সকাল ৬:১১, রবিবার, ২৫শে জুন, ২০১৭ ইং
/ চট্টগ্রাম / গোপন আস্তানা ‘নিরাপদ’ রাখতে কৌশলী জঙ্গিরা
গোপন আস্তানা ‘নিরাপদ’ রাখতে কৌশলী জঙ্গিরা
মার্চ ১৮, ২০১৭

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে গোপন আস্তানা নিয়ে একের পর এক কৌশল পাল্টাচ্ছে জঙ্গিরা।  তাদের সর্বশেষ কৌশল হচ্ছে মফস্বল কিংবা শহরের উপকন্ঠে জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলা, বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায়। সীতাকুন্ডে দুই জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পর এই প্রশ্নটি সামনে এসেছে পুলিশের কাছে এবং বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, শুরুতে জেএমবির বাংলা ভাইয়ের মতো ভয়ঙ্কর জঙ্গিদের উত্থান হয়েছিল একেবারে গ্রামাঞ্চলে।  সেখানে প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে তুলতে শুরু করে।  সেখানে পুলিশের অভিযানে টিকতে না পেরে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের মতো বড় শহরে আস্তানা গড়ে তুলে।

সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিদের আর মূল শহরে আস্তানা গড়ে তুলতে দেখা যাচ্ছে না বলে  জানিয়েছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম। ডিআইজি বলেন, এখন তারা মহাসড়কের পাশে মফস্বল কিংবা শহরের উপকন্ঠ যেগুলোকে বলে সেগুলো বেছে নিচ্ছে।  এটা তাদের ভিন্ন একটা কৌশল হতে পারে।  হয়ত পুলিশের নজরদারি এড়াতে ব্যস্ততম স্থান থেকে একটু দূরে আসা অথবা মহাসড়কে নাশকতার টার্গেট নিয়ে তারা সেখানে অবস্থান নিচ্ছে। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর উপকন্ঠ হিসেবে পরিচিত উত্তর কাট্টলীতে একটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় র্যাব।  সেখান থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়। এরপর গত ৮ মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই পৌরসভায় জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। ৭ মার্চ রাতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধানে পটিয়ার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। কুমিল্লায় পুলিশের উপর বোমা হামলা করে আটক দুই জঙ্গির তথ্যের ভিত্তিতে মিরসরাইয়ে আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়।  একইভাবে তাদের তথ্যের ভিত্তিতেই পটিয়ায় অভিযান চালানো হয়।


এরপর ১৫ মার্চ আবারও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড পৌরসভায় দুটি আস্তানার সন্ধান পাওয়া গেল। পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মফস্বল কিংবা শহরের উপকন্ঠ ছাড়াও জঙ্গিদের আরেকটি কৌশল সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে।  সেটি হল সংখ্যালঘুদের বসতি যেসব এলাকায় বেশি সেখানে আস্তানা গড়ে তোলা। বিষয়টিকে ‘অ্যালার্মিং’ বলছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) নূরে আলম মিনা। এসপি বলেন, এটা অ্যালার্মিং।  জঙ্গিরা নিয়মিত অবস্থান পাল্টাচ্ছে। আস্তানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নানা কৌশল নিচ্ছে।  মাইনোরিটি এরিয়ায় আস্তানা গড়ে তোলা তাদের একটা কৌশল হতে পারে। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সাখাওয়াত হোসেন  বলেন, সাধারণত মাইনোরিটি যেসব এলাকায় বেশি, সেখানে জঙ্গি আস্তানা করলে সন্দেহ কম হবে।  এর মাঝে নাশকতা ঘটানো তাদের জন্য সহজ হবে।  এটাই সম্ভবত তাদের কৌশল। ১৫ মার্চ সীতাকু-ের ৭ নম্বর পশ্চিম আমিরাবাদ ওয়ার্ডের নামারবাজার এলাকায় যেখানে প্রথম জঙ্গি আস্তানা পাওয়া গেছে সাধন কুটির নামের একটি ভবন থেকে।  বাড়ির মালিক সুভাষ চন্দ্র দাশ নামে এক ব্যবসায়ী।

৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাসুদুল আলম  বলেন, আমাদের এলাকায় মাইনোরিটি-মেজরিটি ফিফটি ফিফটি।  তবে যেখানে সাধন কুটির এর আশপাশের পুরো এলাকায় হিন্দু অধ্যুষিত।  সাধুন কুটিরের প্রায় সব ভাড়াটিয়ায় হিন্দু।  এখানে এসে জঙ্গিদের আস্তানা করার বিষয়টি আমাদের অবাক করেছে। ৫ নম্বর দক্ষিণ মহাদেবপুর ওয়ার্ডের প্রেমতলায় যে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মেলে সেই ছায়ানীড় ভবনের আশপাশের ৭০ ভাগ অধিবাসীই হিন্দু বলে জানালেন স্থানীয় কাউন্সিলর শফিকুল আলম চৌধুরী। কাউন্সিলর শফিকুল বলেন, এই এলাকায় ২২টি হিন্দুদের মন্দির আছে। 

উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় হিন্দুদের তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ ধাম প্রেমতলা থেকে ৫-৭ কিলোমিটার দূরে।  এখানে আমরা দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছি। 

এখানে এসে জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলা আমার কাছে মনে হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নস্যাৎ করার একটা কৌশল। ছায়ানীড় ভবন থেকে ৫০ গজ দূরে সাংবাদিক মিহির চক্রবর্তীর বাড়ি।  তিনি  বলেন, আমার কাকার কাছ থেকে জায়গা কিনে ছায়ানীড় ভবনটি তৈরি করা হয়েছে।  প্রেমতলা পুরোটাই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত।  চৌধুরীপাড়ায় সংখ্যালঘু কম।  প্রেমতলায় আমরা কখনও কোন ধর্মীয় উগ্রতা দেখিনি। সীতাকুন্ড বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বাহার  বলেন, জঙ্গিরা এমন এক জায়গা বেছে নিয়েছে, যেখানে এশিয়ার বৃহত্তম তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ ধাম আছে।  প্রতি বছর এখানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০ লাখ লোক আসে।  এই ধরনের একটা এলাকায় থাকলে পুলিশ সন্দেহ করবে না।  সেই কৌশলটাই নিয়েছিল জঙ্গিরা।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top