বিকাল ৫:২৫, সোমবার, ২৯শে মে, ২০১৭ ইং
/ Top News / জয়িতা অন্বেষণে মনোনীত পাঁচবিবির ৫ সংগ্রামী নারী
জয়িতা অন্বেষণে মনোনীত পাঁচবিবির ৫ সংগ্রামী নারী
এপ্রিল ১৭, ২০১৭

আব্দুল হালিম সাবু, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) : জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ-এর আওতায় মনোনীত হয়েছেন পাঁচবিবির ৫ জন সংগ্রামী সফল নারী। তারা এখন আত্মনির্ভরশীল ও সুখী। জীবনের নানান প্রতিকূলতায় লড়াই করে জয়ী করেছেন নিজেদের। এখন তারা কাজ করে চলেছেন সমাজে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে।

এমন সফল জননী বালিঘাটা ইউনিয়নের বরগোছা গ্রামের মাহমুদা বেগম জানান, তার পিতা একজন প্রতিবন্ধী। সংসারে উপার্জনের কেউ ছিল না। অসহায় পিতা একই গ্রামের দরিদ্র তোতা মিয়ার সাথে তার বিয়ে দেন। অভাব অনটনের সংসারে একটি মেয়ে ও একটি পুত্র সন্তান জন্মের পর আমার স্বামী আমাদের ফেলে রেখে অন্যত্র চলে যান। মাহমুদা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন। সন্তানদের লেখাপড়া  শেখানোর জন্য তিনি মাঠে ধান কাঁটা, মাড়াই, সিদ্ধ ও শুকানোর কাজ করেছেন বছরের পর বছর। বর্তমানে তার কন্যা বি.এ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। ছেলে ৩২তম বি.সি.এস ব্যাচে পাস করে বন গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এখন তার সংসারে অভাব নেই। জীবন যুদ্ধে তিনি একজন সফল ও গর্বিত জননী।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন উপজেলার কাশিয়াবাড়ি গ্রামের শ্রাবন্তী সরকার। মাধ্যমিক পড়াকালীন এক আত্মীয়র সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। এই সম্পর্কের এক পর্যায়ে স্বামী সুশান্ত নানান অজুহাতে টাকা নিতেন। বিষয়টি পরিবারের কেউ জানত না। বিত্তবান পরিবারের মেয়ে হওয়ায় নানান স্বপ্ন দেখিয়ে সে আমাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। পরে অর্থের জন্য আমাকে চাপ দিতে থাকে। বিয়ের ১৭ দিনের মাথায় আমি জানতে পারি তার আরও একটি স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। তারাও সমাজে নানান অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। আমি বাধা দিলে তারা আমাকে নির্যাতন চালায়। আমি নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসে এইচ.এস.সি পাসের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সহকর্মীদের সাথে বুটিকের কাজ ও টিউশনি দিয়ে নিজের ভরণপোষণ ও পড়াশুনার খরচ চালাই। পরে স্বামী আবারো নিজের অপকর্মের জন্য ক্ষমা চায়। আমি আবারো সরল বিশ্বাসে তার সাথে ভারতে চলে যাই। যাওয়ার পর  থেকেই অর্থের জন্য সে আমাকে চাপ দিতে থাকে।  আবারো দেশে ফিরে বি.বি.এ শেষ করে একটি এনজিওতে কাজ করছি। পাশাপাশি সমাজের নিপীড়িত, প্রান্তিক নারী ও শিশু এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অধিকার আদায়ের দাবি জানাচ্ছি।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ধরঞ্জী ইউনিয়নের পাবর্তীপুর গ্রামের সুসমা রাণী বলেন, পিতার সংসারে অভাব থাকার কারণে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করি। আমার অন্ধ প্রতিবন্ধী বাবা ১৪ বছর বয়সেই আমার বিয়ে দেন। শুধুমাত্র ভিটা ছাড়া স্বামীর কিছুই নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। পরে এনজিওতে প্রশিক্ষণের পর ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। একসময় অর্থের অভাবে দুই সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়েছিল। এখন দুই ছেলে এইচ.এস.সি এবং এস.এস.সি পাস করেছে। বড় ছেলে ব্যবসার হাল ধরেছে। আজ তিনি জীবন সংগ্রামে জয়ী এক অর্থনৈতিকভাবে সফল নারী। তিনি আশা করেন গ্রামের সাধারণ নারী বা তারই মত ব্যবসা ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করে সফলতা লাভ করুক। ক্ষুদ্র আয়ের মাধ্যমে ও নিরলস পরিশ্রম করলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষা ও চাকরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী পৌরসভার দানেজপুর গ্রামের মোছাঃ সেলিনা আক্তার বলেন, রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হওয়ার কারণে একটি মেয়ের যে চাওয়া পাওয়া থাকে তা মূল্যায়ন হয়নি। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চেয়ে আশাহত হয়েছি। প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তির কারণে আজ আমি উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছি। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছি। যৌতুকের মত এমন প্রথাকে অস্বীকার করে স্বামীর সংসারে এসেছি শুধুমাত্র শিক্ষাকে অবলম্বন করে। শিক্ষা অর্জন না করলে একটি মেয়ে পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে বোঝা স্বরূপ।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন ধাপ গ্রামের মেরিনা। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় পাঁচবিবির রফিকুল ইসলামের সাথে তার বিয়ে হয়। ২ বছর পর তার সংসারে আছে একটি কন্যাসন্তান। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তিনি সংসারে নিয়ম-কানুন বুঝতেন না। এ কারণে স্বামীসহ পরিবারের সকলের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হন। পরে সংসারের কাজের পাশাপাশি দর্জি বিদ্যা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন মেরিনা। ২০১৩ সালে পল্লীশ্রীর উদ্যোগে তাদের গ্রামবাসীর সহযোগিতায় তিনি টিয়া নারী নামে একটি দল গঠন করেন। এ দলের মাধ্যমে আলোচিত মুরশিদাসহ ১২টি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে, হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে ৬৩টি স্বামী-স্ত্রী ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব নিরসন, ২২ জনকে মাতৃকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে মেরিনা উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতর থেকে পুঁথির কজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে এলাকায় ফিরে কিশোরী ও নারীদের বড় আকারে প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়মূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করবেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমটি একটি ভালো কার্যক্রম। উপজেলার বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এই ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতার জীবন কাহিনী পড়ে আমাদের নারী সমাজ উৎসাহিত হবে এবং এভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন হবে বলে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন জানান।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top