সকাল ৬:০৫, রবিবার, ২৫শে জুন, ২০১৭ ইং
/ Today Lead / মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর
মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর
এপ্রিল ১২, ২০১৭

করতোয়া ডেস্ক : এক যুগ আগে সিলেট মহানগরীতে হযরত শাহজালাল (রঃ) মাজারে বোমা হামলা চালিয়ে ৩ জনকে হত্যা ও তৎকালীন বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীসহ ৪০ জনকে আহত করার মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ ৩ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

 

তাদের মধ্যে মুফতি হান্নান ও তার এক সহযোগী শরীফ শাহেদুল বিপুলের ফাঁসি কার্যকর করা হয় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। অপর সহযোগী দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে। তাদেরকে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে বলে জানা যায়।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, বুধবার রাত ১০টা ১ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ শাহেদুল বিপুলকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।


একই সময়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের আরেক সহযোগী দেলোয়ার হোসেন রিপনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় বলে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া জানান।মুফতি হান্নান পাকিস্তানি ও আফগান জঙ্গিদের কায়দায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি) নামের সংগঠন গঠন করে বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন।

তার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা, কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা এবং রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জনকে হত্যাসহ ১৭ মামলা রয়েছে।
মুফতি হান্নান ও বিপুলের ফাঁসি


গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার সহযোগী জঙ্গি শরীফ শাহেদুল বিপুলের ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান।এর আগে রাত ৭টা ৫৭ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন। রাত ৭টা ৫৭ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন তিনি। এর আগে ৭টা ৪০ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন অতিরিক্ত আইজি প্রিজন কর্নেল ইকবাল হোসেন। অন্যদিকে, সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স দুটি কারাগারে প্রবেশ করে।


এর আগে বিকেল ৪টায় কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) তৌহিদুল ইসলাম    কারাগারে প্রবেশ করেন। ফাঁসির রায় কার্যকরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিকেল থেকেই ঢাকা- টাঙ্গাইল মহাসড়কের নতুন বাজার থেকে কারাগারের প্রধান ফটক পর্যন্ত সড়কে যান ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কারাগার এলাকায়ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।


মুফতি আবদুল হান্নান ও তার সহযোগী শরীফ শাহেদুল বিপুলের সঙ্গে শেষ দেখা করার জন্য তাদের পরিবারকে মঙ্গলবার বার্তা পাঠানো হয়। বুধবারই সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে মুফতি হান্নানের সঙ্গে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও বড় ভাই সাক্ষাৎ করেন বলে জানান কারাগারের সিনিয়র সুপার মো. মিজানুর রহমান। তিনি জানান, সকাল সাতটার দিকে কারাগারে আসেন তারা। সকাল ৭টা ১০ মিনিট থেকে ৭টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত মুফতি হান্নানের সঙ্গে তারা কথা বলেন। বিপুলের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলেও তারা কারাগারে যাননি।


কারা সূত্র জানায়, কাশিমপুরে দুই জঙ্গির ফাঁসি কার্যকরে কারা কর্তৃপক্ষের সব প্রস্তুতি ছিল আগে থেকেই। একজন জেলার ও দুজন ডেপুটি জেলারের তত্ত্বাবধানে সাতজন জল্লাদ ফাঁসির মহড়াও শেষ করেন বুধবারের মধ্যেই। মুফতি হান্নানের উচ্চতা ও ওজনের সমপরিমাণ ওজনের বস্তায় রশি বেঁধে ফাঁসির লিভার টেনে মহড়াও হয়।
সিলেটে জঙ্গি রিপনের ফাঁসি
হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার সিলেটের কৃতীসন্তান আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত জঙ্গি দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাত ১০টা এক মিনিটে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে জানিয়েছেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া। রিপনের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের কোনাগ্রামে।


সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্মকর্তারা জানান, জল্লাদ ফারুক ও জাহাঙ্গীর লিভার টেনে রিপনের ফাঁসি নিশ্চিত করেন। ফাঁসি কার্যকরের সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) এসএম সাহেদুল ইসলাম, সিভিন সার্জন, কারাগারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।ফাঁসির পর রিপনের ময়নাতদন্ত করেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক অমল রতন সাহা ও সিভিল সার্জন অফিসের চিকিৎসকরা। ফাঁসি কার্যকর উপলক্ষে গতকাল দুপুর থেকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার ও এর আশপাশ এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।


সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে দুটি মাইক্রোবাস ও একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে হুজির শীর্ষ জঙ্গিদের অন্যতম দেলোয়ার হোসেন রিপনের বাবা-মা ও স্ত্রীসহ প্রায় ২৫ জন শেষ দেখা করতে কুলাউড়া থেকে কারাগারে আসেন।এক ঘণ্টা ৩৬ মিনিট কারাগারে অবস্থানের পর রাত ৮টা ২৬ মিনিটে তারা বেরিয়ে যান। যাওয়ার সময় রিপনের স্ত্রী ও মা কান্নাকাটি করতে দেখো গেছে। তবে তারা কারাফটকে থাকা সাংবাদিকদের সাথে কোনো কথা বলেননি। দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে তারা কারাগার এলাকা ত্যাগ করেন।


স্বজনরা বেরিয়ে যাওয়ার পর রিপনকে তওবা পড়ান সিলেট নগরের আবু তোরাব মসজিদের ইমাম মাওলানা মুফতি মো.বেলাল উদ্দিন। এর আগে তাকে গোসল করানো হয়। তওবা পড়ানোর পর মুফতি মো. বেলাল উদ্দিন রাত ৯টা ২৮ মিনিটে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান।


হান্নান ও তার দলের জঙ্গিরা ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ওই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে। ওই ঘটনায় আনোয়ার চৌধুরী প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন নিহত হন। সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হন সেদিন।এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামরায় ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদন্ড  এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন।


ওই হত্যাকান্ডের দায়ে হান্নান, বিপুল ও রিপনের মৃত্যুদন্ডের রায় সর্বোচ্চ আদালতেও বহাল থাকে। সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ করে আপিল বিভাগ বলে, “তারা যে অপরাধ করেছে তা পূর্বপরিকল্পিত একটি অপরাধ। ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ ও তার সফরসঙ্গীদের হত্যা করার জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছিল। এ অভিযোগের দায় থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া যায় না।


আদালতের ওই রায় এমন এক দিনে কার্যকর হল, যখন বাংলাদেশের মানুষ বৈশাখ বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ওই বর্ষবরণের উৎসবেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত হন দশজন। সেই মামলাতেও নিম্ন আদালতে মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় এসেছে। রায়ের বিরুদ্ধে তার করা আপিলের ওপর শুনানি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে হাই কোর্টে।

 বলা হয়, বিশ শতকের শেষ বছর যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে হরকাতুল জিহাদের বোমা হামলার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সূচনা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ হরকাতুল জিহাদের ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পেছনে মূল ব্যক্তি হিসেবে মুফতি হান্নানকে দায়ী করা হয়। শেখ হাসিনার নিজের জেলা গোপালগঞ্জেই মুফতি হান্নানের বাড়ি। পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে তার জঙ্গিবাদে হাতেখড়ি। আফগানিস্তান সীমান্তে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। আর মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত তার দুই সহযোগীর মধ্যে শরীফ শাহেদুল বিপুলের বাড়ি চাঁদপুর সদরে; দেলোয়ার হোসেন রিপনের বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়।


সিআইডি অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক আব্দুল কাহার আকন্দ গতবছর বিবিসিকে বলেন, “হান্নানের বিশেষত্ব হল- তিনি আফগান স্টাইলে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার তৎপরতা চালচ্ছিলেন। প্রথমে দেশি বোমা ব্যবহার করলেও পরে পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করেন। এছাড়া বোমা বানানো এবং আক্রমণ বিষয়েও তার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে এবং এ নিয়ে প্রশিক্ষণও দিতেন তিনি।” ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৭ মামলার আসামি হান্নান ও তার সহযোগীদের মুক্ত করতে গত ৬ মার্চ টঙ্গীতে প্রিজন ভ্যানে হামলার ঘটনাও ঘটে।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top