বিকাল ৪:১১, শুক্রবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / পূজার পড়ালেখা
পূজার পড়ালেখা
মার্চ ১০, ২০১৭

রণজিৎ সরকার: পূজার ভোরে ঘুম থেকে উঠল। হাতমুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসল। ক্লাসের পড়া পড়তে লাগল। একটু পর মা সকালের নাস্তা নিয়ে এলেন। নাস্তা খাওয়া শেষ করে স্কুলড্রেস পরল পূজা। তারপর স্কুলে যাওয়ার জন্য মায়ের সঙ্গে বাসা থেকে বের হলো ও। বাসষ্ট্যান্ডে স্কুলবাস আসে। বাসা থেকে বাসষ্ট্যান্ড একটু দূরে। হেঁটেই আসা যায়। স্কুলবাসে করে নিয়মিত স্কুলে যায় পূজা। বাসা থেকে বাসষ্ট্যান্ডে আসার পথে সেলুন, চায়ের দোকান, হোটেলের কাজ করে এমন ছেলেমেয়েরা স্কুলড্রেস পরা পূজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এ বিষয়টা পূজা ও পূজার মা লক্ষ করে। একদিন ওদের দিকে তাকিয়ে পূজা বলল, ‘আচ্ছা মা, আমি প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়া করি। ওরা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কেন? ওরা কি আমার সাথে স্কুলে যেতে চায়?’

মা বুঝতে পারেন। এই শিশুরা কেন পূজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পূজার মতো স্কুলড্রেস পরে স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে হয়তো ওদের। তাই তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ওরা কি করে স্কুলে যাবে। ওরা কাজ করে অন্যের দোকানে। পূজা মায়ের ডান হাত ধরে আছে। মা কোন উত্তর দিচ্ছেন না। তাই পূজা মায়ের হাত ধরে জোরে টান দিয়ে বলল, ‘ও মা, মা, তুমি বলছ না কেন? ওরা কি আমার মতো স্কুলে যেতে চায়?’

মা পূজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তোমার মতো ওরাও স্কুলে যেতে চায়। সেজন্যই হয়তো তোমার স্কুলব্যাগের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।’
পূজা বলল, ‘মা, আমি তো নিয়মিত স্কুলে যাই। কিন্তু ওরা স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে আমার স্কুলে যাওয়া দেখে কেন?’
মা দাঁড়িয়ে আশপাশে দোকানগুলো পূজাকে দেখিয়ে বলল, ‘ওরা তো এই দোকানগুলোতে কাজ করে। তাই তোমার মতো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয় না ওদের।’
পূজা বলল, ‘আচ্ছা মা, তুমি তো একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। মানুষ গড়ার কারিগর। তুমি ওদের জন্য পড়ালেখার সুযোগ করে দিতে পারবে না?’
পূজার কথা শুনে স্কুল শিক্ষিকা মা ভাবনায় পড়ে গেলেন। বিষয়টা নিয়ে এভাবে আগে কখনো ভাবেননি তিনি। আজ পূজার কথা শুনে ভাবতে বাধ্য হলেন। পূজা আবার বলল, ‘মা তুমি কিছু ভাবছ?’
‘ওদের নিয়ে ভাবছি, দেখি কিছু করা যায় কি না।’
মা মেয়ে আবার হাঁটতে লাগল। বাসষ্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। স্কুলবাস এল। পূজা বাসে উঠে গেল স্কুলে। পূজার মা ভাবছে- বাসষ্ট্যান্ডের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলব। দুইটা ছেলেকে পেলেন। বয়স আট কি দশ বছর হবে। একজন সেলুন শ্রমিক রায়হান ও অন্যজন লেদযন্ত্রের শ্রমিক সুমন। ওদের বলল, ‘আচ্ছা, তোমাদের প্রায়ই দেখি আমি যখন মেয়েকে নিয়ে যাই। তখন তোমার পূজার স্কুলব্যাগের দিকে তাকিয়ে থাক। কিন্তু কেন তাকিয়ে থাক? আমাকে একটু বলবে?’
রায়হান বলল, ‘আপনার মেয়ে মতন ইস্কুলে যেতে মন চায়। পড়ালেহা করতে ইচ্ছা করে। আমরা পড়ালেহা শিখুম। আপনি শিখাবেন পড়ালেহা?’
সুমন বলল, ‘আমিও পড়ালেহা শিখাতে চাই।’ পূজার মা বললেন, ‘তোমরা কি সত্যি সত্যি পড়ালেখা করবে?’
ওরা দুজন একসঙ্গে বলল, ‘আমরা পড়ালেহা করার সুযোগ চাই।’


ওদের পড়ালেখার আগ্রহ দেখে পূজার মা বললেন, ‘আমি তোমাদের পড়ালেখার সুযোগ করে দেবো। আমার কাছে পড়ালেখা করবে। সময় করে বাসায় ডাকব তোমাদের।’  
ওরা পড়ালেখা শিখতে পরবে বলে খুশিতে হাততালি দিল। পূজার মা বললেন, ‘তোমরা প্রস্তুত থাক। কয়েক দিনের মধ্যেই ডাকব। তোমরা কাজের ফাঁকে এসে পড়ালেখা শিখবে। পারবে না আসতে?’‘অবশ্যই পারব আফা। আপনি যেদিন ডাকবেন আমরা যামু।’


পূজার মা ওদের বিস্কুট কিনে দিলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার ভালো থাক, আজ যাই। পরে আবার দেখা হবে।’  এই বলে পূজার মা বাসার দিকে যেতে যেতে ভাবতে লাগলেনÑ ওদের তো কথা দিলাম। কিন্তু কখন ওদের পড়ালেখা শিখাব। যাক, স্কুল শেষ করে বিকেল থেকে পড়াব। নানা কিছু ভাবতে ভাবেতে বাসায় পৌঁছে গেলেন মা।
পূজা স্কুলে পৌঁচ্ছে ক্লাসরুমে ঢুকে বেঞ্চে ব্যাগ রাখল। ক্লাসে উপস্থিত বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন রকমের গল্প করতে লাগল। অ্যাসেম্বলির জন্য ঘণ্টার ঢং ঢং ঢং শব্দ হলো। সবাই গিয়ে শহীদ মিনারের সামনে জাতীয় সংগীত গাইতে লাগল। একটু পর ক্লাস শুরু হলো। ক্লাস শেষে স্কুল ছুটি হলো। স্কুলবাসে উঠল পূজা। বাসষ্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে আছেন মা। বাস থেকে নেমে পূজা মায়ের হাত ধরল। তারপর পূজা বলল, ‘মা তুমি কি এদের নিয়ে কিছু ভেবেছ?’
‘ভেবেছি।’
‘কি ভেবেছ মা?’
‘প্রথমে দুই জনকে নিয়ে লেখাপড়া শুরু করব। তারপর ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়াব। আর এই দুই জনের মাধ্যমে অন্যেদের নিয়ে আসাব। ওদের দেখে অন্যরা উৎসাহ পাবে।’
‘ভালো পরিকল্পনা করেছ মা।’‘সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পারলে দেশের লাভ। আমারও লাভ। এদের মাঝে পাঠদান করতে পারলে নিজেকে নিজের কাছে ধন্য মনে করব।’
মায়ের কথা শুনে মুচকি হাসি দিয়ে পূজা বলল, ‘আমিও তোমার মতো মাকে নিয়ে গর্ববোধ করব।’
মা হেসে ফেলেন। মা মেয়ে বাসার দিকে হেঁটে গেল। কয়েকদিন পর রায়হান আর সুমনকে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেল। তখন সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মজীবী শিশুদের নিয়ে শিশুকল্যাণ স্কুল নাম দিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম ভালোভাবে শুরু করল বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। শিশুকল্যাণ স্কুলের জন্য এত এলাকায় পূজার মায়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। শিক্ষকতার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য পূজার মায়ের প্রতি সবার সুদৃষ্টি পড়ল। পূজার মা পুরো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হলেন। এবং জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী শিক্ষক হিসেবে পুরস্কার পেলেন। তিনি পুরস্কার পেয়ে উৎসাহিত হয়ে আরও মনোযোগ দিলেন শিশুকল্যাণ স্কুলের প্রতি। খুব ভালোভাবেই চলছে শিশুকল্যাণ স্কুলের কার্যক্রম। মায়ের সাফল্যে ও কার্যক্রমে সব সময় গর্ববোধ করে পূজা। ভালোভাবে পড়ালেখা করে দেশ ও দশের জন্য ভালো কিছু করবে এমনটাই স্বপ্ন দেখছে পূজা।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top