রাত ১২:৪০, রবিবার, ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / মা’র তুলনা মা নিজেই
মা’র তুলনা মা নিজেই
মে ১৩, ২০১৭

তাহমিনা আকতার পাতা :“মা কথাটি ছোট অতি
কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে
নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই।”
[কাজী কাদের নেওয়াজ]
সত্যিই তাই। মা শব্দ বা কথাটি ছোট হলেও এর অর্থ অনেক তাৎপর্য ও মহিমান্বিত। এক অক্ষরের শব্দটির সাথে মিশে আছে, স্নেহ-মায়ার নিবিড় বন্ধন। মায়ের মতো আপনজন এ ভূবনে কেউ নেই। মা আমাদের সবচেয়ে প্রিয়জন। মা নারীর জাত। মায়ের তুলনা মা নিজেই। আর কারো সাথেই মায়ের কোন তুলনা হয় না। তিনি অতুলনীয়, অপরিসীম ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধন। দেশ, কাল, জাতি, বর্ণ-গোষ্ঠী ভেদে মায়ের বিকল্প কিছু নেই।

 জগতের মূল্যায়নে মায়ের তুলনা কারো সাথে হয় না। মাতৃকোষে ক্রোমোজম পদ্ধতি ও জীনের সমন্বয়ে প্রতিটি মানব শিশু গর্ভাবস্থায় মায়ের পেটে ভ্রুণ অবস্থা থেকে শুরু করে পৃথিবীর আলোতে জন্ম হবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পরম শান্তি ও নিরাপদে মায়ের নাড়ীর বন্ধনে সম্পৃক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। মা একজন নারী এবং যথার্থই একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। সন্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে মা-ই বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন। গর্ভধারণ, দুধপান, রাত জেগে সন্তানের তত্ত্বাবধান সহ নানাবিধ কষ্ট একমাত্র মা-ই সহ্য করেন। তাছাড়া সন্তানের প্রতি মা সবচেয়ে বেশি যতœবান এবং বেশি আদর সোহাগ করে থাকেন।
ইসলাম ধর্মে হাদিসে আছে “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত।


সংস্কৃতিতে আছে, ‘জননী ও জন্মভূমি স্বর্গ থেকেও শ্রেষ্ঠ’। সুতরাং মা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ, মা একজন পরিপূর্ণ নারী। মা এবং নারী একই সূত্রে গাঁথা মানুষ। অতএব, নারীর প্রতি আমাদের সম্মান ও দায়িত্ব, কর্তব্যের কোনো শেষ নেই। মা স্নেহময়ী, মা ত্যাগী ও ধৈর্য্যর বীর প্রতীক। মায়ের স্নেহ ছাড়া কোনো শিশু পৃথিবীতে যথার্থ বেড়ে উঠতে পারে না। সন্তানের কল্যাণের জন্য মা হাসিমুখে সব কষ্ট সহ্য করতে পারেন।

 

মায়ের প্রতিও সন্তানের কর্তব্য তাই অনস্বীকার্য। সবাই মিলে এক সঙ্গে পারিবারিকভাবে ভালো থাকা, একটি সুখি পরিবার মায়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে। সেখানে ভালোবাসার মানুষগুলোও মায়ের সাথে অন্যান্য সদস্যসহ সহাবস্থান নিয়ে আসে জীবনে পরিতৃপ্তি।


 এই সুখ, আনন্দের পিছনে মায়ের ত্যাগ, শ্রম, ভালোবাসা চাবিকাঠি হয়ে কাজ করে। জগতে মা’ই পারেন একটি সুখি পারফেক্ট ফ্যামিলি গড়ে তুলতে। তবে বাবার অবদানও অস্বীকার করার কিছু নেই। পরিবারের সদস্যদের সুখী ও শান্তিতে রাখার জন্য বাবা সারাদিন পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনেন।

 

অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা দু’জনেরই সুন্দর পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক আয় রোজগারের স্বাবলম্বিতার জন্য পরিবার সুখী ও সমৃদ্ধিশালী হয়ে ওঠে। সুতরাং পরিবারে বাবার সাথে সাথে মায়ের অবস্থানের গুরুত্বও কোন অংশে কম নয় এবং এ ব্যাপারটা ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই। বাবার তুলনা যেমন বাবা। বাবার স্নেহ, স্বপ্ন, সৎ ইচ্ছা সন্তানের জন্য আশির্বাদ বয়ে আনে। তেমনি মা, মা-ই, তার অন্য কোন রূপ নেই।


পারিবারিক কোলাজে প্রতিটি সম্পর্কের রং, রূপ যথাযথভাবে মিশে ভালোবাসার বিশেষ ছোঁয়ায় মায়ের নিঃস্বার্থ স্পর্শের পাশাপাশি বাবার সান্নিধ্যও আমাদেরকে করে বিমোহিত। মানুষের জীবনে প্রতিটা মুহূর্ত প্রাণভরে বাঁচা, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বেঁচে থাকার নিয়মানুবর্তিতাগুলো আমরা প্রথম মায়ের কাছ থেকেই বুঝতে শিখি।

যে মা আমাদের জন্মদাত্রী, সেই মায়ের জাত, সমগ্র নারী জাতকে সমগ্র পৃথিবী ও পৃথিবীর যতো সমাজ ও রাষ্ট্র আছে, আছে যতো পুরুষ কিংবা শাসক গোষ্ঠী সবাইকে একবাক্যে “নারীর প্রতি ব্যালেন্সড মাইন্ডসেট” থাকতে হবে চরমভাবে। মায়ের প্রতি সম্পর্কের আন্তরিক সমীকরণই হচ্ছে নারীর প্রতি সম্মানের মূলমন্ত্র। এর কোনো বিকল্প নেই। কোনো জিনিসই একদিনে তৈরি বা সৃষ্টি হয়না।


 সমাজে যুগ যুগ ধরে নারীর প্রতি যে অনুশাসন, অত্যাচার, অবহেলা চলে আসছে এটা পরিবর্তন হতে আরো সময় লাগবে। নারীর সম্মানের অস্তিত্ব’র সীমারেখা নির্ণয় করতে আরো বেশি ধৈর্য্যরে প্রয়োজন আছে বৈকি? বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালন করা হয়। মা দিবসের মূল উদ্দেশ্য, মাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া।

জানা যায়, ১৯১১ সাল থেকে এ দিনটি পালনের রেওয়াজ শুরু হয়ে আসছে। ওই বছর সর্বপ্রথম আমেরিকা জুড়ে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার দিবসটি পালিত হয়। বলা যায়, মা দিবস হলো মায়ের প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশের একটি দিন। অন্যদিকে মা দিবস হচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কার্ড আদান- প্রদানকারী দিবস।


 বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ দিবসে নানা আয়োজন, আলোচনা, সেমিনার ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলোতে মায়েদের জন্য বিশেষ ডিজাইনের শাড়ি ও উপহার সামগ্রী বিক্রি করার প্রচলন কিছু বছর ধরে দেখা যাচ্ছে।

 

কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এ দিবসে রতœগর্ভা মাকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করে থাকে। মাকে সম্মান করে উপরোক্ত কাজগুলো অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের প্রত্যেকেরই মায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো উচিত। তারপরও বলবো মায়ের কোন তুলনা নেই এবং শুধু একটি দিবস নয় প্রতি দিবসেই মায়ের সম্মান সমান থাকা উচিত।


মা ও নারী যেহেতু একই সত্ত্বা। সময় গুণ বিচারে মায়ের তুলনার কোনো পরিমাপ নেই। মা নিজেই তার পরিমাপক। মাকে নির্ণয় করার কোনো নির্দিষ্ট দিবসেরও প্রয়োজন নেই। প্রতিটি দিবসই আমার কাছে “মা দিবস”। সে হিসেবে প্রতিটি দিনই অবিস্মরণীয়।

 

জীবনের শুরুতে মানুষের মধ্যে গুড ভ্যালুজ তৈরি হলে নারীর প্রতি পজিটিভ মানসিকতা গড়ে উঠতে বাধ্য। এর জন্য প্রসেস প্রয়োজন অল টাইম। একজন মা কিভাবে পরিবারের সবার মধ্যে ওয়ার্ক আর হোম ব্যালেন্স করে কিভাবে পরিবেশটা সুন্দর রাখেন, তা থেকেও কি সমাজ এবং আমরা কিছু শিখতে পারি না?


আমাদের চোখ বুজে থাকা এবং অজ্ঞতাই এর জন্য দায়ী। যদি নারী এবং জগৎ সম্পর্কে আমরা স্বচ্ছ দৃষ্টি রাখি কিংবা দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টাতে সক্ষম হই তাহলে মায়ের সম্মান এবং সমগ্র নারী জাতির সুসম্মান সমগ্র পৃথিবীতে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য। মায়ের ছোঁয়া ছাড়া জগৎ সংসার যেন এক ‘অনুভবহীন ছোঁয়া’। মা হচ্ছেন অনুচ্চারিত শব্দকোষের শিশুর মুখের প্রথম বুলির পরম উপলব্ধির একটি নাম।

 

এর সাথে মিশে আছে অনেক গভীরতা, আন্তরিকতা ও বন্ধন। এমন চিত্তাকর্ষক জীবনের ওৎপ্রোতভাবে জড়ানো ব্যাক গ্রাউন্ডগুলো “মা” আর “নারী” এর সাথে জড়িত। সুতরাং মা নারী, নারী মা। এই কোয়ালিটি নারীর প্রতি আমাদের মানতেই হবে। আজকের লাইফ স্টাইলের সাথে সাথে সময়ের ব্যবধানটা এতটাও বদলায়নি যে, আমরা নারীর প্রতি সম্মান জানাতে কুন্ঠা বা লজ্জা বোধ করবো।


 এটা পুরোটাই অসুস্থ মানসিকতার ব্যাপার। নারী ও মানুষ, তারও আছে জীবনের ক্লান্তিভাব, আরো আছে সাধ, স্বপ্ন, ইচ্ছা সুতরাং নারীর প্রতি প্রায়রিটি লিস্টে মর্যাদা দেয়া উচিত। জন্মের পর থেকে কন্যা শিশু পিতার ঘরে বড় হতে হতে প্রাপ্ত বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আসে স্বামীর ঘরে। স্বামী-স্ত্রীর জীবন-সংসারে একজন নারী মাতৃত্বের স্বাদ পায়। জীবনের বাঁকে নানা পরতে পরতে মা অন্দর মহলে নানা ডেসার্ট কিংবা রেসিপিতে সাজিয়ে তোলে  জীবনের বন্ধন কিংবা ঘর সংসার।

তার পরিবেশনে মুগ্ধতা পায় অনেকেই কিন্তু মা বা নারী ভুলে যায় নিজের জীবনের রেসিপি, ভুলে যায় নিজের খেয়াল। সে সদা ব্যস্ত পরোপকারে। ‘মা’ মানেই স্পেশাল এক আদর্শ মেরুকরণ, মা মানেই ‘হোম ড্রিমস’। একজন আদর্শ মা, একজন আদর্শ নারী সুস্থ, সুন্দর সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে এ সত্যতার পজিটিভ আউটলুক সবার মধ্যে থাকতে হবে এবং মেনে নিতে হবে, নিতে বাধ্য। ধর্মে আছে “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত”।


প্রত্যেক মানুষের জন্ম আগে। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আনুষঙ্গিক অন্য সব কিছু পরবর্তীতে জীবনের সাথে যোগ হয়। মানুষের জন্ম যেহেতু ভ্রƒণ অবস্থা থেকে শুরু করে মায়ের গর্ভে। সুতরাং কোনো মানুষ কি বলতে পারবে, মায়ের গর্ভ ছাড়া তার জন্ম সম্ভব হয়েছে? মায়ের নাড়ির সাথে আছে সন্তানের টান ও বন্ধন।

 

এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যমন্ডিত। প্রত্যেক মানুষের উচিত মাকে সম্মান করা এবং জীবনের চলার পথে পরবর্তীতে যে ধাপগুলো আছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সহকারে বিশ্বাস বিবেচনা করে সঠিক জীবন ধারণ করা। কন্যা, জায়া, জননী একই অঙ্গে নারীর জীবনে ভিন্ন ভিন্ন প্যাটার্ন যুগে যুগে, শতাব্দীর পর শতাব্দী নারীকে করেছে অনন্যা, লাস্যময়ী, অসাধারণ।


 নারীর জীবনের এমন কন্ট্রাস্ট রঙের ভূমিকা অন্য কোনো মানুষের মধ্যে আছে কি? একথা এখন নতুন করে ভাবতে হবে জগত সংসারকে। এ চাওয়া এ প্রশ্ন আজ পুরাতন সময় পার করে নতুনভাবে সমাজের কাছে উপস্থাপন করছি। পালা পার্বণের অগ্নিশিখায় ‘মা’ এবং ‘নারী’ কে দেখতে চাই সমাজ-সংসারে নতুন সেলিব্রেটি রূপে।

 

মা একজন চমৎকার আশির্বাদ স্বরূপ নারী হয়ে সামাজিক, পারিবারিক পৃথিবীর মেলবন্ধন হয়ে বেঁচে থাকুক মানুষের জন্মলগ্ন থেকে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া অবধি। মায়ের মধ্যে যে বন্ধনের মায়া মমতার বীজ লুকায়িত আছে সে পজিটিভ সম্ভাবনা কাজে লাগুক পৃথিবীর তরে। এ চাওয়া আজ নতুন করে আমার, আমাদের সবার যুগ যুগান্তরের।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক -আইনজীবী
জজ কোর্ট, ঢাকা।
০১৭১১-৮২৫৫৫৪



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top