রাত ১১:১৭, শনিবার, ২৪শে জুন, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / চলচ্চিত্রে রোমেনা আফাজ
চলচ্চিত্রে রোমেনা আফাজ
ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬

 

 

 

 

 

আব্দুস সামাদ পলাশ

২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বরেণ্য লেখিকা রোমেনা আফাজ-এর ৯০তম জন্মজয়ন্তী। পুন্ড্রনগরী খ্যাত বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করে রোমেনা আফাজ ধন্য হয়েছিলেন আর বগুড়াবাসীকে করেছে গর্বিত।

 রোমেনা আফাজ-এর সহজিয়া লেখুনি দ্বারা হাজারো পাঠকদের করেছেন মুগ্ধ। ষাট দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে বেশ কিছু সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র দর্শকদের মাঝে আলোড়ন তুলেছিল। তার মধ্যে রোমেনা আফাজ-এর উপন্যাস ‘কাগজের নৌকা’ ব্যাপক ভাবে সাড়া ফেলেছিল। বাংলাদেশের বরেণ্য চলচ্চিত্রকার বগুড়ার কৃতিসন্তান সুভাষ দত্ত ‘কাগজের নৌকা’ উপন্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছিলেন।

 ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং গীতিকারের কাজটি করেছিলেন সদ্য প্রয়াত কবি সৈয়দ শামসুল হক। ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রের গল্পের গাথুনি কবি সৈয়দ শামসুল হক এমন ভাবে মজবুত করেছিলেন সেই সময় ‘কাগজের নৌকা’ দেখতে গিয়ে দর্শক হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকা সুচন্দা অভিনয় করে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিলেন। নায়ক চরিত্রে অভিনয় করে সৈয়দ হাসান ইমাম এবং আকতারও দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। রোমেনা আফাজ-এর ‘কাগজের নৌকা’ উপন্যাস দিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র আবির্ভাব ঘটে।

 তারপর ‘মোমের আলো’ উপন্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপদেন পরিচালক মোস্তফা মেহমুদ। ‘মোমের আলো’ এতই জনপ্রিয় হয়েছিল মোস্তফা মেহমুদকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এরপর রোমেনা আফাজ-এর ‘মায়ার সংসার’ উপন্যাসটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মোস্তফা মেহমুদ। এই ‘মায়ার সংসার’ চলচ্চিত্রে সেই সময়কার নায়ক বিখ্যাত সংবাদ পাঠক সরকার কবির উদ্দিন এবং নায়িকা চরিত্রে রূপভান খ্যাত সুজাতা মনপ্রাণ ঢেলে অভিনয় করেন।

 মোস্তফা মেহমুদ রোমেনা আফাজ-এর উপন্যাসের প্রতি এতই দূর্বল হলেন যে তিনি একে একে নির্মাণ করলেন জনপ্রিয় নায়িকা শাবানা ও নায়ক আলমগীর অভিনীত ‘মধুমিতা’ চলচ্চিত্রটি। ‘মধুমিতা’ নির্মাণ এবং মুক্তির পরপরেই মোস্তফা মেহমুদ হয়ে যান বাংলাদেশের একজন সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্রকার। সত্তর দশকে আবারো মোস্তফা মেহমুদ রোমেনা আফাজ-এর অন্যতম উপন্যাস ‘মাটির মানুষ’ জনপ্রিয় নায়িকা রোজিনা ও নায়ক আলমগীরকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেই সময় ‘মাটির মানুষ’ চলচ্চিত্রটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তার কারণ কাহিনীটি মাটির মানুষদের নিয়ে।

 এতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী একটি অংশে জড়িত ছিল। তারপর আশির দশকে বাংলাদেশের ড্যাশিং হীরো খ্যাত মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা) নির্মাণ করেন রোমেনা আফাজ-এর সাড়া জাগানো গোয়েন্দা কাহিনী ‘দস্যু বনহুর’। বনহুর চরিত্রে অভিনয় করেন মাসুুদ পারভেজ (সোহেল রানা)। মূল নারী চরিত্র মনিরার ভূমিকায় অভিনয় করেন সেই সময়ের নৃত্যশিল্পী ও জনপ্রিয় নায়িকা অঞ্জনা। যদিও ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ-এর মত ‘দস্যু বনহুর’ চলচ্চিত্রটি দর্শকের মধ্যে তেমন সাড়া ফেলতে পারেন নি। রোমেনা আফাজ-এর সাহিত্য নিয়ে সর্বমোট ৬টি চলচ্চিত্রে রূপ পায়। ৬টি চলচ্চিত্রই সেই সময়ে সুপারহিট ব্যবসা সফল হয়েছে। এর কারণ হল গল্প বিন্যাস, সঙ্গীত ও অভিনয়। ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রে সদ্য প্রয়াত কবি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা গানগুলি এখনো কানে বাজে।

‘মধুমিতা’ চলচ্চিত্রে ‘ও গো মোর মধুমিতা’ গানটি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে সবার মুখে মুখে গাইতে শুনেছি। ‘মধুমিতা’ চলচ্চিত্রে আরেকটি জনপ্রিয় গান প্রয়াত শিল্পী শেফালী ঘোষের ‘তুমি যে আমার জীবনের উপহার কী করে আমি ভুলব’ মানুষ এখনো মনে রেখেছে। এ প্রজন্মের শিল্পীরাও এই গানগুলি গেয়ে সুনাম অর্জন করছে। ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রে নায়িকার কাছ থেকে প্রেমে প্রত্যাখ্যানে আঘাত পাওয়ার দৃশ্য সৈয়দ হাসান ইমামের অভিনয় আজও আমার মনে দাগ কাটে।

 সেই সময়কার সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র সহ যে সব চলচ্চিত্র নির্মিত হত সে সব চলচ্চিত্রে না থাকত অশ্লীলতা, না থাকত ভালগার কোন দৃশ্য। মানুষ স্বপরিবারে সে সব চলচ্চিত্র উপভোগ করতো। সে সময় ওপার বাংলার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, ড. নিহার রঞ্জন গুপ্ত-এর অনেক জনপ্রিয় কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এপার বাংলার অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে রোমেনা আফাজ-এর দাপটও কম ছিল না।

 শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘দেবদাস’ যে রকম আলোড়ন তুলেছিল, সে রকম এপার বাংলার রোমেনা আফাজ-এর ‘কাগজের নৌকা’ এবং ‘মোমের আলো’ দর্শক মহলে ঝড় তুলেছিল। সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র গুলি শুধু যে বিনোদনের জন্য নির্মিত হয়েছে তা কিন্তু নয়। এই সব চলচ্চিত্র থেকে মানুষ অনেক ম্যাসেজ পেয়েছে। চলচ্চিত্রের ব্যবসা তখন ভাল ছিল। মাঝে কিছু অসাধু পরিচালক ও প্রযোজকদের কারনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দর্শকের ধস নেমেছে। এর কারণ এদেশে সাহিত্য নিয়ে কেউ চিন্তা ভাবনা করে না। সে দিক থেকে প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম অনেক জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন এবং বেঁচে থাকতে তাঁর সুনাম দেখে গেছেন। তিনি জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

 বর্তমানে চ্যানেল আই (ইমপ্রেস টেলিফ্লিম) বেশ কিছু সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এখন পরিচালক ও প্রযোজকরা যদি একটু সচেতন হন এবং সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তাহলে হয়তো চলচ্চিত্রে আবার সুবাতাস বইতে পারে। যারা সটকাটে তামিল সিনেমার কাহিনী নকল করে চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন তাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমি বলব, নকল করে বেশি দুর অগ্রসর হওয়া যায় না। হয়তা সস্তা জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন, মনে রাখবেন এই জনপ্রিয়তা বেশি দিন ধরে রাখতে পারবেন না।

 আমাদের এপার বাংলার প্রয়াত সুভাষ দত্ত, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, মোস্তফা মেহমুদ’রা যা দিয়ে গেছেন এই বাংলা চলচ্চিত্রে, তা ফিরে আনতে গেলে অবশ্যই সাহিত্যের প্রতি নির্ভরশীল হতে হবে। শুধু রোমেনা আফাজ নয়, এদেশে রাবেয়া খাতুন, প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক সহ আরো অনেক খ্যাতিমান লেখক আছে যাঁদের কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব। আমার মনে পড়ছে শহীদুল্লাহ্ কায়ছার-এর উপন্যাস ‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রের কথা। যা পরিচালনা করেছিলেন প্রয়াত আব্দুল্লাহ্ আল মামুন।

এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে ইতিহাসের মাইল ফলক হয়ে থাকবে। এই দেশে সাহিত্যের ভান্ডার থেকে কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্রের সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে এলে এদেশের চলচ্চিত্র আবার নতুন করে আলোর মুখ দেখবে। রোমেনা আফাজ-এর ইচ্ছে ছিল তাঁর লেখা দু’টি উপন্যাস ‘কুন্তি বাঈ’ ও ‘কুমারী বধূ’ চলচ্চিত্রে রূপায়ন করা। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকতে সেটা সম্ভব হয় নি। এখন এই দু’টি উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র এবং মঞ্চের জন্য প্রাথমিক কাজ নিয়ে আমরা ব্যস্ত আছি। আমরা চাই রোমেনা আফাজ তাঁর লেখুনির মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকুক।

 প্রজন্মের পরিবর্তন আসবেই। তাঁর মানে এই নয় যে আমরা নতুন প্রজন্মরা অতীতকে ভুলে গিয়ে নতুন কিছু করব। আমরা যাই করি না কেন অতীতকে সামনে নিয়ে করতে চাই। অতীত থেকেই আমরা শিক্ষা নিব। রোমেনা আফাজ এখনো বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি বেঁচে থাকতে অনেক সম্মাননা পেয়েছেন কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় ভাবে ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এর জন্য মাননিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র কাছে আমরা বগুড়াবাসী অনেক অনেক কৃতজ্ঞ।

 রোমেনা আফাজ-এর এই চাওয়া হয়তো অনেক আগেই ছিল। তাইতো তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর কবিতায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, জীবন কালে যে পেলোনা মালা, চিনিলোনা যাঁরে করি অবহেলা। দিলোনা যাঁর প্রতিভার দাম, মৃত্যুর পর কি হবে তাঁর এ সুনাম। কি হবে আর তাঁহারে স্মরি, কি হবে স্মৃতি সৌধ গড়ি। প্রদীপ যদি নিভে যায়, কি হবে তাহে তৈল ভরি হায়।
আজকের এই দিনে রোমেনা আফাজ-এর আত্মার প্রতি শান্তি কামনা করছি।
লেখক ঃ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী, বগুড়া।
০১৭১৯৭৭১৩৯১



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top