সকাল ১০:৩৪, শনিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / নববর্ষের আহ্বান, অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান
নববর্ষের আহ্বান, অসাম্প্রদায়িক চেতনার জয়গান
এপ্রিল ১৩, ২০১৭

বীণাতন্ত্রে হানো হানো খরতর ঝংকারঝঞ্ঝনা, তোলো উচ্চসুর।
হৃদয় নির্দয়ঘাতে ঝর্ঝরিয়া ঝরিয়া পড়–ক প্রবল প্রচুর।
ধাও গান, প্রাণভরা ঝরের মতন উর্ধ্ধবেগে অনন্ত আকাশে।
উড়ে যাক, দূরে যাক বিবর্ণ বিশীর্ণ জীর্ণ পাতা বিপুল নিঃশ^াসে।


কবিগুরুর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা আজ পালন করছি বাংলা নববর্ষের প্রথম দিবস, পহেলা বৈশাখ। পুরনো দুঃখ, গ্লানি, না পাওয়ার বিষয়গুলি ভুলে নতুন স্বপ্নে নতুন আরেকটি বছরে সুস্বাগতম জানানোর দিন আজ।ইতিহাস বলে, গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে হিন্দু সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো। আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উরিষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক পূর্ব থেকেই পালিত হতো হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন।

 

বাঙালিদের সার্বজনীন লোকউৎসব হিসেবে বিবেচিত এ উপলক্ষটি একদা এমনটা ছিলোনা। যা আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তৎকালীন সময়ে এর মূল তাৎপর্য ছিলো কৃষিকাজ। ভারতবর্ষে মুঘল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলতো না । ফলে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। এমন পরিস্থিতিতে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবী হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্বতি কার্যকর হয় স¤্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ” নামে পরিচিত হয়।


বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে নতুন করে বলার কোন অবকাশ নেই। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা, রমনা বটমূলে ছায়ানটের সমবেত কন্ঠে “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো” গানে সুর মেলানোর পাশাপাশি যোগ হয়েছে আরও নতুন নতুন অনুসঙ্গ। লোকজ বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা সত্যিই শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার আদিবাসী ত্রিপুরাদের বৈসুক (বৈসু বা বাইসু), মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে “বৈসাবি” নামে উৎসবটি পালন করে। এই উৎসবের নানাদিকের মধ্যে মারমাদের পানি উৎসব অন্যতম।

 

বছরের শুরুতে নদীর জলে ফুল ভাসিয়ে ফুল বিজু উৎসব সার্বিক মঙ্গলেরই প্রতীক। আদিবাসীরা মাতৃসম ভূমিকে বন্দনা করার মাধ্যমেই জীবনের আরেকটি নতুন পঞ্জিকা শুরু করে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অতীব গর্বের। একটি দেশে এতগুলো স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতির জাতির উপস্থিতি সত্যিই অনেক বেশি প্রশংসিত করে বিশে^র বুকে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় উৎসবগুলিতে প্রণোদনা ও উৎসাহ দিলে এটি আমাদের দেশের প্রাপ্তির পাল্লা ভারী করবে এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়।
কবির ভাষায়,


এখন আমার জেগে ওঠার সময়/এখন আমার পথে নামার সময়
এখন সময় নতুন সূর্যের, পূর্বপানে চাওয়ার…।
আসলেই এখন সময় আমাদের জেগে ওঠার। বহুল আকাঙ্খিত সেই নয়া পৃথিবী গড়ার কাজে নামতে হবে এখনি। নইলে যে দেরী হয়ে যাবে।
এবারের পহেলা বৈশাখের শপথ হোক অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ার। যেখানে ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা, দল-মত নির্বিশেষে সবাই স্বপ্ন দেখবে সুন্দর পৃথিবীর। বাঙালি-অবাঙালি তথা সবাই মিলেমিশে হইহুল্লোর করে পুরনো বছরের দুঃখ ভুলে নূতন প্রত্যাশায় বছর শুরু করবে। থাকবে মতপ্রকাশের সত্যিকার স্বাধীনতা। অসাম্প্রদায়িক চৈতন্য জাগ্রত হয়ে সবাই অন্য সকল পরিচয় ভুলে মানুষ হয়ে উঠুক। নূতন বছরের আনন্দ ধনী-গরীব সবার মনকে দোলা দেবে। যে যার ধর্ম-বিশ^াস-প্রথার চর্চা করবে। সবাই বিশ^াস করবে, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”।
লেখক ঃ নারী বিষয়ক সম্পাদক,
আদিবাসী ছাত্র পরিষদ
বগুড়া জেলা শাখা।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top