রাত ৮:৫১, সোমবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় খাদ্য শস্য আমদানির গুরুত্ব
টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় খাদ্য শস্য আমদানির গুরুত্ব
মে ১২, ২০১৭

আব্দুল হাই রঞ্জু  : দুর্যোগ একটি আতংকের নাম। যে কোন দেশে যে কোন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটতেই পারে, এটা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। তবে দুর্যোগ ঘটলে তা মোকাবিলা করার সামর্থ্য যেমন সরকারের থাকা উচিৎ, তেমনি জনগণকেও তা মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। অতি সম্প্রতি স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে গেল হাওর অঞ্চল খ্যাত জেলাগুলোয়।

 বাঁধ রক্ষায় দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং অতিবর্ষণের পাশাপাশি উজানের  পানির ঢলে প্রায় ৩ লক্ষ হেক্টর জমির আধা পাকা ধান তলিয়ে সর্বনাশ হয় কৃষকের। একমাত্র সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদই হাওরবাসীর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

 

সে অবলম্বনটুকু যখন কোন দুর্যোগের মুখে পড়ে, তখন আর মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। ফলে হাওর অঞ্চলে চলছে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি। অবশ্য সরকারি তরফে এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে এবং বিভিন্ন এনজিও পর্যায়েও সাহায্যের হাত অনেকেই বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের মহাবিপর্যয় না ঘটলে হাওরবাসীর সাহায্যের কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু উপায় কি, বাঁচতে হলে অন্যের কৃপার উপর অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হয়।


 তবে আমরা মনে করি, টেকসই পরিকল্পনার আওতায় হাওর অঞ্চলকে উজানের পানির ঢল ঠেকে রাখার মতো বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। যেন আগাম বন্যার পানি হাওরে ঢুকে ফসলহানির মতো দুর্যোগ আর সৃষ্টি করতে না পারে। ইতিমধ্যেই সরকার দায়িত্ব অবহেলার দায়ে বেশ ক’জনকে সাময়িক ভাবে চাকুরি হতে বরখাস্ত করছে। এমনকি পানি সম্পদ মন্ত্রী এ ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগে প্রস্তুত আছেন বলে বিবৃতিও দিয়েছেন।

 

অবশ্য আমাদের দেশে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করার ঘটনা সহসাই ঘটেনা। যদি হাওর বিপর্যয়ের কারণে পানি সম্পদ মন্ত্রী পদত্যাগ করেন, তাহলে এটা একটা দৃষ্টান্ত হবে। বাস্তবে কি ঘটে, তা দেখার জন্য হয়ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু মনে হয়, দগদগে ঘা কিছুটা শুকিয়ে গেলে মান্যবর মন্ত্রীর এ উপলব্ধি থাকবে কিনা, যা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশও রয়েছে।


দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার খুব কাছাকাছি পৌঁছায় সরকার উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষায় বিদেশ থেকে চাল আমদানির উপর শুল্ক আরোপ করেছিল। যেন বিদেশী চালের আগ্রাসনে দেশীয় উৎপাদক শ্রেণী ধানের উপযুক্ত মুল্য থেকে বঞ্চিত না হয়। ফলে দু’বছর যাবৎ কৃষকের উৎপাদিত ধানের মুল্য সরকার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে।

 

অবশ্য দেশে যেকোন পণ্য আমদানি কিম্বা রফতানির বিষয়টি জনস্বার্থের কথা বিবেচনার নিয়ে সরকার করে থাকে। কারণ সরকারকে যেমন উৎপাদকের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়, তেমনি ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় অনেক সময় আমদানির উপর ধার্য্যকৃত ট্যারিফও প্রত্যাহার করতে হয়। ইতিমধ্যে সরকার বাস্তব অবস্থার নিরিখে চাল আমদানির উপর ধার্য্যকৃত সমুদয় ট্যারিফ প্রত্যাহারের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে।


 আমরাও মনে করি, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে চাল আমদানির উপর শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়ায় হবে সঠিক ও সময়োচিত। সরকার এ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আশা করা যায়, এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজি বন্ধ করা অধিকাংশেই সহজ হবে। এ বছর শুধু যে হাওরেই বিপর্যয় হয়েছে, তা নয়। গোটা দেশে আগাম অতিবৃষ্টির কারণে চিকন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির কারণে নেক ব্লাষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।


এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে, সরকারকে কৃষি পর্যায়ে সার, বীজ, তেল এবং বিদ্যুতে ভর্তুকীর পরিমাণ বৃদ্ধি করে আগামী ফসলকে নির্বিঘœ করতে হবে। তা না হলে কৃষকের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে জানা গেছে, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে বিভিন্ন এনজিওর দেওয়া ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য চাপ অব্যাহত রয়েছে। বাস্তবে আমাদের দেশের চাষীদের ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ, এমনকি মহাজনি ঋণ পর্যন্ত গ্রহণ করে চাষাবাদ করতে হয়। কোন কারণে ফসলের ক্ষতি হলে ঋণ পরিশোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে পড়ে।

 

এ বছর চাষীদের উপর যে পর্যায়ে বিপর্যয়ের কাল মেঘ আঘাত হেনেছে, তা মোকাবিলায় ঋণ মওকুফের পাশাপাশি পুনরায় ফসলি ঋণ দিতে হবে। পৃথিবীর নানা দেশে যখন সহজ কিস্তিতে শস্য বীমার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে শস্যবীমার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে শস্যে বিপর্যয় হলে বীমা না থাকায় চাষীরা ক্ষতিপূরণ পান না। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা অভিঘাত এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে, সেহেতু শস্য বীমার মত কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দ রেখে ঋণ দেয়া জরুরি। তাহলে অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের অর্থের ঝুঁকি অনেকাংশেই  কমে আসবে।

 

আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে সাধারণ ভোক্তার সংখ্যাই বেশি। মুলত যারা মোটা চালের উপর নির্ভরশীল। এ কারণে মোটা চালের বাজার দর তুলনামুলক বেশি। সে ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। পক্ষান্তরে দেশে এখন মোটা ধানের চেয়ে চিকন ধানের চাষাবাদও বেশি হচ্ছে। ফলে মোটা চালের সংকটের কারণে দামও কিছুটা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে দু’টি কারণ বিদ্যমান।

 

সরকার প্রতিবছর যে চাল সংগ্রহ করে তার সিংহভাগই মোটা চাল। আবার ভোক্তা পর্যায়ে মোটা চালের ভোক্তাও বেশি থাকার কারণে মোটা চালের বাজার দর তুলনামুলক বেশি থাকে। পরিস্থিতি যখন সাধারণ ভোক্তাদের প্রতিকূলে চলে যায়, তখন সরকারের খাদ্য বিভাগ স্বল্প মুল্যে ভর্তুকি  দিয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রি করে থাকে। মুলত সে চাল সাধারণ ভোক্তারা কিনে খায়। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেও সরকার গোটা দেশে দশ টাকা কেজির খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির বাইরে খোলা বাজারে চাল বিক্রি করতে পারেনি।

 

 এর মুলেই ছিল, সরকারি গুদামে চালের মজুদ সংকট। সে সংকট এখনও যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সরকার চলতি বোরো মৌসুমে আপদকালীন খাদ্য মজুদ গড়তে অভ্যন্তরীণভাবে ৮ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ও কৃষকদের নিকট থেকে ৭ লক্ষ মেট্রিক টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

 

যদি অভ্যন্তরীন লক্ষ্যমাত্রার ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান সফল হয়, তাহলে খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আর যদি ধান চালের অস্থির বাজারের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়,  তাহলে সরকারকে জিটুজি পদ্ধতিতে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে হলেও কাংখিত চালের মজুদ গড়ে তুলতে হবে।


পাশাপাশি সরকার খোলা বাজারে আটা বিক্রির যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে, সাধারণ ভোক্তার স্বার্থে আটা বিক্রির কার্যক্রমও চালু করা প্রয়োজন। কারণ বাজারে আটা কিংবা ময়দার দাম অনেক বেশি চড়া। যা অনেকের পক্ষে কিনে খাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সরকারের  খোলাবাজারে আটা বিক্রির কর্মসূচিকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হলে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষা করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের স্বার্থে আটা খোলাবাজারে পুনরায় বিক্রির ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।


সামনে রমজান মাস। রমজান মাস আসলেই, ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের বাজার দর মূল্য বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে চাল, আটা, ছোলা, ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওর অঞ্চলসহ গোটা দেশেই এক ধরনের পণ্য সংকটের আতংক বিরাজ করছে।

 

সরকারের উচিৎ এই ধান কাটা মাড়াইয়ের সময়েও যে সব অঞ্চলের ধান পানিতে তলিয়ে  এবং পোকার আক্রমণে নষ্ট হয়েছে, সে সব অঞ্চলকে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে খোলাবাজারে চাল, ডাল, আটা, চিনি, তেল, ছোলার মত নিত্যপণ্য বিপণন করা উচিত। তাহলে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে রমজান মাসের ব্যয় নির্বাহ করা সহজ হবে।

 

 হয়তো সরকারকে এ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে।  আর জনস্বার্থে ভর্তুকি দেওয়াই সরকারের দায়িত্ব। অনেকের স্মরণে আছে, গত ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিশেষ করে চালের তীব্র সংকট হয়েছিল। সে সময় সরকার অর্থ নিয়ে গোটা বিশ্বে দৌঁড় ঝাঁপ করেও আশ্বাস ব্যতিত কাংখিত চাল আমদানি করতে পারেনি। ফলে সাধারণ ভোক্তার কষ্টের শেষ ছিল না। এ বছর যে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না, তা আমরা বিশ্বাস করতে পারছিনা।


 তবে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ থাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ দিনের খাদ্যের প্রয়োজন প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন।

আর ৬০ দিনের প্রয়োজন প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। সে তুলনায় আমাদের দেশের খাদ্য মজুদ যেখানে মাত্র ৫ লাখ টনেরও নিচে, সেখানে সরকারি ভাবে খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি করা যে জরুরি, যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোক্তার স্বার্থ এবং টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের উচিৎ সরকারি বেসরকারিভাবে শুল্ক মুক্ত সুুবিধায় আমদানি করে কাংখিত পরিমাণ খাদ্যশস্যের মজুদ গড়ে তোলা জরুরি। তাহলে খাদ্য সংকটের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি হতে হবে না।
 
 লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮ 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top