সকাল ৭:২৬, সোমবার, ২৪শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ ও প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ ও প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
জানুয়ারি ২, ২০১৭

১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী কোন শিশুকে বাল্যবিবাহ করতে বাধ্য করা যাবে না। এখানে শিশু বলতে ২১ বছরের কম ছেলে এবং ১৮ বছরের কম মেয়েকে বুঝানো হয়েছে। এছাড়াও ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু ধরা হবে।

 এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে বর্তমান সরকার সেই ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন বাতিল করে আবার নতুন করে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ শীর্ষক একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে। আর বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬ শীর্ষক খসড়ায় একটি বিশেষ ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিশেষ ধারার ক্ষেত্রে ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক বা ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় বিয়ে দেয়া হলে সেটিকে বাল্যবিবাহ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না। সেক্ষেত্রে একে আবার অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়েও বলা যাবে না।

 অর্থাৎ কোন পরিবারে বাবা-মা চাইলে আদালতের অনুমতি নিয়ে ১৬ বছরের কোন মেয়েকেও বিয়ে দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তেমন কোন আর আইনি বাধ্য বাধকতা থাকবে না। তবে এখন বিষয় হচ্ছে সরকার কেন আইনটি সংশোধন করে, বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনে এই বিশেষ ধারাটি নিয়ে আসলেন? কেন একটি শিশুকে বিয়ে দেয়ার বৈধতা দিলেন? তারা মনে করছেন বাংলাদেশ এখন একটি মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে ২০২১ সালের মধ্যে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবেন বলে তারা আশা করছেন।

এছাড়াও বাংলাদেশে এখন দারিদ্র্যের হার ব্যাপক হারে কমে এসেছে। এক সময় এদেশে ৭৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত কিন্তু এই সংখ্যাটি এখন তিনগুণেরও বেশি কমে ২২ দশমিক ৪ অবনমিত হয়েছে। অতিদরিদ্র্যের হার এখন প্রায়  ১০ শতাংশের মতো।  সহ¯্র উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেধে দেয়া হলেও আমরা তা ২০১৩ সালের মধ্যে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এমডিজি অর্জন করার পর আমরা এখন এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দেশে এখন মাতৃমৃত্যুর হার কমে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এদেশে এখন ৯৮ শতাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। সামাজিক অনেক সূচকেই আমরা প্রতিবেশি দেশ ভারতের থেকেও অনেক এগিয়ে আছি।

 যেহেতু আমরা এতকিছু উন্নয়ন করছি তাহলে আমরা মেয়েদের বিয়ের বয়সটা কেন কমাতে পারব না? অন্যান্য দেশে যদি মেয়েদেরকে ১৬ বছরেই বিয়ে দেয়া যায় তাহলে আমরা কেন পারব না? এটা হয়তবা সরকারের চিন্তা-ভাবনা। কিন্তু এখন আমাদের চিন্তা ভাবনা হচ্ছে, আমরা কি এত তাড়াতাড়ি ‘বিদেশ’ হয়ে গেলাম? আমাদের দেশের পারিপাশির্^ক অবস্থা ও প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য দেশের পারিপাশির্^ক প্রেক্ষাপট ও অবস্থা কী অভিন্ন? আমাদের দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ঠিকই সেই সাথে আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষদের মধ্যে কি সুষমভাবে মনস্তাত্বিক উন্নয়ন ঘটেছে? আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কি ব্যাপকভাবে পরিবর্তন এসেছে ? এখন গ্রামের মানুষগুলো কি বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে শতভাগ সচেতন হয়েছেন? যে পরিবারগুলো মেয়ে সন্তানকে তাদের সংসারের বোঝা বলে মনে করত তারা কি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আদৌ বেরিয়ে আসতে পেরেছেন?


বাল্য বিবাহের দিক থেকে অনেক বেশি এগিয়ে আমাদের রংপুর অঞ্চলের মানুষ। কারণ আমরা জানি এটি একটি ‘মঙ্গা’ কবলিত এলাকা। আবার অনেকে একে অবহেলিত রংপুর এলাকায়ও বলে থাকেন। অবশ্য এখানে একটু বলে রাখা দরকার যে রংপুরে কিন্তু এখন উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। সেই সাথে অবহেলিত ও মঙ্গা কবলিত এলাকার দুর্নাম মোচন হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এখনকার রংপুর ও আগেরকার রংপুরের মধ্যে একটি বিরাট পার্থক্য তৈরি হয়েছে। রংপুর এখন একটি বিভাগীয় শহর, এখানে সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। শিক্ষার প্রসারে রয়েছে একটি বিশ^বিদ্যালয়। এই এলাকার মানুষের শুধু এখন একটাই দাবি, শুধু যেন গ্যাসের সংযোগটি দেয়া হয়। তবেই তারা তাদের উন্নয়নের যাত্রাকে আরো বেশি বেগবান করতে পারবেন। তবে এই এলাকার মানুষগুলো  ক্ষুধা ও দরিদ্র্যতাকে জয় করতে পারলেও এখনো ক্ষুধা ও দারিদ্র্যর ভয় থেকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

 অবিশ^াস্য হলেও সত্য যে এখনো রংপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো তাদের ক্ষুধাকে যতটা না ভয় পায় তার চেয়ে বহুগুন বেশি ভয় পায় কন্যা সন্তান বা মেয়ে শিশুকে। তারা সংসারে একটি মেয়ে শিশুকে আপদ ও বিপদ দু’য়েই ভাবেন। তাই যত দ্রুত সম্ভব মেয়েকে বাড়িতে থেকে বিদায় করলেই বাঁচেন। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এ এলাকায় বাল্য বিয়ের হার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেকাংশেই বেশি।


পীরগঞ্জ উপজেলার ষোল ঘরিয়া গ্রামের লাভলী আকতার। ২০১১ সালে সে হোসেনপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সেই সময় তার বয়স মাত্র ১২ বছর। ছাত্রী হিসেবে মোটেই খারাপ ছিল না। পড়াশুনা শেষ করে হয়তবা বড় কোন ডাক্তার বা ইঞ্জিয়ার হতে পারতেন না। তবে ছোট্ট করে হলেও দেশের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের সাধারণ মানুষগুলোর জন্য  ভালো কিছু একটা করার প্রত্যাশা তার মনের গহীনে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তার সমস্ত স্বপ্ন, প্রত্যাশা পদদলিত করে, শিক্ষাজীবনের মুখে ছাই, ধূলা-বালি ছিটিয়ে একই গ্রামের মোঃ রঞ্জু মিয়া নামের এক ছেলের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়।

 একেবারে কাঁচের গুড়ার মতোই তার একেকটি স্বপ্ন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সেই সময় লাভলী  বিয়ে শব্দটির সাথে পরিচিত হলেও বিয়ের সঠিক অর্থটি কী তা বুঝতে পারেননি। সে যদি বুঝতে পারত যে বিয়ে মানেই হচ্ছে তার স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে-ছুড়ে নর্দমায় ফেলে দেয়া, বিয়ে মানেই হচ্ছে তার আর পড়াশুনা করার  কোন দরকার নেই, তাকে এখন বই, খাতা, কলম ছেড়ে সংসার ধর্ম পালন করতে হবে। তাহলে হয়তবা সে কিছুতেই বিয়েতে রাজি হত না। হয়তবা সে দৌড় দিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যেত নতুবা আত্মহত্যা করে নিজেই নিজেকে শেষ করে দিত। কিন্তু সেই সুযোগটুকুও তাকে দেয়া হয়নি। একেবারের পুতুলের মতো করে সাজিয়ে তাকে পুতুল বিয়ে দেয়া হয়। সেও হয়তবা পুতুল বিয়ে ভেবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। বিয়ের ঠিক দুই বছর পরেই সে এখন দুই সন্তানের জননী। প্রথম সন্তানটিই মেয়ে  নাম নুরে জান্নাত আর দ্বিতীয়টি ছেলে নাম নুর মুহাম্মদ।

 একই উপজেলার সাতগড়া গ্রামের মেয়ে ববিতা আক্তার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ করতে না করতেই তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হল। বিয়ের পরের বছরই গর্ভবতী। সন্তান জন্মদানের সময় সে মারা গেল। এটি তো গেল একটি লাভলী কিংবা একটি ববিতার গল্প। গোটা বাংলাদেশের আনাচে – কানাচে এরকম হাজার হাজার ববিতা ও লাভলী রয়েছে। যাদের অনেকেই শিক্ষা জীবনের গল্প শুরু করার আগেই সংসার জীবনের গল্প শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ হয়তবা অপ্রাপ্তবয়সেই তাদের শরীর সন্তান ধারণের জন্য উপযোগী না হওয়া সত্ত্বেও ভুলবশত সন্তান নিতে গিয়ে অকালে মারা যান। যদিও আমাদের দেশে এখন মাতৃমৃত্যুর হার অনেকাংশেই কমে এসেছে তবুও এটি এখনো উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। কারণ আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলগুলোতে মাতৃমৃত্যুর পিছনে প্রধান তিনটি কারণ হচ্ছে।

 ক. অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেয়া বা বাল্যবিবাহ খ. অপরিণত অবস্থায় সন্তান ধারণ করা গ. অপুষ্টিজনিত কারণ। পুষ্টিহীনতা সম্পর্কে আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সকল পরিক্ষা শেষ হলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। তবে আমাদের এই গর্বকে খর্ব করে দেয় যখন দেখি আমাদের দেশে এখনো গভীরভাবে পুষ্টির অভাব রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর এই উদ্বেগের  পিছনের অবশ্যই কারণ রয়েছে। আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলগুলোতে মা ও শিশুরাই পুষ্টির অভাবে বেশি ভোগেন।

 তার উপর বাল্য বিবাহের চাপ আমাদের উদ্বেগকে আরো বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউনিসেফের ২০১৪ সালের তথ্যমতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাল্য বিবাহের হার সবচেয়ে বেশি এবং তা উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের তথ্যমতে এখানে ১৫ বছর হওয়ার আগেই ৩৯ শতাংশ এবং ১৮ বছর হওয়ার আগেই ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। আমাদের প্রতিবেশি দেশে বাল্য বিবাহের হার ভারতে ৫০ শতাংশ, নেপালে ৫৭ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৫৪ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে গড় বাল্য বিবাহের হার ৬৫ শতাংশ। যা আমাদের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের কারণ।

এছাড়াও আমাদের দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের পর তাদের ২৪ বছর হওয়ার আগেই তার দুই বা ততোধিক সন্তানের মা হন। এর ফলে একটি সমাজে বা রাষ্ট্রে নারীর প্রতি সংিসতা , মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রজনন সমস্যা, নারীর শিক্ষার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা হ্রাস, উপযুক্ত কর্মের সন্ধান পাওয়া ইত্যাদি সংখ্যার দিন দিন বৃদ্ধি পায়। যা যেকোন রাষ্ট্রের জন্যই সুখকর নয়। বাল্যবিবাহ সমস্যা, মা ও শিশুর পুষ্টির অভাব এরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংকটের মধ্যে যখন আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি  ঠিক সেই সময়েই বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে আবার নতুন করে একটি বিশেষ ধারা এনে শিশু বিয়ের বৈধতা দেয়ার যৌক্তিকতাটা কি আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। এছাড়াও বাল্যবিবাহ আইন ২০১৬ শীর্ষক এই আইনের বিশেষ ধারায় যদি কোন ১৬ বছরের মেয়েকে  বিয়ে দেয়া বৈধতা পায় তাহলে তো সেটি আবার ২০১৩ সালের শিশু আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।

 
যেহেতু অন্যান্য অনেক দেশেই মেয়েদের ন্যুনতম বিয়ের বয়স ১৬ রয়েছে সেহেতু আমরাও এই আইনটি সংশোধন  করতেই পারি। তবে এতো তাড়াহুড়া করার কোন যৌক্তিতা আছে বলে আমি মনে করি না। শিশু মৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যু হার, পুষ্টির অভাব, বাল্যবিবাহের কুফল, শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে ঝরে পড়া, কন্যা সন্তান একটি পরিবারের জন্য অভিশাপ নয় এই বিষয়গুলো আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে আরো ব্যাপকভাবে আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে।

 একটি সমাজে নারীর প্রতি পুরুষের যে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে সেটিরও পরিবর্তন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিকভাবেও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পাশাপাশি নারী ও পুরুষের সকল বৈষম্য দুরীকরণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ঠিক সেক্ষেত্রে এরকম একটি আইন বা আইনের বিশেষ ধারা আমাদের জন্য বড় কোন বাধা হয়ে দাড়াঁবে বলে আমি মনে করি না।   
লেখক ঃ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
ৎধংবফ.৪নধহমষধফবংয@মসধরষ.পড়স
০১৭৫০-৫৩৪০২৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top