সন্ধ্যা ৬:১৬, রবিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / যানজটে ক্ষতি হচ্ছে দেশের অর্থনীতি
যানজটে ক্ষতি হচ্ছে দেশের অর্থনীতি
জুলাই ১৭, ২০১৭

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ :মানুষের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে ঠিক সেই হারে হয়তোবা গাড়ীর সংখ্যা বাড়ছে না। কিন্তু তারপরেও রাস্তায় বের হলেই যানজটের যন্ত্রণায় রীতিমত নাকানি-চুবানি খেতে হয়। যানজট ও যানসংকট এই দু’টো সমস্যা এখন সব শ্রেণির মানুষকেই প্রতিনিয়ত নাজেহাল করে ছাড়ছে আর এর পিছনের প্রধান কারণগুলো কম বেশি আমরা সবাই জানি। তাই সেই সব পুরাতন কথা আবার নতুন করে না বলায় সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে। তবুও দু’চার কথা না বললেই নয়। কারণ এখানে কে শোনে কার কথা? যে যার মত কাজ করে যাচ্ছে। কেউ কারো তোয়াক্কা করছে না।

 একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গোটা দেশকে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে, সুবিধা মত সবাই তার ব্যবহার করছে। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে অথচ সেই বিষয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। সেই সাথে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সুশীল সমাজের বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সরকার নিজেদের খেয়াল খুশি মত যা- ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে। শুধু সরকারকেই বা দোষ দিয়ে কী হবে? ভালো ভালো এক গাদা কথা সবাই বলতে পারে কিন্তু ভালো একটা কাজ করে দৃষ্টান্ত তৈরি করবে এ রকম লোকের সমাজে আজ বড়ই অভাব!

 তবে একটা কথা আমাকে খুব করে ভাবিয়ে তুলছে, বাংলাদেশে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে ঠিক সেই সমানুপাতিক হারে যদি গাড়ির সংখ্যাটা বাড়ানো যেত, তাহলে জানিনা রাস্তাগুলোর কী হাল হত ? আমরা এখন নগরায়ন ও শিল্পায়নের যুগে বাস করছি। আমাদের ঢাকা শহরটিও সেই দিক বিবেচনায় কম এগিয়ে নেই। সময়ের তালে এখানে নগরায়ন ও শিল্পায়নের সমাবেশ ঘটেছে।

গড়ে উঠেছে অনেক বড় বড় গার্মেন্টস শিল্প। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের এখন সিংহভাগই আসে এই গার্মেন্টস শিল্প থেকে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জার্মান, ফ্রান্স এরকম উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শপিংমলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ খ্যাত টি শার্ট ও জিনস প্যান্টগুলোর রমরমা চাহিদা রয়েছে।  একেবারেই নূন্যতম মজুরি নিয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা লাখ লাখ নারী শ্রমিক এখানে কাজ করছেন। বলা চলে আমাদের এখন প্রধান দুটি গর্বের জায়গা তৈরি হয়েছে ‘ক্রিকেটে বাংলাদেশ’ ও ‘তৈরি পোশাকে বাংলাদেশ’।

মানুষ তাদের পেটের ক্ষুধা মেটানোর তাগিদেই প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলগুলো থেকে ঢাকা শহরের দিকে ছুটছে প্রতিনিয়তই। যেহেতু আমাদের আগ্রহের প্রধান কেন্দ্র বিন্দু এই ঢাকা শহরটি সেহেতু এটি নিরাপদ ও সুশৃংখল রাখা সরকারের একটি বড় দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার মধ্যেই পড়ে। আমরা জানি যে একটি আধুনিক নগরীতে তার মোট আয়তনের ২০-২৫ ভাগ রাস্তা বা সড়ক থাকা প্রয়োজন।

কিন্তু ঢাকা শহরের আছে মাত্র ৬-৭ ভাগ রাস্তা।  ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে এই ৭-৮ ভাগ রাস্তার আবার ৩০ শতাংশই আছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং ও অবৈধ দখলদারদের হাতে। সুতরাং সব হিসাব নিকাশ চুকিয়ে সাধারণের চলাচলের জন্য যে জায়গাটুকু বাকি রয়েছে তার মধ্যে আবার মাত্র ১৫ ভাগ যাত্রী দখল করে আছে  প্রায় ৭০ ভাগ রাস্তা।

 স্ট্র্যাটেজিক ট্র্যান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) তথ্য মতে মাত্র ১৫ ভাগ যাত্রী প্রাইভেট গাড়ীতে যাতায়াত করেন। আর এই ১৫ ভাগ প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ ভাগ রাস্তা। এই যদি হয় আমাদের রাস্তার অবস্থা তাহলে যানজট তো হবেই। আর এই যানজটের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে মানুষের  দৈনন্দিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট (বিওআই) এর তথ্যমতে প্রতিবছর যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের যে পরিমাণ কর্মঘন্টা নষ্ট হয় তার স্বাভাবিক মূল্য হিসাব ৪৩ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, উৎপাদন খাতে ক্ষতি হয় ৩০ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ক্ষতি হয় ২১ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, জ্বালানি ও যানবাহন  মেরামতে ১ হাজার ৩৯৩ এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয় ১৫৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শুধুমাত্র যানজটের কারণে প্রতিবছর মোট ক্ষতি হয় ৯৭ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। একটি দেশে শুধুমাত্র যানজটের কারণে যদি ক্ষতির পরিমাণ এত বিশাল হয় তাহলে আরো অন্যান্য খাতে প্রতিবছর ক্ষতির পরিমাণটি কী দাঁড়ায় তা ভাবার বিষয়।

যানজট কী? যানজট কেন হয়? যানজট নিরসনের উপায় কী? এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি মহলে এই নিয়ে যে দীর্ঘদিন ধরেই বিস্তর আলোচনা হয়নি; ঠিক তাও না। আমরা জানি যখন সড়কপথে যানবাহনের সংখ্যা সড়কের ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং যানবাহনগুলোর স্বাভাবিক গতি থেকে একেবারে মন্থর হয়ে পড়ে বা চলাচল করতে পারে না তাকেই মূলত আমরা যানজট বলে থাকি।

  আমাদের দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই সাথে ক্রমান্বয়ে গাড়ির সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু আমাদের রাস্তাঘাটগুলো বাড়ছে না। বরং সেগুলো আরো দিন দিন সংকোচিত হচ্ছে। যার কারণে আমাদের দৈনন্দিন যানজটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যারফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের দেশ।

 যানজট নিরসনে সরকারও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কিন্তু কাজের কাজটি হয়নি। ফ্লাইওভার, ওভার ব্রীজ, উড়াল সেতু  ইত্যাদি নির্মাণ করে সরকার একটু হলেও যানজট নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছিল কিন্তু যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে এসব ছোট ছোট কাজে যানজটের মত একটি ভয়াবহ সমস্যাকে সামাল দেয়া খুবই দুরুহ।

বাংলাদেশের যানজটের  পিছনে শুধু যে জনসংখ্যার লাগামহীন বৃদ্ধিই প্রধান দায়ী তা কিন্তু না। আমাদের সড়কের ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া যানজটের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও কর্মক্ষেত্র বা বিদ্যালয় শুরু এবং ছুটির সময় অস্বাভাবিকভাবে গাড়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি, ঢাকা শহর ছাড়াও অধিকাংশ বড় বড় শহরগুলোতে যানজটের অন্যতম একটি প্রধান কারণ।  অনেক সময়  নিজেদের দোষেও আমরা যানজটের সৃষ্টি করি।

 যেমন অদূরদর্শীভাবে গাড়ি চালানো, সড়কপথে অপরিকল্পিতভাবে চলাচল করা, ট্র্যাফিক আইন মেনে না চলা, ড্রাইভারদের ওভারটেকিং প্রবণতা,  অবৈধভাবে সেখানে সেখানে গাড়ী পার্কিং করা, রাস্তার সংস্কার না করা, বর্ষাকালে রাস্তায় জলাবদ্ধতা ও দখলদারিত্বের কারণেও অধিকাংশ সময়ই রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তাই শুধু যানজট নিরসনে শুধু সরকারি পদক্ষেপেই যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এর গুরুত্ব অনুধাবন এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। সেই সাথে গাড়ি  চালকদেরকেও  শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে এই যানজটের ভয়াবহ কবল থেকে যুগের পর চেষ্টা করলেও বের  হওয়া সম্ভব হবে না।

  কারণ সরকার যানজট নিরসনে অনেক পদক্ষেপেই নিয়েছেন কিন্তু কোনটিই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রথমে আমাদেরকে সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই সাথে প্রতিটি রাস্তায় ডিভাইডারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশদের নিয়মিত টহল বাড়াতে হবে, বেশি যানজটপূর্ণ সড়কের মোড়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করে তাদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের জনগণ হু হু করে বাড়ছে তার সাথে কিছুটা হলেও তাল মিলিয়ে গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু সেই অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। আবার অন্যদিকে রাস্তাগুলো দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। ঢাকা শহরের অনেক রাস্তা থেকেই পানি নিষ্কাশনের কোন সুব্যবস্থা নেই। যার ফলে একটু হালকা বৃষ্টি এলেই রাস্তাগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক রাস্তা গর্ত আর  খানাখন্দে ভরা।

 যার ফলে গাড়ী চালক তাদের স্বাভাবিক গতিতে গাড়ী চালাতে পারে না। এসব বিপর্যস্ত রাস্তা, অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও অধিকাংশ জনাকীর্ণ সড়কের মাঝে রেলক্রসিং, ড্রাইভারদের আইন না মানার প্রবণতা, মাত্রাতিরিক্ত প্রাইভেট কার, পথচারীদের আইন না মানার প্রবণতা। নি¤œগতির রিকশা, ভ্যান, ইত্যাদির কারণেও যানজট দেখা দেয় প্রকট আকারে। এছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মিটিং, মিছিল, আন্দোলন, দলীয় কোন্দল, মারামারি বিভিন্ন হামলা-মামলার প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন ইত্যাদি তো লেগেই আছে।

এগুলোর কারণেও অধিকাংশ সময় সাধারণ মানুষকে যানজটের যন্ত্রণায় পড়ে নাকানি-চুবানি খেতে হয়।  তবে যানজটের মাত্রা ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি। গোটা বাংলাদেশের মানুষ কর্মের সন্ধানে ঢাকায় এসে ভিড় করছে। যার ফলে  সড়ক ব্যবস্থা দিন দিন  মানুষের ধারণ ক্ষমতার একেবারে বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম মেগাসিটিগুলোর মধ্যে ঢাকা একটি অন্যতম প্রধান মেগাসিটি শহর।

 যার কারণে যানজট এই শহরের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। ঢাকা শহরে যানজট এড়িয়ে চলার শুধু একটি মাত্র পথই খোলা আছে আর সেটি হচ্ছে আকাশ পথ। কারণ সড়ক পথে যানজট এড়িয়ে চলা মানে আকাশ কুসুম চিন্তা করা একই কথা। এগুলো তো গেল যানজটের কথা। যানসংকটের কথা তো বাকি থাকল। ঈদের ছুটিতে প্রিয়জনদের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য সাধারণ মানুষ যখন তাদের কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার আশায় বুক বেঁধে থাকেন ঠিক তখনি দেয়া দেয় যানসংকট।

একেকটি টিকিট হয়ে ওঠে যেন একেকটি সোনার হরিণ।  ট্রেন বা বাসের একটি টিকিট পাওয়ার আশায় ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপরেও অনেক সময়  সেই মহামূল্যবান টিকিট মিলে না। অনেক  সময় বহুকষ্ট করে  টিকিট নামক সেই অতি দূর্লভ বস্তুটি পাওয়া গেলেও পথে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়।

তাই এই যানজট ও যানসংকট নিরসনে সরকারের একটি দুরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সড়কগুলো ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রাফিক আইনকে আরো বেশি জোরদার করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ করতে হবে। প্রাইভেট কারের সংখ্যা কমিয়ে পাবলিক বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রতিটি ড্রাইভারকে  শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে সাধারণ পথচারীদেরকেও যানজট সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তবেই আমরা যানজটের যন্ত্রণা থেকে একটু হলেও রক্ষা পাব।
লেখক ঃ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৫০-৫৩৪০২৮

এই বিভাগের আরো খবর



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top