দুপুর ২:৪৪, মঙ্গলবার, ২৩শে মে, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / জান্নাতারার স্কুল
জান্নাতারার স্কুল
এপ্রিল ২৯, ২০১৭

তমসুর হোসেন: জান্নাতারা আজ ডাক্তার আংকেলের কাছে যাবে। বাবার কাছে সে কোনদিন যাবেনা। সেদিন সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। আংকেল তাকে সুস্থ করে তুলেছে। খুব পেট ব্যথা করছিলো তার। ব্যথায় অস্থির হয়েছিলো জান্নাতারা। কোন উপায় না দেখে মা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে।

 

ডাক্তার আংকেল তাকে হাসপাতালের ইনডোরে ভর্তি করে। খুব মনোযোগ দিয়ে ওকে পরীক্ষা করে ডাক্তার আংকেল। তারপর স্যালাইনের সাথে অনো ইনজেক্সন পুশ করেছে তার শরীরে। ঘুমের ইনজেক্সনও দিয়েছে ব্যথার তীব্রতা কমানোর জন্য। খুব জলদি আরাম পেয়েছিলো জান্নাতারা। নেশার মতো গাঢ় ঘুম এসেছিলো তার চোখের গভীরে। ঘুম থেকে যখন সে জেগেছিলো তখন পেটের ব্যথা একটুও ছিলোনা। ব্যথা কমে যাওয়ায় মাকে সে বলেছিলো,
‘মা, চলো বাসায় যাই।’
‘এখন তো বাসায় যাওয়া যাবেনা।’
‘সুস্থ হয়ে গেছি। কেন যাওয়া যাবেনা?’
‘তোমার আংকেল আসুক। উনি যেতে দিলে যাবে।’
‘আংকেল কেন আসেনা?’
‘সময় হলে আসবে।’
‘কখন সময় হবে? আমার যে একটুও ভাল্লাগ্ছে না।’
‘আংকেলের কতো কাজ। কতো রোগী দেখতে হয়!’


বালিশে মুখ গুঁজে চুপ করে শুয়ে থাকে জান্নাতারা। নার্স শরীরের তাপ মেপে গেছে। বিছানার চাদর পাল্টিয়ে ঔষধ দিয়ে গেছে। ওয়ার্ডের সব রোগীরা নাস্তা খাচ্ছে। ওর পেটেও খিদা লেগেছে। কিন্তু ওয়ার্ডবয় নাস্তা দিচ্ছেনা। নার্সকে বেশ কয়েকবার বললো জান্নাতারা,
‘খিদে পেয়েছে। নাস্তা কখন দেবেন আমাকে?’
‘ডাক্তার আসুক। ডাক্তার লিখলে নাস্তা পাবে।’
‘কখন আসবে ডাক্তার?’
‘নয়টা বাজলে আসবে।’
জান্নাতারার মোটেই ভালো লাগছে না। খেতে ইচ্ছে করছে তার। আংকেল এখনও আসছে না। যদি কালকে আংকেল না আসে। অন্য আংকেল যদি খেতে না দেয়। তখন কি করবে জান্নাতারা। মাকে সে বিরক্ত করে। রাতে মা জেগে ছিলো। একটুও ঘুমাতে পারেনি। বাবা আসেনি ওকে দেখতে। বাবার বাড়ির কেউ আসেনি। আর একটা মহিলাকে বিয়ে করেছে বলে বাবাকে ডিভোর্স দিয়েছে মা । কী কালো দেখতে মহিলাটা! একটুও ভালো লাগেনা। ওই বজ্জাত মহিলাকে নিয়ে বাবা কতো ব্যস্ত। ওর অসুখের কথা শুনেও এলোনা বাবা।

 

মা ওকে নিয়ে নানু বাড়িতে চলে গেছে। অনেক দিন হলো নানু বিছানায় শুয়ে থাকে। একটুও উঠতে পারেনা। মামা চাকুরি করে ঢাকায়। নানুর নামে টাকা পাঠিয়ে দেয় মামা। সেই টাকায় খুব কষ্টে নানুর সংসার চলে। তার ওপর মা ওকে নিয়ে নানু বাড়িতে থাকে। ডাক্তার আংকেল ওর অষুধের ব্যবস্থা করেছেন। মায়ের কাছে টাকা নেই। দাদী তাকে কতো ভালবাসত। সে দাদীও দেখতে আসেনি। জান্নাতারা চাদরের নীচে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলে। কখন ডাক্তার আংকেল ওর বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি জান্নাতারা। ওকে দেখে আংকেল বলে,
‘এখনও পেট ব্যথা করে?


কথা বলতে সংকোচ লাগে জান্নাতারার। গলায় জড়তা । মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দেয় সে।
‘ঠিক আছে। অষুধ লিখে দিচ্ছি। এখন মুখে খেতে পারবে।’
‘আংকেল। আমি বাড়ি যাবো।’
এখন যাওয়া যাবেনা। সুস্থ হলে যাবে।’
‘আমি যাবো।’
‘পাগল মেয়ে! এখানে কি অসুবিধা। তোমার অসুখ তো সারেনি।’
‘সেরেছে। বাড়িতে গিয়ে অষুধ খাবো।’


ওর মাথায় হাত দিয়ে বুঝিয়ে বলে ডাক্তার আংকেল। ব্যথা কমলেও রোগ সারতে অনেক বাকি আছে। বাড়ি চলে গেলে রোগ বেড়ে যেতে পারে। তখন অপারেশন করেও সামাল দেয়া সম্ভব হবেনা। আংকেলের কথা অমান্য করতে পারেনা সে। যদি পেটের ব্যথা আরও বেশি হয়। তখন পেট কেটে ভুড়ি বের করলে খুব কষ্ট পাবে সে। খেলার সাথীদের কথা ভাবে জান্নাতারা। কেউ তাকে দেখতে এলোনা। আতিকা, রুবেল, লাবণী, পুজা, মঈনুল একবারও এলোনা দেখতে । নিশ্চুপ পড়ে থাকে সে। রুগীর লোকদের হট্টগোল চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট করে। মারধরের রোগীরা বিছানা আঁকড়ে থাকে শক্ত কাগজ পাওয়ার আশায়।


জান্নাতারার শরীরে জ্বর দেখা দিলো। তার সাথে ঘন ঘন কাশি ডাক্তারকে ভাবিয়ে তুললো। এত জলদি মুখে মেডিকেশন দেয়া ঠিক হয়নি। ব্লাড টেষ্ট করে টাইফয়েড ধরা পড়লো। এখন চলবে দীর্ঘ চিকিৎসা। হালকা খাবার খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়লো সে। ডাক্তার আংকেল প্রত্যহ দু’বার করে দেখতে লাগলো জান্নাতারাকে। জ্বর নামলো সাত দিন পর। আরও পাঁচ দিন পর ছুটি হলো তার। ডিসচার্জ কাগজ লিখে ডাক্তার আংকেল বললো,
‘বাড়ি যাচ্ছো। আমাকে দেখতে আসবেনা?’
‘আসবো।’
‘কখন আসবে।’
‘অষুধ খাওয়া শেষ হলে আসবো।’
‘সময়মতো অষুধ খেও। আর দুষ্টুমি করবে না।’
‘আংকেল। আমাদের বাসায় আসবে।’


দুদিন পর ডাক্তার আংকেল এলো জান্নাতারাকে দেখতে। হেড টিকেট থেকে ঠিকানা জেনে বাড়ি বের করতে পেরেছে। একটা সুন্দর জামা এনেছে আংকেল। কয়েক রকমের ফল। সাথে অনেক কিছু। এসব দেখে মা খুব আপত্তি করলো। কি দরকার ছিলো এসব নিয়ে আসার। মা আংকেলের জন্য খাবার করতে চাইলো। আংকেল কিছুই খেলো না। জান্নাতারাকে  নিয়ে ওদের ছোট্ট গ্রামখানা ঘুরে দেখলো। ওর ছবি তুললো ডাক্তার আংকেল।
‘এতো ছবি কি করবে ?’
‘যখন তোমাকে মনে পড়বে তখন দেখবো।’
‘আমাকে কেন মনে পড়বে আংকেল?’
‘তুমি আমার হারিয়ে যাওয়া মা। মা দেখতে তোমার মতো ছিলো।’
‘ঠিক বলছো ডাক্তার আংকেল?’
‘মাকে মিথ্যে বলতে পারি।’


বাড়ি ফিরে এসে মায়ের বানানো নাস্তা খেলো আংকেল। মাকে অনেক কথা বললো আংকেল। জান্নাতআরার পড়াশুনার বিষয়ে কথা বললো। মায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করে বললো,
‘শোন নাজমা। তোমার নাম ধরে বলছি।’
‘বলুন ভাইজান। আমি আপনার বোনের মতো। নাম ধরলে খুশি হবো।’
‘জান্নাতের পড়ার ভার আমি নিলাম।’
‘আপনি ওকে সুস্থ করে তুলেছেন। এতেই আমি সন্তষ্ট হয়েছি।’
‘এটা আমার কর্তব্য। মন দিয়ে কাজের কথা শোন।’
‘বলুন ভাইজান। মন দিয়ে শুনছি আমি।’
‘কাল থেকে ওয়ার্ডে আসবে। মাষ্টার রোলে আয়ার কাজ করতে হবে।’
‘জ্বি ভাইজান। আপনি যা বলবেন করবো।’
‘জান্নাতের বয়স কতো হলো?’
‘ছয় বছর হলো। দুই এক মাস বেশিই হতে পারে।’
‘কোথায় পড়াবে ভাবছো?’
‘এখনও ভাবিনি। আপনি বলুন কোথায় পড়বে?’


হাসপাতালের পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে জান্নাতারার নাম ভর্তি করা হলো। নতুন বই নিয়ে সে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায় মায়ের সাথে। অটো গাড়ির দুলুনিতে পড়া মনে করতে করতে সে পৌঁছে যায় স্কুলের গেটে। টিফিনের সময় তার খোঁজ নিতে আসে ডাক্তার আংকেল। ওর জন্য টিফিন নিয়ে আসেন তিনি। টিফিন খাওয়া হলে গল্প করে চলে যায় ডাক্তার আংকেল। এবার জান্নাতারাকে খুবই পরিশ্রম করতে হবে। ডাক্তার আংকেল বলেছে তাকে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হতেই হবে। ওর এখন একটাই সাধনা। ক্লাশের বইগুলো বুঝে বুঝে মুখস্ত করে ফেলা। ভালো করে না পড়লে মা বলে ডাকবেনা ডাক্তার আংকেল। ওর মনে খুশির ঢেউ নাচে। বাবা যদি তাকে দেখতে না আসে তাতে দুঃখ নেই। দাদী না আসলেও কষ্ট নেই তার। ডাক্তার আংকেল তার মনের সব বেদনা দূর করে দিয়েছে। এই আনন্দে ভরে গেছে তার ছোট্ট মন।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top