বিকাল ৪:২২, শনিবার, ২৪শে জুন, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার
নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার
মে ১০, ২০১৭

মোঃ সালাউদ্দিন: পৃথিবীতে অনেক আগে থেকেই বিচার ব্যবস্থা প্রচলিত। আমার ধারণা বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল, জালিমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করার জন্য। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) তার দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল এর মাঝে বিরোধ মিটাতে একটি বিচার এর আয়োজন করেছিলেন।

 

এছাড়াও হযরত সুলাইমান (আঃ) এর বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন গল্প আমরা শুনতে পাই, বিভিন্ন রাজ দরবার বা কাজীর অধিনেও বিভিন্ন বিচারের কাহিনী আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। অধুনা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সুলতান সুলেমানের বিচারিক কার্যক্রমের কাহিনী আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম জালিমের হাত থেকে মজলুমকে রক্ষা করার জন্যই মূলত বিচার ব্যবস্থার প্রবর্তন।


 কিন্তু হয়ত কোন কারণে সেই বিচার ব্যবস্থায় অন্যায় ঢুকে পড়েছিল। অর্থাৎ বিচারে হয়ত জালিম রক্ষা পেয়েছিল আর মজলুম দন্ডিত হয়েছিল। সেই থেকেই হয়ত বিচার শব্দটির পূর্বে ন্যায় শব্দটি যোগ করা হয়েছে। কিংবা বলা যায়, একটি ন্যায়বিচার এবং অপরটি অন্যায় বিচার। একজন বিচারক যখন বিচার করেন তার বিচারটি নির্ভর করে উপস্থিত তথ্য উপাত্য, সাক্ষী ও ব্যক্তিবর্গের কথার উপর।


 ফলে যদি জালিম শক্তিশালী হয়, তবে সেখানে ন্যায় বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পরে। কারণ বিচারক যতই সৎ থাকুক না কেন, তাকে সেই উপস্থাপিত তথ্যের উপর নির্ভর করেই রায় দিতে হবে। পক্ষান্তরে, বিচারক যদি অসৎ হন, তবে তিনি উপস্থাপিত তথ্যের মধ্যে ফাঁক খুঁজে ন্যায় বিচার বিঘিœত করতে পারেন। বর্তমানে দেখা যায় যে, অন্যায়কারীও যদি বিচারে হেরে যায়, সে বলে ন্যায়বিচার সে পায়নি, অদ্ভুত!


আবার এই বিচার ব্যবস্থা যদি ন্যায় এর উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে, তবে একটি ভাল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি বিপরীত হয় তবে সেই সমাজের ধ্বংস অনিবার্য্য। কারণ অন্যায়ের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।

 

বিচার যেন ন্যায় এর উপর ভিত্তি করে হয়, এজন্য বিচার ব্যবস্থা গ্রাম আদালত থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। এতো গেল বিচার ব্যবস্থার কথা। বিচার ব্যবস্থার বাইরেও আরো একটি ন্যায় বিচারের জায়গা রয়েছে, যেখানে একজন মানুষ নিজেকে মূল্যায়ণ করতে পারে।


মানুষ স্বভাবতই ন্যায়, অন্যায়ের মিশ্রণে তৈরী। সে নিজেই বুঝতে পারে সে যা করছে তা ন্যায় নাকি অন্যায়। এই বুঝতে পারার বিষয়টিও নির্ভর করে তার আর্থ সামাজিক বা যে পরিবেশে সে বড় হয়েছে তার উপর। যেমনঃ একজন ভুমি দস্যুর সন্তান যখন ভূমি সদ্যুতা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার কাছে এটি অন্যায় মনে হয় না। মনে হবে এটি তার কাজ। ঠিক যেমন ঘুষ দিয়ে চাকুরী নিলে মনে হবে ঘুষ খাওয়াটাও একটি কাজ। অবশ্য সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে এখন মনে হয় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ঘুষ নেয়া বা দেয়া একটি সংস্কৃতি।


 কারণ, কেউ সরকারী চাকুরী পেলেই আমরা জিজ্ঞাসা করি, কিরে কত দিলি? সে যদি বলে কিছুই লাগেনি আমরা বিস্মিত হই, এও কি সম্ভব? ঠিক তেমনি ডাকাত ডাকাতি করতে যেয়ে মানুষ হত্য করে। গাড়ি চাপায় মানুষ মারা যায়, ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বা প্রদর্শন করার জন্য মানুষ হত্যা করে, ধর্মের ঝান্ডা ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করে, কেউ কেউ মানবাধিকার রক্ষার নামে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী নিতে টাকা গুণতে হয় যাদের তাদের কাছে এগুলো অন্যায় নয়, বরং ন্যায় (তা না হলে কেউ টাকা দিত না)।

 

আবার একজন দুর্বল মানুষ পেয়ে দুথাপ্পড় মেরে দেয়া, বাজার করতে যেয়ে কিছু টাকা মেরে দেয়া, কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দেয়া, অধনস্ত্যদের নাজেহাল করা, স্বামী বা স্ত্রী কিংবা মা-বাবা, সন্তানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, গরীব অসহায় মানুষ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে সাহায্য তুলে মেরে দেয়া, এ রকম হাজারো ফিরিস্তি দেয়া সম্ভব।


তাহলে ন্যায় বিচার কি শুধুই আদালতের বিষয়! না, এটি আপনার আমার সকলের বিষয়। নিজের মনুষ্যত্ব না থাকলে ন্যায় বিচার করা যায় না, সেটা হোক ব্যক্তি জীবনে, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে। সবার আগে নৈতিকতা জাগ্রত করতে হবে।

যদি ব্যক্তির মধ্যে নৈতিকতার জন্ম হয় তবেই, সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার দূর করা সম্ভব। অন্যকে দোষারোপের মাঝে কোন কৃতিত্ব নেই, নিজের দোষগুলো ধরে সংশোধন করে আগে নিজের প্রতি ন্যায় বিচার করতে হবে, তারপর পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র। আসুন আমরা সবাই মিলে নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করি।
লেখক ঃ সংগঠক  
asharprodip@yahoo.com
www.asharprodipblog.wordpress.com
০১৭৭৯-৩৫৯৯৮৪



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top