সকাল ১০:৪৪, সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ মতামত

কুমকুম ইয়াছমিন :পুষ্টি হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার কাজ হল খাদ্যবস্তু পরিপাক ও শোষণ করা, দেহের শক্তির চাহিদা পূরণ, রোগ প্রতিরোধ এবং বৃদ্ধি সাধন নিশ্চিত করা। দেহকে সুস্থ ও সবল রাখতে প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি। ছয়টি খাদ্য উপাদানের মাধ্যমে মানুষ তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেয়ে থাকে। জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ধাপসমুহ যথাঃ শিশুকাল, শৈশবকাল, কৈশোর, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদানকাল ও বয়োসন্ধিকালে পুষ্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 সুন্দর ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি মানুষকে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খাবার নির্দিষ্ট পরিমাপে গ্রহণ করতে হয়। এর তারতম্য হলে নানা রকম পুষ্টি সমস্যা দেখা দেয়। পুষ্টি সম্পর্কিত অনেক ভুল ধারণা আমাদের সমাজে বর্তমান। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় সঠিক পুষ্টি গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়। পুষ্টি বিজ্ঞানে ‘ফুড এক্সচেঞ্জ’ নামে একটি শব্দ পাওয়া যায়, যার সম্পর্কে সঠিক ধারণা বেশীরভাগ মানুষের মাঝেই অনুপস্থিত। অনেকেই ধারণা করেন, শুধুমাত্র দামী খাবারেই পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি রয়েছে।

 খাদ্য তালিকায় যে কোন একটি খাবার থেকে যে পরিমাণে ক্যালরি, পুষ্টিমান, ফ্যাট, প্রোটিন পাওয়া যায় তার সম পরিমাণ পুষ্টিগুণ যদি অন্য খাবারে পাওয়া যায়, তাহলে সেটিকে ফুড এক্সচেঞ্জ বা বদলি খাবার বলে। দামি খাবারে যে পুষ্টিগুণ আছে, সেই প্রায় একই রকম পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার আমরা কমদামি খাবারেও পেতে পারি। শুধু দরকার সচেতনতা ও পুষ্টিজ্ঞান।

মাছের প্রায় সম পরিমাণ প্রোটিন আমরা ডালেও পেতে পারি। দামি কলিজার প্রায় সম পরিমাণ লৌহ আমরা কচুশাকে পেতে পারি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তা হল, তিন বেলা পেট পুরে খাবার খেলেই তারা মনে করেন পর্যাপ্ত পুষ্টিমানের খাবার গ্রহণ করেছেন। মনে রাখতে হবে, খাওয়ার উদ্দেশ্য শুধু পেট ভরানো বা ক্ষুধা মিটানো নয়, শরীরের সঠিক চাহিদা নিরুপণ করে পুষ্টি চাহদা পুরোপুরি পূরণ করা।

 আবার শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততায় উচ্চ বিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে ফাস্ট ফুড খাওয়ার অত্যধিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এ ফাস্ট ফুড মূলত জাঙ্ক ফুড। বাড়তি তেল, চর্বি, লবণ, চিনি, সোডিয়াম কার্বনেটের মত উপাদান বেশি পরিমাণে আছে যে খাবার গুলোতে, সেগুলো জাঙ্ক ফুড। এ খাবার গুলো শিশু ও কিশোরদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

যার জন্য তাদের বাবা মাও বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানদের এ খাবার গুলো দিয়ে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় জাঙ্ক ফুডের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানা গেছে। শারীরিক স্বাস্থ্য তো বটেই মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে জাঙ্ক ফুড। শেখা, স্মৃতিতে ধারণ করা, সিদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া এই শিশু ও কিশোররা সাধারণত স্থূলকায় হয়, ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে তাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগে ভোগার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

 
সুষম পুষ্টি একটি দেশের ও জনগণের জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত। অপুষ্টি নানা সমস্যার জন্ম দেয়। জন্মের পর থেকে শিশুর ২ বছর বয়সকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশতঃ এই সময়ে কোনো শিশু অপুষ্টির শিকার হলে তা তার শারীরিক বৃদ্ধি ও বৌদ্ধিক উন্নতিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। সরকার পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, টীকাদান কর্মসূচী, ভিটামিন এ খাওয়ানো, কৃমি নাশক বড়ি খাওয়ানো ইত্যাদি নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। গত চার বছরে বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও জনমিতি জরিপ এর ২০১১ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ৪১% খর্বকায়, ১৬% কৃশকায় ও ৩৬% শিশু কম ওজনের এবং ২০১৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৬% শিশু খর্বকায়, ১৪ ভাগ শিশু কৃশকায় ও ৩৩ ভাগ শিশু কম ওজনের। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও জনমিতি জরিপ এর রিপোর্টে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, শিশুদের অপুষ্টি ধীরে ধীরে কমছে, যা পরোক্ষভাবে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতির ইঙ্গিত বহন করে।

ইউনিসেফের মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (গওঈঝ) ২০১২-২০১৩ সালের রিপোর্টে বিভিন্ন জেলার পুষ্টি তথ্য রয়েছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী অপুষ্টিতে ভোগা সবচেয়ে বেশি শিশু আছে সিলেট বিভাগে। সেখানে কম ওজনের শিশু আছে ৫২.৮ ভাগ, খর্বকায় শিশু আছে ৭২.৮ ভাগ এবং কৃশকায় শিশু আছে ১৬.১ ভাগ।

কম ওজনের ও খর্বকায় শিশু সবচেয়ে কম আছে খুলনা বিভাগে যা যথাক্রমে ৩৪.৭ ভাগ ও ৪৫.৭ ভাগ। কৃশকায় শিশু সবচেয়ে কম আছে রংপুর বাভাগে যা ১০.১ ভাগ। এম আই সি এস এর পুষ্টি চিত্র হতাশাব্যাঞ্জক হলেও এখনো আশা করার মত অনেক কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, মাথা পিছু গড় আয় বৃদ্ধি, লিঙ্গ বৈষম্য কমান, গড় আয়ু বৃদ্ধি, সকল শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।


খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টি একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান ও সবজির বীজ উৎপাদন, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নয়ন, উন্নত বীজ ব্যবহার, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণ করে খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এত কিছুর পরেও কাঙ্ক্ষিত পুষ্টি পরিস্থিতি এখনো অধরা। এখনো পুষ্টির অভাবজনিত কারণে রক্তস্বল্পতায় ভুগছে ৪০ শতাংশের বেশি নারী।


হাড্ডিসার শিশু, কৃশকায় শিশু, খর্বকায় শিশু, এনিমিক শিশু,শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ায় ভোগা শিশু, স্থূলকায় শিশু, প্রথম জন্মদিনের আগেই মরে যাওয়া শিশু-এগুলোই শিশুদের অপুষ্টিজনিত নানা সমস্যার ভয়াবহ চিত্র। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩ কোটী ৬০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। ৫ বছরের কম বয়সী যত শিশু প্রতি বছর মারা যাচ্ছে তাদের তিন জনের এক জন মারা যাচ্ছে অপুষ্টিজনিত কারণে। ৩৬ ভাগ শিশু প্রতি বছর কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। ৪১ ভাগ শিশু বেড়ে উঠছে খর্বকায় বা বিকলাঙ্গ হয়ে। ৩৩ ভাগ শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।

 বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে পুষ্টির জন্য বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। কারণ পুষ্টির জন্য বিনিয়োগ হচ্ছে ‘স্মার্ট বিনিয়োগ’। গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, পুষ্টি সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত ৮ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু ইউনিসেফের “ইমপ্রুভিং চাইল্ড নিউট্রিশন” শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টেও বলা হয়েছে, ৮০শতাংশ খর্বকায় শিশু বাস করে বিশ্বের ১৪ টি দেশে। বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ স্থানে। তাই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বাংলাদেশকে স্মার্ট বিনিয়োগে আরো এগিয়ে আসতে হবে।


বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি উপখাতসমূহের সার্বিক উন্নয়ন ও গতিশীলতার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদী স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচি (ঐচঘঝউচ) বাস্তবায়ন করেছে। পূর্বে বাস্তবায়িত কর্মসূচিগুলোর অভিজ্ঞতা, সরকারের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, রূপকল্প ২০২১, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন ও স্বাস্থ্যনীতির আলোকে তৃতীয় সেক্টরের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের পথে কোনো বাঁধা থাকবে না। নবজাতক শিশুদের বুকের দুধ পান করানোর হার ৪৮ শতাংশ থেকে ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, বিদ্যালয় থেকে শিশু ঝরে পড়ার হার কমেছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে, মেয়ে শিশুর ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (১) ধারায় বলা হয়েছে, “জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য করিবেন।“ স্বাধীনতার পর থেকেই সরকার পুষ্টির উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সমন্বয়হীনতার কারণে এখনো পূর্ণ আলোর মুখ দেখেনি পুষ্টি সেক্টর।
২০১২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের পুষ্টি বিষয়ক অধিবেশনে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য ছয়টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে খর্বকায় শিশু ৪০ শতাংশ, রক্তস্বল্পতার শিকার নারী ৫০ শতাংশ, কম জন্ম ওজনের শিশু ৩০ শতাংশ এবং কৃশকায় শিশুর সংখ্যা ৫ শতাংশ কমাতে হবে। ছয়মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো শিশু ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে এবং অতি ওজনের শিশুর সংখ্যা কমাতে হবে। অংশগ্রহণকারী ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে।

অপুষ্টি দূরীকরণে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে অপুষ্টির ভয়াবহতা ও জটিলতা কমিয়ে আনা সম্ভব। যেমনঃ শিক্ষার হার ও মান বাড়ানোর মাধ্যমে পারিবারিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, দারিদ্র বিমোচন আন্দোলন বেগবান করতে হবে, চালের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের মধ্যে রাখতে হবে, খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে, পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ভিত্তিক হতে হবে, বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে, টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে, কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্য চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ করতে হবে, শিশু ও মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।

 তবে সরকারের পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকা পুষ্টি উন্নয়নে অনস্বীকার্য। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অশিক্ষিত মা আছেন এমন পরিবারের শিশুরা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃশতা, খর্বতা, কম ওজন ইত্যাদি সমস্যায় ভুগছে। গ্রামাঞ্চলের শিশুরাও সচেতনতার অভাবে এ ধরনের সমস্যায় ভুগে থাকে। শিক্ষিত মা পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মা শিক্ষিত হলে ফুড এক্সচেঞ্জ পলিসির মাধ্যমে কম অর্থ ব্যয়ে সঠিক পুষ্টিমানের খাবার সরবরাহ করতে পারেন। আশা করা যায়, ২০২৫ সালের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের অঙ্গীকার পূরণ হবে।  
লেখক ঃ প্রধান শিক্ষক, মন্নুজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
বোয়ালিয়া, রাজশাহী
Kumkum853 @ gamil.com 

এই বিভাগের আরো খবর

কোরবানির প্রয়োজনীয় মাসয়ালা

মাও: মোঃ রায়হানুর রহমান:সাধারণতঃ জিলহজ মাসের দশ তারিখে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোন গৃহপালিত হালাল পশু জবাই করাকে কুরবানি বলা হয়। প্রায় সকল নবী-রাসূলের শরিয়তেই কুরবানির প্রচলন ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর প্রত্যেক উম্মতের জন্যই আমি কুরবানি বিধিবদ্ধ করেছিলাম যেন তারা চতুস্পদ জন্তুসমূহের মধ্যে আল্লাহ পাক তাদের যা দান করেছেন তাতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (সূরা হাজ্ব ঃ ৩৪)। আবু হুরায়রা (রাঃ)  সূত্রে । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তির কুরবানি করার সামর্থ আছে অথচ সে কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (ইবনে মাজাহ্ ঃ ৩১২৩)। নিচে কুরবানির প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল বর্ণনা করা হলো :

১) যার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব : প্রত্যেক আযাদ, মুসলিম, মুক্বীম ও বিত্তশালী (সাহিবে নিসাব- সাড়ে সাত তোলা বা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকে সাহিবে নিসাব বলা হয়) লোকদের উপর নিজ ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি দেয়া ওয়াজিব। (হেদায়া ৪/১৩৯ পৃষ্ঠা)। কোন মহিলা সাহিবে নিসাব হলে তার উপরও কুরবানী দেয়া ওয়াজিব। (হেদায়া, ৪/১৪১,১৪৩ পৃষ্ঠা এবং দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম ঃ ২৬২ পৃষ্ঠা, ) । আহনাফ ইবনে সুলায়িম (রাঃ) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, হে লোকসকল ! নিশ্চয়ই প্রত্যেক গৃহবাসীর উপর প্রত্যেক বছর কুরবানি করা ওয়াজিব। (আবু দাউদ ঃ ২৭৮৮)
২) কুরবানির পশুর বয়স : জাবির (রাঃ) সুত্রে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, লা- তায্ বাহূ ইল্লা মুসিন্নাহ্ অর্থাৎ তোমরা উপযুক্ত বয়সের পশু ব্যতীত কুরবানি কর না। (সহিহ মুসলিম ঃ ৪৯২২, আবু দাউদ ঃ ২৭৯৭, নাসাঈ ঃ ৪৩৯০)। আর উপযুক্ত বয়স হচ্ছে, কুরবানির জন্য উট পাঁচ বছর, গরু-মহিষ দু’বছর এবং ছাগল-ভেড়া ও দুম্বা কমúক্ষে এক বছর বয়সের হতে হবে । অবশ্য ছয় মাসের ভেড়া যদি এক বছরের ভেড়ার ন্যায় মোটা তাজা হয় তবে তা দ্বারা কুরবানি দেয়া বৈধ হবে। (সূত্র: মিশকাত, আরবি : ১২৭ পৃষ্ঠা, ৯নং টিকা )।

৩) কুরবানির শরিকদার : কুরবানির শরিক হওয়ার ক্ষেত্রে উট, গরু কিংবা মহিষ হলে একটিতে সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারবে। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)  বলেন, আমরা হুদায়বিয়ার বছরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে একটি গরুতে সাতজন এবং একটি উটে সাতজন এভাবে কুরবানি দিয়েছি। (সহিহ মুসলিম ঃ ৩০৫৫, তিরমিযি ঃ ৯০৪, আবু দাউদ ঃ ২৮০৯) । আর ছাগল-ভেড়া ও দুম্বা একাকী কুরবাণি দিতে হবে। উল্লেখ্য কুরবানির পশু কেনার আগেই শরিকদার ঠিক করে নেয়া উচিত, পরে অন্যকে শামীল করা মাকরূহ হবে। (হেদায়া ৪/১৪৩ পৃষ্ঠা)।

৪) যে সকল পশু কুরবানি করা উচিত নয় : অন্ধ, কানা, লেংড়া ও ক্ষীণকায় পশু অথবা কান ও লেজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাটা কিংবা শিং মূল থেকে ভেঙ্গে গেছে এমন পশু দ্বারা কুরবানি করা মাকরূহ্। (হেদায়া ৪/ ১৪৬-১৪৭ পৃষ্ঠা )।  বারাআ ইবনে আযেব (রাঃ)  বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চার ধরনের পশু কুরবানির পশু থেকে পৃথক করে রাখতে বলেছেন। খোঁড়া জন্তু-যার খোঁড়ামী স্পষ্ট, অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগা যার রোগ স্পষ্ট, ক্ষীণকায়/দুর্বল- যার হাড়ে মজ্জা নেই। (তিরমিযি ঃ ১৪৯৭, আবু দাউদ ঃ ২৮০৩, ইবনে মাজাহ্ ঃ ৩১৪৪, মিশকাত ঃ ১৪৬৫)। আলী (রাঃ)  বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে শিং ভাঙ্গা ও কান কাটা জন্তু দ্বারা কুরবানি করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযি ঃ ১৫০৬, ইবনে মাজাহ্, মিশকাত ঃ ১৪৬৪)।

৫) কেনার পর কুরবানির পশু ত্রুটিযুুক্ত হলে কিংবা হারিয়ে গেলে করণীয় : কুরবানির পশু কেনার পর যদি ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সম্ভব হলে অন্য একটি পশু কুরবানি করবে। অন্যথায় সেটিই কুরবানি করবে। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, একবার আমরা কুরবানির উদ্দেশ্যে একটি মেষ খরিদ করলাম। অতঃপর নেকড়ে বাঘ তার নিতম্ব অথবা কান কেটে নিয়ে গেল । আমরা নাবী (সাঃ) কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, তিনি আমাদেরকে সেটাই কুরবানি করার নির্দেশ প্রদান করেন। (ইবনে মাযাহ্ ঃ ৩১৪৬)। আর কুরবানির পশু কেনার পর যদি হারিয়ে যায় এবং অন্য একটি পশু ক্রয় করা হয়, তবে কুরবানির আগে হারানো পশুটি পাওয়া গেলে ধনী ব্যক্তি যে কোন একটি কুরবানি করবে। আর গরীব লোক উভয়টি কুরবাণী করবে। (হেদায়া ৪/ ১৫০ পৃষ্ঠা, বেহেশতি জেওর, ২/৫৬ পৃষ্ঠা)।

৬) কুরবানির দিনসমূহ : জিলহজ্ব মাসের দশ, এগার এবং বার এই তিনদিন পর্যন্ত কুরবানি করা বৈধ । তবে প্রথম দিন উত্তম । রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, ‘ওয়া কুল্লু আইয়ামিত তাশরীকি যাব্হুন’ অর্থাৎ আর প্রত্যেক তাকবীরে তাশরিকের দিনই কুরবানির দিন। (আহ্মাদ, সূত্র ঃ হেদায়া ৪/১৪৫ পৃষ্ঠা)। নাফে (রঃ) সূত্রে। ইবনে উমার (রাঃ)  বলেন, কুরবানি ঈদুল আযহার পর আরো দুইদিন।

(মুয়াত্তা ইমাম মালেক, মিশকাত ঃ ১৪৭৩ ) ৭) কুরবানির পশুর চামড়ার বিধান : কুরবানির পশুর চামড়া নিজের গৃহস্থালীর কাজে লাগানো যাবে, তবে বিক্রি করলে তার মুল্য গরীব লোকদের সাদকা করে দিতে হবে। আর কুরবানির পশুর গোশত দ্বারা কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না।  আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে তার কুরবানির উটগুলোর কাছে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। আর এগুলোর গোশত, চামড়া ও বস্ত্র/ঝাড়ল্ ইত্যাদি সাদকা করে দিতে বললেন এবং তা থেকে কসাইয়ের মজুরি দিতে নিষেধ করলেন । তিনি বললেন, আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে তার মজুরি পরিশোধ করে দেব। (সহিহ মুসলিম ঃ ৩০৫০, ইবনে মাজাহ্ ঃ ৩১৫৭)।

৮) কুরবাণির গোশতের বিধান : কুরবানির পশুর গোশত তিনভাগ করা উত্তম। একভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য, আরেক ভাগ গরীব মিসকিনদের দান করা উত্তম। (হেদায়া ৪/ ১৫২ পৃষ্ঠা)।  আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘ফা কুলূ মিন্হা ওয়া আতয়ি’মুল ক্বা-নিআ’ ওয়াল মু’তার’  অর্থাৎ তোমরা তা থেকে নিজেরা খাও এবং অভাবী ও ক্ষুধার্ত লোকদেরকে খাওয়াও। (সূরা হাজ্ব ঃ ৩৬)। সালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রথমদিকে কুরবাণীর গোশত তিনদিনের বেশি ঘরে রাখতে নিষেধ করেছিলেন । পরের বছর লোকজন এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস  করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : ‘কুলূ ওয়া আত্ য়িমূ ওয়া আদ্দাখিরূ অর্থাৎ তোমরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং কিছু জমা করে রাখ ।  (সহিহ বুখারি ঃ ৫৩৫৪, সহিহ মুসলিম ঃ ৪৯৪৭) ।

৯) মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানি করার বিধান : যদি মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত না করে থাকে, তবে সেটি নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি অসীয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত কুরবানিদাতা (নিজেরা) খেতে পারবে না। গরীব মিসকীনদের মাঝে সাদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমাদ : ৮৪৫, রাদ্দুল মুহতার ৬/ ৩২৬, বেহেশতী জেওর, ২/৫৯ পৃষ্ঠা)।

১০) যে ব্যক্তি কুরবানি করতে অপারগ তার করণীয় : কোন ব্যক্তি যদি সামর্থ থাকা সত্বেও কুরবানি করতে না পারে (যেমন, কেউ চেষ্টা করে যদি উক্ত তিনদিনের মধ্যে পশু সংগ্রহ করতে না পারে) তবে তার জন্য একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার সমপরিমাণ মূল্য সাদকা করে দেয়া উচিত। (বেহেশতী জেওর, ২/৫৪ পৃষ্ঠা)। আর যার কুরবাণি করার সামর্থ নাই বা যার উপর কুরবাণি ওয়াজিব হয়নি সে তার মাথার চুল, নখ ও গোঁফ ইত্যাদি কেটে ফেলবে।  আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ)  সুত্রে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর কাছে কুরবাণী করতে অক্ষমতার কথা বলল। তিনি (সাঃ) লোকটিকে বললেন : তুমি তোমার মাথার চুল, নখ ও গোঁফ কেটে ফেল এবং নাভীর নীচের লোম পরিস্কার কর। এটাই আল্লাহর কাছে তোমার কুরবাণী। (আবু দাউদ ঃ ২৭৮৯, নাসাঈ ঃ ৪৩৭৭)।
আসুন আমরা যথানিয়মে কুরবানি করি, আল্লাহর প্রিয়পাত্র হই।  আমিন ।
 লেখক ঃ  ধর্মীয় শিক্ষক, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন
পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া ।
খতীব, কর্ণপুর উত্তরপাড়া বায়তুন নুর জামে মসজিদ, বগুড়া সদর,বগুড়া।
[email protected]
০১৭৩৯-৮৫০৬৫৬

এই বিভাগের আরো খবর

আইনের দৃর্ষ্টিতে নারীর অধিকার

তাহমিনা আকতার পাতা :দন্ডবিধি আইনের ৫২ ধারায় সদবিশ্বাসের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। সদবিশ্বাস শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যও নেহাত কম নয়। যথাযথ মনোযোগ ও সতর্কতা ব্যতিরেকে সম্পাদিত বিশ্বাসকে সদবিশ্বাস বলা যাবে না। সদবিশ্বাস, সততা, সমতার নিরিখে নারীর অধিকার বিচার বিশ্লেষণ করে এক কথায় উপনীত হওয়া যায় যে, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে নারীর রয়েছে ব্যাপক পদচারণা এবং সব ক্ষেত্রেই নারীর উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি নারী সময় বিশেষে কন্যা, জায়া, জননী রূপে আত্মপ্রকাশ করে থাকে। জন্মের পর থেকে একজন মেয়ে বাবা-মার গৃহে কন্যা রূপে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করে। উপযুক্ত বয়সে নারী জায়া রূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং সময়ের সাথে সাথে নারীর শরীর মন পরিপূর্ণ জীবনের পথে এগিয়ে গিয়ে সে জননী রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নারী তার মাতৃত্বের স্বাদ পায়।

 জননী রূপে আত্মপ্রকাশ করে নারী হয়ে ওঠে আত্মসচেতন এবং সে তার অধিকার সম্বন্ধেও সজাগ হতে শেখে। পরিবার থেকেই নারী সময়ের সাথে সাথে বেড়ে ওঠে। তেমনি প্রতিটি নারীরই রয়েছে পারিবারিক অধিকার। নারীর পারিবারিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন সহায়তা সহ আইন সচেতনতা সম্মন্ধে নানা কর্মসূচি সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারণা করা হচ্ছে। দরিদ্র সুবিধা বঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীর অধিকার আদায়ের জন্য আইন সচেতনতা আবশ্যক। তবে অনেক নারীর আইন সম্মন্ধে সাধারণ জ্ঞান না থাকায় প্রতিনিয়ত নারীরা বঞ্চিত ও প্রতারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের বিভিন্ন ধারা পর্যায়ক্রমে গবেষণার মাধ্যমে উপলব্ধি করা গেছে যে, নারী তার পরিবারেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

 নারীর পারিবারিক জীবনের অধিকারের মধ্যে বিয়ে, দেনমোহর, ভরণ-পোষণ, সন্তানের হেফাজত, তালাক, হিলাবিয়ে ও বহুবিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আইনের দৃষ্টিতে বিয়ের আবশ্যকীয় শর্ত মেনে চললে বিবাহিত জীবনে পরস্পর পরস্পরের প্রতি অধিকার সচেতন হওয়া আবশ্যকীয়। তাহলে প্রতিটি পরিবারই সুখি ও সমৃদ্ধশালীভাবে গড়ে উঠবে। আমাদের আইনে দেনমোহর এর গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী স্ত্রীকে ভোরণ-পোষণ দেওয়া স্বামীর আইনগত দায়িত্ব। কোন বিবাহিত নারী নির্যাতনের ফলে বাধ্য হয়ে পৃথকভাবে বসবাস করলেও সে ভরণ পোষণের অধিকারী হয়। গার্জিয়ানস এন্ড ওয়ার্ডস এ্যাক্ট ১৮৯০ অনুযায়ী মা সন্তানের হেফাজতকারীনি অর্থাৎ জিম্মাদার।

 নাবালক সন্তানের পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য মায়ের হেফাজত, স্নেহের কোন বিকল্প নেই। পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী উত্তেজিত হয়ে মুখে তালাক উচ্চারণ করলেই তালাক হয় না, তালাকের জন্য নির্দিষ্ট বিধান আছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সঠিকভাবে তালাক হলে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে। অন্যদিকে আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয়ে যাওয়ার পরও পুনরায় তারা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। হিল্লা বিয়ে কার্যক্রমের জন্য তৃতীয় কোন ব্যক্তির সাথে স্ত্রীর অন্তর্বতীয় বিয়ে সম্পাদন এবং সেই বিয়ে বিচ্ছেদের প্রয়োজন নেই। নারীর পারিবারিক অধিকার আইনে কোন পুরুষের স্ত্রী থাকা অবস্থায় সালিশী পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারবে না।

 এ সম্বন্ধে পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী বিশদ আলোচনা আছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, কর্মক্ষেত্রে কিংবা অন্য ক্ষেত্রেও নারীদের সংখ্যা বাড়ছে। উন্নত শিক্ষা, সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশের পরিবর্তন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের ফলে নারীরা সর্বদিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

মনে রাখতে হবে যে, পারিবারিক ও সামাজিক মনোযোগ ও সতর্কতা, দায়িত্ববোধ ব্যতিত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।সবশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক সর্বক্ষেত্রে আইনগতভাবে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুখি ও সমৃদ্ধশীল সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নারীর অধিকার নিশ্চিত হলে তবেই সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশে নারী হয়ে উঠবে অন্যন্যা ও অদ্বিতীয়া।
লেখক ঃ আইনজীবী
জজ কোর্ট, ঢাকা।
০১৭১১-৮২৫৫৫৪

এই বিভাগের আরো খবর

হে তারুণ্য, দায়িত্ব নাও

আতাউর রহমান মিটন :মঙ্গলবার পুরো জাতি যথাযথ মর্যাদায় শোক পালন করেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যার এই ঘটনায় পুরো জাতি সত্যিই শোকাহত। এই নির্মম ও জঘন্য হত্যাকান্ডকে কোন যুক্তিতেই কেউ সমর্থন করতে পারে না। বঙ্গবন্ধু’র সুযোগ্য কন্যা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রচন্ড দৃঢ়তায় সকল বাধা-বিপত্তি ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচার নিশ্চিত করেছেন। সকল মৃত্যুই বেদনার। এমনকি অপরাধের দায়ে যখন কোন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড হয় সেটাও ঐ ব্যক্তির পরিবার ও প্রিয়জনদের শোকাতুর করে তোলে।

সে কারণে যুগে যুগে মানুষ শান্তির সপক্ষে কথা বলেছে। মানুষ সন্ত্রাস, হত্যা, ক্যু ইত্যাদি বিষয়গুলোকে ঘৃণা করতে শিখেছে। যদিও আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও রাজনীতি থেকে তা চিরদিনের জন্য শেষ করতে পারিনি। ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এখনও স্বয়ংক্রিয়। বঙ্গবন্ধু’র বেঁচে যাওয়া দুই কন্যা এখনও ঝুঁকির মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। শেখ হাসিনা’র উপর কয়েকবার হত্যা প্রচেষ্টা হয়েছে। ষড়যন্ত্রের এই রাজনীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে, গণতন্ত্র চর্চ্চা এবং অনুশীলন সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে আমরা শান্তি পাব না। এর জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সকলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠুভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতন্ত্র অনুশীলনে বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করবে এই প্রত্যাশা করছি। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটেন নি। তিনি লড়াই করেছেন তাঁর স্বপ্ন ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি বারংবার সকলকে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আইনানুগ পথে চলার তাগাদা দিয়েছেন। নৈরাজ্য এবং দুর্নীতি মোকাবেলায় তিনি হিমশিম খেয়েছেন। একাধিক বক্তব্য ও বিবৃতির মাধ্যমে তিনি দলের কর্মী এবং প্রশাসনের সকলকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের তাগাদা দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন জনগণের শক্তিতে। আর সে কারণেই বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের হৃদয়ে তিনি পরম শ্রদ্ধায় আসীন হয়ে আছেন।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছেন। বাঙালির মহান ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা থেকে ১১ দফা, ৭০ এর নির্বাচন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা, ফাঁসির মঞ্চ থেকে স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীত্ব তথা প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ, পরিশেষে দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংসভাবে সপরিবারে নিহত হওয়া এই মানুষটি অবধারিতভাবেই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত চরিত্র। এটা আমাদের জন্য বড়ই পরিতাপের যে আমরা বঙ্গবন্ধুকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছি। তিনি কারও কাছে মহামানব আবার কারও কাছে উল্টোটা। তাঁকে নিয়ে নির্মোহ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন তাঁর সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ বৃদ্ধি। তিনি বাংলাদেশের মানুষকে ভালবাসতেন, বড্ড বেশি ভালবাসতেন।

আর সেই ভালবাসার খোলা জানালা দিয়ে অনেকেই অনেক অপকর্ম করে তাঁর শাসনামলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। এই প্রবণতা তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলেও আমরা লক্ষ্য করছি। দলের নাম ভাঙিয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের অনেক জায়গাতেই ‘ঐশীপিতা’ বা ‘গডফাদার’ জন্ম নিচ্ছে। এদের ঝড় বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও দেশের সুনাম ক্ষুন্ন করেছে। অথচ এই পরিবেশ ধ্বংসকারীদের দল এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। মুখচেনা এই ধান্ধাবাজদের মুখে ‘মুজিব বন্দনা’ তাই সাধারণ জনগণের হৃদয়ে কোন বিশ্বাসের আবেগ তৈরী করে না।  আগামী নির্বাচনে এই মুখচেনা দুর্বৃত্তদের প্রার্থী করা হলে তা ভাল ফল বয়ে আনবে না।

বাংলাদেশে এখন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছে। নানা দেন-দরবার অব্যাহত থাকলেও এই নির্বাচনে সকল দল অংশগ্রহণ করবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের তরুণ সমাজ যারা গতবার প্রথমবারের মত ভোট দিয়েছেন এবং যারা এবার প্রথমবারের মত ভোট দিতে যাচ্ছেন, তারাই আসলে নির্ধারণ করবেন আগামী নির্বাচনের ভবিষ্যত। আমাদের তরুণ সমাজ কেবল ব্যক্তি বন্দনাতে সীমাবদ্ধ থাকতে আগ্রহী নয়। তারা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করবে, বিশ্লেষণ করবে কার হাতে দেশের ভবিষ্যত নিরাপদ থাকবে ও সমৃদ্ধি লাভ করবে।

দলবাজ, তেলবাজ, গলাবাজ, লুটতরাজ এর মহানায়কেরা যদি ভোটে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পান তাতে এদেশের তরুণ সমাজের কোন আগ্রহ থাকবে বলে মনে হয় না। সম্ভবতঃ রাজনৈতিক দলগুলো সেটা বুঝতে পেরেই এবার তরুণ নেতৃত্বকে অধিকতর সুযোগ দানের কথা ভাবছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক তৃতীয়াংশ তরুণ নেতৃত্বকে নমিনেশন দিবে বলে শোনা যাচ্ছে। তারুণ্যের পাশাপাশি দলটি নারী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিবে বলেও শোনা যাচ্ছে। তারুণ্যের এই জয়যাত্রাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাই। জাতীয় নির্বাচনে তরুণদের বেশি বেশি সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি আমি দেশে স্থায়ীভাবে ‘যুব ছায়া সংসদ’ গঠনের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।  

রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে তা নির্ভর করছে আজকের বিদ্যালয়ে কি ধরনের পাঠদান করা হচ্ছে তার উপর। সেই সূত্র ধরেই আমি মনে করি, আগামী দিনের বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চেহারা কেমন হবে তা নির্ভর করছে আজকের তরুণেরা কিভাবে গণতন্ত্র চর্চ্চা করছে তার উপর। সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদকে গণতন্ত্র চর্চ্চার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ বলা হয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার বিকাশ এবং সংসদীয় ধারায় সমস্যা সমাধানের রীতিকে প্রণোদিত করতে ‘যুব ছায়া সংসদ’ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বলাবাহুল্য, ঢাকায় কিছুদিন হলো বেসরকারি উদ্যোগে এ ধরনের ‘যুব ছায়া সংসদ’ পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত বর্ণাঢ্য এই ‘যুব ছায়া সংসদ’ ইতোমধ্যে অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই ‘যুব ছায়া সংসদ’ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতায় নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়। কোথাও কোথাও এটাকে জাতীয় সংসদের অধীনে একটি অন্যতম কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কাতেও এ ব্যবস্থা বিদ্যমান। তাহলে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ খ্যাত স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ‘যুব ছায়া সংসদ’ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেন পরিচালিত হচ্ছে না? আমরা কি মহান জাতীয় সংসদ-এর অধীনে নিয়মিতভাবে ‘যুব ছায়া সংসদ’ পরিচালনা করে দেশের যুব সমাজের ভেতরে লুক্কায়িত নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়ে ‘সোনার বাংলা’ গঠনের প্রচেষ্টাকে বেগবান করতে পারি না? মহান জাতীয় সংসদ-এর নেতা ও সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাবনাটি ভেবে দেখার বিনীত অনুরোধ করছি।

মানতে কষ্ট হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে একটি বড় বন্যা ধেয়ে আসছে বলে পত্রিকাগুলোতে খবর বেরিয়েছে। উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। এবারের বন্যা ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ বলছেন এটা হবে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ বন্যা। আগামী সপ্তাহ জুড়ে, বিশেষ করে আসন্ন অমাবস্যা পর্যন্ত উজানে মোসুমী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে এবং এর ফলে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, পদ্মা ও সুরমা নদীতে পানি প্রবাহ ভয়াবহ বৃদ্ধি পাবে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রগুলোর মতে, চলতি সপ্তাহ জুড়েই উজানের পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হবে। ফলে দুকূল ছাপিয়ে আমাদের নি¤œাঞ্চলগুলো প্লাবিত হবে। বানভাসি মানুষেরা পানির ভেতরে থেকেও পানযোগ্য পানির অভাবে কষ্ট পেতে থাকবে। লাখো লাখো চোখের জল মিশে যাবে বন্যায়। তবু ওরা চেয়ে থাকবে অসহায়, নতুন দিনের আশায়।

দেশের চলমান এই বন্যায় আমাদের খাদ্য পরিস্থিতি হুমকির মুখে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার সেটা স্বীকার করতে না চাইলেও কার্যতঃ বিশ্বের চতুর্থ চাল উৎপাদক দেশ এখন বড় আমদানিকারক। হাজার হাজার হেক্টরে রোপা আমন এখন পানির নীচে। সব্জির বীজতলা ধুয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। কাঁচা বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাকা সড়ক। ব্রীজ-কালভার্ট ধসে গেছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তিস্তা ব্যারেজ। বাঁধ ভেঙেছে অনেক জায়গায়। ফলে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি অন্য যে কোন বারের তুলনায় বেশি এবং ভয়াবহ। সরকার অবশ্য অভয় বাণী শোনাচ্ছে। বলা হচ্ছে খাদ্য মজুদের কোন ঘাটতি নেই। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মত ভিন্ন। জনগণও নির্ভয়ে থাকতে পারছে না। অভাবে পড়লে গ্রামে-গঞ্জে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাবে। মানুষের রোগ-বালাই বেড়ে গেলে উৎপাদনশীলতা কমে আসবে। ফলে দেশের এক বড় জনগোষ্ঠী আবার নতুন করে আর্থিকভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলো এমতাবস্থায় কিস্তি আদায়ে জোর বেশি দিবে নাকি মানুষকে দ্রুত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত হওয়ার মত আর্থিক প্রণোদনা দিবে সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ইতোমধ্যেই কোন কোন ক্ষেত্রে স্থগিত বা বিলম্বিত করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা ভোগান্তির মুখে পড়বে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৪ সালে এরকম এক ভয়াবহ বন্যা মোকাবেলা করতে হয়েছিল। সে সময় খাদ্য সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সময়মত খাদ্য সরবরাহ না করায় দেশের মধ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ২০০৭ সালে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের কাছে আমরা টাকা নিয়ে গিয়েও চাল কিনতে পারিনি। এবারও তারা পেঁয়াজসহ অন্যান্য জিনিষের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র হলেও দেশের ভেতরে যখন সংকট তৈরী হয় তখন অদ্ভুতভাবে তারা সেটা নিয়ে একটা রাজনৈতিক চাল দেয়। প্রতিবেশীদের এই খাদ্য ও চালবাজি আমাদের কাম্য নয়।

ইতিহাসের শিক্ষাটা আমাদের মনে রাখতে হবে। জনগণকে এই বন্যার ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় ধৈর্য্য এবং সাহস অটুট রাখতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুযোগে একদল দুর্বৃত্ত যাতে সাধারণের জানমালের ক্ষতি করতে না পারে তার জন্য প্রয়োজনে পালা করে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যার্তদের মাঝে দ্রুত খাবার পানি, দিয়াশলাই, শুকনা খাবার, জ্বরের অসুধ ইত্যাদি জরুরি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে।

এই মুহূর্তে কেউ যাতে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলো মজুদ করে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করতে পারে তার জন্য প্রশাসনকে সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখাতে অনুরোধ করছি। পাশাপাশি ছাত্র-যুব ভাইবোনদের কাছে অনুরোধ করছি, তোমরা স্বেচ্ছাসেবী ব্রিগেড গঠন করো। নিজেরা রুটি তৈরী করো, অভিজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে স্যালাইন তৈরী করো, শত শত প্লাষ্টিকের বোতল সংগ্রহ করে তাতে খাবার পানি ভরে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াও। নোংরা রাজনীতি নয়, মানুষের সেবায় ব্রতী হও। দলীয় ক্ষুদ্রতা দিয়ে নয়, বরং নিজেদের কর্মের বিশালত্ব দিয়ে তরুণ সমাজ প্রমাণ করো, তোমরা অতন্দ্র প্রহরী বলেই পথ হারাবে না বাংলাদেশ।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

বাঙালির স্মৃতিতে অমর বঙ্গবন্ধু

মো. শহীদ উল্লা খন্দকার:১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের ভয়ঙ্কর দিন। বাংলাদেশ ও বাঙালির জন্য গভীর মর্মস্পর্শী শোকের দিন। কান্নার দিন। কষ্ট ভরা আবেগ চেপে রাখতে না পারার দিন। আমাদের সকলেরই জানা, রক্তের অক্ষরে লেখা পঁচাত্তরের ভয়াল ১৫ আগস্টের ইতিহাস। সেদিনের সেই শোক হয়ে গেছে চিরদিনের। নদীর স্রোতের মতো চির বহমান এই শোকপ্রবাহ। সেদিন ঘাতকের নখর দেখে থমকে যায় বাতাস। নীলাভ আকাশ হয়ে ওঠে বর্ণহীন ফ্যাকাশে।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সেই পুরুষ, যিনি একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে (১৯২০-১৯৭৫) স্বদেশের মাটি আর মানুষকে এমন গভীর ভালবাসার বন্ধনে বেঁধেছিলেন, যে বন্ধন নয় কোনদিনও ছিন্ন হওয়ার। আজীবন ঔপনিবেশিক শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, দারিদ্র-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এমন এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, যার তুলনা বিরল। একজন প্রকৃত নেতার যেসব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, তার সব গুণ নিয়েই জন্মেছিলেন ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ। যাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুবর্ণিল, যাঁর কণ্ঠে ছিল জাদু। যিনি রচনা করেছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিজয় ইতিহাস।

এতকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে ঘাতকের হাতে। নারী-শিশুরাও সেদিন রেহাই পায়নি ঘৃণ্য ঘাতকচক্রের হাত থেকে। বিদেশে থাকার জন্য প্রাণে বেঁচে যান কেবল বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ মুক্তির কান্ডারী। তার নেতৃত্বে  দেশ এখন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে। এ পথ চলাকে অবিরাম করতে হবে। দেশ যত এগিয়ে যাবে, হন্তারকদের ততটাই বিনাশ ঘটতে থাকবে।অথচ তিনি এদেশেরই কিছু বিপথগামীদের হাতে পিতা-মাতা ভাই-বোন সব একসাথে হারিয়েছেন।

 পিতা বঙ্গবন্ধুকে ছাড়াও নিষ্ঠুরভাবে একে একে তারা হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে, তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, দুই ভ্রাতৃবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামালকে, বঙ্গবন্ধুর অনুজ চাচা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ফুফা পানি সম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, আবদুর নঈম খান রিন্টুসহ আরও অনেককে, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলসহ অনেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে। গোটা বাড়িকে গোরস্থানে পরিণত করে।

পৃথিবীর কোনো জাতির ইতিহাসে আমাদের মতো শোকাবহ আগস্ট আছে কিনা জানা নেই। আগস্ট বাঙালি, বাংলাদেশের শোকের মাস। এ মাসের ১৫ তারিখের রাতটি কেবল বঙ্গবন্ধু ও সেদিন ৩২ নম্বরে উপস্থিত পরিবারের স্বজনদের নৃশংস হত্যার কালরাত নয়, নয় কেবল শেখ মনি দম্পতি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত হত্যাকান্ডের কালরাত। এ ছিল এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ কেবল কয়েকজন রজনীতিবিদের হত্যাকান্ড নয়, এ ছিল আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উল্টোযাত্রার অপপ্রয়াস।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে যেন এক বিভাজন রেখা। বায়ান্ন থেকে এ জাতির যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল তার গতিমুখ ছিল গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও স্বাধীনতার দিকে। কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসেরও বাঁক পরিবর্তন ঘটানোরই প্রয়াস।

অবশ্য এই আগস্ট মাস নানা কারণেই শোকবিধুর। এই মাসেই তিরোধান ঘটেছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। এ মাসেই জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন লাখো মানুষ। এ মাসেই আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের মৃত্যু । এ মাসে প্রিয় কবি শামসুর রাহমান ও মুক্তচিন্তার লেখক হুমায়ুন আজাদেরও মৃত্যু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল এ মাসেই। সেই হামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।

তবে সব ছাড়িয়ে আপামর বাঙালি বারবার স্মরণ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। এ মাসটি আমাদের জন্য দু:খের, লজ্জা এবং অসহনীয় কষ্টের। হাজার বছরের শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা এবং বঙ্গোপসাগরের কূলে কূলে যে জনপদের বাস সেই জনপদের সংস্কৃতিতে সর্বত্রভাবে অনুধাবন এবং আত্মস্থ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তাঁর রাজনৈতিক চর্চায় তিনি এই জনপদের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকে জীবন দর্শন হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। হয়েছিলেন বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক।

পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর থেকে শোককে শক্তিতে পরিণত করার যে প্রক্রিয়া চলছে সেই শক্তিতেই আমরা একদিন বিশ্বমঞ্চে বাঙালি জাতি হিসাবে শির উঁচু করে দাঁড়াবো। আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বৈশ্বিক রাজনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রাপ্ত অর্জনগুলো প্রমাণ করে শত আঘাতের শত চক্রান্তেও এই ছোট ভূ-খন্ডের মানুষ যে মাথা নোয়াবার নয়। গভীর শোকের এই ৪২তম বার্ষিকীতে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ না করলেই নয়। টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় বলা হয় “সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই।”
উদ্ধৃতিটি আজ পলে পলে বাঙালি জাতি অনুভব করছে।
 
বঙ্গবন্ধু আজ মিশে আছেন নির্মোহ দানে, বাংলার প্রকৃতিতে, আকাশে-বাতাসে, আলো-ছায়াতে, নদী-গিরি-বনে, শস্য-শ্যামলে, বাংলার অবারিত মাঠজুড়ে, সবখানে। তিনি মিশে আছেন লক্ষ শহীদের রক্তে শিখা অনির্বান হয়ে অগ্নিপ্রভাতে। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী অমর। ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব লাভ করে তিনি বেঁচে আছেন একজন সুদক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, আজন্ম বাস্তববাদী, এক আদর্শবাদী অবিসংবাদিত মহানায়ক রূপে। তিনি শাশ্বত, চির ভাস্বর ও অবিসংবাদিত মহানায়ক রূপে বেঁচে আছেন দুনিয়ার সকল পরাধীন জনতার মুক্তি মিছিলে।

 বেঁচে আছেন জগতের সকলস্থানে চিরদুঃখী, অনাহারী, স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী জনতার বজ্র্যকন্ঠে। এহেন আত্মত্যাগী, মহৎপ্রাণ, জনদরদী, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহাবীর সন্তানকে বরণ করে নিতে হয় হৃদয়ে। নিখাদ সত্যে চিরস্থায়ী বাস্তবে। সকল সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে ও মহামুক্তির জয়গানে “বঙ্গবন্ধু” উল্লাস ধ্বনিতে। স্বীকার করে নিতে হয় রক্তরাঙা ইতিহাসের পথে পথে আপন অস্তিত্বের মণিকোঠায় বাঙালি জাতির “জনক” রূপে।
লেখক : সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

এই বিভাগের আরো খবর

বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই

মাহমুদ আহমদ :প্রাকৃতিক বিপদ-আপদ কখন ধেয়ে আসে তা আমাদের কারো জানা নেই। অবিরাম বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে বলে গণমাধ্যমের সুবাদে খবর পাচ্ছি। উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলাসহ উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সুনামগঞ্জেও  কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। এ বছর বর্ষা  মৌসুমের বৃষ্টিপাতের সঙ্গে উজানের পাহাড়ি ঢল যুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, আত্রাই, তিস্তা, পদ্মা ও সুরমাসহ প্রধান নদীগুলোর পানি প্রবাহের তোড়ে ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম।

 বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি ও খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে প্রবল আকারে। বন্যায় অনেক দরিদ্র পরিবারের বাড়িঘর, সহায়-সম্পদ যা ছিল সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সাহায্য করাই ইসলামের শিক্ষা। আর এর মাধ্যমেই আল্লাহপাক বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আল্লাহপ্রেমিক বান্দারা ঘরে বসেই তার বান্দাদের কষ্ট দূর করার মাধ্যমে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। যারা আল্লাহর বান্দার কষ্টের সময় সহযোগিতা করে আল্লাহপাক তাকে তার বন্ধু বানিয়ে নেন। আমরা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি এসব অসহায় মানুুষদের পাশে দাঁড়িয়েও।


এ জগতে কেউ যদি ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্তকে আহারের ব্যবস্থা করে তাহলে আল্লাহপাক তাকে অসংখ্য নেয়ামতে ভূষিত করেন। যেভাবে হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে মানুষকে খাদ্য দান করেছে, সেদিন তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করেছে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে’ (আবু দাউদ)। আমাদের দেশে প্রায় প্রতি বছরই কম বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক হানা দেয়।

 প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো এমনভাবে ধেয়ে আসে যার ফলে গ্রামের পর গ্রাম তছনছ করে দিয়ে চলে যায়। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো ইত্যাদি দুর্যোগ প্রাকৃতিক, মানুষের এতে কোনো হাত নেই। আমরা কেউ বলতে পারি না কোন সময় আমরা ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছি বা কখন প্লাবনে আমাদের সব কিছু ডুবিয়ে দেয়। তাই এসব প্রাকৃতিক আজাব থেকে যেন আল্লাহপাক আমাদের নিরাপদ রাখেন এজন্য সব সময় দোয়া করা আর আল্লাহর হক এবং বান্দার হক সব সময় আদায় করা উচিত।


বন্যায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি পানির নিচে, ছোট ছোট শিশুরা কান্নাকাটি করছে খাবারের জন্য। শিশুদের কাছে পানি মানে আনন্দ, পানিতে লাফঝাপ করবে এটাই ভাবে, কিন্তু পানির জন্য যে, তাদের না খেয়ে থাকতে হবে এটা তো তারা বুঝার কথা না। যারা কখনও এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে নাই তারা হয়ত বুঝতে পারছেন যে, কত কষ্টকর। এমন পরিস্থিতিতে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকাটাই এক চ্যালেঞ্জ।

 এ ধরনের দুর্যোগের পর সমাজ ও দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আমাদের যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তা নিয়েই দুর্যোগ কবলিত লোকদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। আমাদের সবার একটু সহযোগিতার ফলে একটি পরিবার ফিরে আসতে পারে স্বাভাবিক জীবনে। বন্যায় তাদের যে ক্ষতি হচ্ছে হয়তো তা আমরা পুরণ করতে পারবো না কিন্তু তাদের জন্য যদি আমরা একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই তাহলে হয়তো তারা সব হারানোর যে দু:খ তা থেকে কিছুটা হলেও সুখ খুঁজে নিবে।  
লেখক : ইসলামী গবেষক  ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৭১৬-২৫৩২১৬

এই বিভাগের আরো খবর

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সমাপ্তি প্রয়োজন

মাশরাফী হিরো:অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সমাপ্তি প্রয়োজন। কারণ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির জীবনবৃত্তান্ত অসমাপ্ত থাকবে তা কেমন করে হয়। যিনি বাঙালিকে আলাদা একটি দেশ উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা দুটি বই বের হয়েছে। একটি হলো অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও আরেকটি হলো কারাগারের রোজনামচা। প্রথম বইটিতে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনী তিনি লিখেছিলেন। আর কারাগারের রোজনামচাতে ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনের বর্ণনা রয়েছে। অসমাপ্ত আত্মজীবনি জেলখানায় বসে লিখলেও বাইরের বিষয়গুলি সম্পৃক্ত রয়েছে। আর কারাগারের রোজনামচাতে জেলখানার বিষয়গুলিই প্রাধান্য পেয়েছে। মাঝখানে বাকি রইল ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৫ সাল এবং ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যা অন্যরা সংক্ষিপ্তাকারে বইগুলিতে সংযোজন করেছেন। বই দুটির প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। যিনি খুব কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে।

 জেলখানায় বসে তাঁর এ লেখাগুলি লিখতে সবচাইতে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু পতœী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যিনি কাগজ কলম সরবরাহ করে লিখতে সহযোগিতা করেছিলেন। জেলখানা যেমন বাঙালিকে স্বাধীনতা এনে দিতে ভূমিকা রেখেছিল তেমনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে এখনকার প্রজন্মকে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা ও ফিলিস্তিন নিয়ে তাঁর ভাবনা উঠে এসেছে লেখায়। তাছাড়া বিশ্ব নেতাদের পাশাপাশি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, একে ফজলুল হক ও পাকিস্তানী শাসক আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্পর্কে নানা কথা উঠে এসেছে এ বইগুলিতে।

 

যা বাঙালি এবং বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনের পাথেয় হয়ে থাকবে। যারা এক হুইসেলে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার গল্প শোনান তারা অন্তত বই দুটি প্রকাশের কারণে বেকায়দায় পড়েছেন। সবচাইতে বড় কথা অন্যের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুকে দেখা আর নিজেকে লেখনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। কেউ রাজনীতি করে নিজের জন্য আর বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন মানুষের জন্য। কিছুদিন আগেও যেসব নেতারা বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনকে তুচ্ছ মনে করতেন তারা সম্ভবত এখন আর মনে করেন না। কারণ নাশকতার মামলায় তারাও সম্প্রতি কিছুদিন জেল খেটেছেন। যদিও এখনকার জেল অনেক সহজ। বঙ্গবন্ধুর সময় তা ছিল না। বেশিদিন জেলে থাকলে মানুষ পাগল হয়ে যেত।

 তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। এসব থেকে হয়তো তাদের কিছুটা বোধোদয় হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের দুঃখ-বেদনাগুলি উঠে এসেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট সরকার, ৬-দফা আন্দোলন সমস্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে তাঁর ভাবনা আমরা পেয়েছি লেখনীতে। কারাগারে বসেও তিনি মানবতাবাদী ছিলেন। জেলের নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। তাঁর সাথে অন্যায় হলেও মেনে নিতেন। কখনও ওজর আপত্তি করতেন না। যা একটু প্রতিবাদ করতেন তাও অন্যের জন্য। জেলখানায় বসেও জেলের পাগলদের তিনি ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। জেলখানা থেকে বের হয়েই তিনি সরকার বিরোধী বক্তব্য দিতেন।

 জানতেন জেলে যেতে হবে। তারপরও থামতেন না। নীতির সাথে কখনও আপোষ করেননি। তাইতো তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে মতের অমিল হয়েছে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে দুরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তা তিনি উপহার দিয়েছিলেন। পাকিস্তানে কারাগারে বসেও বাংলার কথা ভুলে যাননি। ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড়িয়ে বলেছেন বাংলা আমার দেশ। এসব বিষয় একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষ করে আমাদের মতো সুবিধাবাদীদের জন্য তো নয়ই। যারা বঙ্গবন্ধুর কথা বলে মুখে ফ্যানা তুলি। আমরা বাঙালি জাতি সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি মহান’৭১-এ তাঁর ভাবনাগুলি জানতে না পেরে। হাজার বছরের আকাঙ্খিত সেই বিষয় যার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৩ বছর জেল খেটেছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে।

 ’৭৫ পরবর্তী ভাবনা এবং দেশ গঠনে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম আমরা জানতে পারিনি। প্রত্যেক মানুষেরই কাজের কিছু সাক্ষি থাকে। বঙ্গবন্ধুর সমস্ত কর্মকান্ড এবং বিভিন্ন বিষয়েরও কিছু সাক্ষি রয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য সাক্ষি প্রয়োজন। যা হতে পারেন সম্ভবত শেখ হাসিনা। যিনি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে চান। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চান। বহু নেতা নিজেকে উপস্থাপন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ভুলে গেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা তা করেননি। বরঞ্চ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াই তাঁর কাজ। আর এতে আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মি ও বাঙালির অবিশ্বাস নেই। যিনি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব নিয়েছেন তাকেই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সমাপ্ত করণের দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর একটি পরিপূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত জানতে চায়। যা পূরণ করতে পারেন একমাত্র কালের সাক্ষি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
[email protected]
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

 

এই বিভাগের আরো খবর

জলাবদ্ধতা নিরসনে চাই নগর সরকার

মীর আব্দুল আলীম :জলে ডুবে যায় আমাদের নগরগুলো। যখন নগর ডুবন্ত অবস্থায় থাকে; যখন নগরের কোন কোন সড়কে নৌকা চলে তখন সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে। নানা বক্তব্য আর বিভিন্ন সংস্থার মিটিংয়ের মধ্যদিয়ে ক’দিন বেশ সরব থাকে। সিটিকর্পোরেশন, ওয়াসা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক বিভাগ আর রাজনৈতিক বৈঠক হয় দফায় দফায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা পরিকল্পন হয়। কি হয় তাতে? বৃষ্টি হলে বর্ষায় নগরের জল কমে না বরং ফি বছর বাড়ে পানি। চট্টগ্রাম নগরে আগে যেখানে হাঁটুর নিচে পানি থাকতো, সেখানে এ বর্ষায় কোমর পানি। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায়, শান্তি নগরের এ মৌসুমে নৌকা চলতে দেখেছি আমরা ঢাকাবাসী।

 পত্রিকার সুবাদে দেশবাসীও  নৌকা রথের এ দৃশ্য অবলোকন করেছেন। আসলে এভাবে হয় না। জলাবদ্ধতা নিরসনে ভাবনাটা হতে হবে সম্মিলিত। ওয়াসা, সিটিকর্পোরেশন, গ্যাস, সড়ক আর বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ। কথায় আছে- ‘এক বনে নাকি, দুই বাঘ থাকতে নেই’। এক নগরে কয় জন মাতব্বর? সবাই যে যার জায়গা থেকে নিজের মত করে কাজ করছে। সড়ক বিভাগ সুন্দর সড়ক করে যাচ্ছেতো, ক’দিন বাদেই তা কেটে ওয়াসা পাইপ বসানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ তার গুঁজবে রাস্তায় তো কাটো রাস্তা। গ্যাসের পাইপ বসানোর টেন্ডার ইচ্ছামতই দিচ্ছে গ্যাস বিভাগ। সবাই সবার মত করে মাতব্বরী করছে নগর জুড়ে। এটা কেবল এদেশেই হয়।

পৃথিবীর বহু দেশে নগরায়নেরর পুরো কাজটা নগর সরকার করে থাকে। নগর সরকার এ আবার কি? এ দেশে এর চর্চা নেই বলেই অনেকেই এর ধারনা রাখে না। নগর সরকার হলো কোন নগরের একক শক্তির সরকার।  সড়ক, বিদ্যুৎ, ওয়াসার পাইপ লাগানোর কাজ নগর সরকারের ইশারায় হবে এককভাবে। পার্শ্ববর্তী ভারতেও এমন নগরায়নের সুব্যবস্থার নজির আছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না? এজন্য আমাদের সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা প্রভৃতি সংস্থারও দায়ভার আছে। মোদ্দা কথা হলো এসব সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেই।

 এ জন্যই নগর সরকার দরকার। রাজধানী  ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ‘নগর সরকার’ গঠনের বিষয় আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা  তাতে কর্ণপাত করে না। এ নিয়ে বহু বছর ধরে শুধু আলোচনাই হয়, কিন্তু নগর সরকার নিয়ে কেউ ভাবে না। জলাবদ্ধতাসহ নগরের বর্তমান যে দুর্ভোগ তা নগর সরকারেই সমাধান আসবে। নগর সরকার গঠনের বিকল্প দেখিনা আমরা।

এক নগরে সবাই রাজা এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। ক’দিন আগে রাজধানীর এক পাঁচ তারকা হোটেলে আমাদের  লায়ন্স ক্লাবের অনুষ্ঠানে অলোচিত মেয়র আনিসুল হকের মুখে কিছু কষ্টের বাণী শুনেছি। তিনি বলেছেন- ‘আমি চাইলেই সব পারি না’।  কোন কিছুতেই সমন্বয় নেই।  তাই নগর সরকার চাই। তাতে জলাবদ্ধতা কমে যাবে, রাস্তা ঘাট এতটা খানাখন্দকে ভরা থাকবে না।

এক বিভাগের সাথে আরেক বিভাগের সমন্বয়হীনতার জন্যই সামান্য বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় রাজধানী ঢাকা। ডুবন্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সড়কে চলে নৌকা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরজীবন অচল হয়ে পড়ে। জল জটের সাথে নগরীতে আছে যানজটও। এভাবে কি নগর জীবন চলে? কি বৈশাখ, কি আষাঢ় জলাবদ্ধতায় ডুবে ঢাকা; আর চট্টগ্রাম নগরীও থাকে পানির তলায়।

ভরসা কোথায়? আদৌ কি এই দুই নগরের জলাবদ্ধতা দূর হবে? ঢাকা এবং চট্টগ্রামের নাগরিকদের সেবায় বর্তমানে তিনজন বেশ জনপ্রিয় নগর পিতা আছেন। নগর পিতারা জলাবদ্ধতা নিরসনে কি করছেন? পরিকল্পিত নগরায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না; ড্যাব বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না; নগরের খালগুলো দখলমুক্ত হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না, এজাতিয় কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে ফল পাওয়া যায় না।

ক’য়েক মাস ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এসব ড্রেন পরিকল্পনা মাফিক হলে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা কিছুটা কমতে পারে। এদিকে রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত খাল আছে; কিন্তু অস্তিত্ব নেই। খালগুলো কোথায় আছে তাই জানে না নগরবাসী। দখল হয়ে গেছে অনেক আগেই। সে কারণে জলাবদ্ধতাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকা এবং দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মহানগর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের। সামান্য বৃষ্টিতেই স্থবির হয়ে পড়ছে কর্মব্যস্ত এই দুই শহরের জনজীবন।

এতে শুধু যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, সেই সাথে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চলে আসছে। গত দেড়-দুই দশকে অনেক আশার বাণী শোনানো হইয়াছে এই দুই নগরের বাসিন্দাদের। কিন্তু কাজের কাজ তেমন একটা হয়নি। এ জলাবদ্ধতাকে সারা দেশের বাস্তবতা হতে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোন উপায় নাই। তবে সামগ্রিক বিচারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই নগরির অবস্থা যে খুবই উদ্বেগজনক তা অনস্বীকার্য। আমরা আশা করি, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক মহল বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখবেন এবং স্থায়ীভাবে নগরবাসীর দুঃখ লাঘবে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

আমরা যারা নগরে বাস করি তারাও সচেতন নই। রাজধানী এবং বন্দরনগরীর সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পেছনে দায়ী বিষয়গুলো সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানি, বুঝি এমনকি নিয়মিত দেখিও। কিন্তু কারো মধ্যে সচেতনতা কাজ করে না। ফলে দেখা গেছে, এখনো মানুষ ঘরের জানালা দিয়ে পলিথিনের ব্যাগে করে রাতের আঁধারে ময়লা-আবর্জনা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেন, যেগুলো গিয়ে স্থান নেয় কোনো একটি পয়োনিষ্কাশন পাইপ কিংবা নালার মুখে। এতে পানি নিঃসরণের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা। জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পেছনে আরেক অভিশাপ বলা যেতে পারে নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে তৈরি উপজাতগুলোকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভবন তৈরির কাঁচামাল এনে জড়ো করা হয় রাস্তার ওপর। তারপর সেখান থেকে নিয়ে তৈরি করা হয় স্থাপনা।

বর্ষাকাল চট্টগ্রাম ও ঢাকা মহানগরীর জনগোষ্ঠীর জন্যে এক মহা দুর্ভোগের কাল হিসেবেই আভির্ভূত হয়। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) নগরবাসীকে জলাবদ্ধতাজনিত দুঃষহ কষ্ট থেকে রেহাই দিতে এখনও কোনো আন্তরিক উদ্যোগ নেয়নি। উপরন্তু এসব সেবাদানকারী সংস্থার কিছু তৎপরতা জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাজনিত দুর্ভোগ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে এর আগে মেয়র নির্বাচনে জনগণ বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সফল হতে পারেননি। এরপর আওয়ামীলীগের ব্যানার থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান মেয়র নাছির। তিনিও দুই বছর পার করেছেন।

 কিন্তু এখনও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মূলত চসিক ও চউকের ব্যর্থতার কারণেই আগাম বর্ষার প্রথম বর্ষণেই তলিয়ে গেছে বন্দরনগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান প্রধান সড়কসহ অলি-গলি কোমর ও হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, একটানা ভারিবর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে ডুবে গেছে নগরের প্রায় সকল রাস্তাঘাট। প্রায় সব রাস্তায় হাঁটুপানি। কিছু কিছু এলাকা কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাসা বাড়ির নিচতলা ও দোকানে পানি ঢুকে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। এই পরিস্থিতির জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন দায় এড়াতে পারে না।

সিডিএ’র অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সিটি কর্পোরেশনের খালগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার না করা এবং নালা-নর্দমার ময়লা অপসারণের ব্যর্থতাই এই দুর্দশার প্রধান কারণ। নগরে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হওয়ার জন্য মূল খাল রয়েছে ১৬টি। কিন্তু নগরের প্রাথমিক ১৬টি খালের সব কটির অধিকাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেদখল হয়ে গেছে। এ ছাড়া এসব খাল সময়মতো সংস্কার ও খনন করা হয়নি। কিছু কিছু খালের মাটি তোলা হলেও তা রাখা হয়েছিল পাড়ে।

পরে বৃষ্টির পানিতে ওই মাটি আবার খালে পড়ে। নগরীতে অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে এমনিতেই বহু নালা-নর্দমা খাল ভরাট হয়ে গেছে, তার উপর সংস্কার নেই পুরনো খাল ও নালার। পানি ধারণক্ষম বহু পুকুর ভরাট করে দালানকোঠা ও দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সরতে পারছে না। সহজে পানি সরে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় ভারী বৃষ্টিতে হঠাৎ এমন জনদুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। জল নিষ্কাশনের পথগুলো উন্মুক্ত রাখলে এ জন-দুর্ভোগের সৃষ্টি হতো না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নগরে মারাত্মক জলাবদ্ধতার কারণে চরম গণদুর্ভোগের পরও কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না কেন? কেনই বা নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করতে নেয়া হয়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ? এখনো কেন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএসহ সংশ্লি­ষ্ট সবাই কী ভাবছেন এ সমস্যা নিয়ে? চট্টগ্রামে এখনও কিছু খাল রয়েছে যেগুলো পুনঃখনন করলে হয়তো সেগুলো পুরনো চেহারায় ফিরে আসতে পারে।

আর উন্নয়নবিদ-পরিকলনাবিদরা যদি ড্রেনেজের বিষয়টা ভাবেন তাহলে পরিস্থিতি রক্ষা পেলেও পেতে পারে। কিন্তু ঢাকার পরম সম্পদ চারটি নদীও দখলে-দূষণে শেষ হওয়ার পথে। রাজধানী ঢাকাকে অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত করায় খাল, পুকুর, জলাশয়ের সংখ্যা কমছে দ্রুততার সাথে। ফলে সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে।

পৃথিবীর বহু দেশে নগরায়নের পরও নদীরক্ষা ও নিষ্কাশন সুব্যবস্থার নজির আছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না? এজন্য আমাদের সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা প্রভৃতি সংস্থারও দায়ভার আছে। তবে এসব সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ‘নগর সরকার’ গড়ার বিষয়টি নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু নগর সরকারের দেখা মিলছে না।

নগর সরকার গঠন করে সকল নগরের জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছার অভাবে তা যেন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। তাই প্রশ্ন জাগে, জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বপ্ন কি বাস্তবায়ন হবে? আমাদের বিশ্বাস, অবশ্যই হবে। এজন্য সকল অপশক্তির লাগাম টেনে ধরতে হবে। পরিকল্পিত নগরায়ন করতে হবে, নদী, খালগুলো দখলমুক্ত করতে হবে। তাহলেই নগরের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে। আর নগর পিতারা যদি সেদিকে দৃষ্টি দেন তাহলে সেটা খুব সহজেই সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

এই বিভাগের আরো খবর

কাজির গরু কাগজে আছে গোয়ালে নেই

আব্দুল হাই রঞ্জু :দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার ওপর লিখতে বসে যে শিরোনাম দিয়ে লেখা শুরু করলাম, তাতে বিদ্যুৎ সমস্যার কোন ইঙ্গিত নেই। ইঙ্গিত না থাকলেও বিষয়টি যে বিদ্যুৎ সমস্যার ওপর, তা হয়তো পরে পরিষ্কার হবে। মানুষের জন্য বিদ্যুৎ এখন একটি অপরিহার্য্য সেবা। যে সেবার ওপর ভর করে মানুষের বসবাস, দৈনন্দিন কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কারখানা সবই নির্ভরশীল। এ দেশে বিদ্যুৎ নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে এবং অতিতেও হয়েছে। মানুষ বিদ্যুতের দাবীতে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে এবং এখনও করছে। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল ২০০৬ সালে বিদ্যুতের দাবীতে কানাসার্টে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ২০ জন সাধারণ নাগরিককে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে।

 শুধু কানসার্টেই নয়, খোদ রাজধানীতে জন বিক্ষোভের রোষানলে পড়ে তৎকালিন সংসদ সদস্য সালাহ্উদ্দিন আহমেদ দৌড়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। সে সময় বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। বিদ্যুৎকে ঘিরে সে সময় বিএনপি সরকারকে ভাবমুর্তি সংকটেও পড়তে হয়েছিল। সর্বত্রই আলোচিত ছিল, বিএনপির প্রভাবশালী কেউ কেউ বিদ্যুতের নামে ‘খাম্বার’ বাণিজ্য করেছে। সে সব কারণে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রতিশ্রুতি ছিল, তারা ক্ষমতায় আসতে পারলে সর্বাগ্রে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে।

জনগণের স্বপ্ন ছিল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাসীন হলে সত্যিই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে। জনগণের সে স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় টানা ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন যে কোন কৌশলে মহাজোট বাস্তবায়ন করলেও প্রকৃত অর্থে বিদ্যুৎ সমস্যার উল্লেখযোগ্য যে অগ্রগতি হয়নি, তা বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে কি?

 
বাস্তবে মহাজোট সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয়েই বিদ্যৎ সমস্যার ত্বরিৎ ব্যবস্থা নিতে রেন্টাল এবং কুইক রেন্টালের মত ব্যয়বহুল প্রকল্প স্বল্প মেয়াদের জন্য গ্রহণ করেছিল। এতে সরকারি কোষাগারের বাড়তি অর্থ খরচ হলেও বিদ্যুৎ খাতে স্থায়ী ও দীর্ঘ মেয়াদি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। তবে, পূর্বের তুলনায় বাড়তি বিদ্যুৎ যে উৎপন্ন হয়েছে, তা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে বেশ কয়েকগুণ। ফলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তা দিয়ে পুরো চাহিদাতো নয়ই হয়ত অর্ধেক (?) চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এ কারণে গোটা দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট ভয়াবহ ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

শুধু পল্লী বিদ্যুতের ক্ষেত্রেই নয়, খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান পিডিবিও চাহিদার অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। এ দিকে সরকার ঘোষণা করছে, গত ৮ বছরে মহাজোট মোট উৎপাদনের ৬১ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা কেন মানুষকে পরিহাস করছে। সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দাবী, মোট চাহিদার সম পরিমাণ বিদ্যুৎ এখন উৎপাদন হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ গড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ কোন ঘাটতি নেই।

 তাহলে মানুষ কেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১০ ঘন্টা বিদ্যুৎ পায় না? এর জবাব পরিষ্কার, তাহলো খাতা কলমে বিদ্যুৎ উপাদনের পরিমান ৯ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও বাস্তবে সে পরিমাণ অনেক কম। অর্থাৎ ‘কাজীর গরু কাগজে আছে গোয়ালে নেই’ অবস্থার মতোই। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগের দাবী, সঞ্চালন লাইনগুলো অনেক পুরনো, অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা কমে এসেছে, এ জন্য উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঠিকভাবে পেতে অসুবিধা হচ্ছে। এ জন্যতো সিস্টেম লস হচ্ছে।

যদি দিনে রাতে ১০ ঘন্টা বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে ২৪ ঘন্টা পাওয়াও সম্ভব। প্রকৃত অর্থে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে কোন কোনটি বন্ধ, সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি, প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ‘কেপটিভ’ বিদ্যুতের হিসাব সব মিলে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ যেমন উৎপন্ন হয় না, তেমনি শিল্প কলকারখানায়, নগর-মহানগরে বেশি পরিমাণ বিন্দু সরবরাহ করায় মফস্বল শহর কিম্বা পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুতের যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তাকে ভয়াবহ বলাই যুক্তিসংগত।


যদিও সরকার দাবী করছে, আগামী তিন বছর বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সরকারের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। যা আগামী ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। সত্যিই যদি সরকারের মহা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়, তাহলে হয়ত চাহিদার বাড়তি বিদ্যুৎ  উৎপন্ন হবে।

যা আগামী ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট উন্নিত হবে। সত্যিই যদি সরকারের মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়, তাহলে হয়তো চাহিদার বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। কিন্তু ২০২১ এবং ২০৩০ সালতো অনেক দুরে। ফলে সরকার প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রেও সময় একটি বড় সমস্যা।


 সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে হবে, তারপর তো বিদ্যুৎ আনা সম্ভব হবে। যেখানে দেশের অভ্যন্তরে সঞ্চালন লাইন করতে কত প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, সেখানে বিদেশে সঞ্চালন লাইন যে তড়িঘড়ি নির্মিত হবে, সেটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। তাহলে চলমান বিদ্যুৎ সংকটকে সরকার কিভাবে মোকাবেলা করবে ? হয়ত এই সময়ের জন্য ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণকে বাড়াতে হবে। এমনকি প্রতিবেশি দেশ নেপাল, ভুটান থেকেও বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে যতদ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে।

পত্রিকান্তরে জানা গেছে, ফেনীর সোনাগাজীতে দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পটি চালু হলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অযতেœ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে। যেখানে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মেয়াদও একের পর এক ধরে বাড়ানো হচ্ছে, সেখানে পরিবেশ বান্ধব বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পটি কেন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা যেমন জরুরি, তেমনি প্রকল্পটি চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন করা জরুরি। আমাদের দেশে আবার উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখাও কঠিন। আর সে প্রকল্প যদি অন্য দলের ক্ষমতাসীনদের দ্বারা চালু হয়ে থাকে, তাহলে সে প্রকল্পটিকে অন্য দল ক্ষমতায় এলে বন্ধ করাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করে। এ কারণে বর্তমান মহাজোট সরকার প্রধান শেখ হাসিনা মাঝে মধ্যেই বলে থাকেন, উন্নয়নের

ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখতে হলে, পুনরায় মহাজোটকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে হবে। সে প্রসঙ্গ ভিন্ন, জনগণ কোন দলকে ক্ষমতায় আনবে, সেটা দেখার জন্য হয়ত আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের কথা হলো, জনগণ যে দলকেই নির্বাচিত করুক, তাদের উচিৎ, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বন্ধ না করে বরং গতিশীল রাখা। কারণ উন্নয়ন পরিকল্পনা কিম্বা গৃহীত প্রকল্প সমূহ কোন দল কিম্বা ব্যক্তি বিশেষের নয় বরং সেগুলো জনস্বার্থেই আরো গতিশীল করার সংস্কৃতিকেই রাজনীতিকদের চালু করতে হবে। তানা হলে প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হবে। বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে অনেক কথাই লেখা হলো।


বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমান গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের লোডশেডিং দেখে মনে হয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। জাতীয় এক দৈনিক সুত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে বিদ্যুৎ ঘাটতির হিসাব না থাকলেও গত ১৪ ও ১৫ জুলাই/১৭ অনুষ্ঠিত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপকদের সম্মেলনে বিদ্যুৎ ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। উক্ত সম্মেলনে মহাব্যবস্থাপকগণ গ্রামাঞ্চলের যে করুণ বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলে ধরেন, তা ভয়াবহ। সম্মেলনে উপস্থিত মহাব্যবস্থাপকগণ বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় লোডশেডিং বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সভায় উল্লেখ করা হয়, গত ২২ জুলাই/১৭ দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৯ হাজার মেগাওয়াট। আর একই দিনে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৯ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট। এই হিসেব দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় ৬৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বেশি উৎপাদন হয়েছে। এই হিসাব সঠিক থাকলে দেশের কোথাও লোডশেডিং থাকার কথা নয় অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে কাগজ কলমে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সমূহের উৎপাদন ক্ষমতার ভিত্তিতে মোট উৎপাদন ধরা হয় ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে হিসাব অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না।

 ফলে দিনে দিনে লোডশেডিং এর মাত্রা এমন ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে জনজীবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প, কল-কারখানায় স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে প্রায় সাড়ে আট বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। যারা বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে। সময়ের অংকে সাড়ে আট বছর কোন ভাবেই কম নয়। দীর্ঘ এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে সত্য, কিন্তু সে তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা যে সম্ভব হয়নি, তা ক্ষমতাসীনদেরকে মেনে নিতেই হবে।

সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খুব বেশি দিন বাকী নেই। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে না পারলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে যেমন বিএনপি জোটকে বিদ্যুৎ সংকটের জন্য মাশুল গুনতে হয়েছে,  হয়ত আগামী নির্বাচনে মহাজোটও সংকটে পড়তে পারে। এই দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে এ সংকট নিরসনে ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। অবশ্য এ নিয়ে সরকারের ভিতরেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।

 সংগত কারণে সরকার বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় চরাঞ্চলে সৌর বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক। প্রথমেই পদ্মার চরাঞ্চলকে বেছে নেয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। শুধু পদ্মার চরাঞ্চল কেন, গোটা দেশে বিশাল বিশাল চরাঞ্চল পতিত পড়ে আছে।

যেখানে সৌর বিদ্যুতের প্লান্ট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলে, সেই বিদ্যুতের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর বাড়তি বিদ্যুৎ অন্যান্য স্থানে ব্যবহার করাও সম্ভব হবে। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় নাম মাত্র খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করা যাবে। অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে আমাদের বেশি করে নজর দিতে হবে। প্রকৃত অর্থে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে, তাহলে বিদ্যুৎ খাতে অর্থ অপচয় কমে আসবে। আর অর্থ কমে আসা মানে, জনগণের ওপর করের বোঝাও কমবে।


পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই, আর কালক্ষেপণ নয়, পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ আমদানি এবং নাবয়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথকেই দীর্ঘায়িত করতে হবে। তাহলে পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ থেকে সরে আসা সম্ভব হবে। তানা হলে একটি সমস্যা দুর করতে হয়ত সরকারকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দিকে বেশি করে ঝুঁকতে হবে।

কিন্তু এ পথ আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য কোন ভাবেই শুভ হবে না, বরং এর বিরূপ প্রভাব ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিপদগ্রস্ত করবে। বাস্তব এ পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথকেই মসৃণ করা উচিৎ। তাহলে একদিকে যেমন পরিবেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের বাড়তি ব্যয় কমে আসলে ভর্তুকীর পরিমাণও কমবে।
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

 

এই বিভাগের আরো খবর

হজের প্রস্তুতি

মোহাম্মাদ মোস্তাকিম হোসাইন :ইসলামের পাঁচ মূল স্তম্ভের মধ্যে হজ্জ অন্যতম। পবিত্র হজ্জ অর্থ শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক ইবাদত। এ বছর আমাদের দেশ থেকে গত ২২ জুলাই প্রথম হজ্জ ফ্লাইট ঢাকা থেকে সৌদি আরবে পৌছে গেছে। অবশ্য এ  বছর ভিসা ও সৌদি মুয়াল্লিম জটিলতার কারণে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে হাজীগণ বেশ বিড়ম্বনায় পড়ছে।

হ্জ্ব ইসলামের পঞ্চম রুকন। এটি একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। কেবলমাত্র ধনী মুসলমানদের ওপর হজ ফরজ। এটি সমগ্র মানব জাতির মধ্যে পারস্পারিক সহযোগিতা ও ঐক্য সৃষ্টির প্রতীক। পবিত্র কাবাগৃহকে কেন্দ্র করে মহান প্রভুর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্য বিশ্বের সুদূর প্রান্তসমূহ থেকে সামর্থবান মুসলমাগণ হৃদয়ভরা ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আবেগজড়িত চিত্তে মক্কায় হাজির হয় এবং সম্পাদন করে হজের যাবতীয় কার্যাবলি।

 মূলত বিশ্ব মুসলিমের সর্বকালের সর্ববৃহৎ ইসলামি মহাসম্মেলন হলো হজ। হজ মুসলিম জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক ঐক্য এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধের এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন। মনে পড়ে বিগত ২০১৫ সালে স্ত্রী সিফাতি জোয়ারিয়া ও চার বছরের একমাত্র শিশুপুত্র সিরাতুন নূর ও শাশুড়িকে নিয়ে এবং ২০১৪ সালে শ্রদ্ধেয় মা সৈয়দা নুর জাহান খানম কে নিয়ে হজব্রত পালনের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে সেই আলোকেই মূলত এই নিবন্ধন। কারণ আমাদের দেশের হাজীগণ অনেকে হজ্জ বিষয়ই নিয়ম নীতি জানে না। ফলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। চলতি বছরে হজব্রত পালন করতে গিয়ে সৌদি আরবে ইতিপূর্বে ৭ জন হাজী ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না….রাজিউন)। আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।

হ্জ্ব যাদের ওপর ওয়াজিব: হজ্ব ঐ সকল মুসলিম ব্যাক্তির ওপর ফরজ যার পবিত্র মক্কা মদিনায় যাতায়াত ও হজের কাজ সম্পাদন করার মতো আর্থিক ও দৈহিক সামর্থ্য রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন-“মানুষের মধ্যে যার সেখানে ( আল্লাহর ঘরে) যাওয়ার সামর্থ্য আছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।”(সূরা আলে ইমরান: ৯৭)
উদ্ধৃত আয়াতে ‘মানইসতাতায়া’ শব্দটির বিশদ ব্যাখ্যা করে তাফসির ও ফিকহশাস্ত্রবিদগণ বলেন, নি¤েœাক্ত শর্তাবলি যার মাঝে বিদ্যমান থাকবে তার ওপর হজ্ব ওয়াজিব। যেমন-
মুসলমান হওয়া। কেননা অমুসলিমের ওপর ইসলামি বিধিবিধান প্রযোজ্য নয়।হজ ওয়াজিব হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে তথা ব্যক্তির স্বাধীন হওয়া। কেননা কোনো দাসদাসীর ওপর হজ ওয়াজিব নয়।প্রাপ্তবয়স্ক ও স্থির মস্তিষ্ক হওয়া। কেননা নাবালেগের ওপর শরয়ী বিধান প্রযোজ্য নয়। সুস্থ হওয়া। স্বাস্থ্যগতভাবে পূর্ণ সুস্থ না হলে তার ওপর হজ ওয়াজিব নয়। দুষ্টিশক্তি সম্পন্ন হওয়া। কেননা অন্ধ ব্যক্তির ওপর হজ ওয়াজিব নয়।পথ খরচ থাকা। আর সম্পদের পরিমাণ ততটুকু হতে হবে, যাতে আসা যাওয়ার সমস্ত খরচের পর বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবার পরিজনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে পারে।

হজে আসা যাওয়ার পথ নিরাপদ হওয়া, শত্রুমুক্ত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকা।
মহিলাদের সাথে স্বামী বা কোনো মহাররাম পুরুষ থাকা। অর্থাৎ এমন পুরুষ যার সাথে ওই মহিলার বিয়ে হারাম। যানবাহনের সুবিধা থাকা।
জ্ঞানবান হওয়া। কেননা পাগলের ওপর হজ ওয়াজিব নয়। হজের সময়ঃ হজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। এর বাইরে হজ আদায় করা জায়েয নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: “হজের মাসসমূহ সুবিদিত।”(সূরা বাকারা: ১৯৭) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি (রা.) বর্ণনা করেন যে-
হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন, হজের মাসসমূহ হচ্ছে শাওয়াল, যিলক্বদ এবং যিলহজের প্রথম ১০ দিন। তাফসিরে মাযহারিতে আছে হজ্জের মাস সাওয়াল হতে আরম্ভ হওয়ার অর্থ হচ্ছে এর পূর্বে ইহরাম বাধা জায়েয নয়। ইমাম আযম আবু হানিফা (র.)- এর মতে অবশ্য হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু মাকরূহ হবে। সুতরাং সকল সামর্থ্যবানের জন্য জীবনে একবার হজ্ব পালন করা ফরজ। নতুবা গুনাগার হতে হবে।
হজ্জ তিন প্রকার। ইফরাত, তামাত্তু, কিরান।
হজের ফরজ    
ইহরাম বাঁধা; উকূফে আরাফা অর্থাৎ ৯ জিলহজ জোহরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সামান্য সময়ের জন্য হলেও আরাফায় অবস্থান করা;
তাওয়াফে জিয়ারত করা। অর্থাৎ ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হজের তাওয়াফ করা।
(খ) হজের ওয়াজিব:
৯ জিলহজ রাতে মুজদালিফায় অবস্থান করা;
সাফা-মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করা;
নির্দিষ্ট দিনগুলোতে জামারাতে কংকর মারা;
কিরান বা তামাত্তু হজকারীর জন্য কোরবানী করা;
হালাল হওয়ার জন্য মাথার চুল মুন্ডানো বা ছাঁটা;
মীকাতের বাহির থেকে আগমনকারীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা।
(গ) হজের সুন্নাত ঃ ইহরাম বাঁধার পূর্বে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হওয়া;
৮ জিলহজ মিনা ময়দানে অবস্থান করা;
বেশী বেশী তালবিয়া পাঠ করা;
৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের সামান্য পূর্বে মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া;
১০,১১, ও ১২ জিলহজ রাতে মিনায় অবস্থান; ইত্যাদি।
যেহেতু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ তামাত্তু হজ্জ পালন করে সেহেতু এ বিষয়ে বেশি দৃষ্টি রাখছি। তামাত্তু হজ্জ পালনকারীদের প্রথম উমরায় করনীয় কর্তব্যঃ (মুসলিম শরীফ: ৩য় খন্ড, হজ্জ অধ্যায়, হাদীস নং২৮২১ আলোকে)
ইহরামের কাপড় পরিধান করুন–ইহরামের দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন–উমরার নিয়ত করুন। “আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল উমরাতা ফাইয়াসসিরহালী ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নী।”

অর্থঃ “ইয়া আল্লাহ! আমি উমরা পালন করার নিয়্যত করছি; আমার জন্য তা সহজ করে দিন এবং কবুল করুন।।”
তারপর আল্লাহর তাওহীদ সস্বলিত নি¤েœর তালবিয়া পাঠ করতে থাকুন-(মনে রাখবেন এই তালবিয়াটি প্রতিবার কমপক্ষে তিনবার পাঠ করবেন। “লাব্বাআইকা আল্লাহুম্মা লাব্বআইকা, লাব্বআইকা লা শারীকা লাকা লাব্বআইকা, ইন্নাল-হামদা ওয়ান-নি’মাতা লাকা ওয়াল-মূলক, লা শারীকা লাকা।”
অর্থঃ  আমি তোমার দরবারে হাজির হয়েছি হে আল্লাহ, আমি তোমার দরবারে হাজির, আমি তোমার দরবারে হাজির, তোমার কোন শরিক নাই, আমি তোমার দরবারে উপস্থিত। নিশ্চিত সমস্ত প্রশংসা, নি’আমত তোমারই এবং সমগ্র রাজত্ব তোমার, তোমার কোন শরীক নাই।”
এরপর তাওয়াফ শুরু করার পূর্ব মুহূর্তে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে সাত বার কা‘বাঘর তাওয়াফ করুন-তিনবার দ্রুতগতিতে এবং চারবার স্বাভাবিক গতিতে। এরপর বায়তুল্লাকে সামনে রেখে (সম্ভব হলে মাকামে ইব্রাহীমে এসে) এই আয়াত তিলাওয়াত করুনÑ

“ওয়াত্তাখিযূ মিম মাক্বা-মি ইব্রা-হীমা মুছাল্লান”(সূরা বাকারা: ১২৫) অর্থঃ “তোমরা মাকামে ইব্রাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ করো।”এরপর দুই রাকাত সালাতে সূরা ‘ক্কুল হুআল্লাহু আহাদ’ ও ক্কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরুন’ পাঠ করুন। অন্য সুরাও পড়া যাবে। অত:পর হাজারে আসওয়াদের কাছে প্রত্যাবর্তন করে হাজারে আসওয়াদকে সম্ভব হলে চুম্বন করবেন। আর চুম্বন সম্ভব না হলে হাজারে আসওয়াদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ ইশারা সহ বলে দরজা দিয়ে সাফা পাহাড়ের দিকে বের হবেন এবং সাফার নিকটবর্তী হয়ে তিলাওয়াত করবেন-
‘ইন্নাছ ছ¦াফা-ওয়াল্ মারওয়াতা মিন্ শা’আ-রিল্লা-হি।’ (সূরা বাকারা: ১৫৮) অর্থঃ নিশ্চয়ই সাফাÑমারওয়া পাহাড়দ্বয় আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতমÑ” অত:পর সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন এবং নি¤েœাক্ত দোয়া পড়–নÑ
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুলÑমুলক ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু আনজাযা ওয়াদাহু ওয়া নাছারা আবদাহ ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।’

অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। তার জন্য রাজত্ব এবং তার জন্য সমস্ত প্রশংসা, তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন ও শত্রু বাহিনীকে একাই পরাস্ত করেছেন।”-এ দোয়া অনুরূপ তিনবার পড়বেন। অত:পর নেমে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হবেন যাবত না পা উপত্যকার সমতল ভূমিতে গিয়ে ঠেকে। এখান থেকে দ্রুত চলবেন যাবত না উপত্যকা অতিক্রম করেন। মারওয়া পাহাড়ে উঠার সময় হেঁটে উঠবেন অত:পর এখানেও তা করবেন সাফা পাহাড়ে যা করেছিলেন। সর্বশেষ তাওয়াফে যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠবেন এরপর মাথা মুন্ডিয়ে অথবা চুল ছেটে ফেলবেন এবং উমরার ইহরাম থেকে হালাল হবেন।
৩) হজ্জের ফযিলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস ঃ
রাসূল (সাঃ) বলেন,
যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হ্জ্জ করল এবং হজ্জ পালনে কোন প্রকার অশ্লীল কথা বলে নাই, কোন প্রকার পাপাচার করে নাই সে যেন সদ্য প্রসূত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরল। (মেশকাত) হজ্জ পালনকারী কখনোও গরীব হয় না। (তিরমিযী) এক উমরা আদায়ের পর কোন ছোট খাট পাপ হয়ে থাকলে দ্বিতীয় উমরা উক্ত পাপের বিনিময় হয়ে যায়। আর কবুল হজ্জের বিনিময় বেহেশত ছাড়া আর কিছুই নহে (মেশকাত)। একজন হাজীর জন্য তাঁর চারিশত পরিবার অথবা নিজ পরিবারের চারিশত লোকের সুপারিশ কবুল করা হবে। (তারগীব)
যে ব্যক্তি হজ্জে অথবা উমরার নিয়তে রওয়ানা হয়ে পথিমধ্যে মারা গেল, তিনি কোন প্রকার জবাবদিহি ও হিসাবের সম্মুখীন হবেন না। তাকে বলা হবে বেহেশতে চলে যাও। (বাইহাকী)
রাসূল (সা.) হজ্জ পালনকারীর জন্য দোয়া করবেন “হে আল্লাহ! তুমি হজ্জকারিকে ক্ষমা করে দাও এবং তিনি যাদের জন্য সুপারিশ করবেন তাদেরকেও ক্ষমা করে দাও।” (মিশকাত)
হজের প্রস্তুতির জন্য কতিপয় নির্দেশনা
প্রাক-নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (ঘওউ) এবং নিবন্ধনের জন্য মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (গজচ) থাকতে হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ হজের দিন হতে পরবর্তী ন্যূনতম ৬ মাস থাকতে হবে। তবে ১৮ বছর বা নি¤œবয়সী হজযাত্রীর জন্য জাতীয় পরিচয় পত্রের স্থলে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন হবে।মহিলা হজযাত্রী কেবলমাত্র শরিয়তসম্মত মাহরাম-এর সাথে হজে যেতে পারবেন।সরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীকে হজ অফিস, আশকোনা, ঢাকা এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীকে অনুমোদিত হজ এজেন্সীর মাধ্যম সৌদি দূতাবাস হতে ইস্যুকৃত হজ ভিসা সংগ্রহ করতে হবে।  

বিমান টিকিট, পাসপোর্ট, হেলথ কার্ড ও বৈদেশিক মুদ্রা ইত্যাদি অবশ্যই হজযাত্রীর নিজের কাছে সাবধানে রাখতে হবে।সৌদি আরবে আইডি কার্ড, কব্জিবেল্ট, মোয়াল্লেম কার্ড, হোটেলের কার্ড ইত্যাদি সার্বক্ষণিক শরীরের সাথে বেঁধে রাখতে হবে; যাতে হজযাত্রী হারিয়ে গেলে বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে (আইডি কার্ড, কব্জিল্টে, হোটেলের কার্ড) দেখে সহজে সনাক্ত করা যায়। বেসককারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীর ট্রলিব্যাগে হজযাত্রীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর, মোয়াল্লেম নম্বর,হজ এজেন্সীর নাম, লাইসেন্স নম্বর এবং সৌদি আরবে সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সীর প্রতিনিধির মোবাইল নম্বরসহ ঠিকানা ইংরেজীতে লেখা বাধ্যতামূলক।

প্রত্যেক হজযাত্রীকে হজে গমনের কমপক্ষে ১০ দিন পূর্ব হতে অনূর্ধ্ব ৩ বছরের মধ্যে বেকসিন গ্রহণ মেডিকেল বোর্ডে অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য স্বাস্থ্য পরিক্ষা, মেনিনজাইটিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। উল্লেখ্য যে, ৭০ বছর বা ততোধিক বয়স্ক হজযাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত বোর্ডের নিকট হতে বিশেষ স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক।ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ কোন ক্রনিকরোগী প্রেসক্রিপসনসহ অবশ্যই ৫০ দিনের ঔষধ সঙ্গে বহন করবেন। প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র বহনের ক্ষেত্রে রেজিষ্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে রাখতে হবে।

ব্যাগ/লাগেজে কিংবা কারো নিকট সামান্যতম কোন প্রকার মাদকদ্রব্য পাওয়া গেলে সৌদি আইন অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করতে হবে। সৌদি আরবে হজযাত্রীর অবস্থানকাল সর্বোচ্চ ৪৫ দিন। এয়ারলাইন্স কর্তক হজযাত্রীর ফিরতি ফ্লাইটের বোর্ডিং পাস বাংলাদেশেই প্রদান করা হবে। কোন হজযাত্রী বোর্ডিং পাস হারিয়ে ফেললে (ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে) বাংলাদেশ হজ অফিস, মক্কা/মদিনা/জেদ্দার প্রত্যয়ন সাপেক্ষে ডুপ্লিকেট বোর্ডিং পাস ইস্যু করা হবে।মদিনা-আল-মুনাওয়ারা থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় জুল-হুলাইফা মিকাতে ইহরাম পরিধান ও নিয়তের জন্য সময় নষ্ট করা যাবে না বরং ইসলামী শরীয়তমতে বাসা থেকে গোসল করে ইহরাম পরিধান করে আসতে হবে এবং মিকাতে এসে নামাজ আদায়পূর্বক নিয়ত করতে হবে।

মদিনা-আল-মুনাওয়ারার ঐতিহাসিক পবিত্র স্থানসমূহ জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট হজযাত্রী নিয়ে মদিনাস্থ আদিল্লা অফিসের মাধ্যমে যেতে হবে নতুবা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিংবা অনির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে পারে। সৌদি আরবে পৌঁছে মোবাইলের সিম সংগ্রহ করা একটি সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। সহজে সিমকার্ড পেতে আপনাকে পাসপোর্টের পিছনে লাগানো নাম্বর/কোড অবশ্যই আপনার সাথে রাখতে হবে। হজ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি সরকার কর্র্তৃক জারীকৃত সকল বিধি বিধান হজযাত্রী ও সকল এজেন্সী মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। হজ সংক্রান্ত যে কোন জরুরি প্রয়োজনে ঢাকা ও সৌদি আরবস্থ (মক্কা/মদিনা/জেদ্দা) হজ অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।  

পরিশেষে এ কথা সংশয়াতীতভাবে প্রমানিত যে, হজ্জ এমন একটি ইবাদত, যার ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও শিক্ষার তুলনা নেই। পৃথিবীর কোণে কোণে ইসলামের শান্তির বার্তা পৌছানোর জন্য এতদপেক্ষা শক্তিশালী উপায় আর হতে পারে না। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শান্তি শৃঙ্খলা, খোদা প্রেম, একক লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধকরণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হজের ভূমিকার বিকল্প নেই। এজন্যই আল্লাহ তাআলা এ মহতী ইবাদত অনুষ্ঠানকে বিশ্বের সামর্থবান মুসলিমের ওপর ফরজ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি হাজিগণ সুস্থ শরীরে হজ্জের যাবতীয় নিয়ম কানুন পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করুন এটাই আজকের প্রার্থনা।
লেখক ঃ ইসলামি গবেষক, কলামিষ্ট, সংগঠক ও কলেজ প্রভাষক
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

এই বিভাগের আরো খবর

‘জ্বীনের বাদশা’, ভয়ঙ্কর!

আতাউর রহমান মিটন :ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা কিন্তু একটা অন্তঃমিল সবক্ষেত্রেই রয়েছে। আর মিলটা হলো ‘প্রতারণা’। প্রতারণা কোন নতুন বিষয় নয়। এটা ছিল, আছে এবং সম্ভবতঃ থাকবেও। রাত ও দিনের পার্থক্য যেমন, ঠিক তেমনিই ভাল ও খারাপের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী। তবে কথায় আছে ‘রাত যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত নিকটে চলে আসে’। সে কারণেই অপরাধীরা যত বেপরোয়া হয়, আমার কাছে মনে হয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তত সামনে চলে আসে।

একটি ঝড়-তুফানে কোন এলাকা তছনছ হয়ে গেলে তাই সেখানে নতুন করে জনপদ গড়ে ওঠে। অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ আগামীদিনের জীবন সাজায়। বগুড়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের নতুন করে সবকিছুকে ভাবতে, গড়ে তোলার তাগাদা দিচ্ছে। অন্ধ আনুগত্য ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বগুড়াকে বাঁচাতে হবে। তাড়াতে হবে সকল ‘জ্বীনের বাদশা’কে।


অনলাইন পত্রিকা থেকে জানলাম, বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ৫নং ভাটগ্রাম ইউনিয়নের চাকলমা গ্রামের হঠাৎপাড়ায় কথিত এক জ্বীনের বাদশার বেপরোয়া তদ্বির বাণিজ্য চলছে। এলাকায় বিতর্কিত সেই জ্বীনের বাদশা নাকি প্রতিদিন গণনার মাধ্যমে তদ্বির-চিকিৎসা দেয়ার নাম করে গ্রামগঞ্জের নিরীহ মানুষদের নিকট থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আরেক ‘জ্বীনের বাদশা’ বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার দাাড়িগাছা গ্রামে বাস করত।

আড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ইউপি সদস্য এই প্রতারককে কিছুদিন আগে পুলিশ গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। আরেক ‘জ্বীনের বাদশা’ বাস করে বগুড়ার মহাস্থানগড় মাজার এলাকায়। কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনে কথিত ঐ জ্বীনের বাদশা’র প্রলোভনের শিকার হয়ে নওগাঁ জেলার সাপাহার থানার রসুলপুর ঘোলাপুকুর গ্রামের নজরুল ইসলাম প্রায় ৪ লক্ষ টাকা খুইয়ে এখন সর্বস্বান্ত। অসহায় এই দরিদ্র পরিবারের লোকজন এখন খেয়ে না খেয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করছে।


জ্বীনের বাদশা’দের বাসস্থান কেবল বগুড়া জেলায় নয়। এরা রয়েছে গাইবান্ধায়, রয়েছে পঞ্চগড়ে। তার চেয়ে বরং বলা ভাল এরা রয়েছে দেশের সর্বত্র। কিছুদিন আগে গাইবান্ধা থেকে এরকম এক জ্বীনের বাদশাকে সদলবলে আটক করেছে পুলিশ। এরা রয়েছে উপকূলীয় জেলা ভোলা বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নেও। বাস্তবে এদের অবস্থান সারাদেশেই। মানুষের সরলতা, ব্যক্তিগত হতাশা এবং কখনও কখনও লোভের সুযোগ নিয়ে এই ভয়ঙ্কর জ্বীনের বাদশারা মানুষকে সর্বশান্ত করে ফেলে।

‘জ্বীনের বাদশা’ বলে কথিত এই প্রতারকদের প্রতারণা কৌশল অনেক ক্ষেত্রেই নিখুঁত। এরা বুদ্ধিমত্তার সাথে তাদের অপতৎপরতা চালায়। এরা মন্ত্র-তন্ত্র পাঠ করে জ্বীন হাজির করে বলে দাবী করে এবং পোষা সেই জ্বীন দিয়ে ভক্তের সকল সমস্যার সমাধানের মিথ্যা আশ্বাস দেয়। যাদের সন্তান হয়না তারা আসেন এই ‘জ্বীনের বাদশা’র কাছে। বিয়ে, দাম্পত্য সুখ, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি, শত্রুনাশ, বিদেশ যাত্রা, হারানো প্রেম ফিরে পাওয়া, মনের মানুষকে বশ করা, সংসারের অভাব দূর করা ইত্যাদি হাজার রকমের সমস্যা নিয়ে মানুষ হাজির হয় এই প্রতারকদের কাছে। নজরানা বা দক্ষিণা দিলেই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস মেলে।

কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সরল মনের মানুষ এসব তান্ত্রিকতা, বা আধ্যাত্মিক কেরামতিতে বিশ্বাস করেন। বাস্তবে জ্বীন দিয়ে তদ্বির করা যায় নাকি যায় না সে তর্কে আমি আজ যাচ্ছিনা। তবে বলে রাখি আমার নিজের জীবন এবং পরিবারে জ্বীন বিষয়ক প্রতারণার অভিজ্ঞতা আছে। আপনারা কেউ আগ্রহী হলে আমি সেই গল্পগুলো ভবিষ্যতে বলতে পারি। তবে আজ আমি এখানে জ্বীনের গল্প বলছি কারণ আমি আসলে আমাদের সমাজের আরেক ধরনের ‘জ্বীনের বাদশা’ সম্পর্কে কথা বলতে চাই।

এই জ্বীনের বাদশার দল খুবই ক্ষমতাশালী। এরা চাইলে আমাকে ‘গুম’ করে দিতে পারে। সাধারণতঃ এদের ক্ষমতার উৎস রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সাথে সখ্যতা।আমি রাজনীতিতেও নানা পদের ‘জ্বীনের বাদশা’ দেখতে পাই। এরা এমন একটা ভাব করেন যেন তারা মানুষের সব সমস্যার সমাধান করে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। আর মানুষও বোকার মত এদের পেছনে ছোটে।

 সাধারণতঃ ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এমন ‘জ্বীনের বাদশা’ বেশি দেখা যায়। সেই হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর শাসনামল থেকে আমি প্রত্যক্ষভাবে এই গোষ্ঠীকে দেখছি। এরা আপনার আমার কাছে তদ্বিরবাজ হিসেবে পরিচিত। এদের পেশা মানুষের বিবিধ সমস্যা সমাধানের দালালী করা, আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভরানো। এরা সরকারি দলের ছত্রছায়ায় থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কলেজে ভর্তি করে দেয়ার নাম করে বাড়িতে ডেকে এনে সর্বস্ব লুটে নেয়। এরা নিজেরা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আর জনসভায় মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়। এরা বহুরূপী, এরা ভয়ঙ্কর!  প্রতারক ‘জ্বীনের বাদশা’ চক্রের মতই রাজনীতিবিদ এই গংদেরও ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। জ্বীনের বাদশা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ ব্যক্তিটি নিজে ‘সাধু’ ভাব নিয়ে সমাজে চলাফেরা করে অথচ তার গ্যাং এর ক্যাডাররাই চারিদিকে জাল বিছিয়ে অপকর্ম করে।

 তাদের বিছানো সেই কারেন্ট জালে আটকে যায় প্রশাসনও। তখন সেই প্রশাসনও পরিণত হয় অপরাধের সহযোগীতে। শুধু বগুড়ার কথায় ধরুন, গত এক সপ্তাহে বগুড়ার মাদক ব্যবসা ও অন্যান্য অপকর্ম নিয়ে পত্রিকায় যত লেখা ছাপা হয়েছে তা কি জেলার সুষ্ঠু প্রশাসনের পরিচয় তুলে ধরে? শহরের কোথায় কোথায়, কারা মাদকের ব্যবসা করছে তা সবাই জানে অথচ সেটা জানে না শুধু প্রশাসন! নিশ্চয় জ্বীনের বাদশা’র তদ্বিরে গুণে অপকর্মের হোতারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলতে পারছে। পরম ক্ষমতাশালী ‘জ্বীনের বাদশা’র আশীর্বাদ যাদের উপরে থাকবে, প্রশাসন তাদের টিকিও স্পর্শ করতে পারবে না। বড় জোর কিছু ছিঁচকে চোর, চুনোপুঠি অপরাধীদের ধরে এনে নিজেদের বীরত্ব দেখাবে। ব্যস এতটুকুই!


পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, গত সাত বছরে বগুড়ায় রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটেছে ২০টি। পরিবহনে চাঁদাবাজি, মাদকের কারবার, সালিস-দরবার, দখল, টেন্ডারবাজিসহ কোটি কোটি টাকা আয়ের উৎস কবজা করতে মরিয়া বিবাদমান পক্ষগুলোর হাতে জিম্মি বগুড়ার শান্তিকামী জনগণ। এক তুফানের ঝাপটাতেই দেশের মানুষের কাছে বগুড়ার ইমেজ দারুণভাবে নষ্ট হয়েছে। অথচ আরও বড় বড় বিশালাকায় ঘুর্ণিঝড় ধেয়ে আসতে অপেক্ষমাণ। এই মহাশক্তিধরদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে বগুড়ায় আগামীদিনে সুশাসন নয়, চলবে অপশাসন। আর সেটা সাধারণ শান্তিকামী মানুষদের জন্য সুখকর হবে না।

 এই প্রতারক চক্র, এই দুর্বৃত্তদের সমূলে উৎপাটন করতে হবে। সেটা করতে হবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি দিয়েই। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে নাগরিক শক্তির জাগরণ ঘটাতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে তাদের সন্তান ও প্রিয়জনদের ভবিষ্যত কতিপয় মুখচেনা দুর্বৃত্তরা পন্ড করে দিতে পারে না। তাই তাদেরকে যোগ্য দেখে পক্ষ নিতে হবে। নবীন ও প্রতিশ্রুতিশীল ক্লিন ইমেজের অধিকারী নেতৃত্বদেরকে সমর্থন দিয়ে যথাস্থানে বসাতে হবে। এটা করতে ব্যর্থ হলে অন্ধকারের অপশক্তিরা উৎসাহিত হবে, আরও ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে তারা গিলে খাবে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যত। এটা হতে দেয়া যাবে না।

যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বা সরকারি পদস্থ ক্ষমতা লাভের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সমাজে অন্ধকারের শাসন জারি রেখেছেন আমরা শান্তিকামী জনগণ তাদের বিচার চাই। আমরা চাই এই ‘জ্বীনের বাদশাদের’ মুখোশ জনসম্মুখে উন্মোচিত হোক। তবে আমি এটাও মনে করি কেবলমাত্র এক বা দুজন ব্যক্তিকে শাস্তি দিলে এই দুর্বৃত্তায়ন হবে না। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। এর জন্য মানুষের মনে ইতিবাচক সমাজ চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। জাগিয়ে তুলতে হবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ। সংগঠনের সৎ ও দৃঢ়তাসম্পন্ন নেতা-কর্মীদের ভরসার জায়গাটাকে আরও বড় করে তুলতে হবে। রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণের অনাস্থা দূর করে গণমুখী রাজনীতির দুয়ার অবারিত করতে হবে।

দুর্বৃত্তদের অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। এক ভাইকে দুর্বল করে অপর ভাইকে শক্তিশালী করার ফাঁদে আমরা যেন পা না দেই। আমরা জ্বলন্ত উনুন থেকে ফুটন্ত কড়াই – এ নিপতিত হতে চাই না। কারণ তাতে পরিণতি একই। এর একটা আমূল পরিবর্তন দরকার। এর জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘নেতা’ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। ভাগ্যের হাতে ভবিষ্যতকে ছেড়ে দেয়াটা বোকামী। ভবিষ্যত তৈরী করে নিতে হয়। অভিমানে, অপমানে অথবা হতাশায় এমন অনেক গুণী ও সম্ভাবনাময় তরুণ নেতৃত্ব আজ দূরে সরে আছেন। তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সৎ ও বিবেকসম্পন্ন জনদরদী নেতা যে দলেরই হোক তারা ভবিষ্যতকে কলুষিত করে না বরং বিকশিত করে। নিজের দলকে ভালবাসতে গিয়ে অন্য দলকে ঘৃণা করার প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক কি না ভাবতে হবে। আমি কোন দর্শন বা মতের সাথে একমত নাও হতে পারি কিন্তু তাই বলে সেই মত বা দর্শনকে ঘৃণা করে তাকে পুঁতে ফেলার বিধ্বংসী আয়োজন মনের গভীরে সহজেই সহিংসতা জাগিয়ে তোলে।
]
তুফান ঝড়ে বগুড়ার রাজনীতিতে অনেক ডাল-পালা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। বেরিয়ে আসছে বিগত আট বছরের সরকার দলীয় আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে কথিতদের রং-বেরংয়ের নানা কাহিনী। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলো সত্য কি মিথ্যা সেটা নিয়ে মন্তব্য করার চাইতে বরং এটা বলা ভাল যে, এই কাহিনীগুলো সরকারি দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে যারা এখনও দলের ঝান্ডা ধরে রেখেছেন তারা এই ঘটনায় নিজেদের লজ্জা লুকাতে পারেন নি। কতিপয় সুবিধাবাদী নেতা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যে অশুভ ‘জ্বীনের বাদশা’র আশ্রয়-প্রশ্রয়ে যে ‘সা¤্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন সেটা ভাঙতেই হবে।

 অশুভ ঝড় ইতোমধ্যেই এই সা¤্রাজ্যকে আঘাত করেছে। সংশ্লিষ্টদের উচিত এই অশুভ সা¤্রাজ্য স্থায়ীভাবে গুড়িয়ে দেয়া, অশুভ চক্রকে পুরোপুরি প্রতিহত করা। তাদের উত্থান রুখতে বিকল্প নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বগুড়ার মানুষ একটি পরিবর্তন দেখতে চান। পুরনো দিনের ‘জ্বীনের বাদশা’ দিয়ে নয়, বরং নতুন দিনের উপযোগী ‘ডিজিটাল’ প্রজন্ম থেকে নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বগুড়াসহ সারাদেশে নবীন নেতৃত্ব দেখতে চায়।  
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১৫২৬৯৭৯

 

এই বিভাগের আরো খবর

গণতন্ত্র শক্তিশালী হোক

মোহাম্মদ নজাবত আলী :আগামী নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে। বড় দুই দল তাদের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ জোরে সোরে চলছে। আগ্রহী প্রার্থীরাও নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেছেন। এবারের নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে বিএনপি গোল দিতে দিবে না। কেন না বিএনপি এবারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। তাই বড় দুদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা ধরনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ কিভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা যায় সেটাই বড় দিক।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ বিজয়ের ৪৪ বছর পাড়ি দিয়েছে। এ দীর্ঘ সময় আমাদের অর্জন অনেক। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য রয়েছে। অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। নানা ঘাত, প্রতিঘাত, রাজনৈতিক হানাহানি, বিশ্বাস অবিশ্বাসের মধ্যেও বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ধরে রাখা একেবারে হালকা করে দেখার বিষয় নয়।

প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হওয়ায় জনগণের মাথা পিছু আয় বেড়েছে। মানুষের জীবন যাত্রার মান বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্য আয় থেকে মধ্য আয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র হ্রাস পেয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, শিক্ষার হার বাড়ছে। নারী শিক্ষার প্রসার ঘটছে, কৃষি উৎপাদন বেড়েছে ও তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে।

 আর্থিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। এ সবই সম্ভব হয়েছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে। বাংলাদেশ কখনো কোনো কালে রাজনৈতিক বিবাদ ছাড়া রাজনীতি চলেনি। যখন যে দল বা জোটই ক্ষমতায় এসেছে নানা দ্বন্দ্ব সংঘাতে, ঝগড়া বিবাদ রাজনৈতিক হানাহানিতে শাসক দলকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়েছে। এরকম নানা প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকে বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশের কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের প্রতীক। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন, আগামী দিনগুলোই যদি অর্থনীতির এমন ধারা অব্যাহত থাকে এবং বিনিয়োগ বাড়ানো যায় তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ শতাংশ যা বাংলাদেশকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তিতে মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে বিশ্বে পরিচিতিতে দান করতে সক্ষম হবে’। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু যা বলেছেন এবং ভবিষ্যতে যা প্রত্যাশা করেছেন তা পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

 সন্ত্রাস, দুর্নীতিকে না বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সর্ব ক্ষেত্রে সুশাসন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে তা অর্জন আমাদের পক্ষে কঠিন হবে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। আর প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়তে গেলে অবশ্যই যে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হওয়া যাতে করে জনমতের প্রতিফলন ঘটে আর সমাজের সর্বক্ষেত্রে সুশাসনের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচন।

অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে তা শত ভাগ স্বচ্ছ বলা যাবে না। তবুও যে গণতন্ত্রের উপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে তাকে আরও কিভাবে পরিশীলিত করা যায় কিভাবে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানো যায় কিভাবে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা যায় সেটাই বড় প্রশ্ন। কেননা একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্ন ও সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য। এর ব্যত্যয় হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না এবং অযোগ্য, অসৎ দুর্নীতিবাজরা জয়ী হলে সমাজে দুর্বৃত্তায়ন বাড়বে। সর্বক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা দূরহ হয়ে পড়বে। সুশাসন, গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া আবশ্যক।

 আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করছি তার মধ্যে ত্র“টি বিচ্যুতি থাকলেও তা থেকে বেড়িয়ে এসে জনগণের অংশ গ্রহনের একটি উন্নত টেকসই গণতন্ত্র চাই যা একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে। তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে সৎ, যোগ্য নেতৃত্বকে নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারদের বেছে নেয়া উচিত। একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে যখন এরকম সৎ যোগ্য নেতৃত্বকে নির্বাচিত করার সুযোগ পাবে ভোটাররা তখন গণতন্ত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

বিশ্ব ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, গণতন্ত্রই সবচেয়ে কাংখিত সরকার ব্যবস্থা তার মতে উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের প্রয়োজন। তাই গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হবে। মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গেলে গণতন্ত্রকে ধরে রাখা যায়। তাই অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতন্ত্রের শর্ত।

 আবার নির্বাচনই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। গণতন্ত্র এখন সারা বিশ্বে উন্নত শাসন ব্যবস্থার মডেল এবং চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করোনো শক্তিশালী করা শুধু সরকারী দলেরই কাজ নয় এ বাইরে যে প্রশাসন ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিরোধী ছোট বড় যে রাজনৈতিক দল রয়েছে তাদের সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার দ্বারা গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

আবার তৃণমূল থেকে গণতন্ত্রের চর্চা যদি করা না যায় তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। তাই উন্নত রাষ্ট্রে স্থানীয় পর্যায় থেকে গণতন্ত্রের চর্চা ও সুসংহিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেটা ইউনিয়ন বা পৌর নির্বাচন যেটাই হোক না কেন। একটি নির্বাচনের কার্যক্রমের সাথে যে সমস্ত  প্রতিষ্ঠান জড়িত তারা যদি প্রকৃত পক্ষে জনগণের আকাংখাকে গুরুত্ব দেয় তাহলে গণতন্ত্র সুসংহত হবে।


বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহণের লক্ষ্যে প্রার্থী বাছাই সহ বিভিন্নভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছেন। একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেমন সবার প্রত্যাশা এবং সে প্রত্যাশা পূরণে ইসির ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আজ নতুন কোনো বিষয় নয়। নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বিদ্যমান আইন ও ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ করতে পারে সে ক্ষমতা ইসির রয়েছে। এ ধরনের কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিজ্ঞমহল অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন। যে কোনো নির্বাচনে ইসি যদি কঠোর হন তাহলে নির্বাচন স্বচ্ছ করা অনেকটা সম্ভব।


নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী রোড ম্যাপ ঘোষণা করেছেন। তবে বিএনপি এ রোড ম্যাপকে সরকারের ক্ষমতায় যাওয়ার নীল নকশা বলে অভিযোগ করেছেন। এটা স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলেও একই কথা বলতেন। যা হোক ৭টি কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে ইসি এ রোড ম্যাপ ঘোষণা করেন। আইনী কাঠামোগুলো পর্যালোচনা ও সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, নির্বাচন কমিশন সহ আরও কয়েকটি দিক রয়েছে।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, এ দলিলই সর্বশেষ নয়। সময় ও বাস্তবতার নিরিখে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন, কর্মকর্তারা আরও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সময়ের প্রয়োজনে ঘোষিত রোডম্যাপ পরিবর্তন আসতেও পারে। তবে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে বিদ্যমান আইনই যথেষ্ট বলেও তিনি মনে করেন।

 এ লক্ষ্যে তিনি দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে সংলাপও করেছেন। সেই সমাজের প্রতিনিধি ব্যক্তিরা নির্বাচনকে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করতে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া, সেনাবাহিনী মোতায়েন, সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল এমন কর্মকর্তাকে নির্বাচনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রাখা সহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করেন। আমরা মনে করি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে সুশীল সমাজের এ সুপারিশগুলো সরকারের আমলে নেয়া দরকার। কিন্তু এরই মধ্যে শাসক দল ও বিএনপি একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়ানো শুরু করেছেন। কারণে অকারণে নানা তর্কে বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছে যা রাজনীতিতে শোভনীয় নয়।  


গণতন্ত্রকে শক্তিশালী টেকসই করতে গেলে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এমন ধরনের সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীরা সমান সুযোগ সুবিধা পাবে যাকে বলা হয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। সবার ক্ষেত্রে সমান সুযোগের মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনই হবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার অন্যতম দিক। নির্বাচনের আগে যে সব অনিয়ম অভিযোগ উঠে নির্বাচন কমিশন যদি তাৎক্ষনিকভাবে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাহলে কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা বাড়ে।

 কারণ নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলো একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেয়। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক নির্বাচন করা কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। মূলত নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতহীন আচরণই গণতন্ত্রকে টেকসই করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। গণতন্ত্র যে কোনো দেশের জন্য আশির্বাদস্বরূপ ও উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। আমাদের দেশ গণতান্ত্রিক হলেও গণতন্ত্র এখনও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি।

 সাধারণ মানুষের বা ভোটারদের ভোট নিয়ে কেউ যদি ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে তাহলে সেটা হবে গণতন্ত্রের জন্য অশুভ ও নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে খারাপ দৃষ্টান্ত। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হলে তা হবে দেশের জন্য গণতন্ত্রের জন্য শুভ। তাই আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হোক এবং ভোটের রাজনীতিতে একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। কোনো দেশের নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীন হয়, নিরপেক্ষ হয় একটি সুষ্ঠু সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারে তাহলে সেটা হবে নির্বাচন কমিশনের কৃতিত্ব।

আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু তা অনেক সময় নানা কারণে প্রয়োগ করতে পারে না। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের জন্য আশির্বাদ। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও প্রতিটি সরকারের আমলে দেখা গেছে কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে সরকারের প্রভাব নানা বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে।


আগামী নির্বাচনে যদি সাধারণ ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে শংকাহীনভাবে ভোট দেবার সুযোগ পায় কোনো প্রকার বাধা বিপত্তির সৃষ্টি না হয় তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। সেটা না হলে সকলের জানা গণতন্ত্রের বিকাশ ও চর্চার পথ রুদ্ধ হবে। তবে শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুসংহত হওয়ার একমাত্র মানদন্ড নয়। এক্ষেত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, সততার প্রশ্নটিও জড়িত। কেননা অসৎ দুর্নীতিবাজরা যদি টাকা ছিটিয়ে নির্বাচিত হয় যা এ যাবত পর্যন্ত হয়ে এসেছে তাহলে তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায় না। তাদের দ্বারা গণতন্ত্রও সুসংহত হয় না।

গণতন্ত্রকে টেকসই সার্থক করতে অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীকে সজ্জন শিক্ষিত রুচিবোধ সম্পন্ন হওয়া চাই। কিন্তু গণতন্ত্র যেহেতু জনগণের শাসন তাই সেখানে যোগ্যতা, শিক্ষিত, সততার বিষয়টি গৌণ ফলে কালো টাকা পেশী শক্তিও প্রভাবশালীরা নির্বাচিত হয়। বর্তমান রাজনীতি জনকল্যাণের পরিবর্তে বাণিজ্য করণ হয়েছে।

 অথচ রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য জনগণের জন্য কিছু করা। এ কারণে যে কোনো নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত মনোভাব সম্পন্ন প্রার্থী রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। কোনো সিস্টেম বা পদ্ধতি রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে না।

একটি বিষয় আমাদের রাজনীতিবিদদের মনে রাখা দরকার পদ্ধতি নয় ব্যক্তি শুদ্ধ না হলে রাজনীতি শুদ্ধ  হবে না। রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে না। আমাদের রাজনীতিকরা রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে নমিনেশন দেন, স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অধিকাংশ সময় উপেক্ষিত হন এমন একটি প্রতিবেদন দিয়েছে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)। তাহলে কি রাজনীতিতে এখন বানিজ্যকরণ ঘটছে? যার কারণেই কি বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করে।


আমরা এমনটি নির্বাচন চাই যা নিয়ে গর্ব করতে পারি। আগামী নির্বাচনের জন্য একটি ভালো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অনেক। শুধু রোডম্যাপ ঘোষণার মধ্যেই কমিশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানই ইসির প্রধান দায়িত্ব। এক্ষেত্রে রাজনৈতিকদলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। তারা যদি দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে তাহলে রোডম্যাপ ঘোষণা ও সংলাপের আয়োজন করেও নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই বলা যায় কোনো পদ্ধতি বা রোড ম্যাপ নয়, ব্যক্তি শুদ্ধ না হলে নির্বাচন শুদ্ধ হবে না।   
লেখক: শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

 

এই বিভাগের আরো খবর

রোদের আরশিতে দেখতে দাও মুখ

রিপন আহসান ঋতু :আমাদের হলটি হবে ধুমপান আর নোংরা রাজনীতি মুক্ত। ছোট ভাই, বড় ভাই, হলের দায়িত্বরত শিক্ষক, সবাই সবার সহযোগি। পড়াশুনা, গল্প, গান, আড্ডা, ক্যারাম, দাবা, জোকস সবই নিয়ে দিন কাটবে।  এগারো জনের মতো গ্রুপ গ্রুপ করে বিসিএস এর প্রস্তুতি নিবে কেউ কেউ। এক এক দিন এক এক বিষয় নিয়ে পাঠচক্র হবে নিয়মিত। আলোচনা হবে জঙ্গি, রামপাল, সুন্দরবন, চ্যাম্পিয়ান অব দ্যা আর্থ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ নানা বিষয় নিয়ে।  প্রসুতি মায়ের রক্ত লাগবে শুনলে হলের সবাই রক্ত দিতে লাইন ধরবেন হাসপাতালে।

 প্রতিটি হল থেকে ছুটে যাবে বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ নিয়ে। কাউকে হলের বারান্দায় শুয়ে হাফিজুরের মতো নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চলে যেতে দেবে না অকালে। সবাই দাঁড়াবে সোনালীর ধর্ষণ আর তনু হত্যার বিচারে।  হলের প্রতিটি রুমের নাম দিবো সালাম, জব্বার, রফিক, নুর হোসেন , আকতারুজ্জামান ইলিয়াস ইত্যাদি। ইত্যাদি। গত আট বছর ধরে এমন স্বপ্নই দেখে আসছে সরকারি আজিজুল হক কলেজের ৩০ হাজার ছাত্র।সেই কবে কলেজের হল ছেড়েছি! তারিখটা মনে নেই। সালটা ২০০৮! শের-ই-বাংলা হল।

 কি অসাধারণ পড়ার পরিবেশ! এখনো ভাবলে মনে হয় হলের সেই প্রিয় বেডরুম, রিডিং টেবিলে সাজানো পুস্তক সম্ভার, করিডোরের পাশে আম গাছের পাতার আচ্ছাদিত সুকোমল পরিবেশ, হল গেটে তুখোড় ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক বাক্যালাপ আর আমার প্রিয় ফোল্ডিং আমব্রেলাটা মাথায় উপরে রেখে অনিন্দ্য সুন্দর ক্যাম্পাসের কলাভবনের সিঁড়ি মাড়ানোর সেই ফেলে আসা দিনগুলি!

সেটা এখন শুধুই স্মৃতি! আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং একজন বিংশ শতকী বাঙালি সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষকতার স্মৃতি বিজড়িত বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের প্রিয় ক্যাম্পাসটি। কলেজটি ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। অবিভক্ত বঙ্গে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব স্যার আজিজুল হক এর নামে কলেজটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল কলেজটি সরকারীকরণ করা হয়। বর্তমানে কলেজটিতে সাড়ে ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার ছাত্র।

 আবার এই ছাত্রদের মধ্যে শতকরা ৮০ জন বগুড়ার বাইরের জেলা থেকে এখানে ভর্তি হয়। কলেজের নতুন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের জন্য তিতুমীর হল, শের-ই-বাংলা হল ও  শহীদ আকতার আলীমুন হল নামে ৩টি এবং ছাত্রীদের জন্য রোকেয়া হল নামে ১টি আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া পুরাতন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের জন্য ফখরুদ্দিন আহমদ হল নামে একটি হল।

বিশাল এই শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ৬১২ শয্যার (সিট) বিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্রাবাস থাকলেও এর মধ্যে তিনটিই গত আট বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে! মাঝে মাঝেই দেখছি হলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। ওরা একটু ঠাঁই পেতে আন্দোলন করছে। ওরা মেসে মেসে পুলিশি তল্লাশির ভয়ে আন্দোলন করছে। ওরা ব্যাচেলর জীবনের কষ্ট ঘোচাতে আন্দোলন করছে। ওরা বাড়িওয়ালাদের রক্ত চক্ষুর ভয়ে আন্দোলন করছে। ওরা পড়ালেখার সুশীতল পরিবেশের জন্য আন্দোলন করছে।

 ওরা অনাবিল শান্তির একটু পরশ পেতে আন্দোলন করছে। ওরা পড়ার পরিবেশের জন্য আন্দোলন করছে। ওরা নিরবিচ্ছিন্ন পরিবেশে ওদের হোম এ্যাসাইনমেন্টগুলি করার জন্য আন্দোলন করছে। ওরা ৪৪ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষে বন্ধ থাকা আবাসিক হলের জন্য আন্দোলন করছে। ওরা হলের জন্য আন্দোলন করছে এমন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যা এ অঞ্চলের প্রাচীনতম এক উচ্চশিক্ষার সূতিকাগার। শিক্ষার অনন্ত শিখা। সুবিশাল দুর্গ। এখানে নিশ্চিত করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুনিপণ পরিবেশ।

 পাঠদানের জন্য রয়েছে বিশ্বমানের একঝাঁক সম্মানিত শিক্ষক যারা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে কলেজটিকে উৎকর্ষের শিখরে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে গবেষণায় কলেজটির অবদান অনস্বীকার্য করে তুলেছে। শিক্ষার্থীরাও তাদের মেধার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের সাবলীলতায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে তা হলো উন্নত পড়ালেখার পরিবেশ! এই পরিবেশ তাদের কাছে একান্ত অনিবার্য করে তুলেছে।

 তাদের দাবিতো কোন অযৌক্তিক না। তারা একটি পরিবেশ চাচ্ছে। পড়ালেখার পরিবেশ! একটু মাথাগোঁজার পরিবেশ! সরকারের শিক্ষা নিয়ে সুবিশাল পরিকল্পনার অংশ হলো ডিজিটাল দেশ গঠনের অঙ্গীকার, ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো ছড়ানো, নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়া, উচ্চ শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীদের দোষ কোথায়? ওরা তো সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য হলে থাকবে। নতুনরা আসবে পুরাতনরা চলে যাবে এটাই তো নিয়ম। সম্মানিত যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গের নিকটে এই শিক্ষার্থীরা হলের দাবি করছে আপনারা একটিবার ভাবুন আপনারা কিন্তু কোন না কোন হলে থেকেই পড়ালেখা শেষ করেছিলেন। আপনাদের কাছে হলের গুরুত্ব বোঝানো নিষ্প্রয়োজন।


শিক্ষার্থীরা দাবি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে একবারে চুপ থাকলে তো হবে না। এমন যদি ভাবা হয় কবে তারা বাস ভাংচুর করবে, রাস্তা অবরোধ করবে, আগুন জ্বালিয়ে আন্দোলন করবে, পুলিশ লাঠি চার্জ করবে, নাম না জানা অসংখ্য শিক্ষার্থীর নামে মামলা হবে, শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ কলেজ থেকে বহিষ্কার হবে, তাহলে সেটা মারাত্মক অন্যায় হবে। এটা প্রশাসনকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। হল দখল করাকে কেন্দ্র করে কলেজে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির কর্মীদের সংঘর্ষের জেরে ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর কলেজের তিতুমীর, শের-ই-বাংলা ও আকতার আলী মুন হল বন্ধ করে দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ।

 এরপর পরিস্থিতি শান্ত হলেও গত আট বছর ধরে তালাবদ্ধই থেকে গেছে ছাত্রদের এই হলগুলো। আর সেগুলো চালু করা হয়নি। দিনের পর দিন বন্ধ থাকার ফলে একসময় শিক্ষার্থীদের হই হুল্লোড়ে প্রাণোচ্ছল থাকা এই কলেজের ছাত্রদের তিনটি আবাসিক হল হয়ে পড়েছে নিশ্চুপ নির্জীব। গত কয়েকদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের বন্ধ দুটি হল এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য।অন্যদিকে কয়েক কোটি  টাকা মূল্যের ভবন পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে চুরি হয়ে গেছে দরজা-জানালা। ভবনের দেয়াল ফেটে জন্মেছে পরগাছা।

 হলের দেয়ালজুড়ে ঠাঁই নিয়েছে আগাছা, আশপাশে গড়ে উঠেছে মাদকসেবীদের নিরাপদ আখড়া। খুবই লজ্জাজনক আর দুঃখজনক ঘটনা এটি। ছাত্রদের আবাসিক হল হয় অপরাধের আবাসস্থল? অথচ হাজার হাজার ছাত্র বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তি মালিকানাধীন ছাত্রাবাসগুলোতে থাকতে গিয়ে পড়ছেন সীমাহীন দুর্ভোগে। এত  অ্যাডভেঞ্চার জীবন কি কেউ কখনো চেয়েছে? আমাদের ছাত্রদের আবাসন ছাড়া শুধুমাত্র শ্রেণি কক্ষে পাঠদান করে কি করুণা করা হচ্ছে? আসন প্রাপ্তি কি আমাদের ছাত্রদের অধিকার নাকি তাদের প্রতি করুণা?

 ছাত্রদের এভাবে থাকতে বাধ্য করা কোন ধরনের অ্যাডভেঞ্চার? ছাত্ররা সরকারি ভর্তুকিতে পড়ছে বলেই কি তাদের এ রকম ‘গুদাম ঘর’ মেসে জীবন কাটাতে হবে? যা দিয়েছে তাতেই খুশি থাকাটাই কি এখানে নীতি? নাকি কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের অধিকার লুটে নিচ্ছে? প্রতিবছর স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ ভর্তি নির্দেশিকায় ছাত্রদের জন্য তিনটি হল (ছাত্রাবাস) থাকার কথা প্রচার করা হচ্ছে। বাস্তবে এ সুবিধা পাচ্ছে না ছাত্ররা। বিগত ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ এই ছাত্রাবাসগুলো নির্মাণ করে।

 বাংলাদেশের প্রতিটি  বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ছাত্রদের বসবাসের জন্য হল  সচল রয়েছে। কেবল ব্যতিক্রম সরকারি আজিজুল কলেজ। তাই এখানে হল সচল হওয়া বাঞ্ছনীয়। শিক্ষার্থীদের বসবাসের জায়গাটা খুবই জরুরি। এই ঐতিহ্যবাহী কলেজটি  কখনো অনাবাসিক হতে পারে না। তাছাড়া এখানে রয়েছে শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা ও পরিবহন সঙ্কটতো আছেই। সেমিনার কক্ষ ও গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ নয়। নামেমাত্র মেডিক্যাল সেন্টার, মেয়েদের হলের নিম্নমানের ক্যান্টিনে চড়া মূল্যের খাবার। এছাড়া খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থাও খুব সমৃদ্ধ নয়।

 তারপরেও ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছে এ কলেজটি এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুকদের পছন্দের তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। সন্দেহ নেই, এই কলেজর বর্তমান সংকট সরকারের আগোচরে নয়। একথা ঠিক বহু বছরের পুঞ্জীভূত সংকট রাতারাতি সমাধান দুঃসাধ্য পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতাও আছে। তবুও সব কিছুর বিবেচনায় ছাত্রদের আবাসিক হল বন্ধ রেখে এর জনপ্রিয়তায় বর্তায় ঘটাবেন না। “দরজা খুলে দাও জানালা খুলে দাও, আসতে দাও হাওয়া, উঠুক ভরে বুক রোদের আরশিতে দেখতে দাও মুখ।”
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও সংগঠক  
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩

এই বিভাগের আরো খবর

সমঝোতার দরজা খোলা থাকুক

প্রফেসর মোঃ খালিকুজ্জামান চৌধুরী:বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ’৭৫- পরবর্তী ১৫ বছর দেশ ছিল সেনাশাসনের অধীনে। এ সময় জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। সাবেক সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ সুদীর্ঘ ৯ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে রেখেছিলেন। স্বৈরশাসক এরশাদ চেয়েছিলেন আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখতে কিন্তু তা রাখতে পারেননি তিনি। ১৯৯০ সালে তীব্র গণ আন্দোলনের মুখে তাকে ক্ষমতা ছেড়ে বিদায় নিতে হয়েছিল। তার শাসনামলে গণতন্ত্র ছিল বন্দী।

স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছিল মানুষ। ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক’- এই শ্লোগান ছিল মানুষের মুখে মুখে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এরশাদ দমননীতি অবলম্বন করেছিলেন। যার ফলে প্রাণহানি ঘটেছিল, দেশের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছিল। তবুও লক্ষ্য অর্জনে জনগণের অবস্থান ছিল অনড়, অটল।

 তাই বিজয় সম্ভব হয়েছে। এ বিজয় ছিল জনগণের। এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমাদের দুই নেত্রী। তাঁরা হলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহাম্মদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করে।   

 
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ঘুরে ফিরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসছে এবং ক্ষমতা থেকে বিদায় নিচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় আমরা বেশ কিছু বছর পেরিয়ে এসেছি। বর্তমানে ২০১৭ সাল চলছে। গণতন্ত্রকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করতে আমাদের যে দুই নেত্রী অবদান রেখেছিলেন, তাঁরা বেঁচে আছেন। দলীয় প্রধান হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে বর্তমান। তবে ক্ষমতাসীন রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা; অন্যদিকে  বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আছেন ক্ষমতা ও সংসদের বাইরে।

 কিন্তু কথা হলো, যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আমাদের দুই নেত্রী লড়াই করেছিলেন- আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই গণতন্ত্র আজ কোন্ পথে? তাঁদের জীবদ্দশায় মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হবে- গণতন্ত্র নামেই থাকবে, বাস্তবে নয় এমনটি কি হতে পারে? এই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দুই নেত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের কথা ভাবলে মনে বড় কষ্ট হয়। জনগণের নেত্রী এবং রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে একটি স্বাভাবিক সম্পর্কও ধরে রাখতে পারেননি তাঁরা।

সম্পর্কের দারুণ অবনতি ঘটেছে। বোধকরি বৈরী সম্পর্ক বললেও ভুল হবে না। কিন্তু দেশের মানুষতো দেখতে চায় না তাঁদের মধ্যকার এই বৈরী সম্পর্ক। যতদূর সম্ভব তাঁদের পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে এনে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন এবং রাজনৈতিক কারণে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি সমঝোতা হওয়া দরকার। আর এই সমঝোতা সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই হতে পারে। কিন্তু সমঝোতার দরজাতো বন্ধ! যদিও সমঝোতার দরজা খোলা রাখাটা উত্তম এই গণতান্ত্রিক দেশে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তা বন্ধ করে রেখেছে।  


গণতান্ত্রিক দেশে থাকবে বিরোধী দল, বিরোধী মত। থাকবে পরমতসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার। সমালোচনার সুযোগ থাকবে, তবে সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক। আমাদের দেশে বিরোধী দল আছে, বিরোধী মত আছে কিন্তু অভাব রয়েছে পরমতসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের। আবার সমালোচনাও গঠনমূলক না হয়ে অশালীন ভাষায় আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে কখনো কখনো। এমনকি আমাদের মাননীয় সাংসদরাও মাঝে মধ্যে সংসদীয় ভাষা হারিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে অশালীন ভাষায় সমালোচনার তীর নিক্ষেপ করেন।

 সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন আমাদের সংসদ সদস্যদের অনেকেই। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাজেটে ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক, ১৫% ভ্যাট বাড়ানোসহ সঞ্চয়পত্রে সুদ কমানোর প্রস্তাবের বিরোধীতায় সরব হয়ে আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের দিকে অশালীন ভাষায় সমালোচনার তীর নিক্ষেপ করলে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ স্থির থাকতে পারেননি। তিনি অর্থমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে বলেই দিলেন: ‘অশালীন ভাষায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সমালোচনা অনাকাক্সিক্ষত। সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক।’


প্রসঙ্গত স্মরণ করছি মাননীয় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওয়াবদুল কাদেরকে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি বেশ কিছু কথা বলেছেন। বিভিন্ন কথার মধ্যে তিনি বিএনপির সমালোচনাও করেছেন। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এক পর্যায়ে বলেছেন: বিএনপির মুখে গণতন্ত্রের বুলি ‘ভূতের মুখে রাম নাম’।

এই উক্তির দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন-বিএনপির মুখে গণতন্ত্র মানায় না। আবার বলেছেন- ‘বিএনপিই সমঝোতার দরজা বন্ধ করেছে।’ এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী মহোদয়কে সবিনয়ে বলব: ধরে নিলাম, সমঝোতার দরজা বিএনপি বন্ধ করেছে- আপনারা এখন দরজাটা খুলে দিন। গণতন্ত্রে তো সংকীর্ণতার স্থান নেই- আছে উদারতা। গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে সমঝোতার দরজা খুলে দেওয়াটাই ভালো।

 গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন আর পরিবেশ সৃষ্টি হলে তা বজায় রাখতে হবে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে সন্ত্রাস জন্ম নেবে, সহিংস ঘটনা ঘটে যাবে এরূপ ভাবার কোনো যুক্তি নেই। যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় এবং সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে থাকে তাদের সংখ্যা খুব কম। তাদের অপরাধকর্মের জন্য নিরীহ মানুষ এবং কোনো দল বা গোষ্ঠীকে দায়ী করা সমীচীন নয়। অপরাধ সব সময়ই অপরাধ।

অপরাধীর ক্ষেত্রে কোনো দল- মত নেই। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে কোনো অপরাধের বিচার কাম্য। তবে কাউকে অমূলক হয়রানি করা নয়, অসৎ উদ্দেশ্যে কাউকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দায়ের করা নয়- কেবল কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।


 দেশে শুধু আইন থাকলেই চলবে না, আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। আইন আপন গতিতে চলবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এক গৌরবময় বিজয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। এর মধ্যে আমরা সুদীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছি। এ কথা সত্য, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে, কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়ে গেছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী দেশে অনেক নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে। বিজ্ঞান-চিকিৎসা বিজ্ঞান- তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে; আবার আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিঃসন্দেহে আমরা  এগিয়ে গেছি। আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারতাম কিন্তু পারিনি।


 এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিক আচরণ-কর্মকান্ড, অস্থিতিশীল পরিবেশ এবং স্বদেশপ্রেমবর্জিত নোংরা প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি ও সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে। এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে তথা স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ পেতে হলে নৈতিক অবক্ষয় ও দুর্নীতি রোধ করা জরুরি। এ ব্যাপারে আমাদের গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ সঙ্গে থাকবে আইনের কঠোর প্রয়োগ।

অগণতান্ত্রিক আচরণ-কর্মকান্ড ও নোংরা প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি পরিহারপূর্বক গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও আদর্শ অনুরসণ করে গঠনমূলক রাজনীতির পথে চলতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে আনা, দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের গণতান্ত্রিক উপায় হচ্ছে আলাপ-আলোচনা। সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই হতে পারে সমঝোতা যা শান্তিকামী দেশবাসীর প্রত্যাশা। তাই সমঝোতার দরজা বন্ধ না রেখে খোলা রাখাটা ভালো। সমঝোতার দরজা খোলা থাকুক।    
লেখক : অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত)
০১৭১৮-৭৪৭৪৪১

এই বিভাগের আরো খবর

এক দুঃখীনি মায়ের আর্তনাদ

আব্দুল হাই রঞ্জু :মা সুলেমা খাতুন। সিদ্দিকুরের বয়স যখন ৩ বছর, তখন স্বামী মারা যান। বাড়ী ময়মনসিংহের তারাকান্দা গ্রামের এক নিভৃত পল্লীতে। স্বামী হারিয়ে ছোট ছেলে সিদ্দিকুর ও বড় ছেলে নায়েব আলীকে নিয়ে ভাসতে থাকেন অথৈ-সাগরে। দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সুলেমা খাতুনকে নির্বিকার করে তোলে। উপায়হীন মা শেষ অবধি লেখাপড়ার খরচ যোগাতে রড মিস্ত্রীর কাজ শুরু করেন। মা সুলেমা ও বড় ভাই নায়েব আলীর স্বপ্ন ছিল, মেধাবী সিদ্দিকুর লেখাপড়া শেষ করে সরকারি কোন চাকরি নিয়ে দু:খীনি মায়ের দু:খ ঘোচাবেন। সিদ্দিকুর অনেক পথ পাড়ি দিয়ে মা ও ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণের দাঁড় প্রান্তে যখন উপনীত, তখন এক খন্ড কালো মেঘ তাদের স্বপ্নের পথে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে লেখাপড়া করা সিদ্দিকুর তিতুমীর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন সিদ্দিকুর।

ময়মনসিংহে যখন তিনি লেখাপড়া করেন, তখন তিন বেলা খাওয়ানোর বিনিময়ে এক বাসায় ছাত্র পড়াতেন। পাশাপাশি অন্য কয়েকটি টিউশন করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি নিজে প্রাইভেট পড়তেন। কি নিদারুন এক জীবন যুদ্ধ। যেন পাশ করার পর বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফল হতে পারেন। তানা হলে দু:খীনি মায়ের মুখে হাঁসি ফুটাবেন কি করে? সবই স্বপ্ন। সব স্বপ্নই কি মানুষের পুরন হয়? হয়ত হয় না। কিন্তু এওতো সত্য, মানুষের কোন প্রচেষ্টা বৃথা যায় না।

দেশের খ্যাতনামা চক্ষু চিকিৎসকগণ অনেকটাই নিশ্চিত হয়েই বলেছেন, হয়ত সিদ্দিকুরের ২ চোখের মধ্যে একটির আলো নিভে যাবে। অন্যটি দিয়ে তিনি কিছু দেখতে পারলেও উন্নত চিকিৎসা না হলে সিদ্দিকুর চির জীবনের জন্য হয়ত অন্ধ হয়ে যাবেন। যে রোগীর হাসপাতালের দরজায় সাহায্যের জন্য ব্যাংক একাউন্ট নম্বর সাটিয়ে দেয়া হয়েছে, একমাত্র সহপাঠীদের সংগৃহীত অর্থে যার চিকিৎসা চলে, সে কিভাবে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন? অকস্মাৎ ঘোর কালো কেটে সূর্যের আলোর ঝলক বেরিয়ে এলো।

পুলিশের এ নির্মমতায় বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য সিদ্দিকুরকে বিদেশে নেয়া হবে। যেমনি কথা তেমনি কাজ। এ যেন হতভাগ্যের কপালে আশির্বাদের তিলক। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিদ্দিকুরকে নেয়া হয়েছে ভারতের চিন্নাইতে। কপাল খারাপ সিদ্দিকুরের চোখের জ্যোতি আর ফিরে আসবে না। সে আর দশ জন ভাল মানুষের মত সুন্দর এই পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে পাবেন না। তবে, এটুকুই সান্ত¡না, সরকার প্রধান সিদ্দিকুরকে সারিয়ে তুলতে সরকারি ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। এটাই বা কম কিসে? ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, সিদ্দিকুরকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে।


কিন্তু কথা হলো, দল মত নির্বিশেষে শুধুমাত্র পরীক্ষার রুটিনের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা শাহাবাগে মিলিত হয়ে সরকারের নজরে বিষয়টি আনতে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে দাবী দাওয়া উপস্থাপন করেছে মাত্র। তারা তো কোন গাড়ী ভাংচুর করা কিম্বা অগ্নিসংযোগ করেনি। তাহলে আলোচনার পথে সংকট নিরসনের বদলে পুলিশ কেন অতি উৎসাহিত হয়ে খুব কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ার সেল ছুঁড়লেন? মাঝে মধ্যেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অতি উৎসাহিত হয়ে অযাচিত এবং অনাকাঙ্খিতভাবে এমন কিছু ঘটনা ঘটায়, যা সরকারের তরফেও মেনে নেয়া কঠিন হয়। অতি সম্প্রতি, বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে আমন্ত্রণ পত্র ছাপানোর দায়ে বরগুনার ইউএনও গাজী সালমান তায়েফের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনৈক আওয়ামী লীগ এক নেতা মামলা করায় পুলিশ ইউএনওকে গ্রেফতার করে। এমনকি তাঁকে হাত কড়া পরিয়ে থানা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অথচ অনেক সময় কত দাগি আসামী কিংবা দূর্ধর্ষ কোন সন্ত্রাসীকে হাত কড়া পরানো হয় না।

 যে কারণে অনেক সময়ই হাত কড়া না পরার কারণে অভিযুক্ত আসামী পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে যায়। সেখানে একজন ইউএনওকে কেন এবং কোন আশঙ্কায় হাত কড়া পর্যন্ত পরানো হল, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে পুলিশের এহেন আচরণে খোদ প্রধানমন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং তিনি এও মন্ত্রব্য করেছেন, বঙ্গবন্ধুর যে ছবি আঁকা হয়েছে, তাতো বিকৃত নয়ই, বরং পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্য। যদিও শেষ পর্যন্ত ইউএনওর বিরুদ্ধে আনিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। যথারীতি তিনি তাঁর দায়িত্বে ফিরিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রকৃত অপরাধি কিম্বা অতি বাড়াবাড়ির জন্য হয়ত শেষ পর্যন্ত কারো কোন সাজা হবে না, বদলি কিংবা তিরষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ করা হবে।

অতিসম্প্রতি মানবাধিকার কর্মী নুর খান ডয়চে ভেলের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘এক দশক ধরে দেশে গুম ও নিখোঁজের অভিযোগ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এমনটি চলতে থাকলে অপরাধীরাই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে গিলে খাবে।’ তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন, গুম, নিখোঁজের মত বিষয়টি উদঘাটন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি কোন কারণে তা উদঘাটনে ব্যর্থ হয়, তাহলে স্বভাবতই দায় চাপে সরকারের ওপর। এক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে গুম, নিখোঁজ, অপহরণের মত ঘটনাগুলো যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা। কারণ জনগণের জানমালের পূর্ণ গ্যারান্টি দেয়ার শপথ নিয়েই সরকার দেশ শাসন করে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যত্যয় ঘটলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক।

দেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু একটি জাতিকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে আশানুরূপ বরাদ্দ এখনও শিক্ষা খাতে রাখা হয় না। আবার শিক্ষা জীবন শেষে কর্মসংস্থানের মত বিষয়টি এখনও মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত রয়েই গেছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার চেয়ে হাতে কলমে কারিগরি শিক্ষার দিকেই আমাদের বেশি করে নজর দেয়া জরুরি। সরকারও বলছে, কারিগরি শিক্ষার প্রসার ব্যতিত শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের তেমন কোন সুযোগ সৃষ্টি হবে না। কিন্তু এখনও সরকারের প্রতিটি বিভাগে কর্মকর্তার অভাবে ভারপ্রাপ্ত কিম্বা একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব একজনকে দিয়ে চালানো হচ্ছে। কিন্তু কেন? সরকার কেন এসব দপ্তরের জনবল সংকট মোকাবেলায় নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত না করে বরং বন্ধ রেখেছে।

 কথা হলো, যদি একজনকে দিয়ে দায়সারা গোছের একাধিক দপ্তর চালানো সম্ভব হয়, তাহলে নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন কি? কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যেহেতু আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে, সেখানে সরকারের প্রতিটি বিভাগে নিয়োগের ব্যবস্থা করলে কিছুটা হলেও বেকারের সংখ্যা কমে আসবে, যা নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে স্বপ্ন বুনছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। মাকে সান্ত¡না দিয়েছিলেন, মা তুমি দু’টি বছর অপেক্ষা করো, আমি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি একটি চাকরি করবো। তাহলে আর তোমাকে কৃষাণির কাজ করতে হবে না।

এ ধরনের হাজারও সিদ্দিকুর বাবা মাকে সান্ত¡না দিয়ে পড়াশুনার পাঠ  চুকিয়ে বছরের পর বছর ধরে ঠাঁই বসে আছে। হয়ত পুলিশের টিয়ার সেলের কারণে সিদ্দিকুরের এ পরিণতি না হলে মাকে দেওয়া সান্ত¡নার এ কথা সকলের জানার বাইরেই থেকে যেত। আমরা চাই, আর সান্ত¡নার আশ্বাস যেন কোন বাবা-মা, ভাই-বোনদেরকে স্বপ্নের ঘোরে থাকতে না হয়। বরং নিয়োগের ব্যবস্থাকরণ, সরকারি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করুন, তাহলে স্বপ্নের বদলে শিক্ষিত বেকাররা বাবা-মা বেঁচে থাকতে দু’বেলা খাবার নিশ্চয়তাটুকু নিশ্চিত করতে পারেন। এর উপর আবার সরকারের কোন কোন মন্ত্রণালয় মাঝে মধ্যে এমন কিছু অপরিণামদর্শী  সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, যার কারণে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়।


যদিও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিচক্ষণ মন্ত্রীদের একজন। যিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর, প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, কারিগরি শিক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজটের দোহাই দিয়ে সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা না নেয়ায় শিক্ষার্থীরা রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবীতে রাজপথে নেমে আসেন। অথচ আমরা দেখে আসছি, শিক্ষার্ক্ষীরা পরীক্ষা পেছানোর দাবীতে অনেক সময় বিক্ষোভ করেছেন। এবারই প্রথম ব্যতিক্রম, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার দাবিতে ব্যানার হাতে শাহবাগে বিক্ষোভ করেছেন। আমাদের দেশে তো বিক্ষোভ, ধর্মঘট না হলে অনেক সময়ই দাবী আদায় হয় না। ফলে কোন সমস্যার সৃষ্টি হলে সবাই রাজপথকেই আগে বেছে নেয়।

 কিন্তু কেন এবং কোন যুক্তিতে সরকারি ৭টি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হলো, যার উপযুক্ত কারণ হয়ত শিক্ষা মন্ত্রীই ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে আমরা যতটুকু বুঝি, সমস্যা নিরসনের জন্য মূলত সরকার ভাল কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তা বাস্তবায়নের পথেই অগ্রসর হয়। এক্ষেত্রে কিন্তু তার ব্যতিক্রম হয়েছে। সেশনজট খুলতে পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবে সেশনজট সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় শুরু হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দাবী মেনে নেয়া হয়েছে। মাঝপথ থেকে সিদ্দিকুরের মত একজন মেধাবী ছাত্রের ভবিষ্যত জীবন অন্ধকারেই থেকে গেল। হয়ত অন্য কোন সমস্যার উদ্ভব হলে তা নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠবেন। কিন্তু সিদ্দিকুরের চোখের জ্যোতি ফিরে না আসার কারণে হয়ত আর কোন দিন আন্দোলন হবে না, এটাই বাস্তবতা।

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিবেক বিবেচনা নিয়ে ধৈর্য্যের সাথে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়া উচিৎ। তানা হলে অনাকাংখিত ঘটনার জন্ম হবে এবং আইন শৃংখলা বাহিনীকে ভাবমূর্তি সংকটেও পড়তে হবে। যা কারো কাছেই কাম্য নয়। হয়ত একটু ধৈর্য্য ধরে কিম্বা অতি কাছ থেকে টিয়ার শেল ছোঁড়া না হলে দু:খীনি মায়ের শেষ অবলম্বন স্বপ্নপূরণের প্রতিক সিদ্দিকুরের এ পরিণতি হত না।
  লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

 

এই বিভাগের আরো খবর

হিজরির একাদশ মাস জিলক্বদ

অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ :ইসলামী ক্যালেন্ডারের একাদশ মাস জিলক্বদ। যুলকা আদা বা যিলকা আদা আরবি শব্দ অর্থ বসিয়া থাকিবার মাস। আরবরা উক্ত মাসে যুদ্ধ ও সফর স্থগিত রেখে বাড়িতে বসে থাকতো বলে উক্ত মাসকে উক্ত নামে অভিহিত করা হয়েছে। জাহিলী যুগেও আরবরা বছরের চারটি মাসকে যুদ্ধ-বিগ্রহ অবৈধ মনে করতো। তাদের নিকট ৪টি মাস পবিত্রমনে হতো।

জিলকাদ, জিলহজ্জ ও মুহাররম- এই তিন মাস হজের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হাজীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে এবং উমরা পালনের সুযোগ করে দেয়ার লক্ষ্যে রজব মাসকে হারাম মাস বলে পবিত্র কুরআনের সুরা তাওবার ৩৬নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও এ চার মাস যুদ্ধ-বিগ্রহ অবৈধ মনে করা হতো।

 পরবর্তীতে উক্ত বিধান রহিত হয়েছে বলে অধিকাংশ তাফসীরকারকগণ উল্লেখ করেছেন। অবশ্য অন্য দল উক্ত হুকুম এখনো বলবৎ আছে বলে মনে করেন। এ মাসের ২টি সাধারণ মর্যাদা রয়েছে: প্রথমত, এ মাস ৪টি হারাম মাসের একটি দ্বিতীয়ত ঃ এ মাস হজ্বের মাসগুলির দ্বিতীয় মাস। এ মাসের বিশেষ কোনো ফযিলত কিংবা কোনো নফল সালাত-সিয়াম পালনের বিশুদ্ধ কোন হাদীস উল্লেখ নেই বলে মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেছেন।

বিভিন্ন বই পুস্তকে এ মাসের ফযিলত বা ইবাদত সম্পর্কে যেগুলি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলি দুর্বল বা অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। তবে অন্যান্য মাসের মত নফল সিয়াম-সালাত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, দুআ-দরূদ যিকর আসকার যত বেশী পারা যায় করা ভাল। রাসুলুল্লাহ (সা) এ মাসে ৩টি অথবা ৪টি উমরা পালন করেছেন। পবিত্র হজ্ব ফরজ হওয়ার আগে হজ্ব এবং উমরা উভয়টি নফল ছিল।

 নবম হিজরীতে হজ্বের বিধান সম্পর্কিত আয়াত নাজিল হলে হজ্ব ফরজ হলো এবং উমরা আগের মতই নফল থেকে গেল। (তাফসীরে আহমাদী)। সুরা বাকারার ১৯৬নং আয়াতের ব্যাখ্যায় উমরার বিধান সম্পর্কে ইসলামি আইনবিদগণ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। যেহেতু ওই আয়াতে হজ্ব এবং উমরার বিধান এক সাথে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

বলা হয়েছে তোমরা হজ্ব এবং উমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে পালন কর বা পূর্ণ কর। এ আয়াতে হজ্ব এবং উমরা একই পর্যায়ে রেখে বর্ণনা করায় ইমাম মালিক ও ইমাম শাফিঈ (রঃ)। উমরাকে হজ্বের মত ফরজ বলেছেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) উমরাকে সুন্নাত বলেছেন। তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনে উমরা শুরু করার পর তা পূর্ণ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। কেউ উমরা শুরু করলে তা পূর্ণ করা ফরজ। তার মতের সপক্ষে তিরমিজী শরীফের একটি হাদিস রয়েছে। হাদীসটি বিশুদ্ধ।

 হযরত জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ (সা) কে প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! উমরা কি ফরজ? জবাবে তিনি বললেন, না। তবে উমরা করা উত্তম। উমরা পালন তার মতে সুন্নত। এ সুন্নাত হজ্বের মাসে কিংবা অন্য সময়ে পালন করা যায়। রমজান মাসে উমরা পালন মুস্তাহাব। এতে হজ্বের সমান পূণ্য বা সাওয়াব পাওয়া যায়। অন্য হাদীসে আছে রমজানের উমরা নবীর সাথে হজ্ব করার সমান। যাই হোক হুজুর (সা) জীবনে ৪ বার উমরা করেছেন।

এক বর্ণনায় সবগুলো উমরা জিলকাদ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা আছে। প্রথম উমরা ষষ্ঠ হিজরীর জিলক্বদ মাসে হুদায়বিয়ার উমরা অনুষ্ঠিত হয়। ইহাই বিশুদ্ধ মত। আরব জাহানের পরিস্থিতি প্রায় মুসলমানদের অনুকূলে, ইসলামি দাওয়াতের সাফল্য ও বিজয়ের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছিলো ঠিক এমন সময়ে নবীজি স্বপ্ন দেখলেন তিনি এবং সাহাবায়ে কেরাম মক্কার মাসজিদে হারামে প্রবেশ করছেন।

 কাবা ঘরের চাবি নিয়েছেন, কাবা ঘর তাওয়াফ করছেন। সাহাবীগণ মাথার চুল কাটছেন। তিনি এ স্বপ্নের কথা প্রকাশ করলেন। সাহাবারা শুনে খুব খুশি হলেন। কারণ দীর্ঘ ছয় বছর হলো মক্কার কাবা ঘর দেখার সুযোগ হয়নি। এর জন্য সাহাবাদের অন্তর কাঁদতো। অনেক সময় মদিনার পাহাড়ে ওঠে মক্কার দিকে তাকিয়ে কবিতা পাঠ করতেন। কবিতাটির অর্থ হলোঃ ‘‘হায়! সেদিন কি আর কখনও ফিরে আসবে যে, আমি মক্কা উপত্যকায় ইযখার এবং জলীল ঘাসের উপর মাত্র এক রাত যাপন করতে পারবো? কারণ অধিকাংশ মুহাজির সাহাবী মক্কা শরীফ হতে একা একা প্রাণ বাঁচিয়ে মদিনায় চলে এসেছেন। তাদের বংশধর এবং সন্তান সন্ততিগণ মক্কায় রয়ে গেছে। এ জন্য তারা মক্কার জন্য কাঁদতেন।


নবীজির স্বপ্নের কথা শুনে তারা আশা করছিলেন যে, এবার মক্কায় যাওয়া সম্ভব হবে। অবশেষে ১৩০০ বা ১৪০০ কিংবা ১৫০০ শত সাহাবীদেক নিয়ে ১লা জিলকাদ (ষষ্ঠ হিজরী) মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) কে (মতান্তরে নোমায়লা লাইসী (রা) মদীনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। ১৪০০ সাহাবী, ৭০টি কুরবানীর উট নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কার সন্নিকটে এক মঞ্জিল দূরে হুদাইবিয়ায় অবস্থান করেন। মক্কার কাফেরদের বাধায় এ বছর কাবা ঘর তাওয়াফ ছাড়াই উমরার কার্যাদি হুদাইবিয়ায় সুসম্পন্ন করা হয়। এটাই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা) এর প্রথম উমরা।

দ্বিতীয় উমরা ছিল ৭ম হিজরীর জিলকদ মাসে। ওই সময় গত বছরের কাযা উমরা আদায়ের নির্দেশ দেওয়ায় মহিলা ও শিশু ছাড়া প্রায় ২০০০ (দুই হাজার) সাহাবীদেক সাথে নিয়ে ষাটটি উট সহ মদীনা হতে রওয়ানা দেন। নবীর অনুপস্থিতিতে আবু রোহম গেফারীকে (মতান্তরে উয়ায়ফ ইবনুল আযবাত) মদীনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সামান্য অস্ত্র-শস্ত্র সঙ্গে নেয়া হলো। কারণ কোরাইশদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশংকা ছিল। মক্কার নিকটে ইয়াজেজ প্রান্তরে সকল অস্ত্র আওস ইবনে খাওলা আনসারীর হেফাজতে রেখে মুসলমানগণ সামনে অগ্রসর হন।

 মক্কার লোকজন এ দৃশ্য দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে কাবা শরীফের উত্তরকোণে অবস্থিত কাইকায়ান পাহাড়ে উঠে তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যে, মুসলমানরা ইয়াসরিবের অর্থাৎ মদীনার জ্বরে কাবু হয়ে গেছে। এ কথা শুনে নবী (সা) প্রথম তিন চক্করে বীরত্বের সাথে হেলে দৃুলে (রমল করার) তাওয়াফ করতে বললেন। কিছু কিছু লোক তারা হিংসা ও ক্রোধবশত এ দৃশ্য দেখা কষ্টকর মনে করে শহরের বাইরে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো। মুসলমানগণ যখন তাওয়াফ করছেন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহা (রাঃ) তখন তলোয়ার উঁচু করে ধরে নবী (সা) এর সামনে সামনে যাচ্ছিলেন আর রণসঙ্গীত আবৃত্তি করছিলেন। যার অর্থ হচ্ছে –
 
‘কাফেরের সন্তানরা ছেড়ে দাও তাঁর পথ তাঁকে ঘিরে রেখেছে আল্লাহর রহমত। অবতরণে তার বাধা এলে আজ হানিব জোর করি বন্ধুর খবর থাকবে না উড়ে যাবে মাথার খুলি।’ তার কবিতা শুনে উমর (রা) বললেন হারাম শরীফে কবিতা আবৃত্তি করছো? নবী (সা) বললেন উমর তাকে আবৃত্তি করতে দাও। কোরাইশদের মধ্যে এর প্রভাব তীরের চেয়েও কার্যকর। তিন দিন মক্কায় অবস্থান করে উমরার যাবতীয় কার্যাদি পালন করেন। এটা ছিল দ্বিতীয় উমরা। তৃতীয়া উমরা ছিল মক্কা বিজয়ের পরের উমরা। অষ্টম হিজরী ১০ই রমজান। ১০ হাজার সাহাবীদেক সাথে নিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা দেন।

 মদিনার দায়িত্ব অর্পণ করেন আবু রাহম গেফারী (রা) এর উপর। মক্কা বিজয়ের পর হোনায়নের যুদ্ধে যাওয়ার সময় আত্তাব ইবনে আছিদকে মক্কার অস্থায়ী গভর্নর নিযুক্ত করেন। হোনায়নের যুদ্ধের ৬ হাজার যুদ্ধ বন্দী, ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজারেরও বেশি বকরী, ৪ হাজার চাঁদি, ১ লাক ৬ হাজার দেরহাম, মক্কার পূর্বে তায়েফের দিকে জেয়ের রানায় গণিমতের মালামাল বন্টন করে সেখান থেকে এহরাম বেঁধে উমরা আদায় করেন। এরপর আত্তাব ইবনে আছিদকে পুনরায় মক্কার গভর্নর নিযুক্ত করে ৮ম হিজরীর ২৪ জিলকাদ তারিখে মক্কা হতে মদিনার পথে যাত্রা শুরু করেন। এ উমরা ছিল তৃতীয় উমরা।

রাসুলুল্লাহ (সা) এর চতুর্থ উমরা ছিল বিদায় হজ্বের উমরা। দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ পূর্ণ হয়েছে। আল্লাহর রববিয়াত প্রতিষ্ঠা সহ একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছে। এরপর যেন অদৃশ্য ঘোষক জানিয়েছিল যে, পৃথিবীতে তার অবস্থানে মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। জীবনের শেষ মুহূর্তে পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে দশম হিজরীর জিলকাদ মাসের শেষ শনিবার ভক্তদের নিয়ে জোহরের আগেই মদিনা হতে রওনা দেন। বিদায় হজ্বের কয়েকদিন পূর্বের উমরা ছিল নবীজির ৪র্থ উমরা বা শেষ উমরা। উমরার বিনিময়ে গুনাহ মাফ হয়, অভাব দূর হয়, সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়। জিলকাদ মাস নবীজির উমরার মাস। তাই এ মাসের গুরুত্ব কম নয়।
লেখক ঃ খতীব, উপশহর জামে মসজিদ
বগুড়া
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

উচ্চ শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন

মোহাম্মদ নজাবত আলী:পৃথিবীতে যত প্রাণীকূল রয়েছে তার মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেকবান অনুভূতিশীল। তাই মানুষের বিবেক বোধকে জাগ্রত করা মনোবিকাশের পথ উন্মুক্ত করে শিক্ষা। শিক্ষায় মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানুষ হতে শেখায়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে চিনতে পারে বুঝতে পারে। সর্বোপরী শিক্ষায় মানুষকে মহৎ করে উন্নত করে এবং কর্ম ও সৃজনশীলতায় নিজেকে তৈরি করে আত্ম কর্মসংস্থানের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।


পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যে ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে তাতে শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষকে মানবিক করার পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠি তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুসারে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চাকুরিতে নিয়োজিত থেকে দেশ জাতির সেবা করার সুযোগ পায়। তাই সে সব রাষ্ট্রগুলোতে যুগের চাহিদা অনুযায়ী এক ধরনের পরীক্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকার ফলে বেকারত্ব কম।

আমাদের দেশে স্বাধীনতার ৪৬ বছরে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে দেশে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে চলেছে কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, গবেষণাধর্মী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। তবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে। যা হোক স্কুল, কলেজ মাদ্রাসা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর যে হারে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না।

 ফলে আমাদের দেশে বেকার সমস্যার কার্যকর কোনো সমাধানও হচ্ছে না। এর মূল কারণ বর্তমান আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কোটা পদ্ধতি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা না পারছে একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক করে তুলতে না পারছে বেকারত্বের অবসান ঘটাতে। প্রতিবছর হাজার হাজার বেকারের জন্ম দিচ্ছে বেকারদের বোবা কান্না তাদের দুঃখ কষ্ট আমাদের মতো অনেক অভিভাবকদের অবশ্যই ব্যথিত করে। অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলো এর সুফল কতটা ভোগ করতে পারছে বা ক’জনই বা পারছে।

যদিও বা শিক্ষার প্রকৃত অর্থ চাকরি নয় কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে শিক্ষার অর্থ আত্ম কর্মসংস্থানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। নীতি নৈতিকতা প্রকৃত শিক্ষার অর্থ এই নয় যে, বেকারত্ব থাকা। বেকার জীবন মানেই অভিশপ্ত জীবন তবুও শ্রম বাজার ও চাকরি বাজারে যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে যা সব পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
 
একটা দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা, মানুষের জীবন যাত্রার মানের ওপর নির্ভর করে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দারিদ্র পীড়িত দেশ। তবে দরিদ্রের হার অনেক কমলেও কাঙ্খিত পর্যায়ে এখনো পৌঁছেনি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, বাড়ছে পাশের হার প্রায় শতভাগ বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বলা যেতে পারে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অর্জন একেবারে কম নয় বরং চোখে পড়ার মতো। শিক্ষা ক্ষেত্রে এ অর্জন বলতে বোঝাতে চাচ্ছি পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হার। নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, জীবন যাত্রার মানও উন্নয়ন ঘটেছে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের পথে এক কথায় বলা যেতে পারে দেশ ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 কিন্তু একটি রাষ্ট্রের মূল কারিগর হচ্ছে দক্ষ মানব সম্পদ। জনসংখ্যা একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক নয়, যদি বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠিকে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করা যায়। কেন না শিক্ষা ছাড়া কোনো দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে যেতে পারে না। আর শিক্ষা ছাড়া কখনই দক্ষ জনগোষ্ঠি তৈরি হতে পারে না। এ জন্য উন্নত রাষ্ট্রগুলো কোন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতি সে রাষ্ট্রকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছিতে বেকারত্বের অবসান ঘটিয়ে আত্মকর্মসংস্থান ও আত্ম নির্ভরশীলতা অর্জনে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে সে ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কারিগরি কর্মমূখী শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। একটি গণমুখি উন্নত মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা বেকারত্বের অবসান ঘটিয়ে দেশকে দ্রুত টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায়। উপরোন্ত আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তাই প্রকৃতপক্ষে জনকল্যাণমুখী বেকারত্ব দূরীকরণ প্রকৃত মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবী।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে তাদের অধিকাংশ অভিভাবকই চান তাদের সন্তানরা শিক্ষাজীবন অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে অবশ্যই একটি ভালো সরকারি চাকরি পাবে এবং বাকি জীবন সুখে শান্তিতে কাটাবে। এ ধরনের প্রত্যাশা অভিভাবকের রয়েছে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা না পারছে বেকারত্বের অবসান ঘটাতে না পারছে মানবিক করে তুলতে।

অথচ পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে তরুণরাই রাষ্ট্রকে উন্নত সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে। আমাদের দেশটাও তারুণ্য নির্ভর। কিন্তু বেকারত্ব দূরীকরণে যুব তরুণ সমাজকে কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বেকারত্ব।

 বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ বেকার। শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত বেকার যুবকদের অভিভাবকদের আয়ের ওপর চলতে হয়। প্রতিবছর আমাদের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২ কোটি। তবে অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জরিপে ২৬ লাখ বেকারের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যা হোক দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে ও তা সমাজে নানা অস্থিরতার সৃষ্টি করছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য থাকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করার মতো একটি সরকারি চাকরি।

 কিন্তু সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রতি বছর বেকার থেকে যাচ্ছে। তাদের সরকারি চাকরির বয়সও শেষ হয়। কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান হয় না। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া শিক্ষিত জনগোষ্ঠির বড় স্বপ্ন, প্রধান আকর্ষণ, সরকারি চাকরি। তবে এর বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। সরকার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর স্বচ্ছতা ও মেধাবীদের নিয়োগ দেয়ার লক্ষ্যে যে, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকাররা নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে আবার ১২তম নিবন্ধন পরীক্ষায়

সরকার মেধা তালিকা প্রকাশ করেন। এ ধারায় প্রথম নিয়োগ দেয়া হয় শূন্যপদের বিপরীতে অনেক কম। কিন্তু যারা এখনও নিয়োগপ্রাপ্ত হননি অথচ মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে অথবা নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের কি হবে ? ইতোমধ্যে যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে সেখানে নাকি ষোল আনা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়নি এমন অভিযোগও উঠেছে। তাই নিয়োগ বঞ্চিত নিবন্ধন সার্টিফিকেট ধারীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ মানববন্ধন করেছে।


কথায় আছে অলস মস্তিষ্কে শয়তানের বাস। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিচ্ছে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের একটি বড় অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি বেকার থাকতে চায় না। শিক্ষিত তরুণদের বড় আকর্ষণ একটি ভালো সরকারি চাকরি। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই তাদের সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে না।

ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা লক্ষ্য করা যায় এবং তারা এ কারণেই বিপথগামীও হচ্ছে। আর এ সুযোগটি গ্রহণ করছে সমাজের অপশক্তি। তারা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ছে। দেশে প্রায় ২কোটি শিক্ষিত বেকার। বেকারত্বের এ পরিসংখ্যান কতটা ভয়াবহ তা সহজে অনুমেয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।

 শিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় আড়াই লক্ষ পদ শূন্য রয়েছে। এ শূন্যপদগুলোতে যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ দিলে সমান সংখ্যক শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। শূন্য পদ পূরণে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে বলে মনে হয় না। সরকারি চাকরি পদ শূন্য হয়ে আছে বছরের পর বছর।

সরকারি পদ শূন্য হওয়ার সাথে উক্ত পদে যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষিত বেকারদের নিয়োগ দিয়ে বেকারের সংখ্যা হ্রাস পাবে। প্রতিবছর যেভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে সেভাবে নিয়োগ দেয়া কিন্তু হচ্ছে না। অথচ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে শূন্য পদ রয়েছে। এ শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণ করতে না পারলে বেকারের সংখ্যা আরও ভয়াবহভাবে বেড়ে যাবে এবং সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। আর সরকারি চাকুরীতে কোটা থাকায় প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে।  


বর্তমান দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থেকে শুরু করে সরকারি চাকুরীর একটি অংশ দখল করে আছে কোঠা পদ্ধতি। সরকারি চাকরি বিসিএস, প্রাইমারি স্কুলে চাকরির ক্ষেত্রে সবখানে কোঠা পদ্ধতি জালের মতো বিস্তার করে আছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোঠার কারণে প্রকৃত মেধাবীরা ঝরে পড়ছে। মেধাবীরা পরীক্ষায় ভালো করেও কোঠার কারণে তাদের চাকরি হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রের প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিতে অপেক্ষতম কম মেধা সম্পন্নরা সুযোগ পাচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে লাখ লাখ বেকার যুবকরা। কোঠা পদ্ধতির অপব্যবহারের ফলে প্রতিবছর বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। চাকরির ক্ষেত্রে কোঠার কারণে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে।

২৫৭ ধরনের কোটা বাংলাদেশে রয়েছে। অথচ মেধা যোগ্যতা থাকা সত্বেও মেধাবীদের ঝরে পড়তে হয়। কোঠার কারণে মেধাবীদের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘের ছায়া জমাট বেধেছে। আর শিক্ষিত বেকাররা হতাশায় ভুগছে। সরকারি চাকরির ১ম ও ২য় শ্রেণির ৫৬ শতাংশ কোঠাধারীদের দখলে। অন্যদিকে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৭০ শতাংশ নিয়োগ দেয়া হয় কোটা থেকে। বাকি ৩০ শতাংশ মেধা তালিকা থেকে। তাছাড়া বিসিএসএ মেধাবীর চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি নিয়োগ দেয়া হয় কোঠা থেকে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে প্রকৃত মেধাবীদের মূল্যায়নের দাবিতে বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার আন্দোলনও হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা মেধার বিকাশ মেধাবী জনগোষ্ঠির সৃষ্টি বেকারত্বের অবসানে বড় অন্তরায়।

 উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যে কোঠা পদ্ধতি রয়েছে তার সাথে আমাদের দেশে অনেক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে কোঠার ব্যবহার প্রবল আকারে। যুক্তরাষ্ট্রে কোঠাধারীদের আগেই একটি নম্বর দেয়া হয় এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই তাকে উত্তীর্ণ হতে হয়। ভারতে কোটার সুযোগ পাবে জীবনে একবার, ২য় বার নয়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটার ব্যবহার বেশি বলে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন বেকারত্ব কমছে না। তাই কোটা পদ্ধতি সংশোধন করে সহনীয় পর্যায়ে আনা যায় কি না তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভাববেন কী ?

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পাশের হার প্রায় শতভাগ হলেও আত্ম কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব দূরীকরণের কোনো সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা নেই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুভা গল্পে বাক প্রতিবন্ধী সুভাকে তার মা গর্ভের কলঙ্ক বলেছেন। বেকাররা কী শিক্ষার কলঙ্ক ! কথাটাকি একটু বাড়িয়ে বলা হলো? কিন্তু বেকারদের যে কত কষ্ট, দুঃখ যন্ত্রণা তা ভুক্তভোগীরাই জানে। তাদের নিঃশব্দ কান্না থামাতে হবে। তাদের কান্না থামাতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যাবে। তারা হবে বিপথগামী। তাই উচ্চ শিক্ষিতরা ভার্সিটি থেকে বের হয়ে যেন চাকরির সুযোগ পান-দেশে এমন কর্ম পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।  
লেখক : শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১
  

এই বিভাগের আরো খবর

ক্ষমতা অপব্যবহারের তুফান ঠেকাতে হবে

আতাউর রহমান মিটন:কেউ যখন ফোন করে প্রশ্ন করে, ‘কিরে ভাই, আপনাদের বগুড়ায় এসব কি হচ্ছে?’ – তখন লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। প্রথমে ধর্ষণ, পরে চরিত্র হননের চেষ্টা এবং শেষে বিচারের নামে নির্যাতিত কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেয়ার ঘটনায় সারাদেশে নিন্দার ঝড় বইছে। আর আমরা যারা বগুড়ার মানুষ তাদেরকেও যেন ঘৃণা আর লজ্জার তীর সইতে হচ্ছে। আমরা এই লজ্জার দায় এড়াতে পারি কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যাব কিভাবে!


অভিযুক্ত তুফান সরকার এবং আলোচিত বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত আসনের মহিলা কমিশনার মার্জিয়া আক্তার রুমকি এত বেপরোয়া হওয়ার সাহস কোথা থেকে কিভাবে পেল, কারা এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আজকের এই ভয়ঙ্কর ঘটনার জন্মদানে সহায়তা করলো সেই প্রশ্ন বগুড়ার নাগরিক সমাজের মনে। বগুড়ার নাগরিক সমাজ এটাও মনে করে যে, ক্ষমতার দাপটে অন্ধ ও বেপরোয়া এই গোষ্ঠীকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামীতে বগুড়া দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। বগুড়ার শান্তিকামী নাগরিক সমাজ এর থেকে পরিত্রাণ চায়।


পত্রিকান্তরে সকলেই ইতোমধ্যে জেনেছেন কি ঘটেছিল বগুড়ায়। অভিযোগ থেকে জানা যায়, কলেজে ভর্তির বিষয়ে সাহায্যের নাম করে গত ১৭ জুলাই তুফান সরকার মেয়েটিকে ফোন দেন। তুফান মেয়েটির ভর্তির কাগজপত্র নিয়ে বাসায় যেতে বলে কিন্তু মেয়েটি বাসায় যেতে অস্বীকার করে। এরপর তুফান সরকার তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ি পাঠিয়ে মেয়েটিকে নিজের বাসায় নিয়ে যান। এ সময় বাসায় তুফানের স্ত্রী ছিলেন না। সেখানে মেয়েটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি ধর্ষণ করেন। এতে মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় তুফান তাঁর ক্যাডার আতিকুর রহমানকে ওষুধ কিনে দিতে বলেন। আতিকুর স্থানীয় দোকান থেকে ওষুধ কিনে দিয়ে তাকে বাসায় পৌঁছে দেন। ধর্ষণের বিষয়টি ফাঁস না করার জন্য মেয়েটিকে ভয় দেখানো হয়।


এদিকে তুফানের স্ত্রী আশা সরকার ঘটনাটি জেনে গেলে সে সব দায় মেয়েটির উপর চাপায়। আশা সরকার তার বড় বোন পৌর কাউন্সিলর মার্জিয়া আক্তার রুমকি’র সহায়তায় গত শুক্রবার (২৮ জুলাই) দুপুরে ৮-১০ জন ক্যাডার পাঠিয়ে ওই কিশোরী ও তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে আনেন। প্রথমে পৌর কাউন্সিলর রুমকি নিজে এবং পরে তুফান সরকারের স্ত্রী আশা সরকার ও তুফানের শাশুড়ি রুমি বেগম মা-মেয়েকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এরপর তুফানের তিন সহযোগী তাঁদের বেধড়ক মারধর করেন। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলে এই নির্যাতন। নাপিত ডেকে মা-মেয়ে দুজনের মাথা ন্যাড়া করে সাদা কাগজে সই নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বগুড়া ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়। বলা হয়, না গেলে এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হবে।

 
প্রতিবেশিদের মাধ্যমে মাথা ন্যাড়া করার ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে যায়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ঝড় ওঠে। নির্যাতিত মা-মেয়ে প্রতিবেশির সহায়তায় থানায় মামলা দায়ের করলে শুক্রবার রাতেই চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে বগুড়া জেলা প্রশাসক নূরে আলম সিদ্দিকীর নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত নির্যাতিতা মা ও মেয়েকে দেখতে গিয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক বলেছেন, “এখন থেকে তাদের দুইজনের চিকিৎসা ব্যয় জেলা প্রশাসন বহন করবে এবং ওই ছাত্রীর লেখাপড়ার সব খরচও সরকার বহন করবে।” এদিকে ঘটনার প্রেক্ষিতে বগুড়ার পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, “কিশোরী ও তার মায়ের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এর পেছনে যত বড় রাঘববোয়ালই থাকুক না কেন, কেউ রক্ষা পাবে না।”


আমি বগুড়ার জেলা প্রশাসক নূরে আলম সিদ্দিকী এবং বগুড়ার পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামানকে তাঁদের স্ব-স্ব ভূমিকা ও দায়িত্বশীল মন্তব্যের অভিনন্দন জানাই। সরকার নির্যাতিত মেয়েটির লেখাপড়ার খরচের দায়িত্ব নিয়ে নির্যাতিতদের মনে বিরাট ভরসা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এটা শুধু টাকার ব্যাপার নয়, এটা সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থা ও ভরসার বহিঃপ্রকাশ। ঠিক তেমনি বগুড়া পুলিশ প্রশাসন যে দৃঢ়তায় “রাঘববোয়াল”দের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়েছেন সেটা আমাদের আশান্বিত করেছে। আমরা দেখতে চাই, প্রশাসন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল কেবল কথার কথা বলে বেদনাহত নাগরিক সমাজের ক্ষতে মলম লাগানোর চেষ্টা করেননি বরং সত্যিকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের আন্তরিকতার নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন।


বলে রাখা দরকার, বগুড়ার এই ঘটনাটি এখন আর কেবল বগুড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা বিশ্বব্যাপী প্রচারণায় চলে গেছে। সোমবার এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বিবিসি এটা নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করেছে। আমার ধারণা অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এটা নিয়ে রিপোর্ট করেছে বা করবে। বগুড়ার নাগরিক সমাজ এই ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে। তাঁরা শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় সমবেত হয়ে নিজেদের ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছে, দাবী জানিয়েছে ন্যায় বিচারের।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। নারী নির্যাতনের এই লোমহর্ষক ঘটনার বিচারের দাবীতে দেশের সকল অঞ্চলে মানবতা সম্পন্ন মানুষেরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠছেন। দেশের মানুষ এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার বিচার চায়। তারা ঐ রাঘববোয়ালদের সমূলে উৎপাটন দেখতে চায় যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তুফান সরকারদের মত নির্যাতনকারীদের জন্ম হয়।


অভিযুক্ত তুফান সরকার ক্ষমতাসীন দলীয় ব্যক্তি। সে বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক ছিল। অনৈতিক ও বর্বর এই ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে তুফান সরকারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ও সাধারণ স¤পাদক গত ৩০ জুলাই স্বাক্ষরিত এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, “ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকারকে জাতীয় শ্রমিক লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা আরও বলেছেন, জাতীয় শ্রমিক লীগ একটি সুশৃঙ্খল আদর্শিক সংগঠন। এই সংগঠনে অপরাধীদের কোন স্থান নেই। নেতৃবৃন্দ এই জঘন্য অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন।” এই ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বিব্রত। রোববার আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে দলের স¤পাদকমন্ডলীর এক সভায় দলের কৃষিবিষয়ক স¤পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী বলেছেন, “এ ঘটনায় দল দুর্নাম কুড়িয়েছে।


 দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এর বিচার হতে হবে।” একই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি সাখওয়াত হোসেন শফিক বলেন, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বরাবরই আইনের শাসনে বিশ্বাসী।

উন্নত-সমৃদ্ধ, আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে এদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ রাজনীতিতে একটি সুস্থ, সুন্দর, ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অপরাধীর কোন দলীয় পরিচয় গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সর্বদা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর শেখ হাসিনার সরকার ইতোমধ্যেই দেশবাসীর কাছে তা প্রমাণ করেছে।

 অতীতেও দলীয় পরিচয়ে কোন অপরাধী পার পায় নাই। কারো কোন ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ভার দল বহন করবে না। এ ব্যাপারে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। বগুড়া’র মানুষ হিসাবে আমি এ ঘটনায় প্রচন্ড মর্মাহত এবং লজ্জিত। আমরা বগুড়াবাসী অন্যায়, অনাচার এবং অরাজকতার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার। আগামীতেও সুন্দর ও উন্নত বগুড়া’ গড়তে সকল অনিয়ম, মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ এবং জাগ্রত থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সবশেষে এমন ঘটনায় সোচ্চার থাকার জন্য বগুড়া’র সর্বস্তরের জনগণকে ধন্যবাদ ও শুভ কামনা’ জানাই।”


আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বগুড়া সদর আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় হুইপ নূরুল ইসলাম ওমর এমপি-কে ফোন করেছিলাম। তিনি বললেন, “এই ঘটনায়  আমি দারুণভাবে ব্যথিত এবং মর্মাহত। আমি এই জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করি। আমি বগুড়ার প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাতে চাই তাঁদের তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। প্রশাসন যেন সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে আমি সে ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।

আপনারা জানেন, আমি সন্ত্রাসের লালন-পালন করিনা। তুফান সরকার বা তার মত বেপরোয়া ব্যক্তিরা অশুভ রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আজকের এই অবস্থায় এসেছে। এই দুর্বৃত্তদের পেছনে কারা আছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। দিনের পর দিন অপরাধ প্রশ্রয় দিলে একদিন তা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে দেখা দেয়। বগুড়ার নাগরিক সমাজের কাছে আমার অনুরোধ আপনারা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। সকল অপশক্তিকে মোকাবেলা করে সুস্থধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে।”


বগুড়ার নাগরিক সমাজ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো নির্যাতনকারী তুফান সরকারসহ জড়িত দোষীদের শাস্তি দাবী করেছেন। এটা এমন এক বর্বরোচিত ঘটনা যা কোনভাবেই সমর্থন করার বা প্রশ্রয় দেয়ার সুযোগ নেই। এই বিচার হতেই হবে। যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যায় বিচার পাওয়া সম্পর্কে আস্থার অভাব লক্ষ্য করছি। অনেকেই মনে করছেন, এখন কয়েকদিন মাঠ গরম থাকবে, গণমাধ্যমের হৈ চৈ এর কারণে প্রশাসনও তৎপর থাকবে কিন্তু এরপর এক সময় জামিন পেয়ে তুফান বেরিয়ে এসে বজ্র-বিদ্যুৎসহ নির্যাতিত মা-মেয়েসহ এই ঘটনায় কণ্ঠ উচ্চকিত ব্যক্তিবর্গকে আছড়ে ফেলবে। তুফান গং ক্ষমতাশালী। তাদের হাত অনেক লম্বা।
রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু বগুড়ায় নয়, সারাদেশেই হচ্ছে।

 প্রদর্শনী বা বাণিজ্যমেলার আড়ালে জুয়ার আসর, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা, দখল, চাঁদা আদায়, চোরাকারবার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ-বদলী বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি কোথায় নেই এই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী চক্র। তুফান তো একজন সাধারণ অপরাধী মাত্র। যারা তুফানের প্রতিপালক তাদের বিচারের দাবী কি আমরা জানাতে পারছি? বগুড়াসহ সারাদেশের অন্ধকার সা¤্রাজ্যের নিয়ন্ত্রকেরা কারা? “গডফাদার” কারা তা সকলেই জানেন কিন্তু ভয়ে কেউই মুখ খুলতে পারে না। এদের দিনের চেহারা সুশীল হলেও রাতে তারা অন্য মানুষ। সে কারণে এই দুর্বৃত্তদের প্রতিহত করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।


অপরাধ প্রবণতা একটা দুরারোগ্য সামাজিক সমস্যা। অপরাধীরা যদি আইনের নাগালের বাইরে নিরাপদে থাকার সুযোগ পায় তাহলে অপরাধ প্রবণতা উৎসাহিত হয়। সেজন্য অপরাধীদের সুরক্ষা দেয়ার রাজনীতিকে ঘৃণা করতে হবে। জনগণকে দায়িত্ব নিতে হবে। ভাল মানুষদের নির্বাচনে জয়ী করার দায়িত্ব, ভাল মানুষদের রাজনীতিতে রাখার দায়িত্ব। আগামীতে আমাদেরকে যোগ্য প্রতিনিধিদের নির্বাচনে জয়ী করতে হবে। স্থায়ীভাবে এই দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় করতে চাইলে রাজনীতিতে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে। দূরে দাঁড়িয়ে সার্কাস দেখে সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। অংশগ্রহণ করতে হবে, দায়িত্ব নিতে পরিবর্তনের। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতিকে ‘না’ বলতে হবে।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক

[email protected]

০১৭১১৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

চোখ আটকালো সংবাদে

হাসনাত মোবারক:আজকের লেখার শিরোনামটি নেওয়া হয়েছে জ্ঞানপীঠ পদকপ্রাপ্ত কবি শঙ্খ ঘোষের ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে ’ কবিতাকে অনুকরণ করে। কবিতা অনুকরণ করা হয়েছে জানলে, শঙ্খ ঘোষ কিছুটা খুশি হবেন বোধ করি। কিন্তু যে সংবাদটিতে আমার চোখ থেমে গেছে, আমার মনে হয়, সেটা দেখলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মন খারাপই করতেন।

দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় ২৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে  ৮ নং পৃষ্টায় একটি সংবাদ প্রকাশিত  হয়। সংবাদটির শিরোনাম ছিল, ‘আত্রাইয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন গোয়ালঘরে পরিণত।’ সংবাদটি পাঠ শেষে জানতে পারলাম নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিশা ইউনিয়নের তেজনন্দী গ্রামে অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি শিক্ষকের অভাবে গোয়ালঘর এবং স্থানীয়দের খড়িঘরে পরিণত হয়েছে।

 এমন একটা প্রতিবেদনে চোখ আটকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেদনে সুরম্য একটা ভবনের ছবি ছাপা হয়েছে। কয়েকটা ছাগল বেঁধে রাখার ছবি  দেখা যাচ্ছে। এমন নিউজ এই সময়ে এসে দেখতে পাওয়া খুবই হতাশার খবর। কেননা দেশ অনেক এগিয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। মিডিয়ার তৎপরতা বেড়েছে। এটা জেনেও কী এলাকাবাসীর মনে কোনো তৎপরতার জন্ম নেয়নি ! ওই এলাকাতে কী বিদ্যাবর্তী কোনো যুবকই নাই! যারা জ্ঞানের আলো ছড়াতে ওই প্রত্যান্ত এলাকাতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। যারা  স্ব্উদ্যোগে নিজেদের এলাকার উন্নয়ন ঘটাবেন। যাতে করে কোনো বিদ্যালয় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর অভাবে  গোয়ালঘরে পরিণত না হয়! একটা সময়

এখন কথা হলো আত্রাইয়ের গ্রামের স্কুলভবন গোয়ালঘরে পরিণত । তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  মন খারাপ হওয়ার কী আছে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো স্কুল পলায়নপর এক বালক ছিলেন। তার তো খুশি হওয়ার কথা। না। রবীন্দ্রনাথ এতে ব্যথিত হবেন। কেননা রবীন্দ্রনাথ স্কুল ভালোবাসতেন বলেই তিনি শান্তি নিকেতন খুলে বসেছিলেন। মহামতি কিশোর  রবীন্দ্রনাথের হয়তো বিদ্যা গেলানো প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনীহা জন্মেছিলো। তাই তিনি নিজে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিদ্যা নিকেতনের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসার প্রমাণ পওয়া যায়। তিনি যদিও বিদ্যালয় খুলে অভাবে পড়েছিলেন। সেকথা ভিন্ন।


নওগাঁর আত্রাই, প্রতিসর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য একটি এলাকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রে এই এলাকার রূপসৌন্দর্যের নিটোল বর্ণনা আছে। তৎকালীন পাবনার সাজাদপুর এবং শিলাহদহ হতে বুযর্গ রবীন্দ্রনাথ নদীপথে ওই নওগাঁর পথে গিয়েছিলেন। এর বর্ণনা ছিন্নপত্রে একাধিকবার আছে। চিকনাই, ভগবতী, ইছামতী, করতোয়া, বড়াল, আত্রাই কত সুন্দর সুন্দর নামের সাথে রবীন্দ্রনাথ আপমার পাঠককে পরিচয় করে দিয়েছেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিলবাওরের রূপসৌন্দর্যের চিত্রপট যারা স্বচক্ষে দেখতে যাওয়ার  সুযোগ হয়নি, তাদের জন্য তিনি ছিন্নপত্র রেখে গেছেন। ২০১৫ সালের সেপ্টম্বর মাসে আমি এই চিত্রভূমিতে যাই। সান্তাহার  থেকে  ট্রেনে চেপে আত্রাই রেলস্টেশনে গিয়ে নামি। তখন সন্ধা গড়িয়ে রাত নেমেছে।

আমাকে রিসিভ করার জন্য আত্রাই রেলস্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রদ্ধেয়জন কবি করিম মোহাম্মদ। ওনার বাংলোতে যাবার পথে আঁকাবাঁকা  আত্রাই নদী পাড় ধরে যাচ্ছিলাম। শান্ত লয় ধীরগতিতে জলের ওপর দিয়ে নৌকা যাচ্ছে। নৌকার ওপর নিবু নিবু করে বাতির আলো জ¦লছে। হোস্ট কবি করিম মোহাম্মদ ওখানকার একটা স্কুল এন্ড কলেজের  অধ্যক্ষ হিসেবে  নিয়েজিত আছেন। আমি ওনাকে ওই নৌকার আলো দেখিয়ে অধ্যক্ষ মহাদয়কে জানিয়েছিলাম। আপনিও ওইরকম করে বিদ্যার আলোয় আলোকিত করবেন এই চিত্রলভূমির মানসসন্তানদের। তিনি আমার কথার প্রতিত্তুরে তেমন আশাব্যঞ্জক কথা জানাননি।  


বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস– সম্পাদনা গ্রন্থ মারফত জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত মোট ১৩ বার এই এলাকাতে এসেছিলেন। সর্বশেষ ১৯৩৭ সালে আত্রাই রেলস্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিদায় জানানোর জন্য তার সাথে অন্নদাশঙ্কর রায় আত্রাই থেকে ট্রেনে চেপে নাটোর গিয়ে নামেন।

পাঠক ভাবতে পারেন, আত্রাইয়ের বিদ্যালয় গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছে। এসবের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  আত্রাই গমন-প্রত্যাগমনের সম্পর্ক কী! তাই তো। হুম।  যে স্থানের সাথে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজরিত। অনেক ক্ষেত্রেই নওগাঁবাসী  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ টেনে থাকেন। তাতে দোষের কিছুই নয়। ভবিষৎ প্রজন্মকে মহামানবদের  আদর্শে আদর্শিত করার জন্য মুনিঋষীদের জীবনী পাঠ করানো হয়। মুনিঋষীদের জীবনী বীক্ষণ করানো হয়।


প্রসঙ্গকথা হলো এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একটি সুরম্য শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষক  কেন থাকবেন না! খড়িঘড়েই বা কেন পরিণত হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! ২৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে  দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় ৮ নং পৃষ্টায় প্রকাশিত উক্ত সংবাদে জাতির  চোখে আরেকবার আঙুল  দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এর জন্য প্রতিবেদকসহ পত্রিকার কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু কথা হলো এরকম একটা প্রতিবেদনে প্রতিয়মান হয় আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থান। এতে মনে সংশয় জাগে! সচেতন মানুষের মনে সংশয় জাগাটাই স্বাভাবিক।

কথা হলো এতে কতটুকুই বা পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটাই দেখার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণতে হবে। ২৩ জুলাই ২০১৭ তারিখে এইচ এস সি পরীক্ষাফলাফল প্রকাশ হয়েছে। মিডিয়াতে প্রকাশ হেেয়ছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কৃতি শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসমুখর ছবি। ভালো ফলাফলকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে প্রচার হয়েছে ভালো প্রতিষ্ঠানের খবারাখবর। সবশেষে সংশয় নিয়ে বলতে হয়, আমাদের দেশ এগিয়েছে! ফলাফলগতভাবে দেশের শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন হলেও টেকসইগত উন্নয়ন খুব একটা হয়েছে বলে মনে হয় না।  
ই/বর্ধিত পল্লবী, মিরপুর ১১.৫, ঢাকা-১২১৬
০১৭৫০৯৩৬৯১৯

এই বিভাগের আরো খবর

মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রোমেনা আফাজ মুক্তমঞ্চ

আব্দুস সামাদ পলাশ:পুন্ডনগরী বগুড়া’য় জন্মগ্রহণ করে রোমেনা আফাজ নিজে হয়েছেন গর্বিত আর বগুড়াবাসীকে করেছেন ধন্য। রোমেনা আফাজ একটি কালজয়ী নাম। রোমেনা আফাজ শুধু দেশে নয় পৃথিবীর যেখানেই বাঙ্গালী আছে সেখানেই রোমেনা আফাজ সবার মাঝে বিরাজ করছে। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এই মহিয়সী লেখিকা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আছে তাঁর অনেক অনেক স্মৃতি। দেশে সাহিত্য অঙ্গণে তাঁর রয়েছে বিশাল ভান্ডার। তাই তাঁর স্মৃতিকে জাগ্রত করতে বগুড়ায় নেওয়া হয়েছিল অনেক উদ্যোগ।

তার মধ্যে রোমেনা আফাজ সড়ক এখন অনেক দৃষ্টিনন্দন। ২৬ ডিসেম্বর ২০০২ সালে আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ টিটু মিলনায়তন চত্ত্বরের একটি ছাউনীকে নাম করণ করেছিল ‘রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চ’। সেই থেকে বগুড়া’র সংগঠনগুলি প্রতিনিয়ত এই মুক্তমঞ্চে তাদের ছোট-খাটো অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছিল। বগুড়া’র সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন অনেক উজ্জ্বল।

 এখন প্রতিটি সংগঠন জাগ্রত হয়েছে তাদের কার্যক্রম নিয়ে। অনেক সংগঠন আছে তারা জায়গার অভাবে অনুষ্ঠান করতে পারছেনা। প্রতিটি সংগঠনের দায়িত্ব তাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসা ছেলে-মেয়েদের নিরাপদে রাখা এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এটা বর্তমান সরকারও চাইছে। সাংস্কৃতিক-এর মাধ্যমে দেশ থেকে মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নিপাত যাক। বগুড়া’র সাংস্কৃতিক অঙ্গণে এখন যে সুবাতাস বইছে খুব তাড়াতাড়ি বগুড়া বিশ্বের দরবারে বড় একটি জায়গা করে নিবে।

তাই এখন শুধু মঞ্চের দরকার। শুধুমাত্র শহীদ টিটু মিলনায়তন নির্ভর হলে চলবেনা বগুড়ার সংগঠনগুলোকে। সব সংগঠন কি পারবে সেখানে অনুষ্ঠান করতে। পারবেনা। তাছাড়া দর্শক মুক্ত পরিবেশ চায়। শহীদ টিটু মিলনায়তন হলের পিছনের সবগুলি ফ্যান নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু কিছু ফ্যান-এর জায়গা খালি পড়ে আছে। মনে হয় খুলে রাখা হয়েছে, তাছাড়া শহীদ টিটু মিলনায়তন ভাড়া নিয়ে সবার অনুষ্ঠান করা কষ্টকর। কারণ সংগঠনগুলোর আর্থিক সংকট আছে।

 তাইতো তারা রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চের মত মঞ্চ চায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রায় কয়েক মাস হলো ঝড়ের কারণে মুক্ত মঞ্চটি দুমড়ে- মুচড়ে পড়ে আছে এবং পৌর পার্কসহ শহীদ টিটু মিলনায়তন তার সৌর্ন্দয হারিয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আমার বিনীত আবেদন অল্প সময়ের মধ্যে রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চ পূণরায় সংস্কার করে বগুড়ার শিল্পীদের শিল্পকর্ম করার সুযোগ দিবেন। রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চের ইতিহাস খুব একটা বেশী দিনের নয়। তারপরও আমার মনে পরে যখন আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী ‘রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চে’ অনুষ্ঠান করত তখন দর্শকের ঢল নামতো।

রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চ থেকে শিল্পী হওয়া কত শিল্পী জাতীয় পর্যায়ে আলো ছড়িয়েছে। তার মধ্যে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা অপু বিশ্বাস বহুবার ঐ মঞ্চে শুধু নৃত্য নয়, সঙ্গীত, অভিনয় করে বগুড়ার দর্শকদের দৃষ্টি কেড়েছিল। আমার মনে আছে একটি অনুষ্ঠানে আমি ও অপু বিশ্বাস একটি যুগল নৃত্য করেছিলাম। কিন্তু মঞ্চের জায়গা ছোট হওয়ায় আমরা নাচ করতে করতে দর্শক সারিতে নেমেছিলাম। এখন এটা শুধু স্মৃতি। কিন্তু পার্কে হাটতে গেলে সেই স্মৃতি বিজরীত মুক্ত মঞ্চটি দেখে ভীষণ কষ্ট পাই।

 বগুড়ায় এতগুলো সংগঠন কিন্তু কারো মুখে যেন কোন কথা নেই। অথচ এটা একটি সামান্য ব্যাপার; পৌর কর্তৃপক্ষ একটু সুনজর দিলেই এখানে আবারো প্রাণের স্পন্দন জেগে উঠবে। জেগে উঠবে দর্শকদের আগমন। আর দর্শকদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের চিত্র বিনোদনের মাধ্যমে সমাজ থেকে মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি দূর হবে। তাই বগুড়া’র সব শিল্পীদের পক্ষ থেকে আমার চাওয়া অতি শ্রীঘই রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চ পূণরায় সংস্কার করে, শহীদ টিটু মিলনায়তন চত্ত্বর-এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করুন। আমরা জানি আমাদের পৌর মেয়র সাহেব তিনিও প্রতিদিন পার্কে হাটাহাটি করেন।

তার চোখে একবারো কি এই রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চটি পড়েনি ? আমি যতদূর জানি রোমেনা আফাজ তাঁর সম্পর্কে চাচি হন। আমি সকল কাউন্সিলরসহ পৌর মেয়র সাহেবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আপনারা রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চটিকে বাঁচান। মুখ থুবড়ে আর কত দিন পড়ে থাকবে ? পড়ে থাকতে থাকতে ইতিমধ্যেই ছাউনীটির পচন ধরেছে।

 এখন তাড়াতাড়ি সংস্কার না করলে ক’দিন পর তার অস্তিত্ব থাকবে না। তাই সচেতন শিল্পী হিসেবে আকুল আবেদন রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চটি পূণরায় আবার উঠে দাঁড়াক। এর জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করছি। সব শিল্পীরা একত্র হয়ে রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চ নিয়ে প্রতিবাদ করুন। আর এটা একমাত্র সম্ভব হবে বগুড়ার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট উদ্যোগ নিলেই। কারণ বগুড়া’র সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট অনেক শক্তিশালী। আর এই মহৎ কাজটি সফল হবে হয়তো তাদের মাধ্যমেই। বগুড়া এখন সাংস্কৃতিকের রাজধানী। নৃত্য, নাটক, আবৃত্তি, সঙ্গীত সবকিছুরই ব্যাপক চর্চা হচ্ছে।

 এত চর্চার পর একজন শিল্পী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। দর্শকদের মুক্ত পরিবেশ আর মুক্ত হাওয়ায় অনুষ্ঠান দেখার একমাত্র ভরসা হলো ‘রোমেনা আফাজ মুক্ত মঞ্চ’। যেমন রবীন্দ্র সরবর, শহীদ মিনারসহ আরো অনেক মুক্ত মঞ্চ আছে ঢাকায়। কিন্তু বগুড়ার শহীদ মিনারে বিশেষ দিন ছাড়া অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। আবারো পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন রোমেনা আফাজ-এর স্মৃতিকে বাঁচান। আমি লেখক নই, আমি নৃত্যশিল্পী। কিন্তু স্পর্শকাতর কিছু বিষয় আমাকে স্পর্শ করলে আপনা আপনি লেখা বেরিয়ে আসে। বগুড়া’র শিল্পীরা জাগ্রত হোক-এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক ঃ সভাপতি, আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী।
০১৭১৯-৭৭১৩৯১   

একজন হারুন অর রশীদের গল্প

ফৌজিয়া সুলতানা :তাঁকে আমি চিনি এবং জানি কলেজ থেকেই (১৯৮১ সাল)। আমি বিটিভির নির্বাহী প্রযোজক হারুন-অর রশীদের কথা বলছি। এত সহজ, সরল, প্রাঞ্জল, সমস্ত সংস্কারের বাইরে যে মানুষ, সে হারুন ভাইকে আজ অকপটে বার বার মনে পড়ছে। কলেজে পড়ার সময় নার্গিস ম্যাডামের ক্লাশে একদিন অবলীলায় হারুন ভাই বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম আপনাকে শাড়ীটা পরে খুব সুন্দর লাগছে?’ এই শাড়ীটার দাম কত?’ ম্যাডাম হেসে বললেন, ‘তুমি এই কথাটা অন্য পরিবেশে বললে ভালো লাগতো। যা হোক যখন রাজশাহী ভার্সিটিতে আমি পড়তাম, প্রায়ই ঈদে হারুন ভাই বাসায় আসতেন। আমি মাঝে মাঝে অপ্রস্তুত হলেও ভাবতাম হারুন ভাই এত আন্তরিক, এত সহজ সরলতা তার মধ্যে। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা আমাদের জীবন।

 আমাদের পরিবারের সবাই তাঁকে খুব সম্মান করতো। কারণ ব্যক্তিগতভাবে তাকে অনেক বড় মাপের মানুষ হিসেবে আমি চিনি। আমার মনে শ্রদ্ধার জায়গায় ছিলেন হারুন ভাই। এক ঈদে হারুন ভাই বিটিভির চাকরীর এপয়েনমেন্ট লেটার নিয়ে বাসায় হাজির। আমি শুনে খুব খুশী হলাম। কারণ অনেক স্ট্রাগল করে আজ এই জায়গায় তিনি। ১৯৯৭ সালে বিটিভির সঙ্গীতের একটা প্রোগ্রামের জন্য হারুন ভাই আমাকে বলেছিলেন। আমি তখন ঢাকায় গেলাম। প্রথম দুর্দিন রিহার্সেলের পর তৃতীয় দিন গানটাকে ওকে করা হলো। তৃতীয় দিন গানটার অডিও এবং ভিডিও দুটোই হলো।

 সে সময়ে হারুন ভাইয়ের আন্তরিক ব্যবহারের কথা ভুলবো না কোনদিন। অনুষ্ঠানটি আসাদ চৌধুরী উপস্থাপনায় ছিল। আজ পরিণত জীবনে শুধুই মনে হচ্ছে এই ইন্টারনেট, ফেসবুকের জগতে হারুন ভাইয়ের মত মানুষ বিরল। কোন কুসংস্কার যাকে আচ্ছন্ন করেনি কোনদিন। গতানুগতিক সম্পর্কের বাইরেও মানুষের সঙ্গে মানুষের যে একটা স্বাভাবিক, সামাজিক এবং মানবিক সম্পর্ক আছে সেটা হারুন ভাইকে দেখলে বোঝা যায়। আজ না ফেরার দেশে হারুন ভাই। কেন জানিনা মনে হচ্ছে অনেক জিজ্ঞাসাই ছিল তাঁর কাছে। অনেক কথা জানা হয়নি। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে কে কার খোঁজ রাখে। আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে প্রতিটি মুহূর্ত।

 নিজের পরিসর, নিজের গন্ডির বাইরে আমরা কিছুই যেন ভাবতে পারি না। নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করছি, হারুন ভাই আপনি কেমন ছিলেন বিগত দিনগুলিতে ? তাঁর শারীরিক সমস্যার কথা আমি জানতাম। কিডনীর সমস্যায় দীর্ঘদিন ভুগছিলেন। প্রথম দিকে কলকাতায় চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। পরে ব্যাংককে চিকিৎসা চলছিল। সেখানেও অনেকটা নেগেটিভ এনসার। বগুড়া জিলা স্কুলের দেড়শ বছর পূর্তিতে যোগ দেবার জন্য হারুন ভাই বগুড়ায় এসেছিলেন। আগের দিন সন্ধ্যায় বাসায় আসলেন ছেলে পূণ্য সহ। এই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। বড় অসময়ে চলে গেলেন হারুন ভাই। এত কষ্ট, এত আক্ষেপ আমার কখনোই হতো না যদি তার মৃত্যুটা স্বাভাবিক হতো। ৫ জুলাই ২০১৭ এর করতোয়া পেপারটা পড়লাম। এই নৃশংস মৃত্যুকে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।

 একটা মানুষ মৃত্যুর আগে প্রতিনিয়ত অনুভব করছে মৃত্যুর কষ্টকে। ধুকে ধুকে কষ্ট পাচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য তাঁর যে আকুল আকুতি এটা ভাবলে আমার চোখ ভিজে আসে জলে। তাঁর মত মানুষের কাছে বর্তমান প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার ছিল। নিভৃতচারী, নিরহংকারী মানুষ। সহজ সরল সাদামাটা মনের মানুষ। যার কোন কথার মধ্যে আমি ছিটেফোটা অহংকার কোনদিন দেখিনি। তাকে আমি শ্রদ্ধায় বিনম্র চিত্তে স্মরণ করি। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। না ফেরার দেশে হারুন ভাই ভালো থাকুক তাঁর সমস্ত সত্ত্বায়।
লেখক ঃ সহকারী শিক্ষক, বগুড়া জিলা স্কুল
বগুড়া।
০১৭১২-২০৪৭৬২

এই বিভাগের আরো খবর

ছাদ বাগান

মো:জোবায়দুর রহমান শাহীন:প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (সপ্রাবি) ছাদে বাগান করা সম্ভব। চাই সমন্বিত ঊদ্যোগ।  বিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি (এস.এম.সি) ও শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে ছাদ বাগানের ঊদ্যোগ নিতে পারেন। বিশ্বজুড়ে উষ্ণতার ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকি দেখা দিয়েছে। যার ফলে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে পৃথিবী। আর এর প্রধান কারণ হলো তাপমাত্রার ভারসাম্য ঠিক না থাকা।

 মূলত অতিমাত্রার শিল্পায়নের ফলে একদিকে কৃত্রিমভাবে উষ্ণতা তথা তাপমাত্রা বাড়ছে অন্যদিকে তাপ শোষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বৃক্ষরাজির সংখ্যা দিন দিন কমছে। এ ছাড়াও টাটকা শাক-সবজি ও ফল-মূল পাওয়ার জন্য, ছাদের সবুজ চত্বরে বিনোদনের সুবিধা পাওয়ার জন্য, পরিবেশ দূষণ মুক্ত রাখার জন্য, বায়ো-ডাইভারসিটি সংরক্ষণের জন্য ও গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়ার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ছাদ বাগান অতীব জরুরি। বর্তমানে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ির ছাদে বাগান করা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিকাংশ ছাদের দিকে তাকালেই বিভিন্ন ধরনের বাগান দেখা যায়।

 আবার অনেকের মনের মাঝে ছাদ বাগানের সুপ্ত বাসনা অংকুরেই থেকে যায়। নিজস্ব কোন জায়গা বা ছাদ না থাকার কারনে। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদকে টার্গেট করে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এস.এম.সি, পিটিএ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্কুলক্যাচমেন্ট এলাকার মানুষকে সম্পৃক্ত করে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব। সামান্য আন্তরিকতা আর সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এ প্রতিশ্রুতিশীল দিকটাকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যেতে পারে। ছাদে বাগান করলে ছাদের সৌন্দর্য যেমন বাড়ে, তার সাথে জায়গাটুকু ব্যবহার করে বিদ্যালয়ের ফুল-ফল ও শাক-সবজির চাহিদাও যথাযথ ভাবে মেটানো যায়। শুধু কি তাই পরিকল্পিতভাবে ছাদে বাগান করে বাড়তি আয়ও করা যায়। সর্বোপরি ছাদের বাগান চাষাবাদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরাও ফুল-ফল ও ঔষধী গাছের সাথে পরিচিত হতে পারে। নির্মল পরিবেশের জন্য যা খুবই প্রয়োজন।


ছাদে বাগান আর মাটিতে বাগান এক বিষয় নয় , আবার কাজটি যে কঠিন, তাও নয়। জানা দরকার, ছাদের উপযোগী গাছ কোনগুলো। গাছের প্রজাতির ওপর নির্ভর করে ওই গাছটি ছাদ-বাগানের জন্য তা হাফ ড্রাম, টব নাকি চৌবাচ্চা কাঠামো করে লাগানো হবে, মাটির টবও হতে পারে। গাছের জন্য পরিচর্যার ধরন কি হবে, তা আগেই ঠিক করে নিতে হবে। খোলামেলা ছাদ থাকলেই হলো। তবে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো ছাদে বাগান করার ক্ষেত্রে ফল চাষাবাদে কলমের ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার বেশি ফলদায়ক। সুন্দরভাবে বাঁশ বা রডের পিলার দিয়ে জাংগি বা জাংলো বা মাচা বানিয়ে সিম, লাউ, কুমড়া, বরবটি, করলা চাষাবাদ করা যেতে পারে। তবে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে ছাদের যাতে কোন ক্ষতি না হয়।


ঠিক এ রকম ইচ্ছা থেকেই এক বছর আগে এমনি এক সময়ে বাঁশবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে ছাদ বাগানের উদ্যোগ গ্রহণ করি। এ উদ্যোগ-কে উৎসাহিত করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বর্তমান ডি.জি ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল (এন.ডি.সি) অতিরিক্ত সচিব মহোদয় সুদূর ঢাকা হতে সৈয়দপুর আসলেন। ওনার উপস্থিতিতে সৈয়দপুরের প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। বাঁশবাড়ী সপ্রাবি’র ছাদ বাগান উদ্বোধন হল।


বাঁশবাড়ী সপ্রাবি’র এক বছর বয়সী ছাদ বাগানে বর্তমানে বারোমাসী আম ধরেছে। ধরেছে আম্রপালী, কমলা, সফেদা, কাগজি লেবু, চায়না বেগুন। ছাদে রয়েছে ডালিম, বেদানা, মাল্টা, বাতাবী লেবু,কাজী পেয়ারা, বাউকুল, আমড়া, জলপাই, কলা, করমচা, শশা, লাউ এবং ঔষধী গাছের মধ্যে রয়েছে আমলকি, বয়ড়া, হরতকী, তুলসি, পুদিনা পাতা, ধনে পাতা। আরো রয়েছে গোলাপ, গাঁদা, গন্ধরাজ, দোলন চাঁপা, ডালিয়া, চন্দ্র মল্লিকা, ঘাসফুল, চায়না ঘাসফুল, লতা গাছের সমারোহ রেড বর্ডার, গ্রীন বর্ডার, ডুরান্ডা প্রভৃতি। এসব গাছ গাছালি, ফুল-ফল, ক্যাকটাস ও ঔষধী গাছ সমুহ স্কুলের পরিবেশকে করেছে অনন্য ও আকর্ষণীয়। এ স্কুলে নাইট গার্ড কাম পিয়ন না থাকায় এ ছাদ বাগানের পরিচর্যার জন্য শুরুতেই আমরা হোচঁট খেয়েছিলাম। ত্রাণকর্তা হয়ে এলেন পৌর মেয়র অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন সরকার। নিয়মিত ছাদ বাগান পরিচর্যার জন্য উনি একজন কর্মচারী দিলেন।

 যার ব্যয় ভার বর্তমানে সৈয়দপুর পৌর পরিষদ বহন করছে। পাক্ষিক আনন্দ আলোর সম্পাদক এবং বাঁশবাড়ীর কৃতি সন্তান শ্রদ্ধাভাজন রেজানুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও ছাদ কৃষির উদ্যোক্তা শাইখ সিরাজ মহোদয়-কে পরিদর্শনে আনবেন। বাঁশবাড়ী সপ্রাবি এ মহিমান্বিত উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ইতিমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর বহমান ফিজার এম.পি, প্রাথমিক শিক্ষার অতিরিক্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম খাঁন, উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ডি.ডি. রিপন কবির লস্কর, প্রাথমিক শিক্ষা রংপুর বিভাগের ডি.ডি. মাহবুব এলাহী, নীলফামারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার দিলিপ কুমার বনিক মহোদয় এ ছাদ বাগান পরিদর্শন করেছেন।


ধন্য হয়েছে বাঁশবাড়ী সপ্রাবি এস.এম.সি, পিটিএ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী এমন একটি উদ্যোগ সফল হওয়ার জন্য। এমনিভাবে দেশের প্রতিটি সপ্রাবি-এ ছাদ বাগান করা সম্ভব। চাই উদ্যোগ, সমন্বিত উদ্যোগ এবং তা এখনই। ড়িৎষফ ংপড়ঁঃ এর মহান প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল বলেছিলেন, ‘পৃথিবীকে যেমন পেয়েছ তার চেয়ে একটু শ্রেষ্ঠতর রেখে যেতে চেষ্টা কর, তোমার মৃত্যুর পালা যখন আসবে তখন এই ভেবে শান্তি পাবে সুন্দর এই পৃথিবীর জন্য কিছু করে যেতে পেরেছো’।
লেখক : সভাপতি, এসএমসি,
বাঁশবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়,
সৈয়দপুর।

এই বিভাগের আরো খবর

কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ হয় না

মীর আব্দুল আলীম:“রাজধানীতে এবার ‘‘ইয়াবা বার”। বাহ ভালইতো! এমন শিরোনামের খবরও আমাদের পড়তে হলো। খবরে প্রকাশ, রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় তৈরি হয়েছে মাদক বিক্রির স্পট। এসব জায়গায় ইয়াবা সেবনের জন্য নির্দিষ্ট রুম ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এগুলোকে ইয়াবা বার বলে আখ্যা দিচ্ছেন কেউ কেউ। ইয়াবা। হালের মাদক সাম্রাজ্যে অন্যতম উচ্চারিত শব্দ। মাদকের এ মরণ থাবায় প্রাণ যাচ্ছে ছোট-বড়, তরুণ-তরুণী, এমনকি কর্মজীবী নারী এবং গৃহিনীদের।  আর এ নেশাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে ইয়াবা বার।

প্রতিবেশি দেশে মিয়ানমার ইয়াবা তৈরি করে প্রতিদিন আমাদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাতে আমাদের যুবসমাজ ইয়াবা আসক্ত হয়ে ধ্বংসে নিপতিত হচ্ছে। ইয়াবার প্রসারতা এত বেড়েছে যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইয়াবার বিষয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাদক সেবনের কুফল সম্পর্কে মাঝে মধ্যেই মহাসমারোহে আলোচনা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। বিভিন্ন এনজিও মাদক সেবনে নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। মাদক পাচার, বহন ও ব্যবহারের বিভিন্ন শাস্তি রয়েছে। তবু মাদকের ব্যবহার কমেনি। বরং ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, প্যাথেডিনের ব্যবসা রমরমা হচ্ছে। নারী, পুরুষ উভয় শ্রেণীর মধ্যে মাদক সেবন প্রবণতা বাড়ছে।

ঘুমের ওষুধ, হেরোইন, গাঁজা, এমনকি কুকুর মারার ইনজেকশন সেবন করছে মাদকসেবীরা। বিষ শরীরে ঢুকিয়ে নেশা করার মতো অভ্যাসও গড়ে উঠছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। এ ব্যাপারে প্রশাসন নির্বিকার। কাজের কাজ কিছুই করে না। আর করবেই বা কেন? মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানে এসব। জানে কোথায় মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়, কোথা থেকে আসে এসব আর কারাই বা বিক্রি করে তা। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীদের ধরাতো দূরের কথা, সংশ্লিষ্টরা এর পাড় ঘেঁষেও দাঁড়াতে রাজি নয়।

মাদকের প্রসারতায় আমাদের সরকারের সম্মতি আছে এ কথা বলার সুযোগ নেই, তবে সরকারে কর্তাবাবুকে ম্যানেজ হয়ে যাবার কারণে মাদককারবারীরা প্রতিদিন দেশে মাদকে সয়লাব করে দিচ্ছে। মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসা নির্বিঘেœ হচ্ছে তা বলছি না। মাদক কারবারীরা ধরাও পড়ছে মাঝে সাঝে। আবার ছাড়া পেয়েও যায়। যারা মাঝে মধ্যে ধরা পড়ে তারা কেবল চুনোপুঁটি। আবার ওদের গডফাদারদের বদান্যতায় ওরা সহসাই ছাড়া পেয়ে যায়।

দেশের প্রতিটি সীমান্তেই এমন হচ্ছে। ভারতের সীমান্তে অসংখ্য ফেনসিডিলের কারখানা আছে। সেখানেও এই একই অবস্থা। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো আমাদের দেশে মাদকের বাজার তৈরি করে নিয়েছে। এ জন্যই হয়তো দেশ মাদকে সয়লাব হচ্ছে। মাদক ব্যবসার সাথে দেশের অনেক রাঘববোয়াল জড়িত। তাই ওদের টিকিটিও ছোঁয় না কেউ। তাই যা হবার তাই হচ্ছে দেশে। আমরা দেশবাসী দুর্ভাগা বলেই আমাদের যুবসমাজ সহজে মাদক হাতের নাগালে পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত আইনের তেমন শাসন সক্রিয় নয় বলেই আমাদের সন্তানদের দিনদিন অধঃপতন হচ্ছে।

দেশের মাদকের প্রসারতা ইউনিট পর্যায়ে চলে এসেছে। এখন ঘরে ঘরে মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তরা বন্ধুকে খুন করছে, প্রতিবেশিকে খুন করছে। মাদকাসক্ত ছেলে বাবা-মাকে খুন করছে,। এখন মাদকাসক্ত মেয়েরা বাবা-মাকে খুন করে নজির দেখালো। ভাই ভাইকে নেশার ঘোরে খুন করছে। এইতো হচ্ছে দেশ জুড়ে। সন্তান যখন পরিবারের সদস্যদের জন্য সহিংস হয়ে উঠে তখন এর চেয়ে ভয়ানক আর কি হতে পারে? আমরা মনে হয় ধর্মকর্ম থেকে একটু দুরে সরে যাচ্ছি। ভিনদেশী কালচার রপ্ত করছি। দেশ মাদকে প্রসারতা আর সামাজিক বন্ধন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিধায় এমন ঘটনা ঘটছে। এখন নেশায় আসক্ত কন্যা সন্তানেরাও বাবা-মাকে খুন করছে। আদালতে তো তাই প্রমাণ হলো।

দেশে একটার পর একটা নজির ঘটে যাচ্ছে। দেখছি কিন্তু কিছুই করছি না। অবাক হওয়ার বিষয় কত কিছু নিয়েইনা ঝড় বয়ে যায় দেশে। মাদক নিয়ে কেউ কথা বলেন না। সংসদে কত কিছু হয় মাদক নিয়ে তারা এক্কবারে চুপ থাকেন। কেন মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন? সরকার দলের ওনারাও চুপচাপ, বিরোধীদলের ওনাদের মুখেও থাকে বন্ধ। দু’একজন যাও বলে তা মোটেও জোরালো নয়। আর দেশের মাথাওয়ালাদের চুপচাপ এমন পরিবেশই দেশ মাদকে সয়লাব করে দিচ্ছে আমাদের মাদক বিক্রি সিন্ডিকেট।  

দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ হয় না? যাদের দায়িত্ব মাদক নিয়ন্ত্রণ করার কী করছেন তারা? মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিকিকিনি এবং বিভিন্ন সীমান্ত পথে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

দেশের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মাদকদ্রব্য বিকিকিনির বিষয়টি এ দেশে বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি অভিযানে মাদকদ্রব্য আটক ও এর সঙ্গে জড়িতদের আটকের কথা শোনা গেলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা ‘গডফাদার’দের আটক করা হয়েছে কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এমন কথা শোনা যায় না। ফলে মাদকবিরোধী নানা অভিযানের কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারো নতুন করে মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটে।

মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের তরুণ সমাজ মাদকের ভয়াবহ প্রভাবে বিপথগামী হচ্ছে। মাদকের নীল ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। যা একটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ বই নয়। সত্য যে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রকট রূপের পেছনে মাদক অন্যতম বড় একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মতো উদ্বেগজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?

মাদক দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। পত্রিকার সূত্র মতে, দেশে বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। সরকার বলছে, ৫০ লাখ; কিন্তু বেসরকারি সূত্র মতে, ৭০ লাখেরও বেশি। তবে আমরা ধারণা করতে পারি এর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। মাদক গ্রহণকারীর ৮০ ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর। বিশ্বের নেশাগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। এর ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয়েছে শহর হতে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। বিভিন্ন মাদকের মরণ নেশায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে ৮-১০ বছরের শিশু হতে শুরু করে নারী এমনকি বৃদ্ধরাও। ২০০২ সালে দেশে মাদক অপরাধীর সংখ্যা ছিল ৬ শতাংশ। বর্তমানে তা ২০ শতাংশের বেশি।

 এর ব্যবসা জমে উঠেছে দেশে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল’, ভারত, নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে ‘গোল্ডেন ওয়েজ’ এবং পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ বাংলাদেশকে ঘিরে ফেলেছে। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম মাদক উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের থাবার মধ্যে অবস্থান করছে। বাংলাদেশকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে গড়ে উঠেছে অজস্র ফেনসিডিলের কারখানা। সংঘবদ্ধ চক্র মিয়ানমার হতে কক্সবাজার দিয়ে সারা দেশে সুকৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ইয়াবা।

নতুন নেশা ইয়াবার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। বিশেষ করে স্কুল- বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছেলেমেয়েরা। ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবার কোনোটি দেশে উৎপাদিত না হলেও তা পাওয়া যাচ্ছে যত্রতত্র। সামাজিক সমস্যা ছাপিয়ে এটি যেন গত দুদশকে পারিবারিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রায়ই চোখে পড়ে মাদকের করাল গ্রাস থেকে ফেরাতে না পেরে পরিবারের শান্তি রক্ষায় বাবা-মা তার সন্তানকে, সন্তান বাবাকে পুলিশে সোপর্দ করছেন। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুন যখমের ঘটনা অহরহ ঘটতে শুরু করেছে।
 
বর্তমান সমাজ জীবনে মাদকের ব্যবহার সবাইকেই উদ্বিগ্ন করেছে। এ থেকে পরিত্রাণের আশায় ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন (১৯৯০ সালের ২০নং আইন) প্রণীত হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ওই আইন ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনের ২(ঠ) ধারায় মাদকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সে মতে মূলত অপিয়াম পপি বা তৎনিঃসৃত আঠালো পদার্থ; আফিম; আফিম থেকে উদ্ভূত মরফিন, কোডিন, হেরোইন ইত্যাদি এবং এদের ক্ষারগুলো; শতকরা ০.২%-এর অধিক মরফিনযুক্ত যে কোনো পদার্থ, কৃত্রিম উপায়ে তৈরি আফিমের সমধর্মী দ্রব্য যথার্থ পেথিডিন,

হাইড্রোমরফিন, ডিমেরাল, বেটাপ্রোডাইন ইত্যাদি, কোকা পাতা এবং তা থেকে উদ্ভূত সব দ্রব্য, কোকেন এবং ০.১% এর অধিক কোকেনযুক্ত যে কোনো পদার্থ অথবা কোকেনের যে কোনো ক্ষার, চরস, হাশিশ, গাঁজাগাছ, গাঁজা, ভাংগাছ, ভাং, গাঁজা বা ভাং সহযোগে প্রস্তুত যে কোনো পদার্থ, এলকোহল এবং ০.৫%-এর অধিক এলকোহলযুক্ত যেকোনো পদার্থ, রেক্টিফাইড স্পিরিট এবং তৎসহযোগে যে কোনো ওষুধ বা তরল পদার্থ, বিয়ার, বারবিচুয়েটস, তাড়ি, পচুই, মেথিলেটেড স্পিরিট ইত্যাদি দ্রব্য মাদক হিসেবে পরিচিত। ভারতে তৈরি ফেনসিডিল সিরাপ আমাদের দেশে মাদক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 এই সিরাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আফিম থেকে উদ্ভূত কোডিন, এই কারণেই ফেনসিডিল সিরাপ সেবন করলে মাদকতা আসে। তাই ফেনসিডিল সিরাপ মাদক হিসেবে পরিচিত। এলকোহল ব্যতীত অন্য কোনো মাদকদ্রব্যের চাষাবাদ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, পরিবহন, আমদানি-রফতানি, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয়, ধারণ, সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, প্রয়োগ ও ব্যবহার ওই আইনের ৯ ধারায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর নবম দশকে (১৯৮১ থেকে ১৯৯০ সাল) বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে মাদকের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় বিদেশ থেকে আসা মাদক সম্পর্কিত অপরাধের বিচার করা হতো ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুসারে। সেখানে শুধু শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাপথে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য দেশে নিয়ে আসা বা নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধেই আসামির বিচার হতো।

 জনজীবনে ব্যাপক ক্ষতি সাধনকারী এই মাদকসংক্রান্ত অপরাধ দমনের জন্য ওই আইন পর্যাপ্ত ছিল না। তাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৯০ সালে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন’ প্রণয়ন করা হয়। ১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ১৯ পৌষ মোতাবেক ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি তারিখ থেকে এ আইন কার্যকর হয়। কিন্তু কুড়ি বছরেরও অধিককালের পথপরিক্রমায় মাদকদ্রব্য ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়নি। এর ব্যবহার এবং প্রসার বেড়েই চলেছে। অভিভাবকরা আজ চিন্তিত তাদের সন্তানদের মাদকাসক্তি নিয়ে। মাদকের হিংস্র ছোবল থেকে সারা জাতি চায় আত্মরক্ষা করতে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ হয়নি বলেই আজ মাদক নিয়ে এতো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বেড়েছে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ।

সর্বোপরি বলবো, পরিস্থিতি উত্তরণে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সুচিন্তিত ও সমন্বিত কর্মপন্থা গ্রহণ করা দরকার। একটি প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার আগে আমাদের সবার দায়িত্ব হবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা। হুঙ্কার দিতে হবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করার। আমরা বিশ্বাস করি রাষ্ট্রের কাছে মাদক সিন্ডিকেট মোটেও শক্তিশালী নয়। রাষ্ট্র চাইলে দেশের মাদক প্রসারতা কমবে। আর রাষ্ট্র তা সহসাই করবে এ প্রত্যাশা রইলো।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

এই বিভাগের আরো খবর

ইসলামে নিষিদ্ধ কালোবাজারি-ভেজাল

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন:মহান আল্লাহ সোবহানুল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। এই মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবন কীভাবে পরিচালিত করবে তার সুন্দর দিক নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। মানুষের অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতার অংশ হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য করা ইসলামে সুন্নত ও সৎকর্ম বলে বিবেচ্য। তাই সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে সত্যিকার অনুগামী ও ইসলামের অনুসারীদেরকে।

আঁকড়ে ধরতে হবে মহানবী (স:) এর সুন্নতকে। হালাল জীবিকা উপার্জনের জন্য রাসুলে করীম (স.) সহ অধিকাংশ আম্বিয়া (আ) এবং সাহাবায়ে কিরাম শ্রমে নিয়োজিত ছিলেন। মহান আল্লাহ আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় জীবিকা উপার্জনের নির্দেশ দিয়ে বলেন: “সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযিক) সন্ধান করো। আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর যাতে তোমরা সফলকামী হও” (আল জুমআহ-১০) মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে হালাল ও উত্তম আহারের নিদের্শে বলেন: হে মুমিনগণ তোমরা আমার দেয়া হালাল ও উত্তম রিযিক আহার কর এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও (বাকারা-১৭২) “অন্যত্র আল্লাহ সোবহানু-তায়ালা ঘোষণা করেছেন।

“হে মু’মিনগণ। তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে ব্যবসা করা বৈধ।” (নিসা-২৯) এ আয়াতের তাৎপর্য হলো, “মিথ্যা বলে, ধোঁকা দিয়ে, প্রতারণা করে, চুরি করে এবং অবৈধ পন্থায় অন্যের সম্পদ ভোগ করা কিছুতেই জায়িয হবে না। তবে হ্যাঁ, পারস্পরিক সম্মতিক্রমে সম্পদ হন্তান্তরিত হলে তাতে কোন দোষ নেই।” রাসুলুল্লাহ (সা) ও সমগ্র উম্মতকে জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল ব্যবসার নীতি গ্রহণ এবং হারাম পন্থাকে পরিহারের বিশেষভাবে তাকিদ দিয়েছেন।


“হযরত আবদুল্লাহ (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, হালাল জীবিকা অন্বেষণ করা অন্যান্য ফরজ আদায়ের পর একটি আবশ্যকীয় ফরম।” (মিশকাত বাইহাকী) অতএব, হালাল পন্থায় ব্যবসা করে হালাল জীবিকা উপার্জন করা মুসলমানের জন্য ফরজ। তথা অবশ্য কর্তব্য। তবে সব ধরনের ব্যবসা ইসলামে হালাল বা বৈধ নয়। যে ব্যবসায়ে যুলুম, ধোঁকাবাজি, চাঁদাবাজী, প্রতারণা, ঠকবাজি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি করে উপার্জন, কালোবাজারি, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ এবং হারাম বস্তু, যেমন মাদকদ্রব্য, শূকর, মূর্তি নির্মাণ বেশ্যাবৃত্তি, নৃত্য ও যৌন শিল্প, মদজাত পণ্য, চরিত্র নষ্টকারী বিনোদন শিল্প, বিচরণশীল প্রাণীর ভাস্কর্য নির্মাণ শিল্প, জুয়া, লটারী, যাদু, জ্যোতিষ গণনা ও মিথ্যা শপথের মাধ্যমে যা উপার্জন করা হয় তা হারাম।


ভেজাল ও কালোবাজারী বলতে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে: ভেজাল শব্দটি বহুল প্রচলিত। এর আভিধানিক অর্থ মিশ্রিত, মেকি, খাঁটি নয় এমন, বিশৃঙ্খলা, ভেজাল দুধ, ভেজাল ঘি, ভেড়ার গোস্ত খাসির গোস্ত বলে বিক্রি, অর্থাৎ উৎকৃষ্ট দ্রব্যের সঙ্গে নিকৃষ্ট দ্রব্যের মিশ্রণ যেমন, খাদ্যে কৃত্রিম সংকট, মেকি, ক্ষতিকর পদার্থ মিশানো, মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ মিশ্রিত কোমল পানীয়, ফরমালিন মিশ্রিত মাছ, কীটনাশক মিশ্রিত শুটকি এবং ক্ষতিকারক রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য। মহান আল্লাহ ভেজাল সম্পর্কে বলেন, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকার্য থেকে: তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন বস্তু হালাল করেন এবং নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ” (সূরা আল আরাফ-১৫৭)।


আল্লাহ আরো বলেন “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রণ করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।” (বাকারা-৪২) তাই যাবতীয় ভেজাল জালিয়াতি ও কালোবাজারী সকল সামাজিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহ এই হুকুম আমাদের মেনে চলা দরকার। অথচ ইসলামে ব্যবসানীতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক-সামষ্টিক কল্যাণ তথা দুর্নীতি ও প্রতারণা মুক্ত।

যেসব উপায়ে উপার্জন বা মুনাফা লাভ করতে গিয়ে অপরের ক্ষতিসাধিত হয় তা ইসলাম সমর্থন করে না। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের পর্যায়ে ইসলামী নীতিমালা হচ্ছে ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও ভেজাল মুক্ত পরোপকারিতা। সত্যিকার বিশ্বস্ত মুসলমান ব্যবসায়ী প্রত্যেক কারবারে দুনিয়ার মুনাফা অর্জনের সাথে সাথে পরকালের মঙ্গল তথা জান্নাত লাভের প্রতি লক্ষ্য রাখতে বা আল্লাহকে রাজী খুশি করতে ভুল করবেন না।


ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়, আর এসব অখাদ্য, কুখাদ্য খেয়ে এদেশের মানুষ প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিষাক্ত খাদ্যের কারণে নানা প্রাণঘাতী ভেজাল মানুষকে তিলে তিলে ধ্বংস করে। সে কারণে মানুষ সদা আতংকগ্রস্ত থাকে। আর অসুস্থ মানুষের জন্য দরকার ওষুধ, সেই ওষুধেও ভেজাল পরিলক্ষিত হচ্ছে, ওষুধের গুণগত মান নির্ণয়ে যথাযথ নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয় না।

মেয়াদ উত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে রুগি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। একথা সত্য প্রত্যেক ধর্মেই মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা ও মানবতাবোধ বিদ্যমান আছে। তাই মানুষের মধ্যে মানবিকতা, পারস্পরিক মমত্ববোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা একে অপরকে আপন করে নেয়া। মানুষ বাঁচার জন্য যে খাদ্যের উপর নির্ভরশীল, তা যদি ভেজাল মিশ্রিত হয়ে অস্বাস্থ্যকর ও অকল্যাণকর এবং জীবন নাশের কারণ হয় তাহলে মানুষ বেঁচে থাকবে কী করে।


ভেজাল এক প্রকার প্রতারণা : সকল ধর্মের বিচারে ধোঁকাবাজি, প্রতারণা চালাকি ও বিশ্বাসঘাতকতা নিষিদ্ধ। সমাজের যে কোন মানুষ এসব প্রতারণাপূর্ণ ব্যবসাকে ঘৃণাভাবে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের জানমাল রক্ষার চেষ্টা করে। বিশেষভাবে ইসলামে ধোকা ও প্রতারণা কোন ভাবেই বৈধ নয় এবং হারাম রাসুল্লাহ (সা) তা থেকে মানুষকে সতর্ক করেছেন এবং অবৈধ ক্রয়-বিক্রয় তথা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সকল প্রকারের প্রতারণামূলক পন্থা অবলম্বনকে হারাম ঘোষণা করেছেন।

বর্তমানে প্রতারণার ভয়াবহতা প্রকট আকার ধারণ করছে। পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে মানুষ তার অপর ভাইকে ঠকানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যা সত্যই ধর্ম ও মানবতা বিরোধী এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত মহানবী (সা) প্রতারণামূলক ক্রয়-বিক্রয়কে নিষিদ্ধ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ) “রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছুই নেই যে, তুমি এক ব্যক্তির সাথে মিথ্যার আশ্রয় নিবে যে তোমাকে বিশ্বাস করে।” (সহীহ মুসলিম)


“হযরত আবু হুরায়রা (র:) থেকে বর্ণিত। রাসুল্লাহ (সা) খাদ্যবস্তুর একটি স্তুপের পাশ দিয়ে গমনকালে তার ভিতরে নিজের হাত ঢুকালেন। তাঁর হাতে কিছুটা ভিজা অনুভূত হলো। তিনি বললেন, ও খাদ্যওয়ালা! একি ভিজা কেন? ঐ ব্যক্তি বলল ইয়া রাসুলাল্লাহ এতে বৃষ্টির পানি পড়ছে। রাসুল (স:) বললেন তা তুমি ভেজাগুলো স্তুপের উপর কেন রাখলে না যাতে লোকেরা তা দেখতে পায়? যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয় সে আমার দলের অন্তর্ভুক্ত নয়। (সহী মুসলিম মেশকাত)


এছাড়া সহীহ বুখারী ও সহী মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে জানা যায় রাসূলুল্লাহ (সা) নাজাশ অর্থাৎ নকল ক্রেতা সেজে পণ্যের দাম বাড়ানোকে প্রতারণামূলক কাজ বলেছেন এবং তা নিষিদ্ধ করেছেন। অনুরূপভাবে সিমসার (দালালের) ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কৃষককে ঠকানোও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। অনুরূপভাবে কেনার নিয়ত ছাড়া শুধু দাম বাড়ানোর উদ্দেশে কোন জিনিসের বেশি দাম বলাও প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির অন্তর্ভূক্ত। বিক্রেতার পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়ানোই এ জাতীয় তৎপরতার লক্ষ্য।

এটাকে নিষিদ্ধ করে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন ‘তোমরা কেনার নিয়ত ছাড়া শুধু দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দরদাম করবে না।” অথচ সমাজে ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন, বিপণন ও পরিবেশনের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতিসাধন করা মানবতা বিরোধী গুরুতর অপরাধ নয় কি? এরফলে শুধু অপরের ক্ষতিসাধন হয় না বরং নিজেও এ ক্ষতির শিকার হতে হয়। তার কারণ, সেতো এ সমাজেরই একজন ভোক্তা সদস্য।

 তাই মানবতা বিধ্বংসী এই ভেজাল মিশ্রণ ঘাতক ব্যাধি থেকে সকলেই পরিত্রাণ চায়। সমাজে কে চায় স্বাভাবিক সুস্থ জীবন যাপন করতে। সুতরাং আমাদের সকলেই এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। আল্লাহ তা’আলা বলেন (আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।) অর্থাৎ হারাম পথে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে এবং অন্যায়ভাবে একে অপরের মাল ভক্ষণ করে তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস করোনা। (ইবনে কাছির) এছাড়া মহান আল্লাহর এক স্বাভাবিক নিয়ম বা রীতি হচ্ছে “মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ, যে ক্ষমাকরে ও আপোষ করে তার পুরষ্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে, নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীকে পছন্দ করেন না” (শুরা-৪০) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন “আর যে লোক সীমালঙ্ঘন করে ও জুলমমূলকভাবে কাজ করবে তাকে আমরা অবশ্যই জাহান্নামে পৌছে দিব।” (সূরা নিসা, ৩০ নং আয়াত) অর্থাৎ দুনিয়ার সুখের জন্য যে প্রতারণা করছে জুলুম করছে তার পরিণাম হবে জাহান্নাম। তাই কালোবাজারি, মজুদদারী ও খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, কারণ এসব কৃত্রিম কারসাজির ফলে বাজারের স্বাভাবিক ক্রয়-বিক্রয় বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য ক্ষুন্ন হয়, সর্বসাধারণ চরম দুর্ভোগের শিকার হয়।


ভেজাল প্রতিরোধে তাকওয়ার গুরুত্ব : একজন ব্যবসায়ীকে হালাল রুজি উপার্জনে অবশ্যই আল্লাহর স্মরণে ব্রতী হতে হয়। কেননা ব্যবসা হলো জীবিকা নির্বাহের একটি বৈধ মাধ্যম। এক্ষেত্রে তাকে সর্বদা তাকওয়া বা আল্লাহভীরুতা, সততা, আমানতদারী ও ন্যায়পরায়ণতা অন্তরে জাগ্রত করতে হবে। যখনই একজন সৎ, বিশ্বস্ত ব্যক্তির মধ্যে এ ধরনের চিন্তা চেতনা লালিত জাগ্রত হতে থাকে, তখন সে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাবতীয় কর্মকান্ড আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে পরিচালিত হতে বাধ্য। কারণ মানুষকে অপরাধ মুক্ত রাখতে হলে প্রথমে দরকার আল্লাহর ভয় যাকে আরবীতে বলা হয় তাকওয়া। লোক চক্ষুর অন্তরালে পুলিশি প্রহরা যেখানে ব্যর্থ, গোয়েন্দা বাহিনী যেখানে অপারগ, স্যাটেলাইটের তীক্ষè দৃষ্টি যেখানে নিস্ক্রিয়।

 সেখানেও আল্লাহর ভয় মানুষকে অপরাধ মুক্ত রাখতে পারে। পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি, সৃষ্টিজীবের কোন কিছুই তাঁর দৃষ্টিকে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই এই একীন বা দৃঢ় বিশ্বাস মানুষের অন্তরে এনে দেয় সেই তাকওয়া নামক বীজটি। তখন তার পক্ষে সম্ভব নয় কাউকে ধোঁকা দেয়া, অসৎ লেনদেন করা, প্রতারণার আশ্রয় নেয়া, দুনিয়ার লোভ-লালসা ও ভোগবিলাস ও নীতিকে প্রাধান্য দেয়া। এ মর্মে আল্লাহ সোবাহান তাআলা বলেন “তোমরা যেখানেই থাকো তিনি (আল্লাহ) তোমাদের সাথে আছেন, তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।” (সুরা হাদীস আয়াত-৪)

এ আয়াতের তাৎপর্য কোন সময়েই তিনি তোমাদের থেকে দূরে থাকেন না, বরং তোমরা যেখানেই থাকো, যে অবস্থায় থাকো, তিনি তা ভাল করেই জানেন এবং প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল কর্মই দেখেন। আল্লাহ আরো বলেন অন্তরের গোপন কথাও তিনি জানেন (হাদীদ-৬)।


খাদ্যে ভেজাল ও কালোবাজারী নামক দুর্নীতি আমাদের সমাজের রন্ধ্র্রে রন্ধ্র্রে ঢুকে পড়েছে। দেশের সর্বত্রই ভেজাল খাদ্যের ছড়াছড়ি ও মহাসমারোহ চলছে। এটি আজ মহামারী আকারে ধারণ করেছে। ভেজাল একটি নিঃসন্দেহে প্রতারণামূলক পদ্ধতি, যা খাদ্যদ্রব্যের কাঙ্খিত গুণগত মান ধ্বংসের প্রয়াস সুষ্পষ্ট। এ মহাবিপদ থেকে দেশ, জাতি ও সমাজকে বাঁচাতে হলে সরকার, জনগণ, এনজিও সব ধরনের প্রচার মাধ্যম, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারক, বুদ্ধিজীবী সচেতন মহলসহ সকলকেই একযোগে কাজ করতে হবে এবং ধর্মীয়বোধে বিশ্বাসী, মানবতা, ন্যায়পরায়ণতা সামাজিক কর্তব্য দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার অনুশীলনের মাধ্যমে এর প্রতিবিধান সম্ভব, সেই সঙ্গে জনগণের মাঝে ভেজাল বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

 এ বিষয়ে তাদের যথাযথ জ্ঞান দানের মাধ্যমে উপলব্ধি সৃষ্টি করা, ভেজালের বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সমাজে ভেজালকারীদেরকে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বয়কট করা যেতে পারে, সেই সাথে দরকার আইনের সঠিক প্রয়োগ। সম্প্রতি খাদ্যদ্রব্য ভেজাল রোধকল্পে চলছে ভেজালবিরোধী অভিযান, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পঁচাবাসি খাবার পরিবেশন এবং খাবারে ভেজাল দেয়ার অপরাধে অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে আর্থিক দন্ড ও জেল জরিমানা করা হচ্ছে। ভেজালের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণও সোচ্চার হচ্ছেন।

 এক্ষেত্রে মহানবী (স:) একটি হাদীসের প্রয়োগ অতি জরুরি তা হচ্ছে হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.) বলেন নবী (স:) এরশাদ করেছেন সর্বাপেক্ষা পবিত্র রোজগার হচ্ছে ব্যবসায়ীদের, তবে শর্ত হচ্ছে তারা যখন কথা বলছে তখন মিথ্যা বলবে না, কোন আমানতের খিয়ানত করবে না। কোন পণ্যক্রয়ের সময় সেটাকে মন্দ সাব্যস্ত করে মূল্য কম দেয়ার চেষ্টা করবে না। নিজের মাল বিক্রির সময় সে মালের অযথা তারিফ করে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করবে না। তার নিজের নিকট অন্যের ধার থাকলে পাওনাদার অযথা ঘুরাবে না। অপর পক্ষে সে কারো কাছে কিছু পাওনা হলে তাকে উত্ত্যক্ত করবে না। (মারেফুল কোরআন-২৪৪) তাই ভেজাল বিরোধী অভিযান যেমন জোরদার জরুরি তেমনি সচেতনতা প্রয়োজন সর্বত্র। আসুন আমরা বিষপান থেকে দেহকে রক্ষা করি। কোরআন সুন্নাহর পথে এগিয়ে চলি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
লেখক ঃ ইসলামী গবেষক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক, কলেজ প্রভাষক।
 [email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রাইভেট কোচিং

প্রফেসর মোঃ খালিকুজ্জামান চৌধুরী:প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠান ও নকলমুক্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিষয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এটা স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের শিক্ষা সম্প্রসারণ নীতির সুফল বলা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো-প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম কেমন চলছে? স্পষ্টভাবে বলতে গেলে বলতে হয়- নিয়মিতভাবে রুটিন অনুসারে ক্লাসগুলো হচ্ছে কি? পরীক্ষা কি নকলমুক্ত? সত্য বটে, দেশে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান – আদর্শ স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে।

 এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়- সুযোগ্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের পরিচালনায় সবকিছুই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছেঃ ক্লাসগুলো রুটিন অনুসারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ক্লাসে ছাত্র- ছাত্রীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক, শিক্ষকগণ পেশাগত দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান, প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাডেমিক শৃংখলাসহ সব ক্ষেত্রে শৃংখলা রক্ষা করা হচ্ছে, নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান সবদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখেন এবং নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠানসহ প্রত্যেকটি বিষয় তদারক করেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক।

এরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশে যত বেশি থাকবে ততই দেশের মঙ্গল। কিন্তু বাস্তব অবস্থার নিরিখে এর সংখ্যা বেশি নেই। ভাল-মন্দ মিলিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আছে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেশে অনেক রয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে, এরূপ নামসর্বস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও দেশে আছে যার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

 এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গেলে দেখা যাবে- রুটিন অনুসারে ক্লাস হচ্ছে না, ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাসবিমুখ, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণে কখনো কখনো আদৌ কোন ক্লাস হয় না, শিক্ষকগণ ক্লাসে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রী না পেয়ে ফিরে আসছেন, কোন কোন শিক্ষক ক্লাস নেন না, আবার শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ দায়সারা গোছের ক্লাস নেন, কোন কোন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পাঠগ্রহণের বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহিত না করে প্রাইভেট কোচিংয়ের দিকে টানছেন এবং অর্থলিপ্সু হয়ে ব্যাপকভাবে প্রাইভেট কোচিং শুরু করে দিয়েছেন, বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক নয়, ছাত্র রাজনীতি গঠনমূলক না হয়ে ধ্বংসাত্মক রূপধারণ করেছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান আছেন কিন্তু তিনি যেন নামেই আছেন।


এবার প্রাইভেট কোচিং বিষয়ে আসা যাক। সুদূর অতীতে তেমন প্রাইভেট কোচিং ব্যবস্থা ছিল না।  শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ক্লাসে উপস্থিত থেকে নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করতো এবং ক্লাসশেষে বাসা-বাড়িতে গিয়ে নিজের মত পড়াশুনা করতো। কিন্তু বর্তমান অবস্থা ভিন্ন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যক্রমে নতুন নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে- এসেছে নতুনত্ব। বিষয়ের পরিধি অনেক বেড়ে গেছে। কিছু জটিলতারও সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে বিশ্বায়নের যুগে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং উন্নতির লক্ষ্যে যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আবার ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখী হতে হয় শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছু কিছু সীমাবদ্ধতাও লক্ষ্য করা যায়। তাই বাস্তবতার তাগিদে যৌক্তিক কারণেই শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়ে।


সাম্প্রতিককালে দেশে প্রাইভেট কোচিং ব্যবস্থার প্রসার ঘটেছে। দেশে কোচিং সেন্টার সম্প্রসারিত হয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত কোচিং সেন্টারগুলো বিস্তৃত। এর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশে অনেক কোচিং সেন্টার আছে। ভাল-মন্দের সঠিক পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। তবে তথ্যসূত্রে জেনেছি, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভাল কোচিং সেন্টার রয়েছে। এসব কোচিং সেন্টার দ্বারা আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। আবার এর ব্যতিক্রমও আছে যেগুলো নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মাঝে-মধ্যে লেখালেখি হয়।

অভিযোগ পাওয়া যায়-কোচিং সেন্টারে কর্মরত শিক্ষকদের কেউ কেউ নিজ বিষয়ের ওপর তেমন দখল রাখেন না, শিক্ষাদান পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ, কোচিং সেন্টারের পরিচালকের মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক-শিক্ষার্থী প্রস্তুত করা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাসের সময়ে কোচিং সেন্টার চালু রাখা হয়েছে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতির ব্যাপারে উৎসাহিত করাতো দূরের কথা, তাদের ক্লাসবিমুখ করে প্রাইভেট কোচিং এর প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আবার অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের জন্য পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কোচিং সেন্টারের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায় যা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।বাংলাদেশ আমার দেশ। এ দেশেই আমি জন্মেছি। বড় ভালবাসি দেশটিকে। পরিশেষে স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বিনয়ের সঙ্গে কয়েকটি পরামর্শ দিতে চাই।


পরামর্শগুলো হলোঃ  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস ও নকলমুক্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীরা সর্বদা ক্লাসমুখী থাকবে- তারা রুটিন অনুসারে সকল ক্লাসে উপস্থিত থেকে ঈষধংং খবপঃঁৎব অনুসরণের মাধ্যমে ক্লাস অনুষ্ঠান সফল করবে এবং সঠিক নির্দেশনা অনুযায়ী পড়াশুনা করবে। কখনো পরীক্ষায় নকলের কথা ভাবা যাবে না। পরীক্ষা কক্ষে নকল কোন সুফল আনে না। তাদের জীবনে উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই নকলকে ঘৃণা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাসের সময়ে ক্লাস বাদ দিয়ে কোন প্রাইভেট কোচিং নয়, কেবলমাত্র ক্লাসের সময়ের বাইরে প্রাইভেট কোচিং এর মাধ্যমে বিষয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে উন্নতির জন্য চেষ্টা করবে শিক্ষার্থীরা।


প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণ পেশাগত কার্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে নিয়মিত পড়াশুনার মাধ্যমে বিষয়ের ওপর দখল অর্জন করবেন এবং শ্রেণীকক্ষে সফল পাঠদানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তাঁরা আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান হবেন। তাঁদের কার্য ও আচরণ হবে শিক্ষকসূলভ। স্মরণযোগ্য, একজন সফল শিক্ষক সর্বদাই শিক্ষার্থীদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি বেঁচে থাকেন শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে।


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান একজন দায়িত্বশীল বড় কর্মকর্তা। তাঁর কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও ব্যবস্থাপনা কৌশলের ওপর প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাঁর দৃষ্টি থাকবে চারদিকে। প্রতিষ্ঠানের ক্লাস অনুষ্ঠানসহ প্রতিটি কাজ তিনি নিয়মিত তদারক করবেন। ক্লাস অনুষ্ঠান ও পরীক্ষা  অনুষ্ঠান-বিষয় দুটিকে গুরুত্ব দেবেন। কর্তব্যে অবহেলা/দয়িত্বহীনতা বা অন্য কোন দোষত্রুটির জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক/কর্মচারীকে সংশোধনের সুযোগ দিতে পারেন। সংশোধিত না হলে কোন ছাড় নয়, তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন প্রতিষ্ঠান প্রধান।


শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে অভিভাবকগণের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবনে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, তাঁরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের দিকে দৃষ্টি রাখবেন কারণ ছেলে-মেয়েরাই তাঁদের ভবিষ্যৎ। অভিভাবকগণ ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা ও এ সংক্রান্ত অগ্রগতির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেবেন এবং সঠিক নির্দেশনা দিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবেন। প্রাইভেট কোচিং ব্যবস্থা পরিচালিত হবে ক্লাসের সময়ের বাইরে। ছাত্র-ছাত্রীদেরকে কোনমতেই ক্লাসবিমুখ করা যাবে না। তাদের প্রস্তুতি ও গঠনের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে প্রাইভেট কোচিং। কোচিং


সেন্টারগুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে এমন কোন কর্মকান্ডে লিপ্ত হবে না যা শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং এ জন্যে সমাজে ঘৃণিত ও নিন্দিত হতে হয়।অনেক আগে থেকেই এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র রাজনীতি চলে আসছে। আজ পর্যন্তও কোন সরকার ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেননি। এ ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ-ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পরিহার করতে হবে।

সকল রাজনীতি হবে গঠনমূলক-কল্যাণবাহক। ছাত্র রাজনীতি দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম যেন কোনক্রমেই ব্যাহত না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলকে দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশে আইনের শাসন থাকবে। শুধু আইন থাকলেই চলবে না, আইনের প্রয়োগ থাকবে। অপরাধ সবসময়ই অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে তার শাস্তি বিধান করতে হবে।

শিক্ষকগণ মানুষ গড়ার কারিগর। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেই মানুষ বড় হয়- জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তাঁদেরকে অবহেলা করা যাবে না। যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে তাঁদের। স্বাধীন দেশে শিক্ষকদের জন্য গৃহীত হোক বৈষম্যহীন নীতি-তাঁরা হোক বৈষম্যমূলক আচরণ ও কর্মকান্ডের শিকার এমনটি কখনো কাম্য নয়। জাতীয় স্বার্থে শিক্ষকদের প্রতি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সমনীতি ও সুদৃষ্টি কাম্য।  
লেখক ঃ অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত)
০১৭১৮-৭৪৭৪৪১

এই বিভাগের আরো খবর

সম্ভাবনার ফুলগুলো যেন ঝরে না যায়

আতাউর রহমান মিটন :যশোরে বসে লিখছি। এখানে এসেছি এক জাপানী বন্ধুকে সাথে নিয়ে। তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ জাপানী এই নারী বাংলাদেশকে ভালবাসেন। এই দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে তিনি কিছু একটা করতে চান। নানা আইডিয়া তার মাথায়। তিনি কথা বলছেন স্থানীয় মানুষদের সাথে। এই কাজে দোভাষী হিসেবে সহযোগিতা করছেন জাপান প্রবাসী বন্ধু চিত্রগ্রাহক ও জাপানের স্কুল শিক্ষক খন্দকার আনিসুর রহমান।

আমরা এসেছি যশোরের গদখালি ফুৃলের হাট এলাকায়। এটা বাংলাদেশের অন্যতম ফুল উৎপাদন কেন্দ্র। এই এলাকায় ৭৫টি গ্রামে প্রায় ১৫০০ হেক্টর জমিতে ফুল উৎপাদন করা হয়, বছরে যার অর্থ মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এখান থেকে ফুল যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

বিদেশেও যাচ্ছে শুনেছি। আমাদের জাপানী বন্ধু এসেছেন এখানকার গোলাপ কিভাবে জাপানে নিয়ে যাওয়া যায় এবং কিভাবে গোলাপ ফুলের নির্যাস (এসেনসিয়াল ওয়েল) তৈরী করা যায় সে সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে। এটা করা হবে বাণিজ্যের জন্য নয়, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের পড়শোনা এগিয়ে নিতে বৃত্তি দেয়ার অর্থের যোগানের জন্য। পুরোটাই একটা সম্ভাবনা। কাজটা সহজ নয় কিন্তু অসম্ভবও মনে করিনা।  

গদখালি এলাকা আমার কাছে একটা বিস্ময়। এ বিষয়ে আমি পরে আরও লিখব। এখানে এসে আমি আবারও ‘দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া’ – কথাটার মর্ম অনুভব করলাম। আমাদের চারপাশে কতকিছু দেখার আছে, করার আছে কতকিছু কিন্তু আমরা সেসব নিয়ে ভাবতে পারছি না অথবা ভাবছি না! কেন ভাবছি না বলতে পারেন? বন্ধু আনিসুর রহমান আনিস ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমার কথা শুনে বললেন, ‘আপনি তো প্রায়ই জাপানে যান, সেদেশে দেখেছেন উপহার দেবার জন্য অল্প টাকার মধ্যে কত শত রকমের জিনিস পাওয়া যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কত ধরনের জিনিস তৈরি করছি? ধরুন একজন বিদেশি বাংলাদেশে এসেছেন এবং তিনি ১০০ টাকা দামের মধ্যে ছোট ছোট স্যুভেনির বা উপহার সামগ্রী কিনবেন। বলতে পারেন তার সামনে কত ধরনের উপায় খোলা আছে?’ আমরা কেন ছোট ছোট জিনিস সুন্দর করে উপস্থাপন করছি না? আমাদের ফুল নিয়েই তো কত কিছু করার আছে!’

আমি হতবিহ্বল বোধ করছি। সত্যিই তো! আমাদের দেশে আমরা কতকিছু অনাদরে অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছি। আমরা গানে গানে বলছি বটে, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি’ কিন্তু সেই জন্মভূমি জননীর প্রতি আমাদের অবহেলা যেন কিছুতেই কাটছে না। বাংলাদেশের বহু মানুষ মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচি নিয়েছে, আমাদের বহু মানুষ সুইস ব্যাংকে কাড়ি কাড়ি টাকা জমাচ্ছে কিন্তু দেশের ভেতরের সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত করার জন্য আমরা মনোযোগ দিতে পারছি না।

 আমাদের ছেলেমেয়েরা হতাশায় দিনাতিপাত করছে, ওরা লেখাপড়া শেষ করে বেকারত্বের জ্বালায় ধুকে ধুকে মরছে অথচ শুধু জাপানেই কর্মক্ষম মানুষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। শুধু জাপান নয়, দুনিয়ার বহু দেশেই এখন কর্মক্ষম মানুষের চাহিদা বাড়ছে কিন্তু আমরা সেই বাজারটা ধরতে পারছি না। আমাদের সেই প্রস্তুতি নাই।

ক্ষমতার কেন্দ্রে বসবাসকারীদের ভেতরে পরস্পরকে গালাগালি দেয়া বা ল্যাং মেরে ধরাশায়ী করার আয়োজন  যত আছে, সেই তুলনায় দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের সৃজনশীলতা বিকাশের আয়োজন সামান্য। আমরা সেই পুরনো ধারায়, গতানুগতিক পথেই উন্নত বা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছি। সৃজনশীল সক্ষমতার উন্মেষ ঘটিয়ে বড় ধরনের, অবাক করা পরিবর্তনের সাহস আমরা দেখাতে পারছি না।

শুধু ফুল চাষ দিয়েই যদি একটি এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার এতটা পরিবর্তন করা যায়, অথবা নাটোরের ঔষধি গ্রামের মত কেবল ঔষধি গাছের চাষ করেই যদি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা বদলিয়ে ফেলা যায় তাহলে পরিবর্তনের সেই সক্ষমতা আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেবার জন্য আমাদের প্রচেষ্টার অভাব কেন? সেই ১৯৮৩ সালে রজনীগন্ধা ফুলের বাণিজ্যিক চাষ শুরুর মাধ্যমে গদখালিতে বাণিজ্যিক ফুল চাষাবাদ শুরু হয়। এখন এখানে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফুলের চাষ হচ্ছে।

এখানকার চাষীরা বললেন, তারা নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে যা ভাল বুঝছেন সেভাবে চাষাবাদ করছেন। কিন্তু এর সাথে আধুনিক ও উন্নততর জ্ঞানের সম্মিলন ঘটানো সম্ভব হলে এখানকার চাষীরা আরও লাভবান হতে পারেন। বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থাপনা ও ফুল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা ও প্রযুক্তি এখানে সহজলভ্য করা গেলে এটি বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভাবনাময় এই ফুল বাণিজ্যের সৃজনশীল প্রসার সম্ভব হবে না।

আমার সাথে আসা জাপানী নারী মিস কায়োকো ফুজিসিগে তার দেশে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য ‘বিডিডি নিউজ’ নামে একটি অনলাইন ম্যাগাজিন বা নিউজ পোর্টাল চালু করেছেন। তিনি চান জাপানীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশি করে জানুক এবং এই দেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসুক। তিনি মনে করেন, কেবল বাংলাদেশীদের জন্য নয়, বরং জাপানী নাগরিকদের জন্যেও বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এটা পারস্পরিক লাভবান হওয়ার বিষয়।

যেমন ধরুন জাপানে এখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তাদের মানুষ দরকার অথচ বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ রয়েছে। জাপান খাদ্য উৎপাদনে অনেক পিছিয়ে আছে কিন্তু বাংলাদেশে এখনও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ বিদ্যমান।

 জাপানীদের কাছে টাকা আছে কিন্তু বিনিয়োগের সুযোগ কম অথচ বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এমনকি জাপানের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজির মালিকেরাও যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন এদেশের জন্য সেটাও একটা বড় বিনিয়োগ হতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে জাপানী জ্ঞান ও দক্ষতা অনায়াসে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে জাপান বিরাট সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু কোথাও একটা গ্যাপ রয়েছে যার কারণে আমরা জাপানের কাছের বন্ধু হয়েও আজও দূরে দূরেই রয়ে গেলাম। অথচ জাপানের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে গেল পূর্ব এশিয়ার প্রায় সবাই!

আমাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা সৃজনশীলতার পথ ছেড়ে সেই দড়ি বাঁধা নৌকায় বৈঠা চালাচ্ছি। ফলে আমরা কষ্ট করছি কিন্তু অগ্রসর হচ্ছি না। আমাদের প্রশাসনকে গণমুখী করে ঢেলে সাজাতে হবে। নাগরিক সেবাদানে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ‘সরকারী মাল, দরিয়া মে ঢাল’ – এই মানসিকতা থেকে উত্তরণের জন্য ‘প্রণোদনাপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা’ চালু করতে হবে। অর্থাৎ প্রশাসনে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের ভাল কাজ বা পদক্ষেপগুলোকে যথাযথভাবে উৎসাহিত করতে হবে।

 মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের অন্যতম কাজ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদারকরণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং অন্যান্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও সমন্বয় করা। এই কাজের সাথে নাগরিক সমাজের সেতৃবন্ধন সৃষ্টি করতে হবে।

এসব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংবিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে দলীয় ক্যাডার নির্ভর বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা মাঠ পর্যায়ে যারা গড়ে তোলার চেষ্টা করে তারা কখনই সরকারের সহযোগী নয়। তাদের দলীয় পরিচয় যাই হোক কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে তারা সরকারের কোন উপকার করছে না।  

সরকার জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করতে আগ্রহী। এর জন্য বছর বছর বরাদ্দও বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি নথি অনুযায়ী গৃহীত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রায় ৯০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে দাবি করা হলেও বাস্তবে উন্নয়ন বা পরিবর্তনের চিত্রটা ভিন্ন রকম। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেই এ বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ বিদ্যমান।

পত্রিকান্তরে জানা যায়, কৃষি জমিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রতি উপজেলায় কতগুলি ইটভাটা হবে তার একটি সিলিং করে দেয়ার জন্য ২০০৯ সালে প্রস্তাব করা হলেও ২০১৬ সালে এসেও তাদেরকে একই বিষয়ে প্রস্তাবনা উত্থাপন করতে হয়েছে। অনুরূপভাবে, দেশে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হলেও তাতে কোন ফল আসেনি। ফল আসেনি প্রকাশ্যে জুয়া খেলা বন্ধ সংক্রান্ত প্রস্তাবনায়। বরং কোন এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে জেলায় জেলায় মাসের পর মাস প্রদর্শনী বা বাণিজ্য মেলার আড়ালে চলে জুয়া খেলার রমরমা বাণিজ্য।

পাঠক যখন এই কলামটি পড়ছেন তখন ঢাকায় চলছে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন। প্রতিবছরের মত এবারের সম্মেলনেও মাঠ প্রশাসনকে গণমুখী করা এবং নাগরিক সেবা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ পর্যালোচনা করা হবে।

বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মানুষের মন জয় করার লক্ষ্যে মাঠ প্রশাসনকে কতিপয় নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। সরকার চাইবে মাঠ প্রশাসন শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রশাসনকে আরও বেশি জনবান্ধব করা। যদিও অনেকেই মনে করেন ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করার সুপ্ত বাসনাকে বিবেচনায় রেখেই প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিবেন।

ক্ষমতাসীনরা মুখে স্বীকার না করলেও তাদের লক্ষ্য হবে ভোটে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে প্রশাসনকে ব্যবহার করা। আমরা মোটেও তা চাই না। আমরা চাই ব্যক্তি বিশেষের খুশির কথা না ভেবে জনগণের স্বার্থে প্রশাসন পরিচালিত হোক। সেখানে কোথায় বাধা তা জেলা প্রশাসকগণ নির্ভয়ে তুলে ধরুন। দয়া করে গতানুগতিকভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলনটি শেষ করবেন না।

 মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রভাবের বাইরে থেকে নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে বলে শোনা যায়। বরিশালের আগৈলঝড়ায় ইউএনওকে হেনস্তা করার ঘটনাটি এর প্রমাণ। এই ধরনের অনভিপ্রেত প্রভাববলয় থেকে প্রশাসনকে প্রটেকশন দেয়া প্রয়োজন।


আমাদের প্রত্যাশা থাকবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন জনতার স্বার্থে কাজ করবে। তারা গদখালী’র মত সম্ভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করবেন এবং বিকাশের সুযোগ দিবেন। দেশের সকল এলাকাতেই কোন না কোন সম্ভাবনা সুপ্ত অবস্থায় বিরাজমান। প্রশাসন প্রয়োজনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা নিয়ে এ বিষয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন। এক একটি জেলাকে একটি মডেল এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনতা-প্রশাসন-উন্নয়ন সহযোগী সমন্বয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। সেটা শুধু মুখে বলা নয়, আমরা এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

অতীতে যাই হয়ে থাকুক না কেন, সেটা বড় করে না দেখে বরং ভবিষ্যতের স্বপ্নটা সামনে নিয়ে আসুন। নতুন প্রজন্মকে বলুন ওদের জন্য আপনারা কি করছেন। রাজনীতি মানেই ল্যাং মারামারি হবে কেন? রাজনীতিবিদেরা কেন একেক জন স্বপ্নচারী মানুষ হবেন না? নিজেদের এলাকার সম্ভাবনাগুলোকে নিয়ে গবেষণা করে এবার তা বিকাশের জন্য স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে সংশ্লিষ্ট সকলকে সাথে নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা করুন। সাধারণ মানুষ তো আপনাদের ক্ষমতার ভাগ চায় না, তারা চায় আপনারা সফল হোন। আপনারা নিজেদের এলাকাকে ফুলে ফুলে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা করুন, দেখবেন মানুষই আপনাদের গলায় ফুলের মালা ভরিয়ে দিয়েছে।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

শুভ জন্মদিন প্রিয় অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার

রিপন আহসান ঋতু:“আলোকিত মানুষ চাই” শ্লোগানকে সামনে রেখে যে মানুষটি আলোকিত মানুষ গড়ার ব্রত নিয়েছেন তাঁকে আমরা সবাই চিনি। তিনি আমাদের সবার প্রিয় সায়ীদ স্যার অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বাংলাদেশের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন সমাজ সংস্কারক।

প্রিয় মানুষটির সাথে আমার মানসিক সম্পর্ক গড়ে উঠে ১-২ জুন ২০১২ সালে ঢাকায়  বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)র সনাক ও ইয়েস জাতীয় সম্মেলনে। এই  সম্মেলনে প্রথমবার খুব কাছ থেকে স্যারকে দেখার সুযোগ হল এবং অমৃত বক্তব্যের স্বাদ পেলাম। সেদিন কথা বলার শুরুতেই স্যার বললেন আমার সবকিছুই একটু দেরীতে হয়। আমি কয়েকদিন আগে একটা অনুষ্ঠানে বলছিলাম, যে আমার সবকিছুই জীবনে এসেছে দেরী করে।

 যেমন শৈশব এসেছে দেরী করে, কৈশোর এসেছে দেরী করে, প্রৌঢ়ত্ব এসেছে দেরী করে। সুতরাং বার্ধক্য যদি আসতেই হয়, তাহলে আমার মৃত্যুর পরই আসতে হবে। প্রথম কথা হলো তোমরা যারা তরুণ, তারা নিশ্চয়ই তরুণ, আমিও তরুণ। এই কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজে। স্যারকে যত জানতে চেয়েছি তত ঋদ্ধ হয়েছি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার মূলত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। তিনি ষাট দশকের একজন প্রতিশ্রুতিময় কবি হিসেবে পরিচিত।

সেই সময় সমালোচক এবং  সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন। তিনি একজন সুবক্তাও বটে। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যা পরিচালিত হয় মূলত বই পড়া কর্মসূচীর মাধ্যমে। তিনি বাংলাদেশের হাজার হাজার স্কুল পড়–য়া ছাত্রছাত্রীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করছেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ১৯৩৯ সালের ২৫ জুলাই কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন।

 তাঁর পৈত্রিক নিবাস বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার অন্তর্গত কামারগাতি গ্রামে। তাঁর পিতা আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। শিক্ষক হিসেবে পিতার অসামান্য সফলতা ও জনপ্রিয়তা শৈশবেই তাঁকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে। পিতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক হিসাবে আব্বা ছিলেন খ্যাতিমান। ১৯৫০ সালে আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, আব্বা তখন পাবনা এডোয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ।

কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কথা উঠলে এমন সশ্রদ্ধ উদ্বেলতায় উপচে পড়ত যে মনে হত কোনো মানুষ নয়, কোনো দেবতা নিয়ে তারা কথা বলছে। একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসার যে কী দুর্লভ বেদিতে অধিষ্ঠিত থাকেন আব্বাকে দেখে তা টের পেতাম। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় আর কী চাওয়ার থাকতে পারে। তখন থেকেই আমি ঠিক করেছিলাম এই পৃথিবীতে যদি কিছু হতেই হয় তবে তা হবে শিক্ষক হওয়া, আব্বার মতন শিক্ষক।


আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের জীবনে তাঁর শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রভাব বিস্তর। শিক্ষকদের কাছ থেকেই তিনি জীবনকে চিনেছেন, জগতকে চিনেছেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ১৯৫৫ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৫৭ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে স্নাতক সম্মান (বাংলা) এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। কলেজ জীবনের স্মৃতিতে আরো একজন তাঁর কাছে চির ভাস্কর, তিনি হলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র।

অধ্যাপক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের খ্যাতি কিংবদন্তীতুল্য। তিনি শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন ১৯৬১ সালে, মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বাইশ বছর। এম এ দেবার পর পরই তিনি ওই কলেজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল একই সময়ে মুন্সীগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তাঁর বাবা আযীমউদ্দিন।

ছেলে একই কলেজে যোগ দিলে তাঁর জন্য প্রশাসনিক অস্বস্তির কারণ হবে মনে করে তিনি কলেজের গভর্নিং বোর্ডের সভায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে অন্তর্ভূক্তি করার ব্যাপারে আপত্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল ভাল থাকায় কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে কলেজের খন্ডকালীন প্রভাষক হিসাবে তাঁকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। গভর্নিং বডির সচিব হিসাবে তাঁর বাবাকেই তাঁর নিয়োগপত্র পাঠাতে হয়েছিল। সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি জমে উঠেছিল কলেজে তাঁর যোগদানের প্রথম দিনটিতে।

 সেই দিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বললেন, ‘প্রথম ক্লাশে ছাত্রদের সঙ্গে নতুন শিক্ষকদের পরিচয় করিয়ে দেবার দায়িত্ব অধ্যক্ষই পালন করতেন এটাই ছিল নিয়ম। আমার ব্যাপারেও আব্বাকেও তাই করতে হলো। রুটিন মাফিক আব্বার পেছনে পেছনে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর একটি শাখায় গিয়ে হাজির হলাম। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তাঁর সংক্ষিপ্ত ইংরেজি ভাষণে আব্বা আমার একটা ছোটখাট পরিচয় তুলে ধরে সব শেষে বললেন, যেহেতু ওর শরীরে শিক্ষকের রক্ত আছে আমার মনে হয় ও ভাল শিক্ষকই হবে। আমার ধারণা ছিল, আমার নিয়োগের দ্বন্দ্বে পরাজয়ের ফলে উনি ভেতরে ভেতরে কিছুটা তেতে আছেন। হয়ত তাঁর সেদিনের বক্তব্যে সেই ক্রোধের কিছু প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু ঘটনা হলো ঠিক উল্টো। বক্তৃতার সময় আব্বার গলা কিছুটা ধরেই এল। মনে হল তাঁর উত্তরসূরির আসনে নিজ হাতে আমাকে বসিয়ে যেতে পেরে তিনি যেন ভেতরে ভেতরে গর্বিত এবং পরিতৃপ্ত।’ পরবর্তীতে তিনি সিলেট মহিলা


কলেজে শিক্ষকতা করেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিজীবন শুরু করেন। রাজশাহী কলেজে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর তিনি ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ) যোগ দেন। এই কলেজে তিনি দু’বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে ঢাকা কলেজে যোগদান করেন।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ঢাকা কলেজেই তাঁর শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। সে সময় ঢাকা কলেজ ছিল দেশসেরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলনস্থল। তিনি যখন ঢাকা কলেজে যোগ দেন তখন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কথা সাহিত্যিক ও গদ্য লেখক শওকত ওসমান।ষাটের দশকে বাংলাদেশে যে নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ছিলেন তাঁর নেতৃত্বে।

সাহিত্য পত্রিকা ‘কন্ঠস্বর’ সম্পাদনার মাধ্যমে সেকালের নবীন সাহিত্যযাত্রাকে তিনি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সংহত ও বেগবান করে রেখেছিলেন এক দশক ধরে। বাংলাদেশে টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকেই রুচিমান ও বিনোদন-সক্ষম ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভুত হন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। টেলিভিশনের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব।

তরুণ বয়সে তিনি কবিতা ও কল্পকাহিনী লিখতেন। তিনি বহু প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা লিখেছেন। লেখা লেখির জন্য অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কারও। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে একটু একটু করে, অনেক দিনে। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মুখে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তাঁকে এগোতে হয়েছে।

 আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ব্যক্তিত্বের প্রায় সবগুলো দিক সমন্বিত হয়েছে তাঁর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সংগঠক সত্তায়। তিনি অনুভব করেছেন যে, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজন অসংখ্য উচ্চাকাক্সক্ষা মানুষ। ‘আলোকিত মানুষ চাই’ সারা দেশে এই আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে তিনি রয়েছেন সংগ্রামশীল। আবু সায়ীদ স্যার বলেন, এই চিন্তাটি প্রথম আমার মনে জাগে ১৯৬৮ সালের দিকে। তখনই কিছু মেধাবী এবং প্রতিভাবান তরুণকে নিয়ে আমি একটি ঋদ্ধিধর্মী চক্র গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তাতে ছেদ পড়ে। তারপর স্বাধীনতা আসে। আমাদের সামনে এক বিপুল সম্ভাবনার জগৎ উন্মোচিত হয়।

 কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এক সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেই স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যেতে শুরু করে। কাজেই আবার নতুন করে আমাদের এ বিষয়ে চিন্তা শুরু করতে হয়। জাতীয় দুঃখের অর্থপূর্ণ আবাসন এবং সত্যিকার জাতীয় উন্নতি ক্ষুদ্র মানুষ দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য চাই বড় মানুষ, আলোকিত মানুষ। এই ভাবনা থেকে আবার ১৯৭৮ সালে আমরা সমবেত হলাম সেই পরিপূর্ণ মানুষ গড়ে তোলার চেষ্টায় যারা একদিন তাদের যোগ্যতা এবং শক্তি দিয়ে, প্রয়াস এবং আত্মদান দিয়ে এই জাতির নিয়তি পরিবর্তন করতে চেষ্টা করবে।’ এইসব ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সাহিত্য চর্চায় নিবিষ্ট। কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, নাটক, অনুবাদ, জার্নাল, জীবনীমূলক বই ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থভা ারও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ২৭টি। এ প্রসঙ্গে স্যার নিজেই বলেছেন, ‘লিখতে চেয়েছিলাম। লিখতে পারিনি।

 মনে হয় লেখক হয়েই জন্মেছিলাম। সেটা পূর্ণ করতে পারলাম না। এখনো আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কোটি কোটি জীবন্ত শব্দের গনগনানি। ইদানীং কিছু কিছু লিখছি। যদি আরও কিছুদিন বেঁচে যাই, তাহলে হয়তো কিছু লিখতে চেষ্টা করব।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন, ১৯৭৭ সালে পেয়েছেন ‘জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার’, ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন মাহবুব উল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার; ১৯৯৯ সালে পান রোটারি সিড পুরস্কার; ২০০০ সালে পান বাংলাদেশ বুক ক্লাব পুরস্কার। ২০০৪ সালে পেয়েছেন র‌্যামন ম্যাগস্যাসে পুরস্কার, ২০০৫ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। ২০০৮ সালে অর্জন করেন পরিবেশ পদক এবং ২০১২ সলে বাংলা একাডেমী পুরষ্কারে ভূষিত হন।  


সব সমাজেই এমন কিছু মানুষ থাকেন সংখ্যায় যাঁরা অল্প; কিন্তু যাঁদের মধ্যে জ্ঞানের ব্যপ্তি, মূল্যবোধের বিকাশ, জীবনের উৎকর্ষ, আত্মমর্যাদার মহিমা এ সবের বড় রকম বিকাশ ঘটে। এঁরা সেই ধরনের মানুষ, যাদের বেচা যায় না, কেনাও যায় না। সমাজের তরল স্রোত যাদের চার পাশ দিয়ে নিরন্তর প্রবাহিত হয়ে চলে; কিন্তু তারা এর মাঝখানে থেকেও প্রবৃদ্ধ বৃক্ষের মতো একটা জাতির ভারসাম্য সুস্থিত করে রাখেন। শুভ জন্মদিন প্রিয় অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আপনাকে।
লেখক ঃ কথা সাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭৪৯৬৮০৩

এই বিভাগের আরো খবর

সুন্দর না অসুন্দর, বেঁচে থাকা না নিস্তার পাওয়া

মাশরাফী হিরো: মরিতে চাই না আমি সুন্দর ভুবনে’ বলেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি নোবেল পেয়েছিলেন ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি রচনার জন্য। যার ইংরেজি অনুবাদ তিনি নিজেই করেছিলেন। যার দু একটি কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হলেও পুরো গীতাঞ্জলি পড়া হয়ে উঠেনি। যিনি বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীকে সুন্দর বলেছিলেন। আমাদের বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য মাত্রায়। পৃথিবীর এক কোণে বসে ইংরেজ শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও পৃথিবীকে সুন্দর বলেছেন।

ইংরেজদের দেওয়া নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছেন। যা ছিল ইংরেজদের শোষণের প্রতিবাদ। এখনতো নোবেল তদ্বির করে পাওয়া যায়। জানিনা এখন নোবেল কবিগুরুকে দিলে প্রত্যাখ্যান করতেন কিনা নাইট উপাধির মতো? প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে পুরস্কার পেয়েছিলেন। যা বাংলা ও বাঙালিকে পরিচয় করে দিয়েছিল বিশ্ব সাহিত্যে। এই জন্য সমস্ত বাঙালি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোন উপায় আমাদের নেই।

 কারণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তার বাড়ি নয়। যা পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। আমাদের শিকড় যেখানে সেখানে আমাদের পৌঁছাবার কোন উপায় নাই। যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বাঙালি জাতির জন্য। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলে শুধু এই দেশের নয়, আমি সারাবিশ্বের।

অর্থাৎ আমাদের জন্ম বাংলায় হলেও সারাবিশ্বই আমাদের। এখন কবিতা কিছুটা অচল। সময় কোথায়। পৃথিবীকে উন্নত করতে হবে। প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে হবে সর্বত্র। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, গ্রহের সন্ধানে নভোযাত্রীদের আকাশে গমন আবার পারমানবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিও চলছে।

 আইনস্টাইন পারমানবিক বোমা তৈরি করেছিলেন। জাপানের হিরোসিমা, নাগাশাকি আক্রান্ত হয়েছিল। ভয়াবহতা এত ছিল যে আইনস্টাইন পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারকে রীতিমত পাপ মনে করেছিলেন। তাইতো পারমাণবিক বোমার ¯্রষ্টা পারমাণবিক বোমা তৈরি নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলেন। পৃথিবী এখন অনেক আধুনিক হয়ে উঠেছে। সুন্দর হয়েছে কিনা জানি না? দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু দেশ এখনও খাদ্যাভাবে দিশেহারা। মধ্যপ্রাচ্যে বেঁচে থাকাটাই এখন মুশকিল।

 তাছাড়া উন্নত বিশ্বের দেশগুলিও অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা ভাবিয়ে তুলেছে তাদের। বিশ্বায়নের ধোঁয়া এখন আর চলছে না। বিশ্বায়নের উদ্যোক্তারা বেরিয়ে এসেছে ইউরো থেকে। যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নিয়েছে। নিজস্বতা খুঁজতে গিয়ে বেছে নিয়েছে পাগলকে। ট্রাম্পের পাগলামি দিন দিন বেড়েই চলেছে।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করছে বিশ্ব থেকে। ন্যাটো থেকে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটাকে ব্যবহার করেই এতদিন স্বার্থ সিদ্ধি করেছে তারা। মুসলিম দেশগুলির যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আবার সৌদি আরবের সাথে ঠিকই অস্ত্র চুক্তি করেছে। তারা মুরব্বিপনা করতে চায় অর্থ খরচ ছাড়া। কারণ অর্থনৈতিক মন্দা। হামলা করে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি।

 উন্নয়ন আর প্রযুক্তি আমাদেরকে বাঁচাতে পারছে না। বৈশ্বিক উষ্ণতা ভাবিয়ে তুলছে সারা বিশ্বকে। যার ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে উন্নত বিশ্ব। তাছাড়া শিল্প দুষণে দুষিত হচ্ছে সারাদুনিয়া। উন্নয়ন এ প্রযুক্তির ছোঁয়া যখন সর্বত্র তখন এখনকার মহাবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস বলছেন, অচিরেই মানুষকে বসবাসের জন্য অন্য কোন গ্রহের সন্ধান করতে হবে। এর মূল কারণ হলো পৃথিবী অচিরেই মানুষের বসবাস অযোগ্য হয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো বিজ্ঞানীরা এখনও কোন গ্রহ খুঁজে পাননি যেখানে মানুষ বসবাস করতে পারে। আর কখনও যদি খুঁজে পান তবে তা নিয়েই যে যুদ্ধ হবে না তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তাছাড়া ওখানেই মানুষ বসবাস শুরু করলে যে কতদিন বসবাস উপযোগী থাকবে তাওতো প্রশ্নসাপেক্ষ।


এই আধুনিক এ তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও যখন ভিন্ন কোন গ্রহের সন্ধান পাওয়া যায়নি, যেখানে মানুষ বসবাস করতে পারে। সুতরাং তা আর পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না। তাই বাধ্য হয়েই পৃথিবীতে থাকতে হবে। পৃথিবীকে ছাড়তে চাইলেও পৃথিবী আপনাকে ছাড়ছে না। তাহলে আর সুন্দর পৃথিবীকে অসুন্দর করা কেন? যারা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তারাই এখন প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে ভাবনায় আছেন। যা থেকে মুক্তি নেই কারোর। না মানুষ, না পশু-পাখির, না পৃথিবীর। জানি না বিশ্ব কবি বেঁচে থাকলে এখন কি বলতেন? সুন্দর না অসুন্দর, বেঁচে থাকা না নিস্তার পাওয়া। এটাই এখন ভাবনার বিষয়।
লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

এই বিভাগের আরো খবর

কতদূর এগোলাম!

হাসনাত মোবারক:সুচেতনা, এই পথে আলো  জ্বেলে Ñ এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;/ সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;  সুচেতনা – জীবনানন্দ দাশ কবি যে পথের কথা বলেছেন, আসলে সেই পথ কখনো আমরা খুঁজে পাব? সেই পথে আলো আসলে কখনো জ¦ালানো হবে কিনা সন্দেহ।  আর কত শতাব্দী পার করতে হবে প্রিয় কবি জীবননান্দ দাশ আপনার কাছে আরজি জানাই। সেই পথ কী কখনো মসৃণ হবে! ক্রমমুক্তিই বা মিলবে কবে! ক্রমমৃক্তির উপায় বা কী? কীভাবে মুক্তি অর্জিত হবে! জানা আছে কারো ? কণ্টকাকীর্ণ এই পথ আমরা আদৌ পাড়ি দিতে পারব !  এসব নিয়ে নানা সংশয় জাগে।

হা্যঁ। আমরা হাজার বছরের মনীষীদের কাজ কতটুকুই বা গ্রহণ করেছি ? আমরা নারী দিবসগুলোতে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলি। বক্তৃতা দিই। সভা- সেমিনার, সিম্পেজিয়াম করি। লিফলেট, প্রচারপত্র বিলি করি।  সভা সেমিনারে সভাপতির আসন অলংকৃত করি। কিন্তু নারীদের অধিকার কতটুকুই বা অর্জিত হয়েছে এখন অবধি! এটা ভাবার সময় এসেছে। সেই বিষয়টি ভেবে তার পর না হয় নারীদের অধিকার নিয়ে দু ’ চারটি বাক্য বলতে হবে বা লিখতে হবে। 

নারীমুক্তি বা নারীর অধিকারের বিষয়ে পরিসংখ্যান মোতাবেক হয়তো নারীদের কর্মেক্ষেত্রে গাণিতিক অগ্রগতি হয়েছে কিছুটা। কিন্তু সার্বিক দৃষ্টিতে নারীদের মানসিকভাবে আমরা কতটুকু সম্মানের জায়গায় নিতে পেরেছি, সেটা ভাবা যেমন জরুরি। আবার নারীরা যে কর্মক্ষেত্রে আছে, সেখানেই  বা তারা কতটুকু নিরাপদ এবং কতটুকু সুবিধা পাচ্ছে! এই বিষয়টিতে পরিষ্কার হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি  যথাযথ পদক্ষেপ নেওটায় বাঞ্ছনীয়।

কোথায় কোনো নারী অবদমিত হলে, আমরা  কথায় কথায় বলি আমাদের নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। নারীদের শিক্ষার হার বেড়েছে। হুম। নারী ক্ষমতায়ন হলেও নারীদের চালিকাশক্তি হিসেবে সমাজের পুরুষ এগিয়ে।  অর্থাৎ সমাজ এগোয়নি এখনো। নারীকে এখনো দুর্বলতার জায়গা থেকেই দেখা হচ্ছে। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে জনকণ্ঠ  পত্রিকায় প্রকাশিত হয়,  ৫ ফেব্রুয়ারি  ২০১৭ তারিখ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে সালমা আক্তার সুমী নামে এক গৃহবধূকে এক মাস ঘরে আটক রেখে পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যদি একজন নারীকে যৌতুকের দায়ে নির্যাাতিত হতে হয়। তাহলে আমাদের সমাজ কতটুকু এগিয়েছে! নারী নির্যাতন বলতে অল্পশিক্ষিত মানুষেরা বোঝে লাঠি পেটা বা কিল ঘুষি এই জাতীয় মারধরকে। মারধর না করেও নারীকে নির্যাতিত করা হয়। মানসিক নিপীড়ন, কটুকথা। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, পেষণ ইত্যাদিভাবে নারীদের নির্যাতিত করা হয়।

ছিয়াশি হাজার গ্রামবাংলার বাংলাদেশে এখনো  সালমা, জরিনা, সখিনাদের মতো হাজার হাজার নারী অপমানিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত , পদদলিত হচ্ছে। যৌতুকের দায়ে বলি হচ্ছে।  শ^শুরালয়ে নির্যাতিত হচ্ছে। কোনোগুলোর খবর কাগজে আসে আবার কোনোগুলোর দৃষ্টি অগোচরেই থেকে যায়। কিছুই করার থাকে না। গত ২৮ মার্চ ২০১৭ তারিখে রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের দাওয়াতে ডেকে এনে বিশ^বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে।

সেই অভিযোগ রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাতেও ভুক্তভোগীরা কতটুকু ফলপ্রসু হয়েছে সেটাও ভাবতে হবে। ০৪.০৭.২০১৭ তারিখ (মঙ্গলবার) রাতে বাহাউদ্দিন নামের এক যুবকের  বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দােেয়র করেছেন ভুক্তভোগী তরুণী। এবার বুঝুন! রেইনট্রির রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি ঘটনার শিকার নারী। আসলে আমরা কতটুকু এগিয়েছি। দেশজুড়ে এত বেশি সোচ্চার। এত সচেতনতা।

 তাতে কী লাভ হলো? নারীর অবদমন ঠেকাতে পেরেছি। না। ‘ দি সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থের ফরাসী লেখক সিমোন দ্য বোভোয়ার নারীর অধিকার সম্বন্ধে বলেছিলেন,  ‘যিনি বিচারের কাঠগড়ায় অভিযুক্ত তাকে দিয়ে সঠিক বিচার পাওয়া সম্ভব নয়। ’ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে হওয়া প্রথম নারী বিচারপতি তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত ৪০০ নারী বিচারক বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়োজিত হয়েছেন।

তাতে কতদূর অগ্রসর হয়েছে নারীর অধিকার। শুধু বিচার বিভাগই নয়। আমাদের দেশের নির্বাহী প্রধানও একজন নারী। তাতে কোনো ফলপ্রসু হচ্ছে না। স্বল্পবিস্তারে বলতে হয় আমাদের দেশের মেয়েরা নির্যাতিত হওয়ার জন্য জন্মগতভাবে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আর পুরুষ তারাও পৌরুষত্বের পদাধিকার বলে নারীকে নির্যাতন করে চলছে হারহামেশাই। এসবের শেষ কোথায় বা মুক্তিই বা কোথায়।

গত মাসে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকাতে পত্রিকা- ম্যাগাজিনের  দোকানে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একজন পুরুষ ক্রেতা এসে ‘আদর্শ নারী’ চাচ্ছেন। আর্দশ নারী  যে লোকটি চাচ্ছেন, তাকে দোকানদারগুলো একবার জিজ্ঞেসালেন, ‘আপনি আদর্শ নারী নামে বই চাচ্ছেন না পত্রিকা চাচ্ছেন?’  ক্রেতা মানুষটি পরিষ্কারভাবে কিছু জানাতে পারলেন না। আসলে তিনি কী চাচ্ছেন। ঠক খাওয়া মানুষের মতো পুরুষ ক্রেতাটি দূরে সরে গেলেন। আর এদিকে উপস্থিত পুরুষগুলো আদর্শ নারী নিয়ে কটুক্তি ঝাড়তে লাগল। নারীর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ল। আমি সব মানুষের সাথে মৌখিক তর্কে জড়াই না।

 নিকোলো মেকিয়াভেলি পাঠ করে যা জেনেছি, ‘চোর শোনে না ধর্মের কাহিনি।’ সেদিন কীভেবে উপস্থিত লোকগুলোকে ডেকে বললাম, ‘আপনারা নারীদের গালিগালাজ করলেন। এই নারী কে? তারা কোথায় থেকে এসেছে? আর আপনারাই বা কোথায় থেকে এসেছেন। একবার একটু ভাবুন তো। তারা যে প্রেমটা করে এই প্রেমটা তো অবশ্যই কোনো না কোনো  পুরুষ মানুষে