দুপুর ২:৫৬, বৃহস্পতিবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / স্মৃতির পাতা থেকে
স্মৃতির পাতা থেকে
এপ্রিল ২০, ২০১৭

প্রফেসর মোঃ খালিকুজ্জামান চৌধুরী: গণতন্ত্রে সংকীর্ণতার স্থান নেই-গণতন্ত্রে আছে উদারতা। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দল-মত নির্বিশেষে যার যেটুকু প্রাপ্য সেটুকু তাকে দিতেই হবে। যাঁরা দেশকে ভালোবেসেছেন, দেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন, মানুষের কল্যাণের জন্য সারাজীবন কাজ করে গেছেন তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁরা মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। প্রসঙ্গত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁদের কাছে থেকে তাঁদের কথা শোনা ও নীতি-আদর্শ লক্ষ্য করার সুযোগ হয়েছে আমার। একটু স্মৃতিচারণ করছি:

 
ষাটের দশকে স্থানীয় শাহ্জাদপুর হাই স্কুলের ছাত্র ছিলাম আমি। আমার পিতা ছিলেন ঐ স্কুলেরই একজন শিক্ষক। স্কুলে পড়াকালীন একদিন খবর পেলাম, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী শাহ্জাদপুরে আসছেন। স্কুল মাঠে একটি জনসমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। অতঃপর সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত দিন ও সময়ে সমাবেশস্থলে হাজির হয়েছিলাম তাঁকে দেখা ও তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য। ভাসানী সাহেবকে দেখলাম। তাঁর বক্তৃতাও শুনেছিলাম মনোযোগ সহকারে। এক সময় লক্ষ্য করলাম, সমাবেশস্থলে পুলিশও এসেছে।

 

একজন পুলিশ তাঁর বক্তৃতার সার কথাগুলো লিখে নিচ্ছে। এক পর্যায়ে ভাসানী সাহেব পুলিশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনতার উদ্দেশ্যে বললেন- ‘দেখুন, পুলিশ সরকারের হুকুমে এখানে এসে আমার কথাগুলো লিখে রাখছে। ওদের শক্তি কি আমাদের চেয়ে বেশি? আমরা ওদের ধরলে ওরা কি আমাদের সাথে পারবে?’ ছাত্রাবস্থায় পুলিশকে উদ্দেশ্যে করে বলা ভাসানী সাহেবের কথাগুলো শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। মওলানা ভাসানী কখনো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে ভয় পাননি; অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি।


তিনি ছিলেন নির্ভীক। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। সততা, দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে শক্তি যুগিয়েছে। স্মৃতিতে এখনো অম্লান আরেকটি ঘটনা। ১৯৬৯ সাল। সে বছর এস এস সি পরীক্ষার্থী ছিলাম আমি। পরীক্ষার পূর্বে শাহ্জাদপুরে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল একদিন। দুপুরের পর ঝড় শুরু হলো।

 

স্থায়ী হয়েছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। আমার পিতা তখন একটি বিশেষ কাজে বাড়ির বাহিরে  ছিলেন। টিনের ঘরে বাস করতাম আমরা। এক ফাঁকে ঘরের বারান্দায় এসে ঝড়ের তান্ডবলীলা স্বচক্ষে দেখেছিলাম। সেই ঝড়ে মানুষের ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। অনেকে আহত হয়েছিলেন। প্রাণহানিও ঘটেছিল।


 আমার পিতা আহত হয়ে ঝড়ের পর বাড়ি ফিরেছিলেন। তখন তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিল না। রেডিও ছিল একমাত্র মাধ্যম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঝড়ের খবর শুনেছিলেন। খবর শুনে স্থির থাকতে পারেননি তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা স্বচক্ষে দেখতে ও মানুষের দুঃখ-দুর্দশার খবর নিতে ছুটে এসেছিলেন শাহ্জাদপুরে। একদিন শুনতে পেলাম, বঙ্গবন্ধু শাহ্জাদপুরে পৌঁছে গেছেন।

 

তাঁকে দেখতে আমি আমার পিতার সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হলাম। খোঁজ নিয়ে জানার পর শাহ্জাদপুরের এক গলিতে বঙ্গবন্ধুকে পেলাম। তাঁর সঙ্গে ছিল কিছু সংখ্যক স্থানীয় লোক। আমরাও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হলাম। তিনি পায়ে হেঁটে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি-ঘর, দোকানপাট, প্রতিষ্ঠান দেখতে লাগলেন।


 কখনো কখনো দাঁড়িয়ে মানুষের সাথে কথা বললেন- ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সান্ত¡না দিলেন। আরও মনে পড়ে, ডাক বাংলোর কাছে একটি সংকীর্ণ পথ ধরে তিনি যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন পাশের ধান ক্ষেতে কয়েকজন কৃষক কাজ করছিল। তাদেরকে দেখে বঙ্গবন্ধু দাঁড়ালেন, তাকিয়ে তাদের সালাম জানালেন এবং আবার পথচলা শুরু করলেন। দীর্ঘ সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ঢাকায় ফিরে গেলেন তিনি।


 বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন কাজ করে গেছেন দেশ ও মানুষের কল্যাণে। তিনি ছিলেন সৎ, নীতিবান ও নির্ভীক। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছিলেন কঠোর। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। এসব কারণে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে; জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। মানুষের মুক্তি ও দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন তিনি।   
লেখক : অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত)
০১৭১৮-৭৪৭৪৪১

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top