বিকাল ৪:৪১, শনিবার, ২১শে জানুয়ারি, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / জাপান সফর
জাপান সফর
January 10th, 2017

প্রায় তিন সপ্তাহ বিরতির পর আবার লিখছি। এটা অনিচ্ছাকৃত। গত ডিসেম্বর ২৫ থেকে জানুয়ারি ০৫ তারিখ পর্যন্ত সপরিবারে জাপান ভ্রমণে গিয়েছিলাম। খুব ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে। প্রচন্ড ঠান্ডায় সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে রাতে ঘরে ফিরে ক্লান্তিতে শরীরটা লেপের ভেতরে নিজেকে সমর্পণ করেছে। অন্যকিছুতে মন বসাতে পারিনি। তবে অভিজ্ঞতাগুলো সঞ্চিত করেছি সবার সাথে শেয়ার করব বলে।


সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে সবকিছুর খরচ একটু বেশি। আমি বিত্তবান নই। বিগত ১৬ বছরে অল্প অল্প করে কিছু জাপানী মুদ্রা জমিয়েছিলাম। এবার সেগুলো কাজে লাগিয়েছি। আর আমার চিকিৎসক স্ত্রী বেশ খানিকটা সহযোগিতা করায় আমার যাত্রায় বেগ পেতে হয়নি। ঐ যে বললাম স্বপ্নটা ধরে রাখা। স্বপ্নের গোড়ায় পানি ঢাললে একদিন সেটা অর্জন করা সম্ভব হয়। আমি যখন বারবার স্বপ্নের কথা বলছি তখন মনে রাখবেন স্বপ্ন সম্পর্কে ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আবুল কালাম বলেছেন, “স্বপ্ন ওটা যা নয়, যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো বরং স্বপ্ন ওটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না”। স্বপ্ন দেখলেই কি তা অর্জিত হয়? স্বপ্ন ভঙ্গ হয় না? আমাদের অনেক স্বপ্নই তো মুকুলেই ঝরে যায়! সত্যি। আমি একমত তবে পুরোপুরি না।

 কারণ স্বপ্ন কেবল শুয়ে শুয়ে কল্পনার তুলিতে আঁকা ছবি নয়, স্বপ্ন হলো একটি কল্পিত ছবি যা আঁকা হয় সংকল্পের তুলিতে। কালো মানুষের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ৩০ বছর জেলখানায় আবদ্ধ থেকেও নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দেননি। ম্যান্ডেলা তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, “শেষ না করা পর্যন্ত যে কোন কাজই অসম্ভব মনে হয়।” আমাদের সীমাবদ্ধতা হলো আমরা শুরু করি কিন্তু শেষ করা পর্যন্ত ধৈর্য্য রাখতে পারি না। পথের ক্লান্তিতেই আমরা ঘুমিয়ে যাই আর হারিয়ে ফেলি আমাদের স্বপ্নগুলোকে। এটা ঠিক স্বপ্ন অর্জনের পথ কঠিন, কখনও কখনও খুবই কঠিন।


আমার জাপান সফর মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তবু প্রসঙ্গটা এখানে আনছি কারণ আমার জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অন্যান্য ভ্রমণ পিপাসুদের হয়তো খানিকটা হলেও অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই মানুষ সুযোগ পেলে অন্ততঃ একবার জাপান বেড়িয়ে আসুক। টাকা তো কতভাবেই খরচ হয়! তাহলে ছবির মত সাজানো, রূপকথার মত দেশ জাপান সফরে যেতে সমস্যা কোথায়! জাপানের ভিসা পাওয়া কঠিন হলেও তা অসম্ভব নয়। স্বল্প মেয়াদী ভিসা বা ১৫ দিনের ভিসার জন্য যে কেউ আবেদন করতে পারেন।

 জাপান দূতাবাসের ওয়েব সাইট থেকে জেনে নিতে পারেন কিভাবে ভিসা আবেদন করতে হয়। সেখানে বিস্তারিতভাবে সব বলা রয়েছে। ভিসা আবেদনের জন্য কোন ফি দিতে হয় না। মোটামুটিভাবে ৭ দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ভিসা আবেদনের ফল জানা যায়। জাপানীরা খুবই স্বচ্ছতাপ্রেমী। তথ্য প্রদানে স্বচ্ছতার অভাব ঘটলে ভিসা প্রাপ্তি অনিশ্চিত হতে পারে। তাই খুব ভালভাবে জেনে-বুঝে, সবকিছু ঠিকঠাক মত গুছিয়ে দূতাবাসে গিয়ে সশরীরে ভিসা আবেদন করতে হয়। অন্যান্য দেশের মত জাপানও ট্যুরিজম থেকে আয় করার কৌশল নিয়েছে। তারা বানিয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার, যার নাম ’স্কাই ট্রি’। সুতরাং নিজেদের স্বার্থেই তারা ভ্রমণ পিয়াসীদের স্বাগত জানায়।


জাপান খুব সুশৃঙ্খল দেশ। সময় এবং শৃঙ্খলা সেখানে অভাবনীয়। মিনিট নয়, সেকেন্ড ধরে জাপানে সবাই চলাফেরা করেন। সবকিছু গণিতের অঙ্কে হিসেব করা। কর্মব্যস্ত মানুষ ছুটছে পাগলের মত কিন্তু কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নেই। সবাই সচেষ্ট কিভাবে অন্যকে বিরক্ত না করে বা কষ্ট না দিয়ে চলা যায়। পথে কোন সমস্যা হলে পুলিশ বা অন্য কোন ব্যক্তির সহযোগিতা চাইলে তারা খুবই আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করে।

পথে কোন ছিনতাই বা চুরির কোন আশঙ্কা নেই। আপনি ভুল করে কোথাও কিছু ফেলে গেলে সেটা ফেরত পাওয়ার আশা রাখতে পারেন। জাপানের মানুষ সবাই খুব ধনী, এমন নয়। কিন্তু মনের ঔদার্যে তারা ঐশ্বর্যময়। ভাল খারাপ সব দেশেই আছে। জাপানেও আছে। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকা সত্ত্বেও কেবল জনগণের সৃজনশীলতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় কিভাবে একটা সুন্দর দেশ গড়ে তোলা যায় সেটা যদি আপনি দেখতে চান তাহলে জাপান একটা অনন্য উদহারণ বলে আমার বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, ‘সভ্যতার প্রথম অবস্থায় ধনের আবশ্যক’।

 তিনি আরও বলেছেন, ‘ধন উপার্জনের জন্য উর্বর ভূমির আবশ্যক’। উর্বর ভূমিই যদি সভ্যতার প্রথম কারণ হয়, তবে আমরা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যশালী। জাপানের জমিও উর্বর এবং সেই উর্বর জমিতে তাঁরা সভ্যতার যে দৃষ্টান্ত তৈরী করেছে সেটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয়। আজও যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে বা নিদ্রিত অবস্থায় আছে তাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য আমাদের দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্ঞানের সাথে, সৃষ্টির সাথে, সম্ভাবনার সাথে মানুষের হৃদয়ের যোগ সৃষ্টি করতে হবে। উন্নতি অর্জন করতে হবে। হঠাৎ করে উন্নয়ন ঘাড়ের উপর এসে পড়লে তা আমাদের চলার পথে বোঝা হয়ে যেতে পারে।


বাংলাদেশ আজ নব উদ্যমে জেগে উঠছে। নবজীবনে সঞ্জীবিত হচ্ছে, দীক্ষিত হচ্ছে নূতন মন্ত্রে। বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এই জাতির পক্ষে অসম্ভব নয়। সভ্যতা পৃথিবীতে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে, একেবারে প্রচুর পরিমাণে সভ্যতা কখনো পৃথিবীতে জন্মিতে পারে না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তাই আমাদের হতাশ হলে চলবে না। জাপান আজ উন্নত হয়েছে কিন্তু ওরাও খুব ভাল করেই জানে বৈশ্বিক অবস্থার উন্নতি না ঘটলে বিচ্ছিন্নভাবে কোন দেশের উন্নতি দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসু হয় না। সে কারণে জাপান এখন বাংলাদেশসহ অন্যান্য পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা করছে। জাপান আমাদের বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বাইরে নাগরিক পর্যায়েও উভয় দেশের মানুষের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব বিরাজমান। যদিও গত বছরে ঢাকার গুলশানে জাপানি নাগরিকদের হত্যা করার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে সেখানে একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে।

 টোকিও’র তামাচি এলাকায় ‘তাজমহল’ নামে এক রেষ্টুরেন্ট এর মালিক বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের আহমেদ হোসেইন এর সাথে কথা বলে জানলাম গুলশানের ঘটনা জাপানে অবস্থিত বাংলাদেশীদের খুবই বিব্রত অবস্থায় ফেলেছে। শুধু যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে তা নয়, বরং জাপানের মানুষেরা আগে যেভাবে বাংলাদেশীদের আপন ভেবে বরণ করে নিত, সহজেই হাসি-খুশীতে মেতে উঠত এখন তা যেন কমে এসেছে। জাপানিরা এখন বাংলাদেশীদের দিকে বিশেষ এক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে ঘৃণা না থাকলেও সংশয়, নিন্দার একটা ছাপ স্পষ্ট। এটা সত্যিই হৃদয় বিদারক!


পৃথিবীতে সংঘাত বাড়ছে। অশান্ত জনপদ বিস্তৃত হচ্ছে চারিদিকে। তবে এটাই শেষ নয়। আমাদের দেশ ঘুরে দাঁড়াবে, জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সম্পর্ক আরও উন্নত হবে এমন ভরসা আমার রয়েছে। সন্ত্রাস বা অন্ধকারের অপশক্তির তান্ডবে এই জাতি দীর্ঘকাল নিপীড়িত হবে না। সর্বস্তরে একটা উচ্ছ্বাস, একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আমরা যাঁরা এখনও দরজা-জানালা বন্ধ করে রেখে সে হাওয়ার শীতল পরশ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছি তারা শীঘ্রই নিজেদের ভুল সংশোধন করে নিবেন বলে আমার বিশ্বাস। মানুষের ভেতরে মানবিক চেতনার ¯্রােতধারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। এটাকে কেউ বাধা দিয়ে থামিয়ে রাখতে পারবে না।
জাপান কোন সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়। সেখানে মানুষে মানুষে সম্পদের বৈষম্য প্রকট। কিন্তু মানবিক মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় আমি কোন ভেদ উপলদ্ধি করিনি। জাপানের উন্নয়নের শক্তি হলো একতা। সেখানে মানুষের মধ্যে সমবায়ী মানসিকতা প্রবল। গ্রামে গ্রামে মানুষ যৌথভাবে চাষাবাদ করা থেকে শুরু করে প্রাণী সম্পদ পালন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেরাই গড়ে তুলে নিজেদের এগিয়ে চলার পথ প্রশস্ত করেছে। আমরা আজ যে জাপান দেখে মুগ্ধ হচ্ছি সেটা আসলে প্রায় ৩০০ বছরের এগিয়ে চলার ফসল। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জাপান বদলে গেছে পুরোপুরি। আধুনিকতার পথে তাদের উন্নয়ন এর আগে এতটা হয়নি। জাপান সে সময় ধনী দেশ না হলেও জ্ঞানার্জনের জন্য তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল বলেই আজকের অর্জন সম্ভব হয়েছে।


উন্নয়ন যদি ভেতর থেকে না ঘটে তাহলে কৃত্রিম উপায়ে তা সৃষ্টি করা গেলেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। জাপান সফর থেকে আমি এবং আমার পরিবার যে শিক্ষাটা আবারও গ্রহণ করলাম তা হচ্ছে, জ্ঞানার্জনকে সর্বাগ্রে স্থান দিতে হবে। জ্ঞানের অভাব ঘটলে মনের মহত্ত্ব জন্মাবে কিভাবে? আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে হবে। ভুল বানানের বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়ে সমৃদ্ধ জাতি গড়ে উঠবে না। আমরা এখন আর না খেয়ে মারা যাই না। তবে আমাদের চারপাশে এখনও জ্ঞানের অভাব থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা অনেক। এই মহামারী দূর করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে দায়িত্ব নিতে হবে সমাজকে। জ্ঞানের বিস্তার ঘটলে আমাদের মানুষেরা জাপানসহ দুনিয়ার অন্যান্য দেশে গিয়ে সম্মানের সাথে কাজ করে দেশের জন্য অর্থ উপার্জন করতে পারবে। সেটাই হবে আমাদের টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
সরঃড়হ২০২১@মসধরষ.পড়স
০১৭১১৫২৬৯৭৯



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :