ভোর ৫:২৩, শুক্রবার, ১৭ই আগস্ট, ২০১৭ ইং
/ জাতীয় / পথশিশুরা আর অবহেলিত নয়, গড়ে উঠছে সমতায়
পথশিশুরা আর অবহেলিত নয়, গড়ে উঠছে সমতায়
মার্চ ১৫, ২০১৭

বাসস : রবিন মিয়া (৭), রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ক্ষুদে সবজি তোলা শ্রমিক। প্রথম শ্রেণীতে পড়া এ শিশু পুলিশ অফিসার হয়ে যারা অসামাজিক কার্যকলাপ এবং শিশুদের মারধর করে তাদের শাস্তি দিতে চায়।

পথশিশু দিনমজুর শিমুল মিয়া (১০), প্রথম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। শিমুলও বড় হয়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে জজ হতে চায়।
বারো বছরের কামাল, ২০১৬ সাল থেকে সে এই শেল্টার হোমে রয়েছে। প্রথম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত কামাল ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে বলে, ‘এখানে এসে অনেক কিছু শিখেছি। শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারি। আদব কায়দা শিখেছি। শিক্ষা-চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ লাভ করছি।’

ওদের মতো আরও শত শত শিশুর মাঝে স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছে বর্তমান সরকারের পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম। পথশিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচির অধীনে গত এক বছরে রাজধানীর দু’টি শেল্টার হোমে প্রায় ৯শ’ শিশু আশ্রয় বা আতিথ্য গ্রহণ করেছে। এখানে শুধু খাবার পরিবেশনই নয়, সমাজে চলার জন্য যে আচার-আচরণ বা নিয়ম-শৃঙ্খলা দরকার তাও তারা রপ্ত করতে শিখছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এমনকি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কেও এসব শিশুদের শিক্ষা দেয়া হয়। এখানে আশ্রয় পাওয়া সব শিশুই জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারে।

‘দেশের কোনো শিশুকে রাস্তায় থাকতে হবে না’-প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পথশিশু পূণর্বাসন প্রায় ১ বছর হলো পথশিশু পূনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এনজিও পার্টনার অপরাজেয় বাংলাদেশ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কমলাপুরে দু’টি শেল্টার হোমে শিশুদের থাকা-খাওয়া, বিনোদন ও শিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এই পথশিশুদের জš§নিবন্ধন ও বায়োমেট্রিক পদ্ধতির আওতায় নাগরিক পরিচয় সুনিশ্চিত করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।  

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে থাকা শেল্টার হোমটিতে সম্প্রতি গিয়ে দেখা গেলো শিশুদের কেউ লেখাপড়ায় ব্যস্ত, কেউবা খেলাধুলায় মত্ত। পূর্ব তেজতুরি বাজারের এ হোমটিতে থাকা ১৫ জন শিশু পাশ্ববর্তী ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ম ও ২য় শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়েসি এমন ১২ জন শিশু দিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া করে এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা রাতে কাজ করে ।

পথশিশুদের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে গৃহীত পূনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে আশাবাদী মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাজধানীতে প্রকল্পটি সফল হলে দেশের বিভিন্নস্থানে এ ধরণের আরো শেল্টার হোম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

পথশিশু পূণর্বাসন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালক ড. আবুল হোসেন জানান, সমাজের মূল ধারায় পথশিশুদের সম্পৃক্ত করতে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে পথশিশু পূণর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। রাজধানীর কমলাপুর ও কারওয়ান বাজারে পথশিশুদের জন্য দু’টি শেল্টার হোম গড়ে তোলা হয়েছে। আশ্রয় পাওয়া শিশুদের পুষ্টির জন্য সুষম খাবার পরিবেশন করা হয়। বিনোদনের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, এখানে আশ্রয় পাওয়া শিশুদের মধ্যে যারা লেখাপড়ায় উৎসাহী তাদেরকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। আর যারা পড়ালেখায় অনিচ্ছুক তাদেরকে ভোকেশনাল বা কারিগরী শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলে সে শিক্ষা দেয়া হয়। গত এক বছরে কমলাপুরে ৬৬৯ জন এবং কারওয়ান বাজার শেল্টার হোমে ২১৭ জন সরকারের এ সেবা গ্রহণ করেছে।  
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়,কমলাপুরে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন, আর কারওয়ান বাজারের শেল্টার হোমে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিশু আশ্রয় পায়। এদের অনেকে তাদের জন্য বরাদ্দ এ সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়মিত থাকে। আবার অনেকে রাত্রিযাপন করে বা দু’একদিন থেকে চলে যায়। তাদেরকে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে কাপড়-চোপড় দেয়া হয়। লেখাপড়া করার তাগিদ দিয়ে বিদ্যালয়মুখী করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও উৎসাহী করা হয়। শেল্টার হোমগুলোতে ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ বিশেষ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল খেলার মাঠে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে পথশিশুদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হয়।

তেজগাঁও শেল্টার হোমের (আবাসিক) সমাজকর্মী ফুয়াদ বাবু বলেন,শেল্টার হোমে নিয়মিত রাত্রিযাপন করে ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু। তাদের বয়স ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে যারা লেখাপড়া করে তারা স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে টেলিভিশন দেখে ,কম্পিউটারে গেমস খেলে। এছাড়া এসব শিশুদের জাতীয়সংগীত গাওয়াসহ পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে উদ্যোগী করা হচ্ছে।

তিনি জানান, সরকারের এই শুভ উদ্যোগের ফলে পথশিশুদের জীবন পাল্টে যাচ্ছে। অনেক শিশু রয়েছে যারা জীবনেও বই ধরেনি। তারা এখন লেখাপড়া করছে। ওপেন এয়ার স্ট্রিট স্কুলে (ওএসএস) বেশ কিছু শিশু লেখাপড়া করে। শৃঙ্খলা বজায় ও নেতৃত্ব শেখাতে গণতন্ত্র ও মূল্যবোধ চর্চার অংশ হিসেবে শেল্টার হোমের শিশুদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচন করা হয় নির্বাচনের মাধ্যমে।   

ড. আবুল হোসেন জানান, জরিপ অনুযায়ী রাজধানীতে প্রায় তিন হাজার পথশিশু রয়েছে। এরা স্থান বদল করে একেক সময় একে জায়গায় চলে যায়। বিভিন্ন পরিবহনে করে এরা স্থানবদল করে নানা সময়ে। প্রায় সকলকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার কাজ চলছে। কোন ধরণের উৎসাহ দিলে এই পথশিশুরা শেল্টার হোমে নিয়মিত থাকবে, লেখাপড়ায় উৎসাহী হবে তাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।   

গৃহীত পদক্ষেপটি পুরোপুরি সফল হলে দেশে আর কোনো পথশিশু থাকবে না। এরাই একসময় হয়ে উঠবে মানবসম্পদ।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top