সন্ধ্যা ৬:১৬, বুধবার, ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং
/ মতামত

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন  : মহাপবিত্র মাহে রমজানের একটি মাস ত্যাগ তিতিক্ষা ও সিয়াম সাধনার পরে শাওয়ালের পহেলা তারিখে আসছে ঈদুল ফিতর। ঈদ শব্দটি আরবি যা মাউদা মূল ধাতু থেকে উৎসারিত, অর্থ ফিরে আসা। অন্য অর্থে ঈদ মানে আনন্দ বা খুশি। ঈদুল ফিতরের আনন্দ মুসলিম নর-নারীকে আলোকিত করে তোলে। মুসলমানদের আনন্দ উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদুল ফিতরই প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদ মানে আনন্দ যা ফিরে আসে বারবার মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে। এই দিন বিশ্ব মুসলিমের জন্য আনন্দের দিন। এ আনন্দ হচ্ছে কৃচ্ছতা, ধৈর্য্য, ত্যাগ, সংযম ও সাধনার পর তার পূর্ণ ফলটি উপভোগ করার আনন্দ।

 শ্রমিকের খাটুনির পর যেমন মজুরি পাওয়া মাত্রই খুশি হয় তেমনি বান্দা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হুকুম পালনে একটি মাস সিয়ামব্রত পালন এবং একাগ্রচিত্তে ইবাদতের পর তার পূর্ণ ফলটি পাওয়ার আশায় অধীর আগ্রহে চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করে এ দিনটির জন্য। তার জন্যই এ দিনটি আনন্দের দিন, খুশির দিন, এক কথায় ঈদের দিন। আর এ কারণেই ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব, ফজিলত ও তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।

ঈদ-উল ফিতর প্রথম উদযাপিত হয় ২য় হিজরী ৬২৪ খৃস্টাব্দে ১ শাওয়াল মদিনাতুল মুনাওয়ারায়। যা ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের মাত্র ১৩ দিন পর। একথা সত্য যে ঈদুল ফিতরের আনন্দ উৎসব তারাই ভোগ করতে পারবে যারা একটি মাস সঠিকভাবে সিয়ামব্রত পালন করেছে। আর তাদের জন্যই রয়েছে এই দিনে বিশেষ ক্ষমা ও ¯্রষ্টার পক্ষ থেকে অবারিত রহমত এবং সীমাহীন কল্যাণ। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত আছে, ইবনু শাহীন আনাস (রা.)-এর সূত্র ধরে বর্ণনা করেন-অত:পর যখন ঈদুল ফিতরের দিন আসে তখন ফেরেশতাগণ নেমে আসে এবং সমুদয় রাস্তায় মুখে দন্ডায়মান হয়ে বলে, হে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতগণ, করুণাময় প্রভুর দিকে অগ্রসর হও।


এরপর যখন তারা সালাতের স্থানে (ঈদগাহ) উপস্থিত হয় তখন প্রতাপশালী আল্লাহ এই বলিয়া ডাকেন, হে আমার ফেরেশতাগণ, যে মজুর তার কাজ শেষ করে অবসর গ্রহণ তখন তার প্রতিদান কি হতে পারে? তারা উত্তরে বলেন, প্রতিদান হচ্ছে তাহাকে পূর্ণ মজুরি দিয়ে দেয়া। তখন আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় এরা আমার দাস ও আমার দাসদের সন্তান সন্তুতি, আমি তাদেরকে রোজা রাখতে আদেশ দিয়েছিলাম, অতঃপর তারা রোজা রেখেছে। আমার আদেশ পালন করেছে। তৎপর আহ্বানকারী এই বলে ডাকে, হে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত তোমরা সৎপথে ফিরে যাও।

 নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছি। (হাদিসে কুদসী পৃ:১৪২) আলোচ্য হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, একজন রোজাদার ব্যক্তি একটি মাস রোজা পালনের পর ঈদুল ফিতরের মাঠ থেকে নিস্পাপ শিশুর মত হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তাই এই ঈদের আনন্দ ও ক্ষমা পাওয়ার জন্য প্রয়োজন সিয়াম ও সাধনা। সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা মুসলমানের প্রতিটি কাজ ও কর্মের অবশ্যই কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব রয়েছে। তেমনিভাবে ঈদুল ফিতর একটি বিশেষ দিবস। সারা বছরের সাধনার ফলপ্রাপ্তি আশায় রমজানের একটি মাস বাস্তবমুখী পরীক্ষা দিয়ে কঠোর সিয়ামব্রত পালনে নিয়োজিত হয়ে মুমিন ব্যক্তি তার প্রতিদানটি পেতে চায় এই ঈদুল ফিতরের দিনে। তাই একে বলা হয় খুশির মুহূর্ত।

 কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায় কার জন্য এই আনন্দ বা খুশি? যে কষ্ট করেছেম গরিব, অসহায়, দুস্থ, আত্মীয়, প্রতিবেশীর সুখ বিধানের আয়োজনে শরীক হয়েছে, ব্যয় করেছে অর্থ, দান ও খয়রাতের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, জান ও মালের সাদকা আদায় করেছে, পালন করেছে ইসলামের প্রতিটি নিয়মনীতি, একমাত্র তারই জন্য  আজ খুশির দিন। আজ সকল পূর্ণ প্রাপ্তির পূর্ণতার সময়। তাই এই ঈদুল ফিতরের দিনে সকলকে আনন্দের পাশাপাশি ইবাদতে মশগুল থাকতে হবে। কারণ মুসলমানদের কোন আনন্দই দুনিয়াবী বা ইহকালীন জীবনের জন্য  নির্দিষ্ট নয়।

 বরং প্রতিটি কাজের মধ্যেই রয়েছে জীবনের প্রাপ্তি। এই দিনে নিছক আনন্দ ফূর্তির দিন নয়। বরং এদিন হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার দিন। দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর ফারুক (রা.) এক ঈদুল ফিতরের দিন কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিতেন। এত কান্না কে? জবাবে তিনি বললেন, যারা কামিয়াব হয়েছে, কৃতকার্য হয়েছে  তাদের জন্য সত্যিই আজ খুশির দিন। প্রকৃত আনন্দ মোত্তাকিদের জন্য। হযরত ওমর বলেন, আমার সিয়াম, ইবাদত যদি কবুল না হয়ে থাকে তবে আমার উপায় কি? এই ভাবনায় অস্থির হয়েছি। ওমর (রা.)- এর মত ব্যক্তির যদি তার ইবাদত সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে কাঁদতে হয় তাহলে আমাদের কি করতে হবে? তা একবার চিন্তা করার জন্য জ্ঞানী পাঠকের প্রতি অনুরোধ করছি।

ঈদ মানেই আনন্দ, যা ধনীর অট্টালিকা ও অসহায় গরীব নিরীহ জনতার ক্ষুদ্র কুঠিতেও একইভাবে প্লাবিত হয়ে থাকে। তাই ঈদুল ফিতরের একটি উল্লেখযোগ্য তাৎপর্য হলো ফিতরা আদায়। ঈদের মাঠে যাবার পূর্বে ফিতরা আদায় করার জন্য প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানদের প্রতি জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এটা ওয়াজিব। এটি আদায় না করলে সিয়ামের কোন মূল্য নেই। আর ঈদের তো প্রশ্ন আসে না। মহানবী (সা.) বলেন, তোমাদের রোজা আসমান ও যমীনের মাঝখানে ঝুলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ওটার যাকাত (সদকা) আদায় না করবে।

 এটাই হলো ইসলামী উৎসবের মূল রহস্য ও শিক্ষা। ইসলাম বিগত দেড় হাজার বছর ধরে বিশ্ববাসীর সামনে এই সফলতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে ইসলামই হচ্ছে সারা বিশ্বের একমাত্র অপরাজেয়, অপ্রতিরোধ্য আদর্শ; যার সামনে বিশ্বের কোন আদর্শ দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। এই উৎসব কারো ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয়, রাজনীতির ধ্যান ধারনায় পালিত হবে না। বরং এই উৎসব সামগ্রিক, ব্যাপক ও সার্বজনীন চিন্তা চেতনা বাস্তবায়নের মাইল ফলক, এখানে আল্লাহমুখী চিন্তা চেতনাই প্রতিফলিত হবে।

এই ঈদে আর একটি গুরুত্ব তা হচ্ছে এই দিনে ঈদগাহে ইমাম সাহেব সালাত ও খুৎবার পূর্বে নসিহতমূলক বক্তব্য রাখবেন, তা হচ্ছে ঈদের খুশি কি? কেন/কার কি কর্তব্য, দেশের অবস্থান দান খয়রাত, যাকাত ফিতরাসহ হিংসা বিদ্বেষ, ঝগড়া ভুলে সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে একে অন্যের জন্য দোয়া ও কল্যাণ কামনা করার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করবেন। কারণ ঈদের এই দিনে রাজা প্রজা ধনী দরিদ্র সকলের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে স্মরণ করবে মহান ¯্রষ্টাকে। ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করবে ব্যক্তি, দেশ ও জাতির জন্য। বিশেষ করে প্রতিবেশির প্রতি বেশি নজর দেয়া দরকার। কারণ যদি মহল্লার একটি ব্যক্তিও আজ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় তবে সকলের জন্যই সর্বনাশ।

একথা চিরসত্য যে মুসলিম জাতির আনন্দ দিবস ঈদ পালিত হয় ব্যতিক্রমধর্মী ভাবধারা ও পৃথক জৌলুসে। তাৎপর্যময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এবং আচরণে মুসলিম মিল্লাতের ও আনন্দ উৎসব আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। পাক পবিত্র ক্লেশ ও খাদ্যবিষমুক্ত, অনাবিল পরিবেশ শুরু হবে ঈদের আনন্দ।
লেখক ঃ প্রভাষক -প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট, ইসলামি গবেষক
     mostakimbogra@gmail.com
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

জুমআতুল বিদা রমজানের শেষ জুমআর গুরুত্ব

এস এম সায়েম: রমজানুল মুবারকের মাস মুমিনদের জন্য আল্লাহ পাকের বিরাট নিয়ামত। এই নিয়ামতের কদর করা না হলে, রমজান মাসের কোনো মূল্য বা মর্যাদা দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। এ মাস ত্যাগ কল্যাণ, জ্ঞানার্জন, প্রশিক্ষণ এবং বড়ই বরকতের মাস। আল্লাহ তায়ালা এ মাসে বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করেন এবং খাছ রহমত বর্ষণ করেন। গোনাহ মাফ করেন ও দোয়া কবুল করেন। যারা রমজান মাসকে পেয়েও উদাসীন থাকে, এ মাসকে পালন করে না এবং যাদের গোনাহ মাফ হয় না তারাই বড়ই হতভাগ্য এবং বঞ্চিত। তাদের উপর রাসুল (সাঃ) এর লানত রয়েছে।


আজ জুমআতুল বিদা। জুমআর ফজিলত ও গুরুত্ব অপরিসীম। রমজান শেষ, সিয়াম সাধনার মাস আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে, বড়ই আফসোসের বিষয়। ইসলামের দৃষ্টিতে জুমআর নামাজ এবং এই দিনের এবাদত বন্দেগীর গুরুত্ব রয়েছে। এ দিনের নামাজ, এবাদত মুমিনদের সার্বিক কল্যাণ সাধন এবং সামাজিক মেরুদ  দৃঢ়করণের এক চিরন্তন ব্যবস্থা। এই দিনের নামাজে মুসলমানগণ মিলিত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে; দেশ, জাতি তথা অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিশ্লেষণ এবং উহার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তব কর্মনীতির ফয়সালা করবে।

 জুমআর নামাজ সম্পর্কে সুরা জুমআর ৯ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘মুুমিনগণ জুমআর দিনে যখন নামাজের আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর; এটা তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ’’। আল্লাহ বলেন, ‘‘নামাজ শেষে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়, আল্লাহ অনুগ্রহ তালাশ কর এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, আল্লাহই একমাত্র রিজিক দাতা’।


আল্লাহতায়ালার নিকট নামাজের ন্যায় প্রিয় আর কিছু নেই। কোরআন হাদীসে নামাজের জন্য যত তাকীদ এসেছে, অন্য কোন ফরজ এবাদতের জন্য এতো তাকীদ দেয়া হয়নি। রাহমানুর রাহীমের অসংখ্য নেয়ামত অজস্রভাবে বান্দার উপর বর্ষিত হতে থাকে এজন্য তার শোকর আদায়ের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। আর সপ্তাহের সাতদিনের মধ্যে শুক্রবার সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। এই দিনে আল্লাহপাক বেশি নেয়ামত দান করেন।


 এই দিনে হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয় এবং এদিনে কিয়ামত বা পৃথিবী ধ্বংস হবে। জুমআর দিনে অধিক সংখ্যক মুমিন মুসলমান একত্র হয়ে নামাজ আদায় করবে, ততই দুনিয়া এবং আখেরাতের নেয়ামত হাছিল হবে। ইহুদীগণ এই বিশেষ এবাদতের জন্য সপ্তাহের শনিবার ধার্য করে এবং নাছারাগণ রবিবার ধার্য করে। কিন্তু উম্মতে মোহাম্মদীদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদতের দিন শুক্রবার অর্থাৎ জুমআর নামাজ।

মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, এই দিনে হিসাব নিকাশের পর পাপীদের দোযখে এবং মুমিনদের বেহেস্তে প্রবেশ করানো হবে। বোখারী শরীফে বর্ণিত আছে, জুমআর দিনে এমন একটি সময়ে রয়েছে মুমিন বান্দাগণ আল্লাহর নিকট যা কিছু চাইবে তাই পাবে  এবং হযরত ফাতেমা (রা) শুক্রবার দিনের শেষে আছরের পর আল্লাহর যিকির এবং দোয়ায় মশগুল থাকতেন।

 আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে, রাসুল (স) বলেছেন তোমরা এ দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়িও। চার ব্যক্তি ছাড়া জুমআর দিনে সবাইকে আল্লাহ ক্ষমা করেন। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সেই চার ব্যক্তি কারা ? উত্তরে নবী (সাঃ) বলেন, (১) মদখোর ব্যক্তি, (২) পিতা-মাতার নাফরমান সন্তান (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি এবং (৪) হিংসুক ও অহংকারী ব্যক্তি। তবে এই চার শ্রেণীর ব্যক্তি যদি তাওবা করে তাহলে আল্লাহ পাক ক্ষমা করতে পারেন। মেশকাত শরীফে বর্ণিত আছে,জুমআর রাত নুরে ভরা রাত এবং জুমআর দিন নূরে ভরা দিন। তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে যে, মুসলমান বান্দার মৃত্যু জুমআর দিনে বা রাতে হয়, আল্লাহ পাক তার গোরআযাব মাফ করেন।


বৃহস্পতিবার থেকে জুমআর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এবং আছরের পর থেকে দরূদ, এস্তেগফার এবং বেশি বেশি যিকির করা উত্তম কাজ। এ ছাড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধৌত করা, চুল, নখ কাটা উত্তম। আর জুমআর দিনে গোসল করে সামর্থ অনুযায়ী ভালো পোশাক পরিধান করে এবং খুশবু লাগিয়ে মসজিদে যাওয়া উত্তম।

তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে, জুমআর নামাজের উদ্দেশ্যে পদব্রজে গমন করলে প্রত্যেক কদমের বিনিময়ে এক বছরের নফল রোজা রাখার ছওয়াব পাওয়া যায়। জুমআর নামাজ ফরজে আইন, হাদিস এবং কোরআনের বাণী দ্বারা প্রমাণিত, ইসলামে এর গুরুত্ব রয়েছে। তিরমিযী শরিফে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি অলসতা করে, উদাসীন ভাবে তিন জুমআর নামাজ ত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তাহার উপর নারাজ হন এবং আল্লাহ পাক তাহার অন্তরে মোহর মেরে দেন।


জুমআর গুরুত্ব এবং ফজিলত আলোচনা করা সম্ভব নয়। আমরা বলতে পারি, উম্মতে মোহাম্মদীদের জন্য জুমআ মর্যাদাশীল। এই দিনে আল্লাহ পাক বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং বান্দার প্রতি ক্ষমা এবং রহমত বর্ষণ করেন। আজ আমরা শংকিত, বিস্মিত, হতাশাগ্রস্ত, কারণ হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, কলহ-বিবাদ এবং পাপাচারে আমরা লিপ্ত। তা শুধু দুনিয়ার স্বার্থেই করা হচ্ছে। নিশ্চয়, আল্লাহ পাকই ভাল জানেন, কে দ্বীনের জন্য পরকালের জন্য কাজ করছে। আর কে দুনিয়ার লোভ লালসায় অন্ধ। হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি আমাদের ও বিশ্ব মুসলিম জাতিকে ক্ষমা কর এবং দয়া কর, সম্মানজনক জীবন ও জীবিকা দাও, দোযখ থেকে রক্ষা করে বেহেস্ত দান কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু (আমীন)।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট,
০১৭১২-৩৫২১৭৫

সময়কে ধারণ করে এগিয়েছে আওয়ামী লীগ

মাশরাফী হিরো : আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ৮ বছর যাবৎ একটানা ক্ষমতায়।  এর আগে কখনই এতটা ক্ষমতায় থাকার সৌভাগ্য হয়নি দলটির। ৬৮ বছরের মধ্যে এই ৮ বছর বাদ দিলে মাত্র ১২ বছর ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে। পাকিস্তান আমলে ৩ বছর, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ৪ বছর এবং ৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ৫ বছর।

ঐ সময়গুলিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে সেনাবাহিনীর খবরদারি ছিল সবসময়। ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত বিপর্যস্ত দেশ গোছাতেই ব্যস্ত। তাছাড়া ষড়যন্ত্রতো রয়েছেই। ষড়যন্ত্রের ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড।


 ৯৬ থেকে ২০০১ সাল ক্ষমতায় থাকলেও বিদেশী খড়গ মাথার উপরে ছিল সবসময়। শুধুমাত্র এই ৮ বছর ব্যতিক্রম। হাজারো ষড়যন্ত্র ও আন্দোলন করেও সরকারের পতন ঘটানো যায়নি। বিডিআর বিদ্রোহ, ২০১৩-১৪ সালে অগ্নিসংযোগ, মানুষ পোড়ানো, হেফাজতের শাপলা চত্বর দখল করেও সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো যায়নি, ২০১৪ সালের নির্বাচনও ঠেকানো যায়নি।

তাছাড়া ৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনে সফল হয়েছে আওয়ামী লীগ। জঙ্গিবাদকে উড়িয়ে দিয়েছে বর্তমান সরকার। আওয়ামী লীগ বিরোধীরা এখন অনেকটা অসহায়। যতই, হুংকার, দিক না কেন কিন্তু এমন অবস্থা ছিল না। আগে মানুষ আওয়ামী লীগ মানেই বিরোধী দল মনে করত। মুসলিম লীগ ক্ষমতায়, আইয়ুব- ইয়াহিয়া ক্ষমতায়, জিয়া-এরশাদ ক্ষমতায়, খালেদা জিয়া ক্ষমতায়। মানুষ এদেরকে ক্ষমতায় দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগ ছিল রাজপথে।


 অধিকার আদায়ের একমাত্র সংগঠন ছিল আওয়ামী লীগ। তাছাড়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি। বরং আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিলো পাকিস্তান সৃষ্টির দুই বছর পর মুসলিম লীগের বিকল্প হিসেবে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল তা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। তাইতো প্রথমে নাম হয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। যাতে আপত্তি ছিল অলি আহাদের।

 

কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এখনও সময় আসেনি। মুসলিম শব্দটি বাদ দিতে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক একটি সংগঠনে রূপ নিতে প্রায় ৭ বছর সময় লেগেছিল। মানুষের বুঝতে সময় লেগেছিল তাই আওয়ামী লীগ অপেক্ষা করেছিল। বঙ্গবন্ধু কমিউনিস্টদের ব্যাপারে বলেছিলেন মানুষ চলছে ঠেলাগাড়িতে আর ওরা চলছে উড়োজাহাজে। ফলে মানুষ তাদেরকে বুঝতে পারেনি। সাধারণ মানুষ না বুঝলে সংগঠন হবে কোত্থেকে!


 বঙ্গবন্ধু এই কথাটি বুঝেছিলেন বলেই গোষ্ঠীগত মুসলিম লীগ আর প্রগতিশীলদের অতি ভাবনা থেকে বের করে এনেছিলেন আওয়ামী লীগকে। তখন থেকে আওয়ামী লীগের একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছে। যা বংশ পরম্পরায় আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ সব সময় সময়কে ধারণ করেছে। অপেক্ষা করে কৌশল নির্ধারণ করেছে। তারপর এগিয়েছে।

 

যার ফলে নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত। যার কারণে স্বৈরশাসকরা আওয়ামী লীগকে দখল করতে পারেনি। যেমনটি করেছিল মুসলিম লীগকে। আর বিএনপি, জাতীয় পার্টি তো তাদেরই সংগঠন। আদর্শের রাজনীতির বীজবপন করেছেন বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগের সীমানার চতুস্পার্শ্বে একটি শক্ত গাঁথুনি দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও  বাঙালি জাতীয়তাবাদ যা বাঙালির চরিত্রকে ধারণ করে। তাই হাজারো অপপ্রচার করে আওয়ামী লীগকে দমন করা যায়নি।


 এই সীমানার বাইরে গিয়ে ছিটকে পড়েছেন আওয়ামী লীগের বহু প্রভাবশালী নেতা। এ থেকে মুক্তি পাননি আওয়ামী লীগের ও বঙ্গবন্ধুর নেতা হোসেন শহীদ সোরাওয়ার্দী। বেরিয়ে গেছেন মাওলানা ভাসানী। এখনও সে ধারাটি অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ আবার সে পথে ফিরেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বহু বছর রাষ্ট্রকে এ ধারা থেকে বেরিয়ে  আনার চেষ্টা করে সফল হয়নি। রাষ্ট্রীয় কৃষ্টি-কালচার এক রকম হলেও মানুষ তা ধারণ করেনি। ধারণ করেছে নিজস্ব সংস্কৃতি। যা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি, যা আওয়ামী লীগের সাথে সংগতিপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা পরিত্যাগ করেছে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যে দিন আওয়ামী লীগের জন্ম। হয়তো সময় সময় তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।


 দেশ ভাগের সময় বাঙালিরা একত্রিত থাকুক এটা কেউই চাননি। না ই্িন্ডয়ান নেতারা বা পাকিস্তানী নেতারা। আর আমাদের নেতারা দ্বি-জাতিতত্ত্বের পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিলেন সাময়িক প্রশান্তির জন্য। এ,কে ফজলুল হক পাকিস্তানের সাথে ছিলেন না কায়েদে আজমের কারণে। কারণ তিনি তাঁকে নেতা হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের  পক্ষে। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য তাদের ত্যাগ ছিল লক্ষণীয়। যে ভুল তাদের ৪৮-এ ভেঙ্গে ছিল সে ভুল যদি ৪০-এ ভাঙ্গত। অথবা বঙ্গবন্ধুর জন্ম যদি আর একটু আগে হতো তাহলে সম্ভবত শুধু বাংলাদেশ নয় আমরা পেতাম পুরো বাংলা। বাঙালিরা পেত স্বাধীন একটি রাষ্ট্র। খন্ডিত দেশ নিয়ে আমাদের এগোতে হতো না।


 আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগ অথবা এখনকার বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিপক্ষ মনে করে না। কারণ তারা কেউ তার সমকক্ষ হতে পারেনি। বরঞ্চ সময় হয়তো আওয়ামী লীগের বিপরীতে ছিল তাই পুরো বাংলা হয়নি। তাই হয়তো ২৩ বছর পরাধীন থাকতে হয়েছে, ঘটেছে ৭৫-এ মর্মান্তিক হত্যাকান্ড। কিন্তু আওয়ামী লীগ সব কিছুকে পরাস্ত করেই ৫২ ও ৭১ সৃষ্টি করেছে, আবার ৯৬, ২০০৮ ও ২০১৫ সৃষ্টি করেছে। নৌকা ঝড় তুফানে তলিয়ে যায়নি। হয়তো স্থিমিত হয়ে গেছে কিছু সময়ের জন্য অথবা ¯্রােতের বিপরীতে চলতে চলতে চরে আশ্রয় নিয়েছে কিছু সময়- কিন্তু থেমে থাকেনি। থেমে থাকবে না। বাঙালি ছিল আওয়ামী লীগের সাথে এবং থাকবে। বাঙালিকে কোথায় নিয়ে যায় আওয়ামী লীগ সেটাই এখন দেখার বিষয়!
লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক,
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

হাবিবুর রহমান স্বপন :উত্তর জনপদের অন্যতম নদী বড়াল। যা এখন মৃতপ্রায়। জীবন্ত বা চলন্ত নদীটিকে কি ভাবে হত্যা করা হয়েছে তাই আজ বলবো।পদ্মা এবং যমুনা নদীর সংযোগ রক্ষাকারী বড়াল নদীর দৈর্ঘ্য দু’শ চার কিলোমিটার। রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদী বড়াল এর উৎপত্তিস্থল।

রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনায় মিশেছে পাবনার বেড়া উপজেলার কাছে। বড়াল হচ্ছে চলন বিলের প্রধান নদী। বড় থেকে বড়াল শব্দটির উৎপত্তি। এই এলাকার সবচেয়ে বড় নদী হেতু এই নামকরণ করা হয়েছে। বড়ালকে ‘বড়হর’ অর্থাৎ পদ্মার বড় হাওরও বলা হয়ে থাকে।


 পদ্মা এবং যমুনার পানি যখন বাড়ে বা কমে বড়াল নদী হয়ে সেই পানি প্রবেশ করে চলন বিলে। এতে বিল চালু থাকে। সে কারণেই বিলটির নাম ‘চলন’। এই বিলের পানি সর্বদাই চলমান। চলনবিলের অভ্যন্তরে শত শত ছোট-বড় বিল ও খাল রয়েছে। এসব খাল প্রাকৃতিক। আবার বিল থেকেও ছোট নদীর উৎপত্তি হয়েছে। নদী থেকে খালও হয়েছে। এক কথায় বলা যায় চলন বিল হচ্ছে অসংখ্য ¯্রােতের জাল।

আর এই জালের প্রধান সূত্র হচ্ছে বড়াল নদী। এ নদী থেকে আরও ৯টি নদীর উৎপত্তি হয়েছে। সেগুলো থেকে সৃষ্টি হয়েছে আরও প্রায় শতাধিক নালা বা খাল। বড়াল নদীতে পানি প্রবাহ না থাকার কারণে মরে গেছে ছোট ছোট নদী, খাল ও চলনবিল। বড়াল মৃতপ্রায় তাই দেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনে এখন শুকনা মৌসুমে পানি থাকে না। সে কারণে মাছের ভান্ডারও এখন প্রায় শূন্য।


বড়ালকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। রাজশাহীর চারঘাট থেকে জন্ম নিয়ে নদীটি নাটোরের গুরুদাসপুরের কাছে আত্রাই নদীর সাথে মিলেছে। এই অংশকে বড়াল আপার বলা হয়। এই অংশের দৈর্ঘ্য ৮৪ কিলোমিটার। আর বড়াইগ্রামের আটঘড়ি থেকে বেরিয়ে বনপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, সাঁথিয়া হয়ে শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ি ঘাটের কাছে হুরা সাগর নদী হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে, এই অংশ লোয়ার বড়াল। আপার বড়াল এর দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। গড়  প্রস্থ ১২০ মিটার, গড় গভীরতা ৯ দশমিক ৯০ মিটার। ৭৭২ বর্গমিটার হচ্ছে নদীটির অববাহিকা।

 লোয়ার বড়াল এর গড় প্রস্থ ৬০ মিটার, গভীরতা ৫ মিটার ও অববাহিকা ৭৭০ বর্গ কিলোমিটার। মুসা খাঁ এবং নন্দকুঁজা বড়ালের দুটি শাখা নদী। মুসা খাঁ নদীর উৎপত্তি নাটোরের বাগাতিপাড়া হাপানিয়ায়। পাইকপাড়া গিয়ে মুসা খাঁ নদী থেকে উৎপত্তি হয়েছে নারোদ নদীর। এই নদীটি নন্দকুঁজা নদী হয়ে আত্রাই নদীতে মিশেছে। বড়াল এর আরও একটি প্রশাখা নাগর নদী।

 এই নদী তীরেই আত্রাই উপজেলার পতিসরের রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি। এই নদীকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে …।’ চলনবিলের মধ্য দিয়েই বড়াল-আত্রাই-নাগর নদী পথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর থেকে পতিসরে এবং পতিসর থেকে নাটোর যাতায়াত করতেন।

বড়াল এর আর একটি শাখা নন্দকুঁজার উৎপত্তি নাটোরের আটঘড়ি থেকে। নদীটি নাটোর হয়ে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈর নামক স্থানে আত্রাই নদীর সঙ্গে  মিশেছে। নন্দকুঁজা এবং আত্রাই এর মিলন স্থল থেকে গুমানী নাম ধারণ করে চাটমোহরের নুন নগরে এসে বড়ালে মিশে আবার বড়াল নামেই বাঘাবাড়ি চলে গেছে।

সেখানে করতোয়া,  হুরাসাগর এবং বড়াল মিশে অগ্রসর হয়েছে যমুনায়। বড়াল নদীর এই দুরাবস্থার জন্য দায়ী কে? এক কথায় এলাকাবাসী বা বড়াল পাড়ের মানুষজন বলে থাকেন এর জন্য দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী, পানি ও বন্যা বিষয়ক কিছু ভুল নীতি।

 
পানি উন্নয়ন বোর্ড পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছিল বন্যা প্রশমন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ধারণা। এর মূল হচ্ছে বেগবান নদীকে বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ আটকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। এই পদ্ধতিকে বলা হয় অবরোধ পন্থা বা ‘কর্ডন এপ্রোচ’। আধুনিক ধারণা তার উল্টো। তাতে বলা হচ্ছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়, প্রয়োজনও নেই।

সামগ্রিক বিচারে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে কোন লাভ নেই। বাঁধ বসিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পানি প্রবেশ রোধ করা যায়। তবে সেই বদ্ধ বা বিতাড়িত পানি নিকটবর্তী বা দূরবর্তী অন্য কোন স্থানে নদীর পাড় ভাঙবে বা আরেক এলাকা প্লাবিত করবে। নতুন এলাকায় বন্যার সূত্রপাত করবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয় না, স্থানান্তর হয় মাত্র।


বড়ালের স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই এলাকার প্রসিদ্ধ নদী বন্দর সমূহ মরে গেছে। চারঘাট, পুঠিয়া, বাগাতিপাড়া, দয়ারামপুর ক্যান্টনমেন্ট, বড়াইগ্রাম, বনপাড়া, রামনগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, মির্জাপুর, জোনাইল, বাঘা, ডেমড়া, সিলন্দা ইত্যাদি নদী বন্দর এখন মৃতপ্রায়।


এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়াল বেসিন ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায়  ১৯৮৫ সালে চারঘাটে বড়াল নদীর উৎস্য মুখে নির্মান করে ক্লোজার বা তিন দরজা বিশিষ্ট স্লইস গেইট। পদ্মা নদী থেকে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া বড়াল নদী’র স্বাভাবিক গতিপথ বন্ধ করা হয় ১৯৯৫-৯৬ সালে নাটোরের আটঘড়ি নামক স্থানে আরও একটি পাঁচ দরজা বিশিষ্ট স্লুইস গেইট নির্মান করে। এই গেইটটি নির্মান করার ফলে দক্ষিণ দিকের অংশে পানি থাকলেও উত্তরের অংশে পানি চলাচল একবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এখানেই বড়াল দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে।

 এক ভাগ নন্দকুঁজা এবং অপর ভাগ বড়াল। এখানেই বড়ালের মুখে নির্মাণ করা হয় এক দরজা বিশিষ্ট একটি স্লুইস গেইট। একদিকে বড়ালের উৎস্যমুখে চারঘাটে স্লুইস গেইট, অন্যদিকে দীর্ঘদিন এত বড় একটি নদীর মুখে এক দরজার একটি স্লুইস গেইট নির্মাণ করায় বনপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় নদী অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

নদীর ভাটিতে বড়াল নদীর উপর তৃতীয় ও চতুর্থ স্লুইস গেইট নির্মান করা হয় ভাঙ্গুরা এবং চাটমোহরের দহপাড়ার নিকটে। দহপাড়ার নিকটবর্তী স্লুইস গেইটটির উভয় পার্শ্বই শুকিয়ে যায় শুকনো মৌসুমে। যেহেতু নদীটিকে এভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। অতএব এর পর যা হওয়ার তাই হয়েছে। যে যেখানে যতটুকু পারে নদী দখল করেছে। নদীর মধ্যে ঘর-বাড়ি, দোকান-গুদাম উঠিয়েছে। নদীর মধ্যে চাষাবাদ করা হচ্ছে। কোন কোন এলাকায় নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে নদীর পানি চলাচল বন্ধ করে দিয়ে মাছ চাষ করছে।


বড়াল অববাহিকার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আশি’র দশক পর্যন্ত বড়াল ছিল স্থানীয় যোগাযোগ ও বাণিজ্যের চালিকাশক্তি তেমনি ছিল সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। এই অঞ্চলের শতকরা নব্বইভাগ অধিবাসীই ছিল বড়াল নদীর উপর নির্ভরশীল। চারঘাটে স্লুইস গেইট নির্মাণ করার ফলে নদী সংকুচিত হতে থাকে, পানি প্রবাহ হ্রাস পায়। এর ফলে পরিবর্তিত হতে থাকে পরিবেশ ও বড়াল পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা।

বড়াল অববাহিকার অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য ও গবাদীপশুসম্পদ নির্ভর। ধান, চাল, মসুর, খেসারী, সরিষা, মাস কালাই, পাট প্রভৃতি উৎপাদনের জন্য বড়াল অববাহিকার সুখ্যাতি ছিল। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলা হয় ভুষালী ফসল। নৌপথে বড়াল পাড়ের ফসল যেতো চাঁদপুর, চট্টগাম, ঢাকা, নারয়নগঞ্জ ও খুলনায়।


আশির দশকের শুরুর দিকেও বড় বড় পণ্যবাহী নৌকা, বার্জ, কার্গোতে পণ্য সামগ্রী আনা-নেয়া হতো বড়াল নদী পথে। চলতো বড় বড় লঞ্চ ও স্টিমার। আমরা ছোট সময়ে ষাটের দশক ও সত্তরের দশকে স্টিমার ও লঞ্চে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করতাম। যখন লঞ্চ-স্টিমার ও কার্গো যাতায়াত করতো তখন আমরা বড়াল পাড়ে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ে পা ভেজাতাম। পানির  ঢেউয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসতো মাছ। আমরা মাছ ধরতে হুমড়ি খেয়ে পড়তাম। বড়াল নদীর ইলিশ মাছ, পাবদা, চিংড়ি, চিতল, আইড় ও বোয়াল মাছের স্বাদই ছিল আলাদা।

 প্রচুর শিশুক ছিল বড়ালে। জেলেরা বড় বড় জাল ফেলে নৌকায় মাছ ধরতো। ¯্রােতস্বীনি বড়ালকে গলা টিপে হত্যা করতে দেখলাম আমরাই। চারঘাটে  স্লুইস গেইট নির্মাণ করার পর পানি প্রবাহ কমে গেল। পদ্মার পানি বড়ালে আসা বন্ধ হলো। বন্ধ হলো যমুনার পানি বাড়ার সময় পানির চলাচল। নদী পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। সেচ সুবিধা কমেছে। বড়ালের মৃতপ্রায় অবস্থার জন্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই এলাকার শতকরা পঁচানব্বই ভাগ মানুষ। বড়ালের সঙ্কোচন জনজীবনে নিয়ে এসেছে অস্বস্তি, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর্থিক, সামজিক ও পরিবেশগতভাবে।


বড়ালে যখন পানি প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক তখন শুকনা মৌসুমে নদী তীরের জমিতে নদীর পানি পাওয়ার পাম্প দ্বারা সেচ দেয়া হতো। নালা বা খালে পানির প্রবাহ ছিল। তাতে বিলের অভ্যন্তরের জমিতেও সেচ দেয়া যেতো। নদীতে ক্লোজার নির্মাণ করার পর পানি না থাকায় সেচ হয়েছে শ্যালো বা ডিপ মেশিন নির্ভর। বড়াল নদী অববাহিকায় এখন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে। 

নদী মরে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিশাল চলনবিলে। চলনবিলের প্রসিদ্ধ মৎস্য সম্পদ হ্রাস পেয়েছে। হাঁস পালন কমেছে। বিশাল গবাদী পশুর চারণভূমিতে আগের মতো মাসকালাই ও খেসারী ঘাস জন্মে না। তাতে গবাদীপশু সম্পদ মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শুকনো মৌসুমে বড়ালে পানি প্রবাহ না থাকায় বিল শুকিয়ে যায়। বিলে পানির সঙ্কট দেখা দেয়। চাষী ও মৎস্যজীবীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। জেলে সম্প্রদায় এখন বিলুপ্ত প্রায়। উত্তরাঞ্চলের মৎস্য ভান্ডার হিসাবে পরিচিত চলন বিলে ৭০ থেকে ৭৫ প্রকার মাছ পাওয়া যেতো। এখন তার অনেক প্রজাতিই বিলুপ্ত প্রায়।


স্লুইস গেইট সমূহ অপসারণ করার দাবি উঠেছে বহু বছর আগেই। কার কথা কে শোনে। এখন এই দাবি জোরালো হচ্ছে। বনপাড়া বাইপাস সড়ক ব্রিজ, বনপাড়া বাজার ব্রিজ, কৈলার খালিয়া ব্রিজ, তিরোইল ব্রিজ, আগ্রান ব্রিজসহ ছোট-বড় সকল ব্রিজ ও কালভার্ট অপসারণ করা হলেই কেবল বড়াল নদী আবার চলাচলের উপযোগী হবে। ভূমি মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি আ ক ম মোজাম্মল হককে চেয়ারম্যান করে ২০০০ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়। ৬ দফার একটি প্রতিবেদন দাখিল করে উক্ত টাক্সফোর্স।

 প্রতিবেদনটি দাখিল করাও হয় কিন্তু বিষয়টি ঝুলে থাকে দীর্ঘদিন। এর পর বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠন ‘বেলা’ বড়াল নদী রক্ষা করার জন্য উল্লিখিত প্রতিবন্ধকতা সমূহ দূর করার জন্য উচ্চ আদালতে (হাই কোর্টে) একটি মামলা দায়ের করে। উচ্চ আদালত ২০১৪ সালে এক রায়ে বড়াল নদীর সকল প্রতিবন্ধকতা মুক্ত করার জন্য সরকারকে আদেশ প্রদান করে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান আতাহারুল ইসলাম কয়েক দফা বড়াল নদী এলাকা পরিদর্শন করেছেন। নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাগণ বড়াল নদী দখল মুক্ত করার জন্য রাজশাহী, পাবনাসহ ঢাকায় কয়েক দফা মিটিং করেছেন।


ইতোমধ্যেই চাটমোহর, ভাঙ্গুরা এলাকার আঁড়াআঁড়ি কয়েকটি বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম (রাজশাহী-৬) বড়াল নদী রক্ষার জন্য সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন (পাবনা-৩) বড়াল নদীর সকল জলকর লিজ বাতিল করার দাবি জানান। এছাড়া তিনি সকল ক্রস বাঁধ, স্লুইস গেইট ও কালভার্ট অপসারণের দাবি করেছেন। সংসদ সদস্য অধ্যাপক আব্দুল কদ্দুসসহ (নাটোর-৪) অত্রাঞ্চলের সকল সংসদ সদস্য বড়াল নদী উদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে ডি ও লেটার দিয়েছেন।


অতিসম্প্রতি রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এর জেলা প্রশাসকদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বড়াল নদীর উৎস্য মুখ চারঘাটে  নদীর বেসিনে খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন বর্ষা মৌসুমে স্লুইস গেইট খুলে দেয়ার দাবি উঠেছে। সভায় আগামী বছরের মধ্যে (২০১৮ খ্রি.) বড়াল নদীর সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

সমস্যা হচ্ছে সরষের মধ্যেই ভূত। বনপাড়া ভূমি রাজস্ব অফিস বড়াল নদীর মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর জমি দখল করে করা হয়েছে হাউজিং সোসাইটি। মজে যাওয়া নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা এভাবে দখল করে পাকাপাকিভাবে যারা বসে আছেন তারা নানা কায়দায় তা দখলে রাখার জন্য তদবির করছে।

সি এস রেকর্ড অনুসরণ করে বড়ালের বেদখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারের দাবি করেছে বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।আমরা উচ্চ আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন আশা করি। এই রায় বাস্তবায়ন হলে একটি নদী বাঁচবে। সেই সাথে বাঁচবে উত্তর জনপদের বিশাল চলন বিল, এলাকার মানুষ, পরিবেশ ও জীবন।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

hrahman.swapon@gmail.com

০১৭১০-৮৬৪৭৩৩

 

ফুটো কলসি ভাসায় না, ডোবায়

আতাউর রহমান মিটন : হতাশার কথা লিখতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আড়ালই বা করি কিভাবে? গত শনিবারে জাপান থেকে দেশে ফিরেছি। বিমানবন্দরে নেমেই দেখতে শুরু করলাম অব্যবস্থাপনার মহোৎসব। রাস্তার যানজট পেরিয়ে পথে ‘হিজড়া’দের গাড়ি থামিয়ে টাকা দাবি করা এবং টাকা দিতে অস্বীকার করায় অকথ্য ভাষায় গালি শুনেও চুপ করে থাকার মত অসহায়ত্ব আমি কাকে প্রকাশ করব!

মনের দুঃখে কেবলই মনে হলো, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি …..’ গানটি খুবই যথার্থ কিন্তু উল্টো অর্থে। এত অরাজকতা, এত অব্যবস্থাপনা, দুর্বিনীতের এমন স্বর্গ রাজ্য আর কোথায় আছে তা আমার জানা নেই। কোথায় জাপান আর কোথায় বাংলাদেশ! অথচ দুটো দেশই অপার সম্ভাবনাময়। উভয়ের মধ্যেই অনেকগুলো অন্তঃমিল রয়েছে, ভাবতে অবাক লাগে তবু আমরা কত আলাদা!


গত সপ্তাহে দেশের পার্বত্য জেলাগুলিতে পাহাড় ধসের যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তা দেখেও বোঝা যায় কি চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে আমরা দিনাতিপাত করছি। পাহাড় ধসে মতান্তরে ১৫৬ জন মানুষ মারা গেলেও আমরা এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিশেষ কোন উদ্বেগ বা অসন্তোষ লক্ষ্য করিনি। বরং এটা নিয়ে আমরা পরস্পরকে দায়ী করার নোংরা রাজনৈতিক খেলা খেলতে দেখেছি।

মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এ ধরনের দুর্ঘটনা যাতে আবারও না ঘটে তার জন্য করণীয় নির্ধারণে পরস্পরের সহযোগিতা চাওয়ার চাইতে আমরা অনেক বেশি পরস্পরকে দায়ী করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটায় ব্যস্ত। এভাবেই রাজনীতির খেলায় পাহাড়ের অসহায় সাধারণ মানুষদের মত আমাদের জীবনও পিষ্ট হয়ে যায়, অবহেলায়, অব্যবস্থাপনায়।


ভাবছি ঈদে বগুড়ায় যাব, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ঈদ করার জন্য। এখনও টিকেট জোগাড় হয়নি। সেখানেও অব্যবস্থাপনা চরম। মানুষের চাহিদার সাথে সমন্বয় রেখে পরিবহন সংস্থাগুলো আসন সরবরাহ করছে না। কাউন্টারে টিকেট শেষ কিন্তু কালোবাজারে তিন-চারগুণ বেশি দামে টিকেট পাওয়া যায়।  বেশি টাকা দিয়ে টিকেট কাটতেও কোন সমস্যা ছিল না কিন্তু প্রশ্ন হলো রাস্তার যানজট নিয়ে।

ঢাকা-বগুড়া মাত্র চার ঘন্টার রাস্তা অথচ ১২ ঘন্টাতেও পৌঁছানো সম্ভব কিনা সেটা ভেবে উদ্বিগ্ন বোধ করছি। যে সকল যাত্রী পরিবারসহ ভ্রমণ করবেন তাদের ভোগান্তি আরও মর্মান্তিক। একে তো সময়মত বাস ছাড়বে না, অন্যদিকে বাস কখন তার গন্তব্যে পৌঁছাবে সেটা কেউ জানে না।

 পথে প্র¯্রাব-পায়খানা ইত্যাদি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক মহাসংকট। ঈদের আনন্দ চুপসে যাওয়ার যোগাড় ভোগান্তির যাতাকলে! অথচ বগুড়াবাসী দীর্ঘদিন থেকে দাবি করে আসছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সরাসরি ট্রেন লাইন চালু করার। এই রুট চালু হলে খুব সহজেই বগুড়ার যাত্রীরা যমুনা সেতু হয়ে ঢাকার সাথে যোগাযোগ করতে পারত।

সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে কোন কার্যকর পদক্ষেপ বগুড়াবাসী আজও দেখেনি। আমাদের বঞ্চনার যেন কোন শেষ নেই! সরকারের চরম উদাসীনতায় বগুড়া এখন যেন এক অবহেলিত জনপদ। শুধু বগুড়া নয়, গোটা উত্তরবঙ্গকেই বঞ্চিত করার একটা প্রচেষ্টা সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় দেখা যায়।

 
মহান জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন চলছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ বাজেটটি নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রবল বিরোধিতা করছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী কি করবেন তা ভেবে আমরা উদ্বিগ্ন বোধ করছি। কারণটা সরকারের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেই স্পষ্ট। সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন, ‘আপনার দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। এই সংসদের ৩৫০ জন জনগণের প্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না।’

 আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ স¤পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘অর্থমন্ত্রী কী কারণে, কার স্বার্থে ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক করেছেন, জানা নেই।’ তিনি বলেন, ‘হলমার্কের চার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এ টাকা কিছু নয়। তাহলে কেন সামান্য টাকার জন্য সারা দেশে মানুষের মধ্যে আক্ষেপ তৈরি করলেন?’ তিনি আরও বলেছেন, ‘অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আরোপ করেছেন গণহারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বছরে ৩০ শতাংশ বাড়তি ভ্যাট আহরণের নজির নেই। এটা যৌক্তিক নয়।’


আমার মনে হয় সরকারি দলের শীর্ষ নেতারা যে ভাষায় বর্তমান বাজেট প্রস্তাবনার সমালোচনা করছেন তা মোট সমালোচনার মাত্র ১০%। মাঠ পর্যায়ে দলের কর্মীদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় তাদের ক্ষোভ আরও বেশি। কারণ অর্থমন্ত্রী আগামীতে নির্বাচন করবেন কিনা তা নিশ্চিত না হলেও সারাদেশে যারা আগামী নির্বাচনে অংশ নিবেন তাদের জন্য এই বাজেট এর গুরুত্ব অপরিসীম।

এই বাজেট যদি জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয় তাহলে আগামী নির্বাচনে সেটা একটা বড় ইস্যুতে পরিণত হবে। সরকার জনগণের উপর করের বোঝা বাড়িয়ে দিয়ে অনেক টাকা সংগ্রহ করে সেই টাকা কোথায় খরচ করার চিন্তা করছে সেটা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


 যেমন ধরুন সরকার বেসিক ব্যাংককে এক হাজার কোটি টাকা মূলধন দিচ্ছে কিন্তু প্রশ্ন হলো কার টাকা কাকে দেয়া হচ্ছে, কেন দেয়া হচ্ছে? ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে কেউ যদি লোকসান দেয় তাহলে জনগণ তার দায় নেবে কেন? সরকার সঞ্চয়পত্রে লাভের হার কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যাংকে সঞ্চয়ের উপর লাভ কমিয়ে দিচ্ছে আবার অন্যদিকে জমা টাকার উপর আবগারী শুল্ক বসিয়ে মূলতঃ জনগণকে ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বা সঞ্চয় করাকে নিরুৎসাহিত করছে। এতে করে লাভবান হবে কে? সরকার জনগণের স্বার্থে এবারের বাজেট প্রস্তাবনাটি পুনর্বিবেচনা করবেন নাকি একগুয়েমি মনোভাব নিয়ে জনগণের উপর জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসবে সেটা আমাদের দেখতে হবে।


ট্যাক্স বা কর দেয়াটা নাগরিকের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব। আমরা টাকা না দিলে সরকার সেবা দিবে কিভাবে? কিন্তু এই প্রশ্নটা কি করা উচিত নয় যে আমরা নাগরিকেরা যে টাকাটা সরকারকে দিচ্ছি তার বিনিময়ে সরকার আমাদের কতখানি সেবা দিচ্ছে। বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা একটি গোষ্ঠীকে হয়তো বিব্রত করে কিন্তু দেশের ভেতরে স্বাস্থ্যখাতে যখন আমরা টাকার অভাবে উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হই তখন কি আমাদের মনে এই প্রশ্ন জাগবে না যে, আমাদের টাকা যাচ্ছে কোথায়? রাস্তার মোড়ে হিজড়া নামক একটা বিশেষ সম্প্রদায় যখন জোর করে, মানুষকে কার্যতঃ বিব্রত করে প্রকাশ্যে টাকা দাবি করে তখন সেখানে কর্মরত পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাক-নীরব থাকে কেন? তাহলে কি তারাও এই টাকার ভাগ নেন?  


পাহাড় ধসে অসহায় মানুষগুলো যখন প্রাণ হারায় তখন তার দায় কেউ নেয় না কেন? সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য তাহলে কোথায়? এটা তো শুধু এবারই প্রথম নয়, একের পর এক নানা স্থানে নানা ভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। বেড়ে যাচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। আমরা জনগণ যদি জীবনের নিরাপত্তা, ভালভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা না পাই তাহলে আমরা ‘কর’ দেব কেন?

একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে আগামীর নির্বাচনে এই জনগণের রায় নিয়েই ক্ষমতায় ফিরতে হবে। কোন শর্টকাট বা বিকল্প পন্থায় সেটা সম্ভব হবে না। জনগণ খুব নীরব থাকলেও সে ভোটের সময় ঠিকই ক্ষমতাসীনদের অতীত কৃতকর্মকে বিবেচনায় নিবে।


মানুষ মানবিক কাজ বা পদক্ষেপগুলোকে মনে রাখে। সরকারের বড় বড় কাজের চাইতে যে পদক্ষেপগুলো মানুষের চলার পথকে সহজ করে তা তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই এখনও তৃণমূলে উন্নয়ন বললে মানুষ প্রথমেই রাস্তা পাকা করা, বিদ্যুৎ সংযোগ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদিকে অগ্রগণ্য বিবেচনা করে। আমরা যেন নিজেদেরকে স্বতন্ত্র, ক্ষুদ্র হিসেবে মনে না করি।

 

কোন এক বিশেষ এলাকার উন্নয়ন দিয়ে সারা দেশের মানুষের মন জয় করা সম্ভব হবে না। জনগণের কল্যাণকে সরকারের কাজের আদর্শ হিসেবে গণ্য করে সারা দেশে সমানভাবে উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করাটাই সকলের কাম্য। জনগণের কল্যাণ করার ব্রতই একটি রাজনৈতিক দলের বল বা প্রধান শক্তি। একজন রাজনৈতিক নেতা সরকারের কাজে গোঁজামিল দিতে পারেন না। তিনি জনগণের সুবিধা অসুবিধাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজের একগুয়েমি আঁকড়ে ধরে ছেলেখেলা করতে পারেন না।


জনগণকে ফাঁকি দেওয়ার বাসনা থেকে দূরে থাকাটাই সত্যিকারের জনদরদী সরকারের কাম্য হওয়া উচিত। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে আড়াল কিছু সময়ের জন্য করা সম্ভব হলেও কারো পক্ষেই সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দেয়া সম্ভব নয়। জনগণকে ক্রমাগত ফাঁকি দিতে থাকলে এক সময় নিজেকেই নিজের কর্মের কাছে পরাজিত হতে হয়। জনগণ চোখ বুঁজে মিথ্যার কাছে নিজেকে সঁপে দিবে না।

 

ক্ষমতার কাছে হার মানা পশুদের ধর্ম হলেও মানুষের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। মানুষ অন্যায় ক্ষমতাকে বারে বারে হার মানিয়েছে। সত্যের জয় হয়েছে। স্বার্থপরতা হয়তো মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কিন্তু সেটাই একমাত্র সত্য নয়, বরং বৃহত্তরের কল্যাণে মানুষ সব সময় সংঘবদ্ধ হয়েছে, পরস্পরকে সহায়তা করেছে। জনগণ যদি শেষ পর্যন্ত সরকারের উপরে আস্থা হারায় তাহলে সে পরিবর্তনের জন্য সংঘবদ্ধ হবেই।


সামনে ঈদ। চারিদিকে এখন ঈদের কেনাকাটার ধুম শুরু হয়েছে। হাওর অঞ্চলের মানুষ, পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড় ধ্বসের শিকার নিরীহ মানুষেরা এবার ঈদে হয়তো মনের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারবে না। একই দেশ, একই সমাজ অথচ কি বিরাট বৈষম্য! মানুষের বল মনুষ্যত্বে।

 

সরকারের বল জনসমর্থনে। সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধির যে কাঠামো বিদ্যমান তাতে কাঁচি চালিয়ে অবদমিত করতে না পারলে সমাজে স্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কলসি যত বড়োই হউক না, সামান্য ফুটা হইলেই তাহার দ্বারা আর কোনো কাজ পাওয়া যায় না। তখন যে তোমাকে ভাসাইয়া রাখে সেই তোমাকে ডুবায়।’ কথাটার তাৎপর্য সংশ্লিষ্টরা মনে রাখবেন আশা রাখি।


কুঁয়োর পানি তীব্র খরায় শুকিয়ে যায়। কিন্তু প্রবাহমান নদী শুকায় না। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য, সবুজ ফসলের জন্য তাই কূয়া নয়, নদীই ভরসা। অনেক সময় ক্ষমতার দম্ভে কারো কারো বিবেচনা, বিচার সক্ষমতা লোপ পায়। তাদের কাজগুলো তখন আর ধ্রুবতারার মত দীপ্তিময় থাকে না। যে কূপে তৃষ্ণা নিবারণ হয় না, তা টিকিয়ে রাখারও কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। প্রবাহমান নদীই সেখানে ভরসা।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘কিন্তু যেখানে চিরনিঃসৃত নদী প্রবাহিত সেখানে যে কেবলমাত্র তৃষা নিবারণের কারণ বর্তমান তাহা নহে, সেখানে সেই নদী হইতে স্বাস্থ্যজনক বায়ু বহে, দেশের মলিনতা অবিশ্রাম ধৌত হইয়া যায়, ক্ষেত্র শস্যে পরিপূর্ণ হয়, দেশের মুখশ্রীতে সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে।’ কথাগুলো মনে রেখে সকলকে ঈদের অগ্রীম প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করছি। ঈদ মোবারক!
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

পবিত্র লাইলাতুল ক্কদরের তাৎপর্য

মোঃ আব্দুস সাত্তার খন্দকার: আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ২৭ পারা সুরা জারিয়াত আয়াত নং-৫৬, আল্লাহ এরশাদ করেছেন- ‘‘আমি মানুষ ও জীন জাতিকে সৃষ্টি করেছি আমার এবাদত করার জন্য।” ইবাদতের শব্দগত অর্থ- দাসত্ব বা বাধ্যানুগত। ইবাদতের মর্ম কথা হলো- মানুষ দুনিয়াতে এসে এবং জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর জীবনের চলার পথে যেমন- শিক্ষা, চাকুরী, কৃষি ও ব্যবসাসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন যাপন করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্ তায়ালা মানুষের পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা দিয়েছেন- যেমন- পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা এবং ব্যবসা বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ মানুষের জীবন জীবিকার পূর্ণ ও পরিষ্কার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। যা আমাদের অবশ্যই পালন করা কর্তব্য।


‘‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ্’র নিকট একমাত্র মনোনিত ধর্ম ইসলাম’’, ‘‘পবিত্র কোরআনে পারা-৩, সুরা- আল এমরান, আয়াত-১৯’’। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ যেমন- কালেমা, নামাজ, রোযা, হজ¦ ও যাকাত এইগুলি যথাযথভাবে পালন করতঃ দান-খয়রাত ও মানবসেবা ইত্যাদি ভাল কাজগুলি সুষ্ঠুভাবে পালন করা অর্থাৎ আল্লাহ্র  আদেশ এবং রসুল (সা.) এর নির্দেশিত পথে সকলকে সর্বদায় চলতে হবে।

আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে রুজীর অনুসন্ধান করতে হবে।  পবিত্র কোরআনের ‘‘পারা-২৮, সুরা-জুমু’আ আয়াত-১০’’, আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘‘অনন্তর নামাজ শেষ হওয়ার পরই তোমরা জমিনের উপর (যার যার কর্মক্ষেত্র) ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথে রুজির সন্ধান কর আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করিতে থাক, যেন তোমরা সফলতা লাভ কর।


আল্লাহর আদেশ এবং রসুল (স.) নির্দেশ অনুযায়ী জীবনের সকল কর্ম পরিচালনা করাই ইসলামের বিধান এবং তাহাই আল্লাহর ইবাদত।এরশাদ হচ্ছে ‘‘তোমাদের উপর রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। আশা যদি তোমরা মুত্ত্বাকী হইবে’’। ‘‘পবিত্র কোরআন পারা-২, সুরা বাকারা আয়াত-১৮৩’’। রমজান মাসে একটি সওয়াবের কাজ করিলে অন্য মাসের চেয়ে ৭০০গুণ পর্যন্ত সওয়াব বৃদ্ধি হতে পারে। রমজান মাসে জান্নাতের সকল দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।


 আর রমজান মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। (আল হাদিস) অন্য সকল কাজের সাওয়াব ফেরেস্তাদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট পৌঁছে, আর রোযার সওয়াব আল্লাহ নিজে বান্দাদের প্রদান করবেন। (আল হাদিস) ইবাদত মানে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ নিষেধ অনুসারে ও রসুল (স.) এর নির্দেশিত পথে দুনিয়ার সকল কাজ সম্পাদন করা।

আমরা দুনিয়াতে এসে জীবন চলার পথে আল্লাহর আদেশ ভুলে গিয়া গুনাহর কাজের লিপ্ত হতে থাকি। তাই দয়াময় গফুরুর রহিম আল্লাহ  তায়ালা বৎসরে বিভিন্ন মাস দিন, রাত ও সময় বান্দার গুনাহ বেশি বেশি মাফ করার জন্য নির্ধারণ করেছেন যেমন- রমজান মাস ও লাইলাতুল ক্বদর, বা সম্মানের রাত্রি উল্লেখযোগ্য। মহা পবিত্র মাহে রমজান মাস গুনাহ মাফের একটি সর্বশ্রেষ্ঠ মাস এবং পবিত্র রজনী লাইলাতুল ক্বদর বা সম্মানের রাত্রি। ইবাদতের অর্থই- জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ নির্দেশ মেনে সকল কার্য্য সম্পাদন করা।


 কিন্তু মানুষ দুনিয়াতে এসে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে অপরাধ বা গুনাহ করে থাকে। তাই আল্লাহ গফুরুর রহিম মানুষের সব গুনাহ মাফের জন্য বান্দাদের বিশেষ সুযোগ দান করেছেন: যেমন- লাইলাতুল ক্বদর উল্লেখযোগ্য।  লাইলাতুল ক্বদরের অর্থ- সম্মানের রাত্রি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র ‘‘কোরআনের ৩০ পারা সূরা ক্বদর প্রথম আয়াতে বলেছেন- ‘‘নিশ্চয় আমি ক্বদরের রাত্রি কোরআন নাযিল করিয়াছি”। ২নং আয়াতে বলেছেন- ‘‘আপনি জানেন কি! ক্বদরের রাত্রি কি”? ৩নং আয়াতে বলেছেন- ‘‘লাইতুল ক্বদর হাজার মাসের (৮৩ বছর ৪ মাস) এবাদতের চেয়েও উত্তম”। আমাদের সমাজের মানুষের গড় আয়ু ৬০-৭০ বসর। যে মানুষ জীবনে একবার লাইতুল ক্বদরের সন্ধান পাইল তবে সে কত সৌভাগ্যবান। সেটা চিন্তা করে শেষ করা যায় না।


হাদিসে এসেছে- রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন- ‘‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইতুল ক্বদরের সন্ধান কর”। রসুলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন- ‘‘যে ব্যক্তি লাইতুল ক্বদরের সন্ধান করলো না এবং সেই রাত্রি জেগে ইবাদত করলো না সে ব্যক্তি খুবই হতভাগা”। (ইবনে মাজা-১৩১৭)রসুলুল্লাহ (স.) অন্য হাদিসে বলেছেন- ‘‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রি জেগে ইবাদত করলো আল্লাহ তায়ালা তার সারা জীবনের গুনাহ মাফ করে দিবেন’’, সোবহানাল্লাহ। (বোখারী-২০৫৩) আসুন আমরা লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রি সন্ধান করি এবং সেই মহিমান্বিত পবিত্র রাত্রিতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগী করে নিজের পরিবারসহ সকলের জন্য দোওয়া করি, আল্লাহ আমাদেরকে মাফ করুন- আমিন।
লেখক ঃ সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জড়া বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান
বগুড়া জেলা শাখা।
০১৭১২-৬৮৩৬৩৬

ঈদ চাঁদাবাজি বন্ধ হোক

মীর আব্দুল আলীম : ১২ জুনের ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা ছেপেছে “ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য”। প্রতিবছরই ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একশ্রেণির চাঁদাবাজ।

এ দৌড়ে এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যও পিছিয়ে নেই। ঈদ বকশিশের নামে সড়ক-মহাসড়ক, বাস টার্মিনালে চালানো হচ্ছে চাঁদাবাজি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উপার্জন, নিরীহদের আটক করে মারধর, ভয়ভীতি দেখিয়ে উৎকোচ আদায়, অর্থের বিনিময়ে অপরাধী ছেড়ে দেওয়া ছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের মতো কর্মকা  চলছে।


চাঁদাবাজরা কিন্তু গর্তে লুকিয়ে থেকে চাঁদাবাজি করছে না! প্রকাশ্যেই চলছে তাদের এমন তৎপরতা। তাহলে কেন তাদের নির্মূল করা যাচ্ছে না? সরকার ধরে ধরে রাজাকার ও জঙ্গি নির্মূল করতে পারলে চাঁদাবাজদের বেলায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? জঙ্গি নির্মূল অসাধ্য মনে হলেও সরকার এ কাজে সফল হয়েছে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা তো আত্মগোপনে নেই! তাছাড়া পুলিশের কর্মকান্ড তো চলে অনেকটা প্রকাশ্যে। প্রকাশ্যে থাকার পরও তাদের দমনে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।


ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মিদের ইন্ধনে দেশের ফুটপাতগুলোয়ও এখন চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ঈদ বকশিশের নামে এখন দ্বিগুণ করা হয়েছে চাঁদার হার। ফুটপাত থেকে পুলিশের লাগাতার চাঁদাবাজির প্রতিবাদে অতীত নিকটে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষোভ মিছিল করেও ব্যবসায়ীরা সুফল পাচ্ছে না। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম পত্রিকাকে জানান, ঈদ উপলক্ষে রোজার শুরু থেকেই ডাবল নেওয়া শুরু হয়েছে হকারদের কাছ থেকে। কিছু পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নামে দ্বিগুণ করা হয়েছে চাঁদার হার। এই দৌরাত্ম্য সারা দেশেই চলছে।  


ঈদ বাণিজ্যের নামে হয়রানির কারণে মহাভোগান্তিতে আছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। শুধু আঞ্চলিক সড়ক নয়, মহাসড়কেও প্রকাশ্যে চলছে চাঁদাবাজি। চাওয়া মাত্রই টাকা না দিলে ভেঙে ফেলা হচ্ছে যানবাহনের লুকিং গ্লাস, চালকদের শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। রাজধানী ঢাকার কাছে সোনারগাঁয়ের মেঘনা ব্রিজের টোলপ্লাজায় এক শ্রেণির পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলের লোকজন সম্মিলিত ভাবে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজির খবর পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে।


দেশের সড়ক, মহাসড়কে বাস ট্রাক প্রাইভেট কার থামিয়ে নানা অজুহাতে ব্যাপক চাঁদাবাজি হচ্ছে। অন্যদিকে কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ‘যানজট নিরসন প্রকল্পের’ নামে রসিদ দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলছে। এজন্য প্রবেশ পথে মোতায়েন করা হয় লাঠিয়াল বাহিনী। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে তাকে হয়রানি ও মারধর করা হচ্ছে।


গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চাঁদাবাজদের অধিকাংশেরই বড়ভাই, লাটভাই জাতীয় কোনো অভিভাবক আছে, যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে। এজন্যই কি চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা চাঁদা দাবি করে শাসানি, প্রাণনাশের হুমকি এবং সেইসঙ্গে ‘মৃত্যু পরোয়ানা’ হিসেবে কাফনের কাপড় পাঠানোর ভয়াবহ তৎপরতাও কখনো কখনো লক্ষ্য করা যায়।

 বস্তুত চাঁদাবাজি, বিশেষ করে ঈদের সময় চাঁদাবাজি হবে না, এদেশে তা স্বপ্নেরও অগোচর। ব্যবসায়ী তথা দেশবাসী যেন বিষয়টিকে তাদের নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছে। সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট দোকান মালিকরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।


ঈদকালীন চাঁদাবাজিতে চাঁদাবাজরা বরাবর সক্রিয় থাকলেও এবার যেন তারা অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, ফকিরাপুল, গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, নামকরা শীর্ষ সন্ত্রাসী, মৌসুমি চাঁদাবাজ, এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীরাই শুধু চাঁদা নিচ্ছে না। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঁদা আদায় করছে হিজড়ারা। শারীরিক অক্ষমতার অজুহাতে এরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে বাসাবাড়ি, যানবাহন ও ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র চাঁদাবাজির উৎসবে মেতে উঠেছে।


বছরের অন্যান্য সময় চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলেও ঈদ উপলক্ষে চাঁদাবাজরা এখন সত্যিই বেপরোয়া। ঈদ সামনে রেখে পরিবহন সেক্টরে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। এ সেক্টরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, চাঁদাবাজির ঘটনায় অনেক সময় এক শ্রেণির অসাধু পুলিশ জড়িত থাকায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছে না মানুষ।


ঈদ বকশিশের নামে বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মি ও পুলিশ বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ঘটনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে থানায় ডায়েরি ও মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নীরব থাকছেন। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, চাঁদাবাজদের সামাল দিতে গিয়ে তাদের এখন ত্রাহি মধূসুদন অবস্থা। জানা গেছে, এলাকার বড় বড় সন্ত্রাসীর নাম করে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে।

 অনেক  দাগি সন্ত্রাসী এলাকায় না থাকলেও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এলাকার কিছু মাস্তান রাজনৈতিক নেতার পরিচয়েও চাঁদাবাজি করছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য হল, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন শৃংখলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোথাও চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তাহলে কেন চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না? এ প্রশ্নের উত্তরই বা কী দেবেন তারা?

বস্তুত শুধু শুকনো কথায় চিঁড়া ভিজবে না। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎপাটন করে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে, চাঁদা দাবি করে কেউ ফোন করলেই যেন পুলিশে খবর দেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদেরও উচিত পুলিশকে সহযোগিতা করা। ঈদ চাঁদাবাজিসহ সাংবাৎসরিক চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধে আইন শৃংখলা বাহিনীর আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। কোন এলাকায় কোন চক্র চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে, তা পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়।

 এদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদ ছাড়াও অবিরাম চাঁদাবাজি চলে দেশে। অনেক সময় উপলক্ষ তৈরি করেও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় বিদেশে পলাতক কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করেও চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। এসব চাঁদাবাজের হুমকির মুখে অনেক ব্যবসায়ী আতংকে দিনাতিপাত করছেন। এ কথা ঠিক, আইনশৃংখলা বাহিনী, বিশেষত র‌্যাব সদস্যরা চাঁদাবাজদের মনে কিছুটা হলেও ভয় ঢুকাতে সক্ষম হয়েছে, যে কারণে সরাসরি চাঁদা চাওয়ায় ঘটনা আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। তার বদলে চলছে ফোনে চাঁদাবাজি।  


একটি সুস্থ সমাজ সর্বদাই আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। চাঁদাবাজি সুস্থ সমাজ কাঠামোয় বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত হলে চাঁদাবাজি কমে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। জোরপূর্বক কারও কাছ থেকে চাঁদা আদায় নিঃসন্দেহে অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দল ও সংস্থার নামেও চাঁদা আদায় করে থাকে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে এ ধরনের চাঁদাবাজি বেশি লক্ষ্য করা যায়। চাঁদা আদায় হয় হাট-বাজারে, ফেরিঘাটে, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালীর নামে।

 ঈদের সময় বাস ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। এর পেছনে সংশ্লিষ্টদের স্বেচ্ছাচারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি চাঁদাবাজরাও এজন্য দায়ী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এদেশে চাঁদা না দিয়ে কোনো ব্যবসা করা সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান পত্রিকায় জানা, কিছু পুলিশ সদস্য অসদুপায় অবলম্বন করে অর্থ উপার্জন করছেন বলে যে অভিযোগ উঠছে তার অন্যতম কারণ পুলিশের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং অস্বচ্ছতা।

 অপরাধ কমাতে হলে সবার আগে এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি এই তিন জায়গায় স্বচ্ছতা আনা সম্ভব না হলে প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতি কমবে না। সৎ কর্মকর্তাদের গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিকতার প্রভাবমুক্ত করতে হবে পুলিশ বাহিনীকে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়ীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হলে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশেই কমবে বলে আমরা মনে করি।


সর্বোপরি বলবো, ঈদকে সামনে রেখে সমাজে শান্তি-শৃংখলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীসহ অন্যান্য অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের পর প্রায়ই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সহজেই ছাড়া পায়। তাছাড়া জেল থেকে বের হয়ে চাঁদাবাজরা আরও সংহারী মূর্তি ধারণ করে। এমন যেন না হয়। আইন শৃংখলা বাহিনীর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। চাঁদাবাজদের দমনে আইনশৃংখলা বাহিনীর আন্তরিকতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও ভাবতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
 newsstore13@gmail.com
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা

ড. এম এ সবুর:শিক্ষাই জাতির প্রাণশক্তি। শিক্ষার মাধ্যমে জাতিসত্তার বিকাশ হয়। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি সুসংহত। আর জাতীয় উন্নয়নে ও সংস্কৃতির বিকাশে শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষা পাশবিক শক্তির বিনাশ করে মানবিক শক্তির বিকাশ ঘটায়। এ ছাড়া শিক্ষার মাধ্যমেই ব্যক্তির সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং সামষ্টিক চেতনার জাগরণ হয়। এজন্য শিক্ষাকে জাতীয় জাগরণ আর উন্নয়নের মূল ভিত্তি বলা যায়।

 দেশের জনশক্তিকে সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিমেয়। আর এসব গুণাবলী মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, নৈতিকভিত্তিক, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তিসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়।

তাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয় এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়। শিক্ষাখাতে কম বরাদ্দের কারণে শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা সম্ভব হয় না। আর এ সুযোগে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করছে। তারা কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন নামে শিক্ষার পসরা বসিয়ে আর চটকদার বক্তব্য-বিজ্ঞাপন দিয়ে মুনাফা লুটছে।

 এ ছাড়া তাদের শিক্ষা বাণিজ্যের কারণেই দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাক্ষেত্রের সকল পর্যায়ে বৈষম্য বাড়ছে। এতে দেশের গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষার যথাযথ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ কম মেধাসম্পন্ন বিত্তশালী শিক্ষার্থীরা টাকার জোরে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছেন। ফলে সমাজে শ্রেণী বৈষম্য বাড়ছে এবং দেশ ভয়াবহ মেধা সঙ্কটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন বিঘিœত হবে এবং নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে।


শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে অবশ্যই শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। অধিকন্তু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আর এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাতীয় বাজেটে যথার্থ পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ থাকতে হবে। কিন্তু জাতীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতার অজুহাতে গবেষণা ও প্রশিক্ষণসহ শিক্ষাখাতের  জরুরি চাহিদাতে অনেক কম বরাদ্দ দেয়া হয় আমাদের জাতীয় বাজেটে।

যা শিক্ষার মানোনন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দের কারণে সরকারি শিক্ষক-কর্মচারিদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত সরকারি চাকুরিজীবীদের থেকে কম আছে।

একই কারণে বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) শিক্ষকদেরকে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট), চিকিৎসা, বাড়ি ভাড়া, উৎসব ভাতার ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়েছে। অধিকন্তু নন-এমপিও অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষকতা করছেন! ফলে অনেক সময় শিক্ষকগণ বেতন-ভাতার দাবিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যস্ত থাকেন।

 

অন্যদিকে ছাত্রবেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদে এবং শিক্ষা উপকরণের দাম কমানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন করেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় দারুণ বিঘœ ঘটে। তাই শিক্ষাব্যবস্থা গতিশীল করতে সরকার শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করে বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষা উপকরণের দাম কমানোর জন্য সরকার ভর্তুকি দিতে পারে।


বিশ্বের সর্বোচ্চ শিক্ষা বিষয়ক সংগঠন ঊফঁপধঃরড়হ ঋড়ৎ অষষ (ঊঋঅ)-এর সুপারিশ এবং ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেক দেশকে শিক্ষাখাতে নিজ দেশের জিডিপি‘র কমপক্ষে ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এমনকি আফ্রিকার দরিদ্রপীড়িত কেনিয়া জাতীয় বাজেটের ৩১% এবং সেনেগাল ৪০% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ রাখে।

 

গত কয়েক বছর ধরে কিউবা জিডিপি’র ৯% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দিচ্ছে। অথচ শিক্ষাখাতে জিডিপি’র বরাদ্দের দিক দিয়ে বিশ্বের ১৬১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৫তম এবং জিডিপি‘র মাত্র ০২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৬৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৬.৪%।

 ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ এতো বিশাল পরিমাণের বরাদ্দ দেখে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ মনে হতে পারে। আসলে এর মধ্যে শুভঙ্করে ফাঁকি লুকিয়ে আছে। কারণ ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাতে শিক্ষামন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য মাত্র ১১.২৮% বরাদ্দ রাখা হয়েছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৪৫ হাজার ১৬৩ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে টাকার অঙ্কে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়লেও মোট বাজেটের আনুপাতিক হারে কমেছে।

 এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমছে। অর্থাৎ ২০১০-১১ অর্থবছরে মূল বাজেটের সর্বোচ্চ ১৬.৩% বরাদ্দের পর থেকে ক্রমাগতভাবে কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তবিত বাজেটে ১১.২৮% দাঁড়িয়েছে! অধিকন্তু শিক্ষাখাতে বরাদ্দের বেশির ভাগ অর্থ প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ, বৃত্তি-উপবৃত্তি ইত্যাদি খাতে ব্যয় হবে। আর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ-গবেষণা, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নমূলক খাতসমূহ উপেক্ষিতই থেকে যাবে। যাতে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা-সংগঠন প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।

 

আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষাখাতের বিনিয়োগে সরাসরি কোন লাভ আসে না। তাই অনেকেই শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পক্ষে থাকেন না। তারা শিক্ষাখাতকে অনুৎপাদনশীল মনে করেন। এজন্য তারা অন্যান্য খাতের চেয়ে শিক্ষাখাতে কম বরাদ্দ দেয়ার পক্ষে থাকেন। কিন্তু শিক্ষার উৎপাদন সুদূর প্রসারি ও দীর্ঘ মেয়াদি। জাতীয় জীবনে এর প্রভাব ও সুফল অবশ্যম্ভাবী। দেশের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বৈদেশিক নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবকিছুই শিক্ষার উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ উন্নত প্রযুক্তি, মেধাবী ব্যবসায়ী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন কুটনীতিক, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবীদ, জনদরদি সমাজসেবক তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রয়োজন অপরিহার্য। যথাযোগ্য ও উপযুক্ত জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষার কোন বিকল্প নাই।


 কেবল মানসম্পন্ন শিক্ষাই পারে দেশের জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে। এসব বিবেচনায় শিক্ষাখাত বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেতে পারে। অধিকন্তু টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ অবশ্যই বাড়াতে হবে। তবে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সমাজসেবী ও মানবহিতৈষীদেরকেও শিক্ষাখাতে অনুদান প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আর শিক্ষাখাতের অনুদান যেন বাণিজ্যভিত্তিক না হয় তা সরকারকে অবশ্যই পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
লেখক ঃ আহবায়ক, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স (ড্যাঙ্গ্ট)।
dmasobur09@gmail.com
০১৭১২-১৮২২১১

গৃহকর্মীকে নির্যাতন বিকৃত মানসিকতা

মোঃ আকতারুল ইসলাম :৯ বছর বয়সী জান্নাতুল। সারা শরীরেও নির্যাতনের চিহ্ন। জান্নাতুল শিশু গৃহকর্মী। ছোট্ট এ শিশুটি কাজ করতো গাজিপুরের একটি বাসায়। গৃহকত্রী মনি বেগম এই নির্যাতনের হোতা। মুমূর্ষু অবস্থায় বাড়িতে পাঠানো হয় জান্নাতুলকে। খবর পেয়ে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার জান্নাতুলকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জান্নাতুল, হ্যাপি, লুৎফা, সুমাইয়া নামগুলো নির্যাতিত শিশু গৃহকর্মীর।

সারাদেশে নামগুলো পরিচিতি পেয়েছে গণমাধ্যমের বদৌলতে। এরা সবাই মানুষের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিল। তাদের সবার ক্ষেত্রেই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম। এদের সবারই নির্যাতনের ধরনও একই। গরম খুন্তির ছেকা, চুল ধরে টানা, গরম ইস্ত্রির ছেকা, লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। এদের মধ্যে আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধর্ষণেরও শিকার হয়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করলেও নিয়মিত মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সময় অনিশ্চয়তা দেখা যায়।


গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালাও আছে, সরকারও আন্তরিক। কিন্তু নির্যাতন খুব একটা কমছে না। এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। নিয়োগকারীদের শিক্ষা, আর মানবিকবোধ জাগ্রত হওয়া, মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনেই কমবে গৃহকর্মীদের  নির্যাতন। গৃহশ্রমিকরা সবাই অতি দরিদ্র শ্রেণির। মামলা চালানোর পয়সা কম, অধিকার নিয়ে তাদের সচেতনতাও কম। নানা ধরনের হুমকি, আবার এমনও হয় নির্যাতনের মামলায় শিশু গৃহকর্মীর বাবা-মা বড় অংকের টাকা পয়সা পেলে নির্যাতনকারীদের সাথে আপোস করে ফেলে।


সরকার গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় আগের যে কোন সময়ের চেয়ে আন্তরিক। গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় সরকার ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নীতিমালায় গৃহকর্মীরা শ্রম আইন অনুযায়ী সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাবেন। নারী গৃহকর্মীরা চারমাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। সর্বনি¤œ ১২ বছরের শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিতে হলে তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে নিয়োগকারী শিশুর বাবা-মার সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শর্ত মোতাবেক নিয়োগ দেয়া যাবে।


গৃহকর্মীদের কর্মঘন্টা বিন্যাসে পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন এবং প্রয়োজনীয় ছুটির ব্যবস্থা রাখতে হবে। অসুস্থ গৃহকর্মীকে নিয়োগকর্তা নিজের দায়িত্বে চিকিৎসা করাবেন। গৃহকর্মী ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবেন এবং কর্মক্ষেত্রে গৃহকর্মীর কোন ক্ষতি হলে মালিক ক্ষতিপূরণ দিবেন। নীতিমালা অনুযায়ী গৃহকর্মীর সাথে মানবিক আচরণ করবেন। অশালীন আচরণ, দৈহিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না।

গৃহকর্মীর ওপর যে কোন ধরনের হয়রানি বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুবিচার নিশ্চিত করতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নেবে। গৃহকর্মীর অধিকার বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ নিবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান এবং আঞ্চলিক নির্বাহী, উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিতে কাজ করবে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গৃহকর্মীদের সুযোগ সুবিধাগুলো তত্ত্বাবধান করবে।


নীতিমালা প্রণয়নের পরে সরকার তা বাস্তবায়নে অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন কোন গৃহকর্মী নির্যাতনের সংবাদ পেলে সাথে সাথে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং নির্যাতনকারীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। প্রয়োজনে নির্যাতিতাকে  চিকিৎসাসহ সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে। সে অনুযায়ী শিশু গৃহকর্মী জান্নাতুলের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। সুমাইয়াকেও ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

 গৃহকর্মী সুরক্ষায় সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ১০৯২১ নম্বরে গৃহকর্মী নির্যাতন রোধে জরুরি সেবার ব্যবস্থা করেছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকার গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালাটি ইতোমধ্যে বিজ্ঞাপন আকারে প্রচারবহুল সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছে। মহিলা আইনজীবী সমিতি গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলাগুলো বিনা খরচে পরিচালনা করছে। 

 

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছে। গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেটওয়ার্ক গঠন করা হয়েছে। নেটওয়ার্কের সাথে এবং আলাদাভাবে বিলস, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, প্রথম আলো ট্রাস্ট, অক্সফামসহ অনেকগুলো সংস্থা নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 
গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধে যারা কাজ করেন তাদের সবাই মনে করেন অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, পাশাপাশি এ বিষয়ে আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকার এনজিও, সকলে মিলে নিয়োগকারীকে  জানাতে হবে যে আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী রয়েছে তার সুরক্ষায় সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সজাগ। গৃহকর্মীকে নির্যাতন করলে নিশ্চিত শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। গৃহকর্মী নির্যাতন বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক।

 নিয়োগকারীকে বুঝতে হবে গৃহকর্মীদেরও মানবিক এবং আইনগত অধিকার আছে। সরকার তার অধিকার সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর। গৃহকত্রীদের গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী তার সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক গৃহকর্তা যদি তার গৃহকর্মীকে নিজের সন্তানের মত দেখেন তাহলে এমনিতে গৃহকর্মী নির্যাতন কমে যাবে।
[পিআইডিÑশিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম]

যাকাত-ফিতরার বিধান

অধ্যক্ষ মোহাম্মাদ আব্দুল আজিজ : ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলামি জীবন বিধানের অন্যতম মূলভিত্তি যাকাত। ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মেরুদ  যাকাত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় নম্বর স্তম্ভ যাকাত। যাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। ইসলামের দৃষ্টিতে ধনীদের ধন মালের নির্ধারিত অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করাকে যাকাত বলা হয়। যাকাত ¦কেদিকে দাতার ধন-সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে অন্যদিকে গরীবদের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে। সালাতের মতই যাকাত ফরজ।

যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। অথচ তারা আল্লাহ ও রাসূল কে মানতো এবং সালাতও আদায় করতো। আমাদের সমাজে অনেক মুসলমান আছেন তারা সালাত আদায় করেন, হজ্জ করেন, সিয়াম পালন করেন, কিন্তু যাকাত দেয়াকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। রমজানের শেষের দিকে অনেক গরীব মিসকিন আসে তাই কিছু টাকা যাকাত হিসাবে দিয়ে দেন।


 আলহামদুলিল্লাহ কিছু মুসলমান এখনও আছেন যারা হিসাব করে সম্পদের যাকাত দিয়ে থাকেন। সালাত এবং যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করার সুযোগ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন “কেউ যদি আল্লাহর পুরষ্কারের আশায় যাকাত দেয় তাহলে তাকে পুরষ্কৃত করা হবে। কিন্তু যে যাকাত দিতে অস্বীকার করবে তার কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে যাকাত আদায় করতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার অর্ধেক সম্পদও নিয়ে নেয়া হবে।” (বুখারী, নাসাঈ ও বায়হাকী)। পবিত্র কুরআনে সালাত ও যাকাত একসাথে ৩৪ বার এবং যাকাত ৫৯ বার বর্ণনা করা হয়েছে। বারবার বলার অর্থ গুরুত্ব বুঝানো। একবার বলাই ফরয হয়ে যায়।

আমরা নামাজ রোজা রাখি অথচ আল্লাহ বলেন নামাজ-যাকাত। কুরআনের কোথাও নামাজ-রোজা নেই কিন্তু নামাজ-যাকাত বহুবার কুরআনে আসছে। তারপরেও আমরা নামাজ-রোজা বলতে সহজ লাগে আর নামাজ যাকাত বহু কঠিন মনে হয়। আফসোস! মুসলমানদের জন্য যারা আজও কুরআনের ভাষা ব্যবহার জানে না।


 আলকুরআনে যাকাতকে ‘সাদাকাহ’ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। প্রত্যেক নবীর উম্মতদের প্রতি যাকাত ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহ আদেশ করেছেন। ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইল (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.) সহ সকল নবীর উম্মতদের উপর যাকাত ফরজ ছিল। যাকাত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র বিমোচনের খোদায়ী পদ্ধতি। এজন্য ইসলামে যাকাতকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রদান করা হয়েছে।

 

ইসলামের নির্দেশ হলো রাষ্ট্র নাগরিকদের নিকট হতে যাকাত আদায় করবে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় তা বন্টন করবে। তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিতে মুমিন বান্দা অবশ্যই নিজের ফরজ ইবাদত ‘যাকাত’ নিজেই আদায় করবেন। বাংলাদেশ ইসলামি রাষ্ট্র না হলেও মুসলিম রাষ্ট্র। এ দেশের প্রায় ৯০% জন মুসলমান।

ইসলামি বিধান মোতাবেক তারা যাকাত দিয়ে থাকেন। তাই বাংলাদেশ সরকার ১৯৮২ সালে যাকাত অধ্যাদেশ-৮২ জারি করেন। পরবর্তীতে তা যাকাত আদায়ের জন্য গ্রহণ করা হয়। ইসলামি ফাউন্ডেশন, ইসলামী ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন যাকাত আদায় করেন।


১৯৮২ সালের ৭ই জুন গঠিত হয় বাংলাদেশ যাকাত বোর্ড। বর্তমানে আমাদের দেশে যাকাত বাধ্যতামূলক এমনটি খুব কম সংখ্যক লোকই ভাবে। যাকাত দিলে ভাল, না দিলে কোন অসুবিধা নেই। অথচ হাদীসে আসছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন “তোমাদেরকে এক সাথে আদেশ দেয়া হয়েছে সালাত এবং যাকাতের। তাই কেউ যদি যাকাত না দেয় (শুধু সালাত আদায় করে) তার সালাত ও হবে না।” ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল। অনেকেই আবার সরকারী কর দিয়ে ভাবেন যে যাকাত দিলাম।


 আপাতদৃষ্টিতে কর ও যাকাত এক বলে মনে হতে পারে কিন্তু উভয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। (১) যাকাতের হার মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পক্ষান্তরে করের হার নির্দিষ্ট থাকে না। সরকার পরিবর্তন করতে পারেন। (২) যাকাত ইচ্ছামত খাতে ব্যয় করা যায় না। কারণ কুরআনে যাকাত ব্যয়ের খাত (৮টি) নির্দিষ্ট করা হয়েছে।অপর দিকে কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ রাষ্ট্র ইচ্ছামত ব্যয় করতে পারে। (৩) যাকাত ইসলামি অর্থ ব্যবস্থা। আর আধুনিক কর সম্পূর্ণ বৈষয়িক রাজস্ব ব্যবস্থা। (৪) যাকাত আদায়ের মূল শক্তি হলো ঈমান। আর কর আদায়ের মূল শক্তি হলো দেশের আইন।

 
যাকাত যাদের উপর ফরজ ঃ ইসলামি আইনবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে যাকাত কেবলমাত্র স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক ও সম্পদশালী মুসলমানদের উপর ফরজ।সম্পদশালী কথাটি একটু ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। (ক) সম্পদ নিসাব পরিমাণ হওয়া (খ) মালিকানা সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ হওয়া। (গ) সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া। (ঘ) ঋণমুক্ত হওয়া (লোন বাদে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা।) (ঙ) কারো কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ একবছর থাকা। একবছর বলতে চন্দ্রবছর বুঝতে হবে। যখন একবছর পূর্ণ হলো তখন যাকাত ফরজ হলো। তা বছরের যে কোন মাসেই হোক। যাকাতের হকদার হলো: (১) ফকীর অর্থাৎ গরীব (২) মিসকীন অর্থাৎ যারা নিঃস্ব (কিছুই নাই) (৩) যাকাত আদায়কারী কর্মচারী কর্মকর্তা।

 (৪) মনজয় করার জন্য অর্থাৎ নও-মুসলিমদের সমস্যা দুর করার জন্য। এমনকি নওমুসলিম ধনী হলেও সমস্যার কারণে তাকে যাকাত দেয়া যাবে। (৫) দাস মুক্তি অর্থাৎ দাসত্ব শৃংখল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে। (৬) লোন পরিশোধ অর্থাৎ লোনে জর্জরিত তবে পাপকাজে লোনগ্রস্তকে যাকাত দেয়া যাবে না। (৭) আল্লাহর পথে কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত। নবীর সময়ে জিহাদের অস্ত্র মালামাল ক্রয় হাজীদের যানবাহন ক্রয় ছিল ‘ফি সাবীলিল্লাহ’। বর্তমানে ‘ইলমে দ্বীন’ শিক্ষার কাজে ব্যয় করাকেও ‘ফি সাবীলিল্লাহ’ বলে ইসলামি আইনবিদগণ উল্লেখ করেছেন।


(৮) মুসাফির অর্থাৎ প্রবাসী এখন তার কাছে সম্পদ নেই। বাড়ীতে আছে যদি সে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে। উপরোক্ত খাত ছাড়া অন্য খাতে যাকাত ব্যয় করা যাবে না। গরীব হলেও স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ে এই ছয় দলকে যাকাত দেয়া যাবে না। মসজিদ মাদ্রাসাতে যাকাত দেয়া যাবে না। তবে যদি মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ গরীব শিক্ষার্থীদের জন্য লিল্লাহ বোর্ডিং কিংবা দরিদ্র তহবিল গঠন করে তা সংরক্ষণ করেন তাহলে দেয়া যায়।
যাকাত ফরজ হয় যে সম্পদের উপর :

 
(১) সোনা-রূপা ও নগদ অর্থ: সোনা সাড়ে সাত তোলা। রূপা সাড়ে বাহান্ন তোলা (প্রায় ৬১৩ গ্রাম)। এক সময় উভয়ের মূল্য কাছাকাছি ছিল যার জন্য নিসাব ঐ রকম বর্ণনা করা হয়েছে। বর্তমানে উভয়ের মূল্যে অনেক পার্থক্য অতএব কিছু সোনা কিছু রূপা উভয়টির মূল্য যদি সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপা বা চাঁদীর মূল্য সমপরিমাণ হয় কিংবা কিছু টাকাও আছে তাহলে সবগুলো যোগ করে নিসাব পরিমাণ হলে এ যাকাত দিতে হবে।

 

বর্তমান মূল্যে নিসাব বলতে প্রায় কমপক্ষে ৪০,০০০/- টাকা ধরতে হবে। (২) ব্যবসার পণ্য বা মালামালের উপর যাকাত ফরজ। অর্থাৎ দোকানের মালের বর্তমান দাম, ব্যাংকের নগদ টাকা, গুদামে রক্ষিত মাল, কাঁচামাল, প্রক্রিয়ায় অবস্থিত মাল, প্রস্তুতকৃত মাল, ইত্যাদি হিসাবে আনতে হবে।


 ব্যবসার জন্য যানবাহন কিনলে আয় ধরতে হবে। (যানবাহনের মূল্য ধরতে হবে না।) ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত যাবতীয় দ্রব্যের যাকাত দিতে হবে। (৩) মৃত ব্যক্তির যাকাত ওয়ারিশ আদায় করবেন। (৪) তত্বাবধায়কের দায়িত্বে ন্যস্ত সম্পদের যাকাত তত্বাবধায়ককে দিতে হবে। সম্পদ দেশের মালিক বিদেশে থাকলে মালিকের পক্ষ হতে প্রতিনিধি যাকাত দিবেন। (৫) যৌথ মালিকানাভূক্ত সম্পদের যাকাত দিতে হবে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অংশের যাকাত দিবে। যদি কারো নিসাবের শর্ত পুরণ না হয় তাহলে তাকে যাকাত দিতে হবে না।


(৬) সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ব্যাংকে যে কোন প্রক্রিয়ায় জমাকৃত টাকার যাকাত দিতে হবে। প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা টাকার যাকাত দিতে হবে না যখন হস্তগত হবে শর্তপূরণ হলে যাকাত দিতে হবে। এককথায় যে সম্পদ (অস্থায়ী) নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা মালিকের আছে নিসাব হলে একবছর পূর্ণ হলেই যাকাত দিতে হবে।
ফিতরার হুকুম :


নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই ফিতরা ওয়াজীব হয়। একবছর পূর্ণ হওয়া জরুরি নয় যেমনটি যাকাতে জরুরি। ফিতরার পরিমাণ হলো জনপ্রতি গম বা গমের আটা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা তার মূল্য। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) মতে। আর খেজুর, কিসমিস, যব বা যবের আটা, পনির এগুলোর মূল্য দিলে জনপ্রতি ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম খেজুরের বা অন্যান্য গুলোর মূল্য দিতে হবে। এর কারণ হলো ফিতরা ফরজ হওয়ার সময় এবং চারখলিফার পরেও মদীনায় ২ কেজি খেজুরের পরিবর্তে সিরিয়ার ১ কেজি গম বা গমের আটা মিলতো। এজন্য গম এবং খেজুরের অনুপাত ছিল ১:২ অর্থাৎ খেজুরের দাম গমের অর্ধেক ছিল। আর গমের দাম ছিল খেজুরের দ্বিগুণ। মদীনার প্রধান আবাদ ছিল খেজুর। সিরিয়াতে প্রচুর গম হতো।

একসময় আমীর মুয়াবিয়া (রা.) গম বা গমের আটা ফিতরা দেয়ার জন্য মদীনায় ফরমান জারি করতে চাইলে প্রখ্যাত সাহাবীগণ তা বাধা প্রদান করে বলেন, না আমরা নবীর জামানা হতে খেজুর ফিতরা দিয়ে আসছি এখনও তাই দিব। খেজুর দিয়ে ফিতরা দেয়া সাহাবীদের সুন্নত। আমাদের দেশের পেপার পত্রিকায় ফিতরা নির্ধারন করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। হিসাব করে দেখবেন এটা গমের দামের সাথেও মিল নাই আবার খেজুরের দামের কাছেও নেই। ফিতরা সম্পর্কে যতগুলি হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলি পড়লে জানা যায় যে, গম দিলে ২ জনে ১ ছা অর্থাৎ ২ জনের জন্য ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম গম বা গমের আটা বা তার মূল্য দিতে হবে। আর খেজুর বা যব বা কিসমিস দিলে প্রতিজনের জন্য ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম দিতে হবে।


 এখন আপনার ইচ্ছা আপনি গম দিবেন না খেজুর দিবেন। বাজার জেনে হিসাব করে আপনার ইচ্ছা মত যে কোন একপথ অবলম্বন করতে পারবেন। বর্তমান বাজারে গম বা গমের আটা বিভিন্ন মূল্যে বিক্রী হয়। আবার খেজুর বিভিন্ন দামে বিক্রী হচ্ছে। সামর্থ্য থাকলে পরকালিন কাজে উত্তমপন্থা অবলম্বন করুন। আল্লাহ আপনাকে ধনসম্পদ দান করেছেন তার শুকরিয়া স্বরূপ খেজুর দিয়ে ফিতরা দেন। একজন মধ্যবিত্ত লোকের মত ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গমের দাম ফিতরা দেয়া বেমানান মনে হয়। তবে যদি কোন কোটিপতি বা তার চেয়েও ধনী ব্যক্তি ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম গম ফিতরা দেন, আদায় হয়ে যাবে। গুনাহ হবে না।
লেখক ঃ খতীব, উপশহর জামে মসজিদ,
বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

চালের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

মীর আব্দুল আলীম : এদেশে চালের দম বাড়ে, ডালের দম বাড়ে, বেগুন, তেল লবন চিনির দাম বাড়ে। কারণে বাড়ে, অকারণে বাড়ে। চালের দাম বেড়েতো আকাশ ছুঁয়েছে। টিসিবির তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশের বাজারে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৪২.১৯ শতাংশ। মোটা চালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরু চালের দামও। চালের বাজার বলতে গেলে বেসামাল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোটা চালের দাম বেশি রেড়েছে।

সরু চালের দাম বাড়লে উচ্চবিত্তের তেমন সমস্যা হয় না, যত আপদ বিত্তহীনদের ওপর। এভাবে কেন বাড়লো চালের দাম? এর অনেক ব্যাখ্যা আছে। যে যার মতো করে ব্যখ্যা দিচ্ছেন। চাহিদা অনুপাতে চালের জোগান যে কম সে কথা বলা যাচ্ছে না। বাজারে চাল আছে। কেউ কেউ মনে করছেন, চালের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে কারসাজি রয়েছে।


 চাল সিন্ডেকেট চক্রের হাতেই চালের মজুত রয়েছে। এরাই অব্যাহতভাবে চালের দাম বাড়িয়ে চলেছে। এদিকে দেশে চালের দাম অব্যাহত বৃদ্ধির কারণ স্পষ্ট করতে পারেননি খাদ্যমন্ত্রী। তবে চাল মিল মালিক সমিতির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, মিলারদের চালের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং চাল বিতরণ দফায় দফায় বাড়ছে চালের মূল্য। চালের দাম সাধারণ মানুষের মধ্যে রাখার জন্য খোলাবাজারে সরকারি উদ্যোগে চাল নিযে কর্মসূচি বন্ধ থাকার কারণে চালের বাজারে বিরাজ করছে অস্থিতিশীলতা।

হাওর অঞ্চলের দুর্যোগকেও চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ চলের বাজারে এর প্রভাব পড়ার কোনোই কারণ নেই বলেই মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাজারে নতুন ধানও এসেছে। এ সময় চালের দাম নেমে আসে। এরপরও দাম কেন বাড়ছে?


আসলে, চালের দাম বাড়ার কোনো সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে চালের দাম বৃদ্ধির কোনো সুফল কিন্তু কৃষকরা পাচ্ছেন না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চালের দাম বাড়িয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষক মেরে লাভবান হচ্ছেন। দেশের বেশ কিছু বড় চালকলের মালিক এই দাম বাড়ানোর সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আড়তে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্য দিকে অনেক মিলের মালিক আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি সরকারি গুদামে চাল সংগ্রহ অভিযানকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করেছেন।

এ জন্য আরেকটি কারণও চালকল মালিকরা দেখিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল পাইকারি বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে নানা জায়গায় চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন তাঁরা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চাঁদাবাজি এখন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে। এই চাঁদাবাজির টাকা এখন চালের দাম বাড়িয়েও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, দেশে ধান-চালের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে ধানের বাম্পার ফলন হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন চালের দাম স্থিতিশীল থাকার কথা।


প্রশ্ন হচ্ছে, চালোর দাম বাড়ছে কেন? এই দাম বৃদ্ধি কি স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক? সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, হাওরে বোরো ধানের আবাদ নষ্ট হয়েছে। এ কারণে চালের দাম বেড়েছে। সরকারের তরফ থেকে চালের দাম বৃদ্ধির খবরকে অস্বীকার করা হয়নি। তবে আমরা মনে করি, যথেষ্ট পরিমাণ চাল মজুত থাকলে হাওরের দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলা করা সরকারের পক্ষে কঠিন হতো না। চালের পর্যাপ্ত মজুত না থাকার জন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। অনেকে মনে করছেন, খাদ্যমন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনে যে ব্যর্থতা দেখিয়েছেন তাতে তার পদত্যাগ করা উচিত।

 সরকার আশা করেছিল, বাজারে বোরো ধান এলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু নতুন চালেও সরকারের আশা পূরণ হয়নি। এখন সরকার আশা করছে চাল আমদানি করা হলে এর দাম কমবে। এক্ষেত্রেও হতাশার খবর মিলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়ছে। সরকার চাল আমদানি করতে করতে এর দাম আরও বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আমরা মনে করি, সর্ব্ব প্রথম সিন্ডিকেটওয়ালাদের চালবাজি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশিষøষ্টদেও নজরদারি কম বলেই মনে হচ্ছে।


দেশে ভোক্তাস্বার্থ বলে কিছু নেই। যদি থাকতো তাহলে চালের বাজারে এমন অরাজক তৈরি হতো না। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের এমনিতেই কোনো ছলের অভাব হয় না। চালের ক্ষেত্রেও নানা কারণ তারা সামনে এনেছে। এবার চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে গেছে। বাজারে মোটা চালই এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫২ টাকা কেজিতে। সরু চালের কেজি ৬০ টাকা ছাড়িয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

 বিশেষ করে মোটা চালের দাম রেকর্ড ভাঙায় নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা এবং সরু চাল ৫৬ টাকায় উঠেছিল। এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চাল-গমের দামবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটা চালের দাম বিশ্বে এখন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি।

 

বিশেষ করে মোটা চালের দাম নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু চাল নয় যে কোনো উসিলায় দ্রব্যমূল্য বাড়ানো একটি দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতায় তৈরি হয়েছে দেশে। এখনো বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থায় গড়ে উঠেনি দেশে। তাই যা হবার তাই হচ্ছে।


আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড়ে খাদ্যশক্তির (ক্যালরি) ৬৫ শতাংশ আসে চাল বা ভাত থেকে। আর প্রতিদিন তারা খাবারের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে, তার ২৭ শতাংশ যায় চাল কিনতে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দাম বাড়লে গরিব মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিতে হয়।

 

ইফপ্রির জরিপে এর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে প্রতি কেজি চালের দাম ৩৮ টাকায় উঠেছিল। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রতি কেজি চাল ছিল ৩৬ টাকা। এরপর ২০০৯ সালে ধানের বাম্পার ফলনের পর দেশে চালের দাম কমতে থাকে। ২০১২ সালে প্রতি কেজি চাল ২৬ টাকায় নেমে আসে। ২০১৪ সালের পর চালের দাম আবারো বাড়তে থাকে।


 ২০১৪ সালে ৩০ এবং ২০১৫ সালে ৩৩ টাকায় ওঠে চালের দাম। ২০১৬ সালে মোটা চাল ৩৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এভাবে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভালো লক্ষণ নয়। পত্রিকার খবরে জানা যায়, আমাদের দেশেই নাকি চালের দাম সবচেয়ে বেশি। এ নিয়ে বিরোধীদলও রিতিমত রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে। চালের মূল্য বেশির দেশগুলোর মধ্যে আমাদের পরের স্থানই নাকি দখল করে আছে পাকিস্তান, যা বাংলাদেশের চেয়ে ১০ টাকা কম।

 

বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে সস্তায় চাল বিক্রি করছে ভিয়েতনাম। সেখানে চালের দাম গড়ে প্রতি কেজি ৩৩ টাকা ৬২ পয়সা। প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রতি কেজি চালের দাম ৩৪ টাকা ৪৩ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৩৭ টাকা ৮১ পয়সা ও পাকিস্তানে ৩৮ টাকা ৫৪ পয়সা। সরকারি হিসাবেই দেশে প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকায়। চালের এই দরও দেশের মধ্যে নতুন রেকর্ড। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চালের দামটা বেশি বেড়েছে গত ৫ মাসে।


 প্রতি মাসেই সব ধরনের চালে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে। দাম বাড়তে বাড়তে তা এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার এবং টিসিবির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জানুয়ারিতে মোটা চালের (স্বর্ণা এবং পারিজা) কেজি ছিল ৪০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ৪২ টাকা। এরপর মার্চে ৪৪ টাকা, এপ্রিলে ৪৬ টাকা এবং মে মাসে এসে হয় ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা। আর জুন মাসে সেটি ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে।

 

অথচ গত বছরের জুনেও এক কেজি মোটা চাল ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এভাবে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায়, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। যারা সচ্ছল ও সম্পদশালী, চালের দাম বৃদ্ধিতে হয়তো তাদের গায়ে খুব একটা লাগে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও লোকলজ্জার ভয়ে কিছু বলতে পারে না বা কোনো না কোনোভাবে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু রাজধানীসহ সারা দেশের খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে। তাদের সংসারের খরচ বেড়েছে, তাই এখন তারা ভাত খাওয়া কমিয়েছে আগের চেয়ে।


আমরা মনে করি, বিত্তহীনদের ব্যাপারে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে। বাজারে কীভাবে চালের দাম কমিয়ে আনা যায় সেদিকেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজর দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অতি মুনাফাখোর লোভী এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতনির্ভর দেশের মানুষ যদি চাহিদা মতো চাল কিনতে না পারে তবে এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? তাই সরকারের উচিত চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা এ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চাই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
 newsstore13@gmail.com
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর আইন চাই

আতাউর রহমান মিটন : গত সপ্তাহে লিখতে না পারার জন্য আমার পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাইছি। গত ৩ জুন ‘ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিতে জাপানে এসেছি। লিখছি এখানে বসেই। এখানে জীবন চলে মেশিনের মতো। খুবই হিসেব কষে, সময় মেনে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ তার পরে রুমে ফেরা হলেও পরদিনের প্রস্তুতি নিতেই সময় পার হয়ে যায়। আজ আমার একমাত্র অবসরের দিন। আশাকরি আমার অক্ষমতা, এই কৈফিয়ত আপনারা গ্রহণ করবেন।  


জাপান ছবির মত একটা সুন্দর দেশ। একটা দ্বীপ রাষ্ট্র। প্রাকৃতিক সম্পদ খুবই কম কিন্তু শুধুমাত্র সৃজনশীল ও কঠোর নিয়ম নির্ভর ব্যবস্থাপনা কৌশল অনুসরণ করে দেশটি বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। আমি জাপানকে ‘ধনী দেশ’ বলার চাইতে ‘উন্নত দেশ’ বলাই শ্রেয় মনে করি। কারণ পৃথিবীতে আরও দেশ আছে যাদের মাথাপিছু আয় জাপানীদের থেকে বেশি কিন্তু তাঁরা মানবিক মর্যাদা ও সংস্কৃতি বোধ এর মাপকাঠিতে কতখানি উন্নত সে বিষয়ে আমার সংশয় আছে। বাংলাদেশেও অনেক মানুষ আছেন যাঁরা অনেক টাকা বা সম্পদের মালিক। কিন্তু তাঁরা কি উন্নত মানুষ?  চুরি-ডাকাতি-লুটপাট-ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমেও অনেক সম্পদ কুক্ষিগত করা যায় কিন্তু তাতে ‘উন্নত মানুষ’ হওয়া যায় না।


জাপান আমার অন্যতম প্রিয় দেশ। আমি এর আগেও একাধিকবার লিখেছি, যদি কোনদিন দেশের বাইরে থাকার প্রয়োজন হয় তাহলে আমি জাপানকেই প্রথমে বেছে নেব। দেশটা ধনী বলে নয়, দেশটা সুন্দর এবং গোছানো বলে। এখানে মানুষের মৌলিক স্বভাব হচ্ছে অপরকে শ্রদ্ধা করা এবং অপরের আরাম বা স্বাচ্ছন্দ্যকে বড় করে দেখা। ধরুন আপনি ট্রেনে বা বাসে যাচ্ছেন কিন্তু আপনি ট্রেনের বা বাসের ভেতরে ফোনে কথা বলতে পারবেন না। কারণ তাতে পাশের যাত্রীর অসুবিধা হবে।

নেহাতই যদি কথা বলতে হয় তাহলে হয় আপনি ফিস ফিস করে বলবেন অথবা উঠে গিয়ে গেটের কাছে বা নিরাপদ কোন স্থানে কথা বলতে হবে। আপনি রাস্তায় কিছু খেতে খেতে যাচ্ছেন। কিন্তু চাইলেই খাওয়া শেষে ঢোঙা বা প্যাকেটটি রাস্তার পাশে ছুঁড়ে ফেলবেন না, কারণ তাতে রাস্তা নোংরা দেখাবে এবং সেটা অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখানোর সামিল।

 আপনি ্চলন্ত সিঁড়ি বা এ্যাসকেলেটর ব্যবহার করার সময় আপনাকে বাম দিকে চেপে দাঁড়াতে হবে, ডান দিক সব সময় ফাঁকা রাখতে হবে যাতে কেউ প্রয়োজন মনে করলে ডান দিক দিয়ে হেঁটে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ চাইলেই আপনি এ্যাসকেলেটরের যে কোন দিক ইচ্ছা দাঁড়াতে পারবেন না। এই ধরনের ছোট ছোট কিন্তু অসংখ্য নিয়ম এখানে সবাই মেনে চলে। এখানে দেরী করার কোন সুযোগ নেই। আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন হঠাৎ দেখলেন স্যুট-কোট-টাই পরা একজন ভদ্রলোক দৌড়াচ্ছেন। অফিস টাইমে এটা খুবই চোখে পড়ে।


আপনাকে বুঝতে হবে এই ভদ্রলোক কিছুটা দেরী করে ফেলেছেন, এখন দৌড় দিয়ে সময় এডজাষ্ট করার চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ আপনাকে সময় মেনে চলতে হবে। ধরুন আপনি রাস্তায় বা কোথাও আপনার ব্যাগ ফেলে রেখে এসেছেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন পুলিশ বা নিরাপত্তা বিভাগের কর্মী ছাড়া কেউ ওটা ছুঁয়েও দেখবে না। সুতরাং আপনি যদি সেখানে দু’ঘন্টা পরেও যান তাহলে ব্যাগটি অক্ষত অবস্থায় পাবেন অথবা নিকটস্থ পুলিশ বক্সে যোগাযোগ করলে পেয়ে যাবেন। জাপানের মানুষ এসব কোথায় শেখে জানেন? প্রাইমারী স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই তারা এসব শেখে এবং জীবনভর তা মেনে চলে। আর টেলিভিশন প্রোগ্রামেও এ ধরনের শিক্ষামূলক বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কার্টুন বা ইমেজ ব্যবহার করে এখানে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এটা জাপানের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য।


বাংলাদেশেও আমি এরকম একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলাম। স্কুল বানাতে পেরেছি কিন্তু সেখানে মানুষ গড়ার শিক্ষা দেয়ার কাজটা এখনও করতে পারিনি। টাকা থাকলে ভবন নির্মাণ করা সহজ কিন্তু ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে না পারলে মানসম্পন্ন সেবা দেয়া সম্ভব নয়। আমি পারিনি কারণ আমি আমার শিক্ষকদের এখনও শেখাতে বা বোঝাতে পারিনি কিভাবে শেখাতে হয়। আমাদের দেশের সিংহভাগ শিক্ষক, অফিসের কর্মকর্তা, সমাজের সম্মানিত নেতৃবৃন্দ বা পথ প্রদর্শকগণ জানেন না কিভাবে শেখাতে হয়। আমাদের দেশে ভাল মানুষ নাই তা নয়, কিন্তু শেখানো বা অপরকে গড়ে তোলার দক্ষতার অভাবের কারণে তারা এগুতে পারছেন না।

ফলে এক ধরনের হতাশা, এক ধরনের ব্যর্থতা বোধ বা এক ধরনের অবিশ্বাস থেকে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের গুটিয়ে নেন, বলেন ‘এটা করা সম্ভব নয়’। কেউ যখন বলেন ‘এটা সম্ভব নয়’ তার মানে তিনি সেটা করতে পারেন নি বটে কিন্তু অন্য কেউই তা পারবে না এটা সত্য নয়। ওটাই ব্যবস্থাপনার মূল কথা। ব্যবস্থাপনা আসলে কেবল বই পড়ার বিষয় নয়। ‘লক্ষ্য অর্জন করতেই হবে’ এটা মাথায় রেখে কি করতে হবে সেটাই ব্যবস্থাপনা। লক্ষ্য বা স্বপ্নটা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশে এখন ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের বাজেট নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মতে, এবারের বাজেট সর্বশ্রেষ্ঠ। আবার অনেকেই বলছেন এই বাজেট গতানুগতিক, উচ্চাভিলাষী এবং অবাস্তব। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় এবং চাহিদা বিবেচনায় বাজেট এর আকার বড় বা উচ্চাভিলাষী নয়। কিন্তু বাজেটের অর্থ জোগান দেয়ার জন্য যেভাবে জনগণকে চেপে ধরা হচ্ছে বা পিষে ফেলার প্রস্তাব করা হচ্ছে তা কতখানি মানবিক সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেটা বড় বিষয় নয়। সরকার চাইলেই ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন করা সক্ষম। আমাদের দেশে বাজেটের বরাদ্দ প্রকৃত কাজে ব্যবহার করার চাইতে পকেটে তোলা বা পাচার করায় বেশি গুরুত্ব পায় বলে বাজেট বাস্তবায়িত হয় না। পুরোটাই অব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত। ব্যাংক ঋণ শোধ না করলে যদি শাস্তি না হয়, তাহলে অর্থ পাচার উৎসাহিত হবে এটাই স্বাভাবিক।


  সরকার কালো টাকার মালিক, অর্থ পাচারকারীদের প্রতি কি ততখানি মনোযোগ দিচ্ছেন যতটা তাঁরা ভ্যাট আরোপ বা ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার উপরে করারোপের ক্ষেত্রে করছেন? কেন করছেন না সেই রাজনৈতিক প্রশ্নটা তুলতেই হবে। আর জনগণ যাতে প্রশ্নটা না তুলতে পারে শাসকগোষ্ঠী এ যাবৎকাল সেই ব্যবস্থাপনাটাই সুন্দরভাবে করে এসেছেন। অথচ হওয়া উচিত ছিল জনগণকে এমনভাবে সহায়তা করা যাতে তাঁরা সরকারের পরিকল্পনা বুঝতে পারে, দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের নেয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে, সেই সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। জনগণ যদি ক্ষমতার মালিক হয় তাহলে তাঁদের ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা কেন?


বাজেট সরকারের এমন এক অর্থনৈতিক দলিল যা দিয়ে সরকার জনগণের জন্য ঐ অর্থবছরে কি ধরনের সেবা প্রদান করবে বা কি ধরনের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে এবং কোথা থেকে সেই অর্থ সংগ্রহ করবে তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করে। বাজেট জানার এবং বাজেট সম্পর্কে মতামত দেবার অধিকার জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। এই দলিল যদি জনগণের সাংবিধানিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে সরকারকে অবশ্যই সে ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। অবশ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গায়ের জোরে জনগণের মতামত উপেক্ষা করাটাই একটা রেওয়াজ হিসেবে দেখা যায়। এটা কাঙ্খিত নয়।


আমরা কথায় কথায় দেশের যুব সমাজের সম্ভাবনার কথা বলি। আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি আমাদের শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি। কিন্তু বাজেটে আসলে তাদের জন্য বরাদ্দ কতখানি? এই বাজেট কি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবাসিক সুবিধা বৃদ্ধি করবে? এর ফলে কি ছাত্র-ছাত্রীদের মানসম্পন্ন লেখাপড়া শেখার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে? এই বাজেট কি আমাদের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে সহযোগিতা করবে?

অনেকদিন থেকে শ্রমিকরা তাঁদের থাকার জন্য ডরমিটরি ও রেশনের ব্যবস্থা করার দাবী জানাচ্ছেন, এই বাজেট কি তাঁদের দাবী পূরণে সহায়ক হবে? এই বাজেট কি জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে? মানুষের সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালাতে কি আগের চেয়ে কষ্ট আরও বাড়বে? এই বাজেট কি পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে সহায়ক হবে? এই ধরনের আবশ্যিক প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর পাওয়াটা বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।


জাপানেও ‘ভোগ্য কর’ দিতে হয়। আমাদের দেশে আমরা যেটাকে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর বলে থাকি সেটা এখানেও আছে। কিন্তু মানুষের মাথাপিছু আয়ের সাথে এই ‘ভোগ্য কর’ সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ এখানে কর দেবার ভয়ে মানুষকে ভোগের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হয় না।

আমি বলছি না যে, ভোগের উপর কর বসানো খারাপ কিন্তু গড়ে সেটা ১৫% করা হলে তা সকলের জন্য অসহনীয় হতে বাধ্য। আমাদের দেশে লোকজন খুব জরুরী না হলে হোটেলে গিয়ে খায় না। এখন যেভাবে ভ্যাট বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে মানুষকে বাইরে গিয়ে খাওয়ার মত বিষয়গুলো সীমিত করে ফেলতে হবে। অবশ্য আশার কথা হচ্ছে, দেশে অনেকেই বিশ্বাস করছেন যে, সরকার মুখে যাই বলুক বাস্তবে ‘সব ম্যানেজ করা’ হবে।


 এই ম্যানেজ করে ফেলাটাই বা ফেলতে পারাটাই হচ্ছে ‘ফুটো পাত্র দিয়ে পানি বয়ে আনা’র মত। আমরা উন্নয়নের জন্য এমন কর হার বসাচ্ছি যা অনিবার্যভাবে মানুষকে আইন পাশ কাটিয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করবে। অথচ ভেবে দেখুন সরকার মাত্র ৪-৫% ভ্যাট নিচ্ছেন কিন্তু সেটা সঠিকভাবে আদায় করছেন, তাহলে আমাদের সামগ্রিক আয় আরও বেড়ে যেত এবং দেশে সুশাসনের চর্চ্চা বৃদ্ধি পেত। কিন্তু সরকার কি জনগণকে সেই সহায়ক পরিবেশ দিতে প্রস্তুত!


জাপানে অনেক জায়গাতেই প্রাকৃতিক ঝরনা ধারায় গরম পানি প্রবাহিত হয়। সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে এখানে ‘ওনসেন’ বা ‘হট স্প্রিং’ বা প্রাকৃতিক গোসলখানা গড়ে তোলা হয়েছে। যা বাণিজ্যিকভাবে খুবই সফল। জাপানের মানুষের কাছে ওনসেন বা হট স্প্রিং-এ যাওয়াটা অত্যন্ত প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবার আমার সাথে উগান্ডা থেকে আসা এক বন্ধু বলল তাদের দেশেও এরকম অসংখ্য প্রাকৃতিক গরম পানির ঝরনা আছে কিন্তু সেগুলো পরিকল্পিতভাবে ব্যবহৃত হয় না। গ্রামের মানুষ খুব বেশি হলে সেগুলোতে ডিম বা কলা সিদ্ধ করে। অথচ সরকার চাইলে এই প্রাকৃতিক ঝরনাগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারতো। কিন্তু উগান্ডা সরকার এ ব্যাপারে উদাসীন।


আমাদের দেশেও আমরা আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে যথাযথ বিনিয়োগ করছি না। আমরা আইন করে জনগণকে আরও ভোগান্তিতে ফেলার আয়োজন করছি। নতুন কর আইন ভোক্তাদের উপর চাপ বাড়াবে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর জন্য এটা ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ বাজেট হলেও জনভোগান্তি বৃদ্ধির এই বাজেট রাজনৈতিক সরকারের জন্য অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ নয়। সরকারকে অবশ্যই জনগণের সক্ষমতা ও আকাঙ্খাকে বিবেচনায় রেখে পা ফেলতে হবে। মাত্র ১% শতাংশের চাহিদা ৯৯% সাধারণের ঘাড়ে চাপানোর কোন যৌক্তিকতা নেই। সে কারণেই ভোটের রাজনীতিতে এমন অবাস্তব বাজেট প্রস্তাবনাটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১৫২৬৯৭৯

রাজনীতির পাশে নির্বাচনের হাওয়া

মোহাম্মদ নজাবত আলী : সমাজ রাষ্ট্র, রাজনীতি এ শব্দগুলো এখন একাকার হয়ে একে অপরের পরিপূরকে পরিণত হয়েছে। সমাজ আছে বলেই রাষ্ট্র টিকে আছে। আর রাজনীতি হচ্ছে সমাজ রাষ্ট্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীতে রাজনীতি বিমুখ কোনো সমাজ, রাষ্ট্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ রাজনীতি হচ্ছে জনগণ নিয়ে আর জনগণ হচ্ছে রাষ্ট্রের মূল শক্তি। কিন্তু এ শক্তির কদর বাড়ে ভোটের রাজনীতিতে, ভোটের সময়।


বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই পরিচালিত হয় সংবিধান মোতাবেক। সংবিধান ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই চলতে পারে না। এজন্য সংবিধানকে রাষ্ট্রের দর্পণ বলা হয়। সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশ সরকারের মেয়াদ ৫ বছর। ৫ বছর পরপর দেশের নির্বাচন হয় যাকে আমরা জাতীয় নির্বাচন বলি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের বৈধ পথ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু শুধু নির্বাচন হলেই হবে না।

 সে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হয়। তাই দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে সব দল মতের মানুষ। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র হচ্ছে উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। আর গণতন্ত্র শুধুমাত্র একদিনের গণতন্ত্র বা নির্বাচন নয়। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে এখানে বিভিন্ন মত পথের মানুষ রয়েছে। গণতন্ত্রে বিভিন্ন দল থাকবে মতের মানুষ থাকবে বিরোধী দল থাকবে এগুলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গণতন্ত্র শিক্ষা দেয় সহনশীলতার সহমর্মিতার, অপরের মতামতকে সম্মান জানানো।


 ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গণতন্ত্র নয়। বরং গণতন্ত্র হচ্ছে সব দল মতের মানুষকে একীভূত করে দেশের উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থার মধ্যে গণতন্ত্র হচ্ছে সর্বগ্রহণযোগ্য ও শ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা। অন্যান্য শাসন ব্যবস্থা বিপরীতে গণতন্ত্র জনগণই ক্ষমতার উৎস। আমাদের সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। আর নির্বাচন হবে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে।


 জাতি হিসাবে আমাদের যেমন প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি হতাশাও। বাঙালি জাতির সৌভাগ্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনা নিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হয়। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঙালি জাতিকে ধাপে ধাপে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে একাত্তরে পৌঁছে দেয়। এটা বাঙালি জাতির বড় সাফল্য ও গৌরব। আর হতাশার কথা যদি বলা হয় তাহলে ৪৬ বছরের বায়ান্ন ও একাত্তরের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করতে আমরা অনেকটা ব্যর্থ হয়েছি। যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা বলা হয় তা ভোটের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আপোষ করা হচ্ছে।  

 

সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন দেশবাসী প্রত্যাশা করে। দেশবাসীর সে প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এখন বর্তমান সরকারের ওপর। গত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার নির্বাচন হয়েছিল এবং যে, নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি জোট অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন ওই রকম কোনো নির্বাচন জনগণ চায় না। জনগণ চায় এমন একটি নির্বাচন যে নির্বাচন রাজনৈতিকদলগুলো ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে। ইতিমধ্যে দেশে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে।


 সে কমিশনের ওপর বিএনপির বড় কোনো অভিযোগ নেই। গত নির্বাচনে ইতিমধ্যে শাসক দল শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বলা যেতে পারে তারা নির্বাচনে প্রচারণা শুরু করেছে। বিএনপিও বসে নেই। তারা বিভাগীয় পর্যায়ে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নামের তালিকা ইতিমধ্যে ঠিক করছেন।

এতে দেখা গেছে প্রতিটি বিভাগে আসনের চেয়ে প্রার্থীদের নামের তালিকা অনেক বড়। কারণ এটাই স্বাভাবিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখন কি হয়ে যায়। কোনো প্রার্থীর একটু ত্র“টির কারণে মনোনয়ন হয়তো বাতিলও হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় দু’টি দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনকল্যাণে এ দু’টি দলের বরাবরই ভূমিকা রয়েছে। দু’টি দলের জোট রয়েছে। তবে দীর্ঘ কয়েক বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে।


গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ তারা করেনি। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অবশ্যই অংশগ্রহণ করবে তা দলীয় নেতাদের বক্তব্য বিবৃতি থেকে বোঝা যায়। একটি রাষ্ট্রে সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণ সব সময় প্রত্যাশা করে। বিগত  নির্বাচনে ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি।

তাই সঙ্গত কারণে আগামী একাদশ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। আওয়ামীলীগ বিএনপি তাদের অতীত বর্তমান বিভিন্ন কর্মকান্ড জনগণ বিচার বিশ্লেষণ করছে। আগামী নির্বাচন হবে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে যে দল বা জোট জয়লাভ করবে তাদের সময় বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করবে। তাই ভোটাররা অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে আগামী নির্বাচনে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো।

 

গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি ও উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। বর্তমান সরকার সে গণতন্ত্রের প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেই দেশের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। আর গণতন্ত্র মানে আত্মমর্যাদা ন্যায় বিচার, সুশাসন, মানবিক উন্নয়ন অর্থাৎ একে অপরের সাথে সৌহার্দ, সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজও সে গণতান্ত্রিক চেতনাগুলো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

 গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বিগত নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করেনি। সাংবিধানিকভাবে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে নির্বাচন জোট নানা আন্দোলন সংগ্রাম করে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করে।

রাজনীতিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সে সহিংস রাজনীতিতে দেশের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সমাজে নানা বিভেদ তৈরি হয়। দলীয় স্বার্থ ক্ষমতার লোভে রাজনীতিবিদদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয় তখন দেশ বিদেশে রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি ও কূটনৈতিকরা বাংলাদেশ সফর করে বড় দু’দলের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরিতে দৌড় ঝাঁপ শুরু করে।


 কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কোনো চেষ্টায় সফল হয় না। সহিংসতার ভিতর দিয়ে নির্বাচন হয় এবং সে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশীদের প্রভাব যা দেশের জন্য শুভ নয়। বর্তমানে বিভিন্ন কূটনৈতিকরা বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। আওয়ামীলীগ বিএনপি সহ বাংলাদেশে যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল রয়েছে বিশেষ করে বড় দু’দলের নেতারা যোগ্য ও অভিজ্ঞ তারা এদেশেরই সন্তান এবং এদেশের মাটিতেই জন্ম।

 এমনকি তাদের মধ্যে অনেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এদেশের মাটি ও মানুষের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কোনো কারণে যদি বড় দুদলের মধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মতভেদ সৃষ্টি হয় তাহলে নিজেরা বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। রাজনীতিতে বিদেশীদের নাক গলানো সুযোগ করে দেয়া মোটেই ঠিক নয়। তবে আশা করি এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না।


আওয়ামীলীগ বিএনপি দুদলই আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কোন্দল মেটাতে দুদল কাজ করে যাচ্ছে। গত ৭মে আওয়ামীলীগের সংসদীয় সভার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১১ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগে যোগদান করে। সেখানে আগামী নির্বাচন নিয়ে কথা উঠে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কঠিন চ্যালেঞ্জের।

 নিজেকে দায়িত্ব নিয়ে জনগণের ভোটে জিতে আসতে হবে। আসলে জনগণই ক্ষমতার উৎস। প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের কথা বার্তায় সহজে প্রতীয়মান হয় যে, গত নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় আগামী নির্বাচন কিন্তু সে ধরনের কোনো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই কাজের দ্বারা জনগণের মন জয় করে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার কোনো বিকল্প নেই। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আরও বলেন, আমার কাছে নিয়মিত জরিপ প্রতিবেদন আসছে। এলাকার কার কি অবস্থা জানি।


 যার প্রতিবেদন খারাপ, যারা এলাকায় দলাদলি করছেন, দলে বিভক্তি তৈরি করছেন তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জোয়ারে এমপি হয়েছেন তারা জানে না নির্বাচন কত কঠিন। বিগত নির্বাচনে যে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সে নির্বাচনে দেড়’শ আসনে সরকার দলীয় জোটে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে যা দেশবাসীতো বটেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ভুলে যাননি। সে দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে ত্যাগী জনগণের আস্থা ভাজন নেতা ছাড়া মনোনয়ন পাবেন না তা স্পষ্ট করেন।

 তাই আগামী নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমনটি আশা করেন দেশবাসী। গত নির্বাচন নিয়ে যতই বিতর্ক থাক আগামী নির্বাচনকে সব দলের অংশগ্রহণের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় ব্যবস্থা সরকারকে বহন করতে হবে। একই সাথে সব দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনকেও  নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। কারণ একটি অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্বাচন কমিশনের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকার নির্বাচন কমিশন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সততা, নিরপেক্ষতা, কর্ম তৎপরতা আগামী নির্বাচন, অবাধ, সর্বগ্রহণযোগ্য হোক এটাই দেশবাসীর কামনা।


দেশের রাজনীতির পালে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সে হাওয়ায় বিএনপি বসে নেই। তারা আগামী নির্বাচনে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় থেকে চলছে নির্বাচনী মহড়া। কারণ নির্বাচনের বেশি সময় নেই। দেড় বছরের মতো সময় আছে উভয় দলই সাধারণ মানুষের মন কিভাবে জয় করা যায় কিভাবে ভোটারদের আস্থা অর্জন করা যায় সেসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন কৌশল ও দিক নির্দেশনা। রাজনৈতিক দলগুলোতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন তৎপরতা সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে ভোটের প্রস্তুত হওয়ার তাগাদা।

 বড় দুটি দলই নির্বাচনে জিততে চায়। নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে উভয় দলই মরিয়া। দলীয় কোন্দল মেটাতে শাসক দল দায়িত্ব দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের। তারা দলীয় কোন্দল মিটিয়ে দলের মধ্যে একটা পরিচ্ছন্ন ভাবধারা গড়ে তুলে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চলছে। বিএনপিও সেই একই পথে হাঁটছে। তবে জাতীয় পার্টির তোড়জোর তেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাছাড়া অন্যান্য ছোটখাটো দলগুলো কোন জোটে যাওয়া যায় তা নিয়ে এক ধরনের চিন্তাভাবনা করছে।

দেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি বরাবরই বড় ধরনের ফ্যাক্টর। দলের মহাসচিব হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কিন্তু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির একটি কথা মানেই নীতি বাক্যের মতো। কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সকালে-বিকাল কথা পরিবর্তন করেন। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের রসিকতাও রয়েছে। তবে তিনি কিছুটা মৌওজে আছেন। কারণ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যদি বিএনপি অংশগ্রহণ না করে তাহলে তার দলই হবে আওয়ামীলীগের প্রধান প্রতিপক্ষ।

 নির্বাচনের পর এরশাদের জাতীয় পার্টিই হবে প্রধান বিরোধী দল। কিন্তু বিএনপি এবারে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দিবে না। গত নির্বাচনের মতো আগামী নির্বাচনে বিএনপি সে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না। এদিকে মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে অরাজনৈতিক সংগঠন নাগরিক ঐক্য ৫ বছর পর রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলো। রাজনীতিতে পোড়া খাওয়া  মান্নার নাগরিক ঐক্য শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে কি চমক সৃষ্টি করে তা দেখতে আরও কিছু সময় লাগবে।


বিভিন্ন বিদেশী, যুক্তরাজ্য একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। সবদলের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনের তকমা বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে যাক। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে একটি সুবাতাস বয়ে আসুক, গণতন্ত্র ও জনগণের জয় হোক।
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

উন্নয়ন বৈষম্য ও তার প্রতিকার

 ডাঃ কে. এ. বি. এম. তাইফুল আলম৪ : দেশের উওর-পশ্চিমাঞ্চলের ৮টি জেলা নিয়ে ২০১০ সালের ১লা জুলাই দেশের ৭ম বিভাগ (প্রশাসনিক) হিসাবে রংপুর বিভাগ গঠিত হয়। স্বাধীনতা পূর্ব তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ৪টি বিভাগ সমন্বয়ে গঠিত ছিল । ১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগ গঠিত হয় ৬টি জেলা নিয়ে। আয়তন ১৩২২৫ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৮৪ লক্ষ। ১৯৯৫ সালে সিলেট বিভাগ গঠিত হয় ৪টি জেলা নিয়ে। আয়তন ১ৃ২৬৩৫ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায়  ১ কোটি। রংপুর বিভাগের মোট আয়তন ১৬১৮৫ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ১কোটি ৬০ লক্ষ। প্রায় ১৭ বৎসর রংপুর অঞ্চলের মানুষ আন্দোলন করে বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। আয়তন ও জনসংখ্যায় এই বিভাগ সিলেট ও বরিশাল হতে বড় হওয়ার পরেও অবকাঠামো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, শিল্প, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে উন্নয়ন না হওয়ায় এই বিভাগ অন্যান্য বিভাগ থেকে পিছিয়ে পড়েছে ।


জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (টঘঋচঅ) সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলির সাথে পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলির উন্নয়ন বৈষম্য প্রকটভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তথা রংপুর বিভাগ চরম উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। নি¤েœ খাতওয়ারী বৈষম্য চিহ্নিতকরে তার সম্ভাব্য প্রতিকারের পথ উল্লেখ করা হল। শিক্ষা ও গবেষণাঃ- সারাদেশে ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। রংপুর বিভাগে ২টি মাত্র। এর মধ্যে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩০তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আত্মপ্রকাশ করে। এটি শিক্ষক কর্মকর্তা স্বল্পতা ও বিষয় ভিত্তিক বিভাগ সংকটে ভূগছে। তাই অবিলম্বে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ সৃষ্টি করে, প্রয়োজনীয় শিক্ষক-কর্মকর্তা কর্মচারীর পদ সৃষ্টি এবং পদায়ন করে ছাত্র-ছাত্রীদের আসন বৃদ্ধি করা হোক।

 

সারাদেশে ৫টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও খুলনায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু কৃষি প্রধান এলাকা হওয়া সত্বেও রংপুর বিভাগে কোন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নাই। তাই অবিলম্বে এখানে ১টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন। সারাদেশে ৯টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়/ কলেজ আছে। কিন্তু রংপুর বিভাগ বঞ্চিত হয়েছে। তাই রংপুর বিভাগ তথা রংপুরে ১টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি। অনুরূপভাবে সিলেট ও চট্টগ্রামে ২টি পশুসম্পদ বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাই রংপুর বিভাগে পশুসম্পদ বিশ্ববিদ্যালয় চাই। এ ছাড়াও এই বিভাগে  আরও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমুদ্র বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি।

 

রংপুরের কৃতী সন্তান বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ডঃ ওয়াজেদ মিয়া স্মরণে রংপুরের পীরগঞ্জে আন্তর্জাতিক মানের পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র চাই এবং নারীজাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার নামে তার জন্মস্থান মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে অবস্থিত রোকেয়া কেন্দ্র পরিপূর্ণভাবে চালু হোক এবং তার নামে মহিলা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হোক। স্বাস্থ্য ঃ- দেশে ৩০টি সরকারী মেডিকেল কলেজ আছে। রংপুর বিভাগে মাত্র ২টি। এই হাসপাতাল গুলিতে বিশেষায়িত বিভাগের স্বল্পতা থাকায় মানসম্পন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। তাই অনতিবিলম্বে এই ২টি মেডিলের কলেজ হাসপাতালে Cardio thoracic Surgery, Bone Marrow Transplant unit Ges Kidney Transplant unit রঃ স্থাপন সহ সকল ধরনের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। বর্তমানে সরকার সারাদেশে ১৬টি নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেছে কিন্তু রংপুর বিভাগে কোন নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়নি।


 রংপুর বিভাগে গাইবান্ধা/কুড়িগ্রামে/নীলফামারী/ ালমনিরহাট/ঠাকুরগাওঁ/পঞ্চগড়ে মেডিকেল কলেজ এবং তৎসংলগ্ন নার্সিং কলেজ চাই। ৪টি জেলা এবং প্রায় ১কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত সিলেট বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়েছে। তাই ৮টি জেলা বিশিষ্ট এবং  ১ কোটি ৭০লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত রংপুর বিভাগে আমরা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চাই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে জেলা সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নতি হলেও রংপুর বিভাগের জেলা গুলিতে তা হয়নি। আবার উপজেলা হাসপাতাল গুলি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নতি হলেও আবারও রংপুর বিভাগ বঞ্চিত হয়েছে। এই বিভাগে আরো গবফরপধষ অংংরংঃধহঃ ঞৎরধরহরহম ঝপযড়ড়ষ এবং ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ ঐবধষঃয ঞবপযহড়ষড়মু  স্থাপন করতে হবে। শিল্প কারখানাঃ- সারাদেশে ৮টি ঊ.চ.ত এবং ৩০টি সরকারী বিশেষ অর্থনৈতিক জোন আছে।

 

কিন্তু রংপুর বিভাগে কোন অর্থনৈতিক জোন নাই এবং ১টি ঊ.চ.ত (উত্তরা ঊ.চ.ত) আছে। এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্লট এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ না থাকায় বিদেশী বিনিয়োগ থেকে এই ঊ.চ.ত বঞ্চিত হচ্ছে। এই বিভাগে ৪টি সুগার মিল আছে( মহিমাগঞ্জ, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, পঞ্চগড়)। বিদেশ থেকে চিনি আমদানী করায় এবং আঁখ চাষীদের সময়মত পাওনা পরিশোধ না করায় চাষীরা চিনিকলে আখ সরবরাহে অনাগ্রহী হওয়ায় এই চিনিকল গুলি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই উপরোক্ত  সমস্যাগুলির সমাধান এবং চিনিকল গুলির প্রয়োজনীয় সংস্কার/ আধুনিকায়ন করে এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ঃ- এই কয়লা খনির উত্তোলিত মজুদ কয়লার যথাযথ  ব্যবহার এবং বিক্রি নিশ্চিত করে, পরিবেশ বান্ধব উপায়ে ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলন করে এই অঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতি নিশ্চিত করা সহ ভারী শিল্প কারখানা স্থাপন করা হোক। রেলওয়ে কারখানা উন্নয়নঃ- পার্বতীপুরে লোকোমোটিভ কারখানার প্রয়োজনীয় সংস্কার করে, বিদেশ থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানী করে দেশেই ডিজেল ইঞ্জিন তৈরী করা সম্ভব।

অনুরূপভাবে সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানায় ক্যারেজ ও ওয়াগন তৈরী করে রেলওয়ে বহরে সংযোজন করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধি  করা সম্ভব। বর্তমানে এই কারখানা ২টি জন বল সংকটে ভূগছে । তাই কারখানা ২টি তে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয়া হোক। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনঃ- এই অঞ্চলে প্রচুর আলু, ভূট্টা, কলা, আম , চা উৎপাদিত হওয়া সত্বেও কোন প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল বা কেন্দ্র না থাকায় কৃষকরা সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই এখানে কৃষি প্রক্রিয়াজাত করণ অঞ্চল গড়ে তোলা হোক। যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ- রেলঃ- এই বিভাগে রেলওয়ের উরারংরড়হধষ ঐবধফ ছঁধৎঃবৎ থাকা সত্বেও রেলের সেবার মান অত্যন্ত করুণ। বিভিন্ন রুটে ট্রেনের সংখ্যা অত্যন্ত কম। নি¤œমানের বগি, পুরনো ইঞ্জিন, এক মুখী ট্রেন গুলি কখনই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। এই অঞ্চলে রেলের উন্নয়নের জন্য নি¤œবর্ণিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবেঃ-  ক. গাইবান্ধার বালাসীঘাট এবং জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাটের মধ্যবর্তী স্থানে ব্রহ্মপুত্র নদীতে বহুমুখী বহ্মপুত্র সেতু /টানেল স্থাপন করতে হবে। এই পথে সেতু স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে স্থগিত রেলওয়ে ফেরী সার্ভিস পুনরায় চালু করতে হবে। খ. সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত সরাসরি উঁধষ মধুঁব, ফড়ঁনষব ষরহব  স্থাপন প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

 গ. রংপুর থেকে ঢাকা দিবাকালীন ট্রেন চালু করতে হবে। ঘ. কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু করতে হবে। ঙ. লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনের নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। চ. দ্বিমুখী ট্রেন চালু করতে হবে। ছ. বগুড়া -গাইবান্ধা-রংপুর আন্তজেলা সার্ভিস ট্রেন চালু করতে হবে। জ. ঢাকার সাথে রংপুরের দূরত্ব কমাতে কাউনিয়া বাইপাস রেলপথ নির্মাণ করতে হবে। সড়ক অবকাঠামো ঃ- বর্তমানে চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৪ লেন বিশিষ্ট সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে যা পর্যাপ্ত নয়। কারণ এই পথে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা, কুষ্টিয়া, ঢাকা, টাঙ্গাইল, গাজীপুর এবং জামালপুরের বাস চলাচল করায় এই পথকে ৮ লেনে রূপান্তর করা প্রয়োজন অথবা এই পথে এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণ প্রয়োজন। দিনাজপুর-ঘোড়াঘাট-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়ক ৪ লেনে প্রশস্তকরণ করা হোক এবং রংপুর-পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা সড়ককে ৪ লেনের মহাসড়কে উন্নীত করা হোক। অন্যান্য আন্তজেলা সড়কগুলিকেও প্রশস্ত করা প্রয়োজন।

 বিমান বন্দরের উন্নয়ন:- সৈয়দপুর বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পরিণত করা হোক এবং লালমনিরহাট বিমান বন্দরকে আঞ্চলিক বিমান বন্দরে রূপান্তর করে ভারত এবং ভূটানের ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার উপযোগী করা হোক। স্থল বন্দর:- বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থল বন্দর কারণ এই পথে সহজেই ভারত, নেপাল, ভূটান, চীনের সাথে যোগাযোগ করা যায়। অবকাঠামো সমস্যা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইমিগ্রেশন জটিলতার জন্য এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এই বন্দর ব্যবহারে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। তাই এই বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। অনুরূপভাবে নীলফামারী জেলার  চিলাহাটি  স্থলবন্দর ১৯৯১ সাল থেকে বন্ধ। এটি চালু করে উত্তরা ইপিজেড সহ এই অঞ্চলের শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। খেলাধূলা ঃ-দেশের বিভিন্ন বড়শহরে আন্তর্জাতিক মানের  স্টেডিয়াম থাকলেও রংপুর বিভাগে তা নেই।


 দিনাজপুর ১টি ক্রিড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তার কর্মকান্ড স্থবির অবস্থায় আছে। তাই রংপুর বিভাগের ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির কর্ম বিস্তৃতি এবং রংপুর ও দিনাজপুর শহরে বহুমুখী আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ করত আঞ্চলিক, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানের খেলাধূলার আয়োজন করা। তথ্য প্রযুক্তি – দেশের বিভিন্ন স্থানে যথা- ঢাকার কালিয়াকৈর, কেরানিগঞ্জ, সিলেট, যশোর প্রভৃতি স্থানে ১২টি আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ চলছে। রংপুর বিভাগের রংপুর সদরে প্রস্তাবিত আইটি ভিলেজ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন সহ এই বিভাগে আরও নতুন আইটি ভিলেজ  স্থাপন জরুরি। বৈদেশিক কর্ম সংস্থানঃ- বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের খুব অল্পসংখ্যক লোক বিদেশে কর্মরত।

তাই এই বিভাগের বিভিন্ন জেলা শহরে স্কিল ডেভলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তুলে পুরুষ এবং নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে  বিদেশে প্রেরণের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। নদী সম্পদ এবং নদী বন্দর ঃ- তিস্তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের সাথে পানি বন্টন চুক্তির সফল বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তিস্তাসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য নদীগুলির ড্রেজিং প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চিলমারী বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করত এই বন্দরকে সচল করে কুড়িগ্রাম জেলা তথা রংপুর বিভাগের উন্নয়ন করা হোক।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমীঃ- কৃষি প্রধান এই এলাকার  গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য কুমিল্লা, বগুড়া ও জামালপুরে অবস্থিত পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর ন্যায় রংপুর বিভাগেও ১টি পল্লী উন্নয়ন একাডেমী স্থাপন করা হোক।
লেখক ঃ প্রফেসর, কলোনী কলেজ রোড, গাইবান্ধা।
alam.taiful@yahoo.com
০১৭১৬-৮৩৬৬৭৮

বাজেটে লক্ষ্যমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন চ্যালেঞ্জ হবে

আব্দুল হাই রঞ্জু : মোটামুটি কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক উন্নয়নশীল দেশগুলোর থেকে বেশ এগিয়েই চলছে। এটা যে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অর্থনতির জন্য ইতিবাচক, যা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ প্রতিবেশী দেশ ভারত, মিয়ানমারের চেয়েও আমাদের প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় গোটা বিশ্ব অবাক দৃষ্টিতে  তাকিয়ে আছে । যদিও ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার টানা ক’বছর ধরেই বলবৎ ছিল।


 এমনকি গেল বছর প্রত্যাশার ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার ঘরকে টপকানোও সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম বারের মত প্রত্যাশা ছাড়িয়ে মোট দেশজ আয় বা প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আর প্রবৃদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে মাথাপিছু জাতীয় আয়ও অনেক বেড়েছে। যেখানে গত অর্থ বছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল, সেখানে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রাকে অতিক্রম করে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবে উঠে এসেছে।


 যদিও বিবিএসের দেয়া হিসাবের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, প্রবৃদ্ধির হিসাবে অনেক গরমিল রয়েছে। অনেকেই দ্বিমত করতেই পারেন, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রবাসী আয়, রফতানি আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ সবল অর্থনীতির কারণে ৭ শতাংশের কিছু উপরে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। আর গত ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। যা বেড়ে গত অর্থবছরে দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ৬০২ ডলার। যা আগের বছরের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে ১৩৭ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।


 আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে ১১ দশমিক ০৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তা কমে গত বছরে এসে দাঁড়িয়েছিল ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ। পাশাপাশি সংস্থাটির তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিল্পে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছিল ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, তাহলে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ল কি ভাবে? দেশে সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুব একটা ভাল না। আবার রফতানি আয়, প্রবাসী আয়ের সূচকও নি¤œমুখী অথচ প্রত্যাশার অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধিও অর্জিত হয়েছে।

 

মুলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ প্রতিবছরই তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। সূত্র মতে, যেখানে যে কোন দেশের দুই মাসের  আমদানি ব্যয় মেটানোর মত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা থাকলে সেটিকেই পর্যাপ্ত ভাবা যায়। সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে পরিমাণ অর্থ এখন মজুদ আছে, তা দিয়ে ৭/৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

 

ফলে যে কোন পণ্য আমদানিতে সরকারকে দেশীয়ভাবে ব্যাংক থেকে ধার দেনা নেয়া কিম্বা কোন দাতা দেশ কিম্বা সংস্থার ওপর কোন ভাবেই নির্ভরশীল হতে হয় না। পাশাপাশি কৃষি অর্থনীতিও অনেকাংশেই মজবুত হয়েছে। এমন এক সময় ছিল, যখন দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চাল ও গম আমদানি করতে হত। কিন্তু এখন চাল আমদানি করতে হয় না, তবে গম আমদানি করতে হয়। যদি সরকার চাষীদের গমের উৎপাদন খরচ পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতো, তাহলে চালের মতো গম আমদানির পরিমাণও কমে আসত।


 বিশেষ করে নদী বিধৌত বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো এখন অনেকটাই মরা খালে পরিণত হয়েছে। আবার সরকার শাসন করে নদীর ভাঙন রোধ করায় প্রায় প্রতিটি নদীকে ঘিরে বিশাল বিশাল দোঁআশ মাটির চর চাষাবাদের উপযোগী হয়েছে। যে জমিগুলোতে গম, ভুট্টা ও আলুর ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে। বলতে গেলে কৃষি চাষাবাদে এখন চরাঞ্চলগুলোর বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শুধু গম, ভুট্টা, আলুই নয়, এখান পুষ্টি সমৃদ্ধ মিষ্টি আলু, কুমড়া এবং নানা জাতের শাক সবজিতে গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটাই চাঙ্গা হচ্ছে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা চাষীদের উৎপাদিত এসব পণ্যের সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার নির্মাণে অনেকটাই বিমুখ। ফলে অধিকাংশ সময়ে পচনশীল সবজি পচে খাবার অযোগ্য হয়ে যায়।


 এমনকি উপযুক্ত মূল্যের অভাবে সবজি খেতেই নষ্ট হয়ে যায়। এসব ঘটনা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নীলফামারীতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কৃষকদের দাবীর মুখে উনি আশ্বস্ত করেছিলেন, এই মৌসুম থেকে সরকারিভাবে উপযুক্ত মুল্যে ভুট্টা  সংগ্রহ করবেন। কিন্তু আমাদের মন্ত্রী মহোদয়গণ যত আশ্বাস প্রতিশ্রুতি দেন, কার্য্যত তা অনেক সময়ই কার্য্যকর হয় না। ফলে জনস্বার্থ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অবশ্য সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবছরই গম সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু যার পরিমাণ উৎপাদনের তুলনায় যৎসামান্য।

 

 সংগত কারণে একজন গমচাষী কৃষি বিভাগের তালিকা প্রদানের সময় সরকারিগুদামে গম বিক্রির সুযোগ পান মাত্র ৫০ কেজি কিম্বা তার চেয়ে ক্ষেত্র বিশেষ কিছু বেশি অর্থাৎ বলতে গেলে অধিকাংশ কৃষকই সরকারি গুদামে গম বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ফলে মধ্যস্বত্ত ভোগীদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকার যদি অভ্যন্তরীণভাবে গম সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করে সকল গম চাষীর গম সংগ্রহ করে ন্যায্যমুল্য নিশ্চিতের ব্যবস্থা নিত, তাহলে গম আমদানির পরিমান অনেক কমে আসতো। যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি মুলত কৃষি নির্ভর, সেখানে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ব্যবস্থা নিতে না পারলে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।

 

যে দেশে সম্ভাবনাময় কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করলে শুধু কৃষির বদৌলতে প্রবৃদ্ধি কাংখিত পরিমাণ অর্জন করা সম্ভব, সে দেশে শুধু পরিকল্পনার অভাব, উদাসীনতা, অবহেলা এবং উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বিপণনের অভাবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় কাংখিত পর্যায়ে সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য বড় প্রয়োজন জাতীয় বাজেট কৃষি খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করে গোটা দেশে সরকারি ভাবে কৃষি পণ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ উপযোগী ব্যবস্থাকে পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত করা। তাহলে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে কৃষি পণ্য রফতানির হার বৃদ্ধি করে মধ্যম আয়ের দেশ বিনির্মাণ উপযোগী প্রবৃদ্ধি অর্জন করা খুবই সহজ হবে।

 

জুন মাস এলেই অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণা করেন। সে বাজেটে ‘কারো পৌষ মাস, আবার কারো সর্বনাশ’ হয়। এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে করের আওতা বৃদ্ধি করেছে। যদিও কৃষি খাতকে করের আওতায় আনা হয়নি। কিন্তু ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করায় পরোক্ষভাবে হলেও এ বোঝা চাষীদের ঘাড়েও পড়বে। কারণ নিত্যপণ্য সাধারণ মানুষকেই কিনে খেতে হয়। ফলে ভ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধির অর্থই পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। আর বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হলে সে বোঝা যে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপবে, যা নিখাদ সত্য।

 

মূলত বিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীর একাদশ বাজেট ঘোষণায় বাজেটের পরিমান যে, স্বাধীনতা উত্তর সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ যা নিয়ে দ্বি-মতের কোন অবকাশ নেই। বাজেট বড় না হলে উন্নয়ন হবেই বা কি করে? কিন্তু সে বাজেটের বিরূপ প্রভার যদি সাধারণ ভোক্তা কিম্বা ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে জনকল্যাণের কথা বলা হলেও বাস্তবে জনকল্যাণ করা সম্ভব হবে না।

 

 ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ ফোরাম এফবিসিসিআই সহ অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যেই সংবাদ সম্মোধন করে ঘোষিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করেছে। অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রবর্তন না করার জন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আপত্তি তুলে আসছে। যদিও সরকারের তরফে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার আশ্বাসও মেলেছিল।

 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রেখেই জাতীয় বাজেট ঘোষণা করলেন। শুধু ১৫ শতাংশ ভ্যাটই নয়, আবগারি শুল্ক পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। যে শুল্কের আওতায় ব্যাংকে লক্ষ টাকার আমানতকারীকেও এবারই প্রথম অনেক বেশি আবগারি শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে। এটা কতটুকু যৌক্তিক তা অর্থমন্ত্রীকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।


 কারণ ব্যাংক হচ্ছে একটি দেশের অর্থ লেনদেন ও আমানত রক্ষার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। সে ব্যাংকে মাত্র এক লক্ষ টাকা আমানত রাখলে বাড়তি আবগারি শুল্ক গুণতে হবে, যা সত্যিই অন্যায্য এবং অনাকাংখিত। অর্থমন্ত্রী কেন এবং কোন যুক্তিতে সাধারণ মানুষের ব্যাংক আমানতের উপর নজর ফেললেন, যা আমাদের বোধগম্য নয়

 

। অর্থনীতির ভাষায় সমৃদ্ধ অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি হচ্ছে বৈধপথে ব্যাংকে লেনদেন এবং আমানত সংরক্ষণের একমাত্র ব্যবস্থা। সেখানে যদি সরকারের নজর পড়ে, তাহলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখা থেকে বিরত থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক অর্থাৎ এখন মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বদলে হয়ত অতীতের ন্যায় টাকা নিজ ঘরে রাখাকেই নিরাপদ ভাববেন।

 

আর যাদের বিদেশে টাকা পাঁচারের সুযোগ আছে, তাদেরতো পোয়াবারো অবস্থা। যারা এই অজুহাতে দেদার আমদানি রফতানির আড়ালে বিদেশে টাকা পাঁচার করতেই থাকবেন। আবার প্রতিবেশি কোন দেশে টাকা রাখার যাদের সুযোগ রয়েছে, তারাও সে পথেই হাঁটবেন। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি।

 

কারণ ব্যাংকে লেনদেন কমে আসা কিম্বা আমানতকারির সংখ্যা কমে আসলে প্রবৃদ্ধির হিসাব নিকাশ করাও কঠিন হবে। আগেই বলেছি, গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ধরা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর এ বছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অবশ্য মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় মুল্যস্ফীতি বাড়লে পণ্যের মূল্য বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আর পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হলে জনভোগান্তিও বাড়বে। এ কারণে  ভ্যাটের পরিমাণ ও পরিধি না বাড়িয়ে এবং আবগারি শুল্কের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা উচিৎ।


 তা না হলে ৫ই জানুয়ারীর  একতরফা নির্বাচনের সরকারের ভাবমূর্র্তি ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশেই বাড়তেই থাকবে। কারণ একটি অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থেকে যা খুশি তা করতে পারে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে দেশের মানুষ জুলুম জবরদস্তির করারোপ আশা করে না। এমনিতেই ব্যাংকগুলোতে সেবার নামে নানাভাবে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এর উপর আবার ‘গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার’ ন্যায় বাড়তি আবগারি শুল্ক আরোপ করায় ব্যাংক থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। ফলে ব্যাংকিং খাতেও এক ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো, করের জাল হতে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে বাড়তি ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক কমানোই  সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য মঙ্গল হবে।
 লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

দুর্নীতি বন্ধে দুদকের সুপারিশ প্রাসঙ্গিক

হাবিবুর রহমান স্বপন:রাষ্ট্রপতি বরাবর দুদকের পক্ষ থেকে ২০১৬ এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দুর্নীতি বন্ধে ৬৫ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন বিভাগের ১০ টি খাত চিহ্নিত করে এই সুপারিশ করা হয়েছে। বিভাগ সমূহ হচ্ছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি। দুর্নীতি রোধে সংশ্লিষ্ট দফতর সমূহের সহযোগিতাও চেয়েছে দুদক।  
সর্বাধিক ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে শিক্ষা খাতের দুর্নীতি রোধে।

 ভূমি ব্যবস্থাপনায় ৯ দফা, স্বাস্থ্য খাতে ৭ দফা, আইন শৃংখলা ব্যবস্থাপনায় ৫ দফা, এন বি আরে ৪ দফা, হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগে ৩ দফা, রাজউক গণপূর্ত ও সরকারি নির্মাণ কাজে ৬ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া জনপ্রশাসন খাতে ১০ দফা, আর্থিক খাতে ৬ দফা এবং বিবিধ খাতের দুর্নীতি রোধে ৫ দফাসহ মোট ৬৫ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।


সচিবালয়ে বিজনেস নিষ্পত্তির পদ্ধতি হিসেবে সনাতনি ফাইল উপস্থাপন প্রক্রিয়া বিলোপ করার সুপারিশও করা হয়েছে উক্ত সুপারিশ মালায়। কোন ফাইল অবশ্যই এক সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।

সরকারি সেবা খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে প্রতিটি সংস্থায় ‘হেল্প ডেস্ক’ ও ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ কার্যক্রম চালু করতে বলা হয়েছে। সুপরিয়র সিলেকশন বোর্ড গঠন করে কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেলের পরিবর্তে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সচিবকে সদস্য অন্তর্ভূক্তিরও সুপারিশ করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ২০১৫ সালেও এমন একটি সুপারিশমালা জমা দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রপতি বরাবর।  উক্ত সুপারিশ সমূহের কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে পুরোপুরি তা বাস্তবায়ন হয়নি। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

তিনি জানান, গত এক বছরে বেশ কিছু এলাকা চিহ্নিত করেই তার ভিত্তিতে সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি পুরোপুরি রোধ করা না গেলেও সুপারিশসমূহ বাস্তবায়িত হলে দুর্নীতি বহুলাংশে হ্রাস পাবে বা সহনীয় পর্যায়ে আসবে।

শিক্ষাখাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা রোধের সুপারিশ করা হয়েছে। মেধার ভিত্তিতে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করে একটি আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় হিসাবের সচ্ছতা আনয়ন, শিক্ষার মান তদারকী করার জন্য সমাজের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে ‘নাগরিক কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

 বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ সমূহে শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা, সনদ প্রদান ইত্যাদির জন্য একটি রেগুলেটরি অথরিটি স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দেয়ার জন্য নিয়ম আছে তা পরিবর্তন করে শিক্ষকদেরই স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্যত্র বা অন্য পরীক্ষা কেন্দ্রে বদলের (পরীক্ষার দায়িত্ব) কথা বলা হয়েছে।


শিক্ষা খাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ সর্বাধিক। তাই দুর্নীতিও বেশি। কথাটি আবারও প্রমাণিত হলো দুদকের সুপারিশের মধ্য দিয়ে। কত প্রকার যে দুর্নীতি হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে তার পরিসংখ্যান রাখা দুস্কর। শিক্ষক নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে করা জরুরি। যোগ্যতম ব্যক্তির পরিবর্তে ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় চাকুরি পাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতা সম্পন্নরা। এতে মেধাবীদের কাছ থেকে দেশ বা জাতি কিছু নিতে পারছে না।

তারা বাধ্য হচ্ছে অন্য পেশা বেছে নিতে অথবা দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে। সম্প্রতি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (সরকারি) শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তদন্তে তার প্রমাণও মিলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনেরও তদন্ত হয়েছে এবং হচ্ছে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বা পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নানা অপকর্মের খবরও আমরা অহরহ সংবাদ মাধ্যমে পড়ছি। এ কারণেই দুদক কর্তৃপক্ষ শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় শিক্ষকরা যখন দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে পড়েন!


বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আলাদা রেগুলেটরি কমিটি গঠনের সুপারিশটিও যুক্তিযুক্ত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ভর্তি বিভিন্ন সময়ে হওয়ায় একই শিক্ষার্থীকে সারা দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারভিউতে অংশ নিতে হয়। এতে ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয় তাদের।

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ডোনেশনের (ইন্টারভিউতে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করার পরেও) মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। যা মোটেই কাম্য নয়। এতে প্রকৃত মেধাবীরা মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থের দাপটে ভর্তি হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা। যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে বাধ্য। বেসরকারি মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান যাচাই করা জরুরি।


স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি রোধে চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও রোগিদের কাছ থেকে নেয়া ফি নির্ধারণে নীতিমালা তৈরি করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ই-টেন্ডারিং পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্য বীমা চালু করে এই অর্থেই স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত ডাক্তার, নার্স, কর্মচারিদের বেতন-ভাতা প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও দুর্নীতি অনেক। ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নেই। মাঝে-মধ্যেই দুর্নীতির খবরাখবর ছাপা হয়। সরকারি চিকিৎসক ও নার্সদের পদোন্নতি, বদলী, পোস্টিং এ অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর সংবাদপত্রে পড়তে হয় আমাদের।


থানায় সাধারণ ডায়েরি অথবা মামলা হওয়ার পর তার তদন্ত ও রিপোর্ট দাখিলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে দুদকের সুপারিশে। উক্ত সুপারিশে পাসপোর্ট পেতে জনগণের ভোগান্তি লাঘবের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি বন্ধে এরকম ৫টি সুপারিশ করা হয়েছে।
ভূমি একটি জটিল বিষয়। কারণ এই বিষয়ে সর্বাধিক মামলা বাংলাদেশের আদালত সমূহে।


 অতএব ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি দমনে ৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। একটি ছাতার নিচে ভূমির সহকারি কমিশনারের তত্ত্বাবধানে সাবরেজিস্ট্রার অফিস, সেটেলমেন্ট অফিসের কার্যক্রম সমন্বয় করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন দফতরকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসার সুপারিশ করা হয়েছে। ভূমি রেজিস্ট্রেশনে পদ্ধতির অটোমেশন করা ও দালালদের দৌরাত্ম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

‘মুয়ীদ কমিটির রিপোর্ট’ পর্যালোচনা করারও কথা বলা হয়েছে। খাস জমি বন্টনে যে অনিয়ম হচ্ছে তা বন্ধ করতে খাস জমির ডাটাবেজ তৈরি করার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইনেরও সংশোধন দরকার। সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা দরকার ভূমি বিষয়ক সকল বিষয়ের।

 
যোগাযোগ, সরকারি নির্মাণ, মেরামত কাজে স্বচ্ছতা আনতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, নির্মাণকারী সরকারি সংস্থার উন্নয়ন কাজের জন্য প্রণীত নিজস্ব প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৃতীয় কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনঃযাচাই করতে হবে। এটা ছাড়া টেন্ডার আহ্বান করা যাবে না।

বিষয়টি প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ভূক্ত করা আবশ্যক। নির্মাণকারী সরকারি সংস্থার কাজ কোনভাবেই বাকিতে বা অগ্রিম ভিত্তিতে কোন ঠিকাদারকে দিয়ে করানো যাবে না। বকেয়া বিল পরিশোধের পদ্ধতিও বন্ধ করতে হবে।সরকারের আর্থিক খাতের দুর্নীতি রোধে ৬ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে।

আর্থিক বছর শুরুর পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা যাচাই করা অর্থ বিভাগের একার পক্ষে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এর জন্য তা নিষ্পত্তির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি ‘অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ উপদেষ্টা কাউন্সিল’ গঠন করার কথা বলা হয়েছে সুপারিশমালায়। এটি সরকারের ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ভেলু ফর মানি’ নিশ্চিত করবে।

 
দুদকের উক্ত সুপারিশে দেশের সকল এমএলএম কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। দেশের বহু মানুষ এতে প্রতারিত হচ্ছে। এমএলএম কোম্পনির প্রতারণা বন্ধ করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা দরকার। জমি, ফ্ল্যাট ও স্থাবর সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন ফি অর্ধেক করা দরকার।

ওষুধ শিল্পে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে মান নিয়ে জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক এবং আয়ুর্বেদিক ওষুধে ভেজাল রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দুর্নীতির উৎস সমূহ চিহ্নিত করে দুদক যেমন ৪ দফা সুপারিশ করেছে। তেমনই যদি ওষুধ শিল্পের দুর্নীতি চিহ্নিত করা যায় তা হলে জনগণের মঙ্গল হবে।

দুদক কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি বন্ধ করতে যেসব সুপারিশ করেছে তা বাস্তবায়ন করার জন্য দরকার দক্ষ এবং সৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যদি সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা হলে দুর্নীতি হ্রাস পেতে বাধ্য। যা বিভিন্ন দেশে প্রমাণিত হয়েছে। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কসহ ইউরোপের বহু দেশ এখন চলে ডিজিটাল সিস্টেমে। যেমন, একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র (জাতীয় পরিচয় পত্র) দিয়েই প্রায় সকল বিষয় সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সকল সরকারি সেবা ও বেসকারি সার্ভিস এই কার্ডের মাধ্যমেই নেয়া যায়।

 জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে বা তা অনলাইনে দেখে একজন নাগরিকের সকল বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। একটি মাত্র পরিচয়পত্র দ্বারা ব্যাংক একাউন্ট খোলা, জমিসহ সকল রেজিস্ট্রেশন কাজ, যানবাহনের টিকিট ক্রয়-বিক্রয়, সার্ভিস সমূহের (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি) বিল পরিশোধ করা এমনকি একজন নাগরিকের কাছে নগদ অর্থ না থাকলেও তাকে সাময়িক সময়ের জন্য অর্থ কর্জ নেয়ার সুযোগ প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা সম্ভব।

 সরকারি সকল প্রকার হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হলে দুর্নীতি বহুলাংশে কমবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।মনে রাখতে হবে দুর্নীতিকে যতই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে ততই তা বাড়বে। দুদকের সুপারিশ সমূহ বাস্তবায়ন করে দেশ দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে আমদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
hrahman.swapon@gmail.com
০১৭১০-৮৬৪৭৩৩

যাকাত ও ফিতরার মাসায়েল

মাওলানা আব্দুজ জাহের আজহারী :মাহে রমজান মুমিন বান্দার সওয়াব অর্জন করার সর্বোত্তম সময়। হাদীস শরীফে রয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করিল, সে ওই ব্যক্তির সমান হইল, যে অন্য মাসে একটি ফরয আদায় করিল।

আর সে ব্যক্তি সে মাসে একটি ফরয আদায় করিল, সে ওই ব্যক্তির সমান হইল, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায় করিল। (মিশকাত, হাদীস নং-১৮৬৮) মহান আল্লাহ চান, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ ঈমান ও আমলে সালিহার মাধ্যমে তারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখুক, ইহকাল ও পরকাল এর অফুরন্ত কল্যাণ অর্জন করুক। যাকাত ওই সকল আমল সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফরয ইবাদাত। ইসলামের রোকন সমূহের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ যাকাত। ঈমান ও সালাতের পরই যাকাতের স্থান।

 পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে সালাতের সাথে সাথেই যাকাতের উল্লেখ রয়েছে। এর অস্বীকারকারী কাফির। যাকাত আদায় না করা গুনাহে কবিরা। পবিত্র কুরআনে যাকাত অনাদায়কারীর পরিণতি বর্ণনা করে  সুরা তওবার ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা সোনা রূপা জমা করে অথচ আল্লাহর রাস্তায় তা খরচ করে না (যাকাত দেয় না) তাদেরকে সংবাদ দিন কষ্টদায়ক আযাবের, যে দিন গরম করা হবে সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে অতঃপর দাগ দেওয়া হবে সেগুলো দ্বারা তাদের ললাটে, তাদের পার্শ্বদেশে ও তাদের পৃষ্ঠ দেশে (বলা হবে) এখন স্বাদ গ্রহণ কর উহার যা তোমরা জমা করেছিলে। সম্মানিত পাঠক পাঠিকা। মহান আল্লাহ তা’লা যাদেরকে তার নিয়মিত ধনসম্পদ প্রদান করেছেন; তাদের কর্তব্য হলো, সঠিক পদ্ধতিতে সম্পদের ব্যয় করা।

মাহে রমজান যেহেতু অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক সওয়াব অর্জন করার মৌসুম, তাই এ মাসে যাকাত প্রদান করে আরো অধিক সওয়াব অর্জন করা যায়। আর সে উদ্দেশ্যে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। যাদের উপর যাকাত ফরয ঃ ইসলামী আইনবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, প্রাপ্ত বয়স্ক, স্বাধীন, মুসলমান নর-নারী সম্পদশালীর উপর যাকাত ফরয। সম্পদশালী বলতে বোঝায়, যার নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত এমন অর্থ, ব্যবসা পণ্য রয়েছে, এদের মূল্য বর্তমান বাজার দর হিসেবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের মূল্যের সমান।


আর উক্ত অর্থ (নিসাব পরিমাণ সম্পদ) এক বছর সময় পর্যন্ত তার নিকট বা অধীনে থাকে। তবে ওই ব্যক্তিকে তার (প্রয়োজনের অতিরিক্ত) সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। (১ তোলা = ১ ভরি)
* কারো নিকট যদি কিছু স্বর্ণ, কিছু রৌপ্য, কিছু ব্যবসায়িক পণ্য এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু টাকা জমা থাকে এগুলোর মূল্য যদি (নিসাব পরিমাণ) সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা সাড়ে সাত তোলা সোনার মূল্যের সমান হয় তবে বছরান্তে তার উপরও যাকাত ফরয হবে। * যদি কারো নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা পয়সা, ব্যবসায়িক পণ্য ও রৌপ্য না থাকে শুধু স্বর্ণ থাকে তাহলে স্বর্ণ সাড়ে সাত তোলা বা তার চেয়ে বেশি হলে যাকাত ফরয হবে। * যদি কারো নিকট শুধু রূপা থাকে। স্বর্ণ, ব্যবসায়িক পণ্য ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা পয়সা না থাকে। তাহলে রূপার পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা তার চেয়ে বেশি হলে যাকাত ফরয হবে।


* কারো নিকট যদি স্বর্ণ, রূপা ও ব্যবসায়িক পণ্য না থাকে। শুধু প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ বা টাকা থাকে। তাহলে ওই জমাকৃত অর্থের পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত তোলা সোনার মূল্যের সমান হয়, তবে ওই অর্থের উপর বছরান্তে যাকাত ফরয হবে।


* তদ্রƒপ যদি কারো কাছে শুধু ব্যবসায়িক পণ্য রয়েছে। স্বর্ণ, রূপা বা অর্থ নেই। তাহলে ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত ফরয হবে। ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত নিরূপণ কালে মালিকানার বছর সমাপ্তি দিবসে যে সম্পদ থাকবে তাই পুরো বছর ছিল বলে ধরে নিয়ে তার উপর যাকাত দিতে হবে।
* শেয়ারের মূল্য ডিপিএস এফডি আর এর উপর যাকাত ফরয হবে। যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়।


* ভাড়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে বাড়ি নির্মাণ করা হয় বা যে জমি ক্রয় করা হয় অথবা গাড়ি লঞ্চ ও কারখানার মেশিন বা যন্ত্রপাতি যার মাধ্যমে উপার্জন করা হয়, এ সবের মূল্যের উপর যাকাত আসে না বরং যাকাত হবে এসব দ্বারা উৎপাদিত মালামাল ও ক্রয়কৃত মালামালে র বা অর্থের উপর। অবশ্য এসব যন্ত্রপাতি, যানবাহন ইত্যাদি যদি ব্যবসার দ্রব্য সামগ্রী হিসেবে ক্রয় করা হয়, তাহলে এগুলোর উপর যাকাত ফরয হবে।


* কারো নিকট টাকা পাওনা থাকলে ওই পাওনা টাকার যাকাত দিতে হবে। তবে যে ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সে টাকার উপর যাকাত ফরয হবে না।
* যৌথ মালিকানায় অর্থ বিনিয়োগ থাকলে প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে হিসেব করে প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নিসাব পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ হলে যাকাত ফরয হবে।
* কেউ যদি বছরের শুরুতে নিসাবের মালিক হয় এবং বছরের শেষেও নিসাব পরিমাণ অর্থের মালিক থাকে, তবে তার উপর যাকাত ফরয হবে।
* যাকাত ফরয হওয়ার সময়কার বাজার দর হিসেবে সোনা, রূপা ও ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদির মূল্য ধরে যাকাত এর হিসেব করতে হবে।


* জমিন থেকে উৎপাদিত কৃষি পণ্য বা ফসলের যাকাত ফরয হবে। ফসল উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম উপায়ে সেচ দিতে হয় এরূপ জমিতে উৎপাদিত ফসলের প্রয়োজনের  অতিরিক্ত টুকুর ২০ ভাগের ১ ভাগ হারে যাকাত দেওয়া ফরয। আর ফসল উৎপাদনের জন্য কৃত্রিম উপায়ে সেচ দিতে হয় না এমন জমিতে উৎপাদিত ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগ (উসর) যাকাত ফরয হবে।


* ছাগল/ভেড়া ৪০টি বা তার অধিক গরু/মহিষ ৩০টি বা তার অধিক, উট ৫টি বা তার অধিক হলে বছরান্তে যাকাত ফরয হবে।
* যাকাতের হকদার ঃ পবিত্র কুরআন মাজীদে আট প্রকারের লোক যাকাত পাবার যোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা তওবার ৬০নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘সাদাকা (যাকাত) তো কেবল ফকির, মিসকিন ও সাদাকা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত কর্মচারীর জন্য, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য দাস মুক্তির জন্য ঋণগ্রস্তদের জন্য আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।’
* যে সকল খাতে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়। যেমন ঃ
র) যার নিকট নিসাব পরিমাণ অর্থ সম্পদ রয়েছে।
রর) যাকাত দাতা তার মা, বাবা, স্ত্রী, স্বামী, ছেলে, মেয়ে ও দাদা-দাদীকে যাকাত দিতে পারবে না।
ররর) মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদি নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে না।
রা) গরীব, অভাবীকে কোন কাজের পারিশ্রমিক বা বেতন ভাতা হিসেবে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে না।
া) অমুসলিম ব্যক্তিবর্গকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়।
সাদাকাতুল ফিতর ঃ
* মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলিম নারী পুরুষের উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব।
* এরূপ সম্পত্তি বর্ধনশীল হওয়া জরুরী নয়। গম, যব, আটা, খেজুর ও কিসমিস দ্বারা ফিতরা আদায় করা যায়।
* গম বা গমের আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম দিতে হবে। যব বা যবের আটা কিংবা খেজুর ও কিসমিস দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করলে এক সা বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম দিতে হবে। রুটি চাউল বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দিতে হলে মূল্য হিসেব করে দিতে হবে। উপরোক্ত বস্তু দ্বারা ফিতরা না দিয়ে উক্ত বস্তুগুলোর যে কোন একটির পরিমাণ মূল্য/ অর্থ দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যায়।


* সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় হলো ঈদুল ফিতরের দিন সুবহি সাদিক হওয়ার পর। সুবহি সাদিকের পূর্বে কেউ মারা গেলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। সুবহি সাদিকের পর কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে কিংবা কেউ মুসলমান হলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। কোন দরিদ্র ব্যক্তি ঈদের দিন রাতে সুবহি সাদিকের পূর্বে সম্পদশালী হলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিবে হবে। আর কোন ধনী ব্যক্তি ওই সময়ের পূর্বে দরিদ্র হয়ে গেলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না।
* ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হবার পূর্বে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। ঈদুল ফিতরের আগে বা পরে ফিতরা আদায় করলেও জায়িয হবে।
* নিজের এবং নিজের নাবালিগ সন্তানদের পক্ষ থেকে সাদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব।


* স্ত্রী এবং বালিগ সন্তানগণ ফিতরা নিজেরাই আদায় করবে। স্বামী বা পিতার উপর তাদের ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। অবশ্য দিয়ে দিলে আদায় হয়ে যাবে।
* নিজ পরিবার ভুক্ত নয় এমন লোকের পক্ষ থেকে তার অনুমতি ব্যতীত ফিতরা দিলে ওয়াজিব আদায় হবে না এবং কোন ব্যক্তির উপর তার পিতা মাতার ও ছোট ভাই বোন এবং নিকট আত্মীয়ের পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়।


* যাকাত পাবার যোগ্য ব্যক্তিগণ ফিতরা পাবারও যোগ্য। অর্থাৎ যাদেরকে যাকাত দেওয়া যায় তাদেরকে ফিতরাও দেওয়া যায়।
* এক ব্যক্তির ফিতরা একজনকে অথবা একাধিক জনকেও দেয়া যায়। আবার একাধিক ব্যক্তির ফিতরা একজনকে দেওয়া জায়িয।
* যিনি রোযা রাখতে অপারগ বা রোযা রাখেন নাই তার উপরও সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে।
মাহে রমজান সওয়াব অর্জন করার মৌসুম এবং আমল করার সর্বোত্তম সুযোগ মহান আল্লাহ তা’লা আমাদেরকে প্রত্যেকটি আমল সহিহ তরিকাহ মোতাবেক পালন করে তার নৈকট্য অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক ঃ খতিব, মদিনা মসজিদ, বগুড়া সদর
abujaher1977@gmail.com
০১৭৫৪-৩২৯১২১ 

বাজেট এবং নানা কথা

সৈয়দ আহমেদ অটল:একমাসেরও বেশি সময় লেখা হয়নি। রোজার মাসটাও লিখতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু না লিখলে কেউ কেউ খোঁচাখুঁচি করেন। লিখছো না কেন। লেখাই তো জীবন। এই বিষয় নিয়ে মন্তব্য চাই ইত্যাদি। তাদের দু’একজনকে বলেছি- আর নয়, এবার অবসরের কথা ভাবছি।

 

অবসরে গেলে প্রায় ৪০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের অম্ল-মধুর নানা অভিজ্ঞতা প্রাণ খুলে লেখা যাবে। কত মানুষকে অতি কাছে থেকে দেখলাম, যারা বাইরে এক ভিতরে অন্য। ওই যে বলে- ‘উপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’। সে সব লিখতে যৌবনকালই শ্রেয়। আজকের লেখায় প্রথমে শিরোনাম করেছিলাম ‘অবস্থাটা লেজে এবং গোবরে।’ কিন্তু হাতের কাছে নতুন অর্থবছরের ‘বিশাল এক বাজেট’ মনটা থৈ থৈ করে উঠলো। তাই বিষয় পরিবর্তন। বাজেটের তো আমিও একজন অংশীদার।

 

এবারের বাজেটে কর আর ভ্যাটের যে ছড়াছড়ি- তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব আমজনতাকে কেবলই করদাতাই মনে করেন। কর আর ভ্যাট দিতেই আমজনতার জন্ম। হ্্যাঁ সেটা ছিল, যখন আমরা পরাধীন ছিলাম। এক. বৃটিশদের দুই. পাকিস্তানীদের। এই দুই গোলামীর জিঞ্জিরে পরে আমাদের অনেকের মন-মানসিকতা ‘গোলামীতে অভ্যস্ত’ হয়ে গেছে। জি জি ছাড়া আর কিছু মুখে আসে না। আফগান কাবুলিওয়ালারা যেমন এক সময় সুদের ব্যবসা করতে গিয়ে বলতো- ‘আসল চাই না, সুদ চাই’। আর এখন সেবা দিতে পারি বা না পারি- ‘কর চাই, ভ্যাট চাই’।


কর, ভ্যাট, আবগারি শুল্ক এ নিয়ে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্যের ছড়াছড়ি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের জন্য ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন। এবারের বাজেট এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ। বাংলাদেশটা তো দিনে দিনে বড়ই হচ্ছে। অতএব বাজেটও বড় হবে তাতে অবাকের কিছু নেই। অর্থমন্ত্রী বলেছেন এ বাজেটই তার জীবনের শেষ বাজেট।

 

বয়স হয়েছে, তাকে বিদায় তো নিতেই হবে। অর্থমন্ত্রী হিসাবে মুহিত ভাগ্যবানই বটে। তিনি এক সময় স্বৈরাচার এরশাদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। স্বৈরাচার বিদায় নিলেও আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে স্বৈরাচারের আত্মা! এক সময় তিনি বিশ্বব্যাংকেও কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশ যে ভাবে জন্ম নিয়েছে সে ভাবে আমরা অর্থমন্ত্রী পাইনি।

 

বলতে চাচ্ছিলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার  সাথে মিলেমিশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পাইনি। যদি তাই হতো তবে, ভাবতে পারেন- বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কালো টাকা সাদা করা রেওয়াজে পরিণত হতে পারে? এখন ২০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা প্রচলিত আইনেই রয়েছে। কালো টাকা মানে কী। কালোটাকা মানে অবৈধ টাকা। বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই আমলেই কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই কালো টাকাই আবার বিদেশে পাচার হচ্ছে। মনে রাখতে হবে- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল অবৈধ সব কিছুর বিরুদ্ধে।


প্রস্তাবিত বাজেটের করের বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। তাতে দেখলাম, বাংলাদেশের মানুষকে একটা করচক্রের মধ্যে নিয়ে যেতে অর্থমন্ত্রীর অন্যতম লক্ষ্য। যে মানুষ আগে ব্যাংকের চৌহদ্দি পার হতো না, সেই মানুষ এখন ব্যাংকমুখী। স্বাধীন দেশে সেটা আশার কথা। কিন্তু এবার বাজেটে মানুষের মধ্যে ব্যাংক সম্পর্কে আতঙ্ক সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেন মানুষ ব্যাংক বিমুখ হয়।

 

ব্যাংক যেন শোষকে পরিণত হয়। মানুষ যেন মাটির ব্যাংকে ফিরে যায়। এমনিতেই আমাদের ব্যাংক সেক্টর নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আছে, তারপরও। একটি জাতীয় দৈনিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী যে ব্যক্তি এক লাখ টাকা সঞ্চয়ী হিসাবে ব্যাংকে রাখবেন, প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী বছর শেষে সে কোনো মুনাফাই পাবে না। অর্থাৎ তার মুনাফার পুরোটাই চলে যাবে কর, আবগারি শুল্ক, ভ্যাট এবং ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ দিতে। এটা কোন কথা হলো? এ যেন সুখে থাকতে ভূতে কিলায়।

 

এটা যেন মগের মুল্লুক। এই হলো মুহিত সাহেবদের সেবা! পাকিস্তানের ২৩ পরিবারের শোষণ থেকে বাঁচতেই এতো রক্ত, প্রাণদান। অথচ স্বাধীন দেশে মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক ব্যবধান বাড়ছে। বাজেট নিয়ে সিপিডি বলেছে- ‘এই বাজেটে মধ্যবিত্তরা চাপের মুখে পড়বে’। তা হলে আরো নিচে যারা আছেন তাদের কী হবে? করের উপর কর বসিয়ে কাদের সেবা দিতে চাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী? বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে  অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘ব্যাংকে যাদের লাখ টাকা আছে তারা সম্পদশালী’।


 এ কোন দেশের অর্থমন্ত্রী, তিনি কী ভাবে এই সিদ্ধান্তে আসলেন। হ্যাঁ তিনিই পারেন- যিনি একদা বলেছিলেন- ‘ব্যাংকের লুট হওয়া ৪ হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না’। সে জন্যই বোধ হয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখলো না। কাদের তিনি রক্ষা করতে চান-জানতে মন চায়। ভাবতে বিস্মিত হই- একটা স্বাধীন দেশে এমনটা হতে পারে? সাধারণ মানুষের তা হলে এ ব্যাপারে জানার কোনই অধিকার নেই? তা হলে দেশটা চালাচ্ছে কারা? মুহিত সাহেব কাদের প্রতিনিধি? ব্যাংকের টাকা জনগণের।

 

সেই টাকা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকবে না? আমাদের জাতীয় সংসদ এখন ব্যবসায়ীদের দখলে। সেই ব্যবসায়ীদের সংগঠন যখন বলে প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসায়ী বান্ধব, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না-এই বাজেট কোন বাজেট। বাজেটের কর, ভ্যাট, আবগারি শুল্ক নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। ঠিক এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, ‘বাজেটে সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা হবে’। বুঝলাম সেটা না হয় হলো।

 

আমাদের এতোদিনের অর্থমন্ত্রী হয়ে সাধারণ মানুষের নাড়ির খবর না রেখে এতো মাত্রায় কর-ভ্যাট-শুল্ক আরোপ করলেন? এমনটা কী কারণে। অর্থমন্ত্রী কথা অনুযায়ী ভ্যাট বৃদ্ধি পেলে নাকি জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাবে না। এটা কোনো সুস্থ কথা হতে পারে কি? মানুষের জীবনটা তো একটা চেইন অব কমান্ডের মধ্যে। সেবা বা অন্যখাতে ভ্যাট বসবে আর তার প্রতিক্রিয়া দ্রব্যমূল্যে পড়বে না -এটা কী করে সম্ভব।


 বাজেটে নানা ধরনের কর বৃদ্ধির ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য স্বাভাবিক ভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্ত এবং তার নিচের মানুষের জন্য জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে। দেশে সরকারি চাকরিদের যে হারে বেতন বেড়েছে সে হারে কেনো তার ধারে কাছেও বেসরকারি চাকরিদের বেতন বাড়েনি। অর্থমন্ত্রী সরকারি চাকরিদের বেতন বাড়িয়ে কিছু মানুষকে খুশি করেছেন বটে কিন্তু আমজনতার জীবন ধারণ কত যে কঠিন হয়ে পড়েছে তা বাতাসে কান পাতলে শুনতে পাবেন! উন্নয়ন করুন তাতে আপত্তি  নেই, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন পিঁপড়া না খায়! বলে না ‘লাভের ভাগ পিঁপড়া খায়’!

 

উন্নয়নের নামে জনগণের কাছে থেকে কোটি কোটি টাকা কর আদায় করে তা যেন দুর্নীতির সাগরে না যায়। দেশ থেকে এখন টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, সেটা রোধ করা দরকার। কেউ কেউ ভেবেছিল- সরকারিদের বেতন বৃদ্ধি পেলে দুর্নীতি থাকবে না। কেননা মানুষ নাকি অভাব থেকে দুর্নীতি করে।

 

যদি তাই হতো- তবে দুর্নীতি কী কমে গেছে। দুর্নীতি তো আমজনতা করে না। করে তারা যাদের আরো চাই। অতি সম্প্রতি সুনামগঞ্জে হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের কথা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন দুদকের কাছে। অনিয়মের মানে কী। অনিয়ম মানে দুর্নীতি। হাওর এলাকার প্রকল্পগুলোতে অনিয়মের তদন্তকারী জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সুনামগঞ্জের ৩৭টি হাওরের ডুবে যাওয়া বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে দুটি প্রকল্প নেওয়া হয় ৬৫ কোটি টাকার।


 ‘কাজ পেয়ে দুইজন ঠিকাদার বাঁধ নির্মাণ কাজ ঠিকমতো করেনি। তারপর এবারও তারা এই কাজ পেয়েছে।’ সেটা তো দুর্নীতির মাধ্যমেই হয়েছে নাকি। এতে কী শুধুই ঠিকাদার জড়িত নাকি সরকারি কর্তারাও জড়িত ছিলেন। আমার জন্য নির্ধারিত স্থানে (১২৫০শব্দ) বাংলাদেশের বর্তমান দুর্নীতির কথা লিখে শেষ করার প্রশ্নই আসে না। তাই আজ এখানেই ক্ষান্ত না হয়ে সেদিন ফেসবুকে নাসিমা মীর নামে একজনের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। তিনি খুবই দরদ দিয়ে স্ট্যাটাসে লিখেছেন- ‘কাল ভাতের মোটা চাল কিনলাম ৪৩ টাকা কেজি।

 

গত বছর বোরো  মৌসুমে এই চাল কিনেছিলাম ৩২ টাকা কেজি দরে। এক বছরে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ১১ টাকা। এই মাস থেকে গ্যাসের বিল দিতে হবে ৯৫০ টাকা। গত বছর এই সময় গ্যাসের বিল দিয়েছি ৬৫০ টাকা। এক বছরে গ্যাসের দাম  বেড়েছে ৩শ’ টাকা। গরুর মাংস গত বছর রোজায় কিনেছি ৪শ’ থেকে ৪২০ টাক। এবার রোজায় গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা। এক বছরে বাড়লো কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। খাসির মাংস কত বেড়েছে এটা না হয় বাদই দিলাম।


 কারণ খাসির মাংস ও দেশি মুরগি এখন সরকারি চাকরিজীবী, বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের জন্য বরাদ্দ।  বেড়েছে ডাল, চিনি, ছোলাসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যের দাম। জানুয়ারি মাসে বেড়েছে বাড়ি ভাড়া। বাড়িওয়ালা লিখিত নোটিশে জানিয়েছেন প্রতি বছর জানুয়ারিতে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো হবে। বিদ্যুতের বিল আসছে নাগাল ছাড়া। কাজের বুয়ার বেতন ৬ মাস পর পর বাড়াতে হয়।

 

নইলে কাজ ছেড়ে দেয়ার হুমকি। সবকিছুর দাম বাড়লেও একটুও বাড়েনি আমাদের দাম। চার বছর আগে আমাদের কাজের যে পারিশ্রমিক ছিল এখনো তাই আছে। কাজের চাপ ও অভিজ্ঞতা বাড়লেও বাড়ে না আমাদের দাম। বরং প্রতি মুহূর্তেই কাজ হারার ভয়ে সংকুচিত হয়ে থাকতে হয়। এর নাম বাংলাদেশ, আর একেই বলে বেসরকারি চাকরিজীবী নিম্ন বিত্তের জীবন ও জীবিকা!!!’
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
atalkaratoa01552@gmail.com
০১৫৫২-৩২২৯৪২

আসুন, সকল পাপাচার থেকে মুক্ত থাকি

মোহাম্মাদ মোস্তাকিম হোসাইন :রমজানের রোজা কেবল উপবাস ব্রত পালন  নয় বরং পানাহার বর্জনের পাশাপাশি একজন রোজাদারকে সকল পাপাচার হতেও বিশেষভাবে বেঁচে থাকতে হবে। যেসব কাজকর্ম মাহে রমজানের বাইরেও নাজায়েজ এবং হারাম সেসব যদি আমরা পরিহার না করি তাহেেল এ উপবাস ব্রত পালন পবিত্র সিয়ামের সঙ্গে উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ব্যাপারে পবিত্র হাদীস শরীফের দ্ব্যর্থহীন বাণী হল- যে ব্যক্তি রোজা রেখেও মিথ্যাবচন ও মিথ্যাচার (অর্থাৎ সর্বপ্রকার পাপাচার) পরিহার করে না- তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই (মানে কোন মূল্য নেই)। (বুখারী শরীফ)


পরিতাপের বিষয় হল, আমাদের সমাজে রোজা রেখেও অনেকে সুদ, ঘুষ, মিথ্যাচার, ধোঁকাবাজি, মানুষকে উৎপীড়ন, ব্যবসায় খাদ্য ও ঔষধে ভেজাল প্রদান, দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়া, পরস্পরে হিংসা-বিদ্বেষ, গীবত (পরচর্চা), ঝগড়া, কলহ-বিবাদ ইত্যাকার অন্যায় কর্মে লিপ্ত থাকেন। এ ছাড়া অশ্লীল গান-বাজনা, ছায়াছবির অশ্লীল চিত্র, ইত্যাদি পবিত্র রমজানের পবিত্রতাকে দারুণভাবে ক্ষুণœ করে। ¯্রষ্টাভীরু সদিচ্ছাসম্পন্ন মু‘মিনদের জন্যে যা দারুণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিয়ামের কাক্সিক্ষত কল্যাণ লাভের পথে তাদের যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। এ জাতীয় পাপাচারের মাধ্যমে পরিবেশ নষ্টকারী ব্যক্তিবর্গ বিশেষ অশুভ পরিণতির শিকার হবেন। আসুন আমরা সিয়ামের উপবাস ব্রত পালনের পাশাপাশি সকল পাপাচার হতে সযতেœ নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। অন্যথায় কষ্টের অনাহার ব্রত আমাদের জন্যে যথার্থ সুফল বয়ে আনবে না।


রোজাদারদের জন্যে বিশেষভাবে বর্জনীয় বিষয় হল গীবত বা পরচর্চা। গীবত এমন একটি মারাত্মক পাপ যা রোজাকে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ছাড়া সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের সমাজকে যে জিনিসটি সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাও হচ্ছে গীবত। মূলতই গীবত এমন একটি মারাত্মক ব্যাধি যা আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে দারুণভাবে কর্দমাক্ত ব্যাধি যা আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে দারুণভাবে কর্দমাক্ত ও কলুষিত করছে। বিভেদ সৃষ্টি করছে আমাদের সামষ্টিক জীবনে। জীবনের সর্বস্তরে গীবতের অপকারিতা অত্যন্ত ভয়ংকর, দুঃখপ্রদ ও শোকাবহ।


 গীবতের দ্বারা রোজাদার ব্যক্তির মানসিক পরিচ্ছন্নতা নষ্ট হয়। সমালোচনাকারী ব্যক্তি অনুভূতিশীল হলে সে নিজেই ভিতর এক প্রকার অস্বস্তি করতে পারেন। পবিত্র কুরআন হাদীসের আলোকে এখানে এ ভয়াবহ ব্যাধিটি সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত জরুরি ও সংগত রোধ করছি। পবিত্র কুরআনে গীবত বা পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করে ইরশাদ হয়েছে : “এবং কেউ কারোর গীবত করবে না, তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণাই কর। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ পাক তওবা কবুলকারী মেহেরবান। (সূরা হুজুরাত : আয়াত-১২)


গীবত হল কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত কোন বিষয়কে এরূপে উপস্থাপন করা যা শুনলে সে নির্ঘাত কষ্ট পাবে, কিংবা যা প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টা তার কাছে আপত্তিকর। যদিও সে ত্রুটি সমালোচিতের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। মুসলিম শরীফের একখানা হাদীস বর্ণিত হয়েছে- একবার হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “জানো গীবত কাকে বলে? লোকজন জবাব দিল, আল্লাহ এবং তাঁর রসূল ভাল জানেন।

 

রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উত্তরে জানালেন যে, (গীবত হল) তুমি তোমার ভাইয়ের আলোচনা এভাবে করা যা সে অপছন্দ করে। সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন – হুযূর! যদি সে ত্রুটি বাস্তবে তার ভেতর বিদ্যমান থাকে তবেও কি গীবত হবে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন হ্যাঁ, যদি বাস্তবে থেকে থাকে তবেই তো সেটা গীবত হবে, অন্যথায় তাতো হবে অপবাদ।

 

 (মুসলিম শরীফ) এই মহান রমজান মাসে নিজেদের পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যস্ততাকে যথাসম্ভব কমিয়ে বেশির ভাগ সময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে এবং আত্মজিজ্ঞাসায় লিপ্ত থাকা উচিত। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- “হাসূসু আনফুসুকুম কবলা আন তু হাসাবু।” তোমরা হিসাবের সম্মুখীন হবার পূর্বে নিজেরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ কর। এ হাদীসে সুস্পষ্টরূপে আত্মজিজ্ঞাসার কথা বলা হয়েছে। পার্থিব কোন বিষয়ে উন্নতি লাভের জন্যে যেমন প্রাপ্তি ও বঞ্চনার হিসাব-নিকাশ জরুরি ঠিক তেমনিভাবে দীনী ও ঈমানী উন্নতির মধ্য দিয়ে পরকালীন সাফল্য লাভের জন্যেও ‘মুহাসাবায়ে নাফস’ তথা আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি।


 অতীত জীবনের প্রাপ্তি ও বঞ্চনা নেক আমল ও বদ আমল ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হয়। কৃত নেক আমলের জন্যে যেমন আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হয়, তেমনিভাবে অনুতপ্ত হয়ে নতুন শপথ গ্রহণ করতে হয় ঘটে যাওয়া ভুল-ভ্রান্তি এবং পাপাচারের জন্যে। আর পবিত্র মাহে রমজানই হল এসবের জন্যে সর্বোত্তম সময়। দুঃখপ্রদ হলেও সত্য যে, আমরা এ ব্যাপারে দারূণ উদাসীন।

 

পবিত্র রমজানে আমাদের পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যস্ততা পূর্বের চেয়েও বহু গুণে বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী বন্ধুগণ এ মাসকে গ্রহণ করেন বিশেষ উপার্জনের মাস হিসেবে । রাতদিন ব্যবসায় ধান্ধায় এতটা আচ্ছন্ন থাকেন যে, কখনও তার অজান্তে নামাযের ওয়াক্ত পর্যন্ত চলে যায়। আবার যারা নামাযের ব্যাপারে মোটামুটি যতœবান তাদেরও অনেকে কোন মতে জামাত ছাড়া দায়সারা গোছের নামায আদায় করে নেন। এ সব বিষয়ে আমাদের বোধোদয় হওয়া উচিত।


পবিত্র রমজান মাসে আরেকটি বিষয় বর্জনীয় তা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত যৌন ক্ষুধা : সমাজে অপরাধ উৎপাদনের ময়দানে অবৈধ যৌন উন্মাদনার ভূমিকা সর্ব স্বীকৃত। এটি রোয়া নষ্ট ও  অপরাধ প্রবণতার এক বিষাক্ত জীবাণু বহন করে। জিনা, ব্যাভিচার, সমকাম, ধর্ষণ, ইভটিজিং, অপহরণ প্রভৃতি অসংখ্য অপরাধের উৎস হচ্ছে এই অবৈধ যৌন ক্ষুধা।


 একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সমাজের সিংহভাগ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সেই সাথে রোজাদার বান্দা হয়ে উঠবে মুত্তাকি। সিয়াম সে জন্য মানুষের যৌন উন্মদনা নিয়ন্ত্রনের বলিষ্ঠ প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত এক শান্তির সমাজে পরিণত করার প্রয়াস গ্রহণ করেছে। মূলত সিয়াম ব্রত যৌন ক্ষুধাকে নিবৃত্তি করে। যেমন রাসূল (সা) বলেছেন ঃ “হে যুবকগণ! বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহের সামর্থ্যবানদের বিয়ে করা উচিত। আর এটি যার জন্য অসম্ভব সে যেন সিয়াম ব্রত পালন করে। কেননা সিয়াম যৌন ক্ষুধাকে দমনকারী।” (বুখারী মুসলিম) পবিত্র রমজান মাসে আরেকটি বিষয় বর্জনীয় তা হচ্ছে অনর্থক কথাবার্তা ও কাজকর্ম একান্তভাবে পরিহার্য।

 

 এ ম?হান মাসে নিছক লৌকিকতাপূর্ণ সারহীন অনুষ্ঠানাদিও বর্জনীয়। যেসব কর্মকান্ডের সঙ্গে দীনের কোন সম্পর্ক নেই তা যথাসম্ভব পরিহার করে যেসব কর্মকান্ড ও আমলের সঙ্গে দীনের সম্পর্ক রয়েছে, কুরআন-হাদীসে যেসব আমলের নির্দেশ একান্তই প্রত্যক্ষ ও সুস্পষ্ট, যেসবের মাধ্যমে বান্দা ও আল্লাহর মাঝে সুনিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়, হৃদয়ে পরকালের ভাবনা জাগ্রত হয়- সেসব কাজকর্ম ও আমলকে প্রাধান্য দেয়া দরকার।


 যেমন বেশি বেশি নফল নামায আদায়, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, অধিক পরিমাণে দরূদ শরীফ পাঠ, আল্লাহর পথে দান খয়রাত, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি। এছাড়া নির্ভরযোগ্য দ্বীনী বই-পুস্তক পাঠ, ¯্রষ্টাভীরু মুত্তাকী আলিম-উলামাদের কাছে গিয়ে দ্বীনী কথাবার্তা শ্রবণ ইত্যাদি কাজেও পবিত্র রমজানের সময় ব্যয়িত হওয়া উচিত।


 স্মর্তব্য যে, ইবাদতই হল দ্বীন ইসলামের রূহ বা প্রাণ। ইবাদতের মাধ্যমেই একজন মু’মিন সুদৃঢ় ঈমান ও আত্মশক্তি অর্জন করে থাকেন। ইবাদতের যথাযথ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সাহাবায়ে কিয়াম , তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনগণ সার্বত্রিক জীবনে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। মূলত ব্যক্তি জীবনে দ্বীনের যথার্থ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক জীবনে দ্বীন প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নির্মিত হয়।


হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে : আজমিলূ ফিতাত্বালাব ও তাওয়াককালু আলায়হি- অর্থাৎ উপায়-উপকরণের অনুসন্ধান যথাসম্ভব  সংক্ষেপ কর এবং আল্লাহর উপর নির্ভর কর। সত্যিকার অর্থে যদি আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ‘ক্বাদিরে মুতলাক্ব’ তথা সর্বশক্তিমান ভাবতে পারি তাহলে পার্থিব উপায়-উপকরণ সংগ্রহে আমাদেরকে অস্থির হতে হবে না। এ জন্যে আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করতে হবে।

 

হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত  করতে হবে অবিচল বিশ্বাস । একান্তভাবে কল্যাণকামিতার ভাবনায় আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে এতক্ষণ পবিত্র মাহে রমজানের মাহাত্ম্য, শিক্ষা, এ মহান মাসের করণীয়-বর্জনীয় এবং আমাদের কতিপয় ত্রুটি ও অসংলগ্নতার কথা সংক্ষেপে আলোচিত হল। সমালোচনার জন্যে নয়, বরং আমরা যাতে সাবধান হয়ে পবিত্র রমজানের বরকত ও সমূহ কল্যাণকর প্রভাব আমাদের‘ জীবনে গ্রহণ করে ইহকাল-পরকাল সফল হতে পারি সে উদ্দেশ্যেই এ আলোকপাত।


অবশেষে আসুন, পবিত্র মাহে রমজানের মহান আহবানে সাড়া দিয়ে আমরা আল্লাহমুখী হই, সকল পাপাচার বর্জন করে ইবাদতের মাধ্যমে আমাদের সিয়াম সাধনাকে সার্থক করে তুলি, আমাদের জীবন । আলোকিত হৃদয়ের সুন্দর মানুষের বসবাসে আবার হেসে উঠুক এই বসুন্ধরা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দিন-।
লেখক ঃ ইসলামি গবেষক, কলামিষ্ট, প্রবন্ধিক ও কলেজ প্রভাষক
 mostakimbogra@gmail.com  
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রসঙ্গ কথা

মীর আব্দুল আলীম :ভ্রাম্যমাণ আদালতের কথা আসলে নিশ্চয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উ-দ্দৌলার নামটি আসে সামনে। তিনিই ভ্রাম্যমাণ আদালতের সুফলটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন দেশবাসীকে। রোকন-উ-দ্দৌলা আমার অতি সুপরিচিত এবং সজ্জন ব্যক্তি। মাদক এবং ভেজালের বিরুদ্ধে  বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

এ ছাড়া সাংবাদিকতা জীবনের প্রায় ৩০ বছরে বহু বার ভ্রাম্যমাণ আদালতের স্পর্শে আসতে হয়েছে আমাকে। আমার লেখার শুরুতেই রোকন-উ-দ্দৌলার নামটি টেনে আনলাম এ কারণে যে তিনি সাহসিকতার সাথে একসময় রাজধানীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দেশবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নেন। গোটা ঢাকায় তখন ভেজাল কারবারিরা আতংকে পড়ে যায়। স্বস্তি ফিরে আসে ভোক্তাদের মাঝে।


 এ মুহূর্তে আরেক জনের কথা মনে পড়ছে আমার। তিনি এক সময় আমার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন। নাম লোকমান হোসেন। তিনি ছিলেন রাজধানী ঢাকার কোলঘেঁষা রূপগঞ্জের সন্ত্রাসী মাদক ব্যবসায়ীসহ নানা ধরনের অপরাধীর কাছে এক আতংকের নাম। দলীয় ছত্র ছায়ায় লালিত মাদক ব্যবসায়িসহ ৬শ’রও বেশি মাদক ব্যবসায়দের তিনি এখানে তার দেড় বছরের চাকুরি জীবনে সাজা দেন।

বাল্য বিবাহ, পিতা মাতাকে মারধোর করায় সন্তান, ইভটিজারসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসীদের তিনি সাজা দিয়ে রূপগঞ্জের মানুষের কাছে প্রিয়পাত্র হন। আর এ ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। তাৎক্ষণিক সাজা হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে চরম আতংক তৈরি হয় বৈকি। এজন্য এ জাতীয় অপরাধ কমে আসে।  


যা হোক পাঠক, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকান্ড নিয়ে অতীত নিকটে জাতীয় দৈনিকের কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। ‘অস্বাস্থ্যকর ইফতার তৈরির দায়ে ফখরুদ্দীন বিরিয়ানিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা’ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাওয়ার অনুপযোগী তেল ব্যবহার করে ইফতার আইটেম তৈরির দায়ে ফখরুদ্দীন বিরিয়ানি নামের একটি খাবারের দোকানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অপর একটি খবর ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: বোম্বে সুইটসকে ২ লাখ টাকা জরিমানা’ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পচা ও পোকামাকড়সহ মিষ্টি সংরক্ষণের দায়ে পুরান ঢাকার চকবাজারে বোম্বে সুইটস অ্যান্ড চানাচুরের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে মহানগর পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত।


 এদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির দায়ে দুজনকে কারাদ  দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। রাজধানীতে মেয়াদোত্তীর্ণ নুডুলস ও শিশু খাদ্য বিক্রির দায়ে দুজনকে ছয় মাস করে কারাদ  দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। দ প্রাপ্তরা হলেন- জাকির হোসেন (২৫) এবং জাহাঙ্গীর আলম (৩৯)। অপর একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত রমজানের প্রথম দিন পুরান ঢাকার বাদামতলীতে অভিযান চালিয়েছেন আম ও কলায় বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়ায় দুই আড়ত মালিককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শেরপুরের শ্রীবরদীতে ইয়াবা বিক্রির অপরাধে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদ  দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২৯ মে দুপুরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালেদা নাছরিন এ সাজা প্রদান করেন।

 ‘রমজানে বেশি দাম রাখায় দুই মাংস বিক্রেতাকে জরিমানা’ ‘কেমিকেল মেশানো ১ ট্রাক আম বিনষ্ট করলো ভ্রাম্যমাণ আদালত’  আরও একটি খবর “২৯ কাঁচাবাজার পর্যবেক্ষণে ৮ ভ্রাম্যমাণ আদালত”।  ইতিবাচক এসব সংবাদ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এমন রায়ে ভেজাল কারবারি, মাদক ব্যবসায়ীসহ অপরাপর সন্ত্রাসীদের মধ্যে আতংক তৈরি হবে বৈকি! এমন আদালত পরিচালনায় উপরোক্ত অপরাধ কমে আসতে বাধ্য। সাম্প্রতিককালের আদালদের রায়ের পর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্ট বন্ধ হলে নিম্ন বর্ণিত সমস্যাগুলোর উদ্ভব হতে পারে বলে মনে করি-  


১. ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যে বাজার সয়লাব হবে। ২. বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ৩. মদ, জুয়া, মাদকে দেশ ভরে যাবে। ৪. পরিবহন খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। ৫. লঞ্চডুবি, নৌকাডুবি বেড়ে যাবে। ৫. নিষিদ্ধ নোট বই পড়ে শিক্ষার্থীরা মেধাহীন হয়ে পড়বে। ৬. পাবলিক পরীক্ষায় নকল বেড়ে যাবে। ৭. ভুয়া ডাক্তার দের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাবে। ৮. অবৈধ ঔষধ বাজার দখল করবে। ৯. ওজনে কম দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাবে। ১০. হোটেল-রেস্টুরেন্ট এর মান বজায় থাকবেনা বা সাধারণ মানুষ প্রতারিত হবে। ১১. ভেজাল দুধ বিক্রয় হবে নির্ভয়ে। ১২. অবৈধভাবে এসিডের ব্যবহার বেড়ে যাবে।

১৩. জাটকা ইলিশ নিধন ঠেকানো যাবেনা। ১৪. পবিত্র রমজান মাস, এসময় পণ্যের মান ও বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ এ রাখতে না পারলে সরকারের জনপ্রিয়তা থাকবেনা। ১৫. সর্বোপরি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রজাদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। বাস্তবতার আলোকে আরও কিছু মতামত ঃ

 
আমরা মনে করি, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা অবৈধ ঘোষণার প্রভাব পরবর্তী কয়েকদিনে তৃণমূলে পড়তে শুরু করে। বেশ ক’জন নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, যুগ্ম সচিবসহ মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সাথে এ নিয়ে আলাপ করে জানতে পারি যে, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদক, বালু উত্তোলন বা খাস জমি দখলের একাধিক ঘটনা জানার পরও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।

এমন পরিস্থিতি বিরাজ করলে মাঠ প্রশাসনের শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা জেগে উঠবে। মাঠ প্রশাসনের ইউএনও, এসিল্যান্ডসহ জেলা প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম দ্বীপ; চরাঞ্চল যেমন হাতিয়া, সন্দ্বীপ; হাওর এলাকা যেমন খালিয়াজুড়ী; পাহাড়ী এলাকা যেমন বরকল, বাঘাইছড়ীসহ অনেক দুর্গম এলাকায় চাকুরী করেন। উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, ঝড়, সাইক্লোনের মত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এসব কর্মকর্তাগণ পারঙ্গম।


 দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা, নির্বাচন, বাল্য বিবাহ রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধ, উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ, মাদকদ্রব্য বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ রক্ষা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখা, ভেজাল বিরোধী অভিযানসহ বহুবিধ দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার নিমিত্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকা জনস্বার্থে অত্যাবশ্যক ও যৌক্তিক বলে ইতোমধ্যে সর্বসাধারণের কাছে প্রতীয়মান। দুর্যোগের সময় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাই উপকূল, হাওর, দ্বীপ ও পাহাড়ী এলাকায় বিচরণ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে। রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত এসব কর্মকর্তাগণ কর্ম সম্পাদনে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছে।


 জননন্দিত ও ঐতিহ্যবাহী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা প্রদানের আইন বর্তমান সরকার জনস্বার্থে জাতীয় সংসদে পাশ করে। পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার মনিটরিংসহ ভেজাল প্রতিরোধ, নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অভিযানসহ নানাবিধ কাজে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণকে দুর্বল করলে জনকল্যাণমূলক সেবা নিশ্চিত করা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী প্রত্যেক উপজেলায় নিয়োগকৃত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য আদালত কক্ষ থাকার প্রয়োজনীয়তা আজ অনুভূত। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ (ডি) ধারায় অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা প্রাপ্তি ও প্রয়োগ জনস্বার্থে বাস্তবিক হবে।


 একই সাথে মোবাইল কোর্টের যে সকল ধারাকে সংবিধান পরিপন্থ’ী বলে রায় দেয়া হয়েছে সে সকল ধারা সংশোধন/সংযোজন/পরিমার্জন করে সংবিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ রেখে বর্তমান মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনপূর্বক সময়োপযোগী করা যেতে পারে। এছাড়া নি¤েœাক্ত বিষয়সমূহেও দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে ঃ- (১) ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী প্রত্যেক উপজেলায় নিয়োগকৃত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আদালত কক্ষ স্থাপনের ব্যবস্থা করা।

যাতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং এসিল্যান্ডগণের জন্য একটি স্থায়ী আদালত কাঠামো তৈরী হয়। (২) জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় কাঠামোসহ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণকে ফৌজদারি কার্যবিধি- ১৮৯৮ এর ১৯০(ডি) ধারা অনুযায়ী ক্ষমতা অর্পণ।  (৩) মোবাইল কোর্টের যেসব ধারা সংবিধান পরিপন্থী বলে রায় দেয়া হয়েছে প্রয়োজনবোধে সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলো সংশোধন/ পরিমার্জন/ পরিবর্ধনপূর্বক আইনটি সময়োপযোগী করা। (৪) আবশ্যিক হলে জনস্বার্থে ভিশন-২০২১ এবং ভিশন -২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি মধ্যম এবং উন্নত বাংলাদেশ গঠণের লক্ষে সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে অথবা অন্য কোন স্থানে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়টি সংযোজন করা যেতে পারে।


মাঠ প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাগণ তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে। ফলে তাঁদের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সকল স্তরের সকল মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ অসীম। যা সরকারের অপরাপর যেকোন ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ থেকে লক্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান এবং  সুপ্রতিষ্ঠিত। সামাজিক ন্যায় বিচার করার পূর্বে সামাজিক ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা এবং সামাজিক বিভেদ সম্পর্কে বাস্তবিক ধারণা থাকলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার পথ অনেক বেশি সম্প্রসারিত হয়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ মাঠ পর্যায়ে সকল শ্রেণীর লোকের সাথে একযোগে দায়িত্ব পালন করে।

এক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর চেয়ে অধিক দক্ষতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা অন্য কারোর জন্য প্রায় অসম্ভব। বিষয়টি কল্পনাপ্রসূত নহে, বাস্তবিক এবং অভিজ্ঞতার আলোকে পরীক্ষিত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের গৃহীত সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নে জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থ নিশ্চিতকরণে উদ্ভূত পরিস্থিতির আলোকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ স্ব-স্ব উপজেলায় আদালত কক্ষ সৃজন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৯৮ এর ১৯০(ডি) ধারার ক্ষমতা প্রত্যেক এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রদান করে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগমের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করা হল।


মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার কারণে বিগত সময়ে মানুষ অনেকটাই সচেতন হয়েছে এবং বিভিন্ন অপরাধ অনেকাংশে কমে এসেছে। মোবাইল কোর্ট বিআরটিএ ও পাসপোর্ট অফিসকে দালাল মুক্ত করার সহযোগিতা, ট্রাকের বাম্পার অপসারণ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর জেলার পণ্যে বাধ্যতামূলক চটের ব্যবহার নিশ্চিত করণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং বা যৌন হয়রানী, মাদক নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সম্পত্তি,

খাসজমি জবর দখল, রাস্তার গাছ কর্তন, অবৈধ বালু উত্তোলন, হাটবাজারের জমি দখল, পাবলিক পরীক্ষায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, খাদ্য ভেজাল প্রতিকার, ভোক্তা অধিকার রক্ষা, জুয়া, সড়ক নিরাপত্তা জোরদারকরণসহ মোবাইল কোর্টের আওতায় বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নওগাঁ জেলা প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এর ফলে দেশের বিভিন্ন মহলে কাছে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন।


 আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাশীলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ মামলা মোবাইল কোর্টেই নিষ্পত্তি হয়েছে। ৭ বছরে ২০৮ কোটি টাকারও বেশি জরিমানা আদায় হয়েছে বৃদ্ধি পেয়েছে সরকারের রাজস্ব। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে গত সাত বছরে বিভিন্ন প্রকৃতির আট লক্ষাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে। প্রায় ৩ লাখ ৬২টি কোর্ট পরিচালনা করা হয় এ সময়ে। এছাড়া প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার ৭৩১টি নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগের সূত্রে ২০৮ কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ৪১২ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২০০৯ সালে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল আট লাখ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমবেশি ৩০ লাখ।


 বিপুল সংখ্যক এই মামলার বিচার সম্পন্ন করার মতো বিচারক ও অবকাঠামোর সংকটের কথা একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে। খাদ্য পণ্যে ভেজাল প্রতিরোধ, পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ কিংবা ইভটিজিং নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট প্রশংসা কুড়িয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও মোবাইল কোর্ট অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এছাড়াও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়নে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেছে। গত বছর থেকে ফরমালিন মুক্তভাবে আম বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে মোবাইল কোর্ট।

ন্যায় বিচারের ঝা া হাতে করে এদেশে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে কাজ করে চলেছে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত। গণমানুষ সংশ্লিষ্টতা এদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মূল শক্তি সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি সেবাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে প্রচেষ্টা যা “রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১” বাস্তবায়নে সহায়ক; অনুরূপভাবে বিচার ব্যবস্থাকে জনগণের দোর গোড়ায় তথা “ঔঁংঃরপব ধঃ ঃযব উড়ড়ৎ” হিসেবে মোবাইল কোর্ট কাজ করছে। এ কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি ভাবা উচিৎ বলে মনে করছি।

 
সর্বোপরি বলতে পারি, দেশের প্রচলিত মোবাইল কোর্ট আইন বন্ধ হলে দেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠী লাভবান হতে পারে। তবে এটি বন্ধ হলে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে অপরাধ প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের মানুষ বাজারের ক্রয়কৃত অনেক ভেজাল খাদ্য দ্রব্য থেকে বিষ খাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে বলে সমাজ বিশ্লেষক ও সমাজ সচেতনমনারা আগামীতে মহাআতংকে ভুগছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে এই সুযোগকে পুঁজি করে মুনাফা অর্জনে বিভিন্ন প্রকার পাঁয়তারা করবে। আর প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে সর্ব শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিষয়টি সরকার এবং বিচার বিভাগের বিবেচনায় আনা উচিৎ।
লেখক ঃ সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
 newsstore13@gmail.com
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

রাজনৈতিক প্রবাহ ও আমাদের সমাজ

তাহমিনা আকতার পাতা :রাজনীতি নিঃসন্দেহে একটি কঠিন ও জটিল বিষয়। এর অন্তর্নিহিত কৌশল উদ্ধার করা সব ক্ষেত্রে, সবার পক্ষে সহজ নয়। রাজনীতি ও সমাজ শব্দ দুইটি পাশাপাশি অবস্থান করলেও তাদের মধ্যে কাজের পার্থক্য রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। মূলত রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ছায়া সমাজে প্রতিফলিত হয়।

সমাজ কিন্তু তার নিজের ছায়া কমই রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বিশেষ করে আমাদের দেশে। সমাজের চিত্র অনুসারে যদি এদেশে রাজনৈতিক কার্য পরিচালিত হতো তাহলে আজকের সমাজের চেহারা এমন হতো না।


অনেকেই রাজচক্র পছন্দ করেন না। তারা কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশে থাকতে পছন্দ করেন। অনেক ক্ষেত্রে সমাজের জন্য সামান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিও করতে চান না। অবশ্য এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। তবে, আমি তাদের কথাই বলছি যারা সমাজের প্রতি সচেতন। যারা সমাজের চিন্তায় নির্ঘুম রাত পার করে।

 এসব সচেতন ব্যক্তিদের অনেক সময় দূর্ভোগও পোহাতে হয়। এই যেমন দলাদলির কথাই ধরা যাক। সমাজের জন্য কিছু করতে গেলে মোটামুটিভাবে রাজনীতির সঙ্গে কিছুটা জড়িয়ে যেতেই হয়। আমি সব ক্ষেত্রে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কথা বলছি না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে। আর সেখানেই যত সমস্যা। আমাদের দেশে যে কতগুলো রাজনৈতিক দল রয়েছে, তার হিসাব নাইবা করলাম। প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে এক একটি নতুন দলের জন্ম, এক এক বেলায় রাজপথে মিছিল নিয়ে বের হয়। প্রতিটি মানুষের নামের শেষে যেমন টাইটেল থাকে।


 আমাদের দলগুলোও তেমন আজকাল টাইটেলধারী হয়ে গেছে। কাজের চেয়ে নাম ফুটায় বেশি। এদেশের রাজনীতির চালচিত্র দেখতে দেখতে সাধারণ জনগণ এখন বোঝে স্বৈরাচারে উৎসাহী, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, বাড়াবাড়ি, হরতাল, খুন, কথায় কথায় মিছিল, গুলিবর্ষণ, কালো টাকার খেলা, শেয়ার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, অর্থনৈতিক বিপর্যস্ত পরিবেশ, দালালের দৌরাত্ম আর আমাদের সমাজ বলতে যদি বুঝায় অসহায় মানুষের ক্ষুধাকে পুঁজি করে সমাজ ব্যবস্থায় ধনী দিন দিন আরও ধনী হওয়া। তাহলে আজকের বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মরা কোন দিকে পা বাড়াবে?


যেহেতু আজকের শিশু, আজকের নাগরিকরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এদেশের ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য অবশেষে একটি বিজয়ের জন্য কত নাম না জানা শহীদ ভাইয়েরা প্রাণ দিলো। জিম্মি এদেশকে স্বাধীন করলো অথচ কি দুঃখের বিষয়, আজ আমরা নিজেরা নিজেদের কাছে কি করুণভাবে জিম্মি।

রাস্তা-ঘাটে, সভা-সমিতিতে হৈ-চৈ মুখরোচক বক্তৃতায় মাউথপিস গরম। কথাগুলো, বক্তার ভাষাগুলো তখন শুনতে ভীষণ মূল্যবান মনে হয়। শোনার সময় শুনতে মন্দ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এরকম বুলি আউড়িয়ে কি কোন কাজ হচ্ছে, সমাজের কোনো পরিবর্তন হয়েছে শান্তির জন্য?

 বাইশ বছর আগে যা লিখেছি, বাইশ বছর পর সমাজের একই চালচিত্র নিয়ে লিখতে হচ্ছে। রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, দারিদ্রতা একই ইস্যু। আজকাল প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিকে ব্যবহার করে স্বার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। ফলে সমাজের সকল দিক দিয়ে নেমে আসছে অন্ধকার জটিলতা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে বিশ্বের কাছে আমাদেরকে  নত হতে হয়।


 দিশেহারা হচ্ছে ক্ষুধিত মানুষ। ক্ষুধার তাড়নায় মা শিশু সন্তানকে বিক্রী করে সামান্য পয়সার বিনিময়ে। কাজের সন্ধানে এসে শহরের দালালদের কাছে মিথ্যা প্রলোভনে জলাঞ্জলি দেয় নারী তার জীবন ও যৌবন। একের পর খুন হচ্ছে সালেহা, ফুলবানু, চাঁপা, রীমা, সাগিরা মোর্শেদা সহ আরো নাম না জানা বোন ও ভিকটিমরা।

অথচ এসব বন্ধ করবার কেউ নেই। ফলে দিনের পর দিন বেঁচে যাচ্ছে শত শত শয়তান হায়েনারা। সাম্প্রতিক সময়ে বনানীর দ্যা রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনা রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে।


কে সাহস নিয়ে দাঁড়াবে। অন্যায়ের প্রতি যাদের রুখে দাঁড়ানো উচিত তাদের মুখেই তো দেখি আজকাল নকল মুখোশ। কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স। তবুও যেন লোভী মানুষেরা নিজের লোভটাকে সামলাতে পারে না। কুখ্যাত কালা কানুনই এদের ধর্ম।

জনসভায় এরা সাধারণ মানুষের মন গলাতে পটু। আর অন্তরে শোষণের নিত্য নতুন বাণী ও আগুন। স্মাগলিং চোরাকারবার থেকে কিন্তু এরা থেমে থাকেনি। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই এর সত্যতা মেলে। ট্রাক বোঝাই অস্ত্র, মাদক, সোনা ও নিষিদ্ধ পণ্য কাদের ইঙ্গিতে দেশের ভেতরে ঢোকার সাহস পায়।

 এ প্রশ্ন আজ সমগ্র সাধারণ মানুষের। অন্তত এভাবে বলা যায় দিনের বেলায় সাধু, রাতে চোর। উচ্ছৃঙ্খল কার্যকলাপে বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সকলের মনকে ভেঙ্গে দিয়েছে। অস্ত্রের ভাষায় যুক্তি আজ হারিয়ে গিয়েছে। দুস্কৃতিকারীর রিভলবারে নীতি আজ স্তব্ধ। স্বার্থান্বেষী কিছু লোক সযতেœ লালন করে চলছে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মাস্তানদের, দেশের শীর্ষ টেররদের। নিজের কুকর্মকে ঢেকে রেখে মঞ্চে উঠে অনেকেই মনে করে আমিই নেতা। সত্যিকার নেতা হওয়া অনেক গুণের ব্যাপার।

 একজন নেতাকে সমাজের জন্য মানুষের জন্য মহৎ এবং সভ্য কাজগুলোই করা উচিত। তাতে জাতির মঙ্গল হবে। মঙ্গল হতে বাধ্য। এদেশকে নিয়ে যারা স্বার্থবাদী উদ্ভট চিন্তা করে তাদের উচিত আত্মগড়া জটিল রাজনীতির কুটিল ষড়যন্ত্রে না গিয়ে দেশের জনগণের জন্য কিছু অবদান রাখা।

তাতে অন্তত ইতিহাসের এক কোণে হলেও নিজের নামটা স্থান পাবে। ভাল কাজ, ভালো নীতি, ভালো মানুষ যারা ছিলেন, যারা ভালো নেতা ছিলেন, সমাজের কিছু মহৎ ও সদ্য প্রয়াত গুণিজন যারা তাদেরকে সমাজ, রাষ্ট্র, জনগণ ঠিকই সারা জীবন শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে। এসব থেকেও আমাদের শেখা উচিত।

 
আমরা বাঙালিরা সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে আজ এতই নিচে নেমে এসেছি যে, এদেশকে নিয়ে নতুন সম্ভাবনার কিছু ভাবতে চাই না। জটিলতার মধ্যেও সম্ভাবনার শেকড় থাকে, এ ভাবনার সময় আমাদের কই। আজকাল আমরা বড় বেশি ধান্ধাবাজ হয়ে গেছি। সবাই স্বার্থের পিছনে ছুটছে।

ফলে একের পর এক শিকার হচ্ছে ক্ষুধাপীড়িত অসংখ্য দেহ, মন ও রক্ত। জীবনের কাছ থেকে সমাজের কাছ থেকে নীচতা, হীনতা, আর দীনতা ছাড়া যেন এদের আর কিছুই পাওয়ার নেই। উপর তলার প্রাচুর্য ও চাকচিক্য, রুচি ও বিদ্যা সবই গড়া হয় শ্রমিকের বিন্দু বিন্দু ঘাম, অস্থিমজ্জা দিয়ে।

 
মাদকতামূলক হেরোইন, ফেনসিডিল বহন করার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। কাদের ইঙ্গিতে উক্ত ব্যক্তিটি হেরোইন, ফেনসিডিল বহন করে, পাচার করে। কোটি কোটি টাকার হেরোইন কেনার মতো সামর্থ্য নিশ্চয়ই এ লোকটির নেই। তাহলে এ কোটি টাকার হেরোইন, মাদকদ্রব্য কার বা কোন গোষ্ঠী চক্রের? আরো লজ্জার বিষয়, যারা এই মাদক নিয়ে খেলা করে তাদের অনেকেই আবার রাজপথে বড় গলায় শ্লোগান দেয় মাদকদ্রব্য বন্ধ করো, মাদক সেবন বন্ধ করো, দেশকে সুন্দর করো আরো কত কী?

 বাংলার প্রবাদ বাক্য “চোরের মার বড় গলা” বিশ্বাস করা ছাড়া আর আমাদের সাধারণদের উপায় কি? যে দেশে যত বেশি দুর্নীতি, ধান্দা, রাজনৈতিক অরাজকতা, হরতাল, খুন, ধর্ষণ, রাজাকারের আস্তানা, সে দেশে প্রতিদিনই মানুষ কোনো না কোনো আতঙ্কে বেঁচে থাকে।

ঘর থেকে বের হয় কাজের সন্ধানে নিরাপত্তাহীনভাবে। অর্থনৈতিক মন্দা হাওয়া দেশ ও মানুষকে করে পঙ্গু। মনের সাজানো বাগান, ইচ্ছা, অনিচ্ছা, প্রেম-ভালোবাসা জীবনের করালগ্রাসে হারিয়ে যায় অন্য কোনো ঠিকানায়। সে ঠিকানা থেকে জন্ম নেয় অগ্নিমানুষ অগ্নিকন্যাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুগ যুগান্তরের


অন্তরের ক্ষোভ, দীপ্ত শপথ, সুন্দর আগামীর জন্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার নতুন অঙ্গীকার প্রজ্জ্বলিত প্রজন্মের এক অবিস্মরণীয় নতুন শ্লোগান ম্যাসেজ। দেশ রক্ষার মিশনে জাতিকে আজ নতুন করে ভাবতে হবে, জানতে হবে এবং সর্বোপরি সকল সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।


এদেশে এখন চলছে পাল্টা-পাল্টি দেশ ধ্বংসের রাজনীতি। চোখের সামনে আমরা দেখতে পারছি ১৯৭১ সালের বর্বর পাকিস্তানি স্টাইলে মানুষ হত্যা, সম্পত্তি ধ্বংস সংখ্যালঘুদের বাসস্থান জ্বালানো পোড়ানো, ধর্ষণ, লুটপাট সহ জঘন্য কার্যকলাপ।


 অর্থনৈতিক নানা ইস্যুকে সামনে নিয়ে মিটিং মিছিল চলছে। অর্থনৈতিক কালো থাবা এদেশের ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প কারখানায় খারাপ প্রভাব ফেলছে প্রতিদিন। ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জের “সেভেন মার্ডার” দেশের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

এসব গুম, খুন, অপহরণ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দেশকে নিয়ে গেছে এক নোংরা রাজনীতির দিকে। এদেশের কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশ ধ্বংসের যে নীল নকশা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা ভাবতে এবং বুঝতে পারলে গা শিউরে ওঠে। ইদানিং রাজনীতির পদে পদে কাউয়া, ইন্দুর, মিশন, প্যশন, ভিশনের উপদ্রবে রাজনৈতিক মাঠ ময়দান সয়লাব।


 অনেক বছর আগে ভারতে কাউয়া নিয়ে একটা হিন্দি গান তুমুল জনপ্রিয় হয়ে কাউয়া বা কাক পাখি আমাদের কাছে সুপারস্টার হয়েছিল। ্গানটা সম্ভবত এমন ছিল ”সুপার কালা কাউয়া দেখা, কা কা——ঝুট বোলে কাউয়া কাকে”। যাহোক এতো বছর পর আবার সেই কাউয়া রাজনীতিতে সুপার কাউয়া হয়ে এসেছে। এ কাউয়া কি আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য? তবে এটা আমরা অবিশ্বাস করি যে এদেশ থেকে মহৎ মানুষ হারিয়ে গেছে।


 এদেশে এখনো মহৎ এবং উদ্যোগী মানুষ আছেন। সমাজে এখনও সৎ মানুষ নিজেরা সাধনা করছেন। সমাজের চোখ ধাঁধানো বিশাল অট্টালিকার পাশাপাশি না খাওয়া মানুষের আহাজারি। এই বিশাল অট্টালিকার ভেতর থেকে যে অহংকার বিচ্ছ্বরিত হয়ে সমাজকে কলুষিত করছে সে অট্টালিকা, সে অহংকারকে শাবল হাতে উপড়ে ফেলতে হবে। তারপর শুরু হবে সব নোংরা সরিয়ে মানুষ জাতির নতুন বসতি গড়ার সকাল-সন্ধ্যা কাজ, এই কাজ করবে মানুষ মহত্তের প্রয়োজনে। এই বসতিতে সমাজের উপর তলার ঘর থাকবে না।


 এই বসতির প্রতিটি ঘরেই জোসনা খেলা করবে। সতেজ অমলিন বাতাস থেকে গ্রহণ করা হবে শ্বাস-প্রশ্বাস। আমাদের এই বাংলার মাটি আর বাঙালির সমাজ থেকে হিংসা, কুটিল, নীল-জঙ্গি, নিচ-স্বার্থপর মনগুলো হারিয়ে যাবে চিরতরে। রাজনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপট এই দুই অঙ্গন পরিচ্ছন্নভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে নতুনভাবে জেগে উঠবে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে পরিচ্ছন্ন জাতি হিসেবে সর্বময় আত্মপরিচয়ে জেগে থাকবে।

 

গণতন্ত্র এগিয়ে যায় তার নিজেস্ব ধারায়। দেশের চলমান রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন হোক পরিবারতন্ত্রের। এ সময় এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার। মেধাবী, চৌকষ আত্মনিবেদিত তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসবে সাধারণ জনগণ সে আশাই করে। 

         লেখক: আইনজীবি ও প্রাবন্ধিক
            জজ কোর্ট, ঢাকা।
            ০১৭১১-৮২৫৫৫৪

খাদ্য মজুদ ও ভোক্তার স্বার্থ

কথায় আছে ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।’ সে রকম এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে সরকারিভাবে খাদ্য মজুদের ক্ষেত্রে। মূলত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অদূরদর্শিতা, অজ্ঞতা, অবহেলা এবং অপরিণামদর্শিতার কারণে গত ২১ মে পর্যন্ত সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুদ ছিল মাত্র ২ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৫ টন (সুত্র: দৈনিক আমাদের সময়, তাং: ২২/০৫/১৭ ইং)। যা স্মরণকালের মধ্যে সর্বনি¤œ।

আব্দুল হাই রঞ্জু  : সরকারি সুত্র মতে, গত ২০১১-১২ অর্থ বছরের মে মাসে সরকারি খাদ্য গুদামে চালের মজুদ ছিল ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৬০২ টন, ২০১২-১৩ অর্থ বছরের মে মাসে চালের মজুদ ছিল ৬ লাখ ৯৯ হাজার ১৫৩ মেট্রিক টন, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের মে মাসে চালের মজুদ ছিল ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৩৭৬ মেট্রিক টন, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের মে মাসে চালের মজুদ ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৩০৭ মেট্রিক টন, আর ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের মে মাসে চালের মজুদ ছিল ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৩ মেট্রিক টন।

এবারই প্রথম মহাজোট সরকারের শাসনামলে মে মাসে চালের মজুদ সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে চলতি বছরের বাজেটের বরাদ্দ অনুযায়ী, বিভিন্ন খাত-উপখাতে চালের প্রয়োজন হবে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন। অথচ এই মুহূর্তে সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুদ আছে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক পরিমাণ।


 যাকে বিশেষজ্ঞরা ভয়াবহ পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর করাটাই স্বাভাবিক, কারণ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সরকারি খাদ্যগুদামে আপদকালীন খাদ্য মজুদ কাঙ্খিত পরিমাণ থাকা উচিৎ। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে কমপক্ষে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ থাকা প্রয়োজন।

আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর একদিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় ৪৬ হাজার টন। সে হিসাবে, আমাদের দেশের ৬০ দিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার টন। অথচ কোন কালেই আমাদের দেশের খাদ্য গুদামে ৬০ দিনের তো নয়ই, মাত্র ১৫-২০ দিনের খাদ্য বরাবরই মজুদ ছিল। যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এবারই প্রথম সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি মাত্র ৫ দিনের সীমানায় নেমে এসেছে।


 অবশ্য সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ধারণা ছিল, যেহেতু বোরো মৌসুমে সরকার প্রতিবছরই কম-বেশি ৭/৮ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে চাহিদা পূরণ করে থাকে, সেহেতু এ বছরও সরকার বোরো মৌসুমে অন্তত ৭/৮ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে চাহিদা পূরণ করতে পারবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা হয়ত অর্জন করা সম্ভব হবে না।

এমতাবস্থায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যদিও সরকারের তরফে বারংবার বলা হচ্ছে, সরকারের যে পরিমাণ খাদ্য শষ্য মজুদ আছে, তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতা সে কথা বলে না। ফলে সরকারের তরফে এ ধরণের বক্তব্য যে, ফাঁকা বুলি, যা আর বলার অপেক্ষাও রাখে না। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অতিবৃষ্টি, খরা ও অসময়ে বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী।


 এর ওপর আবার উজানের প্রতিবেশি দেশ আন্তর্জাতিক পানি আইন লংঘন করে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ এখন মরুকরণের দিকেই এগুচ্ছে। কোন কারণে অতিবৃষ্টি কিম্বা বন্যার বাড়তি পানি ছেড়ে দিয়ে অসময়ের বন্যা বাংলাদেশের কৃষি চাষাবাদকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর একমাত্র বোরো চাষ নির্ভর হাওর অঞ্চল খ্যাত জেলাসমূহে উজানের পানির ঢলে আধা পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

শুধু উজানের পানির ঢলেই হাওর অঞ্চলের ৭টি জেলার ধানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেক ব্লাষ্টের কারণে শস্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার বোরো ধান। মূলত অসময়ে অতিবর্ষণের কারণে নেক ব্লাষ্টে ফলন বিপর্যয় ঘটেছে। ফলে ধান কাটা মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়ছে হু হু করে।


 এখন ভোক্তা পর্যায়ের মোটা চাল কিনতে হচ্ছে কেজি প্রতি অঞ্চল ভেদে ৪৮ টাকা পর্যন্ত। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে  চাল আমদানির জন্য দরপত্রও আহবান করেছে। এ ছাড়াও খোদ খাদ্যমন্ত্রী অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহকে সফল করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন।

শুধু দেশেই নয়, তিনি এখন বিভিন্ন দেশ হতে চাল আমদানির জন্য বিদেশ পর্যন্ত সফর করেছেন। অথচ গত বোরো মৌসুমে বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছিলেন। কৌশল নিয়েছিলেন প্রথম পর্যায়ে কৃষকের নিকট থেকে ধান সংগ্রত করবে, পরে মিলারদের নিকট থেকে অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম পরিমাণ চাল সংগ্রহ করবে।


 করেছেও তাই। অর্থাৎ সরকারিভাবে খাদ্য মজুদের ওপর গুরুত্ব কম দেয়া গত বোরো মৌসুম থেকেই শুরু হয়েছে। এর ওপর আবার সরকারের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রি করায় চালের মজুদ স্মরণকালের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে চলে আসে। কর্মসূচি গ্রহণ ও তার সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা। আর তা করতে না পারলে চরম মাশুল যে গুনতে হয়, তা খাদ্য মন্ত্রণালয় এবার হাঁড়ে হাঁড়ে উপলব্ধি করছে।

এ বছর বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৮ লক্ষ মেট্টিক টন নির্ধারণ থাকলেও চাল কল মালিকরা গত ২১ মে পর্যন্ত চুক্তি করেছে মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার টন। হয়ত শেষ পর্যন্ত চুক্তির পরিমাণ আরও কিছু বেড়েছে। অথচ গোটা দেশের প্রায় ২০/২২ হাজার  চালকল বছরে দু’বার সরকারকে চাল দেয়ার জন্য তীর্থের কাকের ন্যায় অপেক্ষা করে।


 শুধু ধানের বাড়তি বাজার মূল্যের কারণে এ বছর অধিকাংশ চালকল মালিক চুক্তিবদ্ধ হননি। বর্তমানে কাঁচা মোটা ধানের ৪০ কেজির প্রতি মণের মূল্য অঞ্চল ভেদে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। ধান কাঁচা হওয়ার কারণে প্রতি মণে ২০/২১ কেজি চালের বেশি রেশিও পাওয়া যায় না।

অথচ সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ধানের মূল্য ২৪ টাকা নির্ধারণ করায় প্রতি মণ ধানের মূল্য দাঁড়ায় ৯৬০ টাকা। সে ধান আর্দ্রতাহীন শক্ত ও ফেনিং করা উন্নত মানের। সরকারি হিসেবে যার নূন্যতম রেশিও হবে প্রতি মণে ২৬ কেজি চাল। সেখানে একজন মিলার ৮০০ টাকা মণে কাঁচা ধান কিনে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে চাল উৎপাদন করলে খরচ পড়বে অন্তত ৩৭ টাকা থেকে ৩৮ টাকা।


 এমতাবস্থায় চালকল মালিকানা চুক্তি করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে চাল কল মালিক সমিতির পক্ষে অন্তত কেজি প্রতি ৪ টাকা প্রণোদনা চাওয়া হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় অনড়, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহকে সফল করতে কোন প্রকার প্রণোদনা দেয়া হবে না।

উল্টো খাদ্যমন্ত্রী আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কিম্বা জিটুজি পদ্ধতিতে কেজি প্রতি অন্তত ৪৫/৫০ টাকায় চাল আমদানি করবে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সংগ্রহকে সফল করার জন্য প্রণোদনা দিবেন না, এটাই বাস্তবতা। অথচ গোটা দেশে কৃষি ভিত্তিক শিল্প হিসেবে একমাত্র চালকল শিল্পই মূখ্য।


 যে শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের রুটি রুজি নির্ভরশীল। শুধু রুটি রুজিই নয়, এ শিল্পে অর্থ বিনিয়োগকারী ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে। আর অভ্যন্তরীণ সংগ্রহে অংশ না নিলে অধিকাংশ চালকলই বন্ধ থাকবে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিককেও কাজ হারাতে হবে অর্থাৎ কর্মসংস্থানের পথ সম্প্রসারিত হওয়ার বদলে আরো সংকুচিত হবে।


অবশ্য সরকারকে উৎপাদক ও ভোক্তার উভয়ের স্বার্থকে রক্ষা করতে হয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেই ২০০৭-০৮ অর্থবছরের চালের সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিমাণ চাল আমদানি করায় সরকারি গুদামে বিশাল খাদ্য মজুদ গড়ে ওঠে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে চালের বাজার দরও অনেক কমে আসে। কিন্তু ধান উৎপাদকদের ধানের বাজার কমে আসায় টানা কয়েক বছর ধরে চাষীরা ন্যায্য মুল্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। আগেই বলেছি, সরকারকে ভোক্তার ও উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়।


এমতাবস্থায় উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষায় সরকার চাল আমদানির ওপর দুই দফায় শুল্ক হার আরোপ করে। ফলে বেসরকারিভাবে চাল আমদানির পরিমাণ অনেক কমে আসে। ফলশ্রুতিতে গত দু’বছর যাবৎ কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। সে অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, চাষীরা চলতি বোরো মৌসুমে কাঁচা ধান মোটা ও চিকন দুই পর্যায়ে প্রায় প্রতি মণ ধান সাড়ে আটশত এবং সাড়ে নয়শত টাকায় বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।


 কিন্তু সাধারণ ভোক্তাদের বাড়তি দামে মোটা চাল ভরা মৌসুমেও কিনে খেতে হচ্ছে। এ পর্যায়ে  সরকার ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বিদেশ থেকে চাল আমদানির জন্য দিগবিদিক ছোটাছুটিও করছে। যতদিন পর্যন্ত সরকারি কিম্বা বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করা সম্ভব হবে না, ততদিন সাধারণ ভোক্তাদের বাড়তি মুল্যে চাল কিনে খেতে হবে, যা অনেকটাই নিশ্চিত। চাল আমদানির ওপর শুল্ক ধার্য্য থাকায় বেসরকারি পর্যায়ে যেহেতু চাল আমদানি অনেকটাই অনিশ্চিত, সে জন্য সরকারকে জিটুজি পদ্ধতিতে যতদ্রুত সম্ভব চাল আমদানি করে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।


 যেখানে চাল আমদানির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি মুল্যে সরকারকে চাল আমদানি করতে হবে, সেখানে চাল সংগ্রহের জন্য সরকার কেজি প্রতি ৪/৫ টাকা প্রণোদনা দিলে অভ্যন্তরীনভাবে চাল সংগ্রহ অভিযানকে অনেকাংশেই সফল করা সম্ভব হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কোন পথে হাঁটবে? তবে আমরা মনে করি, উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে প্রনোদনা দিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহ অভিযানকে গতিশীল করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চাল আমদানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। তানা হলে নি¤œ আয়ের মানুষের কষ্টের শেষ থাকবে না।


পরিশেষে শুধু এটুক্ইু বলতে চাই যে, যেহেতু বর্তমানে সরকারের খাদ্য শস্য মজুদ পরিস্থিতি খুবই নাজুক, সেহেতু কালক্ষেপণ না করে অভ্যন্তরীণভাবে চাল সংগ্রহকে সফল করতে প্রণোদনা ঘোষণা করা উচিৎ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে চাল আমদানি করে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে হবে। যেন বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক চালের অভাবে সাধারণ ভোক্তাদের অভুক্ত থাকতে না হয়।
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮ 

হিজরীর নবম মাস রমজান

অধ্যক্ষ মোহাম্মাদ আব্দুল আজিজ : ইসলামি ক্যালেন্ডারের নবম মাসের নাম ‘রমজান’ অর্থাৎ গ্রীষ্মের মাস। আরবগণ সর্ব প্রথম যে বছর ১২ মাসের নামকরণ করে ঘটনাক্রমে সে বছর এ মাস ছিল প্রচন্ড গরমের মাস। আরবে তীব্র পিপাসার কারণে গবাদি পশুর বাছুর গরমে অতিষ্ঠ হওয়াকে আরবিতে ‘রুমেজাত’ বলা হয়। পরবর্তীকালে উক্ত নামের অর্থের সাথে উক্ত মাসের প্রাকৃতিক অবস্থার মিল না থাকলেও প্রথম নামকরণের অনুকরণে ‘রমজান’ নামে অভিহিত হয়ে আসছে। আল্লামা ইবন কাছীর বলেন ‘রমজান’ আল্লাহ তায়ালার একটি নাম। এই মর্মে একটি দুর্বল হাদীস রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। শায়েখ ইলমুদ্দীন সাখাবী (রহ.) ছহিহ হাদীস না থাকায় এমতকে তিনি উপেক্ষণীয় বলেছেন। মহান আল্লাহ এ মাসে ‘সিয়াম’ অপরিহার্য্য ঘোষণা করেছেন।


 “ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের উপর ‘সিয়াম’ ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, সম্ভবত তোমরা মুত্তাকী হবে।” (সূরা বাকারা ১৮৩ নং আয়াত)। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সকল নবী-রাসূল সিয়াম পালন করেছেন। যদিও ধরন ও প্রক্রিয়াগতভাবে তাদের সিয়াম কিছুটা ভিন্নতর ছিল। নবীগণের মধ্যে হযরত দাউদ (আ.) এর সিয়াম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার সিয়াম পালনকে হাদীসে নবীর ভাষায় ‘সাওমে দাউদী’ বলেছেন। তিনি একদিন সিয়াম পালন করতেন আর একদিন ছেড়ে দিতেন। (ফলে তিনি দুর্বল হতেন না) যখন তিনি শত্রুর সম্মুখীন হতেন তখন পলায়ন করতেন না।


 ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রাচীন মিসরীয়দের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতেও সিয়াম পালনের প্রচলন ছিল। গ্রীক ও পারসিক ধর্মেও সিয়াম পালনের ব্যবস্থা ছিল। মুলকথা ইসলাম পূর্ব ধর্ম সমূহে সিয়াম প্রচলন ছিল। তবে কোন কোন ধর্মে সিয়াম পালনের বিষয়ে বেশ স্বাধীনতা ছিল। যার ফলে সিয়ামের ভাবমুর্তি ও প্রাণশক্তি বিনষ্ট হয়েছিল। চারিত্রিক মহত্ত্ব, নৈতিক পরিচ্ছন্নতা, আত্মিক পবিত্রতা বলতে কিছুই ছিল না। আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমে এ সিয়াম কালক্রমে অন্ত:সারশূন্য নিছক এক অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছিল।

 

এমন এক অবস্থা থেকে জাতিকে ফিরে নেয়ার জন্য রহমত, বরকত ও মাগফিরাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ দান করে আখেরী নবীর উম্মাতের জন্য রমজানের সিয়ামকে ফরজ বলে মহান আল্লাহ ঘোষণা দেন। নাজিল হলো সুরা আল বাকারার ১৮৩ নং আয়াত। উপরোক্ত বিধান নাজিলের মাধ্যমে সিয়াম অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় মৌলিক সংস্কার সাধন করেছে। ইয়াহুদীদের ধারণা ছিল সিয়াম বেদনা ও শোকের প্রতীক। পক্ষান্তরে ইসলামের দৃষ্টিতে সিয়াম এখন এক ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা বিশুদ্ধ চিন্তাধারা।


 অন্তরের পবিত্রতা ও রূহানী তৃপ্তি লাভ করবে। সিয়ামের যে পুরস্কার মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন তাতে ইমানদার নর-নারী ত্যাগ স্বীকার এবং আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে উঠবে। হাদীসে কুদসীতে আসছে সাওম আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর পুরস্কার দিব। পবিত্র কুরআনে ১১টি সুরায় ১২ বার ‘সাওম’ শব্দটি বিভিন্ন রূপে বর্ণিত আছে। সহীহ হাদীসে ‘সাওম’ কে ইসলামের ৪র্থ বা ৫ম স্তম্ভ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাক্বওয়া অর্জন হয়। এজন্য যে কাজ সিয়াম এর লক্ষ্য উদ্দেশ্যের পরিপন্থি এমন কাজ থেকে সিয়াম পালনকারীকে বিরত থাকার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) জোর তাকীদ করেছেন।


 তিনি বলেন সিয়ামকারী কেউ যেন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া বিবাদ নাকরে। সিয়াম কে প্রাণবন্ত করতে হলে পানাহার কামাচার থেকে বিরত সহ মুখ, চোখ, কান এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কে যাবতীয় হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। সিয়ামের কাংখিত ফলাফল লাভ করার জন্য অন্যতম শর্ত হলো, হালাল খাওয়া। নতুবা নফলের পাশবিকতা অবদমিত হওয়ার পরিবর্তে তা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠবে। ওলামায়ে কেরাম সিয়াম ফরজ করার কয়েকটি হিকমত উল্লেখ করেছেন।


১। সিয়াম পালনে হৃদয়ে তাকওয়ার বীজ বপন করে এবং হারাম থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রক্ষা করে। ২। সিয়াম নফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখার সহায়ক এবং কঠিন মুহূর্তে ধৈর্য সহ্য ও সহিষ্ণুতা শিক্ষা দেয়। ৩। সিয়াম গরীব-মিসকিনদের ব্যথা অনুভব করার সুােগ দান করে এবং গরীবদের প্রতি এহসান বা সৎ ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করে। ৪। সিয়াম আল্লাহর আনুগত্য সহজ করে দেয়। এজন্য রমজান মাসে নেক কাজ করার মনোভাব সৃষ্টি হয়। ৫। সিয়াম মনকে নরম করে। আল্লাহর জিকিরের জন্য প্রস্তুত করে তোলে, অন্যান্য কাজের ব্যস্ততা দুর করে। ৬। সিয়াম পাপের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং ভাল কাজের আগ্রহ বৃদ্ধি করে। ৭। সিয়াম পালনে কামনা-বাসনা কমে যায় ফলে আখেরাতের অভিমুখী হওয়া সহজ মনে হয়। ৮। সিয়াম মুমিনের জন্য ঢাল স্বরূপ। সিয়াম পালনে শয়তানের আক্রমন থেকে হিফাজত করে। ৯। সিয়াম পালনের বরকতে মুমিন বান্দা ফিরিস্তা চরিত্রের কাছাকাছি পৌছতে পারে। ১০। সিয়াম পালনে মুমিনের দুরদর্শিতা আরো প্রখর হয়।


আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে সিয়াম শারীরিক সুস্থতার গ্যারান্টি। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা প্রত্যেক মানুষের জন্য মাঝে মাঝে উপবাস থাকা আবশ্যক বলেছেন। তাদের মতে স্বল্প খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। বিশেষ করে সিয়াম দেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। জেরুজালেমের প্রসিদ্ধ বিশেষজ্ঞ ডা. ইউসুফ খান ছিলেন একজন ইয়াহুদী ধর্মের বড় জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি উপবাস যাপন দ্বারা চিকিৎসা করতেন। তার মতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এর জন্য উপবাস খুবই উপকারী। বেশী বেশী খাওয়ায় যে সকল রোগ সৃষ্টি হয় সিয়াম পালনে সে সকল রোগের উপশম হয়। ডাক্তার প্রফেসর রিচার বার্ড বলেছেন বেশী খাওয়ায় নিম্নোক্ত রোগ হতে পারে: ১। মস্তিষ্কের ব্যাধি ২। চক্ষু রোগ ৩। জিহ্বা ও গলার রোগ। ৪। বক্ষ ও ফুসফুসের ব্যাধি ৫। হৃদরোগ ৬। যকৃত ও পিত্তের রোগ ৭। ডায়াবেটিস ৮। উচ্চ রক্তচাপ ৯। মস্তিস্কের শিরা ফেটে যাওয়া ১০। দুশ্চিন্তা গ্রস্ততা ১১। প্যারালাইসিস রোগ ১২। মনস্তাত্ত্বিক রোগ ১৩। দেহের নিম্নাংশ অবশ হয়ে যাওয়া।

 

উপরোক্ত ১৩ প্রকার রোগের প্রতিরোধক ব্যবস্থা হলো সিয়াম। সিয়াম পালনের ইহলৌকিক ফায়দা সহ পারলৌকিক ফায়েদা অনেক বেশী। বিশুদ্ধ হাদীস থেকে নিম্নোক্ত ফায়েদার কথা জানা যায়। ১। সিয়াম শুধু আল্লাহর জন্য। মহান আল্লাহ সিয়ামকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন বুখারী শরীফের হাদীসে আসছে “সিয়াম আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। ২। সিয়াম জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল।  যেমন সহীহ হাদীসে আসছে: “সিয়াম হলো ঢাল এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার দুর্গ।” (আহমাদ) ৩। সিয়াম জান্নাত লাভের পথ।


 সিয়াম পালনকারীর জন্য জান্নাতের একটি নির্দিষ্ট দরজা আছে। দরজাটির নাম ‘রাইয়ান। রাইয়ান অর্থ পিপাসাহীন। কেবল মাত্র সিয়াম পালন কারীরাই ঐ দরজা দিয়ে পিপাসা মুক্ত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর উক্ত দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। (বুখারী, মুসলিম) ৪। সিয়াম পরকালে অর্থাৎ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে হে, আল্লাহ আমি তাদেক পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে সুপারিশ কবুল করুন। অত:পর সিয়ামের সুপারিশ কবুল করা হবে। (আহমাদ) ৫। সিয়াম গুনাহ মাফের কারণ হয় এবং গুনাহের কাফফারা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানের সিয়াম পালন করবে তার পূর্ববর্তী যা গুনাহ আছে ক্ষমা করা হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)।


পবিত্র মাহে রমজান শুধু সিয়াম পালনের জন্যই বরকতময় বরং আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। আসমানী ৪টি বড় গ্রন্থ তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও কুরআন সবগুলো রমজান মাসে নাজিল হয়েছে। (সহীহ হাদীস, তাবারানী)। নাজিলের তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন মত থাকলেও রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশের বাইতুল ইজ্জতে প্রথম আল কুরআন নাজিল হয়। দ্বিতীয়বার বাইতুল ইজ্জত হতে মক্কার জাবালেলুর পাহাড়ের হিরা গুহায় রমজান মাসে আল কুরআন প্রথম নাজিল হয়। আসুন আল কুরআন নাজিলের মাসে আমরা বেশী বেশী ভাল কাজ করি এবং সকল প্রকার মন্দ কাজ পরিহার করি। মহান আল্লাহ আমাদেক তাওফিক দিন। আমীন।
লেখক ঃ খতীব, উপশহর জামে মসজিদ
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা চাই

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ: তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে এ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ মানুষ সোচ্চার বরাবরই। এছাড়াও এই ব্যাপারে সরকারি মহল থেকেও আশার বাণী শুনানো হয়েছে অসংখ্যবার। কিন্তু কাজের কাজটি আজ পর্যন্ত হয়নি। ভারতের কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। সেই সাথে  অনেক চুক্তি ও সমোঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হল। কিন্তু শুধু বাকি থাকল তিস্তা চুক্তি।

 

 কংগ্রেস সরকার আশ্বাস দিলেন যে এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। কারণ  এখন না হলেও আলোচনার মাধ্যমে খুব শীঘ্রই তিস্তা সমস্যার একটা সমাধান হবে। কারণ বাংলাদেশ ভারতের একটি প্রতিবেশি ও বন্ধুরাষ্ট্র। বাংলাদেশের কোন অংশে স্বার্থের ক্ষতি হোক কিংবা সুবিধা প্রাপ্তির কোথাও কোন কমতি পড়–ক তা ভারত বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে কখনোই চায় না।

 

ভারত সব সময় বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণœ রাখার চেষ্টা করবে। সুতরাং এই নিয়ে চিন্তার কিছুই নেই। ওয়েট এন্ড সি। এরপর ভারতের নির্বাচনে ডানপন্থি দল বিজেপির কাছে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটল। সেই সাথে সরকারেরও পালাবদল ঘটল। ঠিক তখনই এই নিয়ে সবার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল।


 এই বুঝি গোটা ভারতের সব মুসলিমদেরকে দেশ থেকে বের করে দিবে! আর না হয় করে সবাইকে হিন্দু বানিয়ে ফেলবে! কারণ অভিযোগ আছে যে ২০০২ সালে ভারতে হিন্দু তীর্থ যাত্রীদের ট্রেনে আগুন লাগানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজরাটে যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল সেখানে প্রধান উস্কানি দাতার ভূমিকা পালন করেছিলেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

 

বলা হয়ে থাকে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ২০০২ সালের গুজরাটের দাঙ্গার মত এরকম ভয়াবহ দাঙ্গা আর কখনো সংঘটিত হয়নি। এই দাঙ্গায় সরকারি হিসেবে ১ হাজারেরও বেশি সংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হলেও মুসলিমদের দাবি প্রায় ৫ হাজারের মত। মুসলিম বিরোধী ভয়াবহ এই দাঙ্গায় মায়ের গর্ভের শিশুকে পেট থেকে বের করে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল অসংখ্য ঘর বাড়ি ও দোকান-পাট।


 এমনকি মুসলিম মেয়েরা যখন তাদের ইজ্জত রক্ষার জন্য থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেন তখন কোন কোন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছিলেন ‘তোমাদের তো শেষে মেরেই ফেলবে। তার আগে ইজ্জত থাকল কি চলে গেল তাতে কী?’ ২০০২ সালের গুজরাটের এই দাঙ্গার জন্য সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা এক মামলায় পুলিশ কর্মকর্তা সঞ্জিব ভাট অভিযোগ করেন দাঙ্গাকারীদের না ঠেকানোর জন্য নরেন্দ্র মোদি নাকি পুলিশদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সময় নরেন্দ্র্র মোদি ছিলেন গুজরাটের মূখ্যমন্ত্রী। কট্টর ডানপন্থি এই নরেন্দ্র মোদিই যখন ভারতের মত বৃহৎ একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন তখন সেই দেশের অন্যান্য ধর্মীয় অনুসারীদের কী হবে কে জানে? এই নিয়ে যখন তুমুল বিতর্ক শুরু হল।

 

কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে সেই সাথে গোটা ভারত অঞ্চলে কাজ করছেন এখন নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। কংগ্রেস সরকারের সাথে আওয়ামীলীগ সরকারের দুধ-ভাত সম্পর্ক হলেও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে সেই দুধ-ভাতে ছাই বা বালি কোনটাই ছিটায়নি। বরং ভারতের সাথে বাংলাদেশের সামগ্রিক সম্পর্ক আগের চাইতে এখন অনেক ভাল। নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ করেন। সেই সূত্র ধরেই তিনি ২০১৫ সালে ৬ জুন ঢাকায় আসেন।

 নরেন্দ্র মোদি আরো অনেক আগেই ঢাকায় আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সীমান্ত চুক্তি ও তিস্তা চুক্তির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সুরাহা না করেই তিনি তাড়াহুড়া করে ঢাকায় আসতে চাননি। এছাড়াও সেই সময় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং কলকতায় গিয়ে জোর গলায় ঘোষণা দিয়ে আসলেন খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের সাথে ভারতে তিস্তা চুক্তি হতে যাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসলেন। তাকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হল। নরেন্দ্র মোদির ২ দিনের সফরে ঠিক মনমোহন সিং এর মতোই অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হল। কিন্তু বাকি রয়ে গেল শুধু তিস্তা চুক্তি।


 এগুলো তো গেল অনেক পুরনো দিনের ঘটনা। ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের মানুষ আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আর কিছু হোক না হোক মনে হয় এই যাত্রায় তিস্তা চুক্তিটা হবে। কিন্তু ঘটনা ঘটল কী? প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাওয়ার আগেই জানিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হল যে এই যাত্রাতেও তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। তারপরেও প্রধানমন্ত্রী মনের মধ্যে একটু আশা ভরসা নিয়ে গিয়েছিলেন। যেহেতু  প্রতিবেশি ও বন্ধু রাষ্ট্র। যদি বলে- কয়ে কিছু একটা হয়।


 কিন্তু এবারেও ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটল। অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হল কিন্তু তিস্তা চুক্তি আর হল না। নরেন্দ্র মোদি শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দিলেন যে বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ ও ভারতে বিজেপি সরকার থাকতেই এই তিস্তা চুক্তির সুরাহা হবে।  এখন দেখা যাক ভবিষ্যত কী ঘটে? সময়ের কথা সময়ই বলে দিবে।

 

তবে ভবিষতে যাই ঘটুক। তিস্তার প্রধান ফ্যাক্টর যে পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এটা আর অজানা নেই। ভারত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদাভাবে মমতা ব্যানার্জির সাথেও সাক্ষাত করেছেন। শেষমেষ যদি তিনি রাজি হন। কিন্তু না। তার কথা তিস্তায় এখন পানি নেই। সেহেতু তিস্তা চুক্তির প্রশ্নই আসে না। আর মমতা তার জনগণের স্বার্থই আগে দেখবেন। তার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন দোষণীয়তা নেই।


ভারত নদীর উজানের অঞ্চল বাঁধ দিয়ে পানি আটকিয়ে রাখবেন। আর ভাটির অঞ্চলগুলোকে বালির চড়ে শুকিয়ে মারবেন। এটা তো হতে পারে না। ভারতের মত উদারনৈতিক বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এ রকম অনৈতিক ও অযৌক্তিক নীতিতে অগ্রসর হবে হতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদী আইনে এটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে একটি নদী যদি একাধিক দেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় তাহলে এর পানির হিস্যা ঠিক কেমন হবে।

 

১৯১৫ সালের ভিয়েনা সম্মেলন, ১৯২১ সালের দানিয়ুব নদী কমিশন, ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংক নীতিমালার  ৪ ও ৫ নং অনুচ্ছেদ, ১৯৯২ সালের ডাবলিন নীতিমালার ২ নং নীতি এরকম অসংখ্য আন্তর্জাতিক নদী আইনের নীতিমালা রয়েছে যেগুলোর প্রতিটি নদী আইনে উল্লেখ রয়েছে ‘উজানের কোন দেশ ভাটির দেশের স্বার্থ নষ্ট করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের দিক পরিবর্তন বা বিঘিœত করতে পারবে না।


 ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংক নীতিমালার ৪ ও ৫ নং এ বলা হয়েছে ‘প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদী সমূহের ব্যবহার ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে আসবে।’ এছাড়াও ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের জলপ্রবাহ কনভেনশনের প্রণীত আইন অনুযায়ী ‘নদীকে এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে অন্য দেশ মারাত্মক ক্ষতি বা বিপদের মুখে পড়ে।

 

’ অথচ ভারত এসব আন্তর্জাতিক আইনের কোন তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে তাদের সুবিধামত এসব অভিন্ন নদীসমূহ ব্যবহার করছে। পানি স্বাভাবিক প্রবাহকে একতরফাভাবে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাচ্ছে। একসময় বাংলাদেশকে তের শত নদীর দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। কিন্তু সেই নদীগুলোকে আমরা এখন রক্ষা করতে পারছিনা। ভারতের সা¤্রাজ্যবাদী চিন্তা ভাবনা বাংলাদেশের নদীগুলোকে গ্রাস করে ফেলছে। বাংলাদেশে একসময় ছোট বড় সব মিলিয়ে ৭০০ মত নদী ছিল।


 সেগুলোর অধিকাংশই এখন বিলীন হয়ে গেছে। আর বাকি যে ২৩০টি নদী রয়েছে সেগুলোতেও পানি নেই। ১৯৭৪ সালে নির্মিত ফাঁরাক্কা বাঁধই বাংলাদেশের ২০টি নদীকে গ্রাস করে ফেলেছে। সব নদী শুকে চড় হয়ে আছে। দিন দিন নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে সেগুলোর মধ্যে ৫১ টি নদীতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করে রেখেছেন। তারা গায়ের জোরে একতরফাভাবে ভিন্নখাতে পানির প্রত্যাহার করছেন। ভারত আন্তর্জাতিক আইনের কোন রকম তোয়াক্কা না করেই এসব অপকর্ম করে যাচ্ছে।

 সেই সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ভারতের এসব অপকর্মগুলো আমড়া কাঠের ঢেঁকির মত শুধু চেয়ে চেয়ে  দেখছে।  সাধারণ জনগণের মধ্যেও কোন প্রশ্ন নেই। নেই কোন প্রতিবাদের ভাষা। ভারত অনৈতিকভাবে অভিন্ন নদীগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জলাধার নির্মাণ করছে এবং সেচ প্রকল্পের জন্য ব্যারেজ নির্মাণ করছে। আর আমরা অসহায়ের মত বালুর চড়ে শুকিয়ে মরছি। প্রতিবেশি ও বন্ধু রাষ্ট্রের জিকির তুলে ভারতে পররাষ্ট্র নীতির প্রধান কৌশল হচ্ছে নিজেদের স্বার্থটুকু অক্ষুণœ রেখে বাংলাদেশকে শুধু আশ্বস্ত করা। আর সেই কাজটি তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করে যাচ্ছেন।

 এদিকে বাংলাদেশের মানুষ শুধু পানি পানি করে হাহাকার করছে। আর ভারত প্রতিনিয়তই বাংলাদেশকে শুধু আশ্বস্ত করে যাচ্ছেন। কিন্তু কাজের কাজটি করছে না। তাদের এই পানি সা¤্রাজ্যবাদী নীতি বাংলাদেশকে দিন দিন পানি শূন্য ও নদী শূন্য করে ফেলছে। ভারতের পানি অগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল আজ মরুকরণের দিকে যাচ্ছে। সেই সাথে আমরা নিজেদের মধ্যে প্রতিবাদের ভাষাটুকুও হারিয়ে ফেলছি।
লেখক ঃ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
rased.4bangladesh@gmail.com
০১৭৫০-৫৩৪০২৮

 

ইফতার হোক নিরাপদ খাবারে

আতাউর রহমান মিটন: সকলকে পবিত্র রমজানের শুভেচ্ছা জানাই। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এই মাস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলমানদের জন্য এই মাস ট্রেনিং স্বরূপ যাতে করে তাঁরা অন্য ১১টি মাসেও এই ট্রেনিং কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে শান্তি, সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। রমজানের ফজিলত খুবই গভীর। এটা শুধু উপবাস আর ইফতার পার্টিতে নিমজ্জিত হওয়ার উৎসব নয়। আরবিতে সিয়াম।

ফারসিতে রোজা। বাংলায় সংযম। রমজান মাস আমাদেরকে জীবনের সর্বস্তরে সংযম, পরিমিতিবোধ এবং অহিংসা প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। আমরা যেন তা অনুসরণ করি। বিশেষ করে আমরা যেন এমনভাবে জীবনযাপন করি যাতে মনে না হয় যে, রমজানের সংযম থেকে ‘সং’ পালিয়েছে! সংযম থেকে ‘সং’ পালালে কি থাকে সেটা আমাদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুধাবন করতে হবে।


রমজানের সংযম কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিধি আরও বিস্তৃত। এই মাসে মুসলমানদের অনেক বেশি ইহজাগতিক লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাস থেকে দূরে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি এই মাসে মানুষের মধ্যে ভোগ-বিলাস, মুনাফার লোভ অনেক বেড়ে যায়। ইফতার পার্টির নামে চারিদিকে এক নতুন ধরনের উৎসব শুরু হয়ে যায়।

শুধু ইফতার নয়, ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে সেহরী পার্টিও আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনে ধর্মীয় ভাবাদর্শ কতখানি সুরক্ষিত হয় তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন বা দ্বিধা রয়েছে। বরং এই মাসে সামর্থ্যবানেরা দুঃখী, দরিদ্র, এতিম, অসহায় মানুষদের পাশে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি বেশি দাঁড়াতে পারেন। দান করতে পারেন প্রীতি সহযোগে। ¯্রষ্টার সৃষ্টি সকল মানুষের অধিকার সুরক্ষা এবং উন্নত জীবনমান গড়ে তুলতে শপথ নিতে পারেন।


উপদেশ যাই হোক না কেন, বাস্তব একেবারে ভিন্ন। কোথায় এই মাসে মুনাফা কমিয়ে দেয়ায় মানুষের ভোগ্যপণ্যের মূল্য কমে যাবে তা না বরং বাজারে এখন পণ্যের মূল্য লাগাম ছেঁড়া। ফলের মৌসুমে ফলের দামও চড়া। ঢাকার বাজারে কোথাও কোথাও টিসিবি এবং কোন কোন কোম্পানি ন্যায্যমূল্যে সীমিত কিছু পণ্য বিক্রি করছেন বটে কিন্তু সেটা মূলধারার বাজারে কোন প্রভাব ফেলছে না।

বরং এভাবে বিপণন না করে যদি রেশনিং পদ্ধতিতে সারাদেশে সারাবছর প্রান্তিক মানুষ, অবহেলিত মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হতো তাহলে তা ফলপ্রসু হতে পারত। সরকার কিছু বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের সারা বছর রেশন দেয় কিন্তু আমাদের শ্রমজীবী মানুষেরা যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কঠোর পরিশ্রম করে দেশের উন্নয়নে কাজ করছে তাদের জন্য কোন রেশনিং ব্যবস্থা নেই। বঞ্চনার এই কাঠামো কি বদলানো যায় না?
কথায় আছে, ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’।


ফলে সিয়াম সাধনার মাসেও চারিদিকে নানা অন্যায়, ভুল ও অপরাধমূলক কাজ অব্যাহত আছে। এসবের মধ্যে এমন অনেক কিছুই আছে যা আমরা করছি হয়তো অসচেতনতার কারণে। যেমন ধরুন রমজানে সারাদিন রোজা রেখে আমরা যে ইফতার খাই তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভরা। অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত তেল এবং অতিরিক্ত চিনি এই তিনটি জিনিস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুুঁকিপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। অথচ আমাদের ইফতার সামগ্রীতে এই তিন উপাদানের ব্যবহার খুবই বেশি। এর সাথে যুক্ত হয় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রং ও কেমিক্যাল ব্যবহার এবং ক্ষতিকর বা ভেজাল তেল, পোড়া মবিল ব্যবহার ইত্যাদি।

 
সারাদিন রোজা রেখে আমরা ইফতারে যা খাই তা স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া অপরিহার্য। ইফতার গ্রহণ রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি এমনই এক ফজিলত যে যিনি রোজা রাখেন নি তাকেও ইফতারে শরীক হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এই ইফতার হওয়া উচিত নিরাপদ পানীয়, ফল-ফলাদি এবং ঘরে তৈরি নিরাপদ খাবার দিয়ে। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফ্রেস ফলের জুস, বা দুগ্ধজাত খাবার ইফতারে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম। কিন্তু কালের বিবর্তনে আমাদের ইফতার তালিকায় স্থান পেয়েছে প্যাকেটজাত বিভিন্ন জুস, নানা ধরণের রঙিন কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি শরবত, বিভিন্ন নামের ড্রিংকস, চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, অতিরিক্তি মশলা দেয়া নানা ধরনের মাংসজাত খাবার ইত্যাদি। এই ধরণের খাবারগুলো কতখানি নিরাপদ তা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে।


 কিন্তু মানুষের আচরণে কোন পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এসব অস্বাস্থ্যকর পণ্যের ব্যবসা তো দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমরা খাবারের রং, গন্ধ, স্বাদ বা বাহারি বিজ্ঞাপনের কাছে হার মানছি। আমরা একবারও বিবেক জাগ্রত করে প্রশ্ন করছি না, সারাদিন রোজাব্রত পালন শেষে আমি নিজে এবং আমার প্রিয়জনদের মুখে যে খাবার তুলে দিচ্ছি তা কি দিয়ে তৈরী? এই খাবার কোথায়, কি রকম পরিবেশে, কার দ্বারা তৈরি করা হয়েছে? যা খাচ্ছি তা আসলে কতখানি নিরাপদ?


আমাদের দেশে ইফতার সামগ্রী মূলতঃ বিক্রি হয় রাস্তায়, খোলা পরিবেশে। ঢাকার চক বাজার সম্ভবতঃ দেশের বৃহত্তম ইফতারি বাজার। এছাড়াও দেশের সকল জেলা ও উপজেলা শহরের হাটে-বাজারে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ইফতার বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। লক্ষ্য করুন, এই খাবারগুলো বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে দুপুরের আগে। তারপর সেগুলো রাস্তায় খোলা পরিবেশে রাখা হয়েছে। বাতাসে মিশ্রিত ধূলা এসে মিশছে এসব খাবারে। একবার ভেবেছেন ধূলায় কি কি থাকে? সারাদিন রাস্তায় মানুষ কফ-সর্দি ফেলে, রাস্তার পাশে মল-মূত্র ত্যাগ করে, রোদে সেগুলো শুকায় এবং বাতাসে মেশে। এরপর বাতাসের সাথে তা আপনার পেটে যায়। এভাবেই আমাদের অসতর্কতা ও নির্বুদ্ধিতায় আমরা খোলা খাবার খাচ্ছি।


 গরমে তেষ্টা মেটানোর জন্য ইফতারে শরবত কিনছি রাস্তা থেকে। এসব শরবত তৈরিতে যে বরফ ব্যবহার করা হচ্ছে তা কোন পানি দিয়ে তৈরি তা নিশ্চিত হইনি কখনও! যে তেল দিয়ে আমাদের মুখরোচক ভাজাভুজি তৈরি হচ্ছে তা আসলে কিসের তেল এবং কতদিনের পুরনো প্রশ্ন করছি না। অথচ বারবার একই তেল ব্যবহার করলে শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টির উপাদান প্রবেশ করে। আপনার শরীরে আজকে ক্যান্সারের জীবাণু প্রবেশ করলে আপনি কালকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন না। কোন কোন ক্ষেত্রে দশ বছরেও এর প্রভাব বোঝা যায় না কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন ক্ষতি যা হবার তা ঠিকই হচ্ছে।


 একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ গ্রাম পরিমাণ লবণ খেতে পারে। কিন্তু আমরা প্রতিদিন প্রায় ১০ গ্রাম বা তারও বেশি লবণ গ্রহণ করি। বিশেষ করে মুখরোচক নুডলস্, চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা অন্যান্য চাইনিজ খাবারগুলোতে লবণ ব্যবহারের পরিমাণ বেশি থাকে। ঐসব খাবারে ‘টেষ্টিং সল্ট’ ব্যবহার করা হয় যা খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয় বটে কিন্তু মানুষের দেহের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।


‘বিষে ভরা ইফতার, সংযম যেন শুধু মুখে মুখে’-এমন কথা আমরা আর শুনতে চাই না। একদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনিরাপদ খাদ্য তৈরী করা, অন্যদিকে রয়েছে খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে মানুষের খাদ্যকে দূষিত করে ফেলা। আমরা এটাকে ‘নীরব গণহত্যা’র সামিল বলেই মনে করি। এই কর্মকান্ড কোনভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যায় না। বিভিন্ন সূত্র মতে, দেশের প্রায় ৫৪% খাদ্য মারাত্মকভাবে দূষিত এবং তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ.ব.ম ফারুক এর মতে, “তাজা আমের রস, তাজা কমলার রস, আসল আমের মজা ইত্যাদি বলে যে সব বিজ্ঞাপন দেয়া হয় সেগুলোর অধিকাংশতেই শুধু তাজা আমের বা কমলার ছবিটাই থাকে, তাজা বা আসল ফলের আর কোনো কিছুই থাকে না।


 পানির সাথে কিছু সিএমসির দ্রবণ, সরবিটল, ম্যানিটল, কৃত্রিম মিষ্টিকারক, প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম রং এবং আমের বা কমলার কৃত্রিম সুগন্ধ Ñ এই হলো এসব ‘তাজা’ ও ‘আসল’ রসের ফর্মুলা।” এসব খাবার গ্রহণে মানুষের মেজাজ খিট্খিটে হয়ে যায়, ক্ষুধা কমে যায়, এবং শরীর দ্রুত স্থুলকায় হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এসব খাবারের কারণে মানুষের দেহে ক্যান্সার বাসা বাঁধে, কিডনী নষ্ট হয়, রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং ডায়াবেটিস দেখা দেয়।


মানুষের খাবার যেন নিরাপদ থাকে সেই অভিপ্রায়ে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন -২০১৩ অনুযায়ী গঠিত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পত্রিকার মাধ্যমে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী খাদ্য দূষণের অপরাধের দায়ে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এর জারিকৃত গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে,


* অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ইফতার সামগ্রী তৈরী ও পরিবেশন করলে অনুজীব ঘটিত রোগ-বালাই হতে পারে। ইফতার সামগ্রী তৈরি ও বিক্রয়ের জন্য নিয়োজিত খাদ্যকর্মিগণকে স্বাস্থ্যবিধান (সংক্রামক রোগমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন অ্যাপ্রন, মাথায় চুল ঢাকার ক্যাপ ও হ্যান্ড গ্লোবস পরিধান) মেনে চলতে হবে এবং খাদ্য স্থাপনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

* যে কোন ধরনের শরবত বা পানীয় তৈরিতে অনিরাপদ পানি, অননুমোদিত সুগন্ধি বা রঞ্জক পদার্থ কিংবা অনিরাপদ পানি দিয়ে তৈরি বরফ ব্যবহার করলে অনুজীব ও রাসায়নিক দূষকের কারণে ঐ শরবত বা পানীয় অনিরাপদ হয়। * ইফতার সামগ্রী যথা পেঁয়াজু, চপ, বেগুনি, জিলাপি, বুন্দিয়া ইত্যাদি তৈরীতে অননুমোদিত রঞ্জক, সুগন্ধি বা অন্যান্য সংযোজন দ্রব্য ব্যবহার করলে মানবদেহে রাসায়নিক দূষকজনিত বিষক্রিয়া হতে পারে।

* পোড়া বা ভেজাল মিশ্রিত তেল দিয়ে ইফতার সামগ্রী ভাজলে বা খাদ্যদ্রব্য রান্না করলে তা অনিরাপদ হতে পারে। বিশুদ্ধ বা ভেজালমুক্ত তেল ব্যবহার করুন এবং একই তেল বার বার ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। জনস্বার্থে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কিত গণবিজ্ঞপ্তির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলাম। ঐ বিজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ক্ষেত্রে খবরের কাগজ বা অন্য যে কোন ছাপানো কাগজ ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ ঐসব কাগজে ছাপার কাজে ব্যবহৃত কালি খাবারের সাথে মানুষের পেটে গেলে তা মানবদেহের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

তাহলে ভেবে দেখুন, আমাদের অবস্থা কতটা অসহায় এবং খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে কতখানি অসচেতন। একটি প্রাচীন প্রবাদ মতে, ‘মানুষের খাবার যদি নিরাপদ না হয় তাহলে ওষুধে কোন কাজ হয় না, আর খাবার যদি নিরাপদ হয় তাহলে ওষুধের প্রয়োজন হয় না’। মাহে রমজানে, বিশেষ করে ইফতার সামগ্রী উৎপাদন, বিপণন এবং গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। দেশে নিরাপদ খাদ্য আইন বলবৎ আছে। অনেক জায়গাতেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। কিন্তু আমরা পুরো দেশটাকে তো কারাগার বানাতে পারব না। আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১৫২৬৯৭৯

সোয়া লাখ নন-এমপিও শিক্ষকদের দেখার কেউ নেই

রিপন আহসান ঋতু  : সাধারণভাবে গড়ে দেশে একজন মানুষের চাকরিজীবন বছর ত্রিশেক। যৌবনেই প্রাণী সর্বাপেক্ষা সৃজনশীল। জীবনের স্বর্ণপ্রসূকালের দুই-তৃতীয়াংশই এসব নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারির রইল নিষ্ফলা। এই দুনিয়ায় তাঁদের বেঁচে থাকার কী-ই বা অর্থ হয়? কে তার দায় নেবে? যে যুবক ২০ বছর বিনা পয়সায় শ্রম দিচ্ছেন তাঁর যৌবনের হারানো ২০টি বছর কে ফিরিয়ে দেবে? এসব প্রশ্ন তাড়িত করে না এই অন্ধ সমাজকে!


এই সোয়া লাখ নন-এমপিও শিক্ষক, যাঁরা আধুনিক শ্রমদাস ছাড়া আর কিছুই নন, তাঁরা তো এ দেশের অপরাজনীতিরই পার্শ্বফল। ভোটের বাক্সের কথা ভেবেই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁদের নিয়োগ দান। তাঁদের দায়ভার সরকার অস্বীকার করবে কীভাবে? দাসের শ্রম নিতে মালিক অন্তত তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার মতো কিছু খাবার, আবরু ঢাকতে কিছু ছেঁড়া কাপড় চোপড়, অসুখে ওষুধ খাওয়ায় বাঁচিয়ে রাখতে।


 কিন্তু নন-এমপিও শিক্ষকেরা এসব কিছুই পান না! উল্টো কয়েক লাখ টাকা দিয়ে এই মজুরিহীন দাসত্ব কিনেছেন তাঁরা। কেভিন বেইলস গবেষণা করে দেখিয়েছেন, একজন আধুনিক ক্রীতদাসের বর্তমান বাজারমূল্য মাত্র ৯০ ডলার। তিনি বাংলাদেশের একজন নন-এমপিও শিক্ষকের বাজার মূল্য কত বলবেন?  ইসলাম বলছে, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁর মজুরি পরিশোধ কর।’ আমাদের সংবিধানেও শ্রমের মজুরি প্রদানের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে।


 এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে কাজের সাথে মজুরি সম্পর্কের নিশ্চয়তার বিধান রাখা হয়েছে। সংবিধানের সেই ১৫ (খ) ধারাটি হল-কর্মের অধিকার অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার। অথচ এই ধারাটির প্রয়োগ নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারিদের ক্ষেত্রে ঘটছে না। তাই কাউকে গতর খাটিয়ে মজুরি না দেওয়া শুধু অনৈতিক নয়, অপরাধও। এই যে সোয়া লাখ নন-এমপিও শিক্ষক, যাঁদের শ্রম-রক্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, তাঁদের শ্রমের মূল্য পরিশোধের দায় কি আমাদের সবার ওপর বর্তায় না?


দেশে সাড়ে ৭ হাজারের অধিক নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মরত আছেন। কিন্তু তাদের ভাগ্যের দুয়ার খুলছে না। তাদের এ অমানবিক জীবনের দিকটা সরকারের অবশ্যই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের পাশাপাশি তাদের কথাও সরকারকে ভাবতে হবে। তাদের ভাগ্যের দুয়ার কবে খুলবে। এ দুয়ার খোলার চাবিকাঠি সরকারের হাতে। শিক্ষাদানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এসব হতভাগ্য শিক্ষকের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র যে কোনো বিবেকবান মানুষের কাছে কষ্ট ও বেদনাদায়ক।


 তাদের নিয়ে আমি একজন নগণ্য লেখক হিসেবে অনেক ভেবেছি। কিন্তু আমার একার ভাবনায় তো কাজ হবে না। ভাবতে হবে শিক্ষাবিদদের, ভাবতে হবে রাষ্ট্রকে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তাদের নিয়ে ভাবে? অথচ শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। সেই মানুষ গড়ার কারিগররা আজ অভুক্ত রয়েছেন। গত সপ্তাহে বেশ কয়েকজন শিক্ষক কান্না জড়িত কণ্ঠে তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলেছেন, তাতে আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি।


 আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিক্ষকরাই একটি দেশের উন্নতির মূল চালিকাশক্তি। কারণ তারা যে পেশার সঙ্গে জড়িত এবং যাদের মাঝে আলোকবর্তিকা জ্বালাচ্ছেন সে লাখো শিক্ষার্থীই একটি জাতির মেরুদন্ড। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে শিক্ষকরা হচ্ছেন শিক্ষার মেরুদন্ড কিন্তু সে মেরুদন্ড আজ ভেঙে পড়ার উপক্রম অর্থাভাবে। তারা সোজা হবে কীভাবে। রাষ্ট্র কী জবাব দেবে?

 
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে কারো কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যারা বছরের পর বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করে যাচ্ছেন, যারা অন্ধকারে আলো ছড়াচ্ছেন তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্র আর কতকাল নীরব থাকবে। রাষ্ট্রকে নীরবতা ভাঙতে হবে। লাখো শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে যারা জাগ্রত করছেন তারাই আজ নিজেরা বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আজ তারা বড় অসহায়। তাদের আর্তি-আর্তনাদ তো রাষ্ট্রকেই শুনতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তা শুনতে পাচ্ছে না? এমপিওভুক্ত নন এমন শিক্ষকদের পেশকৃত দাবিদাওয়ার পিছনে অনেক কারণ আছে।


 শিক্ষকতা পেশাকে আমরা যতোই মহিমান্বিত করি না কেন, আমাদের, বিশেষত সরকারের মনে রাখা দরকার তাঁদের পেট আছে, পাকস্থলী আছে। শিক্ষকদের পরিবার আছে, তাদের খাবার-পোশাক-দৈনন্দিন জীবন যাপনের উপাদান কিনতে হয়। একজন শিক্ষক সারাদিন শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে বাড়ি গিয়ে যদি দেখে তাঁর নিজের সন্তানের ন্যুনতম চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছেন না; তখন পরদিন তিনি বিদ্যালয়ে কী পড়াবেন, তা সহজেই অনুমেয়।


 সরকার স্কুল বহির্ভূত শিক্ষাদান কেন্দ্রে স্কুল বহির্ভূত সময়ে পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প অর্থ প্রদানে বিশেষ শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকেরা স্কুল বহির্ভূত সময় নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কাজটি সমাধা করছেন। এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশ্ন স্কুল বহির্ভূত সময় স্কুল বহির্ভূত শিক্ষাদান কেন্দ্রে শিক্ষাগ্রহণ সরকারের শিক্ষানীতির সাথে সাংঘর্ষিক হলে কিভাবে স্কুল বহির্ভূত সময়ে একজন শিক্ষককে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ শিক্ষা গ্রহণ কার্যক্রমে শিক্ষকতার অনুমতি দেয়া হচ্ছে?


সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকেরা পেশাজীবী হলেও তাদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যান্য পেশাজীবীর চেয়ে ভিন্ন। অন্যান্য পেশাজীবীর মধ্যে সরকারি চিকিৎসকদের দেখা যায়, অফিস বহির্ভূত সময় ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে তারা অর্থ উপার্জন করছেন। এমনকি কিছু চিকিৎসক নিজ সরকারি কার্যালয়ে থাকাকালেও তথায় বহিরাগত রোগি দেখে অর্থ নিচ্ছেন। থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাসের বেশির ভাগ সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে মাস শেষে ঠিকই বেতন ভাতার সম্পূর্ণটুকুই গ্রহণ করছেন।


 আইনজীবীদের মধ্যে যারা সরকারি অ্যাটর্নি, কৌঁসুলি বা উকিল তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়- সরকারের স্বার্থের সংশ্লেষ নেই, এমন মামলা পরিচালনা করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছেন। প্রকৌশলী ও কৃষিবিদ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নিয়োজিত অনেকেই অফিস বহির্ভূত সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় খ কালীন পরামর্শক হিসেবে কাজ করে  উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছেন।

 

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অনধিক দু’টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে এবং এর পাশাপাশি এনজিও প্রতিষ্ঠা করে বা এর সাথে সম্পৃক্ত থেকে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছেন। কিছু কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যে হারে টিভি টকশোতে অংশগ্রহণ করে এবং পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে সময় ক্ষেপণ করেন, তাতে তার নিজ কর্মস্থলে শিক্ষাদানে যে ব্যাঘাত ঘটে, সে বিষয়টির প্রতি তারা একেবারেই উদাসীন।


 সরকারের সচিব পদধারীদের প্রায় সবাই এক বা একাধিক সরকারি ব্যাংক, শিল্প প্রতিষ্ঠান, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দেশী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। এরা প্রায়ই অফিস সময়ে ও অফিসবহির্ভূত সময়ে উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্যদের সভায় অংশগ্রহণ করে  আকর্ষণীয় অঙ্কের সম্মানী নিয়ে থাকেন। তা ছাড়া, এদের অনেকে অফিস চলাকালেও দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অথবা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে অতিথি বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে যে সম্মানী পান তা, প্রশিক্ষণের মান যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগতভাবে তাদের জন্য লাভজনক ও আনন্দদায়ক।


উপরিউক্ত সবাই সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তুলনায় বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় অনেক উচ্চে অবস্থান করছেন। লজ্জাজনক বেতন-কাঠামো নিয়ে একজন শিক্ষক যখন প্রাইভেট পড়ান, তখন আমরা অনেকেই উচ্চকণ্ঠ হই; কিন্তু তার পেছনে শিক্ষকদের যে করুণ-কাহিনীগুলো যুক্ত থাকে, সেগুলো জানার আগ্রহ সেই তুলনায় অনুপস্থিত। সুতরাং শিক্ষকরা যদি কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি করে, সেগুলোকে আলাদাভাবে মানবিক দিক দিয়ে বিবেচনা করার দরকার নেই; যৌক্তিকভাবে তাঁদের দাবি দাওয়া যুক্তিসঙ্গত কিনা, সেটা দেখলেই চলে।


 বর্তমান মহাজোট সরকারের সবচেয়ে বড় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচন-পূর্ব নানা বক্তব্যে অনেককিছু করার অঙ্গীকার করেছিল। অনেকক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার না করলেও সেগুলো সমাধানের ইঙ্গিত ছিল তাদের বক্তব্যে- দলের নেতৃবৃন্দ এসব কথা কোন বিবেচনায় বলেছিলেন জানা নেই। কিন্তু দলের পক্ষ থেকে যে অঙ্গীকারগুলো করা হয়েছিল সেগুলো যে জেনেবুঝে করা হয় নি, তা দিন দিন পরিষ্কার হচ্ছে। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সেসব অঙ্গীকারেরই একটি।


 শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ একসময় গণমানুষের রাজনীতি করেছেন, শিক্ষকদের সঙ্গে মিশেছেন। শিক্ষাবান্ধব শিক্ষামন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও সরকার যেটুকু কাজ করছে শিক্ষকদের জন্য সেটুকু আসলে কোনো বিচারেই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক বিবেচনা, দুর্নীতি বা ফাইল চালাচালির কারণে এমপিওভুক্তির বিষয়টি থেমে থাকা সরকারের অযোগ্যতাকেই নির্দেশ করে। সরকারের উচিত একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা যার ভিত্তিতে যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন নিয়মিতভাবে এমপিওভুক্ত হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে যারা বাজেট সংকীর্ণতার দোহাই দেন, তাঁরা সম্ভবত ভুলে যান যে, বাজেটের বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারের নিজস্ব মেকানিজমের ওপর। কোন খাতে কতোটুকু বাজেট বরাদ্দ করা হবে, তা সরকার চাইলেই ঠিক করে দিতে পারে।


 বাজেট বক্তৃতার পর যদিও অর্থমন্ত্রী বড় গলায় শিক্ষাবাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দের দাবি করেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো শিক্ষাখাতের সাথে অন্যান্য আরও খাত জুড়ে দেয়া হয়- ফলে সেটা বড় দেখা যায়। শিক্ষাখাতে বড় বাজেট দেখানো সরকারের ফ্যাশন, এই ফ্যাশন না দেখালে বদনামের ভাগিদার হতে হয় কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাবাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অন্য দেশের সঙ্গে তুলনায় না হয় না-ই গেলাম, কিন্তু ইউনেস্কো জাতীয় বাজেটের অন্তত আট শতাংশ শিক্ষাখাতে রাখতে পরামর্শ দেয়। আমরা যদি এর অন্তত অর্ধেকও বরাদ্দ করতে পারতাম, তাহলে আজকে শিক্ষকদের রাস্তায় শুয়ে থাকতে হতো না।


 দুঃখের বিষয়, আমাদের অর্থমন্ত্রী মোটেই শিক্ষাবান্ধব নন। শিক্ষকদের এসব দাবিদাওয়ার কথা বাদ দিয়েও যদি বলি, সরকারের নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবছর যেটুকু টাকা দরকার, অর্থমন্ত্রী সেটুকুও দিতে রাজি নন। কে জানে, হয়তো খোদ সরকারের নীতিনির্ধারকরাই শিক্ষাক্ষেত্রে এই বরাদ্দ দিতে রাজি নয়, শিক্ষানীতি কেবলই একটি আইওয়াশ!

 শিক্ষার জন্য, শিক্ষকদের জন্য সরকারের আলাদা দরদ থাকার কোনোই দরকার নেই, যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য যতোটুকু বরাদ্দ করা দরকার, ততোটুকু বরাদ্দ করলে এসব সমস্যা নিয়ে প্রতিবছর কথা বলতে হয় না। আর এমপিওভুক্তি নিয়ে যে জটিলতা এখন দৃশ্যমান, সেটুকুর দায় পুরোপুরি সরকারের। অনর্থক জটিলতা ডেকে আনতে এ সরকার যথেষ্ট দক্ষতা দেখাচ্ছে, এটিও তার বাইরে কিছু নয়।
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩ 

বাজেট : সরকার বস্ত্র শিল্পের জন্য ভাবুক

মীর আব্দুল আলীম: বাংলাদেশের বস্ত্রখাতে বৃহত্তম তিনটি উপখাত স্পিনিং, উইভিং ও ড্রাইং-ফিনিশিং। এই উপখাতগুলোয় প্রায় ৫৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশের বৃহত্তর বিনিয়োগ এ খাতে, তাই এ খাতে যেমন সমস্যা তেমন সম্ভাবনাও প্রচুর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সহায়ক বাজেট প্রয়োজন। তৈরি পোশাক শিল্পের সহযোগী শিল্প হিসেবে এ তিনটি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যার কারণে তৈরি পোশাক শিল্পখাত ৭৬ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। আজকের প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশের বৃহত্তম শিল্পখাত তথা বস্ত্রখাত সম্পর্কে আগামী বাজেটে কী থাকা উচিত আর কী থাকা উচিত নয়, তা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

 ব্যাংক ঋণের অপ্রতুলতা, অর্থাভাব, উচ্চ সুদের হার, বাড়তি কর ভ্যাটের বোঝা আর গ্যাস বিদ্যুৎ সঙ্কটে বিপর্যস্ত এ খাতকে দেশের স্বার্থেই বাঁচানোর দাবি অনেকেরই। সবারই জানা দেশীয় টেক্সটাইল খাত ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চালে আটকে যাচ্ছে এ শিল্প। গত কয়েক বছরে অসংখ্য টেক্সটাইল মিল (তাঁত) বন্ধ হয়ে গেছে। আমার নিজ এলাকা শিল্প সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এ শিল্পের অনেকে লোকসান গুণতে গুণতে পথে বসেছেন। এমন চিত্র সারা দেশের।


 সরকারি সুতা এবং বস্ত্রকল ধ্বংস হয়ে গেছে। বেসরকারি সুতাকলগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো ছিলো। বস্ত্র শিল্পের উৎপাদিত কাপড়ের দাম উৎপাদন খরচ থেকেও কমে যাওয়ায় লোকসান দিচ্ছে বস্ত্রকলগুলো। যার প্রচন্ড প্রভাব পড়েছে ডায়িং প্রিন্টিং শিল্পে। বস্ত্র (তাঁত) এবং ডায়িং শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্পিনিং (সুতা কল) শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সুতা কলগুলোও। যেগুলো চলছে তা চলছে অনেকটাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। প্রতিবেশী দেশ ভারত অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলাদেশে পুরো বস্ত্রখাতকে করায়ত্তে নিয়ে আসার জন্য পরিকল্পিতভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে অহরহ দাবি করা হচ্ছে।

 তারা যেভাবে সুতা, বস্ত্র ও গার্মেন্ট খাতকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, তাতে আগামীতে ভারতের একচেটিয়া ব্যবসার হাতে বাংলাদেশকে পুতুল হয়েই থাকতে হবে। ভারতীয় আগ্রাসনের ফলে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট খাত ধ্বংস হয়ে ভারতনির্ভর হয়ে পড়বে। এদিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মিল মালিকরা এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত।

বেশি দামে আমদানিকৃত তুলা দিয়ে সুতা ও কাপড় তৈরি করে মিল মালিকরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। ক্রেতার অভাবে তাদের গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে লাখ লাখ টন সুতা। এভাবে মাসের পর মাস লোকসান দিয়ে এবং ব্যাংকের ঋণ ও সুদ গুণতে গিয়েই বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিল। আর দেশীয় সুতা ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পেও পড়তে শুরু করেছে নেতিবাচক প্রভাব।


দেশের বস্ত্র ব্যবসায়ী সংগঠন গুলোর দাবি, তারা নানাভাবে  ৩৫ শতাংশ রাজস্ব দিচ্ছে সরকারকে। এ হারে রাজস্ব দিয়ে শিল্পায়ন হবে না বলে ব্যবসায়ীক নেতারা অর্থমন্ত্রীকে সম্প্রতি প্রাক বাজেট আলোচনায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, দেশের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান মূল্য সংযোজন কর মূসক বা ভ্যাট দেন। বাকি ৯০ শতাংশ দেন না। তাই পরিধি বাড়িয়ে ভ্যাটের হার কমিয়ে সারা দেশ থেকে ভ্যাট আদায়ে ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব করেন। ভ্যাটের হার নয় পরিধি বাড়ানোর ব্যবসায়িদের প্রস্তার যুক্তিযুক্ত মনে হয়। হাল সালের তথ্য মতে, দেশে ভ্যাট নিবন্ধন আছে ৮ লাখ ৪০ হাজারের। কিন্তু মাত্র ৩২ হাজার ব্যবসায়ী ভ্যাট দেন। এটা খুব কম। এটাকে বাড়াতে হবে। এদিকে ভ্যাট আইন নিয়ে ভীতিতে আছেন ব্যবসায়ীরা।


 ডিজিটালের নামে নতুন করে জটিলতায় পড়বেন কিনা সেই শঙ্কায় আছেন তারা। এরই মধ্যে রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাছ থেকে হয়রানির হুমকি পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। নতুন আইনে কোন হয়রানির সুযোগ থাকবে না আশ্বস্ত করে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেছেন, যে কোন অভিযোগ সরাসরি তার দপ্তরে জানাতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। রাজস্ব বোর্ডের প্রাক বাজেট আলোচনায় এসব কথা উঠে এসেছে। যতদুর জানি, জুলাইয়ের এক তারিখ থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হবেই।

 এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে রাজস্ব বোর্ড ও অর্থমন্ত্রণালয়। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নতুন পদ্ধতিতে ভ্যাট দেয়া কিংবা হিসাব নিকাশ করার মত সামর্থ ও প্রস্তুতি ছোট ব্যবসায়ীদের নেই। তাই নতুন  আইন নিয়ে তারা শঙ্কিত। অল্প সময়ে তারা সব কিছু গুছিয়ে উঠতে পারবেন কিনা তাতে সন্দেহ আছে। এছাড়া দেশের বস্ত্র শিল্পের যা অবস্থা তাতে ছোট খাটো বস্ত্র শিল্পই বেশি সমস্যায় পড়বে। ভ্যাট আয়কর আর মূসকের চাপে তারা এখন ব্যবসাই টিকিয়ে রাখতে পারছেন না তার উপর দক্ষ জনবল বাড়ানো তাদের জন্য কষ্ট সাধ্য হবে। বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আনা উচিৎ মনে করি।

 

বস্ত্র শিল্পকে বাঁচাতে ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে বস্ত্র খাতের উপর বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার স্বার্থে কর অবকাশ সুবিধা আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক। গ্লোবালাইজেশন, সুতার মূল্যবৃদ্ধি, ইউ রুলস অব অরিজিনসহ অন্যান্য কারণে সৃষ্ট অসম প্রতিযোগিতা মোকাবিলার মাধ্যমে ওভেন উপখাতকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বিকল্প নগদ সহায়তা ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বিটিএমএ।

এর ফলে বস্ত্রখাত উপকৃত হয়ে অর্থনীতিতে আরো অবদান রাখতে সক্ষম হবে মনে করছে সংগঠনটি। এটি তাদের যৌক্তিক দাবিও। বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, সাইজিং ম্যাটেরিয়েল, রাসায়নিক দ্রব্যে শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা দরকার। বর্তমানে বিদ্যমান শতাংশ আমদানি শুল্ক উদ্যোক্তাদের আর্থিক বোঝা লাঘবের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না।


তাই বস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত ও প্রকল্প ব্যয় হ্র্রাসকরণের স্বার্থে আগের মতো বস্ত্রখাতে ব্যবহৃত যাবতীয় ক্যাপিটাল মেশিনারিকে শূন্য শুল্কে আমদানির সুবিধা দেয়া প্রয়োজন। দেশের স্পিনিং শিল্প গত ৫ বছরে নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। স্পিনিং শিল্পের জন্য দেশে বর্তমানে চার মিলিয়ন বেলের বেশি তুলা আমদানি করা হয়। মিল কর্তৃক তুলা আমদানি হলে কোনো ধরনের শুল্ক ও কর দিতে হয় না।

কিন্তু দেশের বাজার থেকে অন্য কোনো মাধ্যম থেকে তুলা কিনলে প্রতি পাউন্ডে ২ দশমিক ২৫ টাকা হারে ভ্যাট দিতে হয়। ফলে সুতার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজটে এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা জরুরি। বর্তমানে বস্ত্র কারখানায় ব্যবহার অযোগ্য তুলা, যা বর্জ্য হিসেবে পরিচিত, তা মিল থেকে অপসারণ করতে প্রতি কেজিতে এক থেকে ১০ টাকা হারে ভ্যাট দিতে হয়।


 যদিও এই বর্জ্য তুলা কোনো উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে না; বরং বিদ্যমান আইনে বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা, অনিয়ম ও হয়রানির সৃষ্টি হচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায় আগামী বাজেটে বর্জ্য তুলা অপসারণে ভ্যাট প্রত্যাহার করা দরকার। যেসব কারখানা পরিবেশ দূষণ করতে পারে বিশেষ করে বস্ত্রখাতের ড্রাইং-ফিনিশিং খাতের জন্য ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক। কারণ শিল্পকারখানা এসব বর্জ্য পদার্থ ও দূষিত পানি পরিবেশকে নষ্ট করে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ইটিপি স্থাপন বেশ ব্যয়বহুল, যার পরিকল্পনা ব্যয়ও অনেক। তাই ছোটখাটো শিল্প প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করতে পারে না। অন্যদিকে ইটিপি স্থাপনের পর যে কেমিক্যাল প্রতিদিন ব্যবহৃত হয় এর ফলে শিল্পকারখানার জন্য উৎপাদন খরচ বাড়ে।


 শিল্প কারখানায় ইটিপিতে যে কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয়, তার আমদানি ও মূল্যসংযোজন কর যথাক্রমে ১২ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ। এই দুটি কেমিক্যালের আমদানি ও মূল্যসংযোজন কর প্রত্যাহার করলে ইটিপি স্থাপনের ব্যয় হ্রাস পাবে। তাতে ব্যবসায়ীরা ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনা নিয়মিত করবেন। এ ক্ষেত্রে যে দুটি কেমিক্যালের অগ্রিম আয় করের বিধান রয়েছে, তা অগ্রিম আয় কর প্রত্যাহার করা উচিত। আমাদের দেশে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শিল্পাঞ্চলে সরকারিভাবে ইটিপি স্থাপন করা যেতে পারে।

 যারা ইটিপি ব্যবহার করবেন তারা সরকারকে একটি নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রদান করবেন। তাতে করে সকল শিল্পকারখানা ইটিপির আওতায় আসবে পরিবেশ বাঁচবে শিল্পকারখানাগুলোও হয়রানি থেকে রক্ষা পাবে। অনেক ডায়িং মালিক দীর্ঘদিন লোকসান গুনতে গুনতে পথে বসেছেন। এ বাজেটে ডায়িং শিল্প সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, ফতুল্লা, সাভার, নরসিংদী, মধাবদ তে সরকারী ভাবে ইটিপি স্থাপন করা গেলে শিল্প যেমন বাঁচবে। পরিবেশও দুষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে। এজন্য আগামী বাজেটে এখাতে বরাদ্ধ রাখার কথা সরকার ভাবতে পারে।

 

চলতি বাজেটে বস্ত্র খাতকে বাঁচাতে এ শিল্পের জন্য আয়কর হার কমানোর ব্যবস্থা করা, বিকল্প নগদ সহায়তার উপর ধার্যকৃত কর প্রত্যাহার করা, বিকল্প নগদ সহায়তা ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা, পুরাতন মূলধনী যন্ত্রপাতিকে পিএসআই’র (প্রাক জাহাজিকরণ পরিদর্শন) আওতার বাইরে রাখা, বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, সাইজিং ম্যাটেরিয়াল ও রং রসায়নের শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা, অ্যাক্রেলিক টপসের উপর শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা, পলিয়েস্টার, স্ট্যাপল ফাইবারের এইচ এস কোড (পণ্য পরিচিতি কোড) সংশোধন করা অত্যাবশ্যক। বর্তমানে বস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সুতার মিল, সুতা ডায়িং, ফিনিশিং, কাপড় তৈরি, কাপড় ডায়িং, ফিনিশিং এবং প্রিন্টিংয়ের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে আয় কর দিচ্ছে। যদিও তৈরি পোশাকশিল্পের উৎসে আয়কর হার হচ্ছে ০.৪০ শতাংশ এবং পোলট্রি খাতে আয়কর হার ৫ শতাংশ।


 আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে বিকল্প নগদ সহায়তার ওপর ৩৭.৫০% আরোপিত কর সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তা প্রত্যাহার করা জরুরি। প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতে একটি কার্যকর ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প’ গড়ে তোলার জন্য সরকার ৫% নগদ সহায়তা দেয়। কিন্তু এ থেকে সরকার প্রায় ৩৭.৫০% কর হিসেবে কেটে নেয়। ফলে যে উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীদের এ সহায়তা দেয়া হয় তা সত্যিকারের কাজে লাগে না। ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, এ সব সহায়তা নিট আয় হিসেবে না দেখে আয়করমুক্ত হিসেবে আগামী বাজেট থেকে কার্যকর করতে। এ কথা কোনো রাখঢাক না রেখেই বলা যায়, ভারত বাংলাদেশের সুতা ও বস্ত্র খাতের বাজার পুরোপুরি দখল করে রাখতে সুকৌশলে অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।


 একদিকে তারা এ খাতকে দিচ্ছে আকর্ষণীয় প্রণোদনা (ইনসেনটিভ) সুবিধা, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও রেখেছে সর্বনিম্ন। ফলে ভারতীয় সুতা কলগুলোর উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম পড়ছে। কেজি প্রতি তারা ৫ ডলার থেকে ৫ ডলার ২০ সেন্টস দরে বিক্রি করছে। আর নানা বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে এই কম দামের সুতা প্রবেশ করায় দেশীয় সুতার কারখানাগুলো অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। কারণ বাংলাদেশের সুতা কারখানার মালিকদের সার্ভিস চার্জ ও চক্রবৃদ্ধিসহ ব্যাংক ঋণের সুদের হার গুণতে হয় ২২ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত। আবার সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতের জন্য কোনো প্রকারের প্রণোদনা দেয়া হয় না। ফলে সব মিলিয়ে দেশীয় মিলগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার পথে।


বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েক বছর ধরে তৈরি পোশাকের জন্য জিএসপির নতুন যে শর্ত দিয়েছে, তাতে স্পিনিং ও টেক্সটাইল শিল্পখাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে বিদেশি সুতা ও বস্ত্রের। পাশাপাশি দেশীয় সুতার বাজারে ভারতীয় আগ্রাসনে বিপর্যস্ত দেশীয় স্পিনিং শিল্প। এদিকে ইইউতে জিএসপির নতুন শর্তে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রিফারেন্স (জিএসপি) সুবিধার শর্ত পরিবর্তন করেছে। এর ফলে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের স্পিনিংসহ টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা।


 এতদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা দেশে উৎপাদিত কাপড় ও সুতা ব্যবহার করত। তাদের সুতার চাহিদার বেশিরভাগই পূরণ করত দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো। কিন্তু জিএসপির শর্ত পরিবর্তন করায় এখন বিদেশ থেকে সুতা ও কাপড় আমদানি করে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। শুধু সেলাই করেই পোশাক ইউরোপে শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করতে পারছে তারা। বিষয়টি নিয়ে চলতি বাজেটে ভাববার দরকার রয়েছে। পোশাক প্রস্তুতকারকরা কাপড় ও সুতা ব্যাপকভাবে আমদানি করছে। ইতোমধ্যেই বিদেশি সুতা ও কাপড়ে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। ফলে ভয়াবহ সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে দেশের সুতা তৈরির মিলগুলো।

 সুতার আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দেশে বিপুল পরিমাণ সুতা অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মিল মালিকরা বাধ্য হয়েই উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে স্টক লটের সুতা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের শিল্প সংরক্ষণ নীতি গ্রহণের সাথে সাথে শিল্প-আগ্রাসনও প্রতিরোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব না দিলে দেশের বস্ত্রশিল্প বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
 newsstore13@gmail.com
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

উচ্চ শিক্ষা প্রসঙ্গে কিছু কথা

আব্দুল হাই রঞ্জু : সবাই বলি শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। বাস্তবেও তাই, যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। আর শিক্ষা অর্জন করার সুযোগ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ জন্য জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে ব্যয়ের জন্য বাড়তি বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা শিক্ষার উন্নয়নে মুখে যত কথা বলেন, বাস্তবে সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ আজও সূদুর পরাহত।


 অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের মৌলিক অধিকারগুলোর দাবিতে বাঙালি জাতির দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের ফসল আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জন। মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি অর্জন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনে ছিল ছাত্র সমাজের মুখ্য ভূমিকা। স্বপ্ন ছিল দেশ স্বাধীন হবে, স্বাধীন দেশে প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, স্বাধীনতা অর্জনের পর দীর্ঘ সময়েও সে আকাঙ্খার সফল বাস্তবায়ন হয়নি। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, নিশ্চয়ই আপনি অবগত আছেন, প্রাথমিক স্তর ব্যতিত দেশে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে রেজি: বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারিকরণ করায় প্রাথমিক স্তরে এখন আর কোন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই।

 

 যা অর্জিত হয়েছে আপনার সফল নেতৃত্বের কারণে। এ জন্য গোটা জাতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আপনাকে অভিনন্দিত করেছে। বলতে দ্বি-ধা নেই, মহান স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতিয়করণ করায় প্রাথমিক শিক্ষার অনেক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সরকারিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের তেমন কোন নজির নেই। মূলত স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, দানশীল সুশীল সমাজের নেতৃত্বে শহর থেকে মফস্বল অঞ্চলে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা স্থাপিত হয়েছে।


 এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকার বেসরকারি শিক্ষা কাঠামোর আওতায় এমপিওভুক্ত করে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। অতিতে মুল বেতনের অংশ বিশেষ সরকারিভাবে প্রদান করা হলেও শিক্ষক কর্মচারীদের শতভাগ বেতন এখন সরকারি কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে। সরকার এখন ব্যক্তি উদ্যোগে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দিচ্ছে না। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে এখনও কোন বাধা নিষেধ আরোপ করা হয়নি। মুলত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নানাবিধ সমস্যা নিয়েই পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, নির্দিষ্ট এক বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে অন্য বিষয়ে পাঠদানের মত কার্যক্রম এখনও চালু আছে।


বাস্তব এ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিও নীতিমালা চতুর্থবারের মতো সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ যে সময়োচিত এবং বাস্তবসম্মত, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং তা এমপিও ভুক্তির আওতায় বাদ পড়া একটি বিষয়কে জরুরি ভেবেই মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীকে তা ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিষয়ের জনৈক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে এমপিও জনবল কাঠামো অনুযায়ী নি¤œমাধ্যমিক স্কুলে বাংলা, ইংরেজী ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে একজন করে শিক্ষকের এমপিও পদ আছে। নতুন প্রস্তাবনায় প্রতিটি বিষয়ে একজন করে শিক্ষক এমপিওভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।


 মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে বাংলা, ইংরেজী, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে ৩ জন করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকের পদ রয়েছে। নতুন করে  ব্যবসায় শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন এবং গণিত বিষয়ে আলাদা শিক্ষক এমপিওভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শারীরিক শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং চারু ও কারুকলা বিষয়সমূহ চালু থাকলেও এগুলো এখনও এমপিও বঞ্চিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়গুলোর মধ্যে শুধুমাত্র শারীরিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দু’টিকেও এমপিওভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।


 এমনকি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল এবং দাখিল ও আলিম পর্যায়ের মাদ্রাসায় বিজ্ঞানের একজন শিক্ষকের পদ এমপিওভুক্ত রয়েছে। তিনি একাই পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা ও উচ্চতর গণিত বিষয়ে পাঠদান করে আসছেন। সংশোধিত নীতিমালায় ভৌত বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের জন্য পৃথক শিক্ষক এমপিওভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। স্কুল ও মাদ্রাসায় কৃষি এবং গার্হস্থ্য আলাদা বিশেষায়িত বিষয় হলেও একজন শিক্ষককে দুই বিষয়ে পাঠদান করতে হয়। নতুন প্রস্তাবনায় গার্হস্থ্য বিষয়ের জন্য পৃথক শিক্ষক এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। এমনকি বালিকা বিদ্যালয়ে বিষয়টিকে বাধ্যতামুলক করার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।


কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উক্ত বিষয়টিকে এমপিওভুক্তির আওতায় আনা হয়নি, তা বিবেচনায় নিতে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই আজকের এ লেখার অবতারণা। মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই উপলব্ধি করেছে, অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা, জেল, জুলুম উপক্ষো করে বাঙালি জাতিকে মহান স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অনেক রক্ত ও সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়েছে। আমাদের মহান স্বাধীনতা স্বল্প সময়ে অর্জিত হয়নি।


এজন্য বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বৈরাচারী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুগের পর যুগ ধরে আন্দোলন করতে হয়েছে। সে ইতিহাস অনেক পুরনো। যা বর্তমান প্রজন্মের জানার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের নিকট তুলে ধরতে না পারলে প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত হবে। যা নিয়ে বর্তমান সরকারের দুস্তর অভিযোগও রয়েছে। এ বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই ডিগ্রি স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ নামে একটি বিষয়কে পাঠাদানে অন্তর্ভুক্ত করে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে পাঠদানের নিমিত্তে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিধি মোতাবেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সংশোধিত নীতিমালায় বাধ্যতামূলক এই বিষয়টিকে এমপিওভুক্তির আওতায় কেন আনা হলো না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।


 তবে আমরা মনে করি, যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের জানা দরকার, সেহেতু বাধ্যতামূলক এই বিষয়টিকে সংশোধিত নীতিমালার আওতায় এনে এমপিওভুক্ত করা উচিৎ। তা না হলে, সরকারের সদিচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে না। এমনকি কোন সময় সরকার পরিবর্তন হলে এই বিষয়টি শিক্ষা কারিকুলাম থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনাও থেকে যাবে। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস বাধ্যতামূলক বিষয়টিকে এমপিওভুক্তি আনা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করছি, মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিবেন।


শিক্ষার প্রসারে সরকার নানাভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ফলে শিক্ষার হারও অনেক বেড়েছে। যেখানে সরকার বেসরকারি পর্যায়ে নতুন করে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা স্থাপনে বাধা দিচ্ছে, সেখানে বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে স্বীকৃতি বন্ধ করা হয়নি। এখন বিত্তশালী অনেকেই শিক্ষাকে বাণিজ্যিক হিসেবে গ্রহণ করেছে। যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিম্বা মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে কোটি কোটি টাকা ডোনেশন হিসেবে আদায় করছে। শিক্ষা মন্ত্রনালয় আইন করে নিজস্ব ক্যাম্পাসে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্থানান্তর করার সময়সীমা বেঁধে দিলেও কার্যত তা পালন করা হচ্ছে না।

মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ সরকার রহিত  করলেও কেন এবং কোন যুক্তিতে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্যের বাইরে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় মন্ত্রী আপনি অতি-সম্প্রতি অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুনাফার লক্ষ্য নিয়ে চলতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হবে মর্মেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।


 প্রকারান্তরে মাননীয় মন্ত্রী আপনি স্বীকার করেছেন, হয়ত উচ্চ শিক্ষার নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থ বাণিজ্য করছে! আমরা মনে করি, আপনার হুঁশিয়ারি যৌক্তিক এবং সময়োচিত। কিন্তু শুধু হুংকার ছাড়লেই হবে না বরং শিক্ষার নামে বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মান উন্নয়নের জন্য এমন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেন বেঁধে দেওয়া পরিমাণ শিক্ষার্থী চুড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে সেই বিষয়ের শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে সরকারি সুযোগ সুবিধা স্থগিত করা হবে।


 তাহলে শিক্ষার মান উন্নয়নে সকলেই আন্তরিক হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৮ জন শিক্ষক ও ১ লাখ ৫ হাজার ৫৭৪ জন কর্মচারি চাকুরিরত রয়েছেন। যেখানে সব মিলে শিক্ষক কর্মচারির সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার। আর সংশোধিত নীতিমালা কার্যকর হলে গোটা দেশে ২৬ হাজার ৯০টি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরও ১ লাখ ২ হাজার ৬৭৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী নতুন করে এমপিওভুক্তির সুযোগ পাবেন।

সেখানে বাধ্যতামুলক বিয়ষ “স্বাধীন বাঙলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস” বিয়য়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হলে নুতন প্রজন্মের স্বাধীনতা অর্জনের সঠিক ইতিহাস জানার যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, তার সফল বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হবে। কারণ একটি বাধ্যতামুলক বিষয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক অভুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের আর কতদিন পাঠদান করে আসবেন। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ বিষয়টিকে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ আপনি গ্রহণ করবেন, এটাই আপামর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা।
 লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

প্রশিক্ষণ ও আত্মসংযমের শ্রেষ্ঠ মাস মাহে রমজান

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রবিবার শুরু হতে যাচ্ছে রহমত, বরকত মাগফেরাত, আত্মোপলদ্ধি, সততা, আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও প্রশিক্ষণের শ্রেষ্ঠ মাস পবিত্র মাহে রমজান। যে মাসের প্রতীক্ষায়  রয়েছে  প্রতিটি মোমিনের দেহ প্রাণ। তাই রমজানের আগমন বার্তাকে জানাই স্বাগতম ও মোবারকবাদ।

রমজান শব্দটি রমজ ধাতু হতে উৎপত্তি যার অর্থ পোড়ানো, জ্বালানো। যেহেতু রমজানের একটি মাস বনি আদম সওমের মাধ্যমে যাবতীয় গুণাহ (ছগিরা) পুড়ে ভস্ম করে খাটি নিঃষ্পাপ সন্তানের মত হয়ে উঠে, তাই এই মাসের নাম দেয়া হয়েছে রমজান। তেমনিভাবে রোজা শব্দটি ফার্সি।


 আরবীতে বলা হয় সওম অর্থ বিরত থাকা বা বর্জন করা, ইসলামী পরিভাষায় সুবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহার পানাহার, যৌন ক্রিয়া সহ যাবতীয় খারাপ কাজ থেকে দেহ ও প্রাণকে সচেতন ভাবে বিরত থাকার নাম রোজা। শারীরিক ইবাদতের মধ্যে নামাজের পরেই রোজার স্থান। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ও দৈহিক সামর্থ্যরে অধিকারী মুসলিম নর-নারীর উপর রমজানের রোজা ফরজ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাক ইসলামী যুগেও রোজা রাখার বিধান ছিল। ইহুদী খ্রীষ্টান সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও রোজা রাখতো। হযরত দাউদ (আঃ) তাহার শিশু পুত্রের জন্য অসুস্থতার সময় ৭ দিন রোজা রাখতেন, মুসা (আ:) বছরে ৪ দিন রোজা রাখতেন, ঈসা (আ:) রোজা রাখতেন আশুরার ১০ দিন। আরবের প্রাক-ইসলামী যুগের লোকেরা সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অথবা দুঃখজনক ঘটনার স্মরণার্থে রোজা পালন করত। আমাদের পিয়ারা নবী হযরত মোহাম্মদ (স:) রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে মহরমের দশ তারিখ রোজা রাখতেন।

 

মহানবী (স:) এর ২য় হিজরী অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে রমজানে, ঈমানদার বান্দাদের জন্য রোজা রাখার স্বর্গীয় আদেশ নাজিল হয়। মহান আল্লাহ বলেন ‘হে ঈমানদারগণ তোমাদের জন্য রোজা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যাহাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার (সুরা বাকারা ১৮৩)।


মূলত রমযান মাস হচ্ছে তাকওয়ার মাস, খোদাভীতি অর্জনের মাস। খোদাভীরু মানুষের পক্ষে অপরাধ করা অসম্ভব। কারণ যার মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই তার দ্বারা সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতা বিরোধী সব ধরনের অপরাধ সম্ভব। তাই রমজান আসছে বনি আদমের মধ্যে আল্লাহ ভীতি তথা তাকওয়ার বীজ বপনের জন্য। খোদাভীতি অর্জনই হচ্ছে রমজানের মূল উদ্দেশ্য এই মাসে পশ্চিম আকাশে নতুন চাঁদ ওঠার সাথে সাথে মুসলমান নর নারীর উপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ যা পরবর্তী সওয়াল মাসের চাঁদ উদয়ের সাথে সাথে রোজার সমাপ্তি ঘটে। এ কথা সত্য যে, মুসলমানদের রোজা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে অনাহারে থাকাতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তাদের চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা ও অন্য সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সমূহকে যাবতীয় লোভ লালসা, দুষ্কর্ম হতে সংযত করা বুঝায়।


 কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল আমাদের সমাজে রোজা রেখেও অনেকে সুদ, ঘুষ, মিথ্যাচার ধোকাবাজী, মানুষকে উৎপীড়ন, ব্যবসায় ভেজাল প্রদান, দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়া, পরস্পর হিংসা বিদ্বেষ, গীবত, পরচর্চা, ঝগড়া, কলহ, বিবাদ ইত্যাকার অন্যায় কর্মে লিপ্ত এছাড়াও অশ্লীল গান, বাজনা, ছায়াছবির অশ্লীল চিত্র ইত্যাদি কার্যকলাপ পবিত্র রমজানের পবিত্রতাকে দারুনভাবে ক্ষুন্ন করে। স্রষ্টাভীরু সদিচ্ছা সম্পন্ন মুমিনদের জন্য যা দারুণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিয়ামের কাঙ্খিত কল্যাণ লাভের পথে তাদের যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। যা মোমিনের কাম্য হতে পারে না। এমন কি হাদিসে বলা হয়েছে যে রোজা অবস্থায় কারও সাথে ঝগড়া করা যাবে না।

 

বরং যদি কেহ ঝগড়া করতে চায় তবে তুমি সেখানে বল আমি একজন রোজাদার। এ জন্য পবিত্র মাহে রমযানের পবিত্রতা রক্ষা করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। রোজাদারের রোজা বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয় এমন কাজ করা উচিত নয়। রমজানের ফজিলত দর্শন ও তাৎপর্য এই অল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তথাপি কিছু তথ্য নির্ভর আলোচনা জ্ঞানি পাঠক পাঠিকা ভাই ও বোনদের নিকট উপস্থাপন করার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।


পবিত্র মাহে রমজানের ফজিলত ও বরকত সম্পর্কে আওলিয়া কূল শিরোমনি গওসুল আযম হযরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহ) রচিত গুনিয়াতুত্তালেবীন গ্রন্থে ২১৯ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন হযরত আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত তিনি বলেন নবী (স) বলেছেন রমযানের প্রথম চাঁদ উদয়ের সাথে সাথে আসমান ও বেহেস্তের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। রমজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করা হয় না। যদি কোন মোমেন পুরুষ বা মহিলা রমজানের রাত্রে নামায পড়ে তবে প্রত্যেক সেজদাহর পরিবর্তে এক হাজার সাতশত পূণ্য দান করা হয়। তার জন্য লাল ইয়াকুত পাথর দ্বারা বেহেশতে প্রাসাদ তৈরি করা হবে

 

প্রত্যেক প্রাসাদে স্বর্ণের সত্তর হাজার দরজা থাকবে। দরজাগুলি ইয়াকুত দ্বারা সুসজ্জিত করা হবে। যখন কোন বান্দা রমজানের প্রথম রোযা রাখে আল্লাহ রমজানের শেষ পর্যন্ত তাহার সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। রমজানের প্রত্যেকটি রোযার পরিবর্তে সত্তর হাজার দরজা বিশিষ্ট এক একটি প্রাসাদ তার জন্য তৈয়ার করা হয়। সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। রাত দিনে যত সিজদাহ করে উহার প্রত্যেক সেজদার পরিবর্তে এমন এক একটি গাছ দান করা হবে। যার দ্বারা কোন অশ্বারোহী শত বছর অশ্ব পরিচালনা করলেও সেই ছায়ার প্রান্ত সীমায় পৌছাতে পারবে না’।


অন্যত্র হযরত আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুল (স) এরশাদ করেছেন রমজান মাস আগমন করলে দোযখের সব দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, বেহেস্তের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং সমস্ত শয়তানকে শিকল দ্বারা বন্ধ করা হয়। এ মাসে চারটি কাজ করা জরুরি বলে বুজুর্গ ব্যক্তিরা মনে করেন। দুইটি আল্লাহকে রাজি-খুশি রাখা অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু তসবিহ পাঠ করা এবং বেশি বেশি এসতেগফার বা তওবা পাঠ করা। বাকি দুইটি হলো আল্লাহর নিকট জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া এবং জান্নাত কামনায় প্রার্থনা করা। রোজার ফযিলত সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে বনি আদমের প্রত্যেক কাজের সওয়াব দশগুণ হতে সাতশতগুণ পর্যন্ত অথবা তদুর্দ্ধে বৃদ্ধি করিয়া দেয়া হল, আল্লাহ যদি তাহা ইচ্ছা করেন মহান ও প্রতাপশালী আল্লাহ বলেন শুধু রোজা ব্যতীত।


 কারণ তা বিশেষভাবে আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দিব। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ, একটি ইফতারের সময় অপরটি হচ্ছে আখেরাতে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত, নিশ্চয় রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মৃগনাভির সুগন্ধি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর আহম্মদ ও মুসলিম উহা আবু হুরায়রা এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন (হাদিসে কুদসী পৃ: ১৩৩)। রমজানের মাস ধৈর্য্যরে মাস, এ মাসে বান্দার ধৈর্য্যরে পরীক্ষা হয়। ৩০ দিন সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সায়েম তার মন্দ প্রবণতা সমূহ পোড়াইয়া দেয়। মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয় সাম্য, মৈত্রী, সহানুভূতি ও সমবেদনার ভাব।


সমস্ত রমজান মাসই আল্লাহ বলতে থাকেন হে আমার বান্দাগণ। তোমরা ধৈর্য্য প্রতিষ্ঠিত থাক অচিরেই তোমাদের ধৈর্য্যরে প্রতিদান দেয়া হবে। অচিরেই তোমরা আমার রহমত এবং সান্নিধ্য লাভ করবে। আবু হুরায়রা থেকে বর্নিত নবী (স) বলেন ঈমানদার অবস্থায় এবং পূণ্যের  আশায় যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোযা রাখে এবং রাতে ইবাদত করে (নামাজ পড়ে) আল্লাহ তায়ালার তার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেন। অন্যত্র বলা হয়েছে নবী (স) বলেন মানুষের জন্য রোযা অর্ধেক ধৈর্য। প্রত্যেক জিনিসের যাকাত আছে দেহের যাকাত রোজা।


এ মাসের আরও একটি গুরুত্ব হচ্ছে এ মাসের শেষের ১০ তারিখের মধ্যে রয়েছে শবে কদর বা কোরআন নাযিলের রাত। এটা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সুরা কদর) এ মাসে নির্দিষ্ট সময় আহার, সেহেরী ও তারাবির নামাজের মাধ্যমে বনী আদম এক প্রশিক্ষণ ও আত্মসংযমে উত্তীর্ণ হয়। রোজা আল্লাহর এক অপূর্ব নিয়ামত আমরা এটা পালনের মাধ্যমে দ্রুত আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। দয়াময় আল্লাহর বিশ্বের সকল মুসলমান নরনারীকে সুস্থ শরীরে সঠিকভাবে রমজানের রোজা পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন ছুম্মা আমিন!  
লেখক : প্রভাষক ও প্রাবন্ধিক।
mostakimbogra@gmail.com
০১৭১২-৭৭৭০৫৮



Go Top