বিকাল ৩:০৪, বৃহস্পতিবার, ২৭শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং
/ শিক্ষা / চারুকলায় নববর্ষ উদযাপন প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে
‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’
চারুকলায় নববর্ষ উদযাপন প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে
এপ্রিল ১০, ২০১৭

আলী আজম সিদ্দিকী : আগামী শুক্রবার পহেলা বৈশাখ। বাকি মাত্র তিন দিন। বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ কড়া নাড়ছে দুয়ারে। নানা আয়োজনে বাঙালির শত বছরের ঐতিহ্যকে বরণ করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর’ স্লোগানে এবারের নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হবে। এছাড়াও এবারের পয়লা বৈশাখে ঢাকা শহরসহ সারাদেশব্যাপী ব্যাপক নিরাপত্তা কর্মসূচী নেওয়া হবে।

বাংলা নববর্ষ-১৪২৪ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন কমিটি। ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন এ কমিটির সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

সভায় কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে শৃঙ্খলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ৩৯ সদস্যবিশিষ্ট শৃঙ্খলা উপ-কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ এবং সদস্য-সচিব সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান। ২৯ সদস্যবিশিষ্ট মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন এবং সদস্য-সচিব মৃৎশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম। সভায় উপ-কমিটিগুলোকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করে উপাচার্যকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

বাংলা নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৯০ সাল থেকে প্রতি বছরই এ শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। অতীতের মতো এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি; চলছে জোর প্রস্তুতি।

সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারুকলা করিডোরে মঙ্গলশোভা যাত্রার প্রস্তুতি পর্বের মহাযজ্ঞ চলছে। প্রায় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী শোভা যাত্রার উপকরণ তৈরি করতে একযোগে কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের নিরলস শ্রম এবং মেধা ও মননের নিখুঁত সংমিশ্রণে তৈরি হচ্ছে নানা শিল্পকর্ম ও চিত্রকর্ম। ভিন্ন ভিন্ন টেবিলের উপর চলছে পটচিত্র, জলরংয়ের চিত্রের কাজ। এ ছাড়া সারিসারি করে রাখা হয়েছে মাটির সরা। সেগুলোর ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে বেশি ব্যস্ত দেখা গেলো চারুকলার শিক্ষার্থীদের। আর সে সব সরাচিত্রে উদ্ভাসিত হচ্ছে পল্লীবধুর মুখচ্ছবি, সাপুড়ে, কাকতাড়ুয়া, হরেক রকমের পাখি, হাতি, লক্ষীপেঁচা, বিড়াল, বাঘসহ বৈচিত্রময় নানা লোকজ অনুষঙ্গ। চারুকলা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আহমেদ রনি জলরংয়ের পেইন্ট করছিলেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত গ্রুপে গ্রুপে এসে বিভিন্ন কাজ করছেন তারা। তিনি আরও জানান, এবারের আয়োজনকে সফল করতে সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচশ ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত পালা করে কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। মাটির পুতুল, বাঘ, মাছ, কাঠের তৈরি গহনা, সুতোর তৈরি পুতুল ও কারুকার্যসহ নানাবিধ ভাস্কর্য তৈরি করছেন তারা। এ সব বিক্রি করে উৎসবের খরচের বিরাট একটি অংশের যোগান দেন তারা বলে জানান তিনি। চারুকলার আরেক ছাত্র সুদীপ্ত সিকদার বলেন, তাদের কাছে যে সব জল রংয়ের পেইন্ট আছে তার মধ্যে পাঁচশ থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা মুল্যেরও আছে। ভাস্কর্য বিভাগে কাজ করছিলেন প্রায় ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে চন্দ্রনাথ পাল জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য তৈরি করছেন। এখন পর্যন্ত আটটি বড় ভাস্কর্যের কাজে হাত দিয়েছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

এর মধ্যে হাতি, ঘোড়া, টেপা পুতুল, নৌকা, মাছ, হরিণ, পাখি, মা ও শিশু বিষয়ক ভাস্কর্য রয়েছে। দিনাজপুরের পটচিত্রশিল্পী পটুয়া নাজির হোসেন জানান, তিনি মূলত চারুকলার ছাত্র নয়। পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। কিন্তু সংস্কৃতির টানে আর ঐতিহ্য লালনের নেশায় তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পটচিত্র আঁকেন। এই ১২ বছরের প্রতিটা নববর্ষে চারুকলায় স্বেচ্ছাশ্রমে পটচিত্র ও সরাচিত্র তৈরির কাজ করেছেন তিনি। তিনি জানান, এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তিনি এই কয়দিনে প্রায় ২০টি সরাচিত্র ও ১৫টি পটচিত্র এঁকেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ৬০ থেকে ৭০ টি চিত্র আঁকার ইচ্ছা আছে তার। পেপার ম্যাশ বিভাগে ব্যস্ত তুহিন দাশ জানান, রাজা-রানীসহ বিভিন্ন আকারের ৫০-৬০টি পেপার ম্যাশ তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে রাজা-রানীর পেপার ম্যাশ জোড়ার মূল্য ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অন্যগুলো ৪/৫ হাজার টাকা এবং ছোটগুলো পাঁচশ টাকায় বিক্রি হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে শুধু বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা হিসেবে চিন্তা করা ঠিক হবে না জানিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষিজীবী মানুষদের একটি উৎসব হলো পয়লা বৈশাখ। তাদের এ উৎসব ঘিরে যে সব সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে সেটা আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে উপস্থাপন করি। এ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় দেশবাসীর মঙ্গল কামনা করে।

আমরা জানি রাজধানীর জীবনে বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার তেমন সুযোগ থাকে না। আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে নগরবাসীকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করি।’ মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের লোকসংস্কৃতির উৎসব; সার্বজনীন উৎসব। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে টানাটানি করলে চলবে না।’



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top