সকাল ৮:৩৬, সোমবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / নদী নয় যেন মরা খাল
নদী নয় যেন মরা খাল
মার্চ ১৭, ২০১৭

আব্দুল হাই রঞ্জু :জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি, অকাল বন্যা, অসময়ে ঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গি। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর পানির নাব্যতা এখন অনেক কম। উত্তরাঞ্চলের প্রমত্তা নদী গঙ্গাঁ, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ নদ-নদীগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিশেষ করে উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় খর¯্রােতা তিস্তা এখন নামেই নদী।

তিস্তায় এখন পানি না থাকায় চোখে পড়ে শুধু ধুধু বালুচর। এক কালের প্রমত্তা তিস্তা নদীটি পানির অভাবে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। এমন এক সময় ছিল, যখন নদী পারাপারে নৌকাই ছিল মানুষের একমাত্র অবলম্বন। অনেকেই বলতেন, এক নদী মানে হাজার ক্রোশ; অর্থাৎ নৌকা ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তরই ছিল না। সে নদীতে এখন হাঁটু পানি। ফলে নৌকা ছাড়াই মানুষ নির্বিঘেœই নদী পারাপার করছে। এমনকি নদীর বুকে চাষীরা নানা জাতের ফসলের চাষাবাদও করছেন। দেখলে মনে হয়, নদী নয়, এ যেন ফসলের কোন সবুজ মাঠ।  


মূলত ভারত তিস্তার উজানে জলপাইগুঁড়ি জেলার গজল ডোবায় ব্যারেজ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী পানির অভাবে এখন মৃত্যু প্রায়। এমনকি ভারত এখন তিস্তা নদীর উজানে ব্যারেজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তায় প্রবাহিত পানি ভারতের মহানন্দা নদীতে এবং জলপাইগুড়ি জেলার দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুরের মালদহ ও কুচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে। সেখানে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটক কিংবা পরিবর্তন করার বৈধতা আন্তর্জাতিক আইনে নেই,  সেখানে ভারত সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে একতরফাভাবে তিস্তার পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহ আটকে দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য ভান্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 যা অনৈতিক এবং বাংলাদেশের মানুষের উপর এক ধরনের অবিচার। এ নিয়ে বাংলাদেশের তরফে যুগের পর যুগ ধরে পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও আশ্বাস ব্যতিত কার্যকর কোন সুযোগ মেলেনি। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, নদীর গতি, পানি ও বাতাস কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা মানে না।

প্রকারান্তরে তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার যে অধিকার, তা পাওয়া উচিৎ। আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম, হয়ত এ দফায় তিস্তার পানির চুক্তির একটি যৌক্তিক সমাধান হবে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, কথার বাইরে বাস্তবে পাওয়ার মতো সম্ভাবনা এখনও সুদুর পরাহত। আগামী এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাচ্ছেন। আশা ছিল, হয়ত এ দফায় তিস্তার একটি সমাধান হবে। কিন্তু জানা গেছে, এ দফায়ও তিস্তা চুক্তি হাওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও তিস্তা ছাড়া ভারতের সাথে প্রতিরক্ষাসহ বাংলাদেশের অনেক চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

 জানা গেছে, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি ভবনের আতিথিয়েতা গ্রহণ করেন। প্রনব মুখার্জির সহধর্মীনির জন্ম বাংলাদেশে। আমরা আশা করতেই পারি, আত্মীয়তার সুত্র ধরে হলেও রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তির একটি সুরাহায় এগিয়ে আসবেন। বাস্তব বড়ই নির্মম, হয়ত শেষ পর্যন্ত উষ্ণ আতিথিয়েতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্যে জুটবে, যা নিশ্চিত; কিন্তু পানির ন্যায্য হিস্যার অধিকার হয়ত মিলবে না। অথচ এটাই বাংলাদেশের মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য অতি আবশ্যকীয়। কথায় আছে, নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা বরাবরই নতজানু পররাষ্ট্র নীতির কারণে নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষায় তোষামোদি করে। এখন বাঁচার তাগিদেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় হিসাব নিকাশ করে আমাদের পা ফেলতে হবে।

 কারণ বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ পুরন হয় উত্তরাঞ্চলের সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে। আর উত্তরাঞ্চলের সব ক’টি নদীর উজানে ভারতের অংশ। স্মরণ করাতে চাই, গঙ্গাঁ চুক্তি হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পানি বাংলাদেশ এখনও পায় না। আবার তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের উজানে ভারত যুগের পর যুগ ধরে পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করায় উত্তরাঞ্চলে এখন ভূ-গর্ভস্থ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির বড়ই সংকট। বরেন্দ্র অঞ্চল গবেষণা সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কর্মকর্তা জাহাঙ্গির আলম খান বলেন, চলতি বছরের শুরুতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাগঞ্জ, নওগাঁ জেলার ১০০টি পয়েন্টে বোরিং করে দেখা গেছে, গত ২ বছরে এসব অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ৮ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এ তথ্য যে উদ্বেগের, যা সচেতন মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন।

 যেখানে মাত্র ২ বছরে পানির স্তর ১২ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে, সেখানে বুঝতে অসুবিধা হবে না, আগামী বছরগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট কি পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে। মূলত ভূ-গর্ভস্থ পানির সংকট হলে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। ফলে উত্তরাঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন অতিব জরুরী হয়ে পড়েছে। যা মোকাবিলায় আমাদের যে সব উদ্বেগ নেওয়া জরুরি, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।


১. উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে এখন খাদ্যশস্য ভান্ডার হিসাবে খ্যাত। যেখানে এই ১৬টি জেলার উৎপাদিত ধান ও গম দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহ ভাগ পুরণ করায় খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে, সেখানে পানির অভাবে সেচভিত্তিক চাষাবাদ কমে আসলে এই অর্জনকে ধরে রাখা কঠিন হবে। এজন্য বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণের জন্য উত্তরাঞ্চলের ছোট বড় নদী-নালা সমূহকে জরুরি ভিত্তিতে খননের জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা উচিৎ।
২. সেচভিত্তিক চাষাবাদের পরিবর্তে স্বল্প সেচে এমনকি বিনা সেচে উচ্চফলনশীল জাতের ধান উৎপাদনের দিকেই আমাদের ঝুঁকতে হবে। এ জন্য গবেষণা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কাংখিত ফলন অর্জনে নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে।

৩. ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন ব্যবহারে পানি আইন প্রণয়ন করে মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত পানির বড় অংশ বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষন করার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এ জন্য পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পানি পরিশোধন প্লান্ট স্থাপন করে পার্শ্ববর্তী নদী-নালার পানি ও বৃষ্টির পানি ধারন করে তার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ওয়াসা, পৌরসভাগুলোর অনুকুলে পানি সংরক্ষণ খাতে প্রকল্প গ্রহণ করে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ৪. পানির অপচয় রোধ করতে হবে। অনেকের ধারণা পানি অফুরন্ত। বাস্তবে পানিও একটি ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ। এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে মিতব্যয়ি হতে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য পত্র পত্রিকা, রেডিও ও টিভিতে বিশেষ প্রচারণা চালাতে হবে।

বিশেষ করে খোদ রাজধানী ঢাকার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর এতই নেমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগের ব্যাপার। যেখানে ভূ-উপরিস্থ পানির অভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে যাচ্ছে, সেখানে উজানের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। মূলত ভূ-উপরিস্থ পানির সংকটের কারণেই ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার দিনে দিনে শুধুই বাড়ছে। ফলে উজানের পানির ন্যয্য হিস্যা আদায় করা ছাড়া আমাদের আর অন্য কোন গত্যন্তর নেই।

প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিম, এতে কোন সন্দেহ নেই। যারা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে। সেই দেশের কাছ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের মতো অনৈতিক, অমানবিক আচরণ আমরা কোনভাবেই আশা করতে পারিনা। কিন্তুু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সেই ভারত ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি করেও শর্ত অনুযায়ী পানি দেয়নি। ত্রিশ বছর মেয়াদের চুক্তির এখনও ৯ বছর বাকী আছে। ইতিমধ্যেই ভারত সরকার গঙ্গাঁর পানি আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় অন্যান্য রাজ্যে চালান করছে।

এমনকি আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্প ভারত বাস্তাবায়ন করলে গঙ্গা এবং তিস্তায় পানির প্রবাহ আরো কমে যাবে। আর গোটা বাংলাদেশ মরুকরণের পথেই এগিয়ে চলবেই। ফলে আমাদের কৃষি, মৎস্য চাষ, নৌ-যোগাযোগ সবই হুঁমকির মুখে পড়বে। এমনিতেই বলতে গেলে বাংলাদেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক আগেই ভেঙ্গে পড়েছে। অথচ নৌ-যোগাযোগ, মৎস্য চাষ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামকই যেখানে পানি, সেখানে পানির কহর বৃদ্ধি পেলে এই অঞ্চলের মানুষের রুটি রুজি বন্ধ হয়ে যাবে। নদী যেখানে বাংলাদেশের মানুষের খেঁয়ে পড়ে বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন, সেখানে তিস্তা, গঙ্গাঁ, ব্রহ্মপুত্রে ধু-ধু বালুচর হলে শুধু ভবিষ্যত প্রজন্মই নয়, বর্তমান প্রজন্মের ভাগ্য বিড়ম্বনার মিছিল যে দীর্ঘ হবে, যা অনেকটাই নিশ্চিত।


যদিও উজান থেকে নেমে আসা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় পরিবেশ, প্রকৃতি, জীব বৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি সেচ কার্য্য পরিচালনার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় ৪১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি খাল খননের প্রকল্প হাতে নিয়েছে তিস্তা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। এ খালগুলি খনন করা শেষ হলে বর্ষা মৌসুমের বাড়তি পানি ধরে রেখে গ্রীষ্ম মৌসুমে পানি সংকট মোকাবিলা করা অনেকটাই সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পানি সংরক্ষনের জন্য এ ধরনের খাল খনন প্রকল্প উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশে মরা খালে পরিণত হওয়া নদ-নদীগুলোকে সংস্কার করে বর্ষা মৌসুমের বাড়তি পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিৎ।


পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, নদী মাতৃক বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের আদায় করতেই হবে। তানা হলে তিস্তার অববাহিকায় বৃহৎ জনগোষ্ঠির কৃষি চাষাবাদ, মৎস্য চাষ কিম্বা বেঁচে থাকার জন্য সুপেয় পানির অভাবে যে সংকটাপন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তা নিকট ভবিষ্যতে সামাল দেওয়া অনেকাংশেই কঠিন হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরের সময় তিস্তার পানি চুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তির সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আর তিস্তা চুক্তির ফয়সালা না হলে দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য চুক্তি হয়ত ঠেকে থাকবে না, কিন্তু তিস্তার সমাধান না হলে এ সফর যে অতীতের ন্যায় গতানুগতিক সফর হবে, যা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top