রাত ১১:১৯, বৃহস্পতিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / ফ্লাইওভার দুর্ঘটনা
ফ্লাইওভার দুর্ঘটনা
মার্চ ১৮, ২০১৭

মীর আব্দুল আলীম : আমরা কেন কোথাও নিরাপদ নই? ঘরেও না; বাইরেও না। নিজ ঘরে থাকবেন? খুন হবেন। রাস্তায় যাবেন? গুম হবেন; যেকোনো সময় হুড়মুড় করে আপনার ওপরই ভেঙে পড়তে পারে ফ্লাইওভারের গার্ড কিংবা পরিবহন চাপা দিয়ে কেড়ে নিতে পারে আপনার প্রাণ।

কর্মস্থলে থাকবেন? সর্বনাশা আগুনে যে অঙ্গার হবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায় এদেশে? নদীতে যাবেন? সেখানেও লঞ্চ ডুবিতে প্রাণ যাবে। কোনো নিরাপত্তা নেই, কোনো গ্যারান্টি নেই জীবনের। যখন যেখানে সেখানেই মৃত্যু। ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ছে, ব্রিজ ভেঙে পড়ছে, বিল্ডিং ভেঙে পড়ছে।

যা কিছু মানুষের সৃষ্টি, সবই ভেঙে পড়ে মানুষের ওপর। ভাগ্যিস আকাশটা সৃষ্টিকর্তার গড়া ছিল! তা না হলে সেটাও যে ভেঙে পড়ত ঘাড়ে। আজ স্বাভাবিক মৃত্যুই যেন অস্বাভাবিক। কিন্তু কেন? কে দেবে এর উত্তর? রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন মগবাজার-মৌচাক উড়ালসড়কের (ফ্লাইওভার) গার্ডার ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। মালিবাগ রেলগেট ব্যস্ততম এলাকা।

এখানে সারাক্ষণই যানজট লেগে থোকে। দিনের বেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটলে কি হতো তা সহজেই বোধগম্য। প্রতিনিয়ত একেরপর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা, গুম হওয়া, খুন হওয়ার ভয় আমাদের অশান্ত করে তুলেছে। নানা কারণেই এখন স্বজনদের লাশের অপেক্ষায় থাকতে হয়। বারবার এমন হচ্ছে কেন?


মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। যেন এক ভোগান্তির নাম। কাকরাইল মোড় থেকে মালিবাগ সড়কে ঢোকার সময় মনে হয় যেন স্বেচ্ছায় কোনো এক মৃত্যুপুরিতে প্রবেশ করছে সবাই। এলোপাতাড়ি পড়ে আছে ফ্লাইওভার তৈরির সরঞ্জামাদি। ধুলো আর বালিতে সেখানে চোখ মেলা দায়, শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া দুষ্কর। এমন অরাজক এক সড়ক দিয়েই প্রাণ হাতে চলাচল করছে অসংখ্য মানুষ। সেখানে চোখ তুলে ওপরের দিকে তাকালেই ভয়ে বুক চিনচিন করে উঠে, যেন এখনই গার্ডার ভেঙে পড়ে জীবন শেষ হয়ে যাবে। পথচারীদের সেই শঙ্কাই নিষ্ঠুর সত্যে পরিণত হলো ১৩ মার্চ রাত পৌনে ২টার দিকে।

 অনেকে অভিযোগ করেছেন, হতাহতের ঘটনা আড়াল করা হচ্ছে। পত্রিকান্তে প্রকাশ, ভেঙে পড়া গার্ডার অত্যন্ত নিম্ন মানের রড, সিমেন্ট, পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে তা তো ভেঙে পড়বেই। গার্ডার স্থাপনে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞদের কাজে ডেকে আনা হয়েছে। নিহত কাঠমিস্ত্রি স্বপন নাকি তাদেরই একজন। এমন দায়িত্বহীন কাজ কি মেনে নেয়া যায়? মাঝে মাঝে সরকারের তরফ থেকে নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়। অথচ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের কথা শোনা যায় না।

 তারপর আবার যেই লাউ সেই কদু। আগুনে পুড়ে মানুষ মরে। বাসে, ট্রাকে চাপা পড়ে মানুষ মরে। লঞ্চ ডুবে মানুষ মরে। ওভার ব্রিজ ধসে মানুষ মরে। বস্তিতে; বাসাবাড়িতে বেঘোরে মানুষ মরে। শুধু মরে আর মরে। এর কোনো প্রতিকার নেই। দেশের কোথাও যেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। দেশ যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চারদিকে কেবল আতঙ্ক ও শোক। কোথাও কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে প্রতিক্ষেত্রেই কেবল দুঃখ প্রকাশ করা হয়। আমরা দুঃখ প্রকাশ করা শিখেছি; দুঃখ লাঘব করা শিখিনি। এভাবে আর চলবে কত দিন?


মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার এভাবে অসাবধানতা এবং নিয়ম না মেনে নির্মাণ কাজ বছরের পর বছর চলতে থাকায় অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার পথচারি এবং স্থানীয়রা। একবার চলতে গিয়েই দেখা যাবে, ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ ওই এলাকার লোকজন এবং সেখান দিয়ে চলাচলকারীদের জন্য কত দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটিতে ত্রুটির কারণে নকশায় বারবার পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এ ধরনের বড় একটি প্রকল্পে কেন ভালোভাবে যাচাই না করে নকশা-পরিকল্পনা করা হয়? ত্রুটি ধরা পড়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলেই আমরা জানি। উল্টো বারবার সময় ও বরাদ্দ বাড়ানো হল? পত্রিকান্তে জানতে পারি-২০১৩ সাল থেকে চলছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ।

 এর আগে জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাইসহ অন্যান্য প্রারম্ভিক কাজ থেকেই শুরু শান্তিনগর, রাজারবাগ, মালিবাগ, ইস্কাটন-বাংলা মোটর ও মগবাজার এলাকার মানুষের ভোগান্তি। ২০১৪ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে সময়। আর জনগণের ভোগান্তির পাশাপাশি তাদের করের অর্থের অপচয়ের বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য।

 প্রথমে ব্যয় ধরা হয় ৩৪৩ কোটি টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৭২ কোটি, সর্বশেষ তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকায়। অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগের কারণ ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থকলেও খোদ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাই এ বিষয়ে সংশয়ে রয়েছেন। বহু প্রতীক্ষিত ফ্লাইওভারটির হাতিরঝিল-মিন্টোরোড, ইস্কাটন-ওয়ারলেস অংশের কাজ শেষ হয়েছে, অন্য অংশগুলো নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। নির্র্মাণ কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং নিয়ম না মেনে কাজ করার কারণেই ঘটছে দুর্ঘটনা। এরই মধ্যে একাধিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হয়েছে প্রকল্পটি। ১৩ মার্চ (১২ মার্চ রাতে) মালিবাগ অংশে গার্ডার ক্রেন দিয়ে তোলার সময় ছিটকে পড়ে ২ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে মগবাজারে দু’জনকে মরতে হয়।


প্রশ্ন হলো, ফ্লাইওভারের গার্ডার কীভাবে ভেঙ্গে পড়ে? উপযুক্ত নির্মাণ সংস্থাকে কি কাজটি দেওয়াা হয়েছিলো কি না? এর আগে কয়েকবার নির্মাণাধীন এ ফ্লাইওভারেই দুর্ঘটনায় হতাহত হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামের বদ্দারহাট ফ্লাইওভারে বহু মানুষ (সম্ভবত ২০ জন) মারা গেছে। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটছে, কোথায় সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান? এ সব ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হয় না। এবারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে খুবই ভালো কথা, ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হওয়া যাবে, কিন্তু যাদের প্রাণহানি হলো তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে কে? এসব তো অনাকাঙ্খিত মৃত্যু।

 এসব নিছক দুর্ঘটনা নয়। এগুলো কি এড়ানো যেতো না ? যদি বলি অনিয়ম, অবহেলা, আত্মসাৎ, সংশ্লিষ্টদের নজরদারীর অভাব আর অব্যবস্থাপনাই এসব মৃত্যুর জন্য দায়ি? মোটেও ভুল হবে না। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজের মান নিয়ে আগেও এন্তার অভিযোগ ছিল। এর আগেও সেখানে একবার গার্ডার ভেঙ্গে পড়েছিলো। ভাগ্যিস রাতে মানুষের চলাচল কম ছিলো বলে, সেখানে  লোকজন না থাকায় প্রাণহানির ঘটনা কম ঘটেছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে পত্রপত্রিকাগুলো লিখেছে। তাতে তোয়াক্কা করেনা সংশ্লিষ্টরা।

 এসব নিয়ে বহুবার লেখা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের তাতে কর্ণপাত নেই। তাই যা  হবার তাই হলো। এ দায় কে নেবে? সরকারের সংশ্লিষ্টার কি এ দায় এড়াতে পারেন? মানুষের জীবনের মূল্য কি তারা দিতে পারবেন? কী মর্মান্তিকই না এ মৃত্যু! ফ্লাইওভারের মস্ত গার্ডের চাপে থেঁতলে গেছে শরীর; কেবল ক্ষতবিক্ষত পা দুটো বের হয়ে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। স্থানীয়দের বর্ণনায়, গার্ডারে পিষ্ঠ হওয়া তরতাজা শরীর থেকে তখনও গলগলিয়ে রক্ত বয়ে যাচ্ছিল। মুহূর্তে লাল হয়ে যায় পিচঢালা পথ। এমন মৃত্যু কি মেনে নেয়া যায়?


আইনের প্রয়োগ হলে; নিয়মতান্ত্রিকভাবে ঠিকঠাক মত সব পরিচালিত হলে অনেকাংশেই এসব দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। আমরা যারা লিখিয়ে তারা কেবলই লিখি। কার কথা কে শোনে? অর্থের মহব্বতে কারো কারো মুখে কুলুপ আঁটা থাকে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়তই নানা গেড়াকলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবেলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,

[email protected] 

০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top