বিকাল ৩:১১, রবিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ রাজশাহী / নওগাঁয় অসহনীয় শব্দ দূষণ চলছেই কেউ মানে না বিধিবিধান
নওগাঁয় অসহনীয় শব্দ দূষণ চলছেই কেউ মানে না বিধিবিধান
এপ্রিল ৯, ২০১৭

নবির উদ্দিন,নওগাঁ : নওগাঁ শহরে প্রতিনিয়ত উচ্চ শব্দে মাইকিংয়ের ফলে রাতের নিদ্রাসহ স্বাভাবিক কর্মকান্ড দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে জনসাধারণের। বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই। জেনে অথবা না জানার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরবতায় ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে জনগণের। সু-খবর সু-খবর, উন্নতজাতের একটি কেংনি মহিষ জবাই করা হইবে, মহিষটির মূল্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা, প্রতি কেজি মাংস ৪শ’ টাকা…। রোগীসাধারণের জন্য সু-খবর, এখন থেকে প্রতি শুক্রবার ঢাকা থেকে আগত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ নিয়মিত রোগি দেখছেন, সিরিয়ালের জন্য যোগাযোগ করুণ। ছাত্রÑছাত্রী ও অভিভাবকদের জন্য সু-খবর, অভিজ্ঞ শিক্ষকÑশিক্ষিকামন্ডলি দ্বারা কোচিং দেয়া হচ্ছে। শাড়ির বিরাট মূল্য ছাড়, এই সুযোগ আগামী…। আগামী…তারিখের মধ্যে সমিতির বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করার জন্য…। এ ধরনের মাইকিং এখন নওগাঁ শহরের নিত্যদিনের ব্যাপার। নওগাঁ শহরবাসীর জন্য বিষয়টি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। কখনো লম্বা হর্ণ, আবার কখনো ছোট হর্ণে (মাইকের আকার) চলে উচ্চ শব্দে এধরনের মাইকে প্রচারণা। এখন আর আগের মত ঘোষক লাগেনা। একটি মেমোরি কার্ডে একবার রেকর্ড করে রিকশায় অথবা ইজিবাইকে মাইক বেঁধে চলতে থাকে দিনভর বিরতিহীন ঘোষণা। এতো গেল মাইকের মাধ্যমে শ্রবণ নির্যাতন। এরপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইট ও পাথর ভাঙ্গা মেশিন ও কাঠের আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের বিকট কান ফাটানো শব্দ।  যেন নেই কোন বিধি নিষেধ। নেই দেখভাল করার কোন দপ্তর, এমনই সব অবস্থা। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যে সকল স্থানে মাইক বন্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে তাও কেউ মানছে না।


নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড হারুন-অল-রশিদ বলেন, প্রতিদিন মাইকের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। এরা স্কুল, কলেজ. হাসপাতাল, সরকারি অফিস-আদালত কিছুই মানে না। এই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যে কে পালন করবে তাও বুঝি না। বিষয়টি দিন দিন অত্যাচারের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।


এব্যাপারে কথা হয় নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়–য়া ছাত্রীদের অভিভাবকদের সাথে। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা অভিভাবকরা প্রতিদিন আমাদের মেয়েদের নিয়ে স্কুলে আসি। তাদের স্কুলে  পৌঁছে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু অসহ্য হয়ে পড়ে যখন একটির পর একটি মাইক উচ্চ শব্দে প্রচার করতে করতে স্কুলের সামনে দিয়ে যায়। অভিভাবিকাই প্রশ্ন করেন, এর কি কোনই প্রতিকার নেই?


অধ্যক্ষ (অবঃ) প্রফেসর শরিফুল ইসলাম খান বলেন রাস্তাসহ যত্রতত্র উচ্চ শব্দে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো হচ্ছে। প্রতিদিনই শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে মানুষ। এই সমস্যাটা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন। সমাজ কর্মী মো. মুরাদ আলী মৃধা জানান, যত্রতত্র পাথর ভাঙ্গা, ইট ভাঙ্গা ও কাঠ চাঁচা মেশিন চালানো হচ্ছে। মেশিনের বিকট শব্দ মারাতœকভাবে শ্রবনেন্দ্রিয়ের ক্ষতি করছে। এ বিষয়ে শব্দ নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।


৭ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রন বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। যাতে উল্লেখ আছে নিরব এলাকায় দিনে ৫০ রাতে ৪০, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ রাতে ৪৫, মিশ্র এলাকা দিনে ৬০ রাতে ৫০, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ রাতে ৬০, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ রাতে ৭০  ডেসিবল মানমাত্রায় সাইন্ডে মাইকে প্রচার করা যাবে। ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দিবাকালিন সময় ও রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত রাত্রিকালীন সময় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যা মানুষের শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত শব্দের গড় মাত্রাকে বোঝাবে। এই বিধি  যেসব স্থান,  ক্ষেত্রে প্রচার প্রচারণায় অনুষ্ঠানে প্রযোজ্য হবে না যেমন রাষ্ট্রীয় কোন দিবসে (স্বাধীনতা, ২১  ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, জাতীয় দিবস)। অথবা সরকার কর্তৃক ঘোষিত কোন গুরুত্বপূর্ণ দিবসে অনুষ্ঠান চলাকালে। মৃত্যু সংবাদ,  কোন ব্যক্তি নিখোঁজ থাকলে, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হারিয়ে গেলে, প্রকৃতিক বিপর্যয় বা অন্যকোন বিপদে বিপদ সংকেত প্রচারকালে, সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রাচারকালে, প্রতিরক্ষা-পুলিশ বাহিনী ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দাপ্তরিক কাজ সম্পাদনকালে, ইফতার ও শিহরির সময় প্রচারকালে, সরকার কর্তৃক সময় সময় অব্যহতিপ্রাপ্ত অন্যকোন কার্যক্রম সম্পাদনকালে, ধর্মীয় স্থান ও অনুষ্ঠানে।


বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রম করা যন্ত্রপাতি যেমন মাইক, লাউড স্পিকার, এমপ্লিফায়ার, মেগাফোন বা শব্দ বর্ধনের জন্য ব্যবহৃত কোন বা সকল বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা অন্যকোন যান্ত্রিক কৌশল ব্যবহারের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই বিধিমালার বিধানাবলি প্রধান্য পাবে। তবে শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরব এলাকা ব্যতিত অন্যান্য এলাকায় ব্যবহারের জন্য পূর্বেই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। যার জন্য ৩ দিন পূর্বে দরখাস্ত করতে হবে। বিশেষ জরুরি ক্ষেত্রে অয়োজনের ১ দিন আগে দরক্ষাস্ত দাখিল করতে হবে। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুমতি প্রদান করবেন অথবা কারণ উল্লেখপূর্বক দরখাস্ত নামঞ্জুর করবেন। এক্ষেত্রে সহনীয় পর্যায়ের শব্দের মানমাত্রা অতিক্রকারী যে কোন যন্ত্রপাতি দৈনিক ৫ ঘন্টার বেশি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করতে পারবেন না। অনুমোদিত সময়সীমা রাত ১০টা অতিক্রম করতে পারবেনা।


নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকার শেষ সীমানা হতে ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙ্গা মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত মিকচার মেশিনসহ নির্মান কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য যন্ত্র বা যন্ত্রপাতি চালানো যাবেনা। নির্দিষ্ট মানমাত্রার অতিরিক্ত শব্দদূষণের সৃষ্টি হলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে টেলিফোনে, মৌখিক অথবা লিখিত ভাবে জানানো যাবে। সে ক্ষেত্রে শব্দদূষণ মানমাত্রা অতিক্রমকারীকে ক্ষমাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মৌখিক ভাবে অথবা লিখিত নির্দেশ প্রদান করবেন। বিধান লংঘনকারী ওই নিদের্শ পালনে ব্যর্থ হলে আইনের ধারা ১০ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ক) এবং (ঙ) অধিনে প্রয়োজনীয় সহায়তা সহকারে যে কোন ভবন, স্থান বা আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ করবেন। শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আটক করতে পাবেন। কোন ব্যক্তি উপ-বিধি (১) এর অধীন নির্ধারিত অপরাধে দোষি সাব্যস্ত হলে তিনি প্রথম অপরাধের জন্য অনধিক ১ মাসের কারাদন্ডে বা অনধিক ৫হাজার টাকা অর্থ দন্ডে বা উভয় দন্ডে এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য অনধিক ৬ মাসের কারাদন্ডে বা অনধিক ১০হাজার টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

২০০৬ সালে ৭ সেপ্টেম্বর শব্দ দূষন নিয়ন্ত্রন বিধিমালা গেজেট উল্লেখ আছে উপজেলায় এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা। জেলা সদরে নিয়ন্ত্রণ করবেন জেলা প্রশাসক অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশন পুলিশ কমিশনার অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনার অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, এছাড়া অন্যান্য এলাকায় জেলা প্রশাসক অথবা তৎকর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে নওগাঁর জেলা প্রশাসক ড. মোঃ আমিনুর রহমান বলেন, শব্দদূষণ অবশ্যই একটি বড় ধরনের সমস্যা। এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রেজাউল বারী জানান, বিষয়টি তিনিও অনুধাবন করেছেন। যতদ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।
নওগাঁ সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডাঃ মোঃ মাহবুব আলম সিদ্দিকী জানান, অতিরিক্ত শব্দদূষণ শিশুসহ সব বয়সের মানুষের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শব্দে মস্তিস্কে বিরক্তির কারণ ঘটে। ফলে শ্রবণ শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মস্তিস্কে চাপ সৃষ্টি হয়, কর্মক্ষমতা কমে যায়, মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়, বিশ্লেষণ ক্ষমতা কমে যায়, মানুষ যখন ধীরে ধীরে বার্ধক্যে পোঁছে যায় তখন পরিলক্ষিত হয় শব্দদূষণের মারাত্মক প্রভাব।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top