিয়ে কথা উঠতে সে জানায়, ওই দেশে গরুর মাংস ৫শ’ টাকা কেজি। আমি তখন শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। এখন আমাদের দেশেই গরুর মাংস ৫শ’ টাকা কেজি। কয়েক দিন আগে ঢাকায় গরুর মাংস বিক্রেতারা ধর্মঘট করেছে দাম বৃদ্ধির দাবিতে।

সভায় শুরুতে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দাম বৃদ্ধিতে আপত্তি জানায়। মাংস বিক্রেতারা বলে চাঁদাবাজি বন্ধ হলে আগের দামেই মাস বিক্রি করতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধের দায়িত্ব নেয়নি সিটি করপোরেশন। নেবেই বা কেনো- একদিকে চাঁদাবাজি বন্ধের ক্ষমতা তাদের নেই। অন্যদিকে চাঁদাবাজরা কম ক্ষমতাধর নয়। বাজার দর নিয়ে বলতে না পারলেই ভালো হতো। কেননা কারো কারো মতে বাজারে জিনিস-পত্রের দাম স্বাভাবিক রয়েছে।

 সে ক্ষেত্রে এই ছাপোষা মানুষ যদি বাজার দর নিয়ে প্রশ্ন তুলি তবে সবাই বলবে আমি বাজারেই যাইনা। আসলেই তাইÑ আমি আর বাজারে যেতে চাই না। গরুর মাংসের দাম বেড়েছে বলে কী খদ্দেরের অভাবে দোকান কী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? আসলে আমরা যারা একদিন মধ্যবিত্ত ছিলাম তাদের একটা অংশ নিচে নেমে যাচ্ছি আর অন্য অংশটি উপরে উঠে গেছে।

 সেই পাকিস্তানী আমলে যেমন ২৩ পরিবার ছিল, এখন সেখানে ২৩ হাজার পরিবার হয়েছে। এক দল পায়ে হেঁটে হেঁটে শুকতলা ক্ষয় করে, আরেক দলের পরিবারের সকল সদস্যদের একটি করে গাড়ি আছে। রাজনৈতিক কালচার থেকে শুরু করে সব কিছুতে আমাদের মানসিকতা যেন দিনে দিনে নিকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সমাজের এমন সব কর্মকান্ডই পশুদের লেজের পর্যায়ে পড়ে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

atalkaratoa01552@gmail.com
০১৫৫২-৩২২৯৪২

আলো জ্বালাতে হবে প্রীতি দিয়ে

আতাউর রহমান মিটন: সপ্তাহ জুড়ে আমি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরলাম। সাথে ছিলেন ৮০ বছর বয়সী এক জাপানী মহিয়সী নারী। তাঁর নাম হিরোকো কোবায়াসি। খুব ভোরে সূর্য ওঠার ছবি তোলা থেকে শুরু করে নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করলাম। কোবায়াসি’র দৃঢ়তা, এই বয়সেও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য কিছু করার অভিপ্রায়ে ছুটে চলার গতি দেখে আমি আবারও মুগ্ধ হলাম। মনের ভেতরে সুর বেজে উঠছে, ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য …’। গানটি গেয়েছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত জনদরদী, গণমানুষের গায়ক ভূপেন হাজারিকা।


জাপানে সম্মানের সাথে কোন নাম উচ্চারণ করতে শেষে ‘সান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সান শব্দটি নারী-পূরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। যা হোক। কোবায়াসি সান বাংলাদেশে এবার এলেন দু’বছর পর। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষতঃ বিদেশিদের উপর আক্রমণের প্রেক্ষিতে জাপান সরকার ঘোষিত নিরাপত্তা নির্দেশিকা’র কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি আসতে পারছিলেন না। এখন পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভাল, তাই তিনি ছুটে এসেছেন।


সেই ২০০৩ সাল থেকে তিনি প্রতিবছর বাংলাদেশে আসছেন। প্রথমবার এসেছিলেন একজন পর্যটক হিসেবে। আমাদের জাপান প্রবাসী বন্ধু, জাপানস্থ বাঙালিদের সংগঠন ‘নবদিগন্ত’-এর সম্পাদক, ফটোগ্রাফার খন্দকার আনিসুর রহমান তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি বাংলাদেশে এসে এখানকার প্রকৃতি, বিশেষ করে আমাদের গ্রামীণ মেয়েদের জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতা, দুরাবস্থা ইত্যাদি সত্ত্বেও এগিয়ে চলার শক্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এগিয়ে চলার প্রত্যয়ী এই মেয়েদের পাশে কিভাবে দাঁড়ানো যায় সে বিষয়ে তিনি আমাদের সাথে কথা বলেন। অনেক আলোচনা করে, অনেক বিষয় ভেবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় তিনি বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করবেন। কিন্তু কিভাবে?


বাংলাদেশ সরকার মেয়েদের লেখাপড়া এগিয়ে নেয়ার জন্য অনেকগুলো ইতিবাচক কর্মসূচি নিয়েছেন। যেমন মেয়েদের জন্য স্কুলের বেতন মওকুফ, উপবৃত্তি চালু ইত্যাদি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিনামূল্যে বই অবশ্য ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য বিতরণ করা হয়।

সরকারের এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলি মেয়েদের শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। কিন্ত তথাপি গ্রামে বহু মেয়েকে আমরা দেখেছি যারা অর্থনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়ছে। কারণ, স্কুলের বেতন মওকুফ হলেও পড়ালেখার অন্যান্য খরচ প্রয়োজন হয়। লাগে প্রাইভেট শিক্ষক। সেই খরচগুলিও কিন্ত কম নয়। আমরা কথা বলে, ঘুরে ঘুরে দেখেছি এই খরচ জোগাতেও অনেক পরিবার হিমশিম খেয়ে যান। তাই তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।


২০০৩ সালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় মোস্তবাপুর গ্রামে আমরা সে সময় খাদিজা নামের একটি মেয়েকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পরিবার সহযোগিতা না করায় আত্মহত্যা করতে দেখেছি। কোবায়াসি সানসহ আমরা সেদিন গ্রামে ঘুরছিলাম। হঠাৎ এই কাহিনী জানতে পেরে তিনি বিমর্ষ হয়ে যান।

নিজের ফেলে আসা অতীত কোবায়াসি সান এর সামনে এসে দাঁড়ায়। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া অর্থনীতিতে তিনিও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হিমশিম খেয়েছেন। তিনি নিজেও অন্যের সহযোগিতা নিয়ে লেখাপড়া করেছেন। সেই সময় তাঁর একটি প্রতিজ্ঞা ছিল, ‘জীবনে প্রতিষ্ঠা পেলে তিনিও অন্যদের সহযোগিতা করবেন।’ সেই প্রতিজ্ঞা থেকেই শুরু হয় ‘হাঙ্গার ফ্রি উমেন স্কলারশীপ’ এর যাত্রা।


ব্যক্তিগত জীবনে হিরোকো কোবায়াসি ‘ইকেবানা’ (ফুল সাজানোর জাপানী কৌশল বা আর্ট) শিক্ষক। এই পেশা থেকে তিনি যা আয় করেন তা খুব বেশি নয়, তবু তিনি এর একটি অংশ বাংলাদেশের মেয়েদের লেখাপড়ার খরচের জন্য দান করেন। একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি ছবি তোলেন এবং সেই ছবি বিক্রির অর্থও তিনি বাংলাদেশের নারীদের জন্য দান করেন। এভাবেই ‘হাঙ্গার ফ্রি উমেন স্কলারশীপ’ এর মূল তহবিল গড়ে ওঠে।

প্রায় ৩২ লক্ষ টাকার এই তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্বেচ্ছাব্রতী সংগঠন হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড এর উপর ন্যস্ত। গত বছর থেকে অবশ্য বাংলাদেশের কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল ব্যক্তি এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন এবং তাদের নিয়ে একটি ‘ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠিত হয়েছে। আমি নিজেও সেই কমিটির জন্য একজন সদস্য।

 কিছুদিন আগেও ১১০ জন মেয়েকে আমরা পড়ালেখায় সহযোগিতা করতে পারতাম কিন্তু ব্যাংক ইন্টারেষ্ট ১৩% থেকে বর্তমানে ৬%-এ নেমে আসায় আমাদের আয় কমে গেছে। এ বছর ৭০ জন মেয়েকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এই কর্মসূচি পরিচালিত হয় ব্যাংকে রক্ষিত আমানত এর বিপরীতে প্রাপ্ত ইন্টারেষ্ট থেকে। মূল টাকাটা গচ্ছিত রেখে পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য আমরা চেষ্টা করছি যাতে এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকে।

আমাদের সামনে বাধা অনেক কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো। শুরুতেই এই কর্মসূচিটি জাপানী অনুদান নির্ভর হলেও বর্তমানে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী এর সাথে যোগ দিয়েছেন। নারী শিক্ষা বিস্তারে আমাদের এই প্রচেষ্টায় যে কেউ যোগ দিতে পারেন।


মিস হিরোকো কোবায়াসি ২০০৪ সালে বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে ঢাকা শিল্পকলায় এবং জাপানের টোকিওতে ‘চিত্র প্রদর্শনী’ আয়োজন করেছিলেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তিনি টোকিওতে আবার প্রদর্শনী করছেন। এবারের থিম বা বিষয়বস্তু ‘বাংলাদেশের নদী ও নারী’। সুদূর পঞ্চগড়ের করতোয়া, লালমনিরহাট পয়েন্টে তিস্তা ব্যারেজ থেকে দক্ষিণের হাতিয়া দ্বীপ পর্যন্ত তিনি এবার ছবি তুলছেন।

তিনি নদীর পাশাপাশি নদী পাড়ের নারীদের ছবি তুলেছেন, চেষ্টা করেছেন নারীর জীবন সংগ্রামকে ফ্রেমে তুলতে ধরতে। বিশেষ করে জাপানের দর্শকদের কাছে বাংলাদেশ এবং এই দেশের মায়েরা, মেয়েরা কিভাবে দৃপ্তভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন সেটা তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।


প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে কোন একটা নদী বা জলাধারের পাড়ে গিয়ে সূর্যোদয়ের ছবি তোলার যে সংগ্রাম, তা আমাকে ক্লান্ত করলেও কোবায়াসিকে স্পর্শ করতে পারেনি। বলতে দ্বিধা নেই, আমি তার চেয়ে বয়সে অনেক কম হলেও তিনি আমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জীবনীশক্তি সম্পন্ন একজন মানুষ।

আমি ভাবতেই পারি না যে ৮০ বছর পর্যন্ত আমি বাঁচব অথচ তিনি ৮০ বছর বয়সে ছুটে চলেছেন, কার্যতঃ দৌড়াচ্ছেন! কোথায় পাচ্ছেন তিনি এই ছুটে চলার শক্তি? আমার মনে হয় এর উৎস ‘ভালবাসা’। পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য ভালবেসে কিছু করতে যাওয়ার বাসনাই তাকে শক্তি যোগাচ্ছে। ¯্রষ্টা নিশ্চয় তাঁর প্রতি লক্ষ্য রাখছেন, তাঁকে সহযোগিতা করছেন কারণ তিনি জীবের সেবা করছেন আর আমরা তো জানি, ‘জীবে সেবা করিছে যে জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’।  


হিরোকো কোবায়াসি সান এর সাথে এবার খন্দকার আনিসুর রহমান বাংলাদেশে এসেছেন। আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম কোবায়াসি সান এর বাংলাদেশ সফর এবং তাঁর কাজ সম্পর্কে মন্তব্য করতে। তিনি বললেন, ‘ফটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব।

একজন মেয়ে হিসেবে বাংলাদেশের মেয়েদের দুর্দশা দূর করার জন্য তাঁর যে আকুতি সেটা আমাকে বিস্মিত করে। কোবায়াসি মেয়েদের আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে তাদের আত্মশক্তির বিকাশ চান। আমি মনে করি বৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকারের কাজে সহযোগিতা করছেন।

 জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস তাঁর এই কর্মকান্ড সম্পর্কে জানেন। ছবি এমন একটা মাধ্যম যা দিয়ে খুব দ্রুত অন্যের কাছে অনুভূতি তুলে ধরা যায়। তিনি বাংলাদেশের রূপ ও রং দেখে মুগ্ধ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে জাপানের তুলনায় দরিদ্র হলেও এ দেশের প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে বিরাজমান আধ্যাত্মিকতার শক্তি খুবই বেশি। আমি এই নারীর সাথে আছি। বাংলাদেশের বন্ধু অনেক।

সেই বন্ধুত্ব বিনষ্ট হয়, বিদেশের মেহমানরা অসম্মানিত বোধ করেন এমন কাজ করা আমাদের উচিত নয়। আমি বাংলাদেশের সকল মানুষকে বলব আপনারা বাঙালির সত্যিকার সাংস্কৃতিক যে চেতনা, মেহমানদের বরণ করার যে হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে, সেটা দয়া করে নষ্ট করবেন না।’


কোবায়াসি সান তাঁর বৃত্তির কর্মসূচির মেয়েদেরকে নিজের মেয়ের মত ভাবেন। তাঁর বাসায় ফটো এলবামে সকলের ছবি আছে। নিকট বন্ধুদের সাথে তিনি ছবিগুলো শেয়ার করেন। ঠিক আমরা যেমনটি করে থাকি। সেই মেয়েদের সাথে দু’বছর পরে হলেও দেখা করতে পেরে এবার আনন্দে তিনি কেঁদেছেন। তিনি বললেন, ‘আমি আবার বাংলাদেশে আসতে পারব কি না জানি না, তাই আমি আমার মেয়েদেরকে বলব, তোমরা ভাল থেকো, এই দেশটাকে তোমরা ভালবাসা দিয়ে গড়ে তোল।’

 
বাংলাদেশ সত্যিই একটা সুন্দর দেশ। এই দেশকে ভালবাসা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি নয়, ক্ষুদ্র স্বার্থে হানাহানি নয়, মায়ের মমতায়, বোনের উদারতায় আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। একজন নারী প্রাণের জন্ম দেয়, সে কখনও প্রাণ কেড়ে নিতে পারে না। ছবির শক্তি ব্যবহার করে মেয়েদের অবস্থা পরিবর্তনে কোবায়াসি সান কাজ করছেন। তিনি সাধারণভাবে অসাধারণ কাজ করছেন।

‘মানুষ মানুষের জন্যে..’ এই কথাটা মনে রাখতে হবে। ভূলে গেলে চলবে না যে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে আমার দায়িত্ব ‘দান করা’। আমাদের দিয়ে যেতে হবে। শুধু নেয়ার দিকে মনযোগ দিলে প্রশান্তি মিলবে না। কোবায়াসির মানবতা, প্রীতিবোধ আমি ভাষা দিয়ে হয়তো বোঝাতে পারব না।

এটা অনুভব করার বিষয়। যেমন ধরুন, তিনি বাংলাদেশে আসার সময় সকলের কথা ভেবে চকলেট নিয়ে এসেছেন, এই যে তিনি সকলের কথা ভাবলেন, হাতে করে কিছু একটা আনলেন এটা আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? এটা কি অর্থমূল্য দিয়ে বিচার করা যাবে? ভালবাসা সব সময় অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়।


দেশের বিরাট একটা অংশ এখনও নানাভাবে পিছিয়ে পড়ে আছে। অনেকের দুঃখ-দুর্দশার করুণ গল্পগুলো ধামাচাপাই থেকে যায়। অথচ তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এটা করতে হবে ভালবেসে, নিঃস্বার্থভাবে। রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, “মানুষকে সকলের চেয়ে নত করিবার উপায় তাহার হিত করা অথচ তাহাকে প্রীতি না-করা। প্রীতির দানে কোনো অপমান নাই”। ¯্রষ্টা কোন কোন মানুষকে অনেক ধন-সম্পদ দিয়েছেন।

কিন্তু সকলেই সেই সম্পদ মানুষের জন্যে ব্যবহার করতে পারেন না। আবার পরের উপকার করতে চাইলেও উপকার করতে পারা যায় না। কারণ উপকার করার অধিকার থাকা চাই। প্রীতির সম্পর্কটা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দানের পরিমাণে নয়, প্রীতির পরিমাপে আসুন একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি।
লেখক ঃ সংগঠক-প্রাবন্ধিক

miton2021@gmail.com
01711-526979

জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন ধর্মীয় অনুশাসন

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ একটি প্রধান সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সমস্যা। বিশ্বের দেশে দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ যেভাবে তার ডালপালা বিস্তার করছে এতে সামাজিক স্থিতি এক বিরাট হুমকির মুখে এসে পড়েছে। কোন মানুষই আর নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। সন্ত্রাসীদের কর্মকা  শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠিবিশেষকে কেন্দ্র করেই নয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোও সব সময় আতংকগ্রস্ত করে রাখে।


আমাদের মুসলিম বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। বহুঘাত প্রতিঘাত লড়াই ও সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশ। যে দেশে দল, মত ও ধর্ম-বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকলের চিন্তা ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। এমন একটি দেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে সন্ত্রাসী কর্মকা  পরিচালনা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার।

কারণ সত্য ও বাস্তব দিক হচ্ছে, যে দেশে চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে এবং জনগণের মাধ্যমে তাদের অধিকাংশের পছন্দ অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা ও সরকার বেছে নেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে সে দেশে দাবি আদায়ের জন্য সশস্ত্র তৎপরতা জনগণের সমর্থন লাভ করতে পারে না। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান সহ ২৪ জনের মৃত্যু জাতিকে হতবাক করে দিয়েছে। গত ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার মত অচিন্তনীয় ঘটনাটিই সংঘটিত হলো। সেই সময় সারাদেশে ১৬১টি মামলা হয়েছিল। তার মধ্যে ১০২টির বিচার শেষ।

 ঝুলে আছে ৫৯টি মামলা। এতে ১৫ জনের মৃত্যুদন্ড আর ২৪৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে (দৈনিক ইত্তেফাক ১৭/০৮/২০১৬)। এছাড়াও ১ জুলাই-১৬, গুলশানে বিদেশী রেষ্টুরেন্টে হলি অর্টিজান হামলা, ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় ঈদগাহে হামলা-২০১৬ সহ বিভিন্ন স্থানে অতর্কিত বোমা নিক্ষেপ জাতিকে হতবাক করে দিয়েছিল। অবশ্য এই উগ্র অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশের রাজনৈতিক অরাজনৈতিক, পেশাজীবী, নির্বিশেষে সকল ইসলামী মহল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এ সন্ত্রাসের বা জঙ্গিবাদের তীব্র নিন্দা করেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, ইসলাম সন্ত্রাস সমর্থন করে না, সন্ত্রাস ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার পথ নয়। বাংলাদেশে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার দাবির নামে সাম্প্রতিককালে যে সন্ত্রাসী হামলা চলানো হয়েছে কোরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে তা জিহাদ পর্যায়ভূক্ত নয় বরং নিছক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মাত্র। হযরত আবু সাঈদ খুদরী ও আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত মহানবী বলেন “আসমান ও যমীনের সমস্ত বাসিন্দাও যদি একজন মুমিনকে হত্যা করার ব্যাপারে শরীক থাকে তবে তাদের সবাইকে মহান আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”। (আত তিরমিজি-২৫৯)
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ইসলামী দর্শন :


মহানবী (স:) অশান্ত পৃথিবীতে এসে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন একমাত্র ভালবাসা আর ক্ষমার মাধ্যমে। ক্ষমার মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি, প্রাণের শত্র“কে তিনি ক্ষমা করতে দ্বিধাবোধ করেন নাই। মক্কা ও তায়েফ বিজয়ের সময় তিনি সে ক্ষমার আদর্শ দেখিয়েছেন। ইসলাম শান্তির ধর্ম, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোন নজির নাই। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। ইসলাম শান্তির ধর্ম, পৃথিবীর শান্তি ও সৌহার্দ্য স্থাপনই এর লক্ষ্যে।

]উগ্রতা ও সন্ত্রাসের বিপরীত শব্দ। যে ধর্মের নামই শান্তি সে ধর্ম অশান্তি সৃষ্টিকারী বা সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গিবাদ গ্রহণ করতে পারে না বা করে না। সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা  এ ধর্মে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কারণ ইসলাম হচ্ছে সার্বজনিন ধর্ম। সেখানে উগ্রবাদের কোন স্থান নেই। তাই আল্লাহ বলেন “দ্বীন সম্পর্কে জোর জবরদস্তি নেই। সত্যপথ ভ্রান্তপথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে।

সুরা বাকারা-১৫৬মহানবী (স.) যে ধর্ম এনেছে তাতে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা নিষিদ্ধ। ইসলাম সকল মানবজাতিকে অখ  সমাজভূক্ত করেছেÑতাইতো মহান স্রষ্টা ঘোষণা করেছেন নিশ্চয়ই মানবজাতি এক অখ  সমাজ। (সূরা বাকারা-২১৩)


আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা রাসূলে কারীম (সা:) কে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছিলেন শান্তির দূত হিসেবে। তিনি ছিলেন সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন। তিনি যুবক বয়সে সন্ত্রাস নির্মূল করে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে হিলফুল ফুজুল নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার জন্য উদ্যোক্তাদের সহযোগী হয়েছিলেন। এ সংগঠনের অন্যতম শর্ত ছিল: আল্লাহ্র কসম, মক্কা নগরীতে কারো উপর অত্যাচার করা হলে আমরা সবাই মিলে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাহায্য করবো-চাই সে উঁচু শ্রেণির হোক, না নীচু শ্রেণির, স্থানীয় হোক, বা বিদেশী। অত্যাচারিতের প্রাপ্য যতক্ষণ পর্যন্ত না আদায় করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এভাবেই থাকবো [দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ (ইফাবা, ১৯৮৭), ২য় খ  পৃ. ২২৮]। এভাবে মহানবী (স.) তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য মানব ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 একটি কথা না বললেই নয় তা হচ্ছে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার জঙ্গির অন্যতম কারণ। তাই ধর্মীয় অতুভূতি জাগ্রত করতে হবে সর্বত্র। একজন প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তি কোন অবস্থায় জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হতে পারে না। তার দ্বারা মানুষতো দূরের কথা বরং কোন প্রাণির ক্ষতি হবে না। আমি রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসাবে গত ৯ ফেব্র“য়ারি ২০১৭ পুরস্কার সনদ ও ক্রেষ্ট নেয়ার জন্য জাতীয় ইমাম সম্মেলন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রধান অতিথি হিসাবে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রতিটি মসজিদের ইমামদেরকে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোরআন হাদিসের আলোকে বক্তব্য প্রদানের আহ্বান জানান। কারণ ইমামদের কে আজও মানুষ সম্মান করে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশের আলেম ওলামা সহ সর্বস্তরের


মানুষ জোরালো ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে গুলশান, শোলাকিয়াসহ সব কয়টি জঙ্গী তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালি ও জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। এজন্য দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে পুলিশ বাহিনী কে সাধুবাদ জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইজিপি এ.কে.এম. শহীদুল হক বলেন “জঙ্গীবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশের পুলিশ সফলতার বিষয়টি নিয়ে ইন্টারপোল সহ বিশ্বের অনেক দেশই সাধুবাদ জানিয়েছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমন পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্য দেশের অপরাধীরা আত্মগোপন করে থাকে এর মূল উৎপাটনের জন্য প্রয়োজন আন্ত:দেশীয় সহযোগিতা।

 (তথ্য: ১২ মার্চ ২০১৭ বাংলাদেশ প্রতিদিন) অবশ্য একারণে ইন্টারপোল ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথ উদ্যোগ গত ১২ মার্চ ২০১৭ থেকে ঢাকায় প্রথম বারের মত তিনদিন ব্যাপি চিফ অফ পুলিশ কনফারেন্স সফলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে। আসলে সকল সমস্যা সমাধানের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। এ লক্ষে বাংলাদেশে অপরাধ দমনের জন্য কমিউনিটি পুলিশ এর মাধ্যমে পুলিশ ও জনতা যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বিপিএম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তিনি ইতিপূর্বে বগুড়া জেলার প্রায় সব কয়টি থানায় সর্বস্তরের মানুষের সাথে সমাবেশ করেছেন। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম বগুড়ার সভাপতি ও দৈনিক করতোয়া পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হক ও সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শাহাদৎ আলম ঝুনুর সফর সঙ্গী হিসাবে আমিও বেশ কয়েকটি সমাবেশে উপস্থিত থেকে কোরআন হাদীসের আলোকে বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় বিশ্বাসই মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারে। ধার্মিক ব্যক্তি নিজ ধর্ম তো দূরের কথা অন্য ধর্মেরও ক্ষতি করতে পারে না।


এক বর্ণনায় এসেছে হযরত আবু বকর (রা.) বলেন রাসুল (স.) এরশাদ করেছেন “অভিশপ্ত সেই ব্যক্তি যে কোন মুমিনের ক্ষতি করে বা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে (তিরমিজি ১৯৪১) অন্য বর্ণনায় মহানবী (স.) বলেছেন সাবধান (জেনে রাখ) যে কেউ কোন জিম্মির (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোন কাফের) প্রতি অবিচার করবে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার কমিয়ে দেবে বা সামর্থ্যরে বাইরে কোন কাজ চাপিয়ে দিবে কিংবা তার আত্মিকতুষ্ট ব্যতিত তার সম্পদ ভোগ করবে। কিয়ামত দিবসে আমি তার প্রতিপক্ষ হয়ে তার অন্যায় অপরাধ প্রমাণ করব (আবু দাউদ ৩০৫২)

 
আসুন, আমরা দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রতিরোধ করি এবং কুরআন ও মহানবী (সা.) এর শিক্ষার আলোকে আমরা একটি মানবতার চেতনায় সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাই। এগিয়ে যাই হককানি ওলী আওলীয়াদের উত্তম চরিত্র ও চেতনা নিয়ে। সন্ত্রাস নয়, ইসলামের মানবতাবাদী স্লোগানকে উজ্জীবিত করি। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের সকল শুভ প্রয়াস কবুল করুন। আমীন!
লেখক ঃ ইসলামী গবেষক-কলামিষ্ট
সড়ংঃধশরস নড়মৎধ@মসধরষ.পড়স
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করা যুক্তিযুক্ত

রিপন আহসান রিটু : চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ছে না! পড়ালেখার সময় বাড়ছে। বাড়ছে চাকরি প্রাপ্তির জটিলতা। দেশে বাড়ছে বেকার সংখ্যাও সমানতালে। সরকারি চাকরির বয়স চলে গেলে অর্থাৎ তিরিশোর্ধ্ব যে কোন তরুণ ভাবতে শুরু করেন যে তিনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন! তার জীবনের আর কোনো আশা নাই! এতে তার মনের ওপর যে চাপ পড়ে, তাতে উদ্যম ও কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলা বিচিত্র নয়। বয়স হয়ে যাওয়া আর চাকরি না পাওয়াদের ‘দূর দূর’ করার মত লোকেরও অভাব এই দেশে কম নেই। যার সরকারি চাকরির বয়স গেছে বেসরকারি খাতেও তার কদর নেই।

 অথচ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যে রূপ বিশৃংখলা তাতে ২৭-২৮ বৎসর চলে যায় লেখাপড়া শেষ করতে। চার বৎসর কোর্স শেষ করতে সাত বৎসর লেগে যায় এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে। সর্বাধিক সংখ্যক তরুণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে অধ্যয়ন করেন। সেখানে সেশনজট কত প্রকার এবং কত দীর্ঘ তা কমবেশি সকলেই জানেন। এমতাবস্থায় পাস করে বের হওয়ার পর দম নিতে না নিতেই তারা দেখতে পান যে সরকারের নির্ধারিত যৌবন সূর্য অস্তাচলগামী এবং দেখতে দেখতে তাদের দিবাবসান ঘটে যায়। তারপর থাকে শুধু বয়স পেরুনো নিরাশার বালুচর। অথচ বাস্তবে তিরিশ হতে চল্লিশই হলো যৌবনের মুখ্য সময়।


অন্যদিকে আমাদের বয়সের হিসাব ও বিবেচনার মধ্যেও রয়েছে গরমিল এবং স্ববিরোধিতা। আঠার বৎসর না হওয়া পর্যন্ত আমরা প্রাপ্তবয়স্ক ধরি না। তার পরে মাত্র ১২ বসন্তে যৌবন শেষ! অতঃপর প্রৌঢ়কাল তিরিশ হতে ঊনষাট, কারো ষাট, কারো পঁয়ষট্টি। সরকারি চাকরির অবসরের বয়স করা হয়েছে ঊনষাট। মুক্তিযোদ্ধাদের বেলায় ষাট। কোনো কোনো চাকরিতে রিটায়ারমেন্টের বয়স করা হয়েছে ৬৫ বৎসর। আর চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে নিয়োগের বেলায় তো বয়সের কোনো বালাই-ই নাই। বিপত্তি যত চাকরিতে প্রবেশের বেলায়। নবম জাতীয় সংসদের শেষ দিকে মহাজোট সরকারের চমক হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক নির্দেশনা দেয়া হয়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে এ প্রস্তাবের পক্ষে বিভিন্ন জেলা-প্রশাসকরা সমর্থনও দিয়েছিলেন।

 প্রথম দিকে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কথাবার্তাই পরিবেশিত হতো। দশম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ বহু এমপি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর বিষয়ে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন এবং প্রায় প্রতিটি  অধিবেশনেই এ ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় একটি বিষয় সংসদে এত বার ওঠার পরও কেন তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না তা ছিল বড় বিস্ময়কর! কিন্তু সব কথা, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশেষে ঘোষণা দিলেন চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হবে না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যার নয়ে হয়না তার নব্বইয়ে হয়না এতে সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা হতাশ হয়েছেন। এর কারণ হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  দেখালেন-


১। সেশনজট কমে গেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সঠিক সময়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে এবং যথাসময়ে ফলাফল প্রকাশ হচ্ছে।  
২। ২২-২৩ বছরে মাস্টার্স শেষ করে ৩০ এর আগে ৭-৮ বছর সময় পাওয়া যাবে চাকরিতে প্রবেশের জন্য।
৩। যার নয়ে হয় না, তার নব্বইএ ও হয়না অর্থাৎ ৩০ বছরের মধ্যে যারা চাকরিতে প্রবেশ করতে না পারবে তার সারা জীবন চেষ্টা করেও পারবে না।


প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে আমার মত অনেকেই হয়তো একমত হবেন না। প্রথমত সেশনজট নেই বা কমে গেছে সেটা পুরোপুরি সঠিক নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৩-০৪ সেশনের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা ২০০৪ সালে কিন্তু মাস্টার্সের রেজাল্ট পাবলিস্ট হয় ২০১১ এর শেষের দিকে। ০৪-০৫ সেশানের মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা ০৯- এ কিন্তু এই রেজাল্ট পাবলিষ্ট হয় ২০১৩ সালে। ২০১৩ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা ২০১৬ সালে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে দেখা যায় একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকে ৩-৪ বছর অবলীলায় হারিয়ে যায়।

 বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেশনজট নিরসনের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন হচ্ছেনা খুব একটা। সেশনজট মুক্ত হলেও একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করতে বয়স দাঁড়ায় ২২-২৩ বছর। অতঃপর তার হাতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় থাকে ৭-৮ বছর। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপট তো আর এতটা সহজ সরল নয়। সরকারের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে পরিপূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সরকারী চাকরিতে ৫৫% কোটার মাধ্যমে নিয়োগ হয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোন কোটা নাই। কোটা-ধারিরা চাকরিতেও কোটা পায়, আবার বয়সও তাদের শিথিলযোগ্য। এ ছাড়া প্রতি বছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে পড়াশোনার পর্ব শেষ করে চাকরি প্রাপ্তি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে পরিমাণ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছেনা।


প্রশ্ন হচ্ছে চাকরি থেকে অবসরের সীমা যদি বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে, তাহলে চাকরিতে প্রবেশের সীমা কেন বাড়বেনা? কি যুক্তি আছে এর পেছনে? এটা কি সামঞ্জস্যহীন একটা ব্যাপার হয়ে গেলনা? তার উপর আমাদের সারা পৃথিবীর মত এদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় আয়ু যখন ৪৫ বছর ছিল তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ বছর, গড় আয়ু যখন ৫০ বছর হল তখন ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত হল। আর এখন গড় আয়ু ৭১ বছর। তবুও কি বয়স বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না? মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও উপজাতীয় কোটার প্রার্থীদের বয়স ৩২ বছর। এ ছাড়া জুডিসিয়াল ও ডাক্তারদের ৩২ বছর এবং নার্সদের ৩৬ বছর। তাহলে মেধাবীদের কেন ৩০ বছরের বেশি নয়? মেধাবীরা কি দেশের বোঝা? আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে চিত্রটা একটু ভিন্ন দেখা যায়। আমাদের দেশের তুলনায় তারা অনেক বেশি বয়সে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পায়।

 ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, এ ছাড়া বিভিন্ন প্রদেশে বয়সসীমা ৩৮ থেকে ৪০ বছর। শ্রীলংকায় ৪৫,  ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫,  ইতালিতে ৩৫-৩৮, ফ্রান্সে ৪০, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১৮, ১৮ ও ১৬ এবং সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত। আফ্রিকায় চাকরি প্রার্থীদের বয়স ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বয়সে আবেদন করা যায়। রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যে যোগ্যতা থাকলে অবসরের আগের দিনও যে কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স কমপক্ষে ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের উর্ধে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়।


আমরা আজ বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি। নিজেদের সব কিছুকে উন্নত বিশ্বের সাথে তুলনা করছি। যে সকল বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের এগিয়ে নেয়ার কথা ভাবছি। অনেক ক্ষেত্রে আমরাও অন্যান্য দেশের অনুসরনীয় হচ্ছি। তাহলে চাকরি প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের পিছুটান কিসের?  চাকরি হবে নিজ যোগ্যতা বলে। জীবনের যে বয়সে যদি যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া যায় তাহলে চাকরিতে প্রবেশের জন্য বয়স কোন বাঁধা হওয়ার কথা নয়। এই সিস্টেমটিই বর্তমান অগ্রসরমান পৃথিবীর জন্য নেতিবাচক আসুন আরো হিসেব দেখি; পূর্বে জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ১৪ বছরে এস.এস.সি. পাস করা সম্ভব হত। তখন ডিগ্রি অনার্স কোর্স ছিল ৩ বছর এবং ডিগ্রি (পাস) কোর্স ছিল ২ বছর ফলে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে স্নাতক পাস করা যেত। ফলশ্রুতিতে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে বিসিএস সহ পি.এস.সির অন্যান্য চাকুরীগুলোতেও আবেদন করা যেত।

 বর্তমানে ৬ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তির বিধান নির্দিষ্ট হওয়ার ফলে ১৬ বছর ৩ মাস বয়সে এস.এস.সি. পরীক্ষা দিতে হয়। নন-ক্যাডারে পি.এস.সি.’র ক্ষেত্রে যে প্রজ্ঞাপন তাতে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮ বছর। কিšুÍ ১৮ বছর বয়সে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কিভাবে শেষ হয়? ২ বছর মেয়াদী ডিগ্রিও এখন নেই। ১৬ বছর ২ মাসে এস.এস.সি., ১৮ বছর ৪ মাসে এইচ.এস.সি. ও ১৮ বছর ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলে ১৯ বছর বয়সে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করলে ২৩ বছরের পূর্বে কখনো অনার্স শেষ করা সম্ভব না।

 তাহলে পিএসসি কোন যুক্তিতে চাকরির আবেদনের শুরুর বয়স ২১ থাকবে? ১৬ বছর এখন নির্দিষ্ট (এস.এস.সি.’র ক্ষেত্রে)। নন-ক্যাডারে পিএসসি’র ক্ষেত্রে ১৮ বছর এই চলমান আইনটি এখন অকার্যকর। ক্যাডারের ক্ষেত্রে ২১ বছরের আইনটিও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এই অকার্যকর আইন এখনো প্রয়োগ করে ছাত্র সমাজকে চরম ভাবে ঠকানো হচ্ছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে  বিচার করলে ২৩ বছর হচ্ছে চাকরিতে আবেদনে শুরুর বয়স, যদি তাই হয়, পূর্বের ন্যায় যদি আমাদের (১৮-৩০) অর্থাৎ ১২ বছর সময় দেওয়া হয় তাহলে সহজ হিসাব ২৩ এর সাথে আমাদের সুযোগ ১২ বছর যোগ করলে ২৩+১২=৩৫ বছর। এই অকার্যকর আইনগুলো সংশোধন করলেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩৫ বছরই যুক্তিযুক্ত। কমপক্ষে ৩৫ বছর চাকরির ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।


আজকের এই লেখার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় আবেদন বেকারদের দু:খটা একটু বোঝেন। বেকারত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিন লক্ষ লক্ষ যুবককে। বিশ্বায়নের এই যুগে সমগ্র বিশ্বের সাথে সমান তালে পা ফেলে চলার সুযোগ করে দিন আমাদের। চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা বাড়ান। আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করব আপনাকে।
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩

 

ফ্লাইওভার দুর্ঘটনা

মীর আব্দুল আলীম : আমরা কেন কোথাও নিরাপদ নই? ঘরেও না; বাইরেও না। নিজ ঘরে থাকবেন? খুন হবেন। রাস্তায় যাবেন? গুম হবেন; যেকোনো সময় হুড়মুড় করে আপনার ওপরই ভেঙে পড়তে পারে ফ্লাইওভারের গার্ড কিংবা পরিবহন চাপা দিয়ে কেড়ে নিতে পারে আপনার প্রাণ।

কর্মস্থলে থাকবেন? সর্বনাশা আগুনে যে অঙ্গার হবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায় এদেশে? নদীতে যাবেন? সেখানেও লঞ্চ ডুবিতে প্রাণ যাবে। কোনো নিরাপত্তা নেই, কোনো গ্যারান্টি নেই জীবনের। যখন যেখানে সেখানেই মৃত্যু। ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ছে, ব্রিজ ভেঙে পড়ছে, বিল্ডিং ভেঙে পড়ছে।

যা কিছু মানুষের সৃষ্টি, সবই ভেঙে পড়ে মানুষের ওপর। ভাগ্যিস আকাশটা সৃষ্টিকর্তার গড়া ছিল! তা না হলে সেটাও যে ভেঙে পড়ত ঘাড়ে। আজ স্বাভাবিক মৃত্যুই যেন অস্বাভাবিক। কিন্তু কেন? কে দেবে এর উত্তর? রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন মগবাজার-মৌচাক উড়ালসড়কের (ফ্লাইওভার) গার্ডার ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। মালিবাগ রেলগেট ব্যস্ততম এলাকা।

এখানে সারাক্ষণই যানজট লেগে থোকে। দিনের বেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটলে কি হতো তা সহজেই বোধগম্য। প্রতিনিয়ত একেরপর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা, গুম হওয়া, খুন হওয়ার ভয় আমাদের অশান্ত করে তুলেছে। নানা কারণেই এখন স্বজনদের লাশের অপেক্ষায় থাকতে হয়। বারবার এমন হচ্ছে কেন?


মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। যেন এক ভোগান্তির নাম। কাকরাইল মোড় থেকে মালিবাগ সড়কে ঢোকার সময় মনে হয় যেন স্বেচ্ছায় কোনো এক মৃত্যুপুরিতে প্রবেশ করছে সবাই। এলোপাতাড়ি পড়ে আছে ফ্লাইওভার তৈরির সরঞ্জামাদি। ধুলো আর বালিতে সেখানে চোখ মেলা দায়, শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া দুষ্কর। এমন অরাজক এক সড়ক দিয়েই প্রাণ হাতে চলাচল করছে অসংখ্য মানুষ। সেখানে চোখ তুলে ওপরের দিকে তাকালেই ভয়ে বুক চিনচিন করে উঠে, যেন এখনই গার্ডার ভেঙে পড়ে জীবন শেষ হয়ে যাবে। পথচারীদের সেই শঙ্কাই নিষ্ঠুর সত্যে পরিণত হলো ১৩ মার্চ রাত পৌনে ২টার দিকে।

 অনেকে অভিযোগ করেছেন, হতাহতের ঘটনা আড়াল করা হচ্ছে। পত্রিকান্তে প্রকাশ, ভেঙে পড়া গার্ডার অত্যন্ত নিম্ন মানের রড, সিমেন্ট, পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে তা তো ভেঙে পড়বেই। গার্ডার স্থাপনে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞদের কাজে ডেকে আনা হয়েছে। নিহত কাঠমিস্ত্রি স্বপন নাকি তাদেরই একজন। এমন দায়িত্বহীন কাজ কি মেনে নেয়া যায়? মাঝে মাঝে সরকারের তরফ থেকে নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়। অথচ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের কথা শোনা যায় না।

 তারপর আবার যেই লাউ সেই কদু। আগুনে পুড়ে মানুষ মরে। বাসে, ট্রাকে চাপা পড়ে মানুষ মরে। লঞ্চ ডুবে মানুষ মরে। ওভার ব্রিজ ধসে মানুষ মরে। বস্তিতে; বাসাবাড়িতে বেঘোরে মানুষ মরে। শুধু মরে আর মরে। এর কোনো প্রতিকার নেই। দেশের কোথাও যেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। দেশ যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চারদিকে কেবল আতঙ্ক ও শোক। কোথাও কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে প্রতিক্ষেত্রেই কেবল দুঃখ প্রকাশ করা হয়। আমরা দুঃখ প্রকাশ করা শিখেছি; দুঃখ লাঘব করা শিখিনি। এভাবে আর চলবে কত দিন?


মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার এভাবে অসাবধানতা এবং নিয়ম না মেনে নির্মাণ কাজ বছরের পর বছর চলতে থাকায় অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার পথচারি এবং স্থানীয়রা। একবার চলতে গিয়েই দেখা যাবে, ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ ওই এলাকার লোকজন এবং সেখান দিয়ে চলাচলকারীদের জন্য কত দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটিতে ত্রুটির কারণে নকশায় বারবার পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এ ধরনের বড় একটি প্রকল্পে কেন ভালোভাবে যাচাই না করে নকশা-পরিকল্পনা করা হয়? ত্রুটি ধরা পড়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলেই আমরা জানি। উল্টো বারবার সময় ও বরাদ্দ বাড়ানো হল? পত্রিকান্তে জানতে পারি-২০১৩ সাল থেকে চলছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ।

 এর আগে জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাইসহ অন্যান্য প্রারম্ভিক কাজ থেকেই শুরু শান্তিনগর, রাজারবাগ, মালিবাগ, ইস্কাটন-বাংলা মোটর ও মগবাজার এলাকার মানুষের ভোগান্তি। ২০১৪ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে সময়। আর জনগণের ভোগান্তির পাশাপাশি তাদের করের অর্থের অপচয়ের বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য।

 প্রথমে ব্যয় ধরা হয় ৩৪৩ কোটি টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৭২ কোটি, সর্বশেষ তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকায়। অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগের কারণ ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থকলেও খোদ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাই এ বিষয়ে সংশয়ে রয়েছেন। বহু প্রতীক্ষিত ফ্লাইওভারটির হাতিরঝিল-মিন্টোরোড, ইস্কাটন-ওয়ারলেস অংশের কাজ শেষ হয়েছে, অন্য অংশগুলো নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। নির্র্মাণ কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং নিয়ম না মেনে কাজ করার কারণেই ঘটছে দুর্ঘটনা। এরই মধ্যে একাধিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হয়েছে প্রকল্পটি। ১৩ মার্চ (১২ মার্চ রাতে) মালিবাগ অংশে গার্ডার ক্রেন দিয়ে তোলার সময় ছিটকে পড়ে ২ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে মগবাজারে দু’জনকে মরতে হয়।


প্রশ্ন হলো, ফ্লাইওভারের গার্ডার কীভাবে ভেঙ্গে পড়ে? উপযুক্ত নির্মাণ সংস্থাকে কি কাজটি দেওয়াা হয়েছিলো কি না? এর আগে কয়েকবার নির্মাণাধীন এ ফ্লাইওভারেই দুর্ঘটনায় হতাহত হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামের বদ্দারহাট ফ্লাইওভারে বহু মানুষ (সম্ভবত ২০ জন) মারা গেছে। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটছে, কোথায় সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান? এ সব ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হয় না। এবারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে খুবই ভালো কথা, ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হওয়া যাবে, কিন্তু যাদের প্রাণহানি হলো তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে কে? এসব তো অনাকাঙ্খিত মৃত্যু।

 এসব নিছক দুর্ঘটনা নয়। এগুলো কি এড়ানো যেতো না ? যদি বলি অনিয়ম, অবহেলা, আত্মসাৎ, সংশ্লিষ্টদের নজরদারীর অভাব আর অব্যবস্থাপনাই এসব মৃত্যুর জন্য দায়ি? মোটেও ভুল হবে না। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজের মান নিয়ে আগেও এন্তার অভিযোগ ছিল। এর আগেও সেখানে একবার গার্ডার ভেঙ্গে পড়েছিলো। ভাগ্যিস রাতে মানুষের চলাচল কম ছিলো বলে, সেখানে  লোকজন না থাকায় প্রাণহানির ঘটনা কম ঘটেছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে পত্রপত্রিকাগুলো লিখেছে। তাতে তোয়াক্কা করেনা সংশ্লিষ্টরা।

 এসব নিয়ে বহুবার লেখা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের তাতে কর্ণপাত নেই। তাই যা  হবার তাই হলো। এ দায় কে নেবে? সরকারের সংশ্লিষ্টার কি এ দায় এড়াতে পারেন? মানুষের জীবনের মূল্য কি তারা দিতে পারবেন? কী মর্মান্তিকই না এ মৃত্যু! ফ্লাইওভারের মস্ত গার্ডের চাপে থেঁতলে গেছে শরীর; কেবল ক্ষতবিক্ষত পা দুটো বের হয়ে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। স্থানীয়দের বর্ণনায়, গার্ডারে পিষ্ঠ হওয়া তরতাজা শরীর থেকে তখনও গলগলিয়ে রক্ত বয়ে যাচ্ছিল। মুহূর্তে লাল হয়ে যায় পিচঢালা পথ। এমন মৃত্যু কি মেনে নেয়া যায়?


আইনের প্রয়োগ হলে; নিয়মতান্ত্রিকভাবে ঠিকঠাক মত সব পরিচালিত হলে অনেকাংশেই এসব দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। আমরা যারা লিখিয়ে তারা কেবলই লিখি। কার কথা কে শোনে? অর্থের মহব্বতে কারো কারো মুখে কুলুপ আঁটা থাকে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়তই নানা গেড়াকলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবেলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,

newsstore13@gmail.com 

০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

নদী নয় যেন মরা খাল

আব্দুল হাই রঞ্জু :জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি, অকাল বন্যা, অসময়ে ঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গি। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর পানির নাব্যতা এখন অনেক কম। উত্তরাঞ্চলের প্রমত্তা নদী গঙ্গাঁ, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ নদ-নদীগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিশেষ করে উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় খর¯্রােতা তিস্তা এখন নামেই নদী।

তিস্তায় এখন পানি না থাকায় চোখে পড়ে শুধু ধুধু বালুচর। এক কালের প্রমত্তা তিস্তা নদীটি পানির অভাবে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। এমন এক সময় ছিল, যখন নদী পারাপারে নৌকাই ছিল মানুষের একমাত্র অবলম্বন। অনেকেই বলতেন, এক নদী মানে হাজার ক্রোশ; অর্থাৎ নৌকা ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তরই ছিল না। সে নদীতে এখন হাঁটু পানি। ফলে নৌকা ছাড়াই মানুষ নির্বিঘেœই নদী পারাপার করছে। এমনকি নদীর বুকে চাষীরা নানা জাতের ফসলের চাষাবাদও করছেন। দেখলে মনে হয়, নদী নয়, এ যেন ফসলের কোন সবুজ মাঠ।  


মূলত ভারত তিস্তার উজানে জলপাইগুঁড়ি জেলার গজল ডোবায় ব্যারেজ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী পানির অভাবে এখন মৃত্যু প্রায়। এমনকি ভারত এখন তিস্তা নদীর উজানে ব্যারেজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তায় প্রবাহিত পানি ভারতের মহানন্দা নদীতে এবং জলপাইগুড়ি জেলার দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুরের মালদহ ও কুচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে। সেখানে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটক কিংবা পরিবর্তন করার বৈধতা আন্তর্জাতিক আইনে নেই,  সেখানে ভারত সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে একতরফাভাবে তিস্তার পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ আটকে দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 যা অনৈতিক এবং বাংলাদেশের মানুষের উপর এক ধরনের অবিচার। এ নিয়ে বাংলাদেশের তরফে যুগের পর যুগ ধরে পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও আশ্বাস ব্যতিত কার্যকর কোন সুযোগ মেলেনি। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, নদীর গতি, পানি ও বাতাস কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা মানে না।

প্রকারান্তরে তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার যে অধিকার, তা পাওয়া উচিৎ। আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম, হয়ত এ দফায় তিস্তার পানির চুক্তির একটি যৌক্তিক সমাধান হবে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, কথার বাইরে বাস্তবে পাওয়ার মতো সম্ভাবনা এখনও সুদুর পরাহত। আগামী এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাচ্ছেন। আশা ছিল, হয়ত এ দফায় তিস্তার একটি সমাধান হবে। কিন্তু জানা গেছে, এ দফায়ও তিস্তা চুক্তি হাওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও তিস্তা ছাড়া ভারতের সাথে প্রতিরক্ষাসহ বাংলাদেশের অনেক চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

 জানা গেছে, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি ভবনের আতিথিয়েতা গ্রহণ করেন। প্রনব মুখার্জির সহধর্মীনির জন্ম বাংলাদেশে। আমরা আশা করতেই পারি, আত্মীয়তার সুত্র ধরে হলেও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তির একটি সুরাহায় এগিয়ে আসবেন। বাস্তব বড়ই নির্মম, হয়ত শেষ পর্যন্ত উষ্ণ আতিথিয়েতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্যে জুটবে, যা নিশ্চিত; কিন্তু পানির ন্যায্য হিস্যার অধিকার হয়ত মিলবে না। অথচ এটাই বাংলাদেশের মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য অতি আবশ্যকীয়। কথায় আছে, নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা বরাবরই নতজানু পররাষ্ট্র নীতির কারণে নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষায় তোষামোদি করে। এখন বাঁচার তাগিদেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় হিসাব নিকাশ করে আমাদের পা ফেলতে হবে।

 কারণ বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ পুরন হয় উত্তরাঞ্চলের সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে। আর উত্তরাঞ্চলের সব ক’টি নদীর উজানে ভারতের অংশ। স্মরণ করাতে চাই, গঙ্গাঁ চুক্তি হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পানি বাংলাদেশ এখনও পায় না। আবার তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের উজানে ভারত যুগের পর যুগ ধরে পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করায় উত্তরাঞ্চলে এখন ভূ-গর্ভস্থ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির বড়ই সংকট। বরেন্দ্র অঞ্চল গবেষণা সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম খান বলেন, চলতি বছরের শুরুতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাগঞ্জ, নওগাঁ জেলার ১০০টি পয়েন্টে বোরিং করে দেখা গেছে, গত ২ বছরে এসব অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ৮ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এ তথ্য যে উদ্বেগের, যা সচেতন মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন।

 যেখানে মাত্র ২ বছরে পানির স্তর ১২ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে, সেখানে বুঝতে অসুবিধা হবে না, আগামী বছরগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট কি পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে। মূলত ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট হলে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। ফলে উত্তরাঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন অতিব জরুরী হয়ে পড়েছে। যা মোকাবিলায় আমাদের যে সব উদ্বেগ নেওয়া জরুরি, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।


১. উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে এখন খাদ্যশস্য ভান্ডার হিসাবে খ্যাত। যেখানে এই ১৬টি জেলার উৎপাদিত ধান ও গম দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহ ভাগ পুরণ করায় খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে, সেখানে পানির অভাবে সেচভিত্তিক চাষাবাদ কমে আসলে এই অর্জনকে ধরে রাখা কঠিন হবে। এজন্য বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণের জন্য উত্তরাঞ্চলের ছোট বড় নদী-নালা সমূহকে জরুরি ভিত্তিতে খননের জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা উচিৎ।
২. সেচভিত্তিক চাষাবাদের পরিবর্তে স্বল্প সেচে এমনকি বিনা সেচে উচ্চফলনশীল জাতের ধান উৎপাদনের দিকেই আমাদের ঝুঁকতে হবে। এ জন্য গবেষণা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কাংখিত ফলন অর্জনে নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে।

৩. ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন ব্যবহারে পানি আইন প্রণয়ন করে মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত পানির বড় অংশ বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষন করার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এ জন্য পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পানি পরিশোধন প্লান্ট স্থাপন করে পার্শ্ববর্তী নদী-নালার পানি ও বৃষ্টির পানি ধারন করে তার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ওয়াসা, পৌরসভাগুলোর অনুকুলে পানি সংরক্ষণ খাতে প্রকল্প গ্রহণ করে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ৪. পানির অপচয় রোধ করতে হবে। অনেকের ধারণা পানি অফুরন্ত। বাস্তবে পানিও একটি ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ। এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে মিতব্যয়ি হতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য পত্র পত্রিকা, রেডিও ও টিভিতে বিশেষ প্রচারণা চালাতে হবে।

বিশেষ করে খোদ রাজধানী ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এতই নেমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগের ব্যাপার। যেখানে ভূ-উপরিস্থ পানির অভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে যাচ্ছে, সেখানে উজানের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। মূলত ভূ-উপরিস্থ পানির সংকটের কারণেই ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার দিনে দিনে শুধুই বাড়ছে। ফলে উজানের পানির ন্যয্য হিস্যা আদায় করা ছাড়া আমাদের আর অন্য কোন গত্যন্তর নেই।

প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিম, এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে। সেই দেশের কাছ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের মতো অনৈতিক, অমানবিক আচরণ আমরা কোনভাবেই আশা করতে পারিনা। কিন্তুু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সেই ভারত ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি করেও শর্ত অনুযায়ী পানি দেয়নি। ত্রিশ বছর মেয়াদের চুক্তির এখনও ৯ বছর বাকী আছে। ইতিমধ্যেই ভারত সরকার গঙ্গাঁর পানি আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় অন্যান্য রাজ্যে চালান করছে।

এমনকি আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প ভারত বাস্তাবায়ন করলে গঙ্গা এবং তিস্তায় পানির প্রবাহ আরো কমে যাবে। আর গোটা বাংলাদেশ মরুকরণের পথেই এগিয়ে চলবেই। ফলে আমাদের কৃষি, মৎস্য চাষ, নৌ-যোগাযোগ সবই হুঁমকির মুখে পড়বে। এমনিতেই বলতে গেলে বাংলাদেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক আগেই ভেঙ্গে পড়েছে। অথচ নৌ-যোগাযোগ, মৎস্য চাষ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামকই যেখানে পানি, সেখানে পানির কহর বৃদ্ধি পেলে এই অঞ্চলের মানুষের রুটি রুজি বন্ধ হয়ে যাবে। নদী যেখানে বাংলাদেশের মানুষের খেঁয়ে পড়ে বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন, সেখানে তিস্তা, গঙ্গাঁ, ব্রহ্মপুত্রে ধু-ধু বালুচর হলে শুধু ভবিষ্যত প্রজন্মই নয়, বর্তমান প্রজন্মের ভাগ্য বিড়ম্বনার মিছিল যে দীর্ঘ হবে, যা অনেকটাই নিশ্চিত।


যদিও উজান থেকে নেমে আসা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় পরিবেশ, প্রকৃতি, জীব বৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি সেচ কার্য্য পরিচালনার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় ৪১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি খাল খননের প্রকল্প হাতে নিয়েছে তিস্তা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। এ খালগুলি খনন করা শেষ হলে বর্ষা মৌসুমের বাড়তি পানি ধরে রেখে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি সংকট মোকাবিলা করা অনেকটাই সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পানি সংরক্ষনের জন্য এ ধরনের খাল খনন প্রকল্প উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশে মরা খালে পরিণত হওয়া নদ-নদীগুলোকে সংস্কার করে বর্ষা মৌসুমের বাড়তি পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিৎ।


পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, নদী মাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের আদায় করতেই হবে। তানা হলে তিস্তার অববাহিকায় বৃহৎ জনগোষ্ঠির কৃষি চাষাবাদ, মৎস্য চাষ কিম্বা বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির অভাবে যে সংকটাপন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তা নিকট ভবিষ্যতে সামাল দেওয়া অনেকাংশেই কঠিন হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরের সময় তিস্তার পানি চুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তির সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আর তিস্তা চুক্তির ফয়সালা না হলে দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য চুক্তি হয়ত ঠেকে থাকবে না, কিন্তু তিস্তার সমাধান না হলে এ সফর যে অতীতের ন্যায় গতানুগতিক সফর হবে, যা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

ইতিহাসের পাতায় পাতায় বঙ্গবন্ধু

শাওন রহমান : সৃষ্টিকর্তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাস হয়ে ওঠার জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন। তার জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে; ইতিহাস শেখ মুজিব ডেকে নিয়ে, ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাকে বেঁধে রেখেছে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময়ে ছাত্র জীবন থেকেই। সেবছর স্কুল পরিদর্শনে আসেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও উপমহাদেশের বর্ষীয়ান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে শেখ মুজিব তাদের কাছে যান।

 বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির আন্দোলনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করেন। এই আন্দোলনের কারণে ১১ সেপ্টেম্বর তাকে আটক করা হয় এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ১৪ আগস্ট এক সিন্ডিকেট সভায় তার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগ গঠন করেন। শেখ মুজিব মুসলিমলীগ ছেড়ে এই নতুন দলে যোগ দেন। তাকে দলের যুগ্ম-সচিব নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমন উপলক্ষে আওয়ামী মুসলিমলীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষ বিরোধী মিছিল করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে শেখ মুজিবকে আটক করা হয়। সেবার তার দু’বছর জেল হয়। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ঘোষণা দেন ‘উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এসময় শেখ মুজিব জেলে বসে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন পালন করেন। অনশন চলাকালীন ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশনে মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অন্যান্য দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়।

 ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টিতে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে, যারমধ্যে ১৪৩টি আসনেই আওয়ামীলীগ জয়লাভ করে। ২৯ মে কেন্দ্রিয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। ১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। ১৭ জুন পল্টন ময়দানে আয়োজিত সম্মেলনে আওয়ামীলীগ ২১ দফা দাবি পেশ করে, যারমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অন্তর্ভূক্ত ছিল।


এরপর ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিমলীগের বিশেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেয়া হয়। শেখ মুজিব পুনরায় দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিয়ে একযোগে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। তিনি দলে সম্পূর্ণ সময় দেয়ার জন্য ১৯৫৭ সালে ৩০ মে মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা উপস্থাপিত হয়। ১৯৬৮ সালের প্রথম দিকে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবসহ ৩৪জন বাঙালি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে।

 যা ইতিহাসে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এই মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ শেখ মুজিবসহ অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের এগার দফা দাবি পেশ করে। যারমধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সবগুলো দাবিই অন্তর্ভূক্ত ছিল। এই পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপি ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।

 এই গণআন্দোলন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। আইয়ুব খান রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বৈঠকে এই মামলা প্রত্যাহার করে নেন। শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া হয়। কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে। এই জনসভায় শেখ মুজিবকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে “বাংলাদেশ” নামে অভিহিত করা হবে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানে ২টি আসন ছাড়া আওয়ামীলীগ সবকটিতেই জয়ী হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠনের আহ্বান জানালে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা ভুট্টো সে সরকারকে মানবেন না বলে ঘোষণা দেন। পশ্চিম পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন থেকে বঞ্চিত হন। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেন।

ইয়াহিয়া সামরিক আইন জারি করলে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। নয়মাস যুদ্ধ চলার পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

 নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু’র আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে দাঁড় করাতে বঙ্গবন্ধু অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন। দিন-রাত দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরমধ্যে কতিপয় বিপথগামী তরুণ সেনা কর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২নং বাড়ি ঘেরাও করে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারবর্গকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার দুই মেয়ে পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশেরই নেতা নন, তিনি অধিকার বঞ্চিত, শোষিত শ্রেণিহীন মানুষের নেতা। বিশ্বের বুকে যখনই মানুষ তার অধিকার হারাবে, শোষণের শিকার হবে তখনই মানুষ বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হবে। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী একুশ বছর বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে তা লজ্জাকর। আবার এখন বঙ্গবন্ধুকে যথাযথ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে তার দলের মধ্যে যেভাবে তাকে সংকীর্ণভাবে ধরে রাখা হয়েছে, তাতেও তার উপযুক্ত মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। কারণ, বঙ্গবন্ধু কোন দলের নয় তিনি সমগ্র ইতিহাসের, গোটা জাতির।
লেখক ঃ সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক

shaown077@gmail.com

০১৭১৬-২২৪৮১০

বঙ্গবন্ধু একটি অনুভূতির নাম

মাশরাফী হিরো : বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে  লেখা বহু স্মৃতিচারণমূলক লেখা হয়তো বের হবে। যারা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন অথবা চর্চা করেছেন তাদের। কিন্তু, আমাদের মত অসংখ্য কর্মি যারা বঙ্গবন্ধুকে না দেখে আদর্শ মনে করি তাদের সামনে সম্ভবত ইতিহাস, তার সহচরদের বর্ণনা অথবা শেখ হাসিনার উপর নির্ভর করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে না দেখে তার স্বরূপ অংকন করার চেষ্টা আমাদের মত আওয়ামী লীগের কর্মির পক্ষে হয়তো পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও ব্যর্থ চেষ্টা। আজকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহু গবেষণা হচ্ছে। টিভি, পত্র-পত্রিকা, সভা-সমাবেশ, টকশোতে বিস্তর আলোচনা চলছে।

 কিন্তু, ৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে খুব কম গবেষকই গবেষণা করেছেন। বিশেষ করে ৯৬ এর পূর্ব পর্যন্ত। ২১ বছর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রায় নিষিদ্ধ। কিন্তু, তাতে বঙ্গবন্ধু হারিয়ে যাননি। বরঞ্চ প্রতিদিন তার নাম ইতিহাসের পাতায় মলিনতার পরিবর্তে উজ্জ্বল হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে হয়তো টিভি, টকশো হচ্ছে। সারা বাংলাদেশের মানুষ জানছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে। কিন্তু, তাতে আওয়ামী লীগের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি। আমাদের শুনতে হয় আওয়ামী লীগের চাইতে শেখ হাসিনার সরকার অনেক বেশি শক্তিশালী। বঙ্গবন্ধুর সময়ও ঠিক একই অবস্থা। আওয়ামী লীগের চেয়ে বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। এর মূল কারণ হলো আমাদের মত অসংখ্য ‘সুবিধাবাদী’। যারা প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে বিতর্কিত করছি। যার কারণে বিতর্কিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ।

একজন মানুষের পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর পক্ষেও তা করা সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা সেদিন নিজেদের নিয়ে এতই মত্ত ছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জন মানুষ শহীদ হলেন তারপরও অসংখ্য নেতা জীবিত ছিলেন। আমাদের মতো সুবিধাবাদীদের কারণে বঙ্গবন্ধু মারা গিয়েও বাঁচতে পারেননি। প্রতিনিয়ত তাদের অপকর্মের জবাবদিহি করেছেন বঙ্গবন্ধু। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও  ঠিক তাই। যারা গবেষণা করেন, স্মৃতিচারণ করেন তারাও অনেকে সেদিন নিশ্চুপ ছিলেন। সেদিনকার সময় দেখার কোন সুযোগ পাইনি। কিন্তু, ১/১১ এর সময় অনেক বিষয় পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। যারা ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনার এক নম্বর সৈনিক তারাই তার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। অনেকে আবার বাঁচার তাগিদে দেশ ছেড়েছিলেন।

 চামড়া বাঁচানোর জন্য। কিন্তু, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েননি। জেল খেটেছেন। সেদিন যুদ্ধাপরাধিরা বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনাকে জেল খাটতে হয়েছে। শুধু কাছে থাকলেই অথবা ঘনিষ্ঠভাবে মিশলেই এক নম্বর সৈনিক হওয়া যায় না। হাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের রূপ বদলায়। কিন্তু, বাংলার মেহনতি, খেটে খাওয়া মানুষের রূপ বদলায় না। যারা কোনদিন টিভি টকশো দেখেন না, পেপার পত্রিকা পড়েন না। যারা লিখতে জানেন না, পড়তে পারেন না, তারা কখনও সত্য উপেক্ষা করেন না। যাদের হৃদয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। শ্রমজীবী এসব খেটে খাওয়া মানুষ কারো আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা করেন না।

 মনে রেখেছেন বঙ্গবন্ধুকে। এগিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনাকে সামনের দিকে। কে তাকে মনে রাখলো তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কিছু আসে যায় না। জনপ্রিয়তার জন্য বঙ্গবন্ধু কিছু করেননি। বাস্তবতার নিরীখে সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবায়ন করেছেন বঙ্গবন্ধু। তাইতো সুদূর প্রসারী বঙ্গবন্ধু বেছেনিয়েছিলেন নজরুলের জয় বাংলা স্লোগান। রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলার পাশাপাশি নজরুলের বাংলাদেশ। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের সাথে ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যার আবর্তে ঘুরপার্কর্ খাচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালি।

 তার দেওয়া আদর্শ থেকে বেরুতে পারিনি আমরা। তার যারা বিরোধী গোষ্ঠী তারাও মুখ ফসকে এসব কথা বলে থাকেন। মুখে না বললেও পালনে অভ্যস্ত অনেকে। বঙ্গবন্ধু কোন কিছু চাপিয়ে দেননি। বাঙালি ও বাংলাদেশ যা ধারণ  করেছেন তা নেতা হিসেবে তিনি প্রকাশ করেছেন। এখানেই নেতার সাথে মানুষের সম্পর্ক। যা সমস্ত কিছুর উর্ধ্বে। হৃদয়ের এ সম্পর্ক কোন কলমে আঁকা যায় না। টিভি-টকশোতে ধারণ করা যায় না। এ অনুভূতি কথায় অথবা বক্তৃতায় বিবৃত করা যায় না। হৃদয় যেমন দেখা যায় না, আদর্শ যেমন ছোঁয়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। তেমনি বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। শুধু অনুভব করা যায় হৃদয় দিয়ে। তাইতো বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক ঃ মাশরাফী হিরো
উপ-দপ্তর সম্পাদক,
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

খোকার আজ জন্মদিন

মোঃ মিম পোদ্দার : ৭ মার্চ, ১৯২০ সাল। ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। জন্ম হল একটি শিশুর; জন্ম হল একটি কণ্ঠস্বরের। বীজ বোপিত হল একটি ঐতিহাসিক সংগ্রামের; একটি স্বাধীনতার, একটি বীরত্বগাঁথার।স্কুল জীবন থেকেই শিশুটির রাজনৈতিক ব্যক্তিস্বত্তার প্রকাশ ঘটতে থাকে, যার প্রাতিষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে তৎকালীন মুসলীম লীগের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে। শিশুটি যত বড় হতে থাকে সাহসী ও প্রতিবাদী মানসিকতা তাঁর ব্যক্তিসত্বাকে দাঁড় করাতে থাকে এক মজবুত ভিত্তির উপর।
শিশুটি যখন সবেমাত্র স্কুল পড়–য়া ছাত্র, সে সময়েই একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জের ধরে কংগ্রেস ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের রোষানলের শিকার হয়ে কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। সেই থেকেই কারাবরনের শুরু।

 রাজনৈতিক ২৩ বছরের মধ্যে ১২ বছরের বেশি সময়ই কারাগারে কাটাতে হয় তাঁকে। তিনি ছিলেন নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের নেতা। ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি নিরপেক্ষ, নীতির প্রশ্নে আপোসহীন; দাবিতে অনমনীয় আর সংগ্রামে অকুতোভয়। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা ; আর বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। শিশুটি বাঙালি জাতির জনক; তিনি ছিলেন খোকা, তিনিই বঙ্গবন্ধু। শিশুটি শেখ মুজিবুর রহমান !

এই শিশুটিই একটি পরাধীন জাতিকে জাতীয় চেতনার সূদৃঢ় ছায়াতলে একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এই শিশুটিই ঐতিহাসিক ছয় দফা-কে এক দফায় রূপান্তর করতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন বজ্র কণ্ঠে একটি পরাধীন, নির্যাতিত, শোষিত জাতির স্বাধীনতাকে ঘোষণা করতে। মানুষের জন্য, অধিকারের জন্য; মুক্তির জন্য এই শিশুটিই তৎকালীন সময়ের একটি উন্নততর ও শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজাতে পেরেছিলেন। আর হ্যাঁ- অধিকার কিম্বা মুক্তি, কিম্বা স্বাধীনতা, কিম্বা বাংলাদেশ- যাই বলি না কেন, সে তো এনে দিয়েছে সেই সে শিশুটিই।

তাই তো স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও শত ষড়যন্ত্রের নিকষ অন্ধকারে কবি শুনতে পান সেই ডাক, খুঁজে পান সেই নির্ভরতা!!
”পরাজিত শক্তি যখন হেঁটে বেড়ায় বিজয়ীর বেশে/ যখন ফুলেরা কাঁদে, হায়েনারা হাসে;/ যখন মানুষ ঘুমায়, পশুরা জাগে;/ তখন আমার ঠিকানায় আসে সেই পুরনো পত্র/ তখন আমার কানে ভাসে সেই পুরনো ছত্র/ ” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম.. জয় বাংলা”।
    
আজ সেই শিশুর, সেই অবিসংবাদিত নেতার, স্বাধীন বাংলার স্থপতি, ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙ্গালি জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাঁকে। সেই সাথে রইলো একটি ঐকান্তিক প্রত্যাশা- বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার রূপকার বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার হাত ধরে নবীনদের মেধা দেশ গড়ার কাজে লাগুক, স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে বিধৌত হোক নতুন প্রজন্মের বিবেক ও চেতনা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারন করে নতুনদের লড়াই হোক মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে-
লেখক ঃ যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বগুড়া জেলা শাখা।
                     ০১৬৭১-৯০৭৮৮২    

মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন তরুণ

মোহাম্মদ নজাবত আলী: কবি সুকান্তের ভাষায়, এ বয়স যেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়/পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়…/এদেশের বুকে আঠার আসুক নেমে। মূলত দেশের তরুণ সমাজকে নিয়ে অনেক বিপ্লবী কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে তারুণ্যের জয়গান। তারুণ্যশক্তির ধ্বংস নেই, বিনাশ নেই। তাদের চোখে থাকে শুধু নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন কখনো থেমে থাকে না, যে স্বপ্ন কখনো নতুন সমাজ দেশ গড়ার স্বপ্ন।

 কিন্তু বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের উদ্দীপনাময় শক্তি স্বপ্ন আজ থেমে গেছে মাদকের ভয়াল গ্রাসে। তাই দেখা যায় বিগত বছরগুলোতে মাদক বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ নেশায় পরিণত হয়েছে। মাদক বর্তমান যুবসমাজকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে এর পরিণতি কি এবং এ সর্বনাশা নেশা থেকে বেরিয়ে আসা অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ জাতি ও সমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র আজকের যুব বা তরুণ সমাজ।

কিন্তু তারা যেভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে এ নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বিগ্ন শংকা। এ কুপ্রভাবে যেভাবে আমাদের তারুণ্য শক্তি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনিত তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত হতাশাগ্রস্ত এক শ্রেণির বেকার তরুণরা এই সর্বনাশা পথে পা বাড়িয়েছে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি সমাজের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানরাও মাদকে আসক্ত। একবার ভাবুন না ঐশির কথা। তার পিতা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগে নিজ বাসায় খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। কিন্তু খুনী ! খুনী আর কেউই নয় তাদের একমাত্র মেয়ে ঐশি রহমান। ঐশি একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তে কতগুলো বখাটে সঙ্গ পেয়েছিল তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে সে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ঐশির আচার আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তার বাবা মা বিষয়টি জানতে পেরে কড়া শাসনে তাকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করলে ঐশি আরও ক্ষিপ্ত হয় এবং এক পর্যায়ে সে নিজ হাতে খুন করে আপন পিতা মাতাকে। কোনো পরিবারে মাদকাসক্ত সন্তানাদি থাকলে পরিবারে যেমন অশান্তি নেমে আসে তেমনি ভয়ভীতিও থাকে। ঐশির মতো মাদকাসক্ত সন্তান খুন করছে বাবা-মাকে। মাদকাসক্ত স্বামীর হাতে স্ত্রী, ভাইয়ের হাতে ভাই, এমনকি ছাত্রের হাতে শিক্ষকও খুন হচ্ছে।

মাদকের কারণে ভেঙ্গে যাচ্ছে স্বামী স্ত্রীর সুখের বন্ধন। তথ্য মতে গত ৫বছরে নেশায় সন্তানদের হাতে কমপক্ষে ৩’শ ৮৭ জন বাবা-মা নৃশংস খুনের শিকার হয়েছে। মাদকসেবী স্বামীর হাতে প্রাণ গেছে ২’শ ৫৬ জন নারীর। মাদকাসক্ত প্রেমিক প্রেমিকার হাতে খুন হয়েছে ৬’শ ৭০জন তরুণ-তরুণী। (মাদক ও নেশা নিরোধ সংস্থা-মানস, ১৮ জানুয়ারি যুগান্তর-২০১৭)।


যাদের হাত দিয়ে আগামী দিনে দেশ ও সমাজের অগ্রগতির ধারা ধাবিত হওয়ার কথা তাদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয় তাহলে বিষয়টি অবশ্যই আমাদের উদ্বিগ্ন করে। ১৬ কোটি মানুষের এদেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ মাদকাসক্তে আসক্ত। নেশার ছোবলে পড়ে এদেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ মাদকের পেছনে ছুটছে। আমাদের দারুণভাবে শংকিত এবং উদ্বিগ্ন করে যে, এক শ্রেণির কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও মাদকে আসক্ত হয়েছে। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এ সমস্ত শিক্ষার্থী কখন যে আমাদের মনের আড়ালে, চোখের আড়ালে, মনের অজান্তে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে তা আমরা জানি না।

 বাংলাদেশে ইয়াবা মদ, গাঁজা চরস, আফিম, ঘুমের ওষুধ, হেরোইন, ফেনসিডিল প্রভূতি মাদকদ্রব্য হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এ সমস্ত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলে আসক্ত হচ্ছে বেশি। অথচ এগুলো নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি স্বাভাবিকভাবে মানুষের আগ্রহ একটু বেশি এবং একই সাথে কৌতুহলের জন্ম নেয়। তাই কৌতুহল বশতঃ এগুলোর প্রতি তরুণদের আসক্তি সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে তারা এর সংস্পর্শে আসে। তারপর তাদের মধ্যে এক ধরনের নতুন ও রঙিন অনুভূতি কাজ করে।

 এভাবে তারা নেশার জগতে পা বাড়ায় এবং মাদক তাদের এমনভাবে গ্রাস করে যে, সেখান থেকে ফিরে আসা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। মাদকের ভয়াল থাবায় আজ বিপন্ন তরুণ। স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় সহ সর্বত্র আজ মাদকের ছড়াছড়ি। পারিবারিক সম্পর্ক শিথিল হওয়া তিক্ততা, বেকারত্ব, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে দিন দিন মাদক আসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। মাদক যেহেতু বিনামূল্যে পাওয়া যায় তাই উঠতি বয়সের ছেলেরা পিতার পকেট চুরি এমনকি ছিনতাই করেও অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক সেবনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় ১৫ থেকে ৩০ বছরের বয়সীদের মধ্যে। মাদকসেবীর মধ্যে ৮০শতাংশই তরুণ। তাদের ৪০শতাংশ আবার বেকার। এদের ৫০শতাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

 মাদক এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। তরুণদের পাশাপাশি তরুণীরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের নীল ছোবলে কোমল হাত পরিণত হচ্ছে ভয়ঙ্কর খুনীর হাতে। ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ মাদক ব্যবসায় একটি সুবিধাজনক অবস্থার একটি দেশ। একদিকে সীমান্তবর্তী দেশ অন্যদিকে বাংলাদেশ ‘গোল্ডেন ট্রাইঙ্গেল’ এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এ দু’টি বিশেষণ হচ্ছে মাদক উৎপাদন হিসাবে সবচেয়ে বিখ্যাত অঞ্চল। পাঠকের সুবিধার্থে বলতে গেলে গোল্ডেন ট্রাইঙ্গেল হচ্ছে মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং লাইওসের মধ্যে অবস্থিত যা মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত। অন্যদিকে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলো হচ্ছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরান এর সীমান্ত অঞ্চল যা মাদক উৎপাদন হিসাবে বিখ্যাত।

আর এ অঞ্চল হতে অবৈধপথে মাদকদ্রব্যগুলো ভারতীয় সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মাদক চোরাকারবারী বা সরবরাহকারীর রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক। এ সমস্ত চোরাকারবারীর সাথে জড়িত বাংলাদেশের এক বিশেষ শ্রেণি। তাদের যোগাযোগ রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তারা অত্যন্ত সংগোপনে মাদক তুলে দিচ্ছে তাদের সহযোগিদের। তারা এসব সহযোগির হাত থেকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল প্রভূতি মাদকদ্রব্য চলে যাচ্ছে তাদের খদ্দেরের হাতে। চলে যাচ্ছে তরুণ যুবসমাজের হাতে। তাই মাদকদ্রব্য উৎপাদন থেকে সাধারণ খদ্দেরের কাছে পৌঁছিতে বেশ কয়েকবার হাত বদল হয়।

ভৌগলিক দিক থেকে বাংলাদেশ মাদক অতি সহজে পাওয়া যায়। তাই আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মাদকের মরণ নেশা থেকে তরুণদের বাঁচানো। সীমান্ত রক্ষীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক বাংলাদেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে যার প্রভাবে তরুণ সমাজের একাংশ বিপথগামী মাদকের ভয়াল থাবায়। মাদকের হিংস্র ভয়াবহ ছোবলে আমাদের সন্তানরা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মাদক যে শুধু মাত্র ঢাকা বা বড় বড় শহরে এর ব্যপ্তি তা নয় মাদকের যত্র তত্র ব্যবহার হচ্ছে গ্রাম-গঞ্জে এমনকি পাড়া মহল্লায়।

 তবে মাদকদ্রব্যের প্রতি বেশি আসক্ত হচ্ছে বেকার, ভবঘুরে হতাশাগ্রস্ত তরুণরা। এ মরণ নেশার ছোবলে একদিকে যেমন সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। অন্যদিকে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ছে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে মাদক এখন তরুণ, তরুণীদের মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

এর ভয়াল থাবা প্রতিহত করতে আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে তেমনি সরকারি উদ্যোগেরও প্রয়োজন রয়েছে। গণমাধ্যম থেকে আমরা জানতে পারি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে সতর্ক এবং মাদক সহ অনেককে আটকের খবরও আমরা পাই। দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরও রয়েছে। তবুও এ মাদকের ব্যবহার ঠেকানো যাচ্ছে না। যা আমাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হিসাবে দেখা দিয়েছে।


বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে ৬৮লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে ৮৪ভাগ পুরুষ এবং ১৬ভাগ নারীও রয়েছে। দেশ জুড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪৭ লাখ। যার মধ্যে ৯০ শতাংশই কিশোর, তরুণ হিসাবে পরিচিত।

মদ, গাঁজা, হেরোইন, এসব মাদক মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান, বিবেক, অনুভূতিকে হ্রাস করে। নেশায় আসক্ত হয়ে তারা ক্রমাগতভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠে। তারা এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠে যে, হিতাহিত জ্ঞান না থাকায় তারা অতি আপনজন কেউ খুন করে। সম্প্রতিককালে ঐশি রহমানই তার প্রমাণ। ঐশি ছাড়াও এর অনেক প্রমাণ রয়েছে।


মাদককে না বলুন, মাদকমুক্ত সমাজকে হ্যাঁ বলুন, তাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করতে হলে আমাদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে। আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে তাদের সন্তানদের খোঁজ খবর নেয়া উচিত। সন্তানদের সাথে বন্ধু সুলভ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে তাদের ভালোমন্দের শেয়ার করা উচিত।

আসলে আমাদের ছেলে মেয়েদের কোনো খোঁজ খবর আমরা অনেকে রাখি না। অধিকাংশ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের ব্যাপারে উদাসীন। এমনকি তার স্কুল বা কলেজ পড়–য়া সন্তান নিজ শয়নকক্ষে কি করছে সে খবরও অনেক অভিভাবক রাখেন না।

 তাদের সহপাঠী বা বন্ধু বান্ধব কেমন প্রকৃতির কাদের সাথে মিশে এ সম্পর্কে অভিভাবকদের খোঁজ নেয়া দরকার। সন্তানদের প্রতি উদাসীন পিতা মাতার রুক্ষ ব্যবহার, বেকারত্ব, হতাশা. পারিবারিক বন্ধন হালকা, খারাপ বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ইত্যাদি কারণে আমাদের সন্তানরা বিগড়ে যায় এবং মাদকে আসক্ত হয়। মাদকসেবীর অধিকাংশই কিশোর কিশোরী, তরুণ তরুণী, যাদের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

অথচ তারা আজ বিপথগামী, ধ্বংসের মুখে, মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন। যাদের ওপর দেশের অগ্রগতি, উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের একাংশ যদি পথভ্রষ্ট হয়, ইয়াবা, ফেনসিডিল মাদকের আসক্ত হয় তাই তাদের সঠিক পথে ফিরে আনা অত্যন্ত জরুরি। মাদকের মরণ নেশা থেকে মুক্তির জন্য শুধু আইনের প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হয়ে যার যা অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।


সর্বোপরি পরিবারই হচ্ছে শ্বাশত বিদ্যালয়। পারিবারিক শিক্ষার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো বড় হতে পারে না। তাই পরিবারেই একটি শিশুকে ছোট কাল থেকে ধর্মীয় সামাজিক মূল্যেবোধ, নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে মাদক চোরাকারবারিকে আইনের হাতে সোপর্দ করে ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এ ভয়াল থাবা থেকে তরুণ সমাজকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।
লেখক ঃ শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

ভোক্তার আস্থায় ডিজিটাল বাংলাদেশ

আতাউর রহমান মিটন :আজ ১৫ মার্চ, বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। এটি একটি আন্তর্জাতিক দিবস। বাংলাদেশে এবার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে, “ভোক্তার আস্থায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ি”। একজন ক্রেতার মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা দূর করা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য। জাতীয় পর্যায়ে ভোক্তা আন্দোলনকে গতিশীল করা এবং আন্তর্জাতিক আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবে সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিবসটি গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকে।

‘ভোক্তা অধিকার দিবস’টি খুব পুরোনো নয়। উইকিপিডিয়া’র বর্ণনানুযায়ী, ১৯৮৩ সালের ১৫ মার্চ  মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট পরিবেশবাদী ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলনে সোচ্চার কর্মী আনোয়ার ফজল বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস পালনের আহ্বান জানান। ভোক্তাদের মৌলিক অধিকার সম্বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করাই ছিল দিবসের উদ্দেশ্য। এর আগে ১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি কংগ্রেসে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে বক্তৃতা দেন।

 নিরাপত্তার অধিকার, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, পছন্দের অধিকার এবং অভিযোগ প্রদানের অধিকার – ভোক্তাদের এ চারটি মৌলিক অধিকার স¤পর্কে তিনি তাঁর বক্তৃতায় আলোকপাত করেন যা পরবর্তীতে ‘ভোক্তা অধিকার আইন’ নামে পরিচিতি পায়।

১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে জাতিসংঘ ভোক্তা অধিকার রক্ষার নীতিমালায় কেনেডি বর্ণিত চারটি মৌলিক অধিকারকে আরো বিস্তৃত করে অতিরিক্ত আরো আটটি মৌলিক অধিকার সংযুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল এ সকল অধিকারকে সনদে অন্তর্ভূক্ত করে কেনেডি’র ভাষণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৫ মার্চকে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস হিসেবে বৈশ্বিকভাবে উদযাপন করে আসছে।

কেনেডি সেদিন তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বলেছিলেন, “সংজ্ঞা অনুযায়ী আমরা সকলেই ভোক্তা। অর্থনীতিতে ভোক্তাগণই সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী যারা একই সাথে প্রভাবক এবং প্রভাবিত। সকল ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ সংঘটিত হয় ভোক্তাদের দ্বারা। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই ভোক্তারা অসংগঠিত এবং প্রায়শঃই তাঁদের কথায় কেউ পাত্তা দেয় না। .. ভোক্তাদের পছন্দ এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অতি উন্নত বিজ্ঞাপনের দ্বারা। সাধারণভাবে একজন ভোক্তা জানেন না যে তিনি যে ওষুধ কেনেন তা কতখানি নিরাপদ, মানসম্পন্ন এবং কার্যকর। ভোক্তা জানে না যে খাবার সে খাচ্ছে তা কতখানি পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যসম্মত।
 
প্রায় ৫৩ বছর আগে কেনেডি ভোক্তাদের স্বার্থ চিন্তায় যে কথাগুলো বলেছিলেন তা আজও সমানভাবে অর্থবহ। বাংলাদেশে ‘ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ নামে একটি আইন হয়েছে। গঠিত হয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। আইনের আওতায় সারাদেশে ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষায় জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠিত হওয়ার কথা।

এই আইনে কৃত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব এক থেকে তিন বৎসর কারাদন্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার-তিন লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে। আইনে উল্লেখিত কোন অপরাধের জন্য দন্ডিত ব্যক্তি যদি পুনরায় একই অপরাধ করেন তবে তিনি উক্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যে দন্ড দেয়া হয়েছে তার দ্বিগুণ দন্ডে দন্ডিত হবেন। বলাই বাহুল্য যে, আইন থাকলেও ভোক্তারা আজও তাঁদের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ। আবার যারা আইন সম্পর্কে জানেন, তারাও এই আইনের উপর আস্থা রাখতে পারেন না।
 
সরকার ঘোষিত এবারের প্রতিপাদ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা সবাই জানি, ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘২০২১ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা’র অঙ্গীকার করেছিল।

সেই ধারাবাহিকতায় এখনও প্রশাসনের কার্যক্রম চলছে। সরকারের ভেতরে, বিশেষ করে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই রূপকল্প বাস্তবায়নে যেভাবে কাজ করছে সেই তুলনায় জনগণের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে আস্থা গড়ে ওঠেনি। সরকারী নেতাদের মতে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সুশাসন থাকবে, সরকারের কার্যক্রমে দায়বদ্ধতা-স্বচ্ছতা থাকবে, দুর্নীতি কমে যাবে’। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তির শক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করাটাই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’।

ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে কি? অনেকেই মনে করেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক সেবার এমনভাবে প্রসার ঘটানো, যাতে আগে যেসব সেবার জন্য নানা জায়গায় ছুটতে হতো তার আর দরকার হবে না – ঘরে বসেই ক¤িপউটারে এবং মোবাইল ফোনে তা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এটা হবে এমন এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা যার ফলে হাতের নাগালে, খুব দ্রুততার সাথে, কম খরচে এবং স্বচ্ছতার সাথে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে, ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে দিয়ে সময় বিভ্রাট সৃষ্টি করা নয়।

সন্দেহ নেই যে, বিগত ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি সাধন করেছে। প্রত্যেক ইউনিয়নে তথ্যসেবা কেন্দ্র চালু, সারাদেশে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, জনগুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ক ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ চালু করাসহ তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষাকে সর্বক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়ায় আমাদের দেশে একটা গুণগত পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তবে সরকারের এই অগ্রগতি বা উদ্যোগে ‘জনগণের আস্থা’ কতখানি বিরাজমান তা নিয়ে বিস্তর ভিন্নমত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, আমাদের দেশে ক¤িপউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা মোট কাম্য জনসংখ্যার তুলনায় কম।

 যদিও মোবাইল ফোন ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে আশাতীত। সরকারের নীতি নির্ধারকগণ অবশ্য মোবাইল ফোন এর ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সেইসাথে মোবাইল ফোনভিত্তিক সেবা  (যেমন টাকা আদান-প্রদান, বিল প্রদান, ইত্যাদি) প্রদানের সুবিধাগুলোকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাঁরা মনে করেন, সরকারের সেবাগুলোকে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুততা ও জবাবদিহিতার সাথে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল পথে এগিয়ে চলার চেষ্টা দেখে আর দশজনের মত আমিও খুবই আপ্লুত এবং গর্বিত। কিন্তু একই সাথে আমাদের অনেক হতাশাও আছে। আমার মনে হয় সরকারের ওয়েবসাইটগুলিতে প্রয়োজনীয় হালনাগাদ তথ্য পাওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে।

পুলিশ বা র‌্যাব এর মোবাইল অ্যাপগুলো সত্যিকারের সেবা দিতে সক্ষম হলে দেশে অপরাধ অনেক কমে যাবে। ভূমি মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এর মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলির ডিজিটালাইজেশন সম্পন্ন হলে মানুষের দুর্ভোগ কমে আসবে। জমি রেজিষ্ট্রি অফিস, থানা এবং আদালতগুলোতে মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে এই সেবা কতখানি পাওয়া যায় তা ভুক্তভোগীরা ভালমতই জানেন। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী অনেক সেবাই অনলাইনে পাওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে সেগুলো পুরোপুরি পাওয়া যায় না।

 এটা সত্য যে, দাপ্তরিক সকল বিষয়গুলিকে পুরোপুরি অনলাইনে আনা সম্ভব হলে দুর্নীতি প্রায় বন্ধ করে ফেলা সম্ভব হবে। যদিও স্বার্থান্বেষী মহল কারিগরী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে অনলাইন ব্যবস্থাপনাকে ব্লক বা অকেজো করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এরকম অনেক অভিজ্ঞতার কথা গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশ পায়। যেমন ধরুন কিছুদিন আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাবার ভিসা আবেদনের ‘ই-টোকেন’ অনলাইনে নিতে হতো কিন্তু সেটা একটি মহল ডিজিটালি নিজেদের করায়ত্ব করে একচেটিয়া ব্যবসা করছিল। ফলে জনগণ ডিজিটাল প্রতারণা সম্মুখীন হচ্ছিল। সম্প্রতি অবশ্য ই-টোকেন এর এই ব্যবস্থাটা বাতিল করা হয়েছে। জনগণের আস্থায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাইলে সরকারকে আরও গতিশীল হতে হবে।

 মানুষ এখনও জানে না অনলাইনে কি কি সুবিধা পাওয়া যায়। আবার কম্পিউটার পরিচালনা বা ডিজিটাল সক্ষমতা না থাকায় জনগণের পক্ষেও সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভাষা আরেকটি বড় বাধা। সকল কনটেন্ট যত দ্রুত সম্ভব বাংলায় রূপান্তর করাটা খুবই জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বড় বড় কথা বললে হবে না। যেমন সরকারের উচিত একটি চাকুরী বিষয়ক ওয়েব পোর্টাল চালু করা এবং সেখানে সকল চাকুরী প্রার্থীদের নাম নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে। এর ফলে চাকুরী দাতাগণ সহজেই তাদের কাঙ্খিত প্রার্থীকে খুঁজে নিতে পারবেন। ঐ সাইটে চাকুরী দাতাদের জন্য বিনামূলে বা স্বল্পমূল্যে বিজ্ঞাপন দেয়ার সুযোগ রাখা হলে কোম্পানী বা দপ্তরগুলো তাদের বিজ্ঞাপন উক্ত সাইটে প্রকাশ করতে উৎসাহী হবেন। এর ফলে চাকুরী দাতা এবং প্রার্থীদের মথ্যে সহজেই ডিজিটাল সেতুবন্ধন গড়ে উঠতে পারে। দূর হতে পারে বহু ভোগান্তি।  

প্রত্যেক মানুষই একেকজন ভোক্তা। বাজারের সাথে ভোক্তার সম্পর্ক নিবিড়। গত রোববার ঢাকায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের কম হলে সরকারী কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্ট দেয়া হবে না’। মাননীয় মন্ত্রীর এই কথায় অনেকের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে কারণ বাজারে গেলে বোঝা যায় জিনিসপত্রের দামের কি অবস্থা! সীমিত আয়ের মানুষেরা কষ্ট করে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াচ্ছেন। এই মানুষেরা এখন আর ‘ভোক্তা অধিকার’ নিয়ে ভাবতে পারছেন না। তাদের কাছে বড় বিষয় টিকে থাকার সংগ্রাম।  সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশনে গুরুত্ব দিতে হবে। পণ্যের গুণগত মান এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারলে সেটা সরকারের সাফল্য হিসেবে জনগণ বিবেচনা করবে, অন্যথায় নয়।


ভোক্তা অধিকার দিবসে আমরা ভোক্তারা সরকারের কাছে দায়বদ্ধতা দাবী করছি। নিয়ন্ত্রণহীন সিন্ডিকেট এর কবল থেকে বাজার এবং ভোক্তাদের স্বার্থকে মুক্ত করতে হবে। মানুষের আয় এবং জীবনমানের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড়। সেজন্য সকলের যথাযথ আয় নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের জনগণ ভিক্ষা নয়, অনুদান নয়, বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের নিশ্চয়তা চায়। দুর্নীতিবাজ ও কালোবাজারীদের দৌরাত্ম থেকে মুক্তি পেতে ডিজিটাল স্বচ্ছতা চায়। জনগণ মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ চায় কিন্তু তার আগে চায় নিজেদের জীবনকে মধ্যম মানে উন্নীত করার নিশ্চয়তা।

 ছেলেমেয়েদের জন্য একটি কম্পিউটার অথবা নিদেনপক্ষে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন কিনে দেয়ার সুপ্ত ইচ্ছা অভিভাবকদের হৃদয়ে কিন্তু সক্ষমতা কোথায়? প্রত্যেক নাগরিকই একেকজন ভোক্তা। সরকারকে তাই সকলের কথা ভেবে সকলের স্বার্থেই নীতি প্রণয়ন করতে হবে। জনগণের আস্থা সৃষ্টির জন্য সরকারকে তার কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এর লক্ষ্য বাস্তবায়িত হোক, বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াক এটাই আমাদের কামনা।
 লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১৫২৬৯৭৯

 

নারী স্বাধীনতা একটি জটিল প্রক্রিয়া

তাহমিনা আকতার পাতা :  একজন মানুষের জন্মের ইতিহাস থেকে শুরু করে সমগ্র জীবনের যে পর্যায়ক্রমিক ধারা তার প্রতিটি ধাপকে রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয়, অনুশাসন এবং রাষ্ট্রিয় চরিত্রগত কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই যে সত্যটি বেরিয়ে আসে তা হলো একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারী অনেক বেশি মাত্রায় পরাধীন এবং তা প্রত্যক্ষ। সৃষ্টিগত অর্থে মানুষের মধ্যে এই যে বৈষম্য তা যদি দূর করা না যায় তাহলে শুধু চিরাচরিত বাঙালি ঐতিহ্য কেন সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, কোন কিছুরই বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। যা বহু বছর পূর্বেই লেনিন উপলব্ধি করেছিলেন।


তিনি বলেছিলেন, “নারীকে ঘরোয়া দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ব্যতিত সমাজতন্ত্রের পক্ষে উক্তিটি এজন্যে এনেছি যে ধনতন্ত্র তথা পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় নারী মুক্তি আন্দোলন সার্থক রূপ লাভ করবে না। কেননা পূঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা নারী মুক্তিকে প্রত্যক্ষ সমর্থন করে না কখনো।হাজার বছর ধরে নারীদের মধ্যে পরাধীনতার বীজ যেভাবে রক্তের সাথে মিশে আছে তা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। এর জন্য বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার প্রয়োজন। কিন্তু সেদিকে তীক্ষ্ম মেধা খরচ না করে অনেকেই আঁতেলের মতো নারী অধিকার আদায়ের জন্য গলাবাজি করছেন এবং গদবাধা কিছু যুক্তি উপস্থাপন করে সস্তা জনপ্রিয়তা কুঁড়িয়ে নিচ্ছেন ব্যক্তিগত ব্যবসার খাতিরে।

 আসল সমস্যা জেনে শুনে কেউই উদঘাটন করছেন না। এর পিছনে আমার যুক্তি হলো, যারা এই আন্দোলনের বদৌলতে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য চিৎকার করে মাইক্রোফোন ফাটাচ্ছেন, গরম করছেন পত্রিকার পাতা (সবাই নয়) বাস্তবিক অর্থে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তারাই পড়ে আছেন সেই অনুশাসনের মুখোশ। তারা নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে স্বেচ্ছাচারিতায় রূপান্তর করে সুকৌশলে নারীকে ঠেলে দিচ্ছেন আরো পিছনে। আর এই সুযোগে কিছু কিছু নারীবাদী মহিলা চরিত্র ঐ সমস্ত মিথ্যাচারের মন্ত্রকে বিশ্বাস করে সমস্যার গভীরে না পৌঁছেই এক তরফাভাবে এই চক্রান্তের জন্য দায়ী করছেন সমস্ত পুরুষদের।


ইদানিং অনেকেই আবার নারী স্বাধীনতাকে ফ্যাশন বা যুগের হাওয়া বলে বাঁকা চোখে কটাক্ষ করছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এটা মোটেও ফ্যাশন নয়। বরং এটা বহু শতাব্দীর অত্যাচারিত, নিষ্পেশিত, শৃঙ্খলিত নারীর বুকের অন্দরে ফুলে ফেঁপে ওঠা এক আকাঙ্খার নাম, প্রতিবাদের ভাষা।বর্তমান শতাব্দীতে নারী স্বাধীনতাকে বেগবান করতে হলে পাশ্চাত্যের নারীবাদী গতিধারাকে আগে ভালো করে বিশ্লেষণ করতে হবে, বুঝতে হবে তার দর্শন। বিকৃত মানসিকতার স্বভাব দৃষ্ট চরিত্রগুলোর অনেকেই নারীকে পুঁজিবাদী সমাজের পণ্য বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু নারী যে পণ্য নয় তা প্রথমে নারীকেই তাদের ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় প্রমাণ করতে হবে। নারীর পরাধীনতা যেহেতু নারীর নিজস্ব সমস্যা তাই এর সমাধানের জন্য সমাজ, ধর্ম তথা রাষ্ট্র যতই গতিরোধ করুক প্রথমে নারীকে তার সক্ষমতা, সচেতনতার দ্বারা প্রায়োগিক প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এর জন্য সর্ব প্রথম প্রয়োজন নারী শিক্ষার প্রসার, প্রয়োজন সচেতনতা।


আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছেন যারা নারী প্রগতির ধারাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন এবং ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে সমাজের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে তৈরি করেন বিভ্রান্তি। সঙ্গত কারণে কেউ কেউ মনে করেন পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষদের কর্তৃত্ব খর্ব করতে হলে সমাজে নারীদেরকে পুরুষের মতো গড়ে উঠতে হবে, পুরুষের মতো প্যান্ট সার্ট পরতে হবে, চুল ছোট রাখতে হবে, ধুমপান করতে হবে, স্বামীর বন্ধুদের সাথে বসে এক সাথে মদ খেতে হবে, অর্থাৎ নিজস্ব ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবোধ বিসর্জন দিয়ে পুরোপুরি পুরুষালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে, স্বাধীনতার নামে অপস্বাধীনতাকে প্রশ্রয় দিতে হবে, আজকাল অনেকেই মনে করেন এভাবেই তো পুরুষদের শায়েস্তা করে নারী স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে এই হীন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ক্ষতিকর বলে আমি মনে করি। বাইরে অতি আধুনিকতার হাল্কা প্রলেপ আর ভিতরে মধ্য যুগের অন্ধকার জিইয়ে রাখলে চলবে না। পশ্চাৎপদ, আড়ষ্ঠতা ও সীমাবদ্ধ চিন্তা-চেতনা পরিহার করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য নারীবাদী সংগঠনগুলোকে হতে হবে উদ্যোগী। প্রকৃত পক্ষে নারী মুক্তির আলো, সুকল্যাণ বাতাস তখনই প্রবাহিত হবে, যখন একটা জাতি সমগ্র চিন্তা চেতনায়, জ্ঞানে, বুদ্ধিতে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বুঝবে। নারী মুক্তি সম্পর্কে মানুষের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি এবং নিজস্ব মতামত তৈরি হবে; পরিবর্তন ঘটবে পশ্চাৎপদ চিন্তা-চেতনার, পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটবে নিজস্ব ব্যক্তিত্বের।


আমি বার বার যে কথাটি বুঝাতে চাচ্ছি তা হচ্ছে নারীবাদ সম্পর্কে আগে সঠিক চিন্তা-চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। প্রকৃত ব্যাপারটা আগে বুঝতে হবে সমস্যার আলোকে। নারী মুক্তি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই ভুল পথে চালিত হচ্ছেন। যার কারণে অনেকেই আজ মনে করেন, “নারীবাদ” মানেই উগ্রতা, বেপরোয়া, যা নারীকে প্রশ্রয় দেয় স্বামী সংসারকে উপেক্ষা করতে, সংসারের দায়িত্ববোধকে অস্বীকার করতে, শিক্ষা দেয় অতি আধুনিক ফ্যাশন প্রিয় হতে, স্বীকৃতি দেয় ফ্রি মিক্সিং-এ। তারা আরো মনে করেন, বিয়ে হচ্ছে স্রেফ প্রাণহীন চুক্তির মতো যা কিনা পুরুষের তৈরি নারীদের বন্দি করবার শৃঙ্খল মাত্র। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে স্বাভাবিক সংসার ধর্ম পালনের সঙ্গে নারীবাদের যে তেমন কোন বিরোধ নেই এ সত্য তারা স্বীকার করতে রাজি হন না। এই হচ্ছে আমাদের নারী স্বাধীনতার গতিধারাকে সামনে নেবার চিন্তা চেতনা। সঙ্গত কারণে যা হবার তাই হচ্ছে। হাব ভাবে মনে হচ্ছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারী মুক্তি আন্দোলন অনেকটা সফল রূপ নিয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার হারের সাথে শতকরা হিসাব মেলাতে গেলে এর বিপরীত রূপটাই ধরা পড়বে।


এঙ্গেলসের মন্তব্যের মধ্য দিয়ে নারী জাতির সার্বিক রূপ আমরা উন্মোচন করতে পারি। তিনি বলেছেন, “মাতৃধারার উচ্ছেদ সাধন নারী জাতির বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয় বিশেষ ছিল। পুরুষ গৃহে কর্তৃত্ব করে, নারী অবদমিত হয়, গোলামী স্বীকার করতে বাধ্য হয়। নারী পুরুষের কাম প্রবৃত্তির চরিতার্থ করে ক্রীতদাসী আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়।নারী এবং পুরুষের মধ্যে এই যে বৈষম্য, আজ নতুন নয়। বহু শতাব্দীর পরিকল্পিত রূপরেখার এই বিন্যাস যুগে যুগে সমাজ, রাষ্ট্র এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে পুরুষ নারীদের মগজ ধোলাই করে রেখেছে। একথা অস্বীকার করবার কোন জায়গা নেই।


যেহেতু অধিকাংশ শাসক শ্রেণি পুরুষ ফলে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নিয়ম কানুনও তারা নিজের সুবিধা মতো তৈরি করেছে। আর সেই ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছে বহু শতাব্দী ধরে। তারপরও আমি সোচ্চার কন্ঠে বলবো নারী মুক্তি আন্দোলনের যে ধারা সুচিত হয়েছে বা হচ্ছে তার পিছনে পুরুষের অবদানকে ছোট করে দেখলে চলবে না। যুগে যুগে নারীকে পুরুষের আধিপত্যের শিকার হতে হয়েছে সত্য। তাই বলে এক চোখে দেখে সমস্ত পুরুষের বিরুদ্ধে পুরুষ বিদ্বেষী ভূমিকায় নারীদের নামতে হবে তার কোন যুক্তি নেই।

 ইদানিং অনেকেই এই ভুলটা করছেন। যার কারণে নারী মুক্তির আসল পথ এখনো রয়ে গেছে অন্তরালে। প্রকৃত পক্ষে নারী যতই নিজেকে প্রগতিবাদী ভাবুক আর ‘নারীবাদ’ নিয়ে চিৎকার করুক পুরুষের সহযোগিতা ছাড়া নারী সামগ্রীক উন্নতির পথে ভাটা পড়বেই। দুইশত বছর পূর্বে নারী স্বাধীনতার সোচ্চার কন্ঠ মেরি উলস্টোন ক্র্যাফট থেকে বেগম রোকেয়া এবং বর্তমানে যারা এসব নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন তারা সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুরুষের সহযোগিতাকে এক বাক্যে অস্বীকার করতে পারবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। বেগম রোকেয়াও এতো দূর অগ্রসর হতে পারতেন না যদি না তার ভাই সহযোগিতা করতো। কাজেই এক পেষে চিন্তা ত্যাগ করে কবির কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে নারী এবং পুরুষ এক বাক্যে বলি “এ পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”। [কাজী নজরুল ইসলাম]


অতীত, বর্তমান এর চালচিত্র প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিবেচনা করে দেখলে স্পষ্টই একটা বিষয় চোখের সামনে ফুটে ওঠে তা হলো নারীরা যে কোন স্থানে, যে কোন ভাবে জানা-অজানায় হর হামেশা কোন না কোন ভাবে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা সবকিছুই হিসেব-নিকেষ করে চলতে হয়। পুরুষের পাতানো প্রেম-ভালোবাসার ফাঁদে পা দিয়ে নারীকে সবমসয়ই নিজের কাজ থেকে সংকুচিত হয়ে থাকতে হয়েছে। নারী যখনই আপন যোগ্যতায় নিজের কাজ করার দৃঢ় সংকল্প করেছে; তখনই পুরুষের তৈরি কিছু নিয়ম নীতি নারীকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানতে হয়েছে ক্ষেত্র বিশেষে।

 এছাড়া ইভটিজিং, যৌতুক বলী, এ্যাসিডে ঝলসানো, ধর্ষণ- এগুলো এখন নারীদের ক্ষেত্রে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। নারীর রূপের নিখুঁত বর্ণনা করে পুরুষ সমাজ নারীর ভেতরের সম্ভাবনার সৃষ্টিশীল রূপরেখাকে কোন দিনই যোগ্যতার মাপকাঠিতে তেমনভাবে দেখতে পায়নি। এই আধুনিক যুগে নারীকে এখনও অনেক পুরুষ ভাবে “নারী হচ্ছে রূপের সম্ভার আর ভোগের সামগ্রী” কিন্তু একজন শিক্ষিত, রুচিশীল, কর্পোরেট নারী আমাদের সমাজের জন্য কত বড় অহংকার অনেক পুরুষ তা মানতেই চায় না। নারীর ত্বক, চোখ, চেহারা, গড়ন দেখতেই তারা ব্যস্ত।


সবশেষে বলতে চাই কারও ব্যক্তিগত সমস্যার আলোকে নয় বরং সামগ্রীকতার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রোশের জায়গা থেকে মনগড়া বিভ্রান্ত বক্তব্য প্রদান কিংবা নারী স্বাধীনতার নামে অপস্বাধীনতাকে পরিহার করতে হবে। নারী শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে আত্মসচেতনতা, আর্থিক মুক্তি, আত্মনির্ভরতা এবং নারী ব্যক্তিত্বের প্রসার ঘটাতে হবে। তাহলে সমাজনীতি, অর্থনীতির কালো অন্ধকার কেটে যাবে। নারী আইনবীদদের সহযোগিতায় মান্ধাতা আমলের অচল আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। নারীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা থাকতে হবে।

নারী মুক্তির সঙ্গে যেহেতু নারীর মানসিক ও আর্থিক মুক্তির সম্পর্ক নিহিত, সে কারণে শিক্ষার গুরুত্বটা বেশি। যথার্থ শিক্ষা মনকে সাহসী করে, উদার করে ও স্বাধীন করে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে হবে। নারীর প্রকৃত শিক্ষা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। সন্তানের মধ্যে বৈষম্যের রেখা টানা চলবে না। নারী পুরুষ উভয় উভয়কে বুঝতে হবে সচেতনতার জায়গা থেকে। পুরুষের যেমন বুঝতে হবে নারীর জরায়ুর বিকল্প নেই, তেমনি নারীকে বুঝতে হবে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। প্রত্যেকেই যদি প্রত্যেকের প্রতি সহনশীল মানসিকতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করি তাহলে কোন সমস্যাই প্রকট নয় মানুষের কাছে। নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস বহু পুরানো ইতিহাস। সমাজ পরিবর্তনের এই যাত্রা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। এই পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য।

নারী মুক্তি আন্দোলন কোণঠাসা হলে গোটা জাতির জন্যে তা অভিশাপ বয়ে আনবে। এথেকে পুরুষরাও রেহাই পাবে না। কাজেই শুধু নারী নয়, নারীবাদকে স্বীকৃতি দিয়েই এর গতি সামনের দিকে নিয়ে যেতে বিবেকবান সকল পুরুষদের ও উচিত স্বইচ্ছায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। শেষ কথা হলো, আসুন কোন কাঁদা ছোড়া ছুঁড়ি নয়, এক বাক্যে উচ্চারণ করিÑ
“বুঝি না নারী, বুঝি না পুরুষ
জন্মোবধী এক সত্য মানি
তা হলো মানুষ।”
আইনজীবী জজ কোর্ট, ঢাকা।
০১৭১১৮২৫৫৫৪

ভোক্তা সচেতনতা ও অধিকার আইন

শাওন রহমান  : নাগরিক মানুষ মাত্রই ভোক্তা। অর্থাৎ নগর, রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষই তার সকাল থেকে সন্ধ্যা এবং পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই কোন না কোনভাবে ভোক্তা হিসেবে সমাজ রাষ্ট্রের শৃংঙ্খলে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত ভোক্তার সংজ্ঞায় বলা আছে, ‘যিনি পুনরায় বিক্রি ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছাড়া-মূল্য পরিশোধ বা মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে কোন পণ্য কেনেন; আংশিক পরিশোধিত ও আংশিক প্রতিশ্রুত মূল্যের বিনিময়ে কোন পণ্য কেনেন বা দীর্ঘ মেয়াদ বা কিস্তির ব্যবস্থায় মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে কোন পণ্য কেনেন।

’ উপরোক্তভাবে যে কেউ যে কোন পণ্য কিনলেই সে ভোক্তা। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে, ক্রয়কৃত পণ্যটি পুনঃবিক্রি বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবেনা। এই কেনা পণ্যটি হতে পারে খাদ্য সামগ্রী বা নিত্য ব্যবহারের যে কোন কিছু। আধুনিক যুগে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় টাকার বিনিময়ে সেবা সামগ্রী বা খাদ্যপণ্য যখন কেউ কেনে তখন সে তার অপরিহার্যতার নিরিখেই সেটা কেনে। তবে জীবন ধারণের জন্য আমরা রাষ্ট্রের নাগরিকেরা যে পণ্য বাজার থেকে কিনি তার মান বা গুণাগুণ বিচারের কোন ব্যবস্থা একজন সাধারণ ভোক্তা হিসেবে আমাদের নেই। অর্থাৎ বিনিময় অংকের মাধ্যমে আমরা বাজার থেকে যা কিছু নিজেদের জীবন ধারণের জন্য সংগ্রহ করছি তা মানসম্পন্ন বা মানহীন যাই হোক বাঁচার তাগিদেই তা আমরা গ্রহণ করছি।


গত তিন চার দশক ধরে আমরা খাবার ও নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের সাথে ভেজাল ও এন্টিবায়োটিকের অবাধ ও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে আমরা প্রতিনিয়ত বিষ গ্রহণ ও ব্যবহার করছি। খাদ্যপণ্য বা নিত্য ব্যবহারের জিনিসে ভেজাল বা বিষ সম্পর্কে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে বুঝে ওঠা একেবারেই অসম্ভব। খাদ্যে ভেজাল প্রদানের প্রবণতা খুব বেশি দিন হলো এদেশে শুরু হয়নি। কিন্তু বিগত বছরগুলো থেকে এর প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমাদের বাজার থেকে কেনা বেশিরভাগ খাবারেই ভেজাল। দেশি-বিদেশি বেশির ভাগ ফল-মূলে কার্বাইডসহ নানা প্রকার বিষাক্ত কেমিক্যাল।

মাছ, মাংস, দুধ, ডিমে নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ওষুধ। সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক। বাজার থেকে বাড়িতে তারপর পাত থেকে পেটে। চাল-ডাল, কাঁচা সবজি, প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য, বেকারিসহ সব পণ্যতেই ভেজাল। দই, মিষ্টি, খীরসা, সন্দেশ ভেজাল নেই কোথায়? লবণে সাদা বালু, গুড়া মসলায় ইটের গুড়া, বিষাক্ত রং, চায়ে কাঠের গুড়ো, যে যার ইচ্ছা মত এ রকম বিভিন্ন প্রকার ভেজাল দিয়ে আমাদের প্রতিদিনের খাবারগুলোকে বিষাক্ত করে আমাদের একটু একটু করে মেরে ফেলছে। ভেজালের পাশাপাশি আরও ভয়াবহ বিরূপ অবস্থা সৃষ্টি করছে খাবারে এন্টিবায়োটিক। এন্টিবায়োটিকের ভয়াবহ উপস্থিতি আছে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায়, যা খোলাচোখে সাধারণের পক্ষে দেখা বা বোঝা অসম্ভব। আমরা আমাদের জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে একটু একটু করে এন্টিবায়োটিক খাচ্ছি।

 অতি মুনাফার আশায় অসাধুরা অপরের জীবন নিয়ে বাণিজ্য করছে। এই ভেজাল ও এন্টিবায়োটিকযুক্ত খাবার আজ খেলে কালকেই আমাদেরকে অসুস্থ বা আক্রান্ত করছে না তাই আমরা নিশ্চিন্তে নিরুপায় হয়ে নির্দ্বিতায় তা গ্রহণ করছি। এসবের পরে আছে ওজনের কারচুপি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য, বেশি দাম নেয়া, পণ্যের মোড়কে মূল্য না লিখে ইচ্ছামত দাম নির্ধারণ করে ভোক্তাকে ঠকানো ইত্যাদি। অর্থাৎ ভোক্তার সাথে প্রতারণা করার যাবতিয় ব্যবস্থা অদ্যবধি আমাদের বাজারে বর্তমান। অথচ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে সমাজের সর্বনি¤েœর ব্যক্তি পর্যন্ত সবাই ভোক্তা।

 কিন্তু এই ভোক্তারা নানাভাবে প্রতারণার শিকার হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তার অধিকারের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। যা আছে তা শুধু উৎপাদক ও ব্যবসায়িদের সুবিধার্থে। যদিও সমাজে ভোক্তার তুলনায় উৎপাদক ও ব্যবসায়ির সংখ্যা নগণ্য, এমনকি সবাই উৎপাদক ও ব্যবসায়ি না হলেও সব শ্রেণির পেশার মানুষই ভোক্তা। অথচ প্রতারিত, অধিকার বঞ্চিত ভোক্তার নায্য ও প্রাপ্য অধিকার আদায়ের ব্যাপারে এতদিনে কোন আইনই দেশে ছিলনা। পণ্য উৎপাদক ও বিক্রেতাদের লাগামহীন লাভের যাঁতাকলে পিষ্ট এদেশের ভোক্তাদের রক্ষার যেন কোন ব্যবস্থায় নেই।


এরকম নিয়মিত অনিয়ম ও ভোক্তা শোষণ অবসানের জন্য সরকার ২০০৯ সালে প্রণয়ন করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন। ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্য ও অপরাধ আইনের ধারায় এনে তার যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করায় এই আইনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দায়েরকৃত আমলযোগ্য অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত ও জরিমানা করা হলে আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে প্রদান করা হয়। তবে ২০০৯ সালের এপ্রিলের ৬ তারিখে আইনটি প্রণয়ন হলেও ব্যাপকভাবে এই আইনের প্রচার ও কার্যক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ এই আইন সম্পর্কে যদি কেউ যথাযথভাবে জানে এবং সচেতন হয় তাহলে আমাদের বাজার ব্যবস্থার আমূলই পরিবর্তন হয়ে যাবে। পরিবর্তন আসবে আমাদের নিত্যপণ্যের মানে। যার ওপর আমরা প্রত্যেকেই অপরিহার্যভাবে নির্ভরশীল।  


এই আইনের ৩৭ থেকে ৫৬ মোট ২০টি ধারায় ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্য ও অপরাধে বলা আছে, পণ্যের মোড়ক ইত্যাদি ব্যবহার না করা-কোন আইন বা বিধি দিয়ে কোন পণ্য মোড়কাবদ্ধভাবে বিক্রি করার এবং মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রি মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টভাবে লেখার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করা। মূল্যের তালিকা প্রদর্শন- দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় পণ্যের মূল্য তালিকা টানিয়ে প্রদর্শন না করা।

সেবার মূল্য তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা-দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সেবার মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ না করা এবং সংশ্লিষ্ট স্থানে যা সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় উক্ত তালিকা টানিয়ে প্রদর্শন না করা। নির্ধারিত মূল্যের বেশি মূল্যে পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি-নির্ধারিত মূল্যের বেশি মূল্যে কোন পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করা। ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি-জ্ঞাতসারে ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করা। খাদ্য পণ্যে নিষিদ্ধ বস্তুর মিশ্রণ-মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোন দ্রব্য, অন্য কোন খাদ্য পণ্যের সাথে মিশানো।

 অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ- মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি হয় এমন কোন প্রক্রিয়ায় কোন পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করা। মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা-কোন পণ্য বা সেবা বিক্রির জন্য অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা। প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা-প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা। ওজনে কারচুপি-কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনের পণ্য বিক্রি বা সরবরাহ করা।

ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি-কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের জন্য কোন দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত ওজন পরিমাপক  যন্ত্রে প্রকৃত ওজনের চেয়ে বেশি দেখানো। পরিমাপে কারচুপি-কোন পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজনের কম দেয়া। দৈর্ঘ্য পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতাতে কারচুপি। পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রি।

সেবা গ্রহণকারীর জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্নকারি কাজ। অবহেলা ইত্যাদি দিয়ে সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য, জীবনহানি ইত্যাদি ঘটানো। মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের। একই অপরাধ আবার করা। এর সবকিছু একজন ভোক্তার অধিকার বিরোধী কার্য ও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ভোক্তার অধিকার রক্ষায় এই আইনে অপরাধীর দন্ড হিসেবে অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদন্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।  


একজন ভোক্তা উল্লেখিত যে কোন ধারায় তার অধিকার হারালে, ভোক্তার অধিকার ক্ষুন্নকারীর বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। কোন ভোক্তা বা অভিযোগকারী তার পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর এবং পেশা উল্লেখপূর্বক অধিকার ক্ষুন্নের কারণ ঘটলে ত্রিশ দিনের মধ্যে ভোক্ত অধিকার বিরোধী কার্য সম্পর্কে কোন পণ্যের উৎপাদনকারী, প্রস্তুতকারি, সরবরাহকারি বা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট ই-মেইল, ফ্যাক্স এবং এ্যাপস ব্যবহার করে বা লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। ভোক্তার এই অভিযোগ জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কার্যালয়ে দায়েরের ব্যবস্থা আছে।

 এক্ষেত্রে ভোক্তার অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে নিষ্পত্তির ব্যাপারে কোন থানা পুলিশের প্রয়োজন হয়না। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরই যথেষ্ট। এই অধিদপ্তর ভোক্তার সব ধরনের অভিযোগ কোন টাকা এবং হয়রানি ছাড়াই খুবই আন্তরিকতার সাথে নিষ্পত্তি করছে। এই আইনের কঠোরতা, প্রায়োগিক ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের আন্তরিকতার কারণেই ভোক্তার দায়েরকৃত অভিযোগ খুব সহজেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিকতার সাথে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন।


স্বল্প আয়তনের এই বাংলাদেশে অধিক জনসংখ্যা হওয়ার কারণে এখানে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি যথেষ্ঠ লাভজনক। কোন পণ্য বাজারে একবার প্রচলিত হয়ে উঠলে খুব দ্রুতই সেই পণ্য নকলাকারে ভোক্তার কাছে চলে আসে। ভোক্তার অসচেতনার কারণে উৎপাদক ও বিক্রেতারা খুব সহজেই ভোক্তাদের প্রতারিত করছে। আমাদের অসচেতনতার কারণেই উৎপাদক ও বিক্রেতা শ্রেণির মানুষরা আমাদের খাদ্য ও নিত্য ব্যবহৃত পণ্যে ভেজাল ও বিষ মিশাচ্ছে। প্রতিটি সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি এবং পদক্ষেপের ফলেই বন্ধ হতে পারে ভেজাল ও নি¤œমানের পণ্যের রমরমা কারবার।

খুচরা বিক্রি মূল্য, মেয়দোত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি দেখে পণ্য বা ওষুধ কিনতে হবে। মিথ্যা ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন থেকে সতর্ক থাকতে হবে, ভেজাল ও নকল পণ্য বা ওষুধ প্রস্তুত এবং ফরমালিনসহ ক্ষতিকর দ্রব্য মিশ্রিত খাদ্যপণ্য ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ক্রয়-বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। পণ্য ক্রয়ের সময় ওজন ও পরিমাপ সঠিকভাবে বুঝে নিতে হবে। মূল্য নির্ধারিত থাকলে তা দেখে কিনুন। হোটেল, রেস্তোঁরার খাবারের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। সবার আগে একজন ভোক্তা হিসেবে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। আর ভোক্তার সচেতনতাই পারবে দেশ থেকে ভেজালের কারবার বন্ধ করতে।  
লেখক ঃ সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক

shaown077@gmail.com

০১৭১৬-২২৪৮১০

 

নারী ভাবনায় আমরা কেন পিছিয়ে

মীর আব্দুল আলীম : নারী ভাবনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে। আমাদের পুরুষরা মনে করেন নারীরা কেবল ঘর সামলাবেন। এ ব্যাপারে এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে চাই। অনেক দিন আগের কথা। নদী বিষয়ক একটি সেমিনারে যোগ দিতে ঢাকা থেকে রাজশাহী যাচ্ছি বাসে চড়ে।

পত্রিকা পড়ছিলাম। পাশের যাত্রী তিনিও আমার সাথে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাচ্ছিলেন। তখন এভারেষ্ট জয়ী নিশাত মজুমদার আর ওয়াসফিয়া নাজনিকে নিয়ে দেশে বেশ হৈ চৈ হচ্ছে। সংবাদপত্রে বড় বড় হেড লাইন হয় তাঁদের নিয়ে। সেদিন ইত্তেফাকের মূল শিরোনামে ছিলেন তাঁরা।

বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজনিনকে নিয়ে লেখাটিই আমি পড়ছিলাম। আমার ডানদিকের সিটে বসা যাত্রী তিনিও ওই খবর আড়চোখে পড়ছিলেন। এক ফাঁকে বলে উঠলেন, ‘ঘর ছাইড়া মাইয়ারা এহন এভারেষ্টে যাওয়া ধরছে’। ঠেস্ মেরে নেগেটিভ অর্থেই ভদ্রলোক কথাটি বললেন। এও বললেন, ‘মেয়েদের কাজ ঘরে থাকা, স্বামী সন্তানদের দেখভাল করা, রান্না-বান্না করা, তারা আবার এসব করতে যায় কেন?’ ভদ্রলোকের কথা এমন- এই জন্যেই নাকি আমাদের সমাজটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

 

সরকারের নারী-পুরুষের সমঅধিকার পলিসিই নাকি এ জন্য দায়ি। তাঁর সাথে কথা বলে জানলাম তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। আমাদের শিক্ষকদের মানসিকতাই যদি এমন হয় তাহলে সাধারণ মানুষের ধ্যান ধারণা কেমন তা সহজেই অনুমান করা যায়। আমি তাঁর কথাবার্তায় খুব বিরক্তিবোধ করছিলাম। এক পর্যায়ে বললাম-‘আপনি যেমন মানুষ, নারীও আপনার মতই মানুষ। লিঙ্গের ভেদ আছে কেবল।

 ওদের কি আপনার মতো স্বাদ আহলাদ বলে কিছু থাকতে পারে না? এও বললাম, নারী কিন্তু মা? আমাদের মায়ের সম্মান রক্ষা করতে হবে। মর্যাদা দিয়েই কথা বলতে হবে। নারীর কথা এলইতো মায়ের কথা এসে যায়। মা; ইংরেজিতে গঁস কিংবা গড়ঃযবৎ. একজন নারী, যিনি গর্ভধারিনী, সন্তানের জন্ম তথা সন্তানকে বড় করে তোলেন। তিনিই আমাদের অভিভাবকের মূল ভূমিকায় থাকেন। এ কারণেই মা আমাদের অতি আপন। মা মানেই নারী; নারী মানেই মা। কিন্তু কিছু অথর্ব পুরুষ আছে যারা নারীকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে। এরা সবখানেই ঘৃণিত। নারীর অমর্যাদা হলে সে তো মায়ের অমর্যাদা।

আর তাইতো হচ্ছে বিশ্ব জুড়ে। কি উন্নত রাষ্ট্র কি দরিদ্র; সব জাতিতেই নারী যেন পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে। নারীর মর্যাদা বৃদ্ধিও লক্ষ্যে কাজ চলছে। এ জন্য ১৯১১ সাল থেকে নারীর সম-অধিকার দিবস পালন করছে বিশ্ববাসী। সেই থেকে প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ক্যালেন্ডারে জায়গা করে নিয়েছে। দিবস আসে দিবস যায় কিন্তু পরিবর্তন আসে না নারী জীবনের। প্রশ্ন হলো, নারী কেন এখনও পুরুষের অধীন? নারী কেন এখনও নির্যাতনের শিকার? এখনও ভোগ্যপণ্য হতে হয় কেন নারীকে? আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের ১০৭ বছর পূর্তিতেও কেন নারীর প্রতি নিপীড়ন নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না?


সারা বিশ্বের নারী সমাজই আজ অধিকার বঞ্চিত। তারা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার। নারীদের মর্যাদা আগের চেয়ে বাড়লেও গোটা দুনিয়ার নারীরা এখনও গড়পরতায় পুরুষের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে কম। প্রকৃতপক্ষে আজও নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার। দেশভেদে এদের সংখ্যার হেরফের হয় মাত্র। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান।

 

অথচ, দুনিয়ার মোট সম্পদের একশত ভাগের মাত্র এক অংশের (১%) মালিক নারী। নারীর গৃহস্থালী কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনো দেয়া হয়নি অর্থাৎ তা অর্থনৈতিক মূল্যে অদৃশ্যই থাকে। এখনও পৃথিবীর ৬৬% কাজই করেন নারীরা। সারা বিশের ১০% বৈশ্বিক আয় আসে এই নারীদের হাত দিয়েই। অথচ সারা বিশ্বে নারী প্রতিনিধিত্ব কম। বিশ্বে মাত্র ১৯%নারী সাংসদ রয়েছে যা কিনা পুরুষের চেয়ে ৫ ভাগ কম।

 নারীরা ৬০-৮০% কৃষিকাজ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই নারীদের নিজেদের ভূমি সম্পত্তি রয়েছে মাত্র ২%। পৃথিবীতে গড়ে প্রতি ১ মিনিটে মারা যান ১ জন নারী। যা পুরুষের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে গোটা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৫ লাখ নারী মারা যান গর্ভধারণ এবং শিশু জন্মদানের সময়, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। শিক্ষার দিক থেকেও নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৭৭৪ মিলিয়ন অশিক্ষিত পূর্ণবয়স্ক মানুষই নারী। পাঠক নিশ্চয়ই এ পরিসংখ্যান থেকে আপনিও বলবেন, কেবল বাংলাদেশে নয় সারা দুনিয়ায়ই নারীরা মর্যাদা বঞ্চিত।


মানুষ হিসেবে একজন নারী পরিপূর্ণ অধিকারের দাবিতে সুদীর্ঘকাল আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সামাজিক কর্মকান্ডের বিভিন্ন ধারায় দেখা যায়, নারী কোন অংশেই পুরুষের পেছনে ছিল না। ফ্রান্সের প্যারি কমিউন, ফরাসি বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনসহ ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে পুরুষের সাথে নারীকে দেখা যায়। কিন্তু, নারীরা কাঙ্খিত দাবি নারী সমাজ অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র নারীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি পুরুষের চেয়ে কম। বিশ্বে নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নির্যাতনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার পরিসংখ্যান ভয়াবহ।

 এখানে প্রতি দুইজনের মধ্যে একজন পুরুষ কর্তৃক নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। শতকরা ৬০ জন অসহায় নারী এর বিরুদ্ধে নীরব থাকে। অধিকার আদায়ের জন্য বিশ্বজুড়ে নারীদের কণ্ঠস্বর হাল আমলে ব্যাপকতা পেয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যাও রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এ আন্দোলনের অভিন্ন কোন নেটওয়ার্ক অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উপরন্তু নানা মত-পার্থক্যের কারণে নারী আন্দোলন বিভিন্ন অংশে বিভক্ত।  


নারী নির্যাতন প্রথা আমাদের সমাজে এমনভাবে মিশে আছে যে ভদ্র পোশাকের আড়ালেই এমন ঘটনা হরেদরে ঘটে যাচ্ছে। নানা পেশাজীবি শ্রেণির এক ধরনের মানুষ আর নারী নির্যাতনের বাইরে নেই। এদের অনেকেই ঘরের বাইরে জ্ঞানের কথা বলেন; সাধারণ মানুষকে ভালো হয়ে চলার উপদেশ দেন আর তারাই কিনা ঘরে এসে বউ পেটায়। অবাক লাগে নারী অধিকারের কথা বলে মাঠ গরম করা রাজনীতিবিদদেরও কেউ কেউ বউ পেটায়। মানবতার গান গাওয়া শিল্পীটাও বাসায় ফিরে বউ পেটায়। মানবাধিকার কর্মী হিউমেন রাইটসের কথা বলে মিছিল-মিটিং করে কিন্তু পান থেকে চুন খসলে সেও বউ পেটায়। কারণ, অকারণেই পুরুষ সমাজ নারীর প্রতি চড়াও হচ্ছে। মনে হয় আমাদের রক্তের মাঝে এই কুপ্রবৃত্তি চলে এসেছে।


আমাদের এই মানসিকতার গায়ে আঁচড় পড়ে ১৯৯৫ সালে যখন সংসদ কর্তৃক নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইনটি পাস করা হয়। কিন্তু এই আইনটিও ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন সমস্যার মুখে লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়। এমতাবস্থায়, সংসদ ২০০০ সালে এই আইনটি পরিমার্জন করে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার অপরাধগুলোকে বিশেষভাবে তদন্ত ও বিচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন পাস করে।

 এই আইনে যৌতুকের জন্য সাধারণ বা গুরুতর আহত করণসহ ধর্ষণ, ধর্ষণের প্রচেষ্টা, যৌন হয়রানি, হত্যা, অপহরণ, দহনকারী পদার্থ দিয়ে আহত করা ইত্যাদি প্রায় ১২ প্রকার অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন, ভিকটিমের জবানবন্দি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই আইনের অপরাধকে জামিনের অযোগ্যও ঘোষণা করা হয়। তবু নারী নির্যাতন থেমে নেই।

 

জেলায় উপজেলায় গ্রামেগঞ্জে নারী নির্যাতন চলছে তো চলছেই। বউ পেটানো, নারী নির্যাতন আগে ছিল অশিক্ষিতের কাজ এখন তা ভদ্র সমাজে ঢুকে গেছে। হে পুরুষ ধন্য তোমরা ধন্য হে! ঈশ্বর শব্দের অর্থ সর্বশক্তিমান। অনেক পুরুষ তা ভুলে নিজেদের সর্বশক্তিমান ধরে নিয়ে, নারী নির্যাতন করছে; বউ পিটাচ্ছে। ধিক্কার জানাই এসব পুরুষদের।


আজও প্রতিবাদ করি; জ্ঞান থাকা পর্যন্ত প্রতিবাদ করবো। আমাদের পুরুষ সমাজের কাছে একটাই মিনতি, নারীর উপর নির্যাতন বন্ধ করুন। নারীরা মায়ের, স্ত্রীর মর্যাদা ফিরে পাক। পরিশেষে- আমি কাউকে অনুরোধ করবো না যে ভেবে দেখুন। কাউকে বলবো না যে সচেতন হোন। কাউকে অনুনয়-বিনয় করে বলবো না- নারী নির্যাতন করবেন না, বউ পেটাবেন না। কিছুই বলবো না। মানুষ যে সে বুঝে নেবে।

 

আর যে নয়- তাকে বুঝালেও কোন কাজ হবে না মনে হয়। তবে যারা মানুষ নয়- সেই ঘৃণ্য প্রজাতিদের সমাজ থেকে বের করার ব্যবস্থা নিতে হবে- এমনকি আমি নিজেও যদি সেই রোগে আক্রান্ত হই। ক্ষমা যেন আমারও না হয়। সমগ্র পৃথিবীতে নারী জাতির প্রতি পুরুষদের অত্যাচার অনাচার বন্ধ হোক- এই প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
newsstore13@gmail.com  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

বায়ু দূষণ : হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

আব্দুল হাই রঞ্জু : মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বায়ু অপরিহার্য। শুধু মানুষই নয়, জীব মাত্রই বায়ু গ্রহণ করেই বেঁচে থাকে। এ কারণে নির্মল বায়ুর গুরুত্বও অপরিসীম। নির্মল বায়ুকে নিয়ে সংকট শুধু বাংলাদেশেই নয়, এ সংকট কম-বেশি গোটা বিশ্বেই বিদ্যমান। বিশেষ করে চীন, ভারতের মতো উন্নত দেশে নির্মল বায়ুর আকাল বাংলাদেশের চেয়েও অনেক তীব্র। এতে আমাদের স্বস্তি পাওয়ার মতো সুযোগও দিনে দিনে কমে আসছে।

 কারণ বাংলাদেশের বায়ু দুষণের হার গত কয়েক বছর এমন ভাবে বেড়েছে, যা ভারতের পরের স্থানটি দখলে নিয়েছে। মূলত উন্নয়ন কর্মকান্ডে ব্যবহৃত ইটের ধুলা, নির্মাণ সামগ্রীর ধুলা, নগর উন্নয়ন, বসতবাড়ী, রাস্তাঘাট নির্মাণ পানি নিষ্কাশনসহ নানা কর্মকান্ডের কারণে অতি সম্প্রতি ধুলা আগ্রাসনের শিকার বাংলাদেশ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার অবস্থা সবচেয়ে কাহিল।

কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসবাস উপযোগী এলাকা প্রতিনিয়তই যেমন সম্প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ইটসহ নানা উপাদানের ধুলা, ময়লা, আবার অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে রাস্তাও নষ্ট হচ্ছে। ফলে ধুলা আগ্রাসনে রাজধানী ঢাকার অবস্থা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি বিপর্যস্ত। এ নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ফলাওভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। যা নিয়ে দুস্তর লেখালেখিও হচ্ছে। এ বিষয়ে আমিও দু’চারটি কথা বলার অভিপ্রায় নিয়ে নিবন্ধটি লিখছি।


খুব বেশি দিনের কথা নয়। যা আমরা অনেকেই নিজের চোখ দিয়ে উপলব্ধি করেছি। বয়সে তরুণ। সবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে লেখাপড়া করছি। গোটা দেশে তখন পাকা রাস্তার অবস্থান ছিল না, যেখানে থানা (এখন উপজেলা), পৌরসভাসহ গোটা গ্রামাঞ্চলে ছিল কাঁচা রাস্তা। বর্ষাকালে পানি কাদায় ভরপুর ছিল সেসব রাস্তা। আর সে সময় সেচ ভিত্তিক চাষাবাদও ছিল না। ফলে সারাদিনই প্রতিটি গ্রাম জুড়ে রাস্তাগুলোও যেমন ছিল ধুলার আধিক্য, তেমনি শুকনো জমিতে বীজ ছিটিয়ে চাষাবাদ করার কারণে চাষাবাদের জমিতে ছিল ধুলার রাজত্ব।

 বিশেষ করে ফাল্গুন, চৈত্র মাস এলেই ঘুর্ণি বাতাসের সাথে ধুলায় চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে যেত। এমনকি ঝড় কিম্বা বেশি বাতাস হলে মুখ ঢেকে রাখা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না। আজ সে দিনের শেষ হয়েছে। বলতে গেলে ষাট-সত্তরের দশকে সেচভিত্তিক চাষাবাদের শুরু। প্রাথমিক পর্যায়ে নদী নালা থেকে লো-লিফট পাম্প বসিয়ে পার্শ্বের জমিতে সেচ দিয়ে ধানের চাষাবাদ শুরু হয়। আর তখন নদী নালাগুলোতেও ছিল টই টুম্বর পানি।

খুব সহজেই নদী নালা থেকে পানি উত্তোলন করাও সহজ ছিল। ফলে সেচভিত্তিক চাষাবাদের কারণে চাষের জমিতে ধুলার যে আধিক্য ছিল, তা এখন একবারেই নেই। অথচ সে স্থান দখল করেছে নগর মহানগরগুলোর মাঝে। বিশেষ করে পানি নিষ্কাশনের জন্য বড় বড় ড্রেনের জন্য রাস্তা জুড়ে গভীর করে যে মাটি রাস্তার পার্শ্বে মাসের পর মাস ধরে পড়ে থাকার কারণে ধুলার প্রাদুর্ভাব, এমনকি রাজধানীর অভিজাত এলাকা কিম্বা মন্ত্রী পাড়া ছাড়া অধিকাংশ রাস্তা সংস্কারের অভাবে ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে।

ফলে ধুলা ঝড়ের মত অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির অভাবে ধুলার আগ্রাসন, আবার বৃষ্টি শুরু হলে কাঁদা পানিতে ওই সব রাস্তা চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সংগত কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগের শেষ থাকে না। শুধু দুর্ভোগেই নয়, বিশেষ করে বায়ু দূষণের কারণে বাতাসে ক্ষতিকর উপাদান পিএম ২.৫ এর কারণে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।


যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, বায়ুতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান পিএম ২.৫ সবচেয়ে বেশি নির্গত করত চীন। গত দুই বছরে সে অবস্থানকে টপকে সে স্থান এখন দখল করেছে ভারত। আর ভারত ও চীনের পরের স্থানটি দখল করেছে  বাংলাদেশ।

 সেই হিসাবে বিশ্বে দুষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে এখন ঢাকা। শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি। উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ১২ হাজার ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটছে বায়ু দূষণের কারণে। আর এ কারণে শিশু মৃত্যুর হারের অবস্থানের দিক থেকে পাকিস্তানের পরের স্থানটি দখলে নিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বায়ু দূষণের কারণে মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রতিবেদনটিতে ওঠে এসেছে, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে বাংলাদেশের সরকারি-সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, দেশে ব্যাপকভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ড চলছে। ফলে ইটভাটার সংখ্যাও বাড়ছে প্রয়োজনের তাগিদে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুষণের মাত্রা একটু বেশি থাকে। বর্ষা শুরু হলে দুষণের মাত্রা অনেক কমে যায়। যা এখনও ভারত ও চীনের চেয়ে অনেক কম থাকে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বি-মত পোষণ করলেও প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে বায়ু দুষণের মাত্রা শুষ্ক মৌসুমে বেশি থাকে। বাস্তবে ঢাকা শুধু বায়ু দুষণের কারণেই আক্রান্ত নয়, শব্দ দূষণ, মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের কালো ধোঁয়া নির্গমন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে ঢাকার বায়ুতে উত্তাপও একটি বড় সমস্যা। যে সমস্যা নিরসনে সরকার ডিজেল, পেট্রল চালিত যানবাহনগুলোকে গ্যাসে রূপান্তর করে নগর মহানগরগুলোর যানবাহনের কালো ধোঁয়া নির্গমন বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানেও বিপত্তি, ইতিমধ্যেই গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে। হয়ত নিকট ভবিষ্যতে যানবাহনের গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে।

 এসব সমস্যা তো কম বেশি লেগেই আছে। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো রাজধানী ঢাকায় যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খুড়ে যে পরিমাণ ধুলার রাজত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যে ঔদাসীন, যা স্বীকার করতেই হবে। অর্থাৎ রাজধানী ঢাকার ভিতরে তো কোন ইট ভাটা নেই, তাহলে সেখানে ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে কেন? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফলতি, অপরাগতা, কাজে ধীরগতির কারণে বায়ু দুষণের ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অন্য কোন কারণ দেখিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করে।

অতি সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখতে হলে রাস্তা খোড়ার কোন বিকল্প নেই। তবে, আমরা চেষ্টা করছি, উন্নয়ন কাজের কারণে বায়ু দুষণের মাত্রা কমিয়ে আনার। শুধু জনস্বার্থের কারণে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ভেঙ্গে দু’ভাগ করা হয়েছে। এরপরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে কাজ না করেন, তাহলে বায়ু দূষণ কমবে কি করে? যদি উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিয়োজিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গুলোকে উত্তোলিত মাটি ভিজিয়ে রাখার নির্দেশনা দিয়ে তা নিশ্চিত করা হয়, তাহলেও অন্তত ধুলার আধিক্য অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।


বায়ু দূষণ বিষয়ক গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, তিনি ১০ বছর ধরে ঢাকা ও বাংলাদেশের বায়ু দূষণ পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, যান্ত্রিক উৎস থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া ও ধুলা থেকে বাতাসে ক্ষুদ্র কণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। মুলত কয়লা ও জৈব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কণার সৃষ্টি হয়।

শিল্প কারখানার ধোঁয়া ও যানবাহনের ধোঁয়ার বিরুপ প্রভাব সবচেয়ে বেশির কারণে সংকট দিনে দিনে ঘনিভূত হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, এখন বিশ্বের বড় বড় অনেক শহরের চেয়ে ঢাকার বায়ুদুষণের পরিমাণ তুলনামুলক কম। তবে, বায়ু দূষণের কারণগুলোকে নিবৃত করা না গেলে এ সংকট অদূর ভবিষ্যতে তীব্র হবে। শুধু ঢাকা শহর যে বায়ু দূষণের কারণেই একমাত্র আক্রান্ত হচ্ছে, তা নয়। এর পাশাপাশি পয়:বর্জ্য, খাবার বিশুদ্ধ পানির অভাব ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি  প্রতিনিয়তই তীব্র হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

 মানুষের বেঁচে থাকার জন্য নির্মল পরিবেশের কোন বিকল্প নেই। এখন মহানগরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার নির্মল পরিবেশ বলতে গেলে শূন্যের কোটায়। যা ফিরিয়ে আনতে সুবিশাল ভবনগুলোর আশেপাশে খোলা জায়গায় অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বৃক্ষ রোপণ এবং সেগুলোকে বেড়ে ওঠার পরিবেশকে নিশ্চিত করতে হবে। তা করা না হলে, বৈশ্বিক বায়ু দূষণের কবল থেকে আমাদের নিষ্কৃতির কোন সুযোগ থাকবে না। কারণ বৈশ্বিক বায়ু দূষণের ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে গোটা বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের মৃত্যুর যে হার উল্লেখ করা হয়েছে, তা খুবই উদ্বেগের।

 যেখানে ২০১৫ সালে ১ বছরে চীনে ১১ লাখ ৮ হাজার ১০০ জনের, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ গুলোয় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ জনের, পাকিস্তানে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১০০ জনের এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৮৮ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সেখানে বাংলাদেশের মানুষের জন্য বায়ু দূষণের কারণ যে কত বড় ভয়ানক, তা উপলব্ধি করা কঠিন হবে না। অবশ্যই বায়ু দূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে কমানো সম্ভব না হলে, বাংলাদেশ যে বিশ্ব তালিকার শীর্ষে চলে আসবে, যা অনাকাংখিত হলেও বাস্তবে তাই ঘটবে।
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

হিজরীর ষষ্ঠ মাস জুমাদাস সানিয়া


 অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ: ইসলামি ক্যালেন্ডারের ষষ্ঠ মাস জুমাদাস সানিয়া। অর্থ হলো বরফ জমার দ্বিতীয় মাস। জুমাদাল উলা এবং জুমাদাস সানিয়া উক্ত দুই মাস শীতকাল ছিল। আরবগণ সর্ব প্রথম যে বছর মাস নামকরণ করছিল সেই বছর ঘটনাক্রমে উক্ত দুই মাস কঠিন শীতের কারণে বরফ জমেছিল। তাই উক্ত দুই মাস- কে বরফ জমার প্রথম মাস এবং দ্বিতীয় মাস নামে অভিহিত করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে উক্ত নামের অর্থের সাথে উক্ত মাস দ্বয়ের প্রাকৃতিক অবস্থার মিল না থাকলেও প্রথম নামকরণের অনুকরণে উক্ত নামেই অভিহিত হয়ে আসছে। শায়েখ ইলমুদ্দীন সাখাবী (রহ.) বলেন “জুমাদা’ শব্দটি পুংলিঙ্গ ও স্ত্রী লিঙ্গ উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে।

 তাই জুমাদাস সানিয়াকে জুমাদিউল আখিরা বা জুমাদিউল আখির কিংবা জুমাদাল উখরা বিভিন্নভাবে বলা হয়। আবার জুমাদিউস সানীও বলা যায়। কুরআন সুন্নাহর আলোকে অন্যান্য মাসের মত এ মাসেরও ফরজ ওয়াজিব সুন্নাত পালন সহ নফল সালাত, সিয়াম, দু’আ-দরুদ, যিকর সহ বিভিন্ন নফল ইবাদত করা ভাল। তবে মনে রাখতে হবে নফল ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম কুরআন তেলাওয়াত/ যত বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা যায় তত ভাল। তবে যদি মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হয় তাহলে কুরআন তিলাওয়াত না করে অন্য নফল ইবাদত করতে হবে। এ প্রসংগে হযরত জুনদব (রা.) বর্ণনা করেন নবী করীম (সা.) বলেছেন- “কুরআন মজীদের সাথে যতক্ষণ তোমাদের হৃদয় লেগে থাকে, শুধু ততক্ষণই উহা তিলাওয়াত করবে।

 মনোযোগ দূরীভুত হলে তিলাওয়াত স্থগিত রাখবে। (বুখারী শরীফ)
অবশ্য অন্য বর্ণনায় হাদীসটি জুনদুব ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) নিজস্ব উক্তি হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। আবার কেহ কেহ হযরত উমর ফারুক (রা.) নিজস্ব উক্তি বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম মুসলিম নবী করিম (সা.) বাণী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। যাহোক হাদীসটির তাৎপর্য হলো কুরআন তিলাওয়াতের সময় তিলাওয়াত কারীর অন্তর নিবিষ্ট থাকার কথা, বুঝায়। কারণ অন্তরের নিবিষ্টতা নষ্ট হলে উহার মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবন যা আল কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্যে ব্যহত হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো তার মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবন করে তা আমল করা। কুরআন তিলাওয়াতের ছওয়াব অনেক অনেক। যেমন হযরত জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত নবী করিম (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি কুরআন মজীদের এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করে তার জন্য এক কিনতার ছওয়াব লেখা হয়। এক কিনতার সমান একশত রতল। এক রতল সমান বারো উকিয়া। এক উকিয়া সমান ছয় দীনার।


এক দীনার সমান চব্বিশ কীরাত। এক কিরাত সমান ওহুদ পাহাড়। সুবহানাল্লাহ! কুরআন তিলাওয়াতের এত দওয়ার অথচ আজও অনেক মুসল্লি আছি কুরআন পড়তে পারি না। অনেক কিছু শিখলাম কিন্তু কুরআন শিখলাম না। আমাদের সমাজে কুরআনের সম্মান আছে এ জন্য অনুষ্ঠানের শুরুতে একজন ক্বারী সাহেব কুরআন তিলাওয়াত করেন। ধারণা করা হয় কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করলাম এতে অবশ্যই বরকত হবে। যদি আমরা সকল মুসলমান নর-নারী কুরআন শিক্ষা করতাম এবং নিয়মিত তিলাওয়াত করতাম তাহলে আরও ভাল হত। ওলামায়ে কেরাম বলেছেন কুরআনের ছয়টি হক রয়েছে। এক : মুসলমান নর-নারী সবাই কুরআন পড়া জানবে। এটা ফরজ অর্থাৎ অবশ্য কর্তব্য। “যার পেটে কুরআন নেই সে পরিত্যক্ত ঘর” -আল হাদীস।

 দুই : শুধু কুরআন পড়া জানলেই হবে না নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে। এতে মহান আল্লাহর ভালবাসা পয়দা হবে। এটা সুন্নত। সাধ্যমত আগ্রহের সাথে সহীহ শুদ্ধভাবে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা। তিন: কুরআনের অর্থ ব্যাখ্যা শিক্ষা করা ফরজে কিফায়া অর্থাৎ কিছু কিছু আলেম কুরআনের অর্থ ব্যাখ্যা শিক্ষা করবে। তবে সবাই অর্থ জানা আরও ভাল। চার: কুরআনের অর্থ ব্যাখ্যা অপরকে শিক্ষা দেয়া ফরজে কিফায়া।

সবাই না পড়লেও আলেমদের কর্তব্য হলো অপরকে কুরআনের অর্থ ব্যাখ্যা শিক্ষা দেয়া। হাদীসে আছে তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়। (বুখারী)। পাঁচ: কুরআন অনুসারে আমল করা। সবার জন্য ফরজ বা বাধ্যতামূলক। শুধু হাফেজ, ক্বারী, ইমাম, মুয়াজ্জিন তারা কুরআনের আমল করবে আর আমরা করবো না তা হবে না। সকল মুসলিম নর-নারী কুরআনের আদেশ নিষেধ মেনে চলবে। কুরআনের আদেশ নিষেধ মানার নাম হলো কুরআনের আমল করা। কুরআনকে ভালবাসা, মান্য করা।

 এক হাদীসে আসছে নবী করীম (সা.) বলেছেন “যারা কুরআনের ধারক, বাহক ও অনুসারী তারা আমার উম্মাতের মধ্যে অধিকতম সম্ভ্রান্ত।” ছয় : কুরআন নিয়ে গবেষণা করা। উচ্চ পর্যায়ের আলিমদের দায়িত্ব হলো কুরআন নিয়ে গবেষণা করা। এটাও ফরজে কেফায়া। এ ব্যাপারে আলেমদেক সহযোগিতা করা সকলের দায়িত্ব। আমরা দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে অনেক অর্থ ব্যয় করি। সময় লাগাই। প্রচেষ্টা চালাই। কিন্তু মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কুরআন শেখার জন্য আমরা কতটুকু সময়, শ্রম বা অর্থ ব্যয় করেছি চিন্তা করা উচিত।


আমাদের দেশে অতি সহজে কুরআন শেখা যায়। বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুরআন শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকলেও কুরআন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। আবার সহীহ শুদ্ধ ভাবে কুরআন পড়তে পারে এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই নগণ্য। অথচ বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া অনেক সময় সালাত নষ্ট হয়ে যায়। ১৯টি কারণে সালাত নষ্ট হয়। তার মধ্যে এমন ভুল তিলাওয়াত যাতে অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়।

 সারা জীবন সালাত আদায় করলাম কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত সহীহ বা শুদ্ধ নয় এমন মুসল্লির জন্য আক্ষেপ। কুরআন মজীদ শ্রেষ্ঠতম বাণী। নেককার ব্যক্তির কুরআন তিলাওয়াত লেবুর মত। উহার স্বাদ ও ঘ্রাণ উভয়ই ভাল- বুখারী শরীফ। নবী করীম (সা.) কোন ধন-সম্পদ রেখে যান নাই। তিনি দুই মলাটের মধ্যে রক্ষিত কিতাব (কুরআন) রেখে গেছেন। নবী করীম (সা.) কোন ধন-সম্পদ রেখে যান নাই।

তিনি দুই মলাটের মধ্যে রক্ষিত কিতাব (কুরআন) রেখে গেছেন। নবী করীম (সা.) আল্লাহর কিতাব (কুরআন) কে আঁকড়ে ধরার জন্য ওসিয়াত করে গেছেন। কুরআন তিলাওয়াতের সময় রহমতের ফিরিস্তা নাজিল হন। এমন বরকতপূর্ণ কিতাব আমরা সবাই তিলাওয়াত করবো অর্থ ব্যাখ্যা জানার চেষ্টা করবো। আজীবন কুরআনের ছাত্র অথবা শিক্ষক হিসাবে বেঁচে থাকবো। কুরআনের অনুসরণ করবো। মহান আল্লাহ আমাদেক তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক ঃ খতীব, উপশহর জামে মসজিদ,
বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

কুকুরের গল্প, বাস ধর্মঘট এবং গ্যাস

সৈয়দ আহমেদ অটল: সেই ছোটবেলায় গল্পটি পাঠ করেছিলাম। এখন বড় বেলায় এসে তেমনি একটি গল্পের পাঠ নিলাম। তবে আগে ছোট বেলার গল্পটি বলি। তাতে পাঠকের বুঝতে সহজ হবে। যতটুকু মনে আছে তাতে গল্পটি ছিল এমন। এক কিশোর জাহাজে চড়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছিল। কিন্তু অসাবধানতাবশত কিশোরটি জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে জাহাজের অন্যান্য যাত্রীরা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল। কিন্তু এ পর্যন্তই। তবে হঠাৎই দেখা গেল একটি কুকুর জীবনের মায়া ত্যাগ করে কিশোরটিকে বাঁচাতে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এবং কুকুরটি কিশোরকে জীবিত উদ্ধার করে জাহাজে নিয়ে আসে। সেই গল্পের আজ এটুকুই মনে আছে। কিন্তু ছোট বেলার সেই কুকুরের গল্পটি এই বড় বেলায় এসে নতুন করে মনে করিয়ে দিল ফেসবুকের একটি ছবি। এই ছবিটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর শাহবাগ থেকে তোলা। ছবিটি তুলেছেন ফটোসাংবাদিক রহমান আসাদ। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সেদিন ঢাকায় আধাবেলা হরতাল ডেকেছিল সিপিবি ও বাসদসহ কয়েকটি বাম দল। সেই হরতালের সমর্থনে শাহবাগে অবস্থান নেয় বাম রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। সেই অবস্থান কর্মসূচির একপর্যায়ে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে।

 শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। জলকামানও ব্যবহার করে পুলিশ। সে সময় কয়েকজন ‘পুরুষ পুলিশ’ ধাওয়া দিয়ে এক নারীকর্মীকে আটক করে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। নারীকর্মীটি মনে মনে হয়তো তখন বলছিল ‘যেতে দিও না আমায়…’। তবে তাতে কেউ এগিয়ে না এলেও, পুলিশের সেই কাজে বাধা দিতে এগিয়ে আসে পথের এই সাহসী কুকুরটি (ছবিতে দেখুন)।

ঘেউ ঘেউ করে (এটাই কুকুরের প্রতিবাদের ভাষা) কুকুরটি পেছন থেকে সেই নারীকর্মীর কামিজ কামড়ে ধরে। উদ্দেশ্য প্রতিবাদী কুকুরটি নিয়ে যেতে দেবে না তাকে। বেওয়ারিশ কুকুরটি মনে মনে হয়তো বুঝেছিল কবি রবীন্দ্রনাথের সেই ভাষার আকুতি। অবশ্য আমরা কুকুরের ভাষা বুঝি না। আমরা কেবলই শুনি ‘ঘেউ ঘেউ’। যদি এখানেই আমার কথা শেষ করি, তবে শুধুই বলব- স্বাধীনতার পরে করা খান আতার (চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমান) সেই বিখ্যাত সাহসী ছবির নাম ‘আবার তোরা মানুষ হ’। আর যদি তা না হয়, তবে পাঠকের কাছে জিজ্ঞাসা থাকবে- এই কুকুরের কাছে কি আমাদের কিছু শেখার আছে?


এবার বাস ধর্মঘটের কথায় আসি। দু’দিনের বাস ধর্মঘটে সব কিছু এলোমেলো হয়ে উঠেছিল। চরম ভোগান্তিতে পড়েছিল মানুষ। যাত্রীরা অসহায় হয়ে পড়েন। যদিও মালিক এবং শ্রমিক পক্ষ একে ধর্মঘট বলতে নারাজ। তাদের বক্তব্য বাস বন্ধ রাখার কারণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ক্ষোভ থেকে পরিবহন শ্রমিকদের কাজে অনীহা। সেই ‘ক্ষোভ’ হচ্ছে- মানিকগঞ্জে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় জামির হোসেন নামের এক বাস চালকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং অপরটি সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার দায়ে ট্রাকচালক মীর হোসেনের ফাঁসির রায়।

 কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সারা দেশে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটা কী ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার হতে পারে। কোনো নোটিশ নেই, জানাজানি নেই, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো মানুষের উপর সওয়ার হওয়া। পরিবহন সেক্টরে এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। কোনো না কোনো কারণ পেলেই বাস-ট্রাক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ এক তোগলকি কান্ড। খবরে প্রকাশ, এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন একজন মন্ত্রী এবং সাথে ছিলেন একজন প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রী সাহেব পরিবহন শ্রমিকদের নেতাও বটে। ধর্মঘটে মালিক পক্ষেরও সায় ছিল। শ্রমিকদের হয়ে তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। বলা হয়েছে এমনটি করা (পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ধর্মঘটে যাওয়া) শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এ ক্ষেত্রে বলা যায়- এক. আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে প্রতিবাদ করা যায় না।

 যায় না বলেই হাইকোর্ট এ নিয়ে রুল জারি করেছে। প্রতিবাদ করতে হলে ‘সংক্ষুব্ধদের’ আদালতেই যেতে হবে। দুই. এভাবে জনগণকে জিম্মি করে দুইমন্ত্রী আইন ও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আমাদের দেশে আর সব দেশের চেয়ে অনেক বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এবং স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। শুধু বেশিই নয়, প্রায়ই সংবাদপত্র শিরোনাম করে ‘সড়কে মৃত্যুর মিছিল’। সড়কে এত মৃত্যুর কারণ কি? সে কারণও আমাদের জানা। যেমন, ড্রাইভার বা চালক হতে যে সব শর্তাবলীর কথা আইনে আছে তা মানা হয় না। ‘মানুষ আর গরু চিনতে পারলেই’ ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া যাবে না।

 আর একজন ড্রাইভার যেভাবে ওভার টাইম করেন তা তার জন্য মোটেও সহনীয় নয়। ফিটনেস ছাড়া গাড়ি চলছে দেদার। ২০ বছরের পুরনো গাড়ি চলছে সর্বত্র। প্রথমটির জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে। দ্বিতীয়টির জন্য পরিবহন মালিকদের কেবলই মুনাফার দিকে না তাকিয়ে শ্রমিকের জীবনের দিকেও তাকাতে হবে। কেননা উভয় কারণের জন্য যাত্রীদের অকাতরে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

 একজন ড্রাইভার ও সহকারী প্রতিদিন ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করেন। বিশাল এই সেক্টরে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন-মান উন্নত হয়নি। দুর্ঘটনা নিয়ে যে সব মামলা মোকদ্দমা হয় সে জন্য সংশ্লিষ্টদেরই ভোগান্তি হয়। মালিকরা দূরে থাকেন। ইন্স্যুরেন্স থাকায় মালিকরা গাড়ির ক্ষতিপূরণ পান। শ্রমিক জেলে যান, পরিবার মানবেতর জীবন-যাপন করে। এটা কোনো স্বস্তির কথা নয়। স্বাধীনতার অনেক বছর পেরিয়ে এলাম আমরা। তাই পরিবহন সেক্টরে সুস্থ পরিবেশ আনা দরকার। আর যে কথাটি বলে এই পর্বের শেষ করতে চাই, তা হলো- বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে এবারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। সেটা সরকারের ব্যাপার। সরকার যদি মনে করে ঘটনায় সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে তবে ব্যবস্থা তো নিতেই পারেন। তবে সব কথার শেষ কথা, জনগণকে অহেতুক ভোগান্তি দেওয়া যাবে না। এ অধিকার কারো নেই।


শুরুতেই গ্যাস নিয়ে লিখতে চাচ্ছিলাম। গ্যাস নিয়েই লেখা দরকার। কিন্তু বাদসাধলো ওই কুকুরটি। কুকুরটির প্রতি আমার মায়াও হলো। মায়া হলো এ জন্য, যে মানুষ কুকুরকে ভালোবাসে না- সেই কুকুর কত গভীরভাবে মানুষকে ভালোবাসে। কতটা দরদ দিয়ে ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারে। যা অনেক সময় অনেক মানুষ বুঝতে পারে না। একবার পথ চলতে চলতে মাইকে ইসলামিক বয়ান শুনছিলাম। বয়ানকারী বলছিলেন, ‘ইসলামে এ কথাও বলা হয়েছে বিনা কারণে কুকুরকেও আঘাত করা যাবে না। কেননা কুকুর তো সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্ট।’

 কুকুরের অনেক দোষ। তবে একটি বিষয়ের সাথে মানুষ আর কুকুরের মিলের কথা বলা হয় কখনো কখনো। সে মিলটি হলো, কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। তেমনি সমাজে কতিপয় মানুষ আছে, যাদের মন বদলায় না। তাই উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, ঘি মেখেও কুকুরের লেজ যেমন সোজা হয় না, তেমনি সমাজের কতিপয় মানুষেরও ভালো কথায় মন বদলায় (খারাপ থেকে ভালো) না। উপরে ভালো চরিত্র দেখা গেলেও ভিতরে তাদের ‘কালো’ চরিত্র বিদ্যমান। এমন সব চরিত্র উন্মোচিত হওয়া দরকার। যা হোক কুকুরের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাই শুরুতে গ্যাস বাদ দিয়ে কুকুরে চলে গিয়েছিলাম। কুকুরের কান্ড এতোটাই ভালো লেগেছিল যে, আবারও কুকুরের গল্পেই চলে গিয়েছিলাম।

 এবার গ্যাসের কথায় আসি। সরকারের লোকরা বলছেন, দামের সমন্বয় করতেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আমার এক সহকর্মী বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বলে উঠলেন, কই আমাদের বেতন তো সমন্বয় করা হয় না। প্রায় বছর হলো, সাংবাদিকদের বেতন বৃদ্ধির কথা হচ্ছে। তথ্যমন্ত্রীও নিজেকে ‘সাংবাদিক বান্ধব’ বলতে ভালোবাসেন, তবে ওয়েজবোর্ড ঘোষণা হয় না কেন? সে অনেক কথা। যেমন সাগর-রুনি হত্যার চার্জশিট হয় না। বেশ কায়দা করে এবার সরকার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করেছে। মার্চ মাসে একবার। আবার জুন মাসে আরেকবার।

দু’দফায় এই বৃদ্ধি পেয়ে দুই চুলা হবে ৯৫০ টাকা। যদিও নাকি এক বছরে দুইবার দাম বাড়ানো যাবে না। গ্যাসের দাম বাড়ানো উচিত কি-না এ নিয়ে গণশুনানি হয়েছে। যারা গণশুনানিতে অংশ নিয়েছেন তাদের বক্তব্য ছিল গ্যাসের দাম বাড়ানো যাবে না। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সে সব কথা থাকেনি। সরকারের কাজ সরকার করেছে। তাই প্রশ্ন রাখতে চাই, তা হলে গণশুনানি কেনো?  নিশ্চয় লোক দেখানো, জনগণকে বোকা বানানোর জন্য। বলা হচ্ছে, অচিরেই আমাদের মজুদ গ্যাস শেষ হয়ে যাবে।

তাই জনগণকে সিলিন্ডারে যেতে হবে। হতেই পারে। কিন্তু সরকারের গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় বাজারে সিলিন্ডারের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর জনগণের কাছে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে আছে তা হলো- প্রাইভেট কার মালিকদের সহজ দামে গ্যাস দেওয়ার কারণ কি? এটা তো কোনো জনগণই সমর্থন করে না। তবে গ্যাস নিয়ে আজ আর এগুতে চাই না। বিষয়টি আদালতে গেছে। আগে সেখানেই সুরাহা হোক। আসল কথা হলো, সরকার যদি জনগণের হয়, তবে গুরুত্ব দিয়ে জনগণের কথাই ভাবতে হবে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে পরিবহনে ভাড়াও বৃদ্ধি পাবে।

মনিটরিং করে দেখেন- সরকারি লোকসহ অন্যদের বেতন বৃদ্ধির পর আমজনতার বেতন কত পার্সেন্ট বেড়েছে। বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম তাতে মানুষের ত্রাহি অবস্থা। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আড়ালে আবডালে বেড়েই চলেছে। কিন্তু তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আর সব মানুষের আয়-ইনকাম বাড়েনি। মন্ত্রী-এমপিদের বেতনও সামঞ্জস্য করা হয়েছে, কিন্তু জনগণ যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই থেকে যাচ্ছেন।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
ধঃধষশধৎধঃড়ধ০১৫৫২@মসধরষ.পড়স
০১৫৫২-৩২২৯৪২

 

‘ক্ষমতায়ন’ নারী-পুরুষ সকলেরই প্রয়োজন

আতাউর রহমান মিটন: আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতিসংঘের আহ্বানে এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। আমাদের দেশে ১৯৭১ সালের মার্চেও নারী দিবস পালিত হয়েছিল। আজও হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন পরিস্থিতি এখন অনেক উন্নত হয়েছে কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় গন্তব্যে পৌঁছাতে এখনও বেশ খানিকটা পথ বাকি। দুর্গম এই পথ পরিক্রমায় নারী-পূরুষের সম্মিলিত প্রয়াস অপরিহার্য। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মানুষের সৃষ্টিতে নারী পুরাতনী। নবসমাজে নারীশক্তিকে বলা যেতে পারে আদ্যাশক্তি। এই সেই শক্তি যা জীবলোকে প্রাণকে বহন করে, প্রাণকে পোষণ করে।’


আমরা সকলেই জানি, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি বৈষম্য হ্রাস, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। প্রায় ১৬০ বছর আগে সেই মিছিলেও চলে সরকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন। শুরুটা সেখানেই। এরপর ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্রাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। বিশ্বের ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।


ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ক্লারাই প্রস্তাব করেছিলেন ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের। শুরুর দিকে কেবলমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ এবং প্রগতিশীল শিবিরেই নারী দিবস পালিত হতো। পরিবর্তিতে  ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনে জাতিসংঘ বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। মূলতঃ এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে। নারীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্যের অবসান এবং নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রচলিত পুরুষালী দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাঠামোর যথাযথ সংস্কারের দাবী নিয়ে আজও বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবস পালনের দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে, নারীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য, নারীকে মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে এখনও অনেক কিছু করার আছে। সমাজ এগিয়েছে। নারীও পিছিয়ে নেই কিন্তু সম অধিকারের নিশ্চয়তা এখনও সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।


নারী দিবস পালনের সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৩০ বছর হলো জড়িত আছি। প্রতিবছরই প্রায় একই ধরণের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বঞ্চনার কাহিনী এবং ইস্যুগুলো তুলে ধরা হয়। তাহলে কি পরিস্থিতি কিছুই পাল্টায়নি? আমি তো দেখছি নারীর ক্ষমতায়নের পথে আমাদের দেশ ও সমাজ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ সরকার জন্মলগ্ন থেকেই নারীর ক্ষমতায়নে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮, ২৯ এবং ৬৫ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও জনজীবনের সকল স্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সরকার জাতীয় সংসদ থেকে তৃণমূলে তথা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণকে প্রণোদিত করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলেছে। সরকারী দলের বহু অভিজ্ঞ এবং বর্ষিয়ান দক্ষ সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত নবীন একজন নারীকে জাতীয় সংসদে স্পীকার হিসেবে মনোনয় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতি সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা নির্দেশ করে।


নারীরা এগিয়ে চলেছে। আমাদের প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে মেয়েরা ভাল করছে। অফিসগুলোতে নারীদের নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা শুধু সূঁচি-শিল্প নয়, বরং স্বাধীন ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জিং পেশাতেও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। আমরা যে কোন সূচকেই দেখি না কেন এটা স্পষ্ট যে, যথাযথ সুযোগ পেলে নারীরাও এগিয়ে যেতে পারে, তাদের সক্ষমতা কম নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে উৎকর্ষময়। গণতন্ত্রের বিকাশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ইতিবাচক। তাহলে কি নারীর কোন সমস্যা নেই? নারীর ক্ষমতায়ন কি বাংলাদেশে সম্পন্ন হয়েছে?


না, আমি মোটেও তা বলছি না। আপনার যাত্রা পথ যদি হয় হাজার মাইলের আর আপনি যদি শত মাইল অতিক্রম করে এসে থাকেন তাহলে যেমন আপনার যাত্রা সম্পন্ন হয় না ঠিক তেমনি নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং নারীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্য অবসানের হাজার মাইলের পথে হয়তো আমরা শত মাইল অতিক্রম করে এসেছি কিন্তু আমাদের আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। চ্যালেঞ্জটা সেখানেই। নারীরা এখন আর কেবল অন্তঃপুরের অধিবাসী কিংবা পুরুষের সেবাদাসী নয়। নারীরাও এখন আপন মর্যাদা ও গৌরবে মহিমান্বিত। নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানো, নারীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষমতায়নে এখনও আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।


নারীর ক্ষমতায়ন অর্থ পুরুষকে খাটো করা বা পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশি গুরুত্ব দেয়া বোঝায় না। যদিও আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে আলোচনা উত্থাপিত হলে তাতে নারী বনাম পুরুষ একটা লড়াই সৃষ্টি করি। অথচ সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয়েরই সমান সুযোগ ও অধিকার রয়েছে। কথা বলার অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, চিকিৎসা পাবার অধিকার, স্বাধীন পেশা বেছে নেবার অধিকার, চলাফেরার অধিকার, নির্যাতিত না হওয়ার অধিকার এবং সর্বোপরি মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার


অধিকার সকলেরই রয়েছে। ঐতিহ্য এবং প্রথাগত কারণে আমাদের সমাজে নারীর সমানাধিকার কেতাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে, দৈনন্দিন জীবনে এখনও অসমান। অনেক পরিবারে, অনেক সমাজে, অনেক দেশে এখনও কেবলমাত্র লিঙ্গীয় পরিচয়ে নারী হওয়ার কারণে নিদারুণ কষ্ট ও বঞ্চনা সহ্য করতে হয়। সে কারণেই ভারতে ‘বেটি বাঁচাও’ আন্দোলন গড়ে তুলতে হয়েছে। পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যাকার কিশোরী নারী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মালাল ইউসুফজাইকে বলতে হচ্ছে, ‘নীরব থাকতে থাকতেই আমরা নিজেদের আওয়াজের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছি।’


আমরা সাধারণতঃ পশ্চিমা সংস্কৃতিকে খুব উন্নত এবং মানসম্পন্ন বলে মনে করি। আমার তো মনে হয়, নারীর অবমূল্যায়ন এবং নারীকে ভোগপণ্য হিসেবে তুলে ধরার সবচেয়ে বেশি প্রয়াস হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ায়। পুঁজিবাদ নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, পণ্য হিসেবে গণমাধ্যমে তুলে ধরেছে। পারফিউমের বিজ্ঞাপনগুলো ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখুন। ভারতীয় চলচ্চিত্রেওে নারীর উপস্থাপনা খুবই নগ্ন এবং আপত্তিকর।

 আমাদের দেশে আমরা সেসব অশ্লীল নাচ-গান শুধু দেখি বললে ভুল বলা হবে, আমরা সেগুলো যেন গিলি। শুধু তরুণ বয়সীদের নয়, অনেক মধ্যবয়সী পুরুষদের স্মার্ট ফোনেও দেখবেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের যৌন উত্তেজক, অশ্লীল নাচের ভিডিও ধারণ করা রয়েছে। পর্ণো ছবির ক্লিপগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। আমেরিকায় নাকি প্রতি ৫৯ মিনিটে অর্থাৎ প্রায় প্রতিঘন্টায় একটি করে পর্ণো ভিডিও তৈরী হয়। আর সম্প্রতি আমাদের কয়েকটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত চ্যানেলগুলো কি রকম অস্থিরতায় আমাদের পারিবারিক সমাজকে উথাল-পাতাল করে তুলেছে সেটা না হয় আজকের পরিসরে নাইবা বললাম। আমাদের শহুরে মধ্যবিত্ত ও ধনীক সমাজে এখন পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখুন, দেখবেন পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ে আমরা এখন বিপর্যন্ত। এই বাস্তবতা নারী স্বাধীনতার ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


স্বাধীনতা বলতে কখনই যা কিছু করার ম্যান্ডেন্ট বা অনুমোদন বোঝায় না। স্বাধীনতারও সীমা আছে, নিয়ন্ত্রণ রেখা রয়েছে। যেমন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু দেশটি একটি সুনির্দিষ্ট সীমা দ্বারা নির্ধারিত। আবার দুনিয়ার সকল স্বাধীন দেশই অপরের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে বিবেচনা করে থাকে।

 

ইসরায়েল যখন ফিলিস্তানীদের পবিত্র ভূমিতে জোর করে বসতি গড়ার চেষ্টা চালায়, আমেরিকা যখন মেক্সিকো সীমান্তে বিভেদের দেয়াল তোলার সিদ্ধান্তে অটল থাকে কিংবা আফগানিস্তানে কোন একটি গোষ্ঠী যখন মেয়েদের স্কুলগুলো জোর করে বন্ধ ঘোষণা করে তখন আমরা কোনভাবেই তাকে স্বাধীনতা বলতে পারি না। আমার স্বাধীনতা এটা নয়, যা অন্যের জন্য সংকট সৃষ্টি করে। প্রকৃত স্বাধীনতা যেমন অন্যের অস্তিত্বকে সমীহের সাথে স্বীকার করে এবং সস্মান দেখায় তেমনি নারী স্বাধীনতাও সমাজের অন্য সকলের প্রতি শ্রদ্ধাসীন থাকা ও সমীহ দেখাতে শেখায়।


নারীর ক্ষমতায়ন কারো দয়া বা দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। সমাজ তাকে বঞ্চিত করেছে এবং এই সমাজ বদলানোর মাধ্যমেই কেবল নারীর অধিকার সসম্মানে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। নারীকে জেগে উঠতে হবে। নিজের অধিকার বুঝে নিতে হবে। মাথা নত করে থাকবার দিন আর নেই। নারীদের আজ প্রশ্ন করতে হবে, রবীন্দ্রনাথ যেমন করে তাঁর সবলা কবিতায় প্রশ্ন করেছেন,
“ নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার
হে বিধাতা?
নত করি মাথা
পথপ্রান্তে কেন রব জাগি
ক্লান্ত ধৈর্য প্রত্যাশার পূরণের লাগি
দৈবাগত দিনে।
শুধু শূন্যে চেয়ে রব? কেন নিজে নাহি লব চিনে
সার্থকের পথ।
কেন না ছুটাব তেজে সন্ধানের রথ
দুর্ধর্ষ অশ্বেরে বাঁধি দৃঢ় বল্গাপাশে।
দুর্জয় আশ্বাসে
দুর্গমের দুর্গ হতে সাধনার ধন
কেন নাহি করি আহরণ
প্রাণ করি পণ।
‘ক্ষমতায়ন’ নারী-পূরুষ সকলেরই প্রয়োজন। ক্ষমতায়নের সাথে মানবতা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। নারী-পূরুষ নির্বিশেষে সকলের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্য যে কেবল নারীর প্রতি বিদ্যমান তা নয়। লিঙ্গীয় বিবেচনায় সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী এই বৈষম্যের অমানবিক শিকার হলেও প্রতিটি মানুষের অধিকারই এই পৃথিবীতে এখনও সমান নয়। সিরীয়ার আলেপ্পেতে নারী-পুরুষ-শিশুরা এখন যে সংকট মোকাবেলা করছে, যে সংকটের কারণে পুরুষ শিশু আয়লান বিশ্ব বিবেককে প্রচন্ড ধাক্কা দিয়েছে, যে বৈষম্যেময় কাঠামোর কারণে মিয়ামমারের রোহিঙ্গারা নৌকায় চেপে গভীর সমুদ্রের অজানা পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সেই বৈষম্যের অবসান, সেই কাঠামো বদলানোর ব্যাপারে বিশ্ব মনযোগ চালিত করতে হবে। নারী এর কেন্দ্রে অবশ্যই। যুদ্ধ হলে মানুষ প্রাণ হারায় সত্য কিন্তু নারী প্রাণও হারায়, তারও আগে হারায় তার নারীত্বের গৌরব।  নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন তাই অপরিহার্য। বিশ্ব নারী দিবসে সকল কন্যা, জায়া ও জননীদের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১৫২৬৯৭৯

৭ মার্চের ভাষণ-স্বপ্নের অমর জ্যোতি

 রিপন আহসান ঋতু:১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকাস্থ রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মাত্র ১৯ মিনিটের একটি বিখ্যাত ভাষণ ৭ কোটি বাঙালির স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহাকে চাঙ্গা করে দিয়েছিল। তার এ ভাষণই সেদিন সংশয়ে থাকা বাঙালির চোখে জ্বালিয়ে দিয়েছিল স্বপ্নের অমর জ্যোতি।  দুনিয়া কাঁপানো ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম এ ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ’৭১ সালের ২৬ মার্চ দেয়া হলেও মূলত ৭ মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার বীজ বপনের দিন। ’৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে পূর্ব-পাকিস্তানিরা ক্ষণে ক্ষণে যে স্বাধীনতার স্বপ্নের জাল বুনেছিল সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন যে অবশ্যম্ভাবী সেটা স্পষ্ট হয়েছিল ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কথার গাঁথুনিতে।

 বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সে বক্তৃতার সূত্র ধরেই এ বঙ্গের ৭ কোটি মানুষ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছিনিয়ে এনেছিল আকাঙ্খিত স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণের গুরুত্ব স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়েই বিলীন হয়ে যায়নি বরং তাতে বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙালির চলার পথের দিক-নির্দেশনা, অনুপ্রেরণা আজও চির অমলীন হয়ে আছে। ৭ মার্চের ভাষণের পেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ় প্রসারী। মূলত পশ্চিম পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি বিমাতা সূলভ আচরণের প্রতিবাদ এবং বাঙালির মুক্তির পথ দেখানো ছিল এ ভাষণের মূল উপজীব্য।

 ’৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরেও সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে মুসলিমলীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে টালবাহানা শুরু করে। শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরই নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানিদের এধরণের অনেকগুলো অন্যায় কাজের প্রতিবাদের কঠোর প্রকাশই ফূটে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোন পরিকল্পনায় হবে, বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের কোন উপায়ে প্রতিহত করবে, প্রতিরোধের ধরণ এবং শিক্ষা কেমন হবে এবং কোন আদর্শিক মতাদর্শে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হবে তার পূর্ণাঙ্গ ছক চিত্রিত হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যে।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও পূর্ব-পাকিস্তানের ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে কোন অংশ বাদ রাখেননি। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শুরুতেই উপস্থিত কোটি জনসমুদ্রকে ‘প্রিয় ভাইয়েরা’ সম্বোধন করে আপন করে নেন। মাত্র ১৯ মিনিট স্থায়ী বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন। একই সাথে মুসলিমলীগের প্রধান হিসেবে তার নিজের ভূমিকা ও অবস্থান স্পষ্ট করেন। ’৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন ও তার ফলাফল এবং পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের উপর একটি নতিদীর্ঘ আলোচনা করেন। সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের কাছে সামরিক আইন প্রত্যাহারসহ পূর্ব-পাকিস্তানিদের ওপর চালানো বর্বোরোচিত অত্যাচার এবং সামরিক আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধু হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি এ দাবি মেনে নেওয়া না হয় তবে সামগ্রিকভাবে অন্যায়ের মোকাবেলা করা হবে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ব-পাকিস্তানে সার্বিক হরতাল চালিয়ে যাওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু-এই সর্বজন স্বীকৃত নামটা উচ্চারিত হলেই সবার হৃদয়ের মনি কোঠায় জেগে ওঠে বিনয়াবণত শ্রদ্ধা। যেন সবাই অন্তর চক্ষু দ্বারা অনুভব করে, তর্জনী উঁচু করে আজও বজ্র কন্ঠে ঘোষণা করছেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ আজও শ্রবণ করলে রক্তের অনুরণন ঘটে। যতবার শুনি ততবার নতুন করে শিহরণ অনুভূত হয়, যতবার ততবার শিখি;


১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে আমাদেরকে শিখিয়েছিলেন সহনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা । দিয়েছিলেন ন্যায়ের পক্ষে জীবন বাজি রাখার প্রেরণা। তিনি বলেছিলেন, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। বিশ্বের সকল বাঙালিকে তার অমোঘ ঘোষণার মাধ্যমে শিখিয়েছিলেন কিভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং অন্যায়কে প্রতিহত করতে হবে। বঙ্গবন্ধু তার বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলেছিলেন এই বলে, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে, তা দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করত হবে।

 বঙ্গবন্ধুর ভাষণে জাতির জন্য শিক্ষা ছিল কিভাবে শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে-হোক সে বাইরের শত্রু কিংবা ঘরের শত্রু।
২. বাঙালিকে তিনিই প্রথম শিখিয়েছিলেন শুধু মরণাস্ত্র দিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করা যায় না। শত্রুকে পরাজিত করার জন্য চাই অনেক কলা-কৌশল। তাইতো স্বাধীনতার স্থপতি বলেছিলেন, আমরা তাদেরকে ভাতে মারবো, পানিতে মারব। বঙ্গবন্ধুর বাতলে দেয়া সে কৌশল অবলম্বন করেই স্বাধীনতা যোদ্ধারা অস্ত্রের বলে বলীয়াণ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রায় খালি হাতেই জয়ী হতে পেরেছিল। ’৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে বঙ্গবন্ধুর শেখানো অনেক কৌশল প্রয়োগ করেছিল। তাইতো ৯ মাস দীর্ঘকালব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এদেশের মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীকে খাদ্যে কষ্ট দিয়েছে। এদেশের বিভিন্ন খাল, বিল ও নদীতে তাদেরকে চুবিয়ে চুবিয়ে মেরেছে।


৩. বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণে কোন ধ্বংসাত্মক নির্দেশনা ছিল না। পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে তিনি সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, “আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো। ঐতিহাসিক এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শোষণ, নির্যাতন, হত্যার তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, “আমি বলেছি কিসের এসেম্বলি বসবে? কার সঙ্গে কথা বলবো? আপনারা যারা আমার মানুষের রক্ত নিয়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলবো না”।


৪. সংখ্যাগুরু কর্তৃক সংখ্যালগুদেরকে নির্যাতন এদেশের জন্য একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে বারবার তাদেরকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির খরা চলছে অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন, এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে-তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনার উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয় ।


৫.বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণের একেবারে শেষদিকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে জাতিকে সাবধান করে বলেছিলেন, যেন বন্ধুর বেশে শত্রু আমাদের অন্দরে প্রবেশ করে আমাদের ক্ষতি করতে না পারে । বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, শোনেন, মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তব্যে কোন উসকানিমূলক কথা ছিল না। পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি তিনি বলেন, “সৈন্যরা, তোমরা আমাদের ভাই। তোমরা ব্যারাকে থাকো। তোমাদের কেউ কিছু বলবে না, কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করোনা।” অত্যন্ত সুন্দর, সাবলীল ভাষায় বঙ্গবন্ধু সেদিন বাংলার মানুষের তরে স্বাধীনতার পূর্বাভাস দিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি বিশ্বের অন্যতম ভাষণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


৪৪ বছর পূর্বে অর্জিত স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে বঙ্গবন্ধুর যে দর্শন মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল তার সে দর্শন আজও আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল পরিমন্ডলে অবশ্য পালনীয়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাব-ডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক ! মনে রাখবা ! রক্ত যখন দিয়েছি আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ! এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ! জয় বাংলা !! ।


যে বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন বুনতে সাহায্য করেছিল, এনে দিয়েছিল অমূল্য স্বাধীনতা, সেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শুরু হয়েছে চরম দলীয়করণ অথচ বঙ্গবন্ধু কোন দলের, ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি নন । তিনি সবার । প্রকৃত বিচারে ৭ মার্চের ভাষণের হাত ধরেই আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতা, তার ৭ মার্চের ভাষণটি স্থান পেয়েছে দুনিয়া কাঁপানো ভাষণগুলোর শীর্ষের দিকে।

 এমনকি স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আজও পৃথিবীর কোন মহান নেতা সংক্ষিপ্ত সময়ে এত তাৎপর্যমন্ডিত ভাষণ দিতে পারেন নি। রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইউএসবি (টঝই) বঙ্গবন্ধুকে দডড়ৎষফ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ঢ়ড়বঃ’ বা বিশ্ব রাজনীতির কবি উপাধীতে ভূষিত করেছে। সুতরাং ৭ মার্চের ভাষণের প্রেরণায় উজ্জীবিত হোক গোটা দেশ, সমগ্র বাঙালি সমাজ। স্বাধীনতা অর্জনের মানসে উৎসর্গিত ত্রিশ লাখ শহীদের বুকের তাজা খুন এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম যেন বৃথা না যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্বাধীনদেশের ১৬ কোটি মানুষ যেন হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারি, এই হোক ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের শিক্ষা এবং আমাদের শপথ।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭৪৯৬৪০৩

উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের অভিশাপ

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ : দিন যতই গড়াচ্ছে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের সংখ্যাটাও ততই  বাড়ছে। এটা আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত বলা যেতে পারে। এই অবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ যারা বেকার তারা সবাই তরুণ, যুবক ও উদ্যমী। আর এ রকম তরুণ ও যুব সমাজের বড় একটা অংশকে  কর্মক্ষেত্র থেকে বাইরে রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। বেকার জীবনের অভিশাপ, গ্লানি, ধিক্কার, বঞ্চনা, অন্যের তিরস্কার, তাচ্ছিল্য যে একটি জীবনে কতটা দুর্বিসহ হয়ে উঠতে পারে তা এখানে লেখনির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব না। তবে আমি মনে করি গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের এটা বুঝে নেয়া উচিত।


গাইবান্ধা জেলার উত্তর আসকুর গ্রামের একজন গরীব কৃষকের ছেলে মোঃ দেলোয়ার হোসেন। বাবা আজহারুল হান্নান খুব আশা ও ভরসা নিয়ে ছেলেকে শহরে পাঠিয়েছিলেন। ভালো একটা কলেজে ভর্তি করেও দিয়েছিলেন। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকেই সে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী ২০১২ সালে মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেশন জটের কারণে তা ২০১৬ পর্যন্ত গড়িয়েছে। দেলোয়ার হোসেন ২০১৪ সালে অনার্স শেষ করার পর থেকেই একটা চাকরি পাওয়ার আশায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে খোঁজাখুঁজি করেছে। কিন্তু কোথাও কোন চাকরি পায়নি। সে ভেবেছিল এখন না হোক অন্তত মাস্টার্স শেষ করে হলেও ছোট-খাট একটা চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু না! সময় ঠিকই চলে যায়। কিন্তু ছোট্ট একটা চাকরিরও দেখাও মিলে না। বাবা গ্রাম থেকে সস্তা ধান বেচা, চাল বেচা টাকা পাঠাচ্ছেন। যাতে করে ছেলের পড়াশুনা কোন ক্ষতি না হয়। তিনি সংসারের দিকে কোন দিন তাকাননি।

 সারা বছর তার দৃষ্টি থাকে শুধু ছেলের দিকে। ছেলে পড়াশুনা শেষ করবে। তারপর ভালো একটা চাকরি করবে। তখন আমাদের আর কোন অভাব অভিযোগ থাকবে না। ছোট্ট এই আশাটুকু নিয়ে তারা দীর্ঘদিন থেকেই বুক বেধে ছিলেন। কিন্তু তাদের সেই নিষ্পাপ আশা যে কোন দিনই পূরণ হবার নয় আজ তারা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তাই দেলোয়ার হোসেন এখন বাধ্য হয়েই চাকরীর আশা ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসেছেন। বাবার নড়বড়ে সংসারটিকে একটু হলেও গতি দেয়ার চেষ্টায় সে দিনভর খাটা-খাটুনি করছেন। দেলোয়ার হোসেনের বাবার সাথে কথা বললাম। তিনি খুব আক্ষেপ করেই বললেন জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল করেছি ছেলেকে পড়াশুনার জন্য শহরে পাঠিয়ে। প্রথম থেকেই যদি ছেলেকে পড়াশুনা না করিয়ে সংসারে লাগাতাম, তাহলেই মনে হয় ভালো হত। ভালো কিছু না হোক, অন্তত আজ আমাদের সংসারের এই করুণ দুর্দশা হতো না।  এটি তো গেল একটি দেলোয়ারের গল্প।

 এ রকম হাজার হাজার  দেলোয়ার গোটা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে যেগুলোর খবর আমরা কেউ রাখি না। দেলোয়ার একটি ভালো সরকারি কলেজ থেকে অনার্স এবং মার্স্টাস শেষ করেছে। সে একজন উচ্চশিক্ষিত ছেলে। অথচ সে কোন চাকরি পাচ্ছে না। এর পিছনের কারণ কী? অনেকেই হয়তবা সুন্দর করে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করবেন। বাংলাদেশ একটি ছোট্ট জনবহুল দেশ। এখানে প্রতিবছর যেভাবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে ঠিক সেই হারে শিক্ষার্থীদের বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও গড়ে উঠছে (বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো)। প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছে। এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর একযোগে চাকরি দেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রতিবছর বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তাদের এই পাতলা, অযৌক্তিক যুক্তি কী সাধারণ মানুষ মানবে? গ্রামের একজন গরীব কৃষকের ছেলে দীর্ঘ ১৮ বছর পড়াশুনা শেষ করে যখন একটা চাকরির জন্য আপনার দ্বারে এসে দাঁড়াবে, তখন কী তার এসব এক পায়ে চলা খোঁড়া যুক্তি ভালো লাগবে? অবশ্যই ভালো লাগবে না। কারণ এখন তার চাকরি দরকার। সে কোন যুক্তি শুনতে চাইবে না।


আমরা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশে বাস করছি। আমরা সব সময় রাষ্ট্রের কল্যাণ কামনা করছি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। অথচ এই পোশাক খাতকে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই দিনমজুর অসহায়, মেহনতি মানুষগুলোর সাথে আমরা কী অবিচারটাই না করছি! গার্মেন্টেসের একজন শ্রমিকের নূন্যতম বেতন ধরা হয়েছে ৫৩০০ টাকা। ভাবতেই অবাক লাগে! ঢাকা শহরে কী মাত্র ৫৩০০ টাকা বেতন দিয়ে একটা পরিবার চলতে পারে? এরকম অদ্ভুত, অযৌক্তিক ও অনৈতিক চিন্তা-ভাবনা এদের মাথায় আসে কী কোথা থেকে ? শ্রমিকরা যে প্রতিনিয়তই নির্যাতিত ও বঞ্চিত হচ্ছে এদের কথা কেউ ভাবে না! ভাবে শুধু প্রতিবছর রপ্তানি আয় বাড়ছে নাকি কমছে! তাদের ভাবনা শুধু এতটুকুই। দেশের সাধারণ মানুষগুলোর কথা ভাববার কোন সময় তাদের হাতে নেই।

তারা পুঁজিবাদী স্বার্থকে চরিতার্থ করার নেশায় ব্যস্ত ও পিপাসিত। তাদের কাছে নীতি নৈতিকতা ও মনুষ্যবোধের কোন স্থান নেই। তারা সব সময় ক্ষতিকর খাদ্যের ভোগে শুধু ভোগী হতে চায়। এখন এই অবস্থায় রাষ্ট্র বা সরকারের দায়-দায়িত্বটা কী? দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা, জিডিপি বৃদ্ধি করা, সড়ক বা সেতু নির্মাণ করা, বিনিয়োগ বাড়ানো আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করা। শুধু এগুলোই কী সরকারের কাজ? শুধু এগুলো করেই কী দেশকে আর দেশের মানুষগুলোকে ভালো রাখা যায়? না। যায় না।  রাষ্ট্রের সব চাহিদা যদি জনগণ পূরণ করতে পারেন তাহলে জনগণের সব চাহিদা রাষ্ট্র পূরণ করবেন না কেন?  দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, সড়ক বা সেতু নির্মাণ আবার প্রতিবছর লক্ষ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন, এত টাকা আসে কোথা থেকে? এসব টাকার যোগান কে দেয়? নিশ্চয় রাষ্ট্রের কোন গোপন অর্থভান্ডার  নেই, যেখান থেকে উন্নয়নের নামে প্রতিবছর এত টাকা বাজেট আসে?  এসব জনগণের টাকা। এসব আমাদের টাকা। এসব সাধারণ শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের রক্ত পানি করা টাকা। যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে বিদেশে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে তিল তিল করে টাকা কামান এবং মাস শেষে আবার সেই টাকা দেশে পাঠান। এসব তাদের টাকা। রিক্সা চালক, ভ্যান চালক, কুলি,  দিনমজুর, কাঠ মিস্ত্রী, রাজ মিস্ত্রী, মুচি, চাড়াল, কামার, কুমার, জেলে ও কৃষকের টাকা। এই টাকা সাধারণ মানুষের টাকা। রাষ্ট্রকে এরাই ভরণ-পোষণ করেন।

 তাই রাষ্ট্রের সবকিছুই ব্যবহৃত হবে সাধারণ মানুষের কল্যাণে। সরকার শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের দেখভাল করবে মাত্র। এর বেশি কিছুই না। কিন্তু আদৌ কি তা হচ্ছে? আমি একটা সরকারি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার পড়াশুনা শেষ করেছি। এখন আমাকে চাকরী দেয়ার দায়িত্বটা কার? নিশ্চয় আমার বাবা-মার না। এটা সরকারের দায়িত্ব। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই কাজটা রাষ্ট্র বা সরকারকেই করতে হবে। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র সেটা করতে পারছে না। আর এর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর।  ফলে তারা শিক্ষার্থীদেরকে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিচ্ছে। সেটি হচ্ছে চাকরী য্দ্ধু। এটি যে কত বড় জঘন্য, নৃশংস ও আত্মঘাতী যুদ্ধ, যারা এখন চাকরীর যুদ্ধের বাজারে আছেন একমাত্র তারাই শুধু এটা উপলব্ধি করতে পারবেন।


শেষে নিজের উপর সব আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ক্ষোভে, দুঃখ, হতাশায় অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। একরম ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। কিন্তু আমরা হয়তবা কোন খবর পাচ্ছি না। স্বপ্ন তৈরি হওয়ার আগেই তাদের সহ¯্র স্বপ্নগুলো অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাজারো নিষ্পাপ প্রাণগুলো অকাতরে ঝরে পড়ছে প্রতিনিয়তই। একজন শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ও মননশীলতাকে নষ্ট করে দেয়ার একটি নিঁখুত ফাঁদ তৈরি করে রেখেছে। এর দায় ভার কার? এর পুরো দায়-ভার সরকার বা রাষ্ট্র কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারেন না। যে হারে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি এখন দেশের জন্য গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আইএলও) জরিপ অনুযায়ী বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। এছাড়াও সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ (সিডার) কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা -২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী  প্রায় ২৫ শতাংশ তরুণই নিস্ক্রিয়। অর্থাৎ যারা কোন কাজেই করছে না। তারা শিক্ষা, শ্রমবাজার, প্রশিক্ষণ কোথাও নেই। এসব ২৫ শতাংশ নিস্ক্রিয় তরুণকে যদি দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যেত তাহলে আমরা দেশের উন্নয়কে আরো ত্বরান্বিত করতে পারতাম।

 এসব নিস্ক্রিয় তরুণদেরকে সরকার কোন কাজে লাগাতে না পারার কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। দেশে গুম, খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, লুটতরাজ, অপহরণ, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন,  চাঁদাবাজি, চোরাকারবারি, চুরি, ডাকাতি, পিকেটিং, ইভটিজিংসহ নানা প্রকারের অপরাধমূলক কর্মকান্ডগুলো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে প্রতিবছর বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে ২৭ লক্ষ মানুষ কিন্তু চাকরী পাচ্ছে মাত্র ৩ লক্ষ মানুষ। তাহলে বাকি আর ২৪ লক্ষ মানুষ কী করবে ? তাদের মতে প্রতিবছর ২৪ লক্ষ মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। যাদের মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতদের সংখ্যায় বেশি।


অর্থ্যাৎ শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যায় এখন সবচেয়ে বেশি। এদের মধ্যে সবাই এখন শিক্ষাজীবন শেষ করে শুধু চাকরীর সন্ধানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কিন্তু সরকার ক’জনকে চাকরি দিবে ? তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশুনার পাশাপাশি একজন দক্ষ ও কৌশলী উদ্যোক্তা হওয়ার ভূমিকায় এগিয়ে আসেন। সেই সাথে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। যাতে করে আমরা একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারি। কারণ দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে আমাদেরকে পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে। সেই সাথে শিক্ষাখাতে বাজেটও বাড়াতে হবে। কারণ আমরা জানি একটি সুশিক্ষিত জাতি-ই পারে একটি উন্নত ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে।  
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক ও সংগঠক
ৎধংবফ.৪নধহমষধফবংয@মসধরষ.পড়স
০১৭৫০-৫৩৪০২৮

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাই সবার কাম্য

আব্দুল হাই রঞ্জু : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পাঁচ বছর পূর্র্ণ হতে এখনও প্রায় দু’বছর বাকী আছে। সে নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় বিএনপি জোট নির্বাচন বর্জন করায় ফাঁকা মাঠে গোল দেয় ১৪ দলীয় জোট। সে নির্বাচন বন্ধে আন্দোলন সংগ্রামের নামে হরতাল, অবরোধ এমনকি জ্বালাও পোড়াও করেও শেষ পর্যন্ত বিশ দলীয় জোটকে পরাস্ত হতে হয়। নতুন করে মহাজোট সরকারও গঠন করে।

 পরাস্ত বিশ দলীয় জোটের ওপর নেমে আসে রাজনীতির কাঁলো ছায়া। মামলা হামলা কারাবরণ অনিবার্য হয়ে ওঠে বিশ দলীয় জোটের নেতা কর্মিদের ওপর। একমাত্র বেগম খালেদা জিয়া ব্যতিত কম বেশি শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের দীর্ঘ সময় ধরে কারাবরণ করতে হয়। সে অবস্থা থেকে বিএনপি জোট এখনও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এরই মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট। উল্লেখ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের রায়ে রহিত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী চলতি সরকারের অধীনেই নির্বাচনের প্রস্তুতি বলতে গেলে প্রায় চুড়ান্ত।

 এরই মধ্যে বিএনপি জোট নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে সহায়ক সরকারের দাবিতে জনমত গঠনের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন জোট কতটুকু ছাড় দেয়, তা দেখার জন্য হয়ত আরো বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোট নেত্রীকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের টানা পোড়নও তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার দিন ঘনিয়ে আসছে। যদিও বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবিদের দাবী হচ্ছে, ঘন ঘন মামলার তারিখ নির্ধারণ হওয়ায় আশংকা করছে, হয়ত বেগম খালেদা জিয়াকে দন্ড দিয়ে কারাগারে নিতে পারে। আর আশংকা করাও স্বাভাবিক এ কারণে, হয়ত বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিতে পারলে বিএনপি জোট নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়বে।

তাহলে পুনরায় ১৪ দলীয় জোটের ক্ষমতায় আসা সহজ হবে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের আধিপত্য যেখানে প্রবল, সেখানে জিয়া পরিবারের কেউ বিএনপি জোটের হাল ধরবে এমন সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই। এমন অবস্থা, একসময় আওয়ামী লীগের মতো প্রধান দলের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। ৭৫’ এর ১৫ আগষ্টে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতির নামে যে ধরনের অপরাজনীতির খেলা শুরু হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে বিদেশে থাকার সুবাদে শেখ পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকেই দলকে সুসংগঠিত করতে হাল ধরতে হয়েছিল।

সে পথও মসৃন ছিল না। বিদেশ থেকে ফিরে রাজনীতিতে শেখ হাসিনাই দলটিকে সুসংগঠিত করে স্বাধীনতার পক্ষের সমর্থিত ছোট ছোট দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসতে সক্ষম হন। সে ধারা অদ্যবধি বিরাজমান। অর্থাৎ রাজনীতিতে সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে সফলতার দ্বার উন্মোচিত করা খুবই কঠিন। আর সঠিক ও সময়োচিত সিন্ধান্ত নিতে পারলে সফলতার ফসল ঘরে তোলাও সম্ভব হয়। সে অর্থে শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা ও সঠিক পদক্ষেপের কারণে শত প্রতিবন্ধতাকে মোকাবিলা করে ক্ষমতার রাজনীতির ষোলকলা তিনি পূর্ণ করেছেন।

পক্ষান্তরে গৃহবধূ থেকে সরাসরি রাজনীতিতে আসা বেগম খালেদা জিয়ারও সফলতার পথের দুরত্বও কোন অংশে কম ছিল না। বিশেষ করে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্ব তাঁকে আপোষহীন নেত্রীর স্বীকৃতি পর্যন্ত দিয়েছে। অথচ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা দলটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া কয়েকবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে নিজের এবং তাঁর দলের বিপর্যয় যে অনেক গভীরে, তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। আর এ জন্য এই মুহূর্তে অগোছালো কথাবার্তা, সিদ্ধান্তহীনতা, কুটকৌশলের মত পথকে পরিহার করে সঠিক ও সময়োচিত সিদ্ধান্তই বিশ দলীয় জোটকে গ্রহণ করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে এর ব্যতয় হলে বিশেষ করে বিএনপিকে কঠিন মাশুল গুনতে হবে।

 কথাগুলো আরো একটু খোলাসা করে বললে- বলতে হয়, ১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন বর্জনে একরোখা পদক্ষেপ বেগম খালেদা জিয়ার জন্য কোন ভাবেই অনুকুল ছিল না। কথায় আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে অনড় আপোষহীন নেত্রী হিসেবে খ্যাত বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে প্রস্তাব বিরোধী জোট নেত্রী প্রত্যাখ্যান করে গণআন্দোলনের মুখে সরকারকে বাধ্য করার যে কৌশল তিনি নিয়েছিলেন, তা তিনি সফল করতে পারেননি। ফলে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সার্বিক সহযোগিতায় ভোটারবিহীন এক তরফার নির্বাচন করে জনমতকে উপেক্ষা করেও মহাজোট ক্ষমতার এখন পূর্ণ মেয়াদ পুরণের পথে।

 এখন বিএনপি নেত্রীর সামনে অপেক্ষা করছে তিনি কোন পথে হাঁটবেন? শেষ পর্যন্ত বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বদলে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি উত্থাপন করেছে। মুলত গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহায়ক সরকারের ফর্মুলা নিয়ে আলোচনায় বসতে বেগম খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সে আমন্ত্রণ বেগম খালেদা জিয়া প্রত্যাখ্যান করে সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে শেখ হাসিনাকে কাবু করতে পারেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া পেরে উঠতে না পারায় একতরফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করতে সক্ষম হন। বেগম খাদেলা জিয়া শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গণভবন পর্যন্ত পৌছলে বিএনপি বেকায়দায় পড়ার বদলে বর্তমান অবস্থার চেয়ে হয়ত ভালো অবস্থানে থাকতে পারতেন।

 রাজনীতিতে ক্ষমতায় ফেরার কৌশল নিয়ে বিরোধী দল কিম্বা জোট যেমন তৎপর থাকে, তেমনি ক্ষমতাসীনরাও ক্ষমতা ধরে রাখতে নানা কৌশলের পথে হাঁটে। সেখানে জনগণের প্রকৃত রায় নিয়ে ক্ষমতায় থাকা না থাকার বিষয়টি নির্ধারিত হলে সকল পক্ষই তা মেনে নেয়। কিন্তু জনগনের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপব্যবহারে বাধ্য করে। তখন নির্দলীয় কিম্বা সহায়ক সরকারের দাবি ওঠে, এটাই স্বাভাবিক। এজন্য নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীন কর্মকান্ড অপরিহার্য্য হয়ে পড়ে।

 কিন্তু অতিত ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, চারদলীয় জোট কিম্বা ১৪ দলীয় জোটের কোন আমলেই নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। সে অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়ে ভুক্তভোগী জোটগুলোর অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সংগত কারণেই ক্ষমতাসীনরা যখন নির্দলীয় সরকারের দাবি উপেক্ষা করে, তখনই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন থেকে বিরত থাকে।

 এ ধরনের ঘটনা স্বৈরাচার এরশাদের আমলে ১৯৮৮ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ মুলধারার সব রাজনৈতিক দলকে ছাড়া চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী সহ বামপন্থি সকল দলকে বাদ রেখে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি জামায়াত এবং জাতীয় পার্টির একটি অংশ এবং অনেক বাম দলকে বাদ রেখে দশম জাতীয় সংসদের একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।  এ ধরণের ঘটনা যে ভবিষ্যতে ঘটবে না, এমন নিশ্চয়তারও কোন সুযোগ নেই।

 ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছে, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার না হলে এবং বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিলে বিশ দলীয় জোট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেনা। জবাবে ক্ষমতাসীন জোট সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন কারো জন্যই অপেক্ষা করবে না। সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাহলে বিগত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মতো জায়েজি আর একটি নির্বাচন কি অনুষ্ঠিত হবে? এ ধরণের কোন পাতানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, যা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমর্থন করে না।

 দেশের মানুষ চায়, সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি বিরোধী জোট কিম্বা দলগুলোকেও সে সুযোগ কাউকে দেয়া উচিৎও হবে না। তা হলে সারকথা দাঁড়ায়, নির্বাচন বর্জনের বদলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকেই যৌক্তিক এবং সময়োচিত বলেই আমরা মনে করি। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা লেনিনের একটি উক্তি ছিল, রাজনীতিতে কৌশলগত কারণে ‘ওয়ান স্টেপ ফরওয়ার্ড, প্রয়োজনে টু স্টেপ ব্যাক’ ফর্মুলা ক্ষতির চেয়ে লাভের পাল্লাকে ভারি করে।

 অর্থাৎ সব সময় এক কৌশলের ওপর নির্ভরশীলতা রাজনীতির ক্ষেত্রে ভাল ফল দেয় না। অবশ্যই লেনিনের সেই উক্তির যথার্থতা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোকে অনুসরণ করার সময় এসেছে। এমনিতেই দেশের শক্তিশালী বিরোধী দল বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দেশান্তরে, বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলেও চলে গেছে না ফেরার দেশে। আবার বেগম খালেদা জিয়াও মামলার বেড়াজালে চরমভাবে বেকায়দায়। এমন অবস্থায় বিএনপি একাদশ নির্বাচন বর্জন করে তীব্র গণ-আন্দোলন সফল করতে পারবে, এমন সম্ভাবনাও যেখানে ক্ষীন্ন, সেখানে ‘ওয়ান স্টেপ ফরওয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাক’র’ কৌশলকে অবলম্বন করে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে সংগঠিত করার পথেই হাঁটা উচিত বলে বিশিষ্টজনরা মনে করেন।

 সত্যিই যদি শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়াকে জেলেই যেতে হয়, তাহলে ব্যক্তি খালেদা জিয়ার কষ্ট বাড়লেও বিএনপির লাভের পাল্লা ভারীর সম্ভাবনা বাড়বে। কারণ এ দেশের মানুষ যেহেতু খুবই সহানুভুতিশীল, সেহেতু বিএনপির হরিয়ে যাওয়া জনসমর্থন ক্ষমতাসীনদের জন্য বুমেরাংও হতে পারে। আর রাজনীতিতে জেল জুলুমের ইতিহাস অনেক পুরনো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ফেলে তৎকালিন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ফাঁয়দা লুটতে চাইলেও ফলাফল হয়েছে উল্টো। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সূচিকে দীর্ঘদিন ধরে জেলে আটকে রেখেও তাঁর বিজয়কে ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

 বর্ণবাদ বিরোধী লৌহমানব খ্যাত নেলসন মেন্ডালাকে ২৮ বছর কারাগারে রেখে তাঁর বিজয়কেও ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ইতিহাস বারংবার স্বাক্ষর দেয়, জনবিরোধী কোন শাসকই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। অথচ আপোষহীন খ্যাত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দলের নেতা নেত্রীরা যে জেল জুলুমকে ভয় পায়, তা অপ্রিয় হলেও সত্য। অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি বুনিয়াদি দল হিসেবে গড়ে ওঠায় আন্দোলন সংগ্রামের পথে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। ফলে জাতীয়তাবাদের খোলসে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটি তাঁর অবর্তমানে মাঝে মধ্যেই লক্ষ্যচ্যুতির কবলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে।


বিএনপি ফখরুদ্দিনের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনের অধিনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও সেই কমিশনের অধিন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। হয়ত কৌশলগত কারণে সে সিদ্ধান্তকে নেতিবাচক ভাবাও সঠিক হবে না। ইতিমধ্যেই আগের নির্বাচন কমিশন বিদায় নিয়েছে। গঠিত হয়েছে নতুন নির্বাচন কমিশন। রাষ্ট্রপতির ডাকে দলটি বঙ্গভবনেও আলোচনায় বসেছে।

এখন নতুন নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়াই হবে যৌক্তিক। কারণ যেখানে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে সকল প্রস্তুতি পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বিরোধি দল বিএনপিকে নতুন নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রেখেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। নতুবা বিএনপির লক্ষ্যচ্যুতির কারণে আর একটি ৫ জানুয়ারির মত একতরফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ক্ষমতাসীনদেরই লাভের পাল্লা ভারি হওয়ার সম্ভাবনাই বাড়বে।  
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

প্রশ্ন ফাঁস : এ দুর্নাম ঘোচাতে হবে

মীর আব্দুল আলীম :প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রোধ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের তাবৎ হুঙ্কার, আশ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণী সবটাই যেন অকার্যকর মনে হচ্ছে। সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবারও এসএসসি পরীক্ষায় গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গণিত পরীক্ষার বহু আগে ফেসবুকে দেয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলে দেওয়া প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া গেছে। বরাবরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে।

সরকার জঙ্গি দমন করতে পারছে, সরকার বিশ্ব ব্যাংকের উপেক্ষ করেই পদ্মা সেতুর মতো কঠিন কাজগুলো করতে সক্ষমতা দেখালেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? প্রশ্ন হলো সংশ্লিষ্টরা কি না দেখার ভান করছেন। সবাই জানে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার্থী, অভিভাবকরাও বলছেন, যে প্রশ্ন তারা অনলাইনে পেয়েছে তার সাথে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নে পুরোপুরি মিল আছে। সবাই দেখছেন, জানছেন কিন্তু তাঁরা (!) কেন দেখছেন না। এটা কি তাহলে কানার হাট বাজার নাকি? প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সংশ্লিষ্টরা এর দায় কেন নিচ্ছেন না? এমনটা চলতে থাকলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে, শিক্ষার মান বলে কিছু থাকবে না। প্রকৃত শিক্ষিত জাতি থেকে বঞ্চিত হবে দেশ।  আর তা দেশের জন্য ভয়ানক একটা সংবাদ।


প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। আমাদের কালেও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তখন কেউ হঠাৎ প্রশ্নপত্র পেলেও অল্প সময়ে এক জায়গা হতে আরেক জায়গায় পাঠানো দুঃসাধ্য ছিল। তথ্য প্রযুক্তির কারণে এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সহজ হয়েছে। কথায় আছে, কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। প্রশ্নপত্র বিতরণে ভিন্নতা আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কৌশলি হতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে পরীক্ষার দিন সকালবেলা প্রশ্নপত্র ছাপানো এবং বিতরণ করা যায়।

গণিত প্রশ্ন ফাঁসের পর প্রশ্ন ফাঁস রোধে পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র স্থানীয়ভাবে ছাপা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বিবৃতি দিয়েছেন। বছর তিনেক আগে আমি প্রশ্ন ফাঁস রোধে আমার লেখা কলামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েকটি সুপারিশ করেছিলাম। তখন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও এ জাতীয় সুপারিশ পেশ করেন। তা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় উদ্যোগিও হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও সে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা যায়। আলোচিত সৎ এবং সাহসি ম্যাজিষ্ট্রেট রোকন-উ-দ্দৌলার মতো সরকারি আমলাদের এখানে কাজে লাগাতে হবে। যথানিয়মে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্নপত্রের নমুনা কপি সংগ্রহ করা হবে। পরীক্ষার রাতে ওইসব সৎ আমলাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল সংগৃহীত প্রশ্নপত্র থেকে বেছে বেছে নতুন প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি করবেন।

তথ্য প্রযুক্তিতে ভরপুর থাকবে ওই কক্ষ। সেখান থেকে পরীক্ষার আধা ঘন্টা আগে কেন্দ্রগুলোতে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে হবে। কেন্দ্রে আধা ঘন্টা আগে শিক্ষার্থীদেরও প্রবেশ করাতে হবে। এ সময়ে প্রিন্টারে প্রশ্ন প্রিন্ট করে পরীক্ষার হলে সরবরাহ করতে হবে। তাতে সুফল মিলতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য একটি সেন্ট্রাল সার্ভার থাকবে। পরীক্ষার আধা ঘন্ট আগে কেন্দ্রীয় সার্ভার হতে পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকা ট্যাব বা কম্পিউটারে প্রশ্ন পৌঁছে দিতে হবে। অথবা ই-মেইলেও এ কাজটি করা যায়। এক ক্লিকেই কয়েক শ’ ই-মেইল পাঠানো সম্ভব। দেশের সবচাইতে বড় পাবলিক পরীক্ষা হলো পিএসসি, যার কেন্দ্রের সংখ্যা কমবেশি ৬০০।

 এই পরীক্ষার জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো ১২-১৫ কোটি টাকার মধ্যেই গড়া সম্ভব এবং শুধু পিএসসি কেন, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ যে কোনো কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা খুব সহজেই নেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান প্রশ্নপত্র ছাপা এবং পাঠানোর খরচও অনেক বেশি পড়ে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেন্দ্রে প্রশ্ন পাঠালে বর্তমানের তুলনায় খরচ কয়েকগুণ কম হবে তাতে সন্দেহ নাই। বর্তমানে উন্নত পৃথিবীতে পরীক্ষার গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু আছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এদেশেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব। আসল প্রশ্ন হল, সংশ্লিষ্টরা সমাধান চাইছেন কিনা!


দেশে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা বিভিন্ন সময় হয়েছে। এখনো হচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্য দেশবাসীর কাছে বেশ স্পষ্ট হলেও পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাদের সে সফলতাকেই ম্লান করে দিচ্ছে। প্রায় পরীক্ষায়ই এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটায় শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহল চিন্তিত। আর এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য বজায় থাকবে কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখিও হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কর্ণকুহরে পানি ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না। তা যদি হতো তাহলে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটত না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনার ধামাচাপা দেয়ার ঘটনা ঘটে। একবারও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে না কেউ।

 ‘শর্ট সাজেশনস থেকে আসতে পারে’ এমন মন্তব্য করে শিক্ষা বিভাগ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এবার মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যথারীতি ফল প্রকাশ করে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় মেধাবীরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পাওয়াসহ মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে। পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে, মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে কয়েকজনকে আটকও করেছে পুলিশ।

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। বরাবরের মতো আগের রাতে নয় এবার কয়েকদিন আগেই শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের সেট হাতে পেয়ে যায়। ১০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ফটোকপির দোকানে এ প্রশ্ন বিক্রি হয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে। যেসব প্রশ্ন বাজারে পাওয়া গেছে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দেখা গেছে সব প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল ছিল।

 পিএসসি, জিএসসি, এসএসসি ও সমানের পরীক্ষায়ও তাই হয়। খুদে বার্তা ছাড়াও প্রশ্ন ছাপানো (কম্পিউটারে কম্পোজ করা) ও হাতের লেখা কপি পরীক্ষার আগেই বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফাঁস হওয়া ওইসব প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের শতভাগ মিল পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো কি হচ্ছে এসব? শিক্ষা ক্ষেত্রে এভাবেই কি প্রতিনিয়ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটবে? এসব রোধ করা হচ্ছে না কেন? সরকার কি রোধ করতে পারছে না? আমরা এ কথা সহজভাবে মেনে নিতে রাজি নই। সরকার চাইলে সবই পারে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের পারার পারঙ্গমতা অনেক বেশিই মনে হয়। এ সরকার জঙ্গিবাদ দমন করতে পারলে প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসকারীদের রোধ করতে পারবে না কেন? সব দেশি প্রভুদের মুখে ছাই দিয়ে নিজস্ব শক্তিতে পদ্মার মতো সেতু তৈরি করতে পারলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা রোধ করতে পারবে না কেন? তবে কি সরকার এ ক্ষেত্রে আন্তরিক নয়? যদি হয় তাহলে প্রতিবারই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন।

যাই বলি না কেন এ ব্যাপারে সরকার দায় এবং ব্যর্থতা এড়াতে পারে না। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে প্রশ্নপত্রের বিষয়টি বেসরকারি কোনো সংস্থার হতে ন্যস্ত করুক। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এর দায়িত্ব দিক। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঢের দেখেছি। এখন খুব কম। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সফল বলা চলে। এ দায়িত্বটা বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরীক্ষামূলকভাবে দেয়া যেতে পারে।


প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শান্তি ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ডসহ অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। কতবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো কজনকে এ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নাম্বার ধারায় এই শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই শাস্তির এ বিধান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হয় কিন্তু শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে বার বার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে।

চলতি এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হলেও অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই চলে যাবে বলে ধারণা করতে পারি। সরকারি এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ওই সময় থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৮২ বার বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০১৪ সালের জেএসসি, পিএসসি, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২০১৫ সালে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে।

২০১৬ সালেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের গণিত পরীক্ষায় পশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পরিসংখ্যান বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা আরো বাড়বে। এর মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, বাতিল ও তদন্ত কমিটি হয়েছে মাত্র ৩০টি পরীক্ষায়। তদন্ত কমিটি হোতাদের চিহ্নিত করে প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করলেও কোনোটিরই বাস্তবায়ন হয়নি। কারো শাস্তিও হয়নি। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। প্রশ্নফাঁসের ফলে একটি নীতিহীন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সবার মধ্যেই একটি ব্যাধি সংক্রামক আকারে বাড়তে থাকে। এটা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেই আমরা মনে করি।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
হবংিংঃড়ৎব১৩@মসধরষ.পড়স  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮



Go Top