দুপুর ২:৩৯, মঙ্গলবার, ২৫শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ ফিচার / রাগী সিংহ ও শান্ত ইঁদুর
রাগী সিংহ ও শান্ত ইঁদুর
জানুয়ারি ৬, ২০১৭

গ্রামের একপাশে বড় একটি বন। বনের তিনদিকে নদী আর একদিকে গ্রাম। ঐ বনে বাস করত একটি মাত্র সিংহ। সিংহকে যেহেতু বনের রাজা বলা হয়, তাই উত্তরাধিকার সূত্রে সে নিজেকে রাজা মনে করে অন্যান্য প্রাণীদের উপর অত্যাচার চালাতে থাকল। ঐ বনে আর কোনো সিংহ না থাকায় বনের প্রাণীরা আর কারো কাছে অভিযোগ করার সুযোগ পেল না।


একদিন একটা হরিণ সিংহের কাছে শিয়ালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সিংহ কী করল? সিংহ প্রথমে শিয়ালটাকে হত্যা করল, তারপর বিচারের পারিশ্রমিক হিসেবে হরিণটাকে খেয়ে ফেলল। এই খবর যখন বনের সকল প্রাণীদের কানে গেল তখন থেকে সকলেই সিংহের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকল।


এমন অত্যাচারি সিংহের খবর গ্রামবাসীদের কানে পৌঁছাতে খুব একটা দেরি হলো না। ঘনঘন সিংহের চিৎকারই তাদের মনে ভয়ের জন্ম দিতে থাকল। সিংহ বা অন্যান্য প্রাণীরা যাতে লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য গ্রামবাসীরা সবাই মিলে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বড় একটি প্রাচীর নির্মাণ করল। আগে দুই একটা বন্যপ্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করলেও এখন আর পারল না। প্রাচীর নির্মাণের পর থেকে গ্রামবাসীরা নিশ্চিন্তে বসবাস করতে থাকল।


দীর্ঘদিন ধরে সিংহের রাজদরবারে কেউ না আসায় ক্ষুধার জ্বালায় সে ছটফট করতে করতে বাইরে বেরিয়ে আসলো। ঠিক সেই মূহুর্তে তার চোখ পড়ল একটা ছোট্ট ইঁদুরের উপর। সে দেখতে পেল  ইঁদুরটি খুব মজা করে কি যেন খাচ্ছে। ক্ষুধার্ত সিংহের আর রাগ সহ্য হলো না। সে ইঁদুরটিকে ধমক দিয়ে বলল, ‘কী তোর পরিচয়, আর কোথায় থেকে এসে আমাদের অন্ন ধ্বংস করছিস?’ ইঁদুরটা ছিল খুব শান্ত স্বভাবের। সে সিংহ রাজাকে প্রথমে সম্মান জানাল এবং বলল, ‘আমি লোকালয় থেকে পথ ভুল করে বনের ভিতরে চলে এসেছি জাহাপনা, আর লোকালয়ে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না’।

 ইঁদুরের কথা শুনে রাগী সিংহ হা হা করে হেসে উঠল আর বলল, ‘এবার যদি আমি তোকে খেয়ে ফেলি তাহলে কে তোকে রক্ষা করবে বল’?। রাগী সিংহের কথায় ইঁদুরটা ভয় পেল ঠিকই কিন্তু সাহস হারাল না। সে সিংহকে অনেক অনুনয় বিনয় করে ক্ষমা চাইল আর বলল, ‘আমার মতো ছোট্ট ইঁদুরকে খেয়ে তো আপনার পেট ভরবে না জাহাপনা, তার চেয়ে আমাকে চলে যাওয়ার হুকুম দিন, আপনার জন্য অনেক দোয়া করব’।

ইঁদুরের কথা সিংহের মন গলাতে না পারলেও এতটুকু ইঁদুরে যে তার কিছুই হবে না সেটা বুঝতে সিংহের খুব একটা কষ্ট হলো না। তাই সিংহ ইঁদুরটাকে একটিবারের জন্য পালাবার সুযোগ দিয়ে বলল, ‘এবারের মতো আমি তোকে ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু আর কোনোদিন যদি তোকে সামনে পাই, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে গিলে ফেলব’। সিংহের আদেশ মাথা পেতে নিয়ে ইঁদুরটি সঙ্গে সঙ্গে ঘন বনের ভিতরে ঢুকে পড়ল।


ইঁদুরটিকে ছেড়ে দেওয়ার পর সিংহটা মনে মনে কেমন যেন তৃপ্তি অনুভব করতে থাকল। এই ধরনের তৃপ্তি সে আগে কখনও পায়নি, তাই সে বুঝে উঠতে পারল না কি কারণে এমনটা লাগছে। এদিকে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সিংহ যে শিকারের সন্ধানে বেরিয়েছিল তা বানর অন্যান্য প্রাণীদের জানিয়ে দেওয়ায় সারাদিন সিংহ কোনো শিকার করতে পারল না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে একটি গর্তের মধ্যে শুয়ে পরিত্যক্ত খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকল।


এমনিভাবে একটি দিন অতিবাহিত হওয়ার পর সিংহটা আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ল। এর উপরে আজেবাজে জিনিস খাওয়ায় সিংহটার প্রচ  ডায়রিয়া শুরু হয়ে গেল। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকল। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। ঠিক সেই মূহুর্তে তার চোখ পড়ল ছোট্ট ইঁদুরটির উপর। রাগী সিংহ ইঁদুরটিকে এবার আর ধমক না দিয়ে খুব ভালোভাবে কাছে ডেকে নিজের সমস্যার কথা খুলে বলল। ইঁদুরটা সবকিছু বুঝতে পেরে সিংহের কাছে লোকালয়ে যাওয়ার রাস্তাটা কোনদিকে জানতে চাইল। সিংহের দেখানো পথ অনুসরণ করেই ইঁদুরটি লোকালয়ে পৌঁছিয়ে অন্যান্য ইঁদুরদের সঙ্গে নিয়ে সিংহের জন্য স্যালাইনসহ ঔষধপত্র নিয়ে আসলো। সিংহ সেসব খেয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল।


রাগী সিংহ ইঁদুরের আচরণে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য ক্ষমা চাইল আর বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার পর আমি এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করেছিলাম, ইতিপূর্বে এমন তৃপ্তি আমি কখনও পাইনি কেনো বলতে পারো?’ ইঁদুরটি সিংহের কথার উত্তরে জানাল, ‘ভালো কাজ করলে সবসময়ই এমন তৃপ্তি অনুভব করা যায়’।
ছোট্ট ইঁদুরের মুখে এমন মহামূল্যবান কথা শুনে সিংহের ভিতরে আমূল পরিবর্তন সাধিত হলো এবং সেই থেকে সিংহ রাজা বনের সকল প্রাণীদের কাছে সৎ ও নিষ্ঠাবান রাজা হিসেবে পরিচিতি লাভ করল।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top