সন্ধ্যা ৭:৩০, শনিবার, ২৫শে মার্চ, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / বিলটুর স্বপ্ন
বিলটুর স্বপ্ন
জানুয়ারি ২৭, ২০১৭

আজ বিলটুর স্কুলে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা। ওর মনে তাই বেশ খুশি খুশি ভাব। ওদের স্কুলে এ বছর অনেকগুলো বিষয়ে প্রতিযোগিতা হবে। প্রত্যেক বিষয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারীদের এ বছর স্কুলের পক্ষ থেকে দামি দামি পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। তাই শুনে বিলটুও এবছর তিনটি বিষয়ে নাম দিয়েছে। দীর্ঘ লাফ, ২০০ মিটার দৌড় এবং মোরগের লড়াই-য়ে। যদি তার ভাগ্যে একটা পুরস্কার কোন রকমে জুটে যায় তাহলে তো আর কথাই নেই। সবার কাছে ওর তখন কত দাম বেড়ে যাবে। সবাই তখন বলবে কত ভালই না খেলে বিলটু। আহ! আমরা যদি ওর মত  অত ভাল খেলতে পারতাম, ইত্যাদি।

এসব কথা ভেবে ভেবে ওর মন আনন্দে ভরে উঠে। তারপর সকাল ৮টা না বাজতেই গোসল করে, পেটভরে খেয়ে রওনা হয়ে গেল স্কুলের দিকে। এক এক করে সবাই স্কুলে হাজির হল। সকাল ১০টায় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সুচনা হল। স্কুলের ভাইস চেয়ারম্যান মিস্টার আর,কে দত্ত প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করলেন। প্রথমে স্থির হল বালকদের দীর্ঘ লাফ দিয়েই প্রতিযোগিতা শুরু হবে। তাই প্রথমেই এসে গেল বিলটুর পালা। ও দুই মিনিটেই প্রস্তুত হয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল এবার সে রাসেদ ও রতন কে টেক্কা দিয়ে লাফের একটা পুরস্কার নেবেই। তারপর ক্রিড়ার শিক্ষক বাঁশি বাজিয়ে এক এক জনকে ডাকতে লাগল লাফ দেওয়ার জন্য।

বিলটু ভাবতে লাগল আর যদি কোন কারণে লাফের পুরস্কারটা ফসকে যায় তাহলে আরও দুটো প্রতিযোগিতা তো বাকি রয়েছে। তখন ও দেখিয়ে দেবে তাকে সবাই যা ভাবে আসলে সে তা নয়। বলতে বলতে বিলটুর পালা এসে গেল। বাঁশি বাজার সাথে সাথেই সে খুব জোরে দৌড়ে এসে গায়ের জোরে একটা লাফ দিল। কিন্তু পড়ল সবার থেকে দুই-তিন হাত পিছনে। ওর লাফ দেখে সবাই বলল, “ আহারে লাফ একটা মেরেছে বিলটু।” কেউ বলল, “ ওরে বিলটু ফাস্ট হয়েছে।” অবশেষে আরও কয়েক বার লাফ দিলে, লাফের কোন পরিবর্তন হলো না দেখে ক্রিড়ার শিক্ষক ওকে বাদই দিলেন। লাফের পুরস্কারটা সত্যি সত্যিই ওর ফসকে গেল। দীর্ঘ লাফে প্রথম হল রতন আর দ্বিতীয় রাসেদ।

 বিলটুর খুব রাগ হল। ও মনে মনে বলল, “দৌড়ের সময় দেখিয়ে দেব ঐ রতন বেটাকে। দৌড়ের সময় ওকে যদি আমি ল্যাং মেরে  ফেলে না দিই তাহলে আমার নাম বিলটুই নয়। তারপর এল দৌড়ের পালা। স্যার সংকেত দেওয়ার সাথে সাথেই দৌড় শুরু হয়ে গেল। কিছু দুর এসে বিলটু রতনকে ল্যাং মেরে ফেলতে গিয়ে নিজেই পা ফসকে পড়ে গেল। তারপর উঠে আবার যখন দৌড় শুরু করল তখন রতন প্রায় দড়ি ছোঁয় ছোঁয়। বিলটু বৃথা ওর পিছু ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলনা। সবার শেষেই তাকে দড়ি ছুঁতে হল। ওর মন থেকে পুরস্কার পাবার চিন্তাটা ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসতে লাগল। ভাবল পুরস্কার বুঝি ওর ভাগ্যে নেই। তা না হলে দুটি প্রতিযোগিতাতেই তার স্থান হল সবার নিচে। তাই পুরস্কারের আশা ও এক রকম ছেড়েই দিল। কিন্তু শেষ চেষ্টা করতে দোষ কি এখনও তো তার একটা প্রতিযোগিতা বাকি আছে। কিছু বলাতো যায়না হয়তো এবার সে একটা পুরস্কার পেয়েও যেতে পারে। তাছাড়া লাফ ও দৌড়ে সে পুরস্কার পেলনা বলে মোরগের লড়াইতে পাবে না এমন তো কোন কথা নেই। নতুন উদ্যম নিয়ে তাই সে আবারও মাঠে নামলো।

 প্রাণ পনে লড়াই করতে লাগল অন্যদের সাথে। কিন্তু কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই গোপিনাথের কনুইয়ের কয়েকটা জাব্দা ঘা খেয়ে চিত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। ওকে দেখে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। রাগে তখন বিলটুর দম বন্ধ হয়ে আসছে। কাউকে কিছু না বলে মুখ কালো করে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল ও। খানিক দুরে এসে ওর পা আর যেন উঠতে চাইলনা। আসলে তিনটি খেলাতেই তো সে ওর সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। সাধ্যমত কষ্ট করেছে। তাই সে এখন পরিশ্রান্ত। তাই রাস্তার পাশের একটা বাবলা গাছ তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল সে। তার পর সোজা বাড়ি গিয়ে বারান্দার ভাঙ্গা খাটের উপর ধপাস করে শুয়ে পড়ল। আর শোয়া মাত্রই ক্লান্তিতে ওর ঘুম এসে গেল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।

 স্বপ্নে দেখতে লাগল দৌড়ে ও প্রথম হয়েছে। তাই প্রধান শিক্ষক ওকে বলছে, “ বিলটু তোমার পুরস্কারটা নিয়ে তবেই বাড়ি যেও।” তাই পুরস্কার নেওয়ার আশায় স্কুলের একটা বারান্দায় সে বসে আছে। বসে বসে সে খেলা দেখছে। সমস্ত খেলা শেষ হতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু পরেই পুরস্কার বিতরণী শুরু হল। প্রধান শিক্ষক দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকারী হিসাবে বিলটুকে পুরস্কার নেওয়ার জন্য ডাকলেন। ও এগিয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে তাকে একটা সেলুট জানালো। তারপর বাড়ি ফেরার জন্য বাইরে এসে দেখল রাত অনেক হয়েছে। একা একা বাড়ি ফিরতে তার একটু ভয় ভয় করছিল। কিন্তু কাউকে না পেয়ে শেষে একাই রওনা হল। কিছু দুর এসে সে যেন পথ হারিয়ে ফেলল। এ-সে কোথায় এসেছে ? এ তো তার বাড়ি ফেরার রাস্তা নয়। ওর বড় ভয় করতে লাগল। ঠিক ঐ সময় সে তার সামনে দেখতে পেল কতক গুলো কবর। ঠিক মাঝখানের কবরটার উপরে দাড়িয়ে একটা কালো রঙের মানুষ। নিশ্চয় ভূত টুত কিছু একটা হবে। তাকে দেখা মাত্র বিলটুর বুক ছ্যাঁৎ করে  কেপে উঠল।


প্রথমে ও দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু কি আশ্চার্য, ওর পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে আছে। ও কোন মতে দৌড়াতে পারলনা। তারপর ও চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে চাইল। কিন্তু তাও পারলনা। ওর মুখে কথা ফুটলনা। ওর সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে  আসতে লাগল। ওই ভুতটা ওকে হাত ছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। কিন্তু বিলটু সেখান থেকে এক পাও নড়ছেনা দেখে ভুত নিজেই এগিয়ে এল। তার পর বলল, “ বা! বেশ সুন্দর পুরস্কার পেয়েছিস তো। তোর পুরস্কারটা আমার কাছে দেতো।” বিলটু পুরস্কারটা দেবেনা বলে আগলে রাখতে চাইল। তখন ভূতটি বলল, “ দে বলছি, নইলে তোর ঘাড় মটকাবো।” এই বলে ভূতটি বিলটুর হাত থেকে পুরস্কারটা কেড়ে নিল। বিলটু তখন ভূতের হাত থেকে পুরস্কারটা নেবার চেষ্টা করল।

অমনি ভূতটি বিলটুর হাত ধরে তাকে একেবারে আকাশে ছুড়ে দিল। বিলটু হারালো তার পুরস্কারটা। আকাশে গিয়ে বিলটু দেখতে পেল অনেক গুলো গ্রহ পাশাপাশি দাড়িয়ে। ও তখন এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে লাগল। এক গ্রহে গিয়ে দেখতে পেল কতকগুলো মানুষ। মানুষ গুলো তার বোন সীমার ছোট পুতুলটির চেয়েও অনেক ছোট। মানুষ গুলো বিলটুকে দেখে আক্রমণ করল। বিলটু সব কটাকে এক একটা ঘুষি মেরে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। তারপর এল একটা বড় আকারের মানুষ। সে এসে বিলটুকে গলাধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সেই গ্রহ থেকে। তারপর এক সময় সে ধপাস করে এসে পড়ল পৃথিবীতে। যেই পড়া অমনি গেল তার ঘুম ভেঙ্গে। দেখল সে পড়ে আছে তাদের সেই ভাঙ্গা খাটের নিচে। আসলে সে কোন গ্রহ থেকে পড়েনি। খাট থেকে নিচের মাটিতে পড়ে গেছে, এই যা।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top