সকাল ৮:৩৫, সোমবার, ২৪শে জুলাই, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করা যুক্তিযুক্ত
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করা যুক্তিযুক্ত
মার্চ ১৯, ২০১৭

রিপন আহসান রিটু : চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ছে না! পড়ালেখার সময় বাড়ছে। বাড়ছে চাকরি প্রাপ্তির জটিলতা। দেশে বাড়ছে বেকার সংখ্যাও সমানতালে। সরকারি চাকরির বয়স চলে গেলে অর্থাৎ তিরিশোর্ধ্ব যে কোন তরুণ ভাবতে শুরু করেন যে তিনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন! তার জীবনের আর কোনো আশা নাই! এতে তার মনের ওপর যে চাপ পড়ে, তাতে উদ্যম ও কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলা বিচিত্র নয়। বয়স হয়ে যাওয়া আর চাকরি না পাওয়াদের ‘দূর দূর’ করার মত লোকেরও অভাব এই দেশে কম নেই। যার সরকারি চাকরির বয়স গেছে বেসরকারি খাতেও তার কদর নেই।

 অথচ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে যে রূপ বিশৃংখলা তাতে ২৭-২৮ বৎসর চলে যায় লেখাপড়া শেষ করতে। চার বৎসর কোর্স শেষ করতে সাত বৎসর লেগে যায় এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে। সর্বাধিক সংখ্যক তরুণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে অধ্যয়ন করেন। সেখানে সেশনজট কত প্রকার এবং কত দীর্ঘ তা কমবেশি সকলেই জানেন। এমতাবস্থায় পাস করে বের হওয়ার পর দম নিতে না নিতেই তারা দেখতে পান যে সরকারের নির্ধারিত যৌবন সূর্য অস্তাচলগামী এবং দেখতে দেখতে তাদের দিবাবসান ঘটে যায়। তারপর থাকে শুধু বয়স পেরুনো নিরাশার বালুচর। অথচ বাস্তবে তিরিশ হতে চল্লিশই হলো যৌবনের মুখ্য সময়।


অন্যদিকে আমাদের বয়সের হিসাব ও বিবেচনার মধ্যেও রয়েছে গরমিল এবং স্ববিরোধিতা। আঠার বৎসর না হওয়া পর্যন্ত আমরা প্রাপ্তবয়স্ক ধরি না। তার পরে মাত্র ১২ বসন্তে যৌবন শেষ! অতঃপর প্রৌঢ়কাল তিরিশ হতে ঊনষাট, কারো ষাট, কারো পঁয়ষট্টি। সরকারি চাকরির অবসরের বয়স করা হয়েছে ঊনষাট। মুক্তিযোদ্ধাদের বেলায় ষাট। কোনো কোনো চাকরিতে রিটায়ারমেন্টের বয়স করা হয়েছে ৬৫ বৎসর। আর চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে নিয়োগের বেলায় তো বয়সের কোনো বালাই-ই নাই। বিপত্তি যত চাকরিতে প্রবেশের বেলায়। নবম জাতীয় সংসদের শেষ দিকে মহাজোট সরকারের চমক হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক নির্দেশনা দেয়া হয়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে এ প্রস্তাবের পক্ষে বিভিন্ন জেলা-প্রশাসকরা সমর্থনও দিয়েছিলেন।

 প্রথম দিকে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কথাবার্তাই পরিবেশিত হতো। দশম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ বহু এমপি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর বিষয়ে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন এবং প্রায় প্রতিটি  অধিবেশনেই এ ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় একটি বিষয় সংসদে এত বার ওঠার পরও কেন তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না তা ছিল বড় বিস্ময়কর! কিন্তু সব কথা, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশেষে ঘোষণা দিলেন চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হবে না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যার নয়ে হয়না তার নব্বইয়ে হয়না এতে সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা হতাশ হয়েছেন। এর কারণ হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  দেখালেন-


১। সেশনজট কমে গেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সঠিক সময়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে এবং যথাসময়ে ফলাফল প্রকাশ হচ্ছে।  
২। ২২-২৩ বছরে মাস্টার্স শেষ করে ৩০ এর আগে ৭-৮ বছর সময় পাওয়া যাবে চাকরিতে প্রবেশের জন্য।
৩। যার নয়ে হয় না, তার নব্বইএ ও হয়না অর্থাৎ ৩০ বছরের মধ্যে যারা চাকরিতে প্রবেশ করতে না পারবে তার সারা জীবন চেষ্টা করেও পারবে না।


প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে আমার মত অনেকেই হয়তো একমত হবেন না। প্রথমত সেশনজট নেই বা কমে গেছে সেটা পুরোপুরি সঠিক নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৩-০৪ সেশনের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা ২০০৪ সালে কিন্তু মাস্টার্সের রেজাল্ট পাবলিস্ট হয় ২০১১ এর শেষের দিকে। ০৪-০৫ সেশানের মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা ০৯- এ কিন্তু এই রেজাল্ট পাবলিষ্ট হয় ২০১৩ সালে। ২০১৩ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা ২০১৬ সালে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে দেখা যায় একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকে ৩-৪ বছর অবলীলায় হারিয়ে যায়।

 বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেশনজট নিরসনের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন হচ্ছেনা খুব একটা। সেশনজট মুক্ত হলেও একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করতে বয়স দাঁড়ায় ২২-২৩ বছর। অতঃপর তার হাতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় থাকে ৭-৮ বছর। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপট তো আর এতটা সহজ সরল নয়। সরকারের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে পরিপূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সরকারী চাকরিতে ৫৫% কোটার মাধ্যমে নিয়োগ হয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোন কোটা নাই। কোটা-ধারিরা চাকরিতেও কোটা পায়, আবার বয়সও তাদের শিথিলযোগ্য। এ ছাড়া প্রতি বছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে পড়াশোনার পর্ব শেষ করে চাকরি প্রাপ্তি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে পরিমাণ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছেনা।


প্রশ্ন হচ্ছে চাকরি থেকে অবসরের সীমা যদি বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে, তাহলে চাকরিতে প্রবেশের সীমা কেন বাড়বেনা? কি যুক্তি আছে এর পেছনে? এটা কি সামঞ্জস্যহীন একটা ব্যাপার হয়ে গেলনা? তার উপর আমাদের সারা পৃথিবীর মত এদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় আয়ু যখন ৪৫ বছর ছিল তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ বছর, গড় আয়ু যখন ৫০ বছর হল তখন ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত হল। আর এখন গড় আয়ু ৭১ বছর। তবুও কি বয়স বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না? মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও উপজাতীয় কোটার প্রার্থীদের বয়স ৩২ বছর। এ ছাড়া জুডিসিয়াল ও ডাক্তারদের ৩২ বছর এবং নার্সদের ৩৬ বছর। তাহলে মেধাবীদের কেন ৩০ বছরের বেশি নয়? মেধাবীরা কি দেশের বোঝা? আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে চিত্রটা একটু ভিন্ন দেখা যায়। আমাদের দেশের তুলনায় তারা অনেক বেশি বয়সে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পায়।

 ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, এ ছাড়া বিভিন্ন প্রদেশে বয়সসীমা ৩৮ থেকে ৪০ বছর। শ্রীলংকায় ৪৫,  ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫,  ইতালিতে ৩৫-৩৮, ফ্রান্সে ৪০, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১৮, ১৮ ও ১৬ এবং সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত। আফ্রিকায় চাকরি প্রার্থীদের বয়স ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বয়সে আবেদন করা যায়। রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যে যোগ্যতা থাকলে অবসরের আগের দিনও যে কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স কমপক্ষে ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের উর্ধে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়।


আমরা আজ বিশ্বায়নের যুগে বসবাস করছি। নিজেদের সব কিছুকে উন্নত বিশ্বের সাথে তুলনা করছি। যে সকল বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের এগিয়ে নেয়ার কথা ভাবছি। অনেক ক্ষেত্রে আমরাও অন্যান্য দেশের অনুসরনীয় হচ্ছি। তাহলে চাকরি প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের পিছুটান কিসের?  চাকরি হবে নিজ যোগ্যতা বলে। জীবনের যে বয়সে যদি যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া যায় তাহলে চাকরিতে প্রবেশের জন্য বয়স কোন বাঁধা হওয়ার কথা নয়। এই সিস্টেমটিই বর্তমান অগ্রসরমান পৃথিবীর জন্য নেতিবাচক আসুন আরো হিসেব দেখি; পূর্বে জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ১৪ বছরে এস.এস.সি. পাস করা সম্ভব হত। তখন ডিগ্রি অনার্স কোর্স ছিল ৩ বছর এবং ডিগ্রি (পাস) কোর্স ছিল ২ বছর ফলে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে স্নাতক পাস করা যেত। ফলশ্রুতিতে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে বিসিএস সহ পি.এস.সির অন্যান্য চাকুরীগুলোতেও আবেদন করা যেত।

 বর্তমানে ৬ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তির বিধান নির্দিষ্ট হওয়ার ফলে ১৬ বছর ৩ মাস বয়সে এস.এস.সি. পরীক্ষা দিতে হয়। নন-ক্যাডারে পি.এস.সি.’র ক্ষেত্রে যে প্রজ্ঞাপন তাতে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮ বছর। কিšুÍ ১৮ বছর বয়সে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কিভাবে শেষ হয়? ২ বছর মেয়াদী ডিগ্রিও এখন নেই। ১৬ বছর ২ মাসে এস.এস.সি., ১৮ বছর ৪ মাসে এইচ.এস.সি. ও ১৮ বছর ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলে ১৯ বছর বয়সে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করলে ২৩ বছরের পূর্বে কখনো অনার্স শেষ করা সম্ভব না।

 তাহলে পিএসসি কোন যুক্তিতে চাকরির আবেদনের শুরুর বয়স ২১ থাকবে? ১৬ বছর এখন নির্দিষ্ট (এস.এস.সি.’র ক্ষেত্রে)। নন-ক্যাডারে পিএসসি’র ক্ষেত্রে ১৮ বছর এই চলমান আইনটি এখন অকার্যকর। ক্যাডারের ক্ষেত্রে ২১ বছরের আইনটিও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এই অকার্যকর আইন এখনো প্রয়োগ করে ছাত্র সমাজকে চরম ভাবে ঠকানো হচ্ছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে  বিচার করলে ২৩ বছর হচ্ছে চাকরিতে আবেদনে শুরুর বয়স, যদি তাই হয়, পূর্বের ন্যায় যদি আমাদের (১৮-৩০) অর্থাৎ ১২ বছর সময় দেওয়া হয় তাহলে সহজ হিসাব ২৩ এর সাথে আমাদের সুযোগ ১২ বছর যোগ করলে ২৩+১২=৩৫ বছর। এই অকার্যকর আইনগুলো সংশোধন করলেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩৫ বছরই যুক্তিযুক্ত। কমপক্ষে ৩৫ বছর চাকরির ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।


আজকের এই লেখার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয় আবেদন বেকারদের দু:খটা একটু বোঝেন। বেকারত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিন লক্ষ লক্ষ যুবককে। বিশ্বায়নের এই যুগে সমগ্র বিশ্বের সাথে সমান তালে পা ফেলে চলার সুযোগ করে দিন আমাদের। চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা বাড়ান। আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করব আপনাকে।
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top