বিকাল ৪:৪৬, মঙ্গলবার, ২৩শে মে, ২০১৭ ইং
/ আইন-আদালত / দিলদার ও শাফাতের ব্যাংক হিসাব তলব, রেইনট্রিতে মদ
আপন জুয়েলার্সের ৫ শাখায় অভিযান, গুলশান শাখা সিলগালা
দিলদার ও শাফাতের ব্যাংক হিসাব তলব, রেইনট্রিতে মদ
মে ১৪, ২০১৭

রিমান্ডে বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে নিয়ে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষনের কথা স্বীকার করেছে আপন জুয়েলার্স মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে শাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু রেগনাম গ্র“পের কর্ণধার মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলে সাদমান সাকিফ। তারা ওই দুই তরুনীকে ধর্ষনের জন্য জন্মদিনের পার্টির কথা বলে ফাঁদ পেতেছিল বলেও স্বীকার করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের একটি সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে  রোববার ধর্ষনস্থল ঝালকাঠী-২ আসনের সংসদ সদস্য বিএইচ হারুনের ছেলের মালিকানাধীন রেইনট্রি হোটেলে অভিযান চালিয়ে ১০ বোতল বিদেশী মদ পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দারা। ওই হোটেলে  মদ রাখার কোন অনুমতি ছিল না। একইদিন আপন জুয়েলার্সের ৫টি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দারা। পরে জুয়েলার্সের গুলশান শাখা সিলগালা করে দেওয়া হয়। এছাড়া আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ ও তার ছেলে ‘ধর্ষক’ শাফাত আহমেদের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুলিশ জানায়, ধর্ষণ মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে শাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফ গত বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতের নির্দেশে তাদের ৫ ও ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শাফাত ও সাদমান তাদের জড়িত থাকার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন। মামলার অন্য তিন আসামি এখনো পলাতক। তারা হলেন- ইমেকার্স ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাঈম আশরাফ, শাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ।

রেইনট্রি হোটেলে অভিযান : রোববার দুপুর ১২টায় হোটেল রেইনট্রিতে অভিযান চালিয়ে ১০ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মইনুল খান বলেন, ‘হোটেলের প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি চালানো হয়েছে।’ হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার ফ্র্যাংক ফরগেট জানিয়েছিলেন, হোটেলটির মদের লাইসেন্স নেই। অভিযোগ রয়েছে, এমপিপুত্রের মালিকানাধীন এই হোটেলটিতে প্রতি রাতেই জমে ওঠে মদের আসর। পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দারা এসব বিষয় জানলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি। বনানী থানার ওসি, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট জোনের পরিদর্শক, শুল্ক গোয়েন্দা অদিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে আতাত করেই চলছিলেন। মদ-নারীসহ সবকিছুই মিলতো ওই হোটেলে।

আপন জুয়েলার্সে অভিযান : আপন জুয়েলার্সের মালিকের অবৈধ সম্পদের খোঁজে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই অলঙ্কার ব্র্যান্ডের পাঁচটি বিক্রয় কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে একটি শোরুম সিলগালা করে দিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। গতকাল রোববার এই অভিযান চালানো হয়। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেছেন, ‘স্বর্ণ ও রতœ সংগ্রহের তথ্যে অস্বচ্ছতা এবং মালিকের অবৈধ সম্পদের’ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আপন জুয়েলার্সে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, আপন জুয়েলার্স যে সোনা ও ডায়মন্ড বিক্রি করে, তা সংগ্রহের সোর্স স্বচ্ছ নয়। অভিযোগ আমলে নিয়েই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।’ আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ বনানীতে দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদের বাবা। এই পরিবারের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে একটি অনুসন্ধান কমিটি করে এই তদন্ত চালাচ্ছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এর অংশ হিসেবে রোববার বেলা ১১টার দিকে আপন জুয়েলার্সের মৌচাক, উত্তরা, জিগাতলার সীমান্ত স্কয়ার এবং গুলশানের দুটি বিক্রয় কেন্দ্রে একযোগে অভিযান শুরু হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ শাখার ভ্যাট কর্মকর্তারা ছাড়াও র‌্যাব সদস্যরা যোগ দেন এই অভিযানে। বেলা সোয়া ১২টার দিকে গুলশানের সুবাস্তু টাওয়ারের শোরুমটি বন্ধ করে দেওয়ার পর এ বিভাগের যুগ্ম কমিশনার শাফিউর রহমান বলেন, ‘আমরা এটা সিলগালা করেছি। এখন এটা খুলতে হলে তাদের প্রতিনিধি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আমরা দেখব- সেখানে তাদের কী পরিমাণ মালামাল মজুদ আছে।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, ‘শো রুমগুলোতে আমরা স্টক চেকিং করছি। দেশে তো স্বর্ণের আমদানি নেই। তারপরও তারা এগুলো কোথা থেকে কীভাবে এনেছে বৈধ উপায়ে আনলে ভাল, না হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেব।’ দিলদার আহমেদের নামে দেশে-বিদেশে যাবতীয় লেনদেনের হিসাব চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে গত বৃহস্পতিবার একটি চিঠিও পাঠিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযানের বিষয়ে দিলদার আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। দিলদারের বড় ছেলে সাফাত আহমেদের জন্মদিনের পার্টির কথা বলে গত ২৮ মার্চ ঢাকার বনানীর একটি বিলাসবহুল হোটেলে নিয়ে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয় বলে বনানী থানায় একটি মামলা হয় এক সপ্তাহ আগে। ওই মামলার অপর আসামিদের মধ্যে দুজন সাফাতের বন্ধু, বাকি দুজন তার দেহরক্ষী ও গাড়িচালক। গত বৃহস্পতিবার সাফাত ও তার বন্ধু সাদমান সাকিফকে সিলেট থেকে গ্রেফতার করার পর পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ধর্ষণের শিকার এক ছাত্রী বলেছেন, ‘ধর্ষণের পর সাফাত তাকে বলেছিলেন, তারা সোনা চোরাচালান করেন। দুই একটা খুন বা ধর্ষণ করে পুলিশকে টাকা দিলে তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না।’

ব্যাংক হিসাব তলব : বাংলাদেশ ব্যাংক আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ ও তার ছেলে সাফাত আহমেদের সব ব্যাংক হিসাব চেয়ে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ একথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দারা বেশ কয়েকদিন ধরে কাজ করছেন। এরই অংশ হিসেবে তাদের লেনদেনের যাবতীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোর কাছে। শুধু ব্যাংক হিসাবই নয়, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের কোনও ঘটনা ঘটেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর বাইরে তারা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত কিনা সেটাও দেখা হচ্ছে।’ এর আগে বৃহস্পতিবার শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দিলদার আহমেদ ও তার ছেলে সাফাত আহমেদের আর্থিক লেনদেনের যাবতীয় তথ্যাদি চেয়ে চিঠি দেয়। একই দিন পুলিশও তাদের যাবতীয় তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ রাতে রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের শিকার হন দুই তরুণী। ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ এনে ওই দুই তরুণী গত ৬ মে বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ ওই দুই তরুণীকে জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। এরপর তাদের বনানীর ‘কে’ ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বরে রেইনট্রি নামের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে সাফাত ও নাঈম। এ ঘটনা সাফাতের গাড়িচালক বিল্লালকে দিয়ে ভিডিও করানো হয় বলেও উল্লেখ করা হয় এজাহারে। ধর্ষণ মামলার আসামিরা হলো- সাফাত আহমদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top