দুপুর ১২:০৯, বৃহস্পতিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / পহেলা বৈশাখ প্রবর্তনের ইতিকথা
পহেলা বৈশাখ প্রবর্তনের ইতিকথা
এপ্রিল ১৩, ২০১৭

নার্গিস জামান :‘এসো হে দামাল/ করে উন্মাতাল/ দিক ভোলা যত পাখি/ দেখো এলো ঐ বৈশাখী।
তুলে আন পুষ্প ভরা বরণ ডালা/ সাজা পান্তা ভাতের বৈশাখী মেলা, বাজারে বরণ ঢাক
এলো প্রাণের বৈশাখ।’
কবিতা দিয়ে শুরু করি পহেলা বৈশাখের অভিবাদন। স্বাগতম হে ১৪২৪ বাংলা নববর্ষের সোনালী ভোর। পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির একটি অন্যতম অংশ। ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাণের উৎসব। এটি এক সময় গ্রামীণ উৎসব ছিল, যা এখন শুধু বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং সমগ্র বাঙালির প্রাণের উৎসব, জাতীয় উৎসব পহেলা বৈশাখ। এমনকি সরকার এটিকে জাতীয় উৎসব হিসেবে নিরূপণ করেছেন। সরকারকে ধন্যবাদ যে, তাঁরা এই উৎসবটির জন্য উৎসব ভাতাও প্রদান করছেন। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা গত অর্থ বছর থেকেই দুটি উৎসব ভাতা ছাড়াও বৈশাখী ভাতা পাচ্ছেন মূল বেতনের ২০ শতাংশ। বর্তমানে দেশে সরকারী চাকুরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। বৈশাখী ভাতা বাবদ সরকারের প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।


পহেলা বৈশাখ ঃ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিনটিকে বছরের পহেলা দিন হিসেবে ধরে বাঙালি বর্ষবরণ উদযাপন করে থাকে। ‘গ্রেগোরিয়ান’ বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়। এটা বাংলা একাডেমিই নির্ধারণ করে দিয়েছে। ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির এক আদেশানুসারে এই বর্ষপঞ্জির প্রচলন ঘটে। গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিই হলো, ইংরেজি বর্ষপঞ্জি বা খ্রিস্টাব্দ, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সর্বত্র স্বীকৃত বর্ষপঞ্জি। এটির আদিরূপ ছিল জুলিয় বর্ষপঞ্জি।

 

গ্রেগরীয় এটাকে সংস্করণ করেন। কারণ জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিতে একটি মহাবিষুব থেকে আরেকটি মহাবিষুবের সময়কাল ধরা হয়েছিল ৩৬৫.২৫ দিন। যা প্রকৃত সময়কাল থেকে ১১ মিনিট কম। এর ফলে ৪০০ বছর অন্তর মূলঋতু থেকে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির প্রায় তিন দিনের ব্যবধান ঘটত। পোপ গ্রেগরীর সময় এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১০ দিনে। ফলে মহাবিষুব ২১ মার্চের পরিবর্তে ১১ মার্চ পড়েছিল।


 যেহেতু খ্রিষ্টীয় উৎসব “ইস্টারের” দিন নির্ণয় মহাবিষুবের সাথে জড়িত, তাই জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির এই ব্যবধান রোমান ক্যাথলিক গির্জার কাছে অনভিপ্রেত ছিল। তাই পোপ গ্রেগরি এটাকে সংস্করণ করে বারোটি মাসে ভাগ করে দেন। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা একটি গাণিতিক বা সৌর পঞ্জিকা। এটিই বর্তমানে ইংরেজি বা খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জি। আমরা জানি ইংরেজি দিন গণনা শুরু হয় রাত বারোটার পর থেকে, হিজরী দিন গণনা শুরু হয় চাঁদ দেখার পর। কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলার দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১লা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২ টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে। পহেলা বৈশাখ শুরু হয় চৈত্র সংক্রান্তির পরে।


চৈত্র সংক্রান্তি ঃ বাংলা বছরের শেষ দিনটি। এটা মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি উৎসব। তারা এ দিনটিকে পূণ্যের দিন বলে মনে করে। এ দিনটিকে মহাবিষুব সংক্রান্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এ দিনে তারা নদীতে পূন্য¯œান করে থাকেন, বিভিন্ন রকম ভাজা সহ তিতা খেয়ে থাকেন। চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক পূজা। চৈত্রের সূর্যের প্রচন্ড উত্তপ প্রশমন ও বৃষ্টি লাভের আশায় সনাতনী কৃষিজীবীরা বহু অতীতে চৈত্র সংক্রান্তির উদ্ভাবন করেছিলেন বলে জানা যায়। চৈত্র সংক্রান্তির দিনেই গ্রামে চড়ক মেলা বসে। অতঃপর চৈত্রের শেষ সূর্য অস্তমিত হয়ে ভোরে একরাশ আনন্দ দিতে নতুন বছর নতুন সূর্য উদিত হয়, আর আমরা বর্ষবরণ করে থাকি নানা রকম উৎসবের মধ্য দিয়ে। এটাই পহেলা বৈশাখ। চৈত্র সংক্রান্তি যদিও সনাতনী উৎসব, কিন্তু পহেলা বৈশাখ সবার উৎসব।  


পহেলা বৈশাখ প্রবর্তনের ইতিকথা ঃ ভারত বর্ষের মোগল স¤্রাটরা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা দিতে বিড়ম্বনা পোহাতে হত। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোগল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

 

তিনি প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। স¤্রাটের আদেশ মতো জ্যোতিবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ (মতান্তরে ১১) ইং মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা শুরু হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় (১৫৫৬ সনের ৫ই নভেম্বর) থেকে। তখন এই নতুন বাংলা সনের নাম ছিল ‘ফসলি সন’। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন নামে পরিচিত হয়

 

। স¤্রাট আকবরের আমল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়ে আসছে। তখন নিয়ম ছিল চৈত্রের শেষ দিনে বা চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সমস্ত খাজনা, মাশুক, শুল্ক কৃষকদের পরিশোধ করে দিতে হত। আর পরের দিন পহেলা বৈশাখে জমিদাররা নিজ নিজ অধিবাসীদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন এবং খাজনার খাতা হাল নাগাদ করতেন। তখন থেকেই হাল খাতার রেওয়াজ চলে আসছে।


বর্তমান হালখাতা ঃ বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকান-পাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হাল নাগাদ করার প্রক্রিয়া। ব্যবসায়িরা তাদের দেনা-পাওনার হিসেব সমন্বয় করে এদিন নতুন করে খাতা খোলেন। তাই আমরা হালখাতা বলে থাকি। খদ্দেররা তাদের সামর্থ্য মত পুরনো দেনা শোধ করেন নববর্ষের দিন এবং ব্যবসায়িরাও তাদেরকে বিভিন্ন খাবার বা মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করেন। বৈশাখ উৎসব উদযাপন উপলক্ষে আমাদের দেশে নানা রকম কর্মসূচি পালন করা হয়। বিশেষ করে গ্রামে মেলায় নানা ধরনের খেলা, চড়কি বা নাগরদোলা সহ বিভিন্ন আয়োজন থাকে।


গ্রামের বৈশাখ ঃ কয়েকটি গ্রাম মিলে কোন ফাঁকা স্থানে বা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। এটি মূলত ৩০ চৈত্রেই শুরু হয় এবং স্থানভেদে তিন দিন চলতে থাকে। মেলাতে থাকে নানা রকম গ্রামীণ কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন। থাকে নানা রকম পিঠাপুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ ভাজা দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। আমরা বৈশাখ বলতে নতুন লাল সাদা পোশাক, পান্তা ইলিশ, মেলা এবং গ্রামীণ ক্রিড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনকে বুঝে থাকি। খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নৌকা বাইচ, হা-ডুডু, লাঠি খেলা, আর কুস্তি। বাংলাদেশে কুস্তির সব চেয়ে বড় আসর হয় ১২ বৈশাখ চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে। এটি  জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। আরও কিছু মেলা আছে। যেমন- বউ মেলা, ঘোড়া মেলা।


বউ মেলা ঃ ঈশা খাঁ’র সোনার গাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে যার নাম বউ মেলা। মানুষের ধারণা প্রায় ১০০ বছর ধরে এই মেলা হয়ে আসছে। এটি প্রায় পাঁচদিন ধরে চলে। ঘোড়া মেলা ঃ সোনার গাঁয়ের পেরার গ্রামে আরেকটি মেলা হয় তার নাম ঘোড়া মেলা। আদিবাসীদের বর্ষবরণ ঃ ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাদের বৈশাখী উৎসবের নাম যথাক্রমে বৈশুখ, সাংগ্রাই ও বিজু উৎসব। বর্তমানে এই দিন জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। এই যৌথ উৎসবটির নাম ‘বৈসাবি’। এই উৎসবের মধ্যে একটি বিশেষ আয়োজন হলো মার্মাদের পানি উৎসব।


রাজধানীর বৈশাখী উৎসব ঃ ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ ভোরেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের স্বনামধন্য শিল্পীদের সম্মিলিত কন্ঠের গান দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। যদিও বটমূলটি মূলত একটি অশ্বত্থ মূল। ১৯৬০ থেকে ৭০ এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানিদের নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি। যদিও এটা বহু বছর থেকেই প্রচলিত। এইদিন বাংলাদেশে সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। ১৯৭২ সাল থেকে এটিকে জাতীয় উৎসব হিসেবে এক রকম স্বীকৃতি দেয়া হয়। পান্তা ইলিশ রাজধানীর বৈশাখী মেলার একটি অন্যতম বিশেষ আয়োজন। ঢাকায় বৈশাখী মেলার আর একটি বিশেষ আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটি প্রথম আয়োজিত হয় ১৯৮৯ সালে। ঢা.বির চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে থাকে।


পরিশিষ্ট ঃ পরিশেষে যে কথাটি না বললেই নয়, তা হলো- পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসব। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব। কিন্তু এ উৎসবে কোন বাড়াবাড়ি, অপ্রত্যাশিত কার্যকলাপ, অশ্লীলতা, অশালীনতা আমাদের কারোই কাম্য নয়। ইতিপূর্বে এই উৎসবে অশালীন ও অপ্রীতিকর ঘটনার নজির আছে। আমাদের সবারই দায় থাকা উচিৎ এ ব্যাপারে। সন্তানরা যেন উগ্র সাজে অশ্লীলরূপে নিজেকে প্রদর্শন না করে এবং ছেলে সন্তানরাও যেন উগ্রতা পরিহার করে শালীন থাকে। মুসলিম হিসেবে লাগামছাড়া, উল্লাসসর্বস্ব যে কোন ধরনের সমাবেশ এড়িয়ে চলাই ভালো।

 যে কোন ধর্মের মানুষই উগ্রতা ও অশালীনতা অপছন্দ করেন। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির যা কিছু সত্য, সুন্দর, শুভ ও শুচি তা টিকে থাকুক অনন্তকাল সাম্যের সাথে, মননের সাথে। উদ্ভট উচ্ছৃঙ্খলভাবে নয় বরং সহনীয় বরণীয়ভাবে সকল উৎসবে উচ্চারিত হোক মানব আর মানবতার জয়গান। আসুন এ দিবসকে কেন্দ্র করে অহেতুক অতিরঞ্জন, উগ্রতা বর্জন করে শালীনতা বজায় রেখে কল্যাণের কাজ যেমন, গরীবদের খাদ্য বিতরণ, গঠনমূলক আলোচনা সভা ও সকল স্তরের মানুষের সাথে মানব কল্যাণ নিয়ে মত বিনিময় করে দেশ ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
বাংলা মোদের মা
মোরা বাংলার অন্তপ্রাণ
চলো বাংলায় মিলেমিশে
সবাই বাংলায় গাই গান।
লেখক ঃ শিক্ষক, কবি ও কলামিস্ট
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top