দুপুর ১:৫৬, বৃহস্পতিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ শিরোনাম / ‘লাউ আবাদ করি হামার গ্রামের মাইনষের দুঃখ দূর হইছে’
‘লাউ আবাদ করি হামার গ্রামের মাইনষের দুঃখ দূর হইছে’
ডিসেম্বর ২৩, ২০১৬

 

গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি : ‘অন্য ফসলে খালি লোকসান হয়। কদু’ই (লাউ) হামার ভরসা। কদু আবাদ করেইতো কোনমতে দুই মুঠ খ্যায়া ভালো আছি।’ এমন কথা বলেন, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের লাউ চাষি আব্দুল হাকিম। শুধু আব্দুল হাকিমই নন, চেংমারী গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের এখন সংসার চলে লাউ আবাদের উপর নির্ভর করে।

গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম চেংমারী। গ্রামের ভিতর ঢুকলেই চোখে পড়ে অসংখ্য লাউয়ের মাচা। যাদের একখন্ড জমিও নেই তারাও দুটি লাউগাছ তুলে দিয়েছেন ঘরের চালে। শীতকালের অর্থকরী ফসল হিসেবে লাউ এলাকার ঘরে ঘরে ঝুলে থাকে। অধিক মুনাফার আশায় এ বছর আগাম লাউ চাষ করায় গ্রামের পরিবেশটাই যেন বদলে গেছে। কৃষক-কৃষাণীরা মনের আনন্দে সময় কাটাচ্ছেন লাউ েেতর পরিচর্যায়।

এলাকার লোকজন জানান, বালু মিশ্রিত উঁচু জমি বলে গ্রামটিতে ধানের আবাদতো নয়ই, অন্য কোন ফসল ফলানো সম্ভব ছিল না। আয়ের কোন উৎস না থাকায় এ গ্রামের মানুষের দিন কাটতো বড় কষ্টে। ফসল বলতে বালু জমিতে আপনা থেকেই গজিয়ে ওঠা কাঁশবন ছিল এলাকার মানুষের ভরসা।

 সারা বছর ধরে অভাব-অনটন লেগে থাকতো বলে চেংমারী গ্রামে সহসা কেউ ছেলে কিংবা মেয়ে বিয়ে দিতো না। ২০/২৫ বছর আগেও এ অবস্থা ছিল বলে প্রবীণ লোকজন জানান। কিন্তু দিন বদলেছে এখন। প্রয়োজনের তাগিদে বালু জমিতে লাউয়ের চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন চেংমারী গ্রামের মানুষ। শুধু স্থানীয় হাট-বাজারেই নয়, রংপুর শহর কিংবা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে চেংমারীর লাউয়ের বেশ কদর রয়েছে। সে কারণে এখন চেংমারী গ্রাম পরিচিতি পেয়েছে ‘লাউয়ের গ্রাম’ হিসেবে।

কালের বিবর্তনের প্রযুক্তির এ যুগে আর দশটি গ্রামের চেয়ে চেংমারী এখন অনেক উন্নত। অন্যান্য ফসলের চেয়ে তুলামূলকভাবে মুনাফা বেশি হওয়ায় এ গ্রামের কৃষকরা ক’বছর ধরে লাউ চাষে ঝুঁকে পড়েন। কত একর জমিতে লাউ চাষ হয় এমন পরিসংখ্যান না থাকলেও লাউয়ের জন্য চেংমারী গ্রাম বিখ্যাত বলে স্বীকার করেছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

 উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রুহুল ইসলাম সরকার জানান, উঁচু এলাকা বলে চেংমারী গ্রামে সব ধরনের সবজির চাষ হলেও লাউই হলো এখানকার শীতকালীন প্রধান ফসল। লাউ চাষে তেমন ঝুঁকি নেই। তাছাড়া প্রতিটি লাউ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি করতে পারায় চাষিরা প্রতি বছর এর চাষ করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা লাউ কিনতেই মূলত এ গ্রামে আসেন বলে জানান তিনি।

লাউ ছাড়াও ইদানিং ওই গ্রামে যে কোন ধরনের আগাম শাক-সবজি যেমন আলু, বেগুন, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি চাষ হচ্ছে। তবে বড়, মাঝারি, ুদ্র কিংবা প্রান্তিক যে ধরনেরই কৃষক হোক না কেন, লাউয়ের আবাদ করেনি এমন কৃষক খুঁজে পাওয়া যাবে না চেংমারী গ্রামে। প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজির পাইকার (ব্যবসায়ী) রিক্সা কিংবা ভ্যানযোগে চেংমারী গ্রামে আসেন লাউ কেনার জন্য। মুহূর্তের মধ্যে রংপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যায় চেংমারীর লাউ।

এলাকার কৃষক আব্দুল হালিম, ভুট্টু মিয়া জানান, এক বিঘা জমিতে প্রথম বছর লাউ চাষ করতে মাচা তৈরিসহ বীজ, সার, কীটনাশক বাবদ খরচ হয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বছর খরচ নেমে আসে অর্ধেকে। আর ওই জমির লাউ বিক্রি করে পাওয়া যায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। আগাম করতে পারলে লাভ আরো বেশি। তাছাড়া লাউ চাষে অন্যান্য ফসলের চেয়ে পরিশ্রম অনেক কম। লাউয়ের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে শিম, বরবটি, চালকুমড়া, আদা, হলুদ, পিঁয়াজ চাষ করতে পারলে মুনাফা আরো বেশি বলে কৃষকরা জানান।

লাউ চাষি আহম্মদ আলী বলেন, ‘আগোত বাহে এত আবাদ হয় নাই। এ্যালাতো ভূঁইয়োত (জমিতে) সোনা ফলে। কদু (লাউ) আবাদ করি হামার গ্রামের মাইনষের দুঃখ দূর হইছে।’ ঠিক একই ধরনের কথা বলেন, লাউ চাষি সুরেন চন্দ্র মহন্ত, এমদাদ আলীসহ চেংমারী গ্রামের কৃষকরা।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top