বিকাল ৪:৪৬, মঙ্গলবার, ২৩শে মে, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / হাওরের দুর্গত মানুষের কান্না
হাওরের দুর্গত মানুষের কান্না
মে ১৪, ২০১৭

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ: হাওর অঞ্চলের মানুষের কান্না গণমাধ্যমের বদৌলতে এখন সবার কানে পৌছে গেছে। এই কান্না শুধু এখন আর হাওরবাসী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা গোটা বাংলাদেশের কান্না।  প্রতিদিন হাওর অঞ্চলের মানুষদের দুর্ভোগের খবর সংবাদ মাধ্যমগুলো ফলাও করে প্রকাশ করছে।

 

কিন্তু তাতেও কী কাজের কাজটি হচ্ছে? হচ্ছে না। সরকার যেটুকু সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছে সেটিও পর্যাপ্ত নয়। তার উপর আবার অনিয়ম ও দুর্নীতি তো আছেই।  সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে হলেও সরকারি সহায়তার পাশাপাশি দুর্ভোগে আক্রান্ত এসব হাওরবাসীদের পাশে বিত্তবানসহ সবার এগিয়ে আসার কথা ছিল ।


 কিন্তু আমরা তা করতে পারছিনা। এটা আমাদের ব্যর্থতা। কারণ আমরা এখনো সেভাবে মানবিক হতে পারিনি। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সহমর্মিতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে প্রকট আকারে। গোটা সমাজব্যবস্থা এখন চরম ও নির্মম পুঁজিবাদী ও স্বার্থবাদী হয়ে উঠেছে।  যার কারণে অন্যের কষ্ট আমাদেরকে আর পীড়া দেয় না। সোজা কথায় বলতে গেলে  সমাজের প্রতিটি মানুষ এখন হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর ও নির্মম।

 

হাওর অঞ্চলের এসব অসহায় মানুষগুলোর চোখ-মুখের দিকে তাকানোই যাচ্ছে না। সবকিছু হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে কিভাবে তারা বেঁচে আছেন?  একথা ভাবতেই ভেতর থেকে ডুঁকরে কান্না বের হয়ে আসে। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন জানতে পারি সরকারি কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশ করে এসব দুর্যোগ ও দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছেন।

 

হাওরবাসীর এই দুর্ভোগ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ঘটলেও এটাকে মানব সৃষ্ট একটি দুর্ঘটনা বললেও ভুল হবে না। কারণ দুর্নীতিবাজদের অনিয়মের কারণে আজ এই দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে হাওর অঞ্চলের এই ব্যাপক ক্ষতির পরিমাণ যে গোটা বাংলাদেশেই অর্থনীতির উপর কম বেশি প্রভাব ফেলবে এটা আমরা মোটামুটি সবাই অনুমান করতে পারছি।


 হাওর নিয়ে কাজ করে দেশি-বিদেশি এরকম ৩৫ টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম’ এর জরিপ মতে এই অঞ্চলের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে কত দাঁড়ায় সেটিও এখন বলা যাবে না। তবে ক্ষতির পরিমাণ যে দিন দিন বাড়বে এটা নিশ্চিত। সুনামগঞ্জের কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে হাওর অঞ্চলগুলোতে এবারে সব মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল।

 

তার মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির বোরো ধান একেবারে পুরোপুরি তলিয়ে গিয়েছে। অসময়ে এরকম অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের কারণে গোটা হাওর অঞ্চলের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়ে গেছেন। কারণ বোরো ধানের আবাদই ছিল এই অঞ্চলের মানুষদের একমাত্র ফসল। তবে অনেকে বলছেন যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ তাদের ভোগান্তি অন্যদের চেয়ে বেশি।


এই অঞ্চলের কৃষকদের যে শুধু ফসলের ক্ষতি হয়েছে তা কিন্তু না! বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে অনেকের স্বপ্ন ও আশা। মাথা গোজানোর ঠাঁইটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন অনেকে। এসব অসহায় ও নিঃস্ব মানুষগুলো আহাজারির ধ্বনিতে ভারি হয়ে উঠেছে গোটা হাওর এলাকা। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় গোটা হাওর অঞ্চলের মাত্র ৩ লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। আর বাকিদের জন্য ১৫ এবং ১০ টাকা দরে খোলা বাজারে  চাল  বিক্রির মাধ্যমে সেবা দেয়ার কথা বলছেন। যদিও এটি একেবারেই অযৌক্তিক একটা বিষয়।


 যেখানে হাওরবাসীদের মধ্যে ৮ থেকে ১০ লাখ পরিবার তীব্র খাদ্য সংকট ও খাদ্য ঝুঁকির মধ্যে আছেন সেখানে মাত্র ৩ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয়া কতটা যৌক্তিক ও বিবেক সম্মত?  তবে একথাও সত্য যে হাওর অঞ্চলের মানুষের দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও কিছু পেটুক নেতা ও আমলাদের কারণে দুর্গতদের মাঝে সঠিক মানের সেবা পৌছানো সম্ভব হচ্ছে না।

 

প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত এসব সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেয়ার কথা বলা হলেও তারা অনেকে মোবাইল ফোনে খোঁজ-খবর নিয়ে গোঁজামিল দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেছেন। দুর্গত এলাকায় অনেক কর্মকর্তা পা দিয়ে মাড়ানোর চেষ্টাও করেননি।


 অনেক কর্মকর্তা জানেই না যে কোন কোন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে! কোন কোন এলাকায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং সেই এলাকার মানুষদের এখন কী অবস্থা? কোন এলাকায় পরিমাণ সরকারি সহায়তা লাগবে? এসব কিছুই তারা জানেন না। শুধুমাত্র ফোনে একটু খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করেছেন মাত্র। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের সং্িবধানের ২নং অধ্যায়ে ২৭নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’।

 

এখন বিষয় হল সাধারণ মানুষের এরকম একটি চরম দুর্ভোগের সময় যে  সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ কাজে অবহেলা করলেন, তারা কি আমাদের সংবিধান মানেন না? যদি তারা সংবিধান মানেন তাহলে তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত থেকেও কাজে অবহেলা করলেন কেন? আর যদি না মানেন তাহলে তাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে কিনা?


 হাওরবাসী সাধারণ মানুষের এই চরম দুর্ভোগের সময় সরকারের উচিত ছিল গোটা হাওর অঞ্চলকে একটি খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে নিয়ে আসা। সেই সাথে গোটা হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গতদেরকে  অর্থনীতির মূল ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কিন্তু সরকার তা করছে না। সরকারি মহল থেকে অনেকেই বলাবলি করছেন দুর্ভোগ নাকি এখনো চরম অবস্থায় পৌছায়নি। হাওর অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষদেরই নাকি বাড়তি অন্য আয় আছে! যার কারণে সংকট তীব্র না।

 

এজন্য হয়তবা সরকার মাত্র ৩ লাখ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে আর অন্যদের খোলা বাজারে ১৫ টাকা কেজি দরে চালের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়াও যেখানে সরকারিভাবে ২০০ জনকে সহায়তা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে সেখানে হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সরকার থেকে বলা হচ্ছে সমস্যা তেমন প্রকট না। নিজের শেষ সম্বল গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করে মানুষ পেটের খাবার জোগাড় করছে। হাতে কাজ নেই! কিন্তু পেটে তো কিছু দিতে হবে!


আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এখন আগেকার চাইতে অনেক ভাল। গোটা এক দশক থেকে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন স্থিতিশীল। ভবিষৎ আমাদের অনেক সম্ভবনাময়। দেশের অভ্যন্তরে ছোট-খাট দুর্যোগ বা  দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করার সামর্থ এখন আমাদের আছে। আর এটি অর্জন করতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে। দিন মজুর শ্রমিকদের খাটা-খাটুনি দিয়ে আমরা আজ অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছি। তবে একটি দেশে যদি সুশাসন না থাকে তবে সেই দেশের প্রবৃদ্ধি পাহাড় সমান হলেও সেটি ভেঙ্গে পড়তে সময় লাগে না।


 তাই দেশের সার্বিক উন্নয় ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে এক দেশকে সুশাসনের আওতায় নিয়ে আসা খুবই জরুরি। কারণ সুশাসন ও উন্নয়ন যদি সুষম গতিতে চলে তবেই সেই দেশের উন্নয়ন হবে ‘টেকসই উন্নয়ন’। সুশাসন ছাড়া কোন দেশকেই টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির মধ্যে রাখা যায় না। এজন্য সুশাসন ও উন্নয়ন একটি দেশের জন্য খুবই জরুরি।

 

আমরা জানি দিন যতই গড়াচ্ছে আমরা ততই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে এটি স্পষ্ট। কারণ উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটি দেশে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন ঘটবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটিই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই উন্নয়নের পাশাপাশি আমরা সুশাসন কতটা পাচ্ছি সেটিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


হাওর অঞ্চলের মানুষ আজ আক্রান্ত। এটি কিন্তু শুধু হাওর অঞ্চলের মানুষদের কান্না না। এটা গোটা বাংলাদেশের কান্না। এই দুর্ভোগ গোটা বাংলাদেশের। কারণ এবার হাওরবাসীর বোরো ধানের যে ক্ষতি হল এটি কিন্তু আমাদের অর্থনীতির উপর বড় ধরনের একটি খারাপ প্রভাব ফেলবে।

 

কারণ সব সম্পদই বাংলাদেশের সম্পদ। যেখানেই সেই সম্পদ বা সম্পত্তির বিনষ্ট হোক না কেন সেটি গোটা বাংলাদেশেরই ক্ষতি। আর এর প্রভাব গোটা বাংলাদেশেই পড়বে এটাই স্বাভাবিক। হাওর অঞ্চলে এবার ৯০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সহায়-সম্বল হারিয়ে ৮ থেকে ১০ পরিবার এখন নিঃস্ব। তাদের আহাজারিতে কেঁপে উঠছে গোটা হাওর অঞ্চল।


 গোটা অঞ্চল বন্যার পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। হাঁস-মুরগি, গরু- ছাগল এবং বছরের একমাত্র বোরো ধান হারিয়ে তারা এখন ভাষাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। অনেকেই অভিযোগ করে বলছেন এটি একটি মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারদের অনিয়ম ও গাফিলতির মাশুল দিতে হচ্ছে এসব অসহায় কৃষকদেরকে। বছরের পর বছর দুর্নীতি করে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু দুর্ভোগ পোহাতে সাধারণ মানুষদের। সরকারি হিসাব মতে দেশের মোট ধান উৎপাদনের ১৮ শতাংশই আসে এখানকার ছোট-বড় হাওরগুলো থেকে।


 এছাড়াও উন্মুক্ত মাছের ২৮ শতাংশ আসে এই হাওর অঞ্চলগুলো থেকেই। দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে হাওর অঞ্চলের অবদান ধরা হয় প্রায় ৬ শতাংশ। এছাড়াও ২০১৩ সালের হাওর অঞ্চলের জীবন-জীবিকাবিষয়ক  অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রতিবেদন মতে হাওর অঞ্চলের দারিদ্র্যের হারও বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হারের চেয়ে বেশি। তাই সরকারের উচিত হবে গোটা হাওর অঞ্চলকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষণা করা।

 

ই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসীদেরকে খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে তাদেরকে অর্থনীতির মূল ধারায় ফিরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কারণ কৃষিকে বাঁচাতে হলে প্রথমে কৃষকদেরকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে কৃষকেরা ক্রমান্বয়ে কৃষি কাজের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। যারফলে একদিন  গ্রামীণ কৃষি নির্ভর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।      
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক ও সংগঠক
rased.4bangladesh@gmail.com
০১৭৫০-৫৩৪০২৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top