সকাল ১১:১২, মঙ্গলবার, ২৩শে মে, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / চলনবিল নামে নতুন জেলা হোক
চলনবিল নামে নতুন জেলা হোক
জানুয়ারি ৫, ২০১৭

 


আর্থিক দৈন্যতা চলনবিলের বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যা। এরও মূল কারণ অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখানকার শতকরা নব্বই জন কৃষক ও ধীবর দারিদ্র সীমার নিচে জীবনযাপন করে। চলনবিল মধ্যস্থ নদী নালা, খালা-বিলে পলি জমায় গ্রীম্মকালে পানির অভাবে কৃষিক্ষেত্রে জলসেচনে বিরাট সমস্যা দেখা দেয়।

 এই সময়ে নদী-নালা ও খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ার বাংলার মাছের ডিপো চলনবিলে দেখা দেয় মৎস্যাভাব। চলনবিল অঞ্চলের কৃষকগণ তাদের উৎপাদিত শস্যের ন্যায্য মূল্য পায় না যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধা হেতু। চলনবিল অঞ্চলে এমন বহু ইউনিয়ন রয়েছে, যেখানে আদৌ কোন পাকা রাস্তা নেই। মান্ধাতা আমলের চলাচল-অযোগ্য কাঁচা রাস্তায় নেই প্রয়োজনীয় ব্রিজ ও কালভার্ট। যোগাযোগের অব্যবস্থাই চলনবিল অঞ্চলের সমস্যা। বর্তমান উন্নত বৈজ্ঞানিকযুগেও চলনবিলের বিশ লক্ষ লোক উন্নত সুবিধাবঞ্চিত হয়ে কর্দমাক্ত বা ধূলিঢাকা পথে পদব্রজে বা গো-শকটে এখনও যাতাযাত করছে। একমাত্র ভবিতব্য জানে কবে আসবে তাদের সুদিন।

 
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনবিল। চলনবিলের নাম শুনলেই চোখের সামনে বিশাল দিগন্তজুড়ে জলরাশির ছবি ভেসে ওঠে এক পলকে। মুহূর্তের মধ্যে  মন হারিয়ে যায় পাল তোলা নৌকা, জলের বুকে মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে পড়া ঢেউ, দিগন্ত রেখায় সবুজ অরণ্য, দূর থেকে দেখা যায় ছোট ছোট ঘর- এ সবই চলনবিলের চিরচেনা দৃশ্য। ঐতিহ্যের দিক থেকে দেশ তথা উপমহাদেশজুড়ে এই বিলের সুনাম ও পরিচিতি রয়েছে ব্যাপকভাবে। সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ চলনবিলকে জেলা হিসেবে দেখতে চায় চলনবিলবাসী। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর এই তিনটি জেলার ০৯ টি উপজেলা, ০৮ টি পৌরসভা, ৭৬ টি ইউনিয়ন পরিষদ, ২৭,৭১৫ বর্গ কিলোমিটার (প্রায়) আয়তন নিয়ে চলনবিল বিস্তৃৃত। ০৯ টি উপজেলার লোকসংখ্যা প্রায় ২৫,০৭,৬৪৫ জন।

 
“বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম আর শিব দেখতে তালম”। চলনবিলের সর্বত্র এই প্রবাদ ছড়িয়ে আছে মাঝিমালার ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। দেশের বৃহত্তম বিল, মৎস্য ভান্ডারখ্যাত বিল এবং পাখিদের অভয়ারণ্য লীলাভূমি প্রাকৃতিক সৌদর্যের অপরূপ সৃষ্টি বাংলাদেশের চলনবিল। ব্যস্ততম শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পাবার মতো নিরিবিলি পরিবেশে মায়াবী হাতছানির এক অনুপম দৃশ্য ঐতিহাসিক চলনবিল ঠিক যেন শীতের চাদরে মোড়ানো উঞ্চ পরশ। আমাদের সেই প্রিয় চলনবিলকে বাংলাদেশের বুকে তুলে ধরেছিলেন এমনই এক ব্যক্তি যাঁর নাম মরহুম অধ্যক্ষ এম,এ হামিদ। চলনবিলের সচেতন মানুষের মনে হৃদয়ে  তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন।।

 কিন্তু তাঁর একটি বড় স্বপ্ন ছিল । চলনবিলের মানুষের মনে সে স্বপ্ন তিনি গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিলো চলনবিল নামে একটি পৃথক জেলা প্রতিষ্ঠা করা। উল্লেখ্য, দেশের পার্বত্য অঞ্চল, উপকুলীয় এলাকা, হাওর অঞ্চল ও বরেন্দ্র এলাকা বিভিন্ন সময়ে নানা বিবেচনায় জাতিয় উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া হলেও চলনবিলকে ঘিরে কখনও কোন উন্নয়ন পরিকল্পণা গৃহীত হয়নি যা চলনবিলবাসীর জন্য বেদনা ও দু:খের কারণ। অধ্যাপক এম.এ হামিদের জীবনীভিত্তিক স্মারক গ্রন্থ “চলনবিল রতœ” বইটিতে সাঈদুর রহমান সাঈদ লিখেছেন, হামিদ সাহেব তাঁর বিভিন্ন লেখালেখি এবং আলোচনায় সদা সর্বদা তুলে ধরতেন “চলনবিল জেলা” নামে একটি পৃথক জেলা  প্রতিষ্ঠার কথা।

 এ লক্ষে তিনি চলনবিলের প্রাণ কেন্দ্র তাড়াশ উপজেলায় ‘চলনবিল ভবন’ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। গঠন করেছিলেন ‘চলনবিল একাডেমির’ আহ্বায়ক কমিটি। তাঁর ইচ্ছা ছিল চলনবিল এলাকার সকল উপজেলায় চলনবিল একাডেমির শাখা গঠনপূর্বক চলনবিল জেলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বেগবান করা। রূপরেখা ছিল বর্তমান চলনবিলের সাড়ে ৯শ বর্গ কিলোমিটার এই জেলার আওতাভুক্ত হবে। ফলে তিনি চলনবিল ভবন নির্মাণের জন্য ও চলনবিল একাডেমি গঠনের জন্য বেশ কয়েকটি মিটিং করেন। এর মধ্যে চলনবিলের আরেক গুণীজন ডা: আলী আকবরকে সাহেবকে সংবর্ধনা দেয়া হয় ১লা জানুয়ারি ২০০০ সালে। ডা: আলী আকবর তাড়াশে চলনবিল ভবন নির্মাণের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন।

 এই নিয়ে একাডেমির আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক রাজুৃ এবং যুগ্ন-আহ্বায়ক সৈয়দ সাঈদুর রহমান সাঈদ দফায় দফায় ডা: আলী আকবরের সাথে বৈঠক করেন। এতে তাড়াশে তিনতলা বিশিষ্ট চলনবিল ভবন নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা, সাইট সিলেকশন ও জমি ক্রয়ের জন্য খোঁজাখুঁজি চলছিল। দূর্ভাগ্যবশতঃ তালুকদার আলী আকবর ২০০০ সালের মে মাসে ইন্তেকাল করেন। ফলে ভবন নির্মাণ এবং একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজ পিছিয়ে যেতে থেকে। এরপর  ২০০৪ সালে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায় চলনবিল ভবন, চলনবিল একাডেমি এবং চলনবিল জেলা গঠনের আন্দোলন।”
চলনবিল জেলা কেন প্রয়োজন? অধ্যক্ষ এম.এ. হামিদ বিলচলনী ২০০০ সালে প্রথম ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে তাড়াশ থেকে প্রকাশিত “মাতৃপ্রেম ঃ বিশ্ব স্বীকৃতি” বইটিতে লিখেছিলেন- বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনবিল। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলাত্রয়ের আটটি থানা বা উপজেলাব্যাপী চলনবিল অঞ্চল বিস্তৃত। নাটোর জেলার সিংড়া, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম, সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও উল্লাপাড়া (৫টি ইউনিয়ন) এবং পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর সর্বমোট আটটি উপজেলার দেড় সহস্রাধিক গ্রাম চলনবিল এলাকার অন্তর্ভূক্ত।


বর্তমানে চলনবিলের বিশাল বপু সঙ্কুচিত হয়ে সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলার উল্লেখিত আটটি উপজেলার নয় শত বর্গ মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলের দেড় হাজার গ্রামে বিশ লক্ষাধিক লোক বাস করেন। এককালে চলনবিল অঞ্চলের শতকরা ৮০ ভাগ এলাকা বছরব্যাপী জলমগ্ন থাকতো। এখনও বর্ষাকালে চলনবিল অঞ্চলের অর্ধেক আবাদী জমি অথৈ পানির নীচে ডুবে থাকে। তার বুকের উপর দিয়ে ছুটে চলে উত্তাল উন্মত্ত ঢেউ। তখন কত নৌকা ও তার আরোহী যে সলিল-সমাধি লাভ করে কে রাখে তার হিসাব।


১৮৬১ সালে সর্বপ্রথম চলনবিলের চাটমোহরে রাজা সি.এন ও বাবু এস. এন হাই স্কুল স্থাপিত হয়। এরপর অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে চলনবিলের আটটি থানার মধ্যে দ্বিতীয় কোন হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯১৩ সালে সিংড়া থানায় চৌগ্রাম হাই স্কুল এবং ১৯২১ সালে রায়গঞ্জ থানার চান্দাইকোনা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই তিনটি হাই স্কুল ব্যতীত ১৯৪০ সাল পর্যন্ত চলনবিল এলাকায় আর কোন হাই স্কুল গড়ে ওঠেনি। ১৯৪১ সালে গুরুদাসপুর থানার চাঁচকৈড়ে নাজিমুদ্দিন হাইস্কুল স্থাপিত হয়। তখন পর্যন্ত তাড়াশ ও বড়াইগ্রাম থানায় কোন হাই স্কুল ছিল না।

 বর্তমানে প্রতি থানা ও  ইউনিয়নে অনেক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের দৈনদশা চলনবিল অঞ্চলের জনগণের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে পড়েছে। একমাত্র সিংড়া জি.এ কলেজ ও সিংড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ব্যতীত চলনবিল অঞ্চলে আর কোন দ্বিতীয় সরকারি কলেজ বা হাই স্কুল নাই। ঢিমেতেতালা গতিতে চলছে এই এলাকার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সমূহ।


আর্থিক দৈন্যতা চলনবিলের বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যা। এরও মূল কারণ অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখানকার শতকরা নব্বই জন কৃষক ও ধীবর দারিদ্য সীমার নিচে জীবন যাপন করে। চলনবিল মধ্যস্থ নদী নালা, খাল বিলে পলি জমায় গ্রীষ্মকালে পানির অভাবে কৃষিক্ষেত্রে জলসেচনে বিরাট সমস্যা দেখা দেয়। এই সময়ে নদীনালা ও খালবিল শুকিয়ে যাওয়ায় বাংলার মাছের ডিপো চলনবিলে দেখা দেয় মৎস্যাভাব। চলনবিল অঞ্চলের কৃষকগণ তাদের উৎপাদিত শষ্যের নায্য মূল্য পায় না যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধা হেতু। চলনবিল অঞ্চলে এমন বহু ইউনিয়ন রয়েছে, যেখানে আদৌ কোন পাকা রাস্তা নাই। মান্ধাতা আমলের     চলাচলঅযোগ্য কাঁচা রাস্তায় নাই প্রয়োজনীয় ব্রীজ ও কালভার্ট। যোগাযোগের অব্যবস্থাই চলনবিল অঞ্চলের সবচেয়ে প্রকট সমস্যা। বর্তমান উন্নত যুগেও চলনবিলের বিশ লক্ষাধিক  মানুষ  উন্নত সুবিধা বঞ্চিত হয়ে কর্দমাক্ত বা ধুলিঢাকা পথে পদব্রজে বা গো-শকটে এখনও যাতাযাত করছে। একমাত্র ভবিতব্য জানে কবে আসবে তাদের সুদিন।


অধ্যক্ষ এম.এ. হামিদ স্যার আর নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন আছে, মৃত্যু পথেও তিনি অনেকের কাছে বলেছেন চলনবিল জেলা দেখে যেতে পারলাম না, এটাই আফসোস রইলো। একদিন দেখবে চলনবিল জেলা হবে, তোমরা চেষ্টা করে যাও। হামিদ স্যারের চেষ্টা থেকেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। তাছাড়া কস্মিনকালেও চলনবিলের সর্বাঙ্গীন উন্নতি সম্ভব নয়। পশ্চাৎপদ চলনবিলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য চলনবিল অঞ্চলে একটি নতুন জেলা গঠন করা একান্ত প্রয়োজন। যার নামে হবে চলনবিল। মামনীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ সরকার কাছে ‘চলনবিল’ নামে পৃথক জেলা গঠন করার দাবী বিশ লক্ষ চলনবিল বাসিন্দার।
লেখক ঃ কবি-সম্পাদক
যধফরঁষৎরফড়ু@মসধরষ.পড়স
-০১৭১৫৬৫৯৯৭০



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top