সকাল ৮:১৮, মঙ্গলবার, ২৮শে মার্চ, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন তরুণ
মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন তরুণ
মার্চ ১৫, ২০১৭

মোহাম্মদ নজাবত আলী: কবি সুকান্তের ভাষায়, এ বয়স যেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়/পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়…/এদেশের বুকে আঠার আসুক নেমে। মূলত দেশের তরুণ সমাজকে নিয়ে অনেক বিপ্লবী কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে তারুণ্যের জয়গান। তারুণ্যশক্তির ধ্বংস নেই, বিনাশ নেই। তাদের চোখে থাকে শুধু নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন কখনো থেমে থাকে না, যে স্বপ্ন কখনো নতুন সমাজ দেশ গড়ার স্বপ্ন।

 কিন্তু বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের উদ্দীপনাময় শক্তি স্বপ্ন আজ থেমে গেছে মাদকের ভয়াল গ্রাসে। তাই দেখা যায় বিগত বছরগুলোতে মাদক বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ নেশায় পরিণত হয়েছে। মাদক বর্তমান যুবসমাজকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে এর পরিণতি কি এবং এ সর্বনাশা নেশা থেকে বেরিয়ে আসা অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ জাতি ও সমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র আজকের যুব বা তরুণ সমাজ।

কিন্তু তারা যেভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে এ নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বিগ্ন শংকা। এ কুপ্রভাবে যেভাবে আমাদের তারুণ্য শক্তি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনিত তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত হতাশাগ্রস্ত এক শ্রেণির বেকার তরুণরা এই সর্বনাশা পথে পা বাড়িয়েছে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি সমাজের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানরাও মাদকে আসক্ত। একবার ভাবুন না ঐশির কথা। তার পিতা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।

২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগে নিজ বাসায় খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। কিন্তু খুনী ! খুনী আর কেউই নয় তাদের একমাত্র মেয়ে ঐশি রহমান। ঐশি একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তে কতগুলো বখাটে সঙ্গ পেয়েছিল তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে সে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ঐশির আচার আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তার বাবা মা বিষয়টি জানতে পেরে কড়া শাসনে তাকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করলে ঐশি আরও ক্ষিপ্ত হয় এবং এক পর্যায়ে সে নিজ হাতে খুন করে আপন পিতা মাতাকে। কোনো পরিবারে মাদকাসক্ত সন্তানাদি থাকলে পরিবারে যেমন অশান্তি নেমে আসে তেমনি ভয়ভীতিও থাকে। ঐশির মতো মাদকাসক্ত সন্তান খুন করছে বাবা-মাকে। মাদকাসক্ত স্বামীর হাতে স্ত্রী, ভাইয়ের হাতে ভাই, এমনকি ছাত্রের হাতে শিক্ষকও খুন হচ্ছে।

মাদকের কারণে ভেঙ্গে যাচ্ছে স্বামী স্ত্রীর সুখের বন্ধন। তথ্য মতে গত ৫বছরে নেশায় সন্তানদের হাতে কমপক্ষে ৩’শ ৮৭ জন বাবা-মা নৃশংস খুনের শিকার হয়েছে। মাদকসেবী স্বামীর হাতে প্রাণ গেছে ২’শ ৫৬ জন নারীর। মাদকাসক্ত প্রেমিক প্রেমিকার হাতে খুন হয়েছে ৬’শ ৭০জন তরুণ-তরুণী। (মাদক ও নেশা নিরোধ সংস্থা-মানস, ১৮ জানুয়ারি যুগান্তর-২০১৭)।


যাদের হাত দিয়ে আগামী দিনে দেশ ও সমাজের অগ্রগতির ধারা ধাবিত হওয়ার কথা তাদের একটি অংশ মাদকাসক্ত হয় তাহলে বিষয়টি অবশ্যই আমাদের উদ্বিগ্ন করে। ১৬ কোটি মানুষের এদেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ মাদকাসক্তে আসক্ত। নেশার ছোবলে পড়ে এদেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ মাদকের পেছনে ছুটছে। আমাদের দারুণভাবে শংকিত এবং উদ্বিগ্ন করে যে, এক শ্রেণির কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও মাদকে আসক্ত হয়েছে। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এ সমস্ত শিক্ষার্থী কখন যে আমাদের মনের আড়ালে, চোখের আড়ালে, মনের অজান্তে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে তা আমরা জানি না।

 বাংলাদেশে ইয়াবা মদ, গাঁজা চরস, আফিম, ঘুমের ওষুধ, হেরোইন, ফেনসিডিল প্রভূতি মাদকদ্রব্য হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এ সমস্ত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলে আসক্ত হচ্ছে বেশি। অথচ এগুলো নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি স্বাভাবিকভাবে মানুষের আগ্রহ একটু বেশি এবং একই সাথে কৌতুহলের জন্ম নেয়। তাই কৌতুহল বশতঃ এগুলোর প্রতি তরুণদের আসক্তি সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে তারা এর সংস্পর্শে আসে। তারপর তাদের মধ্যে এক ধরনের নতুন ও রঙিন অনুভূতি কাজ করে।

 এভাবে তারা নেশার জগতে পা বাড়ায় এবং মাদক তাদের এমনভাবে গ্রাস করে যে, সেখান থেকে ফিরে আসা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। মাদকের ভয়াল থাবায় আজ বিপন্ন তরুণ। স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় সহ সর্বত্র আজ মাদকের ছড়াছড়ি। পারিবারিক সম্পর্ক শিথিল হওয়া তিক্ততা, বেকারত্ব, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে দিন দিন মাদক আসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। মাদক যেহেতু বিনামূল্যে পাওয়া যায় তাই উঠতি বয়সের ছেলেরা পিতার পকেট চুরি এমনকি ছিনতাই করেও অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক সেবনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় ১৫ থেকে ৩০ বছরের বয়সীদের মধ্যে। মাদকসেবীর মধ্যে ৮০শতাংশই তরুণ। তাদের ৪০শতাংশ আবার বেকার। এদের ৫০শতাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

 মাদক এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। তরুণদের পাশাপাশি তরুণীরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের নীল ছোবলে কোমল হাত পরিণত হচ্ছে ভয়ঙ্কর খুনীর হাতে। ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ মাদক ব্যবসায় একটি সুবিধাজনক অবস্থার একটি দেশ। একদিকে সীমান্তবর্তী দেশ অন্যদিকে বাংলাদেশ ‘গোল্ডেন ট্রাইঙ্গেল’ এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এ দু’টি বিশেষণ হচ্ছে মাদক উৎপাদন হিসাবে সবচেয়ে বিখ্যাত অঞ্চল। পাঠকের সুবিধার্থে বলতে গেলে গোল্ডেন ট্রাইঙ্গেল হচ্ছে মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং লাইওসের মধ্যে অবস্থিত যা মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত। অন্যদিকে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলো হচ্ছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরান এর সীমান্ত অঞ্চল যা মাদক উৎপাদন হিসাবে বিখ্যাত।

আর এ অঞ্চল হতে অবৈধপথে মাদকদ্রব্যগুলো ভারতীয় সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মাদক চোরাকারবারী বা সরবরাহকারীর রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক। এ সমস্ত চোরাকারবারীর সাথে জড়িত বাংলাদেশের এক বিশেষ শ্রেণি। তাদের যোগাযোগ রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তারা অত্যন্ত সংগোপনে মাদক তুলে দিচ্ছে তাদের সহযোগিদের। তারা এসব সহযোগির হাত থেকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল প্রভূতি মাদকদ্রব্য চলে যাচ্ছে তাদের খদ্দেরের হাতে। চলে যাচ্ছে তরুণ যুবসমাজের হাতে। তাই মাদকদ্রব্য উৎপাদন থেকে সাধারণ খদ্দেরের কাছে পৌঁছিতে বেশ কয়েকবার হাত বদল হয়।

ভৌগলিক দিক থেকে বাংলাদেশ মাদক অতি সহজে পাওয়া যায়। তাই আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মাদকের মরণ নেশা থেকে তরুণদের বাঁচানো। সীমান্ত রক্ষীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক বাংলাদেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে যার প্রভাবে তরুণ সমাজের একাংশ বিপথগামী মাদকের ভয়াল থাবায়। মাদকের হিংস্র ভয়াবহ ছোবলে আমাদের সন্তানরা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মাদক যে শুধু মাত্র ঢাকা বা বড় বড় শহরে এর ব্যপ্তি তা নয় মাদকের যত্র তত্র ব্যবহার হচ্ছে গ্রাম-গঞ্জে এমনকি পাড়া মহল্লায়।

 তবে মাদকদ্রব্যের প্রতি বেশি আসক্ত হচ্ছে বেকার, ভবঘুরে হতাশাগ্রস্ত তরুণরা। এ মরণ নেশার ছোবলে একদিকে যেমন সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। অন্যদিকে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ছে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে মাদক এখন তরুণ, তরুণীদের মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

এর ভয়াল থাবা প্রতিহত করতে আমাদের যেমন সচেতন হতে হবে তেমনি সরকারি উদ্যোগেরও প্রয়োজন রয়েছে। গণমাধ্যম থেকে আমরা জানতে পারি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে সতর্ক এবং মাদক সহ অনেককে আটকের খবরও আমরা পাই। দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরও রয়েছে। তবুও এ মাদকের ব্যবহার ঠেকানো যাচ্ছে না। যা আমাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হিসাবে দেখা দিয়েছে।


বাংলাদেশে মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে ৬৮লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে ৮৪ভাগ পুরুষ এবং ১৬ভাগ নারীও রয়েছে। দেশ জুড়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪৭ লাখ। যার মধ্যে ৯০ শতাংশই কিশোর, তরুণ হিসাবে পরিচিত।

মদ, গাঁজা, হেরোইন, এসব মাদক মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান, বিবেক, অনুভূতিকে হ্রাস করে। নেশায় আসক্ত হয়ে তারা ক্রমাগতভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠে। তারা এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠে যে, হিতাহিত জ্ঞান না থাকায় তারা অতি আপনজন কেউ খুন করে। সম্প্রতিককালে ঐশি রহমানই তার প্রমাণ। ঐশি ছাড়াও এর অনেক প্রমাণ রয়েছে।


মাদককে না বলুন, মাদকমুক্ত সমাজকে হ্যাঁ বলুন, তাই মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করতে হলে আমাদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে। আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে তাদের সন্তানদের খোঁজ খবর নেয়া উচিত। সন্তানদের সাথে বন্ধু সুলভ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে তাদের ভালোমন্দের শেয়ার করা উচিত।

আসলে আমাদের ছেলে মেয়েদের কোনো খোঁজ খবর আমরা অনেকে রাখি না। অধিকাংশ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের ব্যাপারে উদাসীন। এমনকি তার স্কুল বা কলেজ পড়–য়া সন্তান নিজ শয়নকক্ষে কি করছে সে খবরও অনেক অভিভাবক রাখেন না।

 তাদের সহপাঠী বা বন্ধু বান্ধব কেমন প্রকৃতির কাদের সাথে মিশে এ সম্পর্কে অভিভাবকদের খোঁজ নেয়া দরকার। সন্তানদের প্রতি উদাসীন পিতা মাতার রুক্ষ ব্যবহার, বেকারত্ব, হতাশা. পারিবারিক বন্ধন হালকা, খারাপ বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ইত্যাদি কারণে আমাদের সন্তানরা বিগড়ে যায় এবং মাদকে আসক্ত হয়। মাদকসেবীর অধিকাংশই কিশোর কিশোরী, তরুণ তরুণী, যাদের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।

অথচ তারা আজ বিপথগামী, ধ্বংসের মুখে, মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন। যাদের ওপর দেশের অগ্রগতি, উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের একাংশ যদি পথভ্রষ্ট হয়, ইয়াবা, ফেনসিডিল মাদকের আসক্ত হয় তাই তাদের সঠিক পথে ফিরে আনা অত্যন্ত জরুরি। মাদকের মরণ নেশা থেকে মুক্তির জন্য শুধু আইনের প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হয়ে যার যা অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।


সর্বোপরি পরিবারই হচ্ছে শ্বাশত বিদ্যালয়। পারিবারিক শিক্ষার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো বড় হতে পারে না। তাই পরিবারেই একটি শিশুকে ছোট কাল থেকে ধর্মীয় সামাজিক মূল্যেবোধ, নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে মাদক চোরাকারবারিকে আইনের হাতে সোপর্দ করে ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এ ভয়াল থাবা থেকে তরুণ সমাজকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।
লেখক ঃ শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top