রাত ১০:৩২, রবিবার, ২৮শে মে, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / দেশের উন্নয়নে নারীর অগ্রগতি
দেশের উন্নয়নে নারীর অগ্রগতি
জানুয়ারি ৩, ২০১৭

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে দেশের যাত্রা শুরু হয়, সেই বাংলাদেশ কি কেবল হতাশায় নিমজ্জিত? নিশ্চয় তা নয়। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল অর্জন। নানা খাতে দেশ বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি সংস্থা, সংগঠনের দ্বারা বাংলাদেশ সাফল্যের গৌরব গাঁথা ইতিহাস অর্জন করেছে। সারা বাংলাদেশকে বিশ্ববাসী দেখছে অপার সম্ভাবনার দেশ হিসাবে। যেখানে কৃষি শিল্প, শিক্ষার পাশাপাশি নারী সমাজের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
বেগম রোকেয়া যে, নারী জাতির অগ্রগতি উন্নয়নের কথা ভেবেছিলেন তা আজ সত্যে পরিণত হয়েছে। এগিয়ে চলেছে নারী, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বর্তমান সমাজে নারী সেকালের বৃত্তের মধ্যে বন্দি নেই। সমাজ ব্যবস্থার আরোপিত শৃঙ্খল ভেঙ্গে আত্মবিশ্বাসে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই নারী শুধু ঘরেই নয় এমন সব কর্মকান্ডে নিয়োজিত থেকে তাদের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিয়ে অগ্রগতি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে তা শুধু নারীর অগ্রগতি নয় দেশের অর্থনীতির ভীত শক্ত ও মজবুত হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।

 এক তথ্যে জানা গেছে বর্তমান প্রায় ৩ লাখ নারী শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর সহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, নারী শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়া ইতিবাচক। তবে এ ক্ষেত্রে তারা হয়রানি ও নির্যাতনও হচ্ছে। নারী অভিবাসন সংগঠনগুলো তাই সচেতন হয়ে ও যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার কথা বলছেন।

 

বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের উপার্জিত অর্থ দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। তাছাড়া নারী আজ নিজ বাসা বাড়িতে কাঁথা সেলাই, বিভিন্ন রঙবেরঙের কুঠির শিল্প তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গ্রাম বাঙলার গরীব অর্ধশিক্ষিত নারীরা। নিজ এলাকায় নানা ধরনের সমাজ সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছে। বেগম রোকেয়ার যদি জন্ম না হতো তাহলে ভারত উপমহাদেশে বাঙলার নারী এখনও সে অন্ধকার যুগেই পড়ে থাকতো। তাই তিনি অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে বাঙলার নারীদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছেন। সেই শিক্ষার আলোই আজ বাঙলার নারী আলোকিত জীবন পেয়েছে। তাই তারা অগ্রগতির পথে উন্নয়নের পথে ধাবমান।


যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতির মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। কারণ রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। রাজনীতি ও ক্ষমতা কাঠামো থেকে অর্ধেক জনগোষ্ঠি নারীকে বাদ দিয়ে সত্যিকার অর্থে কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন, বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। কবি নজরুল এর এ মহান বাণীটির অর্থ হলো জেন্ডার বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে নারীর অগ্রগতি দেশের উন্নয়ন। মোটা দাগে বলা যায়, নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি দেশের উন্নয়ন ঘটে। বর্তমান বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই নারী পুরুষের যৌথভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে দেশে গণতন্ত্র উন্নয়ন, সুসংহত হবে তেমনি সুশাসন দৃঢ় হবে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নারী আর পিছিয়ে নেই, নারীর অগ্রগতি উন্নয়ন হয়েছে তার বড় প্রমাণ নারীর ক্ষমতায়ন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। এক সময় বাংলাদেশের প্রশাসনে নারীর পদচারণা তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। দীর্ঘ ২১ বছর পর নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৬) ক্ষমতায় আসার পর তিনিই প্রথম সচিব, জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পদে নারী নিয়োগ দেন। সে থেকে বর্তমান পর্যন্ত নারীর অগ্রগতি ক্ষমতায়নের দৃশ্য চোখে পড়ার মতো।  দেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধি আইন তৈরি সহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী গুরুত্ব্পূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অপরদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নারী এলাকার উন্নয়নে, যথেষ্ট অবদান রাখছেন। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পরিষদে সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নারী সদস্যের সরব উপস্থিতিই প্রমাণ করে পুরুষের মতো নারীর অগ্রগতি হয়েছে। এটা শুধু কথার কথা নয়। বাস্তব ও দৃশ্যমান। আজ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

 
আমাদের সংবিধানে শুধু নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্নে ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে। তাই কোনো অনগ্রসর জনগোষ্ঠির মাঝে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগাতে গেলে নারী পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার। যে কথা বেগম রোকেয়া, কবি নজরুল অনেক আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সহ সর্বক্ষেত্রেই নারীর ক্ষমতায়ন মাইল ফলক সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশে। সম্প্রতি সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নারী প্রতিনিধি নির্বাচনের ঘটনা প্রায় সর্বক্ষেত্রে নারী যে অগ্রসরমান সে চিত্রই ফুটে উঠে। বিশেষ করে এক দশকে নারীর সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।

 

নারী শিক্ষায় দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ নারী। মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীর সংখ্যা ৫৩ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ের নারীর অংশগ্রহণের সূচকে এ অঞ্চলের প্রথম কাতারের ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি।

 

সরকারি বেসরকারি চাকুরীর পাশাপাশি কৃষি শিল্প সহ সামরিক, বেসামরিক প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। সাংবাদিকতা হিসাবেও নারী সাহসী ভূমিকা পালন করছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে আন্তর্জাতিক নারী সাহসিকতার পুরস্কার পেয়েছেন ’৭১’র টেলিভিশন চ্যানেলের অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক এবং নারী অধিকার কর্মী নাদিরা শারমীন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার সহ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৭০ জন নারী সদস্য রয়েছেন।

 

আবার অনেক নারী বিভিন্ন খেলায় অংশ গ্রহণ করে। প্রশংসা অর্জন করেছেন। এমনকি আমাদের নারী এভারেস্টও জয় করেছেন। আজ নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলার পদেও অধিষ্ঠিত। উপরšু— নারী, জজ, ব্যারিষ্টার, বিচারক সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত থেকে সমাজ ও রাষ্টের সেবার মধ্যে দিয়ে তাদের অগ্রগতি জানান দিয়ে যাচ্ছেন।


সুতরাং নারী অগ্রগতি শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টি এখন বহুল আলোচিত। বর্তমান আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি আবার দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এ বিপুল জনগোষ্ঠিকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে নিরক্ষর অবহেলিত অদক্ষ রেখে দেশের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই সংবিধানে নারী পুরুষের সমাধিকার নিশ্চিত করেছে। নারীর অগ্রগতি শিক্ষা অর্জন ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের জন্য সরকার শিক্ষাকে অগ্রধিকার দিয়ে নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। ফলে নারী শিক্ষা আজ নবযুগের সূচনা হয়েছে।

 তাই নারী সচেতনতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। শিক্ষার আলো থেকেই তাদের বঞ্চিত করে নারীর অগ্রগতি উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। আবার শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন কখনো সম্ভব নয়। তাই আমাদের সংবিধান মোতাবেক শিক্ষা গ্রহণ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 

তবে নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে কিছু বাধা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এখনও নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি। তাদের পথচলা সুগম হয়নি। ঘরে বাইরে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। অথচ নারীরা আজ ঘরে বাইরে সর্বত্র কাজ করছে পুরুষের চেয়ে বেশি। ওয়াল্ড ইকোমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচক এক প্রতিবেদনে ২০১৬তে জানা যায়, পুরুষের চেয়ে নারীরা বছরে গড়ে ৩৯ দিন বেশি কাজ করেন। এছাড়া দিনে পুরুষের চেয়ে গড়ে ৫০মিনিট বেশি করেন নারীরা।

 প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে আর্থিক সুযোগ সুবিধার দিক থেকে নারী পুরুষের মধ্যে ব্যবধান ২০০৮ সাল থেকে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, গত এক দশকে ২৫কোটি নারী বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে। যদিও পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পুরুষের নারীদের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কাজ বেশি করেন। তবে যেসব কাজে পারিশ্রমিক নেই যেমন (সংসার চালানো, সন্তানদের লাল পালন, বয়স্কদের দেখভাল) এসব কাজে নারী বেশি সময় ব্যয় করেন। নারীদের কাজের এ সময়গুলো যোগ করলে দেখা যাবে বছরে গড়ে একজন নারী পুরুষের চেয়ে ৩৯দিন কাজ বেশি করে (২৭ অক্টোবর যাযাদি)। যা হোক বেগম রোকেয়া বলেছেন কার্যক্ষেত্রে পুরুষের মূল্য বেশি, নারীর কাজ সস্তায় বিক্রি হয়। নারীর এ অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হবে। বাল্য বিয়ে, ঝরে পড়া নারীর শিক্ষা অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় বাধা। তবুও শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফলে অনেক নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষমতা অর্জন করছে।

 
সুতরাং আমরা বলতে পারি অনেক চ্যালেঞ্জ ও বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে বাংলাদেশের নারীরা দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে নিয়ে যেতে যেভাবে সহায়তা করছে, তাদের মধ্যে যে, আত্মবিশ্বাস, অগ্রগতির ধারা দৃশ্যমান তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাই নারীর অগ্রগতির পথে যে সমস্ত বাধা বিপত্তি প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা নারীর পাশাপাশি পুরুষের সহায়তায় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলে দেশ দ্রুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে। কারণ নারীর অগ্রগতি তথা, উন্নয়ন মানেই মানব উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন।
লেখক ঃ শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top