সন্ধ্যা ৬:৪২, মঙ্গলবার, ২৫শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ Today Lead / জঙ্গি আস্তানায় এক শিশুসহ নিহত ৫, বোমার ছড়াছড়ি
জঙ্গি আস্তানায় এক শিশুসহ নিহত ৫, বোমার ছড়াছড়ি
মার্চ ১৬, ২০১৭

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে জঙ্গিদের দ্বিতীয় আস্তানায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শেষ হয়েছে। ২০ ঘন্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে সেখান থেকে এক শিশু ও এক নারীসহ ৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে এক নারীসহ বাকী ৪ জন জঙ্গি বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহত শিশুটি নারী জঙ্গির সন্তান বলে পুলিশ ধারণা করছে। এ অভিযানে ৩ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মীসহ ৪ জন আহত হয়েছে। অভিযান চলাকালে আস্তানার ভিতর থেকে ২০ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান শেষে ভিতরে থাকা বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করার পর আস্তানার দোতলা ভবনটি সীলগালা করে দেয়া হয়েছে।


চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের পৌর এলাকার ৫ নম্বর প্রেমতলা ওয়ার্ডে ‘ছায়ানীড়’ নামের ওই দ্বিতল ভবন বুধবার বিকাল থেকে ঘিরে রেখেছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বিকেল তিনটা থেকে মূলত অপারেশন শুরু হয়।  ছায়ানীড় ভবনের নিচতলায় এই আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালাতে গেলে ভেতর থেকে তিনটি হাতবোমা ছোঁড়ে জঙ্গিরা। এতে সীতাকুন্ড থানার ওসি (তদন্ত) মোজাম্মেলসহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।     রপর পুলিশ পিছু হটে পুরো আস্তানা ঘিরে রাখে। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছে সিএমপির সোয়াত টিম।

রাত ৮টার দিকে সিএমপির সোয়াত এবং জেলা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত টিম গুলি ছুড়তে ছুড়তে সড়ক থেকে আস্তানায় প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় হ্যান্ডমাইকে জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বানও জানায় পুলিশ। কিন্তু জঙ্গিরা ভেতর থেকে গ্রেনেড ছুড়ে প্রতিরোধ করতে থাকে। এই অবস্থায় ঢাকা থেকে পুলিশের বিশেষ টিমকে ঘটনাস্থলে আসার জন্য বলা হয়।


বৃহস্পতিবার ভোর ৫টায় ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় ঢাকার সোয়াত টিম। ডিএমপির সোয়াত টিমের নেতৃত্বে সকাল ৬টা ২০ মিনিটে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ‘অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬’ অভিযান শুরু করে সিএমপি সোয়াত, জেলা পুলিশ, সিএমপির বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, র‌্যাব ও পুলিশের সম্বন্বয়ে গঠিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।


এ সময় সাত থেকে আট মিনিট ধরে টানা গুলির পাশাপাশি সাত-আটটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এক পর্যায়ে প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। কিছুক্ষণ পর পুলিশের ঘেরাওয়ের ভেতর থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে দুই সোয়াট সদস্যকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সোয়াট সদস্যরা পাশের একটি বাড়ি থেকে ছাদ হয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে জঙ্গিরা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে সেখানে বড় ধরনের আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায় বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।     
অভিযান শেষে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি সফিকুল ইসলাম সকাল সোয়া ১০টায় ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত চারটি ডেডবডি সেখানে দেখেছি। তাদের দুজনের শরীরে ছিল সুইসাইড ভেস্ট।

 বিস্ফোরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। দেহগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। দুজন মারা গেছে পুলিশের গুলিতে।”
এই অভিযানে জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে তিন পুলিশ সদস্য এবং গ্রিল কাটতে গিয়ে ফায়ার ব্রিগেডের এক সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) হাবিবুর রহমান বলেন, সর্বশেষ এক শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে ছায়ানীড় নামের দোতলা বাড়ির দেড়-তলার সিঁড়ির মধ্যে। ওই সিঁড়িতেই নারী জঙ্গির মরদেহ পাওয়া যায়।

ধারণা করা হচ্ছে শিশুটির বয়স ৬-৭ বছর এবং নিহত নারী জঙ্গির সন্তান সে। এ নিয়ে সেখানে ৫ জনের লাশ পাওয়া যায়। জঙ্গিদের পরিচয় সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিহত জঙ্গিদের মরদেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। কারও হাত, মাথা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ টেস্ট করা হবে।


তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ২০ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই শ্বাসরূদ্ধকর অপারেশন ‘অ্যাসল্ট ১৬’  সফলভাবে সমাপ্ত করা হয়। এরপর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ অভিযান শুরু  হয় বিকেলে সাড়ে তিনটায়। সন্ধ্যা ছয়টায় বোমা নিষ্ক্রিয়করণ অভিযান শেষ হয়। এরপর সিআইডির ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে। তাদের কাজ শেষে ভবনটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে ডিআইজি সফিকুল বলেন, “জঙ্গিরা দুটি ঘরে ছিল। সেখানে প্রচুর বিস্ফোরক রয়েছে। ছাদেও প্রচুর বোমার মজুদ দেখা গেছে।

দুই তলা ছায়ানীড়ের আটটি ইউনিটের একটিতে আস্তানা গেড়েছিল জঙ্গিরা। বাকি ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সারা রাত আতঙ্কের মধ্যে ভেতরে আটকে থাকতে হয়। সকালে নারী-শিশুসহ ২০ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। সফিকুল ইসলাম বলেন, “সাধারণ নাগরিকদের বের করে আনার জন্য গত রাতে আমরা কয়েকবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে তারা আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানোর পর আবার চেষ্টা শুরু করি। পরে জানালার গ্রিল কেটে বিভিন্ন ঘরের বাসিন্দাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি।


তিনি বলেন, নিহত চার জঙ্গি নব্য জেএমবির সদস্য ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তারা। চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, বুধবার দুপুরে সীতাকুন্ড পৌরসভার লামারবাজার আমিরাবাদের সাধন কুটির থেকে জঙ্গি দম্পতিকে তাদের এক শিশুসন্তান সহ আটক করা হয়। সাধন কুটিরের মালিকই মূলত তাদের ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রেমতলার ছায়ানীড় ভবনে আসে পুলিশ। পুলিশ সুপার বলেন, এটা ছিল আমাদের জন্য একটা দুঃসাহসিক অভিযান।  নিজেদের নিরাপদে রেখে ও জিম্মিদের নিরাপত্তা বজায় রেখে অভিযান চালানো ছিল একটা চ্যালেঞ্জিং কাজ।  ভবনের ভেতরে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ছিল, রোগাক্রান্ত মানুষ ছিল।

 জিম্মিদের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেটাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য।  সবদিক ঠিক রেখে সফলভাবে আমরা অভিযান সম্পন্ন করেছি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোতলা ভবনটিকে প্রতি ফ্লোরে চারটি করে মোট আটটি ও পাশের একটিসহ মোট ৯টি পরিবার বাস করত। এর মধ্যে একটি ফ্ল্যাট জঙ্গিরা ভাড়া নিয়েছিল। বাকি ৮টি পরিবার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান শুরুর পর ভবনে আটকা পড়ে।

তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল কাজ করেছে।  জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়া সবাইকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। এদিকে রাতভর অভিযানকে কেন্দ্র করে সীতাকুে র প্রেমতলাসহ আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি থমথমে ছিল।  সাধারণ মানুষদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করে। স্কুল-কলেজ সহ অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ দেখা গেছে।


‘ছয়ানীড়ের’ জঙ্গি আস্তানায় বোমার ছড়াছড়ি
সীতাকুন্ডের প্রেমতলায় এক জঙ্গি আস্তনায় ২০ ঘণ্টার অভিযান শেষে ভেতরে নানা রকম বোমা ও বিস্ফোরক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।আত্মঘাতী  বিস্ফোরণ ও গুলিতে নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দুইজন নব্য জেএমবির ‘বোমা বিশেষজ্ঞ’ ছিলেন বলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিসি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ছায়ানীড় নামের দ্বিতল ওই বাড়ির সামনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এ বাড়িতে অপারেশনের আগে আমাদের কাছে তথ্য ছিল, এখানে দুইজন লোক আছে, যারা বোমা বানাতে দক্ষ। সে কারণে পুলিশের সোয়াট টিমের প্রবেশে সময় লেগেছে। তিন চার রকমের শক্তিশালী বোমা পাওয়া গেছে ভেতরে।” ছানোয়ার জানান, ভবনের প্রবেশ পথে প্রধান ফটকের কাছে একটি বড় বোমা, বাঁ পাশের প্রথম কক্ষে তোষকের ওপর একটি বড় বোমা, ঘরের দরজার ডান দিকে একটি পাইপ বোমা, ১২ সেট জেল এক্সপ্লোসিভ ও একটি ছোট বোমা পাওয়া গেছে। এছাড়া একটি ব্যাগে পাইপের টুকরো, সুইচ, ব্লাস্টিংস ক্যাপ এবং একটা কার্টনের ভেতরে লিকুইড এক্সপ্লোসিভ পেয়েছেন তাদের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। বিস্ফোরকবোঝাই দুটি সুইসাইডাল ভেস্টসহ চারটি বোমা নিষ্ক্রিয় করেছেন তারা।
বাসা ভাড়া নেওয়া হয় ‘শালা-দুলাভাই’ পরিচয়ে


সীতাকুন্ড পৌর এলাকার প্রেমতলায় ‘ছায়ানীড়’ নামের যে ভবনে আস্তানা গেড়েছিল জঙ্গিরা, ওই বাসা মাসখানেক আগে ‘শালা-দুলাভাই’ পরিচয়ে ভাড়া নিয়েছিলেন দুই ব্যক্তি। দ্বিতল ছায়ানীড়ের প্রতি তলায় চারটি করে মোট আটটি ইউনিট। এর মধ্যে নিচতলার সিঁড়ি লাগোয়া একটি ফ্ল্যাট জঙ্গিরা ভাড়া নেয় মাসখানেক আগে।


ভবন মালিক রেহানা বেগম ছোট ছেলে নাছিরকে নিয়ে থাকেন দোতলার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে। আর বড় ছেলে মো. মহিউদ্দিন তার পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের আকবর শাহ এলাকায় থাকেন। ওই জঙ্গিদের বিষয়ে জানতে রেহানা বেগম ও নাছিরকে সীতাকুন্ড থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। মহিউদ্দিন বলেন, মাঝে মধ্যে ছুটির দিনগুলোতে তিনি মায়ের কাছে আসেন।

 

তবে বুধবার অভিযানের সময় তিনি ওই বাড়িতে ছিলেন না। তিনি বলেন, দুই ব্যক্তি গত মাসে এসে ছয় হাজার টাকায় ওই ফ্ল্যাট ভাড়া করেন। বলেছিলেন, সম্পর্কে তারা শ্যালক-দুলাভাই, কক্সবাজারের রামুতে তাদের রবারের ব্যবসা রয়েছে। “একজনের বয়স হবে ৪০, অন্যজনের ৩০ এর মত। সীতাকুন্ডেও রাবারের ব্যবসা করবেন- এই কথা বলে বাসা ভাড়া নিয়েছিল।


তবে ওই দুই ব্যক্তির কারও নাম বলতে পারেননি মহিউদ্দিন। তার ভাষ্য, বাসা ভাড়ার বিষয়টি তার মা দেখেন, তিনিই নাম জানেন। বাসা ভাড়া দেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র রাখা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে মহিউদ্দিন বলেন, “দু’জনের স্ত্রীসহ চারজন থাকবে বলে জানিয়েছিল। তাদের কাছ থেকে দুটি ভোটার আইডির কপি নিয়েছিল মা। তবে একটি ঝাপসা থাকায় পরে তাদের দুই জনকে পাসপোর্ট সাইজের ছবিও দিতে বলা হয়েছিল। আর বলা হয়েছিল, ব্যবসার মালামাল যেন বাসায় না আনে।” ওই ফ্ল্যাটে বাইরের লোকজন যাওয়া-আসা করত কি না, ভাড়াটেদের আচার আচরণ কেমন ছিল- সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি মহিউদ্দিন।


পাশের নামার বাজার ওয়ার্ডের আমিরাবাদ এলাকায় এক বাড়িওয়ালার কাছ থেকে খবর পেয়ে বুধবার বিকাল ৩টার পর পুলিশের এই অভিযানের সূচনা হয়। ‘সাধন কুটির’ নামের দোতলা ওই বাড়ির নিচ তলা থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ জসিম ও আর্জিনা নামের এক দম্পতিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই কয়েকশ মিটার দূরে প্রেমতলার ‘ছায়ানীড়ে’ এই জঙ্গি আস্তানার কথা জানতে পারেন পুলিশ কর্মকর্তারা।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top