রাত ৯:৪০, রবিবার, ২০শে আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / মানবতার মৃত্যু ঘন্টা বাড়ছেই
মানবতার মৃত্যু ঘন্টা বাড়ছেই
মে ১৯, ২০১৭

আব্দুল হাই রঞ্জু : শিশু অপহরণ, অতপর মুক্তিপণ দাবি কিম্বা বিদেশে পাঁচার করার ঘটনা দেশে হরহামেশাই ঘটছে। অনেক সময়ই হতভাগ্য এসব শিশুদের জীবিত উদ্ধার করাও সম্ভব হয় না। কদাচিৎ ভাগ্যগুণে কেউ কেউ জীবিত উদ্ধার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুই যেন হয় তাদের শেষ ঠিকানা। টানা ২৪ দিন অপহৃত  অবস্থায় জীবিত থেকে সুস্থ শরীরে ৫ বছরের সুমাইয়াকে পুলিশ উদ্ধার করে তার বাবা মায়ের কোলে তুলিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করেছে অনন্য এক দৃষ্টান্ত। আমাদের দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে কতই না অভিযোগ!

 

সেই পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ ধরে তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে টানা ২৪ দিন ধরে লুকিয়ে রাখা শিশু সুমাইয়াকে জীবিত উদ্ধার করায় আর একবার প্রমাণিত হল, সত্যিই আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুুলিশ জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু। হয়তো মাঝে মধ্যে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কিম্বা সদস্যের অপকর্মের দায় গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে বিতর্কিত করে তোলে।


দিনটি ছিল ২৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবারের ভরা দুপুর। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। শ্বাস রুদ্ধকর এক আবেগঘন পরিবেশ। পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ ইব্রাহিম অপহৃত ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশু সুমাইয়াকে মায়ের কোলে তুলে দিয়ে অপহরণের বিবরণ সাংবাদিকদের নিকট তুলে ধরেন। মায়ের কোলে উঠে সুমাইয়া বলতে থাকে, মা-আমি তোমাদের জন্য অনেক কেঁদেছি, আমাকে চুমু দাও মা’ বলতে থাকলে সেখানে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার জন্ম হয়। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠেন মা-বাবা।

 

মা-বাবার এই আনন্দ অশ্রু আর আবেগঘন এক পরিবেশে উপস্থিত সকলেই আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠেন। সুমাইয়া ওর বাবাকে লক্ষ্য করে বলতে থাকে, বাবা, তোমরা আমাকে খুঁজোনি? বাকরুদ্ধ বাবার কিইবা জবাব থাকতে পারে? এমন কি কোন সন্তান আছে, যে হারিয়ে গেলে কোন বাবা-মা খোঁজ না করে থাকতে পারে? যে পাষন্ডরা নিষ্পাপ শিশুটিকে অপহরণ করেছিল, ওদের ঘরে কি কোন সন্তান নেই? ওদের সন্তান হাঁরিয়ে গেলে ওরা কি তার খোঁজ করতেন না? সহজ জবাব, সব বাবা-মাই সন্তানের খোঁঁজ নিবে, এটাই স্বাভাবিক।


তাহলে কি করে মানুষ বাবা-মায়ের বুকের ধন সন্তানকে অপহরণ করে? বাস্তবে ভোগবাদি যান্ত্রিক এ সমাজে মানুষ বাবা-মায়ের বুকের ধন সন্তানকে অপহরণ করে অর্থ আদায় করার নির্মম কৌশলকে অবলম্বন করেই অর্থের চাহিদা মেটানোর চেষ্ট করে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। সেই শিশুরা নির্বিঘেœ সমাজে চলাফেরা করতে না পারলে ওরা বেড়ে উঠবে কি করে? অথচ বেড়ে ওঠার সুযোগ ওদের জন্মগত অধিকার। সেই জন্মগত অধিকারটুকু ভোগের সুযোগ আমাদের সমাজে একেবারেই নেই, যা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। আমরাও শিশু হয়ে জন্ম নিয়ে এ দেশেই বেড়ে উঠেছি। আমাদের সময়তো এ ধরনের নিরাপত্তাহীনতা একেবারেই ছিল না। বলতে গেলে আমরা বলগাহীন ঘোড়ার ন্যায় স্বাধীন সত্তা নিয়েই বেড়ে উঠেছি।


 কিন্তু সমাজ দেশ অনেক এগিয়েছে, তবুও আজ শিশুদের নিরাপত্তাটুকু কেন তাদের জীবনে অনিশ্চিত? কেন ঘুম থেকে ওঠে প্রতিটি বাবা-মাকে, বিশেষ করে স্কুলে নেয়া কিম্বা ছুটির পর সন্তানকে বুকে নিয়ে ফিরতে হয় বাড়িতে। এ দৃশ্য এখন মফস্বল শহর থেকে নগর মহানগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপরও মায়ের কোল থেকে শিশুদের অনেক সময়ই কেড়ে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। এ নির্মমতার কি কোন শেষ নেই? এ প্রশ্ন আজ গোটা জাতির। জবাব মেলা খুবই ভার। তবুও শিশুটির নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মায়ের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে অবিরাম। এরপরও শিশু অপহরণ, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যার ঘটনা সমানেই বেড়েই চলছে। অর্থাৎ মানবতার মৃত্যু ঘন্টা কমার বদলে শুধুই বাড়ছে!


আগেই বলেছি, এর মূলেই রয়েছে ভোগবাদি সমাজব্যবস্থার ভোগ বিলাসের অসম প্রতিযোগিতা। যে সমাজব্যবস্থায় দুর্নীতি, লুটপাট, অবৈধ উপার্জন মানুষকে নিষ্ঠুর করে তুলছে। যে সমাজ ব্যবস্থায় মাদকের মত জীবনঘাতি অবৈধ ব্যবসার দাপটে তরুণ ও যুব সমাজ প্রতিনিয়তই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাদক, অশ্লিলতা এখন এতই বেশি বিস্তৃত, যেখানে বাবা-মায়ের পক্ষে আদরের সন্তানটিকে সুস্থ পরিবেশে মানুষ করতে অনেকেই অপারগ হচ্ছেন। কত মায়ের সন্তান মাদকের ছোবলে অনিশ্চিত অন্ধকার জগতে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিচ্ছে।

 

একবার কোন সন্তান বিপজ্জনক এ পথে পা বাড়ালে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা যে কতবড় কঠিন কাজ, যা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতিত অন্য কেউ কল্পনা করতেও পারবেন না। অথচ বাবা-মায়ের বুকের ধন প্রতিটি সন্তানের অনাবিল ভবিষ্যত সুখ সমৃদ্ধির স্বপ্ন নিয়েই বাবা-মায়ের স্বপ্নের শেষ থাকে না। তবুও কতজনই না বিপথগামী হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নকে ধুলিস্যাত করছে। মাদক মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশের পথে বড় অন্তরায়। একজন মাদকাসক্ত সন্তান অনেক সময়ই মাদকের পয়সার জন্য ভাড়াটে খুনি হতে দ্বিধা করে না। ফলে সমাজে খুন খারাপি অপহরণের মতো ঘটনা সমানেই বাড়ছে।


খুব বেশি দিনের ঘটনা নয়। হয়তো মাস খানেকের বেশি হবে। ঢাকার অদূরে গাজীপুর শ্রীপুরের ছিটপাড়া গ্রামের জনৈক প্রভাবশালীর ছেলের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় ৭ বছরের শিশু আয়েশা আক্তার। এ ঘটনার ন্যায় বিচারের জন্য শিশুটির বাবা হযরত আলী ইউপি মেম্বারসহ স্থানীয় সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। শেষ পর্যন্ত শ্রীপুর থানায় অভিযোগ করলে সেখান থেকেও মানসিক ভারসাম্যহীন আখ্যা দিয়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয় পুলিশ।

 

অগত্যা কোথাও মেয়ের ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিচার না পেয়ে গত ২৯ এপ্রিল বুকের ধন শিশু আয়েশাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বাবা-মেয়ে। ঘটনটি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রকৃত ঘটনাটি কেন এবং কি কারণে ঘটেছে, যা খতিয়ে দেখতে পুলিশ প্রশাসনও নড়ে চড়ে বসেছে। শেষ পর্যন্ত অপরাধিদের বিরুদ্ধে কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া নেয়া হবে, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা চাই, এ ধরনের কর্তব্যে অবহেলার দায় কোন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর বর্তালে তার বিরুদ্ধে যেন উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।


 তা না হলে এ দায় পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, যা কারো কাছেই কাম্য নয়। আগেই বলেছি উপযুক্ত বিচারের অভাব এবং মাদকের আগ্রাসনে সমাজের অবক্ষয় চিত্র যেভাবে দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তা সামাল দেয়া কঠিন হবে। অতিসম্প্রতি আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু নাঈম আশরাফ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে জন্ম দিনের পার্টিতে বনানীর রেইনট্রি নামে বিলাসবহুল হোটেলে আমন্ত্রন দিয়ে এনে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয় ধর্ষণের চিত্র ভিডিও করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়। পরে ভুক্তভোগী ছাত্রী দু’জন বনানী থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। যথারীতি থানা মামলাটি গ্রহণ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আপন জুয়েলার্সের বাসায় তল্লাশি করে। ইতিমধ্যেই দু’জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

 

এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে বিচার কার্য্য সম্পন্ন করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেন এ ধরনের অপকর্ম আর ভবিষ্যতে না ঘটে, তানা হলে ধর্ষণের মাত্রা কমার বদলে বাড়তেই থাকবে। শুধু ধর্ষণই নয়, অতি সম্প্রতি নারায়নগঞ্জের আড়াই হাজার উপজেলার হাজিরটেক গ্রামে ধর্ষিত হন ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা। এ ধরনের ঘটনা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তবে, মাদকাসক্তদের দ্বারা এমন কোন হীনকাজ নেই, যা ঘটানো সম্ভব। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকেও সাবধানে পা ফেলতে হবে। তা না হলে অনাকাংঙ্খিত ঘটনা ঘটতেই পারে।


প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ইয়াবা খ্যাত মাদক আটকের ঘটনা ঘটেই চলছে। মাদকের মধ্যে ইয়াবার আগ্রাসনই এখন অনেক বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ হতে দেদার ইয়াবা পাঁচার হয়ে দেশে ঢুকছে। যা দেশের নিভৃত পল্লী পর্যন্ত দিনে দিনে বিস্তৃত হচ্ছে। মাদকের এই আগ্রাসনকে ঠেকানো সম্ভব না হলে দেশের যুব সম্প্রদায়কে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত। সম্ভাবনাময় সকল শিশুর মেধার বিকাশ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে না উঠলে জাতি একদিন মেধাশূন্য হয়ে পড়বে।

অথচ মেধাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর বিকাশ না হলে সুস্থ ও সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণ করা কশ্মিনকালেও সম্ভব হবে না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থা বা বিএমবিএস এর মিডিয়া অবাধ অ্যান্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা ফাতেমা ইয়াসমিন দিনে দিনে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার যে চিত্র তুলে ধরেন, সত্যিই তা গভীর উদ্বেগের। তিনি বলেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৭ নারী ও শিশু। হত্যাকান্ডের শিকার হয় ১০০ শিশু। তাদের মধ্যে ১০ জনকে হত্যা করে বাবা-মা। বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয় ৮১ শিশু। আর ধর্ষিত হয় ৫৮ জন নারী।


 গণধর্ষণের শিকার হয় ২৪ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৪ জন নারীকে। পারিবারিক কলহে আপনজনদের হাতে খুন হন ২৪ নারী। যৌতুকের বলি হন ২৬ জন। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন ১৫ জন। এছাড়া আত্মহত্যা করেন ১০৮ জন নারী। (সূত্র: দৈনিক আমাদের সময় ৯/৫/১৭ ইং)। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬ সালের তুলনায় চলতি বছরে নারী শিশু নির্যাতন, অপহরন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা অনেক বেড়েছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে খোদ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা শারমীন রেনু গত ১৪ মার্চ রাজধানীর ব্রাক সেন্টারে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, আগের চেয়ে নারী নির্যাতনের ধরন যেমন পাল্টেছে, তেমনি সংখ্যাও বেড়েছে।


 সামাজিক এ সমস্যা সমাধানে নারী-পুরুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে, তা না হলে এ সমস্যা রোধ করা কঠিন হবে। এ প্রসঙ্গে উইমেন সার্পোট অ্যান্ড ইনভেষ্টিগেশন ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের প্রধান ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, এখনও আমাদের সমাজে প্রতিদিন নারীরা নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। আর আইনের ফাঁক ফোঁকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে অপরাধিরা। আমরাও মনে করি, শুধু আইন দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের আইন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তানা হলে সোমাইয়াদের মতো নিষ্পাপ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড়ই কঠিন হবে।  
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top