দুপুর ১:২৮, বৃহস্পতিবার, ২৯শে জুন, ২০১৭ ইং
/ সম্পাদকীয় / বড়দিন ও যীশু খ্রীষ্টের জন্মের তাৎপর্য
বড়দিন ও যীশু খ্রীষ্টের জন্মের তাৎপর্য
ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬

পাস্টার গিলবার্ট মৃধা  মানুষ ও অন্য সমস্ত সৃষ্টি একই ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট হলেও মানুষ অন্যান্য সৃষ্টি থেকে ভিন্নতর। কারণ ঈশ্বর তার আপন প্রতিমূর্তিতে মানব সত্ত্বাকে সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট এর অর্থ মানুষ শ্রষ্টার সাদৃশ্য বহন করে অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের নিকট দায়বদ্ধ। এতে বোঝায় যে, মানুষ তার নিজের ইচ্ছামত জীবন যাপন করার মত স্বাধীন নয়। ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হিসাবে মানুষের বিবেককে নির্দেশ করা হয়েছে। আর তাই বিবেক হচ্ছে আমাদের অন্তরে ঈশ্বরের বাণী। এই বাণী আমাদের দান করে ভাল-মন্দ বিচারের সরাসরি ও স্বতঃস্ফুর্ত সচেতনতা। এই বিবেক জ্ঞান হচ্ছে ভাল-মন্দ বিচারের অন্তরস্থ বিচারক। আর তাই  আমাদের প্রাত্যহিক জীবন চরণের বাস্তবতায় যখন আমরা ঈশ্বরীয় স্বভাব, গুণ, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের আন্তরিক প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হই, কেবলমাত্র তখনই আমরা ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠি। এটাই হচ্ছে সৃষ্টির নমুনা। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে মানব জীবনের বাস্তবতায় তা ঘটেনি।


ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রথম মানব-মানবী আদম ও হবা এদন-বাগানে ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করে সদাসদ জ্ঞান-দায়ক বৃক্ষের ফল খেয়ে পাপে পতিত হয়ে বাগানের বৃক্ষ সমূহের মধ্যে লুকালেন। তখন ঈশ্বর তাদের এদন বাগান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। আর এখানেই মানুষের আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে গেল। ফলে মানুষ পাপময় জীবনে প্রবেশ করল। আর তাই মানুষের জীবনে নেমে আসল- দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, হতাশা ও নৈরাশ্য। কালক্রমে মানুষ পাপের অতল গহ্বরে ডুবে গেল। পৃথিবী ঈশ্বরের সাক্ষাতে ভ্রুষ্ট ও দৌরাত্মে পরিপূর্ণ হল। এই কারণে ঈশ্বর পৃথিবীতে চল্লিশ দিবা-রাত্র মহাবৃষ্টি ও জলপ্লাবন দ্বারা তাহার নির্ম্মিত যাবতীয় প্রাণীকে ভূ-মন্ডল হতে উচ্ছিন্ন করলেন। তৎকালীন লোকদের মধ্যে নোহ ঈশ্বরের দৃষ্টিতে ধার্মিক ও সিদ্ধা হওয়ায় ঈশ্বর নোহ ও তার পরিবারকে এই মহা জল প্লাবন হতে রক্ষা করলেন। নোহ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে পৃথিবীতে জনসংখ্যার আধিক্য হওয়ায় তখনও মানুষ পাপের স্বভাব পরিত্যাগ করতে পারল না।


মানুষকে পাপের এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে ঈশ্বর তার মনোনীত ভাববাদীদের তাদের কাছে প্রেরণ করলেন। ধর্মনিষ্ঠ ও নৈতিক জীবন যাপনের জন্য ঈশ্বর তাদেরকে বিভিন্ন বিধি-ব্যবস্থা, নিয়ম-কানুন পালন করতে এবং পাপমুক্ত হয়ে সতর্ক জীবন যাপনের জন্য নির্দেশ দিলেন। এতকিছুর পরেও মানুষ পাপ স্বভাব পরিত্যাগ করতে ব্যর্থ হল বরং পাপকে ভালবেসে আলিঙ্গন করল। ফলে মানুষের জীবনে নেমে এলো চরম দুঃখ, দুর্দষা, হতাশা ও বিপর্যয়। মানুষের জীবন ভারাক্রান্ত আর দুশ্চিন্তায় পূর্ণ হয়ে উঠল।

 

সেই সময় বাহ্যিক আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতা আর বিলাসিতার আড়ালে দারিদ্র আর অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছিল। অতিরিক্ত কর ভার, জনসংখ্যার আধিক্য ইত্যাদি নানা কারণে দারিদ্রতা বেড়ে গিয়েছিল। জগত তাদের কাছে অত্যন্ত তিক্ত বলে মনে হত। সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মমসেন বলেছেন যে, পৃথিবীর যেন বার্ধক্য এসে গিয়েছিল। বাস্তবিক পৃথিবীর যৌবনকাল পাপে অতিবাহিত হওযার দরুণ তার সমস্ত সৌন্দর্য্যই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মহাত্মারা সবাই বুঝে ছিলেন যে, পৃথিবী ঘোর অন্ধকার ও পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাপপূর্ণ হলেই সত্য যুগের আবির্ভাব হয়। আর তাই ঈশ্বর থেকে কিছু একটা ঘটার সম্ভাবনা মানুষ অনুভব করল। আর তাই ঈশ্বরীয় পরিকল্পনায় স্বর্গের পরিষদে খ্রীষ্টের আগমন কাল নিরূপিত হয়েছিল।


কালের মহা ঘড়িটা যখন সেই কালের পূর্ণতার ইঙ্গিত প্রদান করছিলো, তখন গালীলের বৈৎলেহমের দায়ুদ নগরে যীশুর জন্ম হয়েছিল। গালাতীয় ৪ ঃ ৪ পদে কাল সম্পূর্ণ হলে ঈশ্বর আপনার নিকট হতে যীশুকে প্রেরণ করলেন । ‘কাল পূর্ণ হলে’ কথাটির অর্থ এই যে, পৃথিবীর অবস্থা যখন সম্পূর্ণভাবে খ্রীষ্টের আগমনের পক্ষে প্রস্তুত হল তখন ঈশ্বর পরিপূর্ণভাবে মানুষের কাছে আত্ম প্রকাশ করলেন।

 

সমস্ত দিক থেকে অর্থাৎ সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক এবং ধর্মগত অবস্থা অনুকূল না হলে কালের পূর্ণতা আসতে পারে না। আর তাই সমস্ত অবস্থা অনুকূলে হলে পরে যীশুখ্রীষ্ট পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেন। জগত এবং মানুষের মন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হলে তিনি এলেন। এক মুহুর্ত আগে নয়, এক মুহুর্ত পরেও নয়। ঈশ্বরের বাক্য মাংসে রূপ ধারণ করলেন, সেটি ঈশ্বরের দ্বারা নির্দিষ্ট কাল। যোহন/ইউহোন্না ১ ঃ ১ ও ১৪ পদ আদিতে বাক্য ছিলেন এবং বাক্য ঈশ্বরের সাথে ছিলেন এবং বাক্য ঈশ্বর ছিলেন।

১৪ পদে আর সেই বাক্য মাংসে মূর্তিমান হইলেন এবং আমাদের মধ্যে প্রবাশ করিলেন, আর আমরা তার মহিমা দেখলাম, যেমন পিতা হতে আগত এক জাতের মহিমা, তিনি অনুগ্রহে ও সত্যে পূর্ণ। এই জগত, জগতের সমস্ত কিছু এবং সকল মানুষ ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট। ধবংস করার জন্য তিনি এসকল সৃষ্টি করেননি। কিন্তু তার সৃষ্ট মানব জাতি যখন নিজেরাই নিজেদের ধবংস ডেকে আনল, তখনও তিনি মানবজাতির প্রতি তার অপূর্ব প্রেম প্রকাশ করলেন। যোহন/ইউহোন্না ৩ঃ১৬পদ “কারণ ঈশ্বর জগতকে এমন প্রেম করলেন যে, আপনার একজাত প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে দান করলেন, যেন যে কেউ তাতে বিশ্বাস করে সে বিনষ্ট না হয়, কিন্তু অনন্ত জীবন পায়।”


ঈশ্বর জগতকে এমন প্রেম করলেন- এর অর্থ সুষ্পষ্ট ভাবে এই কথা প্রকাশ করে  জগতের সমস্ত মানুষের জন্য ঈশ্বরের প্রকাশিত প্রেম। এই জন্য প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে কোন আলাদা জাতি, ধর্ম, দল,মত, গোত্র বা সম্প্রদায় হিসাবে পৃথক করার কোন সুযোগ নেই। যীশু খ্রীষ্টকে যদি আলাদা কোনো ধর্ম, হিসাবে আখ্যায়িত করতেই হয়, তবে সেটি হবে মানব মুক্তির ধর্ম। কারণ সৃষ্টির প্রথম মানব মানবী আদম হবা পাপের ফলে এদোন বাগানে যা হারিয়েছিল, যীশু খ্রীষ্টের  দ্বারা মানুষ তা ফিরে পেয়েছে-তাই মানুষের কাছে যীশুর জন্মের দিনটিকে বড়দিন বলা হয়। লুক ২ঃ১০ পদে এই কথা লেখা আছে- কেননা দেখ, আমি তোমাদিগকে মহানন্দের সুসমাচার জানাইতেছি; সেই আনন্দ সমুদয় লোকেরই হইবে। তাই বড়দিন হচ্ছে সকলের জন্য আনন্দের দিন।


এইদিনে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের অভিনব জন্ম আমাদের কাছে মিলনের কথা বলে, ক্ষমার কথা বলে, প্রেম-প্রীতি, শান্তিও ভালবাসার কথা বলে। যীশু খ্রীষ্টের জন্মের এই বড়দিনে আমরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ সকল বৈষম্যের উর্দ্ধে এসে সাম্য ও সমপ্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হই। আমরা এক নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি। যেখানে থাকবে না কোনো দলাদলি, থাকবে না কোনো ধর্মের লড়াই, থাকবে না কোন হিংসা-বিদ্বেষ, থাকবে না কোনো স্বার্থপরতা, অবিচার ও অনাচার। তাই আসুন প্রভু যীশুর জন্মদিনে এই শুভক্ষণে এক নতুন প্রত্যয় নিয়ে পথ চলতে শুরু করি এবং এই প্রার্থনা করি, “হে ঈশ্বর, আমায় তোমার শান্তি দূত কর! হে ঈশ্বর, আমার হৃদয় প্রেম দিয়ে তুমি গড়। যেখানে আছে হিংসা-বিদ্বেষ, যেখানে আছে শোধ-পরিশোধ, সেখানে আমি যেন দেখাতে পারি, তোমার প্রেম, ক্ষমা, শান্তিও মিলনের আনন্দ।” তাহলেই স্বার্থক হবে বড়দিনের এ আনন্দ আয়োজন।
লেখক ঃ পালক
বগুড়া খ্রীষ্টীয় মন্ডলী



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top