সকাল ৯:৪৩, বুধবার, ২৮শে জুন, ২০১৭ ইং
/ স্বাস্থ্য / পরিশ্রমজনিত শ্বাসকষ্ট
পরিশ্রমজনিত শ্বাসকষ্ট
এপ্রিল ২২, ২০১৭

অধ্যাপক ডা: ইকবাল হাসান মাহমুদ : পরিশ্রমজনিত শ্বাসকষ্ট শতকরা ১২ থেকে ১৫ ভাগ মানুষকে আক্রান্ত করে চলেছে। এর লক্ষণের মধ্যে রয়েছে বুকের মাঝে আড়ষ্টভাব, ছোট করে শ্বাস নেয়া, শ্বাসের সাথে সাঁ সাঁ শব্দ হওয়া ক্লান্তি এবং ব্যায়ামের পর সুস্থ হতে অনেক লম্বা সময় লাগা। রোগ নির্ণয় নির্ভর করে প্রকৃত ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা পরীক্ষার উপর। রোগীকে ব্যাপক স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়া এ রোগের চিকিৎসায় খুবই প্রয়োজনীয় দিক। স্বল্পমেয়াদী বিটা-২ এগোনিস্ট ইনহেলারের মাধ্যমে আমরা সাধারণত চিকিৎসা করে থাকি।


 প্রদাহ রিরোধী ঔষধ যেমন ক্রোমলিন সোডিয়াম, নেডোক্রোমিল সোডিয়াম এবং স্টেরয়েড ইনহেলার এ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় রোগের অন্তর্নিহিত সমস্যা দূর করার জন্য। যদিও আমরা মুখে সেব্য থিওফাইলিন অথবা সালবুটামিল জাতীয় ঔষধ প্রয়োগ করি তবুও তার ভূমিকা পরিষ্কার নয়। যদি এ রোগ নির্ণিত না হয়ে থাকে তখন এ ব্যায়ামজনিত হাঁপানি, যা কিনা খুবই প্রচলিত। তাতে দেখা যায়, শ্বাসনালীতে সাময়িক বাধা যেটা সচল জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করে। কারণ কয়েক মিনিট ব্যায়ামের পরেই শুরু হয়ে যায় শ্বাসকষ্ট।

 

 কিন্তু যখন রোগটিকে চিহ্নিত করা হয় এবং ভালোমত চিকিৎসা করা হয় তখন চিকিৎসার সুফলে রোগীর জীবনযাত্রার ব্যাপক স্বাচ্ছন্দ্য ঘটে। ১৯৮৪ সালের আমেরিকান অলিম্পিকের দলে ৫৯৭ জনের মধ্যে ৬৭ জনেরই (১১.২%) ব্যায়ামজনিত হাঁপানি ছিল। অথচ খেলোয়াড়দের মধ্যে ৪১ জনই সেই খেলায় পদক জয় করেছিল এই হাঁপানি নিয়েই। তাদের ব্যাপক সাফল্য সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, সুষ্ঠুভাবে এবং পরিকল্পনামাফিক চিকিৎসা নিয়ে একজন হাঁপানি রোগীও পারে অলিম্পিক সোনা জয় করতে।


এখন প্রশ্ন আসে পরিশ্রমজনিত শ্বাসকষ্ট কতটুকু প্রচলিত? এ রোগে জনসমষ্টির একটি বড় অংশ আক্রান্ত হয়। যাদের হাঁপানি আক্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ রোগী তাদের রোগাক্রান্ত জীবনে এটার মুখোমুখি হয়েছে এবং অনেক হাঁপানি রোগীই ধারণা করেন যে, পরিশ্রমই তাদের হাঁপানি আক্রমণের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।


এ ছাড়া শতকারা ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ রোগী যাদের এ্যালার্জিজনিত নাকের প্রদাহ রয়েছে তারা এ সমস্যায় আক্রান্ত হয়। কিছু এ্যালার্জেন, ভাইরাস, ঠান্ডা বাতাস, বায়ু দূষণ অথবা এ সবগুলো একসাথে মিলে এটা ঘটাতে পারে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝে যারা হাঁপানি রোগী হিসেবে নির্ণিত হয়নি এবং যাদের কোনো এ্যালার্জিজনিত শ্বাসরোগ নেই তাদের মাঝে ব্যায়ামজনিত হাঁপানির সংখ্যা খুব কম। যেমন : মাত্র ৩% থেকে ১০%। মানুষের কর্মক্ষম সময়ের জীবনে এ রোগের হার শতকরা ৩ থেকে ১২ ভাগ উঠানামা করে।

 হাঁপানি একটি শ্বাসতন্ত্রের বাধাজনিত রোগ যেখানে শ্বাসনালীতে প্রদাহ এবং প্রচন্ড সংবেদনশীলতা থাকে। শ্বাসনালীতে বাধা প্রভাবিত হয় শ্বাসনালীর দেয়াল ফুলে, মোটা হয়ে গেলে, আঁঠালো মিউকাস তৈরি হতে থাকলে, শ্বাসনালীর নরম মাংসের খিচুনি হলে, বাধাটি শুরু হতে পারে। প্রদাহজনিত ঘটনা শ্বাসনালীতে ঘটলে বিশেষত প্রদাহের মাধ্যমে বা মিডিয়েটরস মাস্ট সেল, মেক্রোফেজ এবং ইপিথেলিয়াল কোষ থেকে নিঃসরিত হলে। শ্বাসনালীর অতি সংবেদনশীলতা হলো বিভিন্ন ধরনের এ্যালার্জেন, পরিবেশ উত্ত্যক্তকারী বস্তু, শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস সংক্রমণ, ঠান্ডা বাতাস এবং ব্যায়ামের কারণে।


শ্বাসতন্ত্রের বাধা যদি ব্যায়ামের জন্য হয়ে থাকে তখনই তাকে ব্যায়ামজনিত হাঁপানি বলে। এ ধরনের হাঁপানির কারণ বহুবিধ। যদিও এর কারণ অনেকগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে তবুও এ রোগের ব্যাপারে পুরোপুরি ধারণা হয় যে, শ্বাসনালীর বাধা যা কিনা পরিশ্রমজনিত শ্বাসকষ্টে তৈরি হয় তার সম্পর্ক রয়েছে তাপমাত্রার উঠানামার উপর।

 

পরিশ্রম বা পরিশ্রমের পর অতিমাত্রায় শ্বাস গ্রহণের ফলে শ্বাসনালীর উপরের অংশ কিছুটা অক্ষম হয়ে পড়ে শ্বাস নেয়া বাতাসকে শরীরের তাপমাত্রার সঙ্গে সমান করতে এবং ১০০% আর্দ্রতা প্রদান করতে। তাপ এবং পানিকে টেনে নেয়া হয় শ্বাসনালীর কোষগুলো থেকে যাতে করে শ্বাস নেয়া বাতাসকে গরম এবং আর্দ্র রাখা যায়। তার ফলে শ্বাসতন্ত্রের কোষগুলোতে পানির ঘাটতি থাকে এবং শ্বাসনালী ঠান্ডা থাকে।


এ রোগের চিকিৎসার লক্ষ্য হলো একজন রোগীকে পরিশ্রমকালীন অবস্থায় সম্পূর্ণ শ্বাসকষ্ট মুক্ত রাখা। চিকিৎসা শুরু করতে হয় এমন ধারায়, যাতে করে শারীরিক অবস্থানকে ঔষধের প্রতি বেশি নির্ভর না করেও হাঁপানি আক্রমণের হারকে কমানো যায়। উষ্ণ, আর্দ্র পরিবেশ অর্থাৎ উষ্ণ এবং আর্দ্র হাওয়ায় শ্বাসগ্রহণ ব্যায়ামজনিত হাঁপানির চিকিৎসা উন্নতি সাধন করে এবং রোগীর ভালো হওয়ার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে। ব্যায়ামের সময় একটি ফেস মাস্ক ব্যবহার করলে শ্বাসের সময় নেয়া বাতাস উষ্ণ এবং আর্দ্র থাকে বিশেষত যখন ব্যায়ামের সময় বাইরের অবস্থান ঠান্ডা এবং শুকনো থাকে।


 মুখ দিয়ে শ্বাস না নিয়ে বরং নাক দিয়ে শ্বাস নিলে বাতাস উষ্ণ এবং আর্দ্র থাকবে। ওষুধ ব্যবহার করে চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো হাঁপানির শুরুটাকে বাধা দেয়া এবং ব্যায়ামের পর যাতে শ্বাসকষ্ট শুরু না হয়। বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আছে যেগুলো দিয়ে শ্বাসনালীকে প্রসারিত করাএবং প্রদাহ বিরোধী কাজ সম্পন্ন করা যায়। ওষুধগুলোর মধ্যে আছে বিটা এগোনিস্ট, ক্রোমনিল, সোডিয়াম, নেডোক্রমিল সোডিয়াম এবং স্টেরয়েড, যেগুলোর ইনহেলারের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয় এবং এ ছাড়া রয়েছে মুখে সেব্য থিওফাইলিন।

 

বিটা এগোনিস্ট ওষুধের মধ্যে রয়েছে সালবুটামল টারবুটালিন সালফেট এবং সালমেটেরল। যাই হোক, স্বল্পমেয়াদী বিটাএগোনিস্ট ওষুধই হলো পরিশ্রমজনিত হাঁপানি প্রতিরোধে কার্যকর ওষুধ, যা কিনা ৮০% থেকে ৯৫% রোগীর বেলায় কার্যকর। এই ওষুধটি ইনহেলারের মাধ্যমে ব্যায়ামের ১৫ মিনিট পূর্বে নিতে হয়। এই ওষুধটির কর্মক্ষমতা তিন থেকে ছয় ঘন্টা থকে।


 এর মধ্যে ব্যায়ামের সময় যদি হাঁপানির লক্ষণ দেখা দেয় তবে অতিরিক্ত দুই পাফ নেয়া যাবে। ক্রোমলিন এ রোগের চিকিৎসায় খুবই কার্যকর যদিও পরিশ্রমের ১০ থেকে ৪৫ মিনিট পূর্বে ইনহেলারের সাথে নেয়া হয়। নেডোক্রোমিল সোডিয়াম একটি প্রদাহ বিরোধী ইনহেলার যা কিনা এখন ব্যাপকভাবে এ রোগে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

এর কার্যকারিতা ক্রোমলিনের মতোই এবং ব্যায়ামের পূর্বে গ্রহণ করতে হয় এটা খুবই কার্যকর সেসব রোগীর সাথে যাদের পালামোনারি ফাংশন পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকে। নেডোক্রোমিল এবং বিটা এগোনিস্ট এক সাথে প্রয়োগ করলে খুবই ভালো ফল পাওয়া যায়। স্টেরয়েড ইনহেলার হাঁপানির লক্ষণকে যথেষ্ট কমায় প্রদাহ বিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে।

 

 যদিও এর তাৎক্ষণিক শ্বাসনালী প্রসারক কাজ নেই এবং ব্যায়ামের পূর্বে শুধু এটা একা গ্রহণ করে তেমন কোনো কাজ পাওয়া যাবে না। এটাকে বরং সবসময়ের জন্য ব্যবহার চালিয়ে যেতে হবে হাঁপানি দমনের জন্য। মুখে সেব্য থিওফাইলিন কয়েক যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটার কিছু পার্শ¦ প্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও এটি একটি কার্যকর ওষুধ।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top