রাত ২:৫৮, রবিবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ শিক্ষা / বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০ শিক্ষকের তালিকায় স্থান পাওয়া শাহনাজ প্রতিবন্ধী ও পথশিশুদের শিক্ষার আলোকঘর
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০ শিক্ষকের তালিকায় স্থান পাওয়া শাহনাজ প্রতিবন্ধী ও পথশিশুদের শিক্ষার আলোকঘর
December 22nd, 2016

নিমাই ঘোষ ঃ প্রতিদিন দুই মেয়েকে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে আসতাম। এসময় শ্রমজীবী শিশুরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। এদের মধ্যে দু’জন আমার নজর কাঁড়ে সেলুন শ্রমিক সাদমান ও লেদ শ্রমিক শামীম। বয়সে দুইজনই শিশু। অভাব তাদের এই পেশায় নামতে বাধ্য করে। পড়াশোনা করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তবে ইচ্ছে শক্তির কোন কমতি ছিল না। তাই একদিন তাদের সঙ্গে কথা বলতেই লেখাপড়া শেখার আগ্রহ প্রকাশ করলো। এরপর থেকে তাদের পড়াশোনা শেখানোর দায়িত্ব নিলাম। এভাবেই বলছিলেন বিশ্বসেরা ৫০ শিক্ষকের একজন বগুড়ার শাহনাজ পারভীন।

সেই ২০১৩সালের কথা। এই দুই শিশুকে বাড়িতে ডেকে এনে তিনি পড়াশোনা শেখাতে শুরু করেন। নতুন জীবনের শুরুটা তখন থেকেই। আস্তে আস্তে তারা ওপর ক্লাসে ওঠতে থাকে। দেখাদেখি অনেক কর্মজীবী শিশু শিক্ষকের কাছে ছুটে যায়। বাড়তে থাকে কর্মজীবী শিশু শিক্ষার্থীর সংখ্যা। চিন্তায় পড়ে যান এই শিক্ষক। তবে পথশিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এক পর্যায়ে হয়ে উঠেন জ্ঞানের বাতিঘর। সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ানোর পাশাপাশি সুবিধা বঞ্চিত পথশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য গড়ে তুলেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নাম দিয়েছেন ‘শেরপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমানে এই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০জন। সবাই সমাজের অসহায় ঝরে পড়া অভাবী পরিবারের কর্মজীবী পথশিশু।

বগুড়ার শেরপুর পৌরশহরের শান্তিনগরস্থ নিজ বাসভবনে কথা হয় শিক্ষক শাহনাজ পারভীনের সঙ্গে। জানা যায় নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তার একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে ওঠার কথা। এমনকি তাঁর যেসব কর্মকাে র কারণে আজ সারাবিশ্বে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। পাশাপাশি তার নাম উঠেছে বিশ্বসেরা শিক্ষক-২০১৭ (গোবাল টিচার প্রাইজ) এর তালিকায়। লন্ডনভিত্তিক ভারকি ফাউন্ডেশন বিশ্বের ১৭৯টি  দেশ থেকে প্রাপ্ত বিশ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে ৫০জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেন। এই তালিকায় গোবাল টিচার’র পুরস্কারের জন্য প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে স্থান পেয়েছেন শিক্ষক শাহনাজ পারভীন। তাঁর সঙ্গে এই তালিকায় ভারত, পাকিস্তানসহ ৩৭টি  দেশের একজন করে শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। সমাজের সুবিধা বঞ্চিত পথশিশুদের শিক্ষাদানে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি দিতেই সংস্থারটি পক্ষ থেকে তৃতীয়বারের মত এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামি বছরের ১৯মার্চ দুবাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি বিজয়ীদের ১০লাখ মার্কিন ডলার অর্থ পুরস্কার দেয়া হবে।

শাহনাজ পারভীন জানান, স্কুলে যাতায়াতের পথে প্রায়ই ইভটিজিংয়ের শিকার হতেন। ফলে দফায় দফায় স্কুলে যাওয়া তার বন্ধ হয়। এমনকি বখাটেদের ভয়ে মাত্র ১৪বছর বয়সে বাবা-মা তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন। তবে এরপরও হাল ছাড়েননি তিনি। উচ্চ শিক্ষার জন দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তাই বিয়ের পর আবারও পড়াশোনা শুরু করেন।
জন্ম ও শিক্ষা: শাহনাজ পারভীন ১৯৭৬ সালে বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার দাঁড়িগাছা গ্রামে শিক্ষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মানিক উল্লাহ ও মা মিসেস নুরজাহান বেগম দু’জনই পেশায় ছিলেন শিক্ষক।

 মায়ের কর্মস্থল শেরপুর পৌরশহরের উলিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন। ধর্মীয় রক্ষণশীল বাবা-মা শাহনাজ পারভীনকে ভর্তি করে দেন শেরপুর শহীদিয়া আলীয়া কামিল মাদ্রাসায়। সেখান থেকে ১৯৯০সালে বৃত্তিসহ  প্রথম বিভাগে এসএসসি (দাখিল) পাস করেন। এরপর ১৯৯১সালে তাঁর বিয়ে হয় শেরপুর উপজেলার সাধুবাড়ি গ্রামের আজাহার আলী মাষ্টারের ছেলে শিক্ষক মোহাম্মাদ আলীর সঙ্গে। কিন্তু  বিয়ের পর অদম্য শাহানাজের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের দৃঢ় মনোবলকে দুর্বল করতে পারেনি। ১৯৯২ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে কৃতিত্বের সাথে আলিম পাশ করেন। পরে কৃষিতে উচ্চ শিক্ষার জন্য ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পারিবারিক কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি হাল ছাড়েননি। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পিতা-মাতা ও স্বামী শিক্ষক হওয়ার কারণে শিক্ষকতা পেশা  বেছে নেন।

কর্মজীবন: ২০০৩ সালে শাহানাজ পারভীন শেরপুর উপজেলা সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকে শিক্ষক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছেন। এছাড়া অবসর সময়টুকু প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করে চলেছেন। সরকারি ভাবে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হওয়ার দুই বছর পূর্বেই কর্র্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তিনি তার স্কুলে প্রাক প্রাথমিক ক্লাস চালু করেন। এছাড়া বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ দৃষ্টি দেন। একইসঙ্গে নিজের পেশায় অনবদ্য ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সমাজের সুবিধা বঞ্চিত পথশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা অর্জনে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন। সুবিধা বঞ্চিত পথশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শেরপুর শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সপ্তাহের ৬দিন বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে  এই স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম। এদের পরিধেয় পোষাক, বইপুস্তক, খাতা-কলমসহ লেখাপড়ার যাবতীয় যোগান দেন তিনি। পাঠদান কার্যক্রমের সুবিধার্থে দু’জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। তাদের বেতনভাতার ব্যয়ও বহন করেন তিনি। এতো কিছু শুধুই পথশিশুদের শিক্ষা প্রসারে। পুরো আয়োজনের পেছনের কারিগর একজন নারী শিক্ষক। তিনি শাহনাজ পারভীন।

অবদান ও স্বীকৃতি: ছাত্র জীবনে বিভিন্ন সাময়ীকিতে তার লেখা ছাপা হতো। শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের পর তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে চলেছেন। তিনি ২০১০সালে “প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন মান সম্মত শিক্ষা অর্জনে ব্যর্থ ” এই বিষয়ের উপর গবেষণা পত্র “অনুসন্ধান” রচনা করেন। ২০১৪ সালে “পাখির মুখে ফুলের হাসি” নামে একটি ছড়ার বই প্রকাশ করেন। শিক্ষক শাহানাজ পারভীন ২০১০সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। ২০১৩সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। ২০১৬সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ক্লাব লিডার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ২০১৭সালে একুশে পদক পাওয়ার জন্য রাজশাহী বিভাগ থেকে মনোনয়ন  পেয়েছেন তিনি।

শিক্ষক শাহনাজ পারভীন বলেন, অভাব-অনটন অনেক শিশুকে স্কুলের বারান্দায় যেতে দিচ্ছে না। আবার অনেক শিশু একই সমস্যার শিকারে পরিণত হয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। এসব শিশুদের অনেকেই প্রচ  মেধাবী। কিন্তু অভাব তাদের কর্মজীবীর তালিকায় নাম লেখাতে বাধ্য করছে। চোখের সামনে হরহামেশাই ঘটনাগুলো ঘটে চলছে। যা কখনো মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি তাদের জন্য কিছু করার উদ্যোগ নেই। প্রথমে বাড়িতে স্বল্প পরিসরে কার্যক্রম শুরু করি। পরে স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। সেখানে সাধ্যানুযায়ি এসব সুবিধা বঞ্চিত কর্মজীবী পথশিশুদের লেখাপড়া  শেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। শাহনাজ পারভীন চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে দেশবাসীর দোয়া কামনা করেন।

পারিবারিক জীবন: চার সদস্যের সংসার তাঁর। বড় মেয়ে মাসুমা মরিয়ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রথমবর্ষে অধ্যয়নরত। ছোট মেয়ে আমেনা মুমতারিন শ্রেয়া বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। স্বামী মোহাম্মাদ আলী শেরপুর শহীদিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় আরবী প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য: উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ুম বলেন, এক কথায় শাহনাজ পারভীন একজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি শিক্ষক সমাজের জন্য অনুকরণীয়। তিনি আমাদের গৌরব। দেশ ও জাতির সাথে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের জন্য তিনি বিরাট সম্মান বয়ে এনেছেন।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top