রাত ৩:৪৮, শনিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / বই উৎসব
বই উৎসব
ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬

বই নিয়ে করি হইচই! হ্যাঁ। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই বই তুলে দিলে, তারা তো একটু আনন্দ বেশিই একটু বেশিই হইচই করতেই পারে। বই আনন্দের প্রতীক, মননের রাজ্য। সেই  নতুন বইয়ের গন্ধ শুকতে শুকতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মাতোয়ারা তো হবেই। বইয়ের সামনে গিয়ে আমরা সবাই মৌনব্রত হয়ে যাই। তাকিয়ে থাকি। মুদ্রিত ওই মায়াভরা অক্ষরের দিকে। জ্ঞানপিপাসু মানুষের হাতের নাগালে বই থাকলে তা পড়ার সময় না পেলেও, একবার বইয়ের সাদা পাতায় মুদ্রিত কালো অক্ষরগুলোর গন্ধ শুকে নেন।

বইয়ের প্রচ্ছদ, বানান, জেনে নেওয়া হয় লেখকের বায়োডাটা। একটু সুযোগ পেলেই নানান কিছু পরখ করে দেখেন, বইপ্রেমিক মানুষেরা। বই মননশীলতার প্রতীক। বই মানব জীবন তথা সমাজ সংস্কৃতির পথরেখা বাতলে দেয়। বই বহু বর্ণিল জীবনের পথরেখা অঙ্কিত করে দেয়। একটি নান্দনিক জীবন-জগৎ গড়ে তোলার জন্য বইয়ের বিকল্প আর  অন্য কিছু হতে পারে না। একটি ভালো বই- চেতনায় ভাবনায় জীবনের পাথেয় হিসেবে কাজ করে থাকে। চিন্তার বিকাশ সাধনে বইয়ের বিকল্প আর কিছু নেই।

কাল ১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন। বছরের প্রথম দিনেই শুরু হয় অপার আনন্দ। এই দিনটিতে সাপ্তাহিক ছুটির দিন (শুক্রবার) না পড়লে বাংলাদেশের  কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে আনন্দের বান ডেকে যায়। নতুন বছরে বাংলাদেশ সরকার বিনামূল্যে ৩৬ কোটি নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পারবে।  বছরের প্রথম দিন নতুন বইয়ের বর্ণের গন্ধ শুকতে শুকতে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফেরে। নতুন বছরের প্রথম দিনেই বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্যকার বর্তমান সরকার। বলতে হয় সকল শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই দিতে পারাটা একটা কর্তৃত্বই বটে।

 যে দেশে পনেরো বছর আগেই এমন অবস্থা ছিল না।  সম্পূর্ণ উল্টোচিত্র ছিল সেই সময়ে।
খুব অল্প বয়স্ক শিক্ষার্থীরা যারা প্রথমবারের মতো স্কুলে ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিনেই তারা যখন কড়কড়ে মুদ্রণের বই হাতে পায়। বই হাতে নিয়ে বইয়ের পৃষ্ঠার ছবির দিকে বারবার তাকিয়ে থাকে। বই পড়তে না পারলেও  তাদের চোখ আটকে থাকে সেই দৃশ্যরাজির ভেতর।  প্রত্যেকটি মানুষেরই একটা কল্পরাজ্য আছে।  সেই কল্পরাজ্যকে বিকশিত করার জন্য বই অপরিসীম ভূমিকা পালন করে।
 
শিশুরাজ্যে কল্পনায় সুন্দর সুন্দর মেকাপ, গেটআপ করা বইগুলো চিত্তাকর্ষক হিসেবে কাজ দেয়। পরিশীলিত কাগজে বাধাই চার রঙা কাগজের মুদ্রণ সবই শিশু মানসে তৈরি করে এক অন্য রকম দ্যোতনা। বাংলাদেশের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতে বাংলাদেশ সরকার বিনামূল্যে  বই তুলে দিচ্ছেন। এটা বলতে সরকারের বড় অর্জন। আজ থেকে বিশ বছর দশ বছর আগে ফিরে তাকালে দেখা যাবে উল্টো দৃশ্য। বছরের ছয় মাস পার হওয়ার পরও অর্ধেক শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছাতে পারেনি সরকার। বড় পরিতাপের একটা অধ্যায় ছিল সেটা। দিনের পর দিন স্কুলে বই ছাড়া ক্লাস করতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। আজকের মতো তখন বাংলাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এত উন্নত ছিল না। এত বেশি কিন্ডার গার্টেনও গজিয়ে উঠেনি। দুর্নীতি আরা সন্ত্রাসের রাহুর কবলে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমনকি পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো দখলে ছিল ছাত্রনেতাদের দখলে।

স্বাধীনতা অর্জনের চার দশক শেষে শিক্ষা ব্যবস্থার কতটুকু উন্নতি ঘটেছে সেটুকু বলব না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। দেশের জলপথ, হাওড়-বাওড় তথা , ধু ধু করা বালির রাজ্যেও ইট সিমেন্টর বিদ্যনিকেতন নির্মাণ করতে পেরেছে সরকার।  শিক্ষার মান কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে! সে বিষয় নিয়ে জলসিঞ্চন করতে যাব না। তবে আমাদের  নীতিপ্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছুটা গতিশীতিশীল হয়েছে। কিছুটা চিন্তারেখার ছাপ পড়েছে । এই সাধারণ বিষয় বুঝতে পন্ডিতী ফলানো লাগে না। বোঝা যায়। আমাদের কলাকৈবল্যবিদরাও পরিপক্কতা অর্জন করেছেন

। সে জন্য দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ কোটি নতুন বই পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে যেতে হয়েছিল কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। রৌমারী শৌলমারী  দেশের রাজধানী শহর থেকে তো দূরে বটে, সাথে খোদ জেলা শহর কুড়িগ্রাম থেকেও অনেকটুকু দূরের জনপদ রৌমারী। দেখলাম সেই চরাঞ্চালেও বই পৌঁছে গেছে  যথাসময়ে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা ডিসেম্বর মাসেই সব গোছগাছ করে রাখেন। যাতে করে বছরের প্রথম দিনই নতুন বইয়ের আমেজ নিয়ে সব শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরতে পারে।


এখন কথা হলো সেই বই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কতটুকু মনোরঞ্জন করতে পারবে সেটাই ভাবার বিষয়। মুদ্রণ প্রমোদ, বানানবিভ্রাট এসব এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

শিক্ষা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বা ভাবতে গেলে, প্রথমেই আমার মনের অন্দরমহলে ভেসে উঠে, যে প্রবাদ প্রচলনটি। ‘দেখায় শিক্ষা নাচনে বিদ্যা।’ অর্থাৎ দেখতে দেখতে শিখি। আর নাচতে নাচতে বিদ্যা লাভ করি। শৈশব থেকে এখন অবধি এই প্রবাদ স্মরণ করে আসতেছি। চলতে ফিরতে কত শিক্ষাই তো নিলাম। তবে দেখতে দেখতে  আমরা যে শিক্ষা পেয়ে থাকি তার কোন শিক্ষাটি গ্রহণ করবো। সেই বিষয়ে কোনো কূল-কিনারা পাই না! সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেমপ্লেট, ব্যানার খোদাইকরা নামলিপিতে বানানবিভ্রাট দেখে  নিজেকে  খুব অসহায় মনে হয়। আমাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান বাংলা একাডেমি। আমাদের প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল ভাষার লড়াই করা।

 যাকে বলা হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। অর্থাৎ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। একটা ভাষাকে টিকে রাখার জন্য সেই ভাষাভাষী মানুষদের সারাজীবনই আন্দোলন করে যেতে হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করার জন্য ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর গঠিত হয় বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমি  ইংরেজি ও বাংলা অভিধান রচনা করতে পেরেছে। সেই অভিধানটি কয়জন শিক্ষকের কাছে আছে! বাংলা অভিধান ও বানানরীতি বইটি বাংলাদেশের কতজন মানুষের কাছে আছে সেটা খতিয়ে  দেখার  জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে খতিয়ে দেখার দরকার পড়ে না। বরং প্রকাশনার স্টক এবং দেশের বই বিপণনগুলোতে একবার ঢু মারলেই বুঝতে পারবেন। আমরা কতটুকু বই কিনি বা পড়ি!
যাইহোক আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা যে টেক্সট বই এবং চলতে ফিরতে যা শিখে আসছে সেগুলো কতটুকু পরিশুদ্ধ তা একবার ভাবতে হবে। সরকার যে ৩৬ কোটি টেক্সট বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিবে সেগুলোতে কতটুকু মননশীল এবং পরিশুদ্ধ সেটা  একবার  দেখতে হবে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠান পেশাগত এবং দায়িত্বরত লোকজনকেই নিয়োজিত করতে হব্,ে তাহলে আমাদের ভাষা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক পথে হাঁটতে শিখবে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক
০১৭৫০-৯৩৬৯১৯৬



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top