দুপুর ২:০৮, রবিবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এবং…
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এবং…
জানুয়ারি ১১, ২০১৭

কে মুক্তি-যোদ্ধা আর কে মুক্তিযোদ্ধ নয় এ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই বিতর্ক চলছে। আজও সে বিতর্ক অব্যাহত আছে। জানি না আরো কতদিন বিষয়টি বিতর্কের মধ্যে থাকবে। মোটা দাগে বলা হয়ে থাকে, কতিপয় স্বাধীনতা বিরোধী ছাড়া পুরো জনগণ ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে তথা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। সে সময় যারা স্বাধীনতার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, বীরাঙ্গনা হয়েছেন, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন তাদের একটা তালিকা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই তালিকা নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল তা স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও শেষ হয়নি।


এই ৪৫ বছর যত সরকার ক্ষমতায় ছিল, সব সরকারই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে কাজ করেছে। কাজ করেছে মানে তালিকায় সংযোজন-বিয়োজন করেছে। সেটা হতেই পারে। তা ছিল চলমান বিষয়। কেননা আমাদের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা তৈরি করা কঠিন বৈকি। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিরাট অংশ ভারতে গিয়ে ট্রেনিং ও অস্ত্র নিয়ে দেশে এসে এবং অনেকে দেশে থেকে ট্রেনিং নিয়ে নানাভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে হানাদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এখন যে তালিকাটি সরকারের কাছে আছে, তারা মাসিক ভাতা, নিজের এবং সন্তানদের চাকরি, শিক্ষা ক্ষেত্রে ভর্তিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তাতে আপত্তির কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধে যাদের অবদান রয়েছে তার স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ মর্যাদা পেতেই পারেন। যেহেতু রাষ্ট্রের সেই আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে। যাদের অবদানের জন্য আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছে, তারা অনন্তকাল ইতিহাসের পাতায় সম্মানিত হয়ে থাকবেন। সে জন্যই মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও পাচ্ছেন।


একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় চিফ অব স্টাফ ছিলেন লে. জেনারেল (অব.) জেএফআর জ্যাকব। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে যে দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন সেই দলিলের খসড়া রচয়িতা ছিলেন জেনারেল জ্যাকব। দলিলের খসড়া রচনাই নয়, নিয়াজীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার কৃতিত্ব্ও ছিল তার। সম্প্রতি জেনারেল জ্যাকব বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময় একটি বেসরকারি নিউজ এজেন্সি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষৎকারে জ্যাকব বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বেই স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ’। সেই সাক্ষাৎকারে এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল জ্যাকব বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানী বাহিনীর নৃশংসতার কথা আপনাদের চেয়ে ভালো আর কে বলতে পারবে। এ ব্যাপারে আর যে কারো চাইতে বেশি তথ্যবহুল এবং খুটিনাটি বর্ণনা সমেত রেকর্ড রয়েছে আপনাদের কাছে। আপনারা ওই নির্মমতার সাক্ষী, তাই এ ব্যাপারে আপনারাই সঠিক রায় দিতে পারবেন। আমি সবসময়ই বলেছি, এটা আপনাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ।

 আপনাদের মুক্তিযুদ্ধ’। সেই সাক্ষাৎকারটি জেনারেল জ্যাকব এই বলে শেষ করেন- ‘মুক্তিযোদ্ধা ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অসাধারণ বীরত্বের সুবাদেই স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে স্রেফ তুমুল দেশপ্রেম পুঁজি করেই একটা শক্তিশালী নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে জয় ছিনিয়ে এনেছেন তারা। আমরা তাদের সাহায্য করেছি, আমরা তাদের সহযোদ্ধা। কিন্তু তাদের লড়াইটা তারা নিজেরাই লড়েছেন। চেতনার পুরোটা ঢেলে দিয়েই তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছেন। তাদের প্রতি আমার হৃদয়ভরা আশীর্বাদ এবং আপনাদের সঙ্গে আমিও তাদের শ্রদ্ধা জানাই। তারাই আপনাদের সত্যিকার রতœ যাদের নিয়ে এদেশ গর্ব করতে পারে।’ জেনারেল জ্যাকবের সাক্ষাৎকারের এই অংশটি এ জন্য আনলাম যে, বাংলাদেশ স্বাধীন করতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কী পরিমাণ অবদান রেখেছে- তা নতুন করে তুলে ধরতে। কথাটা এখানেই থেমে গেলে খুশি হতাম। কিন্ত তা নয়।

 কেননা যখন শুনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। নিজেকে ছোট মনে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এমন বেশকিছু ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান পাওয়া গেছে। যারা সমাজের উপরের স্তরের মানুষ। এসব দেখে মনে হয়, সমাজের উপরের স্তরের কতিপয় মানুষদের মধ্যে দুর্নীতির একটা প্রবল প্রবণতা কাজ করছে। এটা আর কিছুই নয়, সংক্ষিপ্ত পথে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া। যারা গরিব, তারা দুর্নীতিতে থাকে না। গরিবরা দুর্নীতিবাজ নয়। যাদের ক্ষমতা নেই, তাদের আবার ক্ষমতার অপব্যবহার কী! একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সরকার হতদরিদ্র মানুষদের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেবার একটা মহতী ব্যবস্থা করেছে। সেই কর্মসূচি এখনও চলমান।

 কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সেই চাল নিয়ে দুর্নীতির কথা মাঝে-মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে আসছে। গরিব মানুষের চাল মেরে যারা ধনী হতে চায় তাদের মানসিকতার কথা চিন্তা করুন! নৈতিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গেলে সৃষ্টির সেরা কতিপয় ‘মানুষ’ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? চাল আত্মসাতের ঘটনায় সর্বশেষ প্রাপ্ত একটা খবর জানাতে চাই। সেই খবরের শিরোনাম ছিল ‘চাল আত্মসাৎ করায় চাঁদপুরে ২ জনের দন্ড’। সরকারি চাল আত্মসাতের দায়ে খাদ্য কর্মকর্তাসহ দুইজনকে ১০ বছর করে কারাদন্ড দিয়েছে চাঁদপুরের একটি আদালত। দন্ডিতরা হলেনÑ কচুয়া উপজেলা খাদ্য গুদামের সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুন্সী আব্দুস সালাম এবং ওই গুদামের গাড়ি চালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে আসামিরা চাঁদপুর কারাগারে রয়েছেন। তাদের ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ চালের লোভ সামলাতে না পারেন তবে থাকে কী? তাদের কী এখন বেতন খুবই কম? তাই দুর্নীতি করতে হচ্ছে! আসলে লোভ এদেরকে গ্রাস করেছে। মুক্তিযোদ্ধা সেজে ভূয়ারা একই কাজ করছে। ‘এদের’ আর ‘ওদের’ কোনো তফাৎ নেই।

     
আবার মুক্তিযোদ্ধাদের কথায় ফিরে আসি। বলছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে। আমি ভীষণভাবে বিস্মিত যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তি ন্যাপ-ছাত্র ইউনয়ন- কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ২৩৬৭ সদস্যকে মামলা করে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্বীকৃতি নিতে হলো। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার সময় এই কাজটি হলো। বিস্মিত এই জন্য যে, একাত্তরের প্রজন্মের অনেকেই এখনও জীবিত। ইতিহাস তাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। ২০১৩ সালের ২২ জুলাই গেরিলা বাহিনীর ওই ২ হাজার ৩শ ৬৭ জন যোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। পরে কোনো কারণ ছাড়াই ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যেটিতে ওই গেরিলা যোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর সরকারের তালিকা বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন ওই গেরিলা বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ও ঐক্য ন্যাপ- এর সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। পরে ওই রিটের শুনানি শেষে প্রজ্ঞাপনটিকে কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চ ২৩৬৭ যোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন অবৈধ বলে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। রিট আবেদনে বলা হয়েছিল, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পরপরই ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ও সদস্যরা একটি বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন।

 দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি গেরিলা বাহিনীর কমান্ডাররা ঢাকায় তৎকালীন জাতীয় স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন’। সেই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিপিবির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। যে ছবি আজও সংবাদপত্রে দেখতে পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার এবং স্বাধীনতা উত্তর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারসহ প্রতিটি সরকার এই বিশেষ গেরিলা বাহিনীকে মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী অন্যতম মুক্তি বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটা একটা ইতিহাস। এই ইতিহাসে ‘ভূয়া’ শব্দের অস্তিত্ব নেই। সেই ইতিহাসকে কারা পাশ কাটাবার ধৃষ্টতা দেখায় জানি না। যে তালিকায় ছিলেন মনি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, পংকজ ভট্টাচার্য, মঞ্জুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ। এদের মধ্যে মনি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ একাত্তরের প্রবাসী সরকারে উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন।  

   
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের সদস্যদের মধ্যে এখন একমাত্র জীবিত আছেন ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। তার বয়স এখন ৯০। এতোদিন পর এসে গত স্বাধীনতা দিবসে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে স্বাধীনতা পদক প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু তিনি সে পদক গ্রহণ করেননি। আওয়ামী লীগ এর আগে দুবার ক্ষমতায় ছিল। তখন কী তিনি স্বাধীনতা পদক পেতে পারতেন না? নিজের বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে পদক প্রদানের ঘোষণা ‘গাছ কেটে পানি ঢালা’র সামিল বৈকি।

 আমরা যারা এই বাহিনীর হয়ে ভারতের আসামের তেজপুরে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলাম তাদের প্রত্যেকের ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আছে। ইচ্ছে করলেই সরকার সেই তালিকা সংগ্রহ করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংকালে আমাদের ব্যাচের ৩শ জনের কমান্ডার ছিলেন মঞ্জুরুল আহসান খান। যে কথাটি বলে আজ শেষ করতে চাই তা হলো, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একক কোনো দলের ছিল না। এখানে বিভেদের কোনো সুযোগ নেই। সেটা হলে, তা হবে খন্ডিত ইতিহাস। তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। চলতি জানুয়ারি থেকে বাদপড়া মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে। আশা করবো- এতে করে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ তালিকা করতে সরকার সচেষ্ট হবে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তির আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা  দেখতে চাই।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]পড়স
০১৫৫২-৩২২৯৪২



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top