রাত ১:৪৭, রবিবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
/ জাতীয় / রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে কূটনীতিকরা শরণার্থীদের মানবেতর জীবন জানাবেন নিজ নিজ দেশে
* সংকট গভীরতর হচ্ছে: ১২ নোবেলজয়ী * ইইউয়ের ৩০ লাখ ইউরো সহায়তা
রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে কূটনীতিকরা শরণার্থীদের মানবেতর জীবন জানাবেন নিজ নিজ দেশে
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭

কক্সবাজার প্রতিনিধি: নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশের মানবিকতা খুবই প্রশংসনীয়। তবে ক্যাম্পে শরণার্থীদের মানবেতর জীবন পীড়াদায়ক। তাই তাদের নিজ দেশে (মিয়ানমার) ফেরত যেতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে নিজ নিজ দেশের সঙ্গে আলাপ করা হবে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা বিভিন্নি দেশের কূটনীতিকরা। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তারা এ কথা জানান।

এর আধা ঘণ্টা আগে উখিয়ার কুতুপালংয়ে পৌঁছান বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের বহন করা গাড়িটি। সেখানে পৌঁছে তারা কুতুপালং ক্যাম্পে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে আবেগাপ¬ুত হয়ে পড়েন তারা।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, এতদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি জেনেছেন কূটনীতিকরা। কিন্তু আজ (বুধবার) পরিদর্শনে এসে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছেন তারা। পলিথিনের ঝুপড়িতে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট কাদাময় পরিবেশে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন সবাইকে ব্যথিত করেছে। তাই পরিদর্শনরত বিদেশি কূটনীতিকরা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যেতে নিজ নিজ দেশের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দুর্বিষহ জীবনাচার সম্পর্কে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন।

বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬৭ আসনের পে¬নে রওনা হয়ে বেলা সোয়া ১১টার দিকে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সেখানে তাদের স্বাগত জানান কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন ও পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখান থেকে গাড়িতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কুতুপালং ক্যাম্পে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পুরো ক্যাম্প ঘুরিয়ে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক ক্ষতির বিষয়াদিও তাদের নজরে আনা হয়। নিপীড়িত মানবতার দিকে চেয়ে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ সহায়তা দিতে গেলে আমরা নিজেরাই নিষ্পেষিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনার কথাও তাদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলে উলে¬খ করেন জেলা প্রশাসক।

নিজ দেশে জাতিগত সহিংসতায় নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী-শিশু ও পুরুষ। গত ২৪ আগস্ট আনান কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর দিবাগত রাতে আরাকান রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে অভিযানের নামে সে দেশের সেনা-পুলিশ। তারা নিরস্ত্র সাধারণ রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুন দিয়ে ধ্বংসস্তূপ বানাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ঘটনার পর থেকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এসে জড়ো হন আতঙ্কিত হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-শিশু-পুরুষ। তখন তাদের বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা দেয়া হলেও ১ সেপ্টেম্বর রাত থেকে নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢোকা শুরু করে। গত ১২ দিনে ৪ লাখের অধিক নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করে টেকনাফ-উখিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ও তাদের ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিকতা নিয়ে বিশ্ব মিডিয়া সংবাদ প্রচার করায় বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে তাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করছে। কিন্তু আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা দেয়ায় শেষ সমাধান না হওয়ায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বিশ্ব জনমত গড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এ কারণে বাংলাদেশে অবস্থানরত ৪০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রদূত, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বা প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থার প্রধানকে বুধবার রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন যাত্রার চিত্র দেখাতে উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।

রোহিঙ্গা সঙ্কট আরও গভীরতর হচ্ছে : ১২ নোবেলজয়ী
‘রোহিঙ্গা সঙ্কট আরও গভীরতর হচ্ছে’ উল্লেখ করে মিয়ানমারের রাখাইনে মানবিক সঙ্কট অবসানে জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ১২ নোবেল লরিয়েট ও বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিকরা। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন তারা। চিঠিতে রাখাইনের নিরীহ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার বন্ধ এবং ওই এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপের জন্য সাতটি সুপারিশ বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানো হয় নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও সদস্যদের কাছে। রাজধানীর ইউনূস সেন্টার থেকে বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

চিঠিতে ১২ নোবেল লরিয়েট ও বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিকরা উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা পরিষদের সভা আহ্বানের জন্য প্রথমে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই যে, মিয়ানমারের রাখাইন এলাকায় মানবীয় ট্র্যাজেডি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে তার অবসানে আপনাদের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আপনাদের এই মুহূর্তের দৃঢ় সংকল্প ও সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর মানব ইতিহাসের ভবিষ্যৎ গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে। সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে গত বছরের শেষে আমরা কয়েকজন নোবেল লরিয়েট ও বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আপনাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আপনাদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে নিরীহ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার বন্ধ এবং রাখাইন এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমরা আবারো আপনাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।

আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্ভাব্য সব হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে নিরীহ বেসামরিক মানুষদের ওপর নির্বিচার সামরিক আক্রমণ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়, যার ফলে এই অসহায় মানুষগুলোকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে এবং রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হতে না হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব যথার্থই বলেছেন যে, ‘রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ ও অমীমাংসিত দুর্দশা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার একটি অনস্বীকার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের শাসকদের অবশ্যই সহিংসতার এই দুষ্ট চক্র বন্ধ করার দৃঢপ্রতিজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং নিপীড়িত সকলের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’

কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীরা ৭ দফা প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপগুলো সুপারিশ করছি। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন- প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, মেইরিড মাগুইর, বেটি উইলিয়াম্স, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, অসকার আরিয়াস সানচেজ, জোডি উইলিয়াম্স, শিরিন এবাদী, লেইমাহ বোয়ি, তাওয়াক্কল কারমান, মালালা ইউসাফজাই, স্যার রিচার্ড জে. রবার্টস, এলিজাবেথ ব্যাকবার্ন, সাইয়েদ হামিদ আলবার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হচ্ছেন- এমা বোনিনো, স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন, গ্রো হারলেম ব্রান্ড্টল্যান্ড, মো ইব্রাহীম, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী; কেরি কেনেডি, আলা মুরাবিত, কাসিত পিরোমিয়া, সুরিন পিটসুয়ান, পল পোলম্যান, ম্যারি রবিনসন, জেফরে ডি. সাচ।

‘আনান কমিশনের সুপারিশ শিগগিরই বাস্তবায়ন’
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট’র সুপারিশ শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মঙ্গলবার ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বলছে, আনান কমিশন ছাড়াও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউ মিয়েন্ট সোয়ে নেতৃত্বাধীন সরকারের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশও পর্যালোচনা করবে নতুন এ কমিটি। মিয়ানমারের প্রভাবশালী ইংরেজি সংবাদমাধ্যম ইরাবতি বুধবার এক প্রতিবেদনে বলছে, ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গত মাসে বেশ কিছু সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে উভয় কমিশন।

কমিটি গঠনের একদিন পর সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান, দেশটির সামাজিক কল্যাণ, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন মন্ত্রী ইউ উইন মিয়াত আয়ের সঙ্গে কথা বলেছে ইরাবতি। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ধর্ম, বর্ণ, নাগরিকত্ব, লিঙ্গ নির্বিশেষে সব গোষ্ঠীর শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে ও বাস্তবায়নে সুপারিশ যাচাই প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে কাজ করবে নতুন কমিটি। মাদক ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কমিটি কাজ করবে বলে জানানো হয়েছে। কমিটির সহ-চেয়ারম্যান রাখাইন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইউ নি পু।

নতুন এই বাস্তবায়ন কমিটি আইনের শাসন, স্থিতিশীলতা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামজিক কল্যাণ ও মৌলিক অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে কাজ করবে। একই সঙ্গে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর গ্রাম, মানবিক ত্রাণ সহায়তা বিতরণ ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের জন্য আশ্রয়শিবির বন্ধ করে তাদের পুনর্বাসন করা হবে। প্রতি চার মাস অন্তর এই কমিটি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাদের অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করবে। এ কমিটির প্রথম কাজ কী হবে; এমন প্রশ্নের জবাবে কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, প্রথমত, বৃহস্পতিবার আমরা একটি বৈঠকে বসব। দুই কমিশনের যেসব সুপারিশ আছে সেগুলো বিস্তারিত নিরীক্ষণ ও পরিষ্কারভাবে বোধগম্যের দরকার আছে।

এরপরই আমরা বাস্তবতার নিরীখে মানুষের জন্য উপকারী সুপারিশসমূহের বাস্তবায়ন শুরু করব। আর যত দ্রুত সম্ভব এটি করা হবে। ভিন্ন দুই কমিশনের সুপারিশ শতভাগ বাস্তবায়ন করা হবে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউ মিয়েন্ট সোয়ে বলেন, সব সুপারিশ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষার পরই কেবল আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। পরিস্থিতি ও মানুষের জন্য উপকারী সব সুপারিশকেই আমরা প্রাধান্য দেব। সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুপারিশ বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছে। কমিটি এ বাস্তবায়নের কাজ কখন শুরু করতে পারে বলে আপনি মনে করেন? তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। কমিটি গঠনের আগে আমি রাখাইনে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর এলাকা সফর করেছি। সাম্প্রতিক সহিংসতায় হিন্দু, ডাইংনেট, ম্রো ও কামান সম্প্রদায়ের অনেকেই নিহত হয়েছে। কোনো ধরনের বিলম্ব ছাড়াই আমরা রাখাইনের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করব।

রোহিঙ্গাদের জন্য ইইউয়ের ৩০ লাখ ইউরো
মিয়ানমারে দমন-পীড়নের মুখে নতুন করে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসার পর তাদের জন্য আরও ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবিক সহায়তা ও সঙ্কট ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার ক্রিসতোস্ত স্তিলিয়ানিদেস। এর আগে কমিশনার স্তিলিয়ানিদেস গত মে মাসে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের জন্য এক কোটি ২০ লাখ ইউরো মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নতুন করে বরাদ্দ করা বাড়তি অর্থ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের সঙ্কটকালীন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করা হবে বলে জানান তিনি। কমিশনার স্তিলিয়ানিদেস বলেন, পরিস্থিতি সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জরুরিভিত্তিতে এই মানবিক সহায়তা দিচ্ছে। এই বাড়তি অর্থ নতুন করে বাংলাদেশে আসা শরণার্থী এবং পরবর্তীতে মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পুনরায় শুরুর পর সেখানকার মানুষের (রোহিঙ্গা) আশ্রয়, পানি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সহায়তায় ব্যয় হবে। ইইউয়ের সব ত্রাণ কার্যক্রমের মতো করে সহায়তার নতুন এই অর্থও জাতিসংঘ ও রেডক্রসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের জন্য ব্যয় হবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান ইইউর মানবিক সহায়তা ও সঙ্কট ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনার ক্রিসতোস্ত স্তিলিয়ানিদেস।

আন্তজার্তিক মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম করতে দেওয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে ইইউ। স্তিলিয়ানিদেস বলেন, ইতোমধ্যে মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় সঙ্কট যেন আরও বাড়তে না পারে সেজন্য উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে শিগগির মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। এই কঠিন সময়ে যারা বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সমর্থন দিয়ে যাবে। মঙ্গলবার পর্যন্ত পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে জাতিসংঘ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। এছাড়া গত তিন দশক ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্প ও এর বাইরে মিলিয়ে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে।

আবারও রোহিঙ্গা ঢল
মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের স্রোত ফের বেড়েছে। গত দুই দিন বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা কম দেখা গেলেও বুধবার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল নেমেছে। দলে দলে রোহিঙ্গারা আসছে। বুধবার দুপুরে টেকনাফের শাহপরী দ্বীপ বাজার এলাকায় দেখা গেছে,একের পর এক ট্রলারে করে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর প্রবেশমুখেই স্থানীয়রা তাদের বাংলাদেশে আসতে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। ট্রলার থেকে নামার পর পরই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ কেউ টাকা দিচ্ছেন,আবার কেউ কেউ তাদের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

তবে সেখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউকে দেখা যায়নি। টেকনাফে আসা আছিয়া খাতুন (৫০) বলেন, মিয়ানমারে এখনও বর্বর নির্যাতন চলছে। তার স্বামীকে সেখানকার সেনাবাহিনী তার চোখের সামনে হত্যা করেছে। প্রাণভয়ে তিনি চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। বাংলাদেশে আসতে তার তিন দিন লেগেছে। টেকনাফ পৌর এলাকায় কথা হয় মরিয়ম বেগম নামে এক নারীর সাথে। তিন মাসের কন্যা শিশুকে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তার চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার হাতছানি। ফুটফুটে মায়াবী এ শিশুকে নিয়ে তিনি বসে আছেন ফুটপাতে।

কোথায় যাবেন কিছুই জানেন না ওই নারী। কাঁদতে কাঁদতে বলেন,এ পৃথিবীতে আমার আর কেউই রইল না। মা-বাবা ও স্বামীকে সেনাবাহিনী গুলি করে মেরেছে। সাত দিন সাগর-জঙ্গল-পাহাড় অতিক্রম করে সন্তানকে বুকে নিয়ে এ দেশে এসেছি। মরিয়ম আর আছিয়া খাতুনের মতো এ রকম- হাজারো মানুষ এখন টেকনাফ-উখিয়া সড়কের দুই ধারে অপেক্ষা করছে। বুধবার সকাল ৯টায় কক্সবাজার থেকে টেকনাফের দিকে আসা রাস্তায় দেখা গেছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল। আর রাস্তার দুই পাশে বসানো হয়েছে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ সামগ্রীর দোকান। কেউ কেউ সেখান থেকে পলিথিন নিয়ে রাস্তার পাশে ঘর নির্মাণ করে মাথা গোজার চেষ্টা করছেন। তবে রাস্তায় রাস্তায় দেখা গেছে রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেওয়ার চিত্রও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ট্রাক-পিকআপে করে খাবার ও বস্ত্র নিয়ে এসেছেন। সেসব সহায়তা নিতে রীতিমত ‘যুদ্ধে’লিপ্ত হয়েছেন রোহিঙ্গারা। টেকনাফের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখো গেছে- রোহিঙ্গারা যে যেভাবে পারছে আসছে,কিংবা আশ্রয় নিচ্ছে। আবার কেউ অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা তেমন দেখা মেলেনি। স্থানীয় লেগুনা চালক রফিক উল্যাহ বলেন,গত তিন দিন ধরে রোহিঙ্গাদের আসার পরিমাণ খুবই কম ছিল। আজ থেকে আবার বেড়েছে। গত কয়েকদিনে এ রকম স্রোত দেখিনি।

 

 

 

 

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top