রাত ১০:৫২, শনিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা
স্বাধীনতা সংগ্রামে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা
এপ্রিল ১৬, ২০১৭

আলহাজ্ব মোঃ নূরবক্ত মিঞা  : ১৯৭১ সালে   ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। যতদিন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এদিনটি বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বার্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ওইদিন প্রবাসে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় এবং স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র জারি করা হয়। ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল তারিখে তাজউদ্দীন আহমদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠনের কথা বলা হয়, বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে শপথ গ্রহণ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

 

 বিশ্বে বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং বেতারে প্রচারিত হয়। কসবা আখাউড়া সেক্টরে স্বল্পকালীন স্থায়ী একটা এক কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার সংবলিত স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল তারিখে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি রেকর্ডকৃত ভাষণ প্রচারিত হয়। পরে এই ভাষণ আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকেও প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়।


মেহেরপুর আম্রকাননে মুজিবনগর সরকারের প্রকাশ্যে শপথ গ্রহণ ঃ ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ ১৩ এপ্রিল তারিখে নির্বাচিত মুজিবনগর সরকারের ছয় সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রীসভার সদস্যদের নাম ও দফতর ঘোষণা করা হয়। মন্ত্রীসভায় অন্যদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামরুজ্জামান আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ দায়িত্ব নেন। ১৭ এপ্রিল তারিখে প্রায় শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক, বেতার ও টিভি প্রতিনিধিদের কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর ভবেরপাড়া গ্রামে যায়। চুয়াডাঙ্গা থেকে এই গ্রামের দুরত্ব প্রায় ১৮ মাইল। কিছুসংখ্যক নবনির্বাচিত পরিষদ সদস্যও এখানে উপস্থিত ছিলেন। আর ছিলেন হাজার পাঁচেক গ্রামবাসী। নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রমাণ হিসেবে এই ‘ভবেরপাড়া’ গ্রামে এক নাতিদীর্ঘ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।


 আনসারদের ও সাবেক ইপিআরের দুটি পৃথক প্লাটুনের কাছ থেকে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অভিবাদন গ্রহণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। এরপর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। আওয়ামীলীগ সংসদীয় দলের চিফ হুইপ দিনাজপুরের অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সমাপ্ত করলে মুহুর্মুহু শ্লোগান উচ্চারিত হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্ণেল (অব.) ওসমানী নাম ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ‘ভবেরপাড়া’ গ্রামের নাম পরিবর্তন করে মুজিবনগর নামকরণ করেন।


 (আমি বিজয় দেখেছি পৃঃ ১১৪-১১৫ পর্যন্ত) মতান্তরে মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলা। (১৬৪পৃঃ বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রীসভার সদস্যদের মধ্যে দফতর বন্টন ঘোষণা করা হয়। এই অস্থায়ী মন্ত্রসভা ছিল নিম্নরূপঃ রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উপরাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী: এম মুনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র-ত্রাণ-পুনর্বাসনমন্ত্রী: এ এইচ কামরুজ্জামান, পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী: খন্দকার মোশতাক আহমেদ। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং সর্বাধিনায়কের দায়িত্বভার প্রধান করা হয়।


 এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং টাঙ্গাইলের আ. মান্নানকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তথ্য, প্রচার ও বেতারের দায়িত্বে প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর নিরাপত্তার খাতিরে এই মন্ত্রী সভার পাঁচজন সদস্য প্রথম কলকাতার ১৩ নম্বর লর্ড সিংহ রোডে অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে কিছুসংখ্যক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারি ঢাকা ও লন্ডন থেকে হাজির হলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আরও তিনজন সচিব নিয়োগ করেন। এরা হলেন-প্রিন্সিপ্যাল সচিব: রুহুল কুদ্দুস, তথ্য ও বেতার সচিব:আনোয়ারুল হক খাঁন, বৈদেশিক সচিব: মাহবুব আলম চাষী। একাত্তরের ২৭ নভেম্বর তারিখে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বিশেষ অর্থবহ কারণে এক নির্দেশে বৈদেশিক সচিব মাহবুব আলম চাষীকে বরখাস্ত করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী অন্যতম রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহকে নয়া বৈদেশিক সচিব নিয়োগ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ফতেহ হচ্ছেন প্রথম পররাষ্ট্র সচিব।


 মুজিবনগরের এ ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান এবং সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহবান জানান। নতুন সরকারের আহবানে বাঙালিরা উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করতে শুরু করে। মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানী ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন দুই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মণিসিং ও কংগ্রেসের নেতা মনোরঞ্জন ধর অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিপূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন। এসব দলের প্রধান ও আওয়ামীলীগের সদস্য-সহ মোট নয়জনকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়।

 এ কমিটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী সরকারকে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে।  ’৭১-এর জুলাই মাসে মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত ১১টা সেক্টর কমান্ডারদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান সেনাধ্যক্ষ তৎকালীন কর্ণেল (অব.) আতাউল গণি ওসমানীর উপস্থিতিতে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি এই ১১ সেক্টরের সীমানা চিহ্নিত করে কমান্ডারদের কাছে পৃথক পৃথক ম্যাপ পর্যন্ত হস্তান্তর করেন। লড়াইয়ের ময়দানে বিভ্রান্তিকর অবস্থা এড়ানোর জন্য এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। (আমি বিজয় দেখেছি, পৃ.২৫৪) পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল বাঙালি জাতি অনেক আশা-আকাঙ্খা নিয়ে মুজিব নগর সরকার গঠন করেছিল।


আমরা মনে করি মুজিবনগর সরকার জাতির এই আশা-আকাঙ্খা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করতে সক্ষম হয়েছিল। এ সরকারের সঠিক নেতৃত্বের ফলে পাকিস্তানি সরকারের অত্যাচার, নিপীড়ন এবং বর্বর কর্মকান্ড সারা বিশ্বে প্রকাশ পায়। মুক্তিবাহিনী এবং মুজিবনগর সরকারের জনপ্রিয়তা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসে। তখন আমাদের স্বাধীনতার পথ খুব সুগম হয়। সুতরাং বিশ্ব জনমত গঠন করে মুজিবনগর সরকারের অবদান অতুলনীয় এবং অপরিসীম। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে মুজিবনগর সরকারের অবদান এবং আত্মত্যাগের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।                                                                                                         
লেখক ঃ সাংবাদিক
০১৭১৬-২৪৯৮৫৯



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top