সকাল ৮:২৮, সোমবার, ১লা মে, ২০১৭ ইং
/ স্বাস্থ্য / স্কাফোয়েড বোন ফ্রাকচার
স্কাফোয়েড বোন ফ্রাকচার
মার্চ ৪, ২০১৭

ডা : এম নজরুল ইসলাম বকুল :কি? হাতের ছোট ছোট অস্থিগুলোকে কারপাল বোন বলা হয় যেগুলো দু’সারিতে মোট আটটি থাকে। ১ম সারিতে বাইরের দিক হতে ভিতরের দিকে প্রথম অস্থির নাম “স্ক্যাফোয়েড।” এ অস্থি আড়াআড়ি ভাবে দু’সারির মাঝে থাকে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং সম্মুখবাহু বা ফোর আর্মের মাঝে লোড বহন করে। যদি এই অস্থি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায় তবে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে রোগী এমন কি চিকিৎসক (অভিজ্ঞতা সম্পন্ন্ না হলে)-ও বুঝতে পারে না। কারপাল অস্থির মধ্যে প্রায় ৭৫% ক্ষেত্রে স্ক্যাফোয়েড বোন ফ্রাকচার ঘটে যদিও বৃদ্ধ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এটার সম্ভাবনা সাধারণত: খুবই কম।

কিভাবে হয়? যখন কেউ কব্জি উপরের দিকে বাঁকানো বা ডরসি ফ্লেকশন অবস্থায় মাটিতে অথবা শক্ত কোন বস্তুর উপর পড়ে যায়, তখন কারপাল মুভমেন্ট এবং কমপ্রেশন ফোর্স যৌথভাবে কাজ করে, ফলে প্রচন্ড রকমের ধাক্কা স্ক্যাফোয়েড বোনের উপর পড়ে এবং তা ভেঙ্গে যায়। সাধারণত: স্ক্যাফোয়েড ফ্রাকচার সু-স্থির; কিন্তু টুকরো সরে গেলে এটা অস্থির বা আনষ্টেবল হয়ে যায়। স্ক্যাফোয়ে-লুপেট লিগামেন্টের টানে নীচের ভাঙ্গা অংশ সরে যায়, উপরের টুকরো সংকুচিত হয়ে পিছনের দিকে ঠেলে উঠে “হাম্প ব্যাক” ডিফোরমিটি তৈরী করে। স্ক্যাফোয়েডের বিশেষ ব্যতিক্রমধর্মী রক্তের সরবরাহ পদ্ধতির কারণে নীচের তৃতীয়াংশে ১%, মধ্যাংশ ২০% এবং উপরের তৃতীয়াংশ ৪০% ক্ষেত্রে এভাস্কুলার নেক্রোসিস বা ননইউনিয়ন, উপরাংশের টুকরোর ক্ষেত্রে ঘটে।


উপসর্গ: আপাত: দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও কব্জির পিছনের বাইরের দিকে বৃদ্ধাংগুলির গোড়ায় অর্থাৎ এনাটমিক্যাল স্নাব বক্সে ফোলা লক্ষ্য করা যায়। এনাটমিক্যাল স্নাব বক্সে চাপ দিলে রোগী ব্যথা অনুভব করবে। সামনে অথবা পিছন থেকে স্কোফোয়েড বোনে চাপ দিলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। বৃদ্ধাংগুলির লম্বারেখা বরাবর উপরের দিকে চাপ দিলে রোগী তীব্র ব্যথা অনুভব করে। এটাকে অনেকে ‘স্ক্যাফোয়েড ফ্রাকচারের” নির্ণয় চিহ্ন বা ‘ডায়াগনষ্টিক সাইন” বলে।


পরীক্ষা-নিরীক্ষা: ফ্রাকচারের ক্ষেত্রে এক্সরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এক্সরে এপি, লেটারাল এবং অবলিক এই তিন ভিউয়েই করা হয়। তাৎক্ষনিকভাবে ফ্রাকচার অবলিক ভিউয়ে দৃষ্টিগোচর হয়। কখনো আড়াআড়ি বা ট্রান্সভারস ফ্রাকচার লাইন, কখনো আবার চাপা চিকন অংশে অথবা উপরের মেরু বরাবর কিংবা স্ক্যাফোয়েড টিউবারকল বরাবর ভাঙ্গা দেখা যায়। এক্সরেতে ভাঙ্গা অংশের অস্থিরতা পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবলিক ফ্রাকচার, টুকরো দুরে সরে যাওয়া, টুকরোর মাঝের কোণের পরিমাণ এবং স্ক্যাফোয়েড ভেঙ্গে ছোট আকৃতির হয়ে যাওয়া ইত্যাদি দেখে ভাঙ্গা স্থির বা ষ্টেবল নাকি অস্থির বা আনষ্টেবল তা নির্ধারণ করা হয়। তবে কয়েক সপ্তাহ পর এক্সরে করলে ভাঙ্গা টুকরো, এভাসকুলার নেক্রোসিস অথবা নন ইউনিয়ন হলো নাকি জোড়া লাগলো ভালভাবে অবলোকন করা যায়। সিটি স্ক্যানেও তা ধরা পড়ে।


চিকিৎসা: (১) স্ক্যাফোয়েড টিউবারকল ফ্রাকচার হলে কোন প্লাষ্টারের প্রয়োজন পড়ে না। সেক্ষেত্রে ক্রেপ ব্যান্ডেজ ব্যবহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয় ৪ সপ্তাহ।
(২) আন-ডিসপ্লেসড বা অস্থানচ্যুত ফ্রাকচারে ক্ষেত্রে কোনরূপ রিডাকশন করা প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র স্ক্যাফোয়েড প্লাষ্টার দিয়ে ৬ সপ্তাহ রাখা হয়। স্ক্যাফোয়েড প্লাষ্টারের বৈশিষ্ট হলো এটা বৃদ্ধাঙ্গুলি মেটা-কারপো- ফ্যালাঞ্জিয়াল জয়েন্টের কভারেজ করে শুধুমাত্র ইন্টার ফালেঞ্জিয়াল জয়েন্ট ফ্রি রেখে মধ্য বাহু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে; কনুই ৯০০, কব্জি ডরসি ফ্লেক্সড এবং হাতের আঙ্গুলগুলো “গ্লাস ধরার পজিশনে” রাখা হয়। ৬ সপ্তাহ পর প্লাষ্টার খুলে কব্জি সরাসরি পর্যবেক্ষণ, এক্সরে করে দেখা হয়। যদি কব্জি কিংবা এনাটমিক্যাল স্নাব বক্সে এ ব্যথা না থাকে এবং এক্সরেতে ভাঙ্গা জোড়া লাগা পর্যবেক্ষণ করা যায় সেক্ষেত্রে কব্জি ফ্রি রাখা হয়। আর যদি ব্যথা থাকে এবং এক্সরে-তে ফ্রাকচার দেখা যায় তবে আরো ৬ সপ্তাহ আবার একই পদ্ধতির প্লাস্টার রাখা হয়।


(৩) ডিসপ্লেসড ফ্রাকচার বা স্থানচ্যুত ফ্রাকচার- এক্ষেত্রে প্লাষ্টার করা যায় তবে ফলাফল খুব ভাল নয়। তাই ফ্রাকচার অপারেশনের মাধ্যমে স্ক্রু দিয়ে ফিক্সেশন করা হয়। এক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি জোড়া লাগে এবং অনড় করে রাখার সময় কম লাগে।
জটিলতা:
(১) এ ভ্যাস্কুলার নেক্রোসিস: এটা আর্থ্রাইটিস এবং ব্যথার অন্যতম কারণ অপারেশন প্রয়োজন হয়।
(২) নন-ইউনিয়ন: তিনমাসের মধ্যে ভাঙ্গা জোড়া না লাগলে নন-ইউনিয়ন হয়। এক্ষেত্রে অপারেশন এবং বোন গ্রাফটের প্রয়োজন পড়ে।
(৩) অষ্টিও আর্থ্রাইটিস: নন-ইউনিয়ন অথবা এ্যাভাসকুলার নেক্রোসিসের কারণে আথ্রাইটিস অষ্টিও আর্থ্রাইটিস হয়। কারপাল রোলগুলোর জয়েন্টে অথবা কব্জিতে এই অষ্টিও আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রেও অপারেশন প্রয়োজন হয়। স্ক্যাফোয়েড ছোট্ট একটা অস্থি যা কারপাল বোনের প্রথম সারিতে প্রথম। ভেঙ্গে গেলে অনেকক্ষেত্রেই এটা ভ্রম হয়। রোগী কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসক কেউই বুঝতে পারেননা যে কি ক্ষতি হয়েছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী দেরীতে ব্যথা এবং অস্বস্থি নিয়ে আসে। এক্সরে কিংবা সিটিস্ক্যান করে তখন ধরা পড়ে নন-ইউনিয়ন অথবা এ্যাভাসকুলার নেক্রোসিস যার চিকিৎসা অপারেশন। তাই অবহেলা না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা গ্রহণের জন্য কেবলমাত্র অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক সার্জনই হোক প্রথম চয়েস। ধন্যবাদ



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top