বিকাল ৫:৫৭, সোমবার, ২১শে আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ আইন-আদালত / সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল
সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল
মে ১৫, ২০১৭

মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতা দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদন্ডের যে রায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দিয়েছিল, পুনর্বিবেচনায় তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে খালাস চেয়েছিলেন একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদন্ডের রায় পুনর্বহাল চেয়েছিল। গত রবি ও সোমবার শুনানি করে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ দুটি রিভিউ আবেদনই খারিজ করে দিয়েছে। এর ফলে দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সকল বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটল এবং তার আমৃত্যু কারাদন্ডের রায়ই বহাল থাকল। ৭৭ বছর বয়সী সাঈদী বর্তমানে আছেন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। ২০১০ সালের ২৯ জুন থেকে তিনি কারাবন্দী। রিভিউ রায়ের পর তার ছেলে মাসুদ-বিন- সাঈদী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ন্যায়বিচার পেলাম না, ন্যায় বিচার হলো না। ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি, একদিনের সাজাও প্রাপ্য ছিল না।’

আর এই জামায়াত নেতার প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘যেহেতু সর্বোচ্চ আদালতের রায়, তাই ক্ষোভ-দুঃখ যাই থাকুক না কেন, রায় মেনে নিতে হবে।’ অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাঈদীকে দেশ, সভ্যতা ও মানুষের জন্য ‘ক্ষতিকর’ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপারধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন এবং তদন্ত সংস্থার ব্যর্থতা ও দুর্বলতার কারণে সাঈদীকে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। সাঈদী যুদ্ধাপরাধীদের শিরোমনি, তার সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় আমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত।’

ফাঁসি থেকে আমৃত্যু সাজা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীর বিচার শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর। মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে একাত্তরে জামায়াত নেতা সাঈদীকে পিরোজপুরের মানুষ চিনত ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামে। সে সময় রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় তিনি অংশ নিয়েছিলেন, তা উঠে এসেছে এ মামলার বিচারে। বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়। ওই রায়ের পর দেশজুড়ে সহিংসতা চালায় জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। ওই তান্ডবে প্রথম তিন দিনেই নিহত হন অন্তত ৭০ জন। এছাড়া বহু গাড়ি-দোকানপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হিন্দুদের মন্দির-ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এরপর সাঈদী আপিল করলে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারকের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেয়। তাতে সাজা কমে আমৃত্যু কারাদন্ডের আদেশ আসে। আপিলের রায়ের ১৫ মাস পর ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ আদালত এর পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করলে বিষয়টি রিভিউয়ের পর্যায়ে আসে। এরপর গতবছর ১২ জানুয়ারি সাঈদীর আমৃত্যু কারাদন্ডের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর পাঁচদিনের মাথায় খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন সাঈদী। দুটি আবেদনই খারিজ হয়ে যাওয়ায় এই যুদ্ধাপরাধীর আমৃত্যু কারাদন্ডের সাজাই বহাল থাকল।

তিন অপরাধে আমৃত্যুদন্ড
আপিলের রায়ে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে হত্যা, নিপীড়ন, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করায় সাঈদীকে ‘যাবজ্জীবন’ কারাদন্ড দেয়া হয়। যাবজ্জীবন বলতে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর সময় পর্যন্ত’ কারাবাস বোঝাবে বলে ব্যাখ্যা দেয় আদালত। এছাড়া ৮ নম্বর অভিযোগের একাংশের জন্য সাঈদীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ৭ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদন্ডের আদেশ দেয় আপিল বিভাগ। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীর ফাঁসির রায় দিয়েছিল। তবে চূড়ান্ত বিচারে তা টেকেনি। অভিযোগ-১০:  ১৯৭১ সালের ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। যার মধ্যে রয়েছে চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেণ ঠাকুর, অনিল মন্ডল, বিসাবালী, সুকাবালী, সতিশবালার ঘর। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিসাবালীকে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। অভিযোগ-১৬:  স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জন সশস্ত্র রাজাকার পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোনকে অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাদের আটকে রেখে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে ছেড়ে দেয়া হয়। অভিযোগ-১৯: স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সাঈদী জোর করে মধুসুদন ঘরামী, কৃষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হাওলাদার, শান্তি রায়, হরি রায় জুরান, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্যরাণী ও কামাল রাণীসহ ১০০/১৫০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করেন।

রায়ে গণজাগরণমঞ্চের ক্ষোভ
মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতা দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদন্ডের যে রায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দিয়েছিল, পুনর্বিবেচনায় তাতে কোনো পরিবর্তন না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।  সোমবার এক বিবৃতিতে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলোওয়ার হোসাইন সাইদীর মামলার রিভিউতে সর্বোচ্চ শাস্তির বদলে আমৃত্যু কারাদন্ডের রায়ে জনগণ ক্ষুব্ধ এবং হতাশ। এই রায়ে জাতির আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করেন তিনি। বিবৃতিতে ইমরান বলেন, দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রাপ্য ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়েও এই যুদ্ধাপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছিল।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top