সকাল ১০:২৯, সোমবার, ১লা মে, ২০১৭ ইং
/ স্বাস্থ্য / সেরিব্রাল পলসি (সিপি)
সেরিব্রাল পলসি (সিপি)
মার্চ ১৮, ২০১৭

ডা : এম নজরুল ইসলাম বকুল : কি? একগুচ্ছ অরাজকতা যা মস্তিষ্কের অবর্ধনশীল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বর্ধনের শুরুতেই নবজাতকের ক্ষেত্রে ঘটে। এ ঘটনা প্রতি হাজার জীবন্ত জন্মলাভকারীর দুইজন নবজাতকের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।কি কারণে হয়: একক কোন কারণ নয়। ব্রেইন বা মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে কোন কারণেই এটা হতে পারে। কারণগুলো তিন ভাগে শ্রেণী বিভক্ত করা হয়।


(১) প্রি-ন্যাটাল কারণ: নার্ভাস সিস্টেম সঠিকভাবে গঠিত না হলে, ইরাথ্রোব্লাষ্টোসিস, ইকটেরাস গ্রাভিস, কার্নিক্বেরাস্ ইত্যাদি।
(২) ন্যাটাল কারণ: জন্মের সময় মস্তিষ্কের বার্থ ইনজুরি, রক্ত শূন্যতা, সেরিব্রাল এনোক্সিয়া, প্রিম্যাচুরিটি ইত্যাদি।
(৩) পোষ্ট-ন্যাটাল কারণ: ইনফেকশন, হুপিং কাশি, এনকেফালাইটিস, মেনিঞ্জাইটিস, হেড-ইনজুরি, ষ্ট্রোক ইত্যাদি। প্রধান কারণ হিসাবে প্রসবকালীন মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ততা এবং কষ্টসাধ্য ডেলিভারীর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে আঘাত কিংবা সেরিব্রাল এনোক্সিয়া অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
 
শ্রেণীভাগ বা টাইপ: (১) স্পাষ্টিক প্যারেসিস: এটা সবচেয়ে বেশী প্রায় ৬০%। মাসলটোন বেশী এবং হাইপারএকটিভ বিফ্লেক্সফকে (২) এথেটোসিস- অনিয়ন্ত্রিত সার্বক্ষনিক মুভমেন্ট থাকে। (৩) এটা ক্সিয়া: নড়াচড়া করতে গেলে মাংসপেশীর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। (৪) রিজিড পলসি: মাংসপেশী সার্বক্ষণিক কণ্ট্রাকশনে ফাকে যাতে পেশী বেশ শক্ত থাকে। (৫) মিশ্র বা মিক্সড টাইপ: এছাড়া ট্রপোগ্রাফিক শ্রেণীভাগ করা হয়। যেমন- হোমপ্লেজিয়া, ডাইপ্লেজিয়া, মনোপ্লেজিয়া, ট্রাইপ্লেজিয়া টেট্রাপ্লেজিয়া এবং হোলবডি ইনডলভলবমেন্ট ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশী স্পাষ্টিক প্যারেসিস নিয়ে আলোচনা করবো।


 প্যাথোলজী: মটর কর্টেক্সের কিছু অংশ ব্রেন গ্লাওসিস দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। ফলে পিরামিডাল ট্রাক্ট-এ ডিজেনারেশন হয়।
উপসর্গ/লক্ষণ: প্রিন্যাটাল টেক্সি মিয়া, হেমোররেজ, প্রিম্যাচুর বার্থ, কষ্টসাধ্য ডেলিভারী কিংবা নবজাতকের ডিসট্রেজ ইত্যাদির ইতিহাস থাকতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে মার্বনে নবজাতক বুকের দুধ টানতে পারে না, গিলতে পারে না বাচ্চার মুখের কোনা দিয়ে লাল পড়ে। বাচ্চার সাধারণ মাইল ষ্টোন ঘাড় তোলা, হামাগুড়ি দেয়া, বসা, দাঁড়ান, হাঁটা কিংবা দাঁত উঠা সবকিছু দেরীতে হয়। সাধারণত: এক পার্শ্বের হাত পা (হেমিপ্লেজিয়া) যে কোন হাত বা নিম্ন বাহু (মেনোপ্লেজিয়া) উভয় নিম্ন বাহু (প্যারাপ্লেজিয়া) উপরের এবং নিচের মোট চার বাহু (টেট্রাপ্লেজিয়া) হতে পারে। এমন কি শরীর বা মুখমন্ডলের পেশীও আক্রান্ত হতে পারে। বাচ্চাকে পর্যবেক্ষণ করলে দুর্বলতা, শক্তপেশী বা স্পাষ্টিসিটি ইচ্ছাকৃত নড়াচড়া অনিয়ন্ত্রিত ইত্যাদি দেখা যায়। বাচ্চার মানসিক বৈকল্য, দুষ্টিত্রুটি অথবা বধিরতা অথবা কানে কম শোনা ইত্যাদি থাকতে পারে।


বৈকল্যতা: যখন মাংসপেশীতে স্পাজম কিংবা নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা বিরাজ করে তখন নানা ধরনের বৈকল্যতা দেখা যায়। সাধারণত: উর্ধ্ববাহুর ফ্লেকশন কণ্ট্রাকচার কনুই, সম্মুখবাহুর প্রনেশন, কব্জির ফ্লেকশন, বৃদ্ধাঙ্গুলীর এ্যাডাকশন প্রভৃতি ডিফোরমিটি থাকে। নিম্ন বাহুতে হিপ জয়েন্ট এ্যাডাকশন, ফ্লেকশন হাঁটু সন্ধি এবং এ্যাংকেল জয়েন্ট ইকুইনাস অবস্থায় থাকে, স্পাইনে স্কোলিওসিস, কাইকোসিস কিংবা পেলভিক অবলিকুইটি থাকতে পারে। বাচ্চা স্পাষ্টিসিটির কারণে লাফিয়ে হাঁটে অনেক সময় সাপোর্ট ছাড়া হাঁটতে পারে না। চলন বৈকল্য অনেকটা কাঁচির মতো অর্থাৎ এক পায়ের মধ্যে আরেক পা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে জার্কিং “সেইজারস গেইট” অবস্থায় চলাচল করতে চেষ্টা করে।


 সেন্সেশন সাধারণত উপস্থিত থাকে জার্ক অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়। বাচ্চার চোখ অনেকসময় টেরা হয়। বৈকল্যতা বিভিন্ন বাচ্চার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়। কম বৈকল্যের ক্ষেত্রে বাচ্চা কোন রকমে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে আবার সামান্য প্রতিবন্ধী হতে পারে। আর তীব্র বৈকল্যের ক্ষেত্রে খুবই মারাত্মক প্রতিবন্ধী হিসাবে হেল্প লেস জীবন যাপন করে।
 

যেহেতু ব্রেনের একটা অংশ ধ্বংস হয়, যা কোনক্রমেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয় তাই সম্পূর্ণ সুস্থতা আশা করা বাঞ্ছনীয় নয়। সাহায্যকারীকে চরম ধৈর্য্য ধারণ করে সিপির বাচ্চার নিবির পরিচর্যা করলে শুরু থেকে শেষে মোটামুটি ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে কোন ফল নাও মিলতে পারে। সেক্ষেত্রে রোগী অপরের সাহায্য নিয়ে তার দৈনন্দিন কাজ সম্পূর্ণ করতে পারে। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে অনেকে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে নিজে নিজে কিছু দৈনন্দিন কাজ করতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে ‘সিপি’-র বাচ্চা প্রতীকী হিসাবে সবার কাছে বোঝা হয়ে থাকে।


চিকিৎসা: সেরিব্রাল পলসি এমনি একটি রোগ যার জন্য এক্সরে, সিটিস্ক্যান এমআরআই এবং মাইলোগ্রাফি প্রভৃতি রোগ নির্ণয় পদ্ধতির প্রয়োজন পড়তে পারে। প্রয়োজনে ইলেক্ট্রো মাইওগ্রাফিরও দরকার হতে পারে। তবে চিকিৎসা পদ্ধতি মাল্টিডিসিপ্লিনবো এ্যাপ্রোচ। একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপী, স্পিচ-থেরাপী, শিশু রোগী চিকিৎসক, মনোরোগ চিকিৎসক, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, অর্থোপেডিক সার্জন ও সার্জারী বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন।


পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত: পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাইরে চিকিৎসা করা যেতে পারে কিন্তু পাঁচ বছর বয়স পার হলে প্রতিবন্ধী বাচ্চাকে নিবির পরিচর্যা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করে চিকিৎসা করতে হবে। চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলে মাংস পেশীর প্রশিক্ষণ যা ফিজিও থেরাপিষ্ট করবে এবং সেক্ষেত্রে রিলাক্স-স্পাষ্টিক পেশীই প্রধান উদ্দেশ্য। বৈকল্যগুলো সংশোধনের জন্য স্পিøন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।

 প্রয়োজন হলে অজ্ঞান দিয়ে প্লাষ্টার করা যেতে পারে। কথা থেরাপী: বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সিপি’র বাচ্চাদের কথা শেখানোর জন্য এবং মুখের জড়তা কাটানোর জন্য স্পিচ থেরাপী প্রয়োজন হয়। অপারেশন:  যে কারণে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে-(১) স্পাষ্টিক বৈকল্য সংশোধনের জন্য। (২) স্থিরবৈকল্য বা ফিক্সড, ডিফোরমিটি থাকলে। (৩)  সেকেন্ডারী ডিফোরমিটি যেমন হিপ স্থানচ্যুৎ হওয়া, জয়েন্ট অস্থিরতা, অস্থির বৈকল্য প্রভৃতি সংশোধনের জন্য।

 বিশেষজ্ঞ সার্জনদ্বারা অষ্টিওটন্সি, টেন্ডন ট্রানফার টেন্ডনের লেন্দেনিং অপারেশন, আর্থোডেসিস কিংবা নিউরেকটাম অপারেশন করা হয়। সেরিব্রাল পন্সির রোগী শুধু একটি পরিবার বা গ্রামের বোঝা নয়, সারা দেশের বোঝা। তাই শুরুতেই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুবা বোঝা আরও বাড়বে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহায্য করুন। ধন্যবাদ



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top