রাত ১০:০৪, বৃহস্পতিবার, ২৯শে জুন, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / পরীর দেশে
পরীর দেশে
মার্চ ১০, ২০১৭

মোস্তফা কামাল গাজী: আফনান আজ খুব খুশি। শীতকালীন ছুটি হয়েছে। দীর্ঘ পনেরো দিন স্কুল বন্ধ। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে ও। মা বলেছেন, আজকে ওরা সবাই নানুবাড়ি যাবে। ছুটি পেয়ে আনন্দে একরকম লাফাতে লাফাতে বাড়ি পৌঁছুলো।  মায়ের গলায় ঝুলে জিজ্ঞেস করলো, ‘আম্মু, আমরা কখন নানু বাড়ি যাচ্ছি?’
‘এইতো বাবা! বিকেলেই রওনা হবো। তুমি গোসল করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।’ আফনান দৌঁড়ে যায় দাদুর কাছে।
‘দাদু, আমরা নানুবাড়ি যাচ্ছি। তুমি যাবে না আমাদের সাথে?’

 
‘না দাদুভাই, আমি যেতে পারছি না। হাঁটুতে ব্যথা। ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। তোমরাই যাও।’ আফনান কিছু না বলে গোসল করতে চলে গেলো।
বিকেলে রওনা হলো ওরা। বাগেরহাট জেলায় আফনানদের নানাবাড়ি। এবার শীতে সব খালা আর মামারা আসছেন। সাথে যাচ্ছেন আব্বু-আম্মু আর আপু। খুব খুশি লাগছে ওর। দীর্ঘদিন পর নানা-নানীর সাথে দেখা হবে। মামাত ভাই চিন্টু ঝন্টুরা আসবে। ওদের সাথে খেলাধূলা হবে। কত্তো মজাই না হবে! এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নানুবাড়ি পৌঁছে গেলো টেরই পেলো না। নানু এসে কোলে তুলে চুমু দিলেন গালে। কেউ চুমু দিলে আফনানের বিরক্ত লাগে। একদলা থুথু দিয়ে গাল ভরে যায়। ঘিন ঘিন লাগে। অন্যকেউ চুমু দিলে চিৎকার চেঁচামেঁচি শুরু করে দিতো। নানু বলে কিছু বললো না।

একহাত দিয়ে শুধু মুছে নিলো গালটা। চিন্টু ঝন্টু আগেই চলে এসেছিলো। ওদের সাথে হৈ হুল্লোড় করেই কাটছে সময়। সন্ধ্যায় নানু পিঠা বানালেন খেজুর রস দিয়ে। সে কী মজা খেজুর রসে! টাটকা রস না খেলে আসল মজাটা পাওয়া যাবে না। পারুলদের ডোবার পাশে একটা খেজুর গাছ আছে। কাল আসার পথে দেখেছিলো। তাতে একটা রসের হাঁড়িও ঝুলছিলো। মনে মনে ঠিক করলো কাল সকালে রস খাওয়ার অভিযানে নামতে হবে। কাউকে জানালো না এ কথা। চিন্টু ঝন্টুকেও না। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে পড়লো রস খাওয়ার জন্যে। খুব শীত পড়েছে আজ। হুহু করে শীতল বাতাস বইছে। ঠা ায় শরীর জমে যায় যায় অবস্থা। গছের কাছে গিয়ে দেখে গাছে হাঁড়িটা নেই। নিশ্চয় করিম নানা এতোক্ষণে নিয়ে গেছেন ওটা। মনটা খারাপ হয়ে গেলো ওর। তখন দেখলো, গাছের মাথায় লাগানো বাঁশের চোঙ দিয়ে টপটপ করে রস ঝরে পড়ছে এখনো। হাঁড়ির রস খেতে না পারলে কী হবে? ঝরে পড়া রস তো খেতে পারে!

 জিহ্বা দিয়ে রস ছোঁয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো। খেজুর গাছটা ডোবার দিকে খানিকটা বাঁকানো। রসের ফোঁটা মৃদু বাতাসে এদিক ওদিক করছিলো। রসের সাথে মুখটাও এদিক ওদিক করতে গিয়ে ঝুপ করে ডোবার জলে পড়ে গেলো আফনান। পঁচা, নোংরা পানি। তার ওপর তীব্র শীত। বাড়িতে গেলে আম্মুর বকুনি আর পিটুনি তো আছেই। সব মিলিয়ে করুণ এক অবস্থা। শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি এলো। ভয়ে কাঁচুমাচু করছে। ওর এ অবস্থা দেখে তো চোখ ছানাবড়া মায়ের। আচ্ছামতো কয়েক ঘা লাগিয়ে দিলেন। রান্নাঘর থেকে নানু এসে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলেন। না হলে হয়তো আরো খেতে হতো। সারাদিন গোমরা মুখে বসে রইলো। কারো সাথে কোনো কথা বললো না।
নানুবাড়ির পাশে একটা বড় মাঠ। বিকেলে ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করে এখানে।

মাঠ পেরুলেই একটা জঙ্গল। সেখানে আছে  বিরাট এক আমগাছ। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের দিকটায় গেলো গেলো ও। আমগাছে লটকানো একটা দোলনায় বসে রইলো। আশেপাশে কেউ নেই। অন্যসময় বড় মাঠটায় ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করতো। আজ সব কেমন ফাঁকা। সকালের ঘটনায় মনটা এখনো ওর খারাপ। মা শুধু শুধুই মারলো। শীতে এ অবস্থা দেখে কোথায় আদর করে ওকে পরিষ্কার করে দেবে, তা না করে অকারণে মারলো। আর কক্ষনও কথা বলবো না মায়ের সাথে। মনে মনে এসব ভাবতে থাকলো। হঠাৎ কোত্থেকে যেনো একটা মেয়ের মিষ্টি হাসি ভেসে এলো কানে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখলো না।


‘আমি তোমার পেছনে।’ কে যেনো বললো হঠাৎ। পেছন ফিরে দেখে একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে দুটো ডানা। হাতে যাদুর লাঠির মতো কিছু একটা। মিটমিট হাসছে মেয়েটা। আফনান জিগ্গেস করলো, ‘কে তুমি?’
‘আমি পরী। দূর দেশে থাকি। আমার নাম সাবিহা। তুমি এখানে এমন গোমরা মুখে বসে আছো কেনো?’
বিস্ময় ধরে রাখতে পারছে না আফনান। একটা পরী ওর সাথে কথা বলছে! বইতে পরীর গল্প পড়েছে। আজ প্রথম পরী দেখলো।
আফনান বললো, ‘আম্মু আজ আমাকে খুব মেরেছে, বকেছে। তাই মন খারাপ।’
কথায় কথায় সাবিহার সাথে খুব ভাব হয়ে গেলো আফনানের।
আফনান বললো, ‘আমি শুনেছি, তোমাদের দেশ অনেক সুন্দর।’
‘ওমা, তুমি আমাদের দেশের কথা কার কাছ থেকে শুনলে?’
   ‘নানু বলেছেন’
‘ঠিক বলেছেন উনি। আমাদের দেশ খুব সুন্দর। ফুল আর পাখিদের মেলা বসে সেখানে। প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়ে। ঝর্ণা আছে, মেঘের ভেলা আছে। আমরা মেঘের ভেলায় চড়ে খেলাধূলা করি। তুমি যাবে আমাদের দেশে? আব্বু-আম্মু তোমাকে পয়ে খুব খুশি হবেন।’আফনান খানিকটা ভেবে বললো, ‘যাবো। আম্মু আমাকে শুধু মারে আর বকা দেয়। তাই চলে যাওয়াই ভালো। আমাকে নিয়ে চলো তোমাদের রাজ্যে। আর আসবো কখনো ফিরে।”তাহলে চোখ বন্ধ করে আমার হাত ধরো। যতোক্ষণ না বলবো চোখ খুলবে না।’ আফনান তাই করলো। ওর মনে হলো বাতাসের ওপর উড়ছে। একটু পর সাবিহা বললো, ‘এবার চোখ খুলো।’


চোখ খুলে চোখের সামনে শুধু বিস্ময় দেখতে পেলো আফনান। কতোই না সুন্দর পরীর দেশ! চারদিকে ফুলের বাগান। ফুলে ফুলে উড়ছে প্রজাপতিরা। গাছগুলো জ্বলছে। যেনো ওতে বাতি লাগানো রয়েছে। মাথার ওপর ভাসছে মেঘেরা। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে একটা ঘরের সামনে এসে থামলো ওরা। সাবিহা বললো, ‘এটাই আমাদের বাড়ি।’ আফনান মনে মনে ভাবলো, এটা আবার কেমন বাড়ি! ব্যাঙের ছাতার মতো ওপরটা। চারপাশে সোনালী পাথর দিয়ে ঘেরা। ঢুকার জন্য বিচিত্র একটা দরোজা। দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত একটা আওয়াজ দিলো সাবিহা।

সাথে সাথে দরজা খুলে গেলো। ঘরে গিয়ে দেখা হলো সাবিহার আব্বু-আম্মুর সাথে। ওকে খুব আদর করলেন তারা। বললেন, ‘বাবা, তুমি এখানেই থাকবে আমাদের সাথে, কেমন?’ একদিকে মাথা কাত করে আফনান বললো, ‘আচ্ছা।’ নাম না জানা অনেক রকমের খাবার খাওয়ালেন তারা। এরপর খেলতে বের হলো ওরা। অনেকক্ষণ পাখি আর প্রজাপতিদের সাথে আনন্দে মেতে ছিলো। মেঘের ভেলায় চড়লো। সন্ধ্যা নামতেই আম্মুর কথা মনে হতে লাগলো আফনানের। মা নিশ্চয় এতোক্ষণ ওকে না পেয়ে চিন্তা করছেন,কান্নাকাটি করছেন। মূহুর্তেই মন খারাপ হয়ে গেলো ওর। কান্নাও পাচ্ছে। মায়ের কোলে ফিরার জন্যে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠলো। সাবিহাকে বললো, ‘আমাকে আম্মুর কাছে দিয়ে এসো। আমি আর থাকতে চাই না এখানে।’
‘সে কী! তুমি না বলেছিলে এখানে থেকে যাবে? আর কখনো যাবে না।’
আফনান কেঁদেই দিলো। বললো, ‘আমি থাকতে চাই না। আমাকে মায়ের কাছে দিয়ে এসো…..।’
‘এই আফনান, ঘুমের ভেতর কাঁদছো কেনো তুমি? কী হয়েছে বাবা?’
মায়ের ডাকে জেগে উঠলো ও। এতোক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিলো। উঠে মা’কে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, ‘উঁ উঁ মা,  তোমাকে খুউব ভালোবাসি। আর কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না।’
মা ওকে পরম আদরে জড়িয়ে নিলেন।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top