রাত ১০:১৭, বৃহস্পতিবার, ২৩শে মার্চ, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / যেতে হবে অনেক দূরে
যেতে হবে অনেক দূরে
জানুয়ারি ১৪, ২০১৭

শিক্ষা মানব সভ্যতা বিকাশের প্রধান সহায়ক। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত হলেও বইয়ের বোঝা সৃজনশীল পদ্ধতি পাবলিক পরীক্ষায় শতভাগ পাশ এ বিষয়গুলো বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুনীজনরা আরও পরিমার্জিত ও সংশোধিত করার পক্ষে তাদের সুচিন্তিত মতবাদ ব্যক্ত করেছেন।  

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা পরিবর্তনযোগ্য। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা গবেষণার ফল আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী কিভাবে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাবে, কিভাবে দক্ষ মানবসম্পদে পরিনত হতে পারে তার দিক নির্দেশনা থাকলেও কার্যত তা হচ্ছে না। এর বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে প্রচলিত নোট গাইড, প্রাইভেট কোচিং, বইয়ের বোঝা যা মারাত্মক আতংকের বিষয়। শিক্ষা তো কোনো পণ্য সামগ্রী নয় অথচ প্রায় প্রতিষ্ঠানই শিক্ষাকে বাণিজ্যকরণ করে ফেলেছে।

 এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে বাধ্য করা হচ্ছে। সেকালে শিক্ষায় এ ধরনের কোনো নিয়ম নীতিমালা ছিল না। এমনকি কোচিং বলে কোনো শব্দও আমরা শুনিনি। বড়জোর দু-চার মাস প্রাইভেট পড়া হয়েছে কিন্তু মাসের পর মাস প্রাইভেট বা কোচিংয়ের কোনো প্রয়োজন হয়নি। অথচ বর্তমান প্রাইভেট বা কোচিংয়ের নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এটাতো নীতি আদর্শের পরিপন্থি। আমি মনে করি প্রতিটি শিক্ষকের একটি ন্যূনতম নীতি ও আদর্শ থাকা দরকার যেটা অনেক শিক্ষকেরই নেই। সেকালে তো সারা বছর প্রাইভেট পড়তে হয়নি। তাহলে কেন বর্তমানে দিনের পর দিন প্রাইভেট কোচিং এমনকি সারা বছর ধরে চলবে এটাও দেখা গেছে যে, একটি বিষয় দুবছর ধরে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়। আমি যারা প্রাইভেট বা কোচিংয়ের সাথে জড়িত সে সমস্ত শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানিয়েই বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করতে চাই তাহলে ক্লাসে কি পড়ানো হয়।

 তিনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন শ্রেণি কক্ষে ভালোভাবে পাঠদান করান। বর্তমানে এটা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। আমাদের অভিভাবকরা  মনে করেন তার সন্তান জিপিএ-৫ পেলেই কেল্লা ফতে। জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই তার সন্তান সবার সেরা। এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্খিত লক্ষ্য উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে না বলে অনেক শিক্ষাবিদরা মনে করেন। যেভাবে শিক্ষার্থীর ওপর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তাতে ক’জন শিক্ষার্থী সৃজনশীল হতে পারবে ? বইয়ের আধিক্য কখনো শিক্ষার গুণগত মান বাড়াবে না।

 আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সম্প্রতি বলেছেন, যেতে হবে অনেক দূরে। আমরাও তাঁর এ বক্তব্যকে স্বাগত জানাই, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা পৃথিবী জয় করুক। মেধা সম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে উঠুক। কিন্তু এভাবে কতটুকু সম্ভব। তাই শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই প্রাইভেট কোচিং, গাইড নির্ভর শিক্ষাই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কি অর্জন করছে। তারাতো মুল বইমুখী নয়। বইয়ের বোঝা প্রাইভেট বা কোচিং গাইড এগুলো কি প্রকৃতপক্ষে সৃজনশীল ও মেধা বিকাশে সহায়ক। এদিকগুলো আমাদের রাষ্ট্র কখনো ভেবে দেখেছে। আর যদি প্রাইভেট কোচিংই মেধা বিকাশে, সৃজনশীলতা অর্জনে সর্বোত্তম পন্থা হয়ে থাকে তাহলে স্কুলের দরকার কী ? তবে সরকার দেরিতে হলেও প্রাইভেট কোচিং বাণিজ্য বন্ধে আইন করতে যাচ্ছে এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন আসবে যা জাতির জন্য হবে অবশ্যই মঙ্গলজনক।

আমরা কখনো ভাবি না পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়। অথচ এ দু’টিকে আমরা এক করে ফেলেছি। ইতিমধ্যে জেএসসি, জেডিসি, পিএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। পাশের হারও সন্তোষজনক। কিন্তু মেধার বিকাশ কি ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। তাই শতভাগ পাশ জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের গভিরতা ও পরিধি সম্পর্কে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে। অভিযোগ রয়েছে পাবলিক পরীক্ষার খাতাগুলো অবমূল্যায়নে। যে কারণে পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর অধিকাংশই ইংরেজি বড় ও ছোট অক্ষর সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজানা। গুণ ভাগের অংকও ভালোভাবে কষতে পারে না। ভালোভাবে বাংলা পড়তে পারে না। তাহলে এ সমস্ত শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ কিভাবে পায়। এ প্রশ্ন কি অমূলক ?

স্বাধীনতার সাড়ে ৪দশক পরও আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দ্বিধায় ভুগি। একটি দেশের বড় সম্পদ হচ্ছে তার জনগোষ্ঠি। আমাদের দেশের এ বিপুল জনগোষ্ঠিকে যদি উপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে তোলা না যায় তাহলে দেশের উন্নয়ন হবে কিভাবে। শুধু শিক্ষাবিদরাই নয় অর্থবিদরাও এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, দীর্ঘ মেয়াদী ভালো শিক্ষায় উন্নয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। তাই শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। যাতে করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কিছু শিখতে পারে, জানতে পারে। বন্ধ করতে হবে সকল প্রকার কোচিং ব্যবসা, নোট গাইড। শিক্ষাকে বাণিজ্য করণের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সরকারি নজরদারী বাড়ানো দরকার। কেউ মানুক বা না মানুক স্বীকার করুক বা না করুক নিজ নিজ বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক প্রাইভেট বা কোচিং যা বছরের পর বছর ধরে চলছে এগুলো কিসের আলামত। কি শেখাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।

 প্রাইভেট কোচিং একটি বিষয়ে বড়জোর ২/৩ মাস চলতে পারে যা সেকালের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছিল। কিন্তু একটি বিষয় এক বছর দু’বছর ? তাহলে ওই শিক্ষক কতটা শ্রেণি কক্ষে আন্তরিক এ প্রশ্ন উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ ব্যবস্থায় কি শিক্ষার মান বাড়ছে। শিক্ষার মান এভাবে বাড়ে না। আজ অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোচিং নির্ভর। তারা বিদ্যালয় বইমুখী নয়। আমি কোনো শিক্ষককে ছোট করতে চাই না তাদের প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলতে চাচ্ছি শ্রেণি কক্ষের চাইতে প্রাইভেট কোচিং ব্যবস্থাকে বড় করে তোলোর ব্যর্থ চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই। কারণ এতে শিক্ষক উপকৃত হলেও শিক্ষার্থী উপকৃত হবে না প্রকৃত পক্ষে। বড়জোর রেজাল্ট ভালো হতে পারে কিন্তু রেজাল্ট স্বর্বোস্ব শিক্ষায় প্রকৃত শিক্ষা নয়। একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ও মনের জোর বাড়াতে হবে। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীর মনের জোর বাড়ানো যায়। কিন্তু কোচিংয়ে না বুঝে নোট মুখস্ত করার মধ্যে শিক্ষার্থীর মনের জোর দুর্বল হয়ে যায়। তারা নোটগুলো হজম করতে পারে না। ভবিষ্যতে এই ধরণের শিক্ষা আমাদের প্রজন্মকে নতুন ও ভালো কিছু দিতে পারে না।

শিক্ষার্থীর মনের জোর আত্মবিশ্বাস মেধা বিকাশের সহায়ক। একাজগুলো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠ্য দানে জাগ্রত করা যায়। সেকালের শিক্ষায় শিক্ষক মন্ডলী খুব সুন্দর এবং ভালো করে শ্রেণিকক্ষে পাঠ দান করেন। সে পাঠদানে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে এমনকি সে সময় এমনও শিক্ষার্থী ছিল যারা নিজ নিজ ক্লাস নিতেও পারতেন। কিন্তু বর্তমানে এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণি কক্ষের চেয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে। যার কারণেই আজকের শিক্ষার্থীরা ভালো রেজাল্ট করলেও প্রকৃত পক্ষে তাদের মধ্যে সৃজনশীল ও মেধার বিকাশ হচ্ছে না। এর মূল কারণই হচ্ছে মুখস্ত বিদ্যা। অথচ এ মুখস্ত বিদ্যা পরিহার করার লক্ষ্যেই একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছেন সরকার। শ্রেণি কক্ষ ছাড়া অন্য কোথাও শিক্ষার্থী ভালো কিছু অর্জন করতে পারে না।

 সৃজনশীল পদ্ধতি এ শিক্ষা ব্যবস্থায় সফল করতে হলে শুধু পাশের হার জিপিএ-৫ বাড়ানো নয় সকলদিক প্রয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে প্রাইভেট কোচিংয়ে এবং নোট গাইডের সুফল পাওয়া যাব্ েনা। আমাদের নতুন প্রজন্ম বেশিদূর যেতে পারবে না। প্রকৃত শিক্ষা, সৃজনশীল মেধা সম্পন্ন জনগোষ্ঠি একটি জাতিকে উন্নতির সোপানে পৌঁছে দেয়। সারা বিশ্বে যেসব দেশ আজ মাথা উঁচু করে আছে এবং সামাজিকভাবে উন্নতি করেছে সেসব দেশে বরাবরই শিক্ষার মান ছিল ভালো। ভারত, নেপাল, ভূটান শ্রীলংকায় উন্নতির মূলে রয়েছে শিক্ষার মান ও উন্নত ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি।

 সেসব দেশেও প্রায় শতভাগ পাশের চিত্র রয়েছে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার মান এতটা উন্নত যে, একজন শিক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষেই মেধা, সৃজনশীলতা অর্জন করে নিজেকে প্রস্তুত করেছে প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে টিকে থাকার লড়াইয়ে। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে বহিঃবিশ্বের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে শতভাগ পাশ আমাদের শিক্ষার মান হয়েছে নিম্নমূখী। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষার মানের প্রশ্নে তারা কোনদিন আপোষ করেননি। আর আমাদের দেশে ভালো স্কুলের সংজ্ঞা হলো কোন স্কুল কতটি এ-প্লাস পেয়েছে। এ এপ্লাস এর নেপথ্যে শিক্ষার্থীর শৈশব, কৈশোর হারানো, প্রাইভেট কোচিংয়ে ব্যস্ত থাকা, বইয়ের বোঝা টানাটানি, প্রকৃতি থেকে জ্ঞান আহরনের সুযোগ না থাকা, এ-প্লাসের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকা এবং এ জন্য প্রতিযোগিতায় বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় গতি থাকলেও গন্তব্য নেই।


আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা অনাচার প্রবেশ করেছে। এ সবকিছু থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুক্ত করতে হবে। শুধু পরীক্ষায় উন্নীর্ণ হওয়াকে সাফল্যের মাপকাটি মনে না করে আমাদের লাখো শিক্ষার্থীকে নৈতিক মূল্যবোধে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার ছবক দিতে হবে। শিক্ষাকে গুনগত মানের দিক থেকে উন্নত করতে পারলেই দেশের উন্নয়ন সহজতর হবে এবং মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীর সেই ‘যেতে হবে অনেক দূরে’ তা বাস্তবায়ন হবে।
লেখক: শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top