দুপুর ১২:০৯, বৃহস্পতিবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / পহেলা বৈশাখ : আমাদের জাগরণের দিন
পহেলা বৈশাখ : আমাদের জাগরণের দিন
এপ্রিল ১২, ২০১৭

ইসলাম রফিক : মেলা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সময়ের বিবর্তনে ইদানিং বেশ বিস্তৃত হয়েছে মেলার পরিধি। মেলা এক সময় গ্রামকেন্দ্রিক থাকলেও গ্রাম ছাড়িয়ে মেলা এখন শহরেও স্থান করে নিয়েছে। মেলার ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। প্রায় দু’হাজার বছর কিংবা তারো বেশি সময়ের। প্রাচীন এসব মেলায় বিনোদনের কোন ব্যবস্থা ছিলো না। হিমালয়ের কোল ঘেঁসে হরিদ্বার, হিন্দুদের  মস্তবড় তীর্থস্থান। এই তীর্থস্থানকে ঘিরেও মেলা বসতো। সম্ভবতঃ এই মেলাটি সবচেয়ে পুরনো। বৈশাখী মেলা অন্যান্য মেলার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।


 বাংলা নববর্ষকে ঘিরে এর আয়োজন বলেই হয়তো সবার কাছে এর আবেদন অনেক বেশি। বৈশাখী মেলা সাধারণত একদিন, তিনদিন কিংবা পাঁচ দিন ধরে চলে। একদিনের জন্য যে মেলা বসে তাকে বলা হয় ’বান্নি’ মেলা। ’বান’ শব্দ থেকেই সম্ভবত বান্নি উৎপত্তি। যেহেতু চতুর্দিক থেকে বানের মতোই মানুষ আসে। অন্যদিকে ’ম্যালা’ মানুষের সমাগমজনিত কারণেই খুব সম্ভব মেলা শব্দের উৎপত্তি।

 

বর্তমানে বৈশাখী মেলা একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে সারাদেশে। এটি কোন ধর্মীয় ঐতিহ্য, কিংবদন্তী কিংবা বিভিন্ন পালা-পার্বন নির্ভর অনুষ্ঠান নয়। সে কারণেই সমস্ত বাংলা ও বাঙালির লোকায়ত সংস্কৃতির অভিন্ন পলিমাটির সমন্বয়েই এটি গড়ে উঠেছে। পহেলা বৈশাখের জন্য থাকে সবার আলাদা প্রস্তুতি। আয়োজনকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে সাধ্যানুযায়ী সবাই চেষ্টা করে। সরকারি নববর্ষ-ভাতা আয়োজনকে গত বছর থেকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।


 বিভিন্ন সংগঠন বিশেষ করে সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের থাকে আলাদা প্রস্তুতি। তাদেরকে বর্ষবরণের জন্য অনেক পয়সা খরচ করে, কঠোর পরিশ্রম করে প্রস্তুতি নিতে হয়। আর সফলতা আসে যখন পহেলা বৈশাখে রং বেরংয়ের র‌্যালিতে ঢেকে যায় সারা শহর, বন্দর। মানুষ আর মানুষে মিশে এক হয়ে যায়। যেখানে থাকে না কোন শ্রেণিভেদ, ধর্মীয় চেতনা কিংবা রাজনীতির নোংরা খেলা। এককাতারে সবাই। মানুষ। এদেশের মানুষ যে কয়টি উৎসবকে নিজেদের করতে পেরেছে তার মধ্যে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন একটি।


পহেলা বৈশাখ আসে আর যায়, আমরা সেখান থেকে কী শিখি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আজ এখানেই। পহেলা বৈশাখ আমাদের জাগ্রত হওয়ার দিন, হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ঐতিহ্যকে খুঁজে বাঙালি চেতনায় উদ্ভাসিত হওয়ার দিন। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসকে বিনির্মাণ করার দিন। ধীরে ধীরে আমরা একা হয়ে যাচ্ছি। সমাজ থেকে, সামাজিকতা থেকে, পরিবার থেকে এমনকি নিজের কাছ থেকেও। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে আজ ঢুকে পড়েছে অপসংস্কৃতি, অপরাজনীতি, দুর্নীতি এবং অবক্ষয়। এই একাকিত্ব কিংবা অবক্ষয়ের কারণ কী? কারণ সামাজিক বন্ধন ছিঁড়ে যাচ্ছে, সামাজিক কালচার থেকে আমরা সরে যাচ্ছি।

 

এখন সামাজিক অনুষ্ঠানের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় যে গানের আসর বসত, যেখানে পাড়ার ছেলে-মেয়ে আবাল বৃদ্ধবণিতারা একসাথে সুরে-সুরে মিলিয়ে গান গাইত, যাতে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তে ঢোল, তবলা হতো পাতিল কিং বদনা, সে সব অনুষ্ঠান আর হয় না। গ্রামে গ্রামে রাত জেগে গ্রামের মানুষেরা যে সংস্কৃতি উপভোগ করতো, সেগুলো কোথায়? গ্রামের সেই সব বয়াতিরা কই, যারা রাত জেগে আমাদের গান শোনাতো। পুঁথিপাঠ, লছিমন পালা, ইউসুফ জুলেখার কিংবা বিষাদ সিন্ধু’র কথকরা আজ আর নেই। যাত্রাপালা আছে, কিন্তু পালা নাই, আছে শাবল।


 গ্রামের মানুষেরা রাত জেগে যাত্রা দেখে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরতো। কিন্তু তার পরিবর্তে যাত্রাপালায় এসেছে অশ্লীল-উলঙ্গ-নৃত্য যার নতুন নাম শাবল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যাত্রাপালায় সারারাত জেগেও কোন অভিনয় দেখতে পারিনি। তবু রাষ্ট্র যাত্রার অনুমতি দেয়, তবু রাষ্ট্র এগিয়ে চলে। হারিয়ে যেতে বসেছে বিয়ের গীত। বর-কনেকে নিয়ে রসাত্মক সেইসব গীত আমাদের মায়েরা, বোনেরা নেচে-নেচে পরিবেশন করতো।

 

এখন বিয়ে হয় কমিউনিটি সেন্টারে, গীতের সময় কই, জায়গা কই? আমাদের এইসব হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে রক্ষা করার শপথ শেখায় পহেলা বৈশাখ। ঢোল, তবলা, বাঁশি, আমের আঁটির বাঁশি আর বাজে না। আমাদের চলাফেরায় এসেছে নতুনত্ব, খাবারে এসেছে নতুনত্ব, সংস্কৃতিতে এসেছে নতুনত্ব।

আমাদের হাজার বছরের শিকড় আজ ডুবতে বসেছে। সেই শিক্ষাই পহেলা বৈশাখের শিক্ষা। সমাজ থেকে শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। বড়দের শ্রদ্ধা করতে হয়Ñ এই চিরায়ত সংস্কৃতি আমরা ভুলে যেতে বসেছি। অল্প-বয়সী একজন ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকে। একবার চিন্তাও করে না তার প্রতিবেশী কিংবা চেনাজানা বড় ভাইদের কথা, নিদেনপক্ষে বাবা-মায়ের কথা, যে কোন সময় দেখে ফেলতে পারে তারা।

 

এটা কী সংস্কৃতি? আমাদের ভাবতে হবে।  এদেশের সংস্কৃতিকে জাগ্রত করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে হবে, তাকে সংরক্ষণ করতে হবে। অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন নামে, বেনামে সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটাচ্ছে সেইসব সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে সতর্ক থাকতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।


বৈশাখ মাস আসলেই কুমারদের কদর বেড়ে যায়। বৈশাখী মেলায় তাদের নিয়ে আসতে চলে প্রতিযোগিতা। কিন্তু আমরা এই শিক্ষিত মানুষেরা মাটির পাতিলে ভাত খাই না, মাটির কলসের পানি খাই না। আমাদের এই স¦-বিরোধী আচরণ বদলাতে হবে। পহেলা বৈশাখের দিন অনেকেই বাঙালি সাজতে পান্তা খাই মরিচ, আলুভর্তা কিংবা ইলিশ মাছ দিয়ে। কিন্তু আমাদের গ্রামের সেইসব মানুষেরাÑ যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাখছেন। মরিচ, আলুভর্তা, পান্তাভাত, কড়কড়া, হাতরুটি, মুড়ি, চিড়া-গুড়, পাটশাক কিংবা আঁটেকলা তাদের নিত্যদিনের খাবার। বৈশাখ মাসের অন্যতম একটি বিষয় হলো হালখাতা। ব্যবসায়ীদের বাকী খাতা হালনাগাদ করার মাস।

 এখন হালখাতাতেও পরিবর্তন এসেছে। খেয়ে যায় কিন্তু পুরনো খাতা পুরানোই থাকে, নতুন খাতা হয় না । তাছাড়া খাবারের মেনুতেও এসেছে পরিবর্তন। এগুলো সব অবক্ষয়ের লক্ষণ। অপসংস্কৃতির আর একটি বড় জায়গা হয়ে উঠেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। ডিশের কল্যাণে আমাদের সন্তানেরা যতটুকু ভালো শিখছে, তার চেয়ে বেশি শিখছে মন্দটা। বাংলা চ্যানেলে আমাদের ছেলেমেয়েদের হাত চলে না, চলে অন্য চ্যানেলে চ্যানেলে। শিশুদের মধ্যে অপ-সংস্কৃতি ঢুকে যাচ্ছে। একে রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। আমাদের এবারের পহেলা বৈশাখের শিক্ষা হোক অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করবার। তবেই পহেলা বৈশাখের সব আনুষ্ঠানিকতা পাবে পূর্ণতা।

লেখক ঃ কবি, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক
সভাপতি, বগুড়া লেখক চক্র
kobiislamrafiq@gmail.com
০১৭১২-৬২৬৪২৬



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top